
Table of Contents
ভূমিকা
মানব প্রজনন ও বংশগতির রহস্য উন্মোচন আধুনিক বিজ্ঞানের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সাফল্য। তবে অণুবীক্ষণ যন্ত্র এবং আণবিক জীববিজ্ঞানের (Molecular Biology) বিকাশের পূর্বে, প্রাক-আধুনিক সভ্যতাগুলো প্রজনন প্রক্রিয়া ব্যাখ্যা করার জন্য মূলত স্থূল দৃশ্যমান পর্যবেক্ষণ এবং অনুমাননির্ভর দর্শনের ওপর নির্ভর করত। সপ্তম শতাব্দীর আরব উপদ্বীপে উদ্ভূত ইসলামী শাস্ত্রীয় বর্ণনাগুলোতেও এর ব্যতিক্রম ঘটেনি। বিশেষ করে হাদিস সাহিত্যে ‘নারী বীর্য’ (Female Semen/Maniy) নামক এক প্রকার তরলের অস্তিত্ব এবং সন্তানের লিঙ্গ বা শারীরিক অবয়ব নির্ধারণে এর জয়-পরাজয়ের যে তত্ত্ব দেওয়া হয়েছে, তা সমকালীন গ্রিক ও পারসিক চিকিৎসাবিদ্যার একটি অপরিপক্ক প্রতিফলন মাত্র।
ঐতিহাসিকভাবে, এই ধারণাগুলো এমন এক সময়ে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল যখন মানুষের কাছে ডিএনএ (DNA), ক্রোমোজোম বা ডিম্বাণুর (Ovum) আণুবীক্ষণিক গঠন সম্পর্কে কোনো ধারণাই ছিল না। ফলে যোনিপথের লুব্রিকেন্ট বা কামরসকে বীর্যের সমতুল্য মনে করা ছিল একটি সাধারণ পর্যবেক্ষণলব্ধ ভুল। এই প্রবন্ধে আমরা ইসলামী টেক্সটগুলোতে বর্ণিত ‘নারী বীর্য’ সংক্রান্ত দাবিগুলোকে ভাষাতাত্ত্বিক, ঐতিহাসিক এবং বৈজ্ঞানিক মানদণ্ডে বিশ্লেষণ করব। আমাদের মূল লক্ষ্য হলো এটি দেখানো যে, এই ধর্মীয় বর্ণনাগুলো কোনো অতিপ্রাকৃত বা ঐশ্বরিক জ্ঞান নয়, বরং সপ্তম শতাব্দীর মানুষের সীমাবদ্ধ জ্ঞানতাত্ত্বিক কাঠামোর (Epistemological framework) একটি বহিঃপ্রকাশ, যা আধুনিক জেনেটিক্স ও ভ্রূণবিদ্যার প্রতিষ্ঠিত সত্যের সাথে সরাসরি সাংঘর্ষিক।
ধর্মীয় দাবি ও তার ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট
ইসলামী শাস্ত্রীয় বর্ণনা অনুযায়ী, পুরুষদের মতো নারীদেরও ‘বীর্য’ থাকে এবং তা সন্তানের শারীরিক সাদৃশ্য নির্ধারণে ভূমিকা রাখে [1] । সহীহ বুখারীর একটি বর্ণনায় দেখা যায়, উম্মু সুলায়ম নামক এক নারী নবী মুহাম্মদকে নারীদের স্বপ্নদোষ ও গোসল সম্পর্কে প্রশ্ন করলে তিনি জানান যে, নারীরা যদি বীর্য দেখতে পায় তবে তাদের ওপর গোসল ফরয হবে। একই হাদিসে আরও উল্লেখ করা হয়েছে যে, সন্তানের শারীরিক আকৃতি পিতার মতো হবে নাকি মাতার মতো, তা নির্ভর করে কার বীর্য বা প্রজনন রস আগে নির্গত হয় বা জয়ী হয় তার ওপর। মুসলিম শরীফের বর্ণনায় এই তরলকে ‘হলুদ ও পাতলা’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
এই বিবরণগুলো পড়লে বোঝা যায় নবী মুহাম্মদের এই সম্পর্কে কোন ধারণা ছিল না। নিশ্চয়ই তিনি যৌনকর্মের সময় মেয়েদের কামরস দেখতেন, সেগুলো দেখে তিনি ভাবতেন মেয়েদেরও বীর্য নির্গত হয়। বস্তুতপক্ষে সেগুলো বীর্য নয়, মেয়েদের কামরস [2] [3] [4] [5] –
সহীহ বুখারী (তাওহীদ পাবলিকেশন)
৩/ আল-ইলম (ধর্মীয় জ্ঞান)
পরিচ্ছেদঃ ৩/৫০. ইল্ম শিক্ষা করতে লজ্জাবোধ করা।
وَقَالَ مُجَاهِدٌ لاَ يَتَعَلَّمُ الْعِلْمَ مُسْتَحْيٍ وَلاَ مُسْتَكْبِرٌ وَقَالَتْ عَائِشَةُ نِعْمَ النِّسَاءُ نِسَاءُ الأَنْصَارِ لَمْ يَمْنَعْهُنَّ الْحَيَاءُ أَنْ يَتَفَقَّهْنَ فِي الدِّينِ.
