
Table of Contents
ভূমিকা
ইসলামী পরকালতত্ত্ব বা এস্ক্যাটোলজির (Eschatology) একটি অন্যতম স্তম্ভ হলো কবরের জীবন। মুসলিম বিশ্বাস অনুযায়ী, একজন মুমিন ব্যক্তিকে কবরে সমাহিত করার পর তার নেক আমলের পুরস্কার স্বরূপ কবরের দৈর্ঘ্য ও প্রস্থ সত্তর হাত পর্যন্ত প্রশস্ত করে দেওয়া হয় এবং সেখানে জান্নাতের আবহ তৈরি করা হয়। প্রাচীন আরবের সীমিত জ্ঞানতাত্ত্বিক কাঠামোয় এই ধরণের বর্ণনা হয়তো পরকালের প্রতি ভীতি বা আগ্রহ তৈরির কার্যকর হাতিয়ার ছিল, কিন্তু আধুনিক বিজ্ঞান ও সাধারণ কাণ্ডজ্ঞানের নিরিখে এটি একটি বিশাল স্ববিরোধিতার জন্ম দেয়। কারণ, সমসাময়িক বিশ্বে অপরাধ তদন্ত বা অন্য কোনো জরুরি প্রয়োজনে নিয়মিত কবর পুনর্খনন করা হয়, কিন্তু আজ পর্যন্ত কোনো একটি কবরেও এই তথাকথিত সত্তর হাতের প্রসারণ বা কোনো অতিপ্রাকৃত পরিবর্তন দেখা যায়নি। এই বৈপরীত্যটি কেবল এই বিশ্বাসের নির্ভরযোগ্যতাকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে না, বরং ধর্মের অলৌকিক দাবিগুলোর সাথে বাস্তব জগতের চিরস্থায়ী বিচ্ছেদকেও স্পষ্ট করে তোলে।
হাদিসের বিবরণঃ কবরকে সত্তর হাত প্রশস্ত করে দেয়া
ইসলামের বিশ্বাস হচ্ছে, মুমিন ব্যক্তির মৃত্যুর পরে কবরের দৈর্ঘ্য প্রস্ত সত্তর হাত প্রশস্ত করে দেয়া হয়। মাঝে মাঝেই মৃতদেহ পোস্টমর্টেম করার জন্য খোড়া হয়, কিন্তু কোন কবর খুড়ে আজ পর্যন্ত এরকম দাবীর সত্যতা পাওয়া যায়নি।
সহীহ মুসলিম (হাঃ একাডেমী)
অধ্যায়ঃ ৫৩। জান্নাত, জান্নাতের নি’আমাত ও জান্নাতবাসীদের বর্ণনা
১৭. মৃত ব্যক্তির কাছে জান্নাত কিংবা জাহান্নামের ঠিকানা উপস্থিত করা হয়, আর কবরের শাস্তি প্রমাণ করা এবং তা থেকে ক্ষমা প্রার্থনা করা
৭১০৮-(৭০/২৮৭০) আবদ ইবনু হুমায়দ (রহঃ) ….. আনাস ইবনু মালিক (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ বান্দাকে যখন তার কবরের মধ্যে রেখে তার সঙ্গী-সাথীরা সেখান থেকে ফিরে আসে এবং সে তাদের জুতার শব্দ শুনতে পায় তখন তার কাছে দু’জন ফেরেশতা এসে তাকে উঠিয়ে বসান। তারপর তাকে তারা জিজ্ঞেস করে, এ লোকটির ব্যাপারে তুমি কি বলতে? মু’মিন বান্দা তখন বলে, আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি, তিনি আল্লাহর বান্দা এবং তার রসূল। তখন তাকে বলা হয়, জাহান্নামে তুমি তোমার আসন দেখে নাও। আল্লাহ তা’আলা তোমার এ আসনকে জান্নাতের আসনের দ্বারা পরিবর্তন করে দিয়েছেন। নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ তখন সে তার উভয় আসন অবলোকন করে নেয়।
বর্ণনাকারী কাতাদাহ্ (রহঃ) বলেন, আমাদের নিকট এ কথাও উল্লেখ করা হয়েছে যে, অতঃপর তার কবরকে (দৈর্ঘ্যে-প্রস্থে) সত্তর হাত প্রশস্ত করে দেয়া হয় এবং সবুজ শ্যামল গাছের দ্বারা পরিপূর্ণ করে দেয়া হয় কিয়ামাত পর্যন্ত। (ইসলামিক ফাউন্ডেশন ৬৯৫২, ইসলামিক সেন্টার ৭০১০)
