Table of Contents
ভূমিকাঃ জনস্বাস্থ্য বনাম প্রাচীন প্রথা
বাংলাদেশ ও ভারতের মতো দক্ষিণ এশীয় দেশগুলোতে নবজাতকের চোখে সুরমা বা কাজল দেওয়া একটি দীর্ঘস্থায়ী সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় প্রথা। কেবল শিশুরাই নয়, নারী-পুরুষ নির্বিশেষে প্রাপ্তবয়স্করাও সৌন্দর্যের অনুষঙ্গ বা ধর্মীয় পুণ্য অর্জনের আশায় নিয়মিত চোখে সুরমা ব্যবহার করেন। তবে এই বহুল প্রচলিত প্রথাটি চোখের স্বাস্থ্যের জন্য প্রকৃতপক্ষে কতটা উপকারী, নাকি এটি জনস্বাস্থ্যের জন্য একটি নীরব হুমকি—তা বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিকোণ থেকে খতিয়ে দেখা জরুরি। বিশেষ করে শিশুদের ক্ষেত্রে ব্যবহৃত যেকোনো দ্রব্যের সুরক্ষা নিশ্চিত করা অপরিহার্য, কারণ তাদের শরীর যেকোনো বিষক্রিয়ায় দ্রুত আক্রান্ত হতে পারে। এই প্রবন্ধে আমরা সুরমার রাসায়নিক গঠন এবং মানবদেহে এর সুদূরপ্রসারী ক্ষতিকর প্রভাবগুলো গবেষণালব্ধ তথ্যের ভিত্তিতে বিশ্লেষণ করব।
আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা বনাম ধর্মীয় প্রচারণা
আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞানের উৎকর্ষের এই যুগে যেখানে প্রতিটি প্রসাধনী বা ওষুধের নিরাপত্তা কঠোরভাবে যাচাই করা হয়, সেখানে ‘সুরমা’ বা ‘কোহল’-এর মতো পদার্থের ব্যবহার নিয়ে বিশ্বজুড়ে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। আপনি কি জানেন যে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ফুড অ্যান্ড ড্রাগ অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (FDA) চোখে সুরমা বা কাজল ব্যবহারকে সরাসরি নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে? তাদের গবেষণায় দেখা গেছে, সুরমার অন্যতম প্রধান উপাদান হলো সীসা (Lead), যা মানবদেহের জন্য অত্যন্ত বিষাক্ত একটি ধাতু [1].
অথচ এই বৈজ্ঞানিক সতর্কবার্তার ঠিক বিপরীতে দাঁড়িয়ে আছে শতাব্দী প্রাচীন ধর্মীয় বিশ্বাস। ইসলামের নবী মুহাম্মদ সুরমা ব্যবহারের ওপর অত্যন্ত জোর দিয়েছেন এবং এটিকে কেবল একটি প্রসাধনী নয়, বরং চোখের জ্যোতি বর্ধক ও নিরাময়কারী হিসেবে বর্ণনা করেছেন। বিশেষ করে ‘ইসমিদ’ নামক সুরমার ব্যাপারে তাঁর সুনির্দিষ্ট দাবি ছিল যে, এটি চোখের পাপড়ি গজাতে সাহায্য করে এবং দৃষ্টিশক্তি পরিষ্কার করে। আসুন এই সম্পর্কিত সহীহ হাদিসগুলোর বর্ণনা দেখে নিই:
মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত)
পর্ব-৫: জানাযা
পরিচ্ছেদঃ ৪. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ – মাইয়্যিতের গোসল ও কাফন
১৬৩৮-[৫] ’আবদুল্লাহ ইবনু ’আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ তোমরা সাদা কাপড় পরিধান করবে, কারণ সাদা কাপড়ই সবচেয়ে ভাল। আর মুর্দাকে সাদা কাপড় দিয়েই কাফন দিবে। তোমাদের জন্য সুরমা হলো ’ইসমিদ’ কারণ এ সুরমা ব্যবহারে তোমাদের চোখের পাপড়ি নতুন করে গজায় ও চোখের জ্যোতি বৃদ্ধি পায়। (আবূ দাঊদ, তিরমিযী)[1]
