
Table of Contents
ভূমিকা
কোরআনের সূরা মারইয়ামের ২৮ নম্বর আয়াতে যিশুর মাতা মরিয়মকে ‘ইয়া উখতা হারুন’ বা ‘হে হারুনের বোন’ বলে সম্বোধন করা হয়েছে। ঐতিহাসিক ও ধর্মতাত্ত্বিক প্রেক্ষাপটে এই সম্বোধনটি একটি গুরুত্বপূর্ণ বিতর্কের জন্ম দিয়েছিল, যা আজ অবধি ভালভাবে পরিষ্কার হয়নি। প্রধানত, মোশি (মুসা) ও হারুনের বোন মিরিয়াম এবং যিশুর মা মরিয়মের মধ্যে সময়ের ব্যবধান প্রায় দেড় হাজার বছর। এই নিবন্ধে এই ঐতিহাসিক অসংগতি বা ‘অ্যানাক্রোনিজম’ (Anachronism)-কে একাডেমিক ও যৌক্তিক মানদণ্ডে বিশ্লেষণ করা হয়েছে।
কান সর্বস্ব নবী মুহাম্মদ
বিভিন্ন লোকমুখে গল্প গুজব শুনে কেউ যখন সেই সব গল্পগুলো কপি করে, সেই কপির মধ্যে অনেক সমস্যা রয়ে যায়। এই বিষয়ে আলোচনার শুরুতেই, কোরআনের একটি আয়াত আমাদের খুব মনোযোগ দিয়ে পড়া প্রয়োজন। আয়াতটিতে বলা হচ্ছে, মক্কার লোকেরা নবী মুহাম্মদকে কান সর্বস্ব লোক বলে ঠাট্টাতামাশা করতো। আচ্ছা, সবকিছু বাদ দিয়ে কান সর্বস্ব লোক বলবার কারণ কী? এমন কী কারণ থাকতে পারে, যার কারণে চোখ নাক মুখ বাদ দিয়ে তাকে কান সর্বস্ব লোক বলে ডাকা হতো [1]
আর তাদের মধ্যে কেউ কেউ নবীকে ক্লেশ দেয়, এবং বলে, এ লোকটি (মুহাম্মদ) তো কানসর্বস্ব। আপনি বলে দিন, কান হলেও তোমাদেরই মঙ্গলের জন্য, আল্লাহর উপর বিশ্বাস রাখে এবং বিশ্বাস রাখে মুসলমানদের কথার উপর। বস্তুতঃ তোমাদের মধ্যে যারা ঈমানদার তাদের জন্য তিনি রহমতবিশেষ। আর যারা আল্লাহর রসূলের প্রতি কুৎসা রটনা করে, তাদের জন্য রয়েছে বেদনাদায়ক আযাব।
এবারে আসুন একটি হাদিস পড়ি, যেখানে শিক্ষিত একজন ওহী লেখক ইসলাম ত্যাগ করে নবীর সম্পর্কে বলেছিলেন, তিনি যা লিখে দিতেন তার চেয়ে বেশি কিছু নবী জানতেন না [2]। এই হাদিস থেকে জানা যায়, নবীর বিরুদ্ধে খ্রিস্টানের কাছ থেকে আয়াত লিখে নেয়ার একটি অভিযোগ উত্থাপিত হয়েছিল।
সহীহ বুখারী (তাওহীদ পাবলিকেশন)
৬১/ মর্যাদা ও বৈশিষ্ট্য
পরিচ্ছেদঃ ৬১/২৫. ইসলামে নুবুওয়াতের নিদর্শনাবলী।
৩৬১৭. আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, এক খ্রিস্টান ব্যক্তি মুসলিম হল এবং সূরা বাকারাহ ও সূরা আলে-ইমরান শিখে নিল। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর জন্য সে ওহী লিখত। অতঃপর সে আবার খ্রিস্টান হয়ে গেল। সে বলতে লাগল, আমি মুহাম্মাদ -কে যা লিখে দিতাম তার চেয়ে বেশি কিছু তিনি জানেন না। (নাউজুবিল্লাহ) কিছুদিন পর আল্লাহ্ তাকে মৃত্যু দিলেন। খ্রিস্টানরা তাকে দাফন করল। কিন্তু পরদিন সকালে দেখা গেল, কবরের মাটি তাকে বাইরে নিক্ষেপ করে দিয়েছে। এটা দেখে খ্রিস্টানরা বলতে লাগল- এটা মুহাম্মাদ এবং তাঁর সাহাবীদেরই কাজ। যেহেতু আমাদের এ সাথী