
Table of Contents
ভূমিকা
ইতিহাসের পাতায় কোনো ব্যক্তির মহত্ত্ব বিচার করার মাপকাঠি হওয়া উচিত তার মানবিক আচরণ এবং নৈতিক অবস্থান। কিন্তু ইসলামি ধর্মতত্ত্বে আমরা দেখি এক অদ্ভুত বৈপরীত্য। যাকে ‘সাইফুল্লাহ’ বা ‘আল্লাহর তলোয়ার’ উপাধিতে ভূষিত করা হয়েছে, সেই খালিদ বিন ওয়ালিদের সামরিক সাফল্যের আড়ালে চাপা পড়ে আছে এক ভয়াবহ রক্তপিপাসু ও বিকৃত মনস্তাত্ত্বিক অধ্যায়। আধুনিক অপরাধবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে বিশ্লেষণ করলে খালিদের কর্মকাণ্ড তাকে একজন ‘সিরিয়াল কিলার’ বা ‘সাইকোপ্যাথিক’ সমরনায়ক হিসেবে চিহ্নিত করতে বাধ্য করে।
ইসলামি ইতিহাস গ্রন্থ ‘আর-রাহীকুল মাখতূম’ থেকে শুরু করে ‘আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া’—প্রতিটি নির্ভরযোগ্য উৎসই সাক্ষ্য দেয় যে, খালিদ বিন ওয়ালিদের তলোয়ার কেবল যুদ্ধক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং তা নির্লজ্জভাবে ব্যবহৃত হয়েছে নিরস্ত্র বন্দী, নারী এবং ভিন্নমতাবলম্বীদের ওপর। ধর্মের প্রসারের দোহাই দিয়ে যে ধরণের নৃশংসতা তিনি চালিয়েছিলেন, তা কেবল সামরিক কৌশল ছিল না; বরং তা ছিল আদিম পাশবিকতা এবং ক্ষমতার দম্ভের এক নির্দয় বহিঃপ্রকাশ। সাড়ে তিনশ মানুষকে একত্রে বেঁধে জবাই করা কিংবা একজন নারীকে দ্বিখণ্ডিত করে ফেলার মতো ঘটনাগুলো কোনো সুস্থ মস্তিষ্কের মানুষের কাজ হতে পারে না। এই প্রবন্ধে আমরা দেখার চেষ্টা করব, কীভাবে একজন চরম নৃশংস ব্যক্তিকে ধর্মের লেবাস পরিয়ে ‘বীর’ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করা হয়েছে এবং কীভাবে ইসলামি দায়মুক্তি (Immunity) সত্য অনুসন্ধানের পথকে রুদ্ধ করে রেখেছে।
ইসলামে সাহাবীদের সমালোচনা হারাম
ইসলামি বিশ্বাসের একটি মৌলিক এবং সমস্যাজড়িত দিক হলো ‘সাহাবীদের ইনফলিবিলিটি’ বা সমালোচনার ঊর্ধ্বে রাখার প্রবণতা। প্রচলিত ফতোয়া এবং ইসলামের আকীদা অনুযায়ী, কোনো সাহাবীর সমালোচনা করা মানেই ঈমান হারানো, সরাসরি কুফরি করা। একজন নিরপেক্ষ সত্যসন্ধানী মানুষের জন্য এটি একটি বড় ধরণের বুদ্ধিবৃত্তিক ফাঁদ। যখন কোনো আদর্শ আগে থেকেই সিদ্ধান্ত দিয়ে দেয় যে—‘অমুক ব্যক্তির কোনো দোষ দেখা যাবে না’—তখন সেই আদর্শ আর সত্যের মাপকাঠি থাকে না, বরং তা একটি অন্ধ আনুগত্যের শৃঙ্খলে পরিণত হয়।
