ইসলামে ডেডবডির পোস্টমর্টেম করা সম্পূর্ণ হারাম

ভূমিকা

পোস্টমর্টেম বা ময়নাতদন্ত হলো মৃতদেহের বাহ্যিক ও অভ্যন্তরীণ পরীক্ষা-নিরীক্ষা করার একটি বৈজ্ঞানিক প্রক্রিয়া। এর মূল লক্ষ্য হলো মৃত্যুর সুনির্দিষ্ট কারণ, সময় এবং পরিস্থিতি বৈজ্ঞানিকভাবে নির্ধারণ করা। এই প্রক্রিয়াটি সাধারণত দক্ষ প্যাথলজিস্ট বা ফরেনসিক বিশেষজ্ঞদের দ্বারা পরিচালিত হয়। পোস্টমর্টেম শব্দটি লাতিন ভাষা থেকে এসেছে, যার আক্ষরিক অর্থ হলো “মৃত্যুর পর” [1]

এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে চিকিৎসক ও তদন্তকারী কর্মকর্তারা নিশ্চিত হতে পারেন যে, মৃত্যুটি কি বার্ধক্যজনিত স্বাভাবিক মৃত্যু ছিল, নাকি এর পেছনে কোনো শারীরিক আঘাত, বিষক্রিয়া কিংবা অন্য কোনো অস্বাভাবিক কারণ রয়েছে। এটি কেবল চিকিৎসাবিজ্ঞানের একটি অংশ নয়, বরং আধুনিক বিচারব্যবস্থা এবং জনস্বাস্থ্যের সুরক্ষার জন্য একটি অপরিহার্য স্তম্ভ।

অপ্রত্যাশিত বা সন্দেহজনক মৃত্যুর ক্ষেত্রে পোস্টমর্টেমই একমাত্র নির্ভরযোগ্য পদ্ধতি যা মৃত্যুর রহস্যকে আলোর সামনে নিয়ে আসে। যখন কোনো সুস্থ মানুষ হঠাৎ মারা যান কিংবা কোনো মৃতদেহের শরীরে বাহ্যিক কোনো আঘাতের চিহ্ন পাওয়া যায় না, তখন পোস্টমর্টেমের মাধ্যমেই শরীরের অভ্যন্তরের সূক্ষ্ম পরিবর্তনগুলো শনাক্ত করা সম্ভব হয়। এটি মূলত সত্য অনুসন্ধানের একটি পদ্ধতি যা কেবল অনুমানের ওপর ভিত্তি না করে প্রমাণের ওপর গুরুত্ব দেয়।


পোস্টমর্টেমের প্রয়োজনীয়তাঃ যুক্তি ও তথ্য-প্রমাণ

পোস্টমর্টেম কেবল একটি লাশের ব্যবচ্ছেদ নয়, বরং এর গুরুত্ব বহুমুখী। নিচে এর বৈজ্ঞানিক, আইনি এবং সামাজিক প্রয়োজনীয়তাগুলো যৌক্তিকভাবে বিশ্লেষণ করা হলো:

অপরাধ শনাক্তকরণ ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা
একটি সভ্য সমাজে অপরাধীকে শাস্তি দিতে হলে অকাট্য প্রমাণের প্রয়োজন হয়। কোনো ব্যক্তিকে যদি বিষ খাইয়ে মারা হয় কিংবা শ্বাসরোধ করা হয়, তবে অনেক সময় বাইরে থেকে তা বোঝা অসম্ভব। পোস্টমর্টেমের মাধ্যমে ফরেনসিক বিশেষজ্ঞরা পাকস্থলীর উপাদান, রক্ত এবং টিস্যু পরীক্ষা করে বিষের উপস্থিতি বা অভ্যন্তরীণ রক্তক্ষরণ শনাক্ত করতে পারেন [2]। যদি পোস্টমর্টেম না করা হতো, তবে বহু খুনি ‘স্বাভাবিক মৃত্যু’র অজুহাতে পার পেয়ে যেত, যা ন্যায়বিচারকে অসম্ভব করে তুলত।
জনস্বাস্থ্য ও মহামারি নিয়ন্ত্রণ
নতুন কোনো রোগ বা অজানা ভাইরাসের সংক্রমণ বুঝতে পোস্টমর্টেম অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। উদাহরণস্বরূপ, ২০১৯ সালে কোভিড-১৯ মহামারির শুরুতে মৃতদেহের ময়নাতদন্তের মাধ্যমেই চিকিৎসকরা ফুসফুসের মারাত্মক ক্ষতির ধরন এবং রক্ত জমাট বাঁধার মতো সমস্যাগুলো বুঝতে পেরেছিলেন [3]। এটি আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞানের উন্নয়নের অন্যতম ভিত্তি, যা জীবিত লক্ষ লক্ষ মানুষের জীবন বাঁচাতে ওষুধ ও ভ্যাকসিন তৈরিতে সহায়তা করে।
বংশগত রোগ শনাক্তকরণ
অনেক সময় পোস্টমর্টেমের ফলে এমন কিছু জেনেটিক বা বংশগত রোগ ধরা পড়ে যা মৃত ব্যক্তির পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের মধ্যেও থাকতে পারে। যেমন—হৃৎপিণ্ডের বিশেষ কোনো জন্মগত ত্রুটি। এটি জানার ফলে পরিবারের জীবিত সদস্যরা আগাম চিকিৎসা নিয়ে অকাল মৃত্যুর হাত থেকে রক্ষা পেতে পারেন।
চিকিৎসাবিজ্ঞানের গবেষণা ও শিক্ষা
মেডিকেল কলেজের শিক্ষার্থীরা মানবদেহের গঠন এবং রোগ কিভাবে শরীরের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গকে ধ্বংস করে, তা সরাসরি পোস্টমর্টেম বা ক্যাডাভার ডিসেকশনের মাধ্যমেই শিখতে পারেন। এর কোনো বিকল্প আজও আবিষ্কৃত হয়নি। যারা চিকিৎসাবিজ্ঞানের এই পদ্ধতিকে অস্বীকার করেন, তারা প্রকারান্তরে আধুনিক চিকিৎসাব্যবস্থাকেই অস্বীকার করেন।
সামাজিক ও আইনি সুরক্ষা
বীমা দাবি (Insurance claim) বা উত্তরাধিকার সংক্রান্ত জটিলতা নিরসনে পোস্টমর্টেম রিপোর্ট একটি বাধ্যতামূলক দলিল হিসেবে কাজ করে। বিশেষ করে দুর্ঘটনায় মৃত্যুর ক্ষেত্রে এটি প্রমাণ করে যে মৃত্যুটি পরিকল্পিত কোনো হত্যাকাণ্ড নয়, বরং একটি দুর্ঘটনা ছিল। এটি মৃত ব্যক্তির পরিবারকে আর্থিক ও আইনি জটিলতা থেকে সুরক্ষা দেয়।

হাদিসের বিবরণঃ মৃত ব্যক্তির হাড় ভাঙ্গা হারাম

এবারে আসুন শুরুতেই হাদিসগুলো পড়ি, [4] [5]

মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত)
পর্ব-৫: জানাযা
পরিচ্ছেদঃ ৬. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ – মৃত ব্যক্তির দাফনের বর্ণনা
১৭১৪-[২২] ’আয়িশাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ মৃত ব্যক্তির হাড় ভাঙ্গা, জীবিতকালে তার হাড় ভাঙারই মতো। (মালিক, আবূ দাঊদ, ইবনু মাজাহ)[1]
[1] সহীহ : আবূ দাঊদ ৩২০৭, ইবনু মাজাহ্ ১৬১৬, সহীহ আত্ তারগীব ৩৫৬৭, সহীহ আল জামি‘ আস্ সগীর ৪৪৭৮, ইরওয়া ৩/৭৬৩, ইবনু হিব্বান ৩১৬৭।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)

