
Table of Contents
ভূমিকা
আবদুল্লাহ ইবন আবি সারাহকে ইসলামি ঐতিহ্যে কেবল একজন ‘সাধারণ সাহাবী’ হিসেবে উপস্থাপন করা হয় না; বরং তাঁকে একজন প্রথিতযশা কুরাইশ বংশীয় শিক্ষিত ব্যক্তি এবং মুহাম্মদের ‘অন্যতম প্রধান ওহী লেখক’ বলে চিহ্নিত করা হয়। এই দাবির মধ্যেই একটি গভীর সংশয়বাদী প্রশ্ন লুকিয়ে আছে: এই ‘প্রধান লেখক’ কীভাবে ধর্মত্যাগ করে মুহাম্মদের বিরুদ্ধে কোরআনের আয়াত নিজেই লেখার অভিযোগ করতে পারে? যদি তিনি সত্যিই ওহী লিপিবদ্ধ করার দায়িত্বে নিয়োজিত ছিলেন, তাহলে এই প্রক্রিয়াটি কতটা স্বচ্ছ ছিল? মুহাম্মদ যদি নিজে নিরক্ষর হয়ে থাকেন, তাহলে তিনি কীভাবে বুঝতেন, এই ওহী লেখক ঠিক লিখছে নাকি ভুল লিখছে? এই প্রশ্নগুলো শুধু ব্যক্তিগত নয়—এগুলো সরাসরি কোরআনের সংকলন প্রক্রিয়ার নির্ভরযোগ্যতাকে আক্রমণ করে।
ঐতিহাসিক বর্ণনা অনুসারে আবদুল্লাহ সচেতনভাবে শব্দ পরিবর্তন করতেন—‘সামিয়ান বাসিরান’-এর বদলে ‘আলীমান হাকিমান’ লিখতেন—এবং লক্ষ্য করতেন যে মুহাম্মদ তা ধরতে পারছেন কি না। এখানে একটি অস্বস্তিকর যৌক্তিক ফাঁক দেখা দেয়। যদি ওহী সত্যিই আল্লাহর পক্ষ থেকে অবতীর্ণ হয়, তাহলে নবী কেন প্রতিবারই শব্দগুলো অন্য কাউকে দিয়ে পড়িয়ে পড়িয়ে শুনে শুনে যাচাই করছেন না? যদি তিনি যাচাই করছেন, তাহলে কেন পরিবর্তন ধরা পড়ছে না? আমরা অন্যান্য সূত্র থেকে জানি, নবী নিজেই কোরআনের অনেক আয়াত ভুলে যেতেন [1]। তাহলে আসলেই ওহীর নামে কী লেখা হতো, তার নির্ভরযোগ্যতা কতটুকু? আমরা কী বর্তমান সময়ে মুহাম্মদের কোরআন পড়ছি নাকি এই ওহী লেখকের স্বরচিত কোন বিশেষ কোরআনের আয়াত পড়ছি, সেটি নিশ্চিত করে কীভাবে বলবো?
গুরুতর প্রশ্ন: যদি একজন সাধারণ লেখক এমন পরিবর্তন করতে পারেন এবং নবী তা ‘ওহী’ বলে গ্রহণ করেন, তাহলে কোরআনের অন্যান্য আয়াতগুলো কি নিশ্চিতভাবে নবীর মুখ থেকে অবিকল লিপিবদ্ধ হয়েছে? আরও কিছু ঘটনা থেকেই আবদুল্লাহর সংশয় জন্ম নেয়—তিনি অনুমান করেন যে মুহাম্মদ নিজেই এই বাণীগুলো রচনা করছেন। ফলে তিনি মক্কায় ফিরে গিয়ে প্রচার করতে থাকেন যে, ‘আমিও একই রকম কথা বানাতে পারি’। এই প্রচার কি শুধু একজন ব্যক্তির বিদ্রোহ, নাকি এটি ইসলামের সবচাইতে বড় কেলেঙ্কারি, যা ইসলামের সত্যতাকে প্রশ্নের সম্মুখে দাঁড় করায়?
