ভূমিকা
সপ্তম শতকের আরবে মুহাম্মদ তাঁর পূর্বপুরুষদের প্রচলিত ধর্মবিশ্বাস, দেবতা ও ধর্মীয় রীতির বিরোধিতা করে ইসলাম প্রচার করেছিলেন। প্রচলিত ধর্মের সমালোচনার সেই ইতিহাসের সঙ্গে পরবর্তী ইসলামি আইনশাস্ত্রে নবীর সমালোচনার জন্য মৃত্যুদণ্ড নির্ধারণের বিধানের একটি মৌলিক সংঘাত রয়েছে। পূর্বপুরুষদের ধর্মবিশ্বাস প্রত্যাখ্যান করার স্বাধীনতা যে ধর্মীয় আন্দোলনের সূচনায় গুরুত্বপূর্ণ ছিল, সেই আন্দোলনের প্রতিষ্ঠাতাকে পরে সমালোচনার ঊর্ধ্বে স্থান দেওয়ার আইনগত পরিণতি অনুসন্ধান ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতার প্রশ্নে গভীর অসংগতি সৃষ্টি করে। [1]
ধ্রুপদি ইসলামি ফিকহে ‘শাতিমে রাসুল’ বলতে নবীকে গালিগালাজ করা, তাঁর মর্যাদা ক্ষুণ্ণ করা বা তাঁকে হেয় করার বিভিন্ন ধরনের বক্তব্য বোঝানো হয়েছে। এসব বক্তব্যের জন্য মৃত্যুদণ্ড, তওবার পরও দণ্ড বহাল থাকা, জিম্মি অমুসলিমের নিরাপত্তা প্রত্যাহার এবং শাস্তি কার্যকরের ক্ষমতা নিয়ে ফকিহরা আলোচনা করেছেন। মুহাম্মদের জীবদ্দশায় নবী অবমাননার অভিযোগে সংঘটিত একটি হত্যার পর তিনি হত্যাকারীকে দায়মুক্তি দেন—এই ঘটনাও হাদিসে সংরক্ষিত। অভিযোগের সত্যতা ও তার ভিত্তিতে প্রাণদণ্ড দেওয়ার অধিকার, বিচার ছাড়াই হত্যার দায়মুক্তি এবং আধুনিক মানবাধিকারের সঙ্গে এসব বিধানের সংঘাত এই আলোচনার কেন্দ্রীয় বিষয়।
অন্ধ সাহাবির দাসী হত্যার হাদিস এবং তার বিভিন্ন বর্ণনার বিশদ আলোচনা রয়েছে গালিদাতাকে নির্মমভাবে হত্যা এবং নবীর সমর্থন প্রবন্ধে। কা’ব ইবনে আশরাফ ও আবু রাফের হত্যাকাণ্ডসহ গুপ্তহত্যার পৃথক ঐতিহাসিক বিবরণ রয়েছে নবী মুহাম্মদের গুপ্তহত্যার তালিকা প্রবন্ধে। নবী অবমাননার অভিযোগে মৃত্যুদণ্ডের ফিকহি কাঠামো বুঝতে এই ঘটনাগুলোর পাশাপাশি অপরাধের সংজ্ঞা, তওবার পরিণতি, অমুসলিমের নিরাপত্তাচুক্তি এবং দণ্ড কার্যকরের ক্ষমতার বিধান গুরুত্বপূর্ণ।
বিচার বিভাগীয় সার্বভৌমত্ব বনাম ধর্মীয় আবেগ
আধুনিক রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অন্যতম মূল ভিত্তি হলো ‘আইনের শাসন’ (Rule of Law), যেখানে অপরাধের সংজ্ঞা এবং তার বিচারিক প্রক্রিয়া আবেগ বা ধর্মীয় অনুভূতির পরিবর্তে সর্বজনীন আইনি কাঠামোর ওপর নির্ভরশীল। দার্শনিক জন লকের ‘সোশ্যাল কন্ট্রাক্ট’ তত্ত্ব অনুযায়ী, একটি সভ্য সমাজে নাগরিকরা তাদের ব্যক্তিগত প্রতিহিংসা চরিতার্থ করার অধিকার রাষ্ট্রের হাতে তুলে দেয় যাতে নিরপেক্ষ বিচার নিশ্চিত করা যায় [7]। কিন্তু ‘শাতিমে রাসুল’ বা নবী অবমাননার নামে যখন বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডকে উৎসাহিত করা হয়, তখন তা সরাসরি রাষ্ট্রের বিচারিক সার্বভৌমত্বকে চ্যালেঞ্জ করে। সমাজবিজ্ঞানী থমাস হবসের মতে, যখন ব্যক্তি নিজেই বিচারকের ভূমিকা পালন করতে শুরু করে, তখন সমাজ ‘প্রাকৃতিক অবস্থায়’ (State of Nature) ফিরে যায়, যা মূলত একটি বিশৃঙ্খল ও সহিংস যুদ্ধাবস্থা ছাড়া আর কিছুই নয় [8]।
যৌক্তিক দৃষ্টিকোণ থেকে, ‘অবমাননা’ একটি আপেক্ষিক শব্দ। যা একজনের কাছে ভক্তি, তা অন্যজনের কাছে যৌক্তিক সমালোচনা হতে পারে। আধুনিক লিবারেলিজমের প্রবক্তা ইমানুয়েল কান্ট মনে করতেন, মানুষের বিচারবুদ্ধি বা ‘রিজন’ (Reason) ব্যবহারের স্বাধীনতা থাকা উচিত এবং কোনো কর্তৃত্বই এই বুদ্ধিবৃত্তিক অনুসন্ধানকে সেন্সর করার অধিকার রাখে না [9]। যখন একটি সমাজ কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তির সমালোচনাকে মৃত্যুদণ্ডযোগ্য অপরাধ মনে করে, তখন সেখানে ‘ব্লাসফেমি’ আইনকে রাজনৈতিক বা ব্যক্তিগত শত্রুতা উদ্ধারের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করার সুযোগ তৈরি হয়। সমাজবিজ্ঞানী হার্বার্ট স্পেনসারের তত্ত্ব অনুযায়ী, যে সমাজ যত বেশি অসহিষ্ণু, সেই সমাজের বিবর্তন তত দ্রুত থমকে যায়। একটি সমাজে যদি ‘পবিত্রতা’র দোহাই দিয়ে প্রশ্ন করার পথ বন্ধ করে দেওয়া হয়, তবে সেখানে বুদ্ধিবৃত্তিক দাসত্ব জেঁকে বসে।
আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনে মতপ্রকাশের স্বাধীনতার ভিত্তি রয়েছে International Covenant on Civil and Political Rights (ICCPR)-এর ১৯ নম্বর অনুচ্ছেদে। অনুচ্ছেদটি মতামত রাখার স্বাধীনতা এবং তথ্য ও ধারণা অনুসন্ধান, গ্রহণ ও প্রচারের অধিকার স্বীকার করে। প্রকাশের স্বাধীনতায় নির্দিষ্ট আইনি সীমাবদ্ধতার সুযোগ রয়েছে—অন্যের অধিকার ও সুনাম রক্ষা, জাতীয় নিরাপত্তা, জনশৃঙ্খলা, জনস্বাস্থ্য এবং নৈতিকতার সুনির্দিষ্ট প্রয়োজনের জন্য। কিন্তু কেবল কোনো ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব বা ধর্মমতকে অসম্মান করা হয়েছে—এই কারণে মতামতদাতাকে প্রাণদণ্ড দেওয়া ওই অধিকারের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। বিশেষভাবে ICCPR-এর অনুচ্ছেদ ২০(২) জাতীয়, বর্ণগত অথবা ধর্মীয় বিদ্বেষের এমন প্রচার নিষিদ্ধ করতে বলে, যা বৈষম্য, শত্রুতা বা সহিংসতার উসকানি সৃষ্টি করে; ধর্মের সমালোচনা এবং মানুষকে আক্রমণের উসকানি এক অপরাধ নয়। [10]
জাতিসংঘ মানবাধিকার কমিটির ২০১১ সালের General Comment No. 34-এর ৪৮ নম্বর অনুচ্ছেদ ধর্ম অবমাননা আইনের বিষয়ে আরও সরাসরি সিদ্ধান্ত দিয়েছে। সেখানে ধর্ম বা বিশ্বাসব্যবস্থার প্রতি অসম্মান প্রদর্শন নিষিদ্ধকারী আইনকে—নির্দিষ্ট বিদ্বেষমূলক সহিংসতার উসকানির পরিস্থিতি ছাড়া—ICCPR-এর সঙ্গে অসংগত বলা হয়েছে। কোনো আইন এক ধর্মকে অন্য ধর্মের চেয়ে বেশি সুরক্ষা দিতে পারে না এবং ধর্মীয় নেতাদের সমালোচনা বা ধর্মীয় মতবাদ সম্পর্কে আলোচনা বন্ধ করার জন্যও ব্যবহার করা যায় না। এই মানদণ্ড শাতিমে রাসুলের বিধানের সঙ্গে মৌলিক সংঘাত সৃষ্টি করে: যে বক্তব্যের জন্য ধ্রুপদি ফিকহে মৃত্যুদণ্ড আলোচিত, তার বড় অংশই আধুনিক মানবাধিকার আইনে সুরক্ষিত সমালোচনা ও মতপ্রকাশের অন্তর্ভুক্ত। [11]
including blasphemy laws, are incompatible with the Covenant, except in the specific circumstances envisaged in article 20, paragraph 2, of the Covenant.