মুজাহিদ (রহ.) বলেন, ’লাজুক এবং অহঙ্কারী ব্যক্তি জ্ঞান অর্জন করতে পারে না। ’আয়িশাহ (রাযি.) বলেন, ’আনসারী মহিলারাই উত্তম। লজ্জা তাদেরকে ইসলামী জ্ঞান অন্বেষণ থেকে ফিরিয়ে রাখতে পারেনি।
১৩০. উম্মু সালামাহ (রাযি.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর নিকট উম্মু সুলায়ম (রাযি.) এসে বললেনঃ হে আল্লাহর রাসূল! আল্লাহ্ হক কথা প্রকাশ করতে লজ্জাবোধ করেন না। মহিলাদের স্বপ্নদোষ হলে কি গোসল করতে হবে?নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ ’হ্যাঁ, যখন সে বীর্য দেখতে পাবে।’ তখন উম্মু সালামাহ (লজ্জায়) তার মুখ ঢেকে নিয়ে বললেন, ’হে আল্লাহর রাসূল! মহিলাদেরও স্বপ্নদোষ হয় কি?’ তিনি বললেন, ’হ্যাঁ, তোমার ডান হাতে মাটি পড়ুক! (তা না হলে) তাদের সন্তান তাদের আকৃতি পায় কীভাবে? (২৮২, ৩৩২৮, ৬০৯১, ৬১২১; মুসলিম ৩/৭, হাঃ ৩১৩, আহমাদ ২৬৬৭৫) (আধুনিক প্রকাশনীঃ ১২৭, ইসলামিক ফাউন্ডেশনঃ ১৩২)
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ উম্মু সালামাহ (রাঃ)
সহীহ বুখারী (ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
৩/ ইলম বা জ্ঞান
পরিচ্ছেদঃ ৯২। ‘ইলম শিক্ষা করতে লজ্জাবোধ করা।
ইসলামিক ফাউন্ডেশন নাম্বারঃ ১৩২, আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ১৩০
وَقَالَ مُجَاهِدٌ لاَ يَتَعَلَّمُ الْعِلْمَ مُسْتَحْيٍ وَلاَ مُسْتَكْبِرٌ. وَقَالَتْ عَائِشَةُ نِعْمَ النِّسَاءُ نِسَاءُ الأَنْصَارِ لَمْ يَمْنَعْهُنَّ الْحَيَاءُ أَنْ يَتَفَقَّهْنَ فِي الدِّينِ
মুজাহিদ (রহঃ) বলেন, ’লাজুক এবং অহঙ্কারী ব্যক্তি জ্ঞান অর্জন করতে পারে না। ’আয়িশা (রাঃ) বলেন, ’আনসারী মহিলারাই উত্তম। লজ্জা তাদেরকে ইসলামী জ্ঞান অন্বেষণ থেকে ফিরিয়ে রাখতে পারে নি।
১৩২। মুহাম্মদ ইবনু সালাম (রহঃ) … উম্মে সালমা (রাঃ) থেকে বর্ণত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর খিদমতে উম্মে সুলায়ম (রাঃ) এসে বললেনঃ ইয়া রাসুল্লাহ! আল্লাহ হক কথা প্রকাশ করতে লজ্জাবোধ করেন না। স্ত্রীলোকের স্বপ্নদোষ হলে কি গোসল করতে হবে?নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ ’হ্যাঁ, যখন সে বীর্য দেখতে পাবে।’ তখন উম্মে সালমা (লজ্জায়) তাঁর মুখ ঢেকে নিয়ে বললেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! স্ত্রীলোকের স্বপ্নদোষ হয় কি?’ তিনি বললেন, ’হ্যাঁ, তোমার ডান হাতে মাটি পড়ুক!* (তা না হলে) তাঁর সন্তান তাঁর আকৃতি পায় কিরূপে?
* এটি কোন বদ দুয়া বরং বিস্ময় প্রকেশের জন্য আরবীতে ব্যবহৃত হয়।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ উম্মু সালামাহ (রাঃ)
সহীহ বুখারী (তাওহীদ পাবলিকেশন)
৫/ গোসল
পরিচ্ছেদঃ ৫/২২. মহিলাদের ইহ্তিলাম (স্বপ্নদোষ) হলে।
২৮২। উম্মুল মু‘মিনীন উম্মু সালামা (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ তিনি বলেনঃ আবূ তালহা (রাঃ) এর স্ত্রী উম্মু সুলায়ম (রাঃ) আল্লাহর রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর খিদমাতে এসে বললেনঃ ইয়া রাসূলাল্লাহ! আল্লাহ্ তা‘আলা হকের ব্যাপারে লজ্জা করেন না।স্ত্রীলোকের ইহ্তিলাম (স্বপ্নদোষ) হলে কি ফরয গোসল করবে? আল্লাহর রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেনঃ হাঁ, যদি তারা বীর্য দেখে।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ উম্মু সালামাহ (রাঃ)
সহীহ মুসলিম (ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
৩/ হায়েয
পরিচ্ছেদঃ ৭. মহিলার মনী (বীর্য) বের হলে তার উপর গোসল করা ওয়াজিব
৬০৩। আব্বাস ইবনুল ওয়ালদী (রহঃ) … আনাস ইবনু মালিক (রাঃ) থেকে বর্ণিত। উম্মু সুলায়ম (রাঃ) বলেন, তিনি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে সেই মহিলা সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলেন যে ঘূমে পুরুষ যা দেখে তাই দেখতে পায়। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, মেয়ে লোক যখন ঐরুপ দেখবে তখন সে গোসল করবে। উম্মু সালামা (রাঃ) বলেন, এ কথায় আমি লজ্জাবোধ করলাম। তিনি বললেন, এ রকমও কি হয়?রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, হ্যাঁ, তা না হলে ছেলে মেয়ে তার সদৃশ কোত্থেকে হয়? পুরুষের বীর্য গাড় সাদা আর মেয়েলোকের বীর্য পাতলা, হলুদ। উভয়ের মধ্য থেকে যার বীর্য ওপরে উঠে যায় অথবা আগে চলে যায় (সন্তান) তারই সদৃশ হয়।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আনাস ইবনু মালিক (রাঃ)
