এক’শজন হত্যা করেও জান্নাতি

ভূমিকা


ইসলামী নৈতিক কাঠামোর একটি কেন্দ্রীয় দাবি হলো—মানুষ যত বড় অপরাধই করুক, “আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস” এবং “তওবার ইচ্ছা” থাকলে শেষপর্যন্ত তার মুক্তির দরজা খোলা থাকতে পারে। এই দাবিটি বাস্তব নৈতিক বিচারবোধ (moral intuition) এবং ন্যায়বিচারের (justice) সাথে কোথায় সংঘর্ষে পড়ে—তা সবচেয়ে তীব্রভাবে সামনে আসে একটি বহুল পরিচিত হাদিস-গল্পে: যে ব্যক্তি ৯৯ জন মানুষ হত্যা করার পরে তওবার সুযোগ খুঁজতে গিয়ে একজন রাহিবকে হত্যা করে ১০০ পূর্ণ করে, এরপর ‘আলিম’-এর পরামর্শে “ভালো দেশে” রওয়ানা হয়ে পথেই মারা যায় এবং শেষ বিচারে ‘রহমতের ফেরেশতা’ তাকে নিয়ে যায়।

সমস্যা হলো—এই ন্যারেটিভটি শুধুই “আল্লাহর অসীম করুণা বা আল্লাহ মহান” ধরনের আবেগঘন বার্তা নয়; এর মধ্যে একটি কার্যকর নৈতিক নীতি (normative principle) নিহিত আছে: বহু হত্যার মতো চূড়ান্ত অপরাধও শেষ পর্যন্ত “বিশ্বাস + তওবা-উদ্দেশ্য” দ্বারা শুদ্ধকরণ বা ওভাররাইড (override) হতে পারে। যদি কথাটি নীতিগতভাবে সত্য হয়, তাহলে ন্যায়বিচারের মৌল ধারণা—অপরাধের ন্যায্য প্রতিকার, ভুক্তভোগীর অধিকার, এবং দায়-অনুপাত (proportional responsibility)—এসবের সাথে এর সংঘর্ষ অনিবার্য হয়ে দাঁড়ায়।


হাদিসের বিবরণ সমূহ

এই হাদিস-ন্যারেটিভ ও এর প্রচলিত ব্যাখ্যা থেকে বোঝা যায়, একজন মানুষ শতাধিক খুন করার পরেও, শুধুমাত্র আল্লাহর প্রতি যুক্তিপ্রমাণহীন বিশ্বাস এবং আল্লাহর কাছে তওবা করার ইচ্ছা প্রকাশ করলেই, সে জান্নাতে যেতে পারবে। একটি বিখ্যাত হাদিসে এই বিষয়টি খুব পরিষ্কারভাবে বর্ণনা করা হয়েছে। [1] [2] [3] তাহলে যারা একটিও খুন করেন নি, অথচ তাদের ভাগ্যে আল্লাহ আগেই জাহান্নামি লিখে দিয়েছেন, যারা কাফের হয়ে জন্মেছে এবং কুফরি অবস্থাতেই মারা গেছে, তাদের সাথে বিষয়টি ইনসাফ হলো কী?

