নবী জাওনিয়া ও উমাইমাকে যৌন নির্যাতন করেছিলেন

ভূমিকা

ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্বদের জীবন নিয়ে আলোচনা কেবল তাদের রাজনৈতিক বা ধর্মীয় অর্জনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকা উচিত নয়। বিশেষ করে যখন কোনো ব্যক্তিত্বের জীবন নৈতিকতার আদর্শ হিসেবে উপস্থাপিত হয়, রাষ্ট্রীয় আইন ও বিচার ব্যবস্থায় সেগুলো প্রভাব ফেলে, তখন তার ব্যক্তিগত সম্পর্কের গভীরতর বিশ্লেষণ অপরিহার্য হয়ে পড়ে। সপ্তম শতাব্দীর আরবের সামাজিক প্রেক্ষাপটে ক্ষমতার বিন্যাস এবং নারীর অবস্থান ছিল বর্তমান বিশ্বের তুলনায় সম্পূর্ণ ভিন্ন। আমরা আমাদের জীবন থেকেও জানি যে, আমাদের নানীদাদীদের জীবনকালেও সম্মতি না কনসেন্টের খুব একটি বালাই ছিল না। মুহাম্মদের জীবনে বিভিন্ন নারীর সাথে তার সম্পর্কের ক্ষেত্রে ‘সম্মতি’ বা ‘চয়েস’ কতটুকু বিদ্যমান ছিল, তা নিয়ে সমসাময়িক ইতিহাসবিদ এবং গবেষকদের মধ্যে যথেষ্ট বিতর্ক রয়েছে। এই প্রবন্ধে আমরা বিশেষ করে জাওনিয়া এবং উমাইমা নামক দুই নারীর সাথে মুহাম্মদের আচরণের পাশাপাশি অন্যান্য উল্লেখযোগ্য ঘটনাগুলো দালিলিক প্রমাণের ভিত্তিতে বিশ্লেষণ করবো। সেইসঙ্গে নবীর অসন্তুষ্টি দূর করার ক্ষেত্রে সাহাবীদের সর্বোচ্চ প্রচেষ্টার একটি বিবরণ আমরা এখানে দেখবো।


ধর্ষণ বা যৌন নির্যাতন কাকে বলে?

শুরুতেই জেনে নেয়া প্রয়োজন, ধর্ষন শব্দটি দ্বারা আসলে কী বোঝায় এবং ধর্ষনের সংজ্ঞা কী। ধর্ষণ হচ্ছে, শারীরিক বলপ্রয়োগ, অন্য যেকোনভাবে চাপ প্রদান, ব্ল্যাকমেইল কিংবা কর্তৃত্বের অপব্যবহারের মাধ্যমে কারোর সাথে শারীরিক সম্পর্ক স্থাপন করা। অনুমতি প্রদানে অক্ষম (যেমন- কোনো অজ্ঞান, বিকলাঙ্গ, মানসিক প্রতিবন্ধী কিংবা অপ্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তি ) এরকম কোনো ব্যক্তির সঙ্গে যেকোন ভাবেই হোক, যৌনমিলনে লিপ্ত হওয়াও ধর্ষণের আওতাভুক্ত। অর্থাৎ, একজন প্রাপ্তবয়ষ্ক মানুষ স্বেচ্ছায় সজ্ঞানে সম্মতি না দিলে, তার সাথে যেকোন ধরণের যৌনমিলনই ধর্ষনের আওতাভুক্ত। আবার, একজনের উপর অন্যজনের চাপিয়ে দেওয়া অনিচ্ছাকৃত যৌন আচরণকে যৌন নির্যাতন বা উৎপীড়ন বলা হয়। যখন প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে যৌনকাজে জোর করা হয় যখন এক পক্ষের কোন সম্মতি থাকে না, তখন তাকে যৌন লাঞ্ছনা বলা হয়। যৌন লাঞ্ছনার মধ্যে অযাচিত স্পর্শ, ক্ষমতার দ্বারা যৌন কাজে সম্মত হওয়ার জন্য চাপ প্রদান ইত্যাদিও অন্তর্ভূক্ত। এ ধরণের ঘটনায় অপরাধীকে যৌন নির্যাতক বা উৎপীড়ক বলে অভিহিত করা হয়। আবার, যদি কোন প্রাপ্তবয়ষ্ক লোক বা তরুণ কোন শিশুকে যৌন কাজে লিপ্ত হওয়ার জন্যে অনুপ্রেরণা দেয় তাকেও যৌন নির্যাতন বলা হবে। শিশু বা নাবালকের সাথে অনুপ্রেরণা দিয়ে যৌন কাজে লিপ্ত হলে তাকে শিশু যৌন নির্যাতন বা বিশেষ আইনের আওতায় ধর্ষন বলা হয়।

আসুন, নবী যৌন নির্যাতক বা ধর্ষক ছিলেন কিনা দেখা যাক।


জাওনিয়াকে নবীর যৌন নির্যাতন

বুখারী শরীফে বর্ণিত রয়েছে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একবার তার সঙ্গীদের নিয়ে শাওত নামক একটি বাগানবাড়িতে গিয়েছিলেন। সেখানে নবীর জন্য একজন মেয়েকে বিশেষভাবে নিয়ে আসা হয়। লক্ষণীয় বিষয় হলো, মেয়েটিকে নবীর নিজস্ব বাসস্থানে বা তার পিত্রালয়ে নয়, বরং একটি নির্জন বাগানবাড়িতে আনা হয়েছিল। তৎকালীন আরবে এ ধরনের প্রাচীরবেষ্টিত বাগানবাড়িগুলো সাধারণত ব্যক্তিগত বিনোদন বা নিভৃত যৌনসঙ্গমের জন্য ব্যবহৃত হতো—যা কেন এবং কোন ক্ষেত্রে, তা বিবেকবান যেকোনো পাঠকের কাছে স্পষ্ট।

সেখানে পৌঁছানোর পর নবী মেয়েটিকে সরাসরি বলেন, তুমি নিজেকে আমার কাছে সমর্পণ করো (হেবা)। বাইরে তিনি তাঁর সঙ্গীদের বসিয়ে রেখে একা ভেতরে প্রবেশ করেছিলেন, যাতে তারা নবীর ‘কাজ’ সম্পন্ন হওয়ার অপেক্ষায় থাকতে পারেন। মেয়েটি এই প্রস্তাবটি ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করেন এবং নিজেকে একজন রাজকুমারী (মালিকা) হিসেবে পরিচয় দিয়ে বলেন যে, কোনো রাজকুমারী কখনো একজন নিচু শ্রেণির বাজারি লোকের কাছে নিজেকে সমর্পণ করে না। হাদিস থেকে স্পষ্ট বোঝা যায় যে, মেয়েটি সেই মুহূর্তে অত্যন্ত রাগান্বিত ও ক্ষিপ্ত ছিলেন।

এরপর নবী তাঁর দিকে হাত প্রসারিত করেন এবং শরীরে হাত রাখার চেষ্টা করেন। বুদ্ধিমতী মেয়েটি তখন নিজেকে রক্ষার শেষ অস্ত্র হিসেবে বলেন, “আমি আপনার থেকে আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাই।” আল্লাহর দোহাই দেওয়ার পর নবী আর অগ্রসর হতে পারেননি এবং তাকে ছেড়ে দিতে বাধ্য হন।

এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ সম্ভাবনা উঠে আসে। হাদিসে উল্লেখ আছে যে, মেয়েটির খিদমতের জন্য একজন ধাত্রী (নার্স/দাই) উপস্থিত ছিল। তৎকালীন আরব সমাজে ধাত্রী সাধারণত অপ্রাপ্তবয়স্ক বা নাবালিকা মেয়েদের সঙ্গেই থাকতেন। ইসলামী বিধান অনুসারে অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়েদের ক্ষেত্রে পিতার সম্মতিই যথেষ্ট বলে বিবেচিত হয়, মেয়ের নিজস্ব সম্মতির প্রয়োজন পড়ে না। তাই এই মেয়েটি খুব সম্ভবত একজন অপ্রাপ্তবয়স্ক বা নাবালিকা ছিলেন, যাকে হয়তো পিতার সম্মতিতে (অথবা জোরপূর্বক) নবীর সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপনের জন্য আনা হয়েছিল।

অথবা আরেকটি সম্ভাবনাও থাকতে পারে যে, মেয়েটিকে ঐ বাগানবাড়িতেই আনা হয়েছিল এবং নবী তাকে সরাসরি ‘হিবা’ (নিজেকে দান) করতে বলেছিলেন। সে যাই হোক, মেয়েটি আসলেই নবীর বৈধ স্ত্রী ছিলেন কি না, বা হিবা কীভাবে কাজ করে—সেসব বিষয় আপাতত বাদ দিয়ে আসুন সরাসরি হাদিসটি পড়ি। [1]

