“কালাম কসমোলজিক্যাল আর্গুমেন্ট” – এর ব্যবচ্ছেদ

Table of Contents

সারসংক্ষেপ

ঐতিহাসিক ও দার্শনিক রচনাবলীতে ‘কালাম কসমোলজিক্যাল আর্গুমেন্ট’ (Kalam Cosmological Argument — KCA) দীর্ঘকাল ধরে শক্তিশালী প্রতিপাদ্য হিসেবে প্রতিষ্ঠিত ছিল। মধ্যযুগীয় ইসলামী তর্কশৈলী থেকে লালিত—পরে আধুনিক খ্রিস্টীয় অ্যাপোলজেটিক্সে নতুন প্রাণ পেয়েছে—এই যুক্তি মহাবিশ্বকে সসীম ধরে নিয়ে তার পিছনে কোনো অনিত্য কারণ, অর্থাৎ একটি সৃষ্টিকর্তা দাবি করে। কিন্তু দাবিটা যত সরল, ততই প্রশ্নগুলো জটিল: কীভাবে ‘প্রসারণের শুরু’কে অটলভাবে ‘অস্তিত্বের পরম শুরু’ হিসেবে রূপান্তর করা যায়? কোন পর্যায়ে দৈনন্দিন কারণ-শৈলীকে বৈজ্ঞানিক সত্য হিসেবে গৃহীত করা যুক্তিযুক্ত?

এই প্রবন্ধের লক্ষ্য হলো তর্কটিকে কেবল আবেগ, বিশ্বাস বা ঐতিহ্যের ভিত্তিতে নয়—বস্তুনিষ্ঠ বৈজ্ঞানিক ও লজিক্যাল মানদণ্ডে—পুনর্মূল্যায়ন করা। আমরা আধুনিক পদার্থবিজ্ঞান, সমকালীন কসমোলজিক্যাল মডেল এবং মডাল লজিক ব্যবহার করে KCA-র মূল প্রস্তাবনাগুলো বিচ্ছিন্নভাবে পরীক্ষা করবো। প্রাথমিক ফলাফলটি সরল: KCA-র কিছু কেন্দ্রীয় অনুমান কোয়ান্টাম মেকানিক্স ও সাম্প্রতিক কসমোলজির সঙ্গে অসঙ্গতিপূর্ণ বা অনিশ্চিত; বিশেষ করে ‘মহাবিশ্ব প্রসারণের সূচনা’ ও ‘মহাবিশ্বের অন্তিম সূচনা’ একবাবে মিলিয়ে দেওয়ার প্রবণতা এবং অংশ থেকে সমগ্রে লজিক্যাল ট্রান্সফার করার ফলে ঘটে যাওয়া কম্পোজিশন ফ্যালাসি—এই দুটি বিষয় যুক্তির সবচেয়ে বড় দুর্বলতা। সংক্ষেপে, KCA যতটা শাস্ত্রীয় প্রভাবশালী, ততটাই তা বৈজ্ঞানিক ও মডাল বিশ্লেষণে পুনর্বিবেচনার দাবি রাখে। কালাম কসমোলজিক্যাল আর্গুমেন্ট (KCA) এর যে মৌলিক দুর্বলতাগুলো রয়েছে:

কোয়ান্টাম অ-কারণতা (Quantum Indeterminacy)
আর্গুমেন্টের প্রথম দাবি—”সবকিছুর কারণ থাকতে হবে”—কোয়ান্টাম মেকানিক্সের ক্ষেত্রে খাটে না। পারমাণবিক স্তরে তেজস্ক্রিয় ক্ষয় বা শূন্যস্থান থেকে ভার্চুয়াল কণার উদ্ভব কোনো নির্দিষ্ট কারণ ছাড়াই স্বতঃস্ফূর্তভাবে ঘটে থাকে [1]
প্রসারণ বনাম পরম শুরু
বিগ ব্যাং মহাবিশ্বের প্রসারণের (expansion) শুরু নির্দেশ করে, কিন্তু এটিই মহাবিশ্বের অস্তিত্বের (existence) পরম শুরু কি না, তা বিজ্ঞানে এখনো অমীমাংসিত। প্রসারণের শুরু মানেই শূন্য থেকে অস্তিত্ব লাভ করা নয় [2]
সময়ের বি-থিওরি (Block Universe)
KCA সময়ের ‘প্রবাহ’ বা এ-থিওরির ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু আইনস্টাইনের আপেক্ষিকতা তত্ত্ব অনুযায়ী সময় একটি ব্লকের মতো (B-Theory), যেখানে অতীত-বর্তমান-ভবিষ্যৎ যুগপৎ বিদ্যমান। এই মডেলে মহাবিশ্বের কোনো পরম “আবির্ভাব” বা শুরু ঘটে না [3]
বিশেষ সুবিধাবাদ (Special Pleading)
সবকিছুর কারণ থাকতে হবে বলে দাবি করার পর ঈশ্বরকে “অনাদি” বলে সেই নিয়মের ঊর্ধ্বে রাখা একটি যৌক্তিক ফ্যালাসি। যদি ঈশ্বর অনাদি হতে পারেন, তবে মহাবিশ্ব বা মাল্টিভার্স কেন আদি সত্য (Brute fact) হতে পারবে না, তার কোনো প্রমাণ KCA দিতে পারে না [4]
ফ্যালাসি অফ কম্পোজিশন
মহাবিশ্বের ভেতরের প্রতিটি বস্তুর একটি কারণ থাকার অর্থ এই নয় যে, সমগ্র মহাবিশ্বেরও একটি কারণ থাকতে হবে। অংশ বা উপাদানের বৈশিষ্ট্যকে সমগ্রের ওপর চাপিয়ে দেওয়া একটি লজিক্যাল ভুল [5]
যৌক্তিক উল্লম্ফন (Logical Leap)
মহাবিশ্বের যদি কোনো কারণ থেকেও থাকে, তবে সেই কারণটি যে কোনো একজন “সচেতন ব্যক্তিসত্তা” বা ধর্মীয় ঈশ্বর হবেন, তার সপক্ষে কোনো অকাট্য যুক্তি এই আর্গুমেন্টে নেই। কারণটি কোনো অন্ধ প্রাকৃতিক শক্তি বা মেকানিজমও হতে পারে [6]
কালহীন ইচ্ছার স্ববিরোধিতা
সময়ের উদ্ভবের আগে বা সময়ের বাইরে কোনো সত্তা কীভাবে “ইচ্ছা” পোষণ করতে পারে বা “সিদ্ধান্ত” নিতে পারে, তা ধারণাগতভাবে অসম্ভব। কারণ সিদ্ধান্ত গ্রহণ নিজেই একটি সময়সাপেক্ষ মানসিক প্রক্রিয়া [7]

ভূমিকা

ঈশ্বরের অস্তিত্ব প্রমাণের নামে যে কয়েকটি যুক্তি যুগে যুগে ‘অকাট্য’ বলে বাজারজাত হয়েছে, কালাম কসমোলজিক্যাল আর্গুমেন্ট তাদের মধ্যে সবচেয়ে প্রচারিত। এর শক্তি তার সরলতায়—বরং বলা ভালো, তার বিপজ্জনক সরলতায়। যুক্তিটির কাঠামো এমনভাবে সাজানো যে এটি সাধারণ বুদ্ধির সঙ্গে তাৎক্ষণিক সাযুজ্য তৈরি করে; শুনলেই মনে হয়, “এ তো খুব স্বাভাবিক কথা।” কিন্তু দর্শনের ইতিহাস বারবার দেখিয়েছে, যা স্বাভাবিক বলে মনে হয়, তা প্রায়ই যৌক্তিক বিশ্লেষণে টেকে না।

ঐতিহাসিকভাবে এর দূরবর্তী সূত্র খুঁজে পাওয়া যায় গ্রিক দার্শনিক অ্যারিস্টটল-এর কার্যকারণ ভাবনায়। তবে যুক্তিটির সুসংহত ধর্মতাত্ত্বিক রূপ নির্মিত হয় মধ্যযুগীয় ইসলামী তর্কচর্চায়। একাদশ শতকে আল-গাজালি তাঁর তাহাফুত আল-ফালাসিফা-তে অ্যারিস্টটলের অনাদি মহাবিশ্ব ধারণার বিরোধিতা করতে গিয়ে এই যুক্তিকে কেন্দ্রীয় অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করেন [8]. বহু শতাব্দী পরে, বিংশ শতাব্দীর শেষভাগে, আমেরিকান দার্শনিক উইলিয়াম লেন ক্রেগ এই যুক্তিটিকে আধুনিক কসমোলজির ভাষায় পুনর্গঠন করেন এবং একে সমকালীন খ্রিস্টীয় অ্যাপোলজেটিক্সের কেন্দ্রস্থলে নিয়ে আসেন [9]

গাঠনিকভাবে এটি একটি অবরোহী বা ডিডাক্টিভ সিলোজিজম। এর রূপ অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত:

যা কিছুর অস্তিত্ব শুরু হয়, তার একটি কারণ থাকে।

মহাবিশ্বের অস্তিত্বের একটি শুরু আছে।

যৌক্তিক সিদ্ধান্ত (Inference)

অতএব, মহাবিশ্বের একটি কারণ আছে।

এই সিদ্ধান্তকে আরও বিস্তৃত করে বলা হয়, সেই ‘কারণ’ অবশ্যই স্থান-কাল-পাত্রের ঊর্ধ্বে, অসীম শক্তিসম্পন্ন এবং ইচ্ছাশীল ব্যক্তিসত্তা—অর্থাৎ ঈশ্বর। কিন্তু এখানেই প্রশ্নের সূত্রপাত। একটি বিমূর্ত “কারণ” থেকে কীভাবে সরাসরি একটি নির্দিষ্ট ধর্মীয় ঈশ্বরের দিকে অগ্রসর হওয়া যায়? এই লাফটি কি যুক্তিগতভাবে বৈধ, নাকি এটি কেবলমাত্র ধর্মতাত্ত্বিক আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন?