রিয়াযুস স্বা-লিহীন
অধ্যায়ঃ ১/ বিবিধ
পরিচ্ছেদঃ ২: তওবার বিবরণ
৮/২১। আবূ সাঈদ সা‘দ ইবনু মালেক ইবনু সিনান খুদরী রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘‘তোমাদের পূর্বে (বনী ইস্রাইলের যুগে) একটি লোক ছিল; যে ৯৯টি মানুষকে হত্যা করেছিল। অতঃপর লোকদেরকে বিশ্বের সবচেয়ে বড় আলেম সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করল। তাকে একটি খ্রিষ্টান সন্নাসীর কথা বলা হল। সে তার কাছে এসে বলল, ‘সে ৯৯ জন মানুষকে হত্যা করেছে। এখন কি তার তওবার কোন সুযোগ আছে?’ সে বলল, ‘না।’ সুতরাং সে (ক্রোধান্বিত হয়ে) তাকেও হত্যা করে একশত পূরণ করে দিল। পুনরায় সে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় আলেম সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করল। এবারও তাকে এক আলেমের খোঁজ দেওয়া হল। সে তার নিকট এসে বলল যে, সে একশত মানুষ খুন করেছে। সুতরাং তার কি তওবার কোন সুযোগ আছে? সে বলল, ‘হ্যাঁ আছে! তার ও তওবার মধ্যে কে বাধা সৃষ্টি করবে? তুমি অমুক দেশে চলে যাও। সেখানে কিছু এমন লোক আছে যারা আল্লাহ তা‘আলার ইবাদত করে। তুমিও তাদের সাথে আল্লাহর ইবাদত কর। আর তোমার নিজ দেশে ফিরে যেও না। কেননা, ও দেশ পাপের দেশ।’
সুতরাং সে ব্যক্তি ঐ দেশ অভিমুখে যেতে আরম্ভ করল। যখন সে মধ্য রাস্তায় পৌঁছল, তখন তার মৃত্যু এসে গেল। (তার দেহ-পিঞ্জর থেকে আত্মা বের করার জন্য) রহমত ও আযাবের উভয় প্রকার ফিরিশ্তা উপস্থিত হলেন। ফিরিশ্তাদের মধ্যে তর্ক-বিতর্ক আরম্ভ হল। রহমতের ফিরিশ্তাগণ বললেন, ‘এই ব্যক্তি তওবা করে এসেছিল এবং পূর্ণ আন্তরিকতার সাথে আল্লাহর দিকে তার আগমন ঘটেছে।’ আর আযাবের ফিরিশ্তারা বললেন, ‘এ এখনো ভাল কাজ করেনি (এই জন্য সে শাস্তির উপযুক্ত)।’ এমতাবস্থায় একজন ফিরিশ্তা মানুষের রূপ ধারণ করে উপস্থিত হলেন। ফিরিশ্তাগণ তাঁকে সালিস মানলেন। তিনি ফায়সালা দিলেন যে, ‘তোমরা দু’ দেশের দূরত্ব মেপে দেখ। (অর্থাৎ এ যে এলাকা থেকে এসেছে সেখান থেকে এই স্থানের দূরত্ব এবং যে দেশে যাচ্ছিল তার দূরত্ব) এই দুয়ের মধ্যে সে যার দিকে বেশী নিকটবর্তী হবে, সে তারই অন্তর্ভুক্ত হবে।’ অতএব তাঁরা দূরত্ব মাপলেন এবং যে দেশে সে যাওয়ার ইচ্ছা করেছিল, সেই (ভালো) দেশকে বেশী নিকটবর্তী পেলেন। সুতরাং রহমতের ফিরিশতাগণ তার জান কবয করলেন।’’ (বুখারী ও মুসলিম)
সহীহতে আর একটি বর্ণনায় এরূপ আছে যে, ‘‘পরিমাপে ঐ ব্যক্তিকে সৎশীল লোকদের দেশের দিকে এক বিঘত বেশী নিকটবর্তী পাওয়া গেল। সুতরাং তাকে ঐ সৎশীল ব্যক্তিদের দেশবাসী বলে গণ্য করা হল।’’
সহীহতে আরো একটি বর্ণনায় এইরূপ এসেছে যে, ‘‘আল্লাহ তা‘আলা ঐ দেশকে (যেখান থেকে সে আসছিল তাকে) আদেশ করলেন যে, তুমি দূরে সরে যাও এবং এই সৎশীলদের দেশকে আদেশ করলেন যে, তুমি নিকটবর্তী হয়ে যাও। অতঃপর বললেন, ‘তোমরা এ দু’য়ের দূরত্ব মাপ।’ সুতরাং তাকে সৎশীলদের দেশের দিকে এক বিঘত বেশী নিকটবর্তী পেলেন। যার ফলে তাকে ক্ষমা করে দেওয়া হল।’’
আরো একটি বর্ণনায় আছে, ‘‘সে ব্যক্তি নিজের বুকের উপর ভর করে ভালো দেশের দিকে একটু সরে গিয়েছিল।’’(1)
(1) সহীহুল বুখারী ৩৪৭০, মুসলিম ২৭৬৬, ইবনু মাজাহ ২৬২৬, আহমাদ ১০৭৭০, ১১২৯০
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)

