সর্বজ্ঞানী হওয়ার মারাত্মক সমস্যাবলী

ভূমিকা

“ঈশ্বর সর্বজ্ঞ”—এই ঘোষণা প্রায় সকল একেশ্বরবাদী ধর্মে, বিশেষ করে ইসলামে, একটি মৌলিক বিশ্বাস। কোরআন আল্লাহকে পরিচিত করায় ‘আল-আলিম’ (সর্বজ্ঞ), যিনি সকল দৃশ্যমান ও অদৃশ্য সকল জ্ঞানের অধিকারী। অর্থাৎ, তার জ্ঞান সীমাহীন এবং সময় ও স্থান থেকে মুক্ত। আল্লাহর জ্ঞানকে এমন এক অবস্থা হিসেবে ধরা হয় যা অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যত সকল বিষয়বস্তু জুড়ে বিস্তৃত।

কিন্তু যদি এই সর্বজ্ঞানের ধারণা বিচার করা হয় দার্শনিক অর্থে, বিশেষ করে ‘অভিজ্ঞতামূলক জ্ঞান’ (experiential knowledge) বা ‘প্রত্যক্ষজ্ঞান’ (knowledge by experience) এর আলোকে, তাহলে আমরা এক গভীর সংকটের মুখোমুখি হই। অভিজ্ঞতামূলক জ্ঞান বলতে আমরা বোঝাই কোনো ঘটনাকে প্রত্যক্ষ করা, কোনো অনুভূতি বা বেদনা সরাসরি উপলব্ধি করা। উদাহরণস্বরূপ,

সন্তানহারা মায়ের শোক ও যন্ত্রণা

সন্তান হারানো মায়ের অন্তরাত্মার এই তীব্র যন্ত্রণা কেবল একটি ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি নয়, বরং এটি অস্তিত্বের এক গভীর সংকট। এই পর্যায়ের শোক যখন কোনো প্রতিকার বা কারণ ছাড়াই ঘটে, তখন তা প্রকৃতির এক চরম নিষ্ঠুরতা ও উদাসীনতাকে ফুটিয়ে তোলে। মনোবিজ্ঞানী এলিজাবেথ কুবলার-রস শোকের যে পর্যায়গুলো বর্ণনা করেছেন, সেখানে সন্তান হারানোকে মানুষের অভিজ্ঞতার সবচেয়ে জটিল ও দীর্ঘস্থায়ী যন্ত্রণার স্তর হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

ধর্ষিত শিশুর একাকীত্ব ও আতঙ্ক

একটি শিশুর ওপর সংঘটিত যৌন সহিংসতা তার শৈশবকে কেবল ধ্বংস করে না, বরং তাকে এক অনন্ত আতঙ্ক ও একাকীত্বের অন্ধকারে নিক্ষেপ করে। এই নিরপরাধ সত্তার আর্তনাদ যখন কোনো দৈব বা প্রাকৃতিক শক্তি দ্বারা বাধাগ্রস্ত হয় না, তখন তা মহাবিশ্বের নৈতিক শৃঙ্খলা বা ‘জাস্ট ওয়ার্ল্ড’ হাইপোথিসিসকে বড় ধরনের প্রশ্নের মুখে দাঁড় করায়। ট্রমা স্টাডিজ অনুযায়ী, শৈশবের এই ভয়াবহ অভিজ্ঞতা ব্যক্তির স্নায়বিক বিকাশ এবং সামাজিক বিশ্বাসের ভিত্তি চিরতরে তছনছ করে দিতে পারে।

ক্ষুধার্ত মানুষের আর্তনাদ ও কষ্ট

ক্ষুধার্ত মানুষের তীব্র আর্তনাদ ও হাহাকার পৃথিবীর অন্যতম নগ্ন সত্য। যখন প্রাচুর্যের বিপরীতে লক্ষ লক্ষ মানুষ স্রেফ খাবারের অভাবে ধুঁকে ধুঁকে মৃত্যুবরণ করে, তখন তা সম্পদের সুষম বণ্টনের অভাব এবং প্রাকৃতিক সংস্থানের নিষ্ঠুর সীমাবদ্ধতাকে তুলে ধরে। এই কষ্ট কোনো আধ্যাত্মিক পরীক্ষার অংশ হতে পারে না, বরং এটি একটি গভীর মানবিক ও জৈবিক সংকট। সমাজবিজ্ঞানী জঁ জিয়েগলার ক্ষুধার্ত মানুষের এই মৃত্যুকে ‘নীরব গণহত্যা’ হিসেবে অভিহিত করেছেন, যা মূলত অবকাঠামোগত ব্যর্থতার ফল।


এই মানবিক অভিজ্ঞতাগুলো কেবল ‘জ্ঞাত’ (known) নয়, বরং ‘অনুভূত’ (felt) ও ‘অভিজ্ঞত’ (experienced)। অর্থাৎ এই মানবিক অভিজ্ঞতাগুলো সম্পর্কে জানাশোনা এগুলো সম্পর্কে পরিপূর্ণ জ্ঞান দান করে না। এগুলো সম্পর্কে পরিপূর্ণ জ্ঞান লাভ করতে হলে এই সব অভিজ্ঞতাকে ‘অনুভূত’ (felt) ও ‘অভিজ্ঞত’ (experienced) করতে হবে।

এখন প্রশ্ন হচ্ছে, আল্লাহ কি এই সকল অভিজ্ঞতাকে শুধুমাত্র ধারণা হিসেবে জানেন, নাকি তিনি সেগুলোকে অনুভবও করতে পারেন? যদি তিনি কেবল ‘জ্ঞাত’ হন, অর্থাৎ তথ্যের স্তরে এই বিষয়গুলো সম্পর্কে জ্ঞান রাখেন, তবে কি তিনি সত্যিকার অর্থে সর্বজ্ঞ? ‘সর্বজ্ঞ’ শব্দটি তো আমাদের ধারণা দেয় যে তিনি শুধু তথ্য জানেন না, বরং মানুষের জীবন ও মানসিকতায় প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা রাখেন। যদি মানুষের অনুভূতির সূক্ষ্মতা, বেদনা, প্রেম, ভালোবাসা, শোক, আতঙ্ক—এসব তার কাছে কেবলই তাত্ত্বিক জ্ঞান হয়, তাহলে কি তিনি প্রকৃত সর্বজ্ঞ?

