ইসলাম অনুসারে বন্ধ্যা নারীদের বিয়ে করা নিষেধ

ভূমিকা

কোরআনের অনেক আয়াত এবং অনেক হাদিস, একই সাথে ইসলামী শরীয়া আইনে নারীর প্রতি যে দৃষ্টিভঙ্গি প্রকাশিত হয়েছে, তা আধুনিক সমাজের নারী অধিকার এবং মানবাধিকারের মৌলিক নীতির পরিপন্থী। ইসলামে নারীর ভূমিকা, তাদের অবস্থান, এবং পুরুষদের সাথে তাদের সম্পর্ককে অনেক ক্ষেত্রেই অত্যন্ত হেয়ভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে। এর মধ্যে একটি হচ্ছে, হাদিসে বর্ণিত আছে নবী মুহাম্মদ বন্ধ্যা নারীদের বিয়ে করতে নিষেধ করেছিলেন, কারণ তারা সন্তান জন্মদানে সক্ষম নয়। এই হাদিসগুলো নারীদেরকে শুধুমাত্র সন্তান জন্মদানের একটি মেশিন হিসেবে বিবেচনা করে, যা তাদের প্রকৃত সক্ষমতা, মূল্যবোধ এবং স্বাধীনতা খর্ব করে। এই প্রবন্ধটিতে আমরা এই হাদিসের বৈষম্যমূলক দৃষ্টিভঙ্গি এবং এর মাধ্যমে নারীর প্রতি যে অপমান এবং অসম্মান করা হয়েছে, তা নিয়ে আলোচনা করবো এবং কেন এই ধরনের দৃষ্টিভঙ্গি নারীর মৌলিক অধিকার এবং সম্মানের পরিপন্থী, তা বিশ্লেষণ করবো।


নারীর ভূমিকাঃ সন্তান জন্মদানের মেশিন?

ইসলামী শাস্ত্রীয় ভাষ্যে নারীর মর্যাদা ও গ্রহণযোগ্যতা অনেকাংশেই তার প্রজনন সক্ষমতার ওপর নির্ভরশীল করে তোলা হয়েছে, যা তাকে মূলত একটি প্রজনন যন্ত্রের সমতুল্য করে তোলে। হাদিসের নির্দেশনা পর্যালোচনায় দেখা যায়, বন্ধ্যা নারীদের বিবাহে নিরুৎসাহিত করার মধ্য দিয়ে তাদের ব্যক্তিগত গুণাবলী বা মানবিক মর্যাদাকে গৌণ এবং প্রজনন উপযোগিতাকে মুখ্য হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। সেই কারণে নবী মুহাম্মদ বন্ধ্যা নারীদের বিবাহ করতে নিষেধ করতে গেছেন। নারীর জন্য যা অত্যন্ত অবমাননাকর।

সূনান নাসাঈ (ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
২৬/ নিকাহ (বিবাহ)
পরিচ্ছেদঃ ১১. বন্ধ্যা নারীকে বিবাহ করা অনুচিত
৩২৩০. আব্দুর রহমান ইবন খালিদ (রহঃ) … মা’কাল ইবন ইয়াসার (রাঃ) বলেন, এক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর খেদমতে আরয করলোঃ আমি এমন এক মহিলার সন্ধান পেয়েছি, যে বংশ গৌরবের অধিকারিণী ও মর্যাদাবান, কিন্তু সে বন্ধ্যা, আমি কি তাকে বিবাহ করবো? তিনি তাকে নিষেধ করলেন। দ্বিতীয় দিন তাঁর নিকট আসলে তিনি নিষেধ করলেন। এরপর তৃতীয় দিন তাঁর খেদমতে আসলে তিনি তাকে নিষেধ করলেন এবং বললেনঃ তোমরা অধিক সন্তান প্রসবা নারীকে বিবাহ করবে, যে তোমাদেরকে ভালবাসবে। কেননা, আমি তোমাদের দ্বারা সংখ্যাধিক্য লাভ করবো।
তাহক্বীকঃ হাসান। ইরওয়া ১৭৮৪, আদাবুয যিফাফ ১৬, সহীহ আবু দাউদ ১৭৮৯।
হাদিসের মানঃ হাসান (Hasan)
বর্ণনাকারীঃ মা‘ক্বিল ইবনু ইয়াসার (রাঃ)

