
Table of Contents
ভূমিকা
হিজড়া/ট্রান্সজেন্ডার/জেন্ডার-ডাইভার্স জনগোষ্ঠী দক্ষিণ এশিয়ায় বহু শতাব্দী ধরে সামাজিক বাস্তবতার অংশ—কিন্তু বাস্তবে তাদের দৈনন্দিন জীবন আজও ব্যাপক বৈষম্য, অপমান, সহিংসতা, এবং প্রাতিষ্ঠানিক বঞ্চনার মধ্যে আবদ্ধ। এই বঞ্চনা শুধু ব্যক্তিগত আচরণ বা “সমাজের মনোভাব”-এর সমস্যা নয়; অনেক সময় আইন, ধর্মীয়-নৈতিক বিধান, সামাজিক রীতি, এবং রাষ্ট্রীয় প্রশাসনিক চর্চা—সব মিলিয়ে একটি কাঠামোগত (structural) ও প্রাতিষ্ঠানিক (institutional) বৈষম্য তৈরি করে, যেখানে হিজড়াদের নিরাপত্তা, মর্যাদা, এবং মৌলিক অধিকার নিয়মিতভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
এই প্রবন্ধের উদ্দেশ্য হলো—হিজড়াদের বিরুদ্ধে বৈষম্যকে কোনো আবেগ-নির্ভর “সহানুভূতি” হিসেবে নয়, বরং অধিকারভিত্তিক (rights-based) এবং প্রমাণ-ভিত্তিক (evidence-informed) একটি সমস্যা হিসেবে দেখা। বিশেষ করে, ধর্মীয়/নৈতিক বিধানের নামে যখন নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীকে “অস্বাভাবিক”, “অপরাধী”, বা “অধিকারহীন” করে তোলার চেষ্টা হয়—তখন তা মানবাধিকারের মৌলিক নীতির সাথে কীভাবে সংঘর্ষে যায়, সেটা যুক্তিগতভাবে বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন। কারণ, একটি আধুনিক রাষ্ট্রে নাগরিক অধিকার কারো জন্ম, পরিচয়, বা সামাজিক গ্রহণযোগ্যতার উপর নির্ভর করে না—তা নির্ভর করে মানুষ হিসেবে তার মর্যাদা ও সমান অধিকারের উপর।
আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন ও মানদণ্ড
আন্তর্জাতিক মানবাধিকার কাঠামো মূলত কয়েকটি কেন্দ্রীয় নীতির উপর দাঁড়িয়ে: (১) সমতা ও বৈষম্যহীনতা, (২) ব্যক্তিগত মর্যাদা ও স্বাধীনতা, (৩) সহিংসতা থেকে সুরক্ষা, এবং (৪) ন্যায্য বিচার ও রাষ্ট্রীয় সুরক্ষা। বাস্তবে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক চুক্তি ও ঘোষণার মাধ্যমে এই নীতিগুলো রাষ্ট্রের ওপর দায়িত্ব হিসেবে নির্ধারিত হয়—যেমন কাউকে পরিচয়/জেন্ডার-পরিচয়ের কারণে সেবা, শিক্ষা, চিকিৎসা, কর্মসংস্থান, বা আইনি সুরক্ষা থেকে বঞ্চিত করা যাবে না; এবং রাষ্ট্রকে সক্রিয়ভাবে সহিংসতা প্রতিরোধ ও বিচার নিশ্চিত করতে হবে।
জেন্ডার আইডেন্টিটি ও সেক্সুয়াল অরিয়েন্টেশনের বিষয়গুলো অনেক দেশে বিতর্কিত হলেও মানবাধিকার মানদণ্ডের মূল প্রশ্নটা বিতর্ক নয়—প্রশ্নটা হচ্ছে: কোনো রাষ্ট্র কি তার নাগরিকের উপর সংঘটিত সহিংসতা, অপমান, বা বৈষম্যকে “নৈতিকতা/সংস্কৃতি/ধর্ম” বলে বৈধতা দিতে পারে? আধুনিক মানবাধিকার দর্শনে উত্তরটা পরিষ্কার: ব্যক্তির মৌলিক অধিকার—বিশেষ করে জীবন, নিরাপত্তা, মর্যাদা, এবং আইনের সমান সুরক্ষা—কোনো সমাজ-নৈতিকতার দোহাই দিয়ে বাতিল করা যায় না। রাষ্ট্র “বিশ্বাস” রক্ষা করতে পারে, কিন্তু “বিশ্বাসের নামে ক্ষতি”কে বৈধ করতে পারে না।