
Table of Contents
- 1 ভূমিকা
- 2 কোরআনের আয়াতঃ আপাত দৃষ্টিতে মানবিক আয়াত
- 3 তালমুদ ও তাওরাতের পার্থক্য এবং উৎসগত ভ্রান্তি
- 4 রাবাইদের লিখিত তালমুদের বাণীঃ ঐশী দাবির ব্যবচ্ছেদ
- 5 উৎসগত ভ্রান্তিঃ মানবিক চয়ন নাকি স্বর্গীয় প্রমাদ?
- 6 শিরকঃ ক্ষমার অযোগ্য অপরাধ ও ‘নিরাপরাধ’ জীবনের বিভ্রম
- 7 পরবর্তী আয়াতঃ ফ্যাসাদ সৃষ্টিকারীদের ভয়ঙ্কর শাস্তি
- 8 ইসলামে ফিতনা ফ্যাসাদ কাকে বলে
- 9 আলেম ওলামাদের বক্তব্য
- 10 উপসংহারঃ মানবিকতার আড়ালে সাম্প্রদায়িক বিভাজন
ভূমিকা
আধুনিক বিশ্বে যখনই ইসলামের উগ্রতা বা সহিংসতার প্রশ্ন ওঠে, তখন তথাকথিত ‘শান্তিপ্রিয়’ মুসলিম প্রচারক ও পশ্চিমা বামপন্থী বুদ্ধিজীবীরা ঢাল হিসেবে একটি নির্দিষ্ট আয়াত অত্যন্ত চতুরতার সাথে উপস্থাপন করেন। সেটি হলো সূরা মায়িদার ৩২ নম্বর আয়াত। এই আয়াতের একটি নির্দিষ্ট খণ্ডাংশ— “যে ব্যক্তি একজন মানুষকে হত্যা করল, সে যেন পুরো মানবজাতিকেই হত্যা করল”—এমনভাবে প্রচার করা হয় যেন এটি ইসলামের একটি বৈশ্বিক ও চিরন্তন মানবিক ঘোষণা। কিন্তু এই আয়াতটিকে এর ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট, শাব্দিক গঠন এবং উৎস থেকে বিচ্ছিন্ন করে যেভাবে উপস্থাপন করা হয়, তাকে স্রেফ একটি ‘বুদ্ধিবৃত্তিক প্রবঞ্চনা’ বলা চলে।
গভীরভাবে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এই আয়াতটি আদতে মুসলিমদের জন্য অবতীর্ণ কোনো মৌলিক মানবিক বিধি নয়। আয়াতের শুরুতেই অত্যন্ত স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে যে, এই নির্দেশটি দেওয়া হয়েছিল ‘বনী ইসরাঈল’ বা ইহুদি জাতির জন্য। আরও চমকপ্রদ তথ্য হলো, এই বিধানটি কোনো ঐশী কিতাব বা তাওরাতের অংশ নয়, বরং এটি প্রাচীন ইহুদি রাবাইদের রচিত ব্যাখ্যামূলক গ্রন্থ ‘তালমুদ’ (Mishnah Sanhedrin 4:5) থেকে হুবহু গৃহীত হয়েছে। প্রশ্ন জাগে, ইসলামের স্রষ্টা কি নিজেই জানতেন না যে তিনি ইহুদিদের জন্য কোন বিধানটি ‘ঐশী’ হিসেবে পাঠিয়েছিলেন আর কোনটি ছিল মানুষের লেখা ব্যাখ্যা?
তাছাড়া, এই আয়াতের তথাকথিত ‘মানবিকতা’র আড়ালে লুকিয়ে আছে এক ভয়াবহ শর্ত। আয়াতে ‘নিরাপরাধ’ মানুষ বলতে কাদের বোঝানো হয়েছে এবং ‘যমীনে ফাসাদ’ বা বিপর্যয় সৃষ্টি করা বলতে ইসলাম কী বোঝায়—তা পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, একজন অমুসলিম বা শিরককারী ব্যক্তি ইসলামের আইনি কাঠামোতে কখনোই পূর্ণাঙ্গ ‘নিরাপরাধ’ হিসেবে গণ্য হয় না। এই প্রবন্ধে আমরা উন্মোচন করব কীভাবে এই আয়াতটি ইহুদি ঐতিহ্য থেকে ত্রুটিপূর্ণভাবে কোরআনে স্থান পেয়েছে এবং কীভাবে এর পরবর্তী আয়াতগুলো (৫:৩৩-৩৪) এই তথাকথিত মানবিকতাকে এক নৃশংস শাস্তির বিধানে রূপান্তরিত করেছে।
কোরআনের আয়াতঃ আপাত দৃষ্টিতে মানবিক আয়াত
নিচে সেই বহুল আলোচিত আয়াতটি বিভিন্ন অনুবাদে তুলে ধরা হলো, যেখানে আয়াতের শুরুতেই নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীর কথা উল্লেখ করা হয়েছে [1]। লক্ষণীয় যে, প্রতিটি অনুবাদেই ‘বনী ইসরাঈল’ অংশটি বিদ্যমান, যা প্রমাণ করে এই ঘোষণাটি কোনো বৈশ্বিক মানবিক সনদ নয়, বরং একটি নির্দিষ্ট জাতির জন্য জারিকৃত পুরনো আইনের উদ্ধৃতি মাত্র।
এ কারণেই আমি বানী ইসরাঈলের জন্য বিধান দিয়েছিলাম যে, যে ব্যক্তি মানুষ হত্যা কিংবা যমীনে সন্ত্রাস সৃষ্টির কারণ ব্যতীত কাউকে হত্যা করবে সে যেন তামাম মানুষকেই হত্যা করল। আর যে মানুষের প্রাণ বাঁচালো, সে যেন তামাম মানুষকে বাঁচালো। তাদের কাছে আমার রসূলগণ সুস্পষ্ট প্রমাণ নিয়ে এসেছিল, এরপরও তাদের অধিকাংশই পৃথিবীতে বাড়াবাড়িই করেছিল।