সহীহ মুসলিম (ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
৫১/ তাওবা
পরিচ্ছেদঃ ৮. হত্যাকারীর তাওবা আল্লাহর দরবারে গ্রহণযোগ্য; যদিও সে বহু হত্যা করে থাকে
৬৭৫২। মুহাম্মাদ ইবনু মুসান্না ও মুহাম্মাদ ইবনু বাশশার (রহঃ) … আবূ সাঈদ খুদরী (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ তোমাদের পূর্ববর্তীদের মধ্যে এক লোক ছিলো। সে নিরানব্বই ব্যক্তিকে হত্যা করার পর জিজ্ঞাসা করল, এ পৃথিবীতে সবচেয়ে বড় আলিম ব্যক্তি কে? তাকে এক রাহিবের সন্ধান দেওয়া হয়। সে তার কাছে এসে বলল, যে, সে নিরানব্বই ব্যক্তিকে হত্যা করেছে এমতাবস্থায় তার জন্য কি তাওবা আছে? রাহিব বলল, না। তখন সে রাহিবকেও হত্যা করে ফেলল। এবং এর (রাহিবের) হত্যা দ্বারা একশ পূর্ণ করল।
তারপর সে আবার প্রশ্ন করল এ পৃথিবীতে সবচেয়ে বড় আলিম কে? তখন তাকে এক আলিম ব্যক্তির সন্ধান দেওয়া হল। সে আলিমকে সে বলল যে, সে একশ ব্যক্তিকে হত্যা করেছে, তার জন্য কি তাওবা আছে? আলিম ব্যক্তি বললেন, হ্যাঁ। এ তাওবার মধ্যে কে অন্তরায় হতে পারে? তুমি অমুক দেশে যাও। সেখানে কতিপয় লোক আল্লাহর ইবাদতে নিয়োজিত আছে। তুমিও তাদের সঙ্গে আল্লাহর ইবাদতে মশশুল হয়ে যাও। নিজের দেশে আর কখনো ফিরে যেয়ো না। কেননা এ দেশটি বড় মন্দ। তারপর সে চলতে লাগল। এমন কি যখন সে অর্ধ পথে পৌছে তখন তার মৃত্যু এল।
এরপর রহমতের ফিরিশতা ও আযাবের ফিরিশতার মধ্যে তার সম্পর্কে বিবাদ লেগে গেল। রহমতের ফিরিশতারা বললেন, সে অন্তরের আবেগ নিয়ে আল্লাহর দিকে তাওবার জন্য ধাবিত হয়ে এসেছে। আর আযাবের ফিরিশতারা বললেন, সে তো কখনো কোন নেক আমল করেনি। এ সময় মানুষের সুরতে এক ফিরিশতা এলেন। তারা তাকে তাদের মধ্যে মীমাংসাকারী নির্ধারণ করলেন।
তিনি তাদের বললেন, তোমরা দুই দেশের মধ্যবর্তী দূরত্ব মেপে নাও। দুই স্থানের মধ্যে যে স্থানের দিকে সে অধিক নিকটবর্তী হবে তাকে সে স্থানেরই গণ্য করা হবে। তারা মাপলেন।তখন তাঁরা তাকে উদ্দিষ্ট স্থানের অধিক নিকটবর্তী পেলেন। তখন রহমতের ফিরিশতা তাকে কবজ করে নিলেন। কাদাতা (রহঃ) বলেন, হাসান (রহঃ) বলেছেন, আমাদের নিকট বর্ণনা করা হয়েছে যে, যখন তার মৃত্যু এল, তখন সে বুকের উপর ভর দিয়ে (কিছু এগিয়ে) গেল।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আবূ সা’ঈদ খুদরী (রাঃ)

