আদম ও মুসার বাদানুবাদ – ইসলামে যুক্তির ওপর অন্ধত্বের বিজয়

ভূমিকাঃ যুক্তি ও ওহীর সংঘাত এবং অদৃষ্টবাদের ব্যবচ্ছেদ

ইসলামী ধর্মতত্ত্বে আকল (যুক্তি) এবং ওহী (ঐশীবাণী)-র মধ্যকার চিরন্তন দ্বন্দ্ব সুপ্রাচীন। এই দ্বন্দ্বে যখনই কোনো মৌলিক যৌক্তিক প্রশ্ন উত্থাপিত হয়েছে, অধিকাংশ ক্ষেত্রে প্রথাগত গোঁড়ামি যুক্তিকে বিসর্জন দিয়ে টেক্সট বা বর্ণনানির্ভরতাকে প্রাধান্য দিয়েছে। এই প্রবণতার সবচেয়ে গভীর এবং দার্শনিক দিক থেকে সংকটাপন্ন উদাহরণ হলো ‘তাকদীর’ বা পূর্বনির্ধারণবাদের ধারণা। বিশেষ করে সহীহ বুখারী এবং সহীহ মুসলিমে বর্ণিত আদম ও মুসার বিতর্ক সংক্রান্ত হাদিসটি এই বৌদ্ধিক সংকটের অন্যতম কেন্দ্রবিন্দুতে অবস্থান করছে [1]

এই বিতর্কটি কেবল একটি ধর্মতাত্ত্বিক উপাখ্যান নয়, বরং এটি মানুষের স্বাধীন ইচ্ছাশক্তি (Free Will) এবং নৈতিক দায়বদ্ধতার মূলে কুঠারাঘাত করে। আদমের যুক্তিতে যেভাবে মানুষের কর্মকে তার সৃষ্টির বহু আগের লিখন হিসেবে জায়েজ করা হয়েছে, তা ন্যায়বিচারের সর্বজনীন ধারণাকেই ধূলিসাৎ করে দেয়। অত্র প্রবন্ধটি উক্ত হাদিসের আলোকে ইসলামের মৌলিক ন্যায়বিচারের ধারণার অসারতা প্রমাণ করবে এবং একটি চরম যুক্তিবিরোধী ও অদৃষ্টবাদী দর্শনের ব্যবচ্ছেদ করবে, যা আধুনিক জ্ঞানতত্ত্ব ও ব্যক্তি-স্বাতন্ত্র্যবাদের সাথে সরাসরি সাংঘর্ষিক।


বৌদ্ধিক স্থবিরতার পটভূমিঃ যুক্তি বনাম ঐশ্বরিক বাণী

ইসলামের ইতিহাসের প্রথম তিন শতাব্দী ছিল এক চরম বুদ্ধিবৃত্তিক অস্থিরতার সময়, যেখানে মানুষের কর্মের স্বাধীনতা এবং আল্লাহর নিরঙ্কুশ ক্ষমতার মধ্যে ভারসাম্য খোঁজার চেষ্টা করা হয়েছিল । এই সময়েই কাদারিয়া ও মুতাজিলাদের মতো যুক্তিবাদী গোষ্ঠীগুলোর উদ্ভব ঘটে, যারা মানুষের স্বাধীন ইচ্ছাশক্তিকে সমর্থন করত । তবে শেষ পর্যন্ত আশআরী ও ঐতিহ্যবাদী মতবাদ জয়ী হয়, যা যুক্তিকে ওহীর দাসে পরিণত করে । এই বৌদ্ধিক পরাজয়ের অন্যতম প্রধান হাতিয়ার ছিল সেই সব হাদিস, যা মানুষের সকল কর্মকাণ্ডকে সৃষ্টির পূর্বেই নির্ধারিত বলে ঘোষণা করে। এই বিষয়ে বিস্তারিত এই লেখাটিতে পাবেন [2]

আদম ও মুসার বিতর্ক সংক্রান্ত হাদিসটি কেবল একটি অতিপ্রাকৃত কথোপকথনের বর্ণনা নয়, বরং এটি ইসলামের দূর্গকে একদম ভেতর থেকে দার্শনিক ও যৌক্তিকভাবে চুরমার করে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট শক্তিশালী। যখনই কোনো মানুষ তার কর্মের জন্য দায়ী কি না—এই প্রশ্ন ওঠে, তখনই তাকদীর সম্পর্কে নানা ধরনের ধোঁয়াশা সৃষ্টি করে বলা হয়, এই বিষয়ে গভীর চিন্তা করা ইমানের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর। এই প্রক্রিয়ায় ইসলাম একটি যৌক্তিক ও নৈতিক ব্যবস্থার পরিবর্তে একটি অযৌক্তিক, যান্ত্রিক ও অদৃষ্টবাদী কাঠামোতে রূপান্তরিত হয়।