প্রথম দৃষ্টিতে যুক্তিটি ত্রুটিহীন মনে হতে পারে। কিন্তু প্রতিটি প্রেমিস আলাদাভাবে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এগুলো অভিজ্ঞতার সীমিত পরিসর থেকে সংগৃহীত ধারণাকে সমগ্র মহাবিশ্বের ক্ষেত্রে প্রয়োগ করে—যেন আমাদের দৈনন্দিন কার্যকারণ বোধই চূড়ান্ত মেটাফিজিক্যাল সত্য। এই প্রবন্ধে আমরা দেখানোর চেষ্টা করবো যে কালাম যুক্তির দৃঢ়তা মূলত ভাষাগত সরলতা ও ধারণাগত অস্পষ্টতার ওপর দাঁড়িয়ে আছে; আর এর ভিত্তি অনেকাংশে অভিজ্ঞতার অতিরঞ্জিত প্রয়োগ ও বৈজ্ঞানিক তথ্যের নির্বাচিত পাঠের ফল। আধুনিক বিজ্ঞান ও দর্শনের আলোকে এটি কঠিন চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন। এই প্রবন্ধে আমরা দেখাবো যে, এই যুক্তিটি অভিজ্ঞলব্ধ জ্ঞানের ভুল প্রয়োগ এবং বৈজ্ঞানিক তথ্যের অপব্যাখ্যার ওপর দণ্ডায়মান।


প্রথম প্রস্তাবনার ব্যবচ্ছেদ: কার্যকারণ তত্ত্বের সীমাবদ্ধতা

প্রথম প্রস্তাবনাটি হলো: “যা কিছুর শুরু আছে, তার একটি কারণ আছে।” এটি আমাদের দৈনন্দিন অভিজ্ঞতার ওপর ভিত্তি করে তৈরি একটি স্বজ্ঞাত ধারণা (Intuition)। একে দর্শনের ভাষায় ‘কজাল প্রিন্সিপাল’ (Causal Principle) বলা হয়। কিন্তু এই আপাত সত্যটি যখন মহাজাগতিক স্কেলে প্রয়োগ করা হয়, তখন এটি আর ধোপে টেকে না।

কার্যকারণ ধারণা ও সময়ের ওপর নির্ভরতা

কালাম কসমোলজিক্যাল আর্গুমেন্টে ‘কারণ’ শব্দটি এমনভাবে ব্যবহৃত হয় যেন এটি সময়ের বাইরে থাকা কোনো অ-কালিক (atemporal) সম্পর্ককে নির্দেশ করে। কিন্তু আমাদের প্রচলিত কার্যকারণ ধারণা সম্পূর্ণভাবে সময়-নির্ভর। একটি ঘটনা ‘আগে’ ঘটে, আরেকটি ‘পরে’ ঘটে — এবং তবেই আমরা প্রথমটিকে দ্বিতীয়টির কারণ বলি।

ইমানুয়েল কান্ত (Immanuel Kant) তাঁর Critique of Pure Reason-এ দেখিয়েছেন যে, কার্যকারণ আসলে আমাদের অভিজ্ঞতার সময়-গঠিত কাঠামোর (temporal framework) মধ্যেই অর্থপূর্ণ। এটি কোনো বাস্তবিক (mind-independent) সম্পর্ক নয়, বরং আমাদের জ্ঞানের একটি a priori শ্রেণি যা সময়ের সাথে অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত (Kant, Critique of Pure Reason, trans. Paul Guyer and Allen W. Wood, Cambridge University Press, 1998, A189–A211)।

যদি বিগ ব্যাং-এর সাথে সাথে সময়েরও সূচনা হয় (যা আধুনিক কসমোলজির মূল ধারণা), তাহলে “সময়ের আগে কী ঘটেছিল?” বা “সময়ের আগে কে কারণ ছিল?” — এই প্রশ্নগুলো স্ববিরোধী (self-contradictory) হয়ে যায়। কারণ ‘আগে–পরে’র ভাষা নিজেই সময়ের অস্তিত্ব ধরে নেয়। কালাম আর্গুমেন্ট এই সমস্যা এড়িয়ে “অ-কালিক কারণ” (atemporal cause) শব্দটি ব্যবহার করে, কিন্তু এতে একই শব্দ ‘কারণ’-কে দুই ভিন্ন অর্থে প্রয়োগ করা হয় — একবার সময়ের ভেতরে (মহাবিশ্বের মধ্যে), আরেকবার সময়ের বাইরে (ঈশ্বরের ক্ষেত্রে)। এই ধারণাগত দ্বৈততা (conceptual equivocation) স্পষ্ট যুক্তির দিক থেকে অগ্রহণযোগ্য।

এই সময়-নির্ভরতার সমস্যা ছাড়াও, KCA-র প্রথম প্রস্তাবনা — “যা কিছুর অস্তিত্ব শুরু হয়, তার একটি কারণ থাকে” — একটি আরোহী (inductive) সিদ্ধান্ত মাত্র। এটি আমাদের স্থূল জগতের প্রতিদিনের অভিজ্ঞতা থেকে উদ্ভূত, কিন্তু মহাবিশ্বের আদি অবস্থায় (Planck scale বা quantum vacuum) এই নিয়ম সম্পূর্ণভাবে ভেঙে পড়ে।

হাইজেনবার্গের অনিশ্চয়তা নীতি (Heisenberg Uncertainty Principle, ১৯২৭) অনুসারে, শক্তি (ΔE) ও সময় (Δt)-এর মধ্যে একটি মৌলিক অনিশ্চয়তা বিদ্যমান:

ΔEΔt 2

এই সমীকরণ দেখায় যে, অত্যন্ত ক্ষুদ্র সময়সীমায় (প্ল্যাঙ্ক টাইমের কাছাকাছি, প্রায় ১০-৪৩ সেকেন্ড) শূন্যস্থান (quantum vacuum) থেকে শক্তি বা ভার্চুয়াল কণা স্বতঃস্ফূর্তভাবে উৎপন্ন হতে পারে — এর জন্য কোনো ক্লাসিক্যাল ‘কারণ’ বা পূর্ববর্তী ঘটনার প্রয়োজন হয় না।

আরও গুরুত্বপূর্ণ, অ্যালেকজান্ডার ভিলেনকিনের ১৯৮২ সালের মডেল (“Creation of Universes from Nothing”) প্রমাণ করে যে, একটি অতি-ক্ষুদ্র আদি মহাবিশ্ব quantum tunneling-এর মাধ্যমে শূন্য থেকে উদ্ভূত হতে পারে। অর্থাৎ, যদি একটি কণা অকারণে সৃষ্টি হতে পারে, তবে একটি singularity-ও একই quantum indeterminacy-র নিয়মে ‘অকারণে’ অস্তিত্ব লাভ করতে পারে। এখানে আমাদের দৈনন্দিন কার্যকারণ বোধ আর প্রযোজ্য নয়।


‘এক্স নিহিলো’ বনাম পদার্থের পুনর্বিন্যাস

আমাদের অভিজ্ঞতায় আমরা যা কিছু ‘শুরু’ হতে দেখি, তা আসলে আগে থেকে বিদ্যমান পদার্থের রূপান্তর মাত্র। যেমন—একটি চেয়ারের অস্তিত্ব ‘শুরু’ হয় কাঠ মিস্ত্রির কাজের মাধ্যমে, কিন্তু কাঠের অণু-পরমাণুগুলো আগে থেকেই বিদ্যমান ছিল। অর্থাৎ, আমাদের অভিজ্ঞালব্ধ কার্যকারণ সম্পর্ক সর্বদা ‘পদার্থের পুনর্বিন্যাস’ (Rearrangement of matter)-এর ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। কিন্তু মহাবিশ্বের উদ্ভবের ক্ষেত্রে ধর্মতাত্ত্বিকরা দাবি করেন ‘শূণ্য থেকে সৃষ্টি’ (Creatio Ex Nihilo)। আমাদের অভিজ্ঞতার জগত থেকে প্রাপ্ত জ্ঞানকে (যেখানে সব কিছুই রূপান্তর) এমন একটি ক্ষেত্রে (শূণ্য থেকে সৃষ্টি) প্রয়োগ করা, যেখানে আমাদের কোনো অভিজ্ঞতাই নেই—এটি একটি ক্যাটাগরি এরর বা শ্রেণীগত ভুল [10]