সুনান ইবনু মাজাহ
৬/ জানাযা
পরিচ্ছেদঃ ৬/৬৩. মৃত ব্যক্তির হাড় ভাঙ্গা নিষেধ।
১/১৬১৬। ’আয়িশাহ্ (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ মৃত ব্যক্তির হাড় ভাঙ্গা, তা তার জীবিত অবস্থায় ভাঙ্গার সমতুল্য।
আবূ দাউদ ৩২০৭, ২৩৭৮৭, ২৪১৬৫, ২৪২১৮, ২৪৮২৮, ২৫১১৭, ২৫৭৪৩ ইরওয়াহ ৭৬৩।
তাহকীক আলবানীঃ সহীহ।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আয়িশা বিনত আবূ বাকর সিদ্দীক (রাঃ)


ফাতাওয়ায়ে আলবানীঃ মুসলিমের পোস্টমর্টেম করা যাবে না

এবং এরপরে শতাব্দীর শ্রেষ্ঠ ইসলামিক আলেম আল্লামা আলবানীর ফতোয়া পড়ে নিই [6] ,

প্রশ্ন ৪৬১: অপরাধ বা অপরাধীকে চিহ্নিত করা শেখার জন্য মানুষের লাশে এনাটমি অনুশীলন করা যাবে কি?
জবাব: যদি মুসলিম নরনারীর লাশ হয় তবে পোস্টমর্টেম করা যাবে না। কারণ, বলেছেন,
كَسْرُ عَظْمِ الْمَيِّتِ كَكَسْرِ عَظْمِ الْحَيِّ.
মৃত মুমিনের হাড় ভাঙা জীবিত অবস্থায় ভাঙার ন্যায়।
মৃত মুসলিমকে এমন সম্মান করা যাবে না, যে সম্মান করলে তাওহীদ ত্রুটিপূর্ণ হয়। তথাপি ইসলাম তাদের যথেষ্ট সম্মানও দিয়েছে। কিছু কিছু হাদীসে এদুটো বিষয় একসঙ্গে উল্লেখ করা হয়েছে। অর্থাৎ মৃতকে এত বেশি সম্মানপ্রদর্শন করতে নিষেধ করা হয়েছে যার মাধ্যমে তাওহীদ ত্রুটিপূর্ণ হয়ে যায়, আবার তাদেরকে অসম্মান করতেও নিষেধ করা হয়েছে। যেমন সহীহ মুসলিমে বর্ণিত হাদীসে রাসূলুল্লাহ বলেন,
لا تَجْلِسُوا عَلَى الْقُبُورِ وَلَا تُصَلُّوا إِلَيْهَا
তোমরা কবরের ওপর বসবে না এবং সেদিকে সালাত আদায় করবে না।
‘তোমরা কবরের ওপর বসবে না’ কারণ এর মাধ্যমে মৃতব্যক্তিকে অপমান করা হয়। ‘সেদিকে সালাত আদায় করবে না’ কারণ এর মাধ্যমে তার পূতপবিত্র ঘোষণা করা হয়। সালাত কাবা ছাড়া অন্যদিকে আদায় করা জায়েয নয়। ‘কবরের ওপর বসবে না’ কথা ‘মৃত মুমিনের হাড় ভাঙা জীবিত অবস্থায় ভাঙার ন্যায়’ কথার সদৃশ।
আপনি পোস্টমর্টেমের জন্য কারণ হিসেবে উল্লেখ করলেন যে, এর মাধ্যমে মৃত্যুর কারণ চিহ্নিত করা হয়-যা কি না একটা ভিনদেশি পদ্ধতি। কাফিরদের সাদৃশ্য অবলম্বন করতে যে নিষেধাজ্ঞা রয়েছে, এটা তার অন্তর্ভুক্ত হবে। কুরআন ও হাদীসে আমাদেরকে যে কাফিরদের বিরোধিতা করতে বলা হয়েছে সেই কাফিরদের দেশ থেকে পোস্টমর্টেম সংক্রান্ত যেসব নিয়মকানুন উৎসারিত, সেসব নিয়মকানুন গ্রহণ করা যাবে