আদমের বিতর্ক ও যুক্তির ব্যবচ্ছেদঃ হাদিস পরিচিতি ও ভাষ্য

সহীহ মুসলিমের কিতাবুত তাকদীরে বর্ণিত হাদিস অনুসারে, নবী মুহাম্মাদ মুসা ও আদমের মধ্যকার একটি বিতর্কের বর্ণনা দিয়েছেন । এই বিতর্কটি মেরাজের রাতে তাদের মৃত্যুর পরে বা কোনো এক আধ্যাত্মিক জগতে সংঘটিত হয়েছিল । মুসা আদমকে দোষারোপ করে বলেন যে, তার ভুলের (নিষিদ্ধ বৃক্ষের ফল খাওয়া) কারণে মানবজাতি জান্নাত থেকে বঞ্চিত হয়েছে এবং পৃথিবীতে দুঃখ-কষ্টের শিকার হয়েছে ।

মুসা-এর এই অভিযোগটি ছিল অত্যন্ত যৌক্তিক এবং বাস্তব জগতের কারণ-ফলাফল ভিত্তিক। তিনি আদমকে তার ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তের জন্য দায়ী করছিলেন। কিন্তু এর জবাবে আদম যে যুক্তিটি দেন, তা ইসলামী দর্শনে একটি ‘বিজয়’ হিসেবে চিহ্নিত করা হলেও যৌক্তিক বিচারে তা গভীর সংকটের জন্ম দেয়। আদম বলেন, “আপনি কি আমাকে এমন এক কাজের জন্য তিরস্কার করছেন, যা আমার সৃষ্টির চল্লিশ বছর আগেই আল্লাহ আমার ভাগ্যে লিখে রেখেছিলেন?” । নবী মুহাম্মাদ (সা.) এই বিতর্কের শেষে তিনবার পুনরাবৃত্তি করেন যে, “আদম মুসার ওপর তর্কে জয়ী হলেন” ।

এই জয়ী হওয়ার বিষয়টিই মূলত সংকটের শুরু। কারণ, যদি আদম তার ভুলের জন্য দায়ী না হন কারণ তা পূর্বনির্ধারিত ছিল, তবে পৃথিবীতে কোনো মানুষেরই কোনো কর্মের জন্য নৈতিক বা আইনি দায়বদ্ধতা থাকা উচিত নয়। নিচের সারণিতে বিভিন্ন কিতাবে বর্ণিত এই হাদিসটির বর্ণনার ধরনগুলো তুলনা করা হলো:

হাদিস গ্রন্থবর্ণনা সূত্রমূল বিষয়বস্তুআদমের যুক্তিআদমের বিজয়
সহীহ বুখারীআবু হুরায়রাআদমের সৃষ্টির আগে তাকদীরে পাপ লেখা ছিল।আল্লাহর লিখনকে অস্বীকার করা অসম্ভব।স্পষ্টভাবে বর্ণিত।
সহীহ মুসলিমআবু হুরায়রা, তাওসমুসা ও আদম আল্লাহর সামনে তর্কে লিপ্ত হন।তাওরাতে এই ভুলের কথা পূর্বেই ছিল।তিনবার পুনরাবৃত্তি।
সুনান নাসাঈআবু হুরায়রাজান্নাত থেকে বহিষ্কারের কারণ নিয়ে বিতর্ক।ভাগ্যের লিখন কোনোভাবেই এড়ানো যায় না।নিশ্চিত করা হয়েছে।
মুসনাদে আহমাদআবু হুরায়রাআদম মুসাকে তর্কে পরাস্ত করেন।সৃষ্টির ৪০ বছর আগে নির্ধারিত বিষয়।বর্ণিত হয়েছে।

হাদিসগুলোর বিবরণঃ আদম মুসার ওপর বিজয়ী হলো

এই হাদিসগুলো থেকে ইসলামের ন্যায়বিচার ও আল্লাহর নির্ধারণ নিয়ে গভীর যৌক্তিক ও দার্শনিক দ্বন্দ্ব তৈরি হয়, যা ইসলামের ধারণাগত কাঠামোকে প্রশ্নবিদ্ধ করে,