সূরা মুমিনুনঃ মানবিক হস্তক্ষেপের অভিযোগ
আবদুল্লাহ ইবন আবি সারাহর ধর্মত্যাগের পেছনে সবচেয়ে বেশি উল্লেখিত ঘটনাটি হলো সূরা আল-মুমিনুনের ১৪ নম্বর আয়াতের অবতরণ-প্রক্রিয়া। এখানে কোরআনের বর্ণনা শুরু হয় ঈশ্বরের প্রথম পুরুষে (‘আমি’/‘আমরা’)—শুক্রবিন্দু থেকে জমাট রক্ত, মাংসপিণ্ড, হাড়, মাংসের আবরণ এবং শেষে “অন্য এক সৃষ্টিতে উন্নীত করি”—কিন্তু আয়াতের শেষ বাক্যটি হঠাৎ তৃতীয় পুরুষে চলে যায়: “কাজেই সর্বোত্তম স্রষ্টা আল্লাহ কতই না মহান!” এই ব্যাকরণগত ধারাবাহিকতার অভাব একজন যুক্তিবাদী পাঠকের কাছে তাৎক্ষণিকভাবে অস্বাভাবিক ঠেকে। যদি পুরো আয়াতটি আল্লাহর নিজের জবানীতে অবতীর্ণ হয়ে থাকে, তাহলে এই আকস্মিক ‘পার্সপেক্টিভ শিফট’ কীভাবে সম্ভব? এটি কি ঐশ্বরিক শৈলীর একটি সূক্ষ্ম বৈশিষ্ট্য, ভাষার অলঙ্কার, নাকি একজন মানুষের (আবদুল্লাহর) স্বতঃস্ফূর্ত প্রশংসা মুহাম্মদের মুখ দিয়ে ‘ওহী’ হিসেবে গৃহীত হয়ে গেছে?
বর্ণনা অনুসারে, মুহাম্মদ যখন আয়াত ডিকটেশন দিচ্ছিলেন, আবদুল্লাহ মুগ্ধ হয়ে বলে ওঠেন “ফাতাবারাকাল্লাহু আহসানুল খালিকিন” এবং মুহাম্মদ তাৎক্ষণিকভাবে নির্দেশ দেন—“এটিও লিখে নাও, এটিও অবতীর্ণ হয়েছে।” এই ঘটনাটি তাফসীরে মাযহারী, বাগবী, ইবন জারীর প্রমুখ পরবর্তীকালীন গ্রন্থে উল্লেখিত। কিন্তু এখানে গুরুতর প্রশ্ন: যদি একজন সাধারণ লেখকের মুখ থেকে বের হওয়া একটি প্রশংসাবাক্য তাৎক্ষণিকভাবে ‘ওহী’ হয়ে যেতে পারে, তাহলে কোরআনের অন্য কোনো অংশে কতটা ‘মানবিক হস্তক্ষেপ’ ঘটেছে যা আমরা কখনো ধরতে পারিনি? এটি কি আবদুল্লাহর জন্য একটি সুবিধাজনক ‘অজুহাত’ তৈরি করা হয়েছে যাতে তার ধর্মত্যাগকে ‘বোধগম্য’ দেখানো যায়, নাকি এটি ওহীর প্রক্রিয়ার একটি অনিবার্য ফাঁক? [2]
Then We made the sperm-drop into a clinging clot, and We made the clot into a lump [of flesh], and We made [from] the lump, bones, and We covered the bones with flesh; then We developed him into another creation. So blessed is Allāh, the best of creators.
— Saheeh International
পরে আমি শুক্রবিন্দুকে পরিণত করি জমাট বাঁধা রক্তে, অতঃপর মাংসপিন্ডকে পরিণত করি হাড্ডিতে, অতঃপর হাড্ডিকে আবৃত করি মাংস দিয়ে, অতঃপর তাকে এক নতুন সৃষ্টিতে উন্নীত করি। কাজেই সর্বোত্তম স্রষ্টা আল্লাহ কতই না মহান!
— Taisirul Quran
পরে আমি শুক্রবিন্দুকে পরিণত করি রক্তপিন্ডে, অতঃপর রক্তপিন্ডকে পরিণত করি মাংসপিন্ডে এবং মাংসপিন্ডকে পরিণত করি অস্থিপঞ্জরে; অতঃপর অস্থিপঞ্জরকে ঢেকে দিই মাংস দ্বারা; অবশেষে ওকে গড়ে তুলি অন্য এক সৃষ্টি রূপে; অতএব নিপুণতম স্রষ্টা আল্লাহ কত কল্যাণময়!
— Sheikh Mujibur Rahman
তারপর শুক্রকে আমি ‘আলাকায় পরিণত করি। তারপর ‘আলাকাকে গোশতপিন্ডে পরিণত করি। তারপর গোশতপিন্ডকে হাড়ে পরিণত করি। তারপর হাড়কে গোশ্ত দিয়ে আবৃত করি। অতঃপর তাকে অন্য এক সৃষ্টিরূপে গড়ে তুলি। অতএব সর্বোত্তম স্রষ্টা আল্লাহ কত বরকতময়!
