ইসলামের আকীদা অনুসারে আল্লাহ কি নিরাকার সত্তা?

Table of Contents

সারসংক্ষেপ

ভারত বাংলাদেশের মুসলিম সমাজে “আল্লাহ নিরাকার/সর্বত্র বিরাজমান”—এ ধরনের বর্ণনা খুব প্রচলিত। কিন্তু কোরআন ও সহিহ হাদিসে আল্লাহ সম্পর্কে “চেহারা/মুখ (Face)”, “হাত (Hand)”, “পা/কদম (Foot)”, “আরশ (Throne)” ইত্যাদি ভাষা বারবার ব্যবহার করতে দেখা যায়। এই প্রবন্ধে সেই দলিল প্রমাণ এবং আলেমদের মতামতগুলো একত্রিত করা হয়েছে যেখানে দেখানো হবে যে, প্রাথমিক ইসলামি উৎসগুলো (কোরআন-হাদিস) আসলে আল্লাহর ‘নিরাকার’ হওয়ার ধারণা সমর্থন করে না, ‘শারীরিক/অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ’- সম্পন্ন শারীরিক অস্তিত্বের কথাই বলে—যা পরে বিভিন্ন ধর্মতাত্ত্বিক স্কুল ব্যাখ্যার মাধ্যমে সামঞ্জস্য করার চেষ্টা করা হয়েছে। কোরআন হাদিসের বিশুদ্ধ টেক্সট-ভিত্তিক বিশ্লেষণের ভিত্তিতে দেখা যায়: (ক) “নিরাকার” শব্দ/দাবি প্রাথমিক উৎসে কোথাও সোজাসাপ্টা বাক্য হিসেবে আসে না। (খ) প্রাথমিক উৎসে উপস্থিত anthropomorphic (মানব-সদৃশ) ভাষা ব্যাখ্যার জন্য মুসলিম ধর্মতত্ত্বে tafwīd (অর্থ আল্লাহ জানেন/কিভাবে জানি না)ta’wīl (রূপক/ব্যাখ্যাগত রূপান্তর)—দুই ধরনের পথ তৈরি করেছেন। ফলত “আল্লাহ নিরাকার”—এটি বিশুদ্ধ সূত্রগুলো অনুসারে কোন সিদ্ধান্ত নয়; বরং কোরআন হাদিসে এর বিপরীত কথাই উপস্থিত। পরবর্তীতে সুফি এবং ভারতীয় বা পারস্য সভ্যতার সংস্পর্শে নিরাকার আল্লাহর ধারণা জনপ্রিয় হতে শুরু করে, যা কোরআন হাদিসের বিশুদ্ধ ব্যাখ্যাগুলোর সাথে সংঘর্ষ তৈরি করে।


ভূমিকা

মহাবিশ্বের স্রষ্টা, যিনি সর্বশক্তিমান এবং সর্বজ্ঞ হিসেবে বিবেচিত, তার প্রাণীদের মতো শারীরিক বৈশিষ্ট্য যেমন হাত-পা থাকার ধারণাটি যৌক্তিকভাবে সম্ভব নয় বলে গুরুত্বপূর্ণ দার্শনিকগণ মনে করে। এর প্রধান কারণ মূলত, ধর্মতাত্ত্বিক এবং বৈজ্ঞানিক জ্ঞান। কারণ হাত পা বা আকার আকৃতি সম্পন্ন হওয়া মূলত প্রাণীর শারীরিক বৈশিষ্ট্য। এই বিষয়গুলো যৌক্তিকভাবে ঈশ্বরের ধারনাকে সীমাবদ্ধ ও নির্ভরশীল করে ফেলে। ঈশ্বরকে একটি সর্বশক্তিমান, অসীম সত্তা হিসেবে বিবেচনা করা হয়, যিনি মানবিক সীমাবদ্ধতা বা শারীরিক বৈশিষ্ট্যের ঊর্ধ্বে।

শারীরিক সীমাবদ্ধতা এবং স্রষ্টার অসীমতা

প্রাণীদের শরীর যেমন হাত, পা, চোখ, কান ইত্যাদি শারীরিক সত্তার অংশ, যা তাদের চলাচল ও কাজ করতে সাহায্য করে। কিন্তু মহাবিশ্বের স্রষ্টা হলেন অসীম ও শাশ্বত, যার শারীরিক সীমাবদ্ধতা নেই। শারীরিক অঙ্গ থাকা মানে একটি নির্দিষ্ট স্থানে সীমাবদ্ধ হওয়া, যা স্রষ্টার সর্বশক্তিমান ও অসীম ক্ষমতার ধারণার পরিপন্থী।

স্রষ্টার অশরীরীতা (Immateriality)

দার্শনিক ও ধর্মতাত্ত্বিকভাবে স্রষ্টাকে ‘অশরীরী’ (immaterial) হিসেবে দেখা হয়। দেহ থাকা মানেই তা কোনো পদার্থ দিয়ে তৈরি, যা স্থান-কালের সীমাবদ্ধতার অধীন। স্রষ্টা যদি পদার্থের সীমাবদ্ধতার বাইরে থাকেন, তবে তাঁর কোনো শারীরিক রূপ থাকা যুক্তিযুক্ত নয়, কারণ অশরীরী অস্তিত্বই তাঁকে অসীম ও সর্বশক্তিমান হিসেবে বজায় রাখে।

প্রয়োজনের অনুপস্থিতি

প্রাণীরা টিকে থাকার প্রয়োজনে হাত বা পা ব্যবহার করে। কিন্তু যিনি সমস্ত কিছুর নিয়ন্ত্রক এবং অসীম জ্ঞানের অধিকারী, তাঁর জন্য শারীরিক অঙ্গের প্রয়োজন নেই। মহাবিশ্বের স্রষ্টার কোনো নির্দিষ্ট কাজ সম্পন্ন করতে হাত-পা বা বাহ্যিক উপকরণের দরকার হয় না; তাঁর ইচ্ছা বা আদেশের মাধ্যমেই সবকিছু সম্ভব হয়।

ধর্মীয় শিক্ষা ও অতুলনীয়তা

ইসলামিক ধর্মতত্ত্বে আল্লাহকে সৃষ্টি থেকে সম্পূর্ণ পৃথক ও অদ্বিতীয় হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। আল্লাহকে মানুষের মতো বা অন্য কোনো সৃষ্টির অবয়বে কল্পনা করা ‘তাশবিহ’ বা শিরক হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। যেহেতু হাত-পা থাকা মানেই সৃষ্টির সাথে কোনো না কোনোভাবে তুলনীয় হওয়া, তাই স্রষ্টাকে এই ভৌত বৈশিষ্ট্যের ঊর্ধ্বে রাখা হয়।

দার্শনিক যুক্তি (গ্রিক দর্শন)

প্লেটো এবং অ্যারিস্টটল সহ প্রাচীন দার্শনিকদের মতে, পরম সত্তার শারীরিক অঙ্গ থাকা অযৌক্তিক। অঙ্গ থাকা মানেই সীমাবদ্ধ থাকা, যা স্রষ্টার শক্তি এবং জ্ঞানের ব্যাপ্তিকে সীমিত করে ফেলে। পরম ও সর্বত্র উপস্থিত একটি সত্তার জন্য শারীরিক রূপ ধারণ করা একটি যৌক্তিক অসংগতি।

বিবর্তন ও উপযোগিতার অভাব

জৈবিক অঙ্গসমূহ বিবর্তনের মাধ্যমে পরিবেশের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার জন্য তৈরি হয়েছে। স্রষ্টা যেহেতু স্বয়ংসম্পূর্ণ এবং আদি-অন্তহীন, তাঁর জন্য এই ধরনের জৈবিক বিবর্তনের কোনো অবকাশ নেই। তাঁর অস্তিত্ব এবং কার্যকারিতার জন্য কোনো বাহ্যিক বিবর্তনমূলক অঙ্গের প্রয়োজনীয়তা বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে অর্থহীন।


আল্লাহ আকার আকৃতি সম্পন্ন সত্তা

ইসলামের আকিদা অনুসারে আল্লাহর হাত পা মাথা চোখ নাক কান সবই রয়েছে। আল্লাহ নিরাকার, এরকম কোন বক্তব্য কোরআন হাদিস সীরাত কিংনা কোন ইসলামিক দলিল থেকেই কখনো জানা যায় না। নিচে আমরা এক এক করে যেই বিষয়গুলো জানবো তা হচ্ছে,

বৈশিষ্ট্য / অঙ্গ বিবরণ ও রেফারেন্স
আল্লাহর চেহারা (Face) সবকিছু ধ্বংস হয়ে গেলেও আল্লাহর মহিমান্বিত চেহারা অবশিষ্ট থাকবে।
[1]
আল্লাহর চোখ (Eyes) আল্লাহর চোখ রয়েছে এবং তিনি টেরা নন; দাজ্জালের সাথে পার্থক্যের বর্ণনায় এটি স্পষ্টভাবে এসেছে।
[2]
আল্লাহর হাত ও আঙুল আল্লাহর উভয় হাত প্রসারিত; তিনি স্বহস্তে আদমকে সৃষ্টি করেছেন এবং মানুষের অন্তর তাঁর দুই আঙুলের মাঝে অবস্থিত।
[3]
আল্লাহর পা ও নলা (Shin) কিয়ামতের দিন জাহান্নাম পূর্ণ করতে আল্লাহ তাঁর পা সেখানে রাখবেন এবং তাঁর পায়ের নলা উন্মোচিত করা হবে।
[4]
ওজন, আরশ ও কদম আল্লাহর আরশ বহনকারী ফেরেশতাদের বিশালত্বের বর্ণনা এবং কুরসী হলো আল্লাহর দুই পা রাখার জায়গা।
[5]
রঙ ও কণ্ঠস্বর (Voice) আল্লাহর বিশেষ রঙ (সিবগাতুল্লাহ) রয়েছে এবং তিনি নির্দিষ্ট দিক বা বৃক্ষ থেকে আওয়াজ বা কণ্ঠস্বরে কথা বলেন।
[6]

আসুন বাংলাদেশের বিখ্যাত একজন আলেম ড. মনজুর ইলাহির বক্তব্য শুনে নিই,

এবারে আসুন মুফতি ইব্রাহিমের একটি বক্তব্য শুনে নিই,

আসুন আরও কিছু বক্তব্য শুনি,


আল্লাহ একটি বস্তুগত সত্তা

ইসলামের আল্লাহ কী একটি বস্তু নাকি অবস্তু? ইসলাম ধর্মের স্রষ্টা আল্লাহকে কী কোন বস্তু হিসেবে অভিহিত করা যায়? এই বিষয়ে নবী বা ইসলাম কী বলে? এই বিষয়ে যা বলবার বুখারী শরীফের একটি সহিহ হাদিসই তা স্পষ্টভাবে বলে দিবে। এই হাদিসটিতে দেখা যায় যে স্বয়ং স্রষ্টা নিজেকে ‘বস্তু’ (শাইউন) হিসেবে সংজ্ঞায়িত করেছেন। মহাবিশ্বের যেকোনো অস্তিত্বশীল সত্তার জন্য একটি নির্দিষ্ট রূপ বা বস্তুগত পরিচয় থাকা যে আবশ্যক, তা এই বর্ণনার মাধ্যমে প্রমাণিত হয়। এটি আল্লাহর নিরাকার হওয়ার প্রচলিত দাবির বিপরীতে একটি প্রধান টেক্সট-ভিত্তিক প্রমাণ। [7] [8]