বাংলা অনুবাদ: ব্লাসফেমি আইনসহ এ ধরনের নিষেধাজ্ঞা এই মানবাধিকার চুক্তির সঙ্গে অসংগত, তবে চুক্তির ২০ নম্বর অনুচ্ছেদের ২ উপ-অনুচ্ছেদে নির্ধারিত বিশেষ পরিস্থিতি ব্যতীত।
এই নীতির মূল বিষয় হলো, ব্যক্তির অধিকার এবং ধর্মীয় মতবাদের সম্মান এক নয়। ধর্মে বিশ্বাসী মানুষ বৈষম্য, হুমকি ও সহিংসতা থেকে সুরক্ষা পাবেন; কিন্তু তাঁদের বিশ্বাস, ধর্মগ্রন্থ, ধর্মীয় নেতা ও প্রতিষ্ঠানের সমালোচনা নিষিদ্ধ করার অধিকার সেই সুরক্ষার অংশ নয়। রাষ্ট্র যখন ধর্মীয় মর্যাদার প্রতি অসম্মানকে প্রাণদণ্ডযোগ্য অপরাধ বানায়, তখন বিশ্বাসকে আইনগত সমালোচনার ঊর্ধ্বে তুলে ধরে এবং ভিন্নমতাবলম্বীর জীবন ও স্বাধীনতাকে হুমকির মুখে ফেলে।
মতপ্রকাশের স্বাধীনতা সম্পর্কে বহুল প্রচলিত উক্তিটি—“আমি তোমার বক্তব্যের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করি, কিন্তু তোমার কথা বলার অধিকার রক্ষার জন্য জীবন দিতেও প্রস্তুত”—ভলতেয়ারের নিজের লেখা নয়। লেখিকা ইভলিন বিট্রিস হল ১৯০৬ সালে The Friends of Voltaire গ্রন্থে ভলতেয়ারের অবস্থান ব্যাখ্যা করতে এই বাক্যটি লিখেছিলেন। বাক্যটির রাজনৈতিক ও নৈতিক তাৎপর্য অক্ষত: অন্যের মত ভুল, আপত্তিকর কিংবা অপমানজনক মনে হলেও তাকে হত্যার ভয় দেখিয়ে নীরব করা যায় না। যে আইনে কোনো ধর্মীয় ব্যক্তিত্বের সমালোচনা বা বিদ্রূপের অভিযোগে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়, সেই আইন নিজের ধর্মীয় সত্য প্রতিষ্ঠার বদলে ভিন্নমত প্রকাশের অস্তিত্বকেই অস্বীকার করে। [12]
গালিদাতাকে নির্মমভাবে হত্যা এবং নবীর সমর্থন
ইসলামী দণ্ডবিধিতে ‘শাতিমে রাসুল’ বা নবী অবমাননাকারীর শাস্তির স্বরূপ বুঝতে হলে নবীর জীবদ্দশায় ঘটে যাওয়া এই চাঞ্চল্যকর ঘটনাটি বিশ্লেষণ করা জরুরি। এটি কেবল একটি সাধারণ হত্যাকাণ্ড নয়, বরং ইসলামী আইনের ইতিহাসে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের একটি আইনি ভিত্তি (Legal Precedent)।
হাদিসগুলোর বিবরণ অনুযায়ী, জনৈক অন্ধ সাহাবীর একজন ‘উম্মু ওয়ালাদ’ (যার গর্ভে মনিবের সন্তান জন্মেছে) দাসী ছিল। সেই দাসীটি নবীর সমালোচনা করতো এবং তাকে গালি দিতো। অন্ধ লোকটি তাকে বারবার নিষেধ করা সত্ত্বেও সে বিরত হয়নি। একদিন গভীর রাতে যখন সেই দাসীটি পুনরায় নবীর অবমাননা শুরু করে, তখন সেই অন্ধ সাহাবী একটি ধারালো ছোরা তার পেটে ঢুকিয়ে দেয় এবং শরীরের সমস্ত শক্তি দিয়ে চেপে ধরে তাকে নির্মমভাবে হত্যা করে। এই হত্যাকাণ্ডের ভয়াবহতা এতটাই ছিল যে, বর্ণনামতে নিহত মহিলার দু’পায়ের মাঝখানে তার গর্ভস্থ শিশুটি রক্তে রঞ্জিত অবস্থায় পতিত হয়।
পরদিন সকালে বিষয়টি নবী মুহাম্মদের গোচরীভূত হলে তিনি অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে হত্যাকারীকে খুঁজে বের করার আদেশ দেন। তিনি আল্লাহর কসম খেয়ে বলেন, হত্যাকারী যেন জনসম্মুখে দাঁড়ায়। অন্ধ সাহাবী প্রকম্পিত অবস্থায় সামনে এসে যখন খুনের দায় স্বীকার করেন এবং খুনের কারণ হিসেবে ‘নবীর অবমাননা’র কথা উল্লেখ করেন, তখন মুহাম্মদের প্রতিক্রিয়া ছিল লক্ষ্য করার মতো। তিনি সেই ব্যক্তিকে কোনো প্রকার শাস্তি দেওয়া বা তিরস্কার করা তো দূরের কথা, বরং জনসমক্ষে ঘোষণা করেন— “তোমরা সাক্ষী থাকো, এই মহিলার রক্ত বৃথা বা মূল্যহীন (Hadar) গেল।”
মুহাম্মদের সামনে হত্যাকারীর স্বীকারোক্তি এবং তাঁর রায়—এই দুটি ধাপেই হাদিসটির বিচারিক তাৎপর্য স্পষ্ট। দাসীটি মুহাম্মদকে গালি দিত বলে হত্যাকারী দাবি করেন; হত্যার আগে কোনো আদালতের বিচার, স্বাধীন সাক্ষ্য গ্রহণ কিংবা নিহত নারীর আত্মপক্ষ উপস্থাপনের সুযোগ বর্ণনায় নেই। হত্যার পরে মুহাম্মদ তার রক্তকে ‘হাদার’ বা ক্ষতিপূরণহীন ঘোষণা করেন। অর্থাৎ অভিযোগকারীর একক সিদ্ধান্তে সম্পন্ন একটি হত্যাকাণ্ড পরবর্তী ঘোষণা দ্বারা দায়মুক্তি পেয়েছে। সেই দৃষ্টান্তের নৈতিক ও আইনগত সমস্যা নিহত ব্যক্তির বক্তব্যের সত্যতা যাচাই না করেই তার প্রাণ নেওয়া এবং হত্যাকারীর বিরুদ্ধে শাস্তি বা দিয়াতের ব্যবস্থা না হওয়া। [13]
পরবর্তী ফিকহে শাস্তি কার্যকরের ক্ষমতা নিয়ে পৃথক বিধান পাওয়া যায়। ইসলামকিউএর ২২৮৪৮২ নম্বর ফতোয়া কাসানির বাদায়ি আস-সানায়ি, মালিকি মাওয়াহিবুল জলিল, শাফেয়ি ইআনাতুত তালিবিন এবং হাম্বলি আল-মুগনি উদ্ধৃত করে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের এখতিয়ার শাসক বা বিচারকের বলে জানিয়েছে। এর ফলে দুটি বাস্তব তথ্য একই সঙ্গে প্রতিষ্ঠিত হয়: মুহাম্মদের সামনে সংঘটিত নির্দিষ্ট হত্যাকাণ্ড পরবর্তীতে দায়মুক্তি পেয়েছিল, এবং পরবর্তী ফিকহি সাহিত্যে সাধারণ ব্যক্তির হাতে দণ্ড কার্যকরের এখতিয়ারকে সীমাবদ্ধ করা হয়েছে। কিন্তু শাস্তির প্রক্রিয়া নিয়ে মতভেদ বা ক্ষমতা নির্ধারণের বিধান নবীকে গালি দেওয়ার জন্য মৃত্যুদণ্ড নির্ধারণের মৌলিক নৈতিক সমস্যাকে দূর করে না। [14]
সুনান আবূ দাউদ (তাহকিককৃত)
পাবলিশারঃ আল্লামা আলবানী একাডেমী
অধ্যায়ঃ ৩৩/ অপরাধ ও তার শাস্তি
পরিচ্ছদঃ ২. যে নবী (ﷺ)-কে গালি দেয় তার সম্পর্কিত বিধান
৪৩৬১। ইবনু আব্বাস (রাঃ) সূত্রে বর্ণিত। জনৈক অন্ধ লোকের একটি উম্মু ওয়ালাদ’ ক্রীতদাসী ছিলো। সে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে গালি দিতো এবং তাঁর সম্পর্কে মন্দ কথা বলতো। অন্ধ লোকটি তাকে নিষেধ করা সত্ত্বেও সে বিরত হতো না। সে তাকে ভৎর্সনা করতো; কিন্তু তাতেও সে বিরত হতো না। এক রাতে সে যখন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে গালি দিতে শুরু করলো এবং তাঁর সম্পর্কে মন্দ কথা বলতে লাগলো, সে একটি একটি ধারালো ছোরা নিয়ে তার পেটে ঢুকিয়ে তাতে চাপ দিয়ে তাকে হত্যা করলো। তার দু’ পায়ের মাঝখানে একটি শিশু পতিত হয়ে রক্তে রঞ্জিত হলো। ভোরবেলা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঘটনাটি অবহিত হয়ে লোকজনকে সমবেত করে বলেনঃ আমি আল্লাহর কসম করে বলছিঃ যে ব্যক্তি একাজ করেছে, সে যদি না দাঁড়ায় তবে তার উপর আমার অধিকার আছে।
একথা শুনে অন্ধ লোকটি মানুষের ভিড় ঠেলে কাঁপতে কাঁপতে সামনে অগ্রসর হয়ে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সামনে এসে বসে বললো, হে আল্লাহর রাসূল! আমি সেই নিহত দাসীর মনিব। সে আপনাকে গালাগালি করতো এবং আপনার সম্পর্কে অপমানজনক কথা বলতো। আমি নিষেধ করতাম; কিন্তু সে বিরত হতো না। আমি তাকে ধমক দিতাম; কিন্তু সে তাতেও বিরত হতো না। তার গর্ভজাত মুক্তার মতো আমার দু’টি ছেলে আছে, আর সে আমার খুব প্রিয়পাত্রী ছিলো। গত রাতে সে আপনাকে গালাগালি শুরু করে এবং আপনার সম্পর্কে অপমানজনক কথা বললে, আমি তখন একটি ধারালো ছুরি নিয়ে তার পেটে স্থাপন করে তাতে চাপ দিয়ে তাকে হত্যা করে ফেলি। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ তোমরা সাক্ষী থাকো, তার রক্ত বৃথা গেলো।(1)
সহীহ।
(1). নাসায়ী।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)

সুনান আবূ দাউদ (ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
৩৩/ শাস্তির বিধান
পরিচ্ছেদঃ ২. নবী (ﷺ) এর মর্যাদাহানিকারী ব্যক্তির শাস্তি সম্পর্কে।
৪৩১০. আব্বাদ ইব্ন মূসা (রহঃ) …. ইব্ন আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেনঃ কোন এক অন্ধ ব্যক্তির একটি দাসী ছিল। সে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর শানে বেয়াদবিসূচক কথাবার্তা বলতো। সে অন্ধ ব্যক্তি তাকে এরূপ করতে নিষেধ করতো, কিন্তু সে তা মানতো না। সে ব্যক্তি তাকে ধমকাতো, তবু সে তা থেকে বিরত হতো না। এমতাবস্থায় এক রাতে যখন সে দাসী নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর শানে অমর্যাদাকর কথাবার্তা বলতে থাকে, তখন ঐ অন্ধ ব্যক্তি একটি ছোরা নিয়ে তার পেটে প্রচন্ড আঘাত করে, যার ফলে সে দাসী মারা যায়। এ সময় তার এক ছেলে তার পায়ের উপর এসে পড়ে, আর সে যেখানে বসে ছিল, সে স্থানটি রক্তাপ্লুত হয়ে যায়।
পরদিন সকালে এ ব্যাপারে যখন রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট আলোচনা হয়, তখন তিনি সকলকে একত্রিত করে বলেনঃ আমি আল্লাহ্র নামে শপথ করে এ ঘটনার সত্যতা সম্পর্কে জানতে চাই এবং ইহা তার জন্য আমার হক স্বরূপ। তাই, যে ব্যক্তি তাকে হত্যা করেছে, সে যেন দাঁড়িয়ে যায়। সে সময় অন্ধ লোকটি লোকদের সারি ভেদ করে প্রকম্পিত অবস্থায় নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সামনে গিয়ে বসে পড়ে এবং বলেঃ ইয়া রাসূলাল্লাহ্! আমি তার হন্তা।
সে আপনার সম্পর্কে কটুক্তি ও গালি-গালাজ করতো। আমি তাকে এরূপ করতে নিষেধ করতাম ও ধমকাতাম। কিন্তু সে তার প্রতি কর্ণপাত করতো না। ঐ দাসী থেকে আমার দু’টি সন্তান আছে, যারা মনি-মুক্তা সদৃশ এবং সেও আমার প্রিয় ছিল। কিন্তু গত রাতে সে যখন পুনরায় আপনার সম্পর্কে কটুক্তি গাল-মন্দ করতে থাকে, তখন আমি আমার উপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলি এবং ছোরা দিয়ে তার পেটে প্রচন্ড আঘাত করে তাকে হত্যা করি। তখন নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ তোমরা সাক্ষী থাক যে, ঐ দাসীর রক্ত ক্ষতিপূরণের অযোগ্য বা মূল্যহীন।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আবদুল্লাহ ইবনু আব্বাস (রাঃ)
বুলুগুল মারাম
পর্ব – ৯ঃ অপরাধ প্রসঙ্গ
পরিচ্ছেদঃ ৪. সম্পদ রক্ষার্থে নিহত হওয়া ব্যক্তি প্রসঙ্গে – নাবী (ﷺ) এর নিন্দাকারীদেরকে হত্যা করা আবশ্যক
১২০৪। ইবনু আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত;কোন এক অন্ধ সাহাবীর একটা সন্তানের মাতা দাসী ছিল, সে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে গালি দিত এবং তাঁর প্রসঙ্গে অশোভনীয় মন্তব্য করত। সাহাবী তাকে নিষেধ করতেন কিন্তু সে বিরত হত না। এক রাত্রে অন্ধ সাহাবী (তার এরূপ দুব্যবহারে অতিষ্ঠ হয়ে) কুড়ালি জাতীয় এক অস্ত্র দিয়ে ঐ দাসীর পেটে বাসিয়ে দেন ও তার উপর বসে যান ও তাকে হত্যা করে ফেললেন। এ সংবাদ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিকটে পৌছালে তিনি বলেন: তোমরা সাক্ষী থাক, এ খুন বাতিল এ জন্য কোন খেসারত দিতে হবে না।[1]
