ইসলামে অমুসলিমের সাক্ষ্য অগ্রহণযোগ্য

ভূমিকা

ন্যায়বিচার এবং আইনের শাসন আধুনিক গণতান্ত্রিক ও মানবাধিকার-ভিত্তিক রাষ্ট্রব্যবস্থার মূল ভিত্তি। সমসাময়িক বিচারব্যবস্থায় সাক্ষীর ব্যক্তিগত ধর্মীয় পরিচয় বা বিশ্বাসের চেয়ে ঘটনার সত্যতা এবং প্রমাণের নির্ভরযোগ্যতাকে অধিক গুরুত্ব প্রদান করা হয়। তবে প্রাচীন ও মধ্যযুগীয় ইসলামি ফিকহশাস্ত্রে সাক্ষ্যগ্রহণের ক্ষেত্রে যে ধর্মীয় বিভাজন লক্ষ্য করা যায়, তা আধুনিক ন্যায়বিচারের ধারণার সাথে সরাসরি সাংঘর্ষিক। ইসলামি শরীয়তের বিধান হচ্ছে, একজন মুসলিমের বিরুদ্ধে অমুসলিমের সাক্ষ্য গ্রহণযোগ্য নয়। যা একটি খুবই সাম্প্রদায়িক এবং বৈষম্যমূলক ইসলামিক বিধান।


ধর্মীয় পরিচয় ও সাক্ষ্যের আইনি সীমাবদ্ধতা

ইসলামের শরীয়তে একজন অমুসলিমের সাক্ষ্যকে মুসলিমের বিরুদ্ধে গ্রহণযোগ্য না হওয়া অত্যন্ত বৈষম্যমূলক, বিভেদমূলক এবং নৈতিকভাবে অগ্রহণযোগ্য একটি আইন। এটি একটি গভীর বৈষম্যমূলক নীতি, যেখানে একজন নিরপরাধ অমুসলিমকে তার সঠিক বক্তব্য ও সাক্ষ্য দেওয়ার অধিকার থেকেও বঞ্চিত করা হয়, শুধুমাত্র তার ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে। এমন একটি আইন, যা ধর্মের ভিত্তিতে ন্যায়বিচারকে প্রভাবিত করে, তা সমাজে ধর্মীয় অসাম্য ও অবিচারের উদাহরণ স্থাপন করে। এই নিয়ম অনুসারে, একজন মুসলিম যদি কোনো অমুসলিম পরিবারের সদস্যদের হত্যা করে এবং সেই পরিবারের জীবিত সদস্যরা সেই হত্যাকাণ্ডের প্রত্যক্ষদর্শী হয়, তবুও ইসলামি আইন অনুযায়ী তাদের সাক্ষ্য আদালতে গ্রহণযোগ্য হবে না, যতক্ষণ না কোন মুসলিম এই বিষয়টি দেখবে এবং সাক্ষ্য দিবে। অর্থাৎ, একজন মুসলিম অপরাধী হলেও সে ইসলামি আদালতে তার ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে রেহাই পেতে পারে, যা শুধু অমুসলিমদের নিরাপত্তা ও মানবাধিকারের জন্যই হুমকিস্বরূপ নয়, বরং এটি সমাজে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার পথকেও সম্পূর্ণরূপে বাঁধাগ্রস্ত করে। এমন আইন শুধু মুসলিমদের এক ধরনের বিশেষ অধিকার প্রদান করে এবং অমুসলিমদের অধিকার ও মর্যাদাকে সম্পূর্ণরূপে অবমাননা করে।

ধর্মের নামে এ ধরনের বৈষম্যমূলক নীতি কি আসলেই ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম? একটি ন্যায়সঙ্গত সমাজ কি ধর্মীয় পরিচয় অনুযায়ী বিচারব্যবস্থাকে পরিচালিত করবে? এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে, ইসলামি আইন প্রণয়নকারীদের এমন নিয়মের পেছনে যুক্তি খোঁজা অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়ে, কারণ এ ধরনের আইন শুধুমাত্র একটি বিশেষ সম্প্রদায়কে সুবিধা দেয়, যা মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন এবং প্রকৃত ন্যায়বিচারের পরিপন্থী [1]

দশম পরিচ্ছেদ: অমুসলিমদের সাক্ষ্য প্রসংগ
১. মাসআলা: মুসলিমের বিরুদ্ধে কাফিরের সাক্ষ্য গ্রহণযোগ্য নয় (আল-মুহীত : আস-সারাখসী)।