— Rawai Al-bayan
বিভিন্ন বাংলা অনুবাদে (সহীহ ইন্টারন্যাশনাল, তাইসিরুল কুরআন, শেখ মুজিবুর রহমান, রওয়াই আল-বয়ান) আমরা দেখি যে শেষ বাক্যটি সর্বদা তৃতীয় পুরুষে রয়েছে, যেখানে পুরো আয়াত প্রথম পুরুষে চলছে। এই অসংগতি কোনো ‘ঐশ্বরিক সৌন্দর্য’ নয়; এটি একটি স্পষ্ট স্টাইল-ব্রেক। যদি আবদুল্লাহর কথাটি সত্যিই ‘অবতীর্ণ’ হয়ে থাকে, তাহলে প্রশ্ন ওঠে—নবী কি নিজেই বুঝতে পারছিলেন না যে এটি তাঁর নিজের ওহী লেখকের মুখনিঃসৃত? অথবা কি তিনি জেনেশুনে এটি গ্রহণ করেছিলেন, কারণ মুহাম্মদের কাছে বাক্যটি খুব ভাল লেগেছিল? এই ঘটনা থেকে আবদুল্লাহর সংশয় জন্ম নেয় যে, “আমিও তো একই রকম কথা বানাতে পারি”—এবং এটি কেবল তার ব্যক্তিগত সন্দেহ নয়, বরং ওহীর দাবির মধ্যে অন্তর্নিহিত একটি সন্দেহের সরাসরি প্রমাণ। যদি ঈশ্বরের বাণীতে একজন মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত উচ্চারণ ঢুকে যেতে পারে, তাহলে কোরআনের ‘অপরিবর্তনীয়তা’র দাবি কতটা টেকসই? [3]
এরপর বলা হয়েছে-‘এবং যে বলে ‘আল্লাহ্ যা অবতারণ করেছেন আমিও তার অনুরূপ অবতারণ করবো, তার চেয়ে বড় জালেম আর কে? বাগবী বলেছেন, এই বাক্যটি অবতীর্ণ হয়েছে আবদুল্লাহ্ বিন আবী সারাহ্ সম্পর্কে।
আবদুল্লাহ্ ইসলাম গ্রহণ করলে রসুল স. তাকে কোরআন মজীদ লিপিবদ্ধ করার কাজে নিযুক্ত করলেন। কিন্তু সে বিশ্বাসভাজন ছিলো না। রসুল স. যখন বলতেন ‘সামিয়াম বাসিরান’। সে লিখতো আলীমান হাকিমান। আবার রসুল স. বলতেন, ‘আলীমান হাকিমান, ‘সে তখন লিখতো ‘গফুরার রহীমান।’ একদিন অবতীর্ণ হলো ‘ওয়ালাক্বদ খলাকুনাল ইনসানা মিন সুলালাতিম মিনি’ (আমি তো মানুষকে সৃষ্টি করেছি মৃত্তিকার উপাদান থেকে)। রসুল স. সদ্য অবতীর্ণ আয়াতটি লিখতে নির্দেশ দিলেন। মানব সৃষ্টি সম্পর্কিত এই আয়াতটি খুবই ভালো লাগলো আবদুল্লাহর। সে হঠাৎ বলে উঠলো-‘ফা তাবারাকাল্লহু আহসানাল খলিকিন’ (আল্লাহপাক কতোইনা সুন্দর স্রষ্টা)। রসুল স. বললেন, এ বাক্যটিও লিপিবদ্ধ করো। এই আয়াতটিও সদ্য অবতীর্ণ। এ কথা শুনে আবদুল্লাহ্ ভাবলো আশ্চর্য! আমার উপরেও তাহলে প্রত্যাদেশ অবতীর্ণ হয়। এ রকম চিন্তার ফলে সে হয়ে গেলো ধর্মত্যাগী। মিশে গেলো মুশরিকদের দলে। হজরত ইকরামা, ইবনে জারীর এবং সুদ্দীও এই ঘটনাটির উল্লেখ করেছেন। যথাস্থানে এর বিবরণ দেয়া হবে।
বাগবী উল্লেখ করেছেন, মক্কা বিজয়ের পূর্বে রসুল স. যখন মাররুজ জাহরান নামক স্থানে অবস্থান গ্রহণ করলেন, তখন অনুতপ্ত আবদুল্লাহ্ এসে পুনরায় ইসলাম গ্রহণ করলেন। হাফেজ ফাহুদ্দীন ইবনে সাইয়্যেদিন্নাস তাঁর রচিত রসুল স. এর জীবনীগ্রন্থে উল্লেখ করেছেন, তখন আবদুল্লাহ্ ইবনে আবী সারাহের জন্য সুপারিশ করেছিলেন হজরত ওসমান। রসুল স. হজরত ওসমানের সুপারিশ কবুল করেছিলেন। পরবর্তী জীবনে আবদুল্লাহ্ ইবনে আবী সারাহ ছিলেন খাঁটী ইমানদার। তাঁর ইসলাম গ্রহণ সম্পর্কে আর কেউ কোনো সন্দেহ করেননি। শেষে তিনি ইন্তেকাল করেছিলেন সেজদারত অবস্থায়।