[1] আবূ দাউদ ৪৩৬১, নাসায়ী ৪০৭০।
ইকরিমাহ (রহঃ) হতে। তিনি বলেন, ‘আলী (রাঃ)-এর কাছে একদল ফিন্দীককে (নাস্তিক ও ধর্মত্যাগীকে) আনা হল। তিনি তাদেরকে আগুন দিয়ে জ্বালিয়ে দিলেন। এ ঘটনা ইবনু আব্বাস (রাঃ)-এর কাছে পৌছলে তিনি বললেন, আমি কিন্তু তাদেরকে পুড়িয়ে ফেলতাম না। কেননা, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিষেধাজ্ঞা আছে যে, তোমরা আল্লাহর শাস্তি দ্বারা শাস্তি দিও না। বরং আমি তাদেরকে হত্যা করতাম। কারণ, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নির্দেশ আছে ……………. অতঃপর উপরোক্ত হাদীসটি বর্ণনা করলেন।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আবদুল্লাহ ইবনু আব্বাস (রাঃ)
সুনান আন-নাসায়ী (ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
৩৮/ হত্যা অবৈধ হওয়া
পরিচ্ছেদঃ ১৬. রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-কে মন্দ বলার শাস্তি
৪০৭১. উসমান ইবন আবদুল্লাহ (রহঃ) … উসমান শাহহাম (রহঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি এক অন্ধ লোকের চালক ছিলাম। একদা তাকে নিয়ে ইকরিমার কাছে গেলাম। তিনি আমাদের কাছে বর্ণনা করলেন যে, ইবন আব্বাস (রাঃ) বলেন, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সময় এক অন্ধ লোক ছিল। তার এক দাসী ছিল, যার গর্ভে তার দুই ছেলে জন্মে। সে দাসী সর্বদাই রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কথা উল্লেখ করে তাঁকে মন্দ বলতো। অন্ধ ব্যক্তিটি তাকে এজন্য তিরস্কার করতো, কিন্তু সে তাতে কর্ণপাত করত না। তাকে নিষেধ করত, কিন্তু তবুও বিরত হত না। অন্ধ লোকটি বলেন, একরাত্রে আমি রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কথা উল্লেখ করলে সে তার নিন্দা করতে শুরু করল। আমার তা সহ্য না হওয়ায় আমি একটি হাতিয়ার নিয়ে তার পেটে বিদ্ধ করলাম। তাতে সে মারা গেল।
ভোরে লোক তাকে মৃতাবস্থায় দেখে ব্যাপারটি রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর খিদমতে জানাল। তিনি সকল লোককে একত্র করে বললেনঃ আমি আল্লাহর কসম দিয়ে ঐ ব্যক্তিকে বলছি, যে এমন কাজ করেছে সে আসুক। একথা শুনে ঐ অন্ধ ব্যক্তি ভয়ে উঠে এসে হাযির হলেন এবং বললেনঃ ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমি এই কাজ করেছি। সে আমার বাদী ছিল, আমার অত্যন্ত স্নেহশীলা ছিল, সঙ্গিণী ছিল। তার গর্ভের আমার দুটি ছেলে রয়েছে, যারা মুক্তাসদৃশ। কিন্তু সে প্রায় আপনাকে মন্দ বলতো, গালি দিত। আমি নিষেধ করলেও সে কর্ণপাত করতো না। তিরস্কার করলেও সে নিবৃত্ত হতো না। অবশেষে গত রাতে আমি আপনার উল্লেখ করলে সে আপনাকে মন্দ বলতে আরম্ভ করল। আমি একটি অস্ত্র উঠিয়ে তার পেটে রেখে চেপে ধরি, তাতে সে মারা যায়। রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ তোমরা সাক্ষী থাক, ঐ দাসীর রক্তের কোন বিনিময় নেই।
তাহক্বীকঃ সহীহ।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ উসমান শাহহাম (রহঃ)
আবু বকরের সমর্থনঃ নবীকে গালি দিলে হত্যা করার বৈধতা
ইসলামী বিধানে ‘শাতিমে রাসুল’ বা নবী অবমাননাকারীকে হত্যা করা যে কোনো সাধারণ আইনি প্রক্রিয়ার অংশ নয়, বরং এটি নবীর একচেটিয়া সার্বভৌম অধিকার (Prophetic Prerogative), তার অন্যতম শ্রেষ্ঠ প্রমাণ পাওয়া যায় প্রথম খলিফা আবু বকর সিদ্দীকের একটি আইনি ফয়সালা থেকে। এই বর্ণনাটি স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে যে, ইসলামী রাষ্ট্রব্যবস্থায় খলিফার ব্যক্তিগত মর্যাদার চেয়ে নবীর অবমাননার দণ্ড অনেক বেশি কঠোর এবং অনন্য। একইসাথে এই হাদিসটি এটিও প্রমাণ করে যে, রাষ্ট্রের আইন ও বিচার ব্যবস্থার চাইতেও নবীর মর্যাদা ইসলামের দৃষ্টিতে বেশি, তাই কেউ যদি নবী অবমাননার দায়ে কাউকে খুন করেও ফেলে, তখন সেটিও ইসলামের দৃষ্টিতে বৈধতা পেয়ে যায়।
সুনান আবূ দাউদ এবং সুনান আন-নাসায়ী’র সহিহ বর্ণনা অনুযায়ী, আবু বারজা আল-আসলামী নামক এক সাহাবী লক্ষ্য করেন যে, জনৈক ব্যক্তি খলিফা আবু বকরের সাথে অত্যন্ত রূঢ় আচরণ করছে এবং তাকে গালি দিচ্ছে। আবু বারজা তখন খলিফার কাছে অনুমতি চান সেই ব্যক্তিকে সরাসরি হত্যা করার জন্য। কিন্তু আবু বকর তাকে ধমক দিয়ে থামিয়ে দেন। পরবর্তীতে খলিফা তাকে ডেকে এই আচরণের কারণ ব্যাখ্যা করেন। আবু বকর পরিষ্কারভাবে জানিয়ে দেন যে, কোনো সাধারণ মানুষের বা এমনকি খলিফার অবমাননার দায়ে কাউকে হত্যা করার কোনো বৈধতা ইসলামে নেই। তবে এই নিয়মটি নবী মুহাম্মদের ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র। আবু বকর স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেন যে, মুহাম্মদের পরে অন্য কোনো মানবের এই অধিকার নেই যে, তাকে গালি দেওয়ার কারণে কাউকে হত্যা করা হবে [15] [16]।
ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল এই ঘটনার ব্যাখ্যায় উল্লেখ করেছেন যে, নবীর অবমাননাকারীকে হত্যা করার এই বিশেষ কর্তৃত্ব খলিফা আবু বকরের জন্য বৈধ ছিল না, কারণ এটি কেবলমাত্র মুহাম্মদের জন্য নির্ধারিত একটি বিশেষ সার্বভৌম ক্ষমতা। অর্থাৎ, সাধারণ অপরাধের বিচারিক প্রক্রিয়ার (যেমন: সাধারণ বিচার বা ক্ষতিপূরণ) বাইরেও নবীর সমালোচক বা গালিদাতাকে হত্যা করা যে একটি ‘লিগ্যাল প্রিভিলেজ’, আবু বকরের এই অবস্থান তা অকাট্যভাবে প্রমাণ করে। এই ঘটনাটি নির্দেশ করে যে, ইসলামী ধ্রুপদী ফিকহি কাঠামোতে নবীর সমালোচনাকে একটি স্বতন্ত্র এবং কঠোরতম অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হয়, যেখানে অপরাধীর তওবা বা কোনো প্রকার আত্মপক্ষ সমর্থনের চেয়েও তার রক্তকে ‘মূল্যহীন’ বা ‘বাতিল’ বলে ঘোষণা করা হয়েছে।
সুনান আন-নাসায়ী (ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
৩৮/ হত্যা অবৈধ হওয়া
পরিচ্ছেদঃ ১৬. রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-কে মন্দ বলার শাস্তি
৪০৭২. আমর ইবন আলী (রহঃ) … আবু বারযা আসালামী (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, এক ব্যক্তি আবু বকর সিদ্দীক (রাঃ)-কে মন্দ বললে, আমি বললামঃ আমি কি তাকে হত্যা করবো? তিনি আমাকে ধমক দিয়ে বললেনঃ এই মর্যাদা রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ব্যতীত আর কারো নেই।
তাহক্বীকঃ সহীহ।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আবূ বারযা আল-আসলামী (রাঃ)
সুনান আবূ দাউদ (আলবানী একাডেমী)
৩৩/ অপরাধ ও তার শাস্তি
পরিচ্ছেদঃ ২. যে নবী (ﷺ)-কে গালি দেয় তার সম্পর্কিত বিধান
৪৩৬৩। আবূ বারযাহ (রাঃ) সূত্রে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদা আমি আবূ বকর (রাঃ)-এর নিকট উপস্থিত ছিলাম। তখন তিনি একটি লোকের প্রতি খুবই ক্রোধান্বিত হলেন। আমি তাকে বললাম, হে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর খলীফাহ! আমাকে অনুমতি দিন, তাকে হত্যা করি। তিনি বলেন, আমার একথায় তার ক্রোধ দূর হলো। তিনি উঠে বাড়ির ভেতরে চলে গেলেন।
অতঃপর তিনি লোক পাঠিয়ে আমাকে (ডেকে নিয়ে) র্প্রশ্ন করেন, তুমি এইমাত্র কি বলেছ? আমি বললাম, আমাকে অনুমতি দিন, আমি তাকে হত্যা করি। তিনি প্রশ্ন করেন, আমি যদি তোমাকে আদেশ করতাম, তুমি কি তাই করতে? আমি বললাম, হ্যাঁ। তিনি বললেন, না আল্লাহর কসম! মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর পরে অন্য কোনো মানবের এ অধিকার নেই।
ইমাম আবূ দাঊদ (রহঃ) বলেন, এই মূল পাঠ বর্ণনাকারী ইয়াযীদের। আহমাদ ইবনু হাম্বাল (রহঃ) বলেন, অর্থাৎ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যে তিনটি অপরাধের কোনটিতে লিপ্ত ব্যক্তিকে হত্যা করার কথা বলেছেন, তাদের ছাড়া অন্য কাউকে হত্যা করা আবূ বকরের জন্য বৈধ নয়ঃ কেউ ধর্ম ত্যাগ করলে, বিবাহিত ব্যক্তি যিনা করলে এবং নিরপরাধ ব্যক্তির হত্যাকারী। তবে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর হত্যা করার কর্তৃত্ব ছিলো।[1]
সহীহ।
[1]. নাসায়ী, আহমাদ।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আবূ বারযা আল-আসলামী (রাঃ)
আলেমদের বক্তব্যঃ শাতিমে রাসুলের একমাত্র শাস্তি কতল
শাতিমে রাসুলের অপরাধ কীভাবে নির্ধারিত হবে, সেই প্রশ্নের উত্তর ধ্রুপদি ফিকহের ভাষায় পাওয়া যায়। কাজী ইয়াজ তাঁর আশ-শিফা বিটা‘রিফি হুকুকিল মুস্তফা গ্রন্থের চতুর্থ বিভাগের প্রথম অধ্যায়ে গালাগালির পাশাপাশি নবীর ব্যক্তিগত বৈশিষ্ট্য, বংশ, ধর্মীয় অবস্থান কিংবা পরিচিত মানবিক বৈশিষ্ট্যকে তাঁর মর্যাদা ক্ষুণ্ণ করার উদ্দেশ্যে উপস্থাপন করাকেও অবমাননার আওতায় এনেছেন। তাঁর সংজ্ঞায় সরাসরি বক্তব্যের পাশাপাশি ইঙ্গিত, তুলনা, বিদ্রূপ ও ত্রুটি আরোপও রয়েছে। এখানে নির্ধারক প্রশ্ন তথ্য সত্য কি না, শুধু তা নয়; ওই তথ্য বা বক্তব্য নবীর মর্যাদাকে হেয় করার উপায় হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে কি না। ফলে ঐতিহাসিক চরিত্র ও কর্মকাণ্ডের সমালোচনাকে ধর্মীয় মর্যাদা রক্ষার বিধানের আওতায় আনার সুযোগ সৃষ্টি হয়। [17]
কাজী ইয়াজ একই আলোচনায় মালিকি ফকিহ ইবনুল কাসিমের বক্তব্য সংরক্ষণ করেছেন। এখানে ‘গালি’, ‘অপমান’, ‘দোষারোপ’ এবং ‘মর্যাদা খাটো করা’ পৃথক শব্দে উপস্থিত। অর্থাৎ মৃত্যুদণ্ডের বিধানকে কেবল অশ্লীল গালাগালির সঙ্গে সীমাবদ্ধ রাখা হয়নি; নবীর দোষত্রুটি তুলে ধরা এবং তাঁকে হেয় করার অভিযোগও একই দণ্ডের আওতায় এসেছে। [18]
قال ابن القاسم في العتبية: من سبه أو شتمه أو عابه أو تنقصه فإنه يقتل، وحكمه عند الأمة القتل كالزنديق.