সহীহ মুসলিম (ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
৪৮/ তাকদীর
পরিচ্ছেদঃ ২. আদম (আঃ) ও মুসা (আঃ) এর বিতর্ক
৬৫০১। মুহাম্মাদ ইবনু হাতিম, ইবরাহীম ইবনু দীনার, ইবনু আবূ উমর মাক্কী ও আহমাদ ইবনু আবদ দাব্বিয়্যু ও তাঊস (রহঃ) … আবূ হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ আদম (আলাইহিস সালাম) ও মূসা (আলাইহিস সালাম) এর মধ্যে বিতর্ক হয়। মূসা (আলাইহিস সালাম) বললেন, হে আদম! আপনি আমাদের পিতা, আপনি আমাদের বঞ্চিত করেছেন এবং জান্নাত থেকে আমাদের বের করে দিয়েছেন। তখন আদম (আলাইহিস সালাম) তাঁকে বললেন, আপনি তো মূসা। আল্লাহ তা’আলা আপনার সঙ্গে কথা বলে আপনাকে মনোনীত (সম্মানিত) করেছেন এবং আপনার জন্য তার হাতে লিখে (কিতাব তাওরাত) দিয়েছেন। আপনি কি এমন বিষয়ে আমাকে তিরস্কার করছেন যা আমার সৃষ্টির চল্লিশ বছর পূর্বে আল্লাহ তাআলা নির্ধারণ করে রেখেছেন।
রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেনঃ আদম (আলাইহিস সালাম) মূসা (আলাইহিস সালাম) এর উপর তর্কে বিজয়ী হলেন।

আর ইবনু আবূ উমর ও ইবনু আবাদাহ বর্ণিত হাদীসে তাদের একজন বলেছেন,خَطَّ অন্যজন বলেছেন,كَتَبَ তিনি তার হাতে তোমার জন্য তাওরাত লিপিবদ্ধ করে দিয়েছেন।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আবূ হুরায়রা (রাঃ)

সহীহ মুসলিম (ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
৪৮/ তাকদীর
পরিচ্ছেদঃ ২. আদম (আঃ) ও মুসা (আঃ) এর বিতর্ক
৬৫০২। কুতায়বা ইবনু সাঈদ (রহঃ) … আবূ হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ আদম (আলাইহিস সালাম) ও মূসা (আলাইহিস সালাম) পরস্পরে বিতর্কে অবতীর্ণ হলেন। মূসা (আলাইহিস সালাম) বললেন, আপনি তো সেই আদম (আলাইহিস সালাম) যিনি লোকদের গোমরাহ করেছেন এবং জান্নাত থেকে তাদের বহিস্কার করেছেন। তখন আদম (আলাইহিস সালাম) বললেন, আপনি তো সেই ব্যক্তি (নবী) যাতে আল্লাহ তাআলা সর্ব বিষয়ে ইলম দান করেছেন এবং রিসালাতের দায়িত্ব দিয়ে মানুষের কাছে পাঠিয়েছেন। মূসা (আলাইহিস সালাম) বললেন, হ্যাঁ। আদম (আলাইহিস সালাম) বললেন, আপনি আমাকে এমন একটি ব্যাপারে ভৎসনা করেছেন, যা আমার সৃষ্টির পূর্বে আমার উপর নির্ধারণ করা হয়েছে।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আবূ হুরায়রা (রাঃ)

