
Table of Contents
- 1 ভূমিকাঃ সংস্কৃতির প্রাণভোমরা বনাম ধর্মীয় প্রতিবন্ধকতা
- 2 হাদিসের বক্তব্যঃ গানবাজনাকারীর প্রতি নবীর লানত
- 3 আলেমদের বক্তব্যঃ আল্লাহ গানের শত্রু
- 4 সঙ্গীত নিষিদ্ধকরণে ইসলামি শরিয়তের ভূমিকা
- 5 বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গিঃ শিশুর বিকাশ ও মানসিক স্বাস্থ্যে সঙ্গীত
- 6 সাংস্কৃতিক শূন্যতা ও উগ্রবাদঃ সঙ্গীত নিষেধাঞ্জা ও তার সামাজিক কুফল
- 7 ধর্মীয় সন্ত্রাসের কবলে সঙ্গীতঃ বাউল নিগ্রহ ও দক্ষিণ এশিয়ায় সঙ্গীত-বিদ্বেষ
- 8 উপসংহারঃ আধুনিক সমাজে প্রাচীন নিষেধাঞ্জা বনাম যৌক্তিক অগ্রগতি
ভূমিকাঃ সংস্কৃতির প্রাণভোমরা বনাম ধর্মীয় প্রতিবন্ধকতা
মানব সভ্যতার ঊষালগ্ন থেকে সঙ্গীত কেবল বিনোদনের মাধ্যম নয়, বরং এটি মানুষের আত্মিক অভিব্যক্তি, সামাজিক সংহতি এবং বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে বিবেচিত হয়ে এসেছে। নৃতাত্ত্বিক ও বিবর্তনীয় দৃষ্টিকোণ থেকে সঙ্গীত মানুষের ভাষাগত দক্ষতার সমান্তরালে বিকশিত হয়েছে, যা প্রাক-ঐতিহাসিক যুগেও গোষ্ঠীগত বন্ধন দৃঢ় করতে ভূমিকা রাখত। ডারউইনের মতে, সুর ও তালের প্রতি মানুষের আকর্ষণ তার আদিম জৈবিক তাড়নারই একটি মার্জিত রূপ। আধুনিক মনোবিজ্ঞানও স্বীকার করে যে, সঙ্গীত মানুষের মস্তিষ্কের ডোপামিন নিঃসরণ বাড়িয়ে মানসিক প্রশান্তি দান করে এবং স্নায়বিক জটিলতা নিরসনে থেরাপি হিসেবে কাজ করে।
তবে এই সর্বজনীন মানবিক সম্পদ ও সৃজনশীলতার চরম উৎকর্ষকে যখন কোনো ধর্মীয় আদর্শ ‘পাপ’ বা ‘শয়তানের কাজ’ হিসেবে চিহ্নিত করে, তখন তা কেবল ব্যক্তিস্বাধীনতার ওপর হস্তক্ষেপ নয়, বরং সামগ্রিক মানব সংস্কৃতির অগ্রগতির পথে এক বিশাল অন্তরায় হয়ে দাঁড়ায়। ইসলামি ধর্মতত্ত্বে গান ও বাদ্যযন্ত্রকে যেভাবে নৈতিক অবক্ষয় এবং পরকালীন শাস্তির কারণ হিসেবে চিত্রায়িত করা হয়েছে, তা আধুনিক বিচারবুদ্ধি ও মননশীলতার নিরিখে অত্যন্ত রক্ষণশীল এবং পশ্চাৎপদ। সপ্তম শতকের আরবের মরুময় প্রেক্ষাপটে গড়ে ওঠা কিছু ব্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দকে যখন মহান স্রষ্টার অলঙ্ঘনীয় বিধান হিসেবে চাপিয়ে দেওয়া হয়, তখন তা সমাজকে এক প্রকার সাংস্কৃতিক স্থবিরতার দিকে ঠেলে দেয়। এই প্রবন্ধে আমরা দেখার চেষ্টা করব কীভাবে ধর্মীয় টেক্সটগুলো সঙ্গীতের মতো একটি স্বাভাবিক মানবিক প্রবৃত্তিকেও অপরাধ হিসেবে গণ্য করে মানুষের সৃষ্টিশীলতাকে অবরুদ্ধ করেছে।
হাদিসের বক্তব্যঃ গানবাজনাকারীর প্রতি নবীর লানত
আসুন এই সম্পর্কে হাদিসে কি বলা আছে দেখে নেয়া যাক,
সহীহ বুখারী (তাওহীদ)