না। প্রথমত, মুসলিমদের উচিত ইসলামী পদ্ধতি এবং কাফিরদের পরস্পর বিরোধী প্রবৃত্তিপ্রসূত ও স্বরচিত পদ্ধতির মাঝে ফারাক জানা। দ্বিতীয়ত, ইসলামী পদ্ধতি নিয়ে গর্ব করা এবং তাদের পদ্ধতি থেকে নিরাপদ রাখার জন্য আল্লাহর প্রশংসা করা। তারা তো মৃত্যুর কারণ উন্মোচন ও হত্যার রহস্য উদঘাটন, এসবের জন্য শরয়ী বিধিবিধান প্রয়োগ করে না। তাদের রয়েছে স্বরচিত বিধিবিধান। ফলে তারা এসব পদ্ধতি অবলম্বন করতে বাধ্য হয়েছে। এসব পদ্ধতি শরীআতসম্মত নয়, যেমন আপনি শুনলেন, মৃত মুমিনের হাড় ভাঙা জীবত অবস্থায় ভাঙার ন্যায়।
মৃত ব্যক্তি যদি কাফির হয় আর তার পরিবার যদি অনুমতি দেয়, তাহলে পোস্টমর্টেম করা যাবে। কিন্তু যদি মুসলিমদের পক্ষ থেকে কাফিরদের প্রতি বাড়াবাড়ি করার উদ্দেশ্যে এ কাজ করা হয়, তাহলে তা জায়েয নয়। ইসলামী আদব হচ্ছে, মুসলিম ও কাফিরদের মাঝে যে যুদ্ধ হয়, সে যুদ্ধেও কাফিরদের লাশ দাফন দিতে মুসলিমদের আদেশ দেওয়া হয়েছে। কাফিরেরা আজ মুখে মানবতার প্রতি সম্মান প্রদর্শনের বুলি আওড়ালেও বাস্তবে তা সারহীন। মানবতার প্রতি সম্মান প্রদর্শন করতে কেবল ইসলামই জানে। কাফিররা সত্যিকারার্থে মানবাধিকার জানলে যেমনটি তারা নিজেদের ক্ষেত্রে মনে করে-ইসলামী শরীআত অনুসরণ করত আর ইসলামী শরীআত তাদের এসব উদ্ভাবিত নিয়মকানুনের প্রয়োজন পূরণ করত। আল্লাহ তাআলা কুরআনুল কারীমে বলেন,
قَاتِلُوا الَّذِينَ لَا يُؤْمِنُونَ بِاللَّهِ وَلَا بِالْيَوْمِ الْآخِرِ وَلَا يُحَرِّمُونَ مَا حَرَّمَ اللَّهُ وَرَسُولُهُ وَلَا يَدِينُونَ دِينَ الْحَقِّ مِنَ الَّذِينَ أُوتُوا الْكِتَابَ حَتَّى يُعْطُوا الْجِزْيَةَ عَنْ يَدٍ وَهُمْ صَاغِرُونَ
যাদেরকে কিতাব দেওয়া হয়েছে তাদের মধ্যে যারা আল্লাহর ও পরকালের প্রতি প্রতি ঈমান আনে না, আল্লাহ ও তাঁর রাসূল যা হারাম করেছেন তাকে হারাম গণ্য করে না এবং সত্য দ্বীনকে নিজেদের দ্বীন হিসেবে গ্রহণ করে না-তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করো, যে পর্যন্ত না তারা বশ্যতা সহকারে স্বেচ্ছায় জিজিয়া (কর) দেয়।
আশা করি আপনার প্রশ্নের জবাব পেয়ে গেছেন।

পোস্ট
পোস্ট 1

বিন বাযঃ মৃতের হাড় বিচ্ছিন্ন করা হারাম

এবারে আসুন সারা পৃথিবীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ ইসলামিক স্কলার বিন বাযের একটি ফতোয়া পড়ে নেয়া যাক, [7]