এই দ্বন্দ্ব আমাদের সামনে একটি মৌলিক সমস্যা তুলে ধরে: সর্বজ্ঞতার অর্থ কী? শুধুমাত্র তথ্যগত জ্ঞান, নাকি প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার অন্তর্ভুক্তি? এবং যদি সর্বজ্ঞতা অভিজ্ঞতাকে অন্তর্ভুক্ত করে, তাহলে কি ঈশ্বরের ঐ অভিজ্ঞতা মানব অভিজ্ঞতার অনুরূপ হতে পারে? এই প্রশ্নগুলো ইসলামিক ঈশ্বরতত্ত্বের ভিত্তিতে আমাদেরকে চিন্তা করতে বাধ্য করে যে, আল্লাহর সর্বজ্ঞতা কি শুধু একটি অন্ধবিশ্বাসীদের নির্বোধ দাবী, নাকি তা মানব জীবনের অভিজ্ঞতাগত গভীরতা পর্যন্ত বিস্তৃত? এই লেখায় আমরা বিশ্লেষণ করবো কিভাবে ইসলামের আল্লাহর ধারণা এই অভিজ্ঞতামূলক জ্ঞানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক, এবং কেন এই দ্বন্দ্ব ঈশ্বরতত্ত্বে এক মৌলিক সমস্যা সৃষ্টি করে।


সর্বজ্ঞ কাকে বলে, এর অর্থ কী

‘সর্বজ্ঞ’ শব্দটি অনেক সময়েই আমরা ব্যবহার করি অত্যন্ত অবলীলায়, বিশেষত ঈশ্বরবিষয়ক আলোচনায়। কিন্তু দর্শন এবং যুক্তিবিদ্যার পরিভাষায় ‘সর্বজ্ঞ’ (omniscient) সত্তার ধারণা একটি জটিল ও গভীর বিষয়। এখানে ‘জ্ঞান’ বলতে কেবল কিছু তথ্য জানা বোঝায় না; বরং এর ভেতরে রয়েছে বিভিন্ন স্তরের ও প্রকৃতির জ্ঞান। ‘সর্বজ্ঞ’ সত্তা বলতে বোঝানো হয় এমন একজন, যিনি সকল সত্য—অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ—সম্পর্কে নিখুঁত ও পরিপূর্ণভাবে অবগত। এই জ্ঞানের পরিধি কেবল বাহ্যিক ঘটনার তথ্য নয়, বরং প্রত্যেক জীবের মনের অন্তর্জালে যে অনুভব, আবেগ, যন্ত্রণা বা আনন্দ প্রবাহিত হচ্ছে—তাও এতে অন্তর্ভুক্ত হওয়া উচিত। অর্থাৎ, ঈশ্বর যদি সত্যিকার অর্থে ‘সর্বজ্ঞ’ হন, তবে তিনি শুধু জানেন না যে কেউ কষ্টে আছে, বরং সেই কষ্টটি কেমন লাগে, তা-ও তিনি অনুভব করেন। যদি অনুভব না করেন, তবে তা কেবল তথ্যগত সর্বজ্ঞতা—যা দর্শনের দৃষ্টিতে খণ্ডিত। তাই ‘সর্বজ্ঞ’ শব্দটির অর্থ হতে হবে এমন এক পরিপূর্ণ জানার ক্ষমতা, যা অভিজ্ঞতা, অনুভূতি এবং বাস্তবতার প্রতিটি সূক্ষ্ম স্তর পর্যন্ত বিস্তৃত।


যৌক্তিক জ্ঞান বনাম উপলব্ধিগত জ্ঞান

এই আলোচনার প্রেক্ষিতে আমরা জ্ঞানকে প্রধানত দুটি ভাগে ভাগ করতে পারি—প্রস্তাবনামূলক জ্ঞান (propositional knowledge) এবং অভিজ্ঞতামূলক জ্ঞান (experiential knowledge)।

প্রস্তাবনামূলক জ্ঞান হলো এমন জ্ঞান যা যুক্তি, উপাত্ত এবং তত্ত্বের মাধ্যমে অর্জিত হয়, যার জন্য সরাসরি ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার প্রয়োজন হয় না। যেমন, “বরফ ঠাণ্ডা” এটি একটি তথ্যগত সত্য। ধরা যাক, আমাদের কাছে দুটি পাত্র আছে এবং প্রতিটিতে দুটি করে আপেল আছে। আমরা যদি পাত্র দুটির আপেলগুলো যোগ করি, তবে গাণিতিক নিয়ম অনুযায়ী মোট চারটি আপেল পাবো। এই একই যৌক্তিক কাঠামো ব্যবহার করে আমরা বলতে পারি যে, দুটি পাত্রে দুটি করে কমলা থাকলেও মোট চারটি কমলাই হবে—এর জন্য আমাদের ব্যক্তিগতভাবে কমলা দেখার বা পরীক্ষা করার প্রয়োজন নেই। এটি একটি বস্তুনিষ্ঠ এবং যৌক্তিক অনুমান যা নিছক আবেগের ওপর ভিত্তি করে নয়, বরং গাণিতিক ধ্রুবকের ওপর প্রতিষ্ঠিত।