বাংলা অনুবাদ: ইবনুল কাসিম আল-উতবিয়্যা-তে বলেছেন: যে ব্যক্তি নবীকে গালি দেয়, অপমান করে, তাঁর দোষ ধরে অথবা তাঁর মর্যাদা খাটো করে, তাকে হত্যা করা হবে। তাঁর মতে, মুসলিম সম্প্রদায়ের বিধানে এমন ব্যক্তির শাস্তি ধর্মদ্রোহীর মতোই হত্যা।
এই সংজ্ঞা মতপ্রকাশের স্বাধীনতার জন্য সরাসরি বিপজ্জনক। একটি ঐতিহাসিক তথ্যের আলোচনা এবং ওই তথ্য দিয়ে কাউকে অপমান করার মধ্যে উদ্দেশ্যগত পার্থক্য থাকতে পারে; কিন্তু যখন ধর্মীয় ব্যক্তিত্বের মর্যাদা কমেছে কি না, সেটি মৃত্যুদণ্ডযোগ্য অপরাধের মানদণ্ড হয়, তখন তদন্তকারীর মতাদর্শ, অভিযোগকারীর সংবেদনশীলতা এবং বক্তব্যের অনুমিত উদ্দেশ্য অপরাধের সীমা নির্ধারণে প্রভাব ফেলতে পারে। কোনো নির্দিষ্ট তথ্য প্রমাণিত হলেও সেই তথ্যকে অসম্মান হিসেবে গণ্য করার ক্ষমতা আইনটি রেখে দেয়। ইতিহাস, ধর্মতত্ত্ব ও নৈতিকতার গবেষণাকে এমন প্রাণদণ্ডের ঝুঁকির মধ্যে রাখা জ্ঞানচর্চার স্বাধীনতার পরিপন্থী।
যুদ্ধ, আয়িশার বিয়ে এবং মিরাজের মতো বিষয় একদিকে প্রশংসামূলক ধর্মীয় বক্তৃতা, অন্যদিকে সমালোচনামূলক ঐতিহাসিক আলোচনার বিষয় হতে পারে। এ ধরনের উদাহরণে কোনো বক্তব্য অপরাধ হিসেবে গণ্য হয়েছে কি না, তা নির্দিষ্ট অভিযোগ বা কর্তৃপক্ষের অবস্থান দিয়ে প্রতিষ্ঠা করতে হয়। কাজী ইয়াজের মূল সংজ্ঞা সেই বিচারিক ঝুঁকির ফিকহি ভিত্তি দেখায়: নবীর মর্যাদা হ্রাস করা হয়েছে বলে গণ্য হলে বক্তব্যের সত্যতাই তার জন্য সুরক্ষা নিশ্চিত করে না।
জিহাদ এবং ‘জঙ্গি’ অভিধার রাজনৈতিক উপযোগিতা
আধুনিক পরিভাষায় ‘জঙ্গি’ শব্দটি নেতিবাচক হলেও, ইসলামী ঐতিহ্যে ‘হারব’ (যুদ্ধ) এবং ‘ইরহাব’ (ভীতি প্রদর্শন) শব্দগুলোর একটি গৌরবোজ্জ্বল ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট রয়েছে। বাংলাদেশের প্রখ্যাত আলেমদের বয়ানে প্রায়ই নবী মুহাম্মদকে একজন আপসহীন যোদ্ধা বা ‘জঙ্গি’ (যুদ্ধংদেহী অর্থে) হিসেবে চিত্রিত করা হয়। তারা যখন এই শব্দগুলো ব্যবহার করেন, তখন তার উদ্দেশ্য থাকে নবীর শৌর্য এবং আধিপত্যবাদী জিহাদের মাহাত্ম্য প্রচার করা। মুমিন সমাজ তখন আবেগের বশবর্তী হয়ে একে সমর্থন জানায়। অথচ, সমসাময়িক কোনো বিশ্লেষক যখন এই ঐতিহাসিক যুদ্ধের বাস্তবতা এবং ‘কাতল’ (হত্যা)-এর নির্দেশসমূহকে তথাকথিত ‘জঙ্গিবাদ’ হিসেবে চিহ্নিত করেন, তখন ইসলামী আইন অনুযায়ী তাকে ‘শাতিমে রাসুল’ তকমা দিয়ে মৃত্যুদণ্ডের দাবি তোলা হয়। অর্থাৎ, এখানে অপরাধ তথ্যের উপস্থাপন নয়, বরং তথ্যের মাধ্যমে নবীর ‘আধ্যাত্মিক পবিত্রতা’র ওপর করা আঘাত।
আয়েশার বয়স এবং ‘শিশুকাম’ (Pedophilia)-এর বিতর্ক
নবী মুহাম্মদের সাথে আয়েশার বিবাহ এবং শারীরিক মিলনের সময় আয়েশার বয়স যে যথাক্রমে ৬ এবং ৯ বছর ছিল, তা কোনো নাস্তিক বা সমালোচকের আবিষ্কৃত তথ্য নয়; বরং এটি সহিহ বুখারি ও মুসলিম শরীফের অকাট্য বর্ণনা [19]। বর্তমান বিশ্বের নৈতিক মানদণ্ডে একে ‘শিশুকাম’ বা ‘পেডোফাইল’ আচরণ হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা হলেও, ইসলামী বিশ্বে এই আলোচনাটি অত্যন্ত সংবেদনশীল। আলেমগণ যখন আলহামদুলিল্লাহ বা সুবহানাল্লাহ সহযোগে এই শিশুবিবাহের ঘটনা বর্ণনা করেন এবং একে ‘ঐশ্বরিক নির্দেশনা’ হিসেবে জায়েজ করেন, তখন মুমিন সমাজ তা ভক্তিভরে গ্রহণ করে। কিন্তু কোনো সমালোচক যখন আধুনিক মনোবিজ্ঞান বা সমাজবিজ্ঞানের আলোকে এই ঘটনাকে ‘পূর্ণবয়ষ্ক পুরুষের শিশুর প্রতি যৌন আকর্ষণ’ বা ‘পেডোফিলিয়া’ হিসেবে চিহ্নিত করেন, তখন তাকে নবীর চরিত্রে কলঙ্ক লেপনের দায়ে অভিযুক্ত করা হয়। অর্থাৎ, ঘটনার সত্যতা এখানে অপ্রাসঙ্গিক; প্রাসঙ্গিক হলো তথাকথিত ‘পবিত্রতা’র আবরণে ঐতিহাসিক সত্যকে আধুনিক নৈতিক পর্যালোচনার ঊর্ধ্বে রাখা।
মিরাজ এবং উম্মে হানীর গৃহের ঐতিহাসিক বিতর্ক
মিরাজের রাতে নবী মুহাম্মদ কোথা থেকে যাত্রা শুরু করেছিলেন, তা নিয়ে ধ্রুপদী সিরাতকারদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। অনেক নির্ভরযোগ্য বর্ণনায় উল্লেখ আছে যে, মুহাম্মদ সেই রাতে তার চাচাতো বোন উম্মে হানীর ঘরে অবস্থান করছিলেন এবং সেখান থেকেই তার ঊর্ধ্বগমন শুরু হয় [20]। এই তথ্যটি যখন আলেমগণ বর্ণনা করেন, তখন তা একটি অলৌকিক ঘটনার অংশ হিসেবে প্রশংসিত হয়। অথচ, কোনো নাস্তিক বা সমালোচক যখন এই ঐতিহাসিক তথ্যের ভিত্তিতে নবীর ব্যক্তিগত জীবন বা সামাজিক সম্পর্ক নিয়ে প্রশ্ন তোলেন, তখন তা ‘ব্লাসফেমি’ হিসেবে গণ্য হয়।
এই বিশ্লেষণ থেকে এটি স্পষ্ট যে, ইসলামী বিধানে অবমাননার আইনটি মূলত একটি ‘ইনটেলেকচুয়াল সেন্সরশিপ’ হিসেবে কাজ করে। এখানে আলেমদের জন্য তথ্যের যে স্বাধীনতা রয়েছে, ভিন্নমতাবলম্বীদের জন্য সেই একই তথ্য প্রকাশ করা মৃত্যু পরোয়ানা হয়ে দাঁড়ায়। ধ্রুপদী ফিকহি তত্ত্ব অনুযায়ী, নবী অবমাননার এই আইনটি মূলত তথ্যের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য নয়, বরং নবীর রাজনৈতিক ও ধর্মীয় ভাবমূর্তির ওপর যে কোনো ধরনের বুদ্ধিবৃত্তিক ব্যবচ্ছেদকে সমূলে উৎপাটন করার জন্য তৈরি করা হয়েছে। যখন একটি সমাজ সত্যের চেয়ে ‘পবিত্রতা’কে এবং যুক্তির চেয়ে ‘বক্তার পরিচয়’কে আইনের মানদণ্ড করে তোলে, তখন সেখানে যেকোনো বস্তুনিষ্ঠ একাডেমিক আলোচনা অসম্ভব হয়ে পড়ে।
আহমদুল্লাহর বক্তব্যঃ শাতিমে রাসুলের শাস্তি
আসুন বাংলাদেশের প্রখ্যাত আলেম আহমদুল্লাহর একটি পুরনো ভিডিও দেখে নেয়া যাক,
মতিউর রহমান মাদানিঃ সমালোচকদের গুপ্তঘাতক দিয়ে হত্যা করানো
এবারে আসুন ঐতিহাসিকভাবেই এই নবীর সমালোচকদের খুন করে ফেলা মুসলিমদের মধ্যে একটি সংস্কৃতি, সে সম্পর্কে একটি আলোচনা শুনি,
নামাজের খুতবায় প্রকাশ্য হুমকি
বাংলাদেশের মসজিদগুলোতে নামাজের পরের খুতবায় কোনো রাখঢাক না রেখে, একদম প্রকাশ্যেই কতল করে ফেলার হুমকি দেয়া হচ্ছে। আসুন একটি খুতবা শুনি,
প্রকাশ্যে বিচারবহির্ভূত হত্যার আহবান
বাংলাদেশে বর্তমান সময়ে কোন রকম লজ্জাশরমের তোয়াক্কা না করে মুমিন মুসলমানরা প্রকাশ্যে জনসভায়, সাংবাদিক সম্মেলনে খুনোখুনি, কল্লা ফেলে দেয়ার আহবান জানাচ্ছে। আসুন তার কিছু নমুনা দেখে নিই,
জামার একটি বোতাম ময়লা বললেও কতল
ইমাম মালিকের নামে সংরক্ষিত একটি বিশেষ বিধানে দেখা যায়, নবীর পোশাক সম্পর্কে সাধারণ একটি মন্তব্যও মৃত্যুদণ্ডযোগ্য হতে পারে, যদি সেটি তাঁর মর্যাদা ক্ষুণ্ণ করার উদ্দেশ্যে করা হয়। কাজী ইয়াজের আশ-শিফা-য় ইবনে ওয়াহবের সূত্রে এই বক্তব্য এসেছে: নবীর চাদর কিংবা জামার বোতাম ময়লা—এ কথা তাঁকে হেয় করার উদ্দেশ্যে বললে হত্যার বিধান। এখানে «أراد عيبه», অর্থাৎ ‘তাঁর ত্রুটি দেখানো বা হেয় করার উদ্দেশ্য’ শর্তটি মূল আরবিতে স্পষ্টভাবে রয়েছে। ঘটনাটি ধর্মীয় মর্যাদাহানির সংজ্ঞাকে কত দূর বিস্তৃত করা হয়েছে, তার গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। [21]
وروى ابن وهب، عن مالك: من قال: إن رداء النبي، ويروى زر النبي، وسخ، أراد عيبه قتل.
