ঈশ্বরের অস্তিত্বে অবিশ্বাস ≠ “ঈশ্বর নেই” বিশ্বাস

ভূমিকা

ঈশ্বরতত্ত্ব ও দর্শনের বিতর্কে একটি অত্যন্ত প্রচলিত বিভ্রান্তি হলো ‘ঈশ্বরের অস্তিত্বে অবিশ্বাস’ এবং ‘ঈশ্বরের অনস্তিত্বে বিশ্বাস’—এই দুইয়ের মধ্যবর্তী সূক্ষ্ম কিন্তু মৌলিক পার্থক্যকে গুলিয়ে ফেলা। আস্তিক্যবাদীদের পক্ষ থেকে প্রায়শই দাবি করা হয় যে, নাস্তিক্যবাদ বা অবিশ্বাস হলো একটি ইতিবাচক দাবি বা বিশ্বাসের অন্য একটি রূপান্তর, যেখানে একজন ব্যক্তি দৃঢ়ভাবে প্রচার করেন যে ‘ঈশ্বর নেই’। এই ভ্রান্ত ধারণার ওপর ভিত্তি করেই অনেক সময় ‘স্ট্রম্যান ফ্যালাসি’ (Strawman Fallacy) বা ‘খড়কুটোর মানুষ’ নামক তর্কের কূটাভাস তৈরি করা হয় [1]এখানে নাস্তিকদের প্রকৃত অবস্থানকে—যা মূলত একটি দাবির প্রতি সংশয় বা অসম্মতি—বিকৃত করে একটি চরম অবস্থানে (ঈশ্বরের অনুপস্থিতির দাবি) দাঁড় করানো হয় এবং তারপর সেই বিকৃত অবস্থানকে আক্রমণ করা সহজ হয়ে পড়ে। প্রকৃতপক্ষে, নাস্তিক্যবাদ বা ঈশ্বরের অস্তিত্বে অবিশ্বাসের মূল ভিত্তি হলো পর্যাপ্ত ও যাচাইযোগ্য প্রমাণের অভাবজনিত কারণে একটি দাবিকে গ্রহণ না করা। এটি কোনো নতুন বিশ্বাসের জন্ম দেয় না, বরং একটি অসমর্থিত দাবিকে প্রত্যাখ্যান করে মাত্র [2]। যুক্তিবাদী দৃষ্টিকোণ থেকে প্রমাণের দায়ভার বা ‘বার্ডেন অফ প্রুফ’ সর্বদা সেই পক্ষের ওপর বর্তায় যারা কোনো অস্তিত্বের বা অলৌকিক সত্তার দাবি করেন; সেই দাবি গ্রহণে অস্বীকৃতি জানানো মানেই এর বিপরীত কোনো ধ্রুব সত্যকে প্রতিষ্ঠা করার দায়ভার গ্রহণ করা নয়।


মার্বেল ও কালো বাক্সের তাত্ত্বিক উদাহরণ

এই যুক্তির তাত্ত্বিক ভিত্তিটি বোঝার জন্য একটি কালো বাক্সের উদাহরণ বিবেচনা করা যাক, যার ভেতরে কতগুলো মার্বেল আছে তা বাইরে থেকে দেখা সম্ভব নয়। এখন যদি কেউ দাবি করেন যে, “এই বাক্সের ভেতরে জোড় সংখ্যক মার্বেল আছে”, তবে যুক্তিবাদী বিচারবুদ্ধি সম্পন্ন একজন ব্যক্তি স্বাভাবিকভাবেই প্রমাণের দাবি করবেন। যেহেতু বাক্সটি স্বচ্ছ নয় এবং ভেতরে মার্বেল গণনার কোনো সুযোগ নেই, তাই ওই ব্যক্তির দাবিটি একটি নিছক অনুমান বা ‘ব্লাইন্ড অ্যাসারশন’ (Blind Assertion) হিসেবে গণ্য হবে। এখন, যদি আমি ওই ব্যক্তির দাবির স্বপক্ষে পর্যাপ্ত প্রমাণের অভাবে বলি যে, “আমি আপনার কথা বিশ্বাস করি না” বা “আমি আপনার দাবিটি গ্রহণ করছি না”, তবে তার মানে কি এই দাঁড়ায় যে আমি দাবি করছি বাক্সে ‘বেজোড়’ সংখ্যক মার্বেল আছে? অবশ্যই নয় [3]। জোড় সংখ্যার দাবিকে প্রত্যাখ্যান করা মানে এই নয় যে আমি বিপরীত কোনো গাণিতিক সত্য (বেজোড়) প্রচার করছি। আমি কেবল একটি অপ্রমাণিত দাবির প্রতি আমার ‘অবিশ্বাস’ বা ‘অসম্মতি’ জ্ঞাপন করছি। ঠিক একইভাবে, আস্তিক যখন কোনো প্রমাণ ছাড়াই মহাবিশ্বের স্রষ্টা হিসেবে ঈশ্বরের অস্তিত্বের দাবি করেন, তখন নাস্তিক বা যুক্তিবাদী সেই সুনির্দিষ্ট দাবিটি গ্রহণ করতে অস্বীকার করেন। এই অস্বীকার মূলত একটি জ্ঞানতাত্ত্বিক (Epistemological) অবস্থান, যা কোনো সুনির্দিষ্ট উপসংহারে পৌঁছানোর আগে পর্যাপ্ত প্রমাণের অপেক্ষা করে [4]। প্রমাণের অভাবে কোনো দাবি গ্রহণ না করা আর সেই দাবির বিপরীত অবস্থাকে সত্য বলে প্রচার করার মধ্যে যে বিশাল যৌক্তিক ব্যবধান রয়েছে, তা উপেক্ষা করাই হলো এই বিতর্কের মূল বিভ্রান্তির উৎস।