অন্যদিকে, অভিজ্ঞতামূলক জ্ঞান (experiential knowledge) বা ‘কোয়ালিয়া’ (Qualia) হলো সরাসরি কোনো বিষয় বা অনুভূতির প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা থেকে অর্জিত জ্ঞান [1] বরফ স্পর্শ করার মাধ্যমে যে শীতলতার অনুভূতি মস্তিষ্কে তৈরি হয়, তা কেবল বর্ণনার মাধ্যমে অর্জন করা অসম্ভব। যিনি জন্ম থেকে শীতলতার অনুভূতির সাথে পরিচিত নন, তাকে হাজারো তত্ত্ব দিয়েও সেই অনুভূতির প্রকৃত স্বাদ বোঝানো সম্ভব নয়।

এই উপলব্ধিগত বা অভিজ্ঞতামূলক জ্ঞান কীভাবে প্রাণীর মধ্যে তৈরি হয়, তা বুঝতে হলে আমাদের মস্তিষ্কের একটি বিশেষ কোষীয় কাঠামো সম্পর্কে জানতে হবে, যাকে বলা হয় ‘মিরর নিউরন’ (Mirror Neurons)। মিরর নিউরন হলো এমন এক ধরনের মস্তিষ্ক-কোষ যা কোনো প্রাণী নিজে যখন কোনো কাজ করে তখন যেমন সক্রিয় হয়, ঠিক একইভাবে অন্য কাউকে সেই একই কাজ করতে দেখলেও সক্রিয় হয়ে ওঠে [2]। নব্বইয়ের দশকের শুরুতে ইতালির পারমা বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকরা বানরের মস্তিষ্কে প্রথম এই নিউরনের অস্তিত্ব খুঁজে পান। তারা দেখেন যে, একটি বানর যখন কোনো ফল হাতে নেয়, তখন তার মস্তিষ্কের যে অংশটি সক্রিয় হয়, অন্য একটি বানরকে ফলটি নিতে দেখলেও তার মস্তিষ্কের ঠিক সেই একই অংশটি একইভাবে সক্রিয় হয়ে উঠছে।

মানুষ এবং অন্যান্য উচ্চতর সামাজিক প্রাণীর ক্ষেত্রে এই মিরর নিউরনগুলো ‘এম্প্যাথি’ বা সহমর্মিতা তৈরির মূল কারিগর হিসেবে কাজ করে। যখন আমরা কাউকে যন্ত্রণায় কাতরাতে দেখি, আমাদের মস্তিষ্কের মিরর নিউরনগুলো সেই যন্ত্রণার দৃশ্যটিকে আমাদের নিজেদের স্নায়ুতন্ত্রে ‘সিমুলেট’ বা অনুকরণ করে [3]। এর ফলে আমরা অন্যের কষ্ট দেখে নিজেরাও এক ধরনের অস্বস্তি বা ব্যথা বা মূল ব্যথার একটি ক্ষুদ্র সংস্করণ অনুভব করি। এটি কোনো অতিপ্রাকৃত বিষয় নয়, বরং বিবর্তনীয় প্রক্রিয়ায় সামাজিক বন্ধন দৃঢ় করার জন্য প্রাণীর ভেতরে গড়ে ওঠা একটি জৈবিক মেকানিজম। এই মিরর নিউরনের কারণেই আমরা সিনেমায় কোনো বিয়োগান্তক দৃশ্য দেখে কেঁদে ফেলি বা অন্যকে আঘাত পেতে দেখে শিউরে উঠি। প্রাণিজগতে টিকে থাকার জন্য একে অপরের অবস্থা বুঝতে পারা এবং অন্যের অনুভূতির ভাগ নেওয়া অপরিহার্য ছিল, যা এই নিউরনগুলোর মাধ্যমেই সম্ভব হয়েছে।

সুতরাং, সন্তান হারানোর যন্ত্রণা কেবল সেই মা-ই প্রকৃত অর্থে বুঝতে পারেন যার মস্তিষ্কের নিউরাল নেটওয়ার্ক সেই অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে গেছে। অন্যের কষ্ট দেখে আমাদের মিরর নিউরনগুলো সক্রিয় হয়ে একটি ধারণা দেয় ঠিকই, কিন্তু সেই অভিজ্ঞতার সামগ্রিকতা বা কোয়ালিয়া কেবল প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার মাধ্যমেই সম্পন্ন হয়। সেই প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা না হলে সেই জ্ঞানটি খণ্ডিত, কোনভাবেই পরিপূর্ণ জ্ঞান নয়। পরিপূর্ণ জ্ঞান হতে হলে অবশ্যই সেই মা যেই কষ্ট অনুভব করেছেন, তা হুবুহু ঈশ্বরেরও বোধ করতে হবে।

এখন এই বৈজ্ঞানিক ও দার্শনিক প্রেক্ষাপট থেকে একটি গভীর মৌলিক প্রশ্ন উত্থাপিত হয়: যদি কোনো সত্তা (যেমন সৃষ্টিকর্তা) জৈবিক বিবর্তন প্রক্রিয়ার অংশ না হন এবং তার যদি কোনো স্নায়বিক কাঠামো বা মিরর নিউরন না থাকে, তবে তিনি কি মানুষের শারীরিক ও মানসিক যন্ত্রণার প্রকৃত ‘অনুভূতি’ অনুধাবন করতে সক্ষম? আল্লাহ যদি নিজে কোনো মানবিক দুঃখ, ক্ষুধা, যৌন আকাঙ্ক্ষা বা মৃত্যুর ভয়ে ভীত হওয়ার অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে না যান, তবে কি তার পক্ষে সেই অনুভূতিগুলো বাস্তব অর্থে জানা সম্ভব? যদি তিনি কেবল তথ্যগতভাবে জানেন যে “মানুষ কষ্ট পাচ্ছে”, তবে তা হবে প্রস্তাবনামূলক জ্ঞান; কিন্তু সেই কষ্টের ‘স্বাদ’ বা ‘অনুভূতি’ (Qualia) জৈবিক অভিজ্ঞতা ছাড়া অর্জন করা কি যৌক্তিকভাবে সম্ভব? যদি তিনি নিজেই সেই অনুভূতি বোধ না করেন, তবে তাকে কি পূর্ণাঙ্গ অভিজ্ঞতাসম্পন্ন বা সর্বজ্ঞানী বলা চলে?