সুনান আবূ দাউদ (তাহকিককৃত)
৬/ বিবাহ
পরিচ্ছেদঃ ৪. যে মহিলা সন্তান দিতে অক্ষম তাকে বিয়ে করা নিষেধ সম্পর্কে
২০৫০। মা‘কিল ইবনু ইয়াসার (রাযি.) সূত্রে বর্ণিত। তিনি বলেন, এক ব্যক্তি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর খিদমাতে উপস্থিত হয়ে বললো, আমি এক সুন্দরী ও মর্যাদা সম্পন্ন নারীর সন্ধান পেয়েছি। কিন্তু সে বন্ধ্যা। আমি কি তাকে বিয়ে করবো? তিনি বললেনঃ না। অতঃপর লোকটি দ্বিতীয়বার এসেও তাঁকে জিজ্ঞেস করলে তিনি তাকে নিষেধ করলেন। লোকটি তৃতীয়বার তাঁর নিকট এলে তিনি তাকে বললেনঃ এমন নারীকে বিয়ে করে যে, প্রেমময়ী এবং অধিক সন্তান প্রসবকারী। কেননা আমি অন্যান্য উম্মাতের কাছে তোমাদের সংখ্যাঘিধক্যের কারণে গর্ব করবো।(1)
হাসান সহীহ।
(1). নাসায়ী।
হাদিসের মানঃ হাসান (Hasan)
বর্ণনাকারীঃ মা‘ক্বিল ইবনু ইয়াসার (রাঃ)

অর্থাৎ, ইসলামে নারীর প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি তাদের সন্তান জন্মদানের ক্ষমতার ওপর ভিত্তি করে নির্ধারণ করা হয়েছে। পুরুষতান্ত্রিক সমাজের এই প্রথাগত চিন্তাধারায় নারীদের ভূমিকা শুধুমাত্র সন্তান জন্মদান এবং পুরুষের যৌনসঙ্গী হওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। এই হাদিসে এর কারণ হিসেবে বলা হয়েছে, বন্ধ্যা নারী সন্তান জন্ম দিতে পারেন না, তাই তাদের মূল্য কম। এই দৃষ্টিভঙ্গি নারীদের প্রতি একধরনের গভীর অপমান এবং বৈষম্যের উদাহরণ। একটি সমাজ যখন নারীর মূল্যায়ন শুধুমাত্র তার সন্তান জন্মদানের ক্ষমতার ওপর ভিত্তি করে করে, তখন সেই সমাজের মূল্যবোধ এবং নারীর প্রতি দৃষ্টিভঙ্গির অবক্ষয় ঘটে। এটি প্রমাণ করে যে, নারীকে একটি পূর্ণাঙ্গ ব্যক্তি হিসেবে নয় বরং সন্তান জন্মদানের যন্ত্র হিসেবে দেখা হয়, যা তার স্বকীয়তা, মর্যাদা এবং স্বাধীনতাকে চরমভাবে খর্ব করে।


আলেমদের বক্তব্যঃ বন্ধ্যা নারী বিবাহ নিরুৎসাহিত

আসুন এই বিষয়ে আলেমদের বক্তব্য শুনি,


নবীর নিজ স্ত্রীকে বন্ধ্যা বলে দুর্ব্যবহার

একজন স্ত্রী যখন সন্তান জন্ম দিতে পারেন না, সমাজে তিনি নানাভাবে অপমানিত এবং অপদস্থ হন এই কারণে। সমাজে তাকে বন্ধ্যা নারী বলে টিটকারি দেয়া হয়, তাকে এই ধরণের শব্দাবলী ব্যবহার করে অপমানিত করা হয়। যেন সন্তান জন্ম দিতে না পারলেই একজন নারীর আর কোন মূল্য নেই! তার জন্য সবচাইতে অপমানজনক এবং অসম্মানজনক গালিই হচ্ছে বন্ধ্যা বলে ডাকা। একজন সন্তানহীন নারীকে কোন মানবিক মানুষই এই কথাটি মনে করিয়ে দেন না। অথচ, নবী নিজেই তার স্ত্রীকে এই নিয়ে খোটা দিতেন, অপমান ও তুচ্ছ করে কথা বলতেন, গালি দিতেন [1] [2] [3]

