
Table of Contents
- 1 ভূমিকাঃ উল্কাপিণ্ড থেকে জান্নাতের পাথর—একটি রূপান্তরের ইতিহাস
- 2 আলেমদের বক্তব্যঃ কালোপাথরটি সাক্ষ্য দিবে
- 3 হাদিসে হাজরে আসওয়াদঃ ইসলামি বিশ্বাসে একটি সচেতন সত্তা
- 4 পৌত্তলিক ঐতিহ্য এবং মুহাম্মদের আপসকামিতা
- 5 অলৌকিকত্বের দাবি বনাম বৈজ্ঞানিক বাস্তবতা
- 6 পাথরের ‘চেতনা’ ও পরকালীন সাক্ষীঃ এক চরম স্ববিরোধ
- 7 উপসংহারঃ একেশ্বরবাদের ছদ্মবেশে পৌত্তলিকতার উত্তরাধিকার
ভূমিকাঃ উল্কাপিণ্ড থেকে জান্নাতের পাথর—একটি রূপান্তরের ইতিহাস
হাজরে আসওয়াদ বা ‘কালো পাথর’ কেন্দ্রিক ইসলামী আখ্যানগুলো নিবিড়ভাবে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে, এটি মূলত একটি প্রাচীন উল্কাপিণ্ড (Meteorite), যাকে কেন্দ্র করে মধ্যযুগীয় আরবে অলৌকিকত্বের মোড়ক পরানো হয়েছে [1]। প্রাগৈতিহাসিক যুগে যখন বায়ুমণ্ডলে কোনো বড় উল্কা প্রবেশ করত, তখন ঘর্ষণের ফলে সৃষ্ট উজ্জ্বল আলোকচ্ছটা দেখে তৎকালীন সাধারণ মানুষের মনে হতো এটি কোনো অতিপ্রাকৃত বা স্বর্গীয় বস্তু। মাটিতে পড়ার পর এর পোড়া ও কালচে গঠন দেখে প্রাচীন আরবরা নানা অলৌকিক কেচ্ছাকাহিনী তৈরি করত, যা পরবর্তীকালে ইসলামী ধর্মতাত্ত্বে ‘জান্নাত থেকে আসা পাথর’ হিসেবে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পায় [2]।
মুসলিম বিশ্বাস অনুযায়ী, এই পাথরটি মানবজাতির আদি পিতা আদমের সময় থেকে পৃথিবীতে বিদ্যমান এবং এটি আদিতে দুধের মতো সাদা ছিল, যা মানুষের পাপে কালো হয়ে গেছে [3]। তবে ভূতাত্ত্বিক ও বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিকোণ থেকে এই দাবিটি হাস্যকর; কারণ উল্কার কালো রং মূলত এর গঠনগত রাসায়নিক পরিবর্তন এবং বায়ুমণ্ডলে প্রবেশের সময় প্রচণ্ড তাপের ফল। মানুষের অদৃশ্য ‘গুনাহ’ বা পাপের কোনো ভৌত প্রভাব পাথরের আণবিক গঠনের ওপর পড়ার দাবিটি নিছক আদিম কুসংস্কার ছাড়া আর কিছুই নয়। আদিম মানুষের আকাশ থেকে পড়া রহস্যময় বস্তুকে ঐশ্বরিক জ্ঞান করার এই প্রবণতাই ইসলামের মতো দাবিদার একেশ্বরবাদী ধর্মে এক ধরণের প্রস্তরপূজা বা লিথোল্যাট্রির (Litholatry) জন্ম দিয়েছে।
আলেমদের বক্তব্যঃ কালোপাথরটি সাক্ষ্য দিবে
বর্তমান সময়ে মিজানুর রহমান আজহারী এবং শায়েখ আব্দুর রাজ্জাক বিন ইউসুফের মতো জনপ্রিয় বক্তারা হাজরে আসওয়াদ নিয়ে যেসব বয়ান দেন, তা মূলত প্রাচীন কুসংস্কারকে আধুনিক মোড়কে বাঁচিয়ে রাখারই একটি অপচেষ্টা। ভিডিওগুলোতে দেখা যায়, ইসলামি বক্তারা এই জড় পাথরের গুণগান করতে গিয়ে প্রায়শই আবেগপ্রসূত এবং বিজ্ঞানের অপলাপমূলক