
Table of Contents
- 1 ভূমিকা
- 2 বিচার বিভাগীয় সার্বভৌমত্ব বনাম ধর্মীয় আবেগ
- 3 গালিদাতাকে নির্মমভাবে হত্যা এবং নবীর সমর্থন
- 4 আলেমদের বক্তব্যঃ শাতিমে রাসুলের একমাত্র শাস্তি কতল
- 5 জামার একটি বোতাম ময়লা বললেও কতল
- 6 ইযাহুল মুসলিমঃ নবীকে গালি দিলে শাস্তি
- 7 নবীর মানহানির শাস্তি মৃত্যুদণ্ড
- 8 মব জাস্টিস ও সামাজিক বর্বরতার উসকানি
- 9 উপসংহারঃ বুদ্ধিবৃত্তিক অন্ধকার ও অসহিষ্ণুতার সংস্কৃতি
ভূমিকা
ইতিহাসের বিচিত্র পরিহাস এই যে, সপ্তম শতকের আরবে নবী মুহাম্মদ যখন তৎকালীন প্রচলিত পৌত্তলিক ধর্মের অবমাননা ও পূর্বপুরুষদের বিশ্বাসকে চ্যালেঞ্জ করে ইসলাম প্রচার শুরু করেন, তখন তা ছিল তার পক্ষ থেকে এক প্রকার ‘ধর্ম অবমাননা’ বা প্রচলিত রীতির বিরোধিতা [1]। অথচ আজকের পৃথিবীতে সেই একই নবীর প্রবর্তিত জীবনদর্শন বা তার ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে সামান্যতম একাডেমিক সমালোচনা বা বিশ্লেষণকেও ‘ব্লাসফেমি’র নামে চূড়ান্ত অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হয়। আধুনিক সভ্যতায় যেখানে কোনো ব্যক্তি বা আদর্শই সমালোচনার ঊর্ধ্বে নয়, সেখানে ইসলামী বিশ্বে নবী মুহাম্মদের সমালোচনা বা ভিন্নমতের জন্য মৃত্যুদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে। শুধু যে বিচারিক প্রক্রিয়াতে মৃত্যুদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে সেটিই নয়, যেকেউ কেকোন সময়ে আইন নিজের হাতে তুলে নিয়ে অভিযুক্ত ব্যক্তিকে হত্যা করে ফেললেও, ইসলামী আইনে এর কোন বিচার নেই। এই প্রবন্ধের উদ্দেশ্য হলো, ইসলামী বিধানে ‘শাতিমে রাসুল’ বা নবী অবমাননার শাস্তির কঠোরতা বিশ্লেষণ করা এবং কেন সমসাময়িক মুসলিম প্রধান দেশগুলোতে যৌক্তিক সমালোচনা বা বুদ্ধিবৃত্তিক বিশ্লেষণ অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে, তা তথ্যপ্রমাণের ভিত্তিতে তুলে ধরা।
বিচার বিভাগীয় সার্বভৌমত্ব বনাম ধর্মীয় আবেগ
আধুনিক রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অন্যতম মূল ভিত্তি হলো ‘আইনের শাসন’ (Rule of Law), যেখানে অপরাধের সংজ্ঞা এবং তার বিচারিক প্রক্রিয়া আবেগ বা ধর্মীয় অনুভূতির পরিবর্তে সর্বজনীন আইনি কাঠামোর ওপর নির্ভরশীল। দার্শনিক জন লকের ‘সোশ্যাল কন্ট্রাক্ট’ তত্ত্ব অনুযায়ী, একটি সভ্য সমাজে নাগরিকরা তাদের ব্যক্তিগত প্রতিহিংসা চরিতার্থ করার অধিকার রাষ্ট্রের হাতে তুলে দেয় যাতে নিরপেক্ষ বিচার নিশ্চিত করা যায় [2]। কিন্তু ‘শাতিমে রাসুল’ বা নবী অবমাননার নামে যখন বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডকে উৎসাহিত করা হয়, তখন তা সরাসরি রাষ্ট্রের বিচারিক সার্বভৌমত্বকে চ্যালেঞ্জ করে। সমাজবিজ্ঞানী থমাস হবসের মতে, যখন ব্যক্তি নিজেই বিচারকের ভূমিকা পালন করতে শুরু করে, তখন সমাজ ‘প্রাকৃতিক অবস্থায়’ (State of Nature) ফিরে যায়, যা মূলত একটি বিশৃঙ্খল ও সহিংস যুদ্ধাবস্থা ছাড়া আর কিছুই নয় [3]।
যৌক্তিক দৃষ্টিকোণ থেকে, ‘অবমাননা’ একটি আপেক্ষিক শব্দ। যা একজনের কাছে ভক্তি, তা অন্যজনের কাছে যৌক্তিক সমালোচনা হতে পারে। আধুনিক লিবারেলিজমের প্রবক্তা ইমানুয়েল কান্ট মনে করতেন, মানুষের বিচারবুদ্ধি বা ‘রিজন’ (Reason) ব্যবহারের স্বাধীনতা থাকা উচিত এবং কোনো কর্তৃত্বই এই বুদ্ধিবৃত্তিক অনুসন্ধানকে সেন্সর করার অধিকার রাখে না [4]। যখন একটি সমাজ কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তির সমালোচনাকে মৃত্যুদণ্ডযোগ্য অপরাধ মনে করে, তখন সেখানে ‘ব্লাসফেমি’ আইনকে রাজনৈতিক বা ব্যক্তিগত শত্রুতা উদ্ধারের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করার সুযোগ তৈরি হয়। সমাজবিজ্ঞানী হার্বার্ট স্পেনসারের তত্ত্ব অনুযায়ী, যে সমাজ যত বেশি অসহিষ্ণু, সেই সমাজের বিবর্তন তত দ্রুত থমকে যায়। একটি সমাজে যদি ‘পবিত্রতা’র দোহাই দিয়ে প্রশ্ন করার পথ বন্ধ করে দেওয়া হয়, তবে সেখানে বুদ্ধিবৃত্তিক দাসত্ব জেঁকে বসে।
