জ্ঞানকোষ প্রবন্ধ

নবীর ভুল ভবিষ্যদ্বাণীঃ বালকের বৃদ্ধ হওয়ার পূর্বে কিয়ামত হবে

প্রকাশিত: এপ্রিল 26, 2024 · লেখক: আসিফ মহিউদ্দীন · 66 মিনিট পড়া

ভূমিকা

ধর্মীয় ভবিষ্যদ্বাণী—বিশেষ করে “কিয়ামতের সময়” নিয়ে করা বক্তব্য—মূলত এক ধরনের জ্ঞান-দাবি (knowledge claim): এগুলো বাস্তব জগতের সময়, ঘটনা, মানবসমাজ এবং ইতিহাসের সঙ্গে সম্পর্কিত বলে উপস্থাপিত হয়। তাই এগুলোকে জ্বীন-ফেরেশতা, জান্নাত-জাহান্নামের মতো “অধরা আধ্যাত্মিক” বলে পাশ কাটিয়ে দেওয়া যুক্তিগতভাবে গ্রহণযোগ্য নয়। যখন কোনো বক্তব্যে নির্দিষ্ট ইঙ্গিত থাকে—“কিয়ামত কখন”, “কিয়ামত ঘনিয়ে এসেছে”, “অমুক ঘটনার আগে”—তখন সেটি স্বভাবতই যাচাইযোগ্য দাবির দিকে চলে যায়।

ভবিষ্যদ্বাণী যাচাইয়ের মৌলিক নিয়ম হলো—দাবিটি উচ্চারিত হওয়ার সময় যে অর্থ বহন করেছিল, ফলাফল ব্যর্থ হওয়ার পরে সেই অর্থ বদলে দেওয়া যাবে না। কোনো বক্তব্য প্রথমে যদি একটি নির্দিষ্ট ঘটনা ও সময়সীমা নির্দেশ করে, কিন্তু সেই ঘটনা না ঘটার পরে বলা হয় “আসলে অন্য কিছু বোঝানো হয়েছিল”, তাহলে সেটি ভবিষ্যদ্বাণীর সাফল্য নয়; বরং ব্যর্থতার পরে দাবিটিকে উদ্ধার করার চেষ্টা। এই প্রবন্ধে তাই দেখা হবে, মুহাম্মদের কিয়ামত-সংক্রান্ত বক্তব্যগুলো তাদের ভাষা ও প্রেক্ষাপটে কী বোঝাচ্ছিল, এবং সেই প্রত্যাশা বাস্তবে পূরণ না হওয়ার পরে শব্দের অর্থ, বর্ণনার সীমা ও ব্যাখ্যার কাঠামো কীভাবে বদলেছে। যে ভবিষ্যদ্বাণী ব্যর্থ হলেই নতুন অর্থ গ্রহণ করতে পারে, তাকে বাস্তবে কখনোই ভুল প্রমাণ করা যায় না; ফলে তার প্রমাণমূল্যও শূন্য হয়ে যায়।

এই অংশে আমরা কিছু প্রসিদ্ধ হাদিসের ভাষা ও বর্ণনা ধরে বিশ্লেষণ করব—“কিয়ামত” ঘনিয়ে আসার দাবি, যুদ্ধের রূপকল্প, এবং সময়-অ্যাঙ্করযুক্ত বাক্য (যেমন “বালক বার্ধক্যে পৌঁছানোর আগে”)—এসবের মধ্যে আসলে কতটা ভবিষ্যতজ্ঞান রয়েছে, আর কতটা সমকালীন কল্পনা ও পরবর্তীকালের প্রতিরক্ষামূলক ব্যাখ্যা।


অ্যাপোক্যালিপ্টিক ধারণার সামাজিক-রাজনৈতিক কার্যকারিতা

ধর্মীয় ইতিহাসে “শেষ যুগ”, “জগতের অবসান”, “মহাবিপর্যয়” বা “শেষ বিচারের দিন”—এই জাতীয় ধারণা (শেষকালের তত্ত্ব/ইস্কাতোলজি — eschatology) অস্বাভাবিক কিছু নয়; বরং বারবার ফিরে আসা একটি পুনরাবৃত্ত কাঠামো। নানা ধর্মে “শেষ সময়” সম্পর্কে বিভিন্ন ভাষা, প্রতীক, দেবতা বা নৈতিক বিধানের পার্থক্য থাকলেও, কাঠামোটি প্রায় একই থাকে: (ক) বর্তমান যুগ নৈতিকভাবে অধঃপতিত, (খ) শিগগিরই এক আকস্মিক ও ভয়াবহ হস্তক্ষেপ/ধ্বংস/বিচার আসবে, (গ) যারা “সঠিক দল/বিশ্বাসে” আছে তারা রক্ষা পাবে, বাকিরা শাস্তি পাবে বা ধ্বংস হবে। [1] [2]

এখানে লক্ষ্যণীয় বিষয়, “শেষ সময় আসন্ন”—এই ধারণা ইসলামের নিজস্ব বা অনন্য কোনো আবিষ্কার নয়। বহু ধর্মীয় ও পৌরাণিক ঐতিহ্যে চূড়ান্ত যুদ্ধ, মহাধ্বংস, বিচার, অশুভ শক্তির পরাজয় এবং নতুন বিশ্বের সূচনার বয়ান পাওয়া যায়। ইসলামের কিয়ামত বর্ণনাও মানুষের বহু পুরোনো প্রলয়কল্পনার একই বিস্তৃত ঐতিহাসিক ধারার মধ্যে পড়ে।। জরথ্রুস্ট্রবাদে (Zoroastrianism) ফ্রাশোকেরেতি (Frashokereti) নামে “বিশ্বের চূড়ান্ত পুনর্নবীকরণ/চূড়ান্ত পুনরুদ্ধার” ধারণা আছে, যেখানে অশুভ শক্তির পরাজয় ও সৃষ্টির পুনর্গঠনকে শেষ অধ্যায় হিসেবে ধরা হয়। [3] [4] নর্স পুরাণে (Norse mythology) র‍্যাগনারক (Ragnarök)—দেবতা-দানব-দৈত্যদের চূড়ান্ত যুদ্ধ, বিশ্বধ্বংস এবং তারপর নতুন করে বিশ্ব “পুনর্জন্ম” নেয়—এটিও একই ধরনের “শেষ/পুনর্গঠন” কাঠামো। [5] আর আব্রাহামিক ধর্মগুলোতে (ইহুদি, খ্রিস্টান, ইসলাম) “শেষ সময়” আরও কেন্দ্রীয়: বিচার, পুনরুত্থান, ন্যায়ের চূড়ান্ত প্রতিষ্ঠা, এবং “সঠিক পথ”–এর অনুসারীদের মুক্তি—এগুলো প্রায়ই একসাথে জুড়ে যায়। [6]

এই ধরনের প্রলয়-বয়ানের রাজনৈতিক ও সামাজিক শক্তি নিহিত থাকে ভয়, সময়ের চাপ এবং দলগত মুক্তির প্রতিশ্রুতিতে। “সময় শেষ হয়ে আসছে”, “বিচার সামনে”, “এখনই পক্ষ বেছে নাও”—এই ধরনের ভাষা ভবিষ্যৎকে সংকুচিত করে এবং মানুষের ওপর তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্তের চাপ সৃষ্টি করে। বর্তমান জীবনকে ক্ষণস্থায়ী ও শেষ বিচারকে আসন্ন বলে উপস্থাপন করলে দীর্ঘমেয়াদি প্রশ্ন, সংশয় ও পরিকল্পনার তুলনায় আনুগত্য, প্রস্তুতি এবং দলগত সংহতি অনেক বেশি গুরুত্ব পায়।

স্বল্পমেয়াদী দৃষ্টিভঙ্গি

মানুষ “দূর ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা” কমিয়ে দেয়; “এখনই বাঁচো/এখনই মানো”—এই মানসিকতা তীব্র হয়। দীর্ঘমেয়াদী যৌক্তিকতার চেয়ে তাৎক্ষণিক আবেগ প্রাধান্য পায়।

👥
গোষ্ঠী সংহতি ও অবিশ্বাস

নিজ গোষ্ঠীর ভেতরে সংহতি (Group Cohesion) বাড়ে, কিন্তু একই সাথে বাইরের লোকদের প্রতি চরম সন্দেহ ও অনাস্থা তৈরি হয়।

📢
কর্তৃত্ববাদী সত্য

নেতার নির্দেশ “জরুরি সত্য” হয়ে ওঠে। সময়ের স্বল্পতার দোহাই দিয়ে প্রশ্নহীন আনুগত্য আদায় করা সহজ হয়।

সারসংক্ষেপ: যখন কোনো বিচার বা শেষ সময়ের ভয় সামনে আনা হয়, তখন মানুষের বিচারবুদ্ধি সঙ্কুচিত হয়ে পড়ে। এই জরুরি অবস্থা (Sense of Urgency) মানুষকে দীর্ঘমেয়াদী চিন্তা থেকে বিচ্যুত করে তাৎক্ষণিক আনুগত্যের দিকে ঠেলে দেয়।

এজন্যই সমাজবিজ্ঞানে ধর্মকে শুধু ব্যক্তিগত বিশ্বাস নয়, ক্ষমতা-বৈধতা (power legitimation) ও সামাজিক নিয়ন্ত্রণের (social control) একটি সম্ভাব্য উৎস হিসেবেও আলোচনা করা হয়। উদাহরণ হিসেবে Annual Review of Sociology–এর “Religion and Political Legitimation” প্রবন্ধে দেখানো হয়—ধর্ম ক্ষমতা ও সুবিধাভোগী কাঠামোকে বৈধতা দিতে পারে, আবার প্রতিবাদও তৈরি করতে পারে; অর্থাৎ ধর্মের “দ্বৈত ভূমিকা” (double function) আছে। [7] এই প্রক্রিয়াকে “শেষ-যুগবাদ/অ্যাপোক্যালিপ্টিকতা (apocalypticism)” আরও তীব্র করে। কারণ এখানে ভয় কেবল নৈতিক ভয় নয়—এটা “এই বুঝি সব শেষ”–জাতীয় অস্তিত্বগত আতঙ্ক। ইতিহাসে “হাজার-বছরবাদী/মিলেনারিয়ান (millenarian)” আন্দোলনগুলো প্রায়ই সংকট, অনিশ্চয়তা, দারিদ্র্য, সামাজিক অস্থিরতার সময়ে জোরালো হয়; এবং “শেষ সময়”–এর ভাষা দিয়ে তারা দ্রুত গণসমর্থন, শৃঙ্খলা, এমনকি সহিংসতাও উসকে দিতে সক্ষম হয়েছে—এটা নরম্যান কোনের The Pursuit of the Millennium–এ মধ্যযুগীয় ইউরোপের নানা আন্দোলনের আলোচনায় ধরা পড়ে। [8]

আর আধুনিক সমাজবিজ্ঞানে কার্ল মার্কসের বিখ্যাত বাক্য “ধর্ম হলো জনগণের আফিম” (opium of the people)–ও এই কার্যকারিতার কথাই বলে—ধর্ম মানুষের বাস্তব কষ্টের মাঝে একধরনের মানসিক “মলম/ব্যথানাশক” (painkiller) হতে পারে, কিন্তু একই সাথে তা ক্ষমতার কাঠামোকে ঢেকে দিতে পারে। [9] [10]

সব মিলিয়ে যৌক্তিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা যায়, “এই বুঝি শেষ এসে গেল”—জাতীয় বার্তা যুগে যুগে টিকে আছে শুধু ধর্মতাত্ত্বিক সত্য-দাবির কারণে নয়, বরং কারণ এটি মানুষের ভয়, অনিশ্চয়তা, এবং গোষ্ঠীগত আনুগত্যকে দ্রুত সংগঠিত করতে পারে। এ ধরনের বয়ান যুক্তি ও প্রমাণের আলোকে পরীক্ষা করলে অনেক সময় দেখা যায়—প্রাথমিক “সময়ঘনিষ্ঠ” দাবিগুলো টিকিয়ে রাখতে পরে পুনঃব্যাখ্যা, প্রতীকীকরণ, বা অর্থ-সরানো দরকার হয়।


হাদিস সম্পর্কে ইসলামিক আকীদা

মুহাম্মদের নিজের মুখে আরোপিত একটি সহিহ বর্ণনাই তাঁর বক্তব্যের সত্যতা সম্পর্কে অত্যন্ত উচ্চ দাবি করে। আবদুল্লাহ ইবন আমর তাঁর কথা লিখে রাখলে কুরাইশরা আপত্তি করেছিল—মুহাম্মদ তো মানুষ, তিনি রাগ ও সন্তুষ্টির অবস্থাতেও কথা বলেন। এর উত্তরে মুহাম্মদ নিজের মুখের দিকে ইঙ্গিত করে বলেন, “যাঁর হাতে আমার জীবন, এ মুখ থেকে যা বের হয় তা সত্য ছাড়া কিছু নয়।” অর্থাৎ এই হাদিসের নিজস্ব দাবি অনুযায়ী তাঁর বক্তব্য সাধারণ মানুষের ভুলভ্রান্ত কথার পর্যায়ে পড়ে না। ফলে ভবিষ্যৎ বা প্রকৃতি সম্পর্কে তাঁর কোনো সহিহ বক্তব্য বাস্তবতার সঙ্গে সংঘর্ষে পড়লে সেটি নবুয়তি জ্ঞান-দাবির সরাসরি সমস্যা হয়ে দাঁড়ায়। [11]

সূনান আবু দাউদ (ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
১৯/ শিক্ষা-বিদ্যা, (জ্ঞান-বিজ্ঞান)
পরিচ্ছেদঃ ৪১৭. ইলম লিপিবদ্ধ করা সম্পর্কে।
৩৬০৭. মুসাদ্দাদ (রহঃ) ….. আবদুল্লাহ ইবন আমর (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেনঃ আমি যা কিছু রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট হতে শ্রবণ করতাম, তা লিখে রাখতাম। আমি ইচ্ছা করতাম যে, আমি এর সবই সংরক্ষণ করি। কিন্তু কুরাইশরা আমাকে এরূপ করতে নিষেধ করে এবং বলেঃ তুমি যা কিছু শোন তার সবই লিখে রাখ, অথচ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একজন মানুষ, তিনি তো কোন সময় রাগান্বিত অবস্থায় কথাবার্তা বলেন এবং খুশীর অবস্থায়ও বলেন। একথা শুনে আমি লেখা বন্ধ করি এবং বিষয়টি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে অবহিত করি। তখন তিনি তার আংগুল দিয়ে নিজের মুখের প্রতি ইাশারা করে বলেনঃ তুমি লিখতে থাক, ঐ যাতের কসম, যাঁর হাতে আমার জীবন, যা কিছু এ মুখ হতে বের হয়, তা সবই সত্য।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আবদুল্লাহ ইবনু আমর ইবনুল আস (রাঃ)


নবী মুহাম্মদের ভুল ভবিষ্যদ্বাণী

কিয়ামতের পূর্বের যুদ্ধে অশ্বারোহী?

আমরা যারা নিয়মিত চলচ্চিত্র দেখি, তারা সবাই বুঝি যে, ভবিষ্যতের পৃথিবী এবং যুদ্ধবিগ্রহগুলো বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই হবে ভারী অস্ত্রশস্ত্র, রোবট, বিমান এবং ক্ষেপণাস্ত্রের দ্বারা। মজার বিষয় হচ্ছে, নবী মুহাম্মদ কিয়ামতের পূর্বে যেই যুদ্ধ হবে তার ভবিষ্যতবাণী করতে গিয়ে বহুস্থানেই ঘোড়ায় চড়ে, বর্শা এবং তরবারির সাহায্যে যুদ্ধের কথা বলা আছে। অর্থাৎ নবী মুহাম্মদ কখনো ভাবতেও পারেনি, পৃথিবী এতদিন পর্যন্ত টিকবে, জ্ঞান বিজ্ঞানের এত প্রসার ঘটবে এবং মানুষ এত এত আবিষ্কার করবে। নইলে ঘোড়ায় চড়ে, বর্শা ঢাল আর তরবারি নিয়ে যুদ্ধের কথা বলতেন না। আসুন অতীতের যুদ্ধ বনাম ভবিষ্যতের যুদ্ধ কেমন হবে তার দুইটি AI দ্বারা তৈরি কাল্পনিক ছবি দেখি,

ভুল
ছবি: ৭ম শতকের আরব যুদ্ধের কাল্পনিক চিত্র (হাদিসের বর্ণনার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ)
ভুল 1
ছবি: আধুনিক/ভবিষ্যত যুদ্ধের কাল্পনিক চিত্র (হাদিসের বিবরণের সাথে কোন মিল নেই)

এবারে আসুন একটি হাদিস পড়ি,

সহীহ মুসলিম (ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
৫৫/ফিতনা সমূহ ও কিয়ামতের নিদর্শনাবলী
পরিচ্ছেদঃ ১০. রোমনদের সংখ্যাধিক্যের অবস্থায় কিয়ামত সংঘটিত হবে
৭০১৭। আবূ বকর ইবনু আবূ শায়বা ও আলী ইবনু হুজর (রহঃ) … উসায়র ইবনু জাবির (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একবার কুফা নগরীতে লাল (উত্তপ্ত) ঝঞ্ঝা বায়ু প্রবাহিত হল। এ সময় এক ব্যক্তি কুফায় আসল। তার কথার ’মুদ্রাদোষ’ ছিল ’আলা’ হে আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদ! কিয়ামত এসে গেছে। তিনি (আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদ) যেভাবে বসে ছিলেন সেভাবেই বসে রইলেন এবং বললেন কিয়ামত কায়িম হবে না, যতক্ষন না উত্তরাধিকার সম্পদ অবণ্টিত থাকবে এবং যতক্ষন না লোক গনীমতে আনন্দিত হবে না। অতঃপর তিনি তার হস্ত দ্বারা সিরিয়ার প্রতি ইঙ্গিত করে বললেন, আল্লাহর শত্রুরা সমবেত হবে মুসলিমদের সাথে লড়াই করার জন্য এবং মুসলিমগণও তাদের সাথে যুদ্ধ করার জন্য সমবেত হবে।
(এ কথা শুনে) আমি বললাম, আল্লাহর শত্রু বলে আপনাদের উদ্দেশ্য হল রোমীয় খ্রীষ্টান সম্প্রদায়। তিনি বললেন, হ্যাঁ এবং তখন ভয়াবহ যুদ্ধ সংঘটিত হবে। তখন মুসলিম সম্প্রদায় একটি দল অগ্রে প্রেরণ করবে, তারা মৃত্যুর জন্য সামনে অগ্রসর হবে। জয়লাভ করা ব্যতিরেকে তারা পেছনে ফিরবে না। এরপর পরস্পর তাদের মাঝে যুদ্ধ হবে। যুদ্ধ করতে করতে রাত হয়ে যাবে। অতঃপর উভয় পক্ষের সৈন্য জয়লাভ করা ব্যতিরেকেই ফিরে চলে যাবে। যুদ্ধের জন্য মুসলিমদের যে দলটি অগ্রে এগিয়ে গিয়েছিল তারা সকলেই মরে যাবে। অতঃপর পূর্ববর্তী দিন মুসলিমগণ মৃত্যুর জন্য অপর একটি দল অগ্রে প্রেরণ করবে। তারা বিজয়ী না হয়ে প্রত্যাবর্তন করবে না। এদিনও পরস্পরের মাঝে মারাত্মক যুদ্ধ হবে। অবশেষে সন্ধ্যা হয়ে যাবে। উভয় বাহিনী জয়লাভ করা ব্যতীতই নিজ নিজ শিবিরে ফিরে আসবে। দলটি নিঃশেষ হয়ে যাবে। অতঃপর তৃতীয় দিন পুনঃরায় মুসলিমগণ মৃত্যুর জন্য একটি বাহিনী পাঠাবে। যারা বিজয়ী না হয়ে ফিরবে না। সে দিন পৃথিবীর সর্বোত্তম অশ্বারোহী দলের অন্তর্ভুক্ত হবে তারা।
এ যুদ্ধ সন্ধ্যা পর্যন্ত চলতে থাকবে। অবশেষে জয়লাভ করা ব্যতিরেকেই এ দল ও ঐ দল ফিরে যাবে। (তবে মুসলিম বাহিনীর সামনের) সেনাদলটি শেষ হয়ে যাবে। এরপর যুদ্ধের চতুর্থ দিবসে অবশিষ্ট মুসলিমগণ সকলেই যুদ্ধের জন্য সম্মুখ পানে এগিয়ে যাবে। সেদিন কাফিরদের উপর আল্লাহ তায়ালা অমঙ্গল চক্র চাপিয়ে দিবেন। অতঃপর এমন যুদ্ধ হবে যা জীবনে কেউ দেখবেনা অথবা যা জীবনে কেউ দেখেনি। অবশেষে তাদের শরীরের উপর পাখী উড়তে থাকবে। পাখী তাদেরকে অতিক্রম করবে না; এমতাবস্থায় তা মাটিতে পড়ে মরে যাবে। একশ মানুষ বিশিষ্ট পূর্ন পুরুষদের একটি গোত্র, এদের থেকে মাত্র এক ব্যক্তি বেঁচে থাকবে। এমতাবস্থায় কেমন করে গনীমতের সম্পদ নিয়ে লোকেরা আনন্দ উৎসব করবে এবং কেমন করে উত্তরাধিকার সম্পদ বন্টন করা হবে।
মুসলিমগণ এ সময় আরেকটি ভয়াবহ বিপদের সংবাদ শুনতে পাবে এবং এ মর্মে একটি আওয়াজ তাদের নিকট পৌছবে যে, দাজ্জাল তাদের পেছনে তাদের পরিবার পরিজনের মধ্যে চলে এসেছে। এ সংবাদ শুনতেই তারা হাতের সমস্ত কিছু ফেলে দিয়ে রওয়ানা হয়ে যাবে এবং দশজন অশ্বারোহী ব্যক্তিকে সংবাদ সংগ্রাহক দল হিসাবে প্রেরণ করবে।রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ দাজ্জালের সংবাদ সংগ্রাহক দলের প্রতিটি ব্যক্তির নাম, তাদের বাপ-দাদার নাম এবং তাদের অশ্বের রং সম্পর্কেও আমি অবগত আছি। এ পৃথিবীর সর্বোত্তম অশ্বারোহী দল সেদিন তারাই হবে। অথবা (বলেছেন) ইবন আবু শায়বা (তার) রিওয়ায়াতের মধ্যে يُسَيْرِ بْنِ جَابِرٍ এর পরিবর্তে أُسَيْرِ بْنِ جَابِرٍ বর্ণনা করে ছেন।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ উসায়র ইবনু জাবির (রাঃ)


ঘোড়া ও গনীমত থাকবে কিয়ামত পর্যন্ত

শেষযুগের যুদ্ধের সঙ্গে ঘোড়ার সম্পর্কটি বিচ্ছিন্ন কোনো একটি বর্ণনায় সীমাবদ্ধ নয়। সহীহ মুসলিমের আরেকটি হাদিসে মুহাম্মদ সরাসরি ঘোড়ার সঙ্গে সওয়াব ও যুদ্ধলব্ধ গনীমতকে “কিয়ামত পর্যন্ত” যুক্ত করেছেন। অর্থাৎ এখানে ঘোড়া শুধু তাঁর সমকালীন যুদ্ধের বাহন নয়; বর্ণনার ভাষায় এটি কিয়ামত পর্যন্ত চলমান যুদ্ধ ও গনীমতের কাঠামোর অংশ। [12]

عَنْ جَرِيرِ بْنِ عَبْدِ اللَّهِ قَالَ: رَأَيْتُ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَلْوِي نَاصِيَةَ فَرَسٍ بِإِصْبَعِهِ، وَهُوَ يَقُولُ: الْخَيْلُ مَعْقُودٌ بِنَوَاصِيهَا الْخَيْرُ إِلَى يَوْمِ الْقِيَامَةِ: الْأَجْرُ وَالْغَنِيمَةُ.

জারীর ইবন আবদুল্লাহ থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন: আমি রাসূলুল্লাহকে তাঁর আঙুল দিয়ে একটি ঘোড়ার কপালের চুল পাকাতে দেখেছি। তখন তিনি বলছিলেন: “ঘোড়ার কপালের সঙ্গে কিয়ামতের দিন পর্যন্ত কল্যাণ বাঁধা রয়েছে—সওয়াব এবং গনীমত।”

এই বক্তব্যের সময়সীমা লক্ষণীয়: إِلَى يَوْمِ الْقِيَامَةِ—“কিয়ামতের দিন পর্যন্ত।” একই প্রবন্ধে দেখা যাচ্ছে, শেষযুগের মহাযুদ্ধে অশ্বারোহী বাহিনী, দাজ্জালের সংবাদ সংগ্রহে দশজন অশ্বারোহী, তরবারি গাছে ঝুলিয়ে গনীমত বণ্টন এবং বর্শা দিয়ে দাজ্জাল হত্যার বর্ণনা রয়েছে। তার সঙ্গে এই হাদিস যোগ করলে সপ্তম শতকের যুদ্ধসংস্কৃতির ধারাবাহিকতা আরও স্পষ্ট হয়: ঘোড়া, জিহাদ এবং গনীমতকে মুহাম্মদের বক্তব্যে শুধু তাঁর নিজের যুগের বাস্তবতা হিসেবে নয়, কিয়ামত পর্যন্ত চলমান ব্যবস্থার অংশ হিসেবেও উপস্থাপন করা হয়েছে।

এই হাদিসে কিয়ামতের আগের চূড়ান্ত সংঘাতের কেন্দ্রে রয়েছে অশ্বারোহী বাহিনী, এবং মুহাম্মদ এমনকি সেই অশ্বগুলোর রং পর্যন্ত জানার দাবি করেছেন। একই ধরনের অন্য বর্ণনায় তরবারি গাছে ঝুলিয়ে গনীমত ভাগ করা এবং ঈসার হাতে বর্শা দিয়ে দাজ্জাল হত্যার দৃশ্যও রয়েছে। একত্রে এগুলো ভবিষ্যৎ সম্পর্কে এমন একটি কল্পচিত্র তৈরি করে যার সামরিক উপকরণ সম্পূর্ণভাবে প্রাচীন ও মধ্যযুগীয় যুদ্ধসংস্কৃতির মধ্যে আবদ্ধ।


কিয়ামতের পূর্বে তরবারির যুদ্ধ?

