ইসলামি বিশ্বাস অনুসারে নবী মুহাম্মদ তো শুধু নবী নন, তিনি সকল নবী-রাসুলের সেরা নেতা, মানবজাতির সর্বশ্রেষ্ঠ মহামানব! কিন্তু ভাগ্যের কী নির্মম পরিহাস! সেই অলৌকিক মহাশক্তিধর, আল্লাহর সবচেয়ে প্রিয় বান্দা, যিনি আল্লাহর তাকদীরে অগাধ বিশ্বাস রাখতেন—তিনি কিনা (ঘটনা সত্য হয়ে থাকলে) নিজের এক স্ত্রীকে তালাক দিলেন, কারণ কী? সেই হতভাগী নারী কুষ্ঠে আক্রান্ত হয়েছিলেন! হায় হায়! যিনি চাইলেই অলৌকিক কুদরতে স্পর্শ করে কুষ্ঠ দূর করতে পারতেন, ক্যান্সার এইডস যার কাছে দুধভাত, সর্বদা ফেরেশতা বাহিনী যার আশেপাশে ঘুরঘুর করে কিংবা আকাশ ফুঁড়ে স্বর্গে যাওয়ার যোগ্যতা রাখতেন, তিনি কিনা সামান্য একটি রোগের ভয়ে ভীত হয়ে স্ত্রীকে তালাক দিলেন! খুব সম্ভবত, নবীজির মোজেজার ব্যাটারি তখন “লো ব্যাটারি” দেখাচ্ছিল।
স্বয়ং আল্লাহর প্রিয়তম রাসুল হয়েও রোগব্যাধির ক্ষেত্রে এ যেন এক অদ্ভুত দুর্বলতা! মোজেজার ক্ষমতা নিয়ে এতসব গল্পগুজব শুনতে শুনতে আমরা তো ধরে নিয়েছিলাম, কুষ্ঠরোগ তার স্পর্শে সেরে উঠবে! কিন্তু বাস্তবে? বাস্তবে নবীজির মনে হল, ‘ভাই, এ তো সিরিয়াস ব্যাপার, এই রোগ না আবার আমার ভেতরে চলে আসে!’ আল্লাহর লিখিত তাকদীরে সম্পূর্ণ বিশ্বাসী নবীজীর আল্লাহর ওপর কত অগাধ বিশ্বাস আর আস্থা, তাই না?
তাহলে কী দাঁড়াল? অলৌকিক ক্ষমতা, তাকদীরের উপর অবিচল বিশ্বাস—সবই জায়গামতো ঠিক আছে, কিন্তু যখন নিজের বিপদের গন্ধ পেলেন, তখন ব্যস, তালাক দিয়ে নিরাপদ গণ্ডিতে চলে গেলেন! নবীর এত মহাশক্তির মাঝেও এই ছোট্ট ‘ব্যাটারির চার্জ ফুরিয়ে যাওয়া’ মুহূর্তটা সত্যিই গবেষণার দাবি রাখে! ঘটনাটি একটি দুর্বল বর্ণনা, তবে মিথ্যা বর্ণনা নয়। আসুন পড়ি, [1] –
460 তাহক্বীক্ব বুলুগুল মারাম মিন আদিল্লাতিল আহকাম বা লক্ষ্যে পৌঁছার দলীলসম্মত বিধিবিধান
وَرَوَى سَعِيدُ أَيْضًا : عَنْ عَلى الله نَحْوَهُ، وَزَادَ : وَبِهَا قَرَنٌ، فَزَوْجُهَا بِالْخِيَارِ، فَإِنْ مَسَّهَا فَلَهَا الْمَهْرُ بِمَا اسْتَحَلَّ مِنْ فَرْجِهَا». بن وَمِنْ طَرِيق سَعِيدِ : الْمُسَيَّبِ أَيْضًا قَالَ : قَضَى [به] عُمَرُ فِي الْعِنّينِ، أَنْ يُؤَجِّلَ سَنَةٌ، وَرِجَالُهُ ثِقَاتُ»