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ মানদণ্ড হলো—প্রাইভেসি ও আত্মপরিচয়ের অধিকার। কারো জেন্ডার পরিচয়, শরীরগত বৈশিষ্ট্য, বা ব্যক্তিগত জীবনকে জনসমক্ষে অপমান, জোরপূর্বক প্রকাশ, অথবা “চিকিৎসা/সংশোধন” চাপিয়ে দেয়ার প্রবণতা মানবাধিকারের চোখে গুরুতর লঙ্ঘন হিসেবে বিবেচিত হয়। অর্থাৎ, হিজড়াদের অধিকার আলোচনা শুধু “সহানুভূতি” নয়—এটা রাষ্ট্রীয় দায়বদ্ধতা, ন্যূনতম আইনি সুরক্ষা, এবং মৌলিক মানবিক মর্যাদার প্রশ্ন।
হিজড়াদের সম্পর্কে হাদিস
সহীহ বুখারী হাদিসে বর্ণিত রয়েছে, হিজড়াদেরকে নির্বাসিত করতে হবে। নবী নিজেই তাদের ঘর থেকে বের করে দিতেন। কেন? শুধুমাত্র তারা হিজড়া হয়ে জন্ম নিয়েছে, এই কারণে [1] [2] –
সহীহ বুখারী (ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
অধ্যায়ঃ ৭৫/ কাফের ও ধর্মত্যাগী বিদ্রোহীদের বিবরণ
পরিচ্ছেদঃ ২৮৫২. গুনাহগার ও হিজড়াদের নির্বাসিত করা
৬৩৭৩। মুসলিম ইবনু ইবরাহীম (রহঃ) … ইবনু আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম লা’নত করেছেন নারীরূপী পুরুষ ও পুরুষরূপী নারীদের উপর এবং বলেছেনঃ তাদেরকে বের করে দাও তোমাদের ঘর হতে এবং তিনি অমুক অমুককে বের করে দিয়েছেন।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আবদুল্লাহ ইবনু আব্বাস (রাঃ)

আলেমদের বক্তব্য
আসুন বাঙলাদেশের একজন প্রখ্যাত আলেমের বক্তব্য শুনে নেয়া যাক,
হিজড়াদের নির্বাসিত করাঃ সহজ নসরুল বারী
সহজ নসরুল বারী, শরহে সহীহ বুখারী অর্থাৎ বুখারী হাদিসের ব্যাখ্যা গ্রন্থে কী বলা রয়েছে, সেটিও দেখে নিই [3],

পাঠক লক্ষ্য করুন, উপরে নসরুল বারী থেকে যেই ব্যাখ্যা দেয়া হয়েছে, সেখানে কবিরা গুণাহে লিপ্ত কথাটির পরে “ও” যুক্ত রয়েছে। এর মানে হচ্ছে, কবিরা গুণাহে লিপ্ত এবং হিজড়াদের কথা এখানে বলা হয়েছে। যদি “ও” অক্ষরটি না থাকতো, তাহলে অর্থটি হতে পারতো, শুধুমাত্র কবিরা গুণাহে লিপ্ত হিজড়াদের কথা এখানে বোঝানো হচ্ছে। যা অনেক ইসলামিস্টই আজকাল দাবী করে বিষয়টি লুকাবার চেষ্টা করেন। তারা বোঝাবার চেষ্টা করেন, এখানে হিজড়াদের সম্পর্কে নয়, শুধুমাত্র নাকি অপরাধী হিজড়াদের কথা বোঝানো হয়েছে। কিন্তু কথাটি যে সম্পূর্ণ মিথ্যা, তা ঐ “ও” অক্ষরটি দ্বারাই প্রমাণ হয়। যদি আমরা তর্কের খাতিরে ধরেও নিই যে, এখানে শুধুমাত্র গুনাহে লিপ্ত হিজড়াদের কথা বলা হচ্ছে, তাহলে তো এই বাক্য কোন অর্থবোধক বাক্য তৈরি করে না। কারণ শুধুমাত্র গুনাহগার হিজড়াদের কেন নির্বাসিত করতে হবে? যারা হিজড়া নন, তারা গুনাহগার হতে পারে না?