তাদের হতে পালিয়ে এসেছিল। এ জন্যই তারা আমাদের সাথীকে কবর হতে উঠিয়ে বাইরে ফেলে দিয়েছে। তাই যতদূর পারা যায় গভীর করে কবর খুঁড়ে তাকে আবার দাফন করল। কিন্তু পরদিন সকালে দেখা গেল, কবরের মাটি তাকে আবার বাইরে ফেলে দিয়েছে। এবারও তারা বলল, এটা মুহাম্মাদ ও তাঁর সাহাবীদের কান্ড। তাদের নিকট হতে পালিয়ে আসার কারণে তারা আমাদের সাথীকে কবর হতে উঠিয়ে বাইরে ফেলে দিয়েছে। এবার আরো গভীর করে কবর খনন করে দাফন করল। পরদিন ভোরে দেখা গেল কবরের মাটি এবারও তাকে বাইরে নিক্ষেপ করেছে। তখন তারাও বুঝল, এটা মানুষের কাজ নয়। কাজেই তারা লাশটি ফেলে রাখল। (মুসলিম ৫০/৫০ হাঃ ২৭৮১, আহমাদ ১৩৩২৩) (আধুনিক প্রকাশনীঃ ৩৩৪৯, ইসলামিক ফাউন্ডেশনঃ ৩৩৫৬)
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আনাস ইবনু মালিক (রাঃ)
ইমরানের জন্য মরিয়ম
এবারে আসুন কোরআনে যা বলা আছে, তা খ্রিস্ট ধর্মের মিথলজির সাথে মেলে কিনা তা পরীক্ষা করে দেখি। নবী মুহাম্মদ সম্ভবত বিভিন্ন লোকের মুখে এইসব গল্পগুলো শুনে শুনে লিখেছেন, যার কারণে আব্রাহামিক নবীদের আবির্ভাবের টাইমলাইনটি ভালভাবে বুঝতে পারেননি। কোরআনে বলা হয়েছে, যীশু খ্রিস্ট বা ঈসা নবীর মা মরিয়মের পিতার নাম হচ্ছে ইমরান [3]
আর (দৃষ্টান্ত দিচ্ছেন) ‘ইমরান-কন্যা মারইয়ামের যে তার লজ্জাস্থান সংরক্ষণ করেছিল, ফলে আমি তার মধ্যে আমার রূহ ফুঁকে দিয়েছিলাম। সে তার প্রতিপালকের বাণী ও তাঁর কিতাবসমূহে (তাওরাত, যবূর ও ইঞ্জীলে) বিশ্বাস স্থাপন করেছিল। সে ছিল অনুগত ও বিনতদের অন্তর্ভুক্ত।
— Taisirul Quran
আরও দৃষ্টান্ত দিচ্ছেন ইমরান তনয়া মারইয়ামের, যে তার সতীত্ব রক্ষা করেছিল, ফলে আমি তার মধ্যে রূহ ফুঁকে দিয়েছিলাম এবং সে তার রবের বাণী ও তাঁর কিতাবসমূহ সত্য বলে গ্রহণ করেছিল; সে ছিল অনুগতদের একজন।
— Sheikh Mujibur Rahman
(আল্লাহ আরো উদাহরণ পেশ করেন) ইমরান কন্যা মারয়াম-এর, যে নিজের সতীত্ব রক্ষা করেছিল, ফলে আমি তাতে আমার রূহ থেকে ফুঁকে দিয়েছিলাম। আর সে তার রবের বাণীসমূহ ও তাঁর কিতাবসমূহের সত্যতা স্বীকার করেছিল এবং সে ছিল অনুগতদের অন্তর্ভুক্ত।
— Rawai Al-bayan
আরও দৃষ্টান্ত পেশ করেন ‘ইমরান-কন্যা মারইয়ামের— যে তার লজ্জাস্থানের পবিত্ৰতা রক্ষা করেছিল, ফলে আমরা তার মধ্যে ফুঁকে দিয়েছিলাম আমাদের রূহ হতে। আর সে তার রবের বাণী ও তাঁর কিতাবসমূহ সত্য বলে গ্রহণ করেছিল এবং সে ছিল অনুগতদের অন্যতম [১]।
— Dr. Abu Bakr Muhammad Zakaria
হারুনের বোন মরিয়ম
একইসাথে আল্লাহ মরিয়মকে হারুনের বোন হিসেবে সম্বোধন করেছেন [4]
অতঃপর সে তার সন্তানকে বয়ে নিয়ে তার সম্প্রদায়ের কাছে আসল। তারা বলল, ‘হে মারইয়াম! তুমি তো এক অদ্ভুত জিনিস নিয়ে এসেছ!