১০১২। যায়দ বিন কা’ব বিন উজরাহ থেকে বর্ণিত, তিনি তাঁর পিতা থেকে বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ বানু গিফার গোত্রের ‘আলিয়াহ নামক এক মহিলাকে বিবাহ করেন। তারপর ঐ মহিলা নাবী রসূলুল্লাহ-এর নিকটে প্রবেশ করেন ও তাঁর দেহাবরণ উন্মোচন করেন, রসূলুল্লাহ তাঁর কোমরের কাছাকাছি অঙ্গে সাদা দাগ দেখতে পান এবং তাঁকে বলেন- কাপড় পরে তুমি তোমার পরিবারের নিকটে চলে যাও। তিনি তাকে তার মোহর দিয়ে দেয়ার জন্য আদেশ করেন । হাকিম এটি বর্ণনা করেছেন। এ হাদীসের সূত্রে জামিল বিন যায়দ একজন অজ্ঞাত রাবী বা বর্ণনাকারী তাঁর ওস্তাদ কে ছিলেন এ নিয়ে বিরাট মতভেদ ঘটেছে।
সা’ঈদ বিন্ মুসাইয়্যিাব থেকে বর্ণিত যে, উমার বিন খাত্তাব বলেছেন- যে ব্যক্তি কোন মহিলাকে বিবাহ করে, অতঃপর তার সাথে মিলন করতে গিয়ে দেখে যে, ঐ নারী শ্বেত কুষ্ঠরোগী বা পাগলী বা কুষ্ঠ রোগগ্রস্তা তাহলে ঐ মহিলার জন্য তার স্বামীর উপর স্পর্শ করা (মিলন) হেতু মোহর আদায় যোগ্য হবে। তবে ঐ ব্যাপারে যদি কেউ ধোঁকা দিয়ে থাকে তাহলে তাকেই মোহরের জন্য দায়ী করা হবে। হাদীসটিকে সা’ঈদ বিন মানসূর, মালিক, ইবনু আবী শাইবাহ বর্ণনা করেছেন। হাদীসটির রাবীগণ নির্ভরযোগ্য।
উক্ত সাহাবী সা‘ঈদ ‘আলী থেকে অনুরূপ আরো অতিরিক্ত বর্ণনা করেছেন- তাতে আছে’ আর যে মহিলার গুপ্তাঙ্গে ক্বার্ণ অর্থাৎ গুপ্তাঙ্গে দাঁতের অনুরূপ শক্ত বস্তু উদ্গত হয়ে থাকে তাহলে স্বামী বিবাহ বিচ্ছেদের অধিকার পাবে। আর ঐ স্ত্রীর সাথে মিলনে গুপ্তাঙ্গ ব্যবহার হয়ে থাকলে স্ত্রী মোহর প্রাপ্য হবে যা দ্বারা তার গুপ্তাঙ্গ হালাল হবে।
এবং সা’ঈদ বিন মুসায়্যিবের সূত্রে আরও আছে তিনি (সাঈদ) বলেছেন- ‘উমার (তাঁর “খেলাফতকালে ইন্নীন বা পুরুষত্বহীনকে এক বছর অবসর দেয়ার ফয়সালা প্রদান করেছিলেন। -এর বর্ণনাকারীগণ নির্ভরযোগ্য।

এই বিষয়ে আরও বর্ণনা পাওয়া যায় আল বিদায়া ওয়ান নিহায়াতে [2]
বলেছেন, রাসূলুল্লাহ (সা)-কে এ নারীর তথ্য সরবরাহ করেছিলেন যাহ্হাক ইন সুফিয়ান আল কিলাবী (রা)। আমি তখন পর্দার অন্তরাল থেকে শুনতে পাচ্ছিলাম। সে বলল, উম্মু শাবীব-এর বোনের প্রতি কি আগ্রহ বোধ করবেন ? উম্মু শাবীব হল যাহ্হাক-এর স্ত্রী। এ সূত্রেই যুহরী (র) বলেছেন, রাসূলুল্লাহ (সা) বনূ আমর ইব্ন কিলাব-এর এক নারীকে বিবাহ করেছিলেন। পরে তাকে এ মর্মে অবহিত করা হল যে, তার গায়ে ধবল কুষ্ঠ রয়েছে। তখন তিনি তার সংগে নিভৃত বাস না করেই তাকে তালাক দিয়ে দেন। গ্রন্থকারের মতে, এ নারী এবং পূর্বোল্লিখিত নারী একই ব্যক্তিত্ব। -আল্লাহই সর্বাধিক অবগত।
