
Table of Contents
- 1 ভূমিকা
- 2 হাদিসের বিবরণঃ নববী চিকিৎসা পদ্ধতি
- 3 ঘটনার কুশীলব ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট
- 4 চিকিৎসা পদ্ধতির খুঁটিনাটিঃ “লুঙ্গির ভেতরের অংশ” ধোয়া পানি
- 5 লিঙ্গ ধোয়া পানির চিকিৎসাঃ আধুনিক ফতোয়া
- 6 কেন এই পদ্ধতি প্রয়োগ করা হলো?
- 7 চিকিৎসা পদ্ধতির তাত্ত্বিক ও বৈজ্ঞানিক অসঙ্গতি
- 8 মনস্তাত্ত্বিক ও যৌন-প্রবৃত্তিগত বিশ্লেষণঃ ‘নজর’ বনাম অবদমিত আকর্ষণ
- 9 উপসংহার
ভূমিকা
মানবসভ্যতার ইতিহাসে আদিম যুগে রোগ-ব্যধির কারণ হিসেবে অলৌকিক বা অতিপ্রাকৃত শক্তিকে দায়ী করার প্রবণতা ছিল প্রবল। ইসলামি ঐতিহ্যেও এর ব্যতিক্রম ঘটেনি। ইসলামি চিকিৎসা বিজ্ঞানের (Prophetic Medicine) একটি বড় অংশ জুড়ে রয়েছে ‘বদনজর’ (Evil Eye) বা ‘আল-আইন’-এর ধারণা। দাবি করা হয় যে, কারো প্রশংসাসূচক বা ঈর্ষাতুর দৃষ্টির মাধ্যমে অন্য ব্যক্তি শারীরিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়তে পারে। এই অলৌকিক সমস্যার সমাধানের জন্য শরিয়াহ আইনে এমন এক চিকিৎসা পদ্ধতির বর্ণনা দেওয়া হয়েছে, যা আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞান ও সাধারণ হাইজিনের (Hygiene) মানদণ্ডে কেবল অবৈজ্ঞানিকই নয়, বরং চরম অস্বাস্থ্যকর ও কৌতুকপূর্ণ। অত্র প্রবন্ধে আমরা ধ্রুপদী হাদিসের আলোকে বদনজরের চিকিৎসা পদ্ধতি এবং এর যৌক্তিক অসারতা নিয়ে আলোচনা করব।
হাদিসের বিবরণঃ নববী চিকিৎসা পদ্ধতি
নবী মুহাম্মদ এবং তার ইসলাম যে কতটা উদ্ভট, বিকট এবং হাস্যকর, তা বোঝার জন্য এই হাদিসগুলো খুব গভীরভাবে পর্যালোচনা করা খুবই জরুরি। আপনারা নিশ্চয়ই জানেন যে, নবী মুহাম্মদ উটের প্রস্রাব পান করার পরামর্শ দিতেন রোগের চিকিৎসা হিসেবে [1], এবারে দেখুন আরও এক ভয়াবহ বিষয়। নবী মুহাম্মদ পুরুষাঙ্গ এবং পশ্চাৎদেশ ধোয়া পানি দিয়ে গোসল করিয়ে বদনজরের চিকিৎসা করতেন। আসুন হাদিসগুলো পড়ি, [2] [3] [4]
সুনান ইবনু মাজাহ
২৫/ চিকিৎসা
পরিচ্ছেদঃ ২৫/৩২. বদনজর
৪/৩৫০৯। আবূ উমামা ইবনে হুনাইফ (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমের ইবনে রবীআ (রাঃ) সাহল ইবনে হুনাইফ (রাঃ)-র নিকট দিয়ে যাচ্ছিলেন। তিনি তখন গোসল করছিলেন। আমের (রাঃ) বলেন, আমি এমন খুবসুরত সুপুরুষ দেখিনি, এমনকি পর্দানশীন নারীকেও এরূপ সুন্দর দেখিনি, যেমন আজ দেখলাম। অতঃপর কিছুক্ষণের মধ্যেই সাহল (রাঃ) বেহুঁশ হয়ে পড়ে গেলেন। তাকে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর নিকট নিয়ে যাওয়া হলো এবং তাঁকে বলা হলো, ধরাশায়ী সাহলকে রক্ষা করুন। তিনি