সাহাবীদের দোষ গোপন করার এই সংস্কৃতি মূলত ইতিহাসের সত্যকে বিকৃত করার একটি হাতিয়ার। খালিদ বিন ওয়ালিদের বর্বরতা এতটাই চরম ছিল যে, স্বয়ং নবী মুহাম্মদ এবং পরবর্তীতে ওমর ইবনুল খাত্তাবও তার কর্মকাণ্ডে ক্ষুব্ধ হয়েছিলেন। অথচ বর্তমানের মুসলিম সমাজ ইমান হারানোর ভয়ে সেই রক্তভেজা ইতিহাসকে অস্বীকার করে অথবা ‘ইজতিহাদি ভুল’ (গবেষণালব্ধ ভুল) বলে এক ধরণের অযৌক্তিক সাফাই গায়। নিরপেক্ষ ঐতিহাসিক পর্যালোচনায় ইমানের এই বাধা কাটিয়ে ওঠা প্রয়োজন। কারণ, যদি কোনো ব্যক্তি সাড়ে তিনশ বন্দিকে ঠান্ডা মাথায় জবাই করতে পারে, তবে তাকে শ্রদ্ধা করা আর নৈতিকতাকে বিসর্জন দেওয়া একই কথা। নিচের ভিডিওটিতে আমরা দেখব কীভাবে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে সাহাবীদের অপরাধ গোপনের শিক্ষা দেওয়া হয়:
ইতিহাসকে নিরপেক্ষভাবে পর্যালোচনা করা যেকোন সত্যান্বেষী মানুষের কর্তব্য হওয়া উচিত। কিন্তু নিরপেক্ষ হওয়ার পথে যদি ইমান এসে বাধা দেয়, তাহলে তো বিপদ। খালিদের নৃশংসতা এতটাই সীমা অতিক্রম করেছিল যে, তার এসব কর্মকাণ্ড দেখে মুহাম্মদ নিজেও বিরক্ত হয়ে পড়েছিলেন—যা তাঁর নৃশংসতার মাত্রা কেমন ছিল, তা সহজেই বোঝায়। একজন মানুষ কতটা হৃদয়হীন হলে সাড়ে তিনশো বন্দিকে একত্রে বেঁধে ঠাণ্ডা মাথায় জবাই করতে পারে? এমন ভয়াবহ নির্মমতার বিবরণ পড়লে গা শিউরে ওঠে। ভাবা যায়, নবীর অন্য সাহাবীরাও তাঁর বর্বরতা দেখে হতবাক হয়েছিল!
বনু জাযীমাহ গণহত্যা: ‘আল্লাহর তলোয়ার’ নাকি উন্মত্ত রক্তপিপাসা?
খালিদ বিন ওয়ালিদের সমর জীবন বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, তার যুদ্ধজয়ের নেশা অনেক ক্ষেত্রেই সাধারণ মানবিক বোধ এবং যুদ্ধের নূন্যতম নীতিকেও হার মানিয়েছে। তার এই উম্মত্ততাকে নিছক ‘রণকৌশল’ হিসেবে চালিয়ে দেওয়া ইতিহাসের এক বড় ধরণের জালিয়াতি। মূলত, এটি ছিল এক চরম রক্তপিপাসার বহিঃপ্রকাশ, যেখানে বিজয় মানেই ছিল মরদেহের স্তূপ। যখন একজন যোদ্ধা সাড়ে তিনশ নিরস্ত্র বন্দিকে একত্রে বেঁধে ঠান্ডা মাথায় একে একে জবাই করার নির্দেশ দেন, তখন তাকে বীর বলার চেয়ে ‘সাইকোপ্যাথ’ বা বিকৃত রুচির খুনি বলাই অধিক যুক্তিযুক্ত।
সবচেয়ে ভয়াবহ বিষয় হলো, এই নিষ্ঠুরতাকে বৈধতা দেওয়ার জন্য বারবার ধর্মের আবশ্যকতাকে ব্যবহার করা হয়েছে। ‘আর-রাহীকুল মাখতূম’ থেকে পাওয়া তথ্যানুযায়ী, মূর্তিপূজা বন্ধের নামে তিনি যেভাবে সাধারণ ও অপ্রকৃতিস্থ মানুষদের ওপর তরবারি চালিয়েছেন, তা আধুনিক নৈতিকতার মানদণ্ডে এক জঘন্য অপরাধ। আসুন আর-রাহীকুল মাখতূম থেকে পড়ি, কীভাবে সে একজন মানসিক ভারসাম্যহীন নারীকে দুই টুকরো করে কেটে ফেলেছিলেন, একইসাথে সাড়ে তিনশ’ মানুষকে একসাথে বন্দী করে জবাই করেছিলেন [1] –