এবারে আসুন কিয়ামতের পূর্বের যুদ্ধে অস্ত্রও হিসেবে তরবারির ব্যবহার সম্পর্কে একটি হাদিস পড়ি। উল্লেখ্য, এরকম হাদিসের সংখ্যা অনেক [13]

সহীহ মুসলিম (ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
৫৫/ ফিতনা সমূহ ও কিয়ামতের নিদর্শনাবলী
পরিচ্ছেদঃ ৯. ইস্তাম্বুল বিজয়, দাজ্জালের আত্মপ্রকাশ এবং ঈসা ইবন মারয়াম (আঃ) এর অবতরণ
৭০১৪। যুহায়র ইবনু হারব (রহঃ) … আবূ হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ কিয়ামত কায়েম হবে না যতক্ষন পর্যন্ত না রোমান সেনাবাহিনী ’আমাক’ অথবা ’দাবিক’ নগরীতে অবতরণ করবে। তখন তাদের মুকাবিলায় মদীনা হতে এ পৃথিবীর সর্বোত্তম মানুষের এক দল সৈন্য বের হবে। অতঃপর উভয় দল সারিবদ্ধভাবে দন্ডায়মান হবার পর রোমানরা বলবে, তোমরা ঐ সমস্ত লোকদের পৃথক করে দাও, যারা আমাদের লোকদের মধ্যে যাদের বন্দী করেছে। আমরা তাদের সাথে লড়াই করবো।
তখন মুসলিমগণ বলবে, আল্লাহর শপথ! আমরা আমাদের ভাইদের থেকে কখনো বিচ্ছিন্ন হবো না। অবশেষে তাদের পরস্পর যুদ্ধ হবে। এ যুদ্ধে মুসলিমদের এক তৃতীয়াংশ সৈন্য পালিয়ে যাবে। আল্লাহ তায়ালা কখনো তাদের তাওবা কবুল করবেন না। সৈন্যদের এক তৃতীয়াংশ নিহত হবে এবং তারা হবে আল্লাহর নিকট শহীদানের মাঝে সর্বোত্তম শহীদ। আর সৈন্যদের অপর তৃতীয়াংশ বিজিয়ী হবে। জীবনে আর কখনো তারা ফিতনায় আক্রান্ত হবে না। তারাই ইস্তাম্বুল জয় করবে। তারা নিজেদের তরবারী যায়তুন বৃক্ষে লটকিয়ে যুদ্ধ লব্ধ সম্পদ বন্টন করতে থাকবে। এমতাবস্থায় তাদের মধ্যে শয়তান চিৎকার করে বলতে থাকবে- দাজ্জাল তোমাদের পেছনে তোমাদের পরিবার-পরিজনের মধ্যে চলে এসেছে।
এ কথা শুনে মুসলিমরা সেখান থেকে বের হবে। অথচ এটি মিথ্যা খবর। তারা যখন সিরিয়া পৌছবে তখন দাজ্জালের আবির্ভাব হবে। যখন মুসলিম বাহিনী যুদ্ধের প্রস্তুতি গ্রহণ করবে এবং সারিবদ্ধভাবে দণ্ডায়মান হতে শুরু করবে তখন সালাতের সময় হবে। অতঃপর ঈসা (আলাইহিস সালাম) অবতরণ করবেন এবং সালাতে তাদের ইমামত করবেন। আল্লাহর শত্রু তাকে দেখামাত্রই বিগলিত হয়ে যাবে যেমন লবণ পানিতে গলে যায়। যদি ঈসা (আলাইহিস সালাম) কাউকে এমনিই ছেড়ে দেন তবে সেও নিজে নিজেই বিগলিত হয়ে ধ্বংস হয়ে যাবে। অবশ্য আল্লাহ তাআলা ঈসা (আলাইহিস সালাম) এর হাতে তাকে হত্যা করবেন এবং তার রক্ত ঈসা (আলাইহিস সালাম) এর বর্শাতে তিনি তাদেরকে দেখিয়ে দিবেন।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আবূ হুরায়রা (রাঃ)


কিয়ামতের পূর্বে তরবারি ও বর্শার ব্যবহার

হাদিসগুলো থেকে আরও জানা যায়, কেয়ামতের পুর্বের যুদ্ধে তরবারি ও বর্শার ব্যবহার হবে [14]

মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত)
পর্ব-২৭: ফিতনাহ
পরিচ্ছেদঃ প্রথম অনুচ্ছেদ – যুদ্ধবিগ্রহ সম্পৰ্কীয়
৫৪২১-[১২] আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: ততক্ষণ পর্যন্ত কিয়ামত সংঘটিত হবে না, যতক্ষণ পর্যন্ত না রূমকগণ (রোমানগন) (মুসলিমদের বিরুদ্ধে) আ’মাক অথবা দাবিক নামক স্থানে অবতরণ করবে এবং মদীনার তৎকালীন উত্তম লোকদের একটি সেনাদল তাদের মোকাবিলায় বের হবে। যুদ্ধের জন্য যখন মুসলিমগণ সারিবদ্ধ হবে, তখন রূমকগণ বলবে, তোমাদের যারা আমাদের সাথে যুদ্ধ করে আমাদের কিছু সংখ্যক লোকজনকে বন্দি করে নিয়ে এসেছ। তাদের সাথে আমরা যুদ্ধ করব। মুসলিমগণ বলবেন, আল্লাহর শপথ! এটা কখনো হতে পারে না। আমরা আমাদের সেই সকল মুসলিম ভাইদেরকে তোমাদের সাথে যুদ্ধ করার জন্য ছেড়ে দিতে পারি না। এরপর মুসলিমগণ রূমক কাফিরদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে লিপ্ত হবে, কিন্তু মুসলিমদের এক-তৃতীয়াংশ রূমকদের মোকাবিলা থেকে পলায়ন করবে। আল্লাহ তা’আলা এই পলায়নকারীদের তাওবাহ্ কখনো গ্রহণ করবেন না। আর এক তৃতীয়াংশ নিহত হবে, তারা আল্লাহ তা’আলার নিকট উত্তম শহীদ হিসেবে গণ্য হবে। আর এক-তৃতীয়াংশ রূমকদের ওপর বিজয়ী হবে, আল্লাহ তা’আলা তাদেরকে কখনো ফিতনায় ফেলবেন না। অবশেষে তারাই কনস্টান্টিনোপল জয় করবে। অতঃপর যখন তারা গনীমতের মাল-সম্পদ ভাগ করণে ব্যস্ত হবে এবং তাদের তরবারিসমূহ যায়তুন গাছের সাথে ঝুলিয়ে রাখবে, ঠিক এ সময় হঠাৎ শয়তান এ ঘোষণা দেবে যে, তোমাদের অনুপস্থিতিতে মাসীহে দাজ্জাল তোমাদের বাড়িঘরে ঢুকে পড়েছে। এতদশ্রবণে মদীনার সেই সেনাদল সেদিকে বের হয়ে পড়বে। অথচ সেই ঘোষণাটি সম্পূর্ণ মিথ্যা। যখন মুসলিমগণ কনস্টান্টিনোপল ছেড়ে সিরিয়ায় প্রবেশ করবে তখনই দাজ্জালের আগমন ঘটবে। এ সময় মুসলিমগণ দাজ্জালের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে প্রস্তুতি নিতে থাকবে এবং সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে যাবে, তৎক্ষণাৎ সালাতের উদ্দেশে (মুয়াযযিন কর্তৃক) ইকামত দেয়া হবে এবং এ মূহুর্তে ’ঈসা ইবনু মারইয়াম (আঃ) আকাশ থেকে (দামিশকের জামে মসজিদের মিনারায়) অবতরণ করবেন এবং মুসলিমদের ইমামতি করে সলাত আদায় করাবেন। অতঃপর যখন আল্লাহর শত্রু (দাজ্জাল) তাঁকে দেখতে পাবে, তখন সে এমনিভাবে গলে যেতে থাকবে যেমনিভাবে লবণ পানিতে গলে যায়। আর যদি ঈসা (আঃ) তাকে এমনিতেই ছেড়ে দিতেন, তবুও সে এমনিতেই গলে ধ্বংস হয়ে যেত, কিন্তু আল্লাহ তা’আলা তাকে ’ঈসা (আঃ) যে বর্শা দিয়ে তাকে হত্যা করবেন, রক্তমাখা সে বর্শাটি তিনি লোকেদের সকলকেই দেখাবেন। (মুসলিম)
সহীহ: মুসলিম ৩৪-(২৮৯৭), সহীহুল জামি’ ৭৪৩৩, আল মুসতাদরাক লিল হাকিম ৮৪৮৬।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আবূ হুরায়রা (রাঃ)


কিয়ামত অতি সন্নিকটেঃ এই বুঝি এসে গেল

কোরআনে খুব পরিষ্কারভাবে বর্ণিত হয়েছে যে, কিয়ামত অতি সন্নিকটে [15]

ক্বিয়ামত নিকটবর্তী হয়েছে এবং চন্দ্র খন্ডিত হয়েছে,
— Taisirul Quran
কিয়ামাত আসন্ন, চাঁদ বিদীর্ণ হয়েছে,
— Sheikh Mujibur Rahman
কিয়ামত নিকটবর্তী হয়েছে এবং চাঁদ বিদীর্ণ হয়েছে।
— Rawai Al-bayan
কিয়ামত কাছাকাছি হয়েছে [১], আর চাঁদ বিদীর্ণ হয়েছে [২],
— Dr. Abu Bakr Muhammad Zakaria


কোরআনে কিয়ামত ও শেষ বিচারের নৈকট্য শুধু সূরা কামারের “কিয়ামত নিকটবর্তী হয়েছে” ঘোষণাতেই সীমাবদ্ধ নয়। সূরা মা‘আরিজেও দূরত্বের প্রশ্নটি সরাসরি বিপরীত দুই অবস্থানে প্রকাশ করা হয়েছে—মানুষ এটিকে দূরের ঘটনা মনে করছে, কিন্তু আল্লাহ এটিকে নিকটবর্তী বলে ঘোষণা করছেন। তাফসীর আল-কুরতুবীতে এই আয়াতের ব্যাখ্যায়ও নৈকট্যের অর্থ বজায় রাখা হয়েছে। [16]

فَاصْبِرْ صَبْراً جَمِيلاً ۝ إِنَّهُمْ يَرَوْنَهُ بَعِيداً ۝ وَنَراهُ قَرِيباً

“অতএব তুমি সুন্দরভাবে ধৈর্য ধারণ করো। নিশ্চয়ই তারা এটিকে দূরবর্তী মনে করে, অথচ আমি এটিকে নিকটবর্তী দেখি।”

قَوْلُهُ تَعَالَى: (إِنَّهُمْ يَرَوْنَهُ بَعِيداً) يُرِيدُ أَهْلَ مَكَّةَ يَرَوْنَ الْعَذَابَ بِالنَّارِ بَعِيدًا، أَيْ غَيْرَ كَائِنٍ. (وَنَراهُ قَرِيباً) لِأَنَّ مَا هُوَ آتٍ فَهُوَ قَرِيبٌ. وَقَالَ الْأَعْمَشُ: يَرَوْنَ الْبَعْثَ بَعِيدًا لِأَنَّهُمْ لَا يُؤْمِنُونَ كَأَنَّهُمْ يَسْتَبْعِدُونَهُ عَلَى جِهَةِ الْإِحَالَةِ.

আল্লাহর বাণী—“তারা এটিকে দূরবর্তী মনে করে”—অর্থাৎ মক্কার লোকেরা আগুনের শাস্তিকে দূরের বিষয় মনে করে; অর্থাৎ তারা মনে করে এটি ঘটবে না। “আর আমি এটিকে নিকটবর্তী দেখি”—কারণ যা আসন্ন, তা নিকটবর্তী। আল-আ‘মাশ বলেন: তারা পুনরুত্থানকে দূরের বিষয় মনে করে, কারণ তারা এতে বিশ্বাস করে না; যেন তারা এটিকে অসম্ভব মনে করে দূরে ঠেলে দিচ্ছে।

এই আয়াতটি কিয়ামতের নৈকট্য-বয়ানে বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এখানে “দূর”“নিকট” শব্দদুটিই একই বাক্যগুচ্ছে মুখোমুখি দাঁড়িয়েছে। মানুষের অবস্থান—ঘটনাটি দূরের; কোরআনের ঘোষণা—ঘটনাটি নিকটবর্তী। কুরতুবীর ব্যাখ্যাতেও এই নৈকট্য মুছে যায়নি; তিনি সরাসরি লিখেছেন, “যা আসছে, তা নিকটবর্তী”, এবং পুনরুত্থানকেও এই আলোচনার অন্তর্ভুক্ত করেছেন। ফলে সূরা কামার ৫৪:১-এর “কিয়ামত নিকটবর্তী হয়েছে” বক্তব্যটি কোনো বিচ্ছিন্ন শব্দচয়ন নয়; কোরআনের অন্য স্থানেও একই শেষ-বিচারকে দূরবর্তী মনে করার বিপরীতে তার নৈকট্য ঘোষণা করা হয়েছে।


আসন্নতার ঘোষণা, অপেক্ষা—কিন্তু কিছুই ঘটলো না

কোরআনে কিয়ামত ও ঐশী শাস্তির নৈকট্যের ভাষা কীভাবে তৎকালীন মানুষ গ্রহণ করছিল, তার একটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বর্ণনা আদ-দুররুল মানসূর-এ সংরক্ষিত আছে। ইবন জুরাইজ থেকে বর্ণিত এই বিবরণে প্রথমে ঘোষণা আসে—“আল্লাহর নির্দেশ এসে গেছে”। কিছু লোক তখন নিজেদের কাজ থামিয়ে অপেক্ষা করতে শুরু করে, কী ঘটে তা দেখার জন্য। কিন্তু কিছুই ঘটতে না দেখে তারা বলে—“আমরা তো কিছুই নাযিল হতে দেখছি না।” এরপর আবার ঘোষণা আসে—“মানুষের হিসাব-নিকাশের সময় নিকটবর্তী হয়েছে।” তারা আবারও একই দাবি শুনে অপেক্ষা করে; আবারও কিছু ঘটতে না দেখে একই আপত্তি তোলে। এরপর আসে শাস্তি একটি নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত স্থগিত রাখার বক্তব্য। [17]

وَأخرج ابْن جرير وَابْن الْمُنْذر عَن ابْن جريج قَالَ: لما نزلت هَذِه الْآيَة “أَتَى أَمر الله فَلَا تستعجلوه” قَالَ رجال من الْمُنَافِقين بَعضهم لبَعض: إِن هَذَا يزْعم أَن أَمر الله قد أَتَى فأمسكوا عَن بعض مَا كُنْتُم تَعْمَلُونَ حَتَّى تنظروا مَا هُوَ كَائِن فَلَمَّا رَأَوْا أَنه لَا ينزل شَيْء قَالُوا: مَا نرَاهُ نزل. فَنزلت “اقْترب للنَّاس حسابهم” الْآيَة، فَقَالُوا: إِن هَذَا يزْعم مثلهَا أَيْضا فَلَمَّا رَأَوْا أَنه لَا ينزل شَيْء قَالُوا: مَا نرَاهُ نزل شَيْء فَنزلت “وَلَئِن أخرنا عَنْهُم الْعَذَاب إِلَى أمة مَعْدُودَة”.

ইবনে জারীর ও ইবনে মুনযির ইবনে জুরাইজ থেকে বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন: যখন এই আয়াত অবতীর্ণ হলো—“আল্লাহর নির্দেশ এসে গেছে, সুতরাং তা ত্বরান্বিত করতে চেয়ো না”—তখন মুনাফিকদের কিছু লোক একে অপরকে বলতে লাগল: “এই ব্যক্তি দাবি করছে যে আল্লাহর নির্দেশ এসে গেছে, সুতরাং তোমরা যা করছ তা থেকে কিছুটা বিরত থাকো যতক্ষণ না দেখ কী ঘটে।” অতঃপর যখন তারা দেখল যে কিছুই ঘটছে না, তখন তারা বলল: “আমরা তো কিছুই নাযিল হতে দেখছি না।” তখন অবতীর্ণ হলো—“মানুষের হিসাব-নিকাশের সময় নিকটবর্তী হয়েছে।” তারা বলল: “সে তো আবারও একই রকম দাবি করছে।” এরপর যখন তারা দেখল যে কিছুই ঘটছে না, তখন তারা বলল: “আমরা তো কিছুই নাযিল হতে দেখছি না।” তখন অবতীর্ণ হলো: “আর যদি আমি একটি নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত তাদের থেকে আযাব স্থগিত রাখি…” (সূরা হুদ, আয়াত: ৮)

এই বর্ণনার ধারাবাহিকতাটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। প্রথমে বলা হচ্ছে, আল্লাহর নির্দেশ ইতিমধ্যেই এসে গেছে; বাস্তবে দৃশ্যমান কিছু না ঘটলে আসে আরেক ঘোষণা—মানুষের হিসাবের সময় নিকটবর্তী; সেটিও প্রত্যাশিত ঘটনায় পরিণত না হলে সামনে আসে শাস্তি স্থগিত থাকার ভাষা। অর্থাৎ “আসন্ন” ঘোষণার মুখোমুখি তৎকালীন সংশয়ও ইসলামি তাফসীরের ভেতরেই সংরক্ষিত আছে—এমনকি সেই সংশয়ের ভাষাটিও অত্যন্ত পরিষ্কার: “আমরা তো কিছুই ঘটতে দেখছি না।” বহু শতাব্দী পরে একই আসন্নতার ভাষাকে অসীম দীর্ঘ সময়ের প্রতীক বানিয়ে পড়ার বিপরীতে এই বর্ণনা দেখায়, অন্তত এই প্রাচীন স্মৃতিতে দাবিগুলোকে এমনভাবে গ্রহণ করা হচ্ছিল যার বাস্তব পরিণতি দেখার জন্য মানুষ অপেক্ষা করছিল।

“আমি এবং কিয়ামত এই দুই আঙুলের মতো প্রেরিত হয়েছি”—এই বর্ণনার প্রচলিত প্রাচীন ব্যাখ্যাতেও নৈকট্যই কেন্দ্রীয় অর্থ। নববী তাঁর শরহ সহীহ মুসলিম-এ লিখেছেন, এর একটি ব্যাখ্যা হলো—দুই আঙুলের দৈর্ঘ্যের মধ্যে যেমন সামান্য পার্থক্য, মুহাম্মদ ও কিয়ামতের মধ্যেও তেমনি সামান্য ব্যবধান; আরেক ব্যাখ্যায় এটি কিয়ামতের অত্যন্ত নিকটবর্তী হওয়ার ইঙ্গিত। [18] অর্থাৎ “দুই আঙুল” উপমার নৈকট্য আধুনিক সমালোচকের আরোপ নয়; প্রাচীন ইসলামি ব্যাখ্যার মধ্যেই সেই অর্থ স্পষ্ট।

সহীহ মুসলিম (ইফাঃ)
অধ্যায়ঃ ৫৫/ ফিতনা সমূহ ও কিয়ামতের নিদর্শনাবলী
পরিচ্ছদঃ ২৩. কিয়ামত নিকটবর্তী হওয়া
৭১৪০। আবূ গাসসান মিসমাঈ (রহঃ) … আনাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ আমি এবং কিয়ামত প্রেরিত হয়েছি এ দুটির মত। রাবী বলেন (এ সময়) তিনি তার শাহাদাত ও মধ্যমা আঙ্গুলিকে একত্রিত করেছেন।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)


কিয়ামত যেন মুহাম্মদকেও ছাড়িয়ে যাচ্ছিল

“দুই আঙুলের মতো” নৈকট্যের বক্তব্যটি বিচ্ছিন্ন কোনো উপমা নয়। একই তাফসীরের একই আলোচনায় কিয়ামতের নৈকট্য আরও তীব্র ভাষায় প্রকাশিত হয়েছে। কাতাদাহ বলেন, “কিয়ামত অতি নিকটবর্তী হয়েছে”; মুহাম্মদের আগমনকেই কিয়ামতের একটি আলামত বলা হয়েছে; পৃথিবীর অতিবাহিত সময়ের তুলনায় অবশিষ্ট সময়কে অস্তগামী দিনের সামান্য অবশিষ্ট অংশের সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে। এরপর বুরাইদার সূত্রে মুহাম্মদের এমন বক্তব্য সংরক্ষিত হয়েছে, যেখানে কিয়ামত শুধু নিকটবর্তী নয়—এতটাই নিকট যে তা যেন তাঁকেই ছাড়িয়ে আগে চলে যাচ্ছিল। [19]

بعثت أَنا والساعة جَمِيعًا إِن كَادَت تسبقني

“আমি এবং কিয়ামত একসঙ্গে প্রেরিত হয়েছি; মনে হয় যেন কিয়ামত আমাকে ছাড়িয়ে আগে চলে যাবে।”

এই বক্তব্যের ভাষা অত্যন্ত স্পষ্ট। এখানে কিয়ামতকে শুধু “একদিন ঘটবে” বলা হয়নি, কিংবা কোনো অনির্দিষ্ট দূর ভবিষ্যতে ঠেলে দেওয়া হয়নি। বরং মুহাম্মদের নিজের আগমন এবং কিয়ামতকে একই সময়গত দৌড়ে পাশাপাশি দাঁড় করিয়ে বলা হচ্ছে—কিয়ামত যেন তাঁকেই অতিক্রম করে আগে চলে যেতে বসেছে। এর সঙ্গে “দুই আঙুল”, “কিয়ামত অতি নিকটবর্তী” এবং অস্তগামী দিনের সামান্য অবশিষ্ট সময়ের উপমা একত্রে রাখলে একই চিত্র বারবার ফিরে আসে: মুহাম্মদের প্রচারের সময়েই পৃথিবীকে শেষ পর্যায়ের অত্যন্ত কাছাকাছি বলে কল্পনা করা হচ্ছিল।

কিয়ামতের নৈকট্য বোঝাতে একই ধরনের আরেকটি উপমাও তাফসীর আল-কুরতুবীতে সংরক্ষিত হয়েছে। সূরা মুহাম্মদ ৪৭:১৮-এর “কিয়ামতের আলামতসমূহ তো এসেই পড়েছে” আয়াত ব্যাখ্যা করতে গিয়ে কুরতুবী প্রথমে “আমি ও কিয়ামত এই দুই আঙুলের মতো প্রেরিত হয়েছি” হাদিসটি উদ্ধৃত করেন। এরপর তিনি আরেকটি বর্ণনা উল্লেখ করেন, যেখানে মুহাম্মদ ও কিয়ামতের মধ্যকার সম্পর্ককে প্রতিযোগিতায় ছুটতে থাকা দুটি ঘোড়ার সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে। [20]

وَفِي الصَّحِيحِ عَنْ أَنَسٍ قَالَ قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم: بُعِثْتُ أَنَا وَالسَّاعَةِ كَهَاتَيْنِ، وَضَمَّ السَّبَّابَةَ وَالْوُسْطَى، لَفْظُ مُسْلِمٍ. وَخَرَّجَهُ الْبُخَارِيُّ وَالتِّرْمِذِيُّ وَابْنُ مَاجَهْ. وَيُرْوَى: بُعِثْتُ وَالسَّاعَةُ كَفَرَسَيْ رِهَانٍ.

