সবকিছু কি এমনি এমনি হয়ঃ আস্তিকদের বয়ান বনাম যুক্তিবাদীদের কার্যকারণবাদ

ভূমিকা

ধর্মতাত্ত্বিক বিতর্কের ময়দানে আস্তিকদের পক্ষ থেকে একটি বহুল ব্যবহৃত এবং প্রায় ক্লিশে হয়ে যাওয়া প্রশ্ন হলো—“এই মহাবিশ্ব কি এমনি এমনি সৃষ্টি হয়েছে?” এই প্রশ্নের আড়ালে একটি প্রচ্ছন্ন বিদ্রূপ এবং কুযুক্তি (Fallacy) লুকিয়ে থাকে, যা ইঙ্গিত দেয় যে নাস্তিক বা সংশয়বাদীরা বুঝি মনে করেন এক বিশাল শূন্যতা থেকে হঠাৎ কোনো প্রাকৃতিক প্রক্রিয়া ছাড়াই এই সুশৃঙ্খল মহাবিশ্ব ‘টপ’ করে পড়ে গেছে। প্রকৃতপক্ষে, “এমনি এমনি” হওয়ার এই ধারণাটি নাস্তিক্যবাদের বা বস্তুবাদের নয়, বরং আস্তিক্যবাদেরই মৌলিক দার্শনিক ভিত্তি। বিজ্ঞানের ছাত্র বা একজন সংশয়বাদী যখন মহাবিশ্বের উদ্ভব নিয়ে আলোচনা করেন, তখন তিনি মূলত কার্যকারণের (Causality) একটি জটিল এবং দীর্ঘ শৃঙ্খল নিয়ে কথা বলেন, যেখানে প্রতিটি ঘটনার পেছনে পূর্ববর্তী কোনো ভৌত কারণ বা শক্তির প্রভাব বিদ্যমান। কিন্তু ধর্মীয় বয়ানে যখন দাবি করা হয় যে পরমেশ্বর বা আল্লাহ কেবল ইচ্ছাশক্তি প্রয়োগ করে কোনো বস্তু বা ঘটনার উদ্ভব ঘটিয়েছেন, তখন তিনি আসলে কার্যকারণের বৈজ্ঞানিক শৃঙ্খলকে অস্বীকার করে এক প্রকার “ঐশ্বরিক আকস্মিকতা” বা জাদুকরী উদ্ভবের কথাই বলছেন। একে লজিক্যাল ফ্যালাসির ভাষায় বলা হয় ‘Argumentum ad Ignorantiam’ বা অজ্ঞতা প্রসূত যুক্তি; অর্থাৎ যেহেতু আমরা মহাবিশ্বের উৎপত্তির চূড়ান্ত কারণটি এখনো শতভাগ নিশ্চিতভাবে ল্যাবরেটরিতে প্রমাণ করতে পারিনি, তাই সেখানে একটি অতিপ্রাকৃত ‘ইচ্ছা’কে বসিয়ে দেওয়া। অথচ মজার বিষয় হলো, আস্তিক্যবাদ নিজেই এই “এমনি এমনি” তত্ত্বে বিশ্বাসী, কারণ তাদের মতে ঈশ্বরের কোনো প্রাকৃতিক নিয়মের তোয়াক্কা করার প্রয়োজন নেই—তিনি চাইলেই কোনো ভৌত প্রক্রিয়া ছাড়াই শূন্য থেকে সব সৃষ্টি করতে পারেন। [1]


এমনি এমনি হওয়ার দাবীঃ ইসলামে ইমানের ভিত্তি

সত্যিকার অর্থে এমনি এমনি সব হয়ে যায়, সেটি মোটেও নাস্তিকদের দাবী নয়। বরঞ্চ এটি পরিষ্কারভাবেই আস্তিকদের দাবী। ইসলাম ধর্মের বিশ্বাস অনুসারে, কোন কিছু সৃষ্টির ইচ্ছা হলে আল্লাহ ‘কুন’ (সৃষ্টি হও) আর তা এমনি এমনি সৃষ্টি হয়ে যায়। আবার তা ধ্বংসের সময় আল্লাহ বলেন, ‘ফাইয়াকুন'( ধ্বংস হও) তখন তা এমনি এমনি ধ্বংস হয়। তাহলে এমনে এমনে বা এমনি এমনি হওয়ার দাবীটি তো আস্তিকদের। আসুন কোরআনের আয়াতটি পড়ে নিই, [2]

Originator of the heavens and the earth. When He decrees a matter, He only says to it, “Be,” and it is.
— Saheeh International
The Originator of the heavens and the earth! When He decreeth a thing, He saith unto it only: Be! and it is.
— M. Pickthall
আল্লাহ আকাশমন্ডলী ও পৃথিবীর সৃজনকারী, যখন কোন কাজ করতে মনস্থ করেন, তখন তার জন্য শুধু বলেন, হয়ে যাও, তক্ষুনি তা হয়ে যায়।
— Taisirul Quran
তিনি আকাশ ও পৃথিবীর সৃষ্টিকর্তা এবং যখন তিনি কোন কাজ সম্পাদন করতে ইচ্ছা করেন তখন তার জন্য শুধুমাত্র ‘হও’ বলেন, আর তাতেই তা হয়ে যায়।
— Sheikh Mujibur Rahman
তিনি আসমানসমূহ ও যমীনের স্রষ্টা। আর যখন তিনি কোন বিষয়ের সিদ্ধান্ত নেন, তখন কেবল বলেন ‘হও’ ফলে তা হয়ে যায়।
— Rawai Al-bayan
তিনি আসমানসমূহ ও যমীনের উদ্ভাবক। আর যখন তিনি কোনো কিছু করার সিদ্ধান্ত নেন, তখন তার জন্য শুধু বলেন, ‘হও’, ফলে তা হয়ে যায়।
— Dr. Abu Bakr Muhammad Zakaria