— Taisirul Quran
অতঃপর সে সন্তানকে নিয়ে তার সম্প্রদায়ের নিকট উপস্থিত হল; তারা বললঃ হে মারইয়াম! তুমিতো এক অদ্ভুত কান্ড করেছ!
— Sheikh Mujibur Rahman
তারপর সে তাকে কোলে নিয়ে নিজ কওমের নিকট আসল। তারা বলল, ‘হে মারইয়াম! তুমি তো এক অদ্ভূত বিষয় নিয়ে এসেছ’!
— Rawai Al-bayan
তারপর সে সন্তানকে নিয়ে তার সম্প্রদায়ের কাছে উপস্থিত হল; তারা বলল, ‘হে মারইয়াম! তুমি তো এক অঘটন করে বসেছ [১]।
— Dr. Abu Bakr Muhammad Zakaria
ওহে হারূনের বোন! তোমার পিতা তো খারাপ লোক ছিল না, আর তোমার মাও ছিল না কোন অসতী নারী।’
— Taisirul Quran
হে হারূন ভগ্নি! তোমার পিতা অসৎ ব্যক্তি ছিলনা এবং তোমার মাতাও ছিলনা ব্যভিচারিণী।
— Sheikh Mujibur Rahman
‘হে হারূনের বোন! তোমার পিতা তো খারাপ লোক ছিল না। আর তোমার মা-ও ছিল না ব্যভিচারিণী’।
— Rawai Al-bayan
‘হে হারূনের বোন! [১] তোমার পিতা অসৎ ব্যক্তি ছিল না এবং তোমার মাও ছিল না ব্যাভিচারিণী [২]।
— Dr. Abu Bakr Muhammad Zakaria
নবীর আমলেই এই নিয়ে আপত্তি
নবী মুহাম্মদের যুগেই কোরআনের এইসব ভুল বক্তব্য সম্পর্কে প্রশ্ন তোলা হয়েছিল। এইসব প্রশ্নের উত্তরে নবী কী ব্যাখ্যা প্রদান করেছিলেন, আসুন তা দেখে নেয়া যাক [5] –
সহীহ মুসলিম (ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
৩৯/ শিষ্টাচার
পরিচ্ছেদঃ ১. ‘আবুল কাসিম’ উপনাম গ্রহন নিষিদ্ধ এবং পছন্দনীয় নামের বিবরণ
৫৪১৩। আবূ বকর ইবনু আবূ শায়বা, মুহাম্মাদ ইবনু আবদুল্লাহ ইবনু নুমায়র, আবূ সাঈদ আশাজ্জ ও মুহাম্মাদ ইবনু মুসান্না আনাযী (রহঃ) … মুগীরা ইবনু শু’বা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি যখন নাজরান গেলাম, তখন সেখানকার লোকেরা আমাকে জিজ্ঞাসা করল, আপনারা (আল-কুরআনে)يَا أُخْتَ هَارُونَ (হে হারুনের বোন) অর্থাৎ ঈসা (আলাইহিস সালাম) [অর্থাৎ ঈসা (আঃ) এর মা মারইয়ামকে হারুনের বোন বলা হয়েছে] অথচ মূসা (আলাইহিস সালাম) ছিলেন ঈসা (আলাইহিস সালাম) এর এত দিন আগে? [সুতরাং মূসা (আলাইহিস সালাম) এর ভাই নবী হারুন (আলাইহিস সালাম) ঈসা (আলাইহিস সালাম) এর অনেক আগের যুগের। মারইরাম তার বোন হন কিভাবে?]