ইসলামী ঈশ্বরতত্ত্বে আল্লাহর ধারণা

ইসলামে আল্লাহ হলেন অতুলনীয়—“لَيْسَ كَمِثْلِهِ شَيْءٌ” (তার মতো কোনো কিছুও নেই)। তিনি আদি ও অনন্ত, সময় ও স্থান থেকে মুক্ত, এবং সমস্ত জ্ঞান ও বোধের অধিকারী। কোরআনের বর্ণনায় আল্লাহ সবকিছু জানেন, মস্তিষ্কের গভীরতম কোণ থেকে শুরু করে সর্বস্তরের তথ্য সম্পর্কে তার অবগতির অভাব নেই। মানব মনের সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম অনুভূতিসহ সমস্ত বিষয় তিনি জানেন। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, উপলব্ধি ছাড়া সেই জানার প্রকৃতি কেমন?

ইসলামি দৃষ্টিকোণ থেকে, আল্লাহর পক্ষে কোনো শারীরিক বা মানসিক মানবিক যন্ত্রণা ভোগ করা সম্ভব নয়। কারণ ঈশ্বর সর্বোচ্চ, পূর্ণতায় অঙ্গীভূত এবং সীমাবদ্ধতার বাইরে। তিনি সময় ও স্থানের ঊর্ধ্বে, সর্বশক্তিমান ও সর্বজ্ঞ।

এখন ভাবুন, একটি শিশুর পেটে প্রচণ্ড ব্যাথা হচ্ছে। এই ব্যাথার তীব্রতা, অবস্থান (ডানপাশে না বামপাশে), ব্যথার প্রকৃতি—এসব কেবল ঐ শিশুরই জানা সম্ভব। কারণ এটি একান্ত নিজস্ব ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা, যার সঙ্গে কেউ অন্য কেউ সরাসরি মিলিয়ে দেখতে পারে না। এর কোন পরিমাণ হয় না, এর কোন রেকর্ড সম্ভব নয়। তাহলে প্রশ্ন উঠে: এই শিশুর ব্যথার সেই সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম অনুভূতি আল্লাহর জানা কি রকম হতে পারে? যদি আল্লাহ শুধুমাত্র “জানেন,” অর্থাৎ তথ্যগত জ্ঞান রাখেন, তবে কি তিনি সত্যিকার অর্থে “সর্বজ্ঞ” — যিনি সব অভিজ্ঞতার গভীরতায় প্রবেশ করেন? উপলব্ধি করেন? আল্লাহ কি শিশুর সেই ব্যথা অনুভবও করেন?

যদি আল্লাহ সেই ব্যথার অনুভূতি না পান, তাহলে শিশুর সেই ব্যথার পরিপূর্ণ অভিজ্ঞতা বা জ্ঞান আল্লাহর কাছে থাকতে পারে না। এক্ষেত্রে, আল্লাহর “সর্বজ্ঞতা” কেবল গালভরা বুলিতেই সীমাবদ্ধ থেকে যায়, যা মানব অভিজ্ঞতা ও উপলব্ধির গভীরতা স্পর্শ করতে পারে না। এই যুক্তি আমাদের সামনে ইসলামী ঈশ্বরতত্ত্বের এক জটিল ও মৌলিক সমস্যা উত্থাপন করে—অর্থাৎ, উপলব্ধি ছাড়া সর্বজ্ঞতার দাবী কীভাবে হয়?


মানব অভিজ্ঞতার পুনঃনির্মাণ

ভাবুন, যদি এমন একটি মেশিন তৈরি করা যায়… (কাল্পনিক চিত্রকল্প) যদি এমন একটি মেশিন তৈরি করা যায়, যা কোনো মানুষের প্রতিটি অনুভূতি, আবেগ, ইন্দ্রিয়লব্ধ অভিজ্ঞতা—যেমন ত্বকের স্পর্শানুভূতি, চোখের অশ্রু, হৃদয়ের আতঙ্ক, প্রেমে পড়ার উত্তাপ, প্রথম প্রেমের প্রেমিকার হাত ধরার কাঁপা অনুভূতি, নিজের কন্যাকে প্রথমবার কোলে নেয়ার অনুভূতি, কিংবা সন্তান হারানোর অসহ্য বেদনা—সব কিছু রেকর্ড করে রাখতে পারে, এবং সেই ডেটা বিশ্লেষণ করে ঐ ব্যক্তির মানসিক অবস্থার প্রতিটি সূক্ষ্ম দিক বুঝে ফেলতে পারে, তাহলে সেই মেশিনটির কাছে ঐ ব্যক্তির অভিজ্ঞতাগুলো সম্পূর্ণভাবে “জানা” হয়ে যাবে। সেই জ্ঞান কেবল বাহ্যিক পর্যবেক্ষণ নয়—তা হবে অভ্যন্তরীণ জ্ঞানের পুনঃনির্মাণ। এই মেশিন কোনো কিছুই এড়িয়ে যেতে পারবে না; সে সব কিছু জানতে বাধ্য হবে।