সহীহ গ্রন্থে আনাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন: “আমি এবং কিয়ামত এই দুইটির মতো প্রেরিত হয়েছি।” এরপর তিনি তাঁর তর্জনী ও মধ্যমা আঙুল একত্র করলেন; এটি মুসলিমের বর্ণনা। বুখারী, তিরমিযী ও ইবনে মাজাহও এটি বর্ণনা করেছেন। আরও বর্ণিত আছে: “আমি এবং কিয়ামত প্রতিযোগিতায় লিপ্ত দুটি ঘোড়ার মতো প্রেরিত হয়েছি।”

كَفَرَسَيْ رِهَانٍ অর্থ প্রতিযোগিতায় পাশাপাশি ছুটতে থাকা দুটি ঘোড়ার মতো। এই উপমায় নৈকট্য শুধু স্থির দূরত্ব নয়; মুহাম্মদের আগমন ও কিয়ামতকে একই দৌড়ের প্রায় সমান্তরাল দুই প্রতিযোগী হিসেবে চিত্রিত করা হয়েছে। ফলে একই ব্যাখ্যাগত ধারায় তিনটি চিত্র পাশাপাশি পাওয়া যাচ্ছে—দুই আঙুলের সামান্য ব্যবধান, কিয়ামত মুহাম্মদকে প্রায় ছাড়িয়ে যাচ্ছে, এবং পাশাপাশি প্রতিযোগিতায় ছুটতে থাকা দুই ঘোড়া। তিন ক্ষেত্রেই কিয়ামতকে মুহাম্মদের আবির্ভাব থেকে বিপুল দূরবর্তী কোনো সময়ের ঘটনা হিসেবে নয়, বরং অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ এক শেষ-পর্বের ঘটনা হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে।

“আমি ও কিয়ামত এই দুই আঙুলের মতো”—এই বর্ণনার নৈকট্য এতটাই প্রত্যক্ষ যে পরবর্তী সময়ে এর সময়গত অর্থ নির্ধারণের জন্য আঙুলের দৈর্ঘ্যের পার্থক্য পর্যন্ত ব্যবহার করা হয়েছে। Stephen J. Shoemaker আল-তাবারির আলোচনা বিশ্লেষণ করে দেখিয়েছেন, সাত হাজার বছরের বিশ্ব-ইতিহাসের ধারণার সঙ্গে তর্জনী ও মধ্যমার দৈর্ঘ্যের পার্থক্য মিলিয়ে কিয়ামতের সময়কে মুহাম্মদের পরবর্তী কয়েক শতাব্দীর মধ্যে স্থাপন করার চেষ্টা করা হয়েছিল। অর্থাৎ প্রথমে “দুই আঙুলের মতো কাছে”, তারপর সময় পেরিয়ে গেলে সেই একই উপমাকে সংখ্যায় রূপান্তর করে নতুন সময়সীমা বের করার চেষ্টা। [21] এই ধারাবাহিকতা দেখায়, কিয়ামতের নৈকট্যকে প্রথম যুগে নিছক “অসীম ভবিষ্যৎ” হিসেবে বোঝা হচ্ছিল না; সময় পেরোনোর সঙ্গে সঙ্গে সেই নৈকট্যের অর্থকেই নতুনভাবে সামঞ্জস্য করতে হয়েছে।


আল-তাবারির হিসাব—পৃথিবীর প্রায় পাঁচশ বছর বাকি

Shoemaker যে হিসাবটির আলোচনা করেছেন, আল-তাবারির নিজের গ্রন্থে তার ভাষা আরও স্পষ্ট। তারিখ আল-তাবারি-র শুরুতেই তিনি পৃথিবীর মোট সময়কাল নির্ধারণ করতে “আমি ও কিয়ামত এই দুই আঙুলের মতো”, আসরের পর থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত অবশিষ্ট দিনের উপমা এবং “অর্ধদিন” সম্পর্কিত বর্ণনাগুলো একত্র করেন। এরপর ইবন আব্বাসের নামে বর্ণিত “দুনিয়া আখেরাতের সপ্তাহগুলোর একটি সপ্তাহ—সাত হাজার বছর” ধারণাকে গ্রহণ করে হিসাব দাঁড় করান: মুহাম্মদের সময় পর্যন্ত প্রায় ৬,৫০০ বছর অতিবাহিত হয়েছে এবং অবশিষ্ট অর্ধদিন = ৫০০ বছর[22]

وَأَنَّهُ قَالَ لِأَصْحَابِهِ: «بُعِثْتُ أَنَا وَالسَّاعَةُ كَهَاتَيْنِ»، وَجَمَعَ بَيْنَ السَّبَّابَةِ وَالْوُسْطَى … وَكَانَ مَعْنَى قَوْلِ النَّبِيِّ ذَلِكَ أَنَّ «لَنْ يُعْجِزَ اللَّهُ هَذِهِ الْأُمَّةَ مِنْ نِصْفِ يَوْمٍ» الَّذِي مِقْدَارُهُ أَلْفُ سَنَةٍ … وَأَشْبَهُهُمَا بِمَا دَلَّتْ عَلَيْهِ الْأَخْبَارُ الْوَارِدَةُ عَنْ رَسُولِ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم قَوْلُ ابْنِ عَبَّاسٍ الَّذِي رَوَيْنَا عَنْهُ أَنَّهُ قَالَ: «الدُّنْيَا جُمُعَةٌ مِنْ جُمَعِ الْآخِرَةِ سَبْعَةُ آلَافِ سَنَةٍ». وَإِذْ كَانَ ذَلِكَ كَذَلِكَ، وَكَانَ الْخَبَرُ عَنْ رَسُولِ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم صَحِيحًا أَنَّهُ أَخْبَرَ عَنِ الْبَاقِي مِنْ ذَلِكَ فِي حَيَاتِهِ أَنَّهُ نِصْفُ يَوْمٍ، وَذَلِكَ خَمْسُمِائَةِ عَامٍ، إِذْ كَانَ ذَلِكَ نِصْفَ يَوْمٍ مِنَ الْأَيَّامِ الَّتِي قَدْرُ الْيَوْمِ الْوَاحِدِ مِنْهَا أَلْفُ عَامٍ، كَانَ مَعْلُومًا أَنَّ الْمَاضِيَ مِنَ الدُّنْيَا إِلَى وَقْتِ قَوْلِ النَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم … كَانَ قَدْرَ سِتَّةِ آلَافِ سَنَةٍ وَخَمْسِمِائَةِ سَنَةٍ، أَوْ نَحْوًا مِنْ ذَلِكَ وَقَرِيبًا مِنْهُ. وَاللَّهُ أَعْلَمُ.

আল-তাবারি মুহাম্মদের বক্তব্য উদ্ধৃত করেন: “আমি এবং কিয়ামত এই দুইটির মতো প্রেরিত হয়েছি”—এবং তর্জনী ও মধ্যমা আঙুল একত্র করার কথা উল্লেখ করেন। এরপর “আল্লাহ এই উম্মতকে অর্ধদিন বিলম্বিত করতে অক্ষম হবেন না” বর্ণনাকে এমন এক দিনের অর্ধাংশ হিসেবে ব্যাখ্যা করেন যার পূর্ণ দিন এক হাজার বছরের সমান। তিনি ইবন আব্বাসের নামে বর্ণিত বক্তব্য—“দুনিয়া আখেরাতের সপ্তাহগুলোর একটি সপ্তাহ, সাত হাজার বছর”—কে অধিক সামঞ্জস্যপূর্ণ মত হিসেবে গ্রহণ করেন। তারপর বলেন, মুহাম্মদের জীবদ্দশায় পৃথিবীর অবশিষ্ট সময় ছিল অর্ধদিন, অর্থাৎ পাঁচশ বছর; সুতরাং তখন পর্যন্ত পৃথিবীর প্রায় ছয় হাজার পাঁচশ বছর অতিবাহিত হয়ে গিয়েছিল।

এটি শুধু পরবর্তী কোনো গবেষকের পুনর্গঠন নয়; আল-তাবারির নিজের গ্রন্থেই সংখ্যাগত হিসাবটি স্পষ্টভাবে লেখা আছে। তাঁর মডেলে পৃথিবীর মোট আয়ু সাত হাজার বছর, মুহাম্মদের সময়ে প্রায় ছয় হাজার পাঁচশ বছর ইতিমধ্যে শেষ, এবং কিয়ামতের আগে অবশিষ্ট প্রায় পাঁচশ বছর। অর্থাৎ “কিয়ামত নিকটবর্তী” এবং “দুই আঙুল” ধরনের ভাষাকে ইসলামি ঐতিহ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রাথমিক ইতিহাসগ্রন্থে বাস্তব কালানুক্রমিক হিসাব হিসেবেই পড়া হয়েছিল। এই গণনা আজ ঐতিহাসিকভাবে ব্যর্থ: আল-তাবারির যুগের পরও এক হাজার বছরের বেশি সময় অতিক্রান্ত হয়েছে, এবং মুহাম্মদের যুগ থেকে প্রায় চৌদ্দ শতাব্দী পার হয়ে গেছে। ফলে এই দলিলটি একই সঙ্গে দুটি বিষয় দেখায়—প্রথমত, নৈকট্যের ভাষা একসময় সংখ্যাগত সময়সীমায় রূপান্তরিত হয়েছিল; দ্বিতীয়ত, সেই সময়সীমাও ইতিহাসের সঙ্গে মেলেনি।


অর্ধদিনের হিসাব—পাঁচশ বছর

কিয়ামতের নৈকট্যকে সংখ্যায় রূপান্তরের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত তাফসীর ইবনে কাসীরে পাওয়া যায়। সূরা আল-হাজ্জের ২২:৪৭ আয়াতে বলা হয়েছে, আল্লাহর কাছে এক দিন মানুষের গণনার এক হাজার বছরের সমান। এই আয়াতের আলোচনায় ইবনে কাসীর সা‘দ ইবন আবি ওয়াক্কাসের সূত্রে একটি বর্ণনা উল্লেখ করেন, যেখানে মুহাম্মদ তাঁর উম্মতের জন্য “অর্ধদিন” বিলম্বের আশা প্রকাশ করেন। সেই অর্ধদিন কত—জিজ্ঞেস করা হলে সা‘দ উত্তর দেন: পাঁচশ বছর। অর্থাৎ ধর্মীয় সময়ের “এক দিন = এক হাজার বছর” সমীকরণ থেকে অর্ধদিনকে সরাসরি পাঁচশ বছরে রূপান্তর করা হয়েছে। [23]

وَيَسْتَعْجِلُونَكَ بِالْعَذَابِ وَلَنْ يُخْلِفَ اللَّهُ وَعْدَهُ وَإِنَّ يَوْمًا عِنْدَ رَبِّكَ كَأَلْفِ سَنَةٍ مِمَّا تَعُدُّونَ

“তারা তোমাকে শাস্তি ত্বরান্বিত করার জন্য বলে, অথচ আল্লাহ কখনো তাঁর প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করবেন না। আর তোমার প্রতিপালকের কাছে এক দিন তোমাদের গণনার এক হাজার বছরের সমান।”

عَنْ سَعْدِ بْنِ أَبِي وَقَّاصٍ، أَنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: إِنِّي لَأَرْجُو أَنْ لَا تَعْجِزَ أُمَّتِي عِنْدَ رَبِّهَا أَنْ يُؤَخِّرَهُمْ نِصْفَ يَوْمٍ. قِيلَ لِسَعْدٍ: وَكَمْ نِصْفُ ذَلِكَ الْيَوْمِ؟ قَالَ: خَمْسُ مِائَةِ سَنَةٍ.

সা‘দ ইবন আবি ওয়াক্কাস থেকে বর্ণিত, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: “আমি আশা করি, আমার উম্মত তাদের প্রতিপালকের কাছে এতটা অক্ষম হবে না যে তিনি তাদের অর্ধদিন বিলম্বিত করবেন না।” সা‘দকে জিজ্ঞেস করা হলো: “সেই অর্ধদিন কত?” তিনি বললেন: “পাঁচশ বছর।”

এই সংখ্যাগত ব্যাখ্যাটি আগের আল-তাবারি আলোচনার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। “এক দিন = এক হাজার বছর” ধরে অর্ধদিন = পাঁচশ বছর—এভাবে ধর্মগ্রন্থের সময়বাচক উপমাকে বাস্তব শতাব্দীর হিসাবে রূপান্তর করা হচ্ছিল। ইবন হাজরও আল-তাবারির এই গণনা আলোচনা করতে গিয়ে লিখেছেন, অর্ধদিনকে পাঁচশ বছর ধরা হয়েছিল কোরআনের এক দিনকে এক হাজার বছরের সমান করার ভিত্তিতে। ফলে “কিয়ামত নিকটবর্তী” ভাষাকে প্রথম থেকেই অসীম ও অনির্দিষ্ট সময়ের রূপক হিসেবে পড়া ইসলামি ব্যাখ্যার একমাত্র ধারা ছিল না; বরং সেই নৈকট্যকে নির্দিষ্ট শতাব্দীর হিসাবের মধ্যে বসানোর প্রচেষ্টাও ইসলামি সাহিত্যেই সংরক্ষিত আছে।

একটি সূর্যগ্রহণ দেখে মুহাম্মদ এতটাই আতঙ্কিত হয়েছিলেন যে তিনি আশঙ্কা করেছিলেন কিয়ামত শুরু হয়ে যাচ্ছে। এই সহিহ বর্ণনাটি দেখায়, কিয়ামত তাঁর কাছে অসীম দূর ভবিষ্যতের কোনো বিমূর্ত ধারণা ছিল না; নিজের জীবদ্দশায় একটি আকস্মিক প্রাকৃতিক ঘটনার সঙ্গে সঙ্গেই শুরু হয়ে যেতে পারে—এমন আশঙ্কা বাস্তব ছিল। আধুনিক জ্যোতির্বিজ্ঞানে সূর্যগ্রহণ পৃথিবী, চাঁদ ও সূর্যের পূর্বাভাসযোগ্য জ্যামিতিক অবস্থানের ফল; হাদিসের বর্ণনায় একই ঘটনাকে তাৎক্ষণিক মহাপ্রলয়ের সম্ভাব্য সূচনা হিসেবে দেখা হচ্ছে [24] [25]

মুখতাসার সহীহ আল-বুখারী
১৬. কিতাবুল কুসুফ (সূর্যগ্রহণের বর্ণনা)
পরিচ্ছেদঃ সূর্যগ্রহণের সময় যিকির করা
আলোকিত প্রকাশনী নাম্বারঃ ৫৬০, আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ১০৫৯
৫৬০: আবু মুসা আশআরী (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেনঃএকদা সূর্যগ্রহণ হল। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তখন ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে দন্ডায়মান হলেন। তিনি কিয়ামত সংঘটিত হয়ে যাওয়ার ভয় করছিলেন। তিনি মসজিদে আগমণ করলেন। তিনি এত লম্বা কিয়াম, রুকূ এবং সিজদা করলেন যা আমি তাঁকে আর কখনও এরূপ করতে দেখিনি। তিনি বললেনঃ এ সমস্ত নিদর্শন কারো জন্ম গ্রহণ বা মৃত্যু বরণ করার কারণে প্রেরিত হয় না; বরং আল্লাহ তাআলা এগুলোর মাধ্যমে তাঁর বান্দাদেরকে ভয় দেখিয়ে থাকেন। তোমরা যখন কোন নিদর্শন দেখতে পাবে তখন তোমরা আল্লাহর যিকির, তাঁর নিকট দু’আ করা এবং তাঁর নিকট ক্ষমা প্রার্থনার দিকে ধাবিত হও।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আবূ মূসা আল- আশ’আরী (রাঃ)

ভুল 3

গ্রহণের জ্যোতির্বিজ্ঞান বনাম হাদিসভিত্তিক কর্তৃত্ব

সূর্য ও চন্দ্রগ্রহণ সম্পর্কে এই ধর্মীয় দৃষ্টিভঙ্গির একটি আধুনিক উদাহরণ সৌদি আলেম আবদুল আজিজ ইবন বাযের ফতোয়ায় পাওয়া যায়। জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা সূর্যগ্রহণকে অমাবস্যার সময় এবং চন্দ্রগ্রহণকে পূর্ণিমার সময় সংঘটিত জ্যামিতিক ঘটনা হিসেবে নির্ণয় করেন এবং বহু আগেই এগুলোর সময় গণনা করতে পারেন। কিন্তু ইবন বায এই জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক নিয়মকে সহিহ হাদিসের বিপরীতে গ্রহণযোগ্য প্রমাণ হিসেবে মানতে অস্বীকার করেন। তিনি এমনও বলেন যে, মাসের শেষ সময় ছাড়াও সূর্যগ্রহণ এবং পূর্ণিমার রাত ছাড়াও চন্দ্রগ্রহণ ঘটতে পারে।[26]

أَمَّا قَوْلُ الْفَلَكِيِّينَ: إِنَّ كُسُوفَ الشَّمْسِ لَا يَكُونُ إِلَّا فِي آخِرِ الشَّهْرِ … فَلَيْسَ عَلَيْهِ دَلِيلٌ يُعْتَمَدُ عَلَيْهِ

“জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের বক্তব্য—সূর্যগ্রহণ কেবল মাসের শেষ দিকেই ঘটে—এর পক্ষে এমন কোনো নির্ভরযোগ্য দলিল নেই, যার ওপর নির্ভর করা যায়।”

ফতোয়াটিতে আরও বলা হয়েছে, সূর্যগ্রহণ মাসের শেষ সময় ছাড়া অন্য সময়েও এবং চন্দ্রগ্রহণ পূর্ণিমার রাত ছাড়া অন্য সময়েও ঘটতে পারে। এখানে জ্ঞান নির্ধারণের পদ্ধতিগত সংঘাতটি স্পষ্ট: একদিকে সূর্য–চাঁদ–পৃথিবীর অবস্থান গণনা করে গ্রহণের সময়, স্থান ও স্থায়িত্ব পূর্বেই নির্ধারণযোগ্য; অন্যদিকে পর্যবেক্ষণ ও গণনার ফল ধর্মীয় বর্ণনার সঙ্গে সংঘর্ষে পড়লে ধর্মীয় বর্ণনাকেই অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। আধুনিক জ্যোতির্বিজ্ঞানে সূর্যগ্রহণ নতুন চাঁদের পর্যায়ে এবং চন্দ্রগ্রহণ পূর্ণিমার পর্যায়ে সংঘটিত হয়। ফলে গ্রহণকে ঘিরে প্রাচীন ধর্মীয় আতঙ্ক শুধু একটি ঐতিহাসিক বর্ণনায় সীমাবদ্ধ থাকেনি; পরবর্তী ধর্মীয় কর্তৃত্বের ভেতরেও পর্যবেক্ষণযোগ্য জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক নিয়মের বিপরীতে শাস্ত্রীয় কর্তৃত্বকে প্রাধান্য দেওয়ার নজির তৈরি করেছে।

এবারে আসুন আরেকটি হাদিস দেখি। এই হাদিসের শুরুতেই একটি গুরুত্বপূর্ণ মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব চোখে পড়ে: নবী সকালে দাজ্জালের কথা বলার সময় কখনও তাকে তুচ্ছ করে দেখান, আবার কখনও অত্যন্ত বড় বিপদ হিসেবে তুলে ধরেন। এই “উঠা–নামা” বর্ণনার ফলে শ্রোতাদের মনে বার্তাটা এমনভাবে গেঁথে যায়—দাজ্জালের আবির্ভাব যেন খুব দূরের কোনো কল্পকাহিনি নয়, বরং নিকট ভবিষ্যতেই ঘটতে পারে এমন বাস্তব আশঙ্কা। দাজ্জালকে তারা এতটাই কাছাকাছি মনে করেছিল যে, শেষ পর্যন্ত ধারণা করতে শুরু করে—দাজ্জাল বুঝি এই খেজুরবাগানের মধ্যেই কোথাও আছে। অর্থাৎ বর্ণনাটি তাদের মনে “এটা সামনে, খুব কাছে” ধরনের বাস্তব উপস্থিতির অনুভূতি তৈরি করেছিল।

এটা এক ধরনের রেটোরিকাল কৌশল: হুমকিকে কখনও ছোট, কখনও বড় করে দেখিয়ে শ্রোতার ভেতরে অনিশ্চয়তাজনিত আতঙ্ক (uncertainty-driven fear) তৈরি করা। ফলে দাজ্জাল “দূরের গল্প” হয়ে থাকে না; বরং “এখনই/শিগগিরই ঘটতে পারে”—এমন সম্ভাব্য আসন্ন বাস্তবতা হিসেবে অনুভূত হয়। একই ধারার মধ্যে নবীর বক্তব্য—“আমি তোমাদের মাঝে থাকলে আমি নিজেই তাকে প্রতিহত করবো”—এটাও ইঙ্গিত করে যে তিনি দাজ্জালের আবির্ভাবকে নিছক তাত্ত্বিকভাবে নয়, বরং নিজের জীবদ্দশায়ও সম্ভাব্য বলে কল্পনা করেছিলেন; কমপক্ষে এই সম্ভাবনাটিকে তিনি শ্রোতাদের সামনে বাস্তবসম্মত আশঙ্কা হিসেবে উপস্থিত করেছিলেন। [27]