নবী নিজেও হিজড়াদের বের করে দিতেন
নবী মুহাম্মদ শুধু যে হিজড়াদের দেশ থেকে বের করে দেয়ার নির্দেশই দিতেন সেটিই নয়, তিনি নিজেও হিজড়াদের গোত্র ত্যাগে বাধ্যও করতেন [4] –
সুনান আবূ দাউদ (তাহকিককৃত)
অধ্যায়ঃ ২৭/ পোশাক-পরিচ্ছদ
পরিচ্ছেদঃ ৩৫. মহান আল্লাহর বাণীঃ ‘‘যৌন কামনা রহিত পুরুষ’’
৪১০৯। আয়িশাহ (রাঃ) সূত্রে অনুরূপ হাদীস বর্ণিত। এতে আরো রয়েছেঃ‘ ‘তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) তাকে আল-বায়দা নামক স্থানে পাঠিয়ে দিলেন। এরপর সে (হিজড়া) প্রতি শুক্রবার খাদ্যের জন্য শহরে আসতো।(1)
সহীহ।
(1). ইরওয়াউল গালীল (৬/২০৫)।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আয়িশা (রাঃ)
আসুন আরো একটি হাদিস পড়ি যেখানে পরিষ্কার যে, হিজড়াদের গৃহ থেকে বহিষ্কার করাই ইসলামের বিধান [5] –
হাদীস সম্ভার
২৪/ বিবাহ ও দাম্পত্য
পরিচ্ছেদঃ পর্দার বিধান
(২৬৬৫) ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেছেন, আল্লাহররসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম খোজা পুরুষ এবং পুরুষসুলভ আচরণ-কারিণী নারীর উপর অভিসম্পাত করেছেন এবং বলেছেন, তোমাদের গৃহ হতে ওদেরকে বের করে দাও। তিনি স্বয়ং এক খোজাকে বহিষ্কার করেছেন এবং উমার (রাঃ) এক হিজড়ে নারীকে গৃহ হতে বহিষ্কার করেছেন।
(আহমাদ ২০০৬, ২১২৩, বুখারী ৫৮৮৬)
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আবদুল্লাহ ইবনু আব্বাস (রাঃ)
একইসাথে, নবী মুহাম্মদ হিজড়াদের ঘৃণা করতেন, যার প্রমাণ পাওয়া যায় আরো কিছু সহিহ হাদিস থেকে [6] [7] [8] –
সহীহ বুখারী (ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
অধ্যায়ঃ ৫১/ মাগাযী (যুদ্ধাভিযান)
পরিচ্ছেদঃ ২২২০. তায়েফের যুদ্ধ। মুসা ইবন উকবা (রাঃ) এর মতে এ যুদ্ধ অষ্টম হিজরীর শাওয়াল মাসে সংগটিত হয়েছে
৩৯৮৮। হুমাইদী (রহঃ) … উম্মে সালামা (রাঃ) থেকে বর্ণিত যে, আমার কাছে এক হিজড়া ব্যাক্তি বসা ছিল, এমন সময়ে নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমার ঘরে প্রবেশ করলেন। আমি শুনলাম, সে (হিজড়া ব্যাক্তি) আবদুল্লাহ ইবনু আবূ উমাইয়া (রাঃ)-কে বলছে, হে আবদুল্লাহ! কি বলো, আগামীকাল যদি আল্লাহ্ তোমাদেরকে তায়েফের উপর বিজয় দান করেন তা হলে গায়লানের কন্যাকে অবশ্যই তুমি লুফে নেবে। কেননা সে (এতই স্থুলদেহ ও কোমল যে), সামনের দিকে আসার সময়ে তার পিঠে চারটি ভাঁজ পড়ে আবার পিঠ ফিরালে সেখানে আটটি ভাঁজ পড়ে। (উম্মে সালামা (রাঃ) বলেন) তখন নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ এদেরকে (হিজড়াদেরকে) তোমাদের কাছে প্রবেশ করতে দিও না। ইবনু উয়াইনা (রাঃ) বর্ণনা করেন যে, ইবনু জুরায়জ (রাঃ) বলেছেন, হিজড়া লোকটির নাম ছিলো হীত।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ উম্মু সালামাহ (রাঃ)