সহীহ বুখারী (তাওহীদ পাবলিকেশন)
৯৭/ তাওহীদ
পরিচ্ছেদঃ ৯৭/২১. মহান আল্লাহর বাণীঃ বল, সাক্ষ্য প্রদানে সর্বশ্রেষ্ঠ কী? বল, আল্লাহ্- (সূরাহ আন‘আম ৬/১৯)। এখানে আল্লাহ্ তা‘আলা নিজেকে ‘শাইউন’ (বস্তু) বলে আখ্যায়িত করেছেন। আবার নাবী (সাঃ) কুরআনকে আখ্যায়িত করেছেন বস্ত্ত বলে । অথচ এটি আল্লাহর গুণগুলোর মধ্যে একটি গুণ। আল্লাহ্ বলেছেনঃ আল্লাহর সত্তা ছাড়া সব কিছুই ধ্বংসশীল- (সূরাহ আল-ক্বাসাস ২৮/৮৮)।
৭৪১৭. সাহল ইবনু সা’দ (রাঃ) হতে বর্ণিত। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একজনকে বললেন, তোমার কাছে কুরআনের কোন বস্তু আছে কি? তিনি বললেন, হ্যাঁ, অমুক সূরাহ অমুক সূরাহ। তিনি সূরাহগুলোর নাম বলেছিলেন। [২৩১০] (আধুনিক প্রকাশনী- ৬৯০০, ইসলামিক ফাউন্ডেশন- ৬৯১২)
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ সাহল বিন সা’দ (রাঃ)

নিরাকার

এবারে আসুন নসরুল বারী থেকে বিষয়টি জেনে নিই। এখানে বিস্তারিত ব্যাখ্যা করা হয়েছে যে, কেন স্রষ্টাকে একটি নির্দিষ্ট সত্তা বা বস্তু হিসেবে বিবেচনা করা যৌক্তিক এবং ভাষাগতভাবে অনিবার্য। ব্যাখ্যাকার এখানে দেখিয়েছেন যে, কোনো কিছুর অস্তিত্ব স্বীকার করার অর্থই হলো তার একটি বস্তুগত বা সত্তাগত ভিত্তি থাকা, যা নিরাকার তত্ত্বের সীমাবদ্ধতাকে স্পষ্ট করে। [9]

নিরাকার 1

বস্তুগত আল্লাহর ওজন রয়েছে

ইসলামী বিশ্বাস অনুসারে, আল্লাহ পাকের ওজন রয়েছে। যার প্রমাণ মেলে নিচের হাদিসটি থেকে। এখানে আরশ বহনকারী ফেরেশতাদের বিশালতা বর্ণনা করা হয়েছে, যা প্রকারান্তরে আরশের ওপর আসীন সত্তার ভৌত ভার বা গুরুত্বকে নির্দেশ করে। যদি স্রষ্টার কোনো ওজন বা বস্তুগত অস্তিত্ব না থাকত, তবে তা বহন করার জন্য বিশালকায় ফেরেশতাদের প্রয়োজনীয়তা যৌক্তিকভাবে অর্থহীন হয়ে পড়ত। [10]

সুনান আবূ দাউদ (তাহকিককৃত)
৩৫/ সুন্নাহ
পরিচ্ছেদঃ ১৯. জাহমিয়্যাহ সম্প্রদায় সম্পর্কে
৪৭২৭। জাবির ইবনু আব্দুল্লাহ (রাঃ) সূত্রে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ যে সকল ফিরিশতা আল্লাহর আরশ বহন করেন,তাদের একজনের সঙ্গে আলাপ করার জন্য আমাকে অনুমতি দেয়া হয়েছিল। তার কানের লতি থেকে কাঁধ পর্যন্ত স্থানের দূরত্ব হলো সাতশ বছরের দূরত্বের সমান।[1]
সহীহ।
[1]. তাবারানী।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ জাবির ইবনু আবদুল্লাহ আনসারী (রাঃ)

কেউ দাবি করতে পারেন, আরশ কাঁপা আল্লাহর ওজনের প্রমাণ নয়—এটা নাকি আরশের নিজস্ব ভারের ফল। কিন্তু এ যুক্তি ধোপে টেকে না। কারণ হাদিসে দেখা যায়, আল্লাহর রাগ, দুঃখ বা শোকের কারণে আরশও কেঁপে ওঠে—যা শুধু আরশের স্থির ভার দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না।

প্রশ্ন: আল্লাহর কোনো শারীরিক ওজন বা উপস্থিতি না থাকলে আরশ কেন কাঁপবে?

আরও স্পষ্ট প্রশ্ন: নবী -এর সাহাবী সা’দ ইবন মু’আয-এর মৃত্যুতে আরশ কেন কেঁপে উঠল? আল্লাহ তো পূর্ব থেকেই জানতেন যে তিনি কখন মারা যাবেন এবং তিনি নিজেই সেই মৃত্যু নির্ধারণ করেছেন। তাহলে এই কম্পনের কারণ কী? কোনটি কেঁপেছিল, আরশ নাকি আল্লাহ নিজেই? আরশ কি সচেতন সত্তা? আর আল্লাহ কেঁপে থাকলেই তো শুধুমাত্র আরশের কম্পন সম্ভব। তাহলে, আল্লাহর ওজন না থাকলে, আল্লাহ কাঁপার ফলে আরশ তো কাঁপবে না।

সাধারণত মানুষ রাগ, দুঃখ বা শোকে শারীরিকভাবে কেঁপে ওঠে। কিন্তু আল্লাহর আরশের কাঁপার প্রয়োজনই বা কী? এই বর্ণনা স্পষ্ট ইঙ্গিত দেয় যে, আরশ ও তার উপর আসীন সত্তার মধ্যে একটি ভৌতিক ও আবেগীয় সম্পর্ক বিদ্যমান—যা কোনো নিরাকার, বিমূর্ত শক্তির পক্ষে অসম্ভব।[11]

সহীহ বুখারী (ইফাঃ)
অধ্যায়ঃ ৫০/ আম্বিয়া কিরাম (আঃ)
পরিচ্ছদঃ ২১২২. স্বাদ ইবন মু’আয (রাঃ) এর মর্যাদা
৩৫৩১। মুহাম্মদ ইবনু মূসান্না (রহঃ) … জাবির (রাঃ) বলেন, আমি নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে বলতে শুনেছি সা’দ ইবনু মু’আয (রাঃ) এর মৃত্যুতে আল্লাহ্ ত’আলার আরশ কেঁপে উঠে ছিল। আমাশ (রহঃ) … নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে অনুরূপ বর্ণিত হয়েছে, এক ব্যাক্তি জাবির (রাঃ) কে বলল, বারা ইবনু আযিব (রাঃ) তো বলেন, জানাযার খাট নড়েছিল। তদুত্তরে জাবির (রাঃ) বললেন, সা’দ ও বারা (রাঃ) এর গোত্রদ্বয়ের মধ্যে কিছুটা বিরোধ ছিল, (কিন্তু এটা ঠিক নয়) কেননা, আমি নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে عَرْشُ الرَّحْمَنِ অর্থাৎ আল্লাহর আরশ সা’দ ইবনু মু’আযের (মৃত্যুতে)কেঁপে উঠল বলতে শুনেছি।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)

সা’দ ইবন মু’আয-এর মৃত্যু
সত্তার ক্ষোভ বা ক্রোধ
আবেগীয় প্রতিক্রিয়া
আল্লাহর আরশ (সিংহাসন)
সনাতন দাবি:
সত্তা নিরাকার ও ওজনহীন। আরশ কেবল একটি সৃষ্টি যা উপমা হিসেবে ব্যবহৃত।
যৌক্তিক প্রশ্ন:
ভৌত ওজন বা ভর (Mass) ছাড়া কোনো সত্তার নড়াচড়ার ফলে আরশের মতো বিশাল কাঠামো কাঁপা কি বৈজ্ঞানিকভাবে সম্ভব?
সংঘাত:
আল্লাহ যদি পূর্বনির্ধারিত মৃত্যুতে শোকাতুর হয়ে কাঁপেন, তবে তা তাঁর বিমূর্ত সত্তার ধারণার পরিপন্থী।
উপসংহার:
এই কম্পন প্রমাণ করে আরশ ও তার উপর আসীন সত্তার মধ্যে একটি ‘বস্তুগত’ ও ‘যান্ত্রিক’ সম্পর্ক বিদ্যমান।

আল্লাহর নামক সত্তার চেহারা রয়েছে

আল্লাহ আল কুরআনের অনেকগুলো আয়াতে তার চেহারার প্রমাণ দিয়েছেন। সুরা রহমানের এই আয়াতে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে যে, মহাবিশ্বের সব কিছু লীন হয়ে গেলেও রবের ‘চেহারা’ (ওয়াজহ) অবশিষ্ট থাকবে। এটি স্রষ্টার একটি সুনির্দিষ্ট ভৌত পরিচিতি বা অবয়বের অস্তিত্বকে দৃঢ়ভাবে সমর্থন করে। [12]

And there will remain the Face of your Lord, Owner of Majesty and Honor.
— Saheeh International
হে রাসূল! কেবলআপনার রবের চেহারাই অবশিষ্ট থাকবে। যিনি নিজ বান্দাদের উপর মহা অনুকম্পা ও অনুগ্রহ প্রদর্শনকারী। ফলে তাঁকে আদৗ কোন ধ্বংসই পাবে না।
— Bengali Mokhtasar
কিন্তু চিরস্থায়ী তোমার প্রতিপালকের চেহারা (সত্তা)- যিনি মহীয়ান, গরীয়ান,
— Taisirul Quran
অবিনশ্বর শুধুতোমার রবের মুখমন্ডল যিনি মহিমাময়, মহানুভব।
— Sheikh Mujibur Rahman
আর থেকে যাবে শুধুমহামহিম ও মহানুভব তোমার রবের চেহারা* *চেহারা বলতে কোন কোন তাফসীরকার আল্লাহর সত্তাকে বুঝিয়েছেন।
— Rawai Al-bayan
আর অবিনশ্বর শুধুআপনার রবের চেহারা [১], যিনি মহিমাময়, মহানুভব [২];
— Dr. Abu Bakr Muhammad Zakaria

এবারে নিচের আয়াতটি লক্ষ্য করুন, যেখানে সকল বস্তুর ধ্বংসশীলতা এবং কেবল আল্লাহর ‘চেহারা’ বা ‘ওয়াজহ’ এর স্থায়িত্বের কথা পুনরায় জোর দিয়ে বলা হয়েছে। আক্ষরিক অর্থে এটি স্রষ্টার আকার ও অস্তিত্বের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ হিসেবে চেহারার উপস্থিতিকে প্রমাণ করে, যা রূপক ব্যাখ্যা দিয়ে উড়িয়ে দেওয়া কঠিন। [13]