এই আয়াতটির তাফসীরও একইসাথে পড়ে নেয়া জরুরি [3]

قوله بَدِيعُ : তিনিই যিনি কোনো অস্ত্র-যন্ত্রের মুখাপেক্ষী নন, যাঁর কোনো মাল-মসলা বা উপকরণ-সরঞ্জামের প্রয়োজন হয় না, যিনি স্থান-অবস্থান ও পরিস্থিতির নিগড়ে আবদ্ধ নন, যিনি সময় বন্ধনের উর্ধ্বে; যিনি কোনো নমুনা স্যাম্পল দেখে বানাবার প্রয়োজন অনুভব করেন না, যার কোনো উস্তাদ প্রশিক্ষকের দিকনির্দেশনার প্রয়োজন হয় না। তিনি সৃজনশীল প্রকৌশলী, তিনি উপকরণ সংযোজক কারিগর নন। প্রকৃত ও বাস্তব অর্থে, আক্ষরিক অর্থে যিনি স্রষ্টা, আবিষ্কারক, অস্তিত্ব বিধায়ক। কারো সহায়তা-সহযোগিত। হাড়াই আরো কোনোরূপ অংশগ্রহণ ব্যতীতই যিনি নাস্তিজগত থেকে অস্তিত্বে নিয়ে আসেন।
بدیع শব্দের উল্লেখ সেসব মুশরিক পৌত্তলিক সম্প্রদায়ের মতবাদ খণ্ডনের জন্য হয়েছে, যারা আল্লাহকে শুধু কারিগর। ও মিস্ত্রি। -এর মর্যাদা দিত এবং আত্মা ও মূল উপকরণকে কোনো না স্তরে তাঁর সহযোগী সহাধ্যায়ী ভাবত। অর্থাৎ যেন মূল ধাতু ও উপকরণ আগে থেকেই বিদ্যমান ছিল এবং তা ছিল অনাদিও নিত্য। কিংবা আত্মা ও তার সঙ্গে সঙ্গে ছিল অনাদি ও নিত্য। আল্লাহ তা’আলার কাজ ছিল শুধু এতটুকু যে তিনি একজন সুদক্ষ কেমিষ্ট রসায়নবিদের ন্যায় বিদ্যমান উপকরণ কেবল আত্মার সংযোজন ও বিন্যাসের কাজটি সুচারুরূপে সমাধা করে নতুন নতুন রূপ ও আকৃতিতে ‘বাজারজাত করেন। কেবল إبداع শব্দটিই মুশরিকদের কল্পিত কল্পনা খণ্ডনের জন্য যথেষ্ট। আল্লাহ তা’আলার জন্য অন্যান্য পূর্বঞ্জ সাবঃপ্রকার’ গুণের অনুরূপ সত্তাগত অনাদিত্বের সাথে সাথে সময় কালগত অনাদিত্ব (১) সাব্যস্ত রয়েছে। কাল বলতে যা বোস, তিনি তার চেয়েও আদি অগ্রবর্তী। এমন একটি সময় [ও কাল] ছিল যখন [কাল বলতে কিছুই ছিল এবং মহাকাল নামের সে অকালে) শুধু তিনিই ছিলেন, আর কিছুই ছিল না, প্রান্ত দিগন্ত, সত্তা অস্তিত্ব জড় অজড়, দেহ, অদেহ] কিছুই ছিল না।
-[তাফসীরে মাজেদী খ. ১. পৃ. ২১৪]