বিভিন্ন অভিযান ও প্রতিনিধি প্রেরণ (السَّرَايَا وَالْبُعُوْثِ):
১. মক্কা বিজয়ের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট যাবতীয় কাজকর্ম সুসম্পন্ন করার পর যখন তিনি কিছুটা অবকাশ লাভ করলেন তখন ৮ম হিজরীর ২৫ রমযান উযযা নামক দেব মূর্তি বিনষ্ট করার উদ্দেশ্যে খালিদ বিন ওয়ালিদ (রাঃ)-এর নেতৃত্বে একটি ছোট সৈন্যদল প্রেরণ করলেন। উযযা মূর্তির মন্দিরটি ছিল নাখলা নামক স্থানে। এটি ভেঙ্গে ফেলে খালিদ (রাঃ) প্রত্যাবর্তন করলে রাসূলুল্লাহ (সাঃ) তাঁকে জিজ্ঞেস করলেন, (هَلْ رَأَيْتَ شَيْئًا؟)‘তুমি কি কিছু দেখেছিলে?’ খালিদ (রাঃ) বললেন, ‘না’ রাসূলুল্লাহ (সাঃ) ইরশাদ করলেন, (فَإِنَّكَ لَمْ تَهْدِمْهَا فَارْجِعْ إِلَيْهَا فَاهْدِمْهَا) ‘তাহলে প্রকৃতপক্ষে তুমি তা ভাঙ্গ নি। পুনরায় যাও এবং তা ভেঙ্গে দাও।’ উত্তেজিত খালিদ (রাঃ)কোষমুক্ত তরবারি হস্তে পনুরায় সেখানে গমন করলেন। এবারে বিক্ষিপ্ত ও বিস্ত্রস্ত চুলবিশিষ্ট এক মহিলা তাঁদের দিকে বের হয়ে এল। মন্দির প্রহরী তাকে চিৎকার করে ডাকতে লাগল। কিন্তু এমন সময় খালিদ (রাঃ) তরবারি দ্বারা তাকে এতই জোরে আঘাত করলেন যে, তার দেহ দ্বিখন্ডিত হয়ে গেল। এরপর রাসূলুল্লাহ (সাঃ)-কে তিনি এ সংবাদ অবগত করালে তিনি বললেন, (نَعَمْ، تِلْكَ الْعُزّٰى، وَقَدْ أَيِسَتْ أَنْ تَعْبُدَ فِيْ بِلَادِكُمْ أَبَدًا) ‘হ্যাঁ’, সেটাই ছিল উযযা। এখন তোমাদের দেশে তার পূজা অর্চনার ব্যাপারে সে নিরাশ হয়ে পড়েছে (অর্থাৎ কোন দিন তার আর পূজা অর্চনা হবে না)।
২. এরপর নাবী কারীম (সাঃ)সে মাসেই ‘আমর ইবনুল ‘আস (রাঃ)-কে ‘সুওয়া’ নামক দেবমূর্তি ভাঙ্গার জন্য প্রেরণ করেন। এ মূর্তিটি ছিল মক্কা হতে তিন মাইল দূরত্বে ‘রিহাত’ নামক স্থানে বনু হুযাইলের একটি দেবমূর্তি। ‘আমর যখন সেখানে গিয়ে পৌঁছেন তখন প্রহরী জিজ্ঞেস করল, ‘তোমরা কী চাও?’ তিনি বললেন, ‘আল্লাহর নাবী (সাঃ) এ মূর্তি ভেঙ্গে ফেলার জন্য আমাদের নির্দেশ প্রদান করেছেন।’
সে বলল, ‘তোমরা এ মূর্তি ভেঙ্গে ফেলতে পারবে না।’
‘আমর (রাঃ) বললেন, ‘কেন?’
সে বলল, ‘প্রাকৃতিক নিয়মেই তোমরা বাধাপ্রাপ্ত হবে।’
‘আমর (রাঃ) বললেন, ‘তোমরা এখনও বাতিলের উপর রয়েছ? তোমাদের উপর দুঃখ, এই মূর্তিটি কি দেখে কিংবা শোনে?’