অধ্যায়ঃ ৭৪/ পানীয়
৭৪/৬. যে ব্যক্তি মদকে ভিন্ন নামে নামকরণ ক’রে তা হালাল মনে করে।
৫৫৯০. ‘আবদুর রহমান ইবনু গানাম আশ’আরী (রহ.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমার নিকট আবূ আমির কিংবা আবূ মালিক আশ’আরী বর্ণনা করেছেন। আল্লাহর কসম! তিনি আমার কাছে মিথ্যে কথা বলেননি। তিনি নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বলতে শুনেছেনঃ আমার উম্মাতের মধ্যে অবশ্যই এমন কতগুলো দলের সৃষ্টি হবে, যারা ব্যভিচার, রেশমী কাপড়, মদ ও বাদ্যযন্ত্রকে হালাল জ্ঞান করবে। তেমনি এমন অনেক দল হবে, যারা পাহাড়ের ধারে বসবাস করবে, বিকাল বেলায় যখন তারা পশুপাল নিয়ে ফিরবে তখন তাদের নিকট কোন অভাব নিয়ে ফকীর আসলে তারা বলবে, আগামী দিন সকালে তুমি আমাদের নিকট এসো। এদিকে রাতের অন্ধকারেই আল্লাহ তাদের ধ্বংস করে দেবেন। পর্বতটি ধ্বসিয়ে দেবেন, আর বাকী লোকদেরকে তিনি ক্বিয়ামাতের দিন পর্যন্ত বানর ও শূকর বানিয়ে রাখবেন। (আধুনিক প্রকাশনী- ৫১৮০, ইসলামিক ফাউন্ডেশন- ৫০৭৬)
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
হাদীস সম্ভার
অধ্যায়ঃ ২২/ নিষিদ্ধ কার্যাবলী
পরিচ্ছেদঃ গান-বাজনা ও নাচ
(২৩০৯) আনাস (রাঃ) কর্তৃক বর্ণিত, আল্লাহর রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, অবশ্যই আমার উম্মতের মাঝে (কিছু লোককে) মাটি ধসিয়ে, পাথর বর্ষণ করে এবং আকার বিকৃত করে (ধ্বংস করা) হবে। আর এ শাস্তি তখন আসবে, যখন তারা মদ পান করবে, নর্তকী রাখবে এবং বাদ্যযন্ত্র বাজাবে।
(ইবনে আবিদ দুনয়া, সহীহুল জামে’ ৫৪৬৭)
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
আলেমদের বক্তব্যঃ আল্লাহ গানের শত্রু
আসুন এই বিষয়ে শায়খ আহমাদুল্লাহর বক্তব্য শুনে নেয়া যাক,
আসুন আরও একটি বক্তব্য শুনি,
সঙ্গীত নিষিদ্ধকরণে ইসলামি শরিয়তের ভূমিকা
ইসলামি শরিয়াহর বিধানে সঙ্গীতকে কেবল অপছন্দনীয় নয়, বরং অত্যন্ত হীন এবং পরকালীন ভয়াবহ শাস্তির কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এই নিষেধাজ্ঞার প্রধান ভিত্তি হলো বিভিন্ন হাদিস, যেখানে গান ও বাদ্যযন্ত্রকে নৈতিক স্খলনের সমার্থক করে তোলা হয়েছে। সহীহ বুখারীর বহুল আলোচিত বর্ণনা অনুযায়ী, নবী মুহাম্মদ ভবিষ্যৎবাণী করেছেন যে, এমন একদল লোক আসবে যারা ব্যভিচার, রেশমি কাপড় এবং মদ্যপানের পাশাপাশি বাদ্যযন্ত্রকেও ‘হালাল’ বা বৈধ মনে করবে। এই বর্ণনায় বাদ্যযন্ত্রকে খুব জঘন্য অপরাধের মত উপস্থাপন করা করা হয়েছে, যা সঙ্গীতের মতো একটি নান্দনিক শিল্পকে নৈতিকভাবে কলঙ্কিত করার এক চরম অপচেষ্টা।
