হযরত উমরের সরাসরি কুফরি কর্মসমূহের তালিকা

ভূমিকা

ইসলামী ধর্মতত্ত্বের একটি কেন্দ্রীয় স্তম্ভ হলো সাহাবীদের ‘আদালত’ বা তাদের সমালোচনার ঊর্ধ্বে স্থান দেওয়া। প্রচলিত ইসলামি বিশ্বাস অনুযায়ী, নবীর সাহাবীরা ভুলের ঊর্ধ্বে না হলেও তাদের কর্মকা্লের সমালোচনা করা ধর্মীয়ভাবে নিষিদ্ধ বা ‘ফিতনা’ হিসেবে গণ্য। কিন্তু একজন নিরাসক্ত ঐতিহাসিক বা যুক্তিবাদী গবেষকের কাছে এই “সমালোচনা-নিষেধ” নীতিটি সত্য অনুসন্ধানের পথে একটি প্রধান অন্তরায়। যখন কোনো নির্দিষ্ট গোষ্ঠীকে সমালোচনার ঊর্ধ্বে রাখা হয়, তখন ইতিহাসের বস্তুনিষ্ঠতা ঢাকা পড়ে যায় এবং একটি কৃত্রিম ‘সোনালী যুগে’র মিথ তৈরি হয়। বিশেষ করে দ্বিতীয় খলিফা উমর ইবনুল খাত্তাবের জীবন ও কর্মকা্ল বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, তার অনেক সিদ্ধান্ত খোদ কুরআনের বিধান এবং নবীর প্রত্যক্ষ নির্দেশের সাথে সাংঘর্ষিক ছিল। কিন্তু এই বিষয়ে যৌক্তিক পর্যালোচনা ইসলামই কঠোর নিষেধাজ্ঞার মাধ্যমে বন্ধ করে রেখেছে, তাই সেসব ইতিহাসের নিরপেক্ষ বিশ্লেষণ ইসলামের ভেতরে থেকে সম্ভবই নয়। আসুন এই বিষয়ে ড. আবু বকর মুহাম্মদ যাকারিয়ার একটি বক্তব্য শুনি,

যদি অনুসন্ধিৎসু মন নিয়ে আমরা উমরের শাসনকাল এবং তার ব্যক্তিগত জীবন পর্যালোচনা করি, তবে এমন কিছু দৃষ্টান্ত পাওয়া যায় যা প্রচলিত ‘আনুগত্যের’ সংজ্ঞাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। উমর কেবল একজন অনুসারীই ছিলেন না, বরং অনেক ক্ষেত্রে তিনি নিজের ইচ্ছা বা খেয়ালখুশি অনুযায়ী ওহীর গতিপথ বা নবীর সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করার চেষ্টা করেছেন। ধর্মীয় দৃষ্টিকোণে একে ‘উমরের موافقات’ (উমরের সাথে আল্লাহর ঐকমত্য) বলে মহিমান্বিত করা হলেও, সমালোচনামূলক দৃষ্টিতে এটি মূলত ঐশ্বরিক বিধানের ওপর একজন শক্তিশালী ব্যক্তিত্বের মনস্তাত্ত্বিক আধিপত্যের বহিঃপ্রকাশ। এই প্রবন্ধে আমরা উমরের এমন কিছু সুনির্দিষ্ট কর্মকাণ্ড পর্যালোচনা করবো যা ইসলামী শরীয়তের মৌলিক নির্দেশনার সাথে সরাসরি দ্বন্দ্বে লিপ্ত হয়েছিল—যাকে তাত্ত্বিক বিচারে ‘বিচ্যুতি’ বা ‘অমান্যকরণ’ হিসেবে চিহ্নিত করা যেতে পারে। সত্য উন্মোচনের এই যাত্রায় ইমানের অন্ধ আনুগত্যের চেয়ে যুক্তির কষ্টিপাথরই হবে আমাদের প্রধান হাতিয়ার। ইতিহাসকে নিরপেক্ষভাবে পর্যালোচনা করা যেকোন সত্যান্বেষী মানুষের কর্তব্য হওয়া উচিত। কিন্তু নিরপেক্ষ হওয়ার পথে যদি ইমান এসে বাধা দেয়, তাহলে তো বিপদ। আসুন পর্যালোচনা করে দেখা যাক, হযরত উমর তার জীবদ্দশায় কী কী কুফরি কর্ম করেছিল।


কোরআন অমান্য করে উমরের স্ত্রী সহবাস ও শেষে আল্লাহর নতিস্বীকার

ইসলামী আইনের বিবর্তন প্রক্রিয়া পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, অনেক ক্ষেত্রেই তথাকথিত ‘ওহী’ বা ঐশ্বরিক নির্দেশগুলো ছিল তৎকালীন শাসকগোষ্ঠী বা প্রভাবশালী সাহাবীদের আচরণের প্রতি এক ধরণের রিঅ্যাক্টিভ রেসপন্স বা প্রতিক্রিয়াশীল সাড়া। এর অন্যতম প্রকৃষ্ট উদাহরণ হলো রমজান মাসের রাতে স্ত্রী সহবাস সংক্রান্ত বিধিনিষেধের পরিবর্তন। প্রাথমিক অবস্থায় ইসলামের রোজা পালনের নিয়ম ছিল অত্যন্ত কঠোর; ঈশার নামাজের পর কিংবা ঘুমিয়ে পড়ার পর থেকে পরবর্তী মাগরিব পর্যন্ত পানাহার ও যৌন মিলন সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ ছিল। কিন্তু এই কঠোর বিধানটি খোদ নবী মুহাম্মদের ঘনিষ্ঠ সাহাবীদের মধ্যেই চরম বিশৃঙ্খলা ও অবাধ্যতা তৈরি করেছিল। বিশেষ করে উমর ইবনুল খাত্তাবের মতো প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব যখন এই বিধান লঙ্ঘন করেন, তখন তা কেবল একটি ব্যক্তিগত বিচ্যুতি থাকে না, বরং তা ধর্মরাষ্ট্রের আইনি কাঠামোর কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তোলে। নিরপেক্ষ ও যৌক্তিক দৃষ্টিতে দেখলে, এটি ছিল একটি মনস্তাত্ত্বিক সংঘাত, যেখানে মানুষের জৈবিক তাড়না তৎকালীন অলঙ্ঘনীয় বলে দাবি করা আল্লাহর আইনের ওপর বিজয় লাভ করেছিল।

ঐতিহাসিক ও তাফসীর গ্রন্থগুলো সাক্ষ্য দেয় যে, উমর এবং কা’ব বিন মালেকের মতো সাহাবীরা আল্লাহর এই বিধানের ‘খেয়ানত’ বা বিশ্বাসঘাতকতা করেছিলেন। কোরআনের ভাষায়, তারা ‘নিজেদের সাথে প্রতারণা’ করছিলেন। উমর যখন রাতের বেলা ঘুম থেকে জেগে স্ত্রীর সাথে মিলিত হলেন এবং পরে নবীর কাছে গিয়ে নিজের অপরাধ স্বীকার করলেন, তখন মুহাম্মদ তাকে কেবল তিরস্কারই করেননি, বরং পুরো আইনি কাঠামোতেই একটি নাটকীয় পরিবর্তন লক্ষ্য করা গেল। এখানে লক্ষ্যণীয় যে, একজন ‘সর্বজ্ঞানী’ সত্তা কেন এমন একটি আইন প্রথমে দিলেন যা তার শ্রেষ্ঠ অনুসারীরাই পালন করতে অক্ষম? যৌক্তিক বিশ্লেষণে এটি স্পষ্ট যে, যখন প্রভাবশালী অনুসারীরা আইন মানতে অস্বীকৃতি জানায় বা গণহারে আইন লঙ্ঘন শুরু করে, তখন নেতৃত্বের স্থিতিশীলতা রক্ষার জন্য আইনটি বদলে ফেলাই ছিল একমাত্র রাজনৈতিক সমাধান। ফলে সূরা বাকারার ১৮৭ নম্বর আয়াতটি নাজিল হয়, যেখানে বলা হয়: “আল্লাহ জানতেন যে তোমরা নিজেদের সাথে প্রতারণা করছিলে, সুতরাং তিনি তোমাদের তওবা কবুল করলেন এবং তোমাদের অব্যাহতি দিলেন” [1]। এই পরিবর্তনটি তথাকথিত ঐশ্বরিক করুণা হিসেবে প্রচার করা হলেও, বাস্তবে এটি ছিল মানুষের দৈহিক চাহিদার কাছে আল্লাহর অসহায় আত্মসমর্পণ

তাফসীরে ইবনে কাসীর এবং তাফসীরে মাযহারীর বর্ণনা অনুযায়ী, উমর যখন নবীর কাছে গিয়ে ওজর পেশ করলেন যে তিনি তার প্রবৃত্তি দমন করতে পারেননি, তখন অন্যান্য সাহাবীরাও দাঁড়িয়ে একই ধরণের স্বীকারোক্তি দিলেন। এটি নির্দেশ করে যে, তৎকালীন মুসলিম সমাজে এই আইনটি অলিখিতভাবে অকার্যকর হয়ে পড়েছিল। বাগবী এবং ইবনে আব্বাসের বর্ণনায় স্পষ্ট যে, উমরের এই অবাধ্যতাই ছিল আয়াতটি নাজিল হওয়ার বা আইনটি পরিবর্তনের মূল কারণ। ধর্মতাত্ত্বিকরা একে ‘আল্লাহর রহমত’ বলে অভিহিত করলেও, যৌক্তিক বিশ্লেষণে এটি মূলত ‘উমর-কেন্দ্রিক ওহী’ প্রপঞ্চের অংশ। অর্থাৎ, উমরের কোনো আচরণ বা ইচ্ছা যখন বিদ্যমান আইনের সাথে সাংঘর্ষিক হতো, তখন ওহীর মাধ্যমে সেই আইনটিকে উমরের অনুকূলে সংস্কার করা হতো। এটি কেবল একটি আধ্যাত্মিক বিষয় নয়, বরং এটি প্রমাণ করে যে আদি ইসলামের আইনগুলো ছিল মূলত পরীক্ষামূলক এবং তা প্রভাবশালী সাহাবীদের শারীরিক ও মানসিক সক্ষমতার ওপর ভিত্তি করে প্রতিনিয়ত পরিবর্তিত বা ‘মানসুখ’ (রহিত) করা হতো।

আসুন কোরআনের সূরা বাকারার আয়াতটি পড়ি, [1]