বর্ণনাকারী (যুহরী) বলেন, বনূল জাওন আল কিন্তী কন্যা” -কেও বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ করেছিলেন। এ কিনদীরা ছিল বনূ ফাযারা-র মিত্র গোত্র এই মহিলাটি নবী করীম (সা) থেকে আল্লাহর স্মরণ প্রার্থনা করলে তিনি বললেন, “তুমি এক মহান সত্তার আশ্রয় নিয়েছ, যও তোমার আপন জনের সংগে মিলিত হও।” এ ভাবে তার সাথে বাসর না করেই তাকে তা দিয়ে দিলেন।
বর্ণনাকারী আরো বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা)-এর মারিয়া নাম্নী একজন বাঁদী ছিলেন। এ বাঁদীর ঘরে তার পুত্র ইবরাহীমের জন্ম হয়। কোলের শিশু অবস্থায় তাঁর ইনতিকাল হয়ে গেল। এছাড়া রায়হানা বিনত শাম’উন নাম্নী তাঁর অন্য এক বাঁদী ছিলেন। তিনি ছিলেন আহলে কিতাব (ইয়াহুদী) এবং বনূ কুরায়জা-র শাখা গোত্র খিনাফা-র মেয়ে। রাসূলুল্লাহ (সা) তাঁকে বন্দীত্ব হতে মুক্তি দিয়েছিলেন। বর্ণনাকারীদের মতে তিনি পর্দানশীল ভুক্ত ছিলেন। হাফিজ ইবন আসাকির (র) আলী ইব্ন মুজাহিদ (র) সনদে রিওয়ায়াত করেছেন যে, রাসূলুল্লাহ (সা) খাওলা বিনতুল হুযায়ল ইব্ন হুযায়রা আত তাগলিবকেও পরিণয় সূত্রে আবদ্ধ করেছিলেন। তাঁর মা ছিলেন খারনাক বিনত খালাফা -দিহয়া বিনত খালীফা-র বোন। সিরিয়া (শাম) হতে তাকে নবী করীম (সা)-এর জন্য নিয়ে আসা হচ্ছিল। পথিমধ্যে তার মৃত্যু হয়ে গেল। পরে তার খালা শিরাফ বিনত ফুলা ইবন খালীফা-কে তিনি বিবাহ করেন। তাকেও সিরিয়া থেকে তার কাছে নিয়ে আসার সময় তিনিও মারা গেলেন। আর ইউনুস ইন বুকায়র (র) মুহাম্মদ ইব্ন ইসহাক থেকে উদ্ধৃত করে বলেছেন, রাসূলুল্লাহ (সা) আসমা বিনত কা’ব আল জাওনীকে বিবাহ করেছিলেন। কিন্তু তার সংগে নিভৃত বাস’ না করেই নবী করীম (সা) তাঁকে তালাক দিয়ে দিলেন। অনুরূপ বনূ কিলাব ও পরে বনূল ওয়াহীদ-এর অন্যতমা নারী আমরা বিনত যায়দকে নবী করীম (সা) বিবাহ করেছিলেন। তার আগেকার স্বামী ছিলেন ফাযল ইব্ন আব্বাস ইবন আবদুল মুত্তালিব। এ স্ত্রীকেও তিনি সহবাসের আগেই তালাক দিয়েছিলেন। বায়হাকী (র) বলেছেন, যুহরী (র) নাম নির্দিষ্ট না করে যে দুজনের কথা উল্লেখ করেছেন এরা এ দুজনই । তবে ইবন ইসহাক (র) আলিয়া নাম্নী মহিলার উল্লেখ করেননি।
বায়হাকী (র) বলেন, হাকিম (র)….শা’বী (র) থেকে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, কয়েকজন নারী নিজেদেরকে রাসূলুল্লাহ (সা) সমীপে ‘হিবা’ রূপে সমর্পিত করেছিলেন। তাদের কতকের সংগে তিনি নিভৃত বাস করেছিলেন এবং অন্য কতককে প্রতীক্ষিতা
১. রওযুল উনুফে তার নাম বরা হয়েছে আসমা বিনতে নু’মান। সম্পাদকমণ্ডলী