শরিয়া 84

এবারে আসুন আরেকটি গ্রন্থ থেকে ইসলামের এই বিধানটি সম্পর্কে জেনে নিই, [2]

(২) সাক্ষীকে মুসলিম হতে হবে :
অনেক ফৌজদারী মামলায় অমুসলিমদের সাক্ষ্য গ্রহণযোগ্য হলেও দেওয়ানী আইনে অমুসলিমদের সাক্ষ্য গ্রহণযোগ্য নয়। আল ফিকহুল ইসলামী গ্রন্থে বলা হয়েছে- সাক্ষীকে মুসলিম হতে হবে। এ সম্পর্কে ফকীহগণ একমত। তাই মুসলিমদের স্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিষয়ে অমুসলিমদের সাক্ষ্য গ্রহণযোগ্য নয়। তবে তারা নিজেদের স্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিষয়ে সাক্ষী হতে পারবে। ২৮ কেননা আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেছেন-
وَالَّذِينَ كَفَرُوا بَعْضُهُمْ أَوْلِيَاءُ بَعْضٍ.
‘যারা কাফির, তারা পরস্পর পরস্পরের অভিভাবক।’২৯
জাবির ইবনু আবদিল্লাহ্ (রা) থেকে বর্ণিত-
أَنَّ النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أَجَازَ شَهَادَةَ أَهْلِ الذِّمَّةِ بَعْضُهُمْ عَلَى بَعْضٍ.
মহানবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) অমুসলিম যিম্মীদের পরস্পরের মধ্যে সাক্ষী হওয়ার অনুমতি প্রদান করেছেন।

সাক্ষ্য

মানবাধিকার ও সমতার নীতির লঙ্ঘন

আধুনিক মানবাধিকারের সর্বজনীন ঘোষণাপত্র (UDHR) অনুযায়ী, আইনের চোখে সকলেই সমান এবং কোনো প্রকার বৈষম্য ছাড়াই সকলে আইনের আশ্রয় লাভের অধিকারী [3]। যখন কোনো বিচারব্যবস্থা সাক্ষীর ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে তার বক্তব্যকে বাতিল করে দেয়, তখন তা নাগরিকের মৌলিক অধিকারের চরম লঙ্ঘন হিসেবে গণ্য হয়।

১. বিচারের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হওয়া: সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা বা পরিকল্পিত আক্রমণের সময়ে, বিশেষ করে যখন কোনো হিন্দু পরিবার বা জনপদ আক্রান্ত হয়, তখন সেই পরিবারের সদস্যদের হত্যা, সম্পদ লুণ্ঠন, অগ্নিসংযোগ কিংবা ধর্ষণের মতো ভয়াবহ অপরাধের প্রধান বা একমাত্র প্রত্যক্ষদর্শী সাধারণত ভুক্তভোগী অমুসলিম পরিবারের সদস্যরাই হয়ে থাকেন। ধ্রুপদী ইসলামি আইনের এই কাঠামোর অধীনে, যেহেতু একজন মুসলিম অপরাধীর বিরুদ্ধে অমুসলিম ভুক্তভোগীর সাক্ষ্য আদালতে গ্রহণযোগ্য নয়, তাই অপরাধী ব্যক্তিটি অপরাধ করেও সম্পূর্ণ আইনি দায়মুক্তি লাভ করতে পারে। এর ফলে অপরাধী চক্রকে প্রশ্রয় দেওয়া হয় এবং ভুক্তভোগী সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীকে আইনি সুরক্ষার বাইরে ঠেলে দেওয়া হয়, যা ন্যায়বিচারের মৌলিক সংজ্ঞার সাথে সরাসরি সাংঘর্ষিক [4]

২. প্রাতিষ্ঠানিক বৈষম্য: এই আইনটি সমাজে একটি গভীর বিভাজনমূলক আইনি ব্যবস্থা তৈরি করে। যেখানে সংখ্যাগুরু মুসলিম সম্প্রদায়কে তাদের ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে এক ধরনের বিশেষ আইনি সুরক্ষা বা ‘প্রিভিলেজ’ প্রদান করা হয়, সেখানে ধর্মীয় সংখ্যালঘু বিশেষ করে হিন্দু বা অন্যান্য অমুসলিম নাগরিকদের আইনিভাবে গুরুত্বহীন ও চূড়ান্তভাবে অনিরাপদ করে তোলা হয়। এটি রাষ্ট্রের সকল নাগরিকের জন্য সমান অধিকারের প্রতিশ্রুতিকে ভঙ্গ করে এবং নাগরিক মর্যাদার পরিবর্তে ধর্মীয় শ্রেষ্ঠত্ববাদকে আইনি বৈধতা প্রদান করে। এমন বৈষম্যমূলক ব্যবস্থা আধুনিক রাষ্ট্রচিন্তা এবং মানবাধিকারের সর্বজনীন ঘোষণার পরিপন্থী, যেখানে স্পষ্ট বলা হয়েছে যে আইনের চোখে সকলেই সমান [3]