সহীহ বুখারী (ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
অধ্যায়ঃ ৫৪/ বিয়ে-শাদী
পরিচ্ছেদঃ ২৫৩৭. যে পুরুষ মহিলার মত সাজ-গোজ করে, তার সাথে কোন নারীর চলাফেরা নিষেধ
৪৮৫৫। উসমান ইবনু আবূ শায়বা (রহঃ) … উম্মে সালামা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার কাছে থাকাকালে সেখানে একজন মেয়েলী ভাবাপন্ন পুরুষ ছিল। ঐ মেয়েলী পুরুষটি উম্মে সালামার ভাই আবদুল্লাহ ইবনু আবূ উমাইয়াকে বলল, যদি আগামীকাল আপনাদেরকে আল্লাহ তায়েফ বিজয় দান করেন, তবে আমি আপনাকে গায়লানের মেয়েকে গ্রহন করারা পরামর্শ দিচ্ছি। কেননা, সে এত মেদবহুল যে, সে সম্মুখ দিকে আগমন করলে তার পেটের চামড়ায় চার ভাঁজ পড়ে আর পিছু ফিরে যাওয়ার সময় আট ভাঁজ পড়ে। একথা শোনার পর নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, (এ মেয়েলী পুরুষ হিজড়া) সে যেন কখনো তোমাদের কাছে আর না আসে।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ উম্মু সুলায়ম (রাঃ)
সূনান আবু দাউদ (ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
অধ্যায়ঃ ৩৬/ আদব
পরিচ্ছেদঃ ৫৯. নপুংসকদের হুকুম সম্পর্কে।
৪৮৪৬. আবূ বকর ইবন আবূ শায়বা (রহঃ) …. উম্মু সালামা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেনঃ একদা নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমার কাছে এমন সময় প্রবেশ করেন, যখন আমর কাছে একজন নপুংসক (হিজড়া) উপস্থিত ছিল। আর সে তার ভাইকে বলছিল। আগামীকাল মহান আল্লাহ্ যদি তায়েফের উপর (মুসলমানদের) বিজয় দান করেন, তবে আমি তোমাকে এমন এক স্ত্রীলোকের খবর দেব, যার আসার সময় তার পেটে চারটি ভাঁজ দেখা যায়; আর যখন সে চলে যায় তখন তার পেটে আটটি ভাঁজ দেখা যায়।একথা শুনে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে ঘর থেকে বের করে দেয়ার নির্দেশ দেন।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ উম্মু সালামাহ (রাঃ)
নবী হিজড়াদের বিতাড়িত করতেনঃ নসরুল বারী
আসুন আরও একটি দলিল দেখে নিই, যেখানে নবী মুহাম্মদের হিজড়াদের প্রতি ঘৃণা ও বিদ্বেষ পরিষ্কার ভাবে বোঝা যায় [9] –

নামাজি হিজড়াদের হত্যা—হাদিসে ইঙ্গিত
সহিহ সূত্রে বর্ণিত একটি হাদিসে দেখা যায়—এক হিজড়াকে (যার হাতে-পায়ে মেহেদী ছিল এবং “নারীর বেশ ধারণ” করার অভিযোগ তোলা হয়) নবী মুহাম্মদের কাছে আনা হলে তিনি তাকে হত্যা করার নির্দেশ দেননি; বরং তাকে আন-নকী নামক স্থানে নির্বাসন দেওয়ার নির্দেশ দেন। এরপর সাহাবীরা প্রশ্ন করে: “আমরা কি তাকে হত্যা করবো না?”—জবাবে নবী বলেন: “সালাত আদায়কারীকে হত্যা করতে আমাকে নিষেধ করা হয়েছে।” [10]