[1] সহীহ : আবূ দাঊদ ৪০৬১, আত্ তিরমিযী ৯৯৪, নাসায়ী ৫৩২২, মুসান্নাফ ‘আবদুর রাযযাক্ব ৬২০০, আহমাদ ৩৪২৬, ইবনু হিব্বান ৫৪২৩, শু‘আবুল ঈমান ৫৯০৫, শারহুস্ সুন্নাহ্ ১৪৭৭, সহীহ আত্ তারগীব ২০২৬, সহীহ আল জামি‘ আস্ সগীর ১২৩৬।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
সহীহ শামায়েলে তিরমিযী
৭. রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এর সুরমা ব্যবহার
পরিচ্ছেদঃ রাসূলুল্লাহ (সাঃ) প্রত্যেক রাতে উভয় চোখে তিনবার করে সুরমা লাগাতেন
৪১. ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, তোমরা ’ইছমিদ’ সুরমা ব্যবহার করো। কারণ, তা চোখের জ্যোতি বৃদ্ধি করে ও পরিষ্কার রাখে এবং অধিক ভ্রু উৎপন্ন করে (ভ্রু উদগত হয়)। ইবনে আব্বাস (রাঃ) আরো বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর একটি সুরমাদানী ছিল। প্রত্যেক রাত্রে (ঘুমানোর পূর্বে) ডান চোখে তিনবার এবং বাম চোখে তিনবার সুরমা লাগাতেন।[1]
[1] সুনানুল কুবরা লিল ইমাম বাইহাকী, হা/৮৫১৬।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
এখানে একটি প্রকট বৈপরীত্য পরিলক্ষিত হয়—আধুনিক বিজ্ঞান যেখানে একে বিষাক্ত বলে চিহ্নিত করছে, ধর্মীয় ঐতিহ্য সেখানে একে স্বাস্থ্যের জন্য পরম উপকারী বলে প্রচার করছে। পরবর্তী পরিচ্ছেদগুলোতে আমরা দেখব, এই ‘ইসমিদ’ পাথর আসলে কী দিয়ে তৈরি এবং এর রাসায়নিক গঠন মানুষের জন্য কতটা ঝুঁকিপূর্ণ।
সুরমার রাসায়নিক গঠন ও বিষক্রিয়ার বিশ্লেষণ
সুরমা বা কোহল কেবল একটি সাধারণ প্রসাধনী নয়, এটি মূলত বিভিন্ন খনিজ উপাদানের একটি জটিল মিশ্রণ। বিশেষভাবে ‘ইসমিদ’ সুরমা তৈরি হয় এক ধরণের প্রাকৃতিক পাথর গুঁড়ো করে। রাসায়নিকভাবে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এই সুরমার প্রধান উপাদান হলো লেড সালফাইড (Lead Sulfide) বা সীসা, যা বিজ্ঞানের ভাষায় ‘গ্যালেনা’ (Galena) নামে পরিচিত। সৌদি আরব এবং দক্ষিণ এশীয় দেশগুলোতে ব্যবহৃত সুরমার নমুনা পরীক্ষা করে দেখা গেছে যে, এতে সীসার পরিমাণ আশঙ্কাজনকভাবে বেশি, অনেক ক্ষেত্রে যা ৮০% থেকে ১০০% পর্যন্ত হয়ে থাকে [2]। ইসমিদ পাথরের রাসায়নিক তালিকায় সীসা ছাড়াও অ্যান্টিমনি (Antimony), কার্বন এবং জিংকের মতো ধাতব পদার্থের উপস্থিতি পাওয়া যায়, যা সরাসরি চোখের স্পর্শকাতর টিস্যুর সংস্পর্শে আসে। গবেষকগণ দীর্ঘমেয়াদী পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে সুরমা ব্যবহারের বেশ কিছু মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকি চিহ্নিত করেছেন:
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে চোখে ব্যবহারের এই সুরমা নিষিদ্ধ
আপনি জানেন কি, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে চোখে ব্যবহারের এই সুরমা নিষিদ্ধ একটি বস্তু [6]? কেন এটি সেখানে নিষিদ্ধ করা হয়েছে, আপনি জানেন?