সহীহ বুখারী (তাওহীদ)
৬৮/ ত্বলাক
পরিচ্ছেদঃ ৬৮/৩. ত্বলাক্ব দেয়ার সময় স্বামী কি তার স্ত্রীর সম্মুখে ত্বলাক্ব দেবে?
৫২৫৫. আবূ উসায়দ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেনঃ আমরা নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সঙ্গে বের হয়ে শাওত নামক বাগানের নিকট দিয়ে চলতে চলতে দু’টি বাগান পর্যন্ত পৌছলাম এবং এ দু’টির মাঝে বসলাম। তখন নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ তোমরা এখানে বসে থাক। তিনি ভিতরে) প্রবেশ করলেন। তখন নু’মান ইব্ন শারাহীলের কন্যা উমাইমার খেজুর বাগানস্থিত ঘরে জাওনিয়াকে আনা হয়। আর তাঁর খিদমতের জন্য ধাত্রীও ছিল। নাবী যখন তার কাছে গিয়ে বললেন, তুমি নিজেকে আমার কাছে সমর্পণ কর। তখন সে বললঃ কোন রাজকুমারী কি কোন বাজারিয়া ব্যক্তির কাছে নিজেকে সমর্পণ করে? রাবী বলেনঃ এরপর তিনি তাঁর হাত প্রসারিত করলেন তার শরীরে রাখার জন্য, যাতে সে শান্ত হয়। সে বললঃ আমি আপনার থেকে আল্লাহর নিকট পানাহ চাই। তিনি বললেনঃ তুমি উপযুক্ত সত্তারই আশ্রয় নিয়েছ। এরপর তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) আমাদের নিকট বেরিয়ে আসলেন এবং বললেনঃ হে আবূ উসায়দ! তাকে দু’খানা কাতান কাপড় পরিয়ে দাও এবং তাকে তার পরিবারের নিকট পৌঁছিয়ে দাও।(৫২৫৭) আধুনিক প্রকাশনী- ৪৮৭১, ইসলামিক ফাউন্ডেশন- ৪৭৬৫)
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আবূ উসাইদ (রাঃ)


বাজারিয়া ব্যক্তি বলতে কী বোঝায়?

একমাত্র অন্ধবিশ্বাসী মুমিন না হলে স্বাভাবিকভাবেই যেকোন সুস্থ মাথার মানুষই বুঝবে, এই হাদিসে মেয়েটি নবীকে গালাগাল করে অত্যন্ত বাজেভাবে অপমান করেছে। এখানে বাজারিয়া লোক বলতে কী বোঝানো হয়েছে, সেই সময়ে বাজারিয়া লোক বলতে আসলে ঠিক কেমন মানুষকে নির্দেশ করা হতো, সেটি আসুন আরেকটি সহিহ হাদিস থেকে বোঝার চেষ্টা করি, [2]

সহীহ মুসলিম (ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
৪৬/ সাহাবী (রাঃ) গণের ফযীলত
পরিচ্ছেদঃ ১৬. উম্মুল মউ’মিনীন উম্মু সালামাহ (রাঃ) এর ফযীলত
৬০৯৩। আবদুল আলা ইবনু হাম্মাদ ও মুহাম্মাদ ইবনু আবদুল আ’লা কায়সী (রহঃ) … সালমান (রাঃ) থেকে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, যদি তোমার পক্ষে সম্ভব হয় তবে বাজারে প্রবেশকারীদের মধ্যে তুমি প্রথম হয়ো না এবং তথা হতে বহির্গমণকারীদের মধ্যে তুমি শেষ ব্যক্তি হয়ো না। বাজার হলো শয়তানের আড্ডাখানা। আর তথায়ই সে তার ঝান্ডা উত্তোলন করে রাখে। সালমান (রাঃ) বলেন, আমাকে এ খবরও দেওয়া হয়েছে যে, জিবরীল (আলাইহিস সালাম) নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কাছে এলেন। তখন তাঁর পাশে উম্মু সালামা (রাঃ) ছিলেন। রাবী বলেন, অতঃপর জিবরীল (আলাইহিস সালাম) কথা বলতে লাগলেন এবং পরে চলে গেলেন।
অতঃপর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উম্মে সালামাকে জিজ্ঞাসা করলেন, ইনি কে ছিলেন? বা এরূপ কথা বললেন। উম্মে সালামা (রাঃ) উত্তর দিলেন, দাহইয়া কালবী। তিনি বলেন, উম্মু সালামা (রাঃ) বলেন, আল্লাহর কসম! আমি তো তাকে দাহইয়া কালবী বলেই ধারণা করেছিলাম। যতক্ষন না রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর ভাষণ শুনলাম। তিনি আমাদের কথা বলছিলেন অথবা এরূপ বলেছিলেন। অর্থাৎ জিবরীলের আগমনের বর্ণনা দিচ্ছিলেন। বর্ণনাকারী বলেন, আমি রাবী আবূ উসমানকে জিজ্ঞাসা করলাম যে, আপনি এ হাদীস কার মাধ্যমে শুনেছেন? তিনি বললেন, উসামা ইবনু যায়দ (রাঃ) থেকে।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ সালমান ফারসী (রাঃ)

এই সম্পর্কে আরও একটি হাদিস পড়ে নেয়া জরুরি, [3]

সহীহ মুসলিম (হাদীস একাডেমী)
৫। মাসজিদ ও সালাতের স্থানসমূহ
পরিচ্ছেদঃ ৫২. ফজরের সালাতের পর বসে থাকার এবং মসজিদসমূহের ফযীলত
হাদিস একাডেমি নাম্বারঃ ১৪১৪, আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ৬৭১
১৪১৪-(২৮৮/৬৭১) হারূন ইবনু মা’রূফ ও ইসহাক ইবনু মূসা আল আনসারী (রহঃ) ….. আবূ হুরায়রাহ (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত। রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ আল্লাহ তা’আলার কাছে সব চাইতে প্রিয় জায়গা হলো মাসজিদসমূহ আর সব চাইতে খারাপ জায়গা হলো বাজারসমূহ। (ইসলামী ফাউন্ডেশন ১৪০০, ইসলামীক সেন্টার ১৪১২)
* এই হাদীস হতে শিক্ষণীয় বিষয়:
১। পৃথিবীর মধ্যে মাসজিদগুলি হলো আল্লাহর জিকির, ইবাদত বা উপাসনা প্রতিষ্ঠিত করার স্থান। আল্লাহর জিকির, ইবাদত বা উপাসনার মধ্যে সর্ব শ্রেষ্ঠ বিষয় হলো পাঁচ ওয়াক্তের ফরজ নামাজ।
২। মসজিদসমূহের সম্মান করা অপরিহার্য; তাই সমস্ত মসজিদ পরিষ্কার এবং সুবাসিত করে রাখা ওয়াজিব। এবং অপ্রীতিকর গন্ধ ও ময়লা পোশাক পরিধান করে মসজিদে প্রবেশ করা জায়েজ নয়।
৩। পৃথিবীর মধ্যে সবচেয়ে ঘৃণিত স্থান হলো সাধারণতঃ বাজার; কেননা সচরাচর বাজার হলো প্রতারণা, ঠকবাজি, মিথ্যা শপথ ইত্যাদির জায়গা এবং আল্লাহর জিকির থেকে বিরত থাকারও স্থান।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আবূ হুরায়রা (রাঃ)


জাওনিয়াকে কী নবী আসলেই বিয়ে করেছিল?