সহীহ মুসলিম (ইফাঃ)
অধ্যায়ঃ ১৬/ হাজ্জ
পরিচ্ছদঃ ৬৪. বিদায়ী তাওয়াফ বাধ্যতামুলক কিন্তু ঋতুমতী মহিলার ক্ষেত্রে তা পরিত্যাজ্য
৩০৯৮। মুহাম্মাদ ইবনুল মুসান্না, ইবনু বাশশার ও উবায়দুল্লাহ ইবনু মু’আয (রহঃ) … হাকাম ইবরাহীম থেকে, তিনি আসওয়াদ থেকে এবং তিনি আয়িশা (রাঃ) থেকে বর্ণনা করেন যে, তিনি বলেন,নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন রওনা হওয়ার ইচ্ছা করলেন, তখন সাফিয়্যাকে তাঁর তাঁবুর দরজায় চিন্তিতা ও অবসাদগ্রস্তা দেখতে পেলেন। তিনি বললেনঃ বন্ধ্যা, নেড়ি! তুমি আমাদের (এখানে) আটকে রাখবে? তিনি পুনরায় তাকে বললেনঃ তুমি কি কুরবানীর দিন (বায়তুল্লাহ) যিয়ারত করেছ? তিনি বললেন, হ্যাঁ। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ তাহলে রওনা হও।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)

সুনানে ইবনে মাজাহ
তাওহীদ পাবলিকেশন
অধ্যায়ঃ ১৯/ হজ্জ
পরিচ্ছদঃ ১৯/৮৩. ঋতুবতী স্ত্রীলোক বিদায়ী তাওয়াফ না করে প্রস্থান করতে পারে
২/৩০৭৩। আয়েশা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাফিয়্যা (রাঃ) সম্পর্কে জানতে চাইলে আমরা বললাম, সে ঋতুবতী হয়েছে। তিনি বলেনঃ বন্ধ্যা, ন্যাড়া, সে তো আমাদের আটকে ফেলেছে। আমি বললাম, ইয়া রাসূলাল্লাহ! তিনি কোরবানীর দিন তাওয়াফ করেছেন। তিনি বলেনঃ তাহলে অসুবিধা নেই। তোমরা তাকে রওনা হতে বলো।
সহীহুল বুখারী ৩২৮, ১৫৬১, ১৭৩৩, ১৭৫৭, ১৭৬২, ১৭৭২, ৪৪০১, ৫৩২৯, ৬১৫৭, ৭২২৯, মুসলিম ১২১১, তিরমিযী ৯৪৩, নাসায়ী ৩৯১, আবূ দাউদ ২০০৩, আহমাদ ২৩৫৮১, ২৩৫৮৯, ২৪০০৪, ২৪০৩৭, ২৪১৫৩, ২৪৩৮৫, ২৪৭৮১, ২৪৮৯৭, ২৪৯১৪, ২৪৯৯১, ২৫০৭৫, ২৫১৩৪, ২৫১৯৩, ২৫২৪৯, ২৫৩৪৭,২৫৪১৩, ২৫৬২৮, মুয়াত্তা মালেক ৯৪৩, ৯৪৫, দারেমী ৯৪২, ১৯১৭, ইরওয়া ৪/২৬১। তাহকীক আলবানীঃ সহীহ।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)

বন্ধ্যা

নারীর সম্মান ও মূল্যবোধের অবমাননা

এই হাদিসটি নারীকে শুধুমাত্র তার শারীরিক ক্ষমতার ওপর নির্ভর করে মূল্যায়ন করে, যা অত্যন্ত অবমাননাকর এবং বৈষম্যমূলক। নারীর মূল্য কেবল তার সন্তান জন্মদানের ক্ষমতার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। একটি নারী শিক্ষিত, বুদ্ধিমতী, সৃজনশীল এবং তার নিজের অধিকারে মূল্যবান। সন্তান জন্মদান একটি নারীর জীবনের একটি অংশ হতে পারে, কিন্তু এটি তার সম্পূর্ণতা নয়। এই হাদিস নারীদেরকে সামাজিক, অর্থনৈতিক, এবং বুদ্ধিবৃত্তিক ক্ষেত্রে অবমূল্যায়িত করে, এবং তাদেরকে শুধু রান্নাবান্না ও প্রজননের দায়িত্বে সীমাবদ্ধ করে রাখে। এভাবে নারীর ক্ষমতা, মর্যাদা, এবং অধিকারকে অগ্রাহ্য করা হয়, যা আধুনিক নারী অধিকারের নীতির সম্পূর্ণ বিপরীত। নারীর সক্ষমতা এবং মূল্যকে সন্তান জন্মদানের ক্ষমতা দ্বারা সীমাবদ্ধ করা নারীর প্রতি অবমাননা এবং অসম্মান।