তোমাদের জন্য রমাযানের রাতে তোমাদের বিবিগণের নিকট গমন করা জায়িয করা হয়েছে, তারা তোমাদের আচ্ছাদন আর তোমরা তাদের আচ্ছাদন। আল্লাহ জানতেন যে, তোমরা নিজেদের সঙ্গে প্রতারণা করছিলে। সুতরাং তিনি তোমাদেরকে ক্ষমা করলেন এবং তোমাদের অব্যাহতি দিলেন। অতএব, এখন থেকে তোমরা তাদের সঙ্গে সহবাস করতে পার এবং আল্লাহ তোমাদের জন্য যা কিছু বিধিবদ্ধ করেছেন তা লাভ কর এবং তোমরা আহার ও পান করতে থাক যে পর্যন্ত তোমাদের জন্য কালো রেখা হতে ঊষাকালের সাদা রেখা প্রকাশ না পায়। তৎপর রাতের আগমন পর্যন্ত রোযা পূর্ণ কর, আর মাসজিদে ই’তিকাফ অবস্থায় তাদের সাথে সহবাস করো না। এসব আল্লাহর আইন, কাজেই এগুলোর নিকটবর্তী হয়ো না। আল্লাহ মানবজাতির জন্য নিজের আয়াতসমূহ বিস্তারিতভাবে বর্ণনা করেন, যাতে তারা মুত্তাকী হতে পারে।
— Taisirul Quran
রামাযানের রাতে আপন স্ত্রীদের সাথে মেলামেশা করা তোমাদের জন্য বৈধ করা হয়েছে, তারা তোমাদের জন্য এবং তোমরা তাদের জন্য আবরণ, তোমরা যে নিজেদের ক্ষতি করছিলে আল্লাহ তা জ্ঞাত আছেন, এ জন্য তিনি তোমাদের প্রতি প্রত্যাবৃত্ত হলেন এবং তোমাদের (ভার) লাঘব করে দিলেন; অতএব এক্ষণে তোমরা (রামাযানের রাতেও) তাদের সাথে মিলিত হও এবং আল্লাহ তোমাদের জন্য যা লিপিবদ্ধ করেছেন তা অনুসন্ধান কর এবং প্রত্যুষে কালো সূতা হতে সাদা সূতা প্রকাশিত না হওয়া পর্যন্ত তোমরা আহার ও পান কর, অতঃপর রাত সমাগম পর্যন্ত তোমরা সিয়াম পূর্ণ কর; তোমরা মাসজিদে ই‘তিকাফ করার সময় (তোমাদের স্ত্রীদের সাথে) মিলিত হবেনা; এটিই আল্লাহর সীমা। অতএব তোমরা উহার নিকটেও যাবেনা; এভাবে আল্লাহ মানবমন্ডলীর জন্য তাঁর নিদর্শনসমূহ বিবৃত করেন, যেন তারা সংযত হয়।
— Sheikh Mujibur Rahman
সিয়ামের রাতে তোমাদের জন্য তোমাদের স্ত্রীদের নিকট গমন হালাল করা হয়েছে। তারা তোমাদের জন্য পরিচ্ছদ এবং তোমরা তাদের জন্য পরিচ্ছদ। আল্লাহ জেনেছেন যে, তোমরা নিজদের সাথে খিয়ানত করছিলে। অতঃপর তিনি তোমাদের তাওবা কবূল করেছেন এবং তোমাদেরকে ক্ষমা করেছেন। অতএব, এখন তোমরা তাদের সাথে মিলিত হও এবং আল্লাহ তোমাদের জন্য যা লিখে দিয়েছেন, তা অনুসন্ধান কর। আর আহার কর ও পান কর যতক্ষণ না ফজরের সাদা রেখা কাল রেখা থেকে স্পষ্ট হয়। অতঃপর রাত পর্যন্ত সিয়াম পূর্ণ কর। আর তোমরা মাসজিদে ইতিকাফরত অবস্থায় স্ত্রীদের সাথে মিলিত হয়ো না। এটা আল্লাহর সীমারেখা, সুতরাং তোমরা তার নিকটবর্তী হয়ো না। এভাবেই আল্লাহ তাঁর আয়াতসমূহ মানুষের জন্য স্পষ্ট করেন যাতে তারা তাকওয়া অবলম্বন করে।
— Rawai Al-bayan
সিয়ামের রাতে তোমাদের জন্য স্ত্রী-সম্ভোগ বৈধ করা হয়েছে [১]। তারা তোমাদের পোষাকস্বরূপ এবং তোমরাও তাদের পোষাকস্বরূপ। আল্লাহ্‌ জানেন যে, তোমরা নিজদের সাথে খিয়ানত করছিলে। সুতরাং তিনি তোমাদের তওবা কবুল করেছেন এবং তোমাদেরকে মার্জনা করেছেন। কাজেই এখন তোমরা তাদের সাথে সংগত হও এবং আল্লাহ্‌ যা তোমাদের জন্য বিধিবদ্ধ করেছেন তা কামনা কর। আর তোমরা পানাহার কর যতক্ষণ রাতের কালোরেখা থেকে উষার সাদা রেখা স্পষ্টরূপে তোমাদের নিকট প্রকাশ না হয় [২]। তারপর রাতের আগমন পর্যন্ত সিয়াম পূর্ণ কর। আর তোমরা মসজিদে ইতিকাফরত [৩] অবস্থায় তাদের সাথে সংগত হয়ো না। এগুলো আল্লাহ্‌র সীমারেখা। কাজেই এগুলোর নিকটবতী হয়ো না [৪]। এভাবে আল্লাহ্‌ তাঁর আয়াতসমূহ মানুষদের জন্য সুস্পষ্টভাবে ব্যক্ত করেন, যাতে তারা তাকওয়ার অধিকারী হতে পারে।
— Dr. Abu Bakr Muhammad Zakaria

এবারে আসুন এই আয়াতটির তাফসীর পড়ে দেখা যাক, [2]

অনুবাদ :
১৮৭. সিয়ামের রাত্রে তোমাদের জন্য স্ত্রীদের সাথে বাধাহীন ব্যবহার সহবাস বৈধ করা হয়েছে ইসলামের প্রথম যুগে সিয়ামের সময় ইশার পরই খানা-পিনা ও স্ত্রীসম্ভোগ ছিল হারাম। উক্ত বিধান মানসূখ করে আল্লাহ তা’আলা এ আয়াত নাজিল করেন।
তারা তোমাদের পরিচ্ছদ এবং তোমরা তাদের পরিচ্ছদ এ স্থানে পরস্পরকে পরিচ্ছদরূপে আখ্যায়িত করে পরস্পরের নিবিড় সম্পর্ক এবং একজন অন্যজনের প্রতি মুখাপেক্ষিতার প্রতি ইঙ্গিত করা হয়েছে। আল্লাহ জানতেন যে সিয়ামের রাত্রে স্ত্রীসম্ভোগ করে তোমরা নিজেদের সাথে প্রতারণা খেয়ানত করছিল। [নিষিদ্ধকালীন সময়ে) হযরত ওমর ও কতিপয় সাহাবীর তরফ হতে এ ধরনের কাজ সংঘটিত হয়েছিল। তাঁরা তখন রাসূলুল্লাহ -এর নিকট এ বিষয়ে ওজর পেশ করেন।
আল্লাহ তা’আলা ইরশাদ করেন, অতঃপর তিনি তোমাদের প্রতি ক্ষমা পরবশ হয়েছেন, তোমাদের তওবা কবুল করেছেন এবং তোমাদের অপরাধ ক্ষমা করেছেন। সুতরাং এখন তোমাদের জন্য যখন বৈধ করে দেওয়া হয়েছে তাদের সাথে সঙ্গত হও সহবাসে লিপ্ত হও এবং আল্লাহ যা তোমাদের জন্য বিধিবদ্ধ করেছেন অর্থাৎ স্ত্রীসম্ভোগ বৈধ করা বা যে সন্তান তোমাদের তকদীরে রাখা হয়েছে তা কামনা কর, অনুসন্ধান কর।

কুফরি

এবারে আসুন তাফসীরে মাযহারীতে কী বলা হয়েছে দেখে নিই, [3]

… এরপর তিনি স্ত্রীগমন করলেন। ওদিকে হজরত কা’ব বিন মালেকও এরকম করলেন। সকালে বিষয়টি রসুলে করীম স. এর গোচরীভূত করা হলে এই আয়াতটি অবতীর্ণ হয়। বাগবী বলেছেন, ইসলামের প্রথম দিকে এশার নামাজের আগে যদি কেউ শুয়ে পড়তো তবে অবশিষ্ট রাতের জন্য পানাহার ও সহবাস নিষিদ্ধ হয়ে যেতো। হজরত ওমর একদিন এই নিষিদ্ধতা ভেঙে ফেললেন। পরদিন তিনি রসুল আকদাস স. এর নিকট ঘটনাটি জানালেন। তিনি স. বললেন, ওমর। তোমার পক্ষে এমতো আচরণ শোভনীয় হয়নি। তখন আরো কিছুসংখ্যক সাহাবী দাঁড়িয়ে স্বীকার করলেন যে, এরকম ঘটনা আমাদের ক্ষেত্রেও ঘটেছে। তখনই এই আয়াতটি অবতীর্ণ হয়।
এরপরের বাক্যে এমর্মে সাক্ষ্য এসেছে, তিনি তোমাদের প্রতি ক্ষমাপরবশ হয়ে তোমাদের অপরাধ ক্ষমা করে দিয়েছেন। সুতরাং এখন থেকে রাতের যে কোনো অংশে সঙ্গত হওয়া বৈধ।
আল্লাহ্ যা তোমাদের জন্য বিধিবদ্ধ করেছেন তা কামনা করো- একথার অর্থ, আল্লাহপাক তোমাদের ভাগ্যে যে সন্তান-সন্ততি নির্ধারণ করেছেন, স্ত্রীসম্ভোগের মাধ্যমে সেই নির্ধারণের অন্বেষী হও। একথার মাধ্যমে প্রমাণিত হয় যে, সন্তান কামনাই স্ত্রীসম্ভোগের মূল উদ্দেশ্য হওয়া উচিত। ইন্দ্রিয়ের চাহিদা পূরণই যেনো প্রধান উদ্দেশ্য না হয়। রসুলে আকদাস স. এরশাদ করেছেন, তোমরা এমন রমণীকে বিবাহবদ্ধ করো, যে তার স্বামীকে ভালোবাসে এবং অধিক সন্তান প্রসবের যোগ্যা হয়। কেনোনা তোমাদের সংখ্যাধিক্য নিয়ে আমি অন্য নবীদের উম্মতের সংখ্যা অতিক্রম করার গর্ব অনুভব করবো। হজরত মা’কাল বিন ইয়াসের থেকে হাদিসটি বর্ণনা করেছেন আবু দাউদ ও নাসাঈ। আয়াতের এই বাক্যটি দ্বারা এটা প্রমাণিত হয়- সহবাসের সময় আজল (স্ত্রী অঙ্গের বাইরে শুক্রপাত করা) মাকরূহ (অনভিপ্রেত)। বাক্যটির মাধ্যমে একথাও বোঝা যায় যে, যথাঅঙ্গের মাধ্যমে সম্ভোগ তৃষ্ণা চরিতার্থ করা মোবাহ্ (বৈধ)। বাগবী বলেছেন, হজরত মুআজ বিন জাবালের মতে ‘মা কাতাবাল্লাহু লাকুম’ বাক্যটির মর্ম লাইলাতুল কদর। আমি বলি, বাক্যটির বাকভঙ্গিমা অভিমতটিকে সমর্থন করে না।
‘আর তোমরা পানাহার করো যতক্ষণ রাত্রির কৃষ্ণরেখা হইতে উষার শুভ্ররেখা স্পষ্টরূপে তোমাদের নিকট প্রতিভাত না হয়’- এই বাক্যে উল্লেখিত ‘খাইতে আয়াদ’ অর্থ দিবসের আলো এবং ‘খাইতি আসওয়াদ’ অর্থ রাত্রির কৃষ্ণতা। ফজরের সূচনায় পুবের আকাশে উত্তর দক্ষিণে প্রলম্বিত দীর্ঘ একটি রেখা পরিদৃষ্ট হয়। ওই রেখাকে নির্দেশ করতেই এখানে ‘খাইত’ শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে। ‘খাইতিল আবইয়াদ’ ফজর (দিন) হলে ‘খাইতিল আসওয়াদ’ অর্থ রাত্রি হওয়া অবশ্যম্ভাবী হয়। ‘মিনাল ফাজরি’ বাক্যাংশটির মিন অব্যয়টি আংশিক অবস্থাকে প্রকাশ করে। আর ‘খাইতিল আবইয়াদ’ ফজরের অবস্থা প্রকাশক। এখানে ফজর অর্থ ফজরের কিয়দাংশ। ফজর প্রকাশ হওয়া পর্যন্ত- এরকম কথা এখানে বলা…