একজন যুক্তিবাদী পাঠকের দৃষ্টিতে এখানে ব্যাকরণগত এবং যৌক্তিক সমস্যা স্পষ্ট। আয়াতের শুরুটা ছিল ঈশ্বরের জবানীতে (First person), কিন্তু শেষ বাক্যটি (‘সর্বোত্তম স্রষ্টা আল্লাহ কতই না মহান’) সম্পূর্ণভাবে একটি তৃতীয় পক্ষের বা মানুষের করা প্রশংসা (Third person)। একজন মানুষের মুখ থেকে বের হওয়া কথা কিভাবে হুবহু ‘ঐশ্বরিক বাণী’র অংশ হয়ে গেল, এই প্রশ্নই আবদুল্লাহকে ইসলামের ভিত্তি নিয়ে সন্দিহান করে তোলে।
সূরা আল-মুমিনুন-এর ১৪ নম্বর আয়াতে ভাষাগত ধারাবাহিকতার এক চরম বিচ্যুতি লক্ষ্য করা যায়। আয়াতের শুরুতে বক্তা স্বয়ং ঈশ্বর (প্রথম পুরুষ), কিন্তু শেষ বাক্যে বক্তা আকস্মিক বদলে গিয়ে তৃতীয় ব্যক্তিতে পরিণত হয়।
“অতঃপর তাকে অন্য এক সৃষ্টিরূপে গড়ে তুলি [আমরা]…” — এখানে বক্তা স্বয়ং আল্লাহ।
“অতএব সর্বোত্তম স্রষ্টা আল্লাহ কত বরকতময়!” — এখানে বক্তা আল্লাহকে নিয়ে প্রশংসা করছেন।
এই Style-break প্রমাণ করে যে, আয়াতের শেষ অংশটি মূল বক্তার জবানবন্দি নয়, বরং এটি বাইরে থেকে যুক্ত হওয়া একটি ‘মানবিক প্রতিক্রিয়া’।
বর্ণনা অনুযায়ী, লেখক আবদুল্লাহ ইবন আবি সারহ ডিকটেশনের সময় মুগ্ধ হয়ে বলে ওঠেন— “ফাতাবারাকাল্লাহু আহসানুল খালিকিন”। মুহাম্মদ তাৎক্ষণিকভাবে নির্দেশ দেন এটিও ওহী হিসেবে লিখে নিতে। প্রশ্ন জাগে: যদি একজন সাধারণ মানুষের বাক্য ‘ওহী’ হয়ে যেতে পারে, তবে ওহীর শাশ্বত উৎসের দাবি কতটুকু যৌক্তিক?
যদি আবদুল্লাহর কথাটি ঠিক সেভাবেই অবতীর্ণ হয়ে থাকে, তবে নবী কি নিজেই বুঝতে পারছিলেন না যে এটি তাঁর নিজের ওহী লেখকের মুখনিঃসৃত? এটি কি ওহীর ভেতরে মানুষের হস্তক্ষেপের সরাসরি প্রমাণ নয়? এই ঘটনাই আবদুল্লাহর মনে সংশয় তৈরি করে যে, “আমিও তো একই রকম কথা বানাতে পারি”।
যদি ঈশ্বরের বাণীতে একজন মানুষের তাৎক্ষণিক উচ্চারণ ঢুকে যেতে পারে, তাহলে কোরআনের ‘অপরিবর্তনীয়তা’র দাবি দুর্বল হয়ে পড়ে। এটি ইঙ্গিত দেয় যে, কোরআনের অন্যান্য অংশেও এমন ‘মানবিক হস্তক্ষেপ’ ঘটে থাকতে পারে যা ঐতিহাসিক নথির অভাবে আমরা শনাক্ত করতে পারছি না।
মক্কা বিজয়ঃ ব্যক্তিগত প্রতিশোধের আকাঙ্ক্ষা
৮ম হিজরীতে মক্কা বিজয়ের সময় মুহাম্মদ মক্কাবাসীদের সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করেছিলেন বলে ইসলামি ঐতিহ্যে বারবার উল্লেখ করা হয়। কিন্তু এই ‘সাধারণ ক্ষমা’র নীতি সর্বজনীন ছিল না। ইবন কাসীরের ‘আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া’ (চতুর্থ খণ্ড, পৃষ্ঠা ৫১১) স্পষ্ট করে যে, নির্দিষ্ট কয়েকজন ব্যক্তির জন্য মৃত্যুদণ্ডের আদেশ বহাল রাখা হয়েছিল—এবং সেই তালিকার শীর্ষে ছিলেন আবদুল্লাহ ইবন আবি সারাহ। যার অর্থ হচ্ছে, নবী মুহাম্মদ তার ওপর কোন কারণে প্রচণ্ড ক্ষিপ্ত ছিলেন। লক্ষ্য করুন, উহুদ যুদ্ধে (৩ হিজরি) নবী মুহাম্মদ-এর সাহাবী ও চাচা হামজা-কে শহীদ করার পর, তার কলিজা চিবিয়েছিলেন আবু সুফিয়ানের স্ত্রী হিন্দ বিনতে উতবা। এমন একজন শত্রুকেও মক্কা বিজয়ের দিন ক্ষমা করা হয়, অথচ আবদুল্লাহ ইবন আবি সারাহকে দেয়া হয় দেখা মাত্র কতলের নির্দেশ। আদেশ ছিল সুনির্দিষ্ট: তাকে যদি কাবার