ঈশ্বর নেই

প্রমাণের দায়ভার ও আদালতের প্রেক্ষাপট

যৌক্তিক বিতর্কে ‘প্রমাণের দায়ভার’ বা ‘বার্ডেন অফ প্রুফ’ (Burden of Proof) একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ নীতি। সাধারণ অর্থে, যে পক্ষ কোনো কিছুর অস্তিত্ব বা বিশেষ কোনো ঘটনার দাবি করেন, সেই দাবি প্রমাণের দায়িত্বও তাদেরই ওপর বর্তায়। একে ল্যাটিন ভাষায় বলা হয় ‘Onus probandi’ [5]। এই ধারণাকে আরও পরিষ্কার করার জন্য আমরা আদালতের বিচার প্রক্রিয়ার একটি উদাহরণ গ্রহণ করতে পারি। যখন একজন ব্যক্তির বিরুদ্ধে কোনো অপরাধের অভিযোগ আনা হয়, তখন প্রসিকিউশন বা অভিযোগকারী পক্ষকে প্রমাণ করতে হয় যে অভিযুক্ত ব্যক্তিটি দোষী। যদি তারা পর্যাপ্ত প্রমাণ উপস্থাপন করতে ব্যর্থ হয়, তবে আদালত রায় দেয় ‘দোষী নয়’ (Not Guilty)। এখানে লক্ষণীয় যে, ‘দোষী নয়’ রায়ের অর্থ এই নয় যে আদালত ওই ব্যক্তিকে শতভাগ ‘নির্দোষ’ (Innocent) বলে ঘোষণা করছে; বরং এর অর্থ হলো অভিযুক্তের অপরাধ প্রমাণের জন্য পর্যাপ্ত তথ্যপ্রমাণ নেই [6]। ঠিক একইভাবে, ঈশ্বর আছেন কি নেই—এই তর্কে আস্তিক যখন ঈশ্বরের অস্তিত্বের সপক্ষে অকাট্য প্রমাণ দিতে ব্যর্থ হন, তখন নাস্তিক বা যুক্তিবাদী সেই দাবিকে ‘অসত্য’ বা ‘প্রত্যাখ্যাত’ বলে গণ্য করেন। এই প্রত্যাখান কোনোভাবেই ‘ঈশ্বরের অনুপস্থিতি’র পাল্টা দাবি নয়, বরং এটি একটি ডিফল্ট বা প্রারম্ভিক অবস্থান যা ততক্ষণ পর্যন্ত বজায় থাকে যতক্ষণ না শক্তিশালী প্রমাণ উপস্থাপিত হচ্ছে। সুতরাং, আস্তিক্যবাদী দাবিকে খারিজ করা এবং ঈশ্বরের অনস্তিত্বে দৃঢ় বিশ্বাস পোষণ করা—এ দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন জ্ঞানতাত্ত্বিক অবস্থান [7]

ঈশ্বর নেই 1

অকল্পনীয় দাবি ও বার্ট্রান্ড রাসেলের চা-দানি (Russell’s Teapot)