সামাজিক প্রভাবঃ নারীর প্রতি বৈষম্য ও অসম্মান

এই ধরনের হাদিসের কারণে অনেক সমাজে নারীরা তাদের প্রকৃত অধিকার এবং মর্যাদার স্বীকৃতি পায় না। অনেক ক্ষেত্রে বন্ধ্যা নারী বা যারা সন্তান জন্ম দিতে সক্ষম নয়, তারা পরিবার এবং সমাজের চাপে হেয় প্রতিপন্ন হয় এবং তাদেরকে পুরুষদের দয়ার ওপর নির্ভর করে বেঁচে থাকতে হয়। এমনকি অনেক পুরুষ এই হাদিসকে ভিত্তি করে তাদের স্ত্রীর প্রতি দুর্ব্যবহার করেন এবং তাদের ছেড়ে অন্য নারীকে বিয়ে করেন, শুধুমাত্র সন্তান জন্মদানের উদ্দেশ্যে। পারিবারিক সহিংসতার শিকার অনেক নারীই অভিযোগ করেছে, স্বামী এবং স্বামীর পরিবারের সদস্যগণ তাদের প্রতি সহিংস হয়েছেন শুধুমাত্র এই কারণে যে, তারা সন্তান জন্ম দিতে সক্ষম নন। এই ধরনের বৈষম্যমূলক মনোভাব নারীর আত্মবিশ্বাস এবং মর্যাদাকে ক্ষুণ্ণ করে। একজন নারীকে শুধুমাত্র সন্তান জন্মদানের মেশিন হিসেবে দেখা হলে, তার ব্যক্তিত্ব এবং মানসিকতার প্রতি বড় ধরণের অসম্মান প্রদর্শন করা হয়। সমাজের এই দৃষ্টিভঙ্গি নারীর মানসিক স্বাস্থ্যকেও বিপর্যস্ত করে এবং তাকে সামাজিকভাবে প্রান্তিক করে তোলে।


নবী মুহাম্মদের নিজস্ব প্রজনন ক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন

নবী মুহাম্মদ যেহেতু নিজেই অন্য নারীর প্রজনন ক্ষমতার ওপর ভিত্তি করে কোন নারীকে বিবাহ করা যাবে কি যাবে না, এরকম পরামর্শ দিতেন, সেহেতু নবী মুহাম্মদের নিজের প্রজনন ক্ষমতা নিয়েও তাই প্রশ্ন তোলা অন্যায় নয়। ইসলামী সূত্রগুলো অনুসারে, মুহাম্মদের প্রথম স্ত্রী খাদিজা বিনতে খুয়াইলিদের সাথে তার ছয় থেকে সাতটি সন্তান হয়েছিল: তিনটি ছেলে (কাসিম, আব্দুল্লাহ, এবং কিছু সূত্রে তায়িব বা তাহির) এবং চারটি মেয়ে (জায়নাব, রুকাইয়া, উম্ম কুলসুম, এবং ফাতিমা)। খাদিজার মৃত্যুর পর (খ্রিষ্টাব্দ ৬১৯ সালের দিকে), মুহাম্মদ কমপক্ষে ১১ জন স্ত্রী এবং কয়েকজন দাসী (কনকুবাইন) নিয়েছিলেন, কিন্তু এদের মধ্যে শুধুমাত্র মারিয়া আল-কিবতিয়া (যিনি একজন কপটিক খ্রিষ্টান দাসী ছিলেন) থেকে একটি ছেলে ইব্রাহিমের জন্ম হয় (খ্রিষ্টাব্দ ৬৩০ সালে), যে শিশুকালে (১৮ মাস বয়সে) মারা যায়। অন্য কোনো স্ত্রী বা দাসীর গর্ভে তার আর কোনো সন্তান হয়নি, যা তার পরবর্তী জীবনে প্রজনন ক্ষমতার অভাব নির্দেশ করতে পারে। আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞানের দৃষ্টিকোণ থেকে, এমন একাধিক যৌন সঙ্গিনী থাকা সত্ত্বেও সন্তান না হওয়া পুরুষের ইনফার্টিলিটি (যেমন লো স্পার্ম কাউন্ট বা অন্যান্য শারীরিক সমস্যা) এর লক্ষণ হতে পারে, যদিও সপ্তম শতাব্দীর এই ঘটনার কোন মেডিকাল প্রমাণ আমাদের কাছে নেই—এটি শুধুমাত্র যুক্তিভিত্তিক অনুমান।