সুনান আবূ দাউদ (তাহকিককৃত)
অধ্যায়ঃ ৩৬/ শিষ্টাচার
পরিচ্ছেদঃ ৬১. হিজড়া সম্পর্কে বিধান
৪৯২৮। আবূ হুরাইরাহ (রাঃ) সূত্রে বর্ণিত। কোনো একদিন এক হিজড়াকে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট আনা হলো। তার হাত-পা মেহেদী দ্বারা রাঙ্গানো ছিলো। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ এর এ অবস্থা কেন? বলা হলো, হে আল্লাহর রাসূল! সে নারীর বেশ ধরেছে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে আন-নকী নামক স্থানে নির্বাসন দেয়ার নির্দেশ দিলেন। সাহাবীগণ বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! আমরা কি তাকে হত্যা করবো না? তিনি বললেনঃ সালাত আদায়কারীকে হত্যা করতে আমাকে নিষেধ করা হয়েছে। আবূ উসামাহ (রহঃ) বলেন, আন-নাফী‘ হলো মদীনার প্রান্তবর্তী একটি জনপদ, এটা বাকী নয়।(1)
সহীহ।
(1). দারাকুতনী।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আবূ হুরায়রা (রাঃ)
এই হাদিসের বক্তব্যটি খুব গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এখানে হিজড়া হওয়ার কারণে এক ব্যক্তির আটককে কেন্দ্র করে প্রশ্নোত্তর এবং এরপরে তাকে নবীর হত্যার নিষেধাজ্ঞাটি “হিজড়া হওয়া”-কে কেন্দ্র করে নয়, বরং “সালাত আদায়কারী”—এই শর্তকে কেন্দ্র করে উপস্থাপিত। ফলে হাদিসটির ভাষা-গঠন থেকে একটি নীরব (implicit) প্রশ্ন তৈরি হয়: যদি “সালাত আদায়কারী” না হয়, তাহলে কি হত্যার ব্যাপারে নিষেধাজ্ঞাটি থাকত? হাদিসটি এ প্রশ্নের উত্তর একটু কৌশলে দেয়। সাহাবীদের প্রশ্ন এবং নবীর শর্তযুক্ত জবাব মিলিয়ে বোঝা যায়—তাদের কাছে “হত্যা” শাস্তিটিই বাস্তবসম্মত/চিন্তাযোগ্য ছিল, এবং নবীও সেই হত্যা করে ফেলার চিন্তাটি সমর্থনই করতেন। কিন্তু নীতিগতভাবে “নামাজি” হওয়ার কারণে হত্যা নিষেধ—এভাবে বলেছেন।
অর্থাৎ, এই হাদিসকে যদি শব্দার্থ-নির্ভরভাবে পড়া হয়, তাহলে এটি “হিজড়া হলেই কাউকে হত্যা করা যাবে না”—এমন সার্বজনীন নীতিবাক্য দেয় না; বরং একটি শর্তযুক্ত রেস্ট্রিকশন দেয়: নামাজ আদায়কারী হলে হত্যা করা যাবে না। এই শর্তযুক্ত বয়ান থেকে “অ-নামাজি হিজড়া”-দের ক্ষেত্রে কী হবে—তা হাদিসটি সরাসরি বলে না; কিন্তু পাঠক সহজেই বুঝতে পারেন, কেন এই প্রশ্নটি উঠে আসে এবং কেন এই বয়ানটি নৈতিকভাবে সমস্যাজনক, মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন এবং আদিম বর্বরতা বলে প্রতীয়মান হতে পারে। অনুরূপ বর্ণনা মিশকাতুল মাসাবীহ-তেও পাওয়া যায় [11]।
মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত)
অধ্যায়ঃ পর্ব-২২ঃ পোশাক-পরিচ্ছদ
পরিচ্ছেদঃ ৩. তৃতীয় অনুচ্ছেদ – চুল আঁচড়ানো