And do not invoke with Allāh another deity. There is no deity except Him. Everything will be destroyed except His Face.1 His is the judgement, and to Him you will be returned.
— Saheeh International
৮৮. আর আপনি আল্লাহ তা‘আলা ছাড়া অন্য কোন মা’বূদকে ডাকবেন না। কারণ, তিনি ছাড়া সত্য কোন মা’বূদ নেই। তিনি ছাড়া অন্য সবকিছুই ধ্বংসপ্রাপ্ত। ফায়সালা করার ক্ষমতা কেবল তাঁরই। তিনি যা চান ফায়সালা করেন। কিয়ামতের দিন হিসাব ও প্রতিদানের জন্য একমাত্র তাঁর কাছেই ফিরে যেতে হবে।
— Bengali Mokhtasar
আল্লাহর সঙ্গে অন্য কোন ইলাহকে ডেকো না, তিনি ছাড়া সত্যিকারের কোন ইলাহ নেই, তাঁর (সত্তা) ছাড়া সকল কিছুই ধ্বংসশীল। বিধান তাঁরই, আর তাঁর কাছেই তোমাদেরকে ফিরিয়ে আনা হবে।
— Taisirul Quran
তুমি আল্লাহর সাথে অন্য ইলাহকে ডেকনা, তিনি ছাড়া অন্য কোন ইলাহ নেই। আল্লাহর সত্তা ব্যতীত সব কিছু ধ্বংসশীল। বিধান তাঁরই এবং তাঁরই নিকট তোমরা প্রত্যাবর্তিত হবে।
— Sheikh Mujibur Rahman
আল্লাহর সাথে অন্য কোন ইলাহকে ডেকো না, তিনি ছাড়া কোন (সত্য) ইলাহ নেই। তাঁর চেহারা (সত্ত্বা)* ছাড়া সব কিছুই ধ্বংসশীল, সিদ্ধান্ত তাঁরই এবং তাঁর কাছেই তোমাদেরকে ফিরিয়ে নেয়া হবে। * আয়াতে উল্লিখিত وجه শব্দের অর্থ চেহারা। আল্লাহর চেহারা আছে। আর তাঁর চেহারা যেমন ধ্বংসশীল নয় তেমনি তাঁর সত্ত্বাও ধ্বংসশীল নয়।
— Rawai Al-bayan
আর আপনি আল্লাহ্‌র সাথে অন্য ইলাহ্‌কে ডাকবেন না, তিনি ছাড়া অন্য কোনো সত্য ইলাহ্‌ নেই। আল্লাহ্‌র সত্তা ছাড়া সব কিছুই ধ্বংসশীল [১]। বিধান তাঁরই এবং তাঁরই কাছে তোমরা প্রত্যাবর্তিত হবে।
— Dr. Abu Bakr Muhammad Zakaria


আল্লাহর দৃশ্য দেখার উপযোগী চোখ রয়েছে

আল্লাহ তা’আলা নিজের দেখার ব্যাপারে কোরআনের প্রায় পঞ্চাশটি আয়াতে প্রমাণ দিয়েছেন। কিন্তু আইন (চোখ) ও আইউন (চোখগুলাে) শব্দ পাঁচটি আয়াতে ব্যবহার করেছেন। সুরা তুরের এই আয়াতের মাধ্যমে স্রষ্টা তাঁর ‘চোখ’ এর অস্তিত্ব সরাসরি ঘোষণা করেছেন। এটি কেবল রূপক কোনো পর্যবেক্ষণ ক্ষমতা নয়, বরং একটি নির্দিষ্ট শারীরিক অঙ্গের বর্ণনা যা তাঁর দেখার গুণকে বাস্তবায়িত করে। [14]

হে মুহাম্মাদ! তােমার প্রতিপালকের হুকুম মােতাবেক তুমি ধৈর্য ধর। কারণ, তুমি আমার চোখের সামনে আছ

নিচের এই প্রসিদ্ধ হাদিসটিতে দাজ্জালের শারীরিক ত্রুটির সাথে আল্লাহর তুলনা করা হয়েছে। এখানে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে যে, আল্লাহ ‘টেরা চোখ বিশিষ্ট নন’। এই তুলনাটি প্রমাণ করে যে আল্লাহর চোখ ভৌতভাবে বিদ্যমান এবং তা দাজ্জালের চোখের চেয়ে উন্নত ও নিখুঁত। যদি আল্লাহর চোখ না-ই থাকত, তবে টেরা না হওয়ার এই তুলনাটি নিরর্থক হয়ে যেত। [15]

সহীহ মুসলিম (হাঃ একাডেমী)
অধ্যায়ঃ ১। ঈমান (বিশ্বাস)
পরিচ্ছদঃ ৭৫. মারইয়াম পুত্র ঈসা (আঃ) ও মাসীহিদ দাজ্জাল-এর বর্ণনা।
৩১৫-(২৭৪/…) মুহাম্মাদ ইবনু ইসহাক আল মুসাইয়্যাবী (রহঃ) ….. আবদুল্লাহ ইবনু উমার (রাযিঃ) বলেন, একদিন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার সাহাবাদের সম্মুখে দাজ্জালের কথা উল্লেখ করে বললেন, অবশ্যই আল্লাহ তা’আলা টেরা চোখ বিশিষ্ট নন। জেনে রাখ দাজ্জালের ডান চোখ টেরা যেন ফোলা একটি আঙ্গুর। ইবনু উমার (রাযিঃ) বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, একবার আমি স্বপ্নে আমাকে কা’বার কাছে পেলাম। গোধূম বর্ণের এক ব্যক্তিকে দেখলাম। এ বর্ণের তোমরা যত লোক দেখেছ তিনি ছিলেন তাদের মধ্যে সবচেয়ে সুন্দর। চুল তার কাঁধ পর্যন্ত বুলছিল। তার চুলগুলো ছিল সোজা। তা থেকে তখন পানি ঝরছিল। তিনি দু’ ব্যক্তির কাঁধে হাত রেখে বাইতুল্লাহ তাওয়াফ করছিলেন। জিজ্ঞেস করলাম, ইনি কে? বলা হল, ইনি মাসীহ ইবনু মারইয়াম। তারই পেছনে দেখলাম, আরেক ব্যক্তি, অধিক কোঁকড়ানো চুল। তার ডান চোখ ছিল টেরা। সে দেখতে ছিল ইবনু কাতান এর ন্যায়। সেও দু’ ব্যক্তির কাঁধে হাত রেখে বাইতুল্লাহর তাওয়াফ করছে। জিজ্ঞেস করলাম, এ কে? বলা হল, মাসীহুদ দাজ্জাল। (ইসলামিক ফাউন্ডেশনঃ ৩২৩, ইসলামিক সেন্টারঃ ৩৩৪)
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)

এই হাদিসটিই দেখে নিই সরাসরি বই থেকে। এখানে আল্লাহর চোখের সুস্থতা ও দাজ্জালের চোখের বিকৃতির যে বর্ণনা রয়েছে, তা আল্লাহর ব্যক্তিক ও ভৌত স্বরূপ বোঝার জন্য একটি অপরিহার্য দলিল। [16]

নিরাকার 3

কোরআনে উক্ত আয়াতগুলাে এবং বিভিন্ন হাদীস থেকে বোঝা যায়, আল্লাহর চোখ আছে


আল্লাহর কোন কিছু ধরবার জন্য হাত রয়েছে

কোরআন হাদিসের অসংখ্য জায়গায় আল্লাহর হাতের কথা খুব পরিষ্কারভাবেই বলা আছে। সুরা সাদের এই আয়াতে আল্লাহ আদমকে ‘স্বহস্তে’ সৃষ্টি করার কথা উল্লেখ করেছেন। এখানে ‘উভয় হাত’ বা ‘স্বহস্ত’ শব্দটির ব্যবহার কোনো বিমূর্ত ক্ষমতা নয়, বরং সরাসরি সৃজনশীল কাজের সাথে যুক্ত অঙ্গের অস্তিত্বকে নির্দেশ করে। [17]

আল্লাহ বললেন- হে ইবলীস! আমি যাকে নিজ হাতে সৃষ্টি করলাম তাকে সেজদা করতে কিসে তোমাকে নিষেধ করল? তুমি কি দম্ভ দেখালে, না তুমি খুব উচ্চ মানের অধিকারী হয়েছ?
— Taisirul Quran
তিনি বললেনঃ হে ইবলীস! আমি যাকে নিজ হাতে সৃষ্টি করেছি তার প্রতি সাজদাহবনত হতে তোকে কিসে বাধা দিল? তুই কি ঔদ্ধত্য প্রকাশ করলি, নাকি তুই উচ্চ মর্যাদাসম্পন্ন?
— Sheikh Mujibur Rahman
আল্লাহ বললেন, ‘হে ইবলীস, আমার দু’হাতে আমি যাকে সৃষ্টি করেছি তার প্রতি সিজদাবনত হতে কিসে তোমাকে বাধা দিল? তুমি কি অহঙ্কার করলে, না তুমি অধিকতর উচ্চ মর্যাদাসম্পন্ন?’
— Rawai Al-bayan
তিনি বললেন, ‘হে ইবলীস! আমি যাকে আমার দু’হাতে [১] সৃষ্টি করেছি, তার প্রতি সাজদাবনত হতে তোমাকে কিসে বাধা দিল? তুমি কি ঔদ্ধত্য প্রকাশ করলে, না তুমি অধিকতর উচ্চ মর্যাদাসম্পন্ন?’
— Dr. Abu Bakr Muhammad Zakaria

পরবর্তী এই আয়াতে সাহাবীদের আনুগত্যের সময় আল্লাহর হাত তাদের হাতের ওপর থাকার কথা বলা হয়েছে। এটি একটি ভৌত ও আধ্যাত্মিক সম্পর্কের মেলবন্ধন, যেখানে হাতের উপস্থিতিকে স্রষ্টার কর্তৃত্বের শারীরিক প্রতীক হিসেবে দেখানো হয়েছে। [18]