গিলাফের নিচেও পাওয়া যায়, তবু হত্যা করতে হবে। এখানে একটি গুরুতর সংশয়বাদী প্রশ্ন ওঠে—যদি মুহাম্মদ সত্যিই ‘রহমতুল্লিল আলামিন’ হন, তাহলে কেন একজন সাবেক ওহী লেখকের জন্য এমন ব্যতিক্রমী, ব্যক্তিগত-স্তরের কঠোরতা? এটি কি শুধুমাত্র রাজনৈতিক কৌশল, নাকি এর পেছনে ছিল গভীর ব্যক্তিগত আক্রোশ? আল্লাহ কী বিশেষভাবে আবদুল্লাহ ইবন আবি সারাহকে হত্যা করতে নির্দেশ দিয়েছিলেন? আর আল্লাহ সত্যিই সেই নির্দেশ দিয়ে থাকলে, পরে তাকে ক্ষমা করে নবী কীভাবে আল্লাহর হুকুম অমান্য করলেন? [4]
তাবারাণী আলী ইব্ন সাঈদ রাযী ইব্ন আব্বাস সূত্রে বর্ণনা করেন যে, রাসূলুল্লাহ্ (সা) বলেছেন: আল্লাহ্ যে দিন আসমান ও যমীন সৃষ্টি করেছেন সে দিন থেকে এ শহরকে ‘হারম’ করেছেন। এবং যে দিন তিনি সূর্য ও চন্দ্র স্থাপন করেন সে দিনই এ শহর স্থাপন করেন। এ শহরের সমান্তরালে অবস্থিত আকাশকেও তিনি হারম করেছেন। আমার পূর্বে কখনও এ শহর কারও জন্যে হালাল করা হয়নি। কেবল আমার ক্ষেত্রে দিবসের স্বল্পক্ষণের জন্যে হালাল করা হয়েছে। এবং স্বল্পক্ষণ পরেই পূর্বের ন্যায় আবার এর হুরমত বহাল করা হয়েছে। তখন রাসূলুল্লাহ্ (সা)-কে জানান হল যে, এই তো খালিদ ইব্ন ওয়ালীদ যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছেন? রাসূলুল্লাহ (সা) তখন একজনকে ডেকে বললেন: তুমি যাও খালিদকে যুদ্ধ বন্ধ করতে বল। লোকটি এসে খালিদকে বললো: নবী করীম (সা) বলেছেন, যাকেই নাগালের মধ্যে পাও তাকেই হত্যা করতে থাক। খালিদ সেদিন সত্তর জন ব্যক্তিকে হত্যা করেন। লোকটি রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর নিকট এসে এ সংবাদ তাঁকে জানায়। তখন তিনি খালিদকে ডেকে এনে জিজ্ঞেস করেন, আমি কি তোমাকে নর হত্যা করতে নিষেধ করিনি? খালিদ জবাব দিলেন, অমুক ব্যক্তি আমাকে গিয়ে বলেছে-যাকেই আমি নাগালে পাই তাকেই যেন হত্যা করি। রাসূলুল্লাহ্ (সা) সে লোকটিকে ডেকে এনে বললেন: আমি কি তোমাকে যুদ্ধ বন্ধ করার হুকুম দিইনি? লোকটি বললো: আপনি এক প্রকার চেয়েছেন, আর আল্লাহ্ চেয়েছেন অন্য প্রকার। আপনার ইচ্ছার উপর আল্লাহর ইচ্ছাই বলবত হয়েছে। তাই যা হওয়ার ছিল তার অন্যথা আমি করতে পারিনি। তার জবাব শুনে রাসূলুল্লাহ্ (সা)
নীরব থাকলেন এবং তাকে কিছুই বললেন না।
ইবন ইসহাক বলেন: রাসূলুল্লাহ্ (সা) তাঁর সেনাধ্যক্ষদের নিকট থেকে এই মর্মে অংগীকার নিয়েছিলেন যে, তাঁরা তাঁদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে আসা লোকদের ব্যতীত অন্য কারও সংগে যুদ্ধে লিপ্ত হবেন না। তবে তিনি নাম উল্লেখ করে বিশেষ কিছু লোককে হত্যার আদেশ