হাদিসের ইসলামী ব্যাখ্যা
আসুন এই বিষয়ে আলেমদের বক্তব্য কি তা সম্পর্কে জেনে নেয়া যাক,
‘মনী’ (Maniy) শব্দের ভাষাতাত্ত্বিক বিশ্লেষণ
সুযোগ সন্ধানী আধুনিক ইসলামিক এপোলোজিস্টগণ ‘মনী’ (Maniy) শব্দটিকে অনেক সময় আধুনিক ‘ডিম্বাণু’ বা ‘জেনেটিক কোড’ হিসেবে সংজ্ঞায়িত করার চেষ্টা করেন, কিছুই সম্ভব না হলে পুরো বিষয়কে রূপক বানিয়ে ফেলেন, যা একটি স্পষ্ট ভাষাতাত্ত্বিক বিকৃতি। আরবি ‘মনী’ (منی) শব্দটির ব্যুৎপত্তিগত অর্থ হলো ‘প্রবাহিত হওয়া’ বা ‘নিঃসরণ’ [6]। সহীহ মুসলিমের বর্ণনায় মুহাম্মদ পুরুষের বীর্যকে ‘সাদা ও ঘন’ এবং নারীর বীর্যকে ‘হলুদ ও পাতলা’ (মাউন আসফারু রকীখ) বলে অভিহিত করেছেন [7]। এখানে ‘মাউন’ (ماء) বা পানি শব্দের ব্যবহার এবং রঙের স্পষ্ট বর্ণনা প্রমাণ করে যে, এটি শরীরের অভ্যন্তরে থাকা কোনো স্থির কোষ নয়, বরং এটি একটি দৃশ্যমান তরল যা শরীর থেকে নির্গত হয়।
হাদিসে বর্ণিত ‘দেখার’ (Visibility) শর্তটি ভাষাতাত্ত্বিক ও যৌক্তিকভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বুখারীর বর্ণনায় মুহাম্মদ বলেছেন, “হ্যাঁ, যখন সে (নারী) বীর্য দেখতে পাবে” তখন তার ওপর গোসল ফরজ হবে। আধুনিক ভ্রূণবিদ্যা অনুযায়ী একটি ডিম্বাণু খালি চোখে দেখা অসম্ভব, যার ব্যাস মাত্র ০.১ মিলিমিটার। সুতরাং, স্বপ্নদোষের পর বিছানায় বা কাপড়ে যা দেখা সম্ভব, তা কোনোভাবেই আণুবীক্ষণিক ডিম্বাণু হতে পারে না। এই ‘দৃশ্যমানতা’র বিষয়টিই প্রমাণ করে যে, মুহাম্মদ মূলত যোনিপথের কামরস বা বার্থোলিন গ্রন্থির নিঃসরণকে বীর্য হিসেবে ভুল বুঝেছিলেন, যা যৌন উত্তেজনার সময় নির্গত হয়।
ধ্রুপদী মুসলিম ব্যাখ্যাকারীদের অবস্থান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, তারাও একে একটি ভৌত তরল পদার্থ হিসেবেই গ্রহণ করেছেন। ইমাম নববী এবং ইবনে হাজার আসকালানী তাদের ব্যাখ্যাগ্রন্থে নারীর বীর্যের ঘনত্ব, রং এবং নিঃসরণের প্রকৃতি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন [8]। কোনো ধ্রুপদী ভাষ্যকারই একে শরীরের অভ্যন্তরীণ কোনো বিশেষ কোষ বা ‘বংশগতির বাহক’ হিসেবে ইঙ্গিত করেননি। বরং তারা একে পুরুষের বীর্যের মতোই একটি প্রজনন রস মনে করতেন যা মিলনের সময় বা চরম উত্তেজনায় বাইরে আসে। ইবনে হাজার আসকালানী সহীহ বুখারীর ‘উম্মু সুলায়ম’-এর হাদিসটির (যেখানে নারী বীর্যের কথা বলা হয়েছে) ব্যাখ্যা করতে গিয়ে লিখেছেন (ফাতহুল বারী গ্রন্থের অনলাইন ভার্শন দেখতে পারেন),
“ومني المرأة أصفر رقيق، وقد يبيض لفضل قوتها، وله خاصيتان يعرف بهما: إحداهما اللذة عند خروجه وفتور الشهوة عقب خروجه، والثانية الرائحة”
অর্থ: “নারীর বীর্য হলো হলুদ ও পাতলা, তবে অতিরিক্ত উত্তেজনার ফলে কখনো তা সাদা হতে পারে। এটি চেনার দুটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য রয়েছে: প্রথমত, এটি নির্গত হওয়ার সময় চরম আনন্দ অনুভূত হয় এবং নির্গত হওয়ার ঠিক পরেই কামভাব স্তিমিত হয়ে যায়; দ্বিতীয়ত, এর বিশেষ এক ধরনের গন্ধ রয়েছে।” [9]
সুতরাং, ‘মনী’ শব্দটিকে বর্তমান যুগের বৈজ্ঞানিক আবিস্কারের সাথে মেলাতে গিয়ে একে ‘ডিম্বাণু’ বা ‘জেনেটিক ইনফরমেশন’ বলা একটি স্পষ্ট ‘অ্যানাক্রোনিজম’ বা কালানুক্রমিক ভুল। ভাষাতাত্ত্বিক ও কারিগরি উভয় দিক থেকেই এটি একটি দৃশ্যমান তরল ক্ষরণকেই নির্দেশ করে। প্রাক-আধুনিক যুগের এই ভুল পর্যবেক্ষণকে আধুনিক বিজ্ঞানের মোড়কে উপস্থাপন করা মূলত একটি বুদ্ধিবৃত্তিক অসততা, যা হাদিসের মূল বক্তব্য এবং ঐতিহাসিক সত্যকে আড়াল করার একটি ব্যর্থ চেষ্টা মাত্র। আসুন বিষয়টি আরও পরিষ্কার হওয়ার জন্য একটি বিখ্যাত ফতোয়া দেখে নেয়া যাক, [10]
فضيلة الشيخ: أود أن أستفسر كيف يمكن أن أميز بين المني وغيره من الإفرازات تمييزا واضحاً ليس فقط من حيث لونه فأنا سمعت أن لونه أصفر وإنما أحياناً يخرج مني إفرازات لونها أصفر، ولكن من غير دفق، وأحياناً يخرج مني عندما أسمع شيئاً مثيراً يخرج مني شيء لزج شفاف لكن دفق من غير شهوة، وفي بعض الأحيان عندما استيقظ وأمسح المحل بمنديل فإني أجد بللاً ولا أذكر أحتلاماً فأفيدوني أرجوكم ولا تحيلوني على أسئلة مماثلة فإني تعبت من كثرة الاغتسال تعبا نفسيا وجسدياً، ما معنى أن المني يخرج بشهوة ومتدفق؟
الإجابــة
الحمد لله، والصلاة والسلام على رسول الله، وعلى آله وصحبه، أما بعد:
فقد ذكر أهل العلم أن مني المرأة يعرف بأمرين:
أحدهما: أن رائحته تشبه رائحة طلع النخل، كما هو الحال بالنسبة لمني الرجل.