ঈশ্বরের অস্তিত্বে অবিশ্বাস যে একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ দাবির পরিবর্তে কেবল একটি প্রতিক্রিয়ামূলক অবস্থান, তা বোঝাতে দার্শনিক বার্ট্রান্ড রাসেলের ‘মহাজাগতিক চা-দানি’র (Russell’s Teapot) উদাহরণটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। রাসেল যুক্তি দিয়েছিলেন যে, যদি তিনি দাবি করেন যে পৃথিবী ও মঙ্গলের মধ্যবর্তী কোনো এক কক্ষপথে একটি অতি ক্ষুদ্র চীনামাটির চা-দানি সূর্যকে প্রদক্ষিণ করছে, তবে সেই দাবিটি মিথ্যা প্রমাণ করা কারো পক্ষেই সম্ভব নয়; কারণ চা-দানিটি এতই ছোট যে পৃথিবীর কোনো শক্তিশালী টেলিস্কোপ দিয়েও তা দেখা যাবে না [8]। এখন, এই দাবির বিপরীতে কেউ যদি বলেন, “আমি আপনার চা-দানির অস্তিত্বে বিশ্বাস করি না”, তবে কি তাকে প্রমাণ করতে হবে যে সেখানে কোনো চা-দানি নেই? যুক্তিবিদ্যার নিয়ম অনুযায়ী, অবিশ্বাসী ব্যক্তিকে কোনো কিছুই প্রমাণ করতে হয় না। এখানে চা-দানির অস্তিত্বে ‘অবিশ্বাস’ করা মানে এই নয় যে ব্যক্তিটি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করেন যে কক্ষপথটি শূন্য। বরং এর অর্থ হলো, দাবিদারের দাবির সপক্ষে যেহেতু কোনো ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য বা গাণিতিক প্রমাণ নেই, তাই সেই দাবিটিকে সত্য বলে গ্রহণ করার কোনো যৌক্তিক ভিত্তি নেই [9]। একইভাবে, কার্ল সেগান তার ‘গ্যারেজে থাকা অদৃশ্য ড্রাগন’-এর রূপকের মাধ্যমে দেখিয়েছেন যে, কোনো দাবি যদি এমন হয় যা কোনোভাবেই পরীক্ষা বা পর্যবেক্ষণ করা যায় না (যেমন: অদৃশ্য, গন্ধহীন, তাপহীন ড্রাগন), তবে সেই ড্রাগনের অস্তিত্বে অবিশ্বাস করা কোনো ‘পাল্টা বিশ্বাস’ নয়, বরং তা হলো সুস্থ মস্তিষ্কের একটি ডিফল্ট অবস্থান [7]। সুতরাং, আস্তিক যখন ঈশ্বরকে একটি অপ্রমাণযোগ্য সত্তা হিসেবে হাজির করেন, তখন নাস্তিক কেবল সেই অপ্রমাণিত দাবিটিকে বর্জন করেন; তিনি নিজে কোনো নতুন অতিপ্রাকৃত দাবির বোঝা মাথায় তুলে নেন না।


উপসংহারঃ আস্তিক্যবাদী দৃষ্টিভঙ্গি ও স্ট্রম্যান ফ্যালাসির অসারতা

ঈশ্বরতত্ত্বের বিতর্কে আস্তিক্যবাদী প্রচারকগণ অনেক সময় একটি কৌশলগত অবস্থান গ্রহণ করেন, যেখানে তারা দাবি করেন যে “নাস্তিক্যবাদও এক ধরণের বিশ্বাস” বা “নাস্তিকরা ঈশ্বরের অনুপস্থিতির ওপর ঈমান এনেছে”। এটি একটি ধ্রুপদী ‘স্ট্রম্যান ফ্যালাসি’ (Strawman Fallacy) বা খড়কুটোর মানুষের কূটাভাস, যেখানে প্রতিপক্ষের প্রকৃত অবস্থানকে বিকৃত করে একটি দুর্বল ও ভুল সংস্করণ তৈরি করা হয় এবং তারপর সেই বিকৃত সংস্করণটিকে আক্রমণ করা হয় [1]। অধিকাংশ যুক্তিবাদী নাস্তিক এই দাবি করেন না যে তারা মহাবিশ্বের প্রতিটি প্রান্ত অনুসন্ধান করে নিশ্চিত হয়েছেন যে ঈশ্বর নেই; বরং তাদের অবস্থান হলো—যেহেতু ঈশ্বরের সপক্ষে কোনো বস্তুনিষ্ঠ বা যাচাইযোগ্য প্রমাণ নেই, তাই তারা এই ধারণায় বিশ্বাস স্থাপন করেন না [2]। আস্তিক্যবাদী দৃষ্টিভঙ্গি যখন অবিশ্বাসকে একটি ‘পাল্টা বিশ্বাস’ হিসেবে উপস্থাপন করে, তখন তারা মূলত প্রমাণের দায়ভার (Burden of Proof) নিজের কাঁধ থেকে নামিয়ে নাস্তিকের ওপর চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেন।