— Taisirul Quran
এ কারণেই আমি বানী ইসরাঈলের প্রতি এই নির্দেশ দিয়েছি যে, যে ব্যক্তি কোন ব্যক্তিকে হত্যা করে অন্য প্রাণের বিনিময় ব্যতীত, কিংবা তার দ্বারা ভূ-পৃষ্ঠে কোন ফিতনা-ফাসাদ বিস্তার ব্যতীত, তাহলে সে যেন সমস্ত মানুষকে হত্যা করে ফেলল; আর যে ব্যক্তি কোন ব্যক্তিকে রক্ষা করল, তাহলে সে যেন সমস্ত মানুষকে রক্ষা করল; আর তাদের (বানী ইসরাঈলের) কাছে আমার বহু রাসূলও স্পষ্ট প্রমাণসমূহ নিয়ে আগমন করেছিল, তবু এর পরেও তন্মধ্য হতে অনেকেই ভূ-পৃষ্ঠে সীমা লংঘনকারী হয়ে গেছে।
— Sheikh Mujibur Rahman
এ কারণেই, আমি বনী ইসরাঈলের উপর এই হুকুম দিলাম যে, যে ব্যক্তি কাউকে হত্যা করা কিংবা যমীনে ফাসাদ সৃষ্টি করা ছাড়া যে কাউকে হত্যা করল, সে যেন সব মানুষকে হত্যা করল। আর যে তাকে বাঁচাল, সে যেন সব মানুষকে বাঁচাল। আর অবশ্যই তাদের নিকট আমার রাসূলগণ সুস্পষ্ট নিদর্শনসমূহ নিয়ে এসেছে। তা সত্ত্বেও এরপর যমীনে তাদের অনেকে অবশ্যই সীমালঙ্ঘনকারী।
— Rawai Al-bayan
এ কারণেই বনী ইসরাঈলের উপর এ বিধান দিলাম যে, নরহত্যা বা যমীনে ধ্বংসাত্মক কাজ করার কারণ ছাড়া কেউ কাউকে হত্যা করলে [১] সে যেন সকল মানুষকেই হত্যা করল [২], আর কেউ কারো প্রাণ রক্ষা করলে সে যেন সকল মানুষের প্রাণ রক্ষা করল [৩]। আর অবশ্যই তাদের কাছে আমার রাসূলগণ স্পষ্ট প্রমাণাদি নিয়ে এসেছিলেন, তারপর এদের অনেকে এরপরও যমীনে অবশ্যই সীমালংঘনকারী।
— Dr. Abu Bakr Muhammad Zakaria
তালমুদ ও তাওরাতের পার্থক্য এবং উৎসগত ভ্রান্তি
কোরআনের ৫:৩২ আয়াতের প্রকৃত স্বরূপ বুঝতে হলে এর নেপথ্যের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট জানা জরুরি। আয়াতের ঠিক পূর্বেই আদমের দুই পুত্র হাবিল ও কাবিলের ভ্রাতৃঘাতী হত্যাকাণ্ডের কাহিনী বর্ণিত হয়েছে। কাবিল যখন প্রতিহিংসাবশত তার ভাই হাবিলকে হত্যা করে, তখন এই ভয়াবহ অপরাধের প্রেক্ষিতে আল্লাহ নাকি বনী ইসরাঈলের ওপর এক বিশেষ বিধান জারি করেছিলেন—এটাই কোরআনের দাবি। কিন্তু এখানেই একটি বিশাল ঐতিহাসিক ও তাত্ত্বিক প্রশ্ন দেখা দেয়: এই তথাকথিত ‘ঐশী বিধানটি’ আসলে কোথা থেকে এলো?
আব্রাহামিক ধর্মতত্ত্ব অনুযায়ী, ঈশ্বর থেকে প্রেরিত মূল কিতাব হলো তাওরাত (Torah), যা মূসার ওপর অবতীর্ণ হয়েছিল। কিন্তু ইহুদি ধর্মে তাওরাত ছাড়াও আরেকটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও বিশাল গ্রন্থ সংকলন রয়েছে যার নাম ‘তালমুদ’ (Talmud)। এটি কোনো ঐশী বাণী নয়; বরং এটি হলো শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে ইহুদি রাবাই বা পণ্ডিতদের লেখা আইনের ব্যাখ্যা, নৈতিক শিক্ষা এবং দার্শনিক বিতর্কের সংকলন। সহজভাবে বললে, ইসলামে যেমন কোরআনের ব্যাখ্যা ও বিধানের জন্য হাদিস বা ফিকাহ শাস্ত্র রয়েছে, ইহুদি ধর্মে তালমুদ ঠিক তেমনই একটি মানবীয় সংকলন। অথচ ৫:৩২ আয়াতে দাবি করা হয়েছে যে, এই বিশেষ বিধানটি আল্লাহ স্বয়ং বনী ইসরাঈলের জন্য ‘নির্ধারণ’ করেছিলেন। কিন্তু ঐতিহাসিক বাস্তবতা হলো, এই বিধানটি তাওরাতের (ঐশী কিতাব) কোথাও নেই। এর হুবহু অস্তিত্ব পাওয়া যায় ইহুদি রাবাইদের সংকলিত ‘ব্যাবিলনীয় তালমুদ: ট্র্যাকটেট সানহেড্রিন, ফোলিও ৩৭এ’ [2]-তে।