আরও ভয়াবহ বিষয় হলো, সঙ্গীতচর্চাকারীদের জন্য যে শারীরিক ও অলৌকিক শাস্তির হুমকি দেওয়া হয়েছে, তা আধুনিক বিচারবুদ্ধিতে অত্যন্ত হাস্যকর এবং নিষ্ঠুর। বিভিন্ন বর্ণনায় পাওয়া যায় যে, যারা গায়িকা বা নর্তকী রাখবে এবং বাদ্যযন্ত্র বাজাবে, তাদের ওপর ভূমিধস, পাথর বর্ষণ এবং তাদের আকৃতি বিকৃত করে (বানর ও শূকরে রূপান্তর) ধ্বংস করা হবে। একটি সৃজনশীল কাজ বা বাদ্যযন্ত্রের সুর উপভোগ করার অপরাধে মানুষকে পশুর আকৃতিতে রূপান্তরিত করার এই আদিম ও পৌরাণিক ভীতি প্রদর্শন মূলত মানুষের স্বাধীন চিন্তাভাবনা এবং সাংস্কৃতিক স্পৃহার ওপর এক প্রকার মনস্তাত্ত্বিক সন্ত্রাস।
ইসলামি স্কলাররা, যেমন আধুনিক সময়ের শায়খ আহমাদুল্লাহ বা মুফতি ইব্রাহিম, এই প্রাচীন বিধানগুলোকেই কঠোরভাবে প্রচার করেন এবং দাবি করেন যে আল্লাহ গানের ‘দুশমন’ বা শত্রু। সঙ্গীতকে শয়তানের আওয়াজ হিসেবে অভিহিত করে তারা যে ধর্মীয় বয়ান তৈরি করেন, তা মূলত মানুষের সহজাত প্রবৃত্তি এবং আবেগের বহিঃপ্রকাশকে রুদ্ধ করে দেয়। যখন কোনো সমাজ বাদ্যযন্ত্রের সুরকে ‘হারাম’ বা নিষিদ্ধ বলে বিশ্বাস করতে শুরু করে, তখন সেখানে সৃজনশীলতার পরিবর্তে এক প্রকার শুষ্কতা ও অন্ধত্ব জেঁকে বসে। বাদ্যযন্ত্রের ধ্বনি মানুষকে আল্লাহর জিকির থেকে বিমুখ করে—এমন এক ঠুনকো অজুহাতে শিল্পের কণ্ঠরোধ করা কোনোভাবেই প্রগতিশীল সমাজের লক্ষণ হতে পারে না।
বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গিঃ শিশুর বিকাশ ও মানসিক স্বাস্থ্যে সঙ্গীত
ইসলামি রক্ষণশীল বয়ানে সঙ্গীতকে যেখানে ‘হৃদয়ে নিফাক বা কপটতা সৃষ্টিকারী’ হিসেবে অপবাদ দেওয়া হয়, আধুনিক বিজ্ঞান ও স্নায়ুবিজ্ঞান (Neuroscience) তার ঠিক উল্টো প্রমাণ দেয়। সঙ্গীত কেবল বিনোদন নয়, বরং এটি মস্তিষ্কের গঠনগত ও কার্যগত উন্নয়নে এক শক্তিশালী অনুঘটক। বিশেষ করে শিশুদের শৈশবকালীন বিকাশে সঙ্গীতের ভূমিকা অনস্বীকার্য। গবেষণায় দেখা গেছে, সঙ্গীতচর্চা বা বাদ্যযন্ত্রের প্রশিক্ষণ শিশুর মস্তিষ্কের ‘কর্পাস ক্যালোসাম’ (Corpus Callosum) নামক অংশটিকে আরও মজবুত করে, যা মস্তিষ্কের বাম ও ডান গোলার্ধের মধ্যে সংযোগ স্থাপন করে এবং বৌদ্ধিক সক্ষমতা বৃদ্ধি করে [1]।
শিশুদের ভাষা শিক্ষা এবং গাণিতিক দক্ষতা বৃদ্ধিতেও সঙ্গীতের ছন্দ ও তালের গভীর প্রভাব রয়েছে। সুরের চড়াই-উতরাই বুঝতে গিয়ে শিশুদের শ্রবণেন্দ্রিয় এবং স্মৃতিশক্তি যেভাবে শাণিত হয়, তা তাদের সামগ্রিক শিক্ষার ভিত গড়ে দেয়। হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণায় দেখা গেছে, সঙ্গীতের প্রশিক্ষণ শিশুদের আইকিউ (IQ) এবং শব্দভাণ্ডার বৃদ্ধিতে সরাসরি সহায়তা করে [2]। যেখানে ইসলামি বিধান বাদ্যযন্ত্রকে ‘শয়তানের বাঁশি’ বলে দূরে সরিয়ে রাখার নির্দেশ দেয়, সেখানে বিজ্ঞান বলছে যে, বাদ্যযন্ত্র বাজানো শিশুর সূক্ষ্ম পেশি সঞ্চালন (Fine motor skills) এবং আত্মবিশ্বাস বৃদ্ধিতে সহায়ক।