দিয়েছিলেন। এমনকি যদি তাদেরকে কা’বার গিলাফের নীচেও পাওয়া যায় তবু। তাদের মধ্যে আবদুল্লাহ্ ইবন সা’দ ইব্ন আবু সারাহ্ ছিল অন্যতম। সে বাহ্যত: ইসলাম গ্রহণ করে ও ওহী লিপিবদ্ধ করার দায়িত্ব পালন করে। কিন্তু পরে সে মুরতাদ হয়ে যায়। রাসূলুল্লাহ্ (সা) মক্কায় প্রবেশ করে তাকে হত্যার ঘোষণা দিলে সে পালিয়ে উছমান (রা)-এর কাছে আশ্রয় নেয়। সে ছিল উছমানের দুধভাই। উছমান তাকে নিরাপত্তা দেয়ার জন্যে রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর কাছে নিয়ে আসেন। তিনি দীর্ঘক্ষণ নীরব থাকার পর বললেন, ‘আচ্ছা ঠিক আছে।’ উছমানের সাথে তার ফিরে যাওয়ার পর রাসূলুল্লাহ্ (সা) উপস্থিত সাহাবীদেরকে লক্ষ্য করে বললেন: তোমাদের মধ্যে এমন একজন সুবুদ্ধিসম্পন্ন লোকও কি ছিল না, যে আমার নীরব থাকা অবস্থায় তাকে হত্যা করে দিত। সাহাবীগণ বললেন- ইয়া রাসূলাল্লাহ! আপনি আমাদেরকে একটু ইংগিত দিলেন না কেন? তিনি বললেন, ইংগিত দিয়ে কাউকে হত্যা করান নবীর জন্যে শোভনীয় নয়। অন্য একটি বর্ণনায় আছে- তিনি তখন বলেছিলেন: কোন নবী চোখের খিয়ানত করতে পারেন না।

ইবন ইসহাক ও তাবারাণীর বর্ণনায় দেখা যায়, মুহাম্মদ তাঁর সেনাধ্যক্ষদের থেকে অঙ্গীকার নিয়েছিলেন যে যুদ্ধ শুধুমাত্র প্রতিরোধকারীদের বিরুদ্ধে হবে। কিন্তু একই সঙ্গে তিনি নাম ধরে ধরে কয়েকজনকে হত্যার নির্দেশ দিয়েছিলেন। আবদুল্লাহর ক্ষেত্রে এই নির্দেশটি অস্বাভাবিকভাবে কঠোর। কেন? কারণ তিনি একমাত্র ব্যক্তি যিনি প্রকাশ্যে দাবি করেছিলেন যে, “আমিও ওহী বানাতে পারি” এবং তিনি নবীর ডিকটেশনের সময় শব্দ পরিবর্তন করে দেখেছিলেন যে তা ধরা পড়ে না। এই দাবি শুধুমাত্র একজন ব্যক্তির বিদ্রোহ ছিল না; এটি ছিল নবুয়তের মূল দাবি—‘অলৌকিক ওহী’—এর ওপর একটি মারাত্মক বুদ্ধিবৃত্তিক চ্যালেঞ্জ। তাকে জীবিত রাখা মানেই ছিল ওহীর অলৌকিকত্ব নিয়ে সন্দেহকে জিইয়ে রাখা। ফলে ‘ক্ষমা’র ঘোষণা যতই মহান দেখাক, আবদুল্লাহর প্রতি এই ব্যতিক্রমী ঘৃণা একজন ধর্মীয় নেতার চেয়ে একজন ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক নেতার আচরণের সঙ্গেই বেশি সামঞ্জস্যপূর্ণ।
এখানে আরও একটি যৌক্তিক অসংগতি লক্ষণীয়। যদি আবদুল্লাহ সত্যিই ‘মুরতাদ’ হয়ে থাকেন এবং ওহী নিয়ে প্রচার করে থাকেন, তাহলে কেন তাঁকে গোপনে হত্যার আদেশ দেওয়া হলো? এর বদলে তো সহজেই প্রকাশ্যে বিতর্ক বা প্রমাণ দাবি করা যেতে পারতো। তাহলে সাহাবীদের মধ্যে কারো কোন সন্দেহ থাকলে সহজেই তা দুর হয়ে যেতো। এটি কি ভয় যে, প্রকাশ্য বিতর্কে আবদুল্লাহর যুক্তি আরও বেশি লোককে প্রভাবিত করতে পারে? ইতিহাসের এই অংশটি পড়লে মনে হয়, মক্কা বিজয়ের ‘ক্ষমা’ ছিল বৃহত্তর রাজনৈতিক প্রয়োজনে একটি প্রচারমূলক নাটক, কিন্তু ব্যক্তিগত স্তরে যারা নবুয়তের সবচেয়ে বড় হুমকি ছিলেন, তাদের প্রতি ছিল নির্মমতা।
উসমানের মধ্যস্থতা এবং ‘চোখের খিয়ানত’
আবদুল্লাহ ইবন আবি সারাহ উসমান ইবন আফফানের দুধভাই ছিলেন। প্রাণের ভয়ে তিনি উসমানের কাছে আশ্রয় নেন এবং উসমান তাঁকে নিয়ে সরাসরি নবীর দরবারে হাজির হন। ইতিহাসের বর্ণনা অনুসারে (সুনান আবূ দাউদ, হাদিস ২৬৭৪; ইবন ইসহাক ও তাবারাণী) মুহাম্মদ দীর্ঘক্ষণ নীরব থাকেন। তিনি না পারছিলেন প্রিয় সাহাবী উসমানের অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করতে, না পারছিলেন আবদুল্লাহর প্রতি তাঁর গভীর ঘৃণা ও হত্যার আকাঙ্ক্ষা ত্যাগ করতে। অবশেষে তিনি বায়াত গ্রহণ করেন এবং বাহ্যিকভাবে ক্ষমা ঘোষণা করেন। কিন্তু এই ‘ক্ষমা’র পেছনের মানসিকতা কতটা স্বচ্ছ? আবদুল্লাহ চলে যাওয়ার পরপরই মুহাম্মদ উপস্থিত সাহাবীদের তিরস্কার করে বলেন: “তোমাদের মধ্যে এমন চালাক লোকও কি ছিল না যে, আমি যখন তাকে বায়াত করছিলাম না, তখন তাকে হত্যা করে দিত?” এই বাক্যটি সরাসরি সুনান আবূ দাউদে সংরক্ষিত। [5] –