পরে যখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কাছে আমি ফিরে এলাম, তখন তাঁকে এ বিষয়ে জিজ্ঞাসা করলাম। তিনি বললেন, তারা (ইয়াহুদী-নাসারারা) তাদের পূর্ববর্তী নবী ও সালিহগণের নামে (সন্তানের) নাম রাখত।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ মুগীরা ইবনু শু’বা (রাঃ)
ঐতিহাসিক কালানুক্রমিক বিশ্লেষণ ও কালবিভ্রান্তি (Anachronism)
১. কালানুক্রমিক ব্যবধান: ঐতিহাসিক ও প্রত্নতাত্ত্বিক তথ্য-প্রমাণ বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, আমরাম (কোরআনিক ইমরান) এর দুই পুত্র হারুন ও মোশি আনুমানিক খ্রিস্টপূর্ব দ্বিতীয় সহস্রাব্দ (Second millennium BCE)-এর মধ্যবর্তী সময়ে জীবিত ছিলেন। বিপরীতে, যিশুর মাতা মরিয়ম প্রথম শতাব্দীর একজন ব্যক্তিত্ব। ঐতিহাসিক মানদণ্ডে এই দুই মরিয়ম/মিরিয়ামের মধ্যে সময়ের ব্যবধান প্রায় ১৩০০ থেকে ১৫০০ বছর। বাইবেলের ওল্ড টেস্টামেন্ট (Exodus 15:20) অনুযায়ী, হারুন ও মোশির একজন আপন বোন ছিলেন যার নাম মিরিয়াম (Miriam)।
২. বংশানুক্রমিক অসংগতি: কোরআনিক আখ্যানে যিশুর মা মরিয়মকে কেবল ‘হারুনের বোন’ (১৯:২৮) হিসেবেই নয়, বরং ‘ইমরানের কন্যা’ (৬৬:১২) হিসেবেও চিহ্নিত করা হয়েছে। যেহেতু মোশি ও হারুনের পিতার নামও ইমরান (বাইবেলে Amram), সেহেতু সমনাম এবং সমগোত্রীয় সম্পর্কের এই সমাপতনকে একাডেমিক পরিভাষায় ‘কনফ্লেশন’ (Conflation) বা দুই ভিন্ন যুগের ভিন্ন চরিত্রকে একীভূত করে ফেলার একটি ধ্রুপদী উদাহরণ হিসেবে দেখা হয়।
৩. তুলনামূলক ধর্মতাত্ত্বিক উৎস: খ্রিস্টধর্মের প্রামাণ্য ও ঐতিহাসিকভাবে নিকটবর্তী সূত্রগুলো বিশ্লেষণ করলে বৈপরীত্যটি আরও স্পষ্ট হয়:
- পিতামাতার পরিচয়: খ্রিস্টীয় ঐতিহ্য এবং খ্রিষ্টীয় ২য় শতকের গুরুত্বপূর্ণ দলিল ‘প্রোটো-ইভানজেলিয়াম অফ জেমস’ (Protoevangelium of James) অনুযায়ী, যিশুর মাতা মরিয়মের পিতা ছিলেন জোয়াকিম (Joachim) এবং মাতা সেইন্ট অ্যান (Saint Anne)।
- পার্থক্য: অপরদিকে, মুসা ও হারুনের পিতা আমরাম (ইমরান) ছিলেন কয়েক শতাব্দী আগের ব্যক্তিত্ব। খ্রিস্টীয় ইতিহাসে যিশুর মা মরিয়মের ‘হারুন’ নামে কোনো ভাই ছিল বলে কোনো ঐতিহাসিক বা ধর্মতাত্ত্বিক সমর্থন পাওয়া যায় না।
৪. যৌক্তিক বিশ্লেষণ ও ‘আফটারথট’ প্রতিরক্ষা: ইসলামি ভাষ্যমতে এই অসংগতি দূর করার জন্য দাবি করা হয় যে, ইহুদিরা তাদের পূর্বসূরিদের নামে সন্তানদের নাম রাখত। তবে এই যুক্তির বিপক্ষে নিম্নোক্ত একাডেমিক প্রশ্নগুলো উত্থাপিত হয়:
ঐতিহাসিক বিচ্যুতি: কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তিকে ‘অমুকের বোন’ বলে ডাকার অর্থ সাধারণত তার সমসাময়িক বা নিকটবর্তী সম্পর্কের ইঙ্গিত দেয়। ১৫০০ বছর আগের একজন ব্যক্তির নামে কাউকে চিহ্নিত করা সমকালীন আরব্য সংস্কৃতির একটি ‘পোস্ট-হক র্যাশনালিজেশন’ (ঘটনা পরবর্তী যৌক্তিক করার চেষ্টা) হতে পারে।
তথ্যের অপ্রতুলতা: যিশুর মা মরিয়মের সমসাময়িক কোনো নিরপেক্ষ ঐতিহাসিক দলিল বা আদি খ্রিস্টীয় লেখায় তার ‘হারুন’ নামে কোনো ভাই কিংবা তার পিতার নাম ‘ইমরান’ হওয়ার কোনো সমর্থন মেলে না।
এই বিষয়ে ইসলাম যেই দাবীটি করছে তা হচ্ছে,

কিন্তু এই চার্টটি প্রাচীন ইহুদি খ্রিস্টান টেক্সট অনুসারে সঠিক নয়, কারণ এই মরিয়ম সেই মরিয়ম নয়। খ্রিস্টধর্ম অনুসারে এই মিরিয়াম সম্পূর্ণ ভিন্ন এক ব্যক্তি, যিনি মুসা এবং হারুনের বোন ছিলেন। নবী মুহাম্মদ সম্ভবত বিভিন্ন লোকের মুখে শুনে এই দুই চরিত্র সম্পর্কে তথ্য গুলিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। পরবর্তীতে ব্যাখ্যায় বলা হয় যে, ইহুদিরা পূর্ববর্তী নবীদের নামে সন্তানদের নাম রাখতো। কিন্তু ঈসার মা মরিয়মের হারুন নামের কোন ভাই ছিল, বা তার পিতা ইমরান ছিল, প্রাচীন খ্রিস্টীয়/ঐতিহাসিক উৎসে এমন দাবির প্রাথমিক স্তরের প্রমাণ পাওয়া যায় না।
নিবন্ধটির উপসংহারের পূর্বে আপনার চাহিদা অনুযায়ী একটি যৌক্তিক ও সমালোচনামূলক পরিচ্ছেদ নিচে যুক্ত করা হলো:
ঐশ্বরিক জ্ঞান বনাম পাঠ্যগত অস্পষ্টতা
এই ঐতিহাসিক অসংগতিটি কেবল ইতিহাস নয়, বরং কোরআনের ‘ঐশ্বরিক উৎস’ (Divine Origin) নিয়ে একটি গভীর জ্ঞানতাত্ত্বিক ও যৌক্তিক প্রশ্ন উত্থাপন করে।
১. সর্বজ্ঞতা ও তথ্যের নির্ভুলতা: যদি কোরআন একজন সর্বজ্ঞ (Omniscient) সত্তার বাণী হয়ে থাকে, তবে সেখানে এমন কোনো ভাষ্য থাকা তাত্ত্বিকভাবে অসম্ভব যা পরবর্তীকালে ঐতিহাসিক কালবিভ্রান্তি বা ‘অ্যানাক্রোনিজম’ হিসেবে চিহ্নিত হতে পারে। একজন ঈশ্বর, যিনি অতীত ও ভবিষ্যৎ সম্পর্কে সম্যক অবগত, তার পক্ষে এমন শব্দচয়ন করা অযৌক্তিক যা হাজার বছর আগের মিরিয়াম এবং যিশুর মা মরিয়মের মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরি করে। এটি মূলত একটি মৌলিক প্রশ্ন উত্থাপন করে: এই ভুলটি কি স্রষ্টার, নাকি তৎকালীন আরবে প্রচলিত লোকগাঁথার দ্বারা প্রভাবিত কোনো মানবিক রচনার?
২. হাদিসের ব্যাখ্যার অসারতা ও কৌশলগত ত্রুটি: ইসলামি ঐতিহ্যে মুহাম্মদ (সা.)-এর দেওয়া ব্যাখ্যাটিকে (পূর্ববর্তীদের নামে নাম রাখা) যদি সত্য হিসেবে ধরেও নেওয়া হয়, তবে সেখানে একটি বড় ‘কৌশলগত ত্রুটি’ পরিলক্ষিত হয়। ঈশ্বর হিসেবে আল্লাহ নিশ্চয়ই অবগত ছিলেন যে, এই আয়াতের শব্দচয়ন ইহুদি ও খ্রিষ্টানদের মনে প্রবল সন্দেহ ও অবিশ্বাসের জন্ম দেবে। একজন প্রজ্ঞাবান সত্তা কেন এমন একটি অস্পষ্ট বাক্য নাজিল করবেন, যা কাঙ্ক্ষিত অনুসারীদের (ইহুদি ও নাসারা) বিশ্বাস স্থাপনের পরিবর্তে তাদের কাছে ধর্মগ্রন্থটিকে একটি ত্রুটিপূর্ণ গ্রন্থ হিসেবে উপস্থাপিত করার সুযোগ করে দেয়?
৩. নবি ও অনুসারীদের বিব্রতকর অবস্থান: এই আয়াতের কারণে খ্রিষ্টানদের প্রশ্নের মুখে নবি মুহাম্মদকে যে উত্তর দিতে হয়েছিল, তা সমকালীন প্রেক্ষাপটে তাকে লজ্জিত বা বিব্রত করার জন্য যথেষ্ট ছিল। যদি ঐশ্বরিক ওহীর উদ্দেশ্যই হয় সত্যের প্রচার, তবে কেন এমন কোনো বাক্য বেছে নেওয়া হলো যা সরাসরি বাইবেলের ঐতিহাসিক বংশলতিকার সাথে সাংঘর্ষিক? এই অসংগতিটি মূলত ইঙ্গিত দেয় যে, তৎকালীন আরবে প্রচলিত হিব্রু বা সিরিয়াক খ্রিষ্টীয় লোককাহিনীগুলো (যাতে দুই মরিয়মকে অনেক সময় গুলিয়ে ফেলা হতো) যাচাই-বাছাই ছাড়াই টেক্সটে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে।
৪. যৌক্তিক সারসংক্ষেপ: সবশেষে, প্রমাণের ভার (Burden of Proof) এবং যৌক্তিক সম্ভাব্যতা বিচার করলে দেখা যায় যে, এই ভুলটি কোনো ‘অলৌকিক রহস্য’ নয়, বরং তথ্যের সীমাবদ্ধতার একটি স্পষ্ট বহিঃপ্রকাশ। একজন ঈশ্বর কেন ইচ্ছাকৃতভাবে তার বাণীর গ্রহণযোগ্যতা কমানোর মতো অস্পষ্ট আয়াত প্রদান করবেন—তার কোনো সন্তোষজনক উত্তর ধর্মতাত্ত্বিকরা আজও দিতে পারেননি। ফলে এটি ঐতিহাসিকভাবে একটি ‘কালবিভ্রান্তি’ বা ভ্রান্ত তথ্য হিসেবেই টিকে থাকে।
উপসংহার
যৌক্তিক ও ঐতিহাসিক বিচারে এটি প্রতীয়মান হয় যে, মৌখিক ঐতিহ্যের ওপর ভিত্তি করে কোরআনিক আখ্যানটি রচিত হওয়ার ফলে ওল্ড টেস্টামেন্টের ‘মিরিয়াম’ (হারুন-মোশির বোন) এবং নিউ টেস্টামেন্টের ‘মরিয়ম’ (যিশুর মাতা)—এই দুই ভিন্ন ব্যক্তিত্বের মধ্যে একটি পদ্ধতিগত কালবিভ্রান্তি বা Anachronism তৈরি হয়েছে। পর্যাপ্ত ঐতিহাসিক প্রমাণের অভাব এবং কালানুক্রমিক বিশাল ব্যবধান এই অসংগতিকে আরও ঘনীভূত করে। অবশ্য মুসলিম ব্যাখ্যাধারায় ‘উখতা/ভগ্নি’কে সম্মানসূচক বা বংশগত উপাধি হিসেবেও ব্যাখ্যা করা হয়; কিন্তু ঐ ব্যাখ্যার ঐতিহাসিক প্রমাণ-ভিত্তি ও ভাষাতাত্ত্বিক সম্ভাব্যতা—এই নিবন্ধের আলোচ্য প্রশ্ন।