ইসলামপন্থীরা সহীহ বুখারীর হাদিসের একটি পরিচ্ছেদের শিরোনামের ভিত্তিতে দাবি করে থাকেন যে, ‘জাওনিয়া’ নামের ঐ নারী নাকি নবীর বিবাহিতা স্ত্রী ছিলেন। কিন্তু এই দাবীটি সঠিক হতে পারে না। কারণ, হাদিস গ্রন্থগুলোর এইসব পরিচ্ছেদ বা শিরোনাম মূল হাদিসের অংশ নয়— এগুলো হাদিস সংকলকগণ অনেক পরে সংযুক্ত করেন এবং এগুলো অনেক সময়ই হাদিসকে নির্দিষ্ট একটি বিধানের আওতায় ফেলার উদ্দেশ্যে সন্নিবেশিত হয়। হাদিসের বর্ণনার ভেতরেও এমন কিছু নেই যা এই নারীর সম্মতির কথা নিশ্চিত করে। বরং হাদিস পাঠে স্পষ্ট বোঝা যায়, তাকে কোনো পূর্বসংবাদ না দিয়ে, এমনকি সম্ভবত জোর করেই আনা হয়েছিল। যদি বিবাহিতা স্ত্রীই হতো, সেই বিয়েতে নিশ্চিতভাবেই মেয়েটির সম্মতির প্রয়োজন হতো। মেয়েটি যে কোনভাবেই সম্মত ছিলেন না, সেটি হাদিস থেকে স্পষ্ট। তাহলে দুইটি সম্ভাবনা বাকি থাকেঃ

মেয়েটি অপ্রাপ্তবয়স্ক ছিল, যার কারণে তার সম্মতি ছাড়াই ইসলামের বিধান অনুসারে তার পিতা তাকে বিবাহ দিতে পেরেছে।
মেয়েটির সাথে বিয়ে হয়নি, নবী মেয়েটিকে ঐ বাগানবাড়িতেই নিজেকে হিবা করতে বলে।

তাছাড়া, হাদিসের পরিচ্ছদে “তালাক” শব্দটির আক্ষরিক অর্থ একটু গভীরভাবে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এটি আরবি “ṭ-l-q” ধাতু থেকে এসেছে, যার অর্থ “মুক্ত করা”, “বিচ্ছিন্ন করা” বা “বাঁধন থেকে ছাড়িয়ে দেওয়া”। এই শব্দটির অর্থ নির্ভর করে প্রেক্ষাপটের ওপর। কেবলমাত্র “তালাক” শব্দ ব্যবহার থেকেই ধরে নেওয়া যায় না যে, সম্পর্কটি ছিল বৈবাহিক। যেমন ইসলামী শরিয়তে দাসীদের ক্ষেত্রেও “তালাক” প্রযোজ্য হয়, অর্থাৎ দাসীর সাথে বৈধ বিবাহের সম্পর্ক না থাকলেও তাকে ‘তালাক’ দেওয়া হতে পারে। ফলে পরিচ্ছেদে কেবলমাত্র ‘তালাক’ শব্দ থাকার ভিত্তিতে নবী ও জাওনিয়ার মাঝে বৈবাহিক সম্পর্ক ছিল এমন দাবি করা যুক্তিসংগত নয়।

দ্বিতীয় বিষয় হচ্ছে, আরেকটি হাদিসে একজন আয়িশার কাছে প্রশ্ন করে, কোন সহধর্মিনীর সাথে নবী সঙ্গম না করেই তালাক দিয়েছিলেন? এখানে রাবী কীভাবে প্রশ্নটি করেছেন, আয়িশা কীভাবে উত্তর দিয়েছেন, সব খুব ভালভাবে বিশ্লেষণ করলে সেখান থেকে নিশ্চিতভাবে বলা সম্ভব নয় যে, জওনিয়া নামক ঐ মেয়েটিকে নবী বিয়েই করেছিলেন। নবী আসলে ঐ মেয়েকে “নিজেকে হিবা” করে দেয়ার জন্য বলেছিলেন। হিবা করে দেয়া কী সেটি নিয়ে আরও বিস্তারিত আলোচনা প্রয়োজন। কিন্তু সেদিকে না গিয়েই, বিখ্যাত ইসলামিক আলেম ইমাম ইবনুল কাইয়্যুম এর যাদুল মাআদ গ্রন্থ থেকে একটি দলিল দেখে নিই [4]

তা ছাড়া এটা মশহর কথা যে, হযরত (সঃ) জওনিয়ার কাছে বিয়ের পয়গাম পাঠিয়েছিলেন। তার বাড়ীতে তিনি তাশরীফও নিয়েছিলেন। কিন্তু, তিনি ওজর পেশ করলেন। হযরত (সঃ) তার ওজর কবুল করলেন। তেমনি ঘটেছিল কালবিয়ার ও যে মহিলার দেহে হযরত (সঃ) শ্বেত রোগ দেখতে পেয়েছিলেন, তাঁর ঘটনাটি। তা ছাড়া এক মহিল। হযরতের (সঃ) কাছে বিয়ে বসার…

যৌন

এরপরে উমাইমার প্রতিও একই আচরণ

পরের হাদিসগুলো থেকে জানা যায়, জাওনিয়ার সঙ্গে যৌনকর্মে ব্যর্থ হয়ে ফিরে আসার পর নবী মুহাম্মদ একই ঘটনাস্থলে উমাইমার সঙ্গেও একই ধরনের আচরণ করতে চেষ্টা করেন। আসুন এরপরের হাদিসটি পড়ে নিই, [5]

সহীহ বুখারী (তাওহীদ পাবলিকেশন)
৬৮/ ত্বলাক
পরিচ্ছেদঃ ৬৮/৩. ত্বলাক্ব দেয়ার সময় স্বামী কি তার স্ত্রীর সম্মুখে ত্বলাক্ব দেবে?
৫২৫৬-৫২৫৭. (ভিন্ন সনদে) সাহল ইবন সা’দ ও আবূ উসায়দ (রাঃ) বর্ণনা করেন। তাঁরা বলেন যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উমাইমা বিনতু শারাহীলকে বিবাহ করেন। পরে তাকে তাঁর কাছে আনা হলে তিনি তার দিকে হাত বাড়ালেন। সে এটি অপছন্দ করল। তাই নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আবূ উসাইদকে তার জিনিসপত্র গুটিয়ে এবং দুখানা কাতান বস্ত্র প্রদান করে তার পরিবারের নিকট পৌঁছে দেবার নির্দেশ দিলেন।[৫২৫৫] আধুনিক প্রকাশনী- ৪৮৭১ শেষাংশ, ইসলামিক ফাউন্ডেশন- ৪৭৬৫)
আবূ উসায়দ ও সাহল ইবন সা’দ (রাঃ) থেকে একই রকম বর্ণিত আছে।[৫২৩৭] আধুনিক প্রকাশনী- নাই, ইসলামিক ফাউন্ডেশন- ৪৭৬৬)
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ সাহল বিন সা’দ (রাঃ)


জাওনিয়া আর উমাইমা কি একই ব্যক্তি নাকি ভিন্ন?

এই বিষয়টি পরিষ্কার করতে হাদিসের মূল ভাষা দেখে নেওয়া জরুরি। সহীহ বুখারী শরীফের হাদিস নং ৫২৫৫-এ আবূ উসাইদ বর্ণনা করেছেন:

“…তখন নু’মান ইব্ন শারাহীলের কন্যা উমাইমার খেজুর বাগানস্থিত ঘরে জাওনিয়াকে আনা হয়। আর তার খিদমতের জন্য ধাত্রীও ছিল। নবী (সা.) যখন তার কাছে গিয়ে বললেন, ‘তুমি নিজেকে আমার কাছে সমর্পণ করো’…”

এই বর্ণনায় স্পষ্টভাবে দুটি আলাদা নাম এবং দুটি আলাদা পরিচয় উল্লেখ করা হয়েছে — জাওনিয়া (যাকে বাগানের ঘরে আনা হয়েছে) এবং উমাইমা বিনতে নু’মান ইব্ন শারাহীল (যার খেজুর বাগানস্থিত ঘরে এই ঘটনা ঘটছে)। হাদিসের আক্ষরিক ভাষায় জাওনিয়াকে “উমাইমার খেজুর বাগানস্থিত ঘরে আনা হয়েছে” বলা হয়েছে। এই বাক্যগঠন আক্ষরিকভাবে দুইজন ভিন্ন নারীর ধারণা জাগায় — একজনকে অন্যজনের ঘরে নিয়ে আসা হয়েছে, যেখানে দ্বিতীয়জনের নাম আগে থেকেই উল্লেখিত।

পরবর্তীকালের ইসলামি আলেম ও ব্যাখ্যাকারকগণ (ইসলামকিউএ, সিকার্স গাইডেন্স, আল-ইকরা ইত্যাদি) এই দুই নামকে একই ব্যক্তি বলে উপস্থাপন করার চেষ্টা করেছেন। তাঁদের যুক্তি হলো, “জাওনিয়া” শুধু গোত্রীয় উপাধি এবং উমাইমাই সেই জাওন গোত্রের মেয়ে। কিন্তু বুখারী শরীফের মূল আরবি ভাষা (“فَأُنْزِلَتْ فِي بَيْتٍ فِي نَخْلٍ فِي بَيْتِ أُمَيْمَةَ بِنْتِ النُّعْمَانِ بْنِ شَرَاحِيلَ”) এবং তার বাংলা অনুবাদ এই একীভূত ব্যাখ্যাকে সরাসরি সমর্থন করে না। কারণ যদি সত্যিই একই ব্যক্তি হতো, তাহলে “উমাইমার ঘরে উমাইমাকেই আনা হয়েছে” বলার কোনো যৌক্তিকতা থাকত না। হাদিসের এই ভাষাগত বিভাজন স্পষ্টতই দুইজন নারীর ধারণা তৈরি করে।