জিজ্ঞেস করলেনঃ তোমরা কাকে অভিযুক্ত করছো? তারা বললো, আমের ইবনে রবীআকে। তিনি বলেনঃ তোমাদের কেউ বদনজর লাগিয়ে তার ভাইকে কেন হত্যা করতে চায়? তোমাদের কেউ তার ভাইয়ের মনোমুগ্ধকর কিছু দেখলে যেন তার জন্য বরকতের দোয়া করে। অতঃপর তিনি পানি নিয়ে ডাকলেন, অতঃপর আমেরকে উযু করতে নির্দেশ দিলেন। তিনি তার মুখমণ্ডল , দু’ হাত কনুই পর্যন্ত, দু’ পা গোছা পর্যন্ত এবং লজ্জাস্থান ধৌত করলেন। তিনি আমেরকে পাত্রের পানি সাহলের উপর ঢেলে দেয়ার নির্দেশ দিলেন। তিনি সাহলের পেছন দিক থেকে পানি ঢেলে দেয়ার জন্য আমেরকে নির্দেশ দেন।
আহমাদ ১৫৫৫০, মুয়াত্তা মালেক ১৭৪৭, মিশকাত ৪৫৬২। তাহকীক আলবানীঃ সহীহ।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আবূ উমামা ইবনে হুনাইফ
মুয়াত্তা মালিক
৫০. বদনজর সংক্রান্ত অধ্যায়
পরিচ্ছেদঃ ১. বদ নজরের প্রভাব হইতে মুক্তির জন্য ওযু করা প্রসঙ্গে
রেওয়ায়ত ২. আবূ উসামা ইবন সহল (রহঃ)-এর রেওয়ায়ত, ’আমির ইবনে রবী’আ সহল ইবনে হানীফকে গোসল করিতে দেখিয়া বলিলেন, আজ আমি যেই সুন্দর মানুষ দেখিলাম, এই রকম কাহাকেও দেখি নাই, এমন কি সুন্দরী যুবতীও এত সুন্দর দেহবিশিষ্ট দেখি নাই। (আমিরের) এই কথা বলার সাথে সাথে সহল সেখানে লুটাইয়া পড়িল। এক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামের খেদমতে হাযির হইয়া আরয করিল, ইয়া রাসূলাল্লাহ্! আপনি সহল ইবনে হুনাইফ (বা হানীফ)-এর কিছু খবর রাখেন কি? আল্লাহর কসম! সে মস্তক উত্তোলন করিতে পারিতেছে না। তখন রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলিলেন, তুমি কি মনে করিতেছ যে, তাহাকে কেহ বদনজর দিয়াছে লোকটি বলিল, হ্যাঁ, আমর ইবন রবী’আ (বদনজর দিয়াছে)। অতঃপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ’আমির ইবন রবী’আকে ডাকিয়া ক্রোধান্বিত হইয়া তাহাকে বলিলেন, তোমাদের কেহ নিজের মুসলিম ভাইকে কেন নিহত করিতেছ? তুমি (بارك الله) কেন বলিলে না? এইবার তুমি তাহার জন্য গোসল কর। অতএব আমির হাত, মুখ, হাতের কনুই, হাটু, পায়ের আশেপাশের স্থান এবং লুঙ্গির নিচের আবৃত দেহাংশ ধৌত করিয়া ঐ পানি একটি বরতনে জমা করিল। সেই পানি সাহলের দেহে ঢালিয়া দেওয়া হইল। অতঃপর সাহল সুস্থ হইয়া গেল এবং সকলের সঙ্গে রওয়ানা হইল।
হাদিসের মানঃ তাহকীক অপেক্ষমাণ

ঘটনার কুশীলব ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট
এই হাদিসটি মূলত মদিনার প্রাথমিক যুগের একটি ঘটনা। এখানে দুইজন বিশিষ্ট সাহাবীর নাম জড়িয়ে আছে:
তিনি ছিলেন মদিনার আনসারদের মধ্যে অন্যতম এবং অত্যন্ত সুপুরুষ। হাদিসে বর্ণিত হয়েছে যে, তার গায়ের চামড়া এতই সুন্দর ছিল যে, তৎকালীন আরবের “পর্দানশীন কুমারী মেয়েদের” সৌন্দর্যের সাথেও তাকে তুলনা করা হতো।
তিনি ছিলেন একজন মুহাজির সাহাবী। তিনি যখন সাহলকে গোসল করতে দেখেন এবং তার রূপের প্রশংসা করেন, তখনই বিপত্তি ঘটে। আমের বলেছিলেন, “আমি আজকের মতো এত সুন্দর দৃশ্য এবং এত সুন্দর চামড়া কখনও দেখিনি, এমনকি কোনো পর্দানশীন কুমারী মেয়েরও নয়”।
ঘটনা: আমের যখন সাহলকে দেখে বললেন, “আমি আজ পর্যন্ত এমন চামড়া দেখিনি, এমনকি পর্দানশীন কুমারী নারীরও না”, তখনই সাহল অসুস্থ হয়ে পড়ে যান। নবী মুহাম্মদ এই ঘটনা শুনে ক্রুদ্ধ হন এবং আমেরকে অভিযুক্ত করেন যে তিনি তার ভাইকে প্রায় “হত্যা” করে ফেলছিলেন। [5]
চিকিৎসা পদ্ধতির খুঁটিনাটিঃ “লুঙ্গির ভেতরের অংশ” ধোয়া পানি
নবী মুহাম্মদ আমেরকে যে বিশেষ পদ্ধতিতে ওযু করার নির্দেশ দিয়েছিলেন, তা আধুনিক হাইজিনের দৃষ্টিকোণ থেকে চরম কৌতুকপূর্ণ। হাদিসে বর্ণিত পদ্ধতিটি হলো:
বদনজরের প্রতিকার হিসেবে ওযুর একটি বিশেষ পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়। এর সাধারণ অংশের মধ্যে রয়েছে মুখমণ্ডল, দুই হাত এবং দুই পা ধোয়া। এটি মূলত নজর দেওয়া ব্যক্তির পবিত্রতা অর্জনের একটি প্রাথমিক ধাপ হিসেবে গণ্য করা হয় [6]।
হাদিসের বর্ণনায় আমেরকে তার “লুঙ্গির ভেতরের অংশ” (Maza Tahti al-Izar) ধৌত করার নির্দেশ দেওয়া হয়। এটি দ্বারা মূলত পুরুষের গোপন অঙ্গ বা লজ্জাস্থান ও পশ্চাৎদেশ ধোয়াকে বোঝানো হয়েছে। ধ্রুপদী ব্যাখ্যাগ্রন্থ ‘ফাতহুল বারী’ বা ‘শরহে নববী’ অনুযায়ী এটি দ্বারা কেবল ঊরু নয়, বরং সরাসরি গোপন অঙ্গ ও পশ্চাৎদেশ ধোয়াকেই বোঝানো হয়। এই বিশেষ অংশটি ধৌত করা বদনজরের প্রভাব দূর করার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে হাদিসে বর্ণিত হয়েছে [7]।
আমের যখন নির্দেশিত অংশগুলো ধুয়ে সেই পানি একটি পাত্রে জমা করেন, তখন সেই পানি সাহল ইবনে হুনাইফের পিঠের দিক থেকে তার মাথায় এবং শরীরে ঢেলে দেওয়া হয়। এই প্রক্রিয়ার উদ্দেশ্য ছিল নজর লাগার ফলে তৈরি হওয়া শারীরিক অসুস্থতা বা সংকেত দূর করা এবং সাহলের সুস্থতা নিশ্চিত করা [8]।
লিঙ্গ ধোয়া পানির চিকিৎসাঃ আধুনিক ফতোয়া
এবারে আসুন একটি আধুনিক ফতোয়া পড়ে নিই, যা কাতারভিত্তিক বিখ্যাত ফতোয়া ওয়েবসাইট islamweb ওয়েবসাইটে দেয়া আছে [9]
ما هي كيفية اغتسال العائن؟ وهل هو اغتسال كامل أم غسل المواضع المذكورة في الحديث فقط؟ وهل داخلة الإزار تقصد بها العورة؟ وهل يجزئ الوضوء فقط؟ وما صفته في هذه الحالة؟.