আন্তর্জাতিক আইনের প্রেক্ষাপটে, ‘ইন্টারন্যাশনাল কোভনেন্ট অন সিভিল অ্যান্ড পলিটিক্যাল রাইটস’ (ICCPR) এর ১৯ নম্বর অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে যে, কোনো ব্যক্তির মত প্রকাশের স্বাধীনতা কেবল তখনই সীমিত করা যেতে পারে যদি তা অন্যের অধিকার ক্ষুণ্ণ করে বা জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি হয়, কিন্তু কেবল কারো ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত লাগে বলে কাউকে হত্যা বা কারাদণ্ড দেওয়া মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন [5]। এই অধিকারগুলো না থাকলে সমাজে নিচের বিপর্যয়গুলো অনিবার্য হয়ে পড়ে:
পরিশেষে, দার্শনিক ভলতেয়ারের সেই বিখ্যাত উক্তি— “আমি তোমার মতের সাথে দ্বিমত পোষণ করতে পারি, কিন্তু তোমার কথা বলার অধিকারের জন্য আমি জীবন দিতে পারি”—একটি গণতান্ত্রিক সমাজের মূল প্রাণশক্তি। অথচ শাতিমে রাসুলের শাস্তির নামে যে আইনি ও সামাজিক কাঠামো ইসলামী বিশ্বে গড়ে উঠেছে, তা মূলত এই প্রাণশক্তিকেই ধ্বংস করছে। এই অসহিষ্ণুতা সমাজকে কেবল একটি বদ্ধ জলাশয়ে পরিণত করে, যেখানে নতুন কোনো চিন্তার স্রোত প্রবাহিত হতে পারে না।
গালিদাতাকে নির্মমভাবে হত্যা এবং নবীর সমর্থন
নিচের হাদিসটি লক্ষ্য করুন। হাদিসটিতে একজন অন্ধ ব্যক্তির ক্রীতদাসী, যার পেটে সেই অন্ধ সাহাবী বাচ্চা জন্ম দিয়েছে, তাকে সে খুব নির্মমভাবে হত্যা করে, শুধুমাত্র নবী-কে গালি দেওয়ার কারণে। নবী মুহাম্মদ পরবর্তীতে এই কথা জানতে পেরে খুশী হন, মৌন সমর্থন জানান এবং এই হত্যাকাণ্ডকে রক্তমূল্যহীন বা বৃথা বলে উল্লেখ করেন। অর্থাৎ নবী এই ধরণের হত্যাকাণ্ডকে সমর্থন দিলেন এবং উৎসাহও দিলেন। নবী মুহাম্মদ যে তাকে গালি দেয়া কিংবা তার সমালোচনা করা সকলের প্রতি সীমাহীন বর্বর ছিলেন, এই হাদিসটি তার জলন্ত প্রমাণ [6] [7] [8] [9] [10] –
সুনান আবূ দাউদ (তাহকিককৃত)
পাবলিশারঃ আল্লামা আলবানী একাডেমী
অধ্যায়ঃ ৩৩/ অপরাধ ও তার শাস্তি
পরিচ্ছদঃ ২. যে নবী (ﷺ)-কে গালি দেয় তার সম্পর্কিত বিধান
৪৩৬১। ইবনু আব্বাস (রাঃ) সূত্রে বর্ণিত। জনৈক অন্ধ লোকের একটি উম্মু ওয়ালাদ’ ক্রীতদাসী ছিলো। সে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে গালি দিতো এবং তাঁর সম্পর্কে মন্দ কথা বলতো। অন্ধ লোকটি তাকে নিষেধ করা সত্ত্বেও সে বিরত হতো না। সে তাকে ভৎর্সনা করতো; কিন্তু তাতেও সে বিরত হতো না। এক রাতে সে যখন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে গালি দিতে শুরু করলো এবং তাঁর সম্পর্কে মন্দ কথা বলতে লাগলো, সে একটি একটি ধারালো ছোরা নিয়ে তার পেটে ঢুকিয়ে তাতে চাপ দিয়ে তাকে হত্যা করলো। তার দু’ পায়ের মাঝখানে একটি শিশু পতিত হয়ে রক্তে রঞ্জিত হলো। ভোরবেলা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঘটনাটি অবহিত হয়ে লোকজনকে সমবেত করে বলেনঃ আমি আল্লাহর কসম করে বলছিঃ যে ব্যক্তি একাজ করেছে, সে যদি না দাঁড়ায় তবে তার উপর আমার অধিকার আছে।
একথা শুনে অন্ধ লোকটি মানুষের ভিড় ঠেলে কাঁপতে কাঁপতে সামনে অগ্রসর হয়ে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সামনে এসে বসে বললো, হে আল্লাহর রাসূল! আমি সেই নিহত দাসীর মনিব। সে আপনাকে গালাগালি করতো এবং আপনার সম্পর্কে অপমানজনক কথা বলতো। আমি নিষেধ করতাম; কিন্তু সে বিরত হতো না। আমি তাকে ধমক দিতাম; কিন্তু সে তাতেও বিরত হতো না। তার গর্ভজাত মুক্তার মতো আমার দু’টি ছেলে আছে, আর সে আমার খুব প্রিয়পাত্রী ছিলো। গত রাতে সে আপনাকে গালাগালি শুরু করে এবং আপনার সম্পর্কে অপমানজনক কথা বললে, আমি তখন একটি ধারালো ছুরি নিয়ে তার পেটে স্থাপন করে তাতে চাপ দিয়ে তাকে হত্যা করে ফেলি। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ তোমরা সাক্ষী থাকো, তার রক্ত বৃথা গেলো।(1)
সহীহ।