এখানে এক গভীর দার্শনিক প্রশ্ন উঠে আসে। বিখ্যাত দার্শনিক থমাস ন্যাগেল তাঁর প্রবন্ধ “What is it like to be a bat?” (১৯৭৪) তে আলোচনায় আনে যে, প্রত্যেক জীবের অভিজ্ঞতার একটি ‘সাবজেক্টিভ’ দিক থাকে — অর্থাৎ, একটি অভ্যন্তরীণ মানসিক অবস্থার অনুভূতি, যেটা বাইরে থেকে কেবল তথ্যগতভাবে বোঝা বা রেকর্ড করা সম্ভব নয়। ন্যাগেল বলেন, অন্য কারো অভিজ্ঞতার ‘মনের ভিতরকার ভাব’ বা ‘what it is like’ বুঝতে পারা সম্ভব নয় শুধুমাত্র বাহ্যিক তথ্যের মাধ্যমে।

অর্থাৎ, একটি মেশিন যতই ডেটা সংগ্রহ করুক না কেন, সেটা ‘অভিজ্ঞতার প্রকৃত গভীরতা’ উপলব্ধি করতে পারবে না—কারণ ‘অভিজ্ঞতা’ কেবল তথ্য নয়, এটি একটি প্রত্যক্ষতাস্বরূপ অনুভূতি যা মস্তিষ্কের অভ্যন্তরীণ প্রক্রিয়ার সঙ্গে সম্পর্কিত।

এবার, যদি ঈশ্বর সত্যিকার অর্থে সর্বজ্ঞ হন, তাহলে তার জ্ঞান অবশ্যই এই অভ্যন্তরীণ দৃষ্টিভঙ্গি অন্তর্ভুক্ত করতে হবে—সেখানে কোনো অভিজ্ঞতা এড়িয়ে যাওয়া যাবে না, তা যত যন্ত্রণাদায়ক বা লজ্জাজনকই হোক না কেন। অন্যথায়, ঈশ্বরের সর্বজ্ঞতা হবে আধা-জ্ঞান, তথ্যগত সীমাবদ্ধতা যুক্ত জ্ঞান।

এখন, এখানে আবার রেনে দেকার্তের ‘কার্তেসিয়ান ডুয়ালিজম’ (Cartesian Dualism) এর কথা স্মরণ রাখা জরুরি, যেখানে তিনি বলেছিলেন মনের অভিজ্ঞতা শারীরিক শরীর থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। যদি ঈশ্বর শুধু একজন বহিরাগত পর্যবেক্ষক হন, তাহলে তার পক্ষে মানুষের অভ্যন্তরীণ মনের অনুভূতি পূর্ণাঙ্গভাবে জানা সম্ভব নয়।


একটি নীতিকথা: বীরবল ও প্রহরীর গল্প

এখানে একটি চতুর নীতিকথা আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে। একবার নাকি আকবর এক শিকার অভিযানে গিয়ে বীরবলের সাথে প্রথম মুখোমুখি হন। তার কোনো এক বুদ্ধিদীপ্ত কাজে খুশি হয়ে সম্রাট তাকে একটি আংটি দিয়ে প্রাসাদে এসে দেখা করতে বলেন। বীরবল যখন প্রাসাদের প্রধান ফটকে উপস্থিত হন, তখন তার জীর্ণবস্ত্র দেখে প্রহরীরা তাকে বাধা দেয়। সম্রাটের আংটি দেখে তারা বুঝতে পারে যে তিনি সম্রাটের কাছ থেকে কোনো পুরস্কারের দাবীদার। প্রাপ্ত পুরষ্কারের অর্ধেক তাদের দিতে হবে এই শর্তে প্রহরীরা তাকে ভেতরে যেতে দেয়।

দরবারে সম্রাট যখন বীরবলকে জিজ্ঞেস করেন যে তিনি কী পুরষ্কার আশা করেন, তখন বীরবল নিজের জন্য একশোটি চাবুকের আঘাত চেয়ে বসেন। এই বিস্ময়কর আব্দারের কারণ জানতে চাইলে বীরবল পুরো ঘটনা খুলে বলেন। বুদ্ধিমান বীরবল এই পুরষ্কারটি চান, কারণ তিনি সেই প্রহরীকে উচিত শিক্ষা দিতে চাচ্ছিলেন। তার উপস্থিত বুদ্ধিতে চমৎকৃত হয়ে আকবর তৎক্ষণাৎ সেই প্রহরীদের পঞ্চাশটি করে চাবুকের আঘাত করতে নির্দেশ দেন এবং বীরবলকে তার একজন উপদেষ্টা হিসেবে গ্রহণ করেন।

এই গল্প আমাদের একটি গভীর দার্শনিক বিষয় শেখায়—যে কোন জ্ঞানের দাবি করবে, তাকেও সেই অভিজ্ঞতার দায়ও বহন করতে হবে। যদি ঈশ্বর দাবি করেন যে তিনি মানবিক অভিজ্ঞতার সর্বোচ্চ জ্ঞান রাখেন, তবে তাকে কেবল সেটির ধারণাগত দিক নয়, বরং সেই অভিজ্ঞতার ব্যথা, শোক, অবসাদ, লজ্জা ও অপমানকেও ধারণ করতে হবে।


সন্তানহারা মায়ের কষ্টের উপলব্ধি

যদি আল্লাহ সর্বজ্ঞ হন, তাহলে তার কাছে একজন সন্তানহারা মায়ের মনের হাহাকার, বেদনা ও অসহ্য কষ্টের পূর্ণাঙ্গ উপলব্ধি থাকতে হবে। অর্থাৎ, আল্লাহ শুধুমাত্র ‘জানেন’ বললেই হবে না, তার ‘অভিজ্ঞতা’ এবং একইসাথে ‘উপলব্ধি’ বা অন্তরগত অনুভূতিও সেই একই গভীরতায় উপস্থিত থাকতে হবে।