الإجابــة
الحمد لله، والصلاة والسلام على رسول الله، وعلى آله وصحبه، أما بعد:
فإنه قد أمر الشرع العائن بالوضوء أو الاغتسال لدفع ضرر العين بعد وقوعها، ثم يغتسل المصاب بالماء الذي توضأ به العائن، فعن عائشة ـ رضي الله عنها ـ قالت: كان يؤمر العائن فيتوضأ ثم يغسل منه المعين.. رواه أبو داود، قال النووي في الأذكار: بإسناد صحيح على شرط البخاري ومسلم ـ وصححه الألباني.
وعن أبي أمامة سهل بن حنيف أنه قال: رأى عامر بن ربيعة سهل بن حنيف يغتسل فقال: ما رأيت كاليوم ولا جلد مخبأة ـ يعني من شدة بياضه ـ فلبط ـ أي صرع وسقط على الأرض ـ سهل، فأتى رسول الله صلى الله عليه وسلم فقيل: يا رسول الله؛ هل لك في سهل بن حنيف والله ما يرفع رأسه، فقال: هل تتهمون له أحداً؟ قالوا: نتهم عامر بن ربيعة، قال: فدعا رسول الله صلى الله عليه وسلم عامراً، فتغيظ عليه وقال: علام يقتل أحدكم أخاه؟! ألا بركت، اغتسل له، فغسل عامر وجهه ويديه ومرفقيه وركبتيه وأطراف رجليه وداخلة إزاره في قدح، ثم صب عليه، فراح سهل مع الناس ليس به بأس. رواه مالك وأحمد وابن ماجه، وصححه الألباني.
قال ابن بطال في شرح صحيح البخاري: فيه من الفقه أنه إذا عرف العائن أنه يقضى عليه بالوضوء لأمر النبي عليه السلام بذلك، وأنها نشرة ينتفع بها. اهـ.
وقال النووي في المجموع: الاستغسال أن يقال للعائن ـ وهو الناظر بعينه بالاستحسان ـ اغسل داخلة إزارك مما يلي الجلد بماء، ثم يصب ذلك الماء على المعين، وهو المنظور إليه.
وأما صفة الوضوء أو الغسل المطلوبة ومعنى غسل داخلة الغزار: فقد قال فيه الباجي: وفي حديث الزهري: اغتسل له إلا أنه فسر الغسل بفعل الوضوء، والوضوء غسل الأعضاء المخصوصة به، وروي عن يحيى بن يحيى عن ابن نافع في معنى الوضوء الذي أمر به رسول الله صلى الله عليه وسلم فقال: يغسل الذي يتهم للرجل وجهه ويديه ومرفقيه وركبتيه ورجليه وداخلة إزاره، قال عيسى بن دينار: إنما يغسل يديه ومرفقيه ولا يغسل ما بين اليد والمرفق، وروي عن الزهري أنه قال: الغسل الذي أدركنا علماءنا يصفونه أن يؤتى العائن بقدح فيه ماء فيمسك مرتفعا من الأرض فيدخل فيه كفه فيمضمض، ثم يمجه في القدح، ثم يغسل وجهه في القدح صبة واحدة، ثم يدخل يده اليسرى فيصب بها على كفه اليمنى، ثم يدخل يده اليمنى فيصب بها على ظهر كفه اليسرى صبة واحدة، ثم يدخل يده اليسرى فيصب بها على مرفقه الأيمن، ثم يدخل يده اليمنى فيصب على مرفقه الأيسر، ثم يدخل يده اليسرى فيصب بها على قدمه اليمنى، ثم يدخل يده اليمنى فيصب بها على قدمه الأيسر، ثم يدخل يده اليسرى فيصب بها على ركبته اليمنى، ثم يدخل يده اليمنى فيصب بها على ركبته اليسرى كل ذلك في قدح، ثم يدخل داخلة إزاره في القدح ولا يوضع القدح في الأرض، فيصب على رأس المعين من خلفه صبة واحدة، وقيل يغتفل ويصب عليه، ثم يكفأ القدح على ظهر الأرض وراءه، وأما داخلة إزاره فهو الطرف المتدلي الذي يفضي من مئزره إلى جلده كأنه إنما يمر بالطرف الأيمن على الأيسر حتى يشده بذلك الطرف المتدلي الذي يكون من داخل، قال يحيى بن يحيى عن ابن نافع: لا يغسل موضع الحجزة من داخل الإزار، وإنما يغسل الطرف المتدلي. اهـ.
