
Table of Contents
ভূমিকাঃ আল্লাহর দাবাভীতি
মানুষের মস্তিষ্ক বিবর্তনের এক শ্রেষ্ঠতম ফসল, যার প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো কৌতুহল, বিশ্লেষণ এবং জটিল সমস্যার সমাধান খোঁজা। আধুনিক বিজ্ঞান ও মনোবিজ্ঞান দ্ব্যর্থহীনভাবে স্বীকার করে যে, দাবা বা শতরঞ্জ কেবল একটি খেলা নয়, বরং এটি মস্তিষ্কের জন্য একটি উৎকৃষ্ট ব্যায়াম যা আইকিউ (IQ) বৃদ্ধি, স্মৃতিশক্তি শাণিত করা এবং কৌশলগত চিন্তাভাবনার বিকাশে অপরিহার্য ভূমিকা পালন করে। অথচ এই বুদ্ধিবৃত্তিক উৎকর্ষের যুগেও আমাদের শুনতে হয় যে, দাবার গুটি ছোঁয়া নাকি ‘শূকরের গোশত ও রক্তে হাত রঞ্জিত করার’ সমান [1]! সপ্তম শতাব্দীর মরুভূমির এক সংকীর্ণ গণ্ডি থেকে উৎসারিত এই ধরণের হাদিসগুলো আধুনিক মানুষের জন্য যেমন হাস্যকর, তেমনি বুদ্ধিবৃত্তিক অগ্রগতির পথে এক চরম অন্তরায়।
ইসলামি শরীয়তে দাবা বা শতরঞ্জকে হারাম ঘোষণা করা হয়েছে মূলত একে ‘সময়ের অপচয়’ এবং ‘জুয়া’র সমতুল্য মনে করে। এমনকি অনেক হাদিসে একে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের সরাসরি অবাধ্যতা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। কিন্তু মজার ব্যাপার হলো, যে ধর্মগ্রন্থ নিজেকে কিয়ামত পর্যন্ত শ্রেষ্ঠ জীবনবিধান দাবি করে, তা মানুষের মস্তিষ্কের কার্যকারিতা বৃদ্ধির একটি বৈজ্ঞানিক মাধ্যমকে কেন নিষিদ্ধ করল, তা এক বিরাট রহস্য। যেখানে দাবা খেলা একজন শিশুকে ধৈর্য, দূরদর্শিতা এবং পরাজয় মেনে নেওয়ার মতো মহৎ গুণাবলী শেখায়, সেখানে এই খেলাকে নিষিদ্ধ করা মূলত মানুষের বুদ্ধিবৃত্তিক সম্ভাবনাকে গলা টিপে হত্যা করার নামান্তর। আধুনিক গবেষণায় যখন দেখা যাচ্ছে দাবা খেলা আলঝেইমার্সের মতো রোগ প্রতিরোধে সহায়ক, তখন তথাকথিত ‘সর্বজ্ঞ’ বিধান দাবার বোর্ডে শয়তানের উপস্থিতি খুঁজে পায়—যা এক চরম বৌদ্ধিক প্রহসন ছাড়া আর কিছুই নয়।
এই প্রবন্ধটি দাবার বৈজ্ঞানিক উপকারিতার বিপরীতে ইসলামি নিষেধাজ্ঞার সেই প্রাচীন ও রক্ষণশীল মানসিকতাকে ব্যবচ্ছেদ করবে। আমরা দেখবো কীভাবে একটি সৃজনশীল মাধ্যমকে ‘হারাম’ তকমা দিয়ে মানুষের চিন্তাশক্তিকে একটি নির্দিষ্ট খাঁচায় বন্দি করার চেষ্টা করা হয়েছে এবং কেন এই ধরণের নিষেধাজ্ঞাগুলো মূলত মানব মননশীলতার ওপর এক ধরণের আক্রমণ।
হাদিস এবং প্রাসঙ্গিক ফতোয়াসমূহ
আমরা যদি শিশুদেরকে বুদ্ধিবৃত্তিক উন্নতি, সমস্যা সমাধানের দক্ষতা এবং কৌশলগত চিন্তার বিকাশের জন্য উৎসাহিত করতে চাই, তবে এমন একটি খেলাকে নিষিদ্ধ করা কখনোই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। বরং শিশুদেরকে দাবা খেলার প্রতি উৎসাহী করা উচিত, যাতে তারা একটি মজবুত এবং সমৃদ্ধ বুদ্ধিমত্তার অধিকারী হতে পারে এবং ভবিষ্যতে জ্ঞানের আলোকে আলোকিত হয়ে উঠতে পারে।