এখানে দর্শনে ‘ইন্টারস্পেকশন’ বা আত্মপর্যালোচনার ধারণা প্রাসঙ্গিক। ইন্টারস্পেকশন হলো নিজের মনস্তাত্ত্বিক অবস্থা বা অনুভূতি সম্পর্কে স্ব-জ্ঞান অর্জনের প্রক্রিয়া। একজন সন্তানহারা মা নিজের অভ্যন্তরীণ যন্ত্রণাকে গভীরভাবে অনুভব করেন, যা কেবল বাহ্যিক পর্যবেক্ষণ বা তথ্য-জ্ঞান দ্বারা জানা বোঝা উপলব্ধি করা সম্ভব নয়।

আবার, ‘এমপ্যাথি’ বা সহানুভূতির তত্ত্ব বলছে অন্যের অভিজ্ঞতা বোঝার জন্য কেবল তথ্য থাকা যথেষ্ট নয়, অন্তত কিছু মাত্রায় সেই অভিজ্ঞতা ‘মনের ভিতর থেকে’ অনুভব করাও জরুরি। অর্থাৎ, অন্য কারো যন্ত্রণাকে সত্যিকার অর্থে বুঝতে গেলে সেই যন্ত্রণার ‘মনস্তাত্ত্বিক পুনঃঅভিজ্ঞতা’ প্রয়োজন। যদি আল্লাহ সন্তানের বেদনা উপলব্ধি করতে না পারেন, অর্থাৎ তার সেই অভ্যন্তরীণ মানসিক অনুভূতির দ্বারা তৈরি হওয়া ‘এমপ্যাথি’ না থাকে, তাহলে আল্লাহর সর্বজ্ঞতা অপূর্ণ থাকবে। এ কারণে এই ধারণা ইসলামী ঈশ্বরতত্ত্বের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হয়ে ওঠে, যেখানে আল্লাহকে সর্বজ্ঞ এবং সর্বদর্শী বলে বিবেচনা করা হয়।


সমকামী পুরুষের যৌনানন্দের উপলব্ধি

ধরে নিই, একজন সমকামী পুরুষ যিনি নিজের শরীরে অন্য পুরুষের পুরুষাঙ্গ প্রবেশ করিয়ে যৌন তৃপ্তি অনুভব করেন। তিনি যদি বহুজনের সঙ্গে সহবাস করেন, এবং প্রতিবারই সেই যৌনক্রিয়ার প্রতিটি মুহূর্ত—আবেগ, উত্তেজনা, শারীরিক সংবেদন, অভ্যন্তরের চাপ ও রিলিজের অনুভব—সবই তার মস্তিষ্কে সঞ্চিত হয়, তবে এই প্রতিটি অভিজ্ঞতা কি সর্বজ্ঞ আল্লাহর জ্ঞানের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত হয়? আল্লাহ কি সেগুলোও উপলব্ধি করেন? অনুভব করেন? সেই উপলব্ধী, অভিজ্ঞতামূলক জ্ঞান, অনুভূতি ও সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম জ্ঞান আল্লাহর না থাকলে, আল্লাহ কীভাবে সর্বজ্ঞানী বলে নিজেকে দাবী করেন? প্রতিবার কোন পুরুষ যখন তার শরীরে পুরুষাঙ্গ প্রবেশ করান, প্রতিবারই তো একই অনুভূতি ও উপলব্ধী আল্লাহরও হবে, যদি তিনি সর্বজ্ঞ বলে নিজেকে দাবী করেন।

এই প্রশ্ন ধর্মতত্ত্বের একটা স্পর্শকাতর অথচ এড়িয়ে যাওয়ার অযোগ্য দিক উন্মোচন করে: সর্বজ্ঞতার দাবি কি এমন সব অভিজ্ঞতা ও অনুভূতির জ্ঞানও দাবি করে, যা ধর্মীয়ভাবে ‘পাপ’ বা ‘অশুচি’ বলে বিবেচিত হয়?

দর্শনের ভাষায়, এখানে উঠে আসে “knowledge by acquaintance” (পরিচয়ের মাধ্যমে প্রাপ্ত জ্ঞান) বনাম “knowledge by description” (বর্ণনার মাধ্যমে প্রাপ্ত জ্ঞান) তত্ত্ব। বার্ট্রান্ড রাসেল এই দুইয়ের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য টেনেছেন। তার মতে, কারো অভ্যন্তরীণ অনুভূতি ও অভিজ্ঞতার সত্যিকার জ্ঞান কেবলমাত্র সেই ব্যক্তি যিনি তা প্রত্যক্ষভাবে অনুভব করেছেন—তিনিই অর্জন করতে পারেন। বর্ণনার মাধ্যমে কেবল একটা ছায়া পাওয়া যায়, মূল জ্ঞান নয়।

যদি আমরা বলি, ঈশ্বর কেবল “বর্ণনার মাধ্যমে” সেই অভিজ্ঞতাগুলি জানেন, তাহলে তার জ্ঞান সীমিত—তার অভিজ্ঞতা second-hand। পক্ষান্তরে, যদি তিনি সত্যিকার অর্থে তা জানেন, তাহলে তার জ্ঞান ওই সমকামী পুরুষের মনের ভেতরকার শিহরণ ও আনন্দসহ অভ্যন্তরীণ অনুভবও ধারণ করে। তাহলে ঈশ্বরের চেতনাতেও সেই যৌনানন্দের একধরনের অংশগ্রহণ থাকে।

এক্ষেত্রে উদ্ভব হয় আরেকটি সমস্যা, যেটি বিশেষ করে ইসলামী ঈশ্বরতত্ত্বে দ্বন্দ্ব সৃষ্টি করে—আল্লাহ পবিত্র, নিষ্পাপ ও ‘অশুচি’ থেকে মুক্ত। তাহলে, কিভাবে তিনি এমন এক অভিজ্ঞতার পুরোটা ধারণ করতে পারেন, যেটি ইসলামী নৈতিকতার পরিপন্থী বলে বিবেচিত?