কুফরি 1

এবারে আসুন তাফসীরে ইবনে কাসীর থেকে দেখে নেয়া যাক, উমর এবং অন্য সাহাবীদের স্ত্রী সহবাসের ইচ্ছার কাছে আল্লাহর অসহায় আত্মসমর্পণ [4]

عَلِمَ اللَّهُ أَنَّكُمْ كُنْتُمْ تَخْتُنُونَ اَنْفُسَكُمْ فَتَابَ عَلَيْكُمْ وَعَفَا عَنْكُمْ তা’আলা অবগত আছেন যে, তোমরা নিজেদের ব্যাপারে খিয়ানত করিতেছিলে। অনন্তর তিনি তোমাদের তাওবা কবুল করিয়াছেন এবং তোমাদিগকে ক্ষমা করিয়াছেন।
হযরত ইব্‌ন আব্বাস (রা) হইতে আলী ইন্ন তালহা বর্ণনা করেন: রমযান মাসে মুসলমানগণ, যখন ইশার নামায সম্পন্ন করিত, তাহার পর হইতে পরবর্তী মাগরিব পর্যন্ত তাহাদের জন্য পানাহার ও স্ত্রীসংগম হারাম হইয়া যাইত। তথাপি তাহাদের কাহারও কাহারও ক্ষেত্রে রমযান মাসে উহার ব্যতিক্রম কার্য ঘটিয়া যায়। তাহাদের ভিতর হযরত উমর (রা)-ও ছিলেন। ফলে একদল লোক নবী করীম (সা)-এর দরবারে এই অভিযোগ উত্থাপন করে। তখন আল্লাহ তা’আলা অবকাশ দানের এই আয়াত নাযিল করেন।
হযরত আওফা মূসা ইব্‌ন্ন উকবা হইতে, তিনি কুরায়েব হইতে ও তিনি ইব্‌ন আব্বাস (রা) হইতে বর্ণনা করেন:
মুসলমানগণ সিয়ামের এই আয়াত নাযিল হওয়ার আগে রাত্রিকালে পানাহার ও স্ত্রীগমন করিত। কিন্তু যখন ঘুমাইয়া পড়িত, তখন হইতে পরদিন সন্ধ্যা পর্যন্ত তাহারা পানাহার ও স্ত্রী সহবাস করিত না। এতদসত্ত্বেও একদিন আমাদের নিকট সংবাদ পৌঁছিল যে, উমর ইবন খাত্তাব ঘুম হইতে জাগিয়া স্ত্রীগমন করিয়াছেন। ইত্যবসরে তিনি নবী করীম (সা)-এর দরবারে হাযির হইয়া আরয করিলেন- ‘আমি আমার কৃতকার্যের বিরুদ্ধে আল্লাহ ও আল্লাহর রাসূলের নিকট অভিযোগ করিতে আসিয়াছি।’ রাসূল (সা) প্রশ্ন করিলেন-তুমি কি করিয়াছ? তিনি জবাব দিলেন-‘আমি রোযা রাখার ইচ্ছা পোষণ করিয়াও ঘুম হইতে জাগিয়া স্ত্রীগমন করিয়াছি।’ রাসূল (সা) বলিলেন- ইহা তোমার জন্য শোভনীয় কাজ হয় নাই। অতঃপর আলোচ্য আয়াত নাযিল হয়।’
হযরত আবূ হুরায়রা (রা) হইতে পর্যায়ক্রমে আতা ইব্‌ন রুবাহ, কয়েস ইবন সা’দ ও সাঈদ ইব্‌ন আবূ উরওয়া বর্ণনা করেন:
এই আয়াত নাযিল হওয়ার আগে রমযানে মুসলমানগণ ইশার নামায শেষ করার পর নিদ্রা গেলে পরবর্তী সন্ধ্যা পর্যন্ত তাহাদের জন্য পানাহার ও স্ত্রী সংগম হারাম হইয়া যাইত। অতঃপর উমর ইব্‌ন খাত্তাব ইশার নামাযের পর স্ত্রী সংগম করেন এবং সুরাকা ইব্‌ন কয়েস আনসারী মাগরিবের নামাযের পর নিদ্রা কাতর হইয়া ঘুমাইয়া পড়েন এবং রাসূল (সা)-এর ইশার নামায পড়ানোর পূর্ব পর্যন্ত নিদ্রামগ্ন থাকেন। অতঃপর ইশার নামায পড়িয়া তিনি পানাহার করেন। পর দিন সকালে আসিয়া তাহারা রাসূল (সা)-এর খিদমতে এই সকল অবস্থা ব্যক্ত করেন। তখনই নাযিল হইল:
أُحِلَّ لَكُمْ لَيْلَةَ الصَّيَامِ الرَّفَثُ إِلَى نِسَائِكُمْ …… ثُمَّ أَتِمُّوا الصِّيَامَ إِلَى اللَّيْلِ বস্তুত ইহা আল্লাহ তা’আলার বিরাট করুণা ও অনুগ্রহ বৈ নহে।
আবদুর রহমান ইব্‌ন আবূ লায়লা হইতে যথাক্রমে হেসীন ইব্‌ন আবদুর রহমান ও হিশাম বর্ণনা করেন:
“একদিন উমর ইব্‌ন খাত্তাব (রা) দাঁড়াইয়া আরয করিলেন ‘ইয়া রাসূলাল্লাহ! বিগত রাত্রিতে আমি আমার স্ত্রীর কাছে সেই অভিলাষ ব্যক্ত করিয়াছিলাম, যাহা একটি পুরুষ নারীর কাছে করিয়া থাকে। আমার স্ত্রী জানাইল, সে নিদ্রা গিয়াছিল। আমি উহাকে তাহার বাহানা ভাবিয়া তাহার সহিত সহবাস করিয়াছি।’ তখনই তাহার উপলক্ষে এই আয়াত নাযিল হইলঃ ثُمَّ اَتِمُّوا الصَّيَامَ إِلَى اللَّيْلِ …. ইব্‌ন আবু লায়লা হইতে শু’বা ও আমর ইব্‌ন শু’বা পর্যায়ক্রমে অনুরূপ বর্ণনা প্রদান করেন। কা’ব ইব্‌ন আবদুল মালেক হইতে পর্যায়ক্রমে আবদুল্লাহ ইব্‌ন কা’ব বনু সালমার গোলাম মূসা ইব্‌ন্ন জুবায়ের, আবু লাহীআ, ইবনুল মুবারক সুয়ায়েদ, মুছান্না ও আবূ জা’ফর ইব্‌ন জারীর বর্ণনা করেন:
“রমযান মাসে লোকদের অবস্থা এই ছিল যে, যদি কেহ রোযা রাখিয়া রাত্রে ঘুমাইয়া পড়িত তাহা হইলে উহার পর হইতে তাহার জন্য পরবর্তী ইফতার পর্যন্ত পানাহার ও স্ত্রী সহবাস হারাম হইত। এক রাত্রে উমর ইবন খাত্তাব রাসূলুল্লাহর (সা) দরবার হইতে দেরীতে ঘরে ফিরেন। তখন তাহার স্ত্রী ঘুমাইতেছিলেন। তিনি তাহার কাছে কামনা চরিতার্থের অভিলাষ ব্যক্ত করিলে তাহার স্ত্রী বলিলেন, আমি তো নিদ্রা গিয়াছিলাম। তিনি উহা অবিশ্বাস করিলেন এবং তাহার সহিত সহবাস করিলেন। কা’ব ইব্‌ন মালেক বলেন-প্রত্যূষেই উমর ইবন খাত্তাব রাসূল (সা)-এর খিদমতে হাযির হন এবং তাঁহাকে এই অবস্থা বর্ণনা করেন। তখন আল্লাহ তা’আলা : … অর্থাৎ তোমরা যে নিজ ব্যাপারে খিয়ানত করিতেছিলে, তাহা আল্লাহ তা’আলা জানিয়াছেন। অতঃপর আল্লাহ তা’আলা তোমাদের তাওবা কবুল করিয়াছিলেন তাই এখন হইতে তোমরা স্ত্রীগমন কর।
অনুরূপভাবে মুজাহিদ, আতা, ইকরামা, কাতাদাহ প্রমুখ হযরত উমর (রা) ও সুরাকা ইব্‌ন কয়েস আনসারীর ঘটনাকে এই আয়াত অবতীর্ণ হওয়ার কারণ হিসাবে বর্ণনা করিয়াছেন। অতঃপর আল্লাহর রহম, অনুগ্রহ ও ভালবাসা স্বরূপ রমযানের সারা রাত্র স্ত্রী সহবাস করা, আহার করা ও পান করাকে আল্লাহ তা’আলা মুবাহ করিয়া দিয়াছেন।
… উহা অন্বেষণ কর) আয়াতাংশের ব্যাখ্যা প্রসংগে আবূ হুরায়রা, ইব্‌ন আব্বাস, আনাস, কাজী শুরাইহ, মুজাহিদ, ইকরামা, সাঈদ ইব্‌ন জুবায়র, আতা, রবী ইব্‌ন আনাস, সুদ্দী, যায়দ ইব্‌ন আসলাম, হাকাম ইব্‌ন উতবা, মাকাতিল ইব্‌ন হাইয়ান, হাসান বসরী, যিহাক, ও কাতাদাহ (র) প্রমুখ সাহাবা ও তাবেঈন বলেনঃ ইহার অর্থ ‘সন্তান’।
আবদুর রহমান ইব্‌ন যায়দ ইব্‌ন আসলাম وَابْتَغُوا مَا كَتَبَ اللَّهُ لَكُمْ এর অর্থ ‘সহবাস’ করিয়াছেন। উমর ইবন মালেক আল বুকরী আবূ জাওযা হইতে ও তিনি হযরত ইব্‌ন আব্বাস (রা) হইতে وَابْتَغُوا مَا كَتَبَ اللَّهُ لَكُمْ এর অর্থ লাইলাতুল কদর করিয়াছেন। ইব্‌ন আবি হাতিম ও ইব্‌ন জারীরও অনুরূপ রিওয়ায়েত করিয়াছেন।
আবদুর রাযযাক বলেনঃ মুআম্মার আমাকে সংবাদ দান করিয়াছেন যে, কাতাদাহ وَابْتَغُوا الرُّحْصَةُ الَّتِي كَتَبَ اللهُ لَكُمْ يَقُولُ مَا أَحَلَّ اللَّهُ لَكُمْ : তোমরা সেই অবকাশের অনুসন্ধান কর যাহা তোমাদের জন্য লিখিত হইয়া গেল। কেহ বলিয়াছেনঃ “যাহা কিছু তোমাদের জন্য হালাল করা হইয়াছে উহার অনুসন্ধান কর।”