অতঃপর মূর্তিটির নিকট গিয়ে তিনি তা ভেঙ্গে ফেললেন এবং সঙ্গীসাথীদের নির্দেশ প্রদান করলেন ধন ভান্ডার গৃহটি ভেঙ্গে ফেলতে। কিন্তু ধন-ভান্ডার থেকে কিছুই পাওয়া গেল না। অতঃপর তিনি প্রহরীকে বললেন, ‘বল, কেমন হল?’
সে বলল, ‘আল্লাহর দ্বীন ইসলাম আমি গ্রহণ করলাম।’
৩. এ মাসেইসা‘দ বিন যায়দ আশহালী (রাঃ)-এর নেতৃত্বে বিশ জন ঘোড়সওয়ার সৈন্য প্রেরণ করেন মানাত দেবমূর্তি ধ্বংসের উদ্দেশ্যে। কুদাইদের নিকট মুশাল্লাল নামক স্থানে আওস, খাযরাজ, গাসসান এবং অন্যান্য গোত্রের উপাস্য ছিল এ ‘মানত’ মূর্তি। সা‘দ (রাঃ)-এর বাহিনী যখন সেখানে গিয়ে পৌঁছেন তখন মন্দিরের প্রহরী বলল, ‘তোমরা কী চাও?’
তাঁরা বললেন, ‘মানাত দেবমূর্তি ভেঙ্গে ফেলার উদ্দেশ্যে আমরা এখানে এসেছি।’
সে বলল, ‘তোমরা জান এবং তোমাদের কার্য জানে।’
সা‘দ মানাত মূর্তির দিকে অগ্রসর হতে গিয়ে একজন উলঙ্গ কালো ও বিক্ষিপ্ত চুল বিশিষ্ট মহিলাকে বেরিয়ে আসতে দেখতে পেলেন। সে আপন বক্ষদেশ চাপড়াতে চাপড়াতে হায়! রব উচ্চারণ করছিল।
প্রহরী তাকে লক্ষ্য করে বলল, ‘মানাত! তুমি এ অবাধ্যদের ধ্বংস কর।’
কিন্তু এমন সময় সা‘দ তরবারির আঘাতে তাকে হত্যা করলেন। অতঃপর মূর্তিটি ভেঙ্গে টুকরো টুকরো করে দিলেন। ধন-ভান্ডারে ধন-দৌলত কিছুই পাওয়া যায় নি।
৪. উযযা নামক দেবমূর্তিটি ভেঙ্গে ফেলার পর খালিদ বিন ওয়ালীদ (সাঃ) প্রত্যাবর্তন করলে রাসূলুল্লাহ (সাঃ) ৮ম হিজরী শাওয়াল মাসেই বনু জাযামাহ গোত্রের নিকট তাঁকে প্রেরণ করেন। উদ্দেশ্য ছিল আক্রমণ না করে ইসলাম প্রচার। খালিদ (রাঃ) মুহাজির, আনসার এবং বনু সুলাইম গোত্রের সাড়ে তিনশ লোকজনসহ বনু জাযীমাহর নিকট গিয়ে ইসলামের দাওয়াত পেশ করেন। তারা (ইসলাম গ্রহণ করেছি) বলার পরিবর্তে (আমরা স্বধর্ম ত্যাগ করেছি, আমরা স্বধর্ম ত্যাগ করেছি) বলল। এ কারণে খালিদ (রাঃ) তাদের হত্যা এবং বন্দী করতে আদেশ দিলেন। তিনি সঙ্গী সাথীদের এক একজনের হস্তে এক এক জন বন্দীকে সমর্পণ করলেন। অতঃপর এ বলে নির্দেশ প্রদান করলেন যে, ‘প্রত্যেক ব্যক্তি তাঁর নিকটে সমর্পিত বন্দীকে হত্যা করবে। কিন্তু ইবনু উমার এবং তাঁর সঙ্গীগণ এ নির্দেশ পালনে অস্বীকৃতি জ্ঞাপন করলেন। অতঃপর যখন নাবী কারীম (সাঃ)-এর খিদমতে উপস্থিত হলেন তখন বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করলেন। তিনি দু’ হাত উত্তোলন করে দু’বার বললেন, (اللهم إِنِّيْ أَبْرَأُ إِلَيْكَ مِمَّا صَنَعَ خَالِدًا) ‘হে আল্লাহ! খালিদ যা করেছে আমি তা হতে তোমার নিকটে নিজেকে পবিত্র বলে ঘোষণা করছি।’(1)