সহীহ মুসলিম (ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
৫১/ তাওবা
পরিচ্ছেদঃ ৮. হত্যাকারীর তাওবা আল্লাহর দরবারে গ্রহণযোগ্য; যদিও সে বহু হত্যা করে থাকে
৬৭৫৩। উবায়দুল্লাহ ইবনু মু’আয আনবারী (রহঃ) … আবূ সাঈদ খুদরী (রাঃ) থেকে বর্ণিত যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, এক ব্যক্তি নিরানব্বই ব্যক্তিকে হত্যা করে জিজ্ঞাসা করে বেড়াতে লাগল, তার কি তাওবা আছে?অবশেষে সে এক পাদ্রীর নিকট এসে এ সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করল। পাদ্রী বলল, তোমার জন্য তাওবা নেই। তখন সে পাদ্রীকে হত্যা করল।এরপর সে আবারো লোকদের জিজ্ঞাসা করতে লাগল। তারপর সে এক জনপদ থেকে অন্য জনপদের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হল যেখানে কিছু নেক লোকের বসবাস ছিলো। রাস্তার এক অংশে তাকে মৃত্যু পেয়ে বসল। তখন সে বুকের উপর ভর করে সামনের দিকে অগ্রসর হলে। তারপর সে মারা গেল। তখন রহমতের ফিরিশতা ও আযাবের ফিরিশতা তার সম্পর্কে বিবাদে লিপ্ত হল। তখন দেখা গেল যে, সে নেক লোকদের জনপদের দিকে এক বিঘত পরিমাণ নিকটবর্তী রয়েছে। তাই তাকে তাদেরই অন্তর্ভুক্ত গণ্য করা হল।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আবূ সা’ঈদ খুদরী (রাঃ)


আলেমদের ওয়াজঃ নৈতিক শিক্ষা নাকি আনুগত্যের?

আসুন এ বিষয়ে মিজানুর রহমান আজহারীর বক্তব্যও শুনে নেই—এখানে তিনি কীভাবে এই হাদিস থেকে “নৈতিক শিক্ষা” দাঁড় করান, এবং সেই ব্যাখ্যা উপরোক্ত ন্যায়-সংকটগুলোকে সমাধান করে কি না, তা যুক্তির মানদণ্ডে যাচাই করা যায়,


ভুক্তভোগী’-দের ন্যায়বিচার অনুপস্থিত

এই হাদিস-কাহিনির সবচেয়ে বড় নৈতিক শূন্যতা হলো—এখানে ১০০ জন নিহত মানুষের কোনো নৈতিক উপস্থিতি নেই। তাদের জীবন, পরিবার, ক্ষতি, ক্ষতিপূরণ (restitution), কিংবা ‘ন্যায়’—কিছুই আলোচ্য নয়। পুরো বিচার-প্রক্রিয়া দাঁড়িয়ে আছে শুধু অপরাধীর অভ্যন্তরীণ মনোভাব (intention) এবং “সে কোন দেশের দিকে কিছুটা এগিয়েছে”—এ ধরনের প্রায় জ্যামিতিক/কারিগরি মাপজোখের (distance-measurement) সিদ্ধান্তের ওপর।

এখানে নৈতিক প্রশ্নটা সরাসরি: যে ১০০ জন মানুষকে হত্যা করা হলো—তাদের প্রতি ইনসাফের হিসাব কোথায়? একটি ন্যায়বিচার ব্যবস্থা সাধারণত অন্তত তিনটি জিনিস দাবি করে: (ক) অপরাধীর দায়-স্বীকার, (খ) ভুক্তভোগীর ক্ষতির স্বীকৃতি ও প্রতিকার, (গ) অপরাধের মাত্রা অনুযায়ী শাস্তি/জবাবদিহি। এই গল্পে (খ) এবং (গ) কার্যত গায়েব। বরং “তওবার দরজা” এতটাই একচ্ছত্র যে, ভুক্তভোগীদের ন্যায় দাবিটা নীতিগতভাবে থাকে না, তাদের অধিকারও রক্ষা হয় না।


‘নৈতিক ঝুঁকি’ – অপরাধকে সস্তা করার কাঠামো

যে নৈতিক কাঠামোতে একজন ব্যক্তি ১০০ খুন করার পরও শেষ বিচারে মূলত “ইচ্ছা প্রকাশ” এবং “ভালো দিকে যাত্রা” দিয়ে মুক্তি পায়—সেখানে অপরাধের নৈতিক মূল্য (moral cost) কমে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়। এটা নৈতিক তত্ত্বের ভাষায় moral hazard: আপনি যদি জানেন যে শেষমেশ একটি নির্দিষ্ট অভ্যন্তরীণ অবস্থান (বিশ্বাস/অনুশোচনা) সবকিছুকে মুছে দিতে পারে, তাহলে অপরাধ-প্রতিরোধের (deterrence) নৈতিক ভিত্তিও দুর্বল হয়।