সহীহ মুসলিম (হাদীস একাডেমী)
৫৪। বিভিন্ন ফিতনাহ ও কিয়ামতের লক্ষনসমূহ
পরিচ্ছেদঃ ২০. দাজ্জাল এর বর্ণনা, তার পরিচয় এবং তার সাথে যা থাকবে
হাদিস একাডেমি নাম্বারঃ ৭২৬৩ , আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ২৯৩৭
৭২৬৩-(১১০/২৯৩৭) আবু খাইসামাহ, যুহায়র ইবনু হারব, মুহাম্মাদ ইবনু মিহরান আর রাযী (রহঃ) ….. নাওওয়াস ইবনু সাম’আন (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদা সকালে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দাজ্জাল সম্পর্কে আলোচনা করলেন। আলোচনার সময় তিনি তার ব্যক্তিত্বকে তুচ্ছ করে তুলে ধরেন। পরে অনেক গুরুত্ব সহকারে উপস্থিত করেন যাতে তাকে আমরা ঐ বৃক্ষরাজির নির্দিষ্ট এলাকায় (আবাসস্থল সম্পর্কে) ধারণা করতে লাগলাম। এরপর আমরা সন্ধ্যায় আবার তার কাছে গেলাম। তিনি আমাদের মধ্যে এর প্রভাব দেখতে পেয়ে বললেন, তোমাদের ব্যাপার কি?আমরা বললাম, হে আল্লাহর রসূল! আপনি সকালে দাজ্জাল সম্পর্কে আলোচনা করেছেন এবং এতে আপনি কখনো ব্যক্তিত্বকে তুচ্ছ করে তুলে ধরেছেন, আবার কখনো তার ব্যক্তিত্বকে বড় করে তুলে ধরেছেন। ফলে আমরা মনে করেছি যে, দাজ্জাল বুঝি এ বাগার মধ্যেই বিদ্যমান। এ কথা শুনে তিনি বললেন, দাজ্জাল নয়, বরং তোমাদের ব্যাপারে অন্য কিছুর আমি অধিক ভয় করছি। তবে শোন, আমি তোমাদের) মধ্যে বিদ্যমান থাকা অবস্থায় যদি দাজ্জালের আত্মপ্রকাশ হয় তবে আমি নিজেই তাকে প্রতিহত করব। তোমাদের প্রয়োজন হবে না। আর যদি আমি তোমাদের মাঝে না থাকাবস্থায় দাজ্জালের আত্মপ্রকাশ হয়, তবে প্রত্যেক মুমিন লোক নিজের পক্ষ হতে তাকে প্রতিহত করবে। প্রত্যেক মুসলিমের জন্য আল্লাহ তা’আলাই হলেন আমার পক্ষ হতে তত্ত্বাবধানকারী।
দাজ্জাল যুবক এবং ঘন চুল বিশিষ্ট হবে, চোখ আঙ্গুরের ন্যায় হবে। আমি তাকে কাফির ’আবদুল উয্যা ইবনু কাতান এর মতো মনে করছি। তোমাদের যে কেউ দাজ্জালের সময়কাল পাবে সে যেন সূরা আল-কাহফ-এর প্রথমোক্ত আয়াতসমূহ পাঠ করে। সে ইরাক ও সিরিয়ার মধ্যপথ হতে আবির্ভূত হবে। সে ডানে-বামে দুর্যোগ সৃষ্টি করবে। হে আল্লাহর বান্দাগণ! তোমরা অটল থাকবে। আমরা প্রশ্ন করলাম, হে আল্লাহর রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম! সে পৃথিবীতে কয়দিন অবস্থান করবে? উত্তরে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, চল্লিশদিন পর্যন্ত। এর প্রথম দিনটি এক বছরের সমান, দ্বিতীয় দিন এক মাসের সমান এবং তৃতীয় দিন এক সপ্তাহের সমান হবে। অবশিষ্ট দিনগুলো তোমাদের দিনসমূহের মতই হবে।
আমরা প্রশ্ন করলাম, হে আল্লাহর রসূল! যেদিন এক বছরের সমান হবে, সেটাতে এক দিনের সালাতই কি আমাদের জন্য যথেষ্ট হবে? উত্তরে তিনি বললেন, না, বরং তোমরা এদিন হিসাব করে তোমাদের দিনের পরিমাণ নির্দিষ্ট করে নিবে। আমরা বললাম, হে আল্লাহর রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম! দুনিয়াতে দাজ্জালের অগ্রসরতা কি রকম বৃদ্ধি পাবে? তিনি বললেন, বাতাসের প্রবাহ মেঘমালাকে যে রকম হাকিয়ে নিয়ে যায়। সে এক কাওমের কাছে এসে তাদেরকে কুফুরীর দিকে ডাকবে। তারা তার উপর ঈমান আনবে এবং তার আহ্বানে সাড়া দিবে। অতঃপর সে আকাশমণ্ডলীকে আদেশ করবে। আকাশ বৃষ্টি বর্ষণ করবে এবং ভূমিকে নির্দেশ দিবে, ফলে ভূমি গাছ-পালা ও শস্য উৎপন্ন করবে। তারপর সন্ধ্যায় তাদের গবাদি পশুগুলো পূর্বের চেয়ে বেশি লম্বা কুজ, প্রশস্ত স্তন এবং পেটভর্তি অবস্থায় তাদের কাছে ফিরে আসবে।
তারপর দাজ্জাল অপর এক কাওমেরর কাছে আসবে এবং তাদেরকে কুফুরীর প্রতি ডাকবে। তারা তার কথাকে উপেক্ষা করবে। ফলে সে তাদের নিকট হতে প্রত্যাবর্তন করবে। আমনি তাদের মধ্যে দুর্ভিক্ষ ও পানির অনটন দেখা দিবে এবং তাদের হাতে তাদের ধন-সম্পদ কিছুই থাকবে না। তখন দাজ্জাল এক পতিত স্থান অতিক্রমকালে সেটাকে সম্বোধন করে বলবে, তুমি তোমার গুপ্তধন বের করে দাও। তখন জমিনের ধন-ভাণ্ডার বের হয়ে তার চতুষ্পার্শে একত্রিত হতে থাকবে, যেমন মধু মক্ষিকা তাদের সর্দারের চারপাশে সমবেত হয়।
অতঃপর দাজ্জাল এক যুবক ব্যক্তিকে ডেকে আনবে এবং তাকে তরবারি দ্বারা আঘাত করে তীরের লক্ষ্যস্থলের ন্যায় দুটুকরো করে ফেলবে। তারপর সে আবার তাকে আহবান করবে। যুবক আলোকময় হাস্যোজ্জল চেহারায় তার সম্মুখে এগিয়ে আসবে। এ সময় আল্লাহ রববুল আলামীন ঈসা ইবনু মারইয়াম (আঃ) কে প্রেরণ করবেন। তিনি দু’ ফেরেশতার কাঁধের উপর ভর করে ওয়ারস ও জাফরান রং এর জোড়া কাপড় পরিহিত অবস্থায় দামেশক নগরীর পূর্ব দিকের উজ্জ্বল মিনারে অবতরণ করবেন। যখন তিনি তার মাথা ঝুঁকবেন তখন ফোটা ফোটা ঘাম তার শরীর থেকে গড়িয়ে পড়বে। তিনি যে কোন কফিরের কাছে যাবেন সে তার শ্বাসের বাতাসে ধ্বংস হয়ে যাবে। তার দৃষ্টি যতদূর পর্যন্ত যাবে তাঁর শ্বাসও ততদূর পর্যন্ত পৌছবে। তিনি দাজ্জালকে সন্ধান করতে থাকবেন। অবশেষে তাকে বাবে লুদ নামক স্থানে গিয়ে পাকড়াও করবেন এবং তাকে হত্যা করবেন।
অতঃপর ঈসা (আঃ) ঐ সম্প্রদায়ের নিকট যাবেন, যাদেরকে আল্লাহ তা’আলা দাজ্জালের বিপর্যয় থেকে রক্ষা করেছেন। ঈসা (আঃ) তাদের কাছে গিয়ে তাদের চেহারায় হাত বুলিয়ে জান্নাতে তাদের স্থানসমূহের ব্যাপারে খবর দিবেন। এমন সময় আল্লাহ তা’আলা ঈসা (আঃ) এর প্রতি এ মর্মে ওয়াহী অবতীর্ণ করবেন যে, আমি আমার এমন বান্দাদের আবির্ভাব ঘটেয়েছি, যাদের সঙ্গে কারোই যুদ্ধ করার ক্ষমতা নেই। অতঃপর তুমি আমার মুমিন বান্দাদেরকে নিয়ে তুর পাহাড়ে চলে যাও। তখন আল্লাহ তা’আলা ইয়াজুজ-মাজুজ কাওমকে পাঠাবেন। তারা ছাড়া পেয়ে পৃথিবীর সব প্রান্তে দ্রুত ছড়িয়ে পড়বে। তাদের প্রথম দলটি “বুহাইরায়ে তাবরিয়া”র (ভূমধ্যসাগর) উপকূলে এসে এর সমুদয় পানি পান করে নিঃশেষ করে দিবে। তারপর তাদের সর্বশেষ দলটি এ স্থান দিয়ে যাত্রাকালে বলবে, এ সমুদ্রে কোন সময় পানি ছিল কি?
তারা আল্লাহর নবী ঈসা (আঃ) এবং তার সাথীদেরকে অবরোধ করে রাখবে। ফলে তাদের নিকট একটি বলদের মাথা বর্তমানে তোমাদের নিকট একশ দীনারের মূল্যের চেয়েও অধিক মূল্যবান প্রতিপন্ন হবে। তখন আল্লাহর নবী ঈসা (আঃ) এবং তার সঙ্গীগণ আল্লাহর নিকট প্রার্থনা করবেন। ফলে আল্লাহ তা’আলা ইয়া’জুজ-মা’জুজ সম্প্রদায়ের প্রতি আযাব পাঠাবেন। তাদের ঘাড়ে এক প্রকার পোকা হবে। এতে একজন মানুষের মৃত্যুর মতো তারাও সবাই মরে নিঃশেষ হয়ে যাবে। তারপর ঈসা (আঃ) ও তাঁর সঙ্গীগণ পাহাড় হতে জমিনে বেরিয়ে আসবেন। কিন্তু তারা অর্ধ হাত জায়গাও এমন পাবেন না যথায় তাদের পচা লাশ ও লাশের দুর্গন্ধ নেই। অতঃপর ’ঈসা (আঃ) এবং তার সঙ্গীগণ পুনরায় আল্লাহর নিকট প্রার্থনা করবেন। তখন আল্লাহ তা’আলা উটের ঘাড়ের মতো লম্বা এক ধরনের পাখি পাঠাবেন। তারা তাদেরকে বহন করে আল্লাহর ইচ্ছানুসারে কোন স্থানে নিয়ে ফেলবে।
এরপর আল্লাহ এমন মুষলধারে বৃষ্টি বর্ষণ করবেন যার ফলে কাঁচা-পাকা কোন গৃহই আর অবশিষ্ট থাকবে না। এতে জমিন বিধৌত হয়ে উদ্ভিদ শূন্য মৃত্তিকায় পরিণত হবে। অতঃপর পুনরায় জমিনকে এ মর্মে নির্দেশ দেয়া হবে যে, হে জমিন! তুমি আবার শস্য উৎপন্ন করো এবং তোমার বারাকাত ফিরিয়ে দাও। সেদিন একদল মানুষ একটি ডালিম ভক্ষণ করবে এবং এর বাকলের নীচে লোকেরা ছায়া গ্রহণ করবে। দুধের মধ্যে বারাকাত হবে। ফলে দুগ্ধবতী একটি উটই একদল মানুষের জন্য যথেষ্ট হবে, দুগ্ধবতী একটি গাভী একগোত্রীয় মানুষের জন্য যথেষ্ট হবে এবং যথেষ্ট হবে দুগ্ধবতী একটি বকরী এক দাদার সন্তানদের (একটি ছোট গোত্রের) জন্য। এ সময় আল্লাহ তা’আলা অত্যন্ত আরামদায়ক একটি বায়ু প্রেরণ করবেন। এ বায়ু সকল মুমিন লোকদের বগলে গিয়ে লাগবে এবং সমস্ত মুমিন মুসলিমদের রূহ কবয করে নিয়ে যাবে। তখন একমাত্র মন্দ লোকেরাই এ পৃথিবীতে বাকী থাকবে। তারা গাধার ন্যায় পরস্পর একে অন্যের সাথে প্রকাশ্যে ব্যভিচারে লিপ্ত হবে। এদের উপরই কিয়ামত সংঘটিত হবে। (ইসলামিক ফাউন্ডেশন ৭১০৬. ইসলামিক সেন্টার ৭১৬০)
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)

আবু উবাইদা ইবনুল জাররাহর আরেক বর্ণনায় সময়সীমাটি আরও স্পষ্ট। এখানে মুহাম্মদ শুধু দাজ্জালের আগমন সম্পর্কে সতর্ক করেননি; তিনি সরাসরি এমন সম্ভাবনাও ব্যক্ত করেছেন যে তাঁকে যারা নিজের চোখে দেখেছে অথবা তাঁর কথা সরাসরি শুনেছে, তাদের মধ্যকার কেউ দাজ্জালকে প্রত্যক্ষ করতে পারে। তিরমিযি বর্ণনাটিকে “হাসান গরীব” বলেছেন; একই বক্তব্য মুসনাদ আহমাদেও সংরক্ষিত আছে। [28]

حَدَّثَنَا عَبْدُ اللَّهِ بْنُ مُعَاوِيَةَ الْجُمَحِيُّ، قَالَ: حَدَّثَنَا حَمَّادُ بْنُ سَلَمَةَ، عَنْ خَالِدٍ الْحَذَّاءِ، عَنْ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ شَقِيقٍ، عَنْ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ سُرَاقَةَ، عَنْ أَبِي عُبَيْدَةَ بْنِ الْجَرَّاحِ، قَالَ: سَمِعْتُ رَسُولَ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم يَقُولُ: إِنَّهُ لَمْ يَكُنْ نَبِيٌّ بَعْدَ نُوحٍ إِلَّا قَدْ أَنْذَرَ الدَّجَّالَ قَوْمَهُ، وَإِنِّي أُنْذِرُكُمُوهُ. فَوَصَفَهُ لَنَا رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم فَقَالَ: لَعَلَّهُ يُدْرِكُهُ بَعْضُ مَنْ رَآنِي أَوْ سَمِعَ كَلَامِي. قَالُوا: يَا رَسُولَ اللَّهِ، فَكَيْفَ قُلُوبُنَا يَوْمَئِذٍ؟ قَالَ: مِثْلُهَا، يَعْنِي الْيَوْمَ، أَوْ خَيْرٌ. قَالَ التِّرْمِذِيُّ: هَذَا حَدِيثٌ حَسَنٌ غَرِيبٌ مِنْ حَدِيثِ أَبِي عُبَيْدَةَ بْنِ الْجَرَّاحِ.

আবু উবাইদা ইবনুল জাররাহ বলেন: আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছি: “নূহের পরে এমন কোনো নবী ছিলেন না যিনি তাঁর জাতিকে দাজ্জাল সম্পর্কে সতর্ক করেননি; আমিও তোমাদের তার সম্পর্কে সতর্ক করছি।” এরপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের কাছে দাজ্জালের বর্ণনা দিয়ে বললেন: “যারা আমাকে দেখেছে অথবা আমার কথা শুনেছে, তাদের মধ্যকার কেউ হয়তো তাকে পাবে।” তাঁরা জিজ্ঞেস করলেন: “হে আল্লাহর রাসূল, সেদিন আমাদের অন্তরের অবস্থা কেমন হবে?” তিনি বললেন: “আজ যেমন আছে, তেমনই—অথবা আরও ভালো।” তিরমিযি বলেন: এটি আবু উবাইদা ইবনুল জাররাহর সূত্রে হাসান গরীব হাদিস।

এই বর্ণনায় সময়গত ইঙ্গিতটি অত্যন্ত নির্দিষ্ট। بَعْضُ مَنْ رَآنِي أَوْ سَمِعَ كَلَامِي—“যারা আমাকে দেখেছে অথবা আমার কথা শুনেছে, তাদের কেউ”—বাক্যটি দাজ্জালের সম্ভাব্য আবির্ভাবকে মুহাম্মদের প্রত্যক্ষ দর্শক ও শ্রোতাদের জীবনসীমার মধ্যেই স্থাপন করছে। দাজ্জাল যেহেতু ইসলামি শেষযুগ-বয়ানের কেন্দ্রীয় নিদর্শন, তাই এই বক্তব্য কিয়ামতের ঘটনাপুঞ্জকে কোনো অনির্দিষ্ট সহস্রাব্দ-দূর ভবিষ্যতে নয়, বরং প্রথম শ্রোতাপ্রজন্মের সম্ভাব্য অভিজ্ঞতার মধ্যেই কল্পনা করার আরেকটি প্রত্যক্ষ সাক্ষ্য।


কিয়ামত কবে হবেঃ সময় নির্দিষ্টকরণ

এই বর্ণনাতেই সময়সংক্রান্ত দাবিটি সবচেয়ে স্পষ্ট। মুহাম্মদকে সরাসরি জিজ্ঞেস করা হলো—কিয়ামত কখন হবে? তিনি একজন জীবিত বালককে দেখিয়ে বললেন, সে বৃদ্ধ হওয়ার আগেই কিয়ামত সংঘটিত হবে। সেই প্রজন্ম বহু শতাব্দী আগে বিলুপ্ত হয়েছে; কিয়ামত ঘটেনি। তাই বাক্যটির স্বাভাবিক অর্থে এটি একটি ব্যর্থ সময়-নির্ধারিত ভবিষ্যদ্বাণী। পরবর্তী ব্যাখ্যায় “কিয়ামত”কে মৃত্যু বা প্রজন্মের অবসান বানালে মূল প্রশ্ন থেকেই নতুন প্রশ্ন জন্মায়—যদি সেই অর্থই উদ্দেশ্য হতো, তবে প্রশ্নকারীর “কিয়ামত কখন?” প্রশ্নের উত্তরে একই “কিয়ামত” শব্দ ব্যবহার করে একটি বালকের বার্ধক্যকে সময়সীমা বানানো হলো কেন? [29] [30] [31] [32]

সহীহ মুসলিম (ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
৫৫/ ফিতনা সমূহ ওকিয়ামতের নিদর্শনাবলী
পরিচ্ছেদঃ ২৩.কিয়ামত নিকটবর্তী হওয়া
৭১৪২। আবূ বকর ইবনু আবূ শায়বা (রহঃ) … আনাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদাএক ব্যক্তি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে জিজ্ঞেস করলেন, কিয়ামত কবে হবে? তখন তাঁর নিকট মুহাম্মাদ নামক এক আনসারী বালক উপিস্থিত ছিল। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ এ বালক যদি বেঁচে থাকে তবে সে বৃদ্ধ হওয়ার পূর্বেই কিয়ামত সংগঠিত হয়ে যাবে।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আনাস ইবনু মালিক (রাঃ)

সহীহ মুসলিম (ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
৫৫/ ফিতনা সমূহ ও কিয়ামতের নিদর্শনাবলী
পরিচ্ছেদঃ ২৩. কিয়ামত নিকটবর্তী হওয়া
৭১৪৩। হাজ্জাজ ইবনু শাঈর (রহঃ) … আনাস ইবনু মালিক (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন,একদা জনৈক ব্যক্তি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে জিজ্ঞেস করলেন যে, কিয়ামত কবে হবে? এ কথা শুনে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কিছুক্ষণ পর্যন্ত চুপ করে থাকেন। অতঃপর তিনি সম্মুখস্থ আয্দ-শানু’আ গোত্রের এক বালকের প্রতি তাকালেন। অতঃপর তিনি বললেনঃ এ বালক যদি দীর্ঘ হায়াত পায় তবে তার বার্ধক্যে পদার্পণ করার পূর্বেই কিয়ামত সংগঠিত হয়ে যাবে। আনাস (রাঃ) বলেন, তখন এ বালক আমার সমবয়স্ক ছিল।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আনাস ইবনু মালিক (রাঃ)

সহীহ মুসলিম (ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
৫৫/ ফিতনা সমূহ ও কিয়ামতের নিদর্শনাবলী
পরিচ্ছেদঃ ২৩. কিয়ামত নিকটবর্তী হওয়া
৭১৪৪। হারুন ইবনু আবদুল্লাহ (রহঃ) … আনাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, মুগীরা ইবনু শুবা (রাঃ) এর এক গোলাম একদা রাস্তা দিয়ে যাচ্ছিল, সে ছিল আমার সমবয়স্কা। তখন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ যদি তার হায়াত দীর্ঘায়িত হয় তবে সে বার্ধক্যে পৌছার পূর্বেই কিয়ামত কায়িম সংগঠিত হবে।
হাদিসের মানঃ সহih (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আনাস ইবনু মালিক (রাঃ)

ভুল 5

এবারে আসুন হাদিসটির বিস্তারিত ভার্শনটি পড়ি। সম্পূর্ণ বিবরণ পড়লে খুব স্পষ্টভাবেই বোঝা যায়, এখানে নবী আসলে মহাপ্রলয়ের কিয়ামতের কথাই বলেছেন [33]

সহীহ ইবনু হিব্বান (হাদিসবিডি)
৬. সদাচারণ ও ন্যায়নিষ্ঠতা সংশ্লিষ্ট কিতাব
পরিচ্ছেদঃ বাতিলপন্থীরা যে হাদীসের সঠিক মর্মার্থ বুঝতে না পেরে মুহাদ্দিসগণের নিন্দা করে থাকে
৫৬৬. আনাস বিন মালিক রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, এক ব্যক্তি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বললেন: “হে আল্লাহর নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম, কিয়ামত কখন সংঘটিত হবে?” এসময় সালাতের ইকামত দেওয়া হয়েছিল- রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন সালাত শেষ করলেনতখন বলেন: “কিয়ামত সম্পর্কে প্রশ্নকারী কোথায়?” তখন সেই ব্যক্তি বলেন: “হে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম, আমি এখানেই আছি।” রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন: “জেনে রাখো, কিয়ামত সংঘটিত হবেই। কিন্তু তুমি কিয়ামতের জন্য কী প্রস্তুতি নিয়েছো?” তিনি বলেন: “আমি কিয়ামতের জন্য খুব বেশি আমল প্রস্তুত করতে পারিনি, তবে আমি আল্লাহ ও তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে ভালবাসি।” রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন: “তুমি যাকে ভালবাসো, কিয়ামতের দিন তুমি তার সাথেই থাকবে।” রাবী বলেন: “এসময় তাঁর কাছে একজন আনসারী সাহাবী ছিলেন, তাঁর নাম মুহাম্মাদ। অতঃপর তিনি বলেন: “যদি এই ব্যক্তি বেঁচে থাকেন, তবে তিনি বৃদ্ধ হওয়ার আগেই কিয়ামত সংঘটিত হয়ে যাবে।”
হুদবা আরেকটু বেশি বর্ণনা করেছেন, আনাস রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু বলেন: “আমরা আল্লাহ ও তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে ভালবাসি।”[1]
قَالَ أَبُو حَاتِمٍ: هَذَا الْخَبَرُ مِنَ الْأَلْفَاظِ الَّتِي أُطْلِقَتْ بِتَعْيِينِ خِطَابٍ مُرَادُهُ التَّحْذِيرُ وَذَاكَ أَنَّ الْمُصْطَفَى صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أَرَادَ تَحْذِيرَ النَّاسِ عَنِ الرُّكُونِ إِلَى هَذِهِ الدُّنْيَا بِتَعْرِيفِهِمُ الشَّيْءَ الَّذِي يَكُونُ بِخَلَدِهِمْ تَقَبُّلُ حَقِيقَتِهِ مِنْ قُرْبِ السَّاعَةِ عَلَيْهِمْ دُونَ اعْتِمَادِهِمْ عَلَى ما يسمعون.
আবু হাতিম ইবনু হিব্বান রহিমাহুল্লাহ বলেন: “হাদীসে সম্বোধনের ক্ষেত্রে এমন কিছু শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে, যার দ্বারা উদ্দেশ্য হলো সতর্কীকরণ। কেননা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম দুনিয়ার প্রতি মানুষের ঝুঁকে যাওয়ার ব্যাপারে সতর্ক করেছেন। তিনি তাদের সামনে এমন জিনিসের পরিচয় করিয়ে দিয়েছেন, যা তাদের চিরস্থায়ী বাসস্থান হবে। কাজেই এটি এই বাস্তবতাকে কবুল করে যে, কিয়ামত তাদের অতি নিকটে। এক্ষেত্রে তারা যেন সচরাচর শোনা কথার উপর নির্ভর না করেন।”
[1] মুসনাদ আহমাদ: ৩/১৫৯; সহীহ মুসলিম: ২৯৫৩; সহীহ আল বুখারী: ৬৫১১।
হাদীসটিকে আল্লামা শু‘আইব আল আরনাঊত রহিমাহুল্লাহ মুসলিমের শর্তে সহীহ বলেছেন। আল্লামা নাসির উদ্দিন আলবানী রহিমাহুল্লাহ হাদীসটিকে সহীহ লিগাইরিহী বলেছেন। (আস সহীহাহ: ৩২৫৩।)
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih) বর্ণনাকারীঃ আনাস ইবনু মালিক (রাঃ)

ذِكْرُ خَبَرٍ شنَّع بِهِ بَعْضُ الْمُعَطِّلَةِ عَلَى أَهْلِ الْحَدِيثِ حَيْثُ حُرِمُوا تَوْفِيقَ الْإِصَابَةِ لِمَعْنَاهُ أَخْبَرَنَا الْحَسَنُ بْنُ سُفْيَانَ الشَّيْبَانِيُّ حَدَّثَنَا عَبْدُ الْأَعْلَى بْنُ حَمَّادٍ وَهُدْبَةُ بْنُ خَالِدٍ قَالَا: حَدَّثَنَا حَمَّادُ بْنُ سَلَمَةَ عَنْ ثَابِتٍ عَنْ أَنَسٍ: أَنَّ رَجُلًا قَالَ: يَا رَسُولَ اللَّهِ مَتَى تَقُومُ السَّاعَةُ؟ – وَأُقِيمَتِ الصَّلَاةُ – فَلَمَّا قَضَى رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ صَلَاتَهُ قَالَ: (أَيْنَ السَّائِلُ عَنِ السَّاعَةِ؟ ) قَالَ: هَا أَنَا ذَا يَا رَسُولَ اللَّهِ قَالَ: (إِنَّهَا قَائِمَةٌ فَمَا أَعْدَدْتَ لَهَا؟ ) قَالَ: مَا أَعْدَدْتُ لَهَا كَبِيرَ عَمَلٍ غَيْرَ أَنِّي أُحِبُّ اللَّهَ وَرَسُولَهُ فَقَالَ النَّبِيُّ صَلَّى الله عليه وَسَلَّمَ: (أَنْتَ مَعَ مَنْ أَحْبَبْتَ) قَالَ: وَعِنْدَهُ رَجُلٌ مِنَ الْأَنْصَارِ يُقَالُ لَهُ مُحَمَّدٌ فقَالَ: (إِنْ يَعِشْ هَذَا فَلَا يُدْرِكُهُ الْهَرَمُ حَتَّى تَقُومَ السَّاعَةُ.) زَادَ هُدْبَةُ: قَالَ أَنَسٌ: فَنَحْنُ نحب الله ورسوله. الراوي : أَنَس | المحدث : العلامة ناصر الدين الألباني | المصدر : التعليقات الحسان على صحيح ابن حبان الصفحة أو الرقم: 566 | خلاصة حكم المحدث: صحيح

এই হাদিসটিকে কিয়ামতের আসন্ন প্রত্যাশার প্রমাণ হিসেবে আধুনিক প্রারম্ভিক-ইসলাম গবেষণাতেও ব্যবহার করা হয়েছে। Stephen J. Shoemaker তাঁর The Death of a Prophet-এর “Muhammad as Eschatological Prophet” অধ্যায়ে মুহাম্মদ ও তাঁর প্রথম অনুসারীদের মধ্যে পৃথিবীর সমাপ্তি অত্যন্ত নিকটবর্তী—এমন প্রত্যাশার পক্ষে এই বালক-সংক্রান্ত বর্ণনাকে গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষ্য হিসেবে আলোচনা করেছেন। বইটির প্রকাশকও তাঁর মূল সিদ্ধান্ত সংক্ষেপে বলেছে: মুহাম্মদ ও তাঁর অনুসারীরা পৃথিবীর শেষকে “immediate future”, এমনকি নিজেদের জীবনকালেও ঘটতে পারে বলে প্রত্যাশা করেছিলেন; কিয়ামত না ঘটায় পরবর্তীতে সেই প্রত্যাশাকে নতুনভাবে ব্যাখ্যা করতে হয়। [34]


হাদিসের পরিচ্ছেদঃ হাদীসের সঠিক মর্মার্থ

!
ঐতিহাসিক স্বীকারোক্তি ও বিশ্লেষণ

খুব গভীর মনোযোগ দিয়ে আমরা ইবনু হিব্বানের দীর্ঘ বর্ণনামূলক সহিহ হাদিসটি পড়লে দেখতে পাই, এই হাদিসের পরিচ্ছেদ হিসেবে ইবনু হিব্বান লিখেছেন:

“বাতিলপন্থীরা যে হাদীসের সঠিক মর্মার্থ বুঝতে না পেরে মুহাদ্দিসগণের নিন্দা করে থাকে।”

অর্থাৎ ইবনু হিব্বান এই হাদিসের আসল মর্মার্থ অনুধাবন করার তাগিদ দিচ্ছেন এবং বাতিলপন্থীদের এক ধরনের তিরস্কার করছেন। এর অর্থ কিন্তু এটিই যে, এই হাদিস নিয়ে তাঁর সময়কালেই নানা ধরনের সমালোচনা এবং অবিশ্বাসের জন্ম নিয়েছিল। ইবনু হিব্বান সেইসব বাতিল পন্থীদের জবাব দিয়েই কথাটি লিখেছেন। প্রশ্ন হচ্ছে, কী নিয়ে এই তথাকথিত বাতিল মতের উদ্ভব ঘটলো?