কুফরি 3
কুফরি 5

পরিশেষে, উমরের এই ‘খিয়ানত’ এবং পরবর্তীতে কোরআনের মাধ্যমে তার বৈধতা পাওয়ার ঘটনাটি ‘সোনালী যুগে’র আনুগত্যের মিথকে ভেঙে দেয়। এটি দেখায় যে, খোদ উমরই আল্লাহর প্রাথমিক বিধানকে তোয়াক্কা করেননি এবং তার এই বিরুদ্ধাচরণই শেষ পর্যন্ত খোদ আল্লাহকে তার নিজস্ব আইন বদলে ফেলতে প্ররোচিত করেছিল। এই ধরণের ঘটনাপ্রবাহ প্রমাণ করে যে, ওহী কোনো স্থির বা ধ্রুব সত্য ছিল না, বরং তা ছিল তৎকালীন আর্থ-সামাজিক ও ব্যক্তিগত চাহিদার সাথে খাপ খাইয়ে নেওয়ার একটি পরিবর্তনশীল হাতিয়ার।


নবীর নির্দেশ অমান্য করা

নবী মুহাম্মদের ওপর সূরা মায়িদার নম্বর আয়াতটির মাঝের অংশটি নাজিল হলো। সেই আয়াতে বলা হচ্ছে, আজকে ইসলাম নামক এই দ্বীনটিকে নাকি পরিপূর্ণ করে দেয়া হলো, অর্থাৎ আল্লাহর ওহী নাজিল শেষ। আসুন আয়াতটির মাঝের অংশটি পড়ি, [5]

আজ তোমাদের জন্য তোমাদের দীন পূর্ণাঙ্গ করলাম, তোমাদের প্রতি আমার অনুগ্রহ সম্পূর্ণ করলাম এবং ইসলামকে তোমাদের জন্য দীন হিসাবে মনোনীত করলাম।
— Sheikh Mujibur Rahman
আজ আমি তোমাদের জন্য তোমাদের দীনকে পূর্ণ করলাম এবং তোমাদের উপর আমার নিআমত সম্পূর্ণ করলাম এবং তোমাদের জন্য দীন হিসেবে পছন্দ করলাম ইসলামকে।
— Rawai Al-bayan
আজ আমি তোমাদের জন্য তোমাদের দীনকে পরিপূর্ণ করলাম এবং তোমাদের উপর আমার নেয়ামত সম্পূর্ণ করলাম [১৪], আর তোমাদের জন্য ইসলামকে দীন হিসেবে পছন্দ করলাম [১৫]।
— Dr. Abu Bakr Muhammad Zakaria

এই আয়াতটি নাজিলের সাথে সাথেই উমর কান্না শুরু করলেন। তিনি বলতে লাগলেন, মুসলিমরা নাকি আল্লাহর কাছে আরও কিছু আশা করেছিল। অর্থাৎ তার মতে, আল্লাহর কোরআন পূর্নাঙ্গ হয়নি। তাই তিনি এই সম্পর্কে নিজের হতাশাও প্রকাশ করেন। এই গ্রন্থে যে ধর্মটি বেশিদিন টিকবে না, সেই নিয়ে আশঙ্কা প্রকাশ করেন। মুহাম্মদও তার সাথে একমত হয় যে, কোরআন নামক এই কেতাবে আসলে ইসলাম ধর্মটি পরিপূর্ণ হয় না। এই ধর্মটি কোরআন নামক গ্রন্থের ওপর নির্ভর করে খুব বেশি দিন টিকবে না, অচিরেই এটি অবনতির দিকে যাবে। আসুন তাফসীর গ্রন্থ থেকে পড়ি, [6]

নীচের দিকে ঝুঁকিয়া পড়েন। বাহনটি ওহীর ভার সহ্য করিতে না পারিয়া বসিয়া পড়িল। তৎক্ষণাৎ আমি রাসূলুল্লাহ (সা)-এর উপর আমার চাদরটি জড়াইয়া দিলাম।
ইন জারীর বলেন: রাসূলুল্লাহ (সা) আরাফাত হইতে বিদায় গ্রহণ করার ৮১ (একাশি) দিন পর ইন্তিকাল করেন। উভয় রিওয়ায়াত ইব্‌ন জারীর (র) উদ্ধৃত করিয়াছেন।
ইন জারীর (র)……হারূন ইন্ন আনতারার পিতা হইতে বর্ণনা করেন যে, হারূন ইন্ন আনতারার পিতা বলেন: اَلْيَوْمَ أَكْمَلْتُ لَكُمْ دِينَكُمْ এই আয়াতটি হজ্জে আরাফাতের দিন যখন অবতীর্ণ হইল, হযরত উমর (রা) কাঁদিতে লাগিলেন। রাসূলুল্লাহ (সা) তাহাকে জিজ্ঞাসা করিলেন যে, তুমি কাঁদিতেছ কেন? তিনি বলিলেন, আমরা এই দীন সম্পর্কে আরো বেশি আশা করিয়াছিলাম। কিন্তু যখন উহা পূর্ণাঙ্গতা লাভ করিয়াছে, তখন তো আর ইহার চেয়ে বেশি আশা করা যায় না; বরং ক্রমান্বয়ে ইহার অবনতিই আশা করা যায়। রাসূলুল্লাহ (সা) তখন বলিলেন, তুমি ঠিক বলিয়াছ।’
এই হাদীসটির সমর্থনে অন্য আর একটি হাদীস আসিয়াছে। হাদীসটি এই: ইসলাম অপরিচিতের বেশে যাত্রা করিয়াছিল, আবার সত্বর সে অপরিচিত হইয়া প্রত্যাবর্তন করিবে। তাই সুসংবাদ সেই অপরিচিত সংখ্যক লোকদের জন্য।
ইমাম আহমদ (র)…… তারিক ইব্‌ন শিহাব হইতে বর্ণনা করেন যে, তারিক ইন্ন শিহাব বলেন: একজন ইয়াহুদী আসিয়া হযরত উমর ইব্‌ন্ন খাত্তাব (রা)-এর নিকট বলিল: হে আমিরুল মু’মিনীন! আপনারা আপনাদের গ্রন্থে এমন একটি আয়াত পাঠ করেন, তাহা যদি ইয়াহুদীদের উপর অবতীর্ণ হইত, তাহা হইলে আমরা সেই আয়াতটি অবতীর্ণ হওয়ার দিনটিকে ঈদ হিসাবে উদ্যাপন করিতাম। উমর (রা) তাহাকে জিজ্ঞাসা করিলেন, সেই আয়াত কোন্টি? ইয়াহুদী বলিল, উহা হইল:
الْيَوْمَ أَكْمَلْتُ لَكُمْ دِينَكُمْ وَأَتْمَمْتُ عَلَيْكُمْ نِعْمَتِي
উমর (রা) বলিলেন: আল্লাহর কসম! যেদিন ও যে সময়ে এই আয়াতটি রাসূলুল্লাহ (সা)-এর প্রতি অবতীর্ণ হয়, সেই সম্পর্কে আমি যথাযথ অবহিত রহিয়াছি। ইহা আরাফার দিন শুক্রবার বিকালে রাসূলুল্লাহ (সা)-এর উপর অবতীর্ণ হয়।
জাফর ইব্‌ন আওনের সূত্রে ইমাম বুখারী এবং কায়স ইন্ন মুসলিমের সূত্রে ইমাম মুসলিম, তিরমিযী ও নাসাঈও এইরূপ বর্ণনা করিয়াছেন।
আলোচ্য আয়াতের ব্যাখ্যায় ইমাম বুখারী (র)…… তারিক হইতে বর্ণনা করেন যে, তারিক বলেন: ইয়াহুদীরা উমর (রা)-কে বলিয়াছিল যে, আপনারা কুরআনে এমন একটি আয়াত পাঠ করেন, যদি উহা আমাদের প্রতি নাযিল হইত তাহা হইলে উহা নাযিলের দিনটিকে আমরা ঈদ হিসাবে উদ্যাপন করিতাম। তখন উমর (রা) বলেন, আমার সঠিকভাবে জানা আছে যে, সেই আয়াতটি কখন, কোথায় এবং কিভাবে রাসূলুল্লাহ (সা)-এর উপর নাযিল হইয়াছিল। সেই দিনটি ছিল আরাফার দিন। আল্লাহর শপথ! আমি সে সময় আরাফায় ছিলাম।
সুফিয়ান (র) বলেন: আলোচ্য আয়াতটি শুক্রবার দিন অবতীর্ণ হইয়াছিল কিনা এই ব্যাপারে আমার যথেষ্ট সন্দেহ রহিয়াছে।