والله أعلم.
ফতোয়া নম্বর: ২৯৭২২৬
শিরোনাম: নজরদাতা ও আক্রান্ত ব্যক্তির গোসল করার পদ্ধতি
প্রশ্ন:
বদনজরের ক্ষেত্রে নজরদাতা (العائن) কীভাবে ওযু করবেন এবং আক্রান্ত ব্যক্তি (المعين) সেই পানি দিয়ে কীভাবে গোসল করবেন তার সঠিক পদ্ধতি কী? দয়া করে বিস্তারিত জানাবেন।
উত্তর:
সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর জন্য। সালাত ও সালাম বর্ষিত হোক রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর ওপর, তাঁর পরিবার ও তাঁর সাহাবীদের ওপর। অতঃপর:
বদনজরের চিকিৎসার জন্য নজরদাতার ধোয়া পানি দিয়ে আক্রান্ত ব্যক্তির গোসল করার পদ্ধতিটি সহীহ সুন্নাহ দ্বারা প্রমাণিত। আবু উমামা ইবনে সাহল ইবনে হুনাইফ (রা.)-এর বর্ণিত দীর্ঘ হাদিসে এর বিস্তারিত বিবরণ পাওয়া যায়। সেখানে বলা হয়েছে:
“নবী (সা.) আমের ইবনে রবিআ (রা.)-কে (যিনি নজর দিয়েছিলেন) গোসল করার নির্দেশ দিলেন। তখন আমের একটি পাত্রে তার মুখমণ্ডল, দুই হাত, দুই কনুই, দুই হাঁটু, দুই পায়ের আঙ্গুলসমূহ এবং লুঙ্গির ভেতরের অংশ (দাখিলাতিল ইযার) ধুয়ে নিলেন। এরপর সেই পানি সাহল ইবনে হুনাইফের (আক্রান্ত ব্যক্তি) মাথার ওপর দিয়ে পেছন দিক থেকে ঢেলে দেওয়া হলো। এতে তিনি তৎক্ষণাৎ সুস্থ হয়ে গেলেন।” [10]।
ইমাম ইবনুল কাইয়্যিম (রহ.) তার ‘যাদুল মা’আদ’ গ্রন্থে এই গোসলের পদ্ধতি আরও বিস্তারিতভাবে বর্ণনা করেছেন। আলেমদের বর্ণনা অনুযায়ী এই পদ্ধতির সারসংক্ষেপ নিম্নরূপ:
১. নজরদাতার (العائن) ধোয়ার নিয়ম:
একটি পানির পাত্র নেওয়া হবে এবং তা মাটিতে রাখা হবে না। নজরদাতা সেই পাত্রে হাত চুবিয়ে প্রথমে কুলি করবেন এবং সেই পানি পাত্রেই ফেলবেন। এরপর তিনি তার মুখমণ্ডল ধোবেন। এরপর বাম হাত দিয়ে ডান হাতের কব্জি পর্যন্ত এবং ডান হাত দিয়ে বাম হাতের কব্জি পর্যন্ত ধোবেন। এরপর বাম হাত দিয়ে ডান কনুই এবং ডান হাত দিয়ে বাম কনুই ধোবেন। এরপর দুই হাঁটু এবং দুই পায়ের আঙ্গুলের প্রান্তভাগ ধোবেন। সবশেষে তিনি তার ‘দাখিলাতিল ইযার’ (داخلة الإزار) অর্থাৎ লুঙ্গির ভেতরের অংশ বা শরীরের গোপন অঙ্গ সংলগ্ন চামড়া ধোবেন। এই সমস্ত ধোয়া পানি সেই পাত্রেই জমা হতে হবে। [11]।
২. আক্রান্ত ব্যক্তির (المعين) ব্যবহারের নিয়ম:
পাত্রে জমানো সেই পানি নিয়ে আক্রান্ত ব্যক্তির মাথার ওপর ঢেলে দিতে হবে। ঢালার সময় আক্রান্ত ব্যক্তির পেছন দিক থেকে এমনভাবে ঢালতে হবে যেন পানি তার পুরো পিঠ এবং শরীরে ছড়িয়ে পড়ে। হাদিসের নির্দেশনা অনুযায়ী, পাত্রটি পেছন থেকে উপুড় করে সবটুকু পানি একবারে ঢেলে দেওয়া উত্তম। [12]।
৩. মূল শিক্ষা:
আলেমগণ উল্লেখ করেছেন যে, এই পদ্ধতিতে যে অঙ্গগুলো ধুতে বলা হয়েছে, সেগুলো মূলত মানুষের তেজ ও উত্তেজনার কেন্দ্র। বিশেষ করে গোপন অঙ্গ বা তার চারপাশের অংশ ধোয়ার রহস্য হলো নফসের কুপ্রভাবের উৎসকে নির্মূল করা। এটি একটি আধ্যাত্মিক চিকিৎসা, যার কার্যকারিতা ওহীর মাধ্যমে প্রমাণিত। যখনই কোনো মুসলিমের বদনজর লাগার স্পষ্ট লক্ষণ দেখা দেবে, তখন এই সুন্নাহসম্মত পদ্ধতিটি অবলম্বন করা উচিত।
আল্লাহই ভালো জানেন।
কেন এই পদ্ধতি প্রয়োগ করা হলো?
ইসলামি বিশ্বাস অনুযায়ী, বদনজর বা ‘আল-আইন’ একটি বাস্তব সত্য। মুহাম্মদ বলেছিলেন, “বদনজর সত্য, যদি ভাগ্যকে কিছু অতিক্রম করতে পারত তবে বদনজর তা করত।” [13]
তাত্ত্বিকভাবে মনে করা হয় যে, যে ব্যক্তির নজর লেগেছে তার শরীরে এক ধরণের “বিষাক্ত” বা “নেতিবাচক” আধ্যাত্মিক শক্তি জমা হয়। সেই ব্যক্তির গোপন অঙ্গ এবং শরীরের বিভিন্ন অঙ্গ ধোয়া পানি দিয়ে আক্রান্ত ব্যক্তিকে গোসল করালে সেই নেতিবাচক শক্তি প্রশমিত হয়। এটি মূলত একটি আধ্যাত্মিক “এন্টিডোট” বা প্রতিষেধক হিসেবে কাজ করে বলে তারা দাবি করে।
চিকিৎসা পদ্ধতির তাত্ত্বিক ও বৈজ্ঞানিক অসঙ্গতি
এই হাদিস এবং এর চিকিৎসা পদ্ধতি নিয়ে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ যৌক্তিক ও বৈজ্ঞানিক প্রশ্ন ওঠে –
মনস্তাত্ত্বিক ও যৌন-প্রবৃত্তিগত বিশ্লেষণঃ ‘নজর’ বনাম অবদমিত আকর্ষণ
এই হাদিসটির একটি গভীর মনস্তাত্ত্বিক দিক হলো আমের ইবনে রবীআ-র প্রতিক্রিয়া। সাহল ইবনে হুনাইফ যখন নগ্ন হয়ে গোসল করছিলেন, তখন আমের তার দেহের গঠন ও চামড়ার উজ্জ্বলতা দেখে যেভাবে বিমোহিত হয়েছিলেন, তাতে স্পষ্ট সমকামী কামনাবাসনার (Homoerotic desire) প্রতিফলন লক্ষ্য করা যায়।