যারা তোমার কাছে বাই‘আত (অর্থাৎ আনুগত্য করার শপথ) করে আসলে তারা আল্লাহর কাছে বাই‘আত করে। তাদের হাতের উপর আছে আল্লাহর হাত। এক্ষণে যে এ ও‘য়াদা ভঙ্গ করে, এ ও‘য়াদা ভঙ্গের কুফল তার নিজেরই উপর পড়বে। আর যে ও‘য়াদা পূর্ণ করবে- যা সে আল্লাহর সঙ্গে করেছে- তিনি অচিরেই তাকে মহা পুরস্কার দান করবেন।
— Taisirul Quran
যারা তোমার বাইআত গ্রহণ করে তারাতো আল্লাহরই বাইআত গ্রহণ করে। আল্লাহর হাত তাদের হাতের উপর। সুতরাং যে ওটা ভঙ্গ করে, ওটা ভঙ্গ করার পরিনাম তারই এবং যে আল্লাহর সাথে অঙ্গীকার পূর্ণ করে তিনি তাকে মহা পুরস্কার দেন।
— Sheikh Mujibur Rahman
আর যারা তোমার কাছে বাই‘য়াত গ্রহণ করে, তারা শুধু আল্লাহরই কাছে বাই‘য়াত গ্রহণ করে; আল্লাহর হাত তাদের হাতের উপর; অতঃপর যে কেউ ওয়াদা ভঙ্গ করলে তার ওয়াদা ভঙ্গের পরিণাম বর্তাবে তারই উপর। আর যে আল্লাহকে দেয়া ওয়াদা পূরণ করবে অচিরেই আল্লাহ তাকে মহা পুরস্কার দেবেন।
— Rawai Al-bayan
নিশ্চয় যারা আপনার কাছে বাই’আত করে [১] তারা তো আল্লাহরই হাতে বাই’আত করে। আল্লাহর হাত [২] তাদের হাতের উপর [৩]। তারপর যে তা ভঙ্গ করে, তা ভঙ্গ করার পরিণাম বর্তাবে তারই উপর এবং যে আল্লাহর সাথে কৃত অঙ্গীকার পূর্ণ করে, তবে তিনি অবশ্যই তাকে মহাপুরস্কার দেন।
— Dr. Abu Bakr Muhammad Zakaria

এখানে ইহুদীদের ভুল ধারণার প্রতিবাদে আল্লাহ তাঁর ‘উভয় হাত’ উন্মুক্ত থাকার কথা বলেছেন। ‘দুই হাত’ শব্দটির বারংবার প্রয়োগ কোনো অবস্থাতেই নিরাকার তত্ত্বে খাপ খায় না, বরং এটি একটি নির্দিষ্ট গঠন ও অস্তিত্বের সাক্ষ্য দেয়। [19]

ইয়াহূদীরা বলে, আল্লাহর হাত আবদ্ধ, তাদের হাতই আবদ্ধ, তাদের (প্রলাপ) উক্তির কারণে তারা হয়েছে অভিশপ্ত, বরং আল্লাহর উভয় হাত প্রসারিত, যেভাবে ইচ্ছে করেন দান করেন, তোমার প্রতিপালকের নিকট হতে তোমার নিকট যা অবতীর্ণ হয়েছে তা তাদের অনেকের সীমালঙ্ঘন ও কুফরী অবশ্য অবশ্যই বাড়িয়ে দিবে, আর ক্বিয়ামাত অবধি আমি তাদের পরস্পরের মধ্যে শত্রুতা ও বিদ্বেষ সৃষ্টি করে দিয়েছি। যখনই তারা যুদ্ধের আগুন প্রজ্জ্বলিত করে, আল্লাহ তা নিভিয়ে দেন, আর তারা দুনিয়ায় ফাসাদ ছড়িয়ে বেড়ায়, আল্লাহ ফাসাদ সৃষ্টিকারীদের পছন্দ করেন না।
— Taisirul Quran
আর ইয়াহুদীরা বলেঃ আল্লাহর হাত বন্ধ হয়ে গেছে। তাদেরই হাত বন্ধ, এবং তাদের এই উক্তির দরুণ তারা অভিশপ্ত। বরং তাঁর (আল্লাহর) তো উভয় হাত উম্মুক্ত, যেরূপ ইচ্ছা তিনি ব্যয় করেন; আর যে বিষয় তোমার নিকট তোমার রবের পক্ষ হতে প্রেরিত হয় তা তাদের মধ্যে অনেকের নাফরমানী ও কুফর বৃদ্ধির কারণ হয়, এবং তাদের পরস্পরের মধ্যে শক্রতা ও হিংসা নিক্ষেপ করেছি কিয়ামাত পর্যন্ত; যখনই (মুসলিমদের বিরুদ্ধে) যুদ্ধাগ্নি প্রজ্জ্বলিত করতে চায়, আল্লাহ তা নির্বাপিত করে দেন; তারা ভূ-পৃষ্ঠে অশান্তি ছড়িয়ে বেড়ায়; আর আল্লাহ অশান্তি বিস্তারকারীদেরকে ভালবাসেননা।
— Sheikh Mujibur Rahman
আর ইয়াহূদীরা বলে, ‘আল্লাহর হাত বাঁধা’। তাদের হাতই বেঁধে দেয়া হয়েছে এবং তারা যা বলেছে, তার জন্য তারা লা‘নতগ্রস্ত হয়েছে। বরং তার দু’হাত প্রসারিত। যেভাবে ইচ্ছা তিনি দান করেন এবং তোমার উপর তোমার রবের পক্ষ থেকে যা নাযিল করা হয়েছে তা তাদের অনেকের অবাধ্যতা ও কুফরী বাড়িয়েই দিচ্ছে। আর আমি তাদের মধ্যে কিয়ামতের দিন পর্যন্ত শত্রুতা ও ঘৃণা ঢেলে দিয়েছি। যখনই তারা যুদ্ধের আগুন প্রজ্বলিত করে, আল্লাহ তা নিভিয়ে দেন। আর তারা যমীনে ফাসাদ করে বেড়ায় এবং আল্লাহ ফাসাদকারীদের ভালবাসেন না।
— Rawai Al-bayan
আর ইয়াহুদীরা বলে, ‘আল্লাহর হাত [১] রুদ্ধ’ [২]। তাদের হাতই রুদ্ধ করা হয়েছে এবং তারা যা বলে সে জন্য তারা অভিশপ্ত [৩], বরং আল্লাহর উভয় হাতই প্রসারিত [৪]; যেভাবে ইচ্ছা তিনি দান করেন। আর আপনার রবের কাছ থেকে যা আপনার প্রতি নাযিল করা হয়েছে, তা অবশ্যই তাদের অনেকের অবাধ্যতা ও কুফরী বৃদ্ধি করবে। আর আমরা তাদের মধ্যে কেয়ামত পর্যন্ত স্থায়ী শত্রুতা ও বিদ্বেষ ঢেলে দিয়েছি [৫]। যখনই তারা যুদ্ধের আগুন জ্বালায় তখনই আল্লাহ তা নিভিয়ে দেন এবং তারা দুনিয়ায় ফাসাদ করে বেড়ায়; আর আল্লাহ ফাসাদকারীদেরকে ভালোবাসেন না।
— Dr. Abu Bakr Muhammad Zakaria

নিরাকার আল্লাহ?

তিরমিজী শরীফের এই বর্ণনায় আল্লাহর ‘ডান হাত’ এবং তাতে থাকা ‘মীযান’ বা দাঁড়ি-পাল্লার কথা বলা হয়েছে। এটি অত্যন্ত নির্দিষ্ট একটি ভৌত বর্ণনা, যা স্রষ্টার কার্যাবলীকে তাঁর অঙ্গপ্রত্যঙ্গের সাথে সরাসরি সম্পর্কিত করে। আলেমদের মতে, এই বর্ণনাগুলো যেমন আছে তেমনই বিশ্বাস করা আবশ্যক। [20]

সূনান আত তিরমিজী (তাহকীককৃত)
অধ্যায়ঃ ৪৪/ তাফসীরুল কুরআন
পাবলিশারঃ হুসাইন আল-মাদানী
পরিচ্ছদঃ ৬. সূরা আল-মায়িদাহ
৩০৪৫। আবূ হুরাইরাহ (রাযিঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ দয়াময় আল্লাহ তা’আলার ডান হাত পূর্ণ। সর্বদা তা অনুগ্রহ ঢালছে। রাত দিনের অবিরাম দান তাতে কখনো কমতি ঘটাতে পারে না। তিনি আরো বলেন, তোমরা লক্ষ্য করেছ কি যেদিন থেকে তিনি আসমান-যামীন সৃষ্টি করেছেন সেদিন হতে কত না দান করে আসছেন, অথচ তার ডান হাতে যা আছে তাতে কিছুই কমতি হয়নি। (সৃষ্টির পূর্বে) তার আরশ ছিল পানির উপর। তার অপর হাতে রয়েছে মীযান (দাঁড়ি-পাল্লা)। তিনি তা নীচু করেন ও উত্তোলন করেন (সৃষ্টির রিযিক নির্ধারণ করেন)।
সহীহঃ ইবনু মা-জাহ (১৯৭)।
আবূ ঈসা বলেন, এ হাদীসটি হাসান সহীহ। এ হাদীসটি হল নিম্নোক্ত আয়াতের ব্যাখ্যাস্বরূপঃ “ইয়াহুদীরা বলে, আল্লাহ তা’আলার হাত রুদ্ধ। ওরাই আসলে রুদ্ধহস্ত এবং ওরা যা বলে তজ্জন্য ওরা অভিশপ্ত। বরং আল্লাহ তা’আলার উভয় হাতই প্রসারিত, যেভাবে ইচ্ছা তিনি দান করেন”— (সূরা আল-মায়িদাহ ৬৪)।
ইমামগণ বলেন, এ হাদীস যেরূপে (আমাদের নিকট) এসেছে, কোনরূপ ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ ও সন্দেহ-সংশয় ব্যতীতই তার উপর সেভাবেই ঈমান আনতে হবে। একাধিক ইমাম এ কথা বলেছেন। তাদের মধ্যে রয়েছেন সুফইয়ান সাওরী, মালিক ইবনু আনাস, ইবনু উয়াইনাহ, ইবনুল মুবারাক (রাহঃ) প্রমুখ। তাদের মতে এরূপ বিষয় বর্ণনা করা যাবে, এগুলোর উপর ঈমান রাখতে হবে, কিন্তু তা কেমন এ কথা বলা যাবে না।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)

সহীহ আত-তিরমিজী শরীফের এই পৃষ্ঠাগুলোতে আল্লাহর হাতের প্রকৃতি এবং সংশ্লিষ্ট দলিলগুলো বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে। এখানে পরিষ্কার করা হয়েছে যে, হাত থাকা আল্লাহর একটি শাশ্বত গুণ যা কোনো রূপক ব্যাখ্যার দ্বারা বাতিল করা সম্ভব নয়। [21]

নিরাকার 6
নিরাকার 8

তিরমিযী শরীফের এই খণ্ডটিতে আল্লাহর হাতের কার্যাবলী এবং মহাবিশ্ব সৃষ্টির সময় তাঁর ভৌত উপস্থিতির বিষয়গুলো সংকলিত হয়েছে। এটি পাঠকের জন্য আক্ষরিক আকিদা বোঝার একটি বড় তথ্যসূত্র। [22]

নিরাকার 10
নিরাকার 12

সহীহ বুখারীর এই হাদিসটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ, যেখানে বলা হয়েছে আল্লাহ কিয়ামতের দিন পৃথিবীকে তাঁর ‘মুঠোয়’ গ্রহণ করবেন। এই ‘মুঠো’ করার ক্ষমতা বা কাজ সরাসরি একটি সাকার ও অঙ্গবিশিষ্ট অস্তিত্বের দাবি রাখে। [23]