যুক্তি ও আধুনিক মানবাধিকারের নিরিখে, সাক্ষ্যের বিশ্বাসযোগ্যতা ব্যক্তির সত্যবাদিতা ও প্রমাণের ওপর ভিত্তি করে নির্ধারিত হওয়া উচিত, তার ধর্মীয় পরিচয়ের ওপর নয়। ধর্মীয় পরিচয়কে সাক্ষ্যের মানদণ্ড হিসেবে ব্যবহার করা কেবল অযৌক্তিক নয়, বরং এটি একটি নিপীড়নমূলক বিচারব্যবস্থারই বহিঃপ্রকাশ।

যৌক্তিক ও নৈতিক বিশ্লেষণ

যুক্তির নিরিখে বিচার করলে দেখা যায়, সত্য বলা বা মিথ্যা বলার সক্ষমতা কোনো নির্দিষ্ট ধর্মের ওপর নির্ভর করে না। একজন মানুষের চারিত্রিক সততা এবং ঘটনার সাথে তার উপস্থিত সাক্ষ্যের ভিত্তি হওয়া উচিত। কিন্তু ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে সাক্ষ্য বর্জন করা হলে তা বিচারিক প্রক্রিয়াকে সত্য অনুসন্ধানের পরিবর্তে একটি পক্ষপাতমূলক ব্যবস্থায় পরিণত করে।

যদি কোনো মুসলিম ব্যক্তি একজন অমুসলিমকে হত্যা করে এবং সেই ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী কেবল নিহতের পরিবারের সদস্যরা (যারা অমুসলিম) হন, তবে তাদের সাক্ষ্য গ্রহণ না করার অর্থ হলো ভিকটিমের ন্যায়বিচার পাওয়ার অধিকারকে অস্বীকার করা। এটি কেবল অমানবিক নয়, বরং একটি সুশৃঙ্খল সমাজের জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ, কারণ এটি অপরাধপ্রবণতাকে উৎসাহিত করে [5]


উপসংহার

পরিশেষে বলা যায়, ধর্মের ভিত্তিতে সাক্ষ্যের গ্রহণযোগ্যতা নির্ধারণ করা আধুনিক বিচারব্যবস্থার ‘ইকুয়ালিটি বিফোর ল’ বা ‘আইনের সমান সুযোগ’ নীতির সম্পূর্ণ পরিপন্থী। একটি ন্যায়সঙ্গত সমাজ গঠনে বিচারব্যবস্থাকে অবশ্যই ধর্ম, বর্ণ এবং লিঙ্গ নিরপেক্ষ হতে হবে। মধ্যযুগীয় এই আইনি কাঠামো আধুনিক সভ্যতায় কেবল অমুসলিমদের মর্যাদা ও নিরাপত্তাকেই ক্ষুণ্ণ করে না, বরং ন্যায়বিচারের বৈশ্বিক আদর্শকেও প্রশ্নবিদ্ধ করে। সুতরাং, যৌক্তিক ও মানবিক সমাজ বিনির্মাণে এই ধরনের বৈষম্যমূলক আইনের বিলোপ এবং সর্বজনীন আইনি সমতা প্রতিষ্ঠা করা অপরিহার্য।


তথ্যসূত্রঃ
  1. ফাতাওয়ায়ে আলমগীরী, ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ, পঞ্চম খণ্ড, পৃষ্ঠা ৫৭০ ↩︎
  2. ইসলামের সাক্ষ্য আইন, মাওলানা মুহাম্মাদ খলিলুর রহমান মুমিন, গবেষণা বিভাগ, বাংলাদেশ ইসলামিক সেন্টার, পৃষ্ঠা ৯৪ ↩︎
  3. Universal Declaration of Human Rights, Article 7 1 2
  4. ইন্টারন্যাশনাল কভেন্যান্ট অন সিভিল অ্যান্ড পলিটিক্যাল রাইটস, অনুচ্ছেদ ১৪ ↩︎
  5. International Covenant on Civil and Political Rights, Article 14 ↩︎