কুন বলা দ্বারা শুধু এতটুকু বুঝানো উদ্দেশ্য যে, ওদিকে আল্লাহ তা’আলার ইচ্ছা হলো আর তৎক্ষণাৎ এদিকে কোনো মাধ্যম ও বিরতি ছাড়াই তা বাস্তবে প্রকাশমান হলো। তাফসীরে মাদারিকে আছে-
ووَهَذَا مَجَازَ عَنْ سُرْعَةِ التَّكوين وَالتَّمْشِيلِ إِذْ لَا قَوْلًا ثُمَّ قَوْلُهُ فَيَكُونُ
: অর্থাৎ ব্যাস, তখনই ঐ বিষয়টি অস্তিত্বে এসে যায়। হয়ে যেতে কোনোও বিলম্ব হয় না এবং তার জন্য কারো সহায়তা, মাধ্যম হওয়া, অংশগ্রহণ করা ইত্যাদির প্রয়োজন হয় না। এ শব্দটি দ্বারা উদ্দেশ্য বিষয়বস্তুর অস্তিত্ব বিধানে আল্লাহ তা’আলার কুদরতের অতি দ্রুত বাস্তবায়ন বুঝানো-
المُرَادُ مِنْ هَذِهِ الكَلِمَةِ سُرْعَةُ نِفَاذِ قدرةِ اللهِ تَعَالَى في تكوين الاشياء – (كبير)
এ যেন মুশরিকদের প্রতিই সম্বোধন যে, আল্লাহ তা’আলার সৃজন প্রক্রিয়া তোমাদের বোধগম্য হলো কি? তাতে তো আল্লাহ তা’আলার ইরাদা ব্যতীত অন্য কোনো কিছুরই অংশ গ্রহণের অবকাশ নেই। সুতরাং এতে তোমাদের অংশীবাদের ভিত্তিই ধ্বংস যায়।
প্রশ্ন : فَانَّمَا يَقُولُ لَهُ كُنْ فَيَكُونُ দ্বারা জানা যায় যে, আল্লাহ তা’আলা কোনো অবিদ্যমান বস্তুকে অস্তিত্বে আনার ইচ্ছা করলে তাকে বলেন। ফলে সে অস্তিত্বহীন বস্তু অস্তিত্বশীল হয়ে যায়। এতে তো مَعْدُوم বস্তুকে সম্বোধন করা লাজেম আসে।
উত্তর : আল্লাহ তা’আলার ইচ্ছাতেই সে অস্তিত্বহীন বস্তু অস্তিত্বশীল বস্তুর হুকুমে হয়ে যায়। সুতরাং সম্বোধন করা সঠিক আছে।
كُن فَيَكُونُ দ্বারা তাড়াতাড়ি উদ্দেশ্য, উদ্ভাবন উদ্দেশ্য নয়।

এমনি
এমনি 1

আসুন আরো একটি আয়াত পড়ি, [4]

Indeed, the example of Jesus to Allāh1 is like that of Adam. He created him from dust; then He said to him, “Be,” and he was.
— Saheeh International
Lo! the likeness of Jesus with Allah is as the likeness of Adam. He created him of dust, then He said unto him: Be! and he is.
— M. Pickthall
আল্লাহর নিকট ঈসার অবস্থা আদামের অবস্থার মত, মাটি দ্বারা তাকে গঠন করে তাকে হুকুম করলেন, হয়ে যাও, ফলে সে হয়ে গেল।
— Taisirul Quran
নিশ্চয়ই আল্লাহর নিকট ঈসার দৃষ্টান্ত আদমের অনুরূপ; তিনি তাকে মাটি দ্বারা সৃষ্টি করলেন, অতঃপর বললেন হও, ফলতঃ তাতেই হয়ে গেল।
— Sheikh Mujibur Rahman
নিশ্চয় আল্লাহর নিকট ঈসার দৃষ্টান্ত আদমের মত, তিনি তাকে মাটি দ্বারা সৃষ্টি করেছেন। অতঃপর তাকে বললেন, ‘হও’, ফলে সে হয়ে গেল।
— Rawai Al-bayan
নিশ্চয় আল্লাহ্‌র নিকট ‘ঈসার দৃষ্টান্ত আদমের দৃষ্টান্তসদৃশ। তিনি তাকে মাটি থেকে সৃষ্টি করেছিলেন; তারপর তাকে বলেছিলেন, ‘হও’, ফলে তিনি হয়ে যান।
— Dr. Abu Bakr Muhammad Zakaria


অলৌকিকতার জাদুকরী বয়ান বনাম ভৌত কার্যকরণবাদ

ধর্মীয় দর্শনে ‘অলৌকিকতা’ বা ‘মিরাকল’ (Miracle) মূলত মহাবিশ্বের প্রতিষ্ঠিত ভৌত নিয়মগুলোকে অস্বীকার করার একটি নামান্তর। যখন দাবি করা হয় যে মুসা নবীর লাঠিটি হুট করে সাপে পরিণত হয়েছে [5], ঈসা নবী মৃত মানুষকে জীবিত করেছেন [6] কিংবা মুহাম্মাদ আঙুলের ইশারায় চাঁদকে দ্বিখণ্ডিত করেছেন [7], তখন সেখানে প্রাকৃতিক কার্যকারণের (Causality) কোনো স্থান থাকে না। বিজ্ঞানের দৃষ্টিতে একটি লাঠি সাপে রূপান্তরিত হতে হলে তার আণবিক কাঠামো পরিবর্তন, কোষীয় পুনর্গঠন এবং বিপুল পরিমাণ শক্তির আদান-প্রদান প্রয়োজন, যা কোনো ভৌত প্রক্রিয়া ছাড়া সম্ভব নয়। অথচ ধর্মীয় বয়ানে এগুলো ঘটে ‘এমনি এমনি’—কেবল এক ঐশ্বরিক নির্দেশে। মজার ব্যাপার হলো, আস্তিকরা যখন বিবর্তনবাদ বা বিগ ব্যাং তত্ত্বকে ‘এমনি এমনি হয়েছে’ বলে বিদ্রূপ করেন, তখন তারা মূলত নিজেদের বিশ্বাসের ‘জাদুকরী উদ্ভব’ তত্ত্বটিকেই বিজ্ঞানের ওপর চাপিয়ে দিতে চান। নাস্তিক বা সংশয়বাদীরা কখনোই দাবি করেন না যে মহাবিশ্ব বা জীবন ‘এমনি এমনি’ এসেছে। বরং বিজ্ঞানের প্রতিটি শাখা—সেটি জ্যোতির্বিজ্ঞান হোক কিংবা আণবিক জীববিজ্ঞান—প্রতিটি ঘটনার পেছনের কারণ এবং প্রাকৃতিক নিয়মগুলো ব্যাখ্যা করতে সচেষ্ট। যখন আমরা বিবর্তন নিয়ে কথা বলি, তখন সেখানে কোটি কোটি বছরের প্রাকৃতিক নির্বাচন এবং জেনেটিক মিউটেশনের একটি সুদীর্ঘ ও জটিল প্রক্রিয়া কাজ করে; এটি কোনো জাদুর কাঠির ছোঁয়ায় এক নিমেষে ঘটে যাওয়া কোনো ঘটনা নয়। পক্ষান্তরে, ‘কুন ফায়াকুন’ (হও, আর তা হয়ে গেল) তত্ত্বটিই হলো প্রকৃত অর্থে ‘এমনি এমনি’ হওয়ার দাবি, যেখানে কোনো প্রক্রিয়া বা মাধ্যম ছাড়াই ফলাফল দৃশ্যমান হয়।