যুক্তি: সমালোচনা দমনের এই চেষ্টা প্রমাণ করে যে, হাদিসটির সময়গত ভবিষ্যদ্বাণী তৎকালীন বুদ্ধিজীবী মহলেও সংশয় তৈরি করেছিল।

“প্রজন্মের মৃত্যু/ব্যক্তির মৃত্যু” – অনুবাদ করলে

আসুন আমরা ইবনু হিব্বানের দীর্ঘ বর্ণনামূলক হাদিসটির শব্দের অর্থ বদলে প্রজন্মের মৃত্যু বা ব্যক্তির মৃত্যু করে দিয়ে পড়ি, দেখা যাক, এটি কোন অর্থ তৈরি করে কিনা।

সহীহ ইবনু হিব্বান (হাদিসবিডি)
৬. সদাচারণ ও ন্যায়নিষ্ঠতা সংশ্লিষ্ট কিতাব
পরিচ্ছেদঃ বাতিলপন্থীরা যে হাদীসের সঠিক মর্মার্থ বুঝতে না পেরে মুহাদ্দিসগণের নিন্দা করে থাকে
৫৬৬. আনাস বিন মালিক রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন,এক ব্যক্তি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বললেন: “হে আল্লাহর নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম, “প্রজন্মের মৃত্যু/ব্যক্তির মৃত্যু” কখন সংঘটিত হবে?” এসময় সালাতের ইকামত দেওয়া হয়েছিল- রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন সালাত শেষ করলেনতখন বলেন: “কিয়ামত সম্পর্কে প্রশ্নকারী কোথায়?” তখন সেই ব্যক্তি বলেন: “হে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম, আমি এখানেই আছি।”রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন: “জেনে রাখো, “প্রজন্মের মৃত্যু/ব্যক্তির মৃত্যু” সংঘটিত হবেই। কিন্তু তুমি “প্রজন্মের মৃত্যু/ব্যক্তির মৃত্যু”-র জন্য কী প্রস্তুতি নিয়েছো?” তিনি বলেন: “আমি “প্রজন্মের মৃত্যু/ব্যক্তির মৃত্যু”-র জন্য খুব বেশি আমল প্রস্তুত করতে পারিনি, তবে আমি আল্লাহ ও তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে ভালবাসি।” রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন: “তুমি যাকে ভালবাসো, “প্রজন্মের মৃত্যু/ব্যক্তির মৃত্যু”-র দিন তুমি তার সাথেই থাকবে।” রাবী বলেন: “এসময় তাঁর কাছে একজন আনসারী সাহাবী ছিলেন, তাঁর নাম মুহাম্মাদ। অতঃপর তিনি বলেন: “যদি এই ব্যক্তি বেঁচে থাকেন, তবে তিনি বৃদ্ধ হওয়ার আগেই “প্রজন্মের মৃত্যু/ব্যক্তির মৃত্যু” সংঘটিত হয়ে যাবে।”
হুদবা আরেকটু বেশি বর্ণনা করেছেন, আনাস রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু বলেন: “আমরা আল্লাহ ও তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে ভালবাসি।”[1]
قَالَ أَبُو حَاتِمٍ: هَذَا الْخَبَرُ مِنَ الْأَلْفَاظِ الَّتِي أُطْلِقَتْ بِتَعْيِينِ خِطَابٍ مُرَادُهُ التَّحْذِيرُ وَذَاكَ أَنَّ الْمُصْطَفَى صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أَرَادَ تَحْذِيرَ النَّاسِ عَنِ الرُّكُونِ إِلَى هَذِهِ الدُّنْيَا بِتَعْرِيفِهِمُ الشَّيْءَ الَّذِي يَكُونُ بِخَلَدِهِمْ تَقَبُّلُ حَقِيقَتِهِ مِنْ قُرْبِ السَّاعَةِ عَلَيْهِمْ دُونَ اعْتِمَادِهِمْ عَلَى ما يسمعون.
আবু হাতিম ইবনু হিব্বান রহিমাহুল্লাহ বলেন: “হাদীসে সম্বোধনের ক্ষেত্রে এমন কিছু শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে, যার দ্বারা উদ্দেশ্য হলো সতর্কীকরণ। কেননা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম দুনিয়ার প্রতি মানুষের ঝুঁকে যাওয়ার ব্যাপারে সতর্ক করেছেন। তিনি তাদের সামনে এমন জিনিসের পরিচয় করিয়ে দিয়েছেন, যা তাদের চিরস্থায়ী বাসস্থান হবে। কাজেই এটি এই বাস্তবতাকে কবুল করে যে, “প্রজন্মের মৃত্যু/ব্যক্তির মৃত্যু” তাদের অতি নিকটে। এক্ষেত্রে তারা যেন সচরাচর শোনা কথার উপর নির্ভর না করেন।”
[1] মুসনাদ আহমাদ: ৩/১৫৯; সহীহ মুসলিম: ২৯৫৩; সহীহ আল বুখারী: ৬৫১১।
হাদীসটিকে আল্লামা শু‘আইব আল আরনাঊত রহিমাহুল্লাহ মুসলিমের শর্তে সহীহ বলেছেন। আল্লামা নাসির উদ্দিন আলবানী রহিমাহুল্লাহ হাদীসটিকে সহীহ লিগাইরিহী বলেছেন। (আস সহীহাহ: ৩২৫৩।)
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih) বর্ণনাকারীঃ আনাস ইবনু মালিক (রাঃ)

উপরের বর্ণনাটি পড়ে দেখুন, এটি আসলেই কোন অর্থবোধক হাদিস হিসেবে গণ্য হতে পারে কিনা। প্রজন্মের মৃত্যুর জন্য কে কী প্রস্তুতি নেয় তা তো মোটে বোধগম্য হয় না। একইসাথে, ভালবাসার মানুষের সাথে প্রজন্মের মৃত্যু বা ব্যক্তির মৃত্যু কীভাবে হবে, তাও বোধগম্য হয় না।


‘আস-সায়াহ’ (السَّاعَةُ) শব্দের সুনির্দিষ্ট ব্যবহার

এখানে السَّاعَة শব্দটির অর্থ নির্ধারণের প্রধান ভিত্তি হলো বাক্যের সম্পূর্ণ প্রেক্ষাপট। প্রশ্নটি متى تقوم الساعة؟—“কিয়ামত কখন সংঘটিত হবে?” এরপর মুহাম্মদ প্রশ্নকারীকে জিজ্ঞেস করছেন সে এর জন্য কী প্রস্তুতি নিয়েছে; প্রশ্নকারী আল্লাহ ও রাসূলের প্রতি ভালোবাসার কথা বলছে; উত্তরে পরকালীন সঙ্গের কথা বলা হচ্ছে; তারপর আবার একই السَّاعَة শব্দ ব্যবহার করে বালকের বার্ধক্যের আগের সময়সীমা দেওয়া হচ্ছে। পুরো কথোপকথনটি মহাকিয়ামত ও পরকালীন বিচারের কাঠামোর মধ্যেই চলছে। ব্যক্তিগত মৃত্যু বা একটি প্রজন্মের বিলুপ্তির কোনো শব্দ প্রথম অংশে নেই।

প্রশ্ন ও উত্তর

প্রশ্নকারী প্রশ্ন করেছিলেন: “মাতা তাকুমুস সায়াহ?” (কেয়ামত কবে হবে?)। নবী বালকটির দিকে ইশারা করে বললেন, “হাত্তা তাকুমুস সায়াহ” (যতক্ষণ না কেয়ামত সংঘটিত হয়)।

ভাষাতাত্ত্বিক বিশ্লেষণ

এখানে লক্ষ্যণীয় যে, নবী প্রশ্নকারীর ব্যবহৃত মূল শব্দটিরই (সায়াহ) পুনরাবৃত্তি করেছেন। আরবী অলঙ্কারশাস্ত্র (Rhetoric) অনুযায়ী, যদি বক্তা প্রশ্নকারীর উদ্দিষ্ট ‘মহাপ্রলয়’ না বুঝিয়ে কেবল ‘মৃত্যু’ বোঝাতে চাইতেন, তবে তিনি শব্দের পুনরাবৃত্তি না করে নির্দিষ্ট সম্বোধন ব্যবহার করতেন।

মাউতুকা (তোমার মৃত্যু)
সায়াতুকা (তোমার সময়)

যুক্তি: নির্দিষ্ট বিশেষ্য (Proper Noun) ব্যবহার না করে যদি তিনি ব্যক্তিগত মৃত্যু বোঝাতে চাইতেন, তবে উপরোক্ত শব্দগুলো অধিকতর ব্যাকরণসম্মত ও স্পষ্ট হতো।

  • প্রশ্নকারী প্রশ্ন করেছিলেন: “মাতা তাকুমুস সায়াহ?” (কেয়ামত কবে হবে?)।
  • উত্তরে নবী যখন ওই বালকটির দিকে ইশারা করে বললেন, “হাত্তা তাকুমুস সায়াহ” (যতক্ষণ না কেয়ামত সংঘটিত হয়), তখন তিনি প্রশ্নকারীর ব্যবহৃত শব্দটিরই পুনরাবৃত্তি করেছেন। যদি নবী এর দ্বারা প্রশ্নকারীর উদ্দিষ্ট ‘মহাপ্রলয়’ না বুঝিয়ে কেবল ‘মৃত্যু’ বোঝাতে চাইতেন, তবে আরবী অলঙ্কারশাস্ত্র অনুযায়ী তিনি ‘মাউতুকা’ (তোমার মৃত্যু) বা ‘সায়াতুকা’ (তোমার সময়) শব্দ ব্যবহার করতেন।

‘তাকুমু’ (تَقُومُ) ক্রিয়াপদ ও ‘কিয়াম’ (قِيَامُ)

تَقُومُ শব্দটি قام ক্রিয়ার বর্তমান/ভবিষ্যৎ রূপ; এর মূল ধাতুমূল ق-و-مقيامقيامة একই ধাতুমূলের শব্দ। এখানে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো تقوم الساعة বাক্যবন্ধের ব্যবহার: কোরআন ও হাদিসের শেষ-বিচার সম্পর্কিত ভাষায় এটি “কিয়ামত সংঘটিত হওয়া” অর্থে বারবার ব্যবহৃত হয়েছে। ফলে এই বর্ণনার অর্থ নির্ধারণে মূল প্রমাণ হলো শব্দটির প্রেক্ষাপট, বাক্যবন্ধ এবং একই কথোপকথনের ধারাবাহিকতা। আরবী ভাষায় মহাপ্রলয় বা শেষ বিচারের দিনকে ‘ক্বিয়ামত’ বলা হয় কারণ সেদিন মানুষ আল্লাহর সামনে দণ্ডায়মান হবে।

তাকুমুস সায়াহ
(تَقُومُ السَّاعَةُ)
এটি একটি নির্দিষ্ট বাক্যবন্ধ (Idiomatic expression), যা আরবী সাহিত্যে ও ধর্মতত্ত্বে কেবল জগত ধ্বংসের প্রাক্কাল বা ‘মহাপ্রলয়’ বোঝাতে ব্যবহৃত হয়।

ভাষাতাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে, ‘তাকুমু’ ক্রিয়াপদটি এখানে একটি বিশেষ গাম্ভীর্য বহন করে। ব্যক্তিবিশেষের সাধারণ মৃত্যু বা শেষ সময় বোঝানোর জন্য আরবী ভাষায় ভিন্ন শব্দভাণ্ডার রয়েছে।

‘মাত’ (مات) ব্যক্তিগত মৃত্যু
‘হিন’ (حين) নির্দিষ্ট শেষ সময়
‘তাকুমু’ (تقوم) প্রলয় সংঘটিত হওয়া

সিদ্ধান্ত: নবী যখন ‘তাকুমুস সায়াহ’ বাক্যবন্ধটি ব্যবহার করেন, তখন তিনি মূলত মহাজাগতিক ধ্বংসের কথাই বলছিলেন। যদি উদ্দেশ্য কেবল মৃত্যু হতো, তবে অলঙ্কারশাস্ত্র অনুযায়ী তিনি ‘তাকুমু’ নয় বরং ‘মাত’ বা ‘হিন’ ব্যবহার করতেন।

  • তাকুমুস সায়াহ (تَقُومُ السَّاعَةُ) একটি নির্দিষ্ট বাক্যবন্ধ (Idiomatic expression), যা আরবী সাহিত্যে জগত ধ্বংসের প্রাক্কাল বোঝাতে ব্যবহৃত হয়। ব্যক্তিবিশেষের মৃত্যুর জন্য সাধারণত ‘মাত’ (মৃত্যু) বা ‘হিন’ (শেষ সময়) ব্যবহৃত হয়, ‘তাকুমু’ নয়।

সময়সীমার সীমাবদ্ধতা (Al-Haram vs As-Sa’ah)

বাক্যটির গঠন লক্ষ্য করুন: “সে বৃদ্ধ হওয়ার আগেই কেয়ামত হয়ে যাবে” (لَا يُدْرِكُهُ الْهَرَمُ حَتَّى تَقُومَ السَّاعَةُ)। এখানে দু’টি ঘটনার তুলনা করা হয়েছে: ১. ওই বালকের বার্ধক্যে পৌঁছানো। ২. কেয়ামত সংঘটিত হওয়া। ভাষাগতভাবে যখন বলা হয় “ক হওয়ার আগেই খ হবে”, তখন ‘খ’ একটি বিশাল ও সুনির্দিষ্ট ঘটনা হিসেবে উপস্থাপিত হয়। যদি এখানে কেয়ামত মানে কেবল মৃত্যু হতো, তবে বাক্যটি নিরর্থক হয়ে যায়। কারণ বার্ধক্যের আগেই মৃত্যু হওয়া একটি সাধারণ বিষয়, কিন্তু নবী এখানে একটি বিস্ময়কর তথ্য বা ‘খবর’ দিচ্ছিলেন। এই সংবাদের গুরুত্ব তখনই তৈরি হয় যখন ‘আস-সায়াহ’ দ্বারা মহাপ্রলয়কে উদ্দেশ্য করা হয়।


বর্ণনাকারীর শিরোনাম ও ঐতিহাসিক বিতর্ক

হাদিসটির শুরুতে ইবনে হিব্বান (রহ.) একটি গুরুত্বপূর্ণ টীকা যোগ করেছেন:

“যাদের সঠিক অর্থ বোঝার তৌফিক হয়নি, এমন কিছু বাতিলপন্থী (المعطلة) এই হাদিসের মাধ্যমে আহলে হাদিসদের বিদ্রূপ করে।”

ইবনু হিব্বানের অধ্যায়ের শিরোনাম নিজেই দেখায় যে এই হাদিসটি তাঁর সময়ে সমালোচনার বিষয় হয়ে উঠেছিল। তিনি অধ্যায়টির নাম দিয়েছেন—“যে বর্ণনা দিয়ে কিছু মু‘আত্তিলা আহলে হাদিসকে নিন্দা করেছে, কারণ তারা এর অর্থ বুঝতে পারেনি।” অর্থাৎ বর্ণনাটি এমন একটি সমস্যার জন্ম দিয়েছিল যার উত্তর দেওয়ার জন্য গ্রন্থকারকে আলাদা ব্যাখ্যা দিতে হয়েছে। আরও গুরুত্বপূর্ণ, তাঁর নিজের ব্যাখ্যাতেও قرب الساعة عليهم—“তাদের ওপর কিয়ামতের নৈকট্য”—ভাষাটি বজায় থাকে। একটি বালকের জীবনসীমার সঙ্গে কিয়ামতের সম্পর্ক স্থাপনকারী বর্ণনাটি তাই শুরু থেকেই ব্যাখ্যার চাপ তৈরি করেছিল—এটি ইবনু হিব্বানের নিজস্ব অধ্যায়-শিরোনামেই নথিবদ্ধ।


‘আনতা মা’আ মান আহবাবতা’ এর প্রসঙ্গের সাথে সংগতি

হাদিসের প্রথমাংশে নবী বলেছেন, “কেয়ামত তো সংঘটিত হবেই (إِنَّهَا قَائِمَةٌ), তুমি তার জন্য কী প্রস্তুতি নিয়েছ?” এখানে ‘কায়েমাহ’ (সংঘটিত হওয়া) শব্দটি দিয়ে কেয়ামতের অনিবার্যতার কথা বলা হয়েছে। এরপরই ওই বালকের উদাহরণ দিয়ে এর নিকটবর্তিতা বোঝানো হয়েছে। প্রশ্নকারী যেখানে পরকাল ও বিচার দিবস নিয়ে চিন্তিত হয়ে প্রশ্ন করছেন, সেখানে উত্তরের ধারাবাহিকতা রক্ষা করতে হলে ‘আস-সায়াহ’ শব্দটিকে মহাপ্রলয় হিসেবেই গ্রহণ করতে হয়।


একই প্রশ্ন, একই শব্দ—তবু “মৃত্যু” ব্যাখ্যার এড-হক সমস্যা

আসুন দুইটি হাদিস পড়ি, পাশাপাশি রেখে। একই ঘটনা/একই কথোপকথনের দুইটি ভিন্ন রেওয়ায়েত, কারণ এগুলোকে আলাদা ঘটনা বলা কঠিন, কারণ দুটো রেওয়ায়েতেই একই রাবি (আনাস), একই প্রশ্ন (السّاعة), একই পাল্টা প্রশ্ন (মاذا أعددت لها), একই উত্তর (ভালোবাসা), এবং একই সিদ্ধান্তবাক্য (أنت مع من أحببت)—একই কথোপকথনের ভিন্ন বর্ণনাই স্বাভাবিক ব্যাখ্যা।

সহীহ বুখারী (তাওহীদ পাবলিকেশন)
৬২/ সাহাবীগণ [রাযিয়াল্লাহ ‘আনহুম]-এর মর্যাদা
পরিচ্ছেদঃ ৬২/৬. পরিচ্ছেদ নাই।
৩৬৮৮. আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত।এক ব্যক্তি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে জিজ্ঞেস করল, কিয়ামত কখন হবে? তিনি বললেন, তুমি কিয়ামতের জন্য কী জোগাড় করেছ? সে বলল, কোনো কিছুই জোগাড় করতে পারিনি, তবে আমি আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূলকে ভালবাসি। তখন তিনি বললেন, তুমি তাঁদের সঙ্গেই থাকবে যাঁদেরকে তুমি ভালবাস। আনাস (রাঃ) বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর এ কথা দ্বারা আমরা এত আনন্দিত হয়েছি যে, অন্য কোনো কথায় এত আনন্দিত হইনি। আনাস (রাঃ) বলেন, আমি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে ভালবাসি এবং আবূ বকর ও ‘উমার (রাঃ)-কেও। আশা করি তাঁদেরকে আমার ভালবাসার কারণে তাঁদের সঙ্গে জান্নাতে বসবাস করতে পারব; যদিও তাঁদের ‘আমলের মত ‘আমল আমি করতে পারিনি। (৬১৬৭, ৬১৭১, ৬১৫৩) (আধুনিক প্রকাশনীঃ ৩৪১৩, ইসলামিক ফাউন্ডেশনঃ ৩৪২০)
بَاب
حَدَّثَنَا سُلَيْمَانُ بْنُ حَرْبٍ حَدَّثَنَا حَمَّادُ بْنُ زَيْدٍ عَنْ ثَابِتٍ عَنْ أَنَسٍ أَنَّ رَجُلًا سَأَلَ النَّبِيَّ صلى الله عليه وسلم عَنْ السَّاعَةِ فَقَالَ مَتَى السَّاعَةُ قَالَ وَمَاذَا أَعْدَدْتَ لَهَا قَالَ لَا شَيْءَ إِلَّا أَنِّيْ أُحِبُّ اللهَ وَرَسُوْلَهُ فَقَالَ أَنْتَ مَعَ مَنْ أَحْبَبْتَ قَالَ أَنَسٌ فَمَا فَرِحْنَا بِشَيْءٍ فَرَحَنَا بِقَوْلِ النَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم أَنْتَ مَعَ مَنْ أَحْبَبْتَ قَالَ أَنَسٌ فَأَنَا أُحِبُّ النَّبِيَّ صلى الله عليه وسلم وَأَبَا بَكْرٍ وَعُمَرَ وَأَرْجُوْ أَنْ أَكُوْنَ مَعَهُمْ بِحُبِّيْ إِيَّاهُمْ وَإِنْ لَمْ أَعْمَلْ بِمِثْلِ أَعْمَالِهِمْ
حدثنا سليمان بن حرب حدثنا حماد بن زيد عن ثابت عن انس ان رجلا سال النبي صلى الله عليه وسلم عن الساعة فقال متى الساعة قال وماذا اعددت لها قال لا شيء الا اني احب الله ورسوله فقال انت مع من احببت قال انس فما فرحنا بشيء فرحنا بقول النبي صلى الله عليه وسلم انت مع من احببت قال انس فانا احب النبي صلى الله عليه وسلم وابا بكر وعمر وارجو ان اكون معهم بحبي اياهم وان لم اعمل بمثل اعمالهم
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আনাস ইবনু মালিক (রাঃ)

আসুন এর ইংরেজি অনুবাদটি দেখি,

Narrated Anas: A man asked the Prophet (ﷺ) about the Hour (i.e. Day of Judgment) saying, “When will the Hour be?” The Prophet (ﷺ) said, “What have you prepared for it?” The man said, “Nothing, except that I love Allah and His Apostle.” The Prophet (ﷺ) said, “You will be with those whom you love.” We had never been so glad as we were on hearing that saying of the Prophet (i.e., “You will be with those whom you love.”) Therefore, I love the Prophet, Abu Bakr and `Umar, and I hope that I will be with them because of my love for them though my deeds are not similar to theirs.

সহীহ ইবনু হিব্বান (হাদিসবিডি)
৬. সদাচারণ ও ন্যায়নিষ্ঠতা সংশ্লিষ্ট কিতাব
পরিচ্ছেদঃ বাতিলপন্থীরা যে হাদীসের সঠিক মর্মার্থ বুঝতে না পেরে মুহাদ্দিসগণের নিন্দা করে থাকে
৫৬৬. আনাস বিন মালিক রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, এক ব্যক্তি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বললেন: “হে আল্লাহর নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম, কিয়ামত কখন সংঘটিত হবে?” এসময় সালাতের ইকামত দেওয়া হয়েছিল- রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন সালাত শেষ করলেন তখন বলেন: “কিয়ামত সম্পর্কে প্রশ্নকারী কোথায়?” তখন সেই ব্যক্তি বলেন: “হে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম, আমি এখানেই আছি।” রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন: “জেনে রাখো, কিয়ামত সংঘটিত হবেই। কিন্তু তুমি কিয়ামতের জন্য কী প্রস্তুতি নিয়েছো?” তিনি বলেন: “আমি কিয়ামতের জন্য খুব বেশি আমল প্রস্তুত করতে পারিনি, তবে আমি আল্লাহ ও তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে ভালবাসি।” রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন: “তুমি যাকে ভালবাসো, কিয়ামতের দিন তুমি তার সাথেই থাকবে।” রাবী বলেন: “এসময় তাঁর কাছে একজন আনসারী সাহাবী ছিলেন, তাঁর নাম মুহাম্মাদ। অতঃপর তিনি বলেন: “যদি এই ব্যক্তি বেঁচে থাকেন, তবে তিনি বৃদ্ধ হওয়ার আগেই কিয়ামত সংঘটিত হয়ে যাবে।” হুদবা আরেকটু বেশি বর্ণনা করেছেন, আনাস রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু বলেন: “আমরা আল্লাহ ও তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে ভালবাসি।”[1]
قَالَ أَبُو حَاتِمٍ: هَذَا الْخَبَرُ مِنَ الْأَلْفَاظِ الَّتِي أُطْلِقَتْ بِتَعْيِينِ خِطَابٍ مُرَادُهُ التَّحْذِيرُ وَذَاكَ أَنَّ الْمُصْطَفَى صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أَرَادَ تَحْذِيرَ النَّاسِ عَنِ الرُّكُونِ إِلَى هَذِهِ الدُّنْيَا بِتَعْرِيفِهِمُ الشَّيْءَ الَّذِي يَكُونُ بِخَلَدِهِمْ تَقَبُّلُ حَقِيقَتِهِ مِنْ قُرْبِ السَّاعَةِ عَلَيْهِمْ دُونَ اعْتِمَادِهِمْ عَلَى ما يسمعون.
আবু হাতিম ইবনু হিব্বান রহিমাহুল্লাহ বলেন: “হাদীসে সম্বোধনের ক্ষেত্রে এমন কিছু শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে, যার দ্বারা উদ্দেশ্য হলো সতর্কীকরণ। কেননা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম দুনিয়ার প্রতি মানুষের ঝুঁকে যাওয়ার ব্যাপারে সতর্ক করেছেন। তিনি তাদের সামনে এমন জিনিসের পরিচয় করিয়ে দিয়েছেন, যা তাদের চিরস্থায়ী বাসস্থান হবে। কাজেই এটি এই বাস্তবতাকে কবুল করে যে, কিয়ামত তাদের অতি নিকটে। এক্ষেত্রে তারা যেন সচরাচর শোনা কথার উপর নির্ভর না করেন।”
ذِكْرُ خَبَرٍ شنَّع بِهِ بَعْضُ الْمُعَطِّلَةِ عَلَى أَهْلِ الْحَدِيثِ حَيْثُ حُرِمُوا تَوْفِيقَ الْإِصَابَةِ لِمَعْنَاهُ أَخْبَرَنَا الْحَسَنُ بْنُ سُفْيَانَ الشَّيْبَانِيُّ حَدَّثَنَا عَبْدُ الْأَعْلَى بْنُ حَمَّادٍ وَهُدْبَةُ بْنُ خَالِدٍ قَالَا: حَدَّثَنَا حَمَّادُ بْنُ سَلَمَةَ عَنْ ثَابِتٍ عَنْ أَنَسٍ: أَنَّ رَجُلًا قَالَ: يَا رَسُولَ اللَّهِ مَتَى تَقُومُ السَّاعَةُ؟ – وَأُقِيمَتِ الصَّلَاةُ – فَلَمَّا قَضَى رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ صَلَاتَهُ قَالَ: (أَيْنَ السَّائِلُ عَنِ السَّاعَةِ؟ ) قَالَ: هَا أَنَا ذَا يَا رَسُولَ اللَّهِ قَالَ: (إِنَّهَا قَائِمَةٌ فَمَا أَعْدَدْتَ لَهَا? ) قَالَ: مَا أَعْدَدْتُ لَهَا كَبِيرَ عَمَلٍ غَيْرَ أَنِّي أُحِبُّ اللَّهَ وَرَسُولَهُ فَقَالَ النَّبِيُّ صَلَّى الله عليه وَسَلَّمَ: (أَنْتَ مَعَ مَنْ أَحْبَبْتَ) قَالَ: وَعِنْدَهُ رَجُلٌ مِنَ الْأَنْصَارِ يُقَالُ لَهُ مُحَمَّدٌ فقَالَ: (إِنْ يَعِشْ هَذَا فَلَا يُدْرِكُهُ الْهَرَمُ حَتَّى تَقُومَ السَّاعَةُ.) زَادَ هُدْبَةُ: قَالَ أَنَسٌ: فَنَحْنُ نحب الله ورسوله. الراوي : أَنَس | المحدث : العلامة ناصر الدين الألباني | المصدر : التعليقات الحسان على صحيح ابن حبان الصفحة أو الرقم: 566 | خلاصة حكم المحدث: صحيح. اخبرنا الحسن بن سفيان الشيباني حدثنا عبد الاعلى بن حماد وهدبة بن خالد قالا: حدثنا حماد بن سلمة عن ثابت عن انس: ان رجلا قال: يا رسول الله متى تقوم الساعة؟ – واقيمت الصلاة – فلما قضى رسول الله صلى الله عليه وسلم صلاته قال: (اين الساىل عن الساعة? ) قال: ها انا ذا يا رسول الله قال: (انها قاىمة فما اعددت لها? ) قال: ما اعددت لها كبير عمل غير اني احب الله ورسوله فقال النبي صلى الله عليه وسلم: (انت مع من احببت) قال: وعنده رجل من الانصار يقال له محمد فقال: (ان يعش هذا فلا يدركه الهرم حتى تقوم الساعة.) زاد هدبة: قال انس: فنحن نحب الله ورسوله. الراوي : انس | المحدث : العلامة ناصر الدين الالباني | المصدر : التعليقات الحسان على صحيح ابن حبان الصفحة او الرقم: 566 | خلاصة حكم المحدث: صحيح. [1]
মুসনাদ আহমাদ: ৩/১৫৯; সহীহ মুসলিম: ২৯৫৩; সহীহ আল বুখারী: ৬৫১১। হাদীসটিকে আল্লামা শু‘আইব আল আরনাঊত রহিমাহুল্লাহ মুসলিমের শর্তে সহীহ বলেছেন। আল্লামা নাসির উদ্দিন আলবানী রহিমাহুল্লাহ হাদীসটিকে সহীহ লিগাইরিহী বলেছেন। (আস সহীহাহ: ৩২৫৩।)
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আনাস ইবনু মালিক (রাঃ)