এছাড়া, ইসলামী ঐতিহাসিক বর্ণনায় উল্লেখ আছে যে, মুহাম্মদের স্ত্রী আয়িশা ইব্রাহিমকে দেখে বলেছিলেন যে শিশুটির চেহারায় মুহাম্মদের সাথে কোনো মিল নেই। এই মন্তব্যটি আয়িশার ঈর্ষা থেকে উদ্ভূত হতে পারে, কারণ মারিয়া অন্য স্ত্রীদের মতো নয়—তিনি একজন দাসী ছিলেন এবং তার গর্ভে সন্তান হওয়ায় অন্য স্ত্রীদের মধ্যে অসন্তোষ দেখা দিয়েছিল। তবে এই বক্তব্য থেকে অনুমান করা যায় যে মুহাম্মদের স্ত্রীরা তার প্রজনন ক্ষমতা নিয়ে সচেতন বা সন্দিহান ছিলেন, কারণ অন্য কোনো স্ত্রীর গর্ভে সন্তান না হওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে ইব্রাহিমের পিতৃত্ব নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। এটি বিভিন্ন ঐতিহাসিক বর্ণনায় পাওয়া যায়, যেখানে মুহাম্মদ নিজে আয়িশাকে শিশুটির সাথে তার মিল দেখাতে চেয়েছিলেন, কিন্তু আয়িশা তা অস্বীকার করেন। এই ঘটনা মুহাম্মদের জীবনের শেষের দিকের (খ্রিষ্টাব্দ ৬৩০-৬৩২), যখন তার বয়স ৫৯-৬২ বছরের মধ্যে ছিল, এবং বয়সজনিত কারণে প্রজনন ক্ষমতা হ্রাস পাওয়া যুক্তিসঙ্গত [4]

অবশেষে জিবরীল (আ) আগমন করলেন এবং বললেন,- السلام عليك يا أبا ابراهیم ‘ইবরাহীমের পিতা! আপনাকে সালাম! আবূ নু’আয়ম (র) বলেছেন, আবদুল্লাহ ইব্‌ন মুহাম্মদ আইশা (রা) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, মুকাওকিস নামে অভিহিত জনৈক সেনাপতি ও রাজা মারিয়া নাম্নী এক কুমারী কিবতী রাজকন্যাকে উপহার পাঠালেন এবং তাঁর সংগে তাঁর এক যুবা বয়সী চাচাত ভাইকেও উপহারের অন্তর্ভুক্ত করে পাঠালেন। রাসূলুল্লাহ (সা) তাঁর সংগে নিভৃত বাসে মিলিত হতেন। একদিন গিয়ে তিনি দেখতে পেলেন যে, তিনি (ইবরাহীমকে) গর্ভে ধারণ করেছেন। আইশা (রা) বলেন, তাঁর গর্ভ দৃশ্যমান হয়ে উঠল। সে তাতে অস্থির হয়ে পড়ল। রাসূলুল্লাহ (সা) নিরবতা অবলম্বন করলেন। পরে তার স্তনে দুধ হচ্ছিল না। তখন তার জন্য একটি দুধেল মেষ খরিদ করা হল। যা দিয়ে শিশুর খাদ্যের ব্যবস্থা করা হত। তাতে তার দেহ সুগঠিত হল এবং বর্ণও সুন্দর ও সুশ্রী হল। একদিন সে সন্তানটিকে কাঁধে করে নবী করীম )সা)-এর নিকট নিয়ে এল। নবী করীম (সা) বললেন, يا عائشة كيف ترين الشبه আইশা চেহারার সাদৃশ্যতা দেখে কেমন মনে হচ্ছে?’ তখন আমি এবং অন্যরা বললাম, ‘বিশেষ কোন সাদৃশ্য দেখছি না।’ তিনি বললেন, ولا اللحم আর দেহ ও গোশতের ব্যাপারটিও নয়? আমি বললাম, আমার জীবনের দোহাই! মেষের দুধে প্রতিপালিত হলে তার গোশত তো সুন্দর হবেই।