গ্রন্থঃ মুয়াত্তা মালিক
অধ্যায়ঃ ৫২. স্বপ্ন সম্পর্কিত অধ্যায়
হাদিস নম্বরঃ ১৭৮৫
২. শতরঞ্জ খেলা প্রসঙ্গে
রেওয়ায়ত ৬. আবূ মূসা আশ’আরী (রাঃ) হইতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলিয়াছেন, যে ব্যক্তি শতরঞ্জ খেলা খেলিল, সে আল্লাহ ও আল্লাহর রাসূলের নাফরমানী করিল (অবাধ্য হইল)।(1)
নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সহধর্মিণী আয়েশা (রাঃ) হইতে বর্ণিত, তাহার বাড়ির একটি ঘরে কিছুসংখ্যক লোক বাস করিত। তিনি শুনিয়াছেন যে, উহাদের নিকট শতরঞ্জ রহিয়াছে। অতঃপর তিনি তাহাদের নিকট বলিয়া পাঠাইলেন, তোমরা উহা (শতরঞ্জ) দূর কর। অন্যথায় আমি তোমাদেরকে আমার ঘর হইতে বাহির করিয়া দিব। তিনি উহাকে অত্যন্ত খারাপ মনে করিয়াছেন।
(1) শতরঞ্জ বলিতে শুধু ছক্কা খেলাকেই বোঝায় না, বরং আমাদের দেশে প্রচলিত দাবা খেলা, তাস খেলা, বাঘ-গুটি খেলা ইত্যাদি সমস্তই ইহার অন্তর্ভুক্ত। এই সমস্ত খেলার মাধ্যমে পরস্পরের মধ্যে শক্রতাও পয়দা হয়। ইহাতে মত্ত হইয়া আল্লাহকে ভুলিয়া যায়, নামায কাযা হইয়া যায় এবং আরও নানা রকমের পাপাচারে লিপ্ত হয়। এক হাদীসে আছে, যে ব্যক্তি শতরঞ্জ খেলিয়াছে সে নিজের হস্তকে শূকরের গোশত ও রক্তে রঞ্জিত করিয়াছে। এই জন্য উলামায়ে কেরাম ইহাকে হারাম বলিয়াছেন। ইমাম আবূ হানীফা (রহঃ), ইমাম মালিক (রহঃ) ও আহমদ ইবনে হাম্বল (রহঃ) এই জাতীয় খেলাকে সম্পূর্ণরূপে হারাম বলিয়াছেন। ইমাম শাফিয়ী (রহঃ) বলেন যে, যদি এই খেলার কারণে আল্লাহর কোন ইবাদতে বিঘ্ন সৃষ্টি হয় কিংবা ইহা অভ্যাসে পরিণত হয়, তাহা হইলে ইহা হারাম, অন্যথায় মকরূহ তানযীহ। হাদিসের মানঃ তাহকীক অপেক্ষমাণ
মুয়াত্তা মালিক
৫২. স্বপ্ন সম্পর্কিত অধ্যায়
পরিচ্ছেদঃ ২. শতরঞ্জ খেলা প্রসঙ্গে
রেওয়ায়ত ৭. আবদুল্লাহ ইবন উমর (রাঃ) তাহার পরিবারের কাহাকেও শতরঞ্জ খেলিতে দেখিলে তাহাকে মারিতেন এবং শতরঞ্জ ভাঙ্গিয়া ফেলিতেন।
ইয়াহইয়া (রহঃ) বলেন, আমি মালিক (রহঃ) হইতে শুনিয়াছি, তিনি বলিয়াছেন, শতরঞ্জ খেলা ভাল নহে। তিনি উহাকে মাকরূহ মনে করিতেন। আমি (ইমাম) মালিক (রহঃ)-এর নিকট শ্রবণ করিয়াছি, তিনি বলিতেন যে, শতরঞ্জ খেলা, অপরাপর সকল অনর্থ এবং উদ্দেশ্যহীন খেলা মকরূহ। অতঃপর এই আয়াত তিলাওয়াত করিতেন (فَمَاذَا بَعْدَ الْحَقِّ إِلاَّ الضَّلاَلُ) (হক-এর পর পথভ্রষ্টতা ছাড়া আর কিছু নাই)।
হাদিসের মানঃ তাহকীক অপেক্ষমাণ
বর্ণনাকারীঃ আবদুল্লাহ ইবন উমর (রাঃ)
সহীহ মুসলিম (হাদীস একাডেমী)
৪২। কবিতা
পরিচ্ছেদঃ পরিচ্ছেদ নাই
হাদিস একাডেমি নাম্বারঃ ৫৭৮৯ , আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ২২৬০