তাপগতিবিদ্যার প্রথম সূত্র

তাপগতিবিদ্যার প্রথম সূত্র স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে যে, আমাদের মহাবিশ্বে শক্তি বা পদার্থ সৃষ্টি বা ধ্বংস করা যায় না, কেবল রূপান্তর করা যায়। কালাম আর্গুমেন্টের উপসংহার পরোক্ষভাবে “শূন্য থেকে সৃষ্টি” (Creatio ex nihilo) দাবি করে, যা পদার্থবিজ্ঞানের এই সুপ্রতিষ্ঠিত মৌলিক সূত্রের সরাসরি পরিপন্থী। মহাবিশ্বের প্রাথমিক ভর-শক্তি যদি সর্বদা বিরাজমান থাকে, তবে মহাবিশ্বের কোনো পরম “শুরু” ছিল না, কেবল এর অবস্থার রূপান্তর ঘটেছে। বিজ্ঞান শূন্য থেকে সৃষ্টির ধারণা সমর্থন করে না, বরং পদার্থের নিত্যতা বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত সত্য; এর বিপরীতে শূন্য থেকে সৃষ্টির দাবি নিছকই প্রমাণহীন বিশ্বাস [11]


শূন্য-শক্তি মহাবিশ্ব হাইপোথিসিস (Zero-Energy Universe)

ধর্মতাত্ত্বিক দাবি অনুযায়ী, ঈশ্বর শূন্য থেকে পদার্থ সৃষ্টি করেছেন। কিন্তু পদার্থবিজ্ঞানের কনজারভেশন ল অনুযায়ী এটি অসম্ভব।

ব্যালেন্সিং এনার্জি: মহাবিশ্বের মোট শক্তি সম্ভবত শূন্য। পদার্থের ধনাত্মক শক্তি এবং মহাকর্ষের ঋণাত্মক শক্তি একে অপরকে বাতিল করে দেয়। যদি মোট শক্তি শূন্য হয়, তবে মহাবিশ্ব সৃষ্টির জন্য কোনো বাহ্যিক ‘সৃষ্টিকর্তা’ বা শক্তির উৎসের প্রয়োজন পড়ে না। শূন্য থেকে শূন্যের উৎপত্তি ঘটা লজিক্যালি এবং ফিজিক্যালি সম্ভব [12]


কোয়ান্টাম মেকানিক্স ও অ-কারণতা

আধুনিক পদার্থবিজ্ঞানের অন্যতম স্তম্ভ কোয়ান্টাম মেকানিক্স কার্যকারণ তত্ত্বের ধ্রুপদী ধারণাকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ করে। সাব-এটমিক লেভেলে বা অতি-পারমাণবিক স্তরে এমন অনেক ঘটনা ঘটে যার কোনো সুনির্দিষ্ট ‘কারণ’ নেই। যেমন, একটি তেজস্ক্রিয় পরমাণু ঠিক কখন ক্ষয় হবে, তা আগে থেকে বলা অসম্ভব এবং এর পেছনে কোনো বাহ্যিক কারণও নেই। হাইজেনবার্গের অনিশ্চয়তা নীতি (Heisenberg’s Uncertainty Principle) অনুসারে, শূন্যস্থানেও প্রতিনিয়ত ‘ভার্চুয়াল পার্টিকল’ (Virtual Particles) সৃষ্টি ও ধ্বংস হচ্ছে কোনো কারণ ছাড়াই [13]। বিখ্যাত পদার্থবিজ্ঞানী লরেন্স ক্রাউস দেখিয়েছেন যে, কোয়ান্টাম ফিল্ড থিওরি অনুযায়ী ‘কিছু না’ (Nothing) অস্থিতিশীল এবং সেখান থেকে স্বতঃস্ফূর্তভাবে মহাবিশ্বের উদ্ভব গাণিতিকভাবে সম্ভব [14]। সুতরাং, “সব কিছুরই কারণ থাকতে হবে”—এই দাবিটি সর্বজনীনভাবে সত্য নয়।


ফ্যালাসি অফ কম্পোজিশন

মহাবিশ্বের ভেতরের প্রতিটি বস্তুর একটি কারণ আছে, এই প্রাত্যহিক অভিজ্ঞতার ওপর ভিত্তি করে সমগ্র মহাবিশ্বেরও একটি কারণ আছে দাবি করা যৌক্তিকভাবে “ফ্যালাসি অফ কম্পোজিশন” (Fallacy of Composition)। ইমানুয়েল কান্ট দেখিয়েছেন যে কার্যকারণ (Causality) নামক ধারণাটি কেবল স্থান-কালের ভেতরেই প্রযোজ্য; স্থান-কালের বাইরের কোনো কিছুর ওপর একে প্রয়োগ করা লজিক্যালি এবং বৈজ্ঞানিকভাবে ভিত্তিহীন। একটি ইটের ওজন এক কেজি হওয়ার অর্থ এই নয় যে, ওই ইট দিয়ে তৈরি একটি বাড়ির ওজনও এক কেজি হবে। তেমনি, মহাবিশ্বের ভেতরের নিয়মনীতি সমগ্র মহাবিশ্বের ওপর চাপিয়ে দেওয়া অযৌক্তিক এবং এর সপক্ষে কোনো বস্তুনিষ্ঠ প্রমাণ নেই [15]। Bertrand Russell (১৯৪৮) স্পষ্ট করে বলেছেন — একটি দেয়ালের প্রতিটি ইট ছোট হওয়ার মানে এই নয় যে পুরো দেয়াল ছোট। মহাবিশ্ব নিজেই একটি closed system বা brute fact হতে পারে — যার কোনো ব্যাখ্যার প্রয়োজন নেই। অংশগুলোর সম্পত্তি (causation within the universe) সমগ্রের সম্পত্তিতে (causation of the universe) স্থানান্তরিত হয় না। এটি একটি classic logical fallacy যা KCA-কে পুরোপুরি দুর্বল করে।


দ্বিতীয় প্রস্তাবনার সমালোচনা: মহাবিশ্বের কি সত্যিই শুরু আছে?

দ্বিতীয় প্রস্তাবনায় বলা হয়: “মহাবিশ্বের একটি শুরু আছে।” এই দাবির স্বপক্ষে সাধারণত বিগ ব্যাং থিওরি এবং এনট্রপি বা তাপগতিবিদ্যার দ্বিতীয় সূত্রকে প্রমাণ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। কিন্তু আধুনিক কসমোলজি এই সরলীকরণকে সমর্থন করে না।

প্রসারণের শুরু বনাম অস্তিত্বের শুরু (The Crucial Distinction)

কালাম আর্গুমেন্টের সবচেয়ে বড় বৈজ্ঞানিক দুর্বলতা হলো ‘প্রসারণের শুরু’ এবং ‘মহাবিশ্বের শুরু’কে গুলিয়ে ফেলা। বিগ ব্যাং থিওরি প্রমাণ করে যে প্রায় ১৩.৮ বিলিয়ন বছর আগে মহাবিশ্বের প্রসারণ শুরু হয়েছিল [16]। কিন্তু এটি মহাবিশ্বের অস্তিত্বের শুরু কি না, তা আমরা জানি না। বিগ ব্যাং-এর শুরুতে যে ‘সিঙ্গুলারিটি’ বা অতি-ঘন অবস্থার কথা বলা হয়, সেখানে আমাদের বর্তমান পদার্থবিজ্ঞানের সূত্রগুলো ভেঙে পড়ে। ফলে সিঙ্গুলারিটির আগে মহাবিশ্ব অন্য কোনো রূপে (যেমন: কোয়ান্টাম ফ্লাকচুয়েশন বা অন্য কোনো স্টেট) অনাদিকাল ধরে ছিল কি না, তা বর্তমান বিজ্ঞানে অমীমাংসিত। প্রসারণের একটি শুরু থাকা মানেই অস্তিত্বের শুরু থাকা নয়।


সিংগুলারিটি: গাণিতিক সীমাবদ্ধতা বনাম পরম শুরু

কালাম আর্গুমেন্টের প্রবক্তারা বিগ ব্যাং-এর ‘সিংগুলারিটি’কে মহাবিশ্বের শূন্য থেকে অস্তিত্বে আসার (Creatio ex nihilo) প্রমাণ হিসেবে ব্যবহার করেন। কিন্তু পদার্থবিজ্ঞানে সিংগুলারিটি মানে ‘কিছু না’ (Nothingness) নয়। এটি মূলত একটি গাণিতিক সংকেত যা নির্দেশ করে যে, ওই বিন্দুতে আমাদের বর্তমান পদার্থবিজ্ঞানের সূত্রগুলো (বিশেষ করে সাধারণ আপেক্ষিকতা) আর কাজ করছে না। যখন কোনো গাণিতিক মডেলে ঘনত্ব বা তাপমাত্রা ‘অসীম’ (Infinite) হয়ে যায়, তখন তাকে সিংগুলারিটি বলা হয়—যা আসলে একটি গাণিতিক ত্রুটি বা ‘Mathematical Breakdown’ মাত্র [17].

আধুনিক কোয়ান্টাম কসমোলজি অনুযায়ী, মহাবিশ্ব হয়তো সিংগুলারিটি দিয়ে শুরুই হয়নি। লুপ কোয়ান্টাম গ্র্যাভিটি (Loop Quantum Gravity) কিংবা স্ট্রিং কসমোলজির মতো উন্নত মডেলগুলোতে সিংগুলারিটিকে এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে। এই মডেলগুলো অনুযায়ী, মহাবিশ্ব হয়তো আগের কোনো সংকুচিত অবস্থা থেকে ‘বাউন্স’ (Bounce) করে প্রসারিত হতে শুরু করেছে। সুতরাং, সিংগুলারিটিকে মহাবিশ্বের ‘পরম সূচনা’ হিসেবে দাবি করা বৈজ্ঞানিক তথ্যের অপপ্রয়োগ ছাড়া আর কিছুই নয়। সিংগুলারিটি কোনো অতিপ্রাকৃত শুরুর বিন্দু নয়, বরং এটি আমাদের মহাবিশ্ব সম্পর্কে জানার সীমানা নির্দেশ করে মাত্র [18].