(1). নাসায়ী।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)

সুনান আবূ দাউদ (ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
৩৩/ শাস্তির বিধান
পরিচ্ছেদঃ ২. নবী (ﷺ) এর মর্যাদাহানিকারী ব্যক্তির শাস্তি সম্পর্কে।
৪৩১০. আব্বাদ ইব্ন মূসা (রহঃ) …. ইব্ন আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেনঃ কোন এক অন্ধ ব্যক্তির একটি দাসী ছিল। সে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর শানে বেয়াদবিসূচক কথাবার্তা বলতো। সে অন্ধ ব্যক্তি তাকে এরূপ করতে নিষেধ করতো, কিন্তু সে তা মানতো না। সে ব্যক্তি তাকে ধমকাতো, তবু সে তা থেকে বিরত হতো না। এমতাবস্থায় এক রাতে যখন সে দাসী নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর শানে অমর্যাদাকর কথাবার্তা বলতে থাকে, তখন ঐ অন্ধ ব্যক্তি একটি ছোরা নিয়ে তার পেটে প্রচন্ড আঘাত করে, যার ফলে সে দাসী মারা যায়। এ সময় তার এক ছেলে তার পায়ের উপর এসে পড়ে, আর সে যেখানে বসে ছিল, সে স্থানটি রক্তাপ্লুত হয়ে যায়।
পরদিন সকালে এ ব্যাপারে যখন রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট আলোচনা হয়, তখন তিনি সকলকে একত্রিত করে বলেনঃ আমি আল্লাহ্র নামে শপথ করে এ ঘটনার সত্যতা সম্পর্কে জানতে চাই এবং ইহা তার জন্য আমার হক স্বরূপ। তাই, যে ব্যক্তি তাকে হত্যা করেছে, সে যেন দাঁড়িয়ে যায়। সে সময় অন্ধ লোকটি লোকদের সারি ভেদ করে প্রকম্পিত অবস্থায় নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সামনে গিয়ে বসে পড়ে এবং বলেঃ ইয়া রাসূলাল্লাহ্! আমি তার হন্তা।
সে আপনার সম্পর্কে কটুক্তি ও গালি-গালাজ করতো। আমি তাকে এরূপ করতে নিষেধ করতাম ও ধমকাতাম। কিন্তু সে তার প্রতি কর্ণপাত করতো না। ঐ দাসী থেকে আমার দু’টি সন্তান আছে, যারা মনি-মুক্তা সদৃশ এবং সেও আমার প্রিয় ছিল। কিন্তু গত রাতে সে যখন পুনরায় আপনার সম্পর্কে কটুক্তি গাল-মন্দ করতে থাকে, তখন আমি আমার উপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলি এবং ছোরা দিয়ে তার পেটে প্রচন্ড আঘাত করে তাকে হত্যা করি। তখন নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ তোমরা সাক্ষী থাক যে, ঐ দাসীর রক্ত ক্ষতিপূরণের অযোগ্য বা মূল্যহীন।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আবদুল্লাহ ইবনু আব্বাস (রাঃ)
বুলুগুল মারাম
পর্ব – ৯ঃ অপরাধ প্রসঙ্গ
পরিচ্ছেদঃ ৪. সম্পদ রক্ষার্থে নিহত হওয়া ব্যক্তি প্রসঙ্গে – নাবী (ﷺ) এর নিন্দাকারীদেরকে হত্যা করা আবশ্যক
১২০৪। ইবনু আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত;কোন এক অন্ধ সাহাবীর একটা সন্তানের মাতা দাসী ছিল, সে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে গালি দিত এবং তাঁর প্রসঙ্গে অশোভনীয় মন্তব্য করত। সাহাবী তাকে নিষেধ করতেন কিন্তু সে বিরত হত না। এক রাত্রে অন্ধ সাহাবী (তার এরূপ দুব্যবহারে অতিষ্ঠ হয়ে) কুড়ালি জাতীয় এক অস্ত্র দিয়ে ঐ দাসীর পেটে বাসিয়ে দেন ও তার উপর বসে যান ও তাকে হত্যা করে ফেললেন। এ সংবাদ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিকটে পৌছালে তিনি বলেন: তোমরা সাক্ষী থাক, এ খুন বাতিল এ জন্য কোন খেসারত দিতে হবে না।[1]
[1] আবূ দাউদ ৪৩৬১, নাসায়ী ৪০৭০।
ইকরিমাহ (রহঃ) হতে। তিনি বলেন, ‘আলী (রাঃ)-এর কাছে একদল ফিন্দীককে (নাস্তিক ও ধর্মত্যাগীকে) আনা হল। তিনি তাদেরকে আগুন দিয়ে জ্বালিয়ে দিলেন। এ ঘটনা ইবনু আব্বাস (রাঃ)-এর কাছে পৌছলে তিনি বললেন, আমি কিন্তু তাদেরকে পুড়িয়ে ফেলতাম না। কেননা, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিষেধাজ্ঞা আছে যে, তোমরা আল্লাহর শাস্তি দ্বারা শাস্তি দিও না। বরং আমি তাদেরকে হত্যা করতাম। কারণ, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নির্দেশ আছে ……………. অতঃপর উপরোক্ত হাদীসটি বর্ণনা করলেন।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আবদুল্লাহ ইবনু আব্বাস (রাঃ)