এ পরিস্থিতিতে শুধুমাত্র বনু সুলাইম গোত্রের লোকজনই নিজ বন্দীদের হত্যা করেছিল। আনসার ও মহাজিরীনগণ হত্যা করেন নি। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) আলী (রাঃ)-কে প্রেরণ করে তাদের নিহত ব্যক্তিদের শোণিত খেসারত এবং ক্ষতিপূরণ প্রদান করেন। এ ব্যাপারটিকে কেন্দ্র করে খালিদ (রাঃ) ও আব্দুর রহমান বিন আওফ (রাঃ)-এর মাঝে কিছু উত্তপ্ত বাক্য বিনিময় এবং সম্পর্কের অবণতি হয়েছিল। এ সংবাদ অবগত হওয়ার পর রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বললেন,
(مَهَلًّا يَا خَالِدُ، دَعْ عَنْكَ أَصْحَابِيْ، فَوَاللهِ لَوْ كَانَ أَحَدٌ ذَهَبًا، ثُمَّ أَنْفَقَتْهُ فِيْ سَبِيْلِ اللهِ مَا أَدْرَكَتْ غُدْوَةَ رَجُلٍ مِّنْ أَصْحَابِيْ وَلَا رَوْحَتَهُ)
‘খালিদ থেমে যাও, আমার সহচরদের কিছু বলা হতে বিরত থাক। আল্লাহর কসম! যদি উহুদ পাহাড় সোনা হয়ে যায় এবং তার সমস্তই তোমরা আল্লাহর পথে খরচ করে দাও তবুও আমার সাহাবাদের মধ্য হতে কোন এক জনেরও এক সকাল কিংবা এক সন্ধ্যার ইবাদতের নেকী অর্জন করতে পারবে না।(2)


যাকাত অস্বীকারকারীর মাথা কেটে রান্না
খালিদ বিন ওয়ালিদের বর্বরতার ইতিহাস কেবল গণহত্যাতেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং তা মৃতদেহের বীভৎস অবমাননা এবং লালসার এক নগ্ন দলিলে পূর্ণ। ইসলামের ইতিহাসে মালিক ইবনে নুওয়ায়রার হত্যাকাণ্ড এমন এক কলঙ্কজনক অধ্যায়, যা তথাকথিত ‘ইসলামি ন্যায়বিচার’ ও ‘সাহাবীদের মহানুভবতা’র মিথকে পুরোপুরি ধূলিসাৎ করে দেয়। একজন মানুষকে স্রেফ যাকাত সংপর্কিত বাকবিতণ্ডার জেরে হত্যা করে তার ছিন্ন মস্তক দিয়ে হাঁড়ি চড়িয়ে রান্না করা—এটি কোনো সুস্থ সমরনায়কের কাজ হতে পারে না; এটি স্রেফ একজন বিকারগ্রস্ত ‘স্যাডিস্ট’ (Sadist) বা পরপীড়ক মানসিকতার পরিচয়। সেইসাথে সেই মৃত মানুষটির স্ত্রীকে বন্দী করে গণিমতের মাল হিসেবে ভোগ করা, এ যেন হলিউডের সবচাইতে বীভৎস সিনেমাকেও হার মানায় [2]
খালিদ (গনীমাত হিসাবে) নারী বন্দীদের মধ্য থেকে মালিক ইব্ন নুওয়ায়রার স্ত্রীকে বেছে নেন। তার নাম ছিল উম্মু তামীম, মিনহালের কন্যা। দেখতে অত্যন্ত সুন্দরী। ঋতু থেকে পাক হওয়ার পর খালিদ তার সাথে মিলিত হন। কেউ কেউ বলেন যে, খালিদ মালিক ইব্ন নওওয়ায়রাকে ডেকে এনে সাজাহর মতাবলম্বন এবং যাকাত প্রদানে বিরত থাকার কারণ জিজ্ঞেস করেন। তিনি বলেন, তোমার কি জানা নেই যে, যাকাতের বিধান সালাতের বিধানের সাথে মিলিয়ে একত্রে দেয়া হয়েছে? মালিক বলল, তোমাদের সাথী (নবী) তো এ রকমই মনে করেন। খালিদ বললেন, তিনি আমাদের সাথী, তোমার সাথী (নবী) নন কি? হে যিরার! এর গর্দান উড়িয়ে দাও! তারপর মালিকের গর্দান উড়িয়ে দেয়া হয়। খালিদের নির্দেশে তার শির ছিন্ন করা হল। তারপর দু’টি পাথর ও মালিকের মস্তক এই তিনটির উপর ডেকচি বসিয়ে খাবার রান্না করা হয়। এই খাবার দিয়ে খালিদ ঐ রাত্রের আহার সারেন। এ ব্যবস্থার উদ্দেশ্য ছিল, আরবের মুবতাদ ও অন্যান্য লোকদেরকে ভীত ও শংকিত করা। কথিত আছে যে, মালিকের মাথার চুলও রান্নার আগুনে দেয়া হয় এবং চুল এত বেশি ছিল যে, গোশ্ত পাকান শেষ হবার পরও চুল অবশিষ্ট ছিল। আবূ কাতাদা খালিদের এই কাজের সমালোচনা করেন এবং এ নিয়ে দু’জনের তর্ক-বিতর্কও হয়। এমন কি আবূ কাতাদা খলীফা হযরত সিদ্দীকের নিকট হাযির হয়ে অভিযোগ পেশ করেন। হযরত উমর (রা)-এ বিষয়ে আবূ কাতাদা থেকে অবগত হয়ে খলীফাকে বলেন, খালিদকে অপসারণ করুন-কেননা তার তরবারীর মধ্যে যুলুম আছে। কিন্তু হযরত আবূ বকর বললেন, যেই তরবারীকে স্বয়ং আল্লাহ্ কাফিরদের জন্য উন্মুক্ত করেছেন আমি তাকে কোষবদ্ধ করতে পারি না। এরপর মুতামমিম ইব্ নুওয়ায়রা এসেও খালিদের বিরুদ্ধে খলীফার নিকট অভিযোগ দায়ের করেন। হযরত উমর তাকে সাহায্য করেন।
হযরত উমর ইব্ন খাত্তাব (রা) খালিদ ইব্ন ওলীদকে সেনাপতির পদ থেকে অপসারণের জন্য খলীফাকে অব্যাহতভাবে চাপ দিতে থাকেন এবং বলতে থাকেন যে, তার তরবারী যুলুমের সাথে জড়িত হয়ে গেছে। অবশেষে খলীফা খালিদকে ডেকে পাঠালেন। তিনি মদীনায় এসে পৌঁছলেন। তখন তিনি লৌহ বর্ম পরিহিত ছিলেন। প্রচুর পরিমাণ রক্ত লাগার কারণে তাতে মরচে ধরে গিয়েছিল। খালিদ তাঁর মাথার পাগড়ির উপর রক্তমাখা একটি তীর গেড়ে রেখে ছিলেন। মসজিদে প্রবেশ করতেই হযরত উমর উঠে তার পাগড়ি থেকে তীরটি নিয়ে ভেংগে ফেললেন, এবং বললেন, তুমি কি দাপট দেখানোর উদ্দেশ্যে একজন মুসলমানকে হত্যা করে তার স্ত্রীর উপর ঝাঁপিয়ে পড়েছ। আল্লাহর কসম, তোমাকে আমি পাথর মেরে হত্যা করব। খালিদ হযরত উমরের সাথে কোন কথা বললেন না । তিনি শুধু লক্ষ্য করলেন যে, খলীফার মত এ ব্যাপারে হযরত উমরের মতের অনুরূপ কিনা। তারপর তিনি হযরত আবূ বকরের কাছে গেলেন এবং ওযর পেশ করলেন। খলীফা তাঁর ওযর গ্রহণ করলেন ও ক্ষমা করে দিলেন এবং মালিক ইব্ নুওয়ায়রার রক্তপণ আদায় করে দিলেন ।