সহীহ বুখারী (তাওহীদ)
অধ্যায়ঃ ৯৭/ তাওহীদ
৭৪১৩. আবূ হুরাইরাহ (রাঃ) সূত্রে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ আল্লাহ্ যমীনকে তাঁর মুঠোয় নিয়ে নেবেন। (৪৮১২) (আধুনিক প্রকাশনী- নাই, ইসলামিক ফাউন্ডেশন- ৬৯০৮)
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)

সুনান আবূ দাউদের এই হাদিসটিতে আকাশমন্ডলী এবং পৃথিবীকে আল্লাহর ‘ডান হাতে’ এবং ‘অপর হাতে’ গুটিয়ে নেওয়ার বর্ণনা রয়েছে। এটি স্রষ্টার বিশালত্ব এবং তাঁর হাতের বাস্তব অস্তিত্বের সবচেয়ে বড় প্রমাণগুলোর একটি। [24]

সুনান আবূ দাউদ (তাহকিককৃত)
৩৫/ সুন্নাহ
পরিচ্ছেদঃ ২১. জাহমিয়্যাহ মতবাদ প্রত্যাখ্যাত
৪৭৩২। আব্দুল্লাহ ইবনু উমার (রাঃ) সূত্রে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ আল্লাহ কিয়ামতের দিন আসমানসমূহকে গুটিয়ে তাঁর ডান হাতে নিয়ে বললেবন, আমি সর্বময় কর্তা ও মালিক, স্বৈরাচারীরা ও অহংকারকারীরা কোথায়? অতঃপর পৃথিবীসমূহকে গুটিয়ে অপর হাতে নিয়ে বলবেন, আমি মালিক স্বৈরাচারীরা ও অহংকারীরা কোথায়?[1]
সহীহ।
[1]. মুসলিম।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আবদুল্লাহ ইবন উমর (রাঃ)


আল্লাহর হাতের আঙুল রয়েছে

আল্লাহর হাতের পূর্ণতার বর্ণনায় হাদিস শরীফে এমনকি তাঁর ‘আঙুল’ এর কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। এই হাদিস অনুযায়ী মানুষের অন্তর আল্লাহর ‘দুই আঙুলের’ মাঝে অবস্থিত। আঙুলের মতো একটি সুনির্দিষ্ট ভৌত কাঠামোর উল্লেখ এটিই প্রমাণ করে যে স্রষ্টার রূপ কল্পনাপ্রসূত নয়, বরং টেক্সট দ্বারা প্রমাণিত। [25]

সূনান আত তিরমিজী (তাহকীককৃত)
অধ্যায়ঃ ৩০/ তাকদীর
পাবলিশারঃ হুসাইন আল-মাদানী
পরিচ্ছদঃ ৭. আল্লাহ তা’আলার দুই আঙ্গুলের মধ্যে সমস্ত অন্তর অবস্থিত
২১৪০। আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এই দু’আ অধিক পাঠ করতেনঃ হে অন্তরসমূহের পরিবর্তনকারী! আমার অন্তরকে তোমার দ্বীনের উপর প্রতিষ্ঠিত (দৃঢ়) রাখো। আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)। আমরা ঈমান এনেছি আপনার উপর এবং আপনি যা নিয়ে এসেছেন তার উপর। আপনি আমাদের ব্যাপারে কি কোনরকম আশংকা করেন? তিনি বললেনঃ হ্যাঁ, কেননা, আল্লাহ তা’আলার আঙ্গুলসমূহের মধ্যকার দুটি আঙ্গুলের মাঝে সমস্ত অন্তরই অবস্থিত। তিনি যেভাবে ইচ্ছা তা পরিবর্তন করেন।
সহীহ, ইবনু মা-জাহ (৩৮৩৪)।
আবূ ঈসা বলেন, নাওয়াস ইবনু সাম্আন, উন্মু সালামা, আব্দুল্লাহ ইবনু আমর ও আইশা (রাঃ) হতেও এ অনুচ্ছেদে হাদীস বর্ণিত আছে। এ হাদীসটি হাসান। আমাশ-আবৃ সুফিয়ান হতে, তিনি আনাস (রাঃ)-এর সূত্রে একাধিক বর্ণনাকারী একইরকম হাদীস বর্ণনা করেছেন। কেউ কেউ আমাশ-আবৃ সুফিয়ান হতে, তিনি জাবির (রাঃ) হতে, তিনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হতে অনুরূপ হাদীস বর্ণনা করেছেন। আনাস (রাঃ)-এর সূত্রে আবূ সুফিয়ানের বর্ণিত হাদীসটি অনেক বেশি সহীহ।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)

এবারে সূনান আত তিরমিজী থেকে এই পৃষ্ঠাগুলো দেখে নিই। এখানে আঙুল সংক্রান্ত হাদিসের ব্যাখ্যা এবং নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। স্রষ্টার ভৌত কাঠামো বোঝার জন্য আঙুলের উল্লেখ একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দিক। [26]

নিরাকার 14
নিরাকার 16

আল্লাহর চলাফেরার উপযোগী পা রয়েছে

আল্লাহর পা এবং পায়ের পাতার থাকার দলিলপ্রমাণ অত্যন্ত শক্তিশালী। নিচের মিশকাতুল মাসাবীহর এই বর্ণনায় বলা হয়েছে যে, জাহান্নাম পূর্ণ করার জন্য আল্লাহ তাঁর ‘পা’ তাতে রাখবেন। এটি স্রষ্টার চলাফেরা বা ভৌত অবস্থানের পরিবর্তন এবং তাঁর অঙ্গপ্রত্যঙ্গের সরাসরি ব্যবহারের একটি পরিষ্কার চিত্র তুলে ধরে। [27]

আবু হুরাইরার বর্ণনায় রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, জাহান্নাম ততক্ষণ ভরবেনা যতক্ষণ না আল্লাহ তাঁর পা জাহান্নামে রেখে দেবেন তখন জাহান্নাম বলতে থাকবে ব্যাস! ব্যাস !!
(বুখারীও মুসলিম, মিশকাত ৫০৫ পৃষ্ঠা)

ইবনু আব্বাসের এই বর্ণনায় ‘কুরসী’ কে আল্লাহর ‘দুই পায়ের পাতা’ রাখার জায়গা হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। এটি স্রষ্টার সিংহাসনে আসীন হওয়ার একটি সুনির্দিষ্ট শারীরিক ভঙ্গি নির্দেশ করে, যা কোনোভাবেই নিরাকার তত্ত্বের সাথে সংগতিপূর্ণ নয়। [28]

ইবনু আব্বাসের বর্ণনায় নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ আলকুর্সী মাওাইল কুদামাইন- কুরসী হচ্ছে আল্লাহর দুটি পায়ের পাতা রাখার জায়গা।
(মুসতাদরকে হা-কিম ২য় খণ্ড, ২৮২ পৃষ্ঠা)

সহীহ বুখারীর এই দীর্ঘ হাদিসে জান্নাত ও জাহান্নামের কথোপকথন এবং শেষ পর্যায়ে আল্লাহর তাঁর ‘কদম’ বা পা জাহান্নামে রাখার বর্ণনা পাওয়া যায়। এটি আল্লাহর অঙ্গপ্রত্যঙ্গের ব্যবহারের মাধ্যমে একটি ভৌত কাজ সম্পন্ন করার অকাট্য প্রমাণ। [29]

সহীহ বুখারী (ইফাঃ)
অধ্যায়ঃ ৮৬/ জাহ্‌মিয়াদের মতের খণ্ডন ও তাওহীদ প্রসঙ্গ
পরিচ্ছদঃ ৩১২৭. আল্লাহ্‌র বাণীঃ আল্লাহ্‌র অনুগ্রহ সৎকর্মপরায়নদের নিকটবর্তী (৭ঃ ৫৬)
৬৯৪১। উবায়দুল্লাহ ইবনু সা’দ ইবনু ইবরাহিম (রহঃ) … আবূ হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ জান্নাত ও জাহান্নাম উভয়টি স্বীয় প্রতিপালকের কাছে অভিযোগ করল। জান্নাত বলল, হে আমার প্রতিপালক! আমার ব্যাপারটি কি হলো যে তাতে শুধু নিঃস্ব ও নিম্ন শ্রেনীর লোকেরাই প্রবেশ করবে। এদিকে জাহান্নামও অভিযোগ করল অর্থাৎ আপনি শুধুমাত্র অহংকারীদেরকেই আমাতে প্রাধান্য দিলেন। আল্লাহ জান্নাতকে লক্ষ্য করে বললেনঃ তুমি আমার রহমত। জাহান্নামকে বললেনঃ তুমি আমার আযাব। আমি যাকে চাইব, তোমাকে দিয়ে শাস্তি পৌছাব। তোমাদের উভয়কেই পূর্ণ করা হবে। তবে আল্লাহ তা’আলা তার সৃষ্টির কারো উপর যুলম করবেন না। তিনি জাহান্নামের জন্য নিজ ইচ্ছানুযায়ী নতুন সৃষ্টি পয়দা করবেন। তাদেরকে যখন জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে, তখন জাহান্নাম বলবে, আরো অভিরিক্ত আছে কি? জাহান্নামে আরো নিক্ষেপ করা হবে, তখনো বলবে, আরো অতিরিক্ত আছে কি? এভাবে তিনবার বলবে। পরিশেষে আল্লাহ তাআলা তাঁর কদম (পা) জাহান্নামে প্রবেশ করিয়ে দিলে তা পরিপূর্ন হয়ে যাবে। তখন জাহান্নামের একটি অংশ আরেকটি অংশকে এই উত্তর করবে যথেষ্ট হয়েছে যথেষ্ট হয়েছে ষথেষ্ট হয়েছে।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)

নিরাকার 18
নিরাকার 20
নিরাকার 22
এখানে সহীহ বুখারীর সংশ্লিষ্ট পৃষ্ঠাটি দেওয়া হয়েছে যেখানে আল্লাহর পায়ের কদম সংক্রান্ত হাদিসটি লিপিবদ্ধ রয়েছে। এটি আক্ষরিক বর্ণনার একটি নির্ভরযোগ্য প্রমাণ। [30]

আল্লাহর পায়ের নলা রয়েছে

কোরআন ও হাদিসের বর্ণনায় আল্লাহর ‘পায়ের নলা’ (সাক) উন্মোচিত হওয়ার কথা রয়েছে। এই চিত্রটি স্রষ্টার একটি ভৌত অবয়বের অস্তিত্বকে আরও সুনির্দিষ্ট করে দেয়। পায়ের নলা উন্মোচিত হওয়া এবং এর মাধ্যমে নিজের পরিচয় প্রদান করা একটি বাস্তব শারীরিক সত্তারই গুণ হতে পারে।