যৌক্তিকভাবে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, সঙ্গীত মানুষের স্ট্রেস হরমোন ‘কর্টিসল’-এর মাত্রা কমিয়ে দেয় এবং আনন্দদায়ক হরমোন ‘ডোপামিন’ ও ‘অক্সিটোসিন’ নিঃসরণ করে, যা সামাজিক বন্ধন ও সহমর্মিতা বৃদ্ধিতে কাজ করে। একটি শিশুকে যদি সঙ্গীতের এই অবারিত জগত থেকে ধর্মীয় ভয়ের দোহাই দিয়ে বিচ্ছিন্ন রাখা হয়, তবে তার শৈশব থেকে এক বিশাল সৃজনশীল জগত অপসারিত হয়। বাদ্যযন্ত্রের আওয়াজ শুনে মানুষের পাথর বা পশুতে রূপান্তরিত হওয়ার রূপকথা প্রচার করার চেয়ে শিশুদের হাতে গিটার বা বেহালা তুলে দেওয়া তাদের উন্নততর ও সুস্থ মস্তিষ্ক গঠনে অনেক বেশি কার্যকর। ইসলামের এই অযৌক্তিক নিষেধাজ্ঞা মূলত শিশুদের একটি পূর্ণাঙ্গ মানসিক ও সাংস্কৃতিক বিকাশ থেকে বঞ্চিত করার নামান্তর।
সাংস্কৃতিক শূন্যতা ও উগ্রবাদঃ সঙ্গীত নিষেধাঞ্জা ও তার সামাজিক কুফল
সমাজের সাংস্কৃতিক কাঠামো মূলত গড়ে ওঠে শিল্প, সাহিত্য এবং সঙ্গীতের মিথস্ক্রিয়ায়। যখন কোনো ধর্মীয় মতাদর্শ সঙ্গীতকে ‘হারাম’ বা নিষিদ্ধ হিসেবে ঘোষণা করে, তখন সেই সমাজ থেকে সৃজনশীল বিনোদনের পথগুলো রুদ্ধ হয়ে যায়। ইসলামি শরিয়াহর এই কঠোর বিধিনিষেধ সমাজে এক বিশাল সাংস্কৃতিক শূন্যতা (Cultural Vacuum) তৈরি করে। এই শূন্যস্থান কখনোই খালি থাকে না; বরং সুস্থ বিনোদন এবং শিল্পের অনুপস্থিতিতে সেখানে কট্টরবাদ, ধর্মীয় অন্ধত্ব এবং উগ্রবাদী চিন্তা জেঁকে বসে। মনস্তাত্ত্বিকভাবে এটি প্রমাণিত যে, মানুষ যখন তার আবেগ ও অনুভূতির শৈল্পিক বহিঃপ্রকাশের পথ খুঁজে পায় না, তখন তার মধ্যে এক প্রকার রুক্ষতা ও অসহিষ্ণুতা তৈরি হয়।
ইসলামের এই সঙ্গীত-বিদ্বেষী অবস্থান মূলত জঙ্গিবাদের তাত্ত্বিক ভিত্তি হিসেবে কাজ করে। সালাফি বা ওহাবি মতাদর্শের অনুসারীরা, যেমন তালেবান বা আইএস (ISIS), যখন কোনো অঞ্চল দখল করে, তখন তাদের প্রথম কাজই হয় বাদ্যযন্ত্র ভেঙে ফেলা এবং সঙ্গীতচর্চাকারীদের ওপর চড়াও হওয়া। তারা মনে করে, সঙ্গীত মানুষকে আল্লাহর স্মরণ থেকে বিমুখ করে এবং এটি শয়তানের প্ররোচনা [3]। এই ধরনের মধ্যযুগীয় দৃষ্টিভঙ্গি তরুণ সমাজকে সুস্থ মননশীলতা থেকে বিচ্ছিন্ন করে একটি বদ্ধ এবং অনুদার জীবনদর্শনে অভ্যস্ত করে তোলে।