সুনান আন-নাসায়ী (ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
৩৮/ হত্যা অবৈধ হওয়া
পরিচ্ছেদঃ ১৬. রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-কে মন্দ বলার শাস্তি
৪০৭১. উসমান ইবন আবদুল্লাহ (রহঃ) … উসমান শাহহাম (রহঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি এক অন্ধ লোকের চালক ছিলাম। একদা তাকে নিয়ে ইকরিমার কাছে গেলাম। তিনি আমাদের কাছে বর্ণনা করলেন যে, ইবন আব্বাস (রাঃ) বলেন, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সময় এক অন্ধ লোক ছিল। তার এক দাসী ছিল, যার গর্ভে তার দুই ছেলে জন্মে। সে দাসী সর্বদাই রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কথা উল্লেখ করে তাঁকে মন্দ বলতো। অন্ধ ব্যক্তিটি তাকে এজন্য তিরস্কার করতো, কিন্তু সে তাতে কর্ণপাত করত না। তাকে নিষেধ করত, কিন্তু তবুও বিরত হত না। অন্ধ লোকটি বলেন, একরাত্রে আমি রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কথা উল্লেখ করলে সে তার নিন্দা করতে শুরু করল। আমার তা সহ্য না হওয়ায় আমি একটি হাতিয়ার নিয়ে তার পেটে বিদ্ধ করলাম। তাতে সে মারা গেল।
ভোরে লোক তাকে মৃতাবস্থায় দেখে ব্যাপারটি রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর খিদমতে জানাল। তিনি সকল লোককে একত্র করে বললেনঃ আমি আল্লাহর কসম দিয়ে ঐ ব্যক্তিকে বলছি, যে এমন কাজ করেছে সে আসুক। একথা শুনে ঐ অন্ধ ব্যক্তি ভয়ে উঠে এসে হাযির হলেন এবং বললেনঃ ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমি এই কাজ করেছি। সে আমার বাদী ছিল, আমার অত্যন্ত স্নেহশীলা ছিল, সঙ্গিণী ছিল। তার গর্ভের আমার দুটি ছেলে রয়েছে, যারা মুক্তাসদৃশ। কিন্তু সে প্রায় আপনাকে মন্দ বলতো, গালি দিত। আমি নিষেধ করলেও সে কর্ণপাত করতো না। তিরস্কার করলেও সে নিবৃত্ত হতো না। অবশেষে গত রাতে আমি আপনার উল্লেখ করলে সে আপনাকে মন্দ বলতে আরম্ভ করল। আমি একটি অস্ত্র উঠিয়ে তার পেটে রেখে চেপে ধরি, তাতে সে মারা যায়। রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ তোমরা সাক্ষী থাক, ঐ দাসীর রক্তের কোন বিনিময় নেই।
তাহক্বীকঃ সহীহ।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ উসমান শাহহাম (রহঃ)
আলেমদের বক্তব্যঃ শাতিমে রাসুলের একমাত্র শাস্তি কতল
শাতিমে রাসুল বা নবী রাসুল সম্পর্কে সমালোচনা বা কটূক্তিকারীদের ইসলামী বিধানে সর্বোচ্চ শাস্তির বিধান রাখা হয়েছে। নবী মুহাম্মদের অবমাননা বলতে আসলে কী বোঝানো হয়, সেটি বোঝা বড় মুশকিল। কারণ বিভিন্ন ওয়াজে হুজুররা যখন বলেন, নবী মুহাম্মদ জঙ্গি ছিল, ইসলাম জঙ্গিবাদের ধর্ম, তখন মুমিনদের কাছে তা অবমাননা মনে হয় না।তারা সমস্বরে সেইসব ওয়াজ শুনে আল্লাহু আকবর বলে স্লোগান দেন। অথচ একই কথা নাস্তিকরা বললে সেই কথাটি অবমাননা হয়ে যায়। আসুন একটি ওয়াজ শুনি, দেখি এই কথাটি নবী অবমাননা কিনা। উল্লেখ্য, বাংলাদেশের একজন প্রখ্যাত আলেম এই ভিডিওতে নবী মুহাম্মদকে নিজেই জঙ্গি বলে আখ্যায়িত করছেন এবং জঙ্গিবাদের গুরুত্ব এবং মাহাত্ম্য প্রচার করছেন,
আবার ধরুন, নাস্তিকরা যখন বলেন, নবী মুহাম্মদ শিশুকামি বা পেডোফাইল ছিলেন, তখন মুমিনদের কাছে তা অবমাননাকর মনে হয়। একই কথা যখন হুজুরেরা আলহামদুলিল্লাহ সহকারে বলেন, সেই কথাটি শুনে মুমিনেরা সুবহানাল্লাহ পড়েন। তাহলে সমস্যাটি কোথায়? ভেবে দেখুন তো, ৫০ বছরের একজন বৃদ্ধ ৬ বছরেরও ছোট একটি মেয়েকে স্বপ্নে দেখে বিয়ে করার খায়েস করছেন, একে শিশুকামী বা পেডোফাইল ছাড়া আর কী বলা যায়?
আসুন আর একটি ওয়াজ শুনি। নাস্তিকরা যখন বলে, মেরাজের রাতে নবী মুহাম্মদ উম্মে হানীর ঘরে ছিল, সেইসব শুনে মুমিনেরা তাদের ফাঁসি চায়। অথচ একই কথা যখন হাজার হাজার ওয়াজে আলেমগণ বলনে, সেগুলো তারা ভক্তি সহকারে শেয়ার করেন। মাশাল্লাহ বলেন। সমস্যাটি কোথায়?