এখানেই কোরআনের রচয়িতার সর্বজ্ঞতা নিয়ে একটি মৌলিক যৌক্তিক সংকট তৈরি হয়। যদি কোরআন আল্লাহর অভ্রান্ত বাণী হয়ে থাকে, তবে আল্লাহ কেন মানুষের লেখা একটি আইনি ভাষ্যকে নিজের প্রেরিত ‘ঐশী বিধান’ হিসেবে উপস্থাপন করবেন? এই বিষয়টি স্পষ্টভাবে ইঙ্গিত দেয় যে, কোরআনের রচয়িতা তৎকালীন আরবে ইহুদিদের মুখে শোনা মৌখিক ঐতিহ্য এবং তাদের লিখিত ব্যাখ্যাগ্রন্থসমূহের মধ্যে তফাৎ করতে সক্ষম ছিলেন না। তৎকালীন আরবের ইহুদিরা তাদের দৈনন্দিন তর্কে ও ধর্মীয় আলোচনায় তালমুদ বা রাবাইদের বাণীসমূহ উদ্ধৃত করত। সম্ভবত মুহাম্মদ সেই রাবাইদের কলমে লেখা একটি উচ্চাঙ্গের বিচারিক যুক্তিকে ভুলবশত সরাসরি ‘ঈশ্বরের আদেশ’ হিসেবে গ্রহণ করেছেন। অর্থাৎ, যা ছিল রাবাইদের মস্তিস্কপ্রসূত একটি মানবীয় নীতি, কোরআনে তা আল্লাহর নিজস্ব ঘোষণা হিসেবে ছদ্মবেশ ধারণ করেছে।
রাবাইদের লিখিত তালমুদের বাণীঃ ঐশী দাবির ব্যবচ্ছেদ
কোরআনের ৫:৩২ আয়াতের তথাকথিত ‘মানবিক’ বার্তার উৎস যে কোনো স্বর্গীয় আসমানি কিতাব নয়, বরং ইহুদি রাবাইদের মস্তিস্কপ্রসূত একটি আইনি ব্যাখ্যা—তা প্রমাণের জন্য ব্যাবিলনীয় তালমুদই যথেষ্ট। তালমুদের এই বিশেষ অংশটি (সানহেড্রিন ৩৭এ) বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এটি ছিল মূলত একটি নির্দিষ্ট জাতিগোষ্ঠীর জন্য প্রণীত আইনি সতর্কবার্তা। তালমুদের সেই মূল বক্তব্যটি ছিল অত্যন্ত জাতিগত, সুনির্দিষ্ট এবং সরাসরি বনী ইসরাঈলের অস্তিত্বের সাথে যুক্ত [2]:
“FOR THIS REASON WAS MAN CREATED ALONE, TO TEACH THEE THAT WHOSOEVER DESTROYS A SINGLE SOUL OF ISRAEL, SCRIPTURE IMPUTES [GUILT] TO HIM AS THOUGH HE HAD DESTROYED A COMPLETE WORLD; AND WHOSOEVER PRESERVES A SINGLE SOUL OF ISRAEL, SCRIPTURE ASCRIBES [MERIT] TO HIM AS THOUGH HE HAD PRESERVED A COMPLETE WORLD.”
কোরআনে এই আয়াতের অন্তর্ভুক্তিকরণ আসলে কোনো মৌলিক আধ্যাত্মিক বিপ্লব নয়; বরং এটি একটি মানবীয় ‘সোর্স’ বা উৎস থেকে সংগৃহীত এবং সামান্য পরিমার্জিত বক্তব্য—যা ভুলবশত ‘ঐশী বাণী’ হিসেবে উদ্ধৃত হয়েছে। ইহুদি পণ্ডিতদের নিজস্ব মস্তিস্কপ্রসূত আইনশাস্ত্রকে আল্লাহর শাশ্বত বিধান হিসেবে চালিয়ে দেওয়া কোরআনের ঐশী দাবির ভিতকেই নড়বড়ে করে দেয়। যদি কোরআন আসমানি কিতাবই হতো, তবে তা মানুষের লেখা তালমুদকে উদ্ধৃত না করে মূল তাওরাতকে উদ্ধৃত করত। কিন্তু এই বিশেষ উক্তিটি তাওরাতের কোথাও খুঁজে পাওয়া যায় না।
এটি পরিষ্কার করে দেয় যে, ৫:৩২ আয়াতের মানবিক সুরটি কোনো স্বর্গীয় প্রেরণা নয়, বরং এটি সমসাময়িক ইহুদি লোকজ ঐতিহ্য ও রাবাইদের আইনি বিতর্ক থেকে ধার করা একটি খণ্ডিত অংশ। কোরআনের রচয়িতা ভুলক্রমে ইহুদিদের এই লৌকিক প্রবাদ বা আইনি ব্যাখ্যাকে ‘আল্লাহর হুকুম’ হিসেবে তাঁর কিতাবে স্থান দিয়েছেন। যা মূলত প্রমাণ করে যে, কোরআন কোনো সর্বজ্ঞ সত্তার বাণী নয়, বরং তৎকালীন আরবে প্রচলিত বিভিন্ন ধর্মীয় কাহিনীর একটি অপূর্ণাঙ্গ সংকলন মাত্র।
আসুন তালমুদের সেই মূল বক্তব্যের বাংলা অনুবাদটি আরও গভীরভাবে লক্ষ্য করি, যেখানে স্পষ্ট হয়ে যায় যে এটি কেন সার্বজনীন নয় বরং একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর জন্য লিখিত ছিল [2]:
বাংলা অনুবাদঃ “বনী ইসরাঈলের জন্য এটি শিক্ষা দেওয়া হয়েছে যে, যে ব্যক্তি ইসরাঈলের একটি আত্মাকে ধ্বংস করল, সে যেন পুরো জগতকেই ধ্বংস করল; আর যে ইসরাঈলের একটি প্রাণ বাঁচাল, সে যেন পুরো জগতকেই বাঁচাল।” [2]

উৎসগত ভ্রান্তিঃ মানবিক চয়ন নাকি স্বর্গীয় প্রমাদ?