ব্যাখ্যা দাঁড় করানোর চেষ্টা করেন। অনেকেই দাবি করেন যে, এই পাথর মানুষের গুনাহ চুষে নেয়—যা কোনো ভৌত বা রাসায়নিক প্রক্রিয়ায় প্রমাণ করা অসম্ভব। অন্যদিকে, আব্দুর রাজ্জাক বিন ইউসুফের মতো সালাফি ঘরানার বক্তারা যুক্তির ধার না ধেরে কেবল ‘সুন্নাহ’র দোহাই দিয়ে এই পাথরকে চুম্বন করাকে আবশ্যকীয় ভক্তি হিসেবে প্রচার করেন। তাদের এই প্রচারণা সাধারণ মানুষের মনে এমন এক গভীর মোহ তৈরি করে যে, প্রতি বছর হজের সময় হাজার হাজার মানুষ একে স্পর্শ করার জন্য মারামারি ও বিশৃঙ্খলায় লিপ্ত হয় [4]। মজার ব্যাপার হলো, তারা একদিকে মূর্তিপূজাকে শিরক বা মহাপাপ হিসেবে গণ্য করেন, আবার অন্যদিকে একটি জড় পাথরের সামনে সিজদা দেওয়া বা মাথা ঠেকানোকে পরম ইবাদত হিসেবে মহিমান্বিত করেন [5]। এই দ্বিমুখী আচরণ প্রমাণ করে যে, আধুনিক ইসলামী প্রচারকগণ যুক্তি বা বিজ্ঞানের চেয়ে অন্ধ আনুগত্য এবং প্রাচীন প্রস্তরপূজার ঐতিহ্যকেই বেশি প্রাধান্য দেন। আসুন ওয়াজগুলো শুনি,
হাদিসে হাজরে আসওয়াদঃ ইসলামি বিশ্বাসে একটি সচেতন সত্তা
এবারে আসুন এই সম্পর্কিত হাদিসগুলো পড়ে নেয়া যাক, [6] [7]
বুলুগুল মারাম
পর্ব – ৬ঃ হাজ্জ (হজ্জ/হজ) প্রসঙ্গ
পরিচ্ছেদঃ ৫. হাজের বিবরণ ও মক্কায় প্রবেশ – হজ্জরে আসওয়াদের (কালো পাথর) উপর সাজদা করার বিধান
৭৪৭। ইবনু ’আব্বাস (রাঃ) থেকে বৰ্ণিত। তিনি ’হাজ্জরে আসওয়াদকে চুম্বন করতেন এবং তার উপর মাথা রাখতেন। হাকিম মারফূ’রূপে এবং বায়হাক্বী মাওকুফরূপে।[1]
[1] মারফু-মাওকুফ উভয় বর্ণনায় সহীহ
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আবদুল্লাহ ইবনু আব্বাস (রাঃ)

সূনান তিরমিজী (ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
৯/ হাজ্জ (হজ্জ)
পরিচ্ছেদঃ হাজরে আসওয়াদ রুকন ও মাকামে ইবরাহীমের ফযীলত।
৮৭৮. কুতায়বা (রহঃ) ……. ইবনু আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, হাজরে আসওয়াদ জান্নাত থেকে অবতীর্ন হয়েছিল তখন সেটি ছিল দুধ থেকেও শুভ্র। মানুষের গুণাহ- খাতা এটিকে এমন কালো করে দিয়েছে। – মিশকাত ২৫৭৭, তা’লীকুর রাগীব ২/১২৩, আল হাজ্জুল কাবীর, তিরমিজী হাদিস নম্বরঃ ৮৭৭ (আল মাদানী প্রকাশনী)
এই বিষয়ে আবদুল্লাহ ইবনু আমর ও আবূ হুরায়রা (রাঃ) থেকেও হাদীস বর্ণিত আছে। ইমাম আবূ ঈসা (রহঃ) বলেন, ইবনু আব্বাস (রাঃ) বর্ণিত হাদীসটি হাসান-সহীহ।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আবদুল্লাহ ইবনু আব্বাস (রাঃ)
হাদীস সম্ভার
১০/ হজ্জ
পরিচ্ছেদঃ রুকনদ্বয়ের মাহাত্ম্য