সহীহ বুখারী (তাওহীদ পাবলিকেশন)
৯৭/ তাওহীদ
পরিচ্ছেদঃ ৯৭/২৪. আল্লাহর বাণীঃ কতক মুখ সেদিন উজ্জ্বল হবে। তারা তাদের প্রতিপালকের দিকে তাকিয়ে থাকবে। (সূরাহ আল-ক্বিয়ামাহ ৭৫/২২-২৩)
৭৪৩৯. আবূ সা’ঈদ খুদরী (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমরা বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! আমরা কিয়ামতের দিন আমাদের রবের দর্শন লাভ করব কি? তিনি বললেনঃ মেঘহীন আকাশে সূর্যকে দেখতে তোমাদের অসুবিধা হয় কি? আমরা বললাম, না। তিনি বললেনঃ সেদিন তোমাদের রবকে দেখতে তোমাদের কোন অসুবিধা হবে না। এতটুকু ব্যতীত যতটুকু সূর্য দেখার সময় পেয়ে থাক। সেদিন একজন ঘোষণাকারী ঘোষণা করবেন, যারা যে জিনিসের ’ইবাদত করতে, তারা সে জিনিসের কাছে গমন কর। এরপর যারা ক্রুশপূজারী ছিল, তারা যাবে তাদের ক্রুশের কাছে। মূর্তিপূজারীরা যাবে তাদের মূর্তির সঙ্গে। সকলেই তাদের উপাস্যের সঙ্গে যাবে। বাকী থাকবে একমাত্র আল্লাহর ’ইবাদতকারীরা। নেক্কার ও বদকার সকলেই এবং আহলে কিতাবের কতক লোকও থাকবে। অতঃপর জাহান্নামকে আনা হবে। সেটি তখন থাকবে মরীচিকার মত। ইয়াহূদীদেরকে জিজ্ঞাসা করা হবে, তোমরা কিসের ’ইবাদত করতে? তারা উত্তর করবে, আমরা আল্লাহর পুত্র উযায়র (আঃ)-এর ’ইবাদত করতাম।
তখন তাদেরকে বলা হবে, তোমরা মিথ্যা বলছ। কারণ আল্লাহর কোন স্ত্রীও নেই এবং নেই তাঁর কোন সন্তান। এখন তোমরা কী চাও? তারা বলবে, আমরা চাই, আমাদেরকে পানি পান করান। তখন তাদেরকে বলা হবে, তোমরা পানি পান কর। এরপর তারা জাহান্নামে নিক্ষিপ্ত হতে থাকবে। তারপর নাসারাদেরকে বলা হবে, তোমরা কিসের ’ইবাদত করতে? তারা বলবে, আমরা আল্লাহর পুত্র মসীহের ’ইবাদত করতাম। তখন তাদেরকে বলা হবে, তোমরা মিথ্যা বলছ। আল্লাহর কোন স্ত্রীও ছিল না, সন্তানও ছিল না। এখন তোমরা কী চাও? তারা বলবে, আমাদের ইচ্ছা আপনি আমাদেরকে পানি পান করতে দিন। তাদেরকে উত্তর দেয়া হবে, তোমরা পান কর। তারপর তারা জাহান্নামে নিক্ষিপ্ত হতে থাকবে। অবশেষে বাকী থাকবে একমাত্র আল্লাহর ’ইবাদতকারীগণ। তাদের নেক্কার ও বদকার সকলেই। তাদেরকে লক্ষ্য করে বলা হবে, কোন্ জিনিস তোমাদেরকে আটকে রেখেছে? অথচ অন্যরা তো চলে গেছে। তারা বলবে, আমরা তো সেদিন তাদের থেকে আলাদা রয়েছি, যেদিন আজকের চেয়ে তাদের অধিক প্রয়োজন ছিল।
আমরা একজন ঘোষণাকারীর এ ঘোষণাটি দিতে শুনেছি যে, যারা যাদের ’ইবাদাত করত তারা যেন ওদের সঙ্গে যায়। আমরা অপেক্ষা করছি আমাদের রবের। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ এরপর মহাক্ষমতাশালী আল্লাহ্ তাদের কাছে আসবেন। এবার তিনি সে সুরতে আসবেন না, যেভাবে তাঁকে প্রথমে ঈমানদারগণ দেখেছিলেন। এসে তিনি ঘোষণা দেবেন- আমি তোমাদের রবব, সবাই তখন বলে উঠবে আপনিই আমাদের প্রতিপালক। আর সেদিন নবীগণ ছাড়া তাঁর সঙ্গে কেউ কথা বলতে পারবে না। আল্লাহ্ তাদেরকে বলবেন, তোমাদের এবং তাঁর মাঝখানে পরিচয়ের জন্য কোন আলামত আছে কি? তারা বলবেন, পায়ের নলা। তখন পায়ের নলা খুলে দেয়া হবে।
এই দেখে ঈমানদারগণ সবাই সিজদা্য় পড়ে যাবে।
বাকি থাকবে তারা, যারা লোক-দেখানো এবং লোক-শোনানো সিজদা্ করেছিল। তবে তারা সিজদার মনোভাব নিয়ে সিজদা্ করার জন্য যাবে, কিন্তু তাদের মেরুদন্ড একটি তক্তার মত শক্ত হয়ে যাবে। এমন সময় জাহান্নামের উপর পুল স্থাপন করা হবে। সাহাবীগণ বললেন, সে পুলটি কেমন হবে হে আল্লাহর রাসূল? তিনি বললেনঃ দুর্গম পিচ্ছিল স্থান। এর ওপর আংটা ও হুক থাকবে, শক্ত চওড়া উল্টো কাঁটা বিশিষ্ট হবে, যা নাজ্দ দেশের সাদান বৃক্ষের কাঁটার মত হবে। সে পুলের উপর দিয়ে ঈমানদারগণের কেউ পার হয়ে যাবে চোখের পলকের মতো, কেউ বিদ্যুতের মতো, কেউ বাতাসের মতো আবার কেউ দ্রুতগামী ঘোড়া ও সাওয়ারের মতো।
তবে মুক্তিপ্রাপ্তরা কেউ নিরাপদে চলে আসবেন, আবার কেউ জাহান্নামের আগুনে ক্ষতবিক্ষত হয়ে যাবে। এ কবারে শেষে অতিক্রম করবে যে লোকটি, সে হেঁচড়িয়ে কোন ভাবে পার হয়ে আসবে। এখন তোমরা হকের বিষয়ে আমার চেয়ে অধিক কঠোর নও, যতটুকু সেদিন ঈমানদারগণ আল্লাহর সম্মুখে হয়ে থাকবে, যা তোমাদের কাছে স্পষ্ট হয়ে গেছে। যখন ঈমানদারগণ এ দৃশ্যটি দেখবে যে, তাদের ভাইদেরকে রেখে একমাত্র তারাই মুক্তি পেয়েছে, তখন তারা বলবে, হে আমাদের রব! আমাদের সেসব ভাই কোথায়, যারা আমাদের সঙ্গে সালাত আদায় করত, সওম পালন কত, নেক কাজ করত? তখন আল্লাহ্ তা’আলা তাদেরকে বলবেন, তোমরা যাও, যাদের অন্তরে এক দ্বীনার পরিমাণ ঈমান পাবে, তাদেরকে জাহান্নাম থেকে বের করে আন। আল্লাহ্ তাদের মুখমণ্ডল জাহান্নামের ওপর হারাম করে দিয়েছেন। এদের কেউ কেউ দু’পা ও দু’পায়ের নলার বেশি পর্যন্ত জাহান্নামের মধ্যে থাকবে।
তারা যাদেরকে চিনতে পারে, তাদেরকে বের করবে। তারপর এরা আবার ফিরে আসবে। আল্লাহ্ আবার তাদেরকে বলবেন, তোমরা যাও, যাদের অন্তরে অর্ধ দ্বীনার পরিমাণ ঈমান পাবে, তাদেরকে বের করে নিয়ে আসবে। তারা গিয়ে তাদেরকেই বের করে নিয়ে আসবে, যাদেরকে তারা চিনতে পারবে। তারপর আবার ফিরে আসবে। আল্লাহ্ তাদেরকে আবার বলবেন, তোমরা যাও, যাদের অন্তরে অণু পরিমাণ ঈমান পাবে, তাদেরকে বের করে নিয়ে আসবে। তারা যাদেরকে চিনতে পারবে তাদেরকে বের করে নিয়ে আসবে। বর্ণনাকারী আবূ সা’ঈদ খুদরী (রাঃ) বলেন, তোমরা যদি আমাকে বিশ্বাস না কর, তাহলে আল্লাহর এ বাণীটি পড়ঃ ’’আল্লাহ অণু পরিমাণও যুল্ম করেন না, আর কোন পুণ্য কাজ হলে তাকে তিনি দ্বিগুণ করেন’’- (সূরাহ আন্-নিসা ৪/৪০)। তারপর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, ফেরেশ্তা ও মু’মিনগণ সুপারিশ করবে। তখন মহা পরাক্রান্ত আল্লাহ্ বলবেন, এখন শুধু আমার শাফাআতই বাকী রয়েছে।
তিনি জাহান্নাম থেকে একমুষ্টি ভরে এমন কতগুলো কওমকে বের করবেন, যারা জ্বলে পুড়ে দগ্ধ হয়ে গিয়েছে। তারপর তাদেরকে জান্নাতের সম্মুখে অবস্থিত ’হায়াত’ নামের নহরে ঢালা হবে। তারা সে নহরের দু’পার্শ্বে এমনভাবে উদগত হবে, যেমন পাথর এবং গাছের কিনারে বয়ে আনা আবর্জনায় বীজ থেকে তৃণ উদগত হয়। দেখতে পাও তার মধ্যে সূর্যের আলোর অংশের গাছগুলো সাধারণত সবুজ হয়, ছায়ার অংশেরগুলো সাদা হয়। তারা সেখান থেকে মুক্তার দানার মত বের হবে। তাদের গর্দানে মোহর লাগানো হবে। জান্নাতে তারা যখন প্রবেশ করবে, তখন অন্যান্য জান্নাতবাসীরা বলবেন, এরা হলেন রাহমান কর্তৃক আযাদকৃত যাদেরকে আল্লাহ্ কোন নেক ’আমল কিংবা কল্যাণকর কাজ ব্যতীতই জান্নাতে দাখিল করেছেন। তখন তাদেরকে বলা হবেঃ তোমরা যা দেখেছ, সবই তো তোমাদের, এর সঙ্গে আরো সমপরিমাণ তোমাদেরকে দেয়া হলো। [২২; মুসলিম ১/৮১, হাঃ ১৮৩, আহমাদ ১১১২৭] (আধুনিক প্রকাশনী- ৬৯২১, ইসলামিক ফাউন্ডেশন- ৬৯৩২)
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আবূ সা’ঈদ খুদরী (রাঃ)

আল্লাহর পাযের নলা

আল্লাহর রূপ রঙ রয়েছে

সুরা বাকারার এই আয়াতে আল্লাহর ‘রঙ’ (সিবগাহ) এর কথা বলা হয়েছে। যদিও এর অনেক আধ্যাত্মিক ব্যাখ্যা রয়েছে, কিন্তু আক্ষরিকভাবে এটি স্রষ্টার একটি নিজস্ব বর্ণ বা রূপ থাকার সম্ভাবনার দিকে ইঙ্গিত করে। আল্লাহর রঙই যে সর্বোত্তম, তা এখানে ঘোষণা করা হয়েছে। [31]