সময়ের প্রকৃতি: হকিং-হার্টল মডেল

স্টিফেন হকিং এবং জেমস হার্টল প্রস্তাবিত ‘নো বাউন্ডারি প্রপোজাল’ (No Boundary Proposal) অনুযায়ী, সময়ের কোনো শুরু নেই, ঠিক যেমন পৃথিবীর পৃষ্ঠের কোনো ‘শুরু’ বা ‘শেষ’ প্রান্ত নেই। আমরা যেমন দক্ষিণ মেরুর দক্ষিণে কী আছে তা জানতে চাইতে পারি না (কারণ দক্ষিণ মেরুই শেষ বিন্দু), তেমনি বিগ ব্যাং-এর ‘আগে’ কী ছিল—এই প্রশ্নটিও অর্থহীন। এই মডেলে মহাবিশ্ব সসীম হলেও এর কোনো সূচনা বিন্দু বা ‘Boundary’ নেই [19]। যদি সময়ের কোনো শুরু না থাকে, তবে ‘শুরু’ হওয়ার প্রশ্নটিই অবান্তর হয়ে পড়ে।


অসীমের ভীতি এবং গাণিতিক বাস্তবতা

কালাম আর্গুমেন্টের প্রবক্তারা দাবি করেন যে ‘প্রকৃত অসীম’ (Actual Infinite) বাস্তবে অসম্ভব, তাই অতীত সময় অসীম হতে পারে না। এর স্বপক্ষে তাঁরা ‘হিলবার্টের হোটেল’ (Hilbert’s Hotel) প্যারাডক্সের উদাহরণ দেন। তবে আধুনিক গণিত, বিশেষ করে জর্জ ক্যান্টরের ‘সেট থিওরি’ প্রমাণ করেছে যে অসীম বা ইনফিনিটি একটি সুসংজ্ঞায়িত গাণিতিক ধারণা এবং বাস্তবে এর অস্তিত্ব অসম্ভব নয় [20]। এছাড়া, পদার্থবিজ্ঞানের বহু মডেলে (যেমন ইটারনাল ইনফ্লেশন) অসীম সময়ের ধারণা ব্যবহার করা হয় [21]


সময়ের প্রকৃতি: এ-থিওরি বনাম বি-থিওরি

কালাম আর্গুমেন্ট সম্পূর্ণভাবে সময়ের ‘এ-থিওরি’ (A-Theory of Time)-এর ওপর নির্ভরশীল, যা মনে করে অতীত থেকে ভবিষ্যতে সময়ের প্রবাহ একটি বস্তুনিষ্ঠ সত্য এবং কেবল বর্তমানেরই অস্তিত্ব আছে। কিন্তু আধুনিক পদার্থবিজ্ঞান, বিশেষ করে আলবার্ট আইনস্টাইনের আপেক্ষিকতা তত্ত্ব, সময়ের ‘বি-থিওরি’ (B-Theory of Time বা Block Universe) দৃঢ়ভাবে সমর্থন করে। এই বৈজ্ঞানিক মডেলে অতীত, বর্তমান এবং ভবিষ্যৎ একটি চতুর্মাত্রিক স্থান-কাল ব্লকে যুগপৎ অবস্থান করে। বি-থিওরি অনুযায়ী মহাবিশ্বের নতুন করে কোনো “আবির্ভাব” বা “শুরু” ঘটে না, বরং স্থান-কালের একটি নির্দিষ্ট সীমানা (boundary) মাত্র রয়েছে। যেহেতু পদার্থবিজ্ঞান বি-থিওরিকে সমর্থন করে, তাই মহাবিশ্বের পরম সূচনার দাবিটি বৈজ্ঞানিকভাবে অকার্যকর এবং এটি কেবল বাতিল দার্শনিক অনুমানের ওপর দাঁড়িয়ে আছে [22]


মডাল লজিকের আলোকে কালাম আর্গুমেন্ট

মডাল লজিক (Modal Logic) সম্ভাব্যতা ও অনিবার্যতার (Possibility & Necessity) ধারণা বিশ্লেষণের একটি শক্তিশালী হাতিয়ার। কালাম আর্গুমেন্টে সাধারণত এমনভাবে কথা বলা হয়, যেন “যা কিছু অস্তিত্ব শুরু করে, তা অবশ্যই (necessarily) কোনো কারণে নির্ভরশীল” এবং “ঈশ্বর অবশ্যই (necessarily) অনাদি ও কারণ-নিরপেক্ষ।” কিন্তু মডাল লজিকের ভাষায় এই দাবিগুলো সর্বোচ্চ ক্ষেত্রে কেবল contingently true—অর্থাৎ, কিছু সম্ভাব্য বিশ্বে সত্য হতে পারে, আবার অন্য সম্ভাব্য বিশ্বে মিথ্যা হতে পারে [23].


সম্ভাব্য বিশ্ব ও ‘অবশ্য সত্তা’র প্রশ্ন

থিয়িস্ট দার্শনিকরা প্রায়ই দাবি করেন, ঈশ্বর একটি “অবশ্য-সত্তা” (Necessary Being)—অর্থাৎ, সকল সম্ভাব্য বিশ্বেই ঈশ্বরের অস্তিত্ব আছে, কিন্তু মহাবিশ্ব কেবল “সম্ভব-সত্তা” (Contingent Being)—কিছু সম্ভাব্য বিশ্বে আছে, কিছুতে নেই [24]. কিন্তু এই পার্থক্যটি যুক্তির মাধ্যমে প্রমাণ না করে ধরে নেওয়া হয়। মডাল দৃষ্টিকোণ থেকে একই ধরনের প্রশ্ন উল্টো দিকেও তোলা যায়: কেন ধরে নেব যে মহাবিশ্ব কিংবা মাল্টিভার্সকে “অবশ্য-সত্তা” হিসেবে কল্পনা করা যাবে না, আর ঈশ্বরকে “সম্ভব-সত্তা” হিসেবে?

অন্যভাবে বললে, যদি আমরা স্বীকার করি যে অন্তত একটি সম্ভাব্য বিশ্ব আছে যেখানে কোনো ঈশ্বর নেই, কিন্তু তবুও কোনো না কোনো ধরনের বাস্তবতা বিদ্যমান, তবে “অবশ্যই ঈশ্বর থাকতে হবে, নইলে কিছুই থাকতে পারত না”—এই কালাম-ধর্মী দাবি মডাল লজিকের আলোকে দুর্বল হয়ে পড়ে। কালাম আর্গুমেন্ট সাধারণত এই মডাল প্রতিযোগিতাকে (modal competition) গুরুত্ব না দিয়ে সরাসরি ঈশ্বরকে একমাত্র সম্ভাব্য ব্যাখ্যা হিসেবে ধরে নেয়।


ভৌত আবশ্যকতা বনাম সচেতন আবশ্যকতা

মডাল লজিকের আলোচনায় একটি বড় বিভ্রান্তি হলো ‘অনিবার্যতা’ বা ‘আবশ্যকতা’কে (Necessity) কেবল সচেতন বা ব্যক্তিগত ঈশ্বরের একক বৈশিষ্ট্য হিসেবে ধরে নেওয়া। ধর্মতাত্ত্বিকরা দাবি করেন যে মহাবিশ্ব যেহেতু ‘সম্ভব-সত্তা’ (Contingent), তাই এর অস্তিত্বের জন্য একজন ‘অবশ্য-সত্তা’র (Necessary Being) প্রয়োজন। কিন্তু মডাল রিয়ালিজমের (Modal Realism) আলোকে চিন্তা করলে দেখা যায়, খোদ প্রাকৃতিক নিয়ম (Laws of Nature) কিংবা কোনো মৌলিক কোয়ান্টাম ফিল্ড (Quantum Field) নিজেই একটি ‘অবশ্য-সত্তা’ হতে পারে।

যদি কোনো গাণিতিক বা ভৌত কাঠামোর অস্তিত্ব লজিক্যালি অনিবার্য হয়—যেমন কোয়ান্টাম মেকানিক্সের অস্থিতিশীল শূন্যতা (Quantum Vacuum)—তবে সেই আদি ভৌত অবস্থাই সকল সম্ভাব্য বিশ্বে বিরাজমান থাকতে পারে। এক্ষেত্রে একটি সচেতন স্রষ্টার প্রয়োজনীয়তা মডাল লজিকের নিয়মেই নাকচ হয়ে যায়। দার্শনিক গ্রাহাম অপ্পি (Graham Oppy) যুক্তি দিয়েছেন যে, আস্তিকরা মহাবিশ্বের ‘সম্ভব’ হওয়ার যে দাবি করে, তা আসলে একটি ভিত্তিহীন অনুমান। কারণ মহাবিশ্ব বা মাল্টিভার্স নিজেই তার অস্তিত্বের জন্য যথেষ্ট এবং এটিই হতে পারে সেই ‘আল্টিমেট নেসেসারি বিয়িং’ বা চূড়ান্ত অপরিহার্য সত্য, যার কোনো সচেতন স্রষ্টার প্রয়োজন নেই [25]


আন্ডারডিটারমিনেশন: একাধিক ব্যাখ্যা, একই তথ্য

মডাল লজিক ও বিজ্ঞানদর্শনের আলোচনায় ‘আন্ডারডিটারমিনেশন’ (Underdetermination) একটি গুরুত্বপূর্ণ ধারণা—একই পর্যবেক্ষণ-তথ্য একাধিক তত্ত্ব সমানভাবে ব্যাখ্যা করতে পারে। কালাম আর্গুমেন্ট তর্ক সাপেক্ষে যদি দেখাতেও পারে যে “মহাবিশ্বের কোনো এক ধরনের কারণ আছে”, তবুও সেই কারণটি হতে পারে একটি প্রাকৃতিক মাল্টিভার্স, একটি নিরাকৃতি কোয়ান্টাম গ্লোবাল স্টেট, বা আরও কোনো অজানা প্রাকৃতিক মেকানিজম। এই সবগুলোই লজিক্যালি এবং মডাল দৃষ্টিতে সম্ভব ব্যাখ্যা। এই পরিস্থিতিতে কেবলমাত্র নির্দিষ্ট এক ধর্মীয় ঈশ্বরকে একমাত্র ব্যাখ্যা হিসেবে ঘোষণা করা আরেকটি লজিক্যাল লীপ বা অযৌক্তিক উল্লম্ফন ছাড়া কিছুই নয়।


সিদ্ধান্তের অসঙ্গতিঃ কারণ কেন ‘ঈশ্বর’?

