
Table of Contents
ভূমিকা
পৃথিবীর ঋতু পরিবর্তন, যেমন শীত এবং গ্রীষ্ম, একটি প্রাকৃতিক প্রক্রিয়া যা বৈজ্ঞানিক পর্যবেক্ষণ এবং যুক্তির ভিত্তিতে ব্যাখ্যা করা যায়। বিদ্যালয়ের পাঠ্যক্রমে আমরা শিখি যে এই পরিবর্তনের মূল কারণ পৃথিবীর অক্ষের হেলানো এবং সূর্যের চারপাশে তার আবর্তন। এটি একটি যৌক্তিক, প্রমাণভিত্তিক ব্যাখ্যা যা পৃথিবীর গতিশীলতা এবং সৌরশক্তির বিতরণের উপর নির্ভর করে। কিন্তু ইসলামী শিক্ষা ব্যবস্থায়, বিশেষ করে মাদ্রাসায়, এই বিষয়ে একটি সম্পূর্ণ অযৌক্তিক এবং অন্ধবিশ্বাসমূলক ধারণা প্রচার করা হয়: শীত এবং গ্রীষ্ম জাহান্নামের শ্বাস-প্রশ্বাসের কারণে ঘটে। এই প্রবন্ধে আমরা প্রথমে বিজ্ঞানীয় ব্যাখ্যা বিস্তারিতভাবে আলোচনা করব, তারপর ইসলামী অন্ধবিশ্বাসের পর্যালোচনা করবো, যাতে দেখা যায় কীভাবে এই ধরনের কুসংস্কার যুক্তিবাদী চিন্তাধারা এবং আধুনিক সমাজ গঠনের পথে বাধা সৃষ্টি করে।
শীতগ্রীষ্মের কারণ সম্পর্কে বর্তমান বৈজ্ঞানিক জ্ঞান
বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিকোণ থেকে, পৃথিবীর ঋতু পরিবর্তনের মূল কারণ তার ঘূর্ণন অক্ষের প্রায় ২৩.৫ ডিগ্রি হেলানো এবং সূর্যের চারপাশে উপবৃত্তাকার কক্ষপথে আবর্তন। পৃথিবী তার অক্ষে ২৪ ঘণ্টায় একবার ঘুরে দিন-রাত সৃষ্টি করে, কিন্তু অক্ষের এই হেলানোর ফলে সূর্যের আলো পৃথিবীর বিভিন্ন অংশে অসমানভাবে পড়ে। ফলে, উত্তর এবং দক্ষিণ গোলার্ধে সূর্যের রশ্মির তীব্রতা এবং দিনের দৈর্ঘ্য পরিবর্তিত হয়, যা ঋতু চক্রের জন্ম দেয়। [1] [2] [3] [4]
গ্রীষ্মকালে, যে গোলার্ধ সূর্যের দিকে হেলে থাকে (যেমন জুন মাসে উত্তর গোলার্ধ), সেখানে সূর্যের রশ্মি আরও সরাসরি পড়ে, দিন দীর্ঘ হয় এবং রাত ছোট। এর ফলে তাপমাত্রা বৃদ্ধি পায় এবং গ্রীষ্ম ঋতু তৈরি হয়। বিপরীতভাবে, শীতকালে একই গোলার্ধ সূর্য থেকে দূরে সরে যায়, রশ্মি তির্যকভাবে পড়ে, দিন ছোট হয় এবং তাপমাত্রা কমে যায়। এই প্রক্রিয়াটি পৃথিবীর সূর্য থেকে দূরত্বের সাথে সম্পর্কিত নয়—যা একটি সাধারণ ভুল ধারণা। পৃথিবীর কক্ষপথ উপবৃত্তাকার হলেও, সূর্য থেকে দূরত্বের সামান্য পরিবর্তন (পেরিহেলিয়ন এবং অ্যাপোহেলিয়ন) ঋতু পরিবর্তনের জন্য দায়ী নয়; এটি অক্ষের হেলানোর ফলাফল [5] [6]। আসুন একটি ভিডিও দেখি,
এই ব্যাখ্যাটি বিজ্ঞানীয় পর্যবেক্ষণ, অ্যাস্ট্রোনমিক্যাল মডেল এবং স্যাটেলাইট ডেটার ভিত্তিতে প্রমাণিত। উদাহরণস্বরূপ, নাসার ডেটা দেখায় যে অক্ষের হেলানো ছাড়া পৃথিবীতে ঋতু চক্র থাকত না। এটি একটি প্রাকৃতিক, গতিশীল প্রক্রিয়া যা পৃথিবীর আবহাওয়া, তাপমাত্রা এবং জীবনচক্রকে প্রভাবিত করে। নিচে চিত্রের মাধ্যমে বিষয়টি বোঝানো হচ্ছে,

বাংলাদেশের পাঠ্যপুস্তক থেকে
এবারে আসুন বাংলাদেশের একটি পাঠ্যপুস্তক থেকেও বিষয়টি দেখে নিই,




শীতগ্রীস্মের কারণ সম্পর্কে ইসলামী কুসংস্কার
ইসলামী ধর্মগ্রন্থ এবং শিক্ষায় ঋতু পরিবর্তনের একটি সম্পূর্ণ অযৌক্তিক এবং অন্ধবিশ্বাসমূলক ব্যাখ্যা প্রচার করা হয়: শীত এবং গ্রীষ্ম জাহান্নামের শ্বাস-প্রশ্বাসের কারণে ঘটে। এটি একটি প্রাচীনকালীন কুসংস্কার যা কোনো যুক্তি বা প্রমাণের ভিত্তিতে দাঁড়ায় না, বরং মানুষের অজ্ঞতা এবং কল্পনাপ্রসূত ধারণার ফলাফল। এই ধারণাটি বিজ্ঞানের সাথে সরাসরি সাংঘর্ষিক এবং যুক্তিবাদী চিন্তাধারাকে অস্বীকার করে, যা আধুনিক সমাজে অগ্রগতির পথে একটি গুরুতর বাধা। আসুন এই বিষয়ে একটি ওয়াজ শুনে নিই,