প্রশ্ন ১ ব্রেইন স্ট্রোকে মৃত্যুবরণকারীর অঙ্গদানের বিধান কি?
উত্তর – জীবিত হোক আর মৃত হোক প্রতিটি মুসলিম অত্যন্ত সম্মানের অধিকারী, সুতরাং তার সাথে এমন কোন আচরণ করা উচিৎ হবে না, যা তার জন্য কষ্টকর বা তার আকৃতি বিকৃতির শামিল, যেমন হাড় বাঙ্গা বা টুকরো টুকরো করা ইত্যাদি। হাদিসে আছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,
كسر عظم الميت ككسره حيا ( رواه أبوداود)
“মৃতের হাড় ভাঙ্গা তার জীবিত অবস্থায় হাড় ভাঙ্গার ন্যায়”। (আবুদাউদ) উল্লেখিত হাদিস এ কথার প্রমাণ বহন করে যে, কোন জীবিত ব্যক্তির উপকারার্থে মৃত ব্যক্তির অঙ্গহানি করা, যেমন রিদপিন্ড বা কলিজা ইত্যাদি কর্তন করা জায়েয নয়, কারণ এটা হাড় ভাঙ্গা হতেও জঘন্য। মানবাঙ্গ দান করা জায়েয কি না এ বিষয়ে ওলামায়ে কেরামের যথেষ্ট মতানৈক্য রয়েছে। কতিপয় আলেম বলেছেন বর্তমান সময়ে অঙ্গদানের অধিক প্রয়োজন দেখা দেয়ার কারণে তা বৈধ। কিন্তু তাদের এ উক্তি সঠিক নয়।
পূর্বোল্লিখিত হাদিস দ্বারা বুঝা যাচ্ছে যে, অঙ্গদান জায়েয নেই। এবং এতে যেমন মৃত ব্যক্তির অঙ্গের সাথে খেল-তামাশা করা হয়, অনুরূপ তাকে অপমানও করা হয়।
বাস্তব সত্য হল এই যে, মৃতের ওয়ারিসগণ সম্পদের লোভে মৃতের মানহানীর বিষয়ে ভ্রুক্ষেপ করে না, তা ছাড়া ওয়ারিসগণ তো শুধু মৃতের মালের ওয়ারিস হয় তার দেহের ওয়ারিস তো কেউ হয় না।
প্রশ্ন ২ মৃত কাফেরের হাড় বিচ্ছিন্ন করার হুকুম কি?
উত্তর – এ বিষয়টি ব্যাখ্যা সাপেক্ষ, যদি মৃত কাফের জিম্মি অথবা চুক্তিভুক্ত বা নিরাপত্তা কামী হয়, তাহলে তার হাড় বিচ্ছিন্ন করা জায়েয হবে না, কারণ সে মুসলিমদের ন্যায় সম্মানী, আর যদি সে যুদ্ধরত দেশের হয় তাহলে জায়েয হবে।
প্রশ্ন ৩ প্রতিশোধ বা কিসাস হিসাবে মৃতব্যক্তির হাড্ডি বিচ্ছিন্ন করা কি ওয়াজিব?
উত্তর – ওয়াজিব নয়, কারণ কিসাস তো চলে শর্তসাপক্ষে শুধু জীবিতদের মাঝে।
প্রশ্ন ৪ – মৃতব্যক্তি অঙ্গদানের অসিয়ত করলে তা কি বাস্তবায়ন করা হবে?
উত্তর – পূর্বের ফতোয়ার কারণে তার অসিয়ত বাস্তবায়ন করা হবে না। যদিও সে অসিয়ত করে যায়, কারণ তার দেহের মালিক সে নিজে নয়।
প্রশ্ন ৫ মৃতের সম্পদ থেকে প্রথমে কাফন সংশ্লিষ্ট বিষয় যেমন সুগন্ধি ইত্যাদির খরচ কি আলাদা করা হবে?
উত্তর – মৃতের ত্যাজ্য সম্পদ হতে সর্বপ্রথম কাফন দাফন যেমন লাশের গোসল দেয়া, কবর খনন করা ইত্যাদির খরচ বের করা হবে, অতপর বন্ধকের বিনিময়ে গৃহিত ঋণ পরিশোধ করা হবে, অতঃপর সাধারণ করজ পরিশোধ করা হবে, অতঃপর সম্পদের এক তৃতীয়াংশ হতে ওয়ারিস ব্যতীত অন্যদের জন্য কৃত অসিয়ত পূরণ করা হবে।
প্রশ্ন ৬ কোন ব্যক্তির যদি ব্রেইন স্ট্রোক হয়, তাহলে তাকে তৎক্ষণাৎ মৃত বলা যাবে?