আমরা আল্লাহর রং গ্রহণ করেছি। আল্লাহর রং এর চাইতে উত্তম রং আর কার হতে পারে? আমরা তাঁরই এবাদত করি।
কুরআন ২ঃ১৩৮


আল্লাহর গলা বা কণ্ঠস্বর আছে

আল্লাহর সাথে মুসা (আঃ) এর কথোপকথনের সময় স্রষ্টা একটি বৃক্ষ থেকে আওয়াজ বা শব্দ করেছিলেন। এই ‘আওয়াজ’ বা শব্দ সরাসরি একটি ভৌত কণ্ঠস্বরের অস্তিত্বকে নির্দেশ করে। স্রষ্টা যদি কেবল নিরাকার শক্তি হতেন, তবে তাঁর কথা বলার জন্য কোনো নির্দিষ্ট মাধ্যম বা আওয়াজের প্রয়োজনীয়তা থাকত না। [32]

যখন সে তার কাছে পৌছল, তখন পবিত্র ভূমিতে অবস্থিত উপত্যকার ডান প্রান্তের বৃক্ষ থেকে তাকে আওয়াজ দেয়া হল, হে মূসা! আমি আল্লাহ, বিশ্ব পালনকর্তা।
কুরআন ২৮ঃ৩০

সুরা নামলের এই আয়াতেও একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি রয়েছে, যেখানে আগুনের কাছে পৌঁছানোর পর আল্লাহর পক্ষ থেকে ‘আওয়াজ’ আসার কথা বলা হয়েছে। কণ্ঠস্বর থাকা এবং নির্দিষ্ট স্থান থেকে শব্দ উৎপন্ন হওয়া আল্লাহর সাকার ও ব্যক্তিক সত্তার একটি বড় লক্ষণ। [33]

অতঃপর যখন তিনি আগুনের কাছে আসলেন তখন আওয়াজ হল ধন্য তিনি, যিনি আগুনের স্থানে আছেন এবং যারা আগুনের আশেপাশে আছেন। বিশ্ব জাহানের পালনকর্তা আল্লাহ পবিত্র ও মহিমান্বিত।
কুরআন ২৭ঃ৮


আল্লাহর শোনার জন্য কান রয়েছে

আল্লাহর ‘শোনা’ এবং ‘দেখা’ এর গুণটি কেবল কোনো বিমূর্ত ক্ষমতা নয়। সুরা মুজাদিলাহর এই আয়াতে বলা হয়েছে যে আল্লাহ সরাসরি মানুষের কথা শুনেছেন। এই শোনার ক্ষমতার বাস্তব ভিত্তি হিসেবে ‘কান’ এর উপস্থিতি আলেমদের বর্ণনায় পাওয়া যায়, যা স্রষ্টার ব্যক্তিক সত্তার এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। [34]

আল্লাহ তার কথা শুনেছেন যে নারী (খাওলাহ বিনত সা‘লাবাহ) তার স্বামীর বিষয়ে তোমার সাথে বাদানুবাদ করছে আর আল্লাহর কাছে ফরিয়াদ জানাচ্ছে, আল্লাহ তোমাদের দু’জনের কথা শুনছেন, আল্লাহ সর্বশ্রোতা, সর্বদ্রষ্টা।
— Taisirul Quran
(হে রাসূল) আল্লাহ শুনেছেন সেই নারীর কথা যে তার স্বামীর বিষয়ে তোমার সাথে বাদানুবাদ করেছে এবং আল্লাহর নিকট ফরিয়াদ করেছে। আল্লাহ তোমাদের কথোপকথন শোনেন; আল্লাহ সর্বশ্রোতা, সর্বদ্রষ্টা।
— Sheikh Mujibur Rahman
আল্লাহ অবশ্যই সে রমনীর কথা শুনেছেন যে তার স্বামীর ব্যাপারে তোমার সাথে বাদানুবাদ করছিল আর আল্লাহর কাছে ফরিয়াদ করছিল। আল্লাহ তোমাদের কথোপকথন শোনেন। নিশ্চয় আল্লাহ সর্বশ্রোতা, সর্বদ্রষ্টা।
— Rawai Al-bayan
আল্লাহ অবশ্যই শুনেছেন সে নারীর কথা; যে তার স্বামীর বিষয়ে আপনার সাথে বাদানুবাদ করছে এবং আল্লাহর কাছেও ফরিয়াদ করছে। আল্লাহ তোমাদের কথোপকথন শুনেন; নিশ্চয় আল্লাহ সর্বশ্রোতা, সর্বদ্ৰষ্টা [১]।
— Dr. Abu Bakr Muhammad Zakaria

পরিশেষে সুরা নিসার এই আয়াতটি আল্লাহর ‘সর্বশ্রোতা’ হওয়াকে দৃঢ় করে। শোনার এই শারীরিক বা ইন্দ্রিয়গত গুণটিই প্রকারান্তরে একটি সংবেদনশীল ভৌত অস্তিত্বের উপস্থিতি নির্দেশ করে যা নিরাকারবাদের সাথে সাংঘর্ষিক। [35]

যে ব্যক্তি পার্থিব পুরস্কার কামনা করে সে জেনে রাখুক যে আল্লাহর নিকট ইহলৌকিক ও পারলৌকিক পুরস্কার আছে। আল্লাহ সর্বশ্রোতা, সর্বদ্রষ্টা।
— Taisirul Quran
যে ইহলোকের প্রতিদান আকাংখা করে, আল্লাহর নিকট ইহলোক ও পরলোকের প্রতিদান রয়েছে; এবং আল্লাহ শ্রবণকারী, পরিদর্শক।
— Sheikh Mujibur Rahman
যে দুনিয়ার প্রতিদান চায় তবে আল্লাহর কাছে দুনিয়া ও আখিরাতের প্রতিদান রয়েছে। আর আল্লাহ সর্বশ্রোতা, সর্বদ্রষ্টা।
— Rawai Al-bayan
কেউ দুনিয়ার পুরস্কার চাইলে তবে (সে যেন জেনে নেয় যে) দুনিয়া ও আখেরাতের পুরস্কার আল্লাহর কাছেই রয়েছে [১]। আর আল্লাহ সর্বশ্রোতা, সর্বদ্রষ্টা।
— Dr. Abu Bakr Muhammad Zakaria


যৌক্তিক সমস্যাবলী

ল অফ নন-কন্ট্রাডিকশন বা অসংগতি বর্জন নীতির প্রয়োগ

যুক্তিবিদ্যার সবচেয়ে মৌলিক নীতিগুলোর একটি হলো অসংগতি বর্জন নীতি (Law of Non-Contradiction)। প্রাচীন গ্রিক দার্শনিক Aristotle তার Metaphysics গ্রন্থে এই নীতিটি স্পষ্টভাবে ব্যাখ্যা করেছিলেন। এই নীতির মূল বক্তব্য হলো: কোনো সত্তার ক্ষেত্রে একই সময়ে একই অর্থে একটি গুণ এবং তার বিপরীত গুণ সত্য হতে পারে না [36]

সহজভাবে বললে, একটি বস্তু একই সাথে “গরম” এবং “গরম নয়” হতে পারে না, কিংবা “আছে” এবং “নেই” একই সাথে হতে পারে না। এই নীতিটি যুক্তির ভিত্তি; এটি ভেঙে গেলে যুক্তিবাদী আলোচনাই অর্থহীন হয়ে পড়ে।

এই নীতিটি যদি ঈশ্বরতত্ত্বে প্রয়োগ করা হয়, তবে একটি গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা সামনে আসে। যদি বলা হয় কোনো সত্তার হাত, পা, চোখ বা মুখ রয়েছে, তবে সেই দাবির ভেতরেই একটি মৌলিক ধারণা নিহিত থাকে। কারণ “হাত” বা “পা” কোনো বিমূর্ত ধারণা নয়; এগুলো একটি নির্দিষ্ট কাঠামো বা অবয়বের অংশ। হাত মানেই একটি প্রসারিত অঙ্গ, যা কোনো বৃহত্তর শরীরের সঙ্গে যুক্ত। পা মানেই একটি নির্দিষ্ট জ্যামিতিক বিন্যাসে অবস্থিত অঙ্গ।

অতএব, কোনো সত্তার হাত-পা আছে বলা মানে সেই সত্তার একটি নির্দিষ্ট আকৃতি বা অবয়ব (shape or form) রয়েছে বলে স্বীকার করা। কিন্তু যদি একই সাথে দাবি করা হয় যে সেই সত্তা সম্পূর্ণ নিরাকার, তবে সেখানে একটি স্পষ্ট যৌক্তিক স্ববিরোধিতা তৈরি হয়।

কারণ আকারহীন কোনো সত্তার ক্ষেত্রে অঙ্গের ধারণাই অর্থহীন হয়ে যায়। অঙ্গ বলতে বোঝায় একটি বৃহত্তর কাঠামোর অংশ। কিন্তু যদি সেই বৃহত্তর কাঠামোই না থাকে, তবে তার অংশ থাকার প্রশ্নও ওঠে না।

অতএব, “হাত-পা আছে” এবং “সম্পূর্ণ নিরাকার” এই দুটি দাবি একই সাথে সত্য হতে পারে না। যুক্তিবিদ্যার দৃষ্টিতে এটি একটি ক্লাসিক contradiction


যৌগিকতা এবং বিভাজ্যতার সংকট

দর্শনের ভাষায়, যে সত্তা বিভিন্ন অংশ বা উপাদান নিয়ে গঠিত তাকে বলা হয় যৌগিক সত্তা (Composite Being)। উদাহরণস্বরূপ, মানুষের শরীর মাথা, হাত, পা, চোখ, কান ইত্যাদি বিভিন্ন অংশের সমন্বয়ে গঠিত। এই অংশগুলো একত্রে একটি কাঠামো তৈরি করে।

প্রখ্যাত ইসলামি দার্শনিক Avicenna তার দার্শনিক গ্রন্থ The Metaphysics of The Healing-এ দেখিয়েছিলেন যে, যেকোনো যৌগিক সত্তা তার অংশগুলোর ওপর নির্ভরশীল [37]

এই ধারণার একটি গভীর দার্শনিক ফলাফল আছে। যদি কোনো সত্তাকে বিভিন্ন অংশে বিশ্লেষণ করা যায়, তবে সেই সত্তাটি প্রকৃতপক্ষে একটি সমষ্টি, একটি একক ও অবিভাজ্য বাস্তবতা নয়। কারণ তার অস্তিত্ব নির্ভর করে অংশগুলোর সমন্বয়ের ওপর।

অর্থাৎ,

  • যেখানে অংশ আছে, সেখানে বিভাজ্যতা আছে
  • যেখানে বিভাজ্যতা আছে, সেখানে সম্ভাব্য ভাঙন আছে
  • আর যেখানে এই ধরনের নির্ভরশীলতা আছে, সেখানে সেই সত্তাকে পরম বা স্বয়ংসম্পূর্ণ বলা কঠিন হয়ে পড়ে