(১১৬৪) আব্দুল্লাহ বিন আমর (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি আল্লাহর রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিকট শুনেছি, তিনি বলেছেন, হাজরে আসওয়াদ ও মাকামে ইবরাহীম জান্নাতের পদ্মরাগরাজির দুই পদ্মরাগ। আল্লাহ এ দু’য়ের নূর (প্রভা) কে নিষ্প্রভ করে দিয়েছেন। যদি উভয়মণির প্রভাকে তিনি নিষ্প্রভ না করতেন, তাহলে উদয় ও অস্তাচল (দিগদিগন্ত) কে উভয়ে জ্যোতির্ময় করে রাখত।
(তিরমিযী ৮৭৮, সহীহুল জামে ১৬৩৩)
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আবদুল্লাহ ইবনু আমর ইবনুল আস (রাঃ)
শুধু তাই নয়, মুহাম্মদ এমন কথাও বলেছে যে, কিয়ামতের দিনে এই কালো পাথর মানুষের পক্ষে বিপক্ষে সাক্ষ্য দিবে। অর্থাৎ এই কালো পাথরের কিছু না কিছু ক্ষমতা তো অবশ্যই আছে, এবং একে খুশি রাখাও জান্নাতে যাওয়ার জন্য জরুরি। মূর্তি এবং পাথরের কোন ক্ষমতা নেই, এই দাবী করা মুহাম্মদের মুখে যখন এরকম স্ববিরোধী বক্তব্য শোনা যায়, তখন হাসবো না কাঁদবো বুঝে উঠতে পারি না।
সুনান ইবনু মাজাহ
১৯/ হজ্জ
পরিচ্ছেদঃ ১৯/২৭. হাজরে আসওয়াদ চুম্বন করা
২/২৯৪৪। সাঈদ ইবনে জুবাইর (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি ইবনে আব্বাস (রাঃ) কে বলতে শুনেছি, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ কিয়ামতের দিন এই পাথরকে উপস্থিত করা হবে। তার দু‘টি চোখ থাকবে, তা দিয়ে সে দেখবে, যবান থাকবে তা দিয়ে সে কথা বলবে এবং সে এমন লোকের অনুকূলে সাক্ষ্য দিবে যে তাকে সত্যতার সাথে চুমা দিয়েছে।
তিরমিযী ৯৬১, আহমাদ ২২১৬, ২৩৯৪, ২৬৩৮, ২৭৯৩, ৩৫০১, দারেমী ১৮৩৯, মিশকাত ২৫৭৮, আত-তালীক আলা ইবনু খুযাইমাহ ২৭৩৫, ২৭৩৬।
তাহকীক আলবানীঃ সহীহ।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ সা‘ঈদ ইবনু যুবায়র (রহঃ)
সূনান আত তিরমিজী (তাহকীককৃত)
৭/ হাজ্জ
পরিচ্ছেদঃ ১১৩. হাজরে আসওয়াদ প্রসঙ্গে
৯৬১। ইবনু আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হাজরে আসওয়াদ প্রসঙ্গে বলেছেনঃ আল্লাহর শপথ! এই পাথরকে আল্লাহ তা’আলা কিয়ামতের দিন এমন অবস্থায় উঠাবেন যে, এর দুটি চোখ থাকবে যা দিয়ে সে দেখবে এবং একটি জিহ্বা থাকবে যা দিয়ে সে কথা বলবে। যে লোক সত্য হৃদয়ে একে পর্শ করবে তার সম্বন্ধে এই পাথর আল্লাহ্ তা’আলার নিকটে সাক্ষ্য দিবে।
— সহীহ, মিশকাত (২৫৭৮), তা’লীকুর রাগীব (২/১২২), তা’লীক আলা ইবনু খুযাইমা (২৭৩৫)
এই হাদীসটিকে আবূ ঈসা হাসান বলেছেন।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আবদুল্লাহ ইবনু আব্বাস (রাঃ)
সুনান আদ-দারেমী
৫. হজ্জ অধ্যায়