কোরআনের ৫:৩২ আয়াতের গঠনশৈলী এবং তালমুদের [2] মূল বার্তার মধ্যে যে শাব্দিক পার্থক্য বিদ্যমান, তা বস্তুনিষ্ঠভাবে বিশ্লেষণ করলে একটি স্পষ্ট ‘সোর্স এরর’ বা উৎসগত ভ্রান্তি ধরা পড়ে। এই ভ্রান্তিটি কেবল ঐতিহাসিক বিচ্যুতি নয়, বরং এটি কোরআনের ঐশী দাবির মূলে এক বড় ধরনের যৌক্তিক সংকট তৈরি করে।
তৎকালীন মক্কা ও মদিনার সামাজিক পরিবেশে ইহুদিদের উপস্থিতি ছিল এবং তাদের মৌখিক ঐতিহ্যের অনেক গল্প ও প্রবাদ আরবে প্রচলিত ছিল। প্রবল সম্ভাবনা রয়েছে যে, কোরআনের রচয়িতা তৎকালীন ইহুদিদের মুখে এই ‘চমৎকার’ ও ‘অর্থবহ’ নীতিবাক্যটি শুনেছিলেন। সম্ভবত তিনি এই বাণীর গাম্ভীর্য ও মানবিক আবেদন দেখে মুগ্ধ হয়েছিলেন এবং ভেবেছিলেন এটি সরাসরি তাওরাতের বাণী। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে এটি ছিল ইহুদি পণ্ডিতদের বা রাবাইদের নিজস্ব আইনি ব্যাখ্যা বা তালমুদের অংশ। মানুষের লেখা একটি সাম্প্রদায়িক নীতিকে আল্লাহর বাণী হিসেবে গ্রহণ করার এই প্রবণতা কোরআনের ঐশী অভ্রান্ততাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে।
এটি ইসলামের ইতিহাসে কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। ওহী লেখক আব্দুল্লাহ ইবনে আবি সারহ-এর ক্ষেত্রেও আমরা একই ধরনের উদাহরণ দেখি। বর্ণিত আছে যে, সূরা মুমিনুনের ১৪ নম্বর আয়াতের শেষে যখন আব্দুল্লাহ মুগ্ধ হয়ে নিজের অজান্তেই বলে উঠেছিলেন— ফাতাবারাকাল্লাহু আহসানুল খালিকীন (অতএব মহান আল্লাহ, যিনি সর্বোত্তম স্রষ্টা), তখন মুহাম্মদ সেই সুন্দর বাক্যটি পছন্দ করেন এবং তাকে সেটি ওহী হিসেবেই লিখে নিতে বলেন [3]। অর্থাৎ, মানুষের মুখে শোনা ভালো ও আকর্ষণীয় কোনো কথাকে ওহী হিসেবে গ্রহণ করার আরও একটি উদাহরণ ইসলামী ঐতিহ্যে বর্তমান। ৫:৩২ আয়াতের ক্ষেত্রেও সম্ভবত একই ঘটনা ঘটেছে; রাবাইদের একটি চমৎকার মানবিক বক্তব্যটি ভালো লেগে যাওয়ায় সেটি ‘আল্লাহর নির্দেশ’ হিসেবে কোরআনে স্থান পেয়েছে।
ব্যাবিলনীয় তালমুদের মূল পাঠে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছিল: “Whosoever destroys a single soul of Israel…” অর্থাৎ, যে ব্যক্তি ইসরাঈলের একটি প্রাণ নাশ করল। এখানে রাবাইদের উদ্দেশ্য ছিল সাম্প্রদায়িক—তারা কেবল তাদের নিজস্ব গোত্রের জীবনের গুরুত্ব বোঝাতে এই উপমাটি ব্যবহার করেছিলেন। কোরআন যখন এই কথাটি উদ্ধৃত করে, তখন সেখানে একটি মৌলিক পরিবর্তন ঘটানো হয়, যেহেতু এটি শুধুমাত্র ইহুদিদের ক্ষেত্রে হয়ে থাকলে আসলে মুহাম্মদের তেমন কোন লাভ ছিল না। তাই সাম্প্রদায়িক ‘ইসরাঈলের আত্মা’ (Soul of Israel) শব্দটিকে সরিয়ে সেখানে কেবল ‘মানুষ’ বা ‘প্রাণ’ (নাফস) শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে, যেন এখানে মুহাম্মদের অনুসারী মুসলিমদেরও অন্তর্ভূক্ত করা যায়।
নৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে একটি সংকীর্ণ সাম্প্রদায়িক নীতিকে বৈশ্বিক ও সার্বজনীন মানবিক বাণীতে রূপান্তর করা নিঃসন্দেহে একটি ইতিবাচক কাজ। কিন্তু সমস্যাটি নৈতিক নয়, বরং উৎসগত। যদি এটি আল্লাহর শাশ্বত ও বৈশ্বিক বিধানই হতো, তবে আয়াতের শুরুতে “আমি বনী ইসরাঈলের ওপর বিধান দিয়েছিলাম”—এই নির্দিষ্ট ঐতিহাসিক সীমাবদ্ধতা জুড়ে দেওয়ার কোনো প্রয়োজন ছিল না। যদি এটি সবার জন্যই প্রযোজ্য হয়, তবে কেন এটি কেবল একটি নির্দিষ্ট প্রাচীন জাতিগোষ্ঠীর দোহাই দিয়ে শুরু করা হলো?
এই অসামঞ্জস্যটিই প্রমাণ করে যে, কোরআনের রচয়িতা জানতেন যে এটি ইহুদিদের একটি বিধান, তাই তিনি আয়াতের শুরুতে ‘বনী ইসরাঈলের ওপর হুকুম দিয়েছিলাম’ কথাটি যোগ করেন। কিন্তু একে আরও চমৎকার ও উদারভাবে উপস্থাপনের লোভে তিনি মূল পাঠের ‘ইসরাঈল’ শব্দটি পরিবর্তন করে ‘মানুষ’ করে দেন। মানুষের তৈরি একটি সাম্প্রদায়িক আইনকে আংশিক পরিবর্তন করে ‘বিশ্বজনীন ঐশী বাণী’ হিসেবে দাবি করা প্রমাণ করে যে, ৫:৩২ আয়াতের তথাকথিত মানবিকতা আসলে ভুল উৎস থেকে সংগৃহীত এবং পছন্দসইভাবে পরিমার্জিত একটি বক্তব্য মাত্র।