এখানে কেউ বলতে পারে, “আসল তওবা কঠিন, সবাই পারে না”—কিন্তু হাদিসটি যে মেসেজটি দেয় তা হলো: শেষ বিচারে ‘অপরাধের পরিমাণ’ নয়, ‘শেষ মুহূর্তের অন্তর্গত টার্ন’ বেশি নিয়ামক। এই অগ্রাধিকারের নৈতিক ফলাফল হলো—মানুষের মধ্যে ন্যায়বোধের একটি মৌল প্রত্যাশা ভাঙে: চূড়ান্ত অপরাধের চূড়ান্ত জবাবদিহি থাকা উচিত।


তাকদীরঃ আগে লেখা জাহান্নাম বনাম পরে পাওয়া জান্নাত

মূল প্রশ্নটা এখানেই সবচেয়ে ধারালো হয়: “যারা একটি খুনও করেনি, অথচ আল্লাহ আগেই তাদের জাহান্নামি লিখে দিয়েছেন”—তাদের সাথে ইনসাফ কোথায়? যদি তাকদীর অনুযায়ী কারো পরিণতি আগে থেকেই নির্ধারিত থাকে, তাহলে নৈতিক বিচার কথাটাই অর্থহীন হয়ে পড়ে, কারণ বিচার তখন আর ‘কর্মের’ ওপর নয়—একটি পূর্বলিখিত ফলাফলের ওপর দাঁড়ায়। আর যদি তাকদীর সত্যিই চূড়ান্ত হয়, তবে এই “হত্যাকারীর তওবা” ঘটনাও শেষ পর্যন্ত পূর্বনির্ধারিত নাটক (script) ছাড়া কিছু নয়—যেখানে অপরাধীও ‘নিজে’ মূল লেখক নয় [4]

এই দ্বন্দ্ব থেকে বের হওয়ার সাধারণ চেষ্টা ব্যর্থ হয়: একদিকে বলা হয়, আল্লাহ সর্বজ্ঞানী—তাই ফলাফল জানেন; অন্যদিকে বলা হয়, মানুষ দায়ী—তাই শাস্তি/পুরস্কার ন্যায্য। কিন্তু হাদিসের এই কাঠামোতে দায়-অনুপাত আরও অস্পষ্ট হয়: ১০০ হত্যার মতো অপরাধের ‘বিচার’ দূরত্ব-হিসাব আর শেষমুহূর্তের ইচ্ছা দ্বারা নির্ধারিত হলে, “কর্ম-জবাবদিহি” (accountability) কেবল একটি প্রতীকী দাবি হয়ে দাঁড়ায়—বাস্তব ন্যায়নীতি নয়।


‘ফেরেশতাদের বিতর্ক’ এবং বিচার-নীতির শূন্যতা

গল্পে দেখা যায়, রহমত ও আযাবের ফেরেশতারা তর্ক করে—একপক্ষ বলে “তওবা করে এসেছে”, অন্যপক্ষ বলে “এখনও ভালো কাজ করেনি”; পরে একজন ‘মানুষরূপী’ ফেরেশতা এসে সালিশ হয় এবং দুই দেশের দূরত্ব মাপার সিদ্ধান্ত দেয়। এটি ধর্মীয় ন্যারেটিভ হিসেবে নাটকীয় হতে পারে, কিন্তু নৈতিক দর্শনের দৃষ্টিতে প্রশ্ন জাগায়: ন্যায়বিচার কি সত্যিই এমন মেকানিক্যাল (mechanical) শর্তে দাঁড়িয়ে—কোন দিকে কয়েক হাত/এক বিঘত বেশি নিকট, কিংবা আল্লাহ দেশকে “সরে যেতে/কাছে আসতে” আদেশ দিলেন বলে? এই অংশগুলো বিচারকে নৈতিকতার বদলে প্রায় “গাণিতিক কৌশল” হিসেবে উপস্থাপন করে—যা ন্যায়বোধকে সন্তুষ্ট করার বদলে আরও সন্দেহ জাগায়।