দাবির তুলনামূলক বিশ্লেষণ: কে ‘এমনি এমনি’তে বিশ্বাসী?
বৈশিষ্ট্য ধর্মীয় দাবি (আস্তিক্যবাদ) বৈজ্ঞানিক অবস্থান (সংশয়বাদ/নাস্তিক্যবাদ)
সৃষ্টির প্রক্রিয়া ঐশ্বরিক আদেশ (কুন ফায়াকুন)। কোনো মধ্যবর্তী ভৌত ধাপ নেই। জটিল ভৌত ও রাসায়নিক প্রক্রিয়া। প্রতিটি ধাপের সুনির্দিষ্ট কারণ বিদ্যমান।
সময়ের প্রয়োজনীয়তা তাৎক্ষণিক বা মুহূর্তের মধ্যে (Instantaneous)। বিশাল সময়কাল (বিলিয়ন বছর), ধাপে ধাপে রূপান্তর।
প্রমাণ ও যুক্তি বিশ্বাস ও অলৌকিকতা। যুক্তির উর্ধ্বে ঐশ্বরিক ক্ষমতা। পর্যবেক্ষণযোগ্য তথ্য, গাণিতিক মডেল এবং পরীক্ষামূলক প্রমাণ।
‘এমনি এমনি’ তত্ত্ব হ্যাঁ, কারণ ইশ্বরের ইচ্ছাই এখানে যথেষ্ট, কোনো প্রাকৃতিক নিয়মের দরকার নেই। না, কারণ মহাবিশ্বের প্রতিটি ঘটনা পূর্ববর্তী শক্তির মিথস্ক্রিয়ার ফলাফল।

এই তুলনামূলক চিত্রটি পরিষ্কার করে যে, ‘এমনি এমনি’ হওয়ার ধারণাটি আসলে ধর্মীয় মিরাকলের মূল ভিত্তি। বিজ্ঞানের সীমাবদ্ধতা বা আমাদের বর্তমান অজ্ঞতাকে পুঁজি করে যারা নাস্তিকদের ওপর এই তকমা সেঁটে দিতে চান, তারা মূলত নিজেদের বিশ্বাসের অযৌক্তিকতাকেই আড়াল করার চেষ্টা করেন। [8] মহাবিশ্বের আদি কারণ আমাদের কাছে এখনো পুরোপুরি উন্মোচিত না হওয়ার অর্থ এই নয় যে সেটি কোনো ঐশ্বরিক জাদুমন্ত্রে ঘটে গেছে। বরং ইতিহাস আমাদের শিখিয়েছে যে, অতীতে যা কিছু ‘অলৌকিক’ বলে মনে করা হতো (যেমন—বজ্রপাত বা মহামারী), বিজ্ঞানের অগ্রযাত্রায় তার প্রতিটিই প্রাকৃতিক কারণ হিসেবে প্রমাণিত হয়েছে। [9]


অজ্ঞতার উপাসনালয় এবং ‘গড অফ দ্য গ্যাপস’