পরিচ্ছেদঃ ২৬. হাজরে আসওয়াদ চুম্বন করার ফযীলত
১৮৭৬. ইবনু আব্বাস রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেনঃ কিয়ামতের দিন এই পাথরকে আল্লাহ এমন অবস্থায় পুন:উত্থিত করবেন যে, এর দু‘টি চোখ থাকবে, যা দিয়ে সেটি দেখবে এবং একটি জিহবা থাকবে যা দিয়ে সেটি কথা বলবে এবং যে ব্যক্তি তাকে যথাযথভাবে চুম্বন করেছে, সেটি সেই লোকের পক্ষে সাক্ষ্য প্রদান করবে।(1)
সালমান (তার বর্ণনায়) বলেন: যে ব্যক্তি তাকে চুম্বন করেছে, তার জন্য (অর্থাৎ ‘যথাযথভাবে’ শব্দটি ব্যতীত)।
(1) তাহক্বীক্ব: এর সনদ সহীহ।
তাখরীজ: [41]
আমরা এর পূর্ণ তাখরীজ দিয়েছি মুসনাদুল মাউসিলী নং ২৭১৯; সহীহ ইবনু হিব্বান নং ৩৭১১, ৩৭১২ ও মাওয়ারিদুয যাম’আন নং ১০০৫ তে।
এছাড়া, তাবারানী, আল কাবীর ১২/৬৩ নং ১২৪৭৯।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আবদুল্লাহ ইবনু আব্বাস (রাঃ)
এই নিয়ে ঝামেলা আরো বাড়ে, যখন মুহাম্মদ সরাসরি এই পাথরের ফজিলত বর্ণনা করেন, এবং ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা আবার এই একই পাথরকে ক্ষমতাহীন পাথর বলে আখ্যায়িত করেন! বলেন যে, এই পাথর কারো ক্ষতি বা উপকার কিছুই করতে পারে না। যা সরাসরি উপরের হাদিসগুলোর নির্দেশনার বিরোধী।
সহীহ মুসলিম (ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
১৬/ হাজ্জ
পরিচ্ছেদঃ ৩৭. তাওয়াফের সময় হাজারে আসওয়াদ চুম্বন করা মুস্তাহাব
২৯৩৯। খালফ ইবনু হিশাম, মুকাদ্দমী, আবূ কামিল ও কুতায়বা ইবনু সাঈদ (রহঃ) … আবদুল্লাহ ইবনু সারজিস (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি টাক মাথাওয়ালা অর্থাৎ উমর ইবনুল খাত্তাব (রাঃ) কে কালো পাথর হাজারে আসওয়াদ চুমো দিতে দেখেছি এবং তিনি বলেছেন, আল্লাহর শপথ! আমি অবশ্যই তোমাকে চুন্বন করব এবং আমি অবশ্যই জানি যে, তুমি একটি পাথর, তুমি কারও ক্ষতিও করতে পার না এবং উপকারও করতে পার না। আমি যদি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে তোমায় চুম্বন করতে না দেখতাম তবে আমি তোমায় চুম্বন করতাম না।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আবদুল্লাহ ইবনু সারজিস (রাঃ)
পৌত্তলিক ঐতিহ্য এবং মুহাম্মদের আপসকামিতা