এর অর্থ এটিও যে, আল্লাহর বিধানে সুনির্দিষ্ট কোন ন্যায় অন্যায়ের সংজ্ঞা এবং কোনটির জন্য কি শাস্তি তা পরিষ্কার নয়, উকিলের মত ফেরেশতাদের বিতর্কের সেখানে প্রয়োজন হয়। সেই বিতর্কে যে জয় লাভ করে, বান্দাকে সেই শাস্তি বা রহমত দেয়া হয়। এগুলো খুবই মানবীয় উদাহরণ, যা পড়লে বোঝা যায় মানুষের আচার আচরণ দেখেই এসব গল্প তৈরি করা হয়েছে। যেই ফেরেশতারা আল্লাহর আইন ও নির্দেশ মোতাবেক চলে, তাদের এরকম মানুষের আদালতের উকিলদের মত বিতর্ক করার কথা নয়।


নৈতিকতার বদলে আনুগত্য-নীতির আধিপত্য

এই ধরনের হাদিস থেকে একটি বড় কাঠামোগত বার্তা তৈরি হয়: নৈতিক অপরাধের চূড়ান্ত ওজন নির্ধারিত হয় ‘ঈশ্বর-সম্পর্ক’ (belief/repentance) দ্বারা, ‘মানুষ-সম্পর্ক’ (victims/restitution) দ্বারা নয়। এতে নৈতিকতা পরিণত হয় “ঈশ্বরের প্রতি আনুগত্য”কেন্দ্রিক একটি সিস্টেমে—যেখানে মানুষ হত্যা করা ভয়াবহ, কিন্তু শেষ বিচারে সেটি ‘আল্লাহর কাছে অবস্থান’ দ্বারা ঢেকে যেতে পারে। ফলাফল: মানবিক ন্যায়নীতি (human-centered justice) ধর্মীয় আনুগত্যনীতির (obedience-centered salvation) অধীনস্থ হয়ে যায়। যদি “যুক্তিপ্রমাণহীন বিশ্বাস” এবং “তওবার ইচ্ছা” ১০০ হত্যাকেও শেষ বিচারে অকার্যকর করে দিতে পারে, তাহলে ন্যায়ের মানদণ্ড আসলে নৈতিক নয়—ক্ষমতা ও কর্তৃত্বভিত্তিক (authority-based) হয়ে দাঁড়ায়: যিনি ক্ষমা করবেন তিনি ক্ষমা করবেন, ভুক্তভোগীর ন্যায্য দাবির কোনো স্বতন্ত্র নৈতিক ওজন থাকবে না।


উপসংহার

এই হাদিস-গল্পটি জনপ্রিয় হয়েছে “আল্লাহর রহমত অপরিসীম” ধরনের বার্তার কারণে। কিন্তু যুক্তিবাদী ও নৈতিক বিশ্লেষণে এটি একটি গুরুতর সংকট উন্মোচন করে: (১) ভুক্তভোগীর ন্যায় দাবি অনুপস্থিত, (২) চূড়ান্ত অপরাধের চূড়ান্ত জবাবদিহি দুর্বল, (৩) তাকদীর-ধারণা থাকলে ন্যায়বিচার ধারণাটাই ধসে পড়ে, এবং (৪) বিচারকে “দূরত্ব-হিসাব/কারিগরি সালিশ”-এ নামিয়ে আনা হয়। ফলে প্রশ্নটা অনিবার্য: যারা অপরাধ করেনি, অথচ ‘পূর্ব নির্ধারিতভাবে জাহান্নামি’—তাদের ইনসাফ কোথায়? আর যে ১০০ মানুষ খুন করলো—তার জন্য যদি শেষমুহূর্তের ইচ্ছাই যথেষ্ট হয়, তবে ন্যায়বিচার কি আদৌ নৈতিক বিচার হিসেবে টিকে থাকে, নাকি শুধুই কর্তৃত্বের দাপট হয়ে যায়?


তথ্যসূত্রঃ
  1. রিয়াযুস স্বা-লিহীন, হাদিসঃ ২১ ↩︎
  2. সহীহ মুসলিম, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, হাদিসঃ ৬৭৫২ ↩︎
  3. সহীহ মুসলিম, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, হাদিসঃ ৬৭৫৩ ↩︎
  4. ইসলামের অন্যতম ভিত্তি তাকদীর প্রসঙ্গে ↩︎