বাংলা অনুবাদ: ইবনে ওয়াহব মালিক থেকে বর্ণনা করেছেন: যে ব্যক্তি বলে, নবীর চাদর ময়লা—অন্য বর্ণনায়, নবীর জামার বোতাম ময়লা—এবং এর দ্বারা তাঁকে হেয় করা উদ্দেশ্য হয়, তাকে হত্যা করা হবে।
এই বিধানে অপরাধের সীমা নির্ধারিত হচ্ছে শুধু উচ্চারিত তথ্য দিয়ে নয়, বক্তব্যকে নবীর মর্যাদাহানি হিসেবে গণ্য করার মাধ্যমে। ধর্মীয় ব্যক্তিত্বের পোশাকের একটি সামান্য ত্রুটির উল্লেখও যদি তাঁর সম্মানহানির উদ্দেশ্য বহন করে বলে ধরা হয়, তাহলে ইতিহাস বা ব্যক্তিগত জীবনসংক্রান্ত কঠোর সমালোচনাও একই অপরাধের আওতায় আনার রাস্তা উন্মুক্ত থাকে। বাংলা গ্রন্থ প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের অবমাননার শাস্তি-তেও বিধানটির অনুবাদ সংরক্ষিত হয়েছে। [22]
আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর বিরুদ্ধে কথা বলে থাকে, তার অঙ্গীকারনামা বাতিল হয়ে যায় এবং তাকেও মৃত্যুদন্ডাদেশ দেয়া উচিত।”
কাজী ই’য়াজ রহ. ‘আশ শিফা’ নামক কিতাবে বলেন, “যে কেউ এমন কোন কথা বলল যা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর নিন্দা করে বলা হয়, কোন ধরনের সতর্কতামূলক ব্যবস্থা ছাড়াই তার মৃত্যু দন্ডাদেশ দেয়া হবে।”
ইবন আতাব রহ. বলেন, “কোরআন এবং সুন্নাহ এই ব্যাপারে ইঙ্গিত দেয় যে, যে কেউ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর ক্ষতি করার চেষ্টা করে অথবা তাঁর নিন্দা করে, তাকে হত্যা করা উচিত এমনকি যদি এটা একটা ক্ষুদ্র বিষয়ও হয়ে থাকে।”
ইমাম মালিক রহ. বলেন, “যদি কেউ বলে থাকে যে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর জামার বোতামটাও ময়লা, তাহলে তাকেও মৃত্যুদন্ডাদেশ দেয়া উচিত।”
এমনকি যদি এটা ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র কোন কথা বলার মত হয়, তারপরও তাকে দন্ডাদেশ দেয়া উচিত।
এরপর কাজী ইয়াজ বলেন, “আমরা এছাড়া আর কোন ভিন্ন মতামত জানি না, এই ব্যাপারে সবাই একমত এবং আর কোন ভিন্ন মতামত আমাদের জানা নেই।”

ইযাহুল মুসলিমঃ নবীকে গালি দিলে শাস্তি
এবারে আসুন, সহিহ মুসলিম গ্রন্থের শরাহ গ্রন্থ ইযাহুল মুসলিম থেকে [23] পড়ি,
রাসূল (সা.)-কে গালি দেয়ার হুকুম
মুরতাদ যদি তওবা করে তাহলে তার তওবা কবুল করতে হবে এবং তাকে হত্যা করা যাবে না। তাকে
কিন্তু কোন ব্যক্তি যদি রাসূল (সা.)-কে গালি দেয়ার কারণে মুরতাদ হয়ে যায় তাহলে তার তওবা কবুল হবে না। তওবা কবুল করলেও তাকে হত্যা করতে করতে হবে।
এমনকি কোন ব্যক্তি যদি অন্য কারণে মুরতাদ হয়ে মুরতাদ অবস্থায় রাসূল (সা.)-কে গালি দেয় অতঃপর তওবা করে মুসলমান হয়ে যায় তথাপি তাকে হত্যা করতে হবে। কেননা এটা আল্লাহর একটি দণ্ড বিধান। যা মওকুফ হওয়ার নয়।
উল্লেখ্য যে, কেউ যদি আল্লাহকে গালি দিয়ে পরে তওবা করে তাহলে তার তওবা কবুল হবে। কারণ আল্লাহ্ তা’আলা সমস্ত ত্রুটি থেকে পবিত্র হওয়াটা যুক্তির নিরিখে সুপ্রমাণিত। পক্ষান্তরে রাসূল (সা.)-এর দোষমুক্ত হওয়াটা যুক্তিদ্বারা প্রমাণিত নয় বরং সরাসরি আল্লাহ্ প্রদত্ত ওহী (সংবাদের) ভিত্তিতে প্রমাণিত। সুতরাং আল্লাহর ওহী অস্বীকার করায় এর অপরাধ অনেক বেশি।
-আল ফিকহু আলা মাযাহিবিল আরবা’আ খণ্ড ৫, পৃষ্ঠা ৪২৮-৪২৯


নবীর মানহানির শাস্তি মৃত্যুদণ্ড
এখন আসুন, প্রখ্যাত ইসলামিক স্কলার মাওলানা মুহাম্মদ আবদুল মান্নানের লেখা থেকে এই সম্পর্কিত রেফারেন্সসমূহ দেখে নিই [24]
দলীলাদি
শেফা শরীফ: ৩২১ পৃষ্ঠায় উল্লেখ করা হয়েছে—
أَجْمَعَ الْعُلَمَاءُ أَنَّ شَاتِمَ النَّبِيِّ ﷺ الْمُنَقِصُ لَهُ كَافِرٌ وَالْوَعِيدُ جَارٍ عَلَيْهِ بِعَذَابِ اللَّهِ تَعَالَى وَمَنْ شَكَ فِي كُفْرِهِ وَعَذَابِهِ فَقَدْ كَفَرَ
অর্থাৎ ‘আলিমদের ঐকমত্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছে এ মর্মে যে, হুযূর-ই আক্বদাস সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর শানে গোস্তাখীকারী কাফির এবং তার উপর আল্লাহর শাস্তির হুমকি কার্যকর ।
তাছাড়া, যে ব্যক্তি এমন লোকের কুফর ও শাস্তিযোগ্য হবার ক্ষেত্রে সন্দেহ করেছে সেও কাফির হয়ে গেছে।” নসীমুর রিয়াদ্ব: ৪র্থ খণ্ড: ৩৮১ পৃষ্ঠায় ইমাম ইবনে হাজর মক্কী থেকে বর্ণিত— যা এরশাদ করা হয়েছে- নবী করীম সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর শানে আক্বদাসে গোস্তাখী পদর্শনকারী কাফির, আর যে ব্যক্তি তার কাফির হওয়ায় সন্দেহ পোষণ করে সেও কাফির । এ মাযহাব আমাদের ইমামগণ প্রমুখেরই ।
ওয়াজীয-ই ইমাম কির্দারী: ৩য় খণ্ড: পৃ. ৩২১ এ উল্লেখ করা হয়েছে— যে ব্যক্তি, আল্লাহ্রই পানাহ্, মুরতাদ্দ হয়ে যায় তার স্ত্রী হারাম হয়ে যায় । তারপর ইসলাম গ্রহণ করলে তাকে পুনরায় নতুনভাবে বিবাহ করা যাবে । ইতোপূর্বে কুফরী কলেমা বলার পর কৃত সঙ্গমের ফলে যে সন্তান হবে সে হারামী (জারজ) হবে । আর এ ব্যক্তি অভ্যাসগতভাবে কলেমা-ই শাহাদত পড়তে থাকলেও কোন লাভ হবে না; যতক্ষণ না নিজের কুফর থেকে তাওবা করবে । কারণ, মুরতাদ্দ অভ্যাসগতভাবে কলেমা পড়তে থাকলে তার কুফর দূরীভূত হয় না । আর যে লোকটি রসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম অথবা কোন নবীর শানে বেয়াদবী করে, দুনিয়ায় তাওবার পরও তাকে শাস্তি দেওয়া হবে । এমনকি যদি নেশার কারণে বেঁহুশ অবস্থায় বেয়াদবীপূর্ণ কথাবার্তা বলে থাকে, তবুও ক্ষমা করা হবে না । আর উম্মতের সমস্ত আলিমের ‘ইজমা’ (ঐকমত্য) প্রতিষ্ঠিত হয়েছে যে, নবী করীম সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর শানে আক্বদাসে বেয়াদবী প্রদর্শনকারী কাফির । আর এমন কাফির যে, যে ব্যক্তি তার কুফরে সন্দেহ করবে সেও কাফির ।
ফাল্গুল ক্বাদীর: ৪র্থ খণ্ড: পৃ. ৪০৭-এ আছে— যার অন্তরে রসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর প্রতি বিদ্বেষ থাকে সে মুরতাদ্দ । সুতরাং বেয়াদবী প্রদর্শনকারী তো অধিকতর উত্তম পন্থায় কাফির । আর যদি নেশাবস্থায় বেয়াদবীপূর্ণ শব্দাবলী বকে থাকে তবে তাকেও ক্ষমা করা যাবে না । বাহরুর রা-ইকু: ৫ম খণ্ড, পৃ. ১৩৫-এ হুবহু ওই শব্দগুলো উল্লেখ করে পৃ. ১৩৫-এ বলেছেন— কোন নবীর শানে বেয়াদবী করলে এ-ই বিধান যে, তাকে ক্ষমা করা হবে না । আর প্রমাণিত হবার পর অস্বীকার করলে তা উপকারী হবে না । কারণ, মুরতাদ্দ তার মুরতাদ্দ হবার কথা অস্বীকার করে শাস্তি থেকে বাঁচার জন্যই । তাওবা ওখানেই সাব্যস্ত হয় (স্থিরতা লাভ করে), যেখানে তাওবা গ্রহণ করা হয় । আর নবী করীম সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম, এমনকি যে কোন নবীর শানে বেয়াদবী অন্য কুফরের মতো নয় । তাকে এখানে মোটেই ক্ষমা করা হবে না ।
আল্লামা মাওলানা খুসরু কৃত দুরুল হুক্কাম: ১ম খণ্ড: পৃ. ২৯৯-এ উল্লেখ করা হয়েছে— যদি কোন ব্যক্তি নিজেকে মুসলমান দাবী করে হুযূর-ই আক্বদাস সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম কিংবা অন্য কোন নবীর শানে গোস্তাখী (বেয়াদবী) করে, তাকে ক্ষমা করা হবে না । আর এ দয়াপ্রাপ্ত উম্মতের সমস্ত আলিমের উপর ইজমা’ হয়েছে যে, সে কাফির । যে ব্যক্তি তার কুফরে সন্দেহ করবে সেও কাফির । গুনিয়াহ্ যুল আহকাম: পৃ. ৩০১-এ উল্লেখ করা হয়েছে— নবী করীম-এর শানে আক্বদাসে বেয়াদবী অন্যান্য কুফরের মতো নয় । প্রত্যেক প্রকারের মুরতাদ্দকে তাওবার পর ক্ষমা করার বিধান রয়েছে; কিন্তু এ মুরতাদ্দের জন্য এর অনুমতি নেই ।