আহমদুল্লাহর বক্তব্য
আসুন বাংলাদেশের প্রখ্যাত আলেম আহমদুল্লাহর একটি পুরনো ভিডিও দেখে নেয়া যাক,
মতিউর রহমান মাদানি
এবারে আসুন ঐতিহাসিকভাবেই এই নবীর সমালোচকদের খুন করে ফেলা মুসলিমদের মধ্যে একটি সংস্কৃতি, সে সম্পর্কে একটি আলোচনা শুনি,
প্রকাশ্যে বিচারবহির্ভূত হত্যার আহবান
বাংলাদেশে বর্তমান সময়ে কোন রকম লজ্জাশরমের তোয়াক্কা না করে মুমিন মুসলমানরা প্রকাশ্যে জনসভায়, সাংবাদিক সম্মেলনে খুনোখুনি, কল্লা ফেলে দেয়ার আহবান জানাচ্ছে। আসুন তার কিছু নমুনা দেখে নিই,
জামার একটি বোতাম ময়লা বললেও কতল
ইমাম মালিকের মতে, কেউ নবীর জামার একটি বোতাম ময়লা, এই কথা বললে তাকে মেরে ফেলতে হবে। আসুন একটি বই পড়ি [11]

ইযাহুল মুসলিমঃ নবীকে গালি দিলে শাস্তি
এবারে আসুন, সহিহ মুসলিম গ্রন্থের শরাহ গ্রন্থ ইযাহুল মুসলিম থেকে [12] পড়ি,
রাসূল (সা.)-কে গালি দেয়ার হুকুম
মুরতাদ যদি তওবা করে তাহলে তার তওবা কবুল করতে হবে এবং তাকে হত্যা করা যাবে না। তাকে
কিন্তু কোন ব্যক্তি যদি রাসূল (সা.)-কে গালি দেয়ার কারণে মুরতাদ হয়ে যায় তাহলে তার তওবা কবুল হবে না। তওবা কবুল করলেও তাকে হত্যা করতে করতে হবে।
এমনকি কোন ব্যক্তি যদি অন্য কারণে মুরতাদ হয়ে মুরতাদ অবস্থায় রাসূল (সা.)-কে গালি দেয় অতঃপর তওবা করে মুসলমান হয়ে যায় তথাপি তাকে হত্যা করতে হবে। কেননা এটা আল্লাহর একটি দণ্ড বিধান। যা মওকুফ হওয়ার নয়।
উল্লেখ্য যে, কেউ যদি আল্লাহকে গালি দিয়ে পরে তওবা করে তাহলে তার তওবা কবুল হবে। কারণ আল্লাহ্ তা’আলা সমস্ত ত্রুটি থেকে পবিত্র হওয়াটা যুক্তির নিরিখে সুপ্রমাণিত। পক্ষান্তরে রাসূল (সা.)-এর দোষমুক্ত হওয়াটা যুক্তিদ্বারা প্রমাণিত নয় বরং সরাসরি আল্লাহ্ প্রদত্ত ওহী (সংবাদের) ভিত্তিতে প্রমাণিত। সুতরাং আল্লাহর ওহী অস্বীকার করায় এর অপরাধ অনেক বেশি।
-আল ফিকহু আলা মাযাহিবিল আরবা’আ খণ্ড ৫, পৃষ্ঠা ৪২৮-৪২৯


নবীর মানহানির শাস্তি মৃত্যুদণ্ড
এখন আসুন, প্রখ্যাত ইসলামিক স্কলার মাওলানা মুহাম্মদ আবদুল মান্নানের লেখা থেকে এই সম্পর্কিত রেফারেন্সসমূহ দেখে নিই [13]
দলীলাদি শেফা শরীফ: ৩২১ পৃষ্ঠায় উল্লেখ করা হয়েছে— أَجْمَعَ الْعُلَمَاءُ أَنَّ شَاتِمَ النَّبِيِّ ﷺ الْمُنَقِصُ لَهُ كَافِرٌ وَالْوَعِيدُ جَارٍ عَلَيْهِ بِعَذَابِ اللَّهِ تَعَالَى وَمَنْ شَكَ فِي كُفْرِهِ وَعَذَابِهِ فَقَدْ كَفَرَ অর্থাৎ ‘আলিমদের ঐকমত্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছে এ মর্মে যে, হুযূর-ই আক্বদাস সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর শানে গোস্তাখীকারী কাফির এবং তার উপর আল্লাহর শাস্তির হুমকি কার্যকর । তাছাড়া, যে ব্যক্তি এমন লোকের কুফর ও শাস্তিযোগ্য হবার ক্ষেত্রে সন্দেহ করেছে সেও কাফির হয়ে গেছে।” নসীমুর রিয়াদ্ব: ৪র্থ খণ্ড: ৩৮১ পৃষ্ঠায় ইমাম ইবনে হাজর মক্কী থেকে বর্ণিত— যা এরশাদ করা হয়েছে- নবী করীম সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর শানে আক্বদাসে গোস্তাখী পদর্শনকারী কাফির, আর যে ব্যক্তি তার কাফির হওয়ায় সন্দেহ পোষণ করে সেও কাফির । এ মাযহাব আমাদের ইমামগণ প্রমুখেরই । ওয়াজীয-ই ইমাম কির্দারী: ৩য় খণ্ড: পৃ. ৩২১ এ উল্লেখ করা হয়েছে— যে ব্যক্তি, আল্লাহ্রই পানাহ্, মুরতাদ্দ হয়ে যায় তার স্ত্রী হারাম হয়ে যায় । তারপর ইসলাম গ্রহণ করলে তাকে পুনরায় নতুনভাবে বিবাহ করা যাবে । ইতোপূর্বে কুফরী কলেমা বলার পর কৃত সঙ্গমের ফলে যে সন্তান হবে সে হারামী (জারজ) হবে । আর এ ব্যক্তি অভ্যাসগতভাবে কলেমা-ই শাহাদত পড়তে থাকলেও কোন লাভ হবে না; যতক্ষণ না নিজের কুফর থেকে তাওবা করবে । কারণ, মুরতাদ্দ অভ্যাসগতভাবে কলেমা পড়তে থাকলে তার কুফর দূরীভূত হয় না । আর যে লোকটি রসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম অথবা কোন নবীর শানে বেয়াদবী করে, দুনিয়ায় তাওবার পরও তাকে শাস্তি দেওয়া হবে । এমনকি যদি নেশার কারণে বেঁহুশ অবস্থায় বেয়াদবীপূর্ণ কথাবার্তা বলে থাকে, তবুও ক্ষমা করা হবে না । আর উম্মতের সমস্ত আলিমের ‘ইজমা’ (ঐকমত্য) প্রতিষ্ঠিত হয়েছে যে, নবী করীম সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর শানে আক্বদাসে বেয়াদবী প্রদর্শনকারী কাফির । আর এমন কাফির যে, যে ব্যক্তি তার কুফরে সন্দেহ করবে সেও কাফির । ফাল্গুল ক্বাদীর: ৪র্থ খণ্ড: পৃ. ৪০৭-এ আছে— যার অন্তরে রসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর প্রতি বিদ্বেষ থাকে সে মুরতাদ্দ । সুতরাং বেয়াদবী প্রদর্শনকারী তো অধিকতর উত্তম পন্থায় কাফির । আর যদি নেশাবস্থায় বেয়াদবীপূর্ণ শব্দাবলী বকে থাকে তবে তাকেও ক্ষমা করা যাবে না । বাহরুর রা-ইকু: ৫ম খণ্ড, পৃ. ১৩৫-এ হুবহু ওই শব্দগুলো উল্লেখ করে পৃ. ১৩৫-এ বলেছেন— কোন নবীর শানে বেয়াদবী করলে এ-ই বিধান যে, তাকে ক্ষমা করা হবে না । আর প্রমাণিত হবার পর অস্বীকার করলে তা উপকারী হবে না । কারণ, মুরতাদ্দ তার মুরতাদ্দ হবার কথা অস্বীকার করে শাস্তি থেকে বাঁচার জন্যই । তাওবা ওখানেই সাব্যস্ত হয় (স্থিরতা লাভ করে), যেখানে তাওবা গ্রহণ করা হয় । আর নবী করীম সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম, এমনকি যে কোন নবীর শানে বেয়াদবী অন্য কুফরের মতো নয় । তাকে এখানে মোটেই ক্ষমা করা হবে না । আল্লামা মাওলানা খুসরু কৃত দুরুল হুক্কাম: ১ম খণ্ড: পৃ. ২৯৯-এ উল্লেখ করা হয়েছে— যদি কোন ব্যক্তি নিজেকে মুসলমান দাবী করে হুযূর-ই আক্বদাস সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম কিংবা অন্য কোন নবীর শানে গোস্তাখী (বেয়াদবী) করে, তাকে ক্ষমা করা হবে না । আর এ দয়াপ্রাপ্ত উম্মতের সমস্ত আলিমের উপর ইজমা’ হয়েছে যে, সে কাফির । যে ব্যক্তি তার কুফরে সন্দেহ করবে সেও কাফির । গুনিয়াহ্ যুল আহকাম: পৃ. ৩০১-এ উল্লেখ করা হয়েছে— নবী করীম-এর শানে আক্বদাসে বেয়াদবী অন্যান্য কুফরের মতো নয় । প্রত্যেক প্রকারের মুরতাদ্দকে তাওবার পর ক্ষমা করার বিধান রয়েছে; কিন্তু এ মুরতাদ্দের জন্য এর অনুমতি নেই । ‘আল-আশবাহ্ ওয়ান্নাযা-ইর’: ‘আরিদ্দাহ্’ শীর্ষক অধ্যায়ে রয়েছে— নেশার কারণে বেহুঁশ অবস্থায় যদি কারো মুখ থেকে কুফরের কোন কথা বের হয়ে যায়, তাকে, বেহুঁশ হবার কারণে, কাফির বলবে না, কুফরের শাস্তি দেবে না; কিন্তু নবী করীম সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর শানে আক্বদাসে বেয়াদবী করা এমন জঘন্য কুফর যে, নেশার কারণে বেহুঁশ হওয়ার অবস্থায়ও যদি তা সম্পন্ন হয়ে যায়, তবে তাকে ক্ষমা করা যাবে না । আর, আল্লাহরই পানাহ্, মুরতাদ্দ হওয়ার বিধান হচ্ছে- তার স্ত্রী তাৎক্ষণিকভাবে তার বিবাহ্ বন্ধন থেকে বের হয়ে যাবে । আর যদি সে ওই মুরতাদ্দ অবস্থায় মরে যায়, তবে আল্লাহরই পানাহ্, তাকে মুসলমানদের কবরস্থানে দাফন করার অনুমতি নেই, না কোন মিল্লাতধারী, যেমন- ইহুদী কিংবা খ্রিস্টানের কবরস্থানেও । তাকে তো কুকুরের মতো কোন গর্তে নিক্ষেপ করা হবে । মুরতাদ্দের কুফর আসল কাফিরের কুফর অপেক্ষাও নিকৃষ্ট । নবী করীম সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর শানে গোস্তাখী এটা এমন জঘন্য কুফর, যার শাস্তি থেকে দুনিয়ায় তাওবার পরও ক্ষমা হয়না । অন্য কোন নবীর শানে বেয়াদবীরও একই বিধান । ফাতাওয়া-ই খায়রিয়াহ্: কৃত আল্লামা খায়রুদ্দীন রামালী, ১ম খণ্ড: পৃ. ৯৫-এ লিখেছেন— যে ব্যক্তি নবী করীম সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর মহান শানে বেয়াদবী করে, সে মুরতাদ্দ । তার সাথেও ওই আচরণ করা হবে, যা মুরতাদ্দদের সাথে করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে । আর তাকে দুনিয়ায় ক্ষমা করা হবে না এবং উম্মতের সমস্ত আলিমের ইজমা’ অনুসারে, সে কাফির । আর যে ব্যক্তি তার কুফরে সন্দেহ পোষণ করবে সেও কাফির । ‘মাজমা’উল আনহুর’ শরহে ‘মূলতাক্বাল আবহুর’: ১ম খণ্ড: পৃ. ৬১৮ তে আছে— যখন কেউ মুসলমান বলে দাবী করে হুযূর-ই আক্বদাস সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম কিংবা অন্য কোন নবীর শানে বেয়াদবী করে, যদিও নেশাবস্থায় হয়, তাহলে তার তাওবার উপরও দুনিয়ায় তাকে ক্ষমা করা হবে না । আর যে ব্যক্তি এ বেয়াদবী প্রদর্শনকারীর কুফরে সন্দেহ করবে সেও কাফির হয়ে যাবে । ‘যখীরাতুল ওকুবা’: ২৪০ পৃষ্ঠায় আছে— এ মর্মে উম্মতের ইজমা’ হয়েছে যে, আমাদের নবী সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম ও অন্য কোন নবী (আলায়হিস্ সালাতু ওয়াস্সালাম)-এর মানহানি কুফর- কাজে হোক কিংবা কথায় । ‘দুরে মুখতার’-এ আছে— যে ব্যক্তি কলেমা পড়ুয়া হয়ে হুযূর-ই আক্বদাস সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলায়হি ওয়াসাল্লামকে মন্দ বলে অথবা মিথ্যারোপ করে, অথবা কোন দোষ-ত্রুটি আরোপ করে অথবা মানহানি করে সে নিঃসন্দেহে কাফির এবং তার স্ত্রী তার বিবাহ্ বন্ধন থেকে বের হয়ে গেছে । কিতাবুল খারাজ: কৃত, সৈয়্যদুনা আবূ ইয়ূসুফ রাদ্বিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু, পৃ. ১১২ ও ২৪২ এ আছে— ওই বেয়াদবী প্রদর্শনকারী যখন মরে যাবে, তবে তাকে না গোসল দেবে, না কাফন পরাবে, না তার জন্য জানাযার নামায পড়াবে । অবশ্য সে যদি তাওবা করে এবং ইসলামে প্রবেশ করে, তারপর মৃত্যুমুখে পতিত হয়; তাহলে তাকে গোসল ও কাফন দেওয়া হবে, জানাযার নামায পড়া হবে এবং মুসলমানদের কবরস্থানে দাফনও করা যাবে । ‘তান্ডীরুল আবসার’: প্রত্যেক মুরতাদ্দের তাওবা কবুল হয়, কিন্তু কোন নবীর শানে বেয়াদবী প্রদর্শনকারী এমন (জঘন্য) কাফির যে, দুনিয়ায় শাস্তি থেকে রক্ষা করার জন্য তার তাওবা গ্রহণযোগ্য নয় । ।। দুই ।। গাযালী-ই যমান আল্লামা সাইয়্যেদ আহমদ সা’ঈদ কাযেমী লিখেছেন— কিতাব, সুন্নাহ্, ইজমা’-ই উম্মাহ্ ও দ্বীনের ইমামগণের স্পষ্ট বর্ণনাদি অনুসারে পরম সম্মানিত নবী ও রসূলের মানহানির শাস্তি একমাত্র মৃত্যুদণ্ড । ক্বোরআন-ই করীম এ অপরাধের শাস্তি মৃত্যুদণ্ড বলেছে । রসূল করীমের শানে বেয়াদবী প্রদর্শনকারীর শাস্তি মৃত্যুদণ্ডই । আব্দুল্লাহ ইবনে খাত্বাল হুযূর-ই আক্রামের মানহানি করে বেড়াতো । ঐতিহাসিক মক্কা বিজয়ের দিন হুযূর-ই করীম এরশাদ করলেন, اقتلوه (তাকে মৃত্যুদণ্ড দাও) । তাকে কা’বা শরীফের গিলাফ থেকে বের করে এনে মাক্বাম-ই ইব্রাহীম ও যমযমের মধ্যভাগে তার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হলো । উপসংহার: অধিকাংশ ফক্বীহ্ ফয়সালা হলো, রাসূলে পাক সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর শানে যারা কটুক্তি করে, তাঁর অবমাননা বা মানহানি করে, তারা কাফের-মুরতাদ্দ । তাদের শাস্তি মৃত্যুদণ্ড । তারা তওবা করলেও তা গ্রহণযোগ্য হবে না । রসূলে পাকের শানে বেয়াদবী প্রদর্শনকারীর বিরুদ্ধে ‘ব্লাসফেমী’ আইন পাস করা এবং কঠোরভাবে এমন জঘন্য অপরাধের পথ চিরদিনের জন্য বন্ধ করা এখন সময়ের দাবী; মুসলিম জাতির প্রাণের দাবী ।


















মব জাস্টিস ও সামাজিক বর্বরতার উসকানি
শাতিমে রাসুলের শাস্তির নামে প্রচলিত এই কঠোর বিধান এবং আলেমদের পক্ষ থেকে প্রকাশ্যে হত্যার আহ্বান সরাসরি একটি রাষ্ট্রকে ‘মব জাস্টিস’ বা গণপিটুনির অভয়ারণ্যে পরিণত করে। সমাজবিজ্ঞানী থমাস হবস তার ‘লেভিয়াথান’ গ্রন্থে সতর্ক করেছিলেন যে, যখন সাধারণ মানুষ আইন নিজের হাতে তুলে নেয়, তখন সেখানে কোনো নিরাপত্তা থাকে না এবং জীবন হয়ে ওঠে “একাকী, দরিদ্র, নোংরা, পাশবিক ও স্বল্পায়ু” [3]। ব্লাসফেমি বা ধর্ম অবমাননার মতো একটি আপেক্ষিক ও আবেগীয় বিষয়কে যখন মৃত্যুদণ্ডযোগ্য অপরাধ হিসেবে প্রচার করা হয়, তখন বিচারিক প্রক্রিয়া এবং প্রমাণের তোয়াক্কা না করেই উন্মত্ত জনতা যে কাউকে অভিযুক্ত করে হত্যা করতে প্রলুব্ধ হয়। এটি মূলত আধুনিক বিচারব্যবস্থার মূল স্তম্ভ ‘নির্দোষ হওয়ার পূর্বানুমান’ (Presumption of Innocence) নীতিকে সম্পূর্ণ ধ্বংস করে দেয়।
যৌক্তিক বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এই ধরনের আইন মূলত ব্যক্তিগত শত্রুতা বা রাজনৈতিক প্রতিহিংসা চরিতার্থ করার একটি শক্তিশালী অস্ত্র। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী হান্না আরেন্ট তার ‘দ্য অরিজিনস অফ টোটালিটারিয়ানিজম’ গ্রন্থে দেখিয়েছেন যে, যখন কোনো একটি পবিত্র আদর্শের দোহাই দিয়ে আইন বহির্ভূত সহিংসতাকে বৈধতা দেওয়া হয়, তখন তা একটি অসভ্য ও বর্বর সমাজের জন্ম দেয় যেখানে যুক্তি নয়, বরং গায়ের জোরই প্রধান হয়ে দাঁড়ায় [14]। যখন কোনো মৌলবাদী গোষ্ঠী বা সাধারণ মানুষ বিশ্বাস করে যে তারা “ঐশ্বরিক বিচার” কার্যকর করছে, তখন তারা প্রচলিত রাষ্ট্রীয় আইনকে অবজ্ঞা করতে শুরু করে। এর ফলে সমাজে এক প্রকার ‘নৈরাজ্যবাদ’ বা অ্যানার্কি তৈরি হয়, যা আধুনিক সভ্য রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বের জন্য চরম হুমকি।
