কোরআনকে ইসলামের অনুসারীরা নির্ভুল, অনন্ত এবং আল্লাহর সরাসরি বাণী হিসেবে মেনে নেন, যা তাদের দাবী অনুসারে যেকোনো ভুল বা অসামঞ্জস্যতা থেকে মুক্ত। কিন্তু কোরআনের সংকলনকারী হযরত উসমান নিজেই এক পর্যায়ে স্বীকার করেছিলেন যে, কোরআনে কিছু শব্দ উচ্চারণের ভুল বা অসামঞ্জস্যতা রয়ে গেছে, যা শুধরে নেওয়া দরকার ছিল। যখন তাকে এই বিষয়ে প্রশ্ন করা হয়, তিনি বলেন, “এভাবেই সেগুলো থাকতে দাও, কারণ এতে কোনো বড় ধরনের পরিবর্তন বা ক্ষতি হবে না; হালালকে হারাম বা হারামকে হালাল করা হচ্ছে না।” এমন বক্তব্য একদিকে যেমন কোরআনের নির্ভুলতার দাবিকে চরমভাবে প্রশ্নবিদ্ধ করে, তেমনি কোরআনের ঐশ্বরিকতা এবং এর নির্ভুলতা সম্পর্কেও সন্দেহের সৃষ্টি করে। যদি আল্লাহর বাণী “লাওহে মাহফুজ”-এ অক্ষতভাবে সংরক্ষিত থেকে থাকে, তবে কেন এমন ত্রুটিপূর্ণ উচ্চারণ কোরআনের পাঠে অন্তর্ভুক্ত হলো? একজন মানুষের মতো করে আল্লাহর বাণীতে ত্রুটি থাকা কি আসলেই সম্ভব? এবং যদি উসমানের মতো একজন খলিফা ভুলকে সঠিক করে দেওয়ার পরিবর্তে তা বজায় রাখতে বলেন, তবে কিভাবে এটি নির্ভুল ও নির্ভরযোগ্য ধর্মগ্রন্থ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হতে পারে? এই ঘটনাটি কেবলমাত্র কোরআনের নির্ভুলতার মিথকে ভেঙে দেয় না, বরং এটি প্রমাণ করে যে, কোরআন সম্পূর্ণরূপে সংরক্ষিত বা অবিকৃত নয়। আল্লাহর বাণী হিসেবে দাবি করা একটি গ্রন্থে যদি উচ্চারণগত ভুল থেকে যায়, তবে তা কি আসলেই ঐশ্বরিক ও অনন্ত হতে পারে? কারণ ইসলামের মৌলিক বিশ্বাসই হচ্ছে, কোরআনে সামান্যতমও কোন বিকৃতি নেই! এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজতে গেলে কোরআনের ঐশ্বরিকতার দাবির ভিত্তিই দুর্বল বলে প্রতীয়মান হয় [1]
সালাত কায়েম করা বা নামাজ প্রতিষ্ঠার কথা আয়াতে বলা হয়েছে এভাবে-আল মুকুিমিনাস্ সলাহ্ (যারা সালাত কায়েম করে)। বাগবীর বর্ণনায় রয়েছে, হজরত আয়েশা এবং হজরত আবান বিন ওসমান বলেছেন, কথাটি লিখতে হতো এভাবে-আল মুকিমুনাস্ সলাহ (যারা সালাত প্রতিষ্ঠাকারী)। সূরা মায়িদার মধ্যেও এ রকম ভুল রয়েছে। যেমন একস্থানে ‘সাবেয়ুন’ লেখা হয়েছে। অথচ শব্দটি লেখা উচিৎ ছিলো ‘সাবেইন।’ আরেকস্থানে লেখা হয়েছে ‘হাজানি’- যার শুদ্ধ লিখিতরূপ ‘হাজাইনি।’ হজরত ওসমান বলেছেন, কোরআনে এ রকম কিছু কিছু ভুল উচ্চারণের শব্দ লিপিবদ্ধ রয়েছে যেগুলোকে আরববাসীরা পাঠ করার সময় সঠিকভাবে উচ্চারণ করে। তাঁকে প্রশ্ন করা হয়েছিলো, আপনি শব্দগুলোকে শুদ্ধরূপে লেখার ব্যবস্থা করেননি কেনো? উত্তরে হজরত ওসমান বলেছিলেন, এভাবেই থাকতে দাও। এর মাধ্যমে হালালকে হারাম এবং হারামকে হালাল করা হয়নি। প্রকৃত কথা এই যে, এ রকম মন্তব্য অসমীচীন। ঐকমত্যসম্মত মত এই যে, কোরআনে যা কিছু লিপিবদ্ধ রয়েছে তা ঐকমত্যসম্মতভাবেই বিশুদ্ধ। অবশ্য সেগুলোর ব্যাখ্যার বিভিন্ন রূপ থাকতে পারে। কোরআন ব্যাখ্যাকারগণ বিভিন্নভাবে সেগুলোকে ব্যাখ্যা করেছেন।


তথ্যসূত্রঃ
- তাফসীরে মাযহারী, আল্লামা কাজী মুহাম্মদ ছানাউল্লাহ পানিপথী, হাকিমাবাদ খানকায়ে মোজাদ্দেদিয়া প্রকাশনী, তৃতীয় খণ্ড, পৃষ্ঠা ৩৪৮-৩৪৯ ↩︎