বন্ধ্যা 1

শুধু আয়িশার মনেই যে এই সন্দেহ ছিল তা নয়। মারিয়ার সন্তান ইব্রাহিমের পিতা কে, এই নিয়ে সন্দেহ ছিল খোদ নবীর মনেও। পরে নাকি জিব্রাইল এসে নবীকে বলে দেয়, এই বাচ্চাটি নবীরই বাচ্চা! অর্থাৎ ইসলামের দলিল থেকেই জানা যায়, খোদ নবীর মনেও এই নিয়ে সন্দেহ ছিল [5]

আর ইবরাহীম (রা) জন্মগ্রহণ করেছিলেন মারিয়া কিবতী (রা)-এর গর্ভে (পূর্ব বর্ণনা দ্রবষ্ট্য)। তাঁর জন্ম হয়েছিল অষ্টম হিজরীর জিলহজ্জ মাসে। ইব্‌ন লাহী’মা (র) প্রমুখ সূত্রে আবদুর রহমান ইবন যিয়াদ ইবরাহীম (রা)-এর আগমন ঘটলে জিবরীল (আ) আগমন করে বললেন,
السلام عليكم يا ابا ابراهيم – ان الله وهب لك غلاما من ام ولدك مارية وامرك ان لسميه ابراهيم فبارك الله لك فيه وجعله قرة عين لك في الدنيا والآخرة
“আসসালামু আলাইকা ইয়া আবা ইবরাহীম! আল্লাহ আপনাকে আপনার বাঁদী-পত্নীর ঘরে একটি পুত্র সন্তান দান করেছেন। তার নাম ইবরাহীম রাখার জন্য আপনাকে হুকুম দিয়েছেন। আল্লাহ আপনাকে তাতে বরকত দান করুন এবং আল্লাহ দুনিয়া ও আখিরাতে তাঁকে আপনার ‘নয়ন মণি’ করুন।”
হাফিয আবূ বকর আল বাযযার (র) রিওয়ায়াত করেন। মুহাম্মদ ইব্‌ন মিসকীন (র)…. আমাস (রা) থেকে। তিনি বলেন, নবী করীম (সা)-এর পুত্র ইবরাহীমের জন্ম হলে তার ব্যাপারে নবী করীম (সা)-এর মনে কিছু দ্বিধার উদ্রেক হল। তখন জিবরীল (আ) তাঁর নিকট আগমন করে বললেন, আসসালামু আলায়কা ইয়া আবা ইবরাহীম!

বন্ধ্যা 3

এবারে আসুন সহিহ মুসলিম শরীফ থেকে আরেকটি হাদিস পড়ে নিই। এই হাদিস থেকে জানা যায়, নবী মুহাম্মদের উম্মে ওয়ালাদ বা মারিয়া কিবতিয়ার সাথে এক ব্যক্তির যৌন সম্পর্কের অভিযোগ শুনেই নবী মুহাম্মদ কোন বিচার আচার সাক্ষী সাবুদের তোয়াক্কা না করে হযরত আলীকে পাঠায় সেই ব্যক্তিকে খুন করে আসার জন্য। অথচ ইসলামী শরীয়তের বিধান হচ্ছে, ব্যাভিচারের জন্য চারজন পুরুষ সাক্ষীর সাক্ষ্য দিতে হয় যে, যারা সুরমা দানীর মধ্যে সুরমা শলাকা যেভাবে প্রবেশ করে সেইভাবে ব্যভিচারের ঘটনা প্রত্যক্ষ করেছে [6]। অথচ মারিয়া কিবতিয়ার সাথে আরেক লোকের সম্পর্ক আছে, এরকম শুনেই নবী তাকে খুন করার জন্য মরিয়া হয়ে ওঠে। এ থেকে পরিষ্কার হয়, মারিয়া কিবতিয়াকে নিয়ে খোদ নবীর মনেও নানা সন্দেহ ছিল। নতুবা এরকম অভিযোগ শুনলে প্রথমেই একজন মানুষের প্রমাণ চাওয়ার কথা। ভেবে দেখুন, আপনার স্ত্রীর সাথে আরেকজন লোকের সম্পর্ক আছে, এরকম শোনামাত্রই আপনি সেই লোককে খুন করতে কেন লোক পাঠাবেন? যদি আগে থেকেই মনে সন্দেহ না থেকে থাকে? আর যদি সন্দেহ না থাকে, তাহলে প্রথমেই আপনি নিশ্চয়ই সাক্ষী প্রমাণ চাইবেন, তাই না? [7] [8]