শিরকঃ ক্ষমার অযোগ্য অপরাধ ও ‘নিরাপরাধ’ জীবনের বিভ্রম
কোরআনের ৫:৩২ আয়াতের তথাকথিত মানবিক আবেদনের গভীরতা পরিমাপ করতে হলে আমাদের প্রথমেই বুঝতে হবে ইসলামের দৃষ্টিতে ‘নিরাপরাধ’ বা ‘মাসুম’ (Innocent) মানুষের সংজ্ঞা আসলে কী। আধুনিক উদারপন্থী ব্যাখ্যায় যেকোনো সাধারণ মানুষকে ‘নিরাপরাধ’ মনে করা হলেও, কোরআনিক আইনশাস্ত্রে বা ফিকাহর ভাষায় ‘নিরাপরাধ’ হওয়ার শর্তটি অত্যন্ত সংকীর্ণ এবং শর্তযুক্ত। ৫:৩২ আয়াতে বলা হয়েছে— “যে ব্যক্তি কোনো প্রাণের (নাফস) প্রাণনাশ করল…”। আপাতদৃষ্টিতে একে সর্বজনীন মনে হলেও, কোরআনের সামগ্রিক প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, একজন অমুসলিম বা মুশরিক ইসলামের আইনি কাঠামোর কোনো স্তরেই পূর্ণাঙ্গ ‘নিরাপরাধ’ হিসেবে গণ্য হয় না।
এর প্রধান কারণ হলো ‘শিরক’। কোরআন ও হাদিস অনুযায়ী, মহাবিশ্বের স্রষ্টা আল্লাহর কাছে সবচেয়ে ঘৃণিত, জঘন্য এবং ক্ষমার অযোগ্য অপরাধ হলো শিরক বা আল্লাহর সার্বভৌমত্বে অন্য কাউকে অংশীদার করা। কোরআন অত্যন্ত কঠোর ভাষায় ঘোষণা করেছে যে, শিরক হচ্ছে একটি ‘মহা জুলুম’ বা চরম পর্যায়ের অন্যায় [4]। এমনকি এই অপরাধকে এতটাই গুরুতর হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে যে, আল্লাহ সরাসরি জানিয়ে দিয়েছেন তিনি শিরক ছাড়া অন্য যেকোনো পাপ চাইলে ক্ষমা করতে পারেন, কিন্তু শিরককারীকে তিনি কখনোই ক্ষমা করবেন না [5]।
এখন অত্যন্ত সূক্ষ্ম ও যৌক্তিক বিচারে এটি স্পষ্ট যে, যে ব্যক্তি আল্লাহর আইন ও মানদণ্ড অনুযায়ী মহাবিশ্বের সবচেয়ে বড় অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত, তাকে ৫:৩২ আয়াতের ‘নিরাপরাধ’ শ্রেণিতে অন্তর্ভুক্ত করা একপ্রকার অসম্ভব। একজন মূর্তিপূজারী বা হিন্দু, বৌদ্ধ বা অন্য কোনো ধর্মাবলম্বী যখন শিরক করে, তখন ইসলামের স্রষ্টার কাছে সে আর ‘নিরাপরাধ’ থাকে না; বরং সে হয়ে ওঠে এক অবিরাম চলমান অপরাধের হোতা। ইসলামী আইনশাস্ত্রে জীবনের নিরাপত্তার (Ismah) অধিকার মূলত ইমানের সাথে সম্পর্কিত। ড. আবু বকর মুহাম্মদ যাকারিয়া সম্পাদিত গ্রন্থেও এটি পরিষ্কার করা হয়েছে যে, শিরক হলো এমন এক অপরাধ যা একজন মানুষের জীবনের নিরাপত্তাকে হরণ করে নেয় এবং শিরককারীর রক্ত মুসলিমদের জন্য হালাল বা বৈধ বলে গণ্য করা হয় [6]।
সুতরাং, ৫:৩২ আয়াতে যে ‘একজনকে বাঁচালে পুরো মানবজাতিকে বাঁচানো’র কথা বলা হয়েছে, তার সুফল ভোগ করার অধিকার একজন মুশরিকের থাকার কথা নয়। কারণ, সে তো ইসলামের দৃষ্টিতে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় অপরাধ বা ‘শিরক’ রচনায় লিপ্ত। যৌক্তিকভাবে তাই এই আয়াতের সুরক্ষা বলয়টি কেবল শিরকমুক্ত মুসলিম বা ইসলামের বশ্যতা স্বীকারকারীদের জন্যই সংরক্ষিত। একজন পৌত্তলিক যেহেতু জন্মগতভাবেই ‘মহা জালেম’ বা ‘মহা পাপী’ হিসেবে চিহ্নিত, তাই ৫:৩২ আয়াতের মানবিক সুরটি তাদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হওয়া ইসলামের নিজস্ব বিচারব্যবস্থার সাথেই সাংঘর্ষিক। এটি মূলত একটি ‘লজিক্যাল এক্সক্লুশন’, যেখানে শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে সাধারণ, কিন্তু অর্থ বা প্রয়োগ করা হয়েছে অত্যন্ত সীমিত ও নির্দিষ্ট একটি গোষ্ঠীর জন্য। যেখানে স্রষ্টার প্রতি ‘অবিশ্বাস’ বা ‘অংশীবাদ’ নিজেই মৃত্যুদণ্ডযোগ্য অপরাধ (চুক্তিবদ্ধ না হলে বা জিজিয়া না দিলে), সেখানে ইসলামের দৃষ্টিতে সেই মারাত্মক অপরাধীকে ৫:৩২ আয়াতের দোহাই দিয়ে নিরাপত্তা দেওয়ার বা জীনবন রক্ষা করার দাবী স্রেফ একটি তাত্ত্বিক ধোঁকাবাজি।
পরবর্তী আয়াতঃ ফ্যাসাদ সৃষ্টিকারীদের ভয়ঙ্কর শাস্তি