ধর্মতাত্ত্বিকদের একটি বড় কৌশল হলো বিজ্ঞানের সীমাবদ্ধতাকে ঈশ্বরের অস্তিত্বের প্রমাণ হিসেবে হাজির করা। মহাবিশ্বের উৎপত্তির একদম আদি মুহূর্ত বা ‘বিগ ব্যাং’-এর ঠিক আগের সেকেন্ডে কী ছিল, তা নিয়ে আধুনিক পদার্থবিজ্ঞান এখনো চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারেনি। এই ‘না জানা’র সুযোগ নিয়ে আস্তিকরা দাবি করেন, “যেহেতু বিজ্ঞান সব বলতে পারছে না, সেহেতু এখানে অবশ্যই একজন স্রষ্টা আছেন।” একে দর্শনের ভাষায় বলা হয় ‘God of the Gaps’ বা ‘শূন্যস্থানের ঈশ্বর’। যখনই বিজ্ঞানের কোনো নতুন আবিষ্কার কোনো একটি রহস্যের সমাধান করে, এই ঈশ্বর তখন পরবর্তী অজানা গর্তে গিয়ে আশ্রয় নেন। নাস্তিক বা সংশয়বাদীরা যখন বলেন “আমরা এখনো জানি না”, সেটি আসলে একটি সততাপূর্ণ বৈজ্ঞানিক অবস্থান। কোনো বিষয়ে নিশ্চিত প্রমাণ না থাকলে মনগড়া অলৌকিক কাহিনী দিয়ে সেই শূন্যস্থান পূরণ করা যুক্তিবাদীর কাজ নয়। আশ্চর্যের বিষয় হলো, যারা প্রশ্ন করেন “মহাবিশ্ব কি এমনি এমনি এসেছে?”, তারাই আবার কোনো প্রশ্ন ছাড়াই মেনে নেন যে আদমকে মাটি দিয়ে বানিয়ে ‘হও’ (কুন) বলতেই তিনি মানুষ হয়ে গেলেন, কিংবা কোনো জৈবিক প্রক্রিয়া ছাড়াই মেরির গর্ভে ঈসার জন্ম হলো। [10] এখানে কার্যকারণের কোনো ভৌত ব্যাখ্যা নেই, কোনো ধারাবাহিকতা নেই—পুরোটাই একটি ‘জাদুকরী ঘটনা’। অর্থাৎ, আস্তিকরা আসলে বিজ্ঞানের কাছে যে যৌক্তিক ব্যাখ্যা দাবি করেন, নিজেদের বিশ্বাসের ক্ষেত্রে তারা সেই যুক্তিকেই পুরোপুরি বিসর্জন দিয়ে ‘এমনি এমনি’র তত্ত্বে আশ্রয় নেন।

লজিক্যাল ফ্যালাসি স্পটলাইট: আর্গুমেন্ট ফ্রম ইগনোরেন্স (Argument from Ignorance)

এই কুযুক্তিটি তখন ঘটে যখন কেউ দাবি করে যে—যেহেতু একটি বিষয় ভুল প্রমাণিত হয়নি, তাই সেটি অবশ্যই সত্য; অথবা যেহেতু আমরা জানি না এটি কীভাবে ঘটেছে, তাই এটি অবশ্যই অলৌকিক বা ঈশ্বরপ্রদত্ত।


উদাহরণ:
  • “বিজ্ঞান কি প্রমাণ করতে পেরেছে প্রাণের স্পন্দন কীভাবে শুরু হলো? পারেনি। সুতরাং, প্রাণ ইশ্বরই দিয়েছেন।”
  • ভ্রান্তি: বিজ্ঞানের ‘অক্ষমতা’ কোনো অলৌকিক দাবির ‘সক্ষমতা’ প্রমাণ করে না। এটি কেবল আমাদের বর্তমান জ্ঞানের সীমাবদ্ধতা নির্দেশ করে।

বিপরীতে, নাস্তিকরা বিশ্বাস করেন যে মহাবিশ্বের প্রতিটি কণা এবং প্রতিটি মহাজাগতিক ঘটনা এক বা একাধিক ভৌত নিয়মের অধীন। এমনকি যদি আমরা মহাবিশ্বের আদি কারণ সম্পর্কে এখনো শতভাগ নিশ্চিত না হই, তাহলেও আমরা এটুকু অন্তত নিশ্চিতভাবে বলতে পারি যে রূপকথার গল্পের মতো কোনো দৈববাণীতে এটি সৃষ্টি হয়নি। কারণ, প্রকৃতিতে আমরা সবসময়ই দেখি যে জটিল গঠনগুলো সরলতর অবস্থা থেকে দীর্ঘ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বিবর্তিত হয়। কোনো কিছুই হঠাৎ করে পূর্ণাঙ্গ অবস্থায় ‘টপকে’ পড়ে না। তাই যখন কোনো আস্তিক বন্ধু প্রশ্ন করেন “সব কি এমনি এমনি হয়েছে?”, তখন আসলে তিনি তার নিজের ধর্মের মিরাকলগুলোকেই প্রশ্নবিদ্ধ করেন। কারণ বিজ্ঞান প্রমাণ ছাড়া কোনো কিছু স্বীকার করে না, আর ধর্ম প্রমাণ ছাড়াই ‘এমনি এমনি’ হয়ে যাওয়া অলৌকিকতায় বিশ্বাস স্থাপন করতে বাধ্য করে। [11]