‘আল-আশবাহ্ ওয়ান্নাযা-ইর’: ‘আরিদ্দাহ্’ শীর্ষক অধ্যায়ে রয়েছে— নেশার কারণে বেহুঁশ অবস্থায় যদি কারো মুখ থেকে কুফরের কোন কথা বের হয়ে যায়, তাকে, বেহুঁশ হবার কারণে, কাফির বলবে না, কুফরের শাস্তি দেবে না; কিন্তু নবী করীম সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর শানে আক্বদাসে বেয়াদবী করা এমন জঘন্য কুফর যে, নেশার কারণে বেহুঁশ হওয়ার অবস্থায়ও যদি তা সম্পন্ন হয়ে যায়, তবে তাকে ক্ষমা করা যাবে না । আর, আল্লাহরই পানাহ্, মুরতাদ্দ হওয়ার বিধান হচ্ছে- তার স্ত্রী তাৎক্ষণিকভাবে তার বিবাহ্ বন্ধন থেকে বের হয়ে যাবে । আর যদি সে ওই মুরতাদ্দ অবস্থায় মরে যায়, তবে আল্লাহরই পানাহ্, তাকে মুসলমানদের কবরস্থানে দাফন করার অনুমতি নেই, না কোন মিল্লাতধারী, যেমন- ইহুদী কিংবা খ্রিস্টানের কবরস্থানেও । তাকে তো কুকুরের মতো কোন গর্তে নিক্ষেপ করা হবে । মুরতাদ্দের কুফর আসল কাফিরের কুফর অপেক্ষাও নিকৃষ্ট । নবী করীম সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর শানে গোস্তাখী এটা এমন জঘন্য কুফর, যার শাস্তি থেকে দুনিয়ায় তাওবার পরও ক্ষমা হয়না । অন্য কোন নবীর শানে বেয়াদবীরও একই বিধান ।
ফাতাওয়া-ই খায়রিয়াহ্: কৃত আল্লামা খায়রুদ্দীন রামালী, ১ম খণ্ড: পৃ. ৯৫-এ লিখেছেন— যে ব্যক্তি নবী করীম সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর মহান শানে বেয়াদবী করে, সে মুরতাদ্দ । তার সাথেও ওই আচরণ করা হবে, যা মুরতাদ্দদের সাথে করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে । আর তাকে দুনিয়ায় ক্ষমা করা হবে না এবং উম্মতের সমস্ত আলিমের ইজমা’ অনুসারে, সে কাফির । আর যে ব্যক্তি তার কুফরে সন্দেহ পোষণ করবে সেও কাফির ।
‘মাজমা’উল আনহুর’ শরহে ‘মূলতাক্বাল আবহুর’: ১ম খণ্ড: পৃ. ৬১৮ তে আছে— যখন কেউ মুসলমান বলে দাবী করে হুযূর-ই আক্বদাস সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম কিংবা অন্য কোন নবীর শানে বেয়াদবী করে, যদিও নেশাবস্থায় হয়, তাহলে তার তাওবার উপরও দুনিয়ায় তাকে ক্ষমা করা হবে না । আর যে ব্যক্তি এ বেয়াদবী প্রদর্শনকারীর কুফরে সন্দেহ করবে সেও কাফির হয়ে যাবে । ‘যখীরাতুল ওকুবা’: ২৪০ পৃষ্ঠায় আছে— এ মর্মে উম্মতের ইজমা’ হয়েছে যে, আমাদের নবী সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম ও অন্য কোন নবী (আলায়হিস্ সালাতু ওয়াস্সালাম)-এর মানহানি কুফর- কাজে হোক কিংবা কথায় ।
‘দুরে মুখতার’-এ আছে— যে ব্যক্তি কলেমা পড়ুয়া হয়ে হুযূর-ই আক্বদাস সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলায়হি ওয়াসাল্লামকে মন্দ বলে অথবা মিথ্যারোপ করে, অথবা কোন দোষ-ত্রুটি আরোপ করে অথবা মানহানি করে সে নিঃসন্দেহে কাফির এবং তার স্ত্রী তার বিবাহ্ বন্ধন থেকে বের হয়ে গেছে ।
কিতাবুল খারাজ: কৃত, সৈয়্যদুনা আবূ ইয়ূসুফ রাদ্বিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু, পৃ. ১১২ ও ২৪২ এ আছে— ওই বেয়াদবী প্রদর্শনকারী যখন মরে যাবে, তবে তাকে না গোসল দেবে, না কাফন পরাবে, না তার জন্য জানাযার নামায পড়াবে । অবশ্য সে যদি তাওবা করে এবং ইসলামে প্রবেশ করে, তারপর মৃত্যুমুখে পতিত হয়; তাহলে তাকে গোসল ও কাফন দেওয়া হবে, জানাযার নামায পড়া হবে এবং মুসলমানদের কবরস্থানে দাফনও করা যাবে ।
‘তান্ডীরুল আবসার’: প্রত্যেক মুরতাদ্দের তাওবা কবুল হয়, কিন্তু কোন নবীর শানে বেয়াদবী প্রদর্শনকারী এমন (জঘন্য) কাফির যে, দুনিয়ায় শাস্তি থেকে রক্ষা করার জন্য তার তাওবা গ্রহণযোগ্য নয় ।
।। দুই ।। গাযালী-ই যমান আল্লামা সাইয়্যেদ আহমদ সা’ঈদ কাযেমী লিখেছেন— কিতাব, সুন্নাহ্, ইজমা’-ই উম্মাহ্ ও দ্বীনের ইমামগণের স্পষ্ট বর্ণনাদি অনুসারে পরম সম্মানিত নবী ও রসূলের মানহানির শাস্তি একমাত্র মৃত্যুদণ্ড । ক্বোরআন-ই করীম এ অপরাধের শাস্তি মৃত্যুদণ্ড বলেছে । রসূল করীমের শানে বেয়াদবী প্রদর্শনকারীর শাস্তি মৃত্যুদণ্ডই । আব্দুল্লাহ ইবনে খাত্বাল হুযূর-ই আক্রামের মানহানি করে বেড়াতো । ঐতিহাসিক মক্কা বিজয়ের দিন হুযূর-ই করীম এরশাদ করলেন, اقتلوه (তাকে মৃত্যুদণ্ড দাও) । তাকে কা’বা শরীফের গিলাফ থেকে বের করে এনে মাক্বাম-ই ইব্রাহীম ও যমযমের মধ্যভাগে তার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হলো ।
উপসংহার: অধিকাংশ ফক্বীহ্ ফয়সালা হলো, রাসূলে পাক সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর শানে যারা কটুক্তি করে, তাঁর অবমাননা বা মানহানি করে, তারা কাফের-মুরতাদ্দ । তাদের শাস্তি মৃত্যুদণ্ড । তারা তওবা করলেও তা গ্রহণযোগ্য হবে না । রসূলে পাকের শানে বেয়াদবী প্রদর্শনকারীর বিরুদ্ধে ‘ব্লাসফেমী’ আইন পাস করা এবং কঠোরভাবে এমন জঘন্য অপরাধের পথ চিরদিনের জন্য বন্ধ করা এখন সময়ের দাবী; মুসলিম জাতির প্রাণের দাবী ।
……
১। সূরা আনফাল: আয়াত-১৩, তাফসীর-ই মাদারিক: ২য় খণ্ড: পৃ. ১৭১, তাফসীর-ই খাফিন: ২য় খণ্ড, পৃ. ১৭১
২। সহীহ বোখারী: ১ম খণ্ড, পৃ. ২৪৩, ২য় খণ্ড: পৃ. ১০২৩, আবূ দাউদ: ২য় খণ্ড: পৃ. ৫৯৮, তিরমিযী শরীফ: ১ম খণ্ড: পৃ. ১৭৬, নাসাঈ: ২য় খণ্ড: পৃ. ১৪১
৩। তাফসীর-ই মাযহারী: ৩য় খণ্ড: পৃ. ১৩৫, রুহুল মা’আনী: পারা-৬: পৃ. ১৬০
৪। বোখারী শরীফ: ২য় খণ্ড: পৃ. ১০৩২, আবু দাউদ: ২য় খণ্ড: ৫৯৮, নাসাঈ: ২য় খণ্ড: পৃ. ১৫২
৫। বোখারী শরীফ, ১ম খণ্ড, পৃ. ২৪৯, ২য় খণ্ড, পৃ. ৬১৪
৮। শেফা শরীফ, ২য় খণ্ড, পৃ. ২১৫
৯। শেফা: ২য় খণ্ড: পৃ. ২১৪, আস্-সারিমূল মাসলুল: পৃ. ২২৫
১০। ফাতাওয়া-ই শামী হানাফী: ৩য় খণ্ড: পৃ. ৩২১, আস্-সারিমুল মাসলূল: হাম্বলী কৃত: পৃ. ৪
১১। ফাতহুল কাদীর: কৃত, ইমাম ইবনে হুম্মাম: ৪র্থ খণ্ড: পৃ. ৪০৭
১২। কিতাবুল খারাজ: কৃত, ইমাম আবু ইয়ুসুফ: পৃ. ১৮২, ফাতাওয়া-ই শামী: ৩য় খণ্ড: পৃ. ৩১৯
১৩। ফাতাওয়া-ই কাযী খান: ৪র্থ খণ্ড: পৃ. ৮৮২
১৪। ইমাম জাস্সাস: কৃত, ‘আহকামূল কোরআন’: ৩য় খণ্ড, পৃ. ১০৬
১৫। নসীমুর রিয়ায় শরহে শিফা: ৪র্থ খণ্ড: পৃ. ৪২৬
১৬। শিফা: ২য় খণ্ড: পৃ. ২১৭
১৭। সূরা আ’রাফ: আয়াত-১৯৯
১৮। বোখারী শরীফ: ২য় খণ্ড: পৃ. ৮৩২
১৯। বোখারী শরীফ: ১ম খণ্ড: পৃ. ১২১, মুসলিম শরীফ: ১ম খণ্ড: পৃ. ৪৩৮


















নবীকে গালি দেওয়ার পর তওবা করলেও মৃত্যুদণ্ড: অপরাধ ক্ষমা ও দণ্ড কার্যকরের পার্থক্য
নবী অবমাননার শাস্তির সবচেয়ে কঠোর বিধানগুলোর একটি হলো—অভিযুক্ত ব্যক্তি নিজের ভুল স্বীকার করে তওবা করলেও তার প্রাণদণ্ড বহাল থাকা। আধুনিক ইসলামি ফতোয়াতেও একই বিধান প্রকাশিত হয়েছে। ইসলামকিউএর ১৫০৯৮৯ নম্বর ফতোয়ায় প্রশ্ন করা হয়েছিল, কেউ গোপনে মুহাম্মদকে গালি দিয়ে পরে তওবা করলে আল্লাহ তার তওবা গ্রহণ করবেন কি না এবং মুসলমান হিসেবে ফিরে আসার জন্য নিজেকে মৃত্যুদণ্ডের উদ্দেশ্যে বিচারকের কাছে সোপর্দ করা আবশ্যক কি না। জবাবে বলা হয়েছে, আন্তরিক তওবা আল্লাহর কাছে গৃহীত হয়ে ব্যক্তি আবার মুসলমান হতে পারেন; কিন্তু তাঁকে হত্যার বিধান তাতে বাতিল হয় না। এমনকি তাকে মুসলমান হিসেবেই হত্যা করে গোসল, জানাজা ও মুসলিম কবরস্থানে দাফনের বিধান দেওয়া হয়েছে। এ ক্ষেত্রে অনুশোচনা ও ধর্মীয় পরিচয়ে প্রত্যাবর্তনও জীবিত থাকার অধিকার ফিরিয়ে দিতে পারে না। [25]
أما قتله فلا يرتفع عنه وجوب القتل، فيقتل مسلماً، فيغسَّل ويصلَّى عليه ويورث ويُدفن في مقابر المسلمين.