৫৭৮৯-(১০/২২৬০) যুহায়র ইবনু হারব (রহঃ) ….. বুরাইদাহ (রাযিঃ) হতে বর্ণিত যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যে লোক পাশা খেলা খেলল, সে যেন তার হাত শুকরের মাংস ও রক্তে রঙিন করে তুলল। (ইসলামিক ফাউন্ডেশন ৫৬৯৯, ইসলামিক সেন্টার ৫৭৩১)
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ বুরায়দাহ ইবনু হুসাইব আল-আসলামী (রাঃ)
আল-আদাবুল মুফরাদ
জুয়া ও দাবা/পাশা খেলা
পরিচ্ছেদঃ ৬১৫- দাবা/পাশা খেলোয়াড়ের পাপ।
১২৮১। আবু মূসা আশআরী (রাঃ) থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ যে ব্যক্তি দাবা/পাশা খেললো সে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের বিরুদ্ধাচরণ করলো। (আবু দাউদ, ইবনে মাজাহ, আহমাদ, দারেমি, হাকিম, ইবনে হিব্বান)
হাদিসের মানঃ হাসান (Hasan)
বর্ণনাকারীঃ আবূ মূসা আল- আশ’আরী (রাঃ)
আল-আদাবুল মুফরাদ
জুয়া ও দাবা/পাশা খেলা
পরিচ্ছেদঃ ৬১৫- দাবা/পাশা খেলোয়াড়ের পাপ।
১২৮২। আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাঃ) বলেন, সাবধান! তোমরা এই চতুৰ্ভুজ টুকরায় পরিহার করো, যা নিক্ষেপ করা হয়। কারণ এই দু’টি জুয়ার অন্তর্ভুক্ত। (আহমাদ হাঃ ৪২৬৩)।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
আল-আদাবুল মুফরাদ
জুয়া ও দাবা/পাশা খেলা
পরিচ্ছেদঃ ৬১৫- দাবা/পাশা খেলোয়াড়ের পাপ।
১২৮৩। আবু বুরায়দা (রহঃ) থেকে তার পিতার সূত্রে বর্ণিত। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ যে ব্যক্তি দাবা/পাশা খেললো সে যেন তার হাত শূকরের মাংস ও রক্তে রঞ্জিত করলো। (মুসলিম, আবু দাউদ, ইবনে মাজাহ, মুয়াত্তা মালিক)
হাদিসের মানঃ হাসান (Hasan)
আল-আদাবুল মুফরাদ
জুয়া ও দাবা/পাশা খেলা
পরিচ্ছেদঃ ৬১৫- দাবা/পাশা খেলোয়াড়ের পাপ।
১২৮৪। আবু মূসা আশআরী (রাঃ) থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ যে ব্যক্তি দাবা/পাশা খেললো সে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের বিরুদ্ধাচরণ করলো। (আবু দাউদ, ইবনে মাজাহ, আহমাদ, দারিমী, হাকিম, ইবনে হিব্বান)
হাদিসের মানঃ হাসান (Hasan)
এবারে আসুন শ্রেষ্ঠতম মুহাদ্দিস আল্লামা আলবানীর একটি ফতোয়া পড়ে নিই [2]
প্রশ্ন ৪৫৭: তাস, দাবা ও পাশা খেলার বিধান কী?
জবাব: তাস কাফিরদের খেলা। তাসের গায়ে থাকা অনেক ছবিতে কাফিরেরা নিজেদের আকীদা ও শিরক অঙ্কন করে রাখে। বাজি ছাড়াও তাস খেলা কমপক্ষে মাকরূহ। কারণ, এতে ছবি থাকে এবং এই খেলায় ধ্যান-জ্ঞান সব ঢেলে দেওয়া হয়।
আলী থেকে বর্ণিত এক হাদীসের কথা এখন মনে পড়ছে, তিনি একদল লোকের পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন যারা দাবা খেলছিল। তিনি তাদের বলেন, এসব কেমন মূর্তি যার সামনে তোমরা ঝুঁকে আছো?