কুফরি 7

উপরে বর্ণিত উমরের বক্তব্য থেকে এটি স্পষ্ট যে, কোরআন নাজিলের সমাপ্তি সম্পর্কে উমর মোটে সন্তুষ্ট ছিলেন না। অথচ সেই একই উমর মুহাম্মদের মৃত্যুর আগে ঘটিয়েছিলেন আরেক কাণ্ড। মৃত্যুর ঠিক আগে নবী মুহাম্মদ একটি কাগজ চেয়েছিলেন, কিছু জরুরি বিষয় লিখে দেয়ার জন্য। কিন্তু হযরত উমরের নির্দেশে সেই সময়ে নবী মুহাম্মদের কাছে কাগজ কলম দেয়া হয় নি। ইসলামের প্রতিষ্ঠিত আকীদা অনুসারে নবী মুহাম্মদের নির্দেশ সর্বাবস্থায় অবশ্য পালনীয় হয়ে থাকলে, উমরের এমন ধৃষ্টতার মানে কী? এই নিয়ে সাহাবীদের মধ্যে তীব্র অসন্তোষও ছিল। রীতিমত ঝগড়া এবং মারামারির উপক্রমও হয়ে যাচ্ছিল। মৃত্যুশয্যায় শুয়ে শেষবেলায় কী বলতে চেয়েছিল মুহাম্মদ? তা আর জানা যায় নি [7] [8]

সহীহ বুখারী (ইফাঃ)
অধ্যায়ঃ ৩/ ইলম বা জ্ঞান
পরিচ্ছেদঃ ৮১। ইলম লিপিবদ্ধ করা
১১৫। ইয়াহইয়া ইবনু সুলায়মান (রহঃ) … ইবনু আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর রোগ যখন বেড়ে গেল তখন তিনি বললেনঃ আমার কাছে কাগজ কলম নিয়ে এস, আমি তোমাদের এমন কিছু লিখে দিব যাতে পরবর্তীতে তোমরা ভ্রান্ত না হও। ‘উমর (রাঃ) বললেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর রোগ যন্ত্রণা প্রবল হয়ে গেছে (এমতাবস্থায় কিছু বলতে বা লিখতে তাঁর কষ্ট হবে)। আর আমাদের কাছে তো আল্লাহর কিতাব রয়েছে, যা আমাদের জন্য যথেষ্ট। এতে সাহাবীগণের মধ্য মতবিরোধ দেখা দিল এবং শোরগোল বেড়ে গেল। তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তোমরা আমার কাছ থেকে উঠে যাও। আমার কাছে ঝগড়া-বিবাদ করা উচিত নয়। এ পর্যন্ত বর্ণনা করে ইবনু আব্বাস (রাঃ) (যেখানে বসে হাদীস বর্ণনা করছিলেন সেখান থেকে এ কথা বলতে বলতে বেরিয়ে গেলেন যে, ‘হায় বিপদ, সাংঘাতিক বিপদ! রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এবং তাঁর লেখনীর মধ্যে যা বাধ সেধেছে।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আবদুল্লাহ ইবনু আব্বাস (রাঃ)

কুফরি 9

এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আমাদের মনে রাখতে হবে যে, সহিহ হাদিস অনুসারে মৃত্যুর কিছুক্ষণ আগ পর্যন্তও কিন্তু নবীর কাছে ওহী নাজিল হচ্ছিল। তাহলে মৃত্যুর আগে নাজিল হওয়া কোরআনের আয়াতগুলো কোথায়? নবী কী সেগুলোই লিখে যেতে চেয়েছিলেন? উমর তাহলে কেন শেষ মূহুর্তে নবীর লেখায় বাধা দিয়েছিলেন? সেই সময়ে ওহী নাজিল হয়ে থাকলে, কিংবা নবী মুহাম্মদের খুবই জরুরি কিছু বলার থাকলে, সেটি এখন আমরা কীভাবে জানবো?

সহীহ মুসলিম (হাদীস একাডেমী)
৫৬। তাফসীর
পরিচ্ছেদঃ পরিচ্ছেদ নাই
হাদিস একাডেমি নাম্বারঃ ৭৪১৪, আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ৩০১৬
৭৪১৪-(২/৩০১৬) আমর ইবনু মুহাম্মাদ ইবনু বুকায়র আন নাকিদ, হাসান ইবনু আলী আল হুলওয়ানী ও ’আবদ ইবনু হুমায়দ (রহঃ) ….. আনাস ইবনু মালিক (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, ইন্তিকালের পূর্বে ও ইন্তিকাল পর্যন্ত আল্লাহ তা’আলা রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর উপর ধারাবাহিকভাবে ওয়াহী অবতীর্ণ করেন। যেদিন রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইন্তিকাল করেন সেদিনও তার প্রতি অনেক ওয়াহী অবতীর্ণ হয়। (ইসলামিক ফাউন্ডেশন ৭২৪৩, ইসলামিক সেন্টার ৭২৯৮)
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আনাস ইবনু মালিক (রাঃ)

ইসলামের আকীদা হচ্ছে, অসুস্থ হোক কিংবা সুস্থ, সর্বাবস্থায় নবীর নির্দেশ পালন করা যেকোন মুসলিমের জন্য ফরজ। কোরআনে পরিষ্কারভাবেই বলা হয়েছে, মুহাম্মদকে অমান্য করা যাবে না [9]

আল্লাহর বাণী পৌঁছানো ও তাঁর পায়গাম প্রচার করাই আমার কাজ। যে কেউ আল্লাহ ও তাঁর রসূলকে অমান্য করে, তার জন্য আছে জাহান্নামের আগুন; তাতে তারা চিরকাল থাকবে।
Taisirul Quran
কেবল আল্লাহর বাণী পৌঁছানো এবং তা প্রচার করাই আমার কাজ। যারা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে অমান্য করে তাদের জন্য রয়েছে জাহান্নামের আগুন, সেখানে তারা চিরস্থায়ী হবে।
Sheikh Mujibur Rahman
কেবল আল্লাহর বাণী ও তাঁর রিসালাত পৌঁছানোই দায়িত্ব। আর যে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে অমান্য করে, তার জন্য রয়েছে জাহান্নামের আগুন। তাতে তারা চিরস্থায়ী হবে।
Rawai Al-bayan
‘শুধু আল্লাহর পক্ষ থেকে পৌঁছানো এবং তাঁর রিসালতের বাণী প্রচারই আমার দায়িত্ব। আর যে-কেউ আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূলকে অমান্য করে তার জন্য রয়েছে জাহান্নামের আগুন, সেখানে তারা চিরস্থায়ী হবে (১)।’
Dr. Abu Bakr Muhammad Zakaria

এই বিষয়টি ইসলামের অন্যতম মৌলিক ভিত্তি, মৌলিক নির্দেশনা যে, আল্লাহর সাথে নবীর আদেশকেও ঠিক আল্লাহর আদেশের মত করেই পালন করতে যেকোন মুসলমান বাধ্য। হাদিসেও বিষয়টি পরিষ্কারভাবে বলা হয়েছে [10]

হাদীস সম্ভার
১৩/ সুন্নাহ
পরিচ্ছেদঃ সুন্নাহ পালনের গুরুত্ব ও তার কিছু আদব প্রসঙ্গে
(১৪৯৯) মিকদাম বিন মা’দিকারিব বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, শোন! আমাকে কুরআন দান করা হয়েছে এবং তারই সাথে তারই মতো (সুন্নাহ) দান করা হয়েছে। শোন! সম্ভবতঃ নিজ গদিতে বসে থাকা কোন পরিতৃপ্ত লোক বলবে, ‘তোমরা এই কুরআনের অনুসরণ কর; তাতে যা হালাল পাও, তাই হালাল মনে কর এবং তাতে যা হারাম পাও, তাই হারাম মনে কর। সতর্ক হও! আল্লাহর রসূল যা হারাম করেন, তাও আল্লাহর হারাম করার মতোই।
(আবূ দাঊদ ৪৬০৬, ইবনে মাজাহ ১২, দারেমী ৫৮৬, মিশকাত ১৬৩)
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ মিকদাম (রাঃ)

এবারে আসুন এই হাদিসের নিচের অংশে বর্ণিত নির্দেশনাটি পড়ে নিই [11] [12]

সহীহ বুখারী (তাওহীদ পাবলিকেশন)
৬৪/ মাগাযী [যুদ্ধ]
পরিচ্ছেদঃ ৬৪/৮৪. নাবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর রোগ ও তাঁর ওফাত।
৪৪৫৮. ‘আয়িশাহ (রাঃ) বলেন, আমরা নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর রোগাক্রান্ত অবস্থায় তাঁর মুখে ঔষধ ঢেলে দিলাম। তিনি ইশারায় আমাদেরকে তাঁর মুখে ঔষধ ঢালতে নিষেধ করলেন। আমরা বললাম, এটা ঔষধের প্রতি রোগীদের স্বাভাবিক বিরক্তিবোধ। যখন তিনি সুস্থবোধ করলেন তখন তিনি বললেন, আমি কি তোমাদের ওষুধ সেবন করাতে নিষেধ করিনি? আমরা বললাম, আমরা মনে করেছিলাম এটা ঔষধের প্রতি রোগীর সাধারণ বিরক্তিভাব। তখন তিনি বললেন, ‘আব্বাস ব্যতীত বাড়ির প্রত্যেকের মুখে ঔষধ ঢাল তা আমি দেখি।[1] কেননা সে তোমাদের মাঝে উপস্থিত নেই। এ হাদীস ইবনু আবূ যিনাদ ……. ‘আয়িশাহ (রাঃ) থেকে এবং তিনি নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বর্ণনা করেন। [৫৭১২, ৬৮৮৬, ৬৮৯৭; মুসলিম ৩৯/২৭, হাঃ ২২১৩, আহমাদ ২৪৩১৭] (আধুনিক প্রকাশনীঃ ৪১০১, ইসলামিক ফাউন্ডেশনঃ ৪১০৪)
[1] প্রথমতঃ এখানে অতি সামান্য ব্যাপারেও কিয়াসের বৈধতা প্রমাণিত হয়। দ্বিতীয়তঃ নাবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সুস্থ ও অসুস্থ সর্বাবস্থাতেই তার নির্দেশ পালনের অপরিহার্যতা সমভাবে প্রযোজ্য।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আয়িশা বিনত আবূ বাকর সিদ্দীক (রাঃ)