পোস্ট 3
পোস্ট 5
পোস্ট 7
পোস্ট 9

উপসংহার

এই তথ্য ও বিশ্লেষণ থেকে এটি সুস্পষ্ট যে, পোস্টমর্টেম বা ময়নাতদন্ত আধুনিক বিজ্ঞানের এমন একটি পদ্ধতি যা ছাড়া ন্যায়বিচার এবং জনস্বাস্থ্য সুরক্ষা অসম্ভব। পক্ষান্তরে, ধর্মীয় বিধানগুলো মূলত ১,৪০০ বছর আগের প্রথাগত বিশ্বাসের ওপর ভিত্তি করে দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে আধুনিক অপরাধ তদন্ত কিংবা ভাইরাসের সংক্রমণ বোঝার মতো বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির কোনো ধারণা ছিল না।

ধর্মীয় ফতোয়া ও হাদিস অনুযায়ী মৃতদেহকে অক্ষত রাখা বা ‘সম্মান’ করার বিষয়টি মানবিক মনে হলেও, বাস্তব ক্ষেত্রে এটি অনেক সময় বড় ধরনের অবিচারের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। যদি ময়নাতদন্ত নিষিদ্ধ করা হয়, তবে বিষক্রিয়া বা অদৃশ্য আঘাতের মাধ্যমে হওয়া হত্যাকাণ্ডগুলো কখনোই প্রমাণিত হবে না। ফলে একজন খুনি কেবল ধর্মীয় অনুভূতির সুযোগ নিয়ে পার পেয়ে যাবে। যুক্তিবাদী দৃষ্টিকোণ থেকে, মৃতদেহের প্রথাগত সম্মানের চেয়ে জীবিতদের নিরাপত্তা, ন্যায়বিচার এবং বিজ্ঞানের অগ্রযাত্রা অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। সত্য ও প্রমাণের পথে পোস্টমর্টেম একটি অপরিহার্য হাতিয়ার, যাকে ধর্মীয় অনুভূতির উর্ধ্বে স্থান দেওয়া আধুনিক সভ্য সমাজের জন্য আবশ্যক।


তথ্যসূত্রঃ
  1. Post-mortem, Britannica ↩︎
  2. Forensic Pathology, National Institutes of Health ↩︎
  3. COVID-19 Autopsies, Nature ↩︎
  4. মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত), হাদিসঃ ১৭১৪ ↩︎
  5. সুনান ইবনু মাজাহ, হাদিসঃ ১৬১৬ ↩︎
  6. ফাতাওয়ায়ে আলবানী, আল্লামা মুহাম্মদ নাসীরুদ্দীন আলবানী (রহঃ) , মুহাম্মাদ শহীদুল্লাহ খান মাদানী (অনুবাদক) , শাইখ আব্দুল্লাহ মাহমুদ (অনুবাদক) , শাইখ ড. আব্দুল্লাহ ফারুক সালাফী (অনুবাদক), পৃষ্ঠা ৩৫১, ৩৫২ ↩︎
  7. জানাযার কিছু বিধানঃ জানাযা বিষয়ে বিভিন্ন ফতোয়া, শায়খ আব্দুল আযীয ইব্‌ন আব্দুল্লাহ ইব্‌ন বায রাহিমাহুল্লাহ, প্রকাশনীঃ ইসলামহাউজ ↩︎