একটি সত্তা যদি সত্যিই অবিভাজ্য (simple) এবং পরম (absolute) হয়, তবে তার ভেতরে কোনো অংশ বা অঙ্গ থাকার কথা নয়। কারণ অংশ থাকলে সেটি আর সম্পূর্ণ স্বয়ংসম্পূর্ণ থাকে না; বরং অংশগুলোর বিন্যাসের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে।

অতএব, যে সত্তাকে একই সাথে “অবিভাজ্য”, “পরম”, “অখণ্ড” বলা হয়, তার আবার হাত-পা-চোখের মতো বিভাজ্য অঙ্গ থাকার ধারণা দর্শনের দৃষ্টিতে সমস্যাযুক্ত হয়ে দাঁড়ায়।


সংজ্ঞায়ন এবং নির্ভরশীলতার যুক্তি

হাত, পা, চোখ, মুখ ইত্যাদি শব্দগুলো কোনো কাব্যিক অলংকার নয়; এগুলোর প্রত্যেকটির একটি নির্দিষ্ট সংজ্ঞা এবং কার্যকারিতা রয়েছে। হাত বলতে বোঝায় এমন একটি অঙ্গ যার সাহায্যে ধরা, স্পর্শ করা বা কাজ করা সম্ভব। পা বলতে বোঝায় চলাচলের অঙ্গ।

অতএব, কোনো সত্তার হাত আছে বলা মানে সেই সত্তার একটি সীমা বা সীমানা রয়েছে। কারণ হাত বা পা তখনই অর্থপূর্ণ হয় যখন সেটি একটি নির্দিষ্ট কাঠামোর অংশ হিসেবে বিদ্যমান থাকে।

এই সীমাবদ্ধতা একটি গুরুত্বপূর্ণ দার্শনিক প্রশ্ন তৈরি করে। যদি কোনো সত্তার সীমানা থাকে, তবে সেই সত্তা আর অসীম হতে পারে না। কারণ অসীম সত্তা কোনো নির্দিষ্ট সীমানায় আবদ্ধ নয়।

এছাড়া অঙ্গপ্রত্যঙ্গ থাকা মানেই একটি নির্দিষ্ট বিন্যাস বা নকশা (design) থাকার কথা বোঝায়। একটি হাত বা পা হঠাৎ করে অস্তিত্ব লাভ করে না; এটি একটি কাঠামোগত সংগঠনের ফল। এই সংগঠন আবার কোনো বস্তুগত বা কাঠামোগত বাস্তবতার ওপর নির্ভরশীল।

মধ্যযুগীয় দার্শনিক Thomas Aquinas তার Summa Theologica-তে ঈশ্বরকে “simple being” বা সম্পূর্ণ অবিভাজ্য সত্তা হিসেবে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করেছিলেন [38]। কিন্তু যদি কোনো সত্তাকে হাত-পা-চোখের মতো অঙ্গসহ কল্পনা করা হয়, তবে সেই সত্তা আর দার্শনিক অর্থে “simple” বা অবিভাজ্য থাকে না।

আরও একটি সমস্যা দেখা দেয় কার্যকারণ দৃষ্টিকোণ থেকে। যদি কোনো সত্তা হাত ব্যবহার করে কোনো কাজ সম্পন্ন করে, তবে সেই কাজটি সম্পন্ন করার জন্য তাকে একটি মাধ্যমের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। অর্থাৎ কাজটি সরাসরি নয়, বরং একটি শারীরিক উপকরণের সাহায্যে সম্পন্ন হচ্ছে।

কিন্তু পরম ও সর্বশক্তিমান সত্তার ক্ষেত্রে এই ধরনের মাধ্যমনির্ভরতা ধারণাগতভাবে সমস্যাজনক।


ভাষার অপপ্রয়োগ ও অর্থহীনতা

ধর্মীয় আলোচনায় প্রায়ই একটি আপাত সমাধান হাজির করা হয়। বলা হয়, ঈশ্বরের হাত বা পা আছে ঠিকই, কিন্তু তা মানুষের হাত-পা নয়; এগুলো মানুষের বোধগম্যতার বাইরে।

এই বক্তব্যটি প্রথমে শুনতে সুবিধাজনক মনে হলেও ভাষাতাত্ত্বিক দৃষ্টিতে এটি নতুন সমস্যার সৃষ্টি করে।

ভাষার মৌলিক নীতি হলো, একটি শব্দ তখনই অর্থপূর্ণ হয় যখন তা কোনো নির্দিষ্ট ধারণা বা গুণ নির্দেশ করে। “হাত” শব্দটি আমরা ব্যবহার করি কারণ এটি একটি পরিচিত আকৃতি, কাঠামো এবং কার্যকারিতার দিকে ইঙ্গিত করে।

কিন্তু যদি বলা হয় যে সেই হাতের কোনো আকৃতি নেই, কোনো কাঠামো নেই, কোনো সীমা নেই, তবে প্রশ্ন ওঠে: তখন একে “হাত” বলা হচ্ছে কেন?

যদি “হাত” বলতে হাত বোঝানো না হয়, তবে শব্দটি তার অর্থ হারিয়ে ফেলে। তখন এটি আর কোনো বাস্তব ধারণা নির্দেশ করে না; বরং একটি অস্পষ্ট ও সংজ্ঞাহীন প্রতীকে পরিণত হয়।

দার্শনিক বিশ্লেষণে এটিকে বলা হয় linguistic incoherence। অর্থাৎ এমন শব্দ ব্যবহার করা যা বাস্তবে কোনো সুনির্দিষ্ট ধারণাকে নির্দেশ করে না।

অতএব, যদি কোনো সত্তাকে সম্পূর্ণ নিরাকার বলা হয়, তবে তার ক্ষেত্রে হাত-পা-চোখের মতো অঙ্গের ভাষা ব্যবহার করা যুক্তিগতভাবে সমস্যাজনক। আর যদি এই অঙ্গগুলো বাস্তব অর্থেই বিদ্যমান বলে দাবি করা হয়, তবে সেই সত্তাকে নিরাকার বলা আর সম্ভব থাকে না।


উপসংহার

মহাবিশ্বের স্রষ্টা যে শারীরিক অঙ্গ যেমন হাত-পা থাকার ধারণার ঊর্ধ্বে তা স্পষ্টভাবে বোঝা যায় বিভিন্ন ধর্মতত্ত্ব, দার্শনিক যুক্তি এবং শারীরবৃত্তীয় বিবেচনায়। শারীরিক অঙ্গ থাকা মানে সীমাবদ্ধতা, স্থান-কাল-দেহের নিয়ন্ত্রণে থাকা। কিন্তু দার্শনিকভাবে আস্তিকদের প্রথাগত স্রষ্টা সর্বশক্তিমান, অসীম এবং শারীরিক সীমাবদ্ধতার বাইরে। তাই স্রষ্টার শারীরিক অঙ্গ থাকার ধারণাটি যৌক্তিকভাবে সঠিক নয় এবং তার মহানত্ব ও অসীম ক্ষমতার পরিপ্রেক্ষিতে এই ধারণাটি যুক্তিহীন কুসংস্কার মাত্র।


তথ্যসূত্রঃ
  1. সূরা আর-রহমান: ২৭, সূরা আল-কাসাস: ৮৮ ↩︎
  2. সূরা তুর: ৪৮, সহীহ মুসলিম: ৩১৫ ↩︎
  3. সূরা সাদ: ৭৫, সূরা মায়েদাহ: ৬৪, তিরমিজী: ৩০৪৫, ২১৪০ ↩︎
  4. সূরা কলম: ৪২, সহীহ বুখারী: ৬৯৪১ ↩︎
  5. সুনান আবূ দাউদ: ৪৭২৭, মুসতাদরকে হাকীম: ২৮২ পৃষ্ঠা ↩︎
  6. সূরা বাকারা: ১৩৮, সূরা আল-কাসাস: ৩০ ↩︎
  7. বুখারী শরীফ, তাওহীদ পাবলিকেশন্স, হাদিসঃ ৭৪১৭ ↩︎
  8. বুখারী শরীফ, তাওহীদ পাবলিকেশন্স, খণ্ড ৬, পৃষ্ঠা ৫০২ ↩︎
  9. সহজ নসরুল বারী শরহে বুখারী, খণ্ড ১৩, পৃষ্ঠা ২৩১ ↩︎
  10. সুনান আবূ দাউদ (তাহকিককৃত), হাদিসঃ ৪৭২৭ ↩︎
  11. সহীহ বুখারী, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, হাদিস: ৩৫৩১ ↩︎
  12. সূরা আর-রহমান, আয়াত ২৭ ↩︎
  13. সুরা আল কাসাস, আয়াত ৮৮ ↩︎
  14. সূরা তুর, ৪৮ আয়াত ↩︎
  15. সহীহ মুসলিম, হাদিস একাডেমি, হাদিসঃ ৩১৫ ↩︎
  16. সহীহ মুসলিম, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, প্রথম খণ্ড, পৃষ্ঠা নম্বর ২০৮, হাদিস নম্বরঃ ৩২৩ ↩︎
  17. সুরা ৩৮ঃ৭৫ ↩︎
  18. কোরআন ৪৮ঃ১০ ↩︎
  19. কুরআন ৫ঃ৬৪ ↩︎
  20. সূনান আত তিরমিজী (তাহকীককৃত), হাদিস ৩০৪৫ ↩︎
  21. সহিহ আত-তিরমিযী, খণ্ড ৫, পৃষ্ঠা ৪৪৫, ৪৪৬ ↩︎
  22. তিরমিযী শরীফ, খণ্ড ৬, পৃষ্ঠা ৮১, ৮২ ↩︎
  23. সহীহ বুখারী (তাওহীদ), হাদিসঃ ৭৪১৩ ↩︎
  24. সুনান আবূ দাউদ (তাহকিককৃত), হাদিসঃ ৪৭৩২ ↩︎
  25. সূনান আত তিরমিজী (তাহকীককৃত), হাদিস নম্বরঃ ২১৪০ ↩︎
  26. সূনান আত তিরমিজী (তাহকীককৃত), চতুর্থ খণ্ড, হাদিস নম্বরঃ ২১৪০ ↩︎
  27. বুখারীও মুসলিম, মিশকাত ৫০৫ পৃষ্ঠা ↩︎
  28. মুসতাদরকে হা-কিম ২য় খণ্ড, ২৮২ পৃষ্ঠা ↩︎
  29. সহীহ বুখারী (ইফাঃ), হাদিসঃ ৬৯৪১ ↩︎
  30. সহিহ বুখারী। ইসলামিক ফাউন্ডেশন, অষ্টম খণ্ড, পৃষ্ঠা ২০৪ ↩︎
  31. কুরআন ২ঃ১৩৮ ↩︎
  32. কুরআন ২৮ঃ৩০ ↩︎
  33. কুরআন ২৭ঃ৮ ↩︎
  34. কোরআন ৫৮ঃ১ ↩︎
  35. কোরআন ৪ঃ১৩৪ ↩︎
  36. Aristotle, Metaphysics, Book IV ↩︎
  37. Avicenna, The Metaphysics of The Healing ↩︎
  38. Thomas Aquinas, Summa Theologica, Part 1, Question 3 ↩︎