৪৪৮১-(৬৩) আবূ হুরায়রা (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদিন রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে এক হিজড়াকে আনা হলো, সে তার হাতে এবং পায়ে মেহেদী লাগিয়ে রেখেছিল। তখন রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জিজ্ঞেস করলেন, এটার এ অবস্থা কেন? সাহাবীগণ বললেনঃ সে নারীদের বেশ ধারণ করেছে। তখন তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) তাকে শহর হতে বের করে দেয়ার নির্দেশ দিলেন। সুতরাং তাকে শহরের বাইরে নাক্বী‘ নামক স্থানে নির্বাসিত করা হলো। অতঃপর রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে জিজ্ঞেস করা হলো, হে আল্লাহর রসূল!আমরা কি তাকে কতল করে দেব? তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেনঃ সলাত আদায়কারী ব্যক্তিদেরকে কতল করতে আমাকে নিষেধ করা হয়েছে। (আবূ দাঊদ)(1)
(1) সহীহ : আবূ দাঊদ ৪৯২৮, সহীহুল জামি‘ ২৫০৬, সিলসিলাতুস্ সহীহাহ্ ২৩৭৯, শু‘আবুল ঈমান ৪৬০৬, দারাকুত্বনী ৯, আল মু‘জামুল আওসাত্ব ৫০৫৮, আস্ সুনানুল কুবরা লিল বায়হাক্বী ১৭৪৪২, আস্ সুনানুস্ সুগরা ৫৯৭।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আবূ হুরায়রা (রাঃ)
হিজড়াদের সুরক্ষা কেন জরুরি
হিজড়াদের সুরক্ষা জরুরি—কারণ এখানে একসাথে কয়েক স্তরে ক্ষতি ঘটে: ব্যক্তিগত, সামাজিক, এবং প্রাতিষ্ঠানিক।
১) সহিংসতা ও ভয়ভিত্তিক জীবন: হিজড়াদের বিরুদ্ধে শারীরিক আক্রমণ, যৌন সহিংসতা, ব্ল্যাকমেইল, পুলিশের হয়রানি, এবং জনসমক্ষে অপমান—এসবের ঝুঁকি সাধারণ জনগোষ্ঠীর তুলনায় অনেক বেশি। নিরাপত্তাহীনতা যখন নিয়মিত বাস্তবতা হয়ে দাঁড়ায়, তখন “স্বাধীন নাগরিক” ধারণাটাই অর্থহীন হয়ে যায়।
২) শিক্ষা-চাকরি-চিকিৎসায় কাঠামোগত বঞ্চনা: পরিবার ও স্কুলে বুলিং/বহিষ্কার, পরিচয়পত্র/ডকুমেন্ট সমস্যা, চাকরিতে বৈষম্য, স্বাস্থ্যসেবায় অপমান—এসব মিলে বহু হিজড়া মানুষকে বাধ্য করে অনানুষ্ঠানিক ও অনিরাপদ জীবিকায় যেতে। এটা “ব্যক্তিগত ব্যর্থতা” নয়; এটা সুযোগ কেটে দিয়ে তৈরি করা দারিদ্র্যচক্র।
৩) আইনের সমান সুরক্ষা না থাকলে অপরাধ বাড়ে: যখন রাষ্ট্রীয় সুরক্ষা দুর্বল হয়, তখন অপরাধীরা জানে—শিকার ন্যায়বিচার পাবে না। ফলে সহিংসতা “কম রিপোর্টেড” হয় এবং অপরাধ “কম শাস্তিপ্রাপ্ত” হয়। এই ইমপিউনিটি (impunity) পরিস্থিতি কেবল হিজড়াদের ক্ষতি করে না; আইনশৃঙ্খলা ও ন্যায়বিচারের উপর সামগ্রিক আস্থা নষ্ট করে।
৪) মানবিক মর্যাদার মৌলিক প্রশ্ন: আধুনিক নৈতিক-আইনি চিন্তায় “মানুষ” হওয়াটাই অধিকার পাওয়ার যথেষ্ট কারণ। পরিচয়, সংখ্যাগরিষ্ঠের স্বাদ, বা সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা—এসব অধিকার দেয় না, অধিকার কেড়ে নেয়ারও যুক্তি হতে পারে না। হিজড়াদের সুরক্ষা তাই “বিশেষ সুবিধা” নয়; সমান মর্যাদা নিশ্চিত করার ন্যূনতম শর্ত।