কুফরি 11

এবারে আসুন সহজ দরসে ইবনে মাজাহ গ্রন্থের একটি পাতা পড়ে নেয়া যাক, যা থেকে বোঝা যায়, নবী নিজে থেকে কিছুই বলেন না। আল্লাহই নবীকে দিয়ে আসলে বলায়। তাহলে, উমর কেন আল্লাহ তথা নবীর কথা শুনতে চাইছিলেন না? [13]

কুফরি 13

নবীর নির্দেশ বাতিল করে দেয়া

জনৈক ব্যক্তিকে নবী মুহাম্মদ একটি উপনাম দিয়েছিলেন। উপনামটি ছিল আবূ ঈসা। এই কারণে উমর তাকে পেটাচ্ছিলেন। তখন তিনি বললেন, এই উপনামটি তাকে খোদ নবী মুহাম্মদই দিয়েছে। এ কথা শোনার পরেও, নবীর নির্দেশের বিরুদ্ধে উমর নির্দেশ জাড়ি করেন এবং নামটি বদলে দেন

সুনান আবূ দাউদ (তাহকিককৃত)
৩৬/ শিষ্টাচার
পরিচ্ছেদঃ ৭২. আবূ ঈসা উপনাম রাখা
৪৯৬৩। যায়িদ ইবনু আসলাম (রহঃ) থেকে তার পিতার সূত্রে বর্ণিত। উমার (রাঃ) তার এক ছেলে আবূ ঈসা উপনাম করায় তাকে প্রহার করেন। মুগীরাহ ইবনু শু’বাহ (রাঃ)-এর উপনাম ছিলো আবূ ঈসা। উমার (রাঃ) তাকে বললেন, তোমার উপনাম পালটে আবূ আব্দুল্লাহ রাখলে কি যথেষ্ট নয়? তিনি বললেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে এ উপনাম দিয়েছেন। উমার (রাঃ) বললেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর পূর্বাপরের সব গুনাহ ক্ষমা করে দেয়া হয়েছে। আর আমরা তো উদ্বিগ্ন আছি। এরপর থেকে মৃত্যু পর্যন্ত তার পদবী আবূ আব্দুল্লাহ ছিলো।[1]
হাসান সহীহ।
[1]. বায়হাক্বী।
হাদিসের মানঃ হাসান (Hasan)
বর্ণনাকারীঃ যায়দ ইবনু আসলাম (রহঃ)


হাজরে আসওয়াদকে অবজ্ঞা করা

মুহাম্মদ সরাসরি হাজরে আসওয়াদ পাথরটির ফজিলত বর্ণনা করে বলেছেন যে, কিয়ামতের দিনে এই কালো পাথর মানুষের পক্ষে বা বিপক্ষে সাক্ষ্য দেবে। অর্থাৎ, এই কালো পাথরের কিছু না কিছু ক্ষমতা অবশ্যই আছে, এবং একে খুশি রাখার জন্য সত্যতার সাথে চুম্বন করাও জান্নাতে যাওয়ার ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখবে। যার থেকে প্রমাণ হয়, এই পাথরের উকালতিতে কিছু সুবিধা পাওয়া যাবে। ধরুন, একজন ব্যক্তি মুসলিম হিসেবে সৎ ও ন্যায়পরায়ণ জীবনযাপন করেছেন, কিন্তু কখনো হাজরে আসওয়াদে চুম্বন করেননি। অন্যদিকে, আরেকজন ব্যক্তি একইভাবে সততার সাথে জীবনযাপন করেছেন, কিন্তু তিনি হাজরে আসওয়াদে চুম্বন করেছেন। কিয়ামতের ময়দানে এই দুইজনের মধ্যে হাজরে আসওয়াদ কার পক্ষে সাক্ষ্য দেবে? নিশ্চয়ই যে চুম্বন করেছে, তার পক্ষে, তাই না?

এক্ষেত্রে, সেই ব্যক্তি অতিরিক্ত সুবিধা পেল, যা প্রমাণ করে যে এই পাথরের নিজস্ব কিছু ক্ষমতা রয়েছে। তা না হলে, শুধুমাত্র চুম্বনের কারণে কেউ বিশেষ সুবিধা পাওয়ার কথা নয়। মূর্তি এবং পাথরের কোন ক্ষমতা নেই, এই দাবী করা মুহাম্মদের মুখে যখন এরকম স্ববিরোধী বক্তব্য শোনা যায়, তখন হাসবো না কাঁদবো বুঝে উঠতে পারি না।

সুনান ইবনু মাজাহ
১৯/ হজ্জ
পরিচ্ছেদঃ ১৯/২৭. হাজরে আসওয়াদ চুম্বন করা
২/২৯৪৪। সাঈদ ইবনে জুবাইর (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি ইবনে আব্বাস (রাঃ) কে বলতে শুনেছি, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ কিয়ামতের দিন এই পাথরকে উপস্থিত করা হবে। তার দু‘টি চোখ থাকবে, তা দিয়ে সে দেখবে, যবান থাকবে তা দিয়ে সে কথা বলবে এবং সে এমন লোকের অনুকূলে সাক্ষ্য দিবে যে তাকে সত্যতার সাথে চুমা দিয়েছে।
তিরমিযী ৯৬১, আহমাদ ২২১৬, ২৩৯৪, ২৬৩৮, ২৭৯৩, ৩৫০১, দারেমী ১৮৩৯, মিশকাত ২৫৭৮, আত-তালীক আলা ইবনু খুযাইমাহ ২৭৩৫, ২৭৩৬।
তাহকীক আলবানীঃ সহীহ।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ সা‘ঈদ ইবনু যুবায়র (রহঃ)

সূনান আত তিরমিজী (তাহকীককৃত)
৭/ হাজ্জ
পরিচ্ছেদঃ ১১৩. হাজরে আসওয়াদ প্রসঙ্গে
৯৬১। ইবনু আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হাজরে আসওয়াদ প্রসঙ্গে বলেছেনঃ আল্লাহর শপথ! এই পাথরকে আল্লাহ তা’আলা কিয়ামতের দিন এমন অবস্থায় উঠাবেন যে, এর দুটি চোখ থাকবে যা দিয়ে সে দেখবে এবং একটি জিহ্বা থাকবে যা দিয়ে সে কথা বলবে। যে লোক সত্য হৃদয়ে একে পর্শ করবে তার সম্বন্ধে এই পাথর আল্লাহ্ তা’আলার নিকটে সাক্ষ্য দিবে।
— সহীহ, মিশকাত (২৫৭৮), তা’লীকুর রাগীব (২/১২২), তা’লীক আলা ইবনু খুযাইমা (২৭৩৫)
এই হাদীসটিকে আবূ ঈসা হাসান বলেছেন।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আবদুল্লাহ ইবনু আব্বাস (রাঃ)

সুনান আদ-দারেমী
৫. হজ্জ অধ্যায়
পরিচ্ছেদঃ ২৬. হাজরে আসওয়াদ চুম্বন করার ফযীলত
১৮৭৬. ইবনু আব্বাস রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেনঃ কিয়ামতের দিন এই পাথরকে আল্লাহ এমন অবস্থায় পুন:উত্থিত করবেন যে, এর দু‘টি চোখ থাকবে, যা দিয়ে সেটি দেখবে এবং একটি জিহবা থাকবে যা দিয়ে সেটি কথা বলবে এবং যে ব্যক্তি তাকে যথাযথভাবে চুম্বন করেছে, সেটি সেই লোকের পক্ষে সাক্ষ্য প্রদান করবে।(1)
সালমান (তার বর্ণনায়) বলেন: যে ব্যক্তি তাকে চুম্বন করেছে, তার জন্য (অর্থাৎ ‘যথাযথভাবে’ শব্দটি ব্যতীত)।
(1) তাহক্বীক্ব: এর সনদ সহীহ।
তাখরীজ: [41]
আমরা এর পূর্ণ তাখরীজ দিয়েছি মুসনাদুল মাউসিলী নং ২৭১৯; সহীহ ইবনু হিব্বান নং ৩৭১১, ৩৭১২ ও মাওয়ারিদুয যাম’আন নং ১০০৫ তে।
এছাড়া, তাবারানী, আল কাবীর ১২/৬৩ নং ১২৪৭৯।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আবদুল্লাহ ইবনু আব্বাস (রাঃ)

এই নিয়ে ঝামেলা আরো বাড়ে, যখন মুহাম্মদ সরাসরি এই পাথরের ফজিলত বর্ণনা করেন, এবং ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা আবার এই একই পাথরকে ক্ষমতাহীন পাথর বলে আখ্যায়িত করেন! বলেন যে, এই পাথর কারো ক্ষতি বা উপকার কিছুই করতে পারে না। যা সরাসরি উপরের হাদিসগুলোর নির্দেশনার বিরোধী। এ থেকে উমরের নবীর হাদিসের বিরোধিতা করার প্রমাণ মেলে। কারণ নবীর কথা সত্য হলে, এই পাথরটি তো উমরের পক্ষে সাক্ষ্য দেবে বলে মনে হয় না।

সহীহ মুসলিম (ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
১৬/ হাজ্জ
পরিচ্ছেদঃ ৩৭. তাওয়াফের সময় হাজারে আসওয়াদ চুম্বন করা মুস্তাহাব
২৯৩৯। খালফ ইবনু হিশাম, মুকাদ্দমী, আবূ কামিল ও কুতায়বা ইবনু সাঈদ (রহঃ) … আবদুল্লাহ ইবনু সারজিস (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি টাক মাথাওয়ালা অর্থাৎ উমর ইবনুল খাত্তাব (রাঃ) কে কালো পাথর হাজারে আসওয়াদ চুমো দিতে দেখেছি এবং তিনি বলেছেন, আল্লাহর শপথ! আমি অবশ্যই তোমাকে চুন্বন করব এবং আমি অবশ্যই জানি যে, তুমি একটি পাথর, তুমি কারও ক্ষতিও করতে পার না এবং উপকারও করতে পার না। আমি যদি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে তোমায় চুম্বন করতে না দেখতাম তবে আমি তোমায় চুম্বন করতাম না।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আবদুল্লাহ ইবনু সারজিস (রাঃ)