الأمر الثاني: وجود اللذة عند خروجه وحصول فتور واسترخاء عقب خروجه.
قال النووي في شرح صحيح مسلم: وأما مني المرأة فهو أصفر رقيق، وقد يبيض لفضل قوتها، وله خاصيتان يعرف بهما إحداهما أن رائحته كرائحة مني الرجل والثانية التلذذ بخروجه وفتور شهوتها عقب خروجه. انتهى.
والخارج عند إثارة الشهوة متصفاً باللزوجة تنطبق عليه صفات المذي، قال الإمام النووي في المجموع: والمذي ماء أبيض رقيق لزج يخرج عند شهوة لا بشهوة ولا دفق ولا يعقبه فتور، وربما لا يحس بخروجه ويكون ذلك للرجل والمرأة وهو في النساء أكثر منه في الرجال. انتهى.
وبالتالي فالخارج الذي على هذه الحالة يعتبر مذياً وترتب عليه أحكامه، وما تجدينه بعد الاستيقاظ من النوم إذا كان يحتمل أن يكون منياً يعطى حكمه، ففي الإنصاف للمرداوي: لو انتبه بالغ أو من يحتمل بلوغه فوجد بللاً جهل أنه مني وجب الغسل مطلقاً على الصحيح من المذهب. انتهى.
وقال خليل في مختصره: وإن شك أمذي أو مني اغتسل وأعاد من آخر نومة كتحققه. انتهى.
وخروج المني بشهوة يعني خروجه مصحوباً بنشوة، وهذه صفة شاملة لمني الرجل والمرأة.
أما خروجه متدفقاً فمعناه خروجه بشدة وبقوة على شكل دفعات يعقب بعضها بعضاً، وهذه صفة خاصة بمني الرجل. قال الإمام النووي في شرح صحيح مسلم: ثم إن خواص المني التي عليها الاعتماد في كونه منياً ثلاث: أحدها: الخروج بشهوة مع الفتور عقبه. الثانية: الرائحة التي تشبه الطلع كما سبق. الثالث: الخروج بزريق ودفق ودفعات وكل واحدة من الثلاث كافية في إثبات كونه منياً، ولا يشترط اجتماعها… إلى أن قال: هذا كله في مني الرجل. وأما مني المرأة فهو أصفر… إلى آخر كلامه الذي سبق أول الفتوى.
والله أعلم.
ফতোয়া অনুবাদ: নারীর বীর্য ও অন্যান্য স্রাবের মধ্যে পার্থক্য চেনার উপায়
প্রশ্নকারী মহিলার জিজ্ঞাসা:
শ্রদ্ধেয় শায়খ, আমি জানতে চাই কীভাবে আমি বীর্য (Maniy) এবং অন্যান্য স্রাবের মধ্যে স্পষ্ট পার্থক্য করতে পারব? আমি শুনেছি এর রঙ হলুদ, কিন্তু মাঝেমধ্যে আমার শরীর থেকে হলুদ স্রাব বের হয় কোনো প্রকার উত্তেজনা বা ধাক্কা (Gushing) ছাড়াই। আবার কখনো উত্তেজনাকর কিছু শুনলে পিচ্ছিল স্বচ্ছ তরল বের হয়, যা বেগে বের হলেও তাতে কামতৃপ্তি থাকে না। আবার কখনো ঘুম থেকে উঠে কাপড়ে ভেজা ভাব দেখি কিন্তু স্বপ্নদোষের কথা মনে পড়ে না। অতিরিক্ত গোসল করতে করতে আমি শারীরিক ও মানসিকভাবে ক্লান্ত। বীর্য ‘কামভাবসহ’ এবং ‘সজোরে’ (Gushing) বের হওয়ার প্রকৃত অর্থ কী?