৫) নীতিগত সামঞ্জস্য (consistency): যদি একটি সমাজ/রাষ্ট্র বলে “সহিংসতা ভুল”, “অপমান অন্যায়”, “আইন সবার জন্য”—তাহলে সেই নীতি হিজড়াদের ক্ষেত্রেও সমানভাবে কার্যকর হতে হবে। নইলে নীতির দাবি কেবল সিলেক্টিভ নৈতিকতা হয়ে দাঁড়ায়।
উপসংহার
হিজড়াদের অধিকার প্রশ্নটি শেষ পর্যন্ত কোনো ধর্মীয় মতবাদ, সাংস্কৃতিক স্বাদ, বা সংখ্যাগরিষ্ঠের অস্বস্তি দিয়ে মীমাংসা করার বিষয় নয়—এটা একটি মানবাধিকার ও আইনের শাসন (rule of law) সম্পর্কিত প্রশ্ন। কোনো জনগোষ্ঠীকে পরিচয়ের কারণে “কম মানুষ” বা “কম অধিকারযোগ্য” হিসেবে দেখা মানে রাষ্ট্রের সমতা-নীতিকে অস্বীকার করা। আর রাষ্ট্র যদি কারো নিরাপত্তা, মর্যাদা, এবং ন্যায্য বিচার নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হয়, তাহলে সেটি কেবল একটি সম্প্রদায়ের ট্র্যাজেডি নয়—পুরো সমাজের আইনি-নৈতিক ভিত্তির ব্যর্থতা।
অতএব, হিজড়াদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা মানে “বিশেষ কারো পক্ষে দাঁড়ানো” নয়—এটা ন্যায্যতা, রাষ্ট্রীয় দায়বদ্ধতা, এবং মৌলিক মানবিক মর্যাদাকে বাস্তবে কার্যকর করা। যে সমাজ দুর্বলকে সুরক্ষা দিতে পারে না, সে সমাজ শেষ পর্যন্ত কাউকেই স্থায়ীভাবে সুরক্ষা দিতে পারে না—কারণ আইন তখন নীতি নয়, কেবল ক্ষমতার ভাষা হয়ে ওঠে।
তথ্যসূত্রঃ
- সহীহ বুখারী, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, হাদিসঃ ৬৩৭৩ ↩︎
- সহীহ বুখারী, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, দশম খণ্ড, পৃষ্ঠা নম্বর- ২৪০, হাদিসঃ ৬৩৭৩ ↩︎
- সহজ নসরুল বারী, শরহে সহীহ বুখারী, আরবি-বাংলা, সহজ তরজমা ও বিস্তারিত ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ, হযরত মাওলানা উসমান গনী, আল কাউসার প্রকাশনী, ১২তম খণ্ড, পৃষ্ঠা ২৪০ ↩︎
- সুনান আবূ দাউদ (তাহকিককৃত), হাদিসঃ ৪১০৯ ↩︎
- হাদীস সম্ভার, হাদিসঃ ২৬৬৫ ↩︎
- সহীহ বুখারী, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, হাদিসঃ ৩৯৮৮ ↩︎
- সহীহ বুখারী, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, হাদিসঃ ৪৮৫৫ ↩︎
- সূনান আবু দাউদ, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, হাদিসঃ ৪৮৪৬ ↩︎
- সহজ নসরুল বারী, শরহে সহীহ বুখারী, আরবি-বাংলা, সহজ তরজমা ও বিস্তারিত ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ, হযরত মাওলানা উসমান গনী, আল কাউসার প্রকাশনী, ৮ম খণ্ড, পৃষ্ঠা ৪২৬ ↩︎
- সূনান আবু দাউদ, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, হাদিসঃ ৪৯২৮ ↩︎
- মিশকাতুল মাসাবীহ, হাদিসঃ ৪৪৮১ ↩︎