সহীহ মুসলিম (ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
৫১/ তাওবা
পরিচ্ছেদঃ ১১. রাসুলুল্লাহ (ﷺ) এর হেরেম সন্দেহমুক্ত হওয়া
৬৭৬৬। যুহায়র ইবনু হারব (রহঃ) … আনাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর উম্মে ওয়ালাদের সাথে এক ব্যক্তির প্রতি অভিযোগ (অপবাদ) উত্থাপিত হয়। তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আলী (রাঃ) কে বললেন, যাও। তার গর্দান উড়িয়ে দাও। আলী (রাঃ) তার নিকট গিয়ে দেখলেন, সে কুপের মধ্যে শরীর শীতল করছে। আলী (রাঃ) তাকে বললেন, বেরিয়ে আস। সে আলী (রাঃ)এর দিকে হাত বাড়িয়ে দিল। তিনি তাকে বের করলেন এবং দেখলেন, তার পূরুষাঙ্গ কর্তিত, তার লিঙ্গ নেই। তখন আলী (রাঃ) তাকে হত্যা করা থেকে বিরত থাকলেন। তারপর তিনি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিকট এসে বললেন, ইয়া রাসুলাল্লাহ! সে তো লিঙ্গ কর্তিত তার তো লিঙ্গ নেই।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আনাস ইবনু মালিক (রাঃ)

বন্ধ্যা 5

যদি এই বর্ণনাগুলো সত্য হয়, তাহলে হাদিসে বন্ধ্যা নারীদের বিয়ে নিষেধ করার পরামর্শ (যেমন সুনান নাসাই ৩২২৭) মুহাম্মদের নিজস্ব অভিজ্ঞতার সাথে সাংঘর্ষিক, কারণ খাদিজার মৃত্যুর পরে নবী নিজেই বেশি সন্তান উৎপাদনে সক্ষম ছিলেন না, বা কোন বাচ্চাই উৎপাদনে সক্ষম ছিলেন না। কিন্তু লাগাতার একের পর এক বিবাহ করেছেন, দাসীও রেখেছেন। সেগুলো তিনি কেন করেছেন, এই প্রশ্ন তো উঠবেই। ইসলামিক বা রক্ষণশীল পুরুষতান্ত্রিক সমাজে অবশ্য পুরুষের সন্তান জন্মদানে অক্ষমতা বা ইনফার্টিলিটিকে উপেক্ষা করা হয়। আর নারীর ক্ষেত্রে অত্যন্ত অপমান এবং অবমাননামূলক দৃষ্টিভঙ্গি প্রকাশ করে।