উত্তর (ইসলামওয়েব):
সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর। আলেমগণ উল্লেখ করেছেন যে, নারীর বীর্য (Maniy) চেনার উপায় দুটি:
১. গন্ধ: এর গন্ধ খেজুর গাছের পরাগ রেণুর (Palm Pollen) মতো, যা পুরুষের বীর্যের গন্ধের সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ।
২. তৃপ্তি ও শিথিলতা: এটি বের হওয়ার সময় ‘চরম তৃপ্তি’ (Lust/Orgasm) অনুভূত হবে এবং বের হওয়ার ঠিক পরেই শরীরে এক ধরনের ঝিমুনি বা অবসাদ (Relaxation) চলে আসবে।
ইমাম নববী ‘শরহে সহীহ মুসলিম’-এ বলেছেন:
“নারীর বীর্য হলো হলুদ ও পাতলা। তবে মহিলার শারীরিক শক্তির আধিক্যের কারণে এটি কখনো সাদা হতে পারে। এটি চেনার দুটি বিশেষ গুণ রয়েছে: প্রথমটি হলো এর গন্ধ পুরুষের বীর্যের মতো, এবং দ্বিতীয়টি হলো এটি বের হওয়ার সময় চরম আনন্দ পাওয়া এবং বের হওয়ার পর কামভাব স্তিমিত হয়ে যাওয়া।”
মজি (Madhiy – যৌন উত্তেজনার শুরুতে বের হওয়া পিচ্ছিল রস):
যৌন উত্তেজনার সময় যে পিচ্ছিল তরল বের হয়, তাকে ‘মজি’ বলা হয়। ইমাম নববী বলেন, “মজি হলো সাদা, পাতলা ও আঠালো পানি, যা কামভাবের সময় বের হয়; কিন্তু এটি বীর্যের মতো সজোরে ছিটকে বের হয় না এবং এটি বের হওয়ার পর শরীরে কোনো ক্লান্তি আসে না। অনেক সময় এটি বের হওয়ার কথা জানাও যায় না। এটি নারী-পুরুষ উভয়েরই হয়, তবে নারীদের ক্ষেত্রে এর আধিক্য বেশি।”
ঘুম থেকে উঠে ভেজা ভাব দেখলে:
যদি ঘুম থেকে উঠে এমন ভেজা ভাব পাওয়া যায় যা বীর্য হওয়ার সম্ভাবনা থাকে, তবে শরীয়তের বিধান অনুযায়ী গোসল করা ওয়াজিব।
‘কামভাবসহ’ এবং ‘সজোরে’ বের হওয়ার ব্যাখ্যা:
১. কামভাবসহ (With Lust): এর অর্থ হলো এটি চরম যৌন তৃপ্তি বা ‘অর্গাজম’-এর সাথে বের হওয়া। এটি নারী ও পুরুষ উভয়ের বীর্যের সাধারণ বৈশিষ্ট্য।
২. সজোরে বা ধাক্কা দিয়ে বের হওয়া (Gushing): এর অর্থ হলো তরলটি প্রবল বেগে এবং কয়েক দফায় ছিটকে বের হওয়া। এটি মূলত পুরুষের বীর্যের বিশেষ বৈশিষ্ট্য।
ইমাম নববী আরও স্পষ্ট করেছেন যে, বীর্যের তিনটি প্রধান বৈশিষ্ট্য রয়েছে: (১) তৃপ্তিসহ বের হওয়া ও পরে অবসাদ আসা, (২) বিশেষ গন্ধ থাকা, (৩) সজোরে ছিটকে বের হওয়া। এই তিনটির যেকোনো একটি পাওয়া গেলেই তাকে বীর্য হিসেবে গণ্য করা হবে। তবে ‘ছিটকে বের হওয়া’র বিষয়টি কেবল পুরুষদের জন্য প্রযোজ্য, আর নারীদের বীর্য হলো ‘হলুদ ও পাতলা’।
আল্লাহই ভালো জানেন।
দ্বৈত-বীজ তত্ত্ব এবং মুহাম্মদের ধারণার উৎস
মুহাম্মদের প্রজনন সংক্রান্ত ধারণাগুলো কোনো অলৌকিক উৎস থেকে নয়, বরং তাঁর সমকালীন ও পূর্ববর্তী গ্রিক চিকিৎসাবিদ্যা থেকে উদ্ভূত হওয়ার পক্ষে কিছু প্রমাণ পাওয়া যায়। খ্রিস্টপূর্ব পঞ্চম শতাব্দীতে হিপোক্রেটিস এবং পরবর্তীতে দ্বিতীয় শতাব্দীতে গ্যালেন ‘দ্বৈত-বীজ তত্ত্ব’ (Two-seed theory) প্রবর্তন করেন। এই তত্ত্ব অনুসারে, পুরুষ ও নারী উভয়েই বীর্য উৎপাদন করে এবং সন্তানের লিঙ্গ ও শারীরিক বৈশিষ্ট্য নির্ধারণে উভয়ের বীর্যের অবদানের কথা বলা হয় [11]। গ্যালেন দাবি করেছিলেন যে, নারীর বীর্য পুরুষের বীর্যের তুলনায় শীতল ও পাতলা, যা মুহাম্মদের বর্ণিত ‘হলুদ ও পাতলা’ নারী বীর্যের বর্ণনার সাথে হুবহু মিলে যায় [12]। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, গ্যালেনের এই ধারনাগুলো সম্পর্কে তৎকালীন আরববিশ্ব কি অবগত ছিল?
ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণে দেখা যায়, মুহাম্মদের সমসাময়িক আরবে গ্রিক চিকিৎসাবিদ্যা অত্যন্ত প্রভাবশালী ছিল। বিশেষ করে হারিস বিন কালাদাহ নামক জনৈক ব্যক্তি, যাঁকে মুহাম্মদের চিকিৎসক এবং সমসায়িক সময়ের সাহাবী হিসেবে অভিহিত করা হয়, তিনি পারস্যের জুন্দিশাপুর একাডেমিতে শিক্ষালাভ করেছিলেন যেখানে গ্রিক ও ভারতীয় চিকিৎসাবিজ্ঞানের চর্চা হতো [13]। অসংখ্য ইসলামিক গ্রন্থে তার সম্পর্কে কিছু কিছু বিবরণ পাওয়া যায়, তবে খুব বিস্তারিত তথ্য জানা যায় না। ইসলামিক ষড়রসগুলো থেকেই জানা যায়, তিনি সেই সময়ে রীতিমত মানুষের চিকিৎসা করতেন এবং শরীর, স্বাস্থ্য, মানুষের অঙ্গপ্রত্যঙ্গ ইত্যাদি বিষয়ক পরামর্শ দিতেন এবং আলোচনা করতেন। আসুন উনার সম্পর্কে একটি ফতোয়া দেখি,
২১৯৯. প্রশ্ন
আমি একজন আলেমকে স্বাস্থ্য রক্ষার গুরুত্ব বর্ণনা করতে গিয়ে নিম্নোক্ত হাদীসটি বলতে শুনেছি।
المعدة بيت الداء، والحمية رأس الدواء، وأعط كل بدن ما عودته
(অর্থাৎ) উদর হল সর্বরোগের কেন্দ্র। আর খাদ্য-সংযম সর্বরোগের মহৌষধ। দেহকে তা-ই দাও, যাতে তাকে অভ্যস্ত করেছ। জানার বিষয় হল, এটি কি হাদীস। হাদীস হলে তা কোন কিতাবে আছে? জানিয়ে উপকৃত করবেন।
উত্তর
প্রশ্নোক্ত কথাটি কোথাও হাদীস হিসেবে উল্লেখেতি হলেও হাদীস বিশারদগণ বলেছেন, এটি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর হাদীস হিসেবে প্রমাণিত নয়; বরং তা আরবের প্রসিদ্ধ চিকিৎসক হারিস ইবনে কালদাহ-এর উক্তি।
অতএব তা হাদীস হিসেবে বর্ণনা করা যাবে না।
-আলমাকাসিদুল হাসানাহ পৃ. ৬১১; কাশফুল খাফা ২/৯৩; আদ্দুরারুল মুনতাছিরাহ ১৬৮; আল লাআলিল মানসুরাহ ১৪৫; আলফাওয়াইদুল মাজমূআহ ১৬৬; যাদুল মাসীর ৩/১৮৮; রুহুল মাআনী ৫/১১০; তাফসীরে কুরতুবী ৭/১৯২
শুধু তাই নয়, উনার সম্পর্কে কিছু জইফ হাদিসও পাওয়া যায়। জইফ হাদিসগুলো সঠিক হয়ে থাকলে, মুহাম্মদ তার কাছে মানুষকে চিকিৎসা নেয়ার জন্য পাঠাতেন বলেই মনে হয়। উনি গ্রীসের চিকিৎসকদের গ্রন্থগুলো আরবিতে অনুবাদ করেছিলেন বলেও কিছু কিছু সূত্র থেকে জানা যায়।
মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত)
পর্ব ২১: খাদ্য
পরিচ্ছেদঃ দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ
৪২২৪-[৬৬] সা‘দ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, এক সময় আমি মারাত্মকভাবে পীড়িত হয়ে পড়লাম। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমার খোঁজ-খবর নিতে তাশরিফ আনলেন। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) নিজের হাতখানা আমার দু’ স্তনের মাঝখানে (বুকের উপর) রাখলেন। তাতে আমি আমার কলিজায় শীতলতা অনুভব করলাম।অতঃপর তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেনঃ তুমি একজন হৃদ-বেদনার রোগী। সুতরাং তুমি সাক্বীফ গোত্রীয় হারিস ইবনু কালদাহ্-এর নিকট যাও। সে একজন চিকিৎসক। পরে তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেনঃ সে যেন অবশ্যই মদীনার সাতটি ‘আজওয়াহ্ খেজুর বীচিসহ পিষে তোমার মুখের মধ্যে ঢেলে দেয়। (আবূ দাঊদ)[1]
[1] য‘ঈফ : আবূ দাঊদ ৩৮৭৫, য‘ঈফুল জামি‘উস্ সগীর ২০৩৩, আল মু‘জামুল কাবীর লিতু ত্ববারানী ৫৩৪৬, য‘ঈফুল জামি‘ ২০৩৩।
হাদীসটি য‘ঈফ হওয়ার কারণ হলো মুজাহিদ সা‘দ হতে বর্ণনা করাটা মুরসাল। আবূ যুর্‘আহ্ আর্ রাযী এমনটিই বলেছেন। বিস্তারিত দেখুন- ‘আওনুল মা‘বূদ ১০/২৫৫ পৃঃ, হাঃ ৩৮৭৫।
হাদিসের মানঃ যঈফ (Dai’f)
বর্ণনাকারীঃ সা’দ বিন আবূ ওয়াক্কাস (রাঃ)
সূনান আবু দাউদ (ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
২২/ চিকিৎসা
পরিচ্ছেদঃ ১২. আজওয়া খেজুর সম্পর্কে।