এই দ্বন্দ্বের ফলাফল আমাদের টেনে নিয়ে আসে একটি গভীর ও দার্শনিক সিদ্ধান্তে: সর্বজ্ঞতা যদি এমন অভিজ্ঞতাও ধারণ করে যা একজন ঈশ্বরের জন্য ‘অশোভন’ বা ‘অনভিপ্রেত’, তবে ঈশ্বরের পবিত্রতা ও সর্বজ্ঞতার ধারণা পরস্পরবিরোধী হয়ে পড়ে।

সুতরাং বলা যায়, সর্বজ্ঞতা নিজেই একটি ধরনের দার্শনিক অভিশাপ—একটি অবস্থা, যেখানে ঈশ্বর নিজের ইচ্ছায়ও নিজেকে কিছু জানা থেকে বিরত রাখতে পারেন না, এমনকি যদি সেই জ্ঞান তার স্বভাব ও নৈতিক অবস্থানের বিরুদ্ধেও যায়।


ধর্ষিত শিশুর উপলব্ধি

ধরি, পাঁচ বা ছয় বছরের একটি মাদ্রাসার শিশু তার মাদ্রাসার শিক্ষকের হাতে ধর্ষিত হলো। এতে তার পায়ুপথ ছিন্ন বিচ্ছিন্ন হয়ে গেল, রক্ত বের হয়ে তার প্রচণ্ড কষ্ট হতে লাগলো। এই শিশুটির ঠিক কেমন লাগছে, ব্যাথা ও যন্ত্রণার পরিমাণ ঠিক কত, তা শুধুমাত্র এই শিশুটির পক্ষেই জানা সম্ভব। যার এই অভিজ্ঞতা নেই, তার পক্ষে পরিপূর্ণভাবে সেটি কোনদিনই জানা সম্ভব নয়। বাইরে থেকে সেই শিশুটির যন্ত্রণা দেখে তার আসলেই কতটা যন্ত্রণা, তা কোনভাবেই উপলব্ধি করা সম্ভব নয়। এবং আল্লাহও যদি সেটি জেনে থাকেন, তাহলে সেই অভিজ্ঞতার জ্ঞানটি আল্লাহও হতে হবে, অর্থাৎ উপলব্ধিতেও থাকতে হবে। অর্থাৎ আল্লাহর পশ্চাতদেশেও আল্লাহ ঠিক একই ব্যাথা অনুভব করবেন, নতুবা সেই জ্ঞানটি কিছুতেই পরিপূর্ণ জ্ঞান হবে না।


অভিজ্ঞতা ও উপলব্ধিহীন জ্ঞানের অপূর্ণতা

জ্ঞানের পূর্ণতা কেবল তথ্যের ওপর নির্ভর করে কি না, এটি দর্শনের একটি ধ্রুপদী বিতর্ক। এই আলোচনার প্রেক্ষিতে আমরা যদি কোনো সত্তার (যেমন ঈশ্বর) “সর্বজ্ঞতা” বা Omniscience-এর দাবিকে বিশ্লেষণ করি, তবে কয়েকটি গুরুতর যৌক্তিক ও বৈজ্ঞানিক সংকট দৃশ্যমান হয়।

👁️‍🗨️
কোয়ালিয়া এবং মেরি’র কামরা (Mary’s Room Argument)
দার্শনিক ফ্রাঙ্ক জ্যাকসন তার বিখ্যাত ‘মেরি’র কামরা’ (Mary’s Room) তত্ত্বে দেখিয়েছেন যে, তথ্যের সমাহার আর উপলব্ধির অভিজ্ঞতা এক নয় [1]। মেরি একজন বিজ্ঞানী, যিনি রঙের সমস্ত পদার্থবিদ্যা (Physics) জানেন—কোন তরঙ্গদৈর্ঘ্যে কোন রং হয়, চোখের স্নায়ু কীভাবে সংকেত পাঠায়—সবই তার মুখস্থ। কিন্তু মেরি জন্ম থেকে একটি সাদাকালো ঘরে বড় হয়েছেন। যখন তিনি প্রথমবার ঘর থেকে বের হয়ে একটি লাল গোলাপ দেখলেন, তখন তিনি নতুন কিছু শিখলেন—তা হলো ‘লাল রঙের অনুভূতি’ বা কোয়ালিয়া (Qualia)।

একই যুক্তিতে, একজন সর্বজ্ঞাতা সত্তা যদি কেবল তথ্যগতভাবে জানেন যে “ধর্ষিত শিশুটি আতঙ্কিত”, তবে সেই জ্ঞান কেবল প্রস্তাবনামূলক (Propositional)। কিন্তু আতঙ্কের সেই সুতীব্র শারীরিক ও মানসিক ‘অনুভূতি’ বা কোয়ালিয়াটি যদি সেই সত্তার অভিজ্ঞতায় না থাকে, তবে তার জ্ঞান অসম্পূর্ণ থেকে যায়। কারণ, “আতঙ্ক কী” তা জানা আর “আতঙ্ক অনুভব করা” এক বিষয় নয়।