এরপরের ঘটনা কী ঘটেছিল, তা হাদিস থেকেই দেখা যাক। নবী জাওনিয়ার কাছে গিয়ে বলেন, “নিজেকে আমার কাছে সমর্পণ করো” (هبي نفسك لي)। জাওনিয়া উত্তর দেন, “কোনো রাজকন্যা কি কোনো বাজারিয়া (সাধারণ/নিম্নশ্রেণির) লোকের কাছে নিজেকে সমর্পণ করে?” নবী তার শান্ত করার জন্য হাত বাড়িয়ে দেন। তখন সে বলে, “আমি আপনার থেকে আল্লাহর নিকট পানাহ চাই।” নবী বলেন, “তুমি তো মহান আশ্রয়দাতার নিকট আশ্রয় চেয়েছ।” তারপর তিনি বেরিয়ে এসে আবূ উসাইদকে বলেন, দুটি সাদা কাতান কাপড় পরিয়ে তাকে তার পরিবারের কাছে পাঠিয়ে দিতে।

কাছাকাছি ঘটনার আরেকটি বর্ণনা সহীহ বুখারী ৫২৫৬ ও ৫২৫৭-এ পাওয়া যায়, যেখানে “উমাইমা বিনতে শারাহীল”-এর কথা বলা হয়েছে। কিন্তু আগের হাদিস ৫২৫৫-এর স্পষ্ট ভাষাগত বিভাজন (জাওনিয়া + উমাইমার ঘর) এবং তিনটি আলাদা হাদিস নম্বরে তিনটি আলাদা বর্ণনা থাকায় এটিকে দুইটি ভিন্ন ঘটনা হিসেবে দেখার যথেষ্ট যুক্তি রয়েছে। পরবর্তী আলেমগণ যদিও একীভূত করার চেষ্টা করেছেন, তবু হাদিসের আক্ষরিক পাঠ্য এবং বর্ণনার কাঠামো সেই একীভূতকরণকে পুরোপুরি ও অনস্বীকার্যভাবে সমর্থন করে না। সেটি মূলত পরবর্তী যুগের স্কলারদের সমন্বয়বাদী ব্যাখ্যা (Harmonization)। কিন্তু এই দুইজন একজন হোক কিংবা দুইজন ভিন্ন নারী, সেটি আমাদের আলোচনার মূল বিষয়কে প্রভাবিত করে না।

আরও পরিষ্কার হওয়ার জন্য এই হাদিস দুইটি খুব ভালভাবে আপনাদের সামনে উপস্থাপন করছি। একটু মন দিয়ে নামগুলো পড়বেন। ছবিগুলো নেয়া হয়েছে সরাসরি বই থেকে [6]

যৌন 1

এবারে আসুন পরের হাদিসটি পড়ি [6]হাদিসের বর্ণনা লক্ষ্য করুন,নু’মান ইবনে শারাহীলের কন্যা উমাইমা এবং জাওনের কন্যা জাওনিয়া কিন্তু দুইজন আলাদা ব্যক্তি বলেই উল্লেখ করা হয়েছে। এদের মধ্যে উমাইমাকে নবী বিয়ে করেছিল বলে একটি তথ্য পাওয়া যায়, কিন্তু জাওনিয়াকে বিয়ে করার কোন সুনির্দিষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায় না। বরঞ্চ ঘটনা পরম্পরা দেখে বলা যায়, ঐ বাগানবাড়িতে তাকে আনা হয়েছিল ভোগ করার উদ্দেশ্যে, মেয়েটির বিরক্তিভাব থেকেই তা অনেকটা পরিষ্কার। সে নিজ সম্মতিতে মুহাম্মদকে বিয়ে করে থাকলে এমনটি হওয়া কোন স্বাভাবিক ঘটনা নয়। একটু মন দিয়ে পড়ুন [7]

যৌন 3

যৌনকর্ম করতে ব্যর্থ নবীকে সাহাবীর প্রস্তাব

পরপর দুইজন মেয়েদের দিকে লোলুপ দৃষ্টি দিয়েও কাজ সম্পন্ন করতে না পারায় নবী নিশ্চয়ই খুবই মর্মাহত হয়েছিল। আসুন দেখি এরপরে নবী আসলে কী করেছিল। তার এক সাহাবী নবীর এরকম অপমানজনক অবস্থায় নবীকে দেখে নবীকে কি বলেছিল, তা জানতে আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া গ্রন্থটি দেখতে হবে [8] – পাঠক লক্ষ্য করুন, বাগানবাড়িতে দুই দুইজন মেয়ে নিয়ে এসেও নিজের যৌন কামনা চরিতার্থ করতে না পারার জ্বালায় নবী তখন উত্তেজিত। দুই মেয়ের দিকে হাত বাড়িয়ে লাভ হল না। দুই দুইজন নারী পর পর তার সাথে যৌনকর্ম করতে অসম্মতি জানিয়েছে, একজন তো রীতিমত গালাগালি করেছে।বেচারা নবীকে তখন তার এক সাহাবী স্বান্তনা দিয়ে বলছে, নবী যেন রাগ না করে। তার ঘরে এক সুন্দরী বোন আছে। নবী চাইলে সেই সাহাবী বরঞ্চ তাকে এনে দিবে! রীতিমত নিজের বোনের সৌন্দর্য্যের কথা বলে লোভ দেখায়, বোন কাতীলাকে এনেও দেয়। যেন নবী মুহাম্মদের কামের জ্বালা তাতে মেটে। কী মহান ব্যক্তিবর্গ ছিলেন নবীর উম্মতেরা, ভাবতেই অবাক লাগে! একটা না পাইলে আরেকটা, সেইটাও না পাইলে আর একটা, ছিদ্র হইলেই চলে আর কি! এই সাহাবী এবং তার বোন কাতীলা পরবর্তী সময়ে মুরতাদ হয়ে গিয়েছিলেন বলে কিছু সূত্র থেকে জানা যায়, সেটি নিয়ে পরে একসময় আলোচনা করা যাবে। আসুন আমরা মুল বিবরণটি পড়ি,

বর্ণনাকারী বলেন, নবী করীম (সা) তাকে বিয়ে করেছিলেন আট হিজরীর যিলকদ মাসে, আর তার মৃত্যু হয়েছিল ষাট হিজরীতে। নবী করীম (সা) যাদের বিয়ে করেছিলেন, কিন্তু তাদের সংগে সহবাস করেননি, এ তালিকায় ইব্‌ন ইসহাক (র) হতে ইউনুস (র) উল্লেখ করেছেন, আসমা বিনত কা’ব জাওনী ও ‘আমরা বিনত ইয়াযীদ কিলাবীকে। তবে ইব্‌ন আব্বাস (রা) ও কাতাদা (র) বলেছেন, আসমা বিনতুন নু’মান ইব্‌ন আবুল জাওন।-আল্লাহই সর্বাধিক অবগত ।
ইবন আব্বাস (রা) বলেন, সে নবী করীম (সা) হতে আল্লাহর আশ্রয় গ্রহণ করলে তিনি রুষ্ট হয়ে তাঁর নিকট থেকে বেরিয়ে আসলে আশ’আছ (রা) তাকে বললেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আপনি এতে দুঃখিত হবেন না। আমার কাছে তার চেয়ে সুন্দরী গুণবতী রয়েছে। পরে তিনি নিজের বোন কাতীলাকে তার সংগে বিয়ে দিলেন। অন্যান্য বর্ণনা মতে এটি ছিল নবম হিজরীর রাবী (আউয়াল/ছানী) মাসের ঘটনা।

যৌন 5

প্রখ্যাত ইসলামের ইতিহাস গ্রন্থ “আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া”-এর পঞ্চম খণ্ড থেকে এই পুরো ঘটনাটি আবারো জানা যায়। নবী একজন নারীর সাথে যৌনকর্ম করার উদ্দেশ্য নিয়ে তাকে নিজের কাছে সমর্পন করতে বলেছিল। কিন্তু ঐ মহিলা রীতিমত হযরত মুহাম্মদকে এই বলে গালি দেন যে, নবী মুহাম্মদ একজন নিম্নমানের বাজারী লোক। তার সাথে সেই মহিলা যৌনকর্ম করতে ইচ্ছুক নন। নবী মুহাম্মদ তখন তার গায়ে হাত দিয়েছিলেন, কিন্তু সেই নারী আল্লাহর দোহাই দিয়ে নবীকে থামতে বলেন। আল্লাহর দোহাই দেয়ার পরে নবী আর তাকে যৌনকাজে বাধ্য করেন নি [9]