কারণ, দাবা ঘোড়ার মতো মূর্তি। তাস খেলার কয়েক প্রকার আছে। এক প্রকার তাস খেলা মনকে অমনোযোগী ও ব্যতিব্যস্ত করে রাখে। আর আরেক প্রকার খেলায় বাজি থাকে। বাজি থাকলে তা পাশা খেলার সদৃশ হবে। আর পাশা খেলা হারাম হওয়ার ব্যাপারে স্পষ্ট সহীহ হাদীস আছে। সহীহ মুসলিমে বর্ণিত আছে, নবী বলেন,
مَنْ لَعِبَ بِالنَّرْدَشِيرِ فَكَأَنَّمَا صَبَغَ يَدَهُ فِي لَحْمِ خِنْزِيرٍ وَدَمِهِ
যে-ব্যক্তি পাশা খেলে সে যেন শুকরের মাংস ও রক্তের মধ্যে হাত ডুবিয়ে দেয়। ১৮৭২
আর যে তাস খেলায় মন অন্যান্য কিছু থেকে অমনোযোগী হয়ে যায় সেই তাস খেলার বিধান দাবার মতো, মাকরূহ। যারা দাবা খেলায় আক্রান্ত তাদের পরামর্শ দেব, তারা যেন ছোটো মূর্তিগুলোর মাথা কেটে ফেলে।
মূলনীতি হচ্ছে, যে-কোনো খেলা হোক, তাতে মূর্তি ও ছবি থাকলে, তা থেকে দূরে থাকা ওয়াজিব। আর যেসব খেলায় মূর্তি বা ছবি থাকবে না তা মাঝেমধ্যে চিত্তবিনোদনের জন্য খেলা জায়েয। তবে তা এমন অভ্যাসে পরিণত করা যাবে না যে, তাতেই তার সময় ব্যয় হবে এবং সালাত ও পরিবার থেকে গাফেল হয়ে পড়বে। এমন অভ্যাস হয়ে গেলে তা মদের মতো হয়ে যাবে, যা মানুষকে সালাত ও যিকর থেকে দূরে রাখে। ৮৭৩

দাবা খেলা বিষয়ে আলেমগণের ওয়াজ
আসুন একজন আলেমের বক্তব্য শুনি,
মস্তিষ্ক-ব্যায়ামাগার বনাম আল্লাহর সংকীর্ণতা
আধুনিক নিউরোসায়েন্স এবং শিক্ষাসংক্রান্ত মনোবিজ্ঞান দাবা খেলাকে কেবল একটি ‘বোর্ড গেম’ হিসেবে দেখে না, বরং একে মানুষের মস্তিষ্কের জন্য একটি পূর্ণাঙ্গ ‘জিমনেসিয়াম’ বা ব্যায়ামাগার হিসেবে গণ্য করে। গত কয়েক দশকের অজস্র বৈজ্ঞানিক গবেষণা প্রমাণ করেছে যে, দাবা খেলা মস্তিষ্কের উভয় গোলার্ধকে (Left and Right Hemispheres) সমানভাবে সক্রিয় করে। অথচ যে সময় আধুনিক বিজ্ঞান দাবার মাধ্যমে মানুষের মেধার বিস্ফোরণ ঘটাচ্ছে, ঠিক সেই সময়ে তথাকথিত ‘ঐশী বিধান’ এবং মদীনার প্রাচীন ফতোয়াগুলো দাবার গুটির মধ্যে ‘শূকরের গোশত ও রক্তের’ নাপাকি খুঁজে পাচ্ছে। বিজ্ঞানের প্রখর আলোকবর্তিকার সামনে এই ধরণের মধ্যযুগীয় দৃষ্টিভঙ্গি যে কতটা হাস্যকর ও করুণ, তা নিচের পয়েন্টগুলো বিশ্লেষণ করলেই পরিষ্কার হয়ে যায়:
ভেনেজুয়েলার এক বিশাল গবেষণায় দেখা গেছে, মাত্র চার মাস নিয়মিত দাবা খেলার পর কয়েক হাজার শিক্ষার্থীর আইকিউ উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। দাবা খেললে মানুষের মস্তিষ্কের ‘নিউরোপ্লাস্টিসিটি’ বা কোষের সংযোগ বৃদ্ধি পায়। অথচ যে খেলা মানুষের বুদ্ধিবৃত্তিক মানদণ্ডকে উঁচুতে নিয়ে যায়, তাকে ‘আল্লাহর নাফরমানি’ হিসেবে চিহ্নিত করাটা মানুষের বুদ্ধিবৃত্তিক বিবর্তনের ইতিহাসের প্রতি এক চরম উপহাস। প্রশ্ন ওঠে, মানুষের বুদ্ধি বাড়লে আল্লাহর কী এমন ক্ষতি হয় যে তাকে এটি নিষিদ্ধ করতে হবে? যুক্তি বুদ্ধি কাজ করতে শুরু করলেই মানুষ প্রশ্ন করতে শুরু করবে, যেই প্রশ্ন অন্ধ আনুগত্যের অন্তরায়? অর্থাৎ বুদ্ধিমান ও কৌশলী মানুষ তৈরি হওয়ার চেয়ে মস্তকহীন অনুগত ‘গোলাম’ তৈরি করাই এই শরিয়তের মূল লক্ষ্য?