উপরে উদ্ধৃত দুইটি হাদিসেই প্রশ্নের মূল “টার্গেট” এক—السّاعة (আস-সা’আহ), অর্থাৎ “কিয়ামত/Hour”। প্রশ্নের ভাষা একদম হুবহু না হলেও ফর্মুলা কার্যত একই: একটিতে বলা হয়েছে مَتَى السَّاعَةُ (“সা’আহ কখন?”), আরেকটিতে مَتَى تَقُومُ السَّاعَةُ (“সা’আহ কখন কায়েম/সংঘটিত হবে?”)। অর্থাৎ, দুটোই একই প্রশ্ন—কিয়ামত কখন হবে—শুধু দ্বিতীয় বর্ণনায় تقوم (কায়েম/ঘটবে) ক্রিয়াটি যুক্ত হওয়ায় বাক্য-গঠন সামান্য বিস্তৃত হয়েছে। একইভাবে বুখারির বর্ণনায় (আনাস থেকে) নবী পাল্টা প্রশ্ন করেন: وَمَاذَا أَعْدَدْتَ لَهَا؟—অর্থাৎ “তুমি এর জন্য কী প্রস্তুতি নিয়েছ?”—যা কথোপকথনটিকে স্পষ্টভাবে এস্কাটোলজিক্যাল/নৈতিক কাঠামোর মধ্যে ধরে রাখে।

হাদিস উৎসআরবি প্রশ্ন (যেমন আছে)মূল শব্দবাক্যগত পার্থক্যঅর্থ (সারকথা)
সহীহ বুখারী ৩৬৮৮مَتَى السَّاعَةُالسّاعةসংক্ষিপ্ত প্রশ্ন-ফর্ম“কিয়ামত/Hour কখন?”
সহীহ ইবনু হিব্বান ৫৬৬مَتَى تَقُومُ السَّاعَةُ؟السّاعةتقوم (কায়েম/ঘটবে) যোগ হওয়ায় প্রশ্নটা একটু বিস্তৃত“কিয়ামত/Hour কখন সংঘটিত/কায়েম হবে?”

সারসংক্ষেপ:

হ্যাঁ
একই শব্দ: দুই বর্ণনায় কেন্দ্রীয় শব্দ হিসেবে الساعة (আল-সায়াহ) ব্যবহৃত হয়েছে।
হ্যাঁ
একই প্রশ্ন (অর্থে): উভয় ক্ষেত্রে প্রশ্নকারীর লক্ষ্য ছিল— “কিয়ামত কখন হবে?”। অর্থের দিক থেকে কোনো পার্থক্য নেই।
না
একই বাক্য (হুবহু): বুখারীতে متى الساعة আর ইবনু হিব্বানে متى تقوم الساعة। দ্বিতীয়টিতে تقوم (তাকুমু) ক্রিয়াটি যুক্ত হলেও প্রশ্নের চূড়ান্ত গন্তব্য অভিন্ন।

সারসংক্ষেপ: শাব্দিক গঠন কিছুটা ভিন্ন হলেও الساعة এবং تقوم শব্দের উপস্থিতি প্রমাণ করে যে, আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু ছিল মহাজাগতিক কিয়ামত, কোনো ব্যক্তির ব্যক্তিগত মৃত্যু নয়।

  • (১) একই শব্দ—হ্যাঁ: দুটোতেই কেন্দ্রীয় শব্দ السّاعة
  • (২) একই প্রশ্ন (অর্থে)—হ্যাঁ: দুটোই “কিয়ামত/Hour কখন হবে?”।
  • (৩) একই বাক্য (হুবহু)—না: বুখারীতে متى الساعة, আর ইবনু হিব্বানে متى تقوم الساعة—দ্বিতীয়টিতে تقوم ক্রিয়াটি যুক্ত, কিন্তু প্রশ্নের লক্ষ্য ও অর্থ একই থাকে।
স্বাভাবিক পাঠ (Plain Reading)

উত্তর-প্রতিউত্তর শেষ হয় নৈতিক/এস্কাটোলজিক্যাল ফ্রেমে: “أَنْتَ مَعَ مَنْ أَحْبَبْتَ”। এখানে “السّاعة” শব্দটি যে মহাকিয়ামত/বিচার দিবস বোঝাচ্ছে, সেটাই স্বাভাবিক পাঠ (plain reading): কিয়ামতের প্রস্তুতি, কিয়ামতের দিন সঙ্গ—সবকিছুই সেই বৃহৎ পরকালীন কাঠামোর সাথে ফিট করে। ফলে একই প্রশ্ন-ভাষা ও একই শব্দ “السّاعة”–কে এখানে “মৃত্যু” বলে সরিয়ে নেওয়া কেবল শব্দের অভিধানগত সম্ভাবনার ওপর দাঁড়ায়, কনটেক্সটের ওপর নয়।

সংকট ও বৈপরীত্য (The Conflict)

এরপর যখন একই প্রশ্ন (متى تقوم الساعة) আরেক বর্ণনায় এসে যোগ হয় অতিরিক্ত বাক্য—“এই ব্যক্তি বাঁচলে বার্ধক্যে পৌঁছানোর আগেই ‘সা’আহ’ কায়েম হবে”—তখন সমস্যাটা শুরু হয়। কারণ এই বাক্যে “السّاعة”-কে “মৃত্যু/প্রজন্মের শেষ” বানাতে চাইলে টেক্সটের ভেতরে সাধারণত যে সংকেত দরকার (যেমন “عليكم ساعتكم”—‘তোমাদের আওয়ার’) সেটা এখানে নেই; বরং একই السّاعة শব্দটি প্রশ্নে যেমন আছে, উত্তরে তেমনই পুনরাবৃত্ত।

যৌক্তিক আপত্তি (Linguistic Critique)

তাই “এটা আসলে ‘তোমাদের মৃত্যু’” বলে ব্যাখ্যা দাঁড় করাতে গেলে অনেক সময় অন্য ভ্যারিয়েন্ট/পরবর্তী ব্যাখ্যা/শরহ টেনে এনে অর্থ বদলাতে হয়। যুক্তিগতভাবে এটাকেই বলা যায় harmonization-driven reading: ঝুঁকিপূর্ণ/বিপজ্জনক পাঠ থেকে পালাতে গিয়ে শব্দের অর্থকে নিরাপদ দিকে সরিয়ে নেওয়া।

আপত্তি হলো, যেখানে “মহাকিয়ামত” অর্থে পড়া প্রেক্ষিতগতভাবে স্বাভাবিক, সেখানে শুধু বাঁচানোর জন্য হঠাৎ করে একই শব্দকে “মৃত্যু/লোকাল আওয়ার” বানানো—এটা উচ্চারিত শব্দ থেকে স্বতঃস্ফূর্তভাবে তৈরি হওয়া ব্যাখ্যা নয়, বরং জোরপূর্বক তৈরি ব্যাখ্যা যা ফলাফলের চাপে অর্থ-শিফট। এই ধরনের rescue-reading ভবিষ্যদ্বাণীমূলক দাবিকে কার্যত অপরীক্ষণীয় (unfalsifiable) করে তোলে।

চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত (Conclusion)

আনাসের বর্ণনায় প্রশ্ন السّاعة নিয়ে, প্রস্তুতি السّاعة-এর জন্য, এবং বালকের বার্ধক্যের আগেই সংঘটিত হবে সেই একই السّاعة। এই ধারাবাহিকতায় মহাকিয়ামতই স্বাভাবিক অর্থ। “তোমাদের মৃত্যু” ব্যাখ্যাটি সব বর্ণনার মূল বাক্যে নেই; এটি এমন একটি ভিন্ন বর্ণনা ও পরবর্তী ব্যাখ্যার ওপর নির্ভর করে যেখানে عليكم ساعتكم—“তোমাদের কিয়ামত”—অতিরিক্ত শব্দ রয়েছে। অর্থাৎ unrestricted حتى تقوم الساعة বর্ণনাকে restricted تقوم عليكم ساعتكم বর্ণনা দিয়ে পুনর্ব্যাখ্যা করা হচ্ছে।


হিশামের বক্তব্য সম্পর্কে

এই হাদিসটির আরেকটি ভার্শন আসুন লক্ষ্য করি [35]

সহীহ বুখারী (ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
৬৮/ কোমল হওয়া
পরিচ্ছেদঃ ২৭২৩. মৃত্যুযন্ত্রনা
ইসলামিক ফাউন্ডেশন নাম্বারঃ ৬০৬৭, আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ৬৫১১
৬০৬৭। সাদাকা (রহঃ) … আয়িশা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেনঃ কিছু সংখ্যক কঠিন মেজাজের গ্রাম্য লোক নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিকট এসে জিজ্ঞাসা করতো কিয়ামত কবে হবে? তখন তিনি তাদের সর্ব-কনিষ্ঠ ব্যক্তির দিকে তাকিয়ে বলতেনঃ যদি এ ব্যাক্তি কিছু দিন বেঁচে থাকে তবে তার বুড়ো হওয়ার আগেই তোমাদের কিয়ামত এসে যাবে। হিশাম বলেন যে, এ কিয়ামতের অর্থ হলো, তাদের মৃত্যু।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আয়িশা বিনত আবূ বাকর সিদ্দীক (রাঃ)

একই বর্ণনার আরেকটি রূপ আদ-দুররুল মানসূর-এ সংরক্ষিত আছে। সেখানে বেদুইনরা মুহাম্মদকে সরাসরি কিয়ামত সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলে তিনি তাদের মধ্যকার সর্বকনিষ্ঠ ব্যক্তির দিকে তাকিয়ে তার জীবনকালকে সময়ের মাপকাঠি হিসেবে ব্যবহার করেন। এই বর্ণনার মূল আরবি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ মুহাম্মদের বক্তব্যে রয়েছে قامت عليكم ساعتكم—“তোমাদের ওপর তোমাদের সা‘আহ সংঘটিত হবে”; মূল বাক্যে কোথাও মৃত্যু শব্দটি নেই। [36]

وَأخرج ابْن مرْدَوَيْه عَن عَائِشَة قَالَت: كَانَت الْأَعْرَاب إِذا قدمُوا على النَّبِي صلى الله عَلَيْهِ وَسلم سَأَلُوهُ عَن السَّاعَة فَينْظر إِلَى أحدث إِنْسَان فيهم فَيَقُول: إِن يَعش هَذَا قرنا قَامَت عَلَيْكُم سَاعَتكُمْ

ইবনে মারদুওয়াইহ আয়িশা থেকে বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন: বেদুইনরা যখন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট আসত, তখন তারা তাঁকে কিয়ামত সম্পর্কে জিজ্ঞেস করত। তিনি তাদের মধ্যে সর্বকনিষ্ঠ ব্যক্তির দিকে তাকিয়ে বলতেন: “যদি এই ব্যক্তি দীর্ঘজীবী হয় বা এক শতাব্দীকাল বেঁচে থাকে, তবে তোমাদের ওপর তোমাদের কিয়ামত (মৃত্যু) আপতিত হবে।”

এখানে আরবি মূল এবং বাংলা ব্যাখ্যার পার্থক্যটি সরাসরি দৃশ্যমান। আরবি বাক্যে আছে سَاعَتكُمْ—“তোমাদের সা‘আহ”; কিন্তু বাংলা অনুবাদে তার পরে বন্ধনীর মধ্যে “মৃত্যু” যোগ করা হয়েছে। অর্থাৎ “মৃত্যু” মূল আরবি বাক্যের কোনো শব্দের অনুবাদ নয়; এটি শব্দটির একটি ব্যাখ্যা। এই পার্থক্যটি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ পরবর্তী বিতর্কের মূল প্রশ্নই হলো—ساعتكم দ্বারা বক্তা নিজে মৃত্যু বুঝিয়েছিলেন, নাকি পরবর্তী বর্ণনাকারী ও ব্যাখ্যাকারীরা এই অর্থ নির্ধারণ করেছেন।

এখানে বর্ণনার স্তরগুলো আলাদা করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আয়িশার বর্ণনায় মুহাম্মদের বক্তব্য হলো تقوم عليكم ساعتكم—“তোমাদের কিয়ামত এসে যাবে”; কিন্তু “এর অর্থ তাদের মৃত্যু” কথাটি মুহাম্মদের বক্তব্য নয়। এটি হিশাম ইবনে উরওয়ার ব্যাখ্যামূলক মন্তব্য—يعني موتهم। হিশামের জন্ম ৬১ হিজরিতে, মুহাম্মদের মৃত্যুর প্রায় অর্ধশতাব্দী পরে। অর্থাৎ “কিয়ামত = তাদের মৃত্যু” সমীকরণটি এখানে মূল বক্তার ব্যাখ্যা নয়; পরবর্তী বর্ণনাকারীর ব্যাখ্যা। আরও গুরুত্বপূর্ণ, আনাসের বর্ণনায় عليكم বা ساعتكم নেই; সেখানে সরাসরি حتى تقوم الساعة। পরবর্তী ব্যাখ্যাকারীরা আয়িশার সীমাবদ্ধ শব্দযুক্ত বর্ণনাকে ব্যবহার করে আনাসের অসীমিত বর্ণনার অর্থও “তাদের মৃত্যু” করেছেন। IslamQA-র আলোচনাতেও ঠিক এই পদ্ধতিই ব্যবহৃত হয়েছে। [37]


ব্যর্থ ভবিষ্যদ্বাণীর পর অর্থ বদল ও এড হক উদ্ধার

নবীর প্রশ্নোত্তরে কিয়ামত নাকি প্রজন্মের মৃত্যু

ইসলামি বর্ণনাগুলতে “কিয়ামত/আস-সা‘আহ (ٱلسَّاعَةُ)”–কে প্রায়ই কোনো নিকট ভবিষ্যৎ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে, অনির্দিষ্ট ভবিষ্যৎ হিসেবে নয়। এসব টেক্সটে নবীর যুগের মানুষের অভিজ্ঞতার সঙ্গে সময়গতভাবে ঘনিষ্ঠ এক আসন্ন বাস্তবতা হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। এর সবচেয়ে পরিচিত দৃষ্টান্ত হলো নবীর উক্তি— “আমাকে এবং কিয়ামতকে একসাথে পাঠানো হয়েছে—এই দুই আঙুলের মতো”, এবং তিনি তর্জনী ও মধ্যমা আঙুল পাশাপাশি করে দেখান। এই বক্তব্যে “উপমা” আছে ঠিকই, কিন্তু উপমাটির কেন্দ্রীয় কাজ হলো সময়-দূরত্বকে দৃশ্যমানভাবে সংকুচিত করা: দুই আঙুলের ফাঁক খুব সামান্য—এটা শ্রোতার চোখে “নিকটতা”কে জোরালোভাবে ইঙ্গিত করে। তাই হাদিসটি পর্যালোচনায় এটিকে কেবল নৈতিক সতর্কবার্তা নয়, বরং সময়ের ঘনিষ্ঠতার সংকেত বলেই বোঝা যায়।

এই নিকটতার ভাষা আরও তীব্র হয়ে ওঠে সেই বর্ণনায়, যেখানে কিছু প্রশ্নকারী (কিছু রেওয়ায়েতে বেদুইন) জিজ্ঞেস করে—“কিয়ামত কবে হবে?” উত্তরে নবী একটি বালকের দিকে ইঙ্গিত করে বলেন: “এই বালক যদি বেঁচে থাকে, তবে বার্ধক্যে পৌঁছানোর আগেই কিয়ামত সংঘটিত হয়ে যাবে।” এখানে লক্ষ্য করুন, প্রশ্নটি কোনো ব্যক্তিগত মৃত্যু, কারও শেষ সময়, বা “আমাদের প্রজন্ম কবে শেষ হবে”—এই জাতীয় কিছু নয়; প্রশ্নটি সরাসরি কিয়ামতের সময় নিয়েই। আর উত্তরটি দেওয়া হচ্ছে একটি মানবজীবনের স্বাভাবিক টাইমলাইনের ভেতরে—“বার্ধক্যের আগে”—অর্থাৎ কয়েক দশকের স্কেলে। ভাষাগতভাবে এটি খুব সরল: “ঘটনা X ঘটবে—সময়সীমা Y–এর ভেতরে।”

এখান থেকেই মূল দ্বন্দ্ব শুরুঃ প্রশ্নকারী কিয়ামত সম্পর্কে জানতে চাইছে, উত্তরদাতা কি সত্যিই কিয়ামত বোঝাচ্ছেন—না কি অন্য কিছু? পরবর্তীকালের হাদিসের ব্যাখ্যাগুলোতে প্রায়ই বলা হয়, এখানে “কিয়ামত” বলতে “ছোট কিয়ামত”—অর্থাৎ ব্যক্তিগত মৃত্যু বা সে প্রজন্মের বিলুপ্তি বোঝানো হয়েছে। এই ব্যাখ্যার পেছনে ক্লাসিক্যাল শরাহরও একটি লাইন আছে: ইমাম নববীর শরহ মুসলিম–এ বিভিন্ন রেওয়ায়েত (“তোমাদের ঘন্টা/সা‘আহ” ইত্যাদি) একত্র করে বলা হয়, “তোমাদের সা‘আহ” বলতে উদ্দেশ্য তাদের মৃত্যু, অর্থাৎ সে যুগ/সে শ্রোতাগোষ্ঠীর শেষ হওয়া—এটা কিয়ামতের বৃহৎ অর্থ নয়। কিন্তু এই “লোকাল কিয়ামত/ব্যক্তিগত মৃত্যু” ব্যাখ্যা টিকিয়ে রাখতে গেলে কয়েকটি কঠিন প্রশ্ন এড়ানো যায় না:

(১) প্রশ্ন-উত্তরের বাস্তববাদিতা (Pragmatics)
মানুষ “কিয়ামত কবে?” জিজ্ঞেস করলে স্বাভাবিকভাবে সে মহাপ্রলয় বা মহাকিয়ামতই বুঝিয়ে জিজ্ঞেস করছে—এটাই সেই সময়ের মানুষের মনস্তত্ত্ব এবং কোরআন-হাদিসের প্রচলিত ভাষা। কুরআনে ٱلسَّاعَةُ (আস-সা‘আহ) শব্দটি বারবার পুনরুত্থান/কবর থেকে ওঠা/বিচার–এর সঙ্গে যুক্ত হয়ে এসেছে—যেমন, “ঘন্টা আসবেই… এবং আল্লাহ কবরগুলোতে যারা আছে তাদের উঠাবেন”—এটা ব্যক্তিগত মৃত্যুর প্রতিশব্দ নয়; বরং মৃত্যুর পরের মহাবিচারের ইঙ্গিত।

এখানে লক্ষ্যণীয়—বেদুইনরা নবীকে কী প্রশ্ন করেছিল, আর মুহাম্মদ কী উত্তর দিয়েছিল। বেদুইনদের যদি জানার ইচ্ছা থাকতো “আমাদের সকলের মৃত্যু কবে হবে”, এবং নবী যদি সেই প্রশ্নের পরিপ্রেক্ষিতে উত্তর দিতেন যে, “ঐ শিশুটির বার্ধক্যে পৌঁছাবার আগেই তোমাদের মৃত্যু হবে”—তাহলে এটি কোনো বোধগম্য বা অর্থবহ ঐতিহাসিক ঘটনা হিসেবে দাঁড়ায় না। কারণ তখনকার যুগে হোক বা যেকোনো যুগেই হোক, এটুকু সবাই জানে—মানুষ মরবেই, এবং অনেকেই এক প্রজন্মের মধ্যেই মারা যাবে। এই ধরনের “তথ্য” জানার জন্য কেউ নবীর কাছে প্রশ্ন করতে আসবে না, এটি যেকোনো মানুষেরই জানা কথা। নবীকে এই প্রশ্ন করার অর্থই ছিল মহাপ্রলয়/মহাকিয়ামত কবে হবে—আসলে বেদুইনদের প্রশ্ন সেটাই ছিল, এবং উত্তরও মুহাম্মদ দিয়েছিল সেই প্রশ্নের ভিত্তিতেই।
আর যদি কেউ দাবী করে—বেদুইনরা মহাপ্রলয় কবে হবে সেটাই জিজ্ঞেস করেছিল, কিন্তু নবী তাদের “মৃত্যু কবে হবে” সেটা বোঝাতে উত্তর দিয়েছিল—তাহলে নবীকে প্রশ্ন এড়িয়ে বিভ্রান্তিকর উত্তরদাতা হিসেবে দেখাতে হয়, মিথ্যাবাদী বা প্রতারণামূলক বক্তব্য দেয়ার অভিযোগেও অভিযুক্ত করা যায়। কারণ সে ক্ষেত্রে নবীর স্পষ্ট করে বলা উচিত ছিল: “মহাপ্রলয় কবে হবে—আমি জানি না।”
(২) “বার্ধক্যের আগে”—এই টাইমফ্রেমের দাগ
যদি উদ্দেশ্য হয় “তোমাদের মৃত্যু কাছেই”—তাহলে সেটি একটি সাধারণ সত্য (মানুষ মরে), কিন্তু “এই বালক বৃদ্ধ হওয়ার আগে”–এর মতো কংক্রিট টাইম-মাপকাঠি যোগ করা বক্তব্যকে ভবিষ্যদ্বাণীমূলক করে তোলে। তাছাড়া, “তোমরা তো মরবেই” ধরনের উত্তর প্রশ্নকারীকে তথ্য দেয় না—বরং প্রশ্নের গুরুত্বকে পাশ কাটিয়ে যায়। পরবর্তীকালের ব্যাখ্যাগুলো তাই প্রায়ই রিডাইরেকশন থিওরি নেয়: নবী নাকি শেখাতে চেয়েছেন “কিয়ামতের সময় জানার দরকার নেই; নিজের শেষের জন্য প্রস্তুত হও।” এই নৈতিক পাঠ সম্ভব হলেও, সমস্যা হলো—এই পাঠ দাঁড় করাতে গিয়ে মূল বাক্যের স্বাভাবিক অর্থ (কিয়ামত বনাম মৃত্যু) পুনঃসংজ্ঞায়িত করতে হয়।
(৩) ব্যাখ্যার সময়-রাজনীতি (After-the-fact pressure)
“কিয়ামত নিকটবর্তী” ধরনের বাক্য কুরআনেও আছে—“ঘন্টা নিকটবর্তী হয়েছে”—এ জাতীয় ভাষা একটি সাময়িক প্রত্যাশা তৈরি করে, বিশেষত যখন সেটি নবীর যুগের শ্রোতাদের কাছেই উচ্চারিত। যখন শতাব্দী পেরিয়ে যায় এবং “মহাকিয়ামত” ঘটে না, তখন একই বাক্যগুলোর ওপর ব্যাখ্যামূলক চাপ পড়ে—এটা ঐতিহাসিকভাবে স্বাভাবিক। ফলে একটি প্রবণতা তৈরি হয়: প্রথমে যে শব্দটি মহাকিয়ামত বোঝাতে ব্যবহৃত হচ্ছিল, পরে তাকে “ব্যক্তিগত মৃত্যু/প্রজন্মের শেষ” হিসেবে পাঠ করা। শরাহ-গ্রন্থে এই পথটি দেখা যায়—কিন্তু যুক্তিবাদের দৃষ্টিতে প্রশ্ন থাকে: এটি কি শুরু থেকেই বক্তার উদ্দেশ্য ছিল, নাকি ব্যর্থ সময়-প্রত্যাশার পরে অর্থকে নিরাপদ করার এক ধরনের “ড্যামেজ-কন্ট্রোল”?