বাংলা অনুবাদ: কিন্তু তাকে হত্যার আবশ্যকতা দূর হয় না। তাকে মুসলমান অবস্থাতেই হত্যা করা হবে; তার গোসল দেওয়া হবে, জানাজা পড়া হবে, উত্তরাধিকার কার্যকর হবে এবং মুসলমানদের কবরস্থানে দাফন করা হবে।
একই ফতোয়ায় মুহাম্মদ ইবনে সালিহ আল-উসাইমিনের ব্যাখ্যা উদ্ধৃত হয়েছে। সেখানে আল্লাহকে গালি দেওয়া এবং মুহাম্মদকে গালি দেওয়ার পরিণতি পৃথক করা হয়েছে। ব্যাখ্যা অনুযায়ী, আল্লাহ নিজের অধিকারের লঙ্ঘন তওবার মাধ্যমে ক্ষমা করতে পারেন; কিন্তু মুহাম্মদের অবমাননায় তাঁর ব্যক্তিগত অধিকারও লঙ্ঘিত হয়। মুহাম্মদের মৃত্যুর পর সেই অধিকার ক্ষমা করে দেওয়ার ক্ষমতা অন্য কারও নেই বলে মৃত্যুদণ্ড বহাল থাকবে। এতে অবমাননাকে শুধু ধর্মবিশ্বাসের অপরাধ নয়, মৃত ধর্মীয় নেতার এক অব্যাহত ব্যক্তিগত অধিকার লঙ্ঘনের অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হচ্ছে। আইনের এই কাঠামোয় অভিযুক্তের বর্তমান বিশ্বাস, অনুশোচনা কিংবা সংশোধিত আচরণের ওপর তার জীবনের অধিকার নির্ভর করে না; অতীতে উচ্চারিত বক্তব্যটির জন্য মৃত্যুদণ্ডকেই অনড় রাখা হয়। [26]
কাজী ইয়াজের আশ-শিফা-র দ্বিতীয় খণ্ডে তওবার পরে শাস্তির প্রশ্নটি আরও পুরোনো ফিকহি ভাষায় এসেছে। সেখানে মালিকি মাযহাবের প্রসিদ্ধ সিদ্ধান্ত অনুযায়ী নবী অবমাননার অপরাধে মৃত্যুদণ্ডকে ধর্মত্যাগের শাস্তির পরিবর্তে পৃথক দণ্ড হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে; ফলে অভিযুক্ত ব্যক্তি তওবা প্রকাশ করলেও সেই দণ্ড মওকুফ হয় না। শাফেয়ি, হানাফি ও হাম্বলি আলোচনাতেও তওবা অপরাধের ধর্মীয় অবস্থান বদলায় কি না এবং ইহজাগতিক হত্যার দণ্ড রহিত করে কি না, তা পৃথক প্রশ্ন হিসেবে এসেছে। নামমাত্র ‘তওবা গ্রহণ’ তাই অভিযুক্তের প্রাণরক্ষার নিশ্চয়তা নয়। মতভেদের মূল ফল হলো মানুষটিকে মুসলমান বা কাফের হিসেবে হত্যা ও দাফন করা হবে কি না এবং কোন ধরনের শাস্তি বহাল থাকবে; তার বাকস্বাধীনতার মৌলিক অধিকারকে এই কাঠামো স্বীকৃতি দেয় না। [27]
জিম্মি অমুসলিমের নিরাপত্তাচুক্তি, নবী অবমাননা এবং হত্যার বিধান
ধ্রুপদি ইসলামি রাজনৈতিক আইনে জিম্মি অমুসলিম এমন একজন ব্যক্তি, যিনি মুসলিম শাসনের অধীনে নির্ধারিত শর্তে নিরাপত্তা পান। সেই নিরাপত্তা নবী সম্পর্কে কী বলা যাবে, সেই সীমার সঙ্গেও যুক্ত করা হয়েছে। ইবনে তাইমিয়ার আস-সারিমুল মাসলুল আলা শাতিমির রাসুল-এ জিম্মি অমুসলিমের নবী অবমাননা, নিরাপত্তাচুক্তির অবস্থান এবং হত্যার বিধান নিয়ে বিস্তৃত আলোচনা রয়েছে। অন্যদিকে হানাফি ফিকহে আবু হানিফা ও তাঁর অনুসারীদের নামে সংরক্ষিত প্রাথমিক অবস্থান অনুযায়ী কেবল অবমাননার ফলে জিম্মির নিরাপত্তাচুক্তি বাতিল হয় না এবং সেই কারণেই তাকে হত্যা করা হয় না; প্রকাশ্যে অবমাননার জন্য তাআযিরের বিধান রয়েছে। এই মতপার্থক্য জিম্মির জীবনরক্ষাকে নিঃশর্ত ব্যক্তি-অধিকার হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে না। কোন বক্তব্য শাস্তিযোগ্য, কী ধরনের শাস্তি হবে এবং কখন তা মৃত্যুদণ্ডে পৌঁছাতে পারে—সবই ধর্মীয়-রাজনৈতিক কর্তৃত্বের বিধানে নির্ধারিত। [28]
وأما أبو حنيفة وأصحابه فقالوا: لا ينتقض العهد بالسب، ولا يقتل الذمي بذلك، لكن يعزر على إظهار ذلك.
বাংলা অনুবাদ: আবু হানিফা ও তাঁর অনুসারীরা বলেছেন: গালাগালির কারণে জিম্মির নিরাপত্তাচুক্তি বাতিল হয় না এবং শুধু এ কারণে তাকে হত্যা করা হয় না; তবে প্রকাশ্যে এমন বক্তব্য দিলে তাকে তাআযির বা বিচারকের নির্ধারিত শাস্তি দেওয়া হবে।
ইবন আবিদিন একই আলোচনায় ইবনে তাইমিয়ার গ্রন্থ থেকে আরও উল্লেখ করেছেন যে, হানাফি ফকিহদের একাংশ নবীকে বারবার প্রকাশ্যে গালি দেওয়া জিম্মির ক্ষেত্রে রাজনৈতিক-প্রশাসনিক শাস্তি হিসেবে মৃত্যুদণ্ডের অনুমোদন দিয়েছেন; কিছু অবস্থানে অভিযুক্ত পরে ইসলাম গ্রহণ করলেও সেই শাস্তি বহাল রাখার মত রয়েছে। একই গ্রন্থে ইবনুল হুমামের বক্তব্যও এসেছে—জিম্মির প্রকাশ্য অবমাননা, অধীনতার চুক্তি এবং মুসলিম শাসনের বিরুদ্ধে ঔদ্ধত্যের প্রশ্নে শাস্তি কঠোর হতে পারে। ফলে হানাফি ঐতিহ্যের মধ্যেও সাধারণ অবমাননা, পুনরাবৃত্ত প্রকাশ্য অবমাননা এবং চুক্তিভঙ্গের অভিযোগে শাস্তির পার্থক্য রয়েছে। **এখানে অমুসলিমের জীবনরক্ষা তার ধর্মীয় আনুগত্য, প্রকাশ্য ভাষা এবং শাসকের সিদ্ধান্তের অধীন।** [29]
মালিকি ঐতিহ্যে কাজী ইয়াজের আশ-শিফা-য় মুসলমান ও অমুসলিম উভয়ের নবী অবমাননার জন্য হত্যার মতও সংরক্ষিত হয়েছে। এখানে দ্বন্দ্বটি কেবল শাস্তির মেয়াদ বা পরিমাণ নিয়ে নয়; মুসলিম শাসনের অধীনে বসবাসকারী অমুসলিম ব্যক্তির নিরাপত্তা এবং তাঁর ধর্মীয় ভিন্নমত প্রকাশের অধিকার নিয়েও। একটি নিরাপত্তাচুক্তি যদি ধর্মীয় ব্যক্তিত্বের সমালোচনা নিষিদ্ধ করার শর্তে কার্যকর থাকে, তাহলে সেই চুক্তি সমান নাগরিক স্বাধীনতা প্রতিষ্ঠা করে না। ধর্মীয় আনুগত্যের পরীক্ষা অমুসলিমের জীবন ও স্বাধীনতার ওপর রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার প্রভাব বিস্তার করে। [30]
দণ্ড কার্যকরের এখতিয়ার এবং ব্যক্তিগত হত্যার দায়
ধ্রুপদি ফিকহে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের জন্য শাসক বা তাঁর মনোনীত বিচারিক কর্তৃত্বের বিধান রয়েছে। কিন্তু একই আইনশাস্ত্রে অনুমতি ছাড়া হত্যা সংঘটিত হলে তার শাস্তি ও নিহত ব্যক্তির রক্তের ক্ষতিপূরণ পৃথকভাবে নির্ধারণ করা হয়েছে। হাম্বলি ফকিহ ইবন কুদামার আল-মুগনি-র ৭০৮৯ নম্বর মাসআলায় মুরতাদ হত্যার অধিকার শাসকের বলে নির্ধারণ করে পরে লেখা হয়েছে, অন্য কেউ মুরতাদকে হত্যা করলে কাজটি অন্যায় এবং তার জন্য তাআযির হতে পারে; কিন্তু নিহতের রক্তের ক্ষতিপূরণ দিতে হবে না। এটি মুরতাদ হত্যার বিধান। নবী অবমাননাকে ধর্মত্যাগের অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হলে দণ্ড কার্যকরের এখতিয়ার এবং অননুমোদিত হত্যার পরিণতি বিশ্লেষণে এই বিধান সরাসরি প্রাসঙ্গিক। [31]
فإن قتله غير الإمام، أساء، ولا ضمان عليه؛ لأنه محل غير معصوم، وسواء قتله قبل الاستتابة أو بعدها؛ لذلك. وعلى من فعل ذلك التعزير.