মহাজাগতিক গোয়েন্দা ও ‘অজ্ঞতা’র যুক্তি

বিষয়টা খুব সহজে বোঝার জন্য চলুন একটা বিস্তারিত কাল্পনিক গল্প বলি। ধরুন, একটা অত্যন্ত দক্ষ, অভিজ্ঞ এবং নিরপেক্ষ গোয়েন্দাকে একটা রহস্যময় খুনের তদন্তের পুরো দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। ঘটনাস্থল একটা সম্পূর্ণ বদ্ধ ঘর। ভেতরে একটা লাশ পড়ে আছে। ঘরের দরজা-জানালা সব বন্ধ, কোনো ধস্তাধস্তির চিহ্ন নেই, কোনো আঙুলের ছাপ নেই, কোনো অস্ত্র বা বিষের বোতল পাওয়া যায়নি। ময়নাতদন্তের রিপোর্টে মৃত্যুর কোনো স্পষ্ট কারণও বের করা যায়নি—বিষক্রিয়া, শ্বাসরোধ, হার্ট অ্যাটাক, মাথায় আঘাত বা অন্য কোনো শারীরিক সমস্যা, কিছুই মিলছে না। গোয়েন্দা সবরকম আধুনিক যন্ত্রপাতি ব্যবহার করেছেন, ল্যাব টেস্ট করিয়েছেন, সাক্ষীদের জিজ্ঞাসাবাদ করেছেন, সিসিটিভি ফুটেজ চেক করেছেন, এমনকি ঘরের ধুলো-ময়লা পর্যন্ত পরীক্ষা করেছেন। কিন্তু এখনো কোনো ক্লু বা প্রমাণ হাতে আসেনি।

এখন প্রশ্ন হলো—এই গোয়েন্দার চূড়ান্ত রিপোর্টটা কেমন হওয়া উচিত? তিনি কি লিখবেন যে—

১. অদৃশ্য কারণের ভ্রান্তি “যেহেতু আমি কোনো খুনিকে খুঁজে পাইনি, তাই নিশ্চয়ই কোনো অদৃশ্য জ্বীন এসে লোকটাকে মেরে ফেলেছে”
২. অজানা প্রযুক্তির ভ্রান্তি “বিজ্ঞানের বর্তমান যন্ত্রপাতি দিয়ে মৃত্যুর কারণ বোঝা যাচ্ছে না, তাই কোনো এলিয়েন এসে তার অত্যাধুনিক প্রযুক্তি দিয়ে তাকে হত্যা করেছে”
৩. অতিপ্রাকৃত কারণের ভ্রান্তি “এমনি এমনি কেউ মরতে পারে না, আর আমি কোনো কারণ জানি না, তাই নিশ্চয়ই কোনো দেবতা অসন্তুষ্ট হয়ে তার প্রাণ কেড়ে নিয়েছেন”

নাকি সবচেয়ে যৌক্তিক, সৎ এবং বৈজ্ঞানিক রিপোর্ট হবে এটাই: “আমি এখন পর্যন্ত খুব নিবিড়ভাবে তদন্ত চালিয়েও মৃত্যুর সুনির্দিষ্ট কারণ বা কোনো খুনিকে শনাক্ত করতে পারিনি। আরও গভীর গবেষণা, নতুন প্রযুক্তি এবং অতিরিক্ত প্রমাণের প্রয়োজন আছে।”

যুক্তিবিদ্যার ভাষায় প্রথম তিনটি উত্তরকে বলা হয় ‘আর্গুমেন্ট ফ্রম ইগনোরেন্স’ বা ‘অজ্ঞতার যুক্তি’। অর্থাৎ, আমরা কোনো বিষয়ের ব্যাখ্যা এখনো জানি না বলেই সেই অজানা জায়গাটায় একটা অতিপ্রাকৃত, অদৃশ্য বা অলৌকিক শক্তিকে ঢুকিয়ে দিয়ে সিদ্ধান্ত টেনে ফেলা। এই একই ভুলের আরেক জনপ্রিয় নাম ‘গড অফ দ্য গ্যাপস’ বা ‘অজ্ঞতার ঈশ্বর’ তত্ত্ব। যখনই বিজ্ঞান বা যুক্তি কোনো প্রশ্নের উত্তর দিতে পারছে না, তখনই সেই ‘ফাঁক’ বা গ্যাপ-এ ঈশ্বরকে বসিয়ে দেওয়া হয়। কিন্তু বিজ্ঞান যত এগোয়, সেই ফাঁকগুলো একে একে ভরাট হয়ে যায়। ফলে ঈশ্বরকে প্রতিবারই আরও ছোট ছোট অজানা গর্তে সরে যেতে হয়।

এখানে আরও দুটি গুরুত্বপূর্ণ যুক্তি যোগ করা যাক। প্রথমত, বিখ্যাত দার্শনিক বার্ট্রান্ড রাসেলের ‘টিপট’ উদাহরণ [12]। রাসেল বলেছিলেন, ধরুন আমি দাবি করলাম যে পৃথিবী ও মঙ্গল গ্রহের মাঝে সূর্যের চারদিকে একটা চায়ের পট (টিপট) ঘুরছে। কিন্তু সেটা এত ছোট যে কোনো টেলিস্কোপেও দেখা যাবে না। এখন আপনি যদি বলেন, “প্রমাণ দেখাও”, তাহলে আমি বলব, “তুমি তো প্রমাণ করতে পারবে না যে সেটা নেই! তাই তুমি মেনে নাও যে আছে”। এটা কি যুক্তিসঙ্গত? একদম না। দাবিটা যতই অদ্ভুত বা অলৌকিক হোক, প্রমাণ দেওয়ার দায়িত্ব দাবিকারীর। অন্যের ওপর ‘অস্বীকার করার’ দায়িত্ব চাপানো যায় না। ঠিক তেমনি, “আমরা মহাবিশ্বের উৎপত্তি বা জীবনের জটিলতা পুরোপুরি ব্যাখ্যা করতে পারছি না, তাই ঈশ্বর আছেন”—এই দাবিটাও রাসেলের টিপটের মতোই। প্রমাণের বোঝা আস্তিকের ওপর, নাস্তিকের ওপর নয়।