মুহাম্মদের নবুয়ত-পূর্ব জীবনের দিকে তাকালে দেখা যায়, তিনি কুরাইশ বংশের প্রচলিত প্রথা ও সংস্কৃতির সাথে গভীরভাবে যুক্ত ছিলেন। বিশেষ করে ‘হিলফুল ফুজুল’ নামক একটি সংগঠনের সদস্য থাকাকালীন মক্কার সামাজিক ও ধর্মীয় রীতির সাথে তার গভীর সংযোগ গড়ে ওঠে। যদিও তিনি পরবর্তী জীবনে কুরাইশদের মূর্তিপূজার ঘোর বিরোধী হিসেবে আবির্ভূত হন, তবুও কাবা ঘরের কোণে থাকা এই রহস্যময় কালো পাথরটির প্রতি তার বাল্যকালের বিশেষ অনুরাগ বা সাংস্কৃতিক টান তিনি কোনোভাবেই কাটিয়ে উঠতে পারেননি। এর ফলে, মক্কার ৩৬০টি মূর্তি ভেঙে ফেললেও তিনি এই একটি বিশেষ পাথরকে কাবার দেয়ালে সযত্নে রেখে দেন এবং একে চুম্বন ও স্পর্শ করার রীতিকে ধর্মীয় বৈধতা দান করেন।
ইসলামের কট্টর একেশ্বরবাদী দাবির সাথে একটি জড় পাথরের প্রতি এই অতিমাত্রার সম্মান প্রদর্শন এবং সেটির ওপর মাথা রাখা বা সেটিকে চুম্বন করা স্পষ্টতই একটি বৈপরীত্য। আধুনিক বিশ্লেষকদের মতে, এটি ছিল মূলত তৎকালীন আরবের প্রভাবশালী পৌত্তলিক সংস্কৃতির সাথে মুহাম্মদের একটি রাজনৈতিক ও মনস্তাত্ত্বিক আপসকামিতা, যা এক হাতে মূর্তিপূজাকে অস্বীকার করলেও অন্য হাতে প্রস্তরপূজার অবশিষ্টাংশকে ইসলামের মূল ইবাদতের অংশ করে তোলে [8]। এই আপসকামিতার ফলেই আজ কোটি কোটি মুসলিম একটি জড় পাথরকে ঘিরে আবর্তন করে এবং তাকে চুম্বন করার জন্য উন্মত্ত হয়ে ওঠে, যা মূলত প্রাক-ইসলামী পৌত্তলিক রীতিরই একটি বিবর্তিত রূপ।
অলৌকিকত্বের দাবি বনাম বৈজ্ঞানিক বাস্তবতা
ইসলামী শাস্ত্রগুলোতে হাজরে আসওয়াদকে কেন্দ্র করে যেসব অলৌকিক দাবি করা হয়েছে, আধুনিক বিজ্ঞানের নিক্তিতে সেগুলো স্রেফ আদিম রূপকথা হিসেবে প্রতীয়মান হয়। সহিহ তিরমিজীর বর্ণনা অনুযায়ী, মুহাম্মদ দাবি করেছিলেন যে এই পাথরটি জান্নাত থেকে আসার সময় দুধের চেয়েও সাদা ছিল, কিন্তু মানুষের পাপরাশি একে কালো করে দিয়েছে [2]। বস্তুনিষ্ঠ দৃষ্টিতে দেখলে, কোনো জড় পদার্থের ওপর মানুষের বিমূর্ত ‘পাপ’ বা ‘পুণ্যের’ প্রভাবে তার আণবিক গঠন বা রঙের পরিবর্তন হওয়া অসম্ভব। ভূতাত্ত্বিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, উল্কাপিণ্ড যখন প্রচণ্ড গতিতে বায়ুমণ্ডলে প্রবেশ করে, তখন ঘর্ষণের ফলে সৃষ্ট উচ্চ তাপমাত্রায় এর উপরিভাগ পুড়ে একটি কালো আস্তরণ বা ‘ফিউশন ক্রাস্ট’ তৈরি হয় [1]। এছাড়া শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে লাখ লাখ মানুষের হাতের স্পর্শ, ঘাম এবং তেলের সংস্পর্শেও পাথরের রঙ পরিবর্তন হওয়া অত্যন্ত স্বাভাবিক একটি ভৌত প্রক্রিয়া। অথচ এই সাধারণ প্রাকৃতিক ঘটনাকে মুহাম্মদের দর্শনে একটি অতিপ্রাকৃত রূপ দেওয়া হয়েছে, যা মূলত তৎকালীন মানুষের অজ্ঞানতাকে পুঁজি করে ধর্মতাত্ত্বিক ভীতি তৈরির একটি কৌশল মাত্র।