আধুনিক ইসলামিক অ্যাপোলজিস্টদের জবাব

অনেক আধুনিক অ্যাপোলজিস্টরা দাবী করেন যে, নবী মুহাম্মদের এই বক্তব্যটি কোন কঠোর নিষেধাজ্ঞা নয়, এটি শুধুমাত্র একটি সাধারণ পরামর্শ। কিন্তু হাদিস থেকে কিন্তু এটি খুব সাধারণ পরামর্শ, তা মনে হয় না। তারপরেও যদি সেটি ধরে নিই, অর্থাৎ আধুনিক ইসলামিক অ্যাপোলজিস্টদের দাবি অনুসারে এটি যদি কোনো কঠোর নিষেধাজ্ঞা না হয়ে কেবল একটি পরামর্শও হয়ে থাকে, তবুও এই নিবন্ধের মূল যুক্তিটি অটুট থাকে। কারণ, পরামর্শের আড়ালেও এই বক্তব্যটি নবীর এক চরম পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতা এবং সামগ্রিকভাবে ইসলামের প্রজনন-কেন্দ্রিক মনস্তত্ত্বকে অত্যন্ত নগ্নভাবে প্রকাশ করে। কোনো ধর্মীয় নেতার পক্ষ থেকে যখন কোনো বিষয়কে ‘পরামর্শ’ হিসেবে প্রদান করা হয়, তখন তা অনুসারীদের জন্য একটি নৈতিক ও সামাজিক আদর্শ (Normative Ideal) হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়। এখানে বিবাহকে ব্যক্তিগত ভাল্পবাসা, আবেগ বা মানবিক সাহচর্যের পরিবর্তে একটি রাজনৈতিক ও জনতাত্ত্বিক হাতিয়ার হিসেবে দেখা হয়েছে, যেখানে নারীর একমাত্র সার্থকতা হলো সংখ্যাবৃদ্ধির মাধ্যমে উম্মাহর শক্তিবৃদ্ধি করা। এই ধরণের ‘পরামর্শ’ মুসলিম সমাজে বন্ধ্যা নারীদের প্রতি এক ধরণের কাঠামোগত অবজ্ঞা তৈরি করে এবং তাদের সামাজিকভাবে প্রান্তিক ও ‘ত্রুটিপূর্ণ’ মানুষ হিসেবে চিহ্নিত করতে প্রত্যক্ষ ভূমিকা পালন করে। ফলে এটি সরাসরি নিষেধাজ্ঞা হোক বা অনুপ্রেরণামূলক পরামর্শ—উভয় ক্ষেত্রেই এটি নারীকে কেবল একটি প্রজনন যন্ত্রে রূপান্তরিত করার পুরুষতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষাকেই বৈধতা দেয়।


উপসংহার

ইসলামের এইসকল হাদিসে নারীর প্রতি যে বৈষম্যমূলক দৃষ্টিভঙ্গি প্রকাশিত হয়েছে, তা আধুনিক সমাজের নারী অধিকার এবং মানবাধিকার নীতির পরিপন্থী। সন্তান জন্মদানের ক্ষমতা দ্বারা নারীর মূল্যায়ন করা শুধু বৈষম্যপূর্ণ নয়, এটি নারীর প্রতি চরম অবমাননা। নারীদেরকে তাদের প্রকৃত অবস্থানে মূল্যায়ন করতে হবে, যেখানে তারা সমাজের একটি পূর্ণাঙ্গ এবং সমান অধিকারভোগী মানুষ হিসেবে প্রতিষ্ঠা পাবে।

ধর্মের নামে নারীর প্রতি এই ধরনের বৈষম্য দূর করতে হলে প্রয়োজন সামাজিক এবং আইনগত পরিবর্তন। নারীদের সম্মান ও মর্যাদাকে পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করতে হবে, এবং তাদের মৌলিক অধিকার রক্ষার জন্য পুরুষতান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গিকে পরিবর্তন করতে হবে। নারীদেরকে সন্তান জন্মদানের মেশিন হিসেবে নয়, বরং পূর্ণাঙ্গ, স্বাধীন এবং সমান মর্যাদাসম্পন্ন মানুষ হিসেবে বিবেচনা করাই একটি আধুনিক ও মানবিক সমাজের মূল ভিত্তি হওয়া উচিত।


তথ্যসূত্রঃ
  1. সহীহ মুসলিম, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, হাদিসঃ ৩০৯৮ ↩︎
  2. সুনানে ইবনে মাজাহ, তাওহীদ পাবলিকেশন, হাদিসঃ ৩০৭৩ ↩︎
  3. সহীহ মুসলিম, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, তৃতীয় খণ্ড, পৃষ্ঠা ২৬৯, হাদিসঃ ৩০৯৮ ↩︎
  4. আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া, পঞ্চম খণ্ড, ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ, পৃষ্ঠা ৪৯৯ ↩︎
  5. আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া, পঞ্চম খণ্ড, ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ, পৃষ্ঠা ৫০৭ ↩︎
  6. ইসলামি শরিয়তে ধর্ষণের শাস্তি ↩︎
  7. সহীহ মুসলিম, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, হাদিসঃ ৬৭৬৬ ↩︎
  8. সহিহ মুসলিম, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, খণ্ড ৬, পৃষ্ঠা ২৮৫ ↩︎