কোরআনের এই আয়াতটি মূলত সহিংসতা পরিহার এবং মানব জীবনের মূল্য ও জীবন রক্ষার কথা বললেও, এর পরবর্তী আয়াতগুলোতে ইসলামী শাস্ত্রের কঠোরতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। আয়াত ৫:৩৩-৩৪-তে বলা হয়েছে, যারা আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে এবং পৃথিবীতে অশান্তি সৃষ্টি করে, তাদের জন্য শাস্তি হল মৃত্যুদণ্ড, শূলে চড়ানো, হাত-পা কাটা বা দেশান্তরিত করা। ৩২, ৩৩ ও ৩৪ নম্বর আয়াতের নির্দেশনা থেকে বোঝা যায় যে, ইসলামে ‘ফিতনা’ বা ‘ফাসাদ’ সৃষ্টি করা সর্বোচ্চ অপরাধ হিসেবে বিবেচিত, যার শাস্তি অনেক কঠোর। তাই ফিতনা ফ্যাসাদ আসলে কাকে বলে, তার সংজ্ঞা জানা এই আয়াতটি বোঝার জন্য সবচাইতে জরুরি। এবারে আসুন এরপরের আয়াতটিও পড়ে নিই, কারণ এই আয়াতটিতেও সেই একই শব্দ فَسَادًا বা ফ্যাসাদিন বা ফিতনা ফ্যাসাদ শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে [7]
যারা আল্লাহ ও তাঁর রসূলের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে আর যমীনে বিশৃঙ্খলা ছড়িয়ে বেড়ায় তাদের শাস্তি হল এই যে, তাদেরকে হত্যা করা হবে অথবা ক্রুশবিদ্ধ করা হবে অথবা তাদের হাত পা বিপরীত দিক থেকে কেটে ফেলা হবে, অথবা তাদেরকে দেশ থেকে নির্বাসিত করা হবে। এ হল তাদের জন্য দুনিয়াতে লাঞ্ছনা, আর তাদের জন্য আখেরাতে রয়েছে মহাশাস্তি।
— Taisirul Quran
যারা আল্লাহর বিরুদ্ধে ও তাঁর রাসূলের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করে, আর ভূ-পৃষ্ঠে অশান্তি সৃষ্টি করে বেড়ায়, তাদের শাস্তি এটাই যে, তাদেরকে হত্যা করা হবে অথবা শুলে চড়ান হবে, অথবা এক দিকের হাত ও অপর দিকের পা কেটে ফেলা হবে, অথবা তাদের দেশ থেকে নির্বাসিত করা হবে; এটাতো দুনিয়ায় তাদের জন্য ভীষণ অপমান, আর আখিরাতেও তাদের জন্য ভীষণ শাস্তি রয়েছে।
— Sheikh Mujibur Rahman
যারা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে এবং যমীনে ফাসাদ করে বেড়ায়, তাদের আযাব কেবল এই যে, তাদেরকে হত্যা করা হবে অথবা শূলে চড়ানো হবে কিংবা বিপরীত দিক থেকে তাদের হাত ও পা কেটে ফেলা হবে অথবা তাদেরকে দেশ থেকে বের করে দেয়া হবে। এটি তাদের জন্য দুনিয়ায় লাঞ্ছনা এবং তাদের জন্য আখিরাতে রয়েছে মহাআযাব।
— Rawai Al-bayan
যারা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে এবং দুনিয়ায় ধ্বংসাত্মক কাজ করে বেড়ায় তাদের শাস্তি কেবল এটাই যে, তাদেরকে হত্যা করা হবে বা ক্রুশবিদ্ধ করা হবে বা বিপরীত দিক থেকে তাদের হাত ও পা কেটে ফেলা হবে বা তাদেরকে দেশ থেকে নির্বাসিত করা হবে [১]। দুনিয়ায় এটাই তাদের লাঞ্ছনা ও আখেরাতে তাদের জন্য মহাশাস্তি রয়েছে [২]।
— Dr. Abu Bakr Muhammad Zakaria
ইসলামে ফিতনা ফ্যাসাদ কাকে বলে
‘ফাসাদ’ শব্দটি আরবি ভাষায় বিপর্যয়, বিশৃঙ্খলা, বা অনৈতিকতার প্রতীক। তবে ইসলামী আইনশাস্ত্রে এর সংজ্ঞা খুব বিস্তৃত। প্রাচীন তাফসিরগুলোতে দেখা যায় যে, ‘ফাসাদ’ শব্দটি আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের বিরুদ্ধাচরণ, দাঙ্গা-হাঙ্গামা, পথ রোধ, সম্পদ লুণ্ঠন, এবং এমনকি ইসলাম থেকে সরে যাওয়ার সাথেও যুক্ত করা হয়েছে। ইবন কাসিরের তাফসিরে বলা হয়েছে, ‘ফাসাদ’ মানে আল্লাহর বিধানের অবাধ্যতা, যা পৃথিবীতে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে। অতএব, এটি শুধুমাত্র যুদ্ধ ও হত্যার সাথে সম্পর্কিত নয়, বরং ধর্মীয় অনুশাসন না মানা এবং ঈমান থেকে সরে যাওয়া সম্পর্কেও এটি প্রযোজ্য।
এই আয়াতে যেই শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে সেই শব্দটি হচ্ছে فَسَادٍۢ বা ফ্যাসাদিন অর্থাৎ ফিতনা ফ্যাসাদ সৃষ্টির কারণ ব্যাতীত। ফিতনা ফ্যাসাদের ইসলামিক অর্থ আমরা একটু পরে জেনে নিবো। আপাতত জেনে নিই, ইসলামের দৃষ্টিতে সবচাইতে বড় অন্যায় বা অপরাধের কাজটি কী! আসুন মতিউর রহমান মাদানীর কাছ থেকে শুনি, ইসলামের দৃষ্টিতে বিধর্মী বা শিরককারীগণ নিরাপরাধ নাকি তারা সবচাইতে ভয়ঙ্কর অপরাধী,
এবারে আসুন কোরআনের কিছু আয়াত দেখে নিই, [8] [9]
স্মরণ কর, যখন লুকমান তার ছেলেকে নসীহত ক’রে বলেছিল- হে বৎস! আল্লাহর সাথে কোন কিছুকে শিরক কর না, শিরক হচ্ছে অবশ্যই বিরাট যুলম।
— Taisirul Quran
স্মরণ কর, যখন লুকমান উপদেশাচ্ছলে তার পুত্রকে বলেছিলঃ হে বৎস! আল্লাহর সাথে কোন শরীক করনা। নিশ্চয়ই শিরক হচ্ছে চরম যুলম।