৩৮৩৫. ইসহাক ইবন ইসমাইল (রহঃ) …. সা’দ (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেনঃ একবার আমি পীড়িত হলে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে দেখার জন্য আসেন। এ সময় তিনি তাঁর হাত আমার বুকের উপর রাখলে আমি তাঁর শৈত্যতা আমার হৃদয়ে অনুভব করি। এরপর তিনি বলেনঃ তুমি হার্টের রুগী। কাজেই তুমি ছাকীফ গোত্রের অধিবাসী হারিছা ইবন কালদার নিকট যাও। কেননা, সে একজন অভিজ্ঞ চিকিৎসক। আর সে যেন মদীনার আজওয়া খেজুরের সাতটা খেজুর নিয়ে, তা বীচিসহ চূর্ণ করে তোমার জন্য তা দিয়ে সাতটি বড়ি তৈরী করে দেয়।
হাদিসের মানঃ যঈফ (Dai’f)
বর্ণনাকারীঃ সা’দ বিন আবূ ওয়াক্কাস (রাঃ)
উপরের এই বর্ণনাগুলো থেকে বোঝা যায়, সেই সময়ের আরব বিশ্ব চিকিৎসা শাস্ত্রের এই বিষয়গুলো সম্পর্কে অবগত ছিলেন এবং মুহাম্মদের বর্ণিত ‘যার বীর্য আগে আসবে বা জয়ী হবে সন্তান তার মতো হবে’—এই ধারণাটি মূলত হিপোক্রেটিসের সেই তত্ত্বের একটি সরলীকৃত রূপ, যেখানে বলা হয়েছিল যে বীর্যের আধিক্য বা শক্তির ওপর সন্তানের শারীরিক সাদৃশ্য নির্ভর করে [14]। ফলে দেখা যাচ্ছে, মুহাম্মদ কেবল তাঁর সময়ের প্রচলিত এবং ভুল বৈজ্ঞানিক ধারণাগুলোকেই নিজের নামে প্রচার করেছিলেন, যা আধুনিক জেনেটিক্সের আবিস্কারের বহু আগেই গ্রিক দর্শনে বিদ্যমান ছিল। এটি স্পষ্ট করে যে, তাঁর প্রজনন সংক্রান্ত জ্ঞান কোনো অতিপ্রাকৃত প্রকাশ নয়, বরং তৎকালীন প্রচলিত লোকজ ও শাস্ত্রীয় চিকিৎসাবিদ্যার একটি সংমিশ্রণ মাত্র।
শারীরবৃত্তীয় বিভ্রান্তি: কামরস বনাম বীর্য
যৌনকর্মের সময় ছেলেদের লিঙ্গ থেকে বীর্য নির্গত হয়, সেটি আমরা সকলেই জানি। বীর্য একপ্রকার জৈবিক তরল যা যৌনসঙ্গমের শেষ পর্যায়ে চরম সুখানুভূতি সৃষ্টির সঙ্গে পুরুষাঙ্গ হতে নি:সৃত হয়। এটি হচ্ছে যার মধ্যে শুক্রাণু থাকে, যেই শুক্রাণু ডিম্বাশয়ে প্রবেশ করলে সন্তান জন্ম হয়। এটি এক প্রকার ঘনীভূত, ঈষৎ ক্ষারীয়, আঠালো জেলির ন্যায় জৈব তরল যা সাধারণত স্পার্মাটোজোয়া বা সহজ ভাষায় স্পার্ম ধারণ করার ক্ষমতা রাখে। এটি সাধারণত কোন জীব প্রজাতির পুরুষের অন্ডকোষ কিংবা উভলিঙ্গ প্রাণীর অন্ডকোষ থেকে উৎপন্ন হয় এবং ঐ প্রজাতির স্ত্রী লিঙ্গের প্রাণীর জরাযুতে সৃষ্ট হওয়া ডিম্বাণু নিষিক্ত করার ক্ষমতা রাখে।
নারীর যোনিমুখের দু’পাশে বিশেষ গ্রন্থি আছে । কামোত্তেজনার সময় এই গ্রন্থি থেকে এক রকম তরল রস নির্গত হয়, যা কিনা সারা যোনি-মুখকে ভিজিয়ে পিচ্ছিল করে দেয়, এর ফলে পুরুষের লিঙ্গ তার গভীরে প্রবিষ্ট করতে সুবিধে হয়। বাইরে থেকে এই গ্রন্থি দৃশ্যমান নয়, চামড়ার আড়ালে সেটি ঢাকা থাকে। কিন্তু যোনিমুখে রস নিঃসরণ হলে সেই রস সরাসরি চোখে দেখা যায়। সব সময় এই রস নিঃসৃত হয় না। কেবল যখন প্রবল কামোত্তেজনা সৃষ্টি হয়- তখনি বার্থোলিন গ্রন্থি এই রসসৃষ্টি করে এবং নারীর যোনিকে পিচ্ছিল করে পুরুষের লিঙ্গ প্রবেশের উপযোগী করে। এই রস দেখে প্রাচীনকালে মানুষ ভাবতো, নারীরও বীর্য রয়েছে। আসলে সেইসব ধারনা ভুল। সেই রসে কোন শুত্রূবীজানু থাকে না। আবার নারীদেহের এই কামরসের সঙ্গে ডিম্বাণুর সরাসরি কোন সস্পর্ক নেই, এই কামরস শুধুমাত্র পুরুষাঙ্গকে প্রবেশের পথ তৈরি করে। অনেকেই বলে থাকেন, রতিক্রিয়া শেষে পুরুষের মতো কি নারীর যোনি থেকেও বীর্যপাত ঘটে? এক কথায় এর জবাব হল ‘না।’ মেয়েদের কোনো বীর্যপাত হয় না। তাদের বীর্য হিসেবে কোনকিছুকে সংজ্ঞায়িত যদি করতেই হয় তাহলে সেটি হবে তার ডিম্বাণু।
আধুনিক বৈজ্ঞানিক গবেষনাপ্রাপ্ত জ্ঞান
আধুনিক অ্যানাটমি বা শরীরতত্ত্ব বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, নারীর প্রজননতন্ত্রে পুরুষের বীর্যের (Semen) সমগোত্রীয় কোনো তরল উৎপাদিত হয় না। পুরুষের বীর্য মূলত শুক্রাণু (Spermatozoa) এবং সেমিনাল ভেসিকল ও প্রোস্টেট গ্রন্থি থেকে নিঃসৃত তরলের মিশ্রণ, যা প্রজননে সরাসরি অংশ নেয়। বিপরীতে, যৌন উত্তেজনার সময় নারীদেহে বারথোলিন গ্রন্থি (Bartholin’s glands) এবং স্কিনস গ্রন্থি (Skene’s glands) থেকে যে তরল নিঃসৃত হয়, তার প্রধান কাজ হলো যোনিপথ পিচ্ছিল করা এবং যৌনক্রিয়া সহজতর করা [15]।