সুনান আবূ দাউদ (ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
৯/ জিহাদ
পরিচ্ছেদঃ ২১. ইসলামের দাওয়াত দেওয়ার আগে, কোন বিধর্মী বন্দীকে হত্যা করা।
২৬৭৪. ’উসমান ইবন আবূ শায়বা (রহঃ) …. সা’দ (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, মক্কা বিজয়ের দিন রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম চারজন ও দুইজন মহিলা ব্যতীত অন্যান্য সকলকে নিরাপত্তা প্রদান করেন এবং তিনি তাদের নামও ঘোষণা করেন। আর ইবন আবূ সারাহ্ … এরপর হাদীস বর্ণিত হয়েছে। রাবী সা’দ বলেনঃ ইবন রাবী সারাহ্ ’উছমান (রাঃ) এর নিকট আত্মগোপন করে থাকেন। এরপর রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন বায়াত গ্রহণের জন্য সকলকে আহ্বান জানান, তখন উছমান (রাঃ) তাকে সঙ্গে নিয়ে আসেন এবং তাকে রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সামনে দাঁড় করে দেন এবং বলেনঃ হে আল্লাহর নবী! আপনি ’আবদুল্লাহকে বায়াত করান। তিনি তাঁর মাথা উঠান এবং তিনবার তার দিকে তাকান এবং প্রত্যক বারই বায়াত করাতে অস্বীকার করেন।
তৃতীয় বারের পর তিনি তাকে বায়াত করান, পরে তিনি তাঁর সাহাবীদেরকে বলেনঃ তোমাদের মাঝে এমন কোন চালাক লোক কি ছিল না, যখন সে আমাকে দেখল যে, আমি তাকে বায়াত করাচ্ছি না, তখন কেন সে তাকে হত্যা করল না? তাঁরা (সাহাবীরা) বললেনঃ ইয়া রাসূলাল্লাহ্! আমরা তো আপনার অন্তরের কথা বুঝতে পারিনি। আপনি (এ ব্যাপারে) চোখ দিয়ে কেন আমাদেরকে ইশারা করলেন না? তিনি বললেনঃ কোন নবীর জন্য এ উচিত নয় যে, সে চোরা দৃষ্টিতে তাকাবে।
আবূ দাঊদ (রহঃ) বলেনঃ আবদুল্লাহ্ ছিলেন ’উছমান (রাঃ) এর দুধ ভাই এবং ওয়ালীদ ইবন ’উকবা ছিলেন ’উছমান (রাঃ) এর বৈমাত্রেয় ভাই। উছমান (রাঃ) তাঁর শাসনামলে মদ্যপানের অভিযোগে তাকে শাস্তি দেন।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ সা’দ বিন আবূ ওয়াক্কাস (রাঃ)
লক্ষ্য করুন, সাহাবীরা জিজ্ঞাসা করেন, “ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমরা তো আপনার অন্তরের কথা বুঝতে পারিনি। আপনি চোখের ইশারা করলেন না কেন?” উত্তরে মুহাম্মদ বলেন, “কোনো নবীর জন্য চোখের খিয়ানত (আড়চোখে ইশারা) করা শোভনীয় নয়।” এখানে একটি গভীর নৈতিক দ্বন্দ্ব উন্মোচিত হয়। একদিকে মুখে ‘ক্ষমা’ ও ‘বায়াত’—অন্যদিকে মনে মনে সাহাবীদের দিয়ে গোপনে হত্যা করানোর ইচ্ছা। এটি কি একজন ‘রহমতুল্লিল আলামিন’-এর চরিত্রের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ? অথবা এটি একজন ক্ষমতাসীন নেতার দ্বিমুখী রাজনৈতিক কৌশল যিনি প্রকাশ্যে মহানত্ব দেখাতে চান, কিন্তু ব্যক্তিগত প্রতিশোধের আকাঙ্ক্ষা দমন করতে পারেন না?