🧠
এম্প্যাথি ও মিরর নিউরনের অনুপস্থিতি
স্নায়ুবিজ্ঞান অনুযায়ী, সহমর্মিতা বা এম্প্যাথি (Empathy) মূলত দুটি স্তরে কাজ করে:
  • কগনিটিভ এম্প্যাথি: অন্যের কষ্ট কেবল বুদ্ধি দিয়ে বুঝতে পারা।
  • অ্যাফেক্টিভ এম্প্যাথি: অন্যের কষ্ট নিজের স্নায়ুতন্ত্রে অনুভব করা।
মানুষের মস্তিষ্কের মিরর নিউরন এবং অ্যান্টিরিয়র ইনসুলা (Anterior Insula) আমাদের অন্য প্রাণীর কষ্টকে নিজের ভেতরে ‘সিমুলেট’ করতে সাহায্য করে [4]। যদি কোনো সত্তা দেহহীন বা জৈবিক বিবর্তনের ঊর্ধ্বে হন, তবে তার পক্ষে এই ‘অ্যাফেক্টিভ এম্প্যাথি’ থাকা জৈবিকভাবে অসম্ভব। যদি ঈশ্বর ক্ষুধার্ত মানুষের পাকস্থলীর জ্বলন কিংবা যুদ্ধবিধ্বস্ত জনপদের হাহাকার নিজের স্নায়ুতন্ত্রে (যদি থেকে থাকে) অনুভব না করেন, তবে তার “রহমান” বা “রাহিম” (পরম দয়ালু ও করুণাময়) হওয়ার দাবিটি প্রশ্নবিদ্ধ হয়। কারণ, সহানুভূতির আদি শর্তই হলো অন্যের যন্ত্রণাকে নিজের ভেতরে ধারণ করা। যে যন্ত্রণা অনুভব করা যায় না, তার প্রতি প্রকৃত করুণা প্রদর্শন কেবল একটি যান্ত্রিক বা গাণিতিক দয়া হতে পারে, মানবিক বা আবেগীয় সহমর্মিতা নয়।
সীমাবদ্ধতার জ্ঞান বনাম অসীম সত্তা
সর্বজ্ঞানী হওয়ার জন্য একটি যৌক্তিক প্যারাডক্স বা কূটাভাস তৈরি হয়। পূর্ণাঙ্গ জ্ঞানের অন্তর্ভুক্ত হতে হবে নিম্নোক্ত বিষয়গুলো:
  • ভয় পাওয়া বা আতঙ্কের অনুভূতি।
  • শারীরিক লালসা বা যৌন তৃপ্তির অভিজ্ঞতা।
  • সীমাবদ্ধ হওয়ার বা মৃত্যুভয়ের অভিজ্ঞতা।
যদি ঈশ্বর অসীম এবং অমর হন, তবে তার পক্ষে ‘মরণশীলতার ভয়’ অনুভব করা অসম্ভব। যদি তিনি অভীষ্ট বা কামনার ঊর্ধ্বে হন, তবে ‘লোভ’ বা ‘লালসা’র অনুভূতি তার কাছে অপরিচিত। ফলে, মানুষের জীবনের একটি বিশাল অংশের অভিজ্ঞতা (যা আবেগ ও দেহজ অনুভূতির ওপর দাঁড়িয়ে) সেই সত্তার কাছে কেবল ‘বাহ্যিক পর্যবেক্ষণ’ হিসেবে থাকে, ‘অন্তর্নিহিত উপলব্ধি’ হিসেবে নয়।

যৌক্তিক সিদ্ধান্ত: যদি কোনো সত্তা ক্রোধ, ঘৃণা, যৌন আনন্দ কিংবা অসহায়ত্বের মতো তীব্র দেহজ ও মানসিক অনুভূতিগুলো নিজে সরাসরি অভিজ্ঞতার মাধ্যমে না জানেন, তবে তার “সর্বজ্ঞতা” কেবল তাত্ত্বিক বা ডাটাবেজ-ভিত্তিক জ্ঞানে সীমাবদ্ধ। এই ধরনের জ্ঞানকে “পরিপূর্ণ জ্ঞান” বলা চলে না, কারণ এতে মহাবিশ্বের সচেতন প্রাণীদের অভিজ্ঞতার নির্যাস বা ‘কোয়ালিয়া’ অনুপস্থিত থাকে।


উপসংহার

ইসলামী আল্লাহ ধারণাকে দার্শনিক বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, অভিজ্ঞতামূলক জ্ঞান ও অনুভূতির বাস্তব উপলব্ধির জ্ঞান সত্যিকার অর্থে একটি ভয়াবহ এবং মারাত্মক অভিশাপ। কারণ প্রতিটি মুহূর্তে তার লক্ষ লক্ষ মানুষের সীমাহীন কষ্টের অনুভূতি উপলব্ধি করতে হচ্ছে। মানুষ একটি সময় ভুলে যায়, স্বজন হারানোর বেদনা কিংবা নিজের শারীরিক যন্ত্রণার কথা। মানুষের মস্তিষ্ক এভাবেই ধীরে ধীরে বিবর্তনের ধারায় পরিবর্তিত হয়েছে যে, মানুষ ক্রমশ এগুলো ভুলে যাবে। কিন্তু আল্লাহর তো সেগুলো ভুলে যাওয়ার উপায় নেই। মানব মনের আবেগ, অনুভূতি, যন্ত্রণার গভীরতা উপলব্ধি নিশ্চিতভাবেই এক মস্তবড় অভিশাপ। এর ফলে “সর্বজ্ঞ” দাবিটি একটি নির্বোধ দাবী, যা আল্লাহর অসহায়ত্বই প্রমাণ করে।



তথ্যসূত্রঃ
  1. Jackson, F. (1982). Epiphenomenal Qualia. Philosophical Quarterly, 32, 127–136. 1 2
  2. Rizzolatti, G., & Craighero, L. (2004). The mirror-neuron system. Annual Review of Neuroscience, 27, 169-192. ↩︎
  3. Iacoboni, M. (2009). Imitation, empathy, and mirror neurons. Annual Review of Psychology, 60, 653-670. ↩︎
  4. Decety, J., & Jackson, P. L. (2004). The functional architecture of human empathy. Behavioral and cognitive neuroscience reviews, 3(2), 71-100. ↩︎