দ্বিতীয়ত, বিখ্যাত বিজ্ঞানী কার্ল সাগানের কথা: “এক্সট্রা অর্ডিনারি ক্লেইমের জন্য এক্সট্রা অর্ডিনারি এভিডেন্স প্রয়োজন” (Extraordinary claims require extraordinary evidence)। ঈশ্বরের অস্তিত্ব বা অতিপ্রাকৃত সৃষ্টিকর্তার দাবিটা একটা অসাধারণ (extraordinary) দাবি। এর জন্য সাধারণ যুক্তি বা “আমরা জানি না তাই ঈশ্বর” এমন অজ্ঞতার দোহাই চলে না। এর জন্য অসাধারণ, অকাট্য, পরীক্ষাযোগ্য প্রমাণ দরকার। শুধু “বিজ্ঞান এখনো ব্যাখ্যা করতে পারেনি” বলে অলৌকিক সত্তাকে ঢুকিয়ে দেওয়া যায় না।

একজন সৎ গোয়েন্দা বা একজন সত্যিকারের বিজ্ঞানী কখনোই নিজের অজ্ঞতাকে লুকানোর জন্য অলৌকিক কোনো কাহিনী তৈরি করেন না। “আমি এখনো জানি না”—এই স্বীকারোক্তিটা আসলে খুব বড় বুদ্ধিমত্তা, সততা এবং বৈজ্ঞানিক মনোভাবের পরিচয়। কিন্তু “আমি জানি না, তাই নিশ্চয়ই এটা ঈশ্বর বা কোনো অতিপ্রাকৃত শক্তির কাজ”—এটা বলাটা একেবারেই অবৈজ্ঞানিক, অযৌক্তিক এবং হাস্যকর। জগতের জটিলতা দেখে যখন কেউ বলেন, “সবকিছু এমনি এমনি হতে পারে না, তাই একজন সৃষ্টিকর্তা নিশ্চয়ই আছেন”, তখন তিনি ঠিক সেই গোয়েন্দার মতোই ভুল করছেন—যিনি কোনো ক্লু না পেয়ে খুনের দায় জ্বীন-পরী, এলিয়েন বা দেবতার ঘাড়ে চাপিয়ে দিচ্ছেন।

তথ্যের অভাব মানে কখনোই অলৌকিকতার উপস্থিতি নয়। বরং সেটা আমাদের আরও গভীর, আরও নিরপেক্ষ, আরও বস্তুনিষ্ঠ গবেষণা করার জন্য সংকেত দেয়। বিজ্ঞানের ইতিহাসে বারবার দেখা গেছে যে, যেখানে একসময় অজ্ঞতা ছিল, সেখানে পরে প্রাকৃতিক, বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা পাওয়া গেছে। তাই অজ্ঞতাকে ঈশ্বরের প্রমাণ বানানোর পরিবর্তে আমাদের উচিত সেই অজ্ঞতাকে স্বীকার করে আরও এগিয়ে যাওয়া। এটাই যুক্তিবাদী মানসিকতা এবং সত্যনিষ্ঠার পথ।


উপসংহারঃ যৌক্তিক সততা বনাম অলৌকিক কুহক

পরিশেষে এটি স্পষ্ট যে, আস্তিক্যবাদের মূল ভিত্তিই দাঁড়িয়ে আছে ‘প্রক্রিয়াহীন উদ্ভব’ বা তথাকথিত ‘এমনি এমনি’ হয়ে যাওয়ার ওপর। যখন একজন বিশ্বাসী দাবি করেন যে মহাবিশ্ব বা জীবন কোনো দীর্ঘ বিবর্তনীয় বা ভৌত প্রক্রিয়া ছাড়াই স্রেফ একটি দৈব বাণীর (কুন) মাধ্যমে অস্তিত্বে এসেছে, তখন তিনি আসলে কার্যকরণবাদের (Causality) কফিনে শেষ পেরেকটি ঠুকে দেন। বিপরীতে, একজন সংশয়বাদী বা নাস্তিক যখন মহাবিশ্বের আদি কারণ সম্পর্কে ‘জানি না’ বলেন, তখন তিনি মূলত বৈজ্ঞানিক সততার পরিচয় দেন। এই ‘না জানা’ কোনো দুর্বলতা নয়, বরং এটিই নতুন জ্ঞান অন্বেষণের চালিকাশক্তি। আমরা যদি প্রাচীনকাল থেকে সব অজানাকে ‘আল্লাহর ইচ্ছা’ বা ‘মিরাকল’ বলে মেনে নিতাম, তবে আজ আমাদের হাতে বিদ্যুৎ, পেনিসিলিন কিংবা মহাকাশযানের মতো প্রযুক্তি থাকত না। কারণ মিরাকল বা অলৌকিকতা অনুসন্ধিৎসাকে থামিয়ে দেয়, আর বিজ্ঞান সেই অজানাকে জানার নিরন্তর প্রচেষ্টা চালিয়ে যায়। আস্তিকরা যখন প্রশ্ন করেন “সব কি এমনি এমনি হয়েছে?”, তারা আসলে নিজেদের বিশ্বাসের আয়নায় নিজেদেরই দেখছেন—যেখানে কোনো লজিক ছাড়াই মাটি থেকে মানুষ হয়, লাঠি থেকে সাপ হয় আর মুহূর্তেই বিশাল আকাশমন্ডলী তৈরি হয়ে যায়।