তর্কের খাতিরে যদি মেনেও নেওয়া হয় যে মহাবিশ্বের একটি কারণ আছে, তবুও কালাম আর্গুমেন্ট যৌক্তিকভাবে সেই কারণকে প্রচলিত ধর্মের ‘ঈশ্বর’ হিসেবে প্রমাণ করতে ব্যর্থ হয়। এটি একটি বিশাল যৌক্তিক উল্লম্ফন (Logical Leap)।

ব্যক্তি-সত্তা বনাম যান্ত্রিক কারণ

যুক্তিটির উপসংহারে বলা হয়, এই কারণটিকে হতে হবে ‘ইচ্ছাশক্তিসম্পন্ন’ (Personal Agent)। যুক্তি হিসেবে বলা হয়, একটি চিরস্থায়ী কারণ থেকে কীভাবে একটি সসীম মহাবিশ্ব তৈরি হতে পারে? একমাত্র যদি সেই কারণের ‘ইচ্ছা’ থাকে সৃষ্টির। কিন্তু এটি একটি দুর্বল যুক্তি। কোয়ান্টাম মেকানিক্সে আমরা দেখি যে কোনো সচেতন ইচ্ছা ছাড়াই একটি অবস্থা থেকে আরেকটি অবস্থার পরিবর্তন হতে পারে (যেমন স্পনটেনিয়াস সিমেট্রি ব্রেকিং)। কারণটি কোনো অন্ধ প্রাকৃতিক শক্তি বা ‘মাল্টিভার্স জেনারেটর’ হতে পারে, যার কোনো চেতনা নেই [26]


বিশেষত্বের কুযুক্তি (Special Pleading Fallacy)

কালাম আর্গুমেন্টের প্রবক্তারা বলেন, “সব কিছুরই কারণ আছে—শুধু ঈশ্বরের ছাড়া।” যখন প্রশ্ন করা হয়, “ঈশ্বরের কারণ কী?”, তখন উত্তর দেওয়া হয়, “ঈশ্বর অনাদি, তাই তার কারণ নেই।” এটি একটি ‘স্পেশাল প্লিডিং’ বা বিশেষ সুবিধাবাদকতা। যদি আমরা কোনো কিছুকে ‘অনাদি’ হিসেবে মেনে নিতে পারি, তবে সেই বৈশিষ্ট্যটি মহাবিশ্ব বা মাল্টিভার্সের ক্ষেত্রে প্রয়োগ না করে সরাসরি একটি কাল্পনিক সত্তার ওপর আরোপ করা ‘অকামস রেজর’ (Occam’s Razor) নীতির লঙ্ঘন। উইলিয়াম অফ অকাম-এর এই নীতি অনুযায়ী, অপ্রয়োজনীয় সত্তা বা ব্যাখ্যা বৃদ্ধি করা অনুচিত [27]


অসীম পশ্চাদপসরণ (Infinite Regress) এবং কারণহীন আদি সত্য

কালাম আর্গুমেন্টের মূল দাবি হলো, যা কিছুর অস্তিত্ব শুরু হয় তার একটি কারণ থাকতে হবে। কিন্তু ঈশ্বরের ক্ষেত্রে প্রবক্তারা দাবি করেন তাঁর কোনো শুরু নেই, যা ‘বিশেষ সুবিধা’ বা স্পেশাল প্লিডিং (Special Pleading) নামক যৌক্তিক ফ্যালাসি তৈরি করে। যদি কার্যকারণের শৃঙ্খল অসীম হয়, তবে তা অসীম পশ্চাদপসরণে (Infinite regress) পতিত হয়, যা প্রবক্তারা নিজেরাই অসম্ভব বলে মানেন। আর যদি একটি ‘কারণহীন প্রথম কারণ’ (Uncaused First Cause) থাকতেই হয়, তবে সেই আদি অবস্থানটি স্বয়ং মহাবিশ্ব বা কোয়ান্টাম শূন্যতা হওয়াই বেশি যৌক্তিক। মহাবিশ্বের অস্তিত্বকেই একটি ব্রুট ফ্যাক্ট (Brute fact) হিসেবে ধরে নেওয়া অকামের রেজর (Occam’s razor) নীতি অনুযায়ী বেশি গ্রহণযোগ্য; এর জন্য কোনো প্রমাণহীন অতিপ্রাকৃত সত্তার অবতারণা করা যুক্তিবিরুদ্ধ এবং অপ্রয়োজনীয় [28]

কালাম আর্গুমেন্টের মূল দাবি হলো, যা কিছুর অস্তিত্ব শুরু হয় তার একটি কারণ থাকতে হবে। ইনফিনিট রিগ্রেস বা অসীম পশ্চাদপসরণ এড়াবার জন্য এই আর্গুমেন্টের প্রবক্তারা একজন ‘অসীম’ ঈশ্বরের ধারণা নিয়ে আসেন।

🔄

যুক্তির ফাঁকি: আস্তিকরা মূলত অসংখ্য অসীম ইভেন্টগুলোকে যুক্ত করে একটি ‘ঈশ্বর’-এ পরিণত করেন। কিন্তু ঈশ্বর যদি সংজ্ঞানুসারেই অসীম অতীত থেকে অস্তিত্বশীল হয়ে থাকেন, তাহলে তো ইনফিনিট রিগ্রেসের সমস্যাটি একই থাকলো! এটি সমস্যার কোনো সমাধান করে না, বরং সমস্যাটিকে ঈশ্বরের আবরণে লুকিয়ে রাখে।

ঈশ্বরের ক্ষেত্রে “তাঁর কোনো শুরু নেই” দাবি করাটা ‘বিশেষ সুবিধা’ বা স্পেশাল প্লিডিং (Special Pleading) নামক যৌক্তিক ফ্যালাসি তৈরি করে। যদি কার্যকারণের শৃঙ্খল অসীম হয়, তবে তা অসীম পশ্চাদপসরণে পতিত হয়, যা প্রবক্তারা নিজেরাই অসম্ভব বলে মানেন। আর যদি একটি ‘কারণহীন প্রথম কারণ’ (Uncaused First Cause) থাকতেই হয়, তবে সেই আদি অবস্থানটি স্বয়ং মহাবিশ্ব বা কোয়ান্টাম শূন্যতা হওয়াই বেশি যৌক্তিক। মহাবিশ্বের অস্তিত্বকেই একটি ব্রুট ফ্যাক্ট (Brute fact) হিসেবে ধরে নেওয়া অকামের রেজর (Occam’s razor) নীতি অনুযায়ী বেশি গ্রহণযোগ্য; এর জন্য কোনো প্রমাণহীন অতিপ্রাকৃত সত্তার অবতারণা করা যুক্তিবিরুদ্ধ এবং অপ্রয়োজনীয় [28]

অসীম ঈশ্বরের ফ্যালাসি
-∞
অসীম অতীত
ইভেন্টগুলোকে যুক্ত করে সংজ্ঞায়িত ‘অসীম ঈশ্বর’
ইভেন্ট N
ইভেন্ট ১
বর্তমান / সৃষ্টি
অসীম অতীত পাড়ি দেওয়া এখানেও অসম্ভব
+∞
অসীম ভবিষ্যৎ
যুক্তি: আস্তিক্যবাদীরা ইনফিনিট রিগ্রেস এড়ানোর জন্য পেছনের অসীম ইভেন্টগুলোকে একটি বাক্সে ভরে তার নাম দেন ‘ঈশ্বর’ এবং দাবি করেন তিনি সংজ্ঞানুসারেই অসীম। কিন্তু চিত্রানুসারে, এই অসীম অতীত থেকে শুরু করে বর্তমান (০ বিন্দু)-এ পৌঁছানো যদি অসম্ভব হয়, তবে ইভেন্টগুলোর নাম বদলে ‘ঈশ্বর’ রাখলেও যৌক্তিক সমস্যাটির কোনো সমাধান হয় না। অসীম সময় পাড়ি দেওয়ার লজিক্যাল অসম্ভবতা একই থেকে যায়।