দাবা খেলার সময় খেলোয়াড়কে প্রতিপক্ষের চাল বুঝতে হয় এবং অন্তত ১০-১৫ চাল পরের ফলাফল নিয়ে ভাবতে হয়। এটি মস্তিষ্কের ‘প্রি-ফ্রন্টাল কর্টেক্স’ (Prefrontal Cortex) নামক অংশকে শাণিত করে, যা মূলত মানুষের বিচারবুদ্ধি, পরিকল্পনা এবং আত্মনিয়ন্ত্রণ পরিচালনা করে। যেখানে বিজ্ঞান বলছে দাবা খেললে শিশুরা অধিকতর ধৈর্যশীল এবং দূরদর্শী হয়ে ওঠে, সেখানে হাদিসগুলো এবং ইসলামি স্কলাররা মনে করেন, এটি মানুষকে ‘নামাজ থেকে গাফেল’ করে দেয়। এক বিস্ময়কর কৌতুক! যে খেলা মানুষের আত্মনিয়ন্ত্রণ শেখায়, তাকেই কিনা ‘নৈতিক পদস্খলন’ হিসেবে তকমা দেওয়া হচ্ছে। আসলে যে সমাজ যুক্তিবুদ্ধির চেয়ে অন্ধ আবেগকে প্রাধান্য দেয়, সেই সমাজের কাছে দাবার প্রতিটি চাল এক একটি ‘বিপজ্জনক বিদ্রোহ’ ছাড়া আর কিছুই নয়।
নিউপ ইংল্যান্ড জার্নাল অফ মেডিসিন-এর এক গবেষণায় দেখা গেছে, ৭৫ বছরের ঊর্ধ্বের ব্যক্তিদের মধ্যে যারা নিয়মিত দাবা খেলেন, তাদের স্মৃতিভ্রংশ বা আলঝেইমার্স হওয়ার সম্ভাবনা অন্যদের তুলনায় অনেক কম। অর্থাৎ দাবা একটি জীবনরক্ষাকারী বৌদ্ধিক টুল। অথচ সহীহ হাদিসের ভাষ্যমতে, দাবার গুটি ছোঁয়া মানে হলো নিজের হাতকে ‘শূকরের রক্তে রঞ্জিত করা’ [3]। যে গুটি আপনার মস্তিষ্ককে সচল রাখছে, তাকে কেন এমন একটি স্থূল ও কুসংস্কারাচ্ছন্ন উপমার সাথে তুলনা করা হলো? এটি কি স্রষ্টার কোনো প্রজ্ঞা, নাকি তৎকালীন আরবের মরুভূমিতে যারা শূকর আর রক্তের বাইরে আর কিছু কল্পনা করতে পারতেন না, তাদের মানসিক দৈন্যের প্রতিফলন?