একটি সমাজে এই ধরনের সংস্কৃতির উপস্থিতির ফলাফল অত্যন্ত ভয়াবহ:
দার্শনিক জন স্টুয়ার্ট মিলের মতে, যে সমাজ তার সদস্যদের ব্যক্তিগত মতামত বা ভিন্নমতের কারণে শারীরিক আঘাত বা মৃত্যু নিশ্চিত করে, সেই সমাজ আসলে প্রগতির পথে নয়, বরং মধ্যযুগীয় বর্বরতার দিকে ধাবিত হচ্ছে [15]। বিচারবহির্ভূত হত্যার এই ইসলামিক বৈধতা মূলত সমাজকে একটি আইনি কাঠামো থেকে সরিয়ে এক ভয়ংকর জঙ্গলের নিয়মে (Law of the Jungle) আচ্ছন্ন করে দেয়, যেখানে সত্যের চেয়ে অন্ধ আবেগ এবং প্রমাণের চেয়ে অভিযোগই চূড়ান্ত দণ্ড হিসেবে বিবেচিত হয়।
উপসংহারঃ বুদ্ধিবৃত্তিক অন্ধকার ও অসহিষ্ণুতার সংস্কৃতি
প্রবন্ধের আলোচনা ও উপস্থাপিত দলিলসমূহ থেকে এটি দিবালোকের মতো স্পষ্ট যে, ‘শাতিমে রাসুল’ বা নবী অবমাননার আইনটি মূলত ভিন্নমত দমন করার একটি প্রাতিষ্ঠানিক হাতিয়ার। ইমাম মালিকের মতো ফকীহদের উদ্ধৃতি, যেখানে নবীর জামার বোতাম ময়লা বললেও হত্যার বিধান দেওয়া হয়েছে, তা প্রমাণ করে যে এই আইনটি কোনো বিচারিক যুক্তির ওপর নয় বরং চরম আবেগ ও অন্ধ আনুগত্যের ওপর প্রতিষ্ঠিত। আধুনিক মানবাধিকারের বৈশ্বিক মানদণ্ড অনুযায়ী, প্রতিটি মানুষের তার বিশ্বাস বা অবিশ্বাস ব্যক্ত করার অধিকার রয়েছে; অধিকার আছে তার যুক্তি ও বুদ্ধি অনুসারে যেকোন ব্যক্তি বা মতাদর্শের সমালোচনা করার। কিন্তু ইসলামী শরীয়ত এই অধিকারকে কেবল ‘কতল’ বা হত্যার মাধ্যমে স্তব্ধ করে দিতে চায়।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, এই মধ্যযুগীয় আইনগুলো কেবল কিতাবের পাতায় সীমাবদ্ধ নেই, বরং বাংলাদেশের মতো দেশগুলোতেও প্রকাশ্যে বিচারবহির্ভূত হত্যার উসকানি হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। যখন শিক্ষিত ও প্রখ্যাত আলেমরাও নবী অবমাননার নামে হত্যার সংস্কৃতিকে বৈধতা দেন, তখন তা সমাজে এক ভয়ংকর অরাজকতা ও অসহিষ্ণুতার বীজ বপন করে। এটি কেবল নাস্তিক বা সমালোচকদের জীবনের ঝুঁকি তৈরি করে না, বরং সমগ্র সমাজকে একটি বুদ্ধিবৃত্তিক অন্ধকারের দিকে ঠেলে দেয়, যেখানে সত্য অনুসন্ধান বা যুক্তিনির্ভর বিতর্কের কোনো স্থান নেই।
একটি সভ্য সমাজের ভিত্তি হওয়া উচিত মুক্তচিন্তা এবং পরমতসহিষ্ণুতা। কিন্তু নবীর মানহানির নামে মৃত্যুদণ্ডের এই বিধান আধুনিক গণতন্ত্র ও সমানাধিকারের ধারণার সাথে সম্পূর্ণ বেমানান। যতক্ষণ পর্যন্ত ধর্মের নামে এই ধরনের বর্বর শাস্তির বিধান টিকে থাকবে, ততক্ষণ পর্যন্ত কোনো সমাজই সত্যিকার অর্থে প্রগতিশীল বা মানবিক হয়ে উঠতে পারবে না। তাই বর্তমান সময়ের দাবি হলো, এই ধরনের বৈষম্যমূলক ও প্রাণঘাতী আইনসমূহ রদ করা এবং প্রতিটি মানুষের নির্ভয়ে চিন্তা করার ও কথা বলার অধিকার নিশ্চিত করা।
তথ্যসূত্রঃ
- নবী মুহাম্মদ ছিলেন ধর্ম অবমাননাকারী ↩︎
- John Locke, “Two Treatises of Government”, 1689 ↩︎
- Thomas Hobbes, “Leviathan”, 1651 1 2
- Immanuel Kant, “An Answer to the Question: What is Enlightenment?”, 1784 ↩︎
- UN General Assembly, “International Covenant on Civil and Political Rights”, Article 19, 1966 ↩︎
- সুনান আবূ দাউদ (তাহকিককৃত), আল্লামা আলবানী একাডেমী, হাদিসঃ ৪৩৬১ ↩︎
- সুনান আবূ দাউদ (তাহকিককৃত), আল্লামা আলবানী একাডেমী, খণ্ড ৫, পৃষ্ঠা ২৯০, ২৯১ ↩︎
- সুনান আবূ দাউদ, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, হাদিসঃ ৪৩১০ ↩︎
- বুলুগুল মারাম, হাদিসঃ ১২০৪ ↩︎
- সুনান আন-নাসায়ী, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, হাদিসঃ ৪০৭১ ↩︎
- প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি অসাল্লামে অবমাননার শাস্তি, পৃষ্ঠা ৫১ ↩︎
- ইযাহুল মুসলিম, মাওলানা আবু বকর সিরাজী, পৃষ্ঠা ৪০৮ ↩︎
- নবীর মানহানির শাস্তি মৃত্যুদণ্ড, মাওলানা মুহাম্মদ আবদুল মান্নান, পৃষ্ঠা ৭-১০, ১২-১৩ ↩︎
- Hannah Arendt, “The Origins of Totalitarianism”, 1951 ↩︎
- John Stuart Mill, “On Liberty”, 1859 ↩︎