গবেষণায় দেখা গেছে, সঙ্গীত ও শিল্পের চর্চা মানুষের মধ্যে সহমর্মিতা (Empathy) এবং সামাজিক মেলবন্ধন বৃদ্ধি করে। এর বিপরীতে, গান-বাজনাকে ‘ব্যভিচার’ বা ‘মদ’-এর সমতুল্য পাপ মনে করার শিক্ষা তরুণদের মনে শিল্পের প্রতি এক প্রকার ঘৃণা ও বিদ্বেষ তৈরি করে। এই ঘৃণা থেকেই জন্ম নেয় পরমতসহিষ্ণুতার অভাব এবং উগ্র উগ্র জাতীয়তাবাদ বা ধর্মীয় শ্রেষ্ঠত্ববাদ। সঙ্গীতকে ‘হারাম’ বলে মানুষের স্বাভাবিক মানবিক প্রবৃত্তিকে দমন করার এই প্রচেষ্টা মূলত সমাজকে এক অন্ধকার গহ্বরের দিকে ঠেলে দেয়, যেখানে যুক্তির চেয়ে অন্ধবিশ্বাস এবং তালের চেয়ে অস্ত্রের শব্দ বেশি প্রাধান্য পায়। সুস্থ ও প্রগতিশীল সমাজ বিনির্মাণে সঙ্গীতের অনুপস্থিতি মূলত ধর্মীয় ফ্যাসিবাদেরই জয়গান গায়।
ধর্মীয় সন্ত্রাসের কবলে সঙ্গীতঃ বাউল নিগ্রহ ও দক্ষিণ এশিয়ায় সঙ্গীত-বিদ্বেষ
ইসলামি ধর্মতত্ত্বে সঙ্গীতকে যে ‘হারাম’ বা নিষিদ্ধ হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে, তার ব্যবহারিক ও সহিংস প্রতিফলন আমরা দেখতে পাই বর্তমান বিশ্বের বিভিন্ন মুসলিম প্রধান অঞ্চলে। বিশেষ করে দক্ষিণ এশীয় জনপদে, যেখানে হাজার বছরের সুফি ও লোকজ সংস্কৃতির শেকড় অত্যন্ত গভীর, সেখানে ইসলামি মৌলবাদীরা সঙ্গীতকে লক্ষ্যবস্তু করে এক ভয়াবহ সাংস্কৃতিক আগ্রাসন চালিয়েছে। বাংলাদেশে লালন সাঁইয়ের অনুসারী বাউলদের ওপর মৌলবাদীদের বর্বরোচিত হামলা এবং তাদের জোরপূর্বক দাড়ি-চুল কেটে দেওয়া বা বাদ্যযন্ত্র ভেঙে ফেলার ঘটনাগুলো মূলত একই ধর্মীয় অন্ধত্ব থেকে উৎসারিত। বাউলদের “কাফের” ফতোয়া দিয়ে তাদের জীবনকে অতিষ্ঠ করে তোলা হয়েছে, যা বাঙালির আদি সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের মূলে কুঠারাঘাতের শামিল। আসুন দেখি মিডিয়াগুলোতে প্রচারিত বাংলাদেশের সাধারণ মুসলমানদের কিছু বক্তব্য,
বাংলাদেশে উদীচী বা ছায়ানটের মতো ঐতিহ্যবাহী সাংস্কৃতিক সংগঠনে বোমা হামলা এবং বিভিন্ন সময়ে বর্ষবরণ বা লোকজ উৎসবের অনুষ্ঠানে মৌলবাদী গোষ্ঠীর হুমকি ও বাধা সৃষ্টি করা এই সঙ্গীত-বিদ্বেষী মানসিকতারই বহিঃপ্রকাশ। আফগানিস্তানে তালেবানদের ক্ষমতা দখলের পর সেখানে বাদ্যযন্ত্র পুড়িয়ে দেওয়া এবং গান গাওয়ার অপরাধে শিল্পীদের ওপর চড়াও হওয়া প্রমান করে যে, মৌলবাদী ইসলামি শাসনে শিল্পের কোনো স্থান নেই। এমনকি পাকিস্তানে বিশ্বখ্যাত সঙ্গীতজ্ঞ নুসরাত ফতেহ আলী খানের মতো কালজয়ী শিল্পীদের বিরুদ্ধেও কট্টরপন্থী মোল্লারা বিভিন্ন সময়ে “হারাম” এবং “কুফরি”র ফতোয়া জারি করেছে [4]।