— Sheikh Mujibur Rahman
আর স্মরণ কর, যখন লুকমান তার পুত্রকে উপদেশ দিতে গিয়ে বলেছিল, ‘প্রিয় বৎস, আল্লাহর সাথে শিরক করো না; নিশ্চয় শিরক হল বড় যুলম’।
— Rawai Al-bayan
আর স্বরণ করুন যখন লুকমান উপদেশ দিতে গিয়ে তার পুত্রকে বলেছিল, ‘হে আমার প্রিয় বৎস! আল্লাহর সাথে কোনো শির্ক করো না। নিশ্চয় শির্ক বড় যুলুম [১]।
— Dr. Abu Bakr Muhammad Zakaria
নিশ্চয়ই আল্লাহ তাঁর সাথে অংশী স্থাপনকারীকে ক্ষমা করবেননা এবং তদ্ব্যতীত যাকে ইচ্ছা ক্ষমা করবেন এবং যে কেহ আল্লাহর অংশী স্থির করে সে মহাপাপে আবদ্ধ হল।
— Sheikh Mujibur Rahman
নিশ্চয় আল্লাহ তাঁর সাথে শরীক করাকে ক্ষমা করেন না। তিনি ক্ষমা করেন এ ছাড়া অন্যান্য পাপ, যার জন্য তিনি চান। আর যে আল্লাহর সাথে শরীক করে সে অবশ্যই মহাপাপ রচনা করে।
— Rawai Al-bayan
নিশ্চয় আল্লাহ তাঁর সাথে শরীক [১] করাকে ক্ষমা করেন না। এছাড়া অন্যান্য অপরাধ যাকে ইচ্ছে ক্ষমা করেন [২]। আর যে-ই আল্লাহর সাথে শরীক করে, সে এক মহাপাপ রটনা করে।
— Dr. Abu Bakr Muhammad Zakaria
অর্থাৎ জানা গেল, ইসলামের দৃষ্টিতে সবচাইতে জঘন্য অপরাধ হচ্ছে শিরকের অপরাধ। একজন শিরককারী বিধর্মী তাই কোনভাবেই ইসলামের দৃষ্টিতে নিরাপরাধ নয়। এবারে আসুন পড়ে নিই, ফিতনা ফ্যাসাদ কাকে বলে। ইসলামের জিহাদের মূল ধারণা বোঝার জন্য শুরুতেই সূরা আনফালের ৩৯ নম্বর আয়াতটির তাফসীর পড়ে নিই। এই তাফসীরটি আপনারা পাবেন তাফসীরে মাযহারী পঞ্চম খণ্ডে। হানাফী মাযহাবের একনিষ্ঠ অনুসারী বিশ্ববিখ্যাত সুন্নি ইসলামী পন্ডিত আল্লামা কাজী ছানাউল্লাহ পানিপথীর লেখা এই তাফসীর কোরআনকে সঠিকভাবে বোঝার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ [10] –
এবং তোমরা তাহাদিগের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করিতে থাকিবে যতক্ষণ না ফিতনা দূরীভূত হয় এবং আল্লাহের দ্বীন সামগ্রীকভাবে প্রতিষ্ঠিত হয় এবং যদি তাহারা বিরত হয় তবে তাহারা যাহা করে আল্লাহ্ তাহার সম্যক দ্রষ্টা।
যদি তাহারা মুখ ফিরায় তবে জানিয়া রাখ যে আল্লাহ্ই তোমাদিগের অভিভাবক এবং কত উত্তম অভিভাবক এবং কত উত্তম সাহায্যকারী ।
( সূরা আনফালঃ ৩৯, ৪০ )
প্রথমে বলা হয়েছে এবং তোমরা তাদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করতে থাকবে যতক্ষণ না ফেতনা দূরীভূত হয় এবং আল্লাহর দ্বীন সামগ্রিকভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়। ফেতনা অর্থ বিশৃংখলা। আর পৃথিবীতে সবচেয়ে বড় বিশৃংখলা হচ্ছে শিরিক ( অংশীবাদিতা )। আলোচ্য বাক্যে ফেতনা অপসারিত না হওয়া পর্যন্ত যুদ্ধ করার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। এ কথার অর্থ-মুশরিকেরা যতক্ষণ পর্যন্ত শিরিক পরিত্যাগ না করবে, অথবা মুসলমানদের একচ্ছত্র কর্তৃত্ব মেনে নিয়ে জিযিয়া দিতে সম্মত না হবে, ততক্ষণ পর্যন্ত সংগ্রাম করতে হবে তাদের বিরুদ্ধে। আলোচ্য নির্দেশনাটিতে এ রকম বলা হয়নি যে, সকল অংশীবাদী ও অবিশ্বাসীকে যুদ্ধের মাধ্যমে ইসলাম গ্রহণে বাধ্য করতে হবে। এ রকম মনে করা হলে আলোচ্য আয়াতটি চলে যাবে জিযিয়া দিতে সম্মত হয় তবে তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ কোরো না। সুতরাং – এই আয়াতের নির্দেশনাটি দাঁড়াচ্ছে এ রকম অবিশ্বাসীরা ইসলাম গ্রহণ না করা পর্যন্ত অথবা জিযিয়া প্রদানের মাধ্যমে পূর্ণ অনুগত না হওয়া পর্যন্ত সংগ্রাম চালিয়ে যেতে হবে। এখানে দ্বীন প্রতিষ্ঠার অর্থ হবে শক্তি , বিজয় এবং একচ্ছত্র শাসন প্রতিষ্ঠা। ‘ দ্বীন ‘ শব্দের এ রকম অর্থ উল্লেখ করা হয়েছে কামুস গ্রন্থে।
হজরত মেকদাদ বিন আসওয়াদ বর্ণনা করেছেন, রসুল স . বলেছেন, এক সময় ইসলাম প্রতিষ্ঠিত হবে পৃথিবীর সকল গৃহে। অবিশ্বাস ও অংশীবাদিতা হয়ে যাবে ইসলামের সম্পূর্ণ অধীন। সকল শ্রেষ্ঠত্ব ও মাহাত্ম্য হবে কেবল আল্লাহর।