আরও বিস্ময়কর দাবি পাওয়া যায় ‘হাদীস সম্ভার’-এর একটি বর্ণনায়, যেখানে বলা হয়েছে হাজরে আসওয়াদ ও মাকামে ইবরাহীম জান্নাতের দুটি প্রদীপ্ত মণি বা পদ্মরাগ, এবং এদের জ্যোতি যদি আল্লাহ নিভিয়ে না দিতেন, তবে তা সমগ্র দিগন্তকে আলোকিত করে রাখত [9]। এই ধরণের পৌরাণিক অতিশয়োক্তি (Mythological Hyperbole) গ্রিক বা হিন্দু পুরাণের অলৌকিক বর্ণনার চেয়ে কোনো অংশে কম নয়। বিজ্ঞানের ভাষায়, কোনো পাথর বা উল্কাপিণ্ডের নিজস্ব কোনো আলোক নিঃসরণ ক্ষমতা থাকে না যদি না তা তেজস্ক্রিয় হয়। অথচ মুহাম্মদ এই জড় পাথরগুলোর ওপর ঐশ্বরিক ক্ষমতার এক কাল্পনিক আবরণ লেপন করেছেন, যা প্রমাণের কোনো বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই। এই রূপক ও অবাস্তব বয়ানগুলো মূলত অনুসারীদের মনে একটি জড় বস্তুর প্রতি মোহ ও ভক্তি জাগিয়ে রাখার একটি উপায় হিসেবেই কাজ করে আসছে।
পাথরের ‘চেতনা’ ও পরকালীন সাক্ষীঃ এক চরম স্ববিরোধ
ইসলামের নবী মুহাম্মদ এই জড় পাথরের ওপর এমন কিছু অতিপ্রাকৃত ও জৈবিক বৈশিষ্ট্য আরোপ করেছেন, যা কেবল অবৈজ্ঞানিকই নয়, বরং ইসলামের নিজস্ব ‘একেশ্বরবাদী’ দাবির সাথেও চরমভাবে সাংঘর্ষিক। বিভিন্ন সহিহ হাদিসে বর্ণিত হয়েছে যে, কিয়ামতের দিন এই কালো পাথরটিকে এমন অবস্থায় পুনরুত্থিত করা হবে যে, এর দুটি চোখ থাকবে যা দিয়ে সে দেখবে এবং একটি জিহ্বা থাকবে যা দিয়ে সে কথা বলবে [10]। শুধু তাই নয়, যারা সত্য হৃদয়ে একে চুম্বন করেছে, তাদের অনুকূলে এই পাথর আল্লাহর কাছে সাক্ষ্য প্রদান করবে। একটি সাধারণ জড় উল্কাপিণ্ডকে এভাবে দেখার, শোনার এবং কথা বলার ক্ষমতা সম্পন্ন একটি সত্তা হিসেবে কল্পনা করা মূলত আদিম অ্যানিমিজম (Animism) বা প্রাণবাদেরই নামান্তর, যেখানে জড় বস্তুর মধ্যে প্রাণের অস্তিত্ব কল্পনা করা হয়।
সবচেয়ে বড় বিভ্রান্তি ও স্ববিরোধিতা তৈরি হয় যখন ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা উমর ইবনুল খাত্তাবের বক্তব্যে এই পাথরের কোনো ক্ষমতা না থাকার কথা উঠে আসে। সহিহ মুসলিমের বর্ণনা অনুযায়ী, উমর পাথরটিকে চুম্বন করার সময় সরাসরি বলেছিলেন, “আমি অবশ্যই জানি যে, তুমি একটি পাথর, তুমি কারও ক্ষতিও করতে পার না এবং উপকারও করতে পার না” [11]। এখন প্রশ্ন জাগে, যদি এই পাথর কারো উপকার বা ক্ষতি করতেই না পারে, তবে এটি কিয়ামতের দিন মানুষের পক্ষে সাক্ষ্য দিয়ে জান্নাতে যাওয়ার পথ সুগম করবে কীভাবে? মুহাম্মদের দাবি অনুযায়ী পাথরটি ‘উপকার’ (সাক্ষ্য দেওয়া) করার ক্ষমতা রাখে, অথচ উমরের দাবি অনুযায়ী এটি একটি তুচ্ছ জড় পদার্থ মাত্র। এই দ্বিমুখী অবস্থান প্রমাণ করে যে, ইসলামের প্রাথমিক যুগেই এই পাথর কেন্দ্রিক আকিদা নিয়ে গভীর বুদ্ধিবৃত্তিক বিশৃঙ্খলা বিদ্যমান ছিল। একদিকে মুহাম্মদের ইসলামে একে ‘জান্নাতের মণি’ ও ‘সাক্ষী’ বানিয়ে পূজনীয় করা হয়েছে, আবার অন্যদিকে উমরের ইসলামে মূর্তিপূজার অপবাদ থেকে বাঁচতে একে ‘নিছক পাথর’ বলে সাফাই গাওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে।
উপসংহারঃ একেশ্বরবাদের ছদ্মবেশে পৌত্তলিকতার উত্তরাধিকার
সামগ্রিক বিশ্লেষণে এটি স্পষ্ট যে, হাজরে আসওয়াদ কেন্দ্রিক ইসলামী বিশ্বাসগুলো এক বিশাল আদর্শিক ও জ্ঞানতাত্ত্বিক স্ববিরোধিতার ওপর দাঁড়িয়ে আছে। যে ধর্ম দাবি করে যে তারা মূর্তিপূজা এবং জড় বস্তুর উপাসনা নির্মূল করতে এসেছে, সেই ধর্মেরই কেন্দ্রবিন্দুতে একটি জড় উল্কাপিণ্ডকে ‘জান্নাতের পাথর’ হিসেবে স্থাপন করা এবং তাকে দেখার ও কথা বলার ক্ষমতা দান করা চরম হাস্যকর ও অযৌক্তিক [12]। বিজ্ঞানের যুগে যখন আমরা জানি যে পাথরটি একটি সাধারণ মহাজাগতিক বস্তু বা উল্কা, তখন তাকে ‘মানুষের পাপে কালো হওয়া’ বা ‘কিয়ামতে সাক্ষ্য দেওয়া’র মতো অতিপ্রাকৃত গল্প দিয়ে সাজানো মূলত মানুষের কাণ্ডজ্ঞানকে অপমান করার শামিল।
মুহাম্মদের শৈশব ও কৈশোরের পৌত্তলিক স্মৃতির প্রতি দুর্বলতা এবং পরবর্তীতে খলিফা উমরের বিদ্রোহী বক্তব্য—সব মিলিয়ে হাজরে আসওয়াদ বিষয়টি ইসলামের একটি ‘দুর্বল যোগসূত্র’ (Weak Link) হয়ে দাঁড়িয়েছে। উমর ইবনুল খাত্তাব পাথরটিকে ক্ষমতাহীন মনে করলেও কেবল মুহাম্মদের অন্ধ অনুকরণে তাকে চুম্বন করেছিলেন, যা প্রমাণ করে যে ইসলামে যুক্তি বা সত্যের চেয়ে ব্যক্তিপূজা ও অন্ধ অনুকরণই শেষ কথা [11]। আজকের দিনে রাষ্ট্র ও সমাজ থেকে ধর্মের এই অন্ধত্ব দূর করা এবং প্রতিটি প্রাচীন বিশ্বাসকে বিজ্ঞানের কষ্টিপাথরে যাচাই করা জরুরি। হাজরে আসওয়াদ মূলত ইসলামের সেই পৌত্তলিক শেকড়কেই নির্দেশ করে, যা তারা মুখে অস্বীকার করলেও আচরণে ও আচারে আজও সযত্নে লালন করে চলেছে।
তথ্যসূত্রঃ
- হিকস, ই. (২০১৫), রিলিজিয়াস রিলিকস অ্যান্ড সায়েন্স 1 2
- সূনান তিরমিজী, হাদিস নং ৮৭৮ 1 2
- তিরমিজী, হাদিস নং ৮৭৭ ↩︎
- শারিয়াটিক, এ. (১৯৭৭)। হজ: অ্যান ইনসাইট ↩︎
- বুলুগুল মারাম, হাদিস: ৭৪৭ ↩︎
- বুলুগুল মারাম, হাদিসঃ ৭৪৭ ↩︎
- তাহকীক বুলুগুল মারাম মিন আদিল্লাতিল আহকাম বা লক্ষ্যে পৌঁছার দলিলসম্মত বিধিবিধান, তাওহীদ পাবলিকেশন্স, পৃষ্ঠা ৩৫৪ ↩︎
- রডিনসন, এম. (১৯৭১), মুহাম্মদ ↩︎
- হাদীস সম্ভার, হাদিস নং ১১৬৪ ↩︎
- সুনান ইবনু মাজাহ, হাদিস: ২৯৪৪; সূনান আত তিরমিজী, হাদিস: ৯৬১; সুনান আদ-দারেমী, হাদিস: ১৮৭৬ ↩︎
- সহীহ মুসলিম, হাদিস: ২৯৩৯ 1 2
- ডকিন্স, আর. (২০০৬), দ্য গড ডিলিউশন ↩︎