আমের বলেছিলেন, “আমি আজ পর্যন্ত এমন চামড়া দেখিনি, এমনকি পর্দানশীন কুমারী নারীরও না।” একজন পুরুষ সাহাবীর সৌন্দর্য বোঝাতে গিয়ে “কুমারী নারীর” উপমা ব্যবহার করা এবং তার নগ্ন দেহে দৃষ্টি নিবদ্ধ রাখা নির্দেশ করে যে, আমেরের এই মুগ্ধতা কেবল নান্দনিক ছিল না, বরং তা ছিল যৌনতাপূর্ণ। আমেরের এই সরাসরি তুলনা সাহলের পুরুষালি সৌন্দর্যের প্রতি তার তীব্র জৈবিক আকর্ষণেরই বহিঃপ্রকাশ হিসেবে বিশ্লেষণ করা যেতে পারে। সাহলের এই “বেহুঁশ হওয়া” মূলত কোনো অতিপ্রাকৃত নজর নয়, বরং প্রচণ্ড গরম (মদিনার উত্তাপ) বা ডিহাইড্রেশন কিংবা মানসিক উত্তেজনাজনিত ‘সাইকোসোমাটিক প্রতিক্রিয়া’ হতে পারে।
তৎকালীন আরবের কঠোর রক্ষণশীল এবং লিঙ্গ-বিভেদপূর্ণ সমাজে (Gender-segregated society) পুরুষের সাথে পুরুষের এই ধরণের আকর্ষণকে সরাসরি স্বীকার করার কোনো পথ ছিল না। আধুনিক মনোবিজ্ঞানের ভাষায় একে ‘Repressed Homosexuality’ বা অবদমিত সমকামিতার একটি রূপ হিসেবে বিশ্লেষণ করা যায়। নিজের অবদমিত অনুভূতির ‘অপরাধবোধ’ (Guilt) থেকে মুক্তি পেতে একে ‘বদনজর’ বা ‘অশুভ শক্তি’ হিসেবে লেবেল করে শয়তানি নজর হিসেবে চিত্রায়িত করা হয়ে থাকতে পারে। মনোবৈজ্ঞানিক বিচারে যখন কোনো তীব্র আকাঙ্ক্ষাকে সমাজ বা ধর্মীয় কারণে অবদমিত করা হয়, তখন তা প্রায়শই অতিপ্রাকৃত ভীতি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে।
মজার বিষয় হলো, নবী মুহাম্মদ যে চিকিৎসা দিলেন, তাতে নজরদাতা ব্যক্তির লজ্জাস্থান ও পশ্চাৎদেশ ধোয়া পানি ব্যবহার করা হয়েছে। এটি এক ধরণের প্রতীকী যৌন বিনিময় বা অবমাননা। নজরদাতার যৌন অঙ্গ ধোয়া পানি নজরলাগা ব্যক্তির শরীরে ঢেলে দেওয়ার এই রিচুয়াল মূলত একটি ‘যৌন ফ্যান্টাসি’ বা আদিম কোনো জাদুটোনারই নামান্তর, যেখানে শরীরের গোপন অংশের তরলকে অলৌকিক শক্তির উৎস মনে করা হতো। প্রাচীন অনেক সংস্কৃতিতেই বীর্য বা যৌন অঙ্গ সংলগ্ন তরলকে আধ্যাত্মিক বা নিরাময়কারী ক্ষমতার আধার হিসেবে বিশ্বাস করা হতো যা এখানে দৃশ্যমান।
আধুনিক ফ্রয়েডীয় মনোবিজ্ঞানের (Freudian Psychology) দৃষ্টিতে, একজনের গোপন অঙ্গ ধোয়া পানি অন্যজনের শরীরে ঢেলে দেওয়া এক ধরণের ‘ডিসপ্লেসমেন্ট’ (Displacement) বা অবদমিত যৌন ক্রিয়ারই একটি আধ্যাত্মিক রূপান্তর। এটি অবদমিত লিবিডো বা কামনার এমন একটি বহিঃপ্রকাশ, যা সরাসরি যৌন আচরণের বদলে ধর্মীয় রিচুয়ালের ছদ্মবেশ ধারণ করে। সিগমুন্ড ফ্রয়েডের তত্ত্ব অনুযায়ী, যখন মানুষের অবদমিত কামনা সরাসরি প্রকাশিত হতে পারে না, তখন তা প্রায়শই ভিন্ন কোনো প্রতীকী বা রিচুয়ালিস্টিক রূপ গ্রহণ করে যা এখানে স্পষ্ট। খুব সম্ভবত নবী মুহাম্মদ সাহাবী আমের ও সাহলের এই সমকামী চরিত্র সম্পর্কে অবগত ছিলেন, তাই এই চিকিৎসা করিয়েছিলেন।