ইসলামি শরিয়তের সবচেয়ে বড় অভিযোগ হলো দাবা ‘সময়ের অপচয়’ ঘটায়। কিন্তু মজার বিষয় হলো, প্রতিদিন পাঁচবার তসবিহ টেপা বা অর্থ না বুঝে তোতা পাখির মতো শ্লোক আওড়ানোকে ইসলামে সময়ের শ্রেষ্ঠ ব্যবহার মনে করা হয়। অথচ দাবার বোর্ডে যখন একজন মানুষ জটিল গাণিতিক ও কৌশলগত সমস্যার সমাধান করে, তখন তাকে ‘গুনাহ’ হিসেবে গণ্য করা হয়। এটি স্পষ্টত নির্দেশ করে যে, ধর্ম চায় মানুষ তার সময়কে ব্যয় করুক কেবল পারলৌকিক কল্পনায়, ইহজাগতিক বুদ্ধিবৃত্তিক কোনো বিনিয়োগে নয়।
দাবার মতো একটি বিজ্ঞানসম্মত ও মননশীল খেলাকে হারাম ঘোষণা করা মূলত মানব মস্তিষ্কের অমিত সম্ভাবনাকে অস্বীকার করার নামান্তর। দাবা মানুষের চিন্তাশক্তিকে শৃঙ্খলমুক্ত করে, আর শরিয়ত চায় মানুষকে শৃঙ্খলিত রাখতে। এই দুইয়ের দ্বন্দ্বে শেষ পর্যন্ত দাবার চালই মানুষের জয়গান গায়, আর ফতোয়াগুলো রয়ে যায় ইতিহাসের ধুলোপড়া ডাস্টবিনে এক একটি হাস্যকর জোকস হয়ে।
আয়েশার ঘর এবং আলবানীর অন্ধকার প্রকোষ্ঠ
ইসলামি শরিয়তের ইতিহাসে বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চাকে অপরাধ হিসেবে গণ্য করার এক অনন্য নিদর্শন হলো দাবা বা শতরঞ্জ নিষিদ্ধকরণ। এই সম্পর্কিত হাদিস ও ফতোয়াগুলো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এই নিষেধাজ্ঞাগুলো কোনো উন্নত নৈতিকতা থেকে আসেনি, বরং এসেছে এক ধরণের ‘বৌদ্ধিক ভীতি’ এবং চরম অনুৎপাদনশীল মানসিকতা থেকে। যে ধর্ম নিজেকে বিজ্ঞানের সমর্থক বলে দাবি করে, তার মূল স্তম্ভগুলো কীভাবে একটি নির্দোষ বোর্ড গেমকে কেন্দ্র করে রণচণ্ডী মূর্তি ধারণ করে, তা নিচের বিশ্লেষণে স্পষ্ট হবে:
মুয়াত্তায় মালিকের হাদিসে দেখা যায়, নবীর সহধর্মিণী আয়েশা জানতে পারেন যে তার ঘরের একটি অংশে বসবাসকারী কিছু লোকের কাছে শতরঞ্জ রয়েছে। তিনি সাথে সাথে হুমকি দিলেন যে, হয় শতরঞ্জ দূর করো, না হয় ঘর ছাড়ো। স্যাটায়ারিক্যালি বললে, মদিনার সেই সময়কার সামাজিক প্রেক্ষাপটে দাসপ্রথা কিংবা যুদ্ধের ভয়াবহতা নিয়ে হয়তো ততটা উদ্বেগ ছিল না, যতটা উদ্বেগ ছিল কাঠের কয়েকটা গুটি নিয়ে। একজন মানুষের বুদ্ধিবৃত্তিক শখকে কেন্দ্র করে তাকে ঘরছাড়া করার এই প্রবণতা মূলত নির্দেশ করে যে, তৎকালীন ধর্মীয় কাঠামোয় ‘চিন্তাশীলতা’র চেয়ে ‘আনুগত্য’ বেশি গুরুত্বপূর্ণ ছিল।