প্রাচীনকালে সম্ভবত এই কামরস বা যোনিপথের পিচ্ছিলকারক তরলকেই পুরুষের বীর্যের সমতুল্য মনে করা হতো। কিন্তু বৈজ্ঞানিক সত্য হলো, এই তরলে কোনো ধরনের প্রজনন কোষ বা ‘গ্যামেট’ থাকে না। নারীর প্রজনন কোষ হলো ডিম্বাণু (Ovum), যা বীর্যের মতো কোনো প্রবাহমান তরল আকারে নির্গত হয় না, বরং ডিম্বাশয় থেকে নির্গত হয়ে ফেলোপিয়ান টিউবে অবস্থান করে [16]।
আধুনিক গবেষণায় দেখা গেছে, নারীদের স্কিনস গ্রন্থি (Skene’s glands) থেকে এক ধরণের প্রোস্টেট-সদৃশ তরল নির্গত হতে পারে, যা চিকিৎসাবিজ্ঞানে ‘স্ত্রী-বীর্যস্খলন’ হিসেবে স্বীকৃত [17]। তবে এই তরলে কোনো শুক্রাণু থাকে না এবং ভ্রূণ গঠন বা সন্তানের বৈশিষ্ট্য নির্ধারণে এর কোনো ভূমিকা নেই, কারণ সন্তান গঠনের যাবতীয় জেনেটিক তথ্য কেবলমাত্র নারীদেহের ডিম্বাণু ও পুরুষের শুক্রাণু থেকে আসে [18]।
উপসংহার
সামগ্রিক আলোচনা ও বৈজ্ঞানিক প্রমাণের সংশ্লেষণ করলে এটি প্রতীয়মান হয় যে, ইসলামী শাস্ত্রে বর্ণিত ‘নারী বীর্য’ সংক্রান্ত ধারণাটি একটি নিরেট প্রাক-বৈজ্ঞানিক মিথ (Pre-scientific myth)। আমরা দেখেছি যে, হাদিসে বর্ণিত ‘হলুদ ও পাতলা’ তরলটি মূলত বার্থোলিন বা স্কিনস গ্রন্থি থেকে নিঃসৃত কামরস, যার সাথে বংশগতি বা প্রজননের কোনো সম্পর্ক নেই। ভাষাতাত্ত্বিক বিশ্লেষণ এবং ধ্রুপদী ফতোয়াগুলো স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে যে, ‘মনী’ (Maniy) বলতে কোনো আণুবীক্ষণিক ডিম্বাণু নয়, বরং খালি চোখে দেখা যায় এমন একটি নিঃসরণকেই বোঝানো হয়েছে। ফলে আধুনিক অ্যাপোলোজিস্টরা যখন একে ‘ডিম্বাণু’ বা ‘জেনেটিক কোড’ হিসেবে চালিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেন, তখন তা কেবল একটি ‘অ্যানাক্রোনিজম’ বা কালানুক্রমিক জালিয়াতি হিসেবেই গণ্য হয়।
ঐতিহাসিকভাবে, এই তত্ত্বটির শেকড় প্রোথিত রয়েছে হিপোক্রেটিস ও গ্যালেনের ‘দ্বৈত-বীজ তত্ত্ব’ (Two-seed theory) এবং আরবের সমকালীন চিকিৎসক হারিস বিন কালাদাহর গ্রিক-পারসিক চিকিৎসা দর্শনের মধ্যে। আধুনিক জেনেটিক্স আমাদের শেখায় যে, সন্তানের শারীরিক বৈশিষ্ট্য এবং লিঙ্গ নির্ধারণ হয় ডিএনএ রিকম্বিনেশন ও ক্রোমোসোমাল উত্তরাধিকারের মাধ্যমে, যেখানে তরল বীর্যের ‘আগে বের হওয়া’ বা ‘উপরে উঠে যাওয়া’র কোনো ভূমিকা নেই। সুতরাং, এই প্রাচীন ও ত্রুটিপূর্ণ পর্যবেক্ষণগুলোকে ‘ঐশ্বরিক সত্য’ হিসেবে দাবি করার কোনো যৌক্তিক অবকাশ অবশিষ্ট থাকে না। বিজ্ঞান যখন কোনো বিষয়ের অসারতা প্রমাণ করে, তখন তাকে রূপক বা অপব্যাখ্যার মোড়কে রক্ষা করার চেষ্টা করা বুদ্ধিবৃত্তিক অসততা মাত্র। বস্তুনিষ্ঠ ও যৌক্তিক বিশ্লেষণ এটাই নির্দেশ করে যে, প্রজনন বিষয়ে মুহাম্মদের দাবিগুলো ছিল নিছক তাঁর সময়ের প্রচলিত ভুল ধারণার সমষ্টি, যা আধুনিক বিজ্ঞানের কষ্টিপাথরে সম্পূর্ণভাবে অচল।
তথ্যসূত্রঃ
- ইসলামী বিশ্বাসে সন্তানের চেহারা কার মত হবে? ↩︎
- সহীহ বুখারী, তাওহীদ পাবলিকেশন, হাদিসঃ ১৩০ ↩︎
- সহীহ বুখারী, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, হাদিসঃ ১৩২ ↩︎
- সহীহ বুখারী, তাওহীদ পাবলিকেশন, হাদিসঃ ২৮২ ↩︎
- সহীহ মুসলিম, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, হাদিসঃ ৬০৩ ↩︎
- Lane’s Arabic-English Lexicon ↩︎
- সহীহ মুসলিম, হাদিস নং ৩১১ ↩︎
- ইবনে হাজার আসকালানী, ফাতহুল বারী, ১ম খণ্ড, পৃষ্ঠা ৩৮৯ ↩︎
- ইবনে হাজার আসকালানী, ফাতহুল বারী, ১ম খণ্ড, পৃষ্ঠা ৩৮৯ ↩︎
- العلامات التي يعرف بها مني المرأة ↩︎
- Hippocrates, On Regimen ↩︎
- Galen, On Semen ↩︎
- Pormann & Savage-Smith, Medieval Islamic Medicine ↩︎
- Hippocrates, On the Nature of the Child ↩︎
- Gray’s Anatomy: The Anatomical Basis of Clinical Practice ↩︎
- Vander’s Human Physiology ↩︎
- The Journal of Sexual Medicine, 2013 ↩︎
- Reviews Urology, 2017 ↩︎