যুক্তিবিদ্যার ভাষায়, কোনো কিছুর অনুপস্থিতি প্রমাণ করা বা ‘প্রুভিং আ নেগেটিভ’ (Proving a Negative) প্রায় অসম্ভব এবং অপ্রয়োজনীয় একটি কাজ [10]। আমরা যদি বলি যে মহাবিশ্বের কোথাও কোনো অদৃশ্য ও ধরাছোঁয়ার বাইরের ড্রাগন নেই, তবে সেই ‘নেই’ প্রমাণ করার জন্য আমাদের মহাবিশ্বের প্রতিটি বিন্দু একই সময়ে পর্যবেক্ষণ করতে হবে, যা লজিক্যালি অসম্ভব। কিন্তু এর মানে এই নয় যে ড্রাগনের অস্তিত্বের দাবিটি সত্য। ঠিক একইভাবে, জোড়-বেজোড় মার্বেলের তাত্ত্বিক উদাহরণের মতো, আস্তিক যখন কোনো প্রমাণ ছাড়াই একটি গাণিতিক বা মহাজাগতিক সত্য দাবি করেন, তখন সেই দাবিকে প্রত্যাখ্যান করা কোনো নতুন দাবির জন্ম দেয় না। এটি কেবল একটি ভিত্তিহীন প্রস্তাবনাকে গ্রহণ করতে অস্বীকৃতি জানানো মাত্র।

পরিশেষে বলা যায়, ঈশ্বরের অস্তিত্বে অবিশ্বাস মানে ঈশ্বরের অনস্তিত্বে বিশ্বাস নয়—এই ধারণাটি বুঝতে পারা মানেই হলো অন্ধবিশ্বাস এবং সংশয়বাদের মধ্যকার মৌলিক পার্থক্যটি ধরতে পারা। ধর্মতত্ত্বের জটিল জাল এবং আবেগতাড়িত বিশ্বাসের ঊর্ধ্বে উঠে যদি কেবল যুক্তি ও প্রমাণের মানদণ্ডে কোনো বিষয়কে বিচার করা হয়, তবে দেখা যায় যে অবিশ্বাসী অবস্থানটি কোনো সক্রিয় বিশ্বাস নয়, বরং এটি হলো প্রমাণের অনুপস্থিতিতে একটি সচেতন ও যৌক্তিক নীরবতা [4]কোনো একটি দাবির সত্যতা নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত সেটিকে সত্য হিসেবে গ্রহণ না করাই হলো যুক্তিবাদী বিচারবুদ্ধির পরিচায়ক, যা কোনোভাবেই অন্য কোনো বিশ্বাসের সমার্থক হতে পারে না।


তথ্যসূত্রঃ
  1. Damer, T. E. (2008). Attacking Faulty Reasoning: A Practical Guide to Fallacy-Free Arguments 1 2
  2. Smith, G. H. (1979). Atheism: The Case Against God 1 2
  3. Barker, D. (2008). Godless: How an Evangelical Preacher Became One of America’s Leading Atheists ↩︎
  4. Pigliucci, M. (2010). Nonsense on Stilts: How to Tell Science from Bunk 1 2
  5. Walton, D. (2014). Burden of Proof, Presumption and Argumentation ↩︎
  6. Kassin, S. M., & Wrightsman, L. S. (1988). The American Jury on Trial: Psychological Perspectives ↩︎
  7. Sagan, C. (1995). The Demon-Haunted World: Science as a Candle in the Dark 1 2
  8. Russell, B. (1952). Is There a God? ↩︎
  9. Dawkins, R. (2006). The God Delusion ↩︎
  10. Shermer, M. (2002). Why People Believe Weird Things ↩︎