সহীহ মুসলিম (ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
৪৮/ তাকদীর
পরিচ্ছেদঃ ২. আদম (আঃ) ও মুসা (আঃ) এর বিতর্ক
৬৫০৩। ইসহাক ইবনু মূসা ইবনু আবদুল্লাহ ইবনু মূসা, ইবনু আবদুল্লাহ ইবনু ইয়াযীদ আনসারী (রহঃ) … আবূ হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ আদম (আলাইহিস সালাম) ও মূসা (আলাইহিস সালাম) তাঁদের প্রতিপালকের কাছে তর্কে অবতীর্ণ হলেন। আদম (আলাইহিস সালাম) মূসা (আলাইহিস সালাম) এর উপর বিজয়ী হলেন। মূসা (আলাইহিস সালাম) বললেন, আপনি তো সেই আদম (আলাইহিস সালাম) যাকে আল্লাহ তা’আলা আপন হাতে সৃষ্টি করেছেন এবং আপনার মাঝে তিনি তাঁর রুহ ফুঁকে দিয়েছেন, তিনি তাঁর ফিরিশতাদের দ্বারা আপনাকে সিজদা করিয়েছেন এবং তাঁর জান্নাত আপনাকে বসবাস করতে দিয়েছেন। এরপর আপনি আপনার ভুলের দ্বারা মানুষকে পৃথিবীতে নামিয়ে এনেছেন।
আদম (আলাইহিস সালাম) বললেন, আপনি তো সেই মূসা (আলাইহিস সালাম) যাকে আল্লাহ তা’আলা রিসালাতের দায়িত্ব ও তার কালামসহ বিশেষ মর্যাদায় মনোনীত করেছেন এবং আপনাকে দান করেছেন ফলকসমূহ (তাওরাত কিতাব), যাতে সব কিছুর বর্ণনা লিপিবদ্ধ আছে এবং একান্তে কথোপকথনের জন্য অন্যান্যকে নৈকট্য দান করেছেন। আচ্ছা আমার সৃষ্টির কত বছর আগে আল্লাহ তায়ালা তাওরাত লিপিবদ্ধ করেছেন বলে আপনি দেখতে পেয়েছেন? মূসা (আলাইহিস সালাম) বললেন, চল্লিশ বছর আগে। আদম (আলাইহিস সালাম) বললেন, আপনি কি তাতে একথা পেয়েছেন, আদম তাঁর প্রতিপালকের নির্দেশ অমান্য করেছে এবং পথ হারা হয়েছে। বললেন, হ্যাঁ।
আদম (আলাইহিস সালাম) বললেন,
এরপর আপনি আমাকে আমার এমন কাজের জন্য কেন তিরস্কার করছেন যা আমাকে সৃষ্টি করার চল্লিশ বছর আগে আল্লাহ তাআলা আমার উপর নির্ধারণ করে রেখেছেন? রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ এরপর আদম (আলাইহিস সালাম) মূসা (আলাইহিস সালাম) এর উপর বিজয়ী হলেন।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আবূ হুরায়রা (রাঃ)


আলেমদের বক্তব্যঃ নবী আদমের বিজয়ে খুশি হলো

আসুন এই সম্পর্কে আলেমদের বক্তব্য শুনি,


তাকদীরের বিড়ম্বনাঃ নৈতিক দায়বদ্ধতা বনাম ঐশ্বরিক পূর্বনির্ধারণ

এই হাদিসের প্রধান দার্শনিক সংকট হলো এটি ‘স্বাধীন ইচ্ছাশক্তি’ (Free Will) এবং ‘ঐশ্বরিক ন্যায়বিচার’ (Divine Justice)-কে সরাসরি নাকচ করে দেয়। যদি আদমের নিষিদ্ধ বৃক্ষের ফল খাওয়ার বিষয়টি তার সৃষ্টির ৪০ বছর আগেই নির্ধারিত হয়ে থাকে, তবে সেই মহাজাগতিক পরিকল্পনায় আদম কেবল একটি ‘যন্ত্র’ বা ‘পুতুল’ ছাড়া আর কিছুই ছিলেন না।

যেকোনো আধুনিক আইনি বা নৈতিক ব্যবস্থায় শাস্তির প্রধান পূর্বশর্ত হলো ব্যক্তির সিদ্ধান্ত নেওয়ার স্বাধীনতা। যদি কোনো ব্যক্তি কোনো নির্দিষ্ট কাজ করতে বাধ্য হন, অথবা সেই কাজটি করার আগে থেকেই তার ওপর অবধারিত থাকে এবং তা এড়ানোর কোনো সুযোগ না থাকে, তবে তাকে নৈতিকভাবে ‘অপরাধী’ বলা অসম্ভব। আদমের ক্ষেত্রেও একই যুক্তি প্রযোজ্য। কিন্তু এখানে ইসলামের একটি স্পষ্ট স্ববিরোধিতা পরিলক্ষিত হয়: একদিকে দাবি করা হচ্ছে আদম “ভুল” করেছেন এবং ফলশ্রুতিতে তাকে জান্নাতচ্যুত করা হয়েছে; অন্যদিকে বলা হচ্ছে, এই ভুলটি করার কোনো বিকল্প আদমের ছিল না কারণ তা পূর্বনির্ধারিত ছিল।