এর কারণ হচ্ছে, সুরমার মূল উপাদান হলো লেড সালফাইড। আসুন সুরমার রাসায়নিক পদার্থগুলোর তালিকা দেখে নেয়া যাক, [7] –

সীসাযুক্ত সুরমা ব্যবহার রক্তপ্রবাহে সীসার মাত্রা বাড়িয়ে দেয় [8] [9] [10] [11], যার ফলে ব্যবহারকারীদের মধ্যে লেড পয়জনিং বা সীসার বিষক্রিয়ার ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যায়। গবেষকদের মতে, রক্তে সীসার মাত্রা বৃদ্ধি পাওয়ার কারণে রক্তস্বল্পতা, শারীরিক বৃদ্ধি ব্যাহত হওয়া, শিশুদের বুদ্ধিবৃত্তিক সক্ষমতা বা আইকিউ (IQ) হ্রাস পাওয়া, খিঁচুনি এবং গুরুতর ক্ষেত্রে মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে। সীসার এই বিষক্রিয়াজনিত রক্তস্বল্পতা বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্য এবং দক্ষিণ এশীয় দেশগুলোর শিশুদের মধ্যে একটি ব্যাপক জনস্বাস্থ্য সমস্যা হিসেবে পরিলক্ষিত হচ্ছে।
উপসংহারঃ অপবিজ্ঞান বনাম বাস্তবতা
ইসলামী ঐতিহ্যে প্রচারিত—“সুরমা চোখের পাপড়ি নতুন করে গজায় এবং চোখের জ্যোতি বৃদ্ধি করে”—এই দাবিটির কোনো জৈবিক বা চিকিৎসাশাস্তীয় ভিত্তি এখন পর্যন্ত খুঁজে পাওয়া যায়নি। প্রকৃতপক্ষে, সীসার মতো ভারী ধাতু চুলের ফলিকল বা লোমকূপের ক্ষতি করে, যা পাপড়ি গজানোর পরিবর্তে পাপড়ি ঝরে পড়ার (Alopecia) কারণ হতে পারে। একইভাবে, সীসার বিষক্রিয়া চোখের অপটিক নার্ভের প্রদাহ সৃষ্টি করতে পারে, যা দৃষ্টিশক্তি বাড়ায় না বরং অন্ধত্বের দিকে ঠেলে দেয়।
ধর্মীয় বিশ্বাসের বশবর্তী হয়ে বিজ্ঞানকে উপেক্ষা করা কেবল ব্যক্তিগত ভ্রান্তি নয়, বরং এটি একটি জনস্বাস্থ্যগত ঝুঁকি। নবজাতকের কোমল চোখে বিষাক্ত সীসা লেপন করা একটি নিষ্ঠুর প্রথা ছাড়া আর কিছুই নয়। আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞানের অকাট্য প্রমাণের সামনে এই জাতীয় প্রাচীন ও ক্ষতিকর প্রথাগুলোকে টিকিয়ে রাখা আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে পঙ্গু করে দেওয়ার শামিল। তাই সামাজিক ও মানসিকভাবে এই কুসংস্কার বর্জন করা এবং বৈজ্ঞানিক সচেতনতা ছড়িয়ে দেওয়া এখন সময়ের দাবি।
তথ্যসূত্রঃ
- FDA, 2017, Kohl, Kajal, Al-Kahal, Surma, Tiro, Tozali, or Kwalli: By Any Name, Beware of Lead Poisoning ↩︎
- Alkhawajah, 1992, Tropical Geographical Medicine ↩︎
- Nir et al., 1992, Israel Journal of Medical Science ↩︎
- Rahbar et al., 2002, Bulletin of the World Health Organization ↩︎
- Al-Saleh et al., 1999, International Journal of Environmental Health ↩︎
- “Kohl, Kajal, Al-Kahal, Surma, Tiro, Tozali, or Kwalli: By Any Name, Beware of Lead Poisoning”. Food and Drug Administration. Retrieved 2017-10-26. ↩︎
- Studies on the chemical composition of kohl stone by X-ray diffractometer – Scientific Figure on ResearchGate. Available ↩︎
- Alkhawajah AM (October 1992). “Alkohl use in Saudi Arabia: Extent of use and possible lead toxicity”. Tropical Geographical Medicine. 44 (4): 373–377. PMID 1295151 ↩︎
- Al-Saleh I, Nester M, DeVol E, Shinwari N, Al-Shahria S (April–June 1999). “Determinants of blood lead levels in Saudi Arabian schoolgirls”. International Journal of Environmental Health. 5 (2): 107–114. doi:10.1179/oeh.1999.5.2.107. PMID 10330510 ↩︎
- Nir A, Tamir A, Nelnik N, Iancu TC (July 1992). “Is eye cosmetic a source of lead poisoning?”. Israel Journal of Medical Science. 28 (7): 417–421. PMID 1506164 ↩︎
- Rahbar MH, White F, Agboatwalla M, Hozhbari S, Luby S (2002). “Factors associated with elevated blood lead concentrations in children in Karachi, Pakistan”. Bulletin of the World Health Organization. 80 (10): 769–775. PMC 2567650. PMID 12471396 ↩︎