আল্লামা আলবানী তার ফতোয়ায় দাবি করেছেন যে, দাবা খেলা কেবল জুয়া হওয়ার কারণেই হারাম নয়, বরং এটি এমনিতেই হারাম। আধুনিক যুগের একজন তথাকথিত ‘বিদ্বান’ যখন দেখেন যে দাবা মানুষের আইকিউ বাড়াচ্ছে, তখন তিনি একে ‘সময়ের অপচয়’ বলে নিষিদ্ধ করেন। অথচ এই একই স্কলাররা ঘণ্টার পর ঘণ্টা ওযু-গোসলের পানির পরিমাণ কিংবা কবরের আযাবের লোমহর্ষক গালগল্প শোনাতে সময় ব্যয় করাকে ‘ইবাদত’ মনে করেন। দাবার বোর্ডে যখন একজন মানুষ তার স্মৃতিশক্তি আর দূরদর্শিতা প্রয়োগ করে, তখন আলবানী সাহেবদের মতে সেটা ‘শয়তানি’ কাজ। আসলে যে ধর্ম চায় মানুষ প্রশ্নহীনভাবে সব মেনে নিক, সেই ধর্মের কাছে দাবার মতো ‘অ্যানালিটিক্যাল’ গেম সবসময়ই একটি হুমকি হিসেবে আবির্ভূত হবে এটাই স্বাভাবিক।
হাদিসে বর্ণিত আছে, যে ব্যক্তি শতরঞ্জ খেলল সে যেন তার হাতকে ‘শূকরের গোশত ও রক্তে রঞ্জিত করল’ [3]। একজন যৌক্তিক মানুষের কাছে এই উপমাটি কেবল স্থূলই নয়, বরং হাস্যকর। কাঠের বা প্লাস্টিকের দাবার গুটির সাথে শূকরের রক্তের জৈবিক সম্পর্ক কোথায়? এটি আসলে এক ধরণের ‘মনস্তাত্ত্বিক আতঙ্ক’ (Fear-mongering) তৈরির অপচেষ্টা। যেহেতু আরবের মানুষ শূকরকে ঘৃণা করত, তাই বুদ্ধিবৃত্তিক একটি খেলাকে ঘৃণ্য প্রমাণ করতে এই নোংরা উপমাটি ব্যবহার করা হয়েছে। এটি কোনো ঐশী প্রজ্ঞা নয়, বরং বিরোধী মত বা বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চাকে দমিয়ে রাখার জন্য এক ধরণের ‘ডিহিউম্যানাইজেশন’ কৌশল।
ইসলামি স্কলারদের মতে, দাবা খেলা মানুষকে ‘নামাজ থেকে গাফেল’ করে দেয় এবং জান্নাত যাওয়ার পথ কঠিন করে। প্রশ্ন হলো, জান্নাত কি কেবল মস্তকহীন বা চিন্তাহীন মানুষদের জন্য সংরক্ষিত? যদি দাবা খেলা বুদ্ধি বাড়ায় এবং বুদ্ধি বাড়লে মানুষ ধর্মের অযৌক্তিক দিকগুলো ধরতে পারে, তবে কি আল্লাহ বুদ্ধিমান মানুষদের জান্নাতে নিতে ভয় পান? দাবার একটি চাল দিতে যে পরিমাণ মস্তিষ্কের পরিশ্রম হয়, তা শত শত অন্ধ তসবিহ টেপার চেয়েও অনেক বেশি উন্নত। কিন্তু শরিয়ত চায় মানুষ কেবল ‘তাকদীরের’ ওপর ভরসা করে বসে থাকুক, নিজের বুদ্ধিবলে দাবার কিস্তিমাত করা শিখলে পাছে সে স্রষ্টাকেও কিস্তিমাত করে বসে!
পরিশেষে, আইশা (রা.) থেকে শুরু করে আলবানী পর্যন্ত—এই নিষেধাজ্ঞার ধারাবাহিকতা প্রমাণ করে যে, রক্ষণশীল ধর্মব্যবস্থা সবসময়ই মানুষের মস্তিষ্কের স্বাধীন বিকাশকে ভয় পেয়ে এসেছে। দাবার বোর্ডে যেখানে রাজার পতন ঘটে এক বুদ্ধিবৃত্তিক কৌশলে, সেখানে ফতোয়াবাজরা ভয় পায় তাদের ‘ঈমানি সাম্রাজ্য’ বুঝি ধসে পড়ে দাবার একটি সাধারণ কিস্তিতে।
উপসংহারঃ দাবার কিস্তিমাত বনাম ফতোয়ার অসারতা