সারকথা, এখানে সমস্যাটি শুধু “শব্দের বহুঅর্থ” নয়; সমস্যা হলো একই শব্দ (ٱلسَّاعَةُ) কোরআনি ব্যবহারে যে মহাবিচার-সংকেত বহন করে, হাদিসের প্রশ্নোত্তরে সেটিকে যদি “ব্যক্তিগত মৃত্যু” বানানো হয়—তাহলে সেটি পাঠকের কাছে স্বাভাবিকভাবে পলায়নধর্মী পুনঃপাঠ (escape-reading) মনে হবে। আর যদি স্বাভাবিক পাঠ বজায় রাখা হয়, তাহলে “এই বালক বৃদ্ধ হওয়ার আগেই কিয়ামত”—জাতীয় বক্তব্যগুলো ঐতিহাসিক বাস্তবতার সাথে সরাসরি সংঘর্ষে পড়ে। এই দ্বিধাটাই এই অংশের মূল: ভবিষ্যদ্বাণী হিসেবে নিলে সমস্যা, আর রূপক/লোকাল-মৃত্যু হিসেবে নিলে ভাষা ও প্রশ্নের সাথে অস্বস্তিকর অসামঞ্জস্য।

ভাষাগত গঠন (Linguistic structure), আরবী ব্যাকরণ (Grammar) এবং ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট—সবদিক থেকেই এই হাদিসে ‘আস-সায়াহ’ বলতে মহাপ্রলয় বা জগত ধ্বংসের চূড়ান্ত সময়কে নির্দেশ করা হয়েছে। সাহাবীরা এবং তৎকালীন বিরোধীরাও এই শব্দ থেকে এটিই বুঝেছিলেন, যার কারণে এটি একটি বহুল আলোচিত ও বিতর্কিত বিষয়ে পরিণত হয়েছিল। এই ধরনের rescue-reading ভবিষ্যদ্বাণীমূলক দাবিকে কার্যত অপরীক্ষণীয় (unfalsifiable) করে তোলে—কারণ কোনো সময়ই ভুল প্রমাণ করা যাবে না; ব্যর্থ হলে অর্থ বদলে দেওয়া হবে।


সাহাবীদের মধ্যেও কিয়ামত ভীতি

কোরআনের “হিসাব নিকটবর্তী” ঘোষণাকে মুহাম্মদের একজন সাহাবী কতটা সরাসরি সময়ঘনিষ্ঠ অর্থে গ্রহণ করেছিলেন, তার একটি গুরুত্বপূর্ণ বর্ণনা তাফসীর আল-কুরতুবীতে সংরক্ষিত আছে। সূরা আল-আম্বিয়ার প্রথম আয়াত—“মানুষের হিসাব-নিকাশের সময় নিকটবর্তী হয়েছে”—নাযিল হওয়ার সংবাদ শুনে এক সাহাবী নিজের নির্মাণকাজ বন্ধ করে দেন এবং শপথ করে বলেন, হিসাব যখন নিকটবর্তী হয়ে গেছে, তখন তিনি আর কখনো দেয়াল নির্মাণ করবেন না। [38]

وَرُوِيَ أَنَّ رَجُلًا مِنْ أَصْحَابِ رَسُولِ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم كان يَبْنِي جِدَارًا فَمَرَّ بِهِ آخَرُ فِي يَوْمِ نُزُولِ هَذِهِ السُّورَةِ، فَقَالَ الَّذِي كَانَ يَبْنِي الْجِدَارَ: مَاذَا نَزَلَ الْيَوْمَ مِنَ الْقُرْآنِ؟ فَقَالَ الْآخَرُ: نَزَلَ “اقْتَرَبَ لِلنَّاسِ حِسابُهُمْ وَهُمْ فِي غَفْلَةٍ مُعْرِضُونَ” فَنَفَضَ يَدَهُ مِنَ الْبُنْيَانِ، وَقَالَ: وَاللَّهِ لَا بَنَيْتُ أَبَدًا وَقَدِ اقْتَرَبَ الْحِسَابُ. “اقْتَرَبَ” أي قرب الوقت.

বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাহাবীদের মধ্যে এক ব্যক্তি একটি দেয়াল নির্মাণ করছিলেন। এই সূরাটি নাযিল হওয়ার দিন অপর এক ব্যক্তি তার পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন। দেয়াল নির্মাণকারী ব্যক্তি জিজ্ঞেস করলেন: “আজ কুরআনের কী নাযিল হয়েছে?” অপরজন বললেন: “মানুষের হিসাব-নিকাশের সময় নিকটবর্তী হয়েছে, অথচ তারা উদাসীনতায় বিমুখ হয়ে আছে”—এই আয়াত নাযিল হয়েছে। তখন তিনি নির্মাণের কাজ থেকে হাত ঝেড়ে ফেললেন এবং বললেন: “আল্লাহর কসম, হিসাব যখন নিকটবর্তী হয়ে গেছে, তখন আমি আর কখনোই দেয়াল নির্মাণ করব না।” ‘ইকতারাবা’ অর্থ—সময় নিকটবর্তী হওয়া।

এই প্রতিক্রিয়াটি বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। “হিসাব নিকটবর্তী” কথাটি এখানে এমন কোনো অসীম দীর্ঘ মহাজাগতিক সময়ের অলংকার হিসেবে নেওয়া হয়নি। সাহাবীটি এর অর্থ এতটাই নিকটবর্তী বলে বুঝেছিলেন যে ভবিষ্যতের জন্য একটি স্থায়ী দেয়াল নির্মাণকেও অর্থহীন মনে করে কাজ বন্ধ করে দেন। কুরতুবীও “اقْتَرَبَ” শব্দটির ব্যাখ্যায় সরাসরি লিখেছেন—“أي قرب الوقت”, অর্থাৎ “সময় নিকটবর্তী হয়েছে।” ফলে প্রাথমিক কিয়ামত-বয়ানের নৈকট্য শুধু শব্দের অলংকার ছিল না; অন্তত এই বর্ণনায় তা মানুষের বাস্তব জীবন-পরিকল্পনা বদলে দেওয়ার মতো সময়ঘনিষ্ঠ প্রত্যাশা তৈরি করেছিল।


একশ বছর পূর্ণ হলেই কিয়ামত—সাহাবীদের এমন বোঝাপড়াও ছিল

কিয়ামতের নৈকট্যকে মুহাম্মদের সমসাময়িকরা বাস্তব সময়সীমার মধ্যে বুঝছিলেন—এর আরও সরাসরি সাক্ষ্য তাফসীর আল-কুরতুবীতে পাওয়া যায়। মুহাম্মদ জীবনের শেষদিকে বলেন, সেই রাতে পৃথিবীতে যারা জীবিত আছে, একশ বছর পরে তাদের কেউ আর জীবিত থাকবে না। ইবন উমরের বক্তব্য উদ্ধৃত করে কুরতুবী জানান, এই কথা শুনে লোকেরা বিভ্রান্ত হয়েছিল। সংশ্লিষ্ট টীকায় বিষয়টি আরও পরিষ্কার করে বলা হয়েছে—সাহাবীরা মুহাম্মদের বক্তব্যের অর্থ বুঝতে ভুল করেছিলেন এবং তাঁদের কেউ কেউ বলতেন, একশ বছর পূর্ণ হলে কিয়ামত সংঘটিত হবে। পরে ইবন উমর ব্যাখ্যা দেন যে মুহাম্মদের উদ্দেশ্য ছিল সেই প্রজন্মের বিলুপ্তি। [39]

قَالَ ابْنُ عُمَرَ: فَوَهَلَ النَّاسُ فِي مَقَالَةِ رَسُولِ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم تِلْكَ فِيمَا يَتَحَدَّثُونَ مِنْ هَذِهِ الأحاديث عن مائة سنة، وإنما قال رسول الله عليه الصلاة والسلام: «لَا يَبْقَى مِمَّنْ هُوَ الْيَوْمَ عَلَى ظَهْرِ الْأَرْضِ أَحَدٌ» يُرِيدُ بِذَلِكَ أَنْ يَنْخَرِمَ ذَلِكَ الْقَرْنُ.

وَهَلَ إِلَى الشَّيْءِ كَضَرَبَ أَيْ غَلِطَ وَذَهَبَ وَهْمُهُ إِلَى خِلَافِ الصَّوَابِ، وَالْمَعْنَى أَنَّ الصَّحَابَةَ رضى الله عنهم غَلِطُوا وَذَهَبَ وَهْمُهُمْ إِلَى خِلَافِ الصَّوَابِ فِي تَأْوِيلِ مَقَالَةِ النَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم، فَكَانَ بَعْضُهُمْ يَقُولُ: تَقُومُ السَّاعَةُ عِنْدَ انْقِضَاءِ مِائَةِ سَنَةٍ، فَبَيَّنَ ابْنُ عُمَرَ مُرَادَ النَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم بِقَوْلِهِ: يُرِيدُ بِذَلِكَ أَنْ يَنْخَرِمَ ذَلِكَ الْقَرْنُ.

ইবন উমর বলেন: রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সেই বক্তব্য এবং একশ বছর সম্পর্কিত হাদিসগুলো নিয়ে মানুষ বিভ্রান্ত হয়ে পড়েছিল। অথচ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছিলেন: “আজ পৃথিবীর উপর যারা আছে, তাদের মধ্য থেকে কেউ অবশিষ্ট থাকবে না।” এর দ্বারা তিনি সেই প্রজন্মের সমাপ্তি বুঝিয়েছিলেন।

এখানে “ওয়াহালা” অর্থ ভুল করা এবং সঠিক অর্থের বিপরীত ধারণায় চলে যাওয়া। অর্থাৎ সাহাবীরা নবীর বক্তব্যের ব্যাখ্যায় ভুল করেছিলেন এবং তাঁদের ধারণা সঠিক অর্থের বিপরীতে চলে গিয়েছিল। তাঁদের কেউ কেউ বলতেন: “একশ বছর পূর্ণ হলে কিয়ামত সংঘটিত হবে।” এরপর ইবন উমর নবীর উদ্দেশ্য ব্যাখ্যা করে বলেন: “এর দ্বারা তিনি সেই প্রজন্মের সমাপ্তি বুঝিয়েছিলেন।”

এই বর্ণনাটি কিয়ামতের সময়গত নৈকট্য নিয়ে প্রাথমিক মুসলিমদের বোঝাপড়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষ্য। এখানে পরবর্তী কোনো সমালোচক সাহাবীদের ওপর “আক্ষরিক পাঠ” চাপিয়ে দিচ্ছেন না; ইসলামি তাফসীরের নিজস্ব পাঠই বলছে, সাহাবীদের একাংশ একশ বছরের সময়সীমাকে সরাসরি কিয়ামতের সময়সীমা হিসেবে বুঝেছিলেন। এরপর সেই প্রত্যাশা সংশোধন করে বলা হচ্ছে—আসলে কিয়ামত নয়, ঐ প্রজন্মের বিলুপ্তি বোঝানো হয়েছিল। ফলে “প্রজন্মের সমাপ্তি” ব্যাখ্যাটি এখানে প্রাথমিক বোঝাপড়া নয়; বরং পূর্ববর্তী সময়গত বোঝাপড়াকে সংশোধনকারী ব্যাখ্যা হিসেবেই উপস্থিত।

কিয়ামতকে মুহাম্মদের যুগে কতটা নিকটবর্তী ঘটনা হিসেবে কল্পনা করা হচ্ছিল, তা কয়েকটি পৃথক বর্ণনা একসঙ্গে রাখলেই স্পষ্ট হয়। সূর্যগ্রহণ দেখে মুহাম্মদ নিজে কিয়ামত শুরু হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা করেছেন; দাজ্জালের আলোচনা শুনে সাহাবীরা তাকে পাশের বাগানে উপস্থিত মনে করেছে; মুহাম্মদ বলেছেন, তিনি জীবিত থাকতেই দাজ্জাল বের হলে নিজে তাকে মোকাবিলা করবেন; আর আবু উবাইদার বর্ণনায় বলেছেন, তাঁকে দেখেছে বা তাঁর কথা শুনেছে—এমন কেউ হয়তো দাজ্জালকে প্রত্যক্ষ করবে। এই একই সময়ঘনিষ্ঠ বোঝাপড়ার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষ্য ইবন হাজর আল-আসকালানীর ফাতহুল বারী-তে সংরক্ষিত আছে। তিনি স্পষ্টভাবে লিখেছেন, সেই যুগের একদল মানুষ মুহাম্মদের একশ বছরের বক্তব্যকে এমনভাবে বুঝেছিল যে একশ বছর পরেই দুনিয়ার অবসান ঘটবে।

[40]

وَهَذَا نَظِيرُ قَوْلِهِ صلى الله عليه وسلم فِي الْحَدِيثِ الَّذِي تَقَدَّمَ بَيَانُهُ فِي الْعِلْمِ أَنَّهُ قَالَ لِأَصْحَابِهِ فِي آخِرِ عُمْرِهِ: «أَرَأَيْتُكُمْ لَيْلَتَكُمْ هَذِهِ، فَإِنَّ عَلَى رَأْسِ مِائَةِ سَنَةٍ مِنْهَا لَا يَبْقَى عَلَى وَجْهِ الْأَرْضِ مِمَّنْ هُوَ الْيَوْمَ عَلَيْهَا أَحَدٌ». وَكَانَ جَمَاعَةٌ مِنْ أَهْلِ ذَلِكَ الْعَصْرِ يَظُنُّونَ أَنَّ الْمُرَادَ أَنَّ الدُّنْيَا تَنْقَضِي بَعْدَ مِائَةِ سَنَةٍ، فَلِذَلِكَ قَالَ الصَّحَابِيُّ: «فَوَهِلَ النَّاسُ فِيمَا يَتَحَدَّثُونَ مِنْ مِائَةِ سَنَةٍ»، وَإِنَّمَا أَرَادَ صلى الله عليه وسلم بِذَلِكَ انْخِرَامَ قَرْنِهِ، أَشَارَ إِلَى ذَلِكَ عِيَاضٌ مُخْتَصَرًا. قُلْتُ: وَوَقَعَ فِي الْخَارِجِ كَذَلِكَ، فَلَمْ يَبْقَ مِمَّنْ كَانَ مَوْجُودًا عِنْدَ مَقَالَتِهِ تِلْكَ عِنْدَ اسْتِكْمَالِ مِائَةِ سَنَةٍ مِنْ سَنَةِ مَوْتِهِ أَحَدٌ، وَكَانَ آخِرُ مَنْ رَأَى النَّبِيَّ صلى الله عليه وسلم مَوْتًا أَبُو الطُّفَيْلِ عَامِرُ بْنُ وَاثِلَةَ كَمَا ثَبَتَ فِي صَحِيحِ مُسْلِمٍ.

ইবন হাজর লিখেছেন: এটি সেই হাদিসের অনুরূপ, যার ব্যাখ্যা পূর্বে কিতাবুল ইলমে এসেছে। জীবনের শেষদিকে নবী তাঁর সাহাবীদের বলেছিলেন: “আজকের এই রাতটি সম্পর্কে তোমরা কী মনে কর? আজ থেকে একশ বছর পূর্ণ হলে বর্তমানে পৃথিবীর ওপর যারা আছে, তাদের কেউ আর অবশিষ্ট থাকবে না।” সেই যুগের একদল মানুষ মনে করত, এর অর্থ হলো একশ বছর পরে দুনিয়ার অবসান ঘটবে। এ কারণেই সাহাবী বলেছিলেন, “একশ বছর সম্পর্কে মানুষ ভুল ধারণায় পড়েছিল।” অথচ এর দ্বারা নবী তাঁর প্রজন্মের সমাপ্তি বুঝিয়েছিলেন—কাজী ইয়াদ সংক্ষেপে এ দিকেই ইঙ্গিত করেছেন। ইবন হাজর এরপর বলেন, বাস্তবেও সেই প্রজন্মের সবাই একশ বছর পূর্ণ হওয়ার মধ্যে মারা যায়; নবীকে দেখেছেন এমন সর্বশেষ ব্যক্তি ছিলেন আবু তুফাইল আমির ইবন ওয়াসিলা।

ইবন হাজরের এই বক্তব্যের ঐতিহাসিক গুরুত্ব সরাসরি। “একশ বছর পরে দুনিয়া শেষ হবে”—এই বোঝাপড়া আধুনিক সমালোচকের তৈরি নয়; তাঁর নিজের ভাষায় “সেই যুগের একদল মানুষ” এমনটাই মনে করেছিল। পরে সেই বোঝাপড়াকে সংশোধন করে বক্তব্যটির অর্থ “দুনিয়ার সমাপ্তি” থেকে “সেই প্রজন্মের সমাপ্তি” করা হয়। ফলে কিয়ামতের সময়ঘনিষ্ঠ পাঠ এবং পরবর্তী অর্থ-সংকোচন—দুটোর সাক্ষ্যই ইসলামি ব্যাখ্যা-ঐতিহ্যের ভেতর থেকে পাওয়া যাচ্ছে।


রূপকের মানসিক কসরত ও এড হক ফ্যালাসি

এখানে যুক্তিগত সমস্যাটি হলো এড হক উদ্ধার—একটি দাবি বাস্তবতার সঙ্গে না মিললে পরে এমন নতুন অর্থ বা শর্ত যোগ করা, যা মূল ব্যর্থতাকে অদৃশ্য করে দেয়। প্রথম বর্ণনায় প্রশ্ন “কিয়ামত কখন?”, উত্তরেও “কিয়ামত”, এবং সময়সীমা “এই বালক বৃদ্ধ হওয়ার আগে”। সেই সময়সীমায় মহাকিয়ামত না ঘটার পরে “কিয়ামত”কে ব্যক্তিগত মৃত্যু বা প্রজন্মের মৃত্যু বানালে দাবিটি আর আগের দাবি থাকে না। একটি ভবিষ্যদ্বাণীর পরীক্ষার ফল প্রকাশিত হওয়ার পরে তার শব্দের অর্থ বদলে দেওয়া হলে সেটিকে আর ভবিষ্যৎজ্ঞান বলা যায় না; সেটি ফলাফল দেখে পুরোনো বক্তব্যকে নতুন অর্থে সাজানো।

এড হক ফ্যালাসি কীভাবে কাজ করে:

অতিরিক্ত ব্যাখ্যা: যখন কোনো তত্ত্ব বা ধারণার পক্ষে যথেষ্ট প্রমাণ থাকে না, তখন সেটিকে বাঁচাতে ‘বিশেষ’ বা ‘অতিরিক্ত’ কিছু শর্ত যোগ করা হয়, বা শব্দগুলোর কিছু নতুন ব্যাখ্যা সৃষ্টি করা হয়, যার উদ্দেশ্য থাকে যেভাবেই হোক শুরুর দাবীটিকে রক্ষা করা।

উদাহরণঃ ধরুন আমি বললাম, আগামী বছর বন্যায় পুরো পৃথিবী ডুবে যাবে। কিন্তু দেখা গেল, সেই বছর পুরো পৃথিবী জুড়ে কোন বন্যা হলো না, শুধুমাত্র বাংলাদেশের নোয়াখালীতে বন্যা হলো। তখন আমি আমার ভবিষ্যতবাণীকে নতুনভাবে ব্যাখ্যা করলাম। বললাম, আমি আগে যেই ভবিষ্যতবাণী করেছিলাম, সেখানে আমি পুরো পৃথিবী বলতে পুরো পৃথিবী নয়, নোয়াখালীকে বুঝিয়েছিলাম। কারণ নোয়াখালী জেলার অনেক মানুষ আছে যারা নোয়াখালী জেলাটিকেই পুরো পৃথিবী মনে করে। আমি সেই মানুষদের সাপেক্ষে বলেছিলাম।

অর্থাৎ, আমি আমার ভবিষ্যতবাণীর অর্থ পরিবর্তন করলাম, পরবর্তী ঘটনার সাপেক্ষে। এটি হবে একটি ফ্যালাসি, যাকে বলা হয় এড হক ফ্যালাসি (Ad Hoc Fallacy)। মূল বিষয় হচ্ছে, এই ধরনের ভবিষ্যৎবাণী যদি সত্যিই “ঐশী জ্ঞান” থেকে আসে, তাহলে এত বড় টাইমলাইন ভুল হওয়ার কথা না, নতুন ব্যাখ্যা- শব্দের নতুন অর্থ তৈরি করে বিষয়টি শুদ্ধ করার মানসিক কসরত করতে হতো না। আর যদি ভুল হয়—তাহলে পরের প্রশ্ন আসে: ভবিষ্যৎবাণীকে “ঐশী প্রমাণ” হিসেবে কেন দেখানো হবে? আসুন বোঝার সুবিধার্থে এই টাইমলাইনটি দেখি,


টাইমলাইন ডায়াগ্রাম: নিকট-কিয়ামত পাঠ → না ঘটার পর → এড হক ব্যাখ্যা
নোট: এটি একটি বিশ্লেষণী মডেল—কোন যুগে কী ধরনের “পাঠ/প্রতিক্রিয়া/ব্যাখ্যা” তৈরি হতে পারে তা বোঝাতে। এই ডায়াগ্রামে আক্ষরিক সময়কাল বোঝানো হয়নি, অনুমানিক সময় ধরা হয়েছে।
প্রাথমিক বয়ান/প্রতিক্রিয়া সময় গড়ানো/ঘটনা সংকলন-যুগ পরে ব্যাখ্যা (এড হক)
পর্ব ১ ৬১০–৬৩২ খ্রি. / ১–১১ হিজরি
নবীর সময়: “কিয়ামত নিকট” আবহ + কিছু বয়ানে সময়-ইঙ্গিত
কিয়ামত নিকটবর্তী – এই বক্তব্য “প্রজন্ম/লাইফটাইম”–সদৃশ ইঙ্গিত—যা স্বাভাবিক পাঠে নিকট ভবিষ্যৎ প্রত্যাশা তৈরি করতে পারে। উপরে এই সম্পর্কিত রেফারেন্সগুলো দেয়া হয়েছে
পর্ব ২ ৬৩২–৭০০+ খ্রি. (সাহাবী → প্রাথমিক তাবেয়ী)
প্রাথমিক শ্রোতা: আক্ষরিক গ্রহণ/উৎকণ্ঠা (সম্ভাব্য)
কিছু ঐতিহ্যবর্ণনায় নবী ও তার সাহাবীদের মধ্যে কিয়ামত ঘটে যাওয়ার ভয়ের ইঙ্গিত পাওয়া যায়—যা দেখায়, সেই সময়ের মানুষের মধ্যে কিয়ামত ঘতে যাওয়ার আশংকা ছিল। নবী নিজেই কিয়ামতের আতঙ্কে আতঙ্কিত ছিলেন, এই না বুঝি হয়ে যায়।
পর্ব ৩ ৭০০–৮০০+ খ্রি. (তাবেয়ী → তাবেঈ-তাবেয়ীন)
সময় গড়ায়: প্রত্যাশিত “মহা-কিয়ামত” দৃশ্যমানভাবে ঘটে না
প্রজন্ম বদলায়, শতাব্দী পার হয়—কিন্তু “মহা-কিয়ামত” বাস্তবে সংঘটিত হয় না। ফলে পুরোনো বাক্যগুলোর অর্থ নিয়ে চাপ তৈরি হয়। কিন্তু নবীর কথাকে তো আর ভুল বলা যায় না, ভুল হলে তো ইমান থাকে না।
পর্ব ৪ ৮ম–৯ম শতক খ্রি. (সংকলন/ক্যানোনাইজেশন)
হাদিস সংকলন: ভিন্ন ভিন্ন ভ্যারিয়েন্ট একইসাথে “স্থির” হয়ে যায়
সনদ-ভিত্তিক সংগ্রহ, শ্রেণিবিন্যাস, মান্যতা—এসব শক্ত হয়। ফলে একই বক্তব্যের একাধিক রেওয়ায়েত পাশাপাশি টিকে যায়, ব্যাখ্যার মাঠও বড় হয়।
পর্ব ৫ ৯ম শতক → পরবর্তী ব্যাখ্যাকার যুগ
পরে ব্যাখ্যা: “কিয়ামত” → “মৃত্যু/ছোট কিয়ামত/প্রজন্মের শেষ”
না ঘটাকে সামাল দিতে “সা’আহ/আওয়ার/কিয়ামত” শব্দকে মৃত্যু বা প্রজন্ম-সমাপ্তি অর্থে পড়া হয়—এভাবে বক্তব্যকে পুনঃব্যাখ্যা করা হয়। নবীর বক্তব্য অভ্রান্ত প্রমাণ করতে শব্দের অর্থ ও ব্যাখ্যা বদলে যায়, এড হক হারমোনাইজেশন—শুরু হয়, যা আসলে পরবর্তী সংযোজন।
পর্ব ৬ ফলাফল: ব্যাখ্যা-নীতির স্থিরীকরণ
নীতিগত শিফট: “হাদিস মিথ্যা নয় → বোঝা ভুল → নতুন অর্থই উদ্দেশ্য”
এর ফলে ব্যাখ্যার একটি পুনরাবৃত্ত ধরন গড়ে ওঠে: সময়সীমা মেলেনি → শব্দের পরিসর ছোট করা হয় → ভিন্ন বর্ণনা দিয়ে মূল বর্ণনাকে সীমাবদ্ধ করা হয় → পরবর্তী ব্যাখ্যাকে বক্তার আসল উদ্দেশ্য হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা হয়। এভাবে ভবিষ্যদ্বাণীটি ইতিহাসের পরীক্ষায় ব্যর্থ হলেও ধর্মীয় কাঠামোর ভেতরে তাকে ভুল বলার পরিস্থিতি আর তৈরি হয় না। দাবিটি ভুল প্রমাণযোগ্যতা হারিয়ে ফেলে।