হজরত ইবনে ওমর কর্তৃক বর্ণিত হয়েছে, রসুল স . বলেছেন, আমাকে অবিশ্বাসীদের বিরুদ্ধে ওই সময় পর্যন্ত সংগ্রাম করার নির্দেশ দেয়া হয়েছে-যতক্ষণ না তারা বলে, ‘ লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মদুর রসুলুল্লাহ’ প্রতিষ্ঠা করে নামাজ এবং প্রদান করে জাকাত। যে এ রকম করবে আমার পক্ষ থেকে তার জীবন ও সম্পদ হয়ে যাবে সুরক্ষিত। আল্লাহ্ই তাদের অভ্যন্তরীণ হিসাব গ্রহণ করবেন ( তিনি বিচার করবেন , তারা তাদের জীবন ও সম্পদ রক্ষার জন্যে , না অন্তরের তাগিদে ইসলাম গ্রহণ করেছে )। বোখারী ও মুসলিম। হজরত আবু হোরায়রা থেকে ছয়জন সাহাবী হাদিসটি বর্ণনা করেছেন। আল্লামা সুয়ুতী বলেছেন , হাদিসটি সুবিদিত ( মুতাওয়াতির )।


উপরের আলোচনা থেকে বোঝা যাচ্ছে, ইসলামের দৃষ্টিতে শিরক হচ্ছে সবচাইতে বড় ফেতনা, সবচাইতে বড় অপরাধ। তাই সূরা মায়িদার ৩২ নম্বর আয়াতটি কোনভাবেই একজন শিরককারী অমুসলিমের ওপর প্রযোজ্য হবে না। কারণ ইসলামের দৃষ্টিতে তারা শিরককারী, তাই সবচাইতে বড় ফিতনাবাজ। তারা ইসলামের দৃষ্টিতে নিরাপরাধ মানুষ হিসেবে গণ্য নয়। প্রখ্যাত বাংলাদেশের আলেম এবং ইসলামী ফিকাহ শাস্ত্রের অন্যতম পণ্ডিত ড. আবু বকর মুহাম্মদ যাকারিয়ার সম্পাদনায় প্রকাশিত মো আব্দুল কাদেরের বই বাংলাদেশে প্রচলিত শির্ক বিদ‘আত ও কুসংস্কার পর্যালোচনা গ্রন্থে পরিষ্কারভাবেই বলা আছে যে, শিরক হচ্ছে হত্যাযোগ্য অপরাধ। যারা শিরক করে, তাদের রক্ত মুসলিমদের জন্য হালাল [11] –

আলেম ওলামাদের বক্তব্য
আসুন সূরা তওবার ৫ নম্বর আয়াতটির তাফসীর শুনি,
এবারে আসুন আরও কিছু ইসলামিক বক্তব্য শুনি,
উপসংহারঃ মানবিকতার আড়ালে সাম্প্রদায়িক বিভাজন
কোরআনের ৫:৩২ আয়াতটিকে বর্তমানে যেভাবে বিশ্বজনীন মানবিক মূল্যবোধের এক অনন্য দলিল হিসেবে উপস্থাপন করা হয়, তা ঐতিহাসিক এবং শাস্ত্রীয়—উভয় বিচারেই একটি বিশাল শুভংকরের ফাঁকি। ইহুদিদের মানবিক ঐতিহ্য (তালমুদ) থেকে খণ্ডিতভাবে ধার করা এই বাণীর মাঝপথে যে ‘ফাসাদ’ বা বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির শর্তটি জুড়ে দেওয়া হয়েছে, সেটিই মূলত এই আয়াতের আসল মরণফাঁদ। এটি কোনো চিরন্তন মানবিক ঘোষণা নয়, বরং একটি সুনির্দিষ্ট ধর্মীয় আইনশাস্ত্রের অংশ।
ইসলামী শাস্ত্রের ধ্রুপদী ব্যাখ্যা ও তাফসীর অনুযায়ী, ‘শিরক’ বা বহুঈশ্বরবাদই হলো যমীনের বুকে সবচেয়ে বড় ‘ফাসাদ’ বা বিপর্যয় [12]। ফলে ৫:৩২ আয়াতের তথাকথিত ‘নিরাপরাধ’ মানুষের নিরাপত্তা বলয় থেকে পৌত্তলিক বা অমুসলিমরা শুরুতেই অপসারিত হয়ে যায়। ইসলামের স্রষ্টার কাছে যারা ‘শিরককারী’ হিসেবে সবচেয়ে বড় অপরাধী, তাদের জীবন রক্ষার দায় এই আয়াত কোনোভাবেই গ্রহণ করে না। বরং এর ঠিক পরবর্তী আয়াতেই (৫:৩৩) সেই ‘ফাসাদ’ সৃষ্টিকারীদের জন্য হাত-পা কাটা বা শূলে চড়ানোর মতো বীভৎস শাস্তির বিধান রাখা হয়েছে।
সুতরাং, এই আয়াতটি তখনই রক্ষা কবচ হিসেবে কাজ করে যখন মানুষটি মুসলিম হয় অথবা ইসলামের সার্বভৌমত্ব মেনে নেয়। এর বাইরে থাকা বিশাল এক অমুসলিম জনগোষ্ঠী—যাদের বিশ্বাসই ইসলামের চোখে ‘ফাসাদ’—তাদের জন্য এই আয়াতে কোনো দয়া বা আশ্রয়ের স্থান নেই। নিচের ডায়াগ্রামটি লক্ষ্য করলে বিষয়টি আরও স্পষ্টভাবে ফুটে উঠবে যে, কীভাবে শব্দের চাতুর্য এবং ‘ফাসাদ’-এর সংজ্ঞার মারপ্যাঁচে এই ‘শান্তির বাণী’ আসলে একটি কঠোর সাম্প্রদায়িক ও আগ্রাসী আইনশাস্ত্রে রূপান্তরিত হয়েছে।
তথ্যসূত্রঃ
- সূরা মায়িদা, আয়াত ৩২ ↩︎
- Babylonian Talmud: Tractate Sanhedrin, Folio 37a 1 2 3 4 5
- মুরতাদ ওহী লেখক আবদুল্লাহ ইবনে সাদ ইবনে আবি সারাহ এর ধর্মত্যাগের কারণ বিশ্লেষণ ↩︎
- সূরা লুকমান, আয়াত ১৩ ↩︎
- সূরা নিসা, আয়াত ৪৮ ↩︎
- বাংলাদেশে প্রচলিত শির্ক বিদ‘আত ও কুসংস্কার পর্যালোচনা, ২. শির্কের পরিণতি ↩︎
- সূরা মায়িদা, আয়াত ৩৩ ↩︎
- সূরা লুকমান, আয়াত ১৩ ↩︎
- সূরা নিসা, আয়াত ৪৮ ↩︎
- তাফসীরে মাযহারী, হাকিমাবাদ খানকায়ে মোজাদ্দেদিয়া প্রকাশনী, ৫ম খণ্ড, পৃষ্ঠা ১১৭-১২০ ↩︎
- বাংলাদেশে প্রচলিত শির্ক বিদ‘আত ও কুসংস্কার পর্যালোচনা ২. শির্কের পরিণতি ↩︎
- তাফসীরে মাযহারী, ৫ম খণ্ড, পৃষ্ঠা ১১৭-১২০ ↩︎