দাবা কেবল একটি বিনোদনের মাধ্যম নয়, বরং এটি মানুষের মস্তিষ্কের বিবর্তনীয় সক্ষমতার এক শৈল্পিক বহিঃপ্রকাশ। যেখানে আধুনিক বিজ্ঞান দাবার প্রতিটি চালকে বিশ্লেষণাত্মক ক্ষমতা, ধৈর্য এবং দূরদর্শিতার মাপকাঠি হিসেবে বিবেচনা করে, সেখানে সপ্তম শতাব্দীর মরুভূমি থেকে আসা প্রাচীন বিধানগুলো একে ‘শূকরের রক্তে হাত ভেজানো’র মতো নোংরা উপমায় বিদ্ধ করে। এই বৈপরীত্যটিই বলে দেয় যে, ইসলামি শরিয়তের অগ্রাধিকারের তালিকায় মানুষের বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশ বা মননশীলতা কখনো গুরুত্ব পায়নি। বরং সৃজনশীলতাকে ‘শয়তানি’ আর বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চাকে ‘নাফরমানি’ হিসেবে তকমা দেওয়া হয়েছে যাতে মানুষ যুক্তিবাদী হওয়ার পরিবর্তে চিরকাল প্রশ্নহীন আনুগত্যের শৃঙ্খলে আবদ্ধ থাকে।
একদিকে বিজ্ঞান বলছে, দাবার গুটিগুলো শিশুদের আইকিউ (IQ) বাড়ায়, তাদের সমস্যা সমাধানের দক্ষতাকে শাণিত করে এবং ভবিষ্যতে তাদের একজন দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলে। অন্যদিকে, আলবানী কিংবা আহমাদুল্লাহদের মতো তথাকথিত স্কলাররা একে ‘সময়ের অপচয়’ বলে নিষিদ্ধ করেন। অথচ প্রতিদিন কয়েক ঘণ্টা ধরে তসবিহ টেপা কিংবা অলৌকিক গালগল্প জ্বীন ফেরেশতার কেচ্ছাকাহিনী শোনাকে তারা সময়ের শ্রেষ্ঠ ব্যবহার হিসেবে দাবি করেন। এই দ্বিচারিতা স্পষ্ট করে দেয় যে, ধর্ম চায় মানুষ কেবল পারলৌকিক কল্পনায় মগ্ন থাকুক, ইহজাগতিক বুদ্ধিবৃত্তিক বিনিয়োগে নয়। কারণ, দাবার বোর্ডে যে মানুষটি প্রতিপক্ষকে কিস্তিমাত করার ক্ষমতা রাখে, সেই মানুষটি একদিন ধর্মের অযৌক্তিক গণ্ডিগুলোকেও চিনে ফেলার ক্ষমতা অর্জন করবে—আর এটাই হলো ফতোয়াবাজদের আসল ভয়।
একটি সমৃদ্ধ ও উন্নত সমাজ গড়তে হলে আমাদের শিশুদেরকে ভয়ের সংস্কৃতি থেকে বের করে এনে যুক্তির আলোয় আলোকিত করতে হবে। দাবার বোর্ডটি কেবল ৬৪টি ঘরের সমষ্টি নয়, বরং এটি একটি ক্ষুদ্র যুদ্ধক্ষেত্র যেখানে অস্ত্র নয়, মেধা আর কৌশল দিয়ে জয়ী হতে হয়। শিশুদেরকে এই বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চায় বাধা দেওয়া মানে তাদের ভবিষ্যতের সম্ভাবনাকে গলা টিপে হত্যা করা। ধর্ম যখন বুদ্ধিবৃত্তিক উৎকর্ষকে ‘হারাম’ ঘোষণা করে, তখন সেই ধর্মের অসারতা প্রমাণে দাবার একটি সাধারণ ‘কিস্তিমাত’ই যথেষ্ট।
পরিশেষে বলা যায়, দাবার কিস্তিমাত কেবল একটি খেলা নয়, এটি অন্ধত্বের বিরুদ্ধে মেধার বিজয়। যুক্তি, বিজ্ঞান এবং মানবিক উন্নয়ন কোনো গণতন্ত্র নয় যে সংখ্যাগরিষ্ঠের বিশ্বাসে তা পরিবর্তিত হবে। সত্য সেটাই যা তথ্যের ভিত্তিতে প্রমাণিত, আর তথ্য বলছে—দাবা মানুষকে উন্নত করে, আর শরিয়তের এই অযৌক্তিক নিষেধাজ্ঞা মানুষকে পেছনে টানে। এখন সিদ্ধান্ত আমাদের, আমরা কি আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে মরুভূমির ধুলোপড়া ফতোয়ায় বন্দি রাখব, নাকি দাবার বোর্ডের মতো বিশাল এক বুদ্ধিবৃত্তিক দিগন্তে ডানা মেলতে সাহায্য করব?