আরও সংশয়বাদী প্রশ্ন: যদি আবদুল্লাহ সত্যিই ‘খাঁটি ঈমানদার’ হয়ে উঠতে পারতেন (যেমন পরবর্তী বর্ণনায় দাবি করা হয়), তাহলে কেন নবী প্রথমেই তাঁকে হত্যার আদেশ দিয়েছিলেন এবং পরে এমন অস্বস্তিকর দ্বিধায় পড়েছিলেন? এই ঘটনা কি প্রমাণ করে যে, যারা নবুয়তের মূল দাবিকে (ওহীর অলৌকিকত্ব) সবচেয়ে বড় হুমকি দিয়েছিলেন, তাদের প্রতি মুহাম্মদের প্রতিক্রিয়া ছিল ব্যক্তিগত আক্রোশপ্রসূত, ধর্মীয় ক্ষমার চেয়ে অনেক বেশি? ‘চোখের খিয়ানত’ না করার যুক্তিটিও অস্বস্তিকর—কারণ এটি স্বীকার করে যে নবী সাহাবীদের দিয়ে অপ্রকাশ্য হত্যা করাতে চেয়েছিলেন, কেবল ‘ইশারা’র মাধ্যমে। এই দ্বিমুখিতা কি নবীর নৈতিক উচ্চতা নিয়ে গভীর সন্দেহ জাগায়, নাকি এটি পরবর্তীকালীন হাদিস সংকলকদের দ্বারা নির্মিত একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছেঁটে ফেলা গল্প যা আসলে নবীর চরিত্রকে আরও জটিল করে তোলে?
উপসংহার
আবদুল্লাহ ইবন আবি সারাহর কাহিনী কোনো সাধারণ ‘ধর্মত্যাগী সাহাবী’র গল্প নয়। এটি একটি জীবন্ত প্রমাণ যে, কোরআনের সংকলন প্রক্রিয়ায় মানবিক হস্তক্ষেপ ছিল, যা বাস্তব এবং দালিলিক। যদি একজন লেখকের স্বতঃস্ফূর্ত প্রশংসা (‘ফাতাবারাকাল্লাহু আহসানুল খালিকিন’) তাৎক্ষণিকভাবে ‘ওহী’ হয়ে যেতে পারে, তাহলে পুরো গ্রন্থটির ‘অপরিবর্তনীয় ঐশ্বরিকত্ব’র দাবি কতটা নির্ভরযোগ্য? ঐতিহাসিক সূত্রগুলো (বাগবী, ইবন জারীর, তাফসীরে মাযহারী, সুনান আবূ দাউদ, ইবন কাসীর) সবই পরবর্তীকালীন—কোনো সমসাময়িক, নিরপেক্ষ সাক্ষ্য নেই। নিরপেক্ষ সাক্ষ্য প্রমাণ হয়তো পুরো ঘটনাটি আরও ভালভাবে আমাদের বিষয়টি বুঝতে সাহায্য করতো। কিন্তু যেটুকু আছে, সেটুকু সন্দেহ হওয়ার জন্য যথেষ্ট।
মক্কা বিজয়ের ‘সাধারণ ক্ষমা’র নাটকের আড়ালে আবদুল্লাহর প্রতি ব্যক্তিগত হত্যার আদেশ এবং ‘চোখের খিয়ানত’ না করার অজুহাত একজন নবীর চরিত্রকে আরও জটিল করে তোলে। যদি তিনি সত্যিই ‘রহমতুল্লিল আলামিন’ হতেন, তাহলে কেন একজন বুদ্ধিবৃত্তিক হুমকির বিরুদ্ধে এমন নীরব প্রতিশোধের ইচ্ছা? পরবর্তীকালে আবদুল্লাহকে ‘খাঁটি ঈমানদার’ এবং ‘সেজদারত অবস্থায় মৃত’ বলে চিহ্নিত করার বর্ণনাগুলো কি আসলেই ঐতিহাসিক সত্য, নাকি পরবর্তী ইসলামি ইতিহাসকারদের দ্বারা তৈরি একটি ‘সুসমাপ্তি’ যাতে নবীর কঠোরতা এবং ওহীর দুর্বলতা ঢেকে রাখা যায়?
এই কাহিনী শেষ পর্যন্ত আমাদের সামনে একটি অস্বস্তিকর সত্য তুলে ধরে: ওহী নামক প্রক্রিয়াটি সম্পূর্ণরূপে ঐশ্বরিক ছিল না—এতে মানুষের ভুল, আবেগ, রাজনৈতিক প্রয়োজন এবং ব্যক্তিগত আক্রোশের ছাপ স্পষ্ট। যারা আজও কোরআনকে ‘অলৌকিক ও অপরিবর্তনীয়’ বলে দাবি করেন, তাদের জন্য আবদুল্লাহ ইবন আবি সারাহ একটি অস্বীকার্য প্রশ্নচিহ্ন রেখে গেছেন—যা কোনো তাফসীর, হাদিস বা পরবর্তীকালীন ‘খাঁটি ঈমান’ দিয়ে মুছে ফেলা যায় না।