কালহীন ইচ্ছাশীল সত্তার ধারণাগত স্ববিরোধ

কালাম আর্গুমেন্টের প্রবক্তারা উপসংহারে দাবি করেন যে মহাবিশ্বের কারণ একটি কালহীন (timeless) এবং ইচ্ছাশীল ব্যক্তিসত্তা। কিন্তু এটি একটি চরম স্ববিরোধী (Self-contradictory) ধারণা। সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং ইচ্ছা পোষণ একটি মনস্তাত্ত্বিক ও পরিবর্তনশীল প্রক্রিয়া, যার জন্য সময়ের প্রবাহ অপরিহার্য। সময়ের অস্তিত্ব সৃষ্টির পূর্বে কীভাবে একটি সত্তা পর্যায়ক্রমিক সিদ্ধান্ত নিতে পারে বা মহাবিশ্ব সৃষ্টির ইচ্ছা পোষণ করতে পারে, তা যৌক্তিকভাবে অসম্ভব। সুতরাং, একটি কালহীন সত্তা কখনোই “ব্যক্তিগত” বা “ইচ্ছাশীল” হতে পারে না; এটি ধর্মতাত্ত্বিক আকাঙ্ক্ষা প্রসূত একটি দাবি, যার লজিক্যাল বা বাস্তব কোনো ভিত্তি নেই [29]

তর্কের খাতিরে ধরে নেওয়া যাক মহাবিশ্বের একটি কারণ আছে। তবুও সেই কারণ কেন একটি ‘ইচ্ছাশীল ব্যক্তিগত ঈশ্বর’ হবে? Quentin Smith (১৯৯৬) দেখিয়েছেন যে একটি disembodied mind বা timeless personal agent স্ববিরোধী। ইচ্ছা বা সিদ্ধান্ত গ্রহণ একটি temporal প্রক্রিয়া — চিন্তা → সিদ্ধান্ত → কর্ম। কিন্তু সৃষ্টির আগে সময়ই যদি না থাকে, তাহলে কোনো ‘ইচ্ছা’ পোষণ করা অসম্ভব। একটি timeless, spaceless, immaterial agent-এর কোনো মানসিক প্রক্রিয়া চালানোর উপায় নেই। ফলে কারণ হিসেবে impersonal quantum law বা brute fact অনেক বেশি যৌক্তিক।


অ্যাপোলোজেটিক অসততার ব্যবচ্ছেদ

তাত্ত্বিক জটিলতা সরিয়ে রেখে এবার চলুন কিছু বাস্তব জীবনের রূপক এবং গল্পের মাধ্যমে দেখি কীভাবে এই আর্গুমেন্টগুলোকে সাধারণ মানুষের কাছে প্রচার করা হয়।

খুনের তদন্ত: ‘জানি না’ কেন একটি যৌক্তিক সৎ অবস্থান

কল্পনা করুন, একটি বন্ধ ঘরের ভেতর একজন ধনী ব্যবসায়ীর মৃতদেহ পাওয়া গেল। ঘরের সব দরজা-জানালা ভেতর থেকে বন্ধ ছিল এবং সেখানে আপাতদৃষ্টে খুনি প্রবেশের কোনো চিহ্ন নেই। এমতাবস্থায় সমাজের একদল মানুষ হয়তো বলতে শুরু করল, “এটি নিশ্চয়ই কোনো অশরীরী আত্মা বা জ্বীন-ভূতের কাজ, কারণ সাধারণ মানুষের পক্ষে এই বন্ধ ঘরে ঢোকা অসম্ভব।” কিন্তু একজন পেশাদার গোয়েন্দা যখন এই কেসের তদন্ত করবেন, তিনি কখনোই অশরীরী আত্মাকে খুনি হিসেবে এফআইআর (FIR) করবেন না। কেন? কারণ আইন এবং বিজ্ঞান ব্যক্তিগত বিশ্বাসের ওপর নয়, বরং যাচাইযোগ্য প্রমাণের ওপর ভিত্তি করে চলে।

তদন্তে যদি কোনো আঙুলের ছাপ, ডিএনএ বা সিসিটিভি ফুটেজ পাওয়া না যায়, তবে একজন দক্ষ গোয়েন্দার একমাত্র সৎ উত্তর হবে— “আমি জানি না”

এই “জানি না” উত্তরটি কোনো পরাজয় নয়, বরং এটি সত্যের প্রতি চরম আনুগত্য। কোনো একটি রহস্যের কারণ এখন পর্যন্ত খুঁজে না পাওয়ার অর্থ এই নয় যে, সেখানে অলৌকিক বা অতিপ্রাকৃত কিছু ঘটেছে [30]। প্রমাণের অভাবকে কখনোই অলৌকিক সত্তার অস্তিত্বের প্রমাণ হিসেবে ব্যবহার করা যায় না; একে যুক্তিবিদ্যার ভাষায় বলা হয় অজ্ঞতার কুযুক্তি (Argument from Ignorance)।

ধর্মতাত্ত্বিকরা যখন মহাবিশ্বের সূচনার কারণ হিসেবে সরাসরি ‘ঈশ্বর’-কে বসিয়ে দেন, তখন তারা মূলত গোয়েন্দা রাহুলের বদলে সেই গ্রামবাসীদের ভূমিকা পালন করেন যারা তথ্যের অভাবকে অতিপ্রাকৃত শক্তির প্রমাণ বলে দাবি করছিল। ‘জানি না’ বলাটা বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে এই কারণেই সৎ অবস্থান যে, এটি নতুন কোনো তথ্যের জন্য দুয়ার খোলা রাখে। পক্ষান্তরে, কোনো প্রমাণ ছাড়াই ‘ঈশ্বর করেছেন’ বলে দেওয়াটা অনুসন্ধানের পথকে বন্ধ করে দেয় এবং একটি রহস্যকে আরেকটি বড় রহস্য (ঈশ্বরের উৎস কী?) দিয়ে প্রতিস্থাপন করে মাত্র [31]। প্রকৃতপক্ষে, বিজ্ঞানের ইতিহাসে অসংখ্য রহস্য—যা এককালে অলৌকিক বলে মনে হতো—পরবর্তীতে প্রাকৃতিক ও যুক্তিগ্রাহ্য ব্যাখ্যার মাধ্যমে সমাধান হয়েছে। তাই আদি কারণ সম্পর্কে চূড়ান্ত প্রমাণ না পাওয়া পর্যন্ত ‘ঈশ্বর’কে দায়ী করা কেবল অলস মস্তিষ্কের কল্পনাপ্রসূত ঢেকুর ছাড়া আর কিছুই নয়।


গডফাদার আক্কাস আলী ও ইনফিনিট রিগ্রেসের গোলকধাঁধা

কালাম আর্গুমেন্টের প্রবক্তারা প্রায়শই দাবি করেন, মহাবিশ্বের সৃষ্টির কারণের একটি দীর্ঘ শৃঙ্খল চিরকাল ধরে পেছনে চলতে পারে না। একে তারা বলেন ইনফিনিট রিগ্রেস (Infinite Regress) বা অসীম পশ্চাদপসরণ। তাদের মতে, কোনো একটি আদি কারণ না থাকলে বর্তমান মুহূর্তের অস্তিত্বই সম্ভব হতো না। এই দার্শনিক গেরোটি সাধারণ মানুষের কাছে সহজবোধ্য করতে আমরা ঢাকা শহরের এক কাল্পনিক গডফাদার ‘আক্কাস আলী’র শরণাপন্ন হতে পারি।

মনে করুন, আপনার এক পুলিশ বন্ধু আকরাম দাবি করলেন—শহরের প্রতিটি খুনের পেছনে গডফাদার আক্কাস আলীর হাত আছে। আপনি দেখলেন শহরে অপরাধ ঘটছে, সুতরাং আপনার বন্ধুর দাবি অনুযায়ী এর একজন মাস্টারমাইন্ড থাকতেই হবে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, আক্কাস আলী কি একাই সব করছেন? যদি তিনি কারো নির্দেশে কাজ করেন, তবে সেই উর্ধ্বতন গডফাদার কে? এভাবে যদি একের পর এক বসের নাম আসতেই থাকে, তবে অপরাধের মূল উৎস কোথায়?

এই অসীম শৃঙ্খল এড়াতে আপনি হয়তো একসময় ক্লান্ত হয়ে সিদ্ধান্ত নিলেন—গডফাদার ‘কুদ্দুস আলী’তে গিয়েই এই শৃঙ্খল শেষ। আপনি বললেন, “কুদ্দুস আলীই আদি গডফাদার, তাঁর আর কোনো বস নেই।” কিন্তু এখানেই বড় একটি যৌক্তিক ফাঁকি বা স্পেশাল প্লিডিং (Special Pleading) ফ্যালাসি তৈরি হয়। আপনি যখন দাবি করেন, “মহাবিশ্বের অস্তিত্বের জন্য অবশ্যই একটি কারণ থাকতে হবে,” কিন্তু পরক্ষণেই ঈশ্বরের ক্ষেত্রে এসে বলেন, “ঈশ্বর অনাদি, তাঁর কোনো কারণের প্রয়োজন নেই,” তখন আপনি নিজের তৈরি করা নিয়মটিই নিজের সুবিধার্থে ভেঙে ফেলছেন [4]

যদি কোনো অতিপ্রাকৃত সত্তা (ঈশ্বর) কোনো কারণ ছাড়াই ‘অনাদি’ বা ‘স্বয়ম্ভু’ হতে পারেন, তবে সেই একই বিশেষ গুণ মহাবিশ্বের ক্ষেত্রে প্রয়োগ করতে বাধা কোথায়? কেন আমরা মহাবিশ্ব বা মাল্টিভার্সকেই একটি ‘ব্রুট ফ্যাক্ট’ বা আদি সত্য হিসেবে মেনে নিতে পারি না? [31]। আস্তিক্যবাদীরা ইনফিনিট রিগ্রেসের হাত থেকে বাঁচতে অসীম সংখ্যক কারণকে একটি বাক্সে ভরে তার নাম দেন ‘ঈশ্বর’, কিন্তু এটি আদতে কোনো সমাধান নয়।