এই যে সঙ্গীতের প্রতি চরম ঘৃণা ও শিল্পীদের ওপর শারীরিক আক্রমণ, তা মূলত ইসলামি স্কলারদের প্রচারিত সেই প্রাচীন হাদিস ও বিধিবিধানের ফলশ্রুতি যা সঙ্গীতকে ব্যভিচারের সমতুল্য মনে করে। সৃজনশীলতাকে “শয়তানি” হিসেবে চিহ্নিত করে এই মৌলবাদীরা সমাজকে এমন এক মরুভূমিতে পরিণত করতে চায় যেখানে কোনো ছন্দ নেই, নেই কোনো প্রাণের স্পন্দন। প্রখ্যাত শিল্পীদের অপমান এবং বাদ্যযন্ত্র ধ্বংসের এই প্রবণতা কেবল একটি ধর্মের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণের চেষ্টা নয়, বরং এটি মানবাত্মার কণ্ঠরোধ করার এক পরিকল্পিত ষড়যন্ত্র।
উপসংহারঃ আধুনিক সমাজে প্রাচীন নিষেধাঞ্জা বনাম যৌক্তিক অগ্রগতি
পরিশেষে এটি স্পষ্ট যে, সপ্তম শতাব্দীর আরবের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপটে ব্যক্তিগত রুচি বা অপছন্দের ভিত্তিতে তৈরি হওয়া ধর্মীয় বিধানগুলোকে আধুনিক যুগের বৈজ্ঞানিক ও মননশীল মানদণ্ডে কোনোভাবেই বৈধতা দেওয়া যায় না। সঙ্গীত কেবল সুরের মূর্চ্ছনা নয়, এটি মানুষের বিবর্তনীয় ইতিহাসের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ এবং মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য এক অপরিহার্য থেরাপি। ইসলামি ধর্মতত্ত্বে সঙ্গীতকে ‘হারাম’ বা নিষিদ্ধ করার পেছনে যেসব যুক্তি বা হাদিস উপস্থাপন করা হয়, তার অধিকাংশেরই কোনো যৌক্তিক বা নৈতিক ভিত্তি নেই। বরং বাদ্যযন্ত্র বাজানোর অপরাধে মানুষকে পশুতে রূপান্তরের মতো অলৌকিক ভীতি প্রদর্শন মানুষের কাণ্ডজ্ঞান ও আত্মমর্যাদার ওপর এক চরম অবমাননা।
আধুনিক সমাজ যখন সঙ্গীতের মাধ্যমে অটিজম আক্রান্ত শিশুদের চিকিৎসা করছে, যখন মহাকাশ গবেষণায় সুরের প্রভাব নিয়ে কাজ হচ্ছে, তখন “বাদ্যযন্ত্র শয়তানের বাঁশি”—এমন মধ্যযুগীয় ধারণা পোষণ করা কেবল হাস্যকর নয়, বরং বিপজ্জনক। শিল্পের প্রতিটি শাখায় ধর্মের এই অযৌক্তিক হস্তক্ষেপ মানুষের স্বাধীন চিন্তা ও সৃজনশীলতাকে অঙ্কুরেই বিনষ্ট করে দেয়। একটি সমাজ তখনই প্রগতিশীল হয়ে ওঠে, যখন সেখানে শিল্পের চর্চা অবাধ থাকে এবং যেখানে মানুষ তার আবেগ প্রকাশের জন্য কোনো কাল্পনিক নরকের আগুনের ভয় পায় না।
ইসলামের এই সঙ্গীত-বিরোধী অবস্থান মূলত একটি বদ্ধ ও অনুদার সমাজ কাঠামোর প্রতিচ্ছবি। সুস্থ সাংস্কৃতিক বিকাশ এবং মানসিক উৎকর্ষের জন্য এই ধরনের পশ্চাৎপদ নিষেধাঞ্জা ভেঙে বেরিয়ে আসাই হবে আধুনিক সভ্যতার দাবি। সঙ্গীতকে ‘পাপ’ নয়, বরং মানুষের সৃজনশীলতার শ্রেষ্ঠতম বহিঃপ্রকাশ হিসেবে গ্রহণ করার মাধ্যমেই একটি সহনশীল, শান্তিকামী এবং বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে উন্নত সমাজ বিনির্মাণ করা সম্ভব। অন্ধবিশ্বাস ও ধর্মীয় গোঁড়ামিকে পেছনে ফেলে যুক্তিবাদ ও শিল্পের আলোয় সমাজকে আলোকিত করাই হোক আমাদের লক্ষ্য।