তিনি যখন খলীফার নিকট থেকে বের হন তখন হযরত উমর মসজিদে বসা ছিলেন। খালিদ তাঁকে লক্ষ্য করে বললেন, ওহে উম্মে শামালার পুত্র, এবার আমার কাছে এসো! উমর কোন উত্তর দিলেন না। তিনি বুঝতে পারলেন যে, খলীফা তার প্রতি প্রসন্ন হয়ে গেছেন । আবূ বকর (রা) খালিদকে সেনাপতির পদে বহাল রাখেন। আসলে মালিক ইব্ নুওয়ায়রাকে হত্যার ব্যাপারে খালিদ ইজতিহাদ করেছিলেন, এবং তাতে তাঁর ভুল হয়েছিল । আর একবার রাসূলুল্লাহ্ (সা) আবূ জুযায়মাকে দমন করার জন্য খালিদকে প্রেরণ করলে তিনি সেই সব বন্দীদেরকে হত্যা করেন যারা বলেছিল “আমরা ধর্ম ত্যাগ করেছি, আমরা ধর্ম ত্যাগ করেছি।” আসলে তারা আমরা মুসলমান হয়েছি- কথাটি বলতে অভ্যস্ত ছিল না। তারপর রাসূলুল্লাহ্ (সা) তাদের রক্তপণ আদায় করেন-যার পরিমাণ ছিল বনূ কালবের পশু পালের সমান। রাসূলুল্লাহ্ (সা) দু’হাত তুলে দু’আ করেছিলেন, হে আল্লাহ্! খালিদ যে কাজ করেছে, আমি তা থেকে মুক্ত। তা সত্ত্বেও রাসূলুল্লাহ্ (সা) খালিদকে সেনাপতির পদ থেকে অপসারণ করেননি ।



বীভৎসতার মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ
মনস্তাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে খালিদের এই আচরণকে কয়েকটি স্তরে ব্যাখ্যা করা যায়:
- স্যাডিজম ও পাওয়ার ডমিন্যান্স (Sadism & Power Dominance): মৃতদেহের মাথা দিয়ে উনুন বানিয়ে আহার করার ঘটনাটি চরম পর্যায়ের ‘স্যাডিজম’ বা পরপীড়নকামী মানসিকতার বহিঃপ্রকাশ। একজন সাধারণ যোদ্ধা প্রতিপক্ষকে হত্যা করেই সন্তুষ্ট থাকে, কিন্তু একজন স্যাডিস্ট প্রতিপক্ষের নিথর দেহের চরম অবমাননা করে নিজের আধিপত্য বা ‘সুপিরিওরিটি কমপ্লেক্স’ চরিতার্থ করতে চায়। এটি কেবল ভয় দেখানো নয়, বরং মানবিক মর্যাদাকে পদদলিত করার এক পৈশাচিক আনন্দ।
- ডী-হিউম্যানাইজেশন (Dehumanization): যখন কোনো মতাদর্শ মানুষকে ‘মুমিন’ এবং ‘কাফের’—এই দুই মেরুতে ভাগ করে দেয়, তখন বিরোধী পক্ষকে ‘মানুষ’ হিসেবে দেখার বোধটি লোপ পায়। খালিদ বিন ওয়ালিদের ক্ষেত্রে এই ‘ডী-হিউম্যানাইজেশন’ বা অমানবিকীকরণ প্রক্রিয়াটি ছিল প্রকট। তার কাছে সামান্য ভিন্নমতাবলম্বীরাও ছিল কেবল হত্যার যোগ্য ‘বস্তু’, আর কিছু নয়। যার ফলে তিনি অবলীলায় সাড়ে তিনশ মানুষকে জবাই করতে পেরেছিলেন।
- ডার্ক ট্রায়াড পার্সোনালিটি (The Dark Triad): খালিদের চরিত্রের মধ্যে নার্সিসিজম (আত্মমুখিতা), ম্যাকিয়াভেলিয়ানিজম (ক্ষমতার জন্য অনৈতিকতা) এবং সাইকোপ্যাথি (সহমর্মিতাহীনতা)—এই তিনটিরই উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়। মালিকের স্ত্রীকে ঐ রাতেই শয্যাসঙ্গিনী করার মাধ্যমে তিনি তার আবেগীয় অসাড়তা এবং লালসা ও ক্ষমতার আদিম সমন্বয় প্রদর্শন করেছেন।
ধর্মীয় দায়মুক্তির চূড়ান্ত ব্যর্থতা