নবী মুহাম্মদ একজন নিম্নমানের বাজারী লোক
নবী মুহাম্মদ একজন বেগানা নারীর গায়ে হাত দেন

ক্ষমতা, অসম্মতি এবং লৈঙ্গিক রাজনীতির ব্যবচ্ছেদ

জাওনিয়ার সাথে মুহাম্মদের এই সংক্ষিপ্ত কিন্তু ঘাত-প্রতিঘাতপূর্ণ ঘটনাটি কেবল একটি সাধারণ বিচ্ছেদের গল্প নয়, বরং এটি তৎকালীন আরব সমাজে ক্ষমতার বিন্যাস, নারীর ‘সম্মতি’ (consent) লঙ্ঘন এবং লৈঙ্গিক রাজনীতির একটি জীবন্ত প্রামাণ্য দলিল। এ ঘটনাটি দেখিয়ে দেয় যে, ধর্মীয় ও রাজনৈতিক কর্তৃত্ব কীভাবে ব্যক্তিগত সম্পর্কের ক্ষেত্রে একতরফা হয়ে উঠতে পারে এবং নারীর স্বায়ত্তশাসনকে কীভাবে ছিনিয়ে নেওয়া হয়। নিচে পয়েন্ট আকারে এর বিস্তারিত বিশ্লেষণ করা হলো, যেখানে প্রতিটি পয়েন্ট হাদিসের বর্ণনার সাথে যুক্ত করে ঐতিহাসিক, সামাজিক, মনস্তাত্ত্বিক ও নৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে গভীরভাবে পর্যালোচনা করা হয়েছেঃ