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
হাদীস সম্ভার
১১/ জানাযা
পরিচ্ছেদঃ কবরের (বারযাখী) জীবন
(১৩৮৩) আবূ হুরাইরা (রাঃ) কর্তৃক বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, মৃত ব্যক্তিকে কবরস্থ করা হলে তার নিকট নীল চক্ষুবিশিষ্ট কৃষ্ণবর্ণের দুই ফিরিশতা আসেন। একজনকে বলা হয় ’মুনকির’ এবং অপরকে বলা হয় ’নাকীর’। তাঁরা তাকে জিজ্ঞাসা করেন, এই (নবী) ব্যক্তির ব্যাপারে তুমি কী বলতে? সে বলে, উনি যা বলতেন তাই, আল্লাহর বান্দা ও তাঁর রসূল। আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ ছাড়া কেউ (সত্য) উপাস্য নেই এবং মুহাম্মাদ তাঁর বান্দা ও তাঁর রসূল। তাঁরা বলেন, আমরা জানতাম যে, তুমি তাই বলবে।
অতঃপর তার কবরকে সত্তর হাত দৈর্ঘ্য ও সত্তর হাত প্রস্থ পরিমাপে প্রশস্ত ক’রে দেওয়া হয়। অতঃপর তা আলোকিত করা হয়। অতঃপর তাকে বলা হয়, তুমি ঘুমিয়ে যাও। সে বলে, ’আমি আমার পরিজনের কাছে ফিরে গিয়ে তাদেরকে খবর দেব।’ তাঁরা বলেন, তুমি সেই বাসর রাতের বরের মতো ঘুমিয়ে যাও, যাকে তার পরিবারের প্রিয়তম ছাড়া কেউ জাগাবে না। পরিশেষে আল্লাহ তাঁকে এই শয়নক্ষেত্র থেকে পুনরুত্থিত করবেন।
(তিরমিযী ১০৭১, সিঃ সহীহাহ ১৩৯১)
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আবূ হুরায়রা (রাঃ)
সহীহ মুসলিম (ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
৫৪/ জান্নাত, জান্নাতের নিয়ামত ও জান্নাতবাসীগনের বিবরণ
পরিচ্ছেদঃ ১৭. মৃত ব্যক্তিকে তার জান্নাত কিংবা জাহান্নামের ঠিকানা প্রদর্শন করানো, কবর আযাবের প্রমান এবং তা থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য দু’আ করা
৬৯৫২। আবদ ইবনু হুমায়দ (রহঃ) … আনাস ইবনু মালিক (রাঃ) থেকে বর্ণিত। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ বান্দাকে যখন তার কবরের মধ্যে রেখে তার সঙ্গী-সাথীরা তথা হতে ফিরে আসে এবং সে তাদের জুতার আওয়াজ শুনতে পায় তখন তার নিকট দু’জন ফিরিশতা এসে তাকে উঠিয়ে বসায়। অতঃপর তাকে তারা প্রশ্ন করে, এ ব্যক্তি সম্পর্কে তুমি কি বলতে? মুমিন বান্দা তখন বলে, আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি, তিনি আল্লাহর বান্দা এবং তাঁর রাসুল। তখন তাকে বলা হয়, জাহান্নামে তুমি তোমার আসন দেখে নাও। আল্লাহ তাআলা তোমার এ আসনকে জান্নাতের আসনের দ্বারা পরিবর্তন করে দিয়েছেন। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ তখন সে তার উভয় আসন দেখে নেয়।