এবারে আসুন শায়েখ আব্দুর রাজ্জাক বিন ইউসুফের একটি ওয়াজ শুনি,


নবীর স্ত্রীকে উত্যক্ত করা

সহিহ হাদিস থেকে জানা যায়, ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা হযরত উমর সরাসরিই নবীপত্নী সাওদাকে রাস্তায় উত্যক্ত করেছিলেন, তার পর্দা না থাকার কারণে। শুধু উত্যক্তই করেনি, একজন প্রস্রাব পায়খানা করতে যাওয়া নারীর পথ আটকে দিয়ে তাকে ঘরে ফেরত যেতে বাধ্য করেছেন। বর্তমান সময়ে অনেক জায়গাতেই দেখা যায়, পোষাকের কারণে রাস্তাঘাটে মেয়েদের নাজেহাল করা হয়, নানা বাজে মন্তব্য করা হয়। কার পোষাক কীরকম হবে, এই নিয়ে কিছু মানুষের সীমাহীন চুলকানি। তারা এইসব কাজের প্রেরণা হযরত উমর থেকে পান কিনা, সেটিও চিন্তার বিষয়। কারণ উমর নিজেও একই কাজ করতেন বলে জানা যায়। ঘটনাটি হচ্ছে এরকম, পরপুরুষ দেখে ফেলবে এই ভয়ে সারাদিন প্রশ্রাব পায়খানা আটকে রেখে রাতের বেলা নবীর স্ত্রীগণ খোলা ময়দানে প্রাকৃতিক কাজ করার জন্য বের হতেন। সেরকম এক সময়ে প্রাকৃতিক কাজ করার জন্য বের হলে উমর সাওদার পিছু নেন এবং পথ আটকে রাখেন। একইসাথে, তিনি সাওদাকে তিরষ্কার করেন ঠিকভাবে পর্দা না করার জন্য। পথ আটকে রাখার জন্য প্রাকৃতিক কাজ করতে না যেতে পেরে সাওদা নবীর কাছে নালিশ নিয়ে যান এবং নবী তাকে বাইরে যাওয়ার অনুমতি দেন। আসুন হাদিসগুলো পড়ে নিই, [14] [15] [16]

সহীহ মুসলিম (ইফাঃ)
অধ্যায়ঃ ৪০/ সালাম
পরিচ্ছদঃ ৭. মানুষের প্রাকৃতিক প্রয়োজন পূরণের জন্য স্ত্রীলোকের বাইরে যাওয়ার বৈধতা
৫৪৮৪। আবদুল মালিক ইবনু শুআয়ব ইবনু লায়স (রহঃ) … আয়িশা (রাঃ) থেকে বর্ণিত যে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর স্ত্রীগণ প্রকৃতির ডাকে সাড়া দেওয়ার সময় রাতের বেলা ‘মানাসি’ এর দিকে বেরিয়ে যেতেন। الْمَنَاصِع (মানাসি) হল প্রশস্ত ময়দান। ওদিকে উমার ইবনু খাত্তাব (রাঃ) রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে বলতেন, আপনার স্ত্রীগণের প্রতি পর্দা বিধান করুন। কিন্তু রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তা করেননি। কোন এক রাতে ইশার সময় নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সহধর্মিনা সাওদা বিনত যাম’আ (রাঃ) বের হলেন। তিনি ছিলেন দীর্ঘাঙ্গী মহিলা। উমার (রাঃ) তাঁকে ডাক দিয়ে বললেন, হে সাওদা! আমরা তোমাকে চিনে ফেলেছি। পর্দার বিধান নাযিল হওয়ার প্রতি প্রবল আকাঙ্ক্ষায় (তিনি এরূপ করলেন)। আয়িশা (রাঃ) বলেন, তখন আল্লাহর তাআলা পর্দা-বিধি নাযিল করলেন।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)

সহীহ বুখারী (ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
৫২/ তাফসীর
পরিচ্ছেদঃ আল্লাহ্‌ তা’আলার বাণীঃ لا تدخلوا … عند الله عظيما হে মু’মিনগণ! তোমরা খাওয়ার জন্য খাবার প্রস্তুতির অপেক্ষা না করে নাবীর ঘরে তোমাদেরকে অনুমতি না দেয়া পর্যন্ত প্রবেশ করবে না; তবে তোমাদেরকে ডাকা হলে তোমরা প্রবেশ করবে এবং খাওয়া শেষ হলে নিজেরাই চলে যাবে, কথাবার্তায় মাশগুল হয়ে পড়বে না। তোমাদের এ আচরণ অবশ্যই নাবীকে পীড়া দেয়। তিনি তোমাদেরকে উঠিয়ে দিতে সংকোচ বোধ করেন। কিন্তু আল্লাহ সত্য বলতে সংকোচবোধ করেন না। তোমরা যখন তাঁর পত্নীদের নিকট হতে কোন কিছু চাইবে, তখন পর্দার অন্তরাল থেকে চাইবে। এটা তোমাদের অন্তরের জন্য এবং তাদের অন্তরের জন্য অধিকতর পবিত্র উপায়। আল্লাহর রসূলকে কষ্ট দেয়া এবং তাঁর মৃত্যুর পর তাঁর পত্নীদেরকে বিবাহ করা তোমাদের কারও পক্ষে কখনও বৈধ নয়। এটা আল্লাহর কাছে সাংঘাতিক অপরাধ। বলা হয় إِنَاهُ খাদ্য পরিপাক হওয়া। এটা أَنَى يَأْنِيْ أَنَاةًথেকে গঠিত। لَعَلَّ السَّاعَةَ تَكُوْنُ قَرِيْبًا সম্ভবত ক্বিয়ামাত অতি নিকটবর্তী। যদি তুমি স্ত্রী লিঙ্গ হিসেবে ব্যবহার কর, তবে قَرِيْبَةً বলবে। আর যদি الصِّفَةَ না ধর ظَرْفًا বা بَدَلًا হিসেবে ব্যবহার কর তবে ‘তা’ নিয়ে যুক্ত করবে না। তেমনি এ শব্দটি একবচন, দ্বি-বচন, বহুবচন এবং নারী-পুরুষ সকল ক্ষেত্রেই ব্যবহৃত হয়।
ইসলামিক ফাউন্ডেশন নাম্বারঃ ৪৪৩২, আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ৪৭৯৫
৪৪৩২। যাকারিয়া ইবনু ইয়াহ্ইয়া (রহঃ) … আয়িশা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, পর্দার বিধান অবতীর্ণ হওয়ার পর সাওদা প্রাকৃতিক প্রয়োজনে বাইরে যান। সাওদা এমন মোটা শরীরের অধিকারিণী ছিলেন যে, পরিচিত লোকদের থেকে তিনি নিজকে গোপন রাখতে পারতেন না। উমর ইবনু খাত্তাব (রাঃ) তাঁকে দেখে বললেন, হে সাওদা! জেনে রাখ, আল্লাহর কসম, আমাদের দৃষ্টি থেকে গোপন থাকতে পারবে না। এখন দেখ তো, কেমন করে বাইরে যাবে? আয়িশা (রাঃ) বলেন, (এ কথা শুনে) সাওদা (রাঃ) ফিরে আসলেন। আর এ সময় রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমার ঘরে রাতের খানা খাচ্ছিলেন। তাঁর হাতে ছিল টুকরা হাড়। সাওদা (রাঃ) ঘরে প্রবেশ করে বললেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমি প্রাকৃতিক প্রয়োজনে বাইরে গিয়েছিলাম। তখন উমর (রাঃ) আমাকে এমন এমন কথা বলেছে। আয়িশা (রাঃ) বলেন, এ সময় আল্লাহ্ তা’আলা তাঁর নিকট ওহী নাযিল করেন। ওহী অবতীর্ণ হওয়া শেষ হল, হাড় টুকরা তখনও তাঁর হাতেই ছিল, তিনি তা রাখেননি। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, অবশ্যই প্রয়োজনে তোমাদের বাইরে যাওয়ার অনুমতি দেয়া হয়েছে।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আয়িশা বিনত আবূ বাকর সিদ্দীক (রাঃ)


নবীকে যুদ্ধের ময়দানে ফেলে পালানো

উমর সম্পর্কে এই অভিযোগটি সবচাইতে মারাত্মক। আসুন শুরুতেই কোরআনের একটি আয়াত পড়ে নেয়া যাক, ঘটনাটি হুনায়নের যুদ্ধের। এই যুদ্ধে মুহাম্মদকে ফেলে সাহাবীরা পালিয়ে গিয়েছিল, তাই আল্লাহ নবীর সাহাবীদের তিরস্কার করছে [17]

বস্তুতঃ আল্লাহ তোমাদেরকে বহু যুদ্ধ ক্ষেত্রে সাহায্য করেছেন আর হুনায়নের যুদ্ধের দিন, তোমাদের সংখ্যার আধিক্য তোমাদেরকে গর্বে মাতোয়ারা করে দিয়েছিল, কিন্তু তা তোমাদের কোন কাজে আসেনি, যমীন সুপ্রশস্ত হওয়া সত্বেও তা তোমাদের নিকট সংকীর্ণই হয়ে গিয়েছিল, আর তোমরা পিছন ফিরে পালিয়ে গিয়েছিলে।
— Taisirul Quran
অবশ্যই আল্লাহ তোমাদেরকে (যুদ্ধে) বহু ক্ষেত্রে বিজয়ী করেছেন এবং হুনাইনের দিনেও। যখন তোমাদেরকে তোমাদের সংখ্যাধিক্য গর্বে উম্মত্ত করেছিল, অতঃপর সেই সংখ্যাধিক্য তোমাদের কোনই কাজে আসেনি, আর ভূ-পৃষ্ঠ প্রশস্ত থাকা সত্ত্বেও তা তোমাদের উপর সংকীর্ণ হয়ে গেল, অতঃপর তোমরা পৃষ্ঠ প্রদর্শন পূর্বক পলায়ন করলে।
— Sheikh Mujibur Rahman
অবশ্যই আল্লাহ তোমাদেরকে সাহায্য করেছেন বহু জায়গায় এবং হুনাইনের দিনে, যখন তোমাদের সংখ্যাধিক্য তোমাদেরকে উৎফুল্ল করেছিল, অথচ তা তোমাদের কোন কাজে আসেনি। আর যমীন প্রশস্ত হওয়া সত্ত্বেও তোমাদের উপর সংকীর্ণ হয়ে গিয়েছিল। অতঃপর তোমরা পৃষ্ঠ প্রদর্শন করে পলায়ন করেছিলে।
— Rawai Al-bayan
অবশ্যই আল্লাহ্‌ তোমাদেরকে সাহায্য করেছেন বহু ক্ষেত্রে এবং হুনায়নের যুদ্ধের দিনে [১] যখন তোমাদেরকে উৎফুল্ল করেছিল তোমাদের সংখ্যাধিক্য হওয়া; কিন্তু তা তোমাদের কোনো কাজে আসেনি এবং বিস্তৃত হওয়া সত্বেও যমীন তোমাদের জন্য সংকুচিত হয়েছিল। তারপর তোমরা পৃষ্ঠ প্রদর্শন করে পালিয়েছিলে [২]।
— Dr. Abu Bakr Muhammad Zakaria