সংক্ষিপ্ত সারমর্ম: বৈজ্ঞানিক বাস্তবতা বনাম ধর্মীয় দাবি
  • 🔍 নাস্তিক্যবাদ ও বিজ্ঞান: দাবি করে যে প্রতিটি ঘটনার পেছনে একটি ভৌত ও পর্যবেক্ষণযোগ্য কারণ রয়েছে। কোনো কিছুই শূন্য থেকে বা কারণ ছাড়া (Spontaneously without cause) ঘটে না।
  • ✨ আস্তিক্যবাদ ও ধর্ম: দাবি করে যে ঈশ্বর চাইলে কোনো মাধ্যম বা কারণ ছাড়াই (Miraculously) যেকোনো কিছু ঘটাতে পারেন। এটিই হলো প্রকৃত অর্থে ‘এমনি এমনি’ ঘটার তত্ত্ব।
  • 📉 আর্গুমেন্ট ফ্রম ইগনোরেন্স: মানুষের জ্ঞানের বর্তমান সীমাবদ্ধতাকে ঈশ্বরের অস্তিত্বের প্রমাণ হিসেবে ব্যবহার করা একটি বিশাল যৌক্তিক ত্রুটি।
  • 💡 চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত: মহাবিশ্বের জটিলতা কোনো জাদুকরী ‘কুন ফায়াকুন’-এর প্রমাণ নয়, বরং এটি আমাদের মহাবিশ্বের গভীরতর ও আরও রহস্যময় ভৌত নিয়মগুলোকে খুঁজে বের করার আহ্বান জানায়।

কাজেই, ‘এমনি এমনি সব হয়ে যাওয়া’র যে অপবাদ নাস্তিকদের ওপর চাপানো হয়, তা মূলত একটি প্রক্ষেপণ (Projection)। সংশয়বাদীরা মহাবিশ্বের শৃঙ্খলাকে কোনো জাদুর ফল মনে করেন না, বরং তারা একে দেখেন কোটি কোটি বছরের প্রাকৃতিক মিথস্ক্রিয়া এবং জটিল ভৌত শক্তির ফলাফল হিসেবে। আমরা রূপকথার গল্পের ‘হয়ে যাও’ তত্ত্বে সন্তুষ্ট নই; আমরা জানতে চাই ‘কীভাবে হলো’। আর এই ‘কীভাবে’র উত্তর খোঁজার পথেই লুকিয়ে আছে মানব সভ্যতার প্রকৃত প্রগতি। [13] সুতরাং, মহাবিশ্ব যে কোনো জাদুমন্ত্রে বা ‘এমনি এমনি’ সৃষ্টি হয়নি, তা প্রমাণের জন্য বিজ্ঞানের জয়যাত্রাই যথেষ্ট—পক্ষান্তরে ধর্মগ্রন্থের মিরাকলগুলোই হলো ‘এমনি এমনি’ হওয়ার সবচেয়ে বড় এবং অবৈজ্ঞানিক দাবি। [14]


তথ্যসূত্রঃ
  1. ইবনে ওয়ারাক, “Why I Am Not a Muslim,” প্রমিথিউস বুকস, ১৯৯৫ ↩︎
  2. সূরা বাকারা, আয়াত ১১৭ ↩︎
  3. তাফসীরে জালালাইন, প্রথম খণ্ড, পৃষ্ঠা ২৯৮, ২৯৯ ↩︎
  4. সূরা ইমরান, আয়াত ৫৯ ↩︎
  5. সূরা আল-আরাফ, আয়াত ১০৭ ↩︎
  6. সূরা আল-ইমরান, আয়াত ৪৯ ↩︎
  7. সূরা আল-ক্বামার, আয়াত ১ ↩︎
  8. Richard Dawkins, “The God Delusion,” Bantam Press, 2006 ↩︎
  9. Victor J. Stenger, “God: The Failed Hypothesis,” Prometheus Books, 2007 ↩︎
  10. সূরা আল-ইমরান, আয়াত ৫৯ ↩︎
  11. Christopher Hitchens, “God Is Not Great: How Religion Poisons Everything,” Twelve, 2007 ↩︎
  12. রাসেলের মহাজাগতিক চায়ের কেতলিঃ ঈশ্বরতত্ত্বের বিরুদ্ধে অব্যর্থ মারণাস্ত্র ↩︎
  13. Richard Dawkins, “The Blind Watchmaker,” W.W. Norton & Company, 1986 ↩︎
  14. David Hume, “An Enquiry Concerning Human Understanding,” 1748 ↩︎