আপনার গল্পের আক্কাস আলীর মতো, ঈশ্বরকেও যদি আমরা আদি কারণ হিসেবে ধরে নেই, তবে কত নম্বর ধাপে গিয়ে আমরা থামব (কুদ্দুস আলী নাকি মোকলেস আলী?), তা নির্ধারণ করার মতো কোনো বস্তুনিষ্ঠ প্রমাণ আমাদের হাতে নেই। কোনো সুনির্দিষ্ট তথ্যপ্রমাণ ছাড়াই একটি নির্দিষ্ট বিন্দুতে গিয়ে “আর কোনো কারণ নেই” বলে দেওয়াটা নিছক অনুমানের ওপর ভিত্তি করে তৈরি একটি কাল্পনিক সমাধান মাত্র। রিচার্ড ডকিন্স যেমনটি বলেছেন, জটিল মহাবিশ্বকে ব্যাখ্যা করার জন্য যদি আরও জটিল এক সত্তার প্রয়োজন হয়, তবে সেই সত্তার উৎস ব্যাখ্যা করতে গিয়ে সমস্যাটি কেবল আরও ঘনীভূত হয়, সমাধান হয় না [4]


আত্মপ্রসাদের কল্পগল্পঃ নাস্তিক প্রফেসরের মিথ এবং স্ট্রোম্যান আর্গুমেন্ট

কালাম কসমোলজিক্যাল আর্গুমেন্ট বা ঈশ্বরের অস্তিত্বের সপক্ষে প্রচার চালাতে গিয়ে অনেক সময় যুক্তিবিদ্যার চেয়েও বেশি আশ্রয় নেওয়া হয় ‘পপুলার মিথ’ বা সস্তা কিংবদন্তির। বিশেষ করে সোশ্যাল মিডিয়া বা বিভিন্ন চটি বইয়ে একটি গল্প খুবই প্রচলিত—ক্লাসরুমে একজন উদ্ধত নাস্তিক প্রফেসর সব ছাত্রের সামনে ঈশ্বরকে অস্বীকার করছেন, আর ঠিক তখনই একজন অতি-মেধাবী ধার্মিক ছাত্র এসে এমন কিছু মোক্ষম প্রশ্ন করল যে প্রফেসরের চোয়াল ঝুলে গেল এবং ঈশ্বরের জয় হলো! এই গল্পগুলো শুনতে বেশ তৃপ্তিদায়ক মনে হলেও, এর গোড়ায় রয়েছে একটি মস্ত বড় যৌক্তিক প্রতারণা, যাকে দর্শনের ভাষায় বলা হয় স্ট্রোম্যান আর্গুমেন্ট (Strawman Argument)। [32]

স্ট্রোম্যান বা ‘খড়ের মানুষ’ আর্গুমেন্ট হলো এমন একটি কৌশল, যেখানে বিপক্ষ পক্ষের প্রকৃত যুক্তিকে আক্রমণ না করে তার একটি দুর্বল এবং বিকৃত সংস্করণ তৈরি করা হয়, এবং এরপর সেই বিকৃত রূপটিকে পরাজিত করে বিজয় ঘোষণা করা হয়। এই গল্পের লেখকেরা নাস্তিক প্রফেসরকে দিয়ে এমন সব কথা বলান, যা বাস্তবে কোনো যুক্তিমনস্ক ব্যক্তি কখনোই বলবেন না।

গল্পগুলোতে প্রায়ই দেখা যায়, প্রফেসর বলছেন— “আমি ঈশ্বরকে দেখি না, তাই তিনি নেই।” তখন সেই চৌকস ছাত্র পাল্ট প্রশ্ন করে— “স্যার, আপনি কি বাতাস দেখেন? ব্ল্যাকহোল দেখেন? জীবাণু দেখেন? না দেখলে কেন বিশ্বাস করেন?” এই যুক্তিতে প্রফেসরের পরাজয় দেখানো হলেও, বাস্তবে এটি একটি চরম বোকামি। কারণ:

নৈর্ব্যক্তিক প্রমাণ
কোনো নাস্তিকই এই দাবি করেন না যে “যা চোখে দেখা যায় না, তা নেই।” বরং তাদের অবস্থান হলো— “যথাযথ প্রমাণ বা এভিডেন্স ছাড়া কোনো কিছু মেনে নেওয়া যায় না।” বাতাস বা জীবাণু চোখে দেখা না গেলেও ল্যাবরেটরিতে পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে এগুলোর অস্তিত্ব নৈর্ব্যক্তিকভাবে প্রমাণিত [33]
কার্যকারিতা
ব্ল্যাকহোল আমরা সরাসরি না দেখলেও গাণিতিক মডেল এবং পার্শ্ববর্তী নক্ষত্রের ওপর এর মহাকর্ষীয় প্রভাব দেখে আমরা এর অস্তিত্ব নিশ্চিত করি। কিন্তু ঈশ্বরের ক্ষেত্রে এমন কোনো পরীক্ষালব্ধ বা পর্যবেক্ষণযোগ্য প্রভাবের হদিস মেলেনি।

আস্তিক্যবাদী অ্যাপোলজেটিক্স যখন নাস্তিকদের অবস্থানকে “শুধু চোখে দেখার বিষয়” হিসেবে ছোট করে দেখায়, তখন তারা মূলত একটি বুদ্ধিবৃত্তিক অসততার আশ্রয় নেয় [34]। তারা নাস্তিকদের প্রকৃত যুক্তিগুলোকে এড়িয়ে গিয়ে একটি কাল্পনিক ‘খড়ের মানুষ’ বা স্ট্রোম্যানের সাথে যুদ্ধ করে আত্মতৃপ্তির ঢেকুর তোলে।

প্রকৃতপক্ষে, বিজ্ঞান এবং যুক্তির ময়দান এমন কোনো সস্তা বীরত্বগাথা দিয়ে চলে না। সেখানে মত পরিবর্তনের জন্য প্রয়োজন অকাট্য প্রমাণ। যেমনটি রিচার্ড ডকিন্স উল্লেখ করেছেন, ধর্মীয় বিশ্বাস প্রায়শই প্রমাণের অনুপস্থিতিকে একটি ‘গুণ’ হিসেবে উপস্থাপন করে, যা যুক্তিবাদী চিন্তার পরিপন্থী [4]। এই কাল্পনিক গল্পগুলো হয়তো কিছুক্ষণের জন্য বিশ্বাসীদের মনে স্বস্তি দেয়, কিন্তু প্রকৃত দার্শনিক বিতর্কে এগুলো কেবল হাস্যকর কৌশল হিসেবেই গণ্য হয়।


সীমাবদ্ধতার রূপকঃ জরায়ুর ভেতর দুই যমজ এবং ‘অজ্ঞতার আবরণ’

কালাম কসমোলজিক্যাল আর্গুমেন্টের প্রবক্তারা প্রায়ই দাবি করেন যে, মহাবিশ্বের এই সুশৃঙ্খল অস্তিত্বই প্রমাণ করে এর পেছনে একজন স্রষ্টা বা ‘মা’ রয়েছেন। মানুষের এই সীমিত জ্ঞান এবং অজানাকে জানার আকুলতাকে বোঝার জন্য আপনার দেওয়া সেই দুই যমজ ভাইয়ের গল্পটি একটি শক্তিশালী দার্শনিক হাতিয়ার হতে পারে [35]

কল্পনা করুন, মায়ের অন্ধকার জরায়ুর ভেতর দুই যমজ ভাই—আহান ও রিদয়। তাদের চেনা জগৎ কেবল ওই ছোট অন্ধকার প্রকোষ্ঠটিই। রিদয় বিশ্বাস করে, এই জগতের বাইরে একজন ‘মা’ আছেন, যিনি তাদের সৃষ্টি করেছেন এবং একদিন তারা এক বিশাল আলোকময় পৃথিবীতে যাবে। অন্যদিকে আহান একজন সংশয়ী; সে বলে, “আমাদের চোখের সামনে যা আছে, তার বাইরে কিছুর অস্তিত্বের প্রমাণ কোথায়? আমরা কি মাকে দেখেছি? আমরা তো এমনি এমনিই এখানে বড় হচ্ছি।”

রিদয় যখন দাবি করে, “মা অনাদি এবং অনন্ত, তাঁর কোনো স্রষ্টা নেই,” তখন সে মূলত কালাম আর্গুমেন্টের সেই চিরন্তন ফাঁদে পা দেয়। আহান তখন মোক্ষম প্রশ্নটি তোলে— “মা যদি অনাদি হতে পারেন, তবে এই জরায়ুর জগতটি কেন অনাদি হতে পারে না? মায়েরও কি কোনো মা নেই?” এই রূপকটি আমাদের অস্তিত্বের একটি রূঢ় বাস্তবতা তুলে ধরে:

অভিজ্ঞতার সীমাবদ্ধতা
জরায়ুর ভেতর থাকা বাচ্চাদের কাছে যেমন বাইরের পৃথিবী কল্পনা করা অসম্ভব, আমাদের কাছেও স্থান-কালের (Space-Time) বাইরের কোনো সত্তাকে কল্পনা করা তেমনি অসম্ভব। ডেভিড হিউম যেমনটি বলেছিলেন, আমাদের অভিজ্ঞতা কেবলমাত্র আমাদের অভ্যন্তরীণ বাস্তবতার সঙ্গে সম্পর্কিত, এর বাইরের কিছু নিয়ে নিশ্চিত দাবি করা অযৌক্তিক [30]
বিশেষ সুবিধাবাদ (Special Pleading)
রিদয় যখন কোনো প্রমাণ ছাড়াই দাবি করে যে “মায়ের কোনো স্রষ্টা নেই,” সে তখন ঈশ্বরবাদীদের মতোই ‘স্পেশাল প্লিডিং’ ফ্যালাসি ব্যবহার করে। মহাবিশ্বের জন্য কারণ খুঁজলেও স্রষ্টার বেলায় তারা কারণের প্রয়োজনীয়তাকে অস্বীকার করেন [4]
অন্ধবিশ্বাস বনাম বৈজ্ঞানিক কৌতূহল
রিদয় তার বিশ্বাসের ওপর নির্ভর করে শান্ত থাকতে চায়, কিন্তু আহান প্রমাণ চায়। বিজ্ঞানের পথটি হলো আহানের পথ—যতক্ষণ পর্যন্ত কোনো বিষয়ের স্বপক্ষে অকাট্য প্রমাণ না মিলছে, ততক্ষণ “জানি না” বলাই হলো সবচেয়ে সৎ অবস্থান।

এই গল্পের মূল শিক্ষা হলো, কোনো কিছু শুনতে ভালো লাগলেই বা তা আমাদের মানসিক প্রশান্তি দিলেই তা সত্য হয়ে যায় না। জরায়ুর বাইরের জগতটি যদি সত্যিই থেকে থাকে, তবে তা জানার উপায় হলো অনুসন্ধান ও প্রমাণ, নিছক কল্পনা বা অন্ধবিশ্বাস নয়। কালাম আর্গুমেন্ট মূলত আমাদের এই ‘সীমিত জ্ঞানকে’ পুঁজি করে একটি রূপকথার ওপর ভিত্তি করে দাঁড়িয়ে আছে [31]


উপসংহার

কালাম কসমোলজিক্যাল আর্গুমেন্ট, তার ঐতিহাসিক গুরুত্ব এবং দার্শনিক চাতুর্য সত্ত্বেও, বহুযুগ ধরে দর্শনের জগতে আলোচিত হয়েছে যা আধুনিক বৈজ্ঞানিক ও যৌক্তিক মানদণ্ডে মহাবিশ্বের উদ্ভবের ব্যাখ্যা হিসেবে অসম্পূর্ণ এবং ত্রুটিপূর্ণ। এর প্রথম প্রস্তাবনা কোয়ান্টাম পদার্থবিজ্ঞানের পর্যবেক্ষণের সাথে সামঞ্জস্যহীন এবং দ্বিতীয় প্রস্তাবনা মহাবিশ্বের আদি অবস্থার জটিলতাকে অতি-সরলীকরণ করে। সর্বোপরি, এই যুক্তিটি একটি ‘কারণ’ থেকে সরাসরি একটি ‘ব্যক্তিগত ঈশ্বরে’ পৌঁছানোর যে চেষ্টা করে, তা ‘গড অফ দ্য গ্যাপস’ (God of the gaps) বা অজানাকে ঈশ্বর দিয়ে ব্যাখ্যা করার নামান্তর। মহাবিশ্বের উৎপত্তির রহস্য উন্মোচনে আমাদের প্রয়োজন বিজ্ঞানমনস্ক অনুসন্ধান এবং প্রমাণের ওপর নির্ভরতা, মধ্যযুগীয় দর্শনের ওপর অন্ধ আস্থা নয়। সংক্ষেপে, কালাম কসমোলজিক্যাল আর্গুমেন্ট মূলত আমাদের সীমিত অভিজ্ঞতার ‘কার্যকারণ’ নিয়মকে এমন এক ক্ষেত্রে প্রয়োগ করার চেষ্টা করে যেখানে আমাদের জানা পদার্থবিজ্ঞানের সূত্রগুলো ভেঙে পড়ে। এটি একটি ‘গড অফ দ্য গ্যাপস’ (God of the gaps) পদ্ধতি, যা বিজ্ঞানের অজানা অংশকে ধর্মতাত্ত্বিক অনুমান দিয়ে পূর্ণ করার চেষ্টা করে, কিন্তু আধুনিক কসমোলজি ও মডাল লজিক এই অনুমানের প্রতিটি স্তম্ভকে প্রশ্নবিদ্ধ করে।

⚠️ জরুরি বিজ্ঞপ্তি ⚠️

প্রথম প্রস্তাবনা: কোয়ান্টাম মেকানিক্সের অ-কারণতা (Quantum Indeterminacy) এবং স্বতঃস্ফূর্ত ঘটনার সাথে এটি সরাসরি সাংঘর্ষিক।

দ্বিতীয় প্রস্তাবনা: মহাবিশ্বের ‘প্রসারণ’ এবং ‘অস্তিত্বের শুরু’কে এক করে দেখা একটি বৈজ্ঞানিক অতি-সরলীকরণ মাত্র।

⚠️

যৌক্তিক ভুল: কারণ থেকে সরাসরি ‘ব্যক্তিগত ঈশ্বরে’ পৌঁছানোর চেষ্টা একটি ‘গড অফ দ্য গ্যাপস’ বা যৌক্তিক উল্লম্ফন।

মহাবিশ্বের রহস্য উন্মোচনে আমাদের প্রয়োজন বিজ্ঞানমনস্ক অনুসন্ধান এবং প্রমাণের ওপর নির্ভরতা, মধ্যযুগীয় দর্শনের ওপর অন্ধ আস্থা নয়।


তথ্যসূত্রঃ
  1. Heisenberg, 1930 ↩︎
  2. Carroll, 2016 ↩︎
  3. Davies, 1995 ↩︎
  4. Dawkins, 2006 1 2 3 4 5
  5. Russell, 1948 ↩︎
  6. Oppy, 2006 ↩︎
  7. Smith, 1996 ↩︎
  8. Abu Hamid Al-Ghazali, The Incoherence of the Philosophers (Tahafut al-Falasifah), trans. Michael E. Marmura (Provo, UT: Brigham Young University Press, 2000), pp. 12–14 ↩︎
  9. William Lane Craig, The Kalām Cosmological Argument (London: Macmillan, 1979), p. 63 ↩︎
  10. Adolf Grünbaum, “The Pseudo-Problem of Creation in Physical Cosmology,” Philosophy of Science, Vol. 56, No. 3 (1989), pp. 373-394 ↩︎
  11. Sean Carroll, The Big Picture: On the Origins of Life, Meaning, and the Universe Itself, 2016 ↩︎
  12. Krauss, L. M., 2012 ↩︎
  13. Werner Heisenberg, The Physical Principles of the Quantum Theory (New York: Dover Publications, 1930), pp. 20-21 ↩︎
  14. Lawrence M. Krauss, A Universe from Nothing: Why There Is Something Rather Than Nothing (New York: Free Press, 2012), pp. 142-150 ↩︎
  15. Immanuel Kant, Critique of Pure Reason, 1781 ↩︎
  16. Planck Collaboration, 2018 ↩︎
  17. Hawking, S., & Penrose, R. (1996). The Nature of Space and Time ↩︎
  18. Steinhardt, P. J., & Turok, N. (2007). Endless Universe: Beyond the Big Bang ↩︎
  19. James B. Hartle and Stephen W. Hawking, “Wave Function of the Universe,” Physical Review D, Vol. 28, No. 12 (1983), pp. 2960-2975 ↩︎
  20. Georg Cantor, Contributions to the Founding of the Theory of Transfinite Numbers, trans. Philip E. B. Jourdain (New York: Dover Publications, 1955), pp. 85-90 ↩︎
  21. Alan H. Guth, “Eternal Inflation and Its Implications,” Journal of Physics A: Mathematical and Theoretical, Vol. 40, No. 25 (2007), pp. 6811-6826 ↩︎
  22. Paul Davies, About Time: Einstein’s Unfinished Revolution, 1995 ↩︎
  23. Brian F. Chellas, Modal Logic: An Introduction (Cambridge: Cambridge University Press, 1980), pp. 1-15 ↩︎
  24. Alexander R. Pruss and Joshua L. Rasmussen, The Principle of Sufficient Reason: A Reassessment (Cambridge: Cambridge University Press, 2018), pp. 64-71 ↩︎
  25. Graham Oppy, Arguing about Gods (Cambridge: Cambridge University Press, 2006), pp. 147-152 ↩︎
  26. Graham Oppy, Arguing about Gods (Cambridge: Cambridge University Press, 2006), pp. 137-145 ↩︎
  27. William of Ockham, Summa Logicae, ed. Philotheus Boehner (St. Bonaventure, NY: Franciscan Institute, 1974), Part II, Chapter 15 ↩︎
  28. David Hume, Dialogues Concerning Natural Religion, 1779 1 2
  29. Michael Martin, Atheism: A Philosophical Justification, 1990 ↩︎
  30. Hume, 1779 1 2
  31. Russell, 1957 1 2 3
  32. আত্মপ্রসাদের কল্পগল্পঃ নাস্তিক প্রফেসরের মিথ ↩︎
  33. Krauss, 2012 ↩︎
  34. যা দেখা যায় না, নাস্তিকরা সেগুলো বিশ্বাস করে? ↩︎
  35. যমজ বাচ্চাদের যুক্তিবাদী কথোপকথন ↩︎