এবারে আসুন দেখা যাক, ঠিক কারা কারা পালিয়ে গিয়েছিল। নবীকে যুদ্ধ ক্ষেত্রে রেখে সেই পালিয়ে যাওয়া সাহাবীদের মধ্যে আসলে কারা কারা ছিল, তা জানা খুবই জরুরি [18]

সহীহ বুখারী (তাওহীদ পাবলিকেশন)
৬৪/ মাগাযী [যুদ্ধ]
পরিচ্ছেদঃ ৬৪/৫৫. মহান আল্লাহর বাণীঃ
৪৩২২. আবূ ক্বাতাদাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, হুনাইন যুদ্ধের দিন আমি দেখলাম যে, এক মুসলিম এক মুশরিকের সঙ্গে লড়াই করছে। আরেক মুশরিক মুসলিম ব্যক্তিটির পেছন থেকে তাকে হত্যা করার জন্য আক্রমণ করছে। তখন আমি তার হাতের উপর আঘাত ক’রে তা কেটে ফেললাম। সে আমাকে ধরে ভীষণ চাপে চাপ দিল। এমনকি আমি শঙ্কিত হয়ে পড়লাম। এরপর সে আমাকে ছেড়ে দিল ও দুর্বল হয়ে পড়ল। আমি তাকে আক্রমণ করে হত্যা করলাম। মুসলিমগণ পালাতে লাগলে আমিও তাঁদের সঙ্গে পালালাম। হঠাৎ লোকের মাঝে ‘উমার ইবনুল খাত্তাব (রাঃ)-কে দেখতে পেলাম। তাকে বললাম, লোকজনের অবস্থা কী? তিনি বললেন, আল্লাহর যা ইচ্ছা। এরপর লোকেরা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট ফিরে এলেন। তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, ‘‘যে (মুসলিম) ব্যক্তি কাউকে হত্যা করেছে বলে প্রমাণ পেশ করতে পারবে নিহত ব্যক্তির পরিত্যক্ত সম্পদ সে-ই পাবে। আমি যাকে হত্যা করেছি তার সম্পর্কে সাক্ষী খোঁজার জন্য আমি দাঁড়ালাম। কিন্তু আমার পক্ষে সাক্ষ্য দিবে এমন কাউকে পেলাম না। তখন বসে পড়লাম। এরপর আমার সুযোগমত ঘটনাটি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে জানালাম। তখন তাঁর পাশে উপবিষ্ট একজন বললেন- উল্লিখিত নিহত ব্যক্তির হাতিয়ার আমার কাছে আছে, সেগুলো আমাকে দিয়ে দেয়ার জন্য আপনি তাকে সম্মত করুন। তখন আবূ বাকর (রাঃ) বললেন, না, তা হতে পারে না। আল্লাহর সিংহদের এক সিংহ যে আল্লাহ এবং তাঁর রাসূলের পক্ষ হয়ে যুদ্ধ করেছে তাকে না দিয়ে এ কুরাইশী দুর্বল ব্যক্তিকে তিনি [নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম] দিতে পারেন না। রাবী বলেন, তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম দাঁড়ালেন এবং আমাকে তা দিয়ে দিলেন। আমি এর দ্বারা একটি বাগান কিনলাম। আর ইসলাম গ্রহণের পর এটিই ছিল প্রথম সম্পদ, যদ্দবারা আমি আমার আর্থিক বুনিয়াদ করেছি। [২১০০] (আধুনিক প্রকাশনীঃ ৩৯৭৮/৩৯৭৯, ইসলামিক ফাউন্ডেশনঃ ৩৯৮৩)
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আবূ ক্বাতাদাহ সালামী (রাঃ)


উপসংহারঃ উমরের উত্তরাধিকার ও দেবত্ব আরোপের সমাপ্তি

প্রবন্ধের আলোচনা থেকে এটি প্রতীয়মান হয় যে, উমর ইবনুল খাত্তাবের চরিত্রটি প্রথাগত ইসলামী বয়ানে যতটা ‘নিখুঁত’ ও ‘অনুগত’ হিসেবে চিত্রিত করা হয়, বাস্তব ইতিহাস তার চেয়ে অনেক বেশি জটিল এবং বৈপরীত্যে ভরা। তার জীবন পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, তিনি বারবার খোদ কুরআনের প্রাথমিক বিধান লঙ্ঘন করেছেন (যেমন রমজানের রাতে সহবাসের ঘটনা), নবীর অন্তিম ইচ্ছা পূরণে বাধা দিয়েছেন (কাগজ-কলম সংক্রান্ত হাদিস), এমনকি নবীর দেওয়া উপনাম পর্যন্ত বদলে দিয়েছেন। এই ঘটনাগুলো কোনো বিচ্ছিন্ন বিচ্যুতি নয়, বরং এগুলো একজন প্রবল প্রতাপশালী শাসকের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য—যিনি নিজের মর্জির মোতাবেক আল্লাহর বিধানকে পরিবর্তন করে নিতে কুণ্ঠাবোধ করতেন না।

সবচেয়ে কৌতূহলোদ্দীপক বিষয় হলো, উমরের এই ‘অবাধ্যতা’ বা ‘স্বকীয়তা’কে পরবর্তীকালের ধর্মতত্ত্ববিদরা অত্যন্ত চতুরতার সাথে ‘ন্যায্যতা’ প্রদান করেছেন। যে উমর নবীর স্ত্রীকে উত্যক্ত করেছেন কিংবা যুদ্ধের ময়দান থেকে পলায়ন করেছেন [19], তাকেই আবার ‘ইসলামের স্তম্ভ’ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। এই বৈপরীত্য মূলত প্রমাণ করে যে, ইসলামী ঐতিহ্যে ‘ন্যায়বিচার’ বা ‘ইমান’ একটি আপেক্ষিক বিষয়, যা রাজনৈতিক ক্ষমতার সমীকরণের ওপর ভিত্তি করে সংজ্ঞায়িত হয়েছে। হাজরে আসওয়াদ নিয়ে তার মন্তব্য কিংবা নবীর অসুস্থাবস্থায় তার ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণ থেকে স্পষ্ট হয় যে, উমর উম্মাহর ওপর নিজের কর্তৃত্বকে অনেক ক্ষেত্রেই ঐশ্বরিক নির্দেশের চেয়ে বেশি গুরুত্ব দিতেন।

পরিশেষে বলা যায়, উমরের শাসনকালকে ‘সোনালী যুগ’ হিসেবে মেনে নিতে হলে ঐতিহাসিক সত্যের সাথে আপোষ করা অপরিহার্য। কিন্তু একজন যুক্তিবাদী নিরপেক্ষ গবেষকের কাছে সত্য কোনো বিশেষ ব্যক্তির ইমেজের মুখাপেক্ষী নয়। উমরের এই তথাকথিত ‘কুফরি’ বা অমান্যকরণমূলক কর্মকাণ্ডগুলো মূলত খিলাফতের সেই প্রাচীন কাঠামোর দুর্বলতাকেই নির্দেশ করে, যেখানে একজন ক্ষমতাধর ব্যক্তি নিজের প্রয়োজন অনুযায়ী ওহী এবং সুন্নাহকে পাশ কাটিয়ে যেতে পারতেন। সাহাবীদের সমালোচনার ঊর্ধ্বে রাখার যে সংস্কৃতি আজ বিদ্যমান, তা মূলত উমরের মতো বিতর্কিত চরিত্রগুলোকে রক্ষার একটি ঢাল মাত্র। নিরপেক্ষ ইতিহাস পর্যালোচনায় এই ঢাল সরিয়ে ফেললে যে চিত্রটি বেরিয়ে আসে, তা কোনো ঐশ্বরিক মহিমা নয়, বরং রক্ত-মাংসের মানুষের ক্ষমতা ও আধিপত্যের এক নগ্ন ইতিহাস।


তথ্যসূত্রঃ
  1. সূরা বাকারা, আয়াত ১৮৭ 1 2
  2. তাফসীরে জালালাইন, প্রথম খণ্ড, পৃষ্ঠা ৪১৪ ↩︎
  3. তাফসীরে মাযহারী, প্রথম খণ্ড, পৃষ্ঠা ৩৮২ ↩︎
  4. তাফসীরে ইবনে কাসীর, খণ্ড ২, পৃষ্ঠা ১১১ ↩︎
  5. সূরা মায়িদা, আয়াত ৩ ↩︎
  6. তাফসীরে ইবনে কাসীর, খণ্ড ২, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, পৃষ্ঠা ৪২৪ ↩︎
  7. সহীহ বুখারী, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, হাদিসঃ ১১৫ ↩︎
  8. সহিহ বুখারী, তাওহীদ পাবলিকেশন্স, প্রথম খণ্ড, পৃষ্ঠা ৭২ ↩︎
  9. কোরআন ৭২ঃ২৩ ↩︎
  10. হাদীস সম্ভার, হাদিসঃ ১৪৯৯ ↩︎
  11. সহীহ বুখারী, তাওহীদ পাবলিকেশন, হাদিসঃ ৪৪৫৮ ↩︎
  12. সহীহ বুখারী, তাওহীদ পাবলিকেশন, ৪র্থ খণ্ড, পৃষ্ঠা ২৭০ ↩︎
  13. সহজ দরসে ইবনে মাজাহ, আল কাউসার প্রকাশনী, পৃষ্ঠা ৬৮ ↩︎
  14. সহিহ বুখারী, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, হাদিসঃ ৪৪৩২ ↩︎
  15. সহিহ বুখারী, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, হাদিসঃ ৫৮০৬ ↩︎
  16. সহিহ বুখারী, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, হাদিসঃ ৫৪৮২ ↩︎
  17. সূরা তওবা, আয়াত ২৫ ↩︎
  18. সহীহ বুখারী, তাওহীদ পাবলিকেশন, হাদিসঃ ৪৩২২ ↩︎
  19. সূরা তওবা, ২৫; সহীহ বুখারী, ৪৩২২ ↩︎