বিজ্ঞানের দৃষ্টিতে “কিয়ামত” বা মহাবিশ্বের ধ্বংস

বিজ্ঞান সাধারণত “কিয়ামত” শব্দটি ব্যবহার করে না; কিন্তু পৃথিবীমহাবিশ্ব—দুই স্তরেই “শেষ/ধ্বংস” বা সম্ভাব্য পরিণতি (end scenarios) নিয়ে বাস্তবসম্মত মডেল, পর্যবেক্ষণ-ভিত্তিক সীমা (constraints), এবং অনিশ্চয়তার পরিসরসহ ব্যাখ্যা দেয়। এখানে “একটা নির্দিষ্ট দিন-তারিখ” ঘোষণা নেই; আছে দীর্ঘ সময়-স্কেলে কী কী ঘটতে পারে—তার সম্ভাব্য ধারাবাহিকতা।

১) পৃথিবীর “শেষ” মানে আগে বাসযোগ্যতা হারানো: পৃথিবীর ক্ষেত্রে সবচেয়ে শক্ত ভিত্তির দীর্ঘমেয়াদি পূর্বাভাস সূর্যের ধীরে ধীরে উজ্জ্বল হওয়া। সূর্যের বিকিরণ শক্তি সময়ের সাথে বাড়তে থাকলে, পৃথিবীর জলবায়ু এমন দিকে যেতে পারে যেখানে গ্রিনহাউস প্রভাব চরমে ওঠা, মহাসাগরীয় জল বাষ্পীভবন বেড়ে যাওয়া, এবং দীর্ঘমেয়াদে পানির স্থায়ী ক্ষয় (যেমন, উপরের স্তরে জলীয়বাষ্প ভেঙে হাইড্রোজেন মহাশূন্যে পালিয়ে যাওয়া)—এ ধরনের প্রক্রিয়ায় জীবন টিকে থাকার শর্ত নষ্ট হতে পারে। কিছু মডেলিং ফলাফল অনুযায়ী, “লাল দানব” (red giant) পর্যায়ে যাওয়ার বহু আগেই পৃথিবী বাসযোগ্যতা হারাতে পারে; আনুমানিক সময়-স্কেল হিসেবে প্রায় ১–১.৫ বিলিয়ন বছর প্রায়ই আলোচিত হয়। [41]

২) সূর্যের বিবর্তনে পৃথিবীর ভাগ্য: এর পরের ধাপে সূর্য তার জীবচক্রে “লাল দানব” পর্যায়ে (red giant phase) প্রবেশ করবে—এ সময় সূর্যের আকার ও শক্তি-নিঃসরণ নাটকীয়ভাবে বদলাবে। NASA–র ব্যাখ্যায় সূর্যের এই পর্যায়ে পৌঁছানোকে সাধারণত প্রায় ৬ বিলিয়ন বছর পরের ঘটনা হিসেবে ধরা হয়। এই রূপান্তরের সময় পৃথিবী “গিলে ফেলা হবে কি না”—এ নিয়ে সূক্ষ্ম গতিবিদ্যাগত অনিশ্চয়তা থাকলেও, পৃথিবীর বর্তমান বাসযোগ্য অবস্থা যে টিকবে না—এটা প্রায় নিশ্চিত দিকেই ইঙ্গিত করে (তীব্র তাপ, বিকিরণ, বায়ুমণ্ডলীয় ভাঙন ইত্যাদি কারণে)। [42]

৩) মহাবিশ্বের “শেষ”: সবচেয়ে সম্ভাব্য—অন্তহীন প্রসারণ ও ‘মহাশীতল/তাপ-মৃত্যু’ (Big Freeze / heat death)। আধুনিক কসমোলজির মানক কাঠামোতে (ΛCDM) যদি অন্ধকার শক্তি (dark energy) সত্যিই প্রায় ধ্রুব “কসমোলজিক্যাল কনস্ট্যান্ট” (cosmological constant, Λ) ধরনের হয়, তবে মহাবিশ্ব দীর্ঘকাল ধরে প্রসারিত হতে পারে। তখন সময়ের সাথে পদার্থ-শক্তি আরও ছড়িয়ে পড়ে, গঠন (structure) তৈরি ও টিকিয়ে রাখার মতো “ফ্রি এনার্জি” কমতে থাকে—ফলে শেষ পরিণতি হিসেবে “মহাশীতল/তাপ-মৃত্যু” (heat death) ধরনের দৃশ্যপটকে বহু আলোচনায় সবচেয়ে সম্ভাব্য ধারার মধ্যে ধরা হয়। প্ল্যাঙ্ক (Planck) মিশনের চূড়ান্ত ফলাফলগুলো ΛCDM–এর সাথে শক্ত সামঞ্জস্য দেখায় এবং dark energy–র equation of state (w) ধ্রুবক Λ–এর কাছাকাছি (w≈−1) হওয়ার সাথে সঙ্গতিপূর্ণ। [43]

৪) তবে “শেষ” একটাই নয়—অন্ধকার শক্তি বদলালে ভাগ্যও বদলাতে পারে: সাম্প্রতিক DESI (Dark Energy Spectroscopic Instrument) ডেটা রিলিজগুলোর বিশ্লেষণে কিছু ক্ষেত্রে ইঙ্গিত এসেছে যে অন্ধকার শক্তি সময়ের সাথে পরিবর্তিত (time-evolving / dynamical) হতে পারে—অর্থাৎ w(z) স্থির নয়। DESI–র DR2 ফলাফল-সারাংশে “time-evolving dark energy”–র দিকে ইঙ্গিত আরও শক্ত হয়েছে—এমন বক্তব্যও আছে। [44] একই ধারার একটি Nature Astronomy গবেষণায় DR1+DR2 BAO, সুপারনোভা, এবং CMB prior মিলিয়ে w(z)–এর পরিবর্তনের দিকে ঝোঁক এবং কিছু ডেটাসেট-সমন্বয়ে ΛCDM–এর সাথে প্রায় ~3σ স্তরের টানাপোড়েনের কথাও উল্লেখ করা হয়েছে—যদিও সম্ভাব্য systematics এখনো পরীক্ষাাধীন এবং ভবিষ্যৎ ডেটা “decisive tests” দেবে বলে তারা স্পষ্ট করেছে। [45]

সার কথা: বিজ্ঞান “কিয়ামতের নির্দিষ্ট তারিখ” দেয় না। বরং (ক) পৃথিবীর ক্ষেত্রে—দীর্ঘ সময়ে বাসযোগ্যতা নষ্ট হওয়া, (খ) সূর্যের বিবর্তনে—গ্রহগুলোর পরিবেশগত ধ্বংস/রূপান্তর, এবং (গ) মহাবিশ্বের ক্ষেত্রে—dark energy/কসমোলজির প্রকৃতি অনুযায়ী একাধিক সম্ভাব্য শেষ (বিগ ফ্রিজ/বিগ ক্রাঞ্চ/বিগ রিপ ইত্যাদি)—এসবকে মডেল + পর্যবেক্ষণ + অনিশ্চয়তা দিয়ে ব্যাখ্যা করে। তাই এখানে “ভবিষ্যদ্বাণীমূলক নিশ্চিত ঘোষণা” নয়; আছে প্রমাণ-নির্ভর সম্ভাব্যতা ও সীমা নির্ধারণ। এই বৈজ্ঞানিক গবেষণাগুলোর কোনোটিই মহাবিশ্বের “চূড়ান্ত ধ্বংস” আগামী কয়েক বিলিয়ন বছরের মধ্যে ঘটবে—এমন কোনো আভাস দেয় না; বরং মানুষের সময়-স্কেলে (মানব ইতিহাস/সভ্যতার টাইমলাইন) এগুলো যে সময়-সংখ্যা দেখায়, তা কল্পনাতীতভাবে বহু-বড়।

বিজ্ঞানের দৃষ্টিতে “কিয়ামত/শেষ” — আনুমানিক টাইমলাইন
সময়গুলো আনুমানিক (approx.) এবং মডেল-নির্ভর। এখানে “পৃথিবীর বাসযোগ্যতা” → “সূর্যের বিবর্তন” → “মহাবিশ্বের সম্ভাব্য ভাগ্য” ধারাবাহিকভাবে দেখানো হয়েছে।
  1. এখন
    পৃথিবী এখনো বাসযোগ্য
    মানব-সভ্যতা-স্কেলে বিজ্ঞান “একটা নির্দিষ্ট শেষের তারিখ” দেয় না; দীর্ঘমেয়াদে জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক পরিবর্তনগুলোর কারণে কী হতে পারে তা সম্ভাব্যতা দিয়ে ব্যাখ্যা করে।
  2. ~ ১–১.৫ বিলিয়ন বছর পরে
    সূর্য ধীরে ধীরে বেশি উজ্জ্বল → পৃথিবীর বাসযোগ্যতা কমে
    সূর্যের আলো/তাপ বাড়ার সাথে সাথে জলবায়ুর দীর্ঘমেয়াদি ভারসাম্য বদলাতে পারে। ফলে পানির স্থায়ী ক্ষয়, মহাসাগরের বাষ্পীভবন, জলচক্র ভেঙে পড়া, এবং জীবনের জন্য প্রয়োজনীয় পরিবেশ নষ্ট হওয়ার সম্ভাবনা বাড়ে—অর্থাৎ “পৃথিবীর বাসযোগ্যতা” আগে কমতে পারে।
  3. ~ ৫–৭ বিলিয়ন বছর পরে
    সূর্য “লাল দানব” (Red Giant) পর্যায়ে
    সূর্যের অভ্যন্তরীণ বিবর্তনে এর আকার ও বিকিরণ বড়ভাবে বদলাবে। এই পর্যায়ে পৃথিবীর বর্তমান অবস্থায় টিকে থাকা অত্যন্ত অনিশ্চিত— অতিরিক্ত তাপ, বায়ুমণ্ডলীয় ক্ষয়, কক্ষপথের পরিবর্তন—সবই সম্ভাব্য।
  4. এর পরে: “কসমিক স্কেল”
    মহাবিশ্বের শেষ-পরিণতি: অন্ধকার শক্তি (Dark Energy) কেমন আচরণ করে তার ওপর নির্ভরশীল
    পৃথিবী/সূর্যের সময়রেখা তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল। কিন্তু “মহাবিশ্বের শেষ” (ultimate fate) বিষয়ে প্রধান অনিশ্চয়তা— অন্ধকার শক্তি ধ্রুব (constant) নাকি সময়ের সাথে পরিবর্তিত (dynamical)।
    সম্ভাব্য পথ–A: ধ্রুব (≈ constant)
    মহাশীতল/তাপ-মৃত্যু (Big Freeze / Heat Death): মহাবিশ্ব প্রসারিত হতে থাকে; নক্ষত্র-জ্বালানি শেষ; শক্তি ছড়িয়ে গিয়ে কাজ করার মতো “ফ্রি এনার্জি” কমে—ফলে দীর্ঘ সময় পরে গঠন/ক্রিয়া নিস্তেজ হয়।
    সময়: অত্যন্ত দীর্ঘ (trillions+ years scale), নির্দিষ্ট সংখ্যা নয়
    সম্ভাব্য পথ–B: পরিবর্তিত (dynamical)
    বিগ রিপ (Big Rip) বা বিগ ক্রাঞ্চ (Big Crunch)–এর মতো বিকল্প দৃশ্যপট তাত্ত্বিকভাবে আলোচনায় আসে—কিন্তু এগুলো ডেটা/মডেল-নির্ভর; নিশ্চিত সিদ্ধান্ত নয়।
    সময়: মডেল অনুযায়ী ব্যাপকভাবে বদলায়

উপসংহার

সব বর্ণনা একত্র করলে একটি ধারাবাহিক চিত্র তৈরি হয়। কোরআনে কিয়ামত “নিকটবর্তী”; মুহাম্মদ নিজেকে কিয়ামতের সঙ্গে পাশাপাশি দুই আঙুলে তুলনা করেন; সূর্যগ্রহণ দেখে কিয়ামত শুরু হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা করেন; দাজ্জালকে নিজের ও প্রত্যক্ষ শ্রোতাদের সম্ভাব্য জীবনসীমার মধ্যে রাখেন; এবং একটি বালকের বার্ধক্যের আগেই কিয়ামত সংঘটিত হওয়ার সময়-ইঙ্গিত দেন। ইতিহাসে সেই প্রত্যাশিত মহাকিয়ামত ঘটেনি। পরবর্তী বর্ণনা ও ব্যাখ্যায় তখন একই শব্দের পরিসর বদলে যায়—“কিয়ামত” হয়ে যায় “তোমাদের কিয়ামত”, তারপর “তোমাদের মৃত্যু”, তারপর “সে প্রজন্মের অবসান”। এটি কেবল শব্দের বহুমুখী ব্যবহার নয়; ব্যর্থ সময়-প্রত্যাশার পরে অর্থের ক্রমাগত সংকোচন। Stephen J. Shoemaker-ও প্রাথমিক ইসলামে এই আসন্ন-প্রলয় প্রত্যাশাকে কেন্দ্রীয় বৈশিষ্ট্য হিসেবে চিহ্নিত করেছেন এবং কিয়ামত বিলম্বিত হওয়ার পর প্রাথমিক মুসলিম চিন্তায় পুনর্বিন্যাসের কথা বলেছেন। [21]

ঐশী ভবিষ্যৎজ্ঞানের দাবি পরীক্ষার মানদণ্ড মানুষের সাধারণ অনুমানের চেয়ে নিচু হতে পারে না। একটি নির্দিষ্ট সময়-ইঙ্গিত বাস্তবে ব্যর্থ হওয়ার পরে যদি বলা যায় “শব্দটির অন্য অর্থ ছিল”, “এটি ওই প্রজন্মের মৃত্যু বোঝায়”, অথবা অন্য একটি বর্ণনার অতিরিক্ত শব্দ এনে মূল বক্তব্যের অর্থ পাল্টে দেওয়া যায়—তাহলে সেই ভবিষ্যদ্বাণীকে আর কোনো সম্ভাব্য ফলাফলই ভুল প্রমাণ করতে পারবে না। আর যা ভুল প্রমাণযোগ্য নয়, তা প্রমাণও নয়। এখানে যে চিত্রটি উঠে আসে তা অলৌকিক ভবিষ্যৎজ্ঞানের নয়; বরং আসন্ন প্রলয়ের একটি ব্যর্থ প্রত্যাশা এবং সেই ব্যর্থতার পরে শতাব্দীব্যাপী অর্থ-পরিবর্তনের ইতিহাস।


তথ্যসূত্রঃ
  1. Britannica: Eschatology—“last things”, end of time, resurrection, judgment ↩︎
  2. Britannica: Apocalypticism ↩︎
  3. Encyclopaedia Iranica: FRAŠŌ.KƎRƎTI—final renovation/transfiguration after evil defeated ↩︎
  4. Encyclopaedia Iranica: ESCHATOLOGY—“final things”, savior defeating evil, end of world; Zoroastrian influence ↩︎
  5. Britannica: Ragnarök—final battle, catastrophe, world reborn ↩︎
  6. Britannica: Eschatology—historical eschatologies in Judaism/Christianity; apocalyptic tradition ↩︎
  7. Billings 1994, Annual Review of Sociology: Religion and Political Legitimation—religion legitimates power/privilege and can also support protest ↩︎
  8. Norman Cohn, The Pursuit of the Millennium—OUP ক্যাটালগ পৃষ্ঠা ↩︎
  9. Marx, A Contribution to the Critique of Hegel’s Philosophy of Right: Introduction ↩︎
  10. Stanford Encyclopedia of Philosophy: Marx—opium remark ↩︎
  11. সূনান আবু দাউদ, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, হাদিসঃ ৩৬০৭ ↩︎
  12. সহীহ মুসলিম, হাদিস ১৮৭২–১৮৭৩ — সংশয়ের ইসলাম আর্কাইভ ↩︎
  13. সহীহ মুসলিম, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, হাদিসঃ ৭০১৪ ↩︎
  14. মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত), হাদিসঃ ৫৪২১ ↩︎
  15. সূরা কামার, আয়াত ১ ↩︎
  16. তাফসীর আল-কুরতুবী, খণ্ড ১৮, পৃষ্ঠা ২৮৪ ↩︎
  17. তাফসীর আদ-দুররুল মানসূর, খণ্ড ৫, পৃষ্ঠা ১০৮ ↩︎
  18. ইমাম নববী, শরহ সহীহ মুসলিম, “কিয়ামত নিকটবর্তী হওয়া” ↩︎
  19. তাফসীর আদ-দুররুল মানসূর, খণ্ড ৭, পৃষ্ঠা ৪৬৭ ↩︎
  20. তাফসীর আল-কুরতুবী, খণ্ড ১৬, পৃষ্ঠা ২৪০ ↩︎
  21. Stephen J. Shoemaker, The Death of a Prophet, Chapter 3 1 2
  22. মুহাম্মদ ইবন জারীর আল-তাবারি, তারিখ আল-তাবারি, খণ্ড ১, পৃষ্ঠা ১১, মুয়াসসাসাত আল-আ‘লামি সংস্করণ ↩︎
  23. তাফসীর ইবনে কাসীর, সূরা আল-হাজ্জ ২২:৪৭ ↩︎
  24. মুখতাসার সহীহ আল-বুখারী, হাদিসঃ ৫৬০ ↩︎
  25. মুখতাসার সহীহ আল-বুখারী, ইসলামী দাওয়া সেন্টার উম্মুল হামাম রিয়াদ সৌদি আরব, পৃষ্ঠা ২৩১ ↩︎
  26. ইবনু বাযের ফতোয়া, খণ্ড ৩০, পৃষ্ঠা ২৮০–২৮৪ ↩︎
  27. সহীহ মুসলিম, হাদীস একাডেমী, হাদিসঃ ৭২৬৩ ↩︎
  28. সুনান আত-তিরমিযী ২২৩৪; মুসনাদ আহমাদ ১৬৯৩ — আবু উবাইদা ইবনুল জাররাহর বর্ণনা ↩︎
  29. সহীহ মুসলিম, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, হাদিসঃ ৭১৪২ ↩︎
  30. সহীহ মুসলিম, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, হাদিসঃ ৭১৪৩ ↩︎
  31. সহীহ মুসলিম, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, হাদিসঃ ৭১৪৪ ↩︎
  32. সহীহ মুসলিম, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, খণ্ড ৬, পৃষ্ঠাঃ ৪৩৫ ↩︎
  33. সহীহ ইবনু হিব্বান (হাদিসবিডি), হাদিসঃ ৫৬৬ ↩︎
  34. Stephen J. Shoemaker, The Death of a Prophet, Chapter 3, pp. 118–196 ↩︎
  35. সহীহ বুখারী, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, হাদিসঃ ৬০৬৭ ↩︎
  36. তাফসীর আদ-দুররুল মানসূর, খণ্ড ৮, পৃষ্ঠা ৪১৪ ↩︎
  37. সহীহ বুখারী ৬৫১১; সহীহ মুসলিম ২৯৫২–২৯৫৩; IslamQA, প্রশ্ন 363920 ↩︎
  38. তাফসীর আল-কুরতুবী, খণ্ড ১১, পৃষ্ঠা ২৬৬ ↩︎
  39. তাফসীর আল-কুরতুবী, খণ্ড ১১, পৃষ্ঠা ৪২ ↩︎
  40. ইবন হাজর আল-আসকালানী, ফাতহুল বারী, খণ্ড ১০, পৃষ্ঠা ৫৭২–৫৭৩ (IslamWeb pagination), ‘باب ما جاء في قول الرجل ويلك’ ↩︎
  41. Science (AAAS), “Earth Won’t Die as Soon as Thought” ↩︎
  42. NASA Science, “Chapter 6: Aging Into Gianthood” — “Sun approaches its red giant phase some 6 billion years from now” ↩︎
  43. Planck 2018 results VI: Cosmological parameters — A&A 641, A6 (2020) PDF ↩︎
  44. DESI DR2 Results: March 19 Guide — 2025-03-19 ↩︎
  45. Nature Astronomy — “Dynamical dark energy in light of the DESI DR2…” (2025) ↩︎

Preferred Sources

About This Article

Genre: Islamic Eschatology Analysis, Muhammad Prophecy Critique, Failed Prophecy Analysis, Quran-Hadith Criticism, Early Islamic Apocalypticism, Dajjal Traditions, Tafsir History, Hadith Interpretation, and Philosophy of Prophecy

Epistemic Position: Secular Humanism, Historical Criticism, Source Criticism, Philosophical Skepticism, Falsifiability-Based Prophecy Analysis, Linguistic Contextualism, Naturalistic Religious-History Reading, and Anti-Apologetic Reasoning

This article critically examines Islamic claims concerning the imminence and timing of al-Sa‘ah (السَّاعَة), the Hour or Day of Judgment, as described in the Quran, hadith literature, classical tafsir, and later Islamic commentary. Particular attention is given to statements attributed to Muhammad that appear to place the Hour, the appearance of the Dajjal, or major end-time events within the foreseeable lifetime of Muhammad, his companions, or members of the earliest Muslim generations.

The analysis focuses especially on Quran 54:1 (“The Hour has drawn near”), Quran 70:6–7 (“They see it as distant, but We see it as near”), and related Quranic language concerning the approaching reckoning. These passages are compared with hadith reports in Sahih al-Bukhari, Sahih Muslim, Sunan Abi Dawud, Jami‘ al-Tirmidhi, Sahih Ibn Hibban, and Mishkat al-Masabih.

Among the central reports examined are Sahih al-Bukhari 1059, in which Muhammad feared that a solar eclipse might signal the Hour; Sahih al-Bukhari 6511 and Sahih Muslim 2952–2953, concerning a young person who would supposedly not reach old age before the Hour; Sahih Muslim 2937, concerning the possible appearance of the Dajjal while Muhammad was still among his followers; Jami‘ al-Tirmidhi 2234, in which Muhammad says that someone who had personally seen him or heard his words might encounter the Dajjal; and traditions comparing Muhammad and the Hour to two adjacent fingers or two racing horses.

The article also analyzes eschatological warfare traditions involving horses, cavalry, swords, spears, booty, Romans, Constantinople, Dajjal, and the return of Jesus. These reports are examined as evidence of the historical and cultural horizon within which early Islamic expectations of the future were formulated, particularly where seventh-century military institutions are projected into the events immediately preceding the Day of Judgment.

A major linguistic focus is the distinction between السَّاعَة (al-Sa‘ah, “the Hour”), تقوم الساعة (taqumu al-sa‘ah, “the Hour occurs”), تقوم عليكم ساعتكم (“your Hour will come upon you”), and the later explanatory gloss يعني موتهم (“meaning their death”). The article distinguishes the wording attributed to Muhammad and Aisha from later transmitter commentary, especially the interpretation attributed to Hisham ibn Urwa, and examines whether “death” or “the end of a generation” represents the original semantic force of the reports or a later harmonizing interpretation.

Classical Islamic interpretation is examined through al-Tabari, al-Qurtubi, al-Suyuti’s al-Durr al-Manthur, Ibn Kathir, al-Nawawi, Ibn Hajar al-Asqalani, and Ibn Hibban. Particular attention is given to reports that some early Muslims understood Muhammad’s hundred-year statement as implying that the world itself would end within one hundred years, as well as al-Tabari’s chronological model in which the world was assigned an approximately 7,000-year lifespan, roughly 6,500 years were considered already elapsed, and approximately 500 years remained.

The article further examines classical attempts to quantify eschatological nearness through the Quranic equation of a divine day with one thousand human years, the interpretation of half a day as five hundred years, the difference in length between Muhammad’s index and middle fingers, and other chronological calculations. These materials are used to trace how the language of an imminent Hour could progressively be converted into numerical chronology, generational extinction, individual death, symbolic nearness, or indefinitely extended theological time.

The central argument is that the cumulative evidence is more consistent with a genuinely imminent eschatological expectation in early Islam than with an originally intended apocalypse located thousands of years in the future. When the expected events did not occur within the implied human or generational timeframe, later transmitters and commentators increasingly restricted, reinterpreted, harmonized, or recalculated the meaning of the earlier statements.

This interpretive development is evaluated through the concepts of falsifiability, ad hoc rescue, semantic narrowing, retrospective harmonization, transmission history, and historical reception. A predictive statement that can always be preserved after failure by redefining “the Hour” as death, generational extinction, symbolic proximity, or an indefinitely elastic divine timescale loses much of its value as independently testable evidence of supernatural foreknowledge.

The article also engages modern historical scholarship, particularly Stephen J. Shoemaker and his study The Death of a Prophet: The End of Muhammad’s Life and the Beginnings of Islam, which examines Muhammad and the earliest Muslim community within the wider context of Late Antique apocalypticism and argues for the importance of imminent eschatological expectation in the beginnings of Islam.

The scientific section distinguishes religious apocalypse from evidence-based long-term models concerning solar evolution, the future habitability of Earth, the Sun’s red-giant phase, cosmological expansion, dark energy, heat death, Big Freeze, Big Rip, and Big Crunch scenarios. Scientific projections are presented as model-dependent conclusions constrained by observation rather than prophetic declarations protected from falsification through retrospective reinterpretation.

This article should therefore be evaluated through the original Arabic wording of the Quran and hadith, comparison of parallel hadith recensions, isnad and matn history, classical tafsir, chronology of interpretation, historical reception, philosophy of language, philosophy of prophecy, falsifiability, astronomy, cosmology, and ordinary standards of logical consistency—not through retrospective semantic expansion, selective harmonization, theological necessity, or reinterpretations introduced only after an originally implied timeframe had already passed.

Leave a comment

Your email will not be published.