স্থান নির্বাচন (বাগানবাড়ি)
হাদিসের বর্ণনা অনুসারে, মুহাম্মদ তার সঙ্গীদের নিয়ে ‘শাওত’ (Ash-Shaut) নামক একটি বাগানবাড়িতে গিয়েছিলেন, যা আরবিতে ‘হায়েত’ বা প্রাচীরবেষ্টিত বাগান হিসেবে পরিচিত [10]। তৎকালীন আরবে এ ধরনের বাগানবাড়িগুলো সাধারণত ব্যক্তিগত বিনোদন, নিভৃত আলাপ বা যৌনসঙ্গমের জন্য ব্যবহৃত হতো—কোনো পারিবারিক অনুষ্ঠান বা আনুষ্ঠানিক বিবাহের স্থান ছিল না। এই স্থান নির্বাচন নিজেই ক্ষমতার একটি প্রকাশ: মুহাম্মদ একটি নিয়ন্ত্রিত, নির্জন পরিবেশ বেছে নিয়েছিলেন যেখানে বাইরের হস্তক্ষেপ কম এবং তার নিজস্ব কর্তৃত্ব সর্বোচ্চ। এটি দেখিয়ে দেয় যে, ঘটনাটি কোনো সম্মানজনক বিবাহের আয়োজন ছিল না, বরং একটি একতরফা নিয়ন্ত্রিত মিলনের পরিকল্পনা।
গৃহের পরিবর্তে বাগান
যদি জাওনিয়া মুহাম্মদের বৈধ স্ত্রী হিসেবে গ্রহণ করা হতো, তাহলে নবীর স্ত্রীদের জন্য নির্ধারিত হুজরা বা কক্ষে তাকে স্থান দেওয়া হতো। কিন্তু তাকে নিজের ঘরে না এনে দূরবর্তী একটি বাগানবাড়িতে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। এই সিদ্ধান্তটি স্পষ্ট ইঙ্গিত দেয় যে, মিলনের উদ্দেশ্য ছিল সাময়িক ও ব্যক্তিগত সন্তুষ্টি, কোনো দীর্ঘমেয়াদি পারিবারিক বন্ধন নয়। এখানে ক্ষমতার অসমতা প্রকট: নবীর স্ত্রী হিসেবে তার অধিকার সুরক্ষিত করার পরিবর্তে তাকে একটি ‘অস্থায়ী স্থানে’ রাখা হয়েছে, যা নারীকে বস্তুর মতো ব্যবহারের একটি উদাহরণ।
সঙ্গীদের অবস্থান ও সাক্ষ্য
মুহাম্মদ সঙ্গীদের (সাহাবীদের) বাগানের বাইরে বসিয়ে রেখে একা ভেতরে প্রবেশ করেন। বর্ণনাকারী আবু উসাইদ জানিয়েছেন, তারা দুই বাগানের মাঝখানে বসেছিলেন [10]। এই নিকটবর্তী অবস্থান নিশ্চিত করে যে, তারা ভেতরের কথোপকথন ও উচ্চবাচ্য শুনতে পাচ্ছিলেন এবং পরবর্তীতে তা হাদিস হিসেবে লিপিবদ্ধ হয়েছে। এটি কেবল সাক্ষ্যের প্রমাণ নয়, বরং ক্ষমতার একটি প্রদর্শনী—সাহাবীরা বাইরে ‘পাহারা’ দিচ্ছিলেন, যা ঘটনাটিকে একটি নিয়ন্ত্রিত ‘প্রাইভেট’ অভিযানে পরিণত করেছে এবং জাওনিয়ার কোনো বাইরের সাহায্য পাওয়ার সম্ভাবনা কমিয়ে দিয়েছে।
জাওনিয়ার অনিচ্ছাকৃত উপস্থিতি
হাদিসে স্পষ্ট বলা হয়েছে, জাওনিয়াকে সেখানে ‘আনা হয়েছিল’ (আরবিতে ‘উতিয়া’ বা ‘জিআ বিহা’ শব্দ ব্যবহৃত)। অর্থাৎ তিনি নিজের ইচ্ছায় বা অভিসারে আসেননি, বরং অন্যদের মাধ্যমে ‘জোরপূর্বক’ উপস্থিত করা হয়েছে, যা পরের কথোপকথন থেকে বোধগম্য। এই বর্ণনা থেকে বোঝা যায় যে, তার সম্মতি ছিল না; তাকে একটি ‘বস্তু’ হিসেবে স্থানান্তর করা হয়েছে, যা তৎকালীন নারীদের প্রতি ক্ষমতাশালী পুরুষের দৃষ্টিভঙ্গির প্রতিফলন। আরও উল্লেখযোগ্য যে, হাদিসে বলা হয়েছে মেয়েটির খিদমতের জন্য একজন ধাত্রী (নার্স/দাই) উপস্থিত ছিল। তৎকালীন আরব সমাজে ধাত্রী সাধারণত অপ্রাপ্তবয়স্ক বা নাবালিকা মেয়েদের সঙ্গেই থাকতেন। ইসলামী বিধান অনুসারে অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়েদের ক্ষেত্রে পিতার সম্মতিই যথেষ্ট বলে বিবেচিত হয়, মেয়ের নিজস্ব সম্মতির প্রয়োজন পড়ে না। এই ধাত্রীর উপস্থিতি তাই জাওনিয়াকে অপ্রাপ্তবয়স্ক বা নাবালিকা হওয়ার একটি শক্তিশালী সম্ভাবনা তুলে ধরে এবং ঘটনাটিকে আরও বেশি অসম্মতিপূর্ণ করে তোলে।
‘হিবা’ বা নিজেকে সমর্পণের দাবি
ঘরে প্রবেশ করেই মুহাম্মদ সরাসরি প্রস্তাব দেন— “হাবি লী নাফসাকি” (هبي لي نفسك), অর্থাৎ “তুমি নিজেকে আমার কাছে দান করো (হেবা করো)” [10]। এটি কুরআনের সূরা আহযাবের ৫০ নম্বর আয়াতের বিশেষ অধিকারের প্রয়োগ, যেখানে কোনো নারী মোহর বা সাক্ষী ছাড়াই নিজেকে নবীর কাছে নিবেদন করতে পারতেন। এখানে কোনো বিবাহের প্রথাগত দায়বদ্ধতা বা দেনমোহরের উল্লেখ নেই—শুধুমাত্র যৌন সম্পর্কের আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ করা হয়েছে। এটি লৈঙ্গিক রাজনীতির চরম উদাহরণ: ধর্মীয় কর্তৃত্বকে ব্যবহার করে নারীর শরীরকে ‘দান’ হিসেবে দাবি করা।
সম্মতির অভাব ও প্রত্যাখ্যান
জাওনিয়া এই প্রস্তাব কেবল প্রত্যাখ্যান করেননি, বরং তীব্র ঘৃণা ও অবজ্ঞা সহকারে বলেন— “কোনো রাজকুমারী কি কোনো বাজারিয়া ব্যক্তির কাছে নিজেকে সমর্পণ করে?” এখানে তিনি নিজেকে ‘মালিকা’ (রাজকুমারী) হিসেবে উচ্চবংশীয় দাবি করেছেন এবং মুহাম্মদকে সাধারণ স্তরের বলে অভিহিত করেছেন। এই প্রত্যাখ্যান সম্মতির স্পষ্ট অভাব প্রমাণ করে এবং দেখায় যে, পুরো ঘটনাটি তার ইচ্ছার বিরুদ্ধে চলছিল।
‘বাজারিয়া’ (সুক্বী) গালি
জাওনিয়া মুহাম্মদকে ‘সুক্বী’ (سوقي) বা বাজারিয়া বলে অভিহিত করেন। তৎকালীন আরব সমাজে এই শব্দটি অত্যন্ত অপমানজনক ও তুচ্ছতাচ্ছিল্যপূর্ণ ছিল, যা নিচু শ্রেণির বা সাধারণ ব্যবসায়ীদের প্রতি ব্যবহৃত হতো। এই গালি তার সামাজিক অবস্থানের প্রতি তীব্র প্রতিবাদ এবং ক্ষমতার বিরুদ্ধে একটি প্রত্যক্ষ চ্যালেঞ্জ।
ক্রোধ ও উত্তেজনা
হাদিসের বর্ণনা থেকে স্পষ্ট যে, জাওনিয়া সেই মুহূর্তে অত্যন্ত রাগান্বিত ও উত্তেজিত ছিলেন। তার উগ্র প্রতিক্রিয়া প্রমাণ করে যে, পরিস্থিতিটি কোনো রোমান্টিক বা সম্মতিপূর্ণ ছিল না—বরং জোরপূর্বক চাপিয়ে দেওয়া একটি অপমানজনক পরিস্থিতি।
শারীরিক স্পর্শের মাধ্যমে সম্মতি লঙ্ঘন
জাওনিয়ার স্পষ্ট প্রত্যাখ্যান শোনার পরেও মুহাম্মদ তার দিকে হাত প্রসারিত করেন এবং শরীরে হাত রাখার চেষ্টা করেন। হাদিসের ভাষায়— “আহওয়া বিয়াদিহি আলাইহা” (أَهْوَى بِيَدِهِ عَلَيْهَا), অর্থাৎ তিনি হাত দিয়ে তাকে স্পর্শ করতে চাইলেন [10]। আধুনিক যেকোনো সংজ্ঞায় একজন নারীর ‘না’ শোনার পর তার শরীরে হাত দেওয়া সম্মতির চরম লঙ্ঘন এবং শারীরিক নির্যাতনের একটি ধাপ। এটি দেখিয়ে দেয় যে, ক্ষমতা কীভাবে ‘সম্মতি’কে অগ্রাহ্য করে এগোয়।
১০
শেষ রক্ষা হিসেবে আল্লাহর দোহাই
মুহাম্মদ যখন তাকে স্পর্শ করতে উদ্যত হন, তখন জাওনিয়া উপায়ান্তর না দেখে বলেন— “আউজু বিল্লাহি মিনকা” (أَعُوذُ بِاللَّهِ مِنْكَ), অর্থাৎ “আমি তোমার থেকে আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাই” [10]। এটি ছিল তার নিষ্কৃতির চূড়ান্ত আর্তনাদ এবং ধর্মীয় কর্তৃত্বের বিরুদ্ধে ধর্মকেই অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার।
১১
সাহাবীদের উপস্থিতি ও নবীর বাধ্যবাধকতা
সাহাবীরা বাইরে থেকে সব শুনছিলেন। জাওনিয়া যখন ‘আল্লাহর দোহাই’ দিলেন, তখন মুহাম্মদের পক্ষে আর অগ্রসর হওয়া সম্ভব ছিল না। কারণ তার নিজের প্রচারিত ধর্মে আল্লাহর নামে আশ্রয় চাওয়ার পর জোর করা জনসমক্ষে কুৎসিত ও নৈতিকভাবে ঝুঁকিপূর্ণ হতো। তাই তিনি বলতে বাধ্য হলেন, “তুমি এক মহান সত্তার আশ্রয় নিয়েছ।” এটি ক্ষমতার সীমা দেখিয়ে দেয়—জনমত ও ধর্মীয় চাপ ছাড়া হয়তো ঘটনা অন্যদিকে যেত।
১২
‘ইকসুহা’ বা কাপড় পরিয়ে দেওয়া
ঘটনার শেষে মুহাম্মদ নির্দেশ দেন— “ইকসুহা রাযিকিয়্যাতাইন” (اکْسُهَا رَازِقِيَّتَيْنِ), অর্থাৎ “তাকে দুটি রাযিকী কাপড় পরিয়ে দাও এবং পরিবারের কাছে পাঠিয়ে দাও” [10]। সাধারণ উপহারের ক্ষেত্রে ‘আতিহা’ (তাকে দাও) শব্দ ব্যবহৃত হতে পারত, কিন্তু ‘ইকসুহা’ (তাকে পরিয়ে দাও) শব্দটি তাৎপর্যপূর্ণ, যা আরও একটি সম্ভাবনাকে সামনে আনে। পুরো ঘটনাটি কল্পনা করলে বোঝা যায়, এইরকম পরিস্থিতিত্তে সাধারণত ধস্তাধস্তি এবং জোরাজুরি হওয়া অস্বাভাবিক নয়। এরপরে এই শব্দ থাকা, এটি তখনই ব্যবহৃত হতে পারে যখন কারো শরীর থেকে কাপড় সরে গেছে বা ধস্তাধস্তিতে বস্ত্রহানি হয়েছে। জাওনিয়ার প্রতিরোধ এবং মুহাম্মদের হাত বাড়ানোর পর এই নির্দেশটি শারীরিক সংঘর্ষ ও সম্ভাব্য বস্ত্রহানির জোরালো প্রচ্ছন্ন ইঙ্গিত বহন করে। এটি ঘটনার শেষে নারীকে ‘আগের মত’ করে ফেরত পাঠানোর একটি প্রক্রিয়া, যা ক্ষমতার অপব্যবহারের চূড়ান্ত প্রমাণ।
১৩
সাহাবীর বোনকে ‘উপহার’ হিসেবে প্রস্তাব: নবীর মন খারাপ না করার জন্য নিজের সুন্দরী বোনকে দান করার মনস্তাত্ত্বিক দাসত্ব এবং কর্তৃত্বের মনোবিজ্ঞান
জাওনিয়ার স্পষ্ট প্রত্যাখ্যান ও আল্লাহর দোহাইয়ের পর মুহাম্মদ যখন সামান্য হলেও মানসিক অস্বস্তি বা অপমানবোধে ভুগছিলেন বলে ধারণা করা হয়, তখন একজন সাহাবী তাৎক্ষণিকভাবে নিজের সুন্দরী বোনকে ‘অফার’ করেন—যাতে নবীর মন খারাপ না হয়, তার আত্মসম্মান পুনরুদ্ধার হয় এবং তিনি যেন কোনোভাবে অসন্তুষ্ট না হন। এই প্রস্তাবটি কেবল একটি সাধারণ সান্ত্বনা বা সহানুভূতির প্রকাশ নয়, বরং গভীর মনস্তাত্ত্বিক দাসত্ব, কর্তৃত্বের প্রতি অন্ধ আনুগত্য এবং নারীকে বস্তুর মতো ব্যবহারের এক চরম উদাহরণ।

মনস্তাত্ত্বিকভাবে এটি প্রথমত ‘charismatic authority’-এর ফ্যানাটিক্যাল অনুসরণের প্রকাশ: সাহাবী নবীর মেজাজকে এতটাই গুরুত্বপূর্ণ মনে করেন যে, তাঁর সামান্য অস্বস্তি পুরো সম্প্রদায়ের জন্য হুমকি হয়ে উঠতে পারে বলে বিশ্বাস করেন। এটি একধরনের ‘anticipatory obedience’ বা আগাম আনুগত্য—যেখানে অনুসারী নেতার মানসিক অবস্থা পড়ে নিয়ে তা নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করেন, যাতে নিজের অবস্থান নিরাপদ রাখা যায়। ফ্রয়েডীয় দৃষ্টিকোণ থেকে এটি ‘father complex’-এর চরম রূপ: মুহাম্মদকে পিতৃসমকক্ষ মনে করে তাঁর ‘অপমান’কে নিজের পরিবারের সদস্যকে বলি দিয়ে পূরণ করা।