বর্ণনাকারী কাতাদা (রহঃ) বলেন, আমাদের নিকট এ কথাও উল্লেখ করা হয়েছে যে, অতঃপর তার কবরকে (দৈর্ঘ্যে-প্রস্থে) সত্তর হাত প্রশস্ত করে দেয়া হয় এবং সবুজ (শ্যামল গাছের) দ্বারা ভরপুর করে দেয়া হয় কিয়ামতে তাদের (মানুষের) উত্থিত হওয়া পর্যন্ত এ অবস্থা চলবে।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আনাস ইবনু মালিক (রাঃ)
বাস্তব প্রমাণ ও ফরেনসিক বিজ্ঞানের সীমাবদ্ধতা
ইসলামী ধর্মতত্ত্ব অনুযায়ী কবরের এই প্রসারণ একটি ভৌত পরিবর্তন হিসেবে বর্ণিত হয়েছে, যা মৃত ব্যক্তির আরাম ও শান্তির প্রতীক। কিন্তু আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞান ও অপরাধ বিজ্ঞানের (Forensic Science) প্রয়োজনে যখনই কোনো কবর পুনরায় খনন বা পোস্টমর্টেম করা হয়, তখন সেখানে মৃতদেহের পচন ছাড়া আর কোনো বিচ্যুতি খুঁজে পাওয়া যায় না। সত্তর হাত প্রশস্ত হওয়ার যে দাবি সহিহ হাদিসে করা হয়েছে, তা যদি সত্যি হতো তবে পার্শ্ববর্তী কবরগুলোর অস্তিত্ব সংকটে পড়ত এবং মাটির উপরিভাগের ভূ-প্রকৃতিতেও বড় ধরনের পরিবর্তন দৃশ্যমান হতো। অথচ আজ পর্যন্ত একটি কবরেও এই তথাকথিত সত্তর হাতের প্রসারণ বা কোনো অতিপ্রাকৃত ভৌত কাঠামোর অস্তিত্বের প্রমাণ পাওয়া যায়নি। এই বাস্তব তথ্যের অনুপস্থিতি প্রমাণ করে যে, ধর্মীয় গ্রন্থগুলোতে বর্ণিত এই ধরণের বর্ণনাগুলো মূলত মানুষের মৃত্যুকালীন ভয়কে প্রশমিত করার জন্য এক ধরণের মনস্তাত্ত্বিক সান্ত্বনা ছাড়া আর কিছুই নয়। বাস্তব জগতের কোনো বৈজ্ঞানিক সূত্র বা পর্যবেক্ষণের সাথে এই অলৌকিক দাবির কোনো দূরতম সম্পর্কও খুঁজে পাওয়া যায় না।
মেটাফিজিক্যাল দাবিঃ গায়েবী জগত কি পরিমাপযোগ্য?
যখনই কবরের এই সত্তর হাত প্রশস্ততার বৈজ্ঞানিক অসারতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়, তখন ধর্মতাত্ত্বিকরা একে ‘বারযাখ’ বা একটি আধ্যাত্মিক জগত (Metaphysical world) বলে পাশ কাটিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন [1]। তাদের দাবি অনুযায়ী, এই প্রশস্ততা আমাদের চর্মচক্ষে দৃশ্যমান নয় বরং এটি এক ধরণের আধ্যাত্মিক প্রসারণ। কিন্তু এখানেই একটি গুরুতর যৌক্তিক ও গাণিতিক স্ববিরোধ দেখা দেয়। যদি কবরের এই প্রসারণ একান্তই আধ্যাত্মিক বা মেটাফিজিক্যাল হয়, তবে সেখানে ‘সত্তর হাত’ নামক একটি সুনির্দিষ্ট ভৌত পরিমাপের (Physical measurement) প্রয়োজনীয়তা কোথায়? তাত্ত্বিকভাবে, একটি মেটাফিজিক্যাল স্পেস বা চেতনার জগতের কোনো জ্যামিতিক সীমা থাকার কথা নয়; সেখানে সত্তর বা আশির মতো সংখ্যাগত সীমাবদ্ধতা থাকা সম্পূর্ণ অর্থহীন।