খালিদ বিন ওয়ালিদের এই নৃশংসতাকে ‘আল্লাহর তলোয়ার’ বা ‘ইজতিহাদি ভুল’ হিসেবে মহিমান্বিত করা ইসলামের নৈতিক দেউলিয়াত্বেরই পরিচয় দেয়। যখন কোনো ধর্মতত্ত্ব একজন সিরিয়াল কিলারকে তার খুনের অপরাধ থেকে মুক্তি দিতে ‘গবেষণালব্ধ ভুল’ নামক হাস্যকর যুক্তি ব্যবহার করে, তখন সেই আদর্শ আর ন্যায়বিচারের প্রতীক থাকে না। এটি প্রমাণ করে যে, তৎকালীন ইসলামি শাসন ব্যবস্থা ছিল একটি টোটালিটারিয়ান বা একনায়কতান্ত্রিক কাঠামো, যেখানে সামরিক বিজয় অর্জনের জন্য যেকোনো পৈশাচিকতাকেই ‘পবিত্র’ করে তোলা সম্ভব ছিল।
খালিদ বিন ওয়ালিদ কোনো মহানায়ক নন; বরং তিনি ইতিহাসের এক রক্তপিপাসু অধ্যায়, যার হাত নিরপরাধ মানুষের রক্তে রঞ্জিত। তার বীরত্বের কাহিনীগুলো আসলে মানবতার কান্নায় ভিজে থাকা এক চরম লজ্জার আখ্যান। এই সত্যটি স্বীকার করা কেবল ঐতিহাসিকভাবেই জরুরি নয়, বরং মানুষের সহজাত বিবেক ও নৈতিকতাকে ধর্মের অন্ধ শৃঙ্খল থেকে মুক্ত করার জন্যও অপরিহার্য। একজন যুক্তিবাদী মানুষের পক্ষে এমন ব্যক্তিকে শ্রদ্ধা করা অসম্ভব, যিনি ক্ষমতার লোভে মানবতাকে নর্দমায় নিক্ষেপ করেছিলেন। তার অপকর্মের একটি লিস্ট দেখে নিই,
উপসংহার
উপরের তথ্যপ্রমাণের আলোকে বলা যায়, খালিদ বিন ওয়ালিদের কর্মকাণ্ডের এই ঐতিহাসিক খতিয়ান কেবল একটি যুদ্ধের বিবরণ নয়, বরং এটি ক্ষমতার দম্ভে মত্ত এক বিকৃত মনস্তত্ত্বের দালিলিক প্রমাণ। মালিক ইবনে নুওয়ায়রার বিচ্ছিন্ন মস্তক দিয়ে চুলা জ্বালানো কিংবা সাড়ে তিনশ বন্দিকে বেঁধে জবাই করার নির্দেশ দেওয়া—এই ঘটনাগুলো কোনো সুস্থ সমরনায়কের সামরিক কৌশলের অংশ হতে পারে না। বরং এগুলোকে বিশ্লেষণ করলে একজন ‘পলিটিক্যাল সাইকোপ্যাথ’ বা ‘প্যাথলজিক্যাল স্যাডিস্ট’-এর চারিত্রিক লক্ষণগুলোই স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
একই সাথে, খালিদ বিন ওয়ালিদের এই কর্মকাণ্ডগুলো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ইসলামি বিজয়ের ইতিহাস কোনো নৈতিক বিপ্লব ছিল না, বরং তা ছিল চরম বলপ্রয়োগ, রক্তপাত এবং নারীর ওপর আধিপত্য বিস্তারের এক পৈশাচিক অধ্যায়। মালিক ইবনে নুওয়ায়রার ছিন্ন মস্তক দিয়ে রান্না করা সেই রাতের আহার আজ অব্দি ইসলামি ইতিহাসের পাতায় এক দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে, যা কোনো পারফিউম দিয়েই ঢাকা সম্ভব নয়। এই ঘটনাটি চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় যে, ধর্মের লেবাসে অপরাধীরা কীভাবে ‘পবিত্র’ হয়ে উঠতে পারে।