দ্বিতীয়ত, এই কাজে নারীর সম্পূর্ণ ভোগ্যকরণ (sexual Objectification) ঘটেছে। সাহাবী তাঁর নিজের বোনকে ‘সুন্দরী’ হিসেবে বর্ণনা করে তাকে একটি পণ্য বা ‘মানসিক সান্ত্বনার উপহার’ হিসেবে উপস্থাপন করেছেন। এখানে বোনের সম্মতি, ইচ্ছা বা আত্মসম্মানের কোনো স্থান নেই—তাকে শুধু নবীর মেজাজ ঠিক রাখার যন্ত্র হিসেবে দেখা হয়েছে। এটি তৎকালীন লৈঙ্গিক রাজনীতির মনস্তাত্ত্বিক ভিত্তি প্রকাশ করে: নারীকে পুরুষের (বিশেষ করে ক্ষমতাশালী পুরুষের) আবেগীয় চাহিদা পূরণের মাধ্যম হিসেবে দেখা। সাহাবীর এই প্রস্তাব তাঁর নিজের মধ্যে অভ্যন্তরীণ সংঘাতেরও ইঙ্গিত দেয়—ধর্মীয় আনুগত্য পরিবারীয় বন্ধন ও নৈতিকতাকে ছাপিয়ে গেছে।

তৃতীয়ত, এটি ‘groupthink’ ও ‘cult psychology’-এর একটি জ্বলন্ত উদাহরণ। সাহাবী জানতেন যে, নবীর প্রত্যাখ্যানের ঘটনা যদি তাঁর মনে দাগ কাটে, তাহলে তাঁর নিজের সামাজিক মর্যাদা, নিরাপত্তা এমনকি পরকালীন মুক্তির সম্ভাবনাও প্রভাবিত হতে পারে। ফলে তিনি সক্রিয়ভাবে ‘damage control’ করেছেন—নিজের বোনকে বলি দিয়ে নবীর আত্মপ্রত্যয় পুনরুদ্ধার করেছেন। এই আচরণ মানসিকভাবে এতটাই বিকৃত যে, একজন পুরুষ তাঁর রক্তের সম্পর্ককে ক্ষমতার সামনে তুচ্ছ মনে করেন এবং নারীকে ‘সুন্দরী বোন’ হিসেবে শুধু শারীরিক আকর্ষণের মানদণ্ডে মূল্যায়ন করেন।

সার্বিকভাবে এই ঘটনা দেখিয়ে দেয় যে, ক্ষমতার চারপাশে গড়ে ওঠা মনস্তাত্ত্বিক পরিবেশ কীভাবে অনুসারীদের মধ্যে স্বাভাবিক মানবিক অনুভূতি (পরিবারের প্রতি ভালোবাসা, নারীর প্রতি সম্মান) ধ্বংস করে দেয়। সাহাবীর এই প্রস্তাব জাওনিয়া ঘটনার পরিপূরক—যেখানে এক নারী নিজেকে রক্ষা করতে পেরেছিলেন, আরেক নারীকে (সাহাবীর বোন) সেই একই ক্ষমতার সামনে নিঃশর্তভাবে উৎসর্গ করা হয়েছে শুধুমাত্র নেতার মন খুশি রাখার জন্য। এটি লৈঙ্গিক রাজনীতির চূড়ান্ত মনোবিজ্ঞান: নারী শুধুমাত্র পুরুষের আবেগ নিয়ন্ত্রণের হাতিয়ার।

এই বিশ্লেষণ থেকে স্পষ্ট যে, জাওনিয়া ঘটনাটি শুধু একটি ব্যক্তিগত অস্বস্তিকর মুহূর্ত নয়, বরং ক্ষমতা, সম্মতি ও লৈঙ্গিক নিয়ন্ত্রণের একটি জটিল রাজনৈতিক দলিল।


এড হক ব্যাখ্যা ও ‘উদ্ধার হাইপোথিসিস’: একটি ব্যবচ্ছেদ

ইসলামিক স্কলার এবং আধুনিক এপোলোজিস্টরা যখন এই হাদিসের মুখোমুখি হন, তখন তারা ঘটনার মধ্যে নিহিত অস্বস্তিকে—একজন নারীর স্পষ্ট, দৃঢ় ও যুক্তিসম্পন্ন প্রত্যাখ্যান এবং নবীর অনাকাঙ্ক্ষিত শারীরিক অগ্রসরতাকে—সম্পূর্ণরূপে আড়াল করার জন্য নানাবিধ ‘উদ্ধার হাইপোথিসিস’ (Rescue Hypothesis) বা এড হক ব্যাখ্যার আশ্রয় নেন। এই ব্যাখ্যাগুলো মূল ঘটনার কয়েকশ বছর পরবর্তী সময়ে ড্যামেজ কন্ট্রোল হিসেবে নির্মিত হয়েছে এবং এগুলোর কোনো সমসাময়িক প্রামাণ্য ভিত্তি বা হাদিসের মূল বর্ণনার সাথে সামঞ্জস্য নেই। যার অর্থ হচ্ছে, ইসলামের বিশুদ্ধতার নীতিমালা(চেইন অফ ন্যারেশন) অনুসারেই সেইসব ড্যামেজ কন্ট্রোল ব্যাখ্যার কোন নির্ভরযোগ্য সূত্র নেই। নিচে পয়েন্ট আকারে এই ব্যাখ্যাগুলোর ব্যবচ্ছেদ করা হলো, যেখানে প্রতিটি পয়েন্ট হাদিসের আক্ষরিক বর্ণনা, ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট, ভাষাতাত্ত্বিক সূক্ষ্মতা এবং যুক্তিগত দুর্বলতার আলোকে বিশ্লেষণ করা হয়েছে:

⚖️
বিয়ের দাবি ও স্ববিরোধিতাঃ
অনেক স্কলার দাবি করেন যে জাওনিয়া বা উমাইমার সাথে নবীর আগে থেকেই বিয়ে সম্পন্ন হয়েছিল এবং এটি ছিল কেবল বাসর রাতের একটি স্বাভাবিক ঘটনা। কিন্তু মূল হাদিসে নবীর প্রথম উচ্চারিত বাক্যটি ছিল “হাবি লী নাফসাকি” (هبي لي نفسك)—অর্থাৎ “তুমি নিজেকে আমার কাছে সমর্পণ করো” [10]। যদি বিবাহ ইতোমধ্যে আইনসম্মতভাবে সম্পন্ন হয়ে থাকে, তাহলে একজন স্ত্রীর কাছে ‘নিজেকে দান করো’ বলে হিবা-জাতীয় সমর্পণের প্রস্তাব দেওয়ার কোনো ফিকহী, আইনি বা সামাজিক প্রয়োজনীয়তা থাকে না। ইসলামী ফিকহে ‘হিবা’ পরিভাষাটি সাধারণত দাসী, যুদ্ধবন্দিনী, নবীর কাছে নিজেকে সমর্পন করতে আসা নারী বা সম্পূর্ণ অনিচ্ছুক নারীর ক্ষেত্রেই প্রয়োগ হয়, যা স্পষ্টতই ইঙ্গিত করে যে সেখানে কোনো পূর্ববর্তী দাম্পত্য সম্পর্ক বা বৈধ বিবাহের স্বীকৃতি বিদ্যমান ছিল না। এই দাবিটি তাই হাদিসের আক্ষরিক ভাষার সাথে সরাসরি স্ববিরোধী এবং ঘটনাটিকে একটি সাধারণ ‘স্বামী-স্ত্রীর অসুবিধা’ হিসেবে পুনর্নির্মাণ করার একটি অসার প্রয়াস মাত্র।
🎭
‘সতীনদের ষড়যন্ত্র’ তত্ত্বঃ
একটি ক্লিশে অজুহাত পরবর্তী যুগের ব্যাখ্যাকাররা (যেমন ইবনে হাজার আসকালানী) একটি বিস্তারিত আখ্যান তৈরি করেছেন যে, নবীর দুই স্ত্রী আয়েশা ও হাফসা নাকি ঈর্ষান্বিত হয়ে মেয়েটিকে আগে থেকেই শিখিয়ে দিয়েছিলেন যে নবী তার কাছে গেলে তিনি যেন তৎক্ষণাৎ ‘আউজু বিল্লাহি মিনকা’ বলে আল্লাহর দোহাই দেন [11]। এই তত্ত্বটি একটি ধ্রুপদী এড হক ব্যাখ্যা। মূল সহীহ বুখারীর বর্ণনায় বা ইসলামের কোন বিশুদ্ধ চেইন অফ ন্যারেশন থেকে এ ধরনের কোনো পূর্বপরিকল্পনা, শিক্ষা বা অন্য নারীদের জড়িত থাকার সামান্যতম ইঙ্গিতও নেই। এই আখ্যানটি মূলত নবীর আচরণের অস্বস্তিকর দিকটিকে আড়াল করে দায়ভার অন্য নারীদের ওপর স্থানান্তর করার একটি পিতৃতান্ত্রিক কৌশল। যুক্তিবিজ্ঞানের পরিভাষায় এটি এক ধরনের “ষড়যন্ত্রতত্ত্ব নির্মান”—যেখানে কোনো প্রত্যক্ষ প্রমাণ ছাড়াই একটি ষড়যন্ত্রমূলক কারণ উদ্ভাবন করে মূল ঘটনার দায়িত্বকে অন্যত্র সরিয়ে দেওয়া হয়। এই তত্ত্বটি শুধু হাদিসের সাথে সাংঘর্ষিক নয়, বরং নারীদের মধ্যে স্বাভাবিক ঈর্ষা ও ষড়যন্ত্রের একটি নেতিবাচক সাংস্কৃতিক স্টিরিওটাইপকেও পুনরায় প্রতিষ্ঠা করে।
🗣️
‘বাজারিয়া’ শব্দের অপব্যাখ্যাঃ
কিছু এপোলোজিস্ট যুক্তি দেন যে ‘বাজারিয়া’ বা ‘সুক্বী’ (سوقي) শব্দটি কোনো গালি নয়, বরং এটি দ্বারা সাধারণ প্রজা বা সাধারণ মানুষকে বোঝানো হয়েছে। কিন্তু হাদিসের প্রেক্ষাপটটি সূক্ষ্মভাবে পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, ঘটনাটি কোন সরল স্বাভাবিক প্রেক্ষাপটের বিবরণ নয়। স্পষ্টতই হাদিসে বর্ণিত নারী নিজেকে রক্ষার চেষ্টায় লিপ্ত, এবং যেভাবেই হোক এই পরিস্থিতিত থেকে সে নিজের শরীর রক্ষা করতে ইচ্ছুক। এরকম অবস্থায় একজন নারী যখন নিজেকে ‘রাজকুমারী’ (মালিকাহ) হিসেবে উচ্চবংশীয় পরিচয় দিয়ে অন্য পুরুষকে ‘বাজারিয়া’ বলে সম্বোধন করেন, তখন সেখানে তীব্র ঘৃণা, অবজ্ঞা এবং স্পষ্ট অপমানের স্তর প্রকাশ পায়। তৎকালীন আরব সমাজে ‘সুক্বী’ শব্দটি নিচু শ্রেণির ব্যবসায়ী বা বাজারের সাধারণ লোকদের প্রতি ব্যবহৃত হতো এবং এটি অত্যন্ত তুচ্ছতাচ্ছিল্যপূর্ণ গালি হিসেবেই প্রচলিত ছিল। তর্কের খাতিরে যদি ধরেও নিই, এই শব্দটি দ্বারা সাধারণ মানুষ বোঝানো হয়েছিল, তাতেও ড্যামেজ কন্ট্রোল হয় না। যদি মেয়েটি স্বেচ্ছায় ও সানন্দে বিবাহিত জীবনে প্রবেশ করতেন, তাহলে তিনি তার স্বামীকে ‘নিচু শ্রেণির সাধারণ লোক’ বলে অভিহিত করতেন না। এই শব্দ-চয়নের সূক্ষ্মতাই প্রমাণ করে যে মেয়েটিকে তার ইচ্ছার বিরুদ্ধে বা কোনো চাপের মুখে সেখানে আনা হয়েছিল এবং তিনি মানসিকভাবে তীব্র প্রতিরোধে ছিলেন। এপোলোজিস্টদের এই অপব্যাখ্যা ভাষাতাত্ত্বিক ও সামাজিক সত্যকে উপেক্ষা করে শুধুমাত্র নবীর ইমেজ রক্ষার জন্য নির্মিত হয়েছে।
🧠
মানসিক ভারসাম্যহীনতার অভিযোগঃ
যখন উপরের কোনো যুক্তি আর টেকে না, তখন কিছু ব্যাখ্যাকার শেষ অস্ত্র হিসেবে দাবি করেন যে সেই মেয়েটি মানসিকভাবে সুস্থ ছিলেন না, অথবা তিনি ‘নির্বোধ’ বা ‘অস্থিরচিত্ত’ ছিলেন। এই অভিযোগটি ইতিহাসজুড়ে একটি অত্যন্ত পরিচিত এবং বিপজ্জনক পিতৃতান্ত্রিক কৌশল। ক্ষমতাশালী পুরুষের প্রতি যখন কোনো নারী স্পষ্ট ও যুক্তিসম্পন্ন প্রত্যাখ্যান জানান, তখন তাকে ‘পাগল’, ‘অসুস্থ’ বা ‘মানসিক ভারসাম্যহীন’ বলে চিহ্নিত করা হয়। হাদিসে মেয়েটির প্রত্যাখ্যানের ভাষা ও যুক্তি (রাজকুমারী বনাম বাজারিয়া) অত্যন্ত সচেতন, সাহসী এবং সামাজিকভাবে সুসংগত। যদি তিনি সত্যিই মানসিকভাবে অসুস্থই হতেন, তাহলে তাকে বিয়ে করার জন্য আনা বা তার কাছে যৌন আকাঙ্ক্ষা নিয়ে যাওয়া নৈতিকভাবে আরও গুরুতর অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হতো। এই অভিযোগটি মূলত নারীর প্রতিরোধকে অস্বীকার করার এবং তার স্বাধীন সিদ্ধান্তকে ‘অসুস্থতা’র পর্যায়ে নামিয়ে আনার একটি ক্লাসিক পদ্ধতি।

উপসংহার

মুহাম্মদের যৌন জীবন এবং নারী সম্পর্কের ইতিহাস বিশ্লেষণ করলে একটি স্পষ্ট ও অস্বস্তিকর সত্য সামনে আসে: অধিকাংশ ক্ষেত্রে নারীর সম্মতি বা স্বাধীন পছন্দ ছিল গৌণ, আর ক্ষমতা ও বিজয়ের রাজনীতি ছিল প্রধান। জাওনিয়ার মতো যে নারীরা সক্রিয়ভাবে প্রতিবাদ করতে পেরেছিলেন, আল্লাহর দোহাই দিয়ে তারা সম্পর্ক থেকে মুক্তি পেয়েছিলেন। কিন্তু সাফিয়্যা বা রায়হানার মতো যুদ্ধবন্দিনী নারীদের ক্ষেত্রে সেই সুযোগও ছিল না—তাদের সম্মতির প্রশ্নটি উঠেইনি।

ইতিহাসের এই খণ্ডচিত্রগুলো স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে যে, তৎকালীন আরবের সামাজিক কাঠামো এবং মুহাম্মদের ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তসমূহ আধুনিক মানবাধিকার, সম্মতির নীতি এবং লিঙ্গ সমতার মানদণ্ডে কোনোভাবেই উত্তীর্ণ হয় না।

আদর্শিক শ্রদ্ধাবোধের ঊর্ধ্বে উঠে তথ্য ও যুক্তির আলোকে এই বিষয়গুলো মূল্যায়ন করাই একজন নিরপেক্ষ গবেষকের প্রধান দায়িত্ব। এই ঘটনাগুলো শুধু অতীতের পাতায় আটকে নেই; আজও যারা মুহাম্মদকে নৈতিক আদর্শ হিসেবে দেখেন, তাদের জন্য এগুলো একটি গুরুতর প্রশ্ন রেখে যায়—ক্ষমতা কখনো সম্মতির ঊর্ধ্বে যেতে পারে কি?


তথ্যসূত্রঃ
  1. সহীহ বুখারী, তাওহীদ পাবলিকেশন্স, হাদিসঃ ৫২৫৫ ↩︎
  2. সহীহ মুসলিম, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, হাদিসঃ ৬০৯৩ ↩︎
  3. সহীহ মুসলিম, হাদীস একাডেমী, হাদিসঃ ১৪১৪ ↩︎
  4. যাদুল মাআদ, ইমাম ইবনুল কাইয়্যুম, প্রথম খণ্ড, ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ, পৃষ্ঠা ৭৩ ↩︎
  5. সহীহ বুখারী, তাওহীদ পাবলিকেশন, হাদিসঃ ৫২৫৬-৫২৫৭ ↩︎
  6. সহীহুল বুখারী, পঞ্চম খণ্ড, পৃষ্ঠা ১০৮ 1 2
  7. সহীহুল বুখারী, পঞ্চম খণ্ড, পৃষ্ঠা ১০৯ ↩︎
  8. আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া, পঞ্চম খণ্ড, পৃষ্ঠা ৪৮৯ ↩︎
  9. আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া, পঞ্চম খণ্ড, পৃষ্ঠা ৪৮৭ ↩︎
  10. সহীহ বুখারী, হাদিস নং: ৫২৫৫ 1 2 3 4 5 6 7
  11. ফাতহুল বারী, ৯ম খণ্ড, পৃ. ৩৫৮ ↩︎