তাছাড়া, ‘হাত’ বা ‘কিউবিট’ হলো দৈর্ঘ্য পরিমাপের একটি নির্দিষ্ট পার্থিব একক, যা মানুষের শরীরের অঙ্গসংস্থানের ওপর ভিত্তি করে তৈরি। একটি অভৌত বা মেটাফিজিক্যাল ডাইমেনশনে এই সত্তর হাত কীভাবে পরিমাপ করা হলো এবং কার হাতের মাপে এটি নির্ধারিত—তা একটি বড় বুদ্ধিবৃত্তিক প্রশ্ন। যদি এই জগতটি আমাদের পরিচিত পদার্থবিজ্ঞানের নিয়মের বাইরে হয়ে থাকে, তবে সেখানে সসীম ও রৈখিক একটি পরিমাপ (যেমন: সত্তর হাত) ব্যবহার করা প্রমাণ করে যে, এই আখ্যানের মূল রচয়িতারা বিষয়টিকে একটি আক্ষরিক ভৌত ঘটনা হিসেবেই কল্পনা করেছিলেন। আধ্যাত্মিকতার দোহাই দিয়ে একে রক্ষার চেষ্টা মূলত একটি যৌক্তিক হেত্বাভাস (Logical Fallacy); কারণ যদি স্পেসটি অসীম বা অদৃশ্য হয়, তবে তাকে ‘সত্তর হাত’ বলার মাধ্যমে তাকে পুনরায় একটি সসীম ভৌত খাঁচায় বন্দী করা হয়। এই ধরণের সুনির্দিষ্ট সংখ্যাতাত্ত্বিক বর্ণনা মূলত তৎকালীন মানুষের সীমাবদ্ধ কল্পনাশক্তিকে তুষ্ট করার একটি প্রাচীন কৌশল ছিল মাত্র, যা আধুনিক যুক্তিবাদে টিকে থাকতে অক্ষম।
উপসংহারঃ মৃত্যুভীতি ও রূপকের আড়ালে সান্ত্বনা
সামগ্রিক বিশ্লেষণে এটি স্পষ্ট যে, কবরের সত্তর হাত প্রশস্ত হওয়ার দাবিটি মূলত প্রাচীন আরব্য লোকগাথা এবং মৃত্যুভীতি তাড়ানোর একটি আদিম মনস্তাত্ত্বিক কৌশল মাত্র। বিজ্ঞানের এই উৎকর্ষের যুগে যখন প্রতিটি ইঞ্চি মাটি স্ক্যান করা এবং কবর পুনর্খনন করে মৃতদেহের অবস্থা পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব, তখন একটি জড় গর্তের রহস্যময় ভৌত প্রসারণের দাবি স্রেফ একটি তাত্ত্বিক কুসংস্কার ছাড়া আর কিছুই নয়। মুমিনদের জন্য সত্তর হাতের বিশাল রাজকীয় জান্নাতী ফ্ল্যাটের আরাম এবং সবুজ শ্যামল পরিবেশের যে রূপক বর্ণনা হাদিসে পাওয়া যায়, তা মৃতদেহের পচন ও পোকা-মাকড়ের আক্রমণের মতো রূঢ় জৈবিক বাস্তবতাকে আড়াল করার একটি বিফল চেষ্টা মাত্র।
যদি এই জগতটি সত্যই ‘বারযাখ’ বা আধ্যাত্মিক হয়, তবে সেখানে মানুষের তৈরি ‘হাত’ বা ‘ফুট’ দিয়ে পরিমাপ করার প্রচেষ্টাই প্রমাণ করে যে, এই আখ্যানের স্রষ্টারা কোনো আধুনিক মেটাফিজিক্স সম্পর্কে জানতেন না; বরং তারা তাদের চারপাশের পরিচিত ভৌত জগতকেই অতিপ্রাকৃত করার চেষ্টা করেছিলেন মাত্র। তাত্ত্বিকভাবে, একটি মেটাফিজিক্যাল স্পেসের কোনো জ্যামিতিক সীমাবদ্ধতা থাকার কথা নয়, সেটি পৃথিবীর মানুষের হাত দিয়ে পরিমাপ করতে পারারও কথা নয়। তাই সেখানে ‘সত্তর’ সংখ্যাটি ব্যবহার করা সম্পূর্ণ অযৌক্তিক ও আরব অঞ্চলের মানুষের মূর্খতার বহিঃপ্রকাশ। পরিশেষে বলা যায়, সত্য কোনো অন্ধ বিশ্বাসের ওপর নির্ভর করে না, বরং তা বস্তুনিষ্ঠ প্রমাণ ও পর্যবেক্ষণের মুখাপেক্ষী। কবরের সত্তর হাত প্রশস্ততা কোনো স্বর্গীয় সত্য নয়, বরং তা মানুষের সীমাবদ্ধ কল্পনার এক রৈখিক প্রতিফলন, যা আধুনিক যুক্তিবাদ ও বিজ্ঞানের সামনে সম্পূর্ণরূপে অসার প্রমাণিত হয়েছে।
তথ্যসূত্রঃ
- আল-গাজ্জালী, ইহয়াউ উলুমিদ্দীন ↩︎

সংশয় ডট কম আ্যাপ এবং এই ওয়েবসাইট টা অনেক উপকারী।