Table of Contents
ভূমিকা
মানুষের সভ্যতা তার অস্তিত্বের শুরু থেকেই সময়কে পরিমাপ করার জন্য বিভিন্ন একক নির্ধারণ করেছে, যা প্রধানত পৃথিবীর গতিবিধি এবং সূর্যের সাথে তার সম্পর্কের উপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে। এই এককগুলোর মধ্যে সৌর বছর একটি প্রধান উদাহরণ, যা সূর্যের চারপাশে পৃথিবীর একটি পূর্ণ প্রদক্ষিণ সম্পূর্ণ করতে লাগা সময়কে নির্দেশ করে—প্রায় ৩৬৫.২৪২৫ দিন। এই হিসাবটি বিজ্ঞানীয় পর্যবেক্ষণের ফলাফল, যা আধুনিক গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডারে ১২টি মাসে বিভক্ত করা হয়েছে মানুষের সুবিধার জন্য। এই বিভাজনটি পৃথিবীর অক্ষীয় ঘূর্ণন এবং সৌর প্রদক্ষিণের সাথে সামঞ্জস্য রক্ষা করে, যার ফলে লিপ ইয়ার যোগ করা হয় যাতে ক্যালেন্ডারটি ঋতু চক্রের সাথে মিলে যায়।
এই ক্যালেন্ডার ব্যবস্থা সম্পূর্ণভাবে পৃথিবী-কেন্দ্রিক এবং মানব-নির্মিত। এটি মহাবিশ্বের সার্বজনীন সত্য নয়, বরং একটি গ্রহের স্থানীয় ঘটনা। বিজ্ঞানীয় দৃষ্টিকোণ থেকে, সময়ের এই এককগুলোর অস্তিত্ব নির্ভর করে সূর্য এবং পৃথিবীর উপস্থিতির উপর, যা মহাবিশ্বের সৃষ্টির শুরুতে ছিল না। এই প্রবন্ধে আমরা বিভিন্ন ঐতিহাসিক ক্যালেন্ডারের উদাহরণ দিয়ে দেখাব যে ক্যালেন্ডারগুলো স্থানীয় সংস্কৃতি এবং পর্যবেক্ষণের উপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে, তারপর বিজ্ঞানীয় প্রমাণের ভিত্তিতে মহাবিশ্ব, সূর্য এবং পৃথিবীর বয়স নির্ধারণ করে দেখাব যে কুরআনের সূরা তাওবার ৩৬ নম্বর আয়াতে বর্ণিত “আকাশ-যমীন সৃষ্টির দিন থেকে মাসের সংখ্যা ১২” এই দাবিটি সম্পূর্ণ অসামঞ্জস্যপূর্ণ এবং অযৌক্তিক। এই দাবিটি কোরআনীয় কসমোলজির একটি উদাহরণ যা বিজ্ঞানীয় ফ্যাক্টের সাথে সাংঘর্ষিক, এবং আমরা এর পর্যালোচনা করবো যুক্তি এবং প্রমাণের ভিত্তিতে।
ঐতিহাসিক ক্যালেন্ডার ব্যবস্থা: মানব-নির্মিত বিভাজনের উদাহরণ
প্রাচীনকাল থেকে বিভিন্ন সভ্যতা সময়কে ভিন্নভাবে বিভক্ত করেছে, যা তাদের স্থানীয় পর্যবেক্ষণ এবং সাংস্কৃতিক চাহিদার উপর নির্ভর করেছে। উদাহরণস্বরূপ, প্রাচীন মায়ান ক্যালেন্ডারে পদ্ধতিটি বেশ জটিল ছিল এবং বিভিন্ন দৈর্ঘ্যের মাসে তা বিভক্ত ছিল। মায়ান ক্যালেন্ডারের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চক্রগুলির মধ্যে একটি ছিল টুন, যা ৩৬০ দিনের সমতুল্য। টুনের মধ্যে, মোট ৩৬০ দিনের জন্য প্রতিটি ২০ দিনের ১৮টি মাস ছিল। মাসগুলির নাম মায়া অঞ্চল এবং সময়কালের উপর নির্ভর করে পরিবর্তিত হতো, সেগুলি সাধারণত প্রাকৃতিক ঘটনা বা দেবতাদের নামে নামকরণ করা হয়েছিল। টুন ছাড়াও, মায়ান ক্যালেন্ডারে হাব নামে পরিচিত আরও একটি পৃথক চক্র ছিল, যেটি ৩৬৫ দিন নিয়ে গঠিত ছিল। ১৮টি মাসে এবং প্রতিটি মাস ২০ দিনে বিভক্ত এই ক্যালেন্ডারে শেষ ৫টি দিন “ওয়ায়েব” নামে পরিচিত ছিল [1]। প্রাচীন রোমান সাম্রাজ্যে ১০ মাসে বছরের হিসেবটি করেছিলেন রোমান সম্রাট Romulus। প্রাচীন গ্রীস দ্বারা অনুপ্রাণিত এই রাজা তাদের পদ্ধতিই অনুসরণ করতেন রাজ্য চালাবার স্বার্থে [2]।
এই উদাহরণগুলো দেখায় যে ক্যালেন্ডার ব্যবস্থা কোনো সার্বজনীন বা ঐশ্বরিক বিধান নয়, বরং মানুষের স্থানীয় পর্যবেক্ষণ এবং সুবিধার ফলাফল। অন্য গ্রহে বা মহাকাশে এই হিসাব সম্পূর্ণ ভিন্ন হবে, কারণ এটি পৃথিবীর গতিবিধির উপর নির্ভরশীল।
বৈজ্ঞানিক প্রমাণ: মহাবিশ্ব, সূর্য এবং পৃথিবীর বয়স
বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি যেমন রেডিওমেট্রিক ডেটিং, অ্যাস্ট্রোফিজিক্যাল মডেলিং এবং কসমিক মাইক্রোওয়েভ ব্যাকগ্রাউন্ড (CMB) পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে আমরা মহাবিশ্বের বয়স নির্ধারণ করেছি। বর্তমান অনুমান অনুসারে, মহাবিশ্বের বয়স প্রায় ১৩.৮ বিলিয়ন বছর। এই হিসাবটি ইউরোপিয়ান স্পেস এজেন্সির প্ল্যাঙ্ক মিশনের ডেটা থেকে আসে, যা CMB-এর পরিমাপ করে ১৩.৭৮৭ ± ০.০২০ বিলিয়ন বছর বলে নির্ধারণ করেছে। একটি সাম্প্রতিক গবেষণা এটিকে ২৬.৭ বিলিয়ন বছর বলে প্রস্তাব করেছে, কিন্তু এটি মেইনস্ট্রিম মডেলের সাথে অসামঞ্জস্যপূর্ণ এবং আরও প্রমাণের অভাবে অগ্রাহ্য।
সূর্যের বয়স নির্ধারণ করা হয়েছে প্রায় ৪.৬ বিলিয়ন বছর, যা সৌর নেবুলার ক্লাউড থেকে গঠিত হয়েছে। এই হিসাবটি মিটিওরাইটের রেডিওমেট্রিক ডেটিং এবং স্টেলার ইভোলিউশন মডেল থেকে আসে। পৃথিবীর বয়সও একইভাবে ৪.৫৪ ± ০.০৫ বিলিয়ন বছর, যা মিটিওরাইট এবং পৃথিবীর প্রাচীন শিলার রেডিওমেট্রিক ডেটিং থেকে নির্ধারিত।
এই ফ্যাক্টগুলো দেখায় যে সৃষ্টির প্রথম ৯ বিলিয়ন বছরে সূর্য বা পৃথিবী ছিল না, তাই সৌর বছর বা ১২ মাসের হিসাব অসম্ভব। এটি কোনো ঐশ্বরিক সত্য নয়, বরং প্রাচীন বিশ্বের পৃথিবী-কেন্দ্রিক ভুল ধারণা।
কোরআনীয় দাবিঃ অযৌক্তিকতা এবং অসামঞ্জস্য
কোরআনের সূরা তাওবা, আয়াত ৩৬-এ বলা হয়েছে যে আকাশ-যমীন সৃষ্টির দিন থেকে মাসের সংখ্যা ১২, যা সম্পূর্ণ অযৌক্তিক। এই দাবিটি বিজ্ঞানের সাথে সাংঘর্ষিক, কারণ মাসগুলো পৃথিবীর চাঁদের চক্র বা সৌর বছরের উপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে, যা সৃষ্টির শুরুতে অস্তিত্বহীন ছিল। এটি একটি প্রাচীন আরবীয় সাংস্কৃতিক ধারণা, যা মহাবিশ্বের সার্বজনীন সত্য হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে, কিন্তু যুক্তির আলোকে এটি অন্ধবিশ্বাসমাত্র। [3]
আসমান-যমীন সৃষ্টির দিন থেকেই আল্লাহর কিতাবে (লৌহ মাহফুজে) মাসগুলোর সংখ্যা হল বার। তার মধ্যে চারটি নিষিদ্ধ মাস। এটা হল সুপ্রতিষ্ঠিত দ্বীন। কাজেই ঐ সময়ের মধ্যে নিজেদের উপর যুলম করো না। মুশরিকদের বিরুদ্ধে সর্বাত্মকভাবে যুদ্ধ কর, যেমন তারা তোমাদের বিরুদ্ধে সর্বাত্মকভাবে যুদ্ধ করে। জেনে রেখ, আল্লাহ অবশ্যই মুত্তাকীদের সঙ্গে আছেন।
— Taisirul Quran
নিশ্চয়ই আকাশমন্ডলী ও পৃথিবী সৃষ্টির দিন থেকে আল্লাহর বিধানে মাস গণনায় বারটি। এর মধ্যে বিশেষ রূপে চারটি মাস হচ্ছে সম্মানিত। এটাই হচ্ছে সুপ্রতিষ্ঠিত ধর্ম। অতএব তোমরা এ মাসগুলিতে (ধর্মের বিরুদ্ধাচরণ করে) নিজেদের ক্ষতি সাধন করনা, আর মুশরিকদের বিরুদ্ধে সকলে একযোগে যুদ্ধ কর, যেমন তারা তোমাদের বিরুদ্ধে সকলে একযোগে যুদ্ধ করে। আর জেনে রেখ যে, আল্লাহ মুত্তাকীদের সাথে রয়েছেন।
— Sheikh Mujibur Rahman
নিশ্চয় মাসসমূহের গণনা আল্লাহর কাছে বার মাস আল্লাহর কিতাবে, (সেদিন থেকে) যেদিন তিনি আসমান ও যমীন সৃষ্টি করেছেন। এর মধ্য থেকে চারটি সম্মানিত, এটাই প্রতিষ্ঠিত দীন। সুতরাং তোমরা এ মাসসমূহে নিজদের উপর কোন যুলম করো না, আর তোমরা সকলে মুশরিকদের সাথে লড়াই কর যেমনিভাবে তারা সকলে তোমাদের সাথে লড়াই করে, আর জেনে রাখ, নিশ্চয়ই আল্লাহ মুত্তাকীদের সাথে আছেন।
— Rawai Al-bayan
নিশ্চয় আসমানসমূহ ও যমীনের সৃষ্টির দিন থেকেই [১] আল্লাহ্র বিধানে [২] আল্লাহ্র কাছে গণনায় মাস বারটি [৩], তার মধ্যে চারটি নিষিদ্ধ মাস [৪], এটাই প্রতিষ্ঠিত দীন [৫]। কাজেই এর মধ্যে তোমরা নিজেদের প্রতি যুলুম করো না এবং তোমরা মুশরিকদের সাথে সর্বাত্মকভাবে যুদ্ধ কর, যেমন তারা তোমাদের বিরুদ্ধে সর্বাত্মকভাবে যুদ্ধ করে থাকে। আর জেনে রাখ, নিশ্চয় আল্লাহ্ মুত্তাকীদের সাথে আছেন।
— Dr. Abu Bakr Muhammad Zakaria
এই আয়াতটি একটি প্রাচীন মিথ যা আধুনিক বিজ্ঞানের আলোকে অচল এবং পুরনো যুগের মানুষের চিন্তা হিসেবে ধরে নেয়া যায়। সৃষ্টির শুরুতে সূর্য বা পৃথিবী না থাকলে মাসের হিসাব কীভাবে থাকবে? এটি কোরআনের কসমোলজির একটি ত্রুটি বা দুর্বলতা, যা প্রাচীন যুগের মানুষের সীমিত জ্ঞানের উপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে। সমস্যা হচ্ছে, কোনো প্রমাণ ছাড়াই এসব তথ্যকে কিছু মানুষ ঐশ্বরিক জ্ঞান বলে দাবি করে যা মানুষের মধ্যে কুসংস্কার এবং ধর্মান্ধতার বিকাশ ঘটায়।
তাফসীরসমূহঃ অন্ধবিশ্বাসের আরো প্রসার
তাফসীরে মাযহারীতে [4] এই আয়াতের ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে যে সৃষ্টির সূচনালগ্ন থেকে এই বিধান প্রচলিত, এবং বছরে ১২ মাসের মধ্যে চারটি নিষিদ্ধ। কিন্তু এটি বিজ্ঞানীয় ফ্যাক্টের সাথে অসামঞ্জস্যপূর্ণ, কারণ এটি মহাবিশ্বের বয়সকে উপেক্ষা করে।
আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীর সৃষ্টির দিন হইতেই আল্লাহের বিধানে আল্লাহের নিকট মাস গণনায় মাস বারটি, তন্মধ্যে চারটি নিষিদ্ধ মাস, ইহাই সুপ্রতিষ্ঠিত বিধান; সুতরাং ইহার মধ্যে তোমরা নিজদিগের প্রতি জুলুম করিও না এবং তোমরা অংশীবাদীদিগের সহিত সমবেতভাবে যুদ্ধ করিবে যেমন তাহারা তোমাদিগের বিরুদ্ধে সমবেতভাবে যুদ্ধ করিয়া থাকে। এবং জানিয়া রাখ, আল্লাহ্ সাবধানীদিগের সঙ্গে আছেন।
এক বৎসরে মাস রয়েছে বারোটি। বৎসর ও মাস গণনায় এই নিয়মটি আল্লাহতায়ালার বিধানাধীন। সৃষ্টির সূচনালগ্ন থেকেই এই বিধানটি প্রচলিত। এখানে আল্লাহ্ বিধানের অর্থ আল্লাহতায়ালার কিতাব। অর্থাৎ লওহে মাহফুজ।
বৎসরের বারো মাসের মধ্যে সম্পাদন করতে হয় বিভিন্ন ইবাদত। যেমন জিলহজ মাসে সম্পাদন করতে হয় হজ। রমজান মাসে রাখতে হয় রোজা। আবার বৎসর অন্তে দিতে হয় জমানো সম্পদের জাকাত। এর মধ্যে আবার চারটি মাস যুদ্ধ বিগ্রহ নিষিদ্ধ। এই চারটি মাসের মধ্যে তিনটি মাস পরস্পর লগ্ন-

তাফসীরে জালালাইনে [5] পৃথিবীর বয়সকে ৭০০০ বছর বলা হয়েছে, যা বিজ্ঞানীয় প্রমাণের সাথে সম্পূর্ণ অসামঞ্জস্যপূর্ণ। এটি একটি অন্ধবিশ্বাস যা কোনো প্রমাণ ছাড়াই প্রচারিত, এবং বিজ্ঞান এটিকে প্রত্যাখ্যান করে।
قَوْلُهُ مُدَةُ الدُّنْيَا : বিভিন্ন রেওয়ায়েত দ্বারা জানা যায় যে, পৃথিবীর বয়স সাত হাজার বছর। আর রাসূল-এর প্রেরণ হয়েছে ষষ্ঠ হাজারের শুরুতে। আবার কতিপয় র্তা এটার উপর বুঝাচ্ছে যে, রাসূল-এর উম্মতের বয়স হাজার বছর হতে বেশি হবে তবে এই বৃদ্ধি পাঁচশত বছরের বেশি হবে না।

ওয়াজ ও মাদ্রাসায় অন্ধবিশ্বাসের প্রচার
আমাদের মাদ্রাসাগুলোতে ইসলামিক আলেমগণ তাদের গ্রন্থ থেকে পৃথিবীর বয়সকে হাজার বছরের সীমায় রাখেন, যা বিজ্ঞানের সাথে সাংঘর্ষিক। এই শিক্ষা যুক্তির পরিবর্তে অন্ধবিশ্বাস প্রচার করে, যা সমাজের অগ্রগতিকে বাধাগ্রস্ত করে। আসুন একটি ওয়াজ শুনি,
উপসংহার
যুক্তি, প্রমাণ এবং বৈজ্ঞানিক পর্যবেক্ষণ আমাদের শেখায় যে সময় একটি আপেক্ষিক একক। আসমান-জমিন বা মহাবিশ্ব সৃষ্টির শুরু থেকে ‘বারো মাস’ নির্ধারিত থাকার দাবিটি জ্যোতির্বিজ্ঞান এবং মহাজাগতিক বিবর্তনের ইতিহাসের সাথে সরাসরি সাংঘর্ষিক। ধর্মীয় বিশ্বাসের এই দাবিগুলো মূলত প্রাচীন মানুষের সীমিত মহাজাগতিক ধারণার ফসল, যা আধুনিক বিজ্ঞানের কষ্টিপাথরে উত্তীর্ণ হতে ব্যর্থ। তথাকথিত ঐশী বাণীর চেয়ে বস্তুগত প্রমাণ এবং গাণিতিক যুক্তিই সত্য নির্ধারণের একমাত্র নির্ভরযোগ্য পথ।
তথ্যসূত্রঃ
- মায়ান ক্যালেন্ডার ↩︎
- রোমান ক্যালেন্ডার ↩︎
- সূরা তওবা, আয়াত ৩৬ ↩︎
- তাফসীরে মাযহারী, ৫ম খণ্ড, পৃষ্ঠা ৩২৮, ৩২৯ ↩︎
- তাফসীরে জালালাইন, পঞ্চম খণ্ড, ইসলামিয়া কুতুবখানা, পৃষ্ঠা ৯২ ↩︎