এই ধরণের বর্ণনা প্রমাণ করে যে, তৎকালীন সময়ে পুরুষের প্রতি পুরুষের আকর্ষণকে ‘বদনজর’ তত্ত্বে রূপান্তর করে এক ধরণের সামাজিক ও ধর্মীয় সমাধান দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছিল, যা আধুনিক যৌনমনস্তত্ত্বের (Sexual Psychology) আলোকে অত্যন্ত হাস্যকর ও আদিম।
উপসংহার
পরিশেষে বলা যায়, বদনজরের এই চিকিৎসা পদ্ধতিটি সপ্তম শতাব্দীর আরবীয় লোকজ কুসংস্কারের একটি উৎকৃষ্ট উদাহরণ। লজ্জাস্থান বা পশ্চাৎদেশ ধোয়া পানি দিয়ে গোসল করানো কিংবা উটের প্রস্রাব পান করার মতো বিষয়গুলো প্রমাণ করে যে, ইসলামি চিকিৎসা পদ্ধতি কোনো ঐশী জ্ঞান নয়, বরং তৎকালীন সময়ের সীমিত ও ভুল ধারণার সমষ্টি। সাহল ইবনে হুনাইফের এই ঘটনাটি ইসলামি চিকিৎসার অন্ধকার দিকটি উন্মোচন করে। লজ্জাস্থান ধোয়া পানি দিয়ে গোসল করিয়ে রোগ সারানোর দাবি যেমন হাস্যকর, তেমনই এটি বৈজ্ঞানিক উৎকর্ষের পরিপন্থী। মুহাম্মদ যেখানে নিজেকে “বিশ্বজগতের রহমত” দাবি করেছেন, সেখানে তার দেওয়া চিকিৎসা পদ্ধতিগুলো মূলত সপ্তম শতাব্দীর জরাজীর্ণ কুসংস্কারের বেশি কিছু ছিল না। আধুনিক পৃথিবীতে এই জাতীয় পদ্ধতি কেবল অবৈজ্ঞানিকই নয়, বরং চরম অস্বাস্থ্যকর ও মানবাধিকারের দৃষ্টিকোণ থেকে অবমাননাকর।
তথ্যসূত্রঃ
- ইসলামে উটের প্রস্রাব হালাল ও পবিত্র ↩︎
- সুনান ইবনু মাজাহ, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, হাদিসঃ ৩৫০৯ ↩︎
- মুয়াত্তা মালিক, হাদিসঃ ১৭৪৬ ↩︎
- সুনান ইবনু মাজাহ, ৩য় খণ্ড, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, হাদিসঃ ৩৫০৯ ↩︎
- মুয়াত্তা মালিক, হাদিস নং ১৭৪৬ ↩︎
- সুনান ইবনু মাজাহ, হাদিস নং ৩৫০৯ ↩︎
- সুনান ইবনু মাজাহ, হাদিস নং ৩৫০৯; ফাতহুল বারী, ১০ম খণ্ড ↩︎
- মুসনাদে আহমাদ, হাদিস নং ১৫৫৫০; মুয়াত্তায় বর্ণিত আছে যে এরপর সাহল তৎক্ষণাৎ সুস্থ হয়ে উঠেছিলেন ↩︎
- صفة اغتسال العائن والمعين ↩︎
- মুসনাদে আহমাদ, হাদিস নং ১৬০২৬; সুনান ইবনে মাজাহ, হাদিস নং ৩৫০৮ ↩︎
- যাদুল মা’আদ, খণ্ড ৪, পৃষ্ঠা ১৬৪ ↩︎
- ফাতহুল বারী, খণ্ড ১০, পৃষ্ঠা ২০৪ ↩︎
- সহীহ মুসলিম, হাদিসঃ ২১৮৮ ↩︎