যদি ঈশ্বর নিজেই কোনো ব্যক্তির ভাগ্যে পাপ লিখে রাখেন এবং পরবর্তীতে সেই নির্দিষ্ট পাপের জন্যই তাকে শাস্তি প্রদান করেন, তবে তাকে ‘ন্যায়বিচারক’ (Al-Adl) হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা যুক্তিবিরুদ্ধ হয়ে পড়ে। এটি ইসলামী আকিদাহর মৌলিক ‘আদল’ বা ন্যায়বিচারের ধারণার সাথে সরাসরি সাংঘর্ষিক। এই বৌদ্ধিক সংকটের কারণেই মুতাজিলা বা যুক্তিবাদী মুসলিম সম্প্রদায় তাকদীরের এই চরম রূপকে অস্বীকার করেছিলেন, কারণ তাদের মতে ঈশ্বর মন্দ কাজের স্রষ্টা হতে পারেন না [3]। তবে সুন্নি অর্থোডক্স চিন্তাধারা, বিশেষ করে আশআরী মতবাদ, যুক্তিকে বিসর্জন দিয়ে এই হাদিসভিত্তিক অদৃষ্টবাদকেই আঁকড়ে ধরেছে।


উপসংহারঃ একটি যুক্তিনির্ভর ভবিষ্যতের সন্ধান

আদম ও মুসার বিতর্ক সংক্রান্ত হাদিস এবং ইসলামের তাকদীর তত্ত্ব বিশ্লেষণ করলে একটি কঠোর অদৃষ্টবাদী (Deterministic) কাঠামোর প্রতিফলন দেখা যায়, যা মানুষের স্বাধীন ইচ্ছাশক্তিকে (Free Will) কার্যত গৌণ করে ফেলে। এই বিতর্কে আদমের ‘বিজয়’ মূলত যুক্তির ওপর অন্ধ বিশ্বাসের প্রাধান্যকে প্রতিষ্ঠিত করে। এই দর্শন কেবল ন্যায়বিচারের ধ্রুপদী ধারণাকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে না, বরং সমাজকে একটি স্থবির ও নিয়তিবাদী ব্যবস্থার দিকে ঠেলে দেয়।

তাকদীরের এই যুক্তি যদি বাস্তব জীবনে প্রয়োগ করা হয়, তবে তা ভয়াবহ আইনি ও নৈতিক জটিলতা সৃষ্টি করতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, কোনো অপরাধী যদি তার কৃতকর্মের জন্য আদমের মতো পূর্বনির্ধারিত ভাগ্যের দোহাই দেয়, তবে ইসলামী ধর্মতত্ত্ব অনুযায়ী তাকে ব্যক্তিগতভাবে দায়ী করা যৌক্তিক ভিত্তি হারায়। যদিও বলা হতে পারে যে তার ‘শাস্তি’ হওয়াটাও পূর্বনির্ধারিত ছিল, কিন্তু এতে অপরাধের নৈতিক দায়বদ্ধতা বা শাস্তির যৌক্তিক ন্যায্যতা (Moral Justification) প্রতিষ্ঠিত হয় না।

ইসলামী ধর্মতত্ত্বের এই গভীর দার্শনিক সংকট থেকে উত্তরণের জন্য ‘আকল’ বা যুক্তিকে সর্বোচ্চ প্রাধান্য দেওয়া অপরিহার্য। যতক্ষণ মানুষ বিশ্বাস করবে যে তার প্রতিটি বিচ্যুতি সৃষ্টির বহু আগেই লিপিবদ্ধ ছিল, ততক্ষণ পর্যন্ত ব্যক্তি-দায়বদ্ধতার (Individual Accountability) ধারণাটি বিকশিত হবে না। প্রকৃত নৈতিকতা জন্ম নেয় স্বাধীন পছন্দ থেকে, কোনো মহাজাগতিক বাধ্যবাধকতা থেকে নয়।

আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞান এবং মানবাধিকারের সর্বজনীন নীতির সাথে ইসলামের এই অদৃষ্টবাদী কাঠামোটি প্রায়শই সাংঘর্ষিক অবস্থানে থাকে। আদম ও মুসার এই রূপক বিতর্কটি আসলে একটি দার্শনিক ফাঁদ, যা মানুষের চিন্তাশক্তিকে ঐতিহ্যের প্রকোষ্ঠে বন্দি করে রাখে। আধুনিক যুগে প্রগতির প্রকৃত পথ হলো এই ধরণের নিয়তিবাদকে অস্বীকার করা এবং নিজের জীবনের ওপর মানুষের নিজস্ব কর্তৃত্ব ও দায়বদ্ধতা প্রতিষ্ঠা করা।


তথ্যসূত্রঃ
  1. সহীহ বুখারী, হাদিস নং ৬৬১৪; সহীহ মুসলিম, হাদিস নং ২৬৫২ ↩︎
  2. ইসলামের অন্যতম ভিত্তি তাকদীর প্রসঙ্গে ↩︎
  3. আল-শাহারস্তানি, কিতাব আল-মিলাল ওয়ান নিহাল ↩︎