বাংলা অনুবাদ: শাসক ছাড়া অন্য কেউ তাকে হত্যা করলে সে অন্যায় করল, কিন্তু তার ওপর রক্তের ক্ষতিপূরণ আবশ্যক হবে না; কারণ নিহত ব্যক্তির রক্ত আইনগতভাবে সুরক্ষিত নয়। তওবা করতে বলার আগে বা পরে হত্যা করলেও একই বিধান। তবে এই কাজের জন্য হত্যাকারীর ওপর তাআযির প্রযোজ্য হবে।
এখানে আইনি ব্যবস্থার অন্তর্নিহিত বৈপরীত্য প্রকাশ পায়। একদিকে শাসকের অনুমতি ছাড়া হত্যা করার জন্য হত্যাকারীকে তিরস্কার বা তাআযিরের মুখোমুখি করা হচ্ছে; অন্যদিকে নিহত ব্যক্তির জন্য দিয়াত বা রক্তের ক্ষতিপূরণ অস্বীকার করা হচ্ছে। অর্থাৎ বিচারিক ক্ষমতা লঙ্ঘনের দায় এবং মানুষ হত্যার দায় এক নয়। ধর্মত্যাগের অভিযোগে একজন মানুষের রক্ত আইনগত সুরক্ষা হারিয়েছে বলে গণ্য হলে, বিচারবহির্ভূত হত্যার পরও হত্যাকারীর বিরুদ্ধে সাধারণ হত্যাকাণ্ডের সমান প্রতিকার কার্যকর হয় না। অন্ধ সাহাবির দাসী হত্যার ঘটনাতে মুহাম্মদের ঘোষিত দায়মুক্তির সঙ্গে এই বিধান এক নয়, কিন্তু উভয় ক্ষেত্রেই ধর্মীয় অপরাধের অভিযোগ নিহত ব্যক্তির রক্তের আইনি মূল্য নির্ধারণে কেন্দ্রীয় ভূমিকা নিয়েছে।
হানাফি আল-কাসানির বাদায়ি আস-সানায়ি-তে সাধারণভাবে দণ্ড কার্যকরের শর্ত হিসেবে শাসক বা তাঁর নিযুক্ত ব্যক্তির কথা বলা হয়েছে। এই বিধানের সঙ্গে ইবন কুদামার অননুমোদিত হত্যায় দিয়াত না থাকার সিদ্ধান্ত মিলিয়ে দেখলে রাষ্ট্রীয় বিচারিক ক্ষমতার সীমা এবং অভিযুক্ত ব্যক্তির জীবনরক্ষার সীমা আলাদা হয়ে ওঠে। বিচারকের অনুমতি নেওয়া আর অভিযুক্তের প্রাণদণ্ডকে ন্যায়সঙ্গত করা এক বিষয় নয়; একইভাবে বিচার ছাড়াই হত্যা করার জন্য তাআযির থাকা আর নিহত ব্যক্তির জীবনকে সমান আইনি সুরক্ষা দেওয়া এক বিষয় নয়। [32]
মব জাস্টিস ও সামাজিক বর্বরতার উসকানি
শাতিমে রাসুলের শাস্তির নামে প্রচলিত এই কঠোর বিধান এবং আলেমদের পক্ষ থেকে প্রকাশ্যে হত্যার আহ্বান সরাসরি একটি রাষ্ট্রকে ‘মব জাস্টিস’ বা গণপিটুনির অভয়ারণ্যে পরিণত করে। সমাজবিজ্ঞানী থমাস হবস তার ‘লেভিয়াথান’ গ্রন্থে সতর্ক করেছিলেন যে, যখন সাধারণ মানুষ আইন নিজের হাতে তুলে নেয়, তখন সেখানে কোনো নিরাপত্তা থাকে না এবং জীবন হয়ে ওঠে “একাকী, দরিদ্র, নোংরা, পাশবিক ও স্বল্পায়ু” [8]। ব্লাসফেমি বা ধর্ম অবমাননার মতো একটি আপেক্ষিক ও আবেগীয় বিষয়কে যখন মৃত্যুদণ্ডযোগ্য অপরাধ হিসেবে প্রচার করা হয়, তখন বিচারিক প্রক্রিয়া এবং প্রমাণের তোয়াক্কা না করেই উন্মত্ত জনতা যে কাউকে অভিযুক্ত করে হত্যা করতে প্রলুব্ধ হয়। এটি মূলত আধুনিক বিচারব্যবস্থার মূল স্তম্ভ ‘নির্দোষ হওয়ার পূর্বানুমান’ (Presumption of Innocence) নীতিকে সম্পূর্ণ ধ্বংস করে দেয়।
যৌক্তিক বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এই ধরনের আইন মূলত ব্যক্তিগত শত্রুতা বা রাজনৈতিক প্রতিহিংসা চরিতার্থ করার একটি শক্তিশালী অস্ত্র। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী হান্না আরেন্ট তার ‘দ্য অরিজিনস অফ টোটালিটারিয়ানিজম’ গ্রন্থে দেখিয়েছেন যে, যখন কোনো একটি পবিত্র আদর্শের দোহাই দিয়ে আইন বহির্ভূত সহিংসতাকে বৈধতা দেওয়া হয়, তখন তা একটি অসভ্য ও বর্বর সমাজের জন্ম দেয় যেখানে যুক্তি নয়, বরং গায়ের জোরই প্রধান হয়ে দাঁড়ায় [33]। যখন কোনো মৌলবাদী গোষ্ঠী বা সাধারণ মানুষ বিশ্বাস করে যে তারা “ঐশ্বরিক বিচার” কার্যকর করছে, তখন তারা প্রচলিত রাষ্ট্রীয় আইনকে অবজ্ঞা করতে শুরু করে। এর ফলে সমাজে এক প্রকার ‘নৈরাজ্যবাদ’ বা অ্যানার্কি তৈরি হয়, যা আধুনিক সভ্য রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বের জন্য চরম হুমকি।
একটি সমাজে এই ধরনের সংস্কৃতির উপস্থিতির ফলাফল অত্যন্ত ভয়াবহ:
দার্শনিক জন স্টুয়ার্ট মিলের মতে, যে সমাজ তার সদস্যদের ব্যক্তিগত মতামত বা ভিন্নমতের কারণে শারীরিক আঘাত বা মৃত্যু নিশ্চিত করে, সেই সমাজ আসলে প্রগতির পথে নয়, বরং মধ্যযুগীয় বর্বরতার দিকে ধাবিত হচ্ছে [34]। বিচারবহির্ভূত হত্যার এই ইসলামিক বৈধতা মূলত সমাজকে একটি আইনি কাঠামো থেকে সরিয়ে এক ভয়ংকর জঙ্গলের নিয়মে (Law of the Jungle) আচ্ছন্ন করে দেয়, যেখানে সত্যের চেয়ে অন্ধ আবেগ এবং প্রমাণের চেয়ে অভিযোগই চূড়ান্ত দণ্ড হিসেবে বিবেচিত হয়।
উপসংহার: বুদ্ধিবৃত্তিক অন্ধকার ও অসহিষ্ণুতার সংস্কৃতি
প্রবন্ধের আলোচনা ও উপস্থাপিত দলিলসমূহ থেকে এটি দিবালোকের মতো স্পষ্ট যে, ‘শাতিমে রাসুল’ বা নবী অবমাননার আইনটি মূলত ভিন্নমত দমন করার একটি প্রাতিষ্ঠানিক হাতিয়ার। ইমাম মালিকের মতো ফকীহদের উদ্ধৃতি, যেখানে নবীর জামার বোতাম ময়লা বললেও হত্যার বিধান দেওয়া হয়েছে, তা প্রমাণ করে যে এই আইনটি কোনো বিচারিক যুক্তির ওপর নয় বরং চরম আবেগ ও অন্ধ আনুগত্যের ওপর প্রতিষ্ঠিত। আধুনিক মানবাধিকারের বৈশ্বিক মানদণ্ড অনুযায়ী, প্রতিটি মানুষের তার বিশ্বাস বা অবিশ্বাস ব্যক্ত করার অধিকার রয়েছে; অধিকার আছে তার যুক্তি ও বুদ্ধি অনুসারে যেকোন ব্যক্তি বা মতাদর্শের সমালোচনা করার। কিন্তু ইসলামী শরীয়ত এই অধিকারকে কেবল ‘কতল’ বা হত্যার মাধ্যমে স্তব্ধ করে দিতে চায়।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, এই মধ্যযুগীয় আইনগুলো কেবল কিতাবের পাতায় সীমাবদ্ধ নেই, বরং বাংলাদেশের মতো দেশগুলোতেও প্রকাশ্যে বিচারবহির্ভূত হত্যার উসকানি হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। যখন শিক্ষিত ও প্রখ্যাত আলেমরাও নবী অবমাননার নামে হত্যার সংস্কৃতিকে বৈধতা দেন, তখন তা সমাজে এক ভয়ংকর অরাজকতা ও অসহিষ্ণুতার বীজ বপন করে। এটি কেবল নাস্তিক বা সমালোচকদের জীবনের ঝুঁকি তৈরি করে না, বরং সমগ্র সমাজকে একটি বুদ্ধিবৃত্তিক অন্ধকারের দিকে ঠেলে দেয়, যেখানে সত্য অনুসন্ধান বা যুক্তিনির্ভর বিতর্কের কোনো স্থান নেই।
একটি সভ্য সমাজের ভিত্তি হওয়া উচিত মুক্তচিন্তা এবং পরমতসহিষ্ণুতা। কিন্তু নবীর মানহানির নামে মৃত্যুদণ্ডের এই বিধান আধুনিক গণতন্ত্র ও সমানাধিকারের ধারণার সাথে সম্পূর্ণ বেমানান। যতক্ষণ পর্যন্ত ধর্মের নামে এই ধরনের বর্বর শাস্তির বিধান টিকে থাকবে, ততক্ষণ পর্যন্ত কোনো সমাজই সত্যিকার অর্থে প্রগতিশীল বা মানবিক হয়ে উঠতে পারবে না। তাই বর্তমান সময়ের দাবি হলো, এই ধরনের বৈষম্যমূলক ও প্রাণঘাতী আইনসমূহ রদ করা এবং প্রতিটি মানুষের নির্ভয়ে চিন্তা করার ও কথা বলার অধিকার নিশ্চিত করা।
তথ্যসূত্রঃ
- ব্লাসফেমির অভিযোগ ও পলায়ন: নবী মুহাম্মদ ছিলেন ধর্ম অবমাননাকারী ↩︎
- আবু দাউদ ৪৩৬১ ↩︎
- আবু দাউদ ৪৩৬৩ ↩︎
- আশ-শিফা ↩︎
- সহীহ বুখারী, হাদিসঃ ২৬৫২ ↩︎
- সহীহ মুসলিম, হাদিসঃ ২৫৩৩ ↩︎
- John Locke, “Two Treatises of Government”, 1689 ↩︎
- Thomas Hobbes, “Leviathan”, 1651 1 2
- Immanuel Kant, “An Answer to the Question: What is Enlightenment?”, 1784 ↩︎
- ICCPR, অনুচ্ছেদ ১৯ ও ২০ ↩︎
- জাতিসংঘ মানবাধিকার কমিটি, General Comment No. 34, অনুচ্ছেদ ৪৮, ২০১১ ↩︎
- Evelyn Beatrice Hall, The Friends of Voltaire, ১৯০৬; উদ্ধৃতিটির উৎস ↩︎
- সুনান আবু দাউদ, ৪৩৬১ ↩︎
- ইসলামকিউএ, ফতোয়া ২২৮৪৮২: বিচারক ছাড়া ধর্মত্যাগ ও নবী অবমাননার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর ↩︎
- সুনান আবূ দাউদ (তাহকিককৃত), আল্লামা আলবানী একাডেমী, হাদিসঃ ৪৩৬৩ ↩︎
- সুনান আন-নাসায়ী (ইসলামিক ফাউন্ডেশন), হাদিসঃ ৪০৭২ ↩︎
- কাজী ইয়াজ, আশ-শিফা, খণ্ড ২, পৃষ্ঠা ৫৩৯–৫৪২, নবীকে গালি ও মর্যাদাহানির সংজ্ঞা ↩︎
- আশ-শিফা, খণ্ড ২, পৃষ্ঠা ৫৪২; ইবনুল কাসিমের নামে সংরক্ষিত বিধান ↩︎
- আয়িশা কি নয়বছর বয়সে বয়ঃসন্ধিকালে পৌঁছেছিলেন? ↩︎
- উম্মে হানী- মুহাম্মদের গোপন প্রণয় ↩︎
- কাজী ইয়াজ, আশ-শিফা, খণ্ড ২, পৃষ্ঠা ৫৪২, ইবনে ওয়াহবের সূত্রে মালিকের বক্তব্য ↩︎
- প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের অবমাননার শাস্তি, পৃষ্ঠা ৫১ ↩︎
- ইযাহুল মুসলিম, মাওলানা আবু বকর সিরাজী, পৃষ্ঠা ৪০৮ ↩︎
- নবীর মানহানির শাস্তি মৃত্যুদণ্ড, মাওলানা মুহাম্মদ আবদুল মান্নান, পৃষ্ঠা ৭-১০, ১২-১৩ ↩︎
- ইসলামকিউএ, ফতোয়া ১৫০৯৮৯: নবীকে গালি দেওয়ার পর তওবা ও মৃত্যুদণ্ড ↩︎
- ইসলামকিউএ, ফতোয়া ১৫০৯৮৯; ইবনে উসাইমিন, মাজমু ফাতাওয়া, খণ্ড ২, পৃষ্ঠা ১৫০–১৫২ থেকে উদ্ধৃতি ↩︎
- কাজী ইয়াজ, আশ-শিফা, খণ্ড ২, নবী অবমাননাকারীর শাস্তি ও তওবার বিধান ↩︎
- ইবন আবিদিন, রদ্দুল মুহতার, খণ্ড ৪, জিম্মির চুক্তি বাতিল হওয়া ও না-হওয়ার বিধান; ইবনে তাইমিয়ার আস-সারিমুল মাসলুল থেকে উদ্ধৃতি ↩︎
- রদ্দুল মুহতার, কিতাবুল জিহাদ, জিম্মির নিরাপত্তাচুক্তি-সংক্রান্ত আলোচনা ↩︎
- কাজী ইয়াজ, আশ-শিফা, খণ্ড ২, নবী অবমাননার জন্য মুসলিম ও অমুসলিমের শাস্তি-সংক্রান্ত আলোচনা ↩︎
- ইবন কুদামা, আল-মুগনি, খণ্ড ৯, পৃষ্ঠা ১৯, কিতাবুল মুরতাদ, মাসআলা ৭০৮৯ ↩︎
- আল-কাসানি, বাদায়ি আস-সানায়ি, খণ্ড ৭, দণ্ড কার্যকরের শর্ত ↩︎
- Hannah Arendt, “The Origins of Totalitarianism”, 1951 ↩︎
- John Stuart Mill, “On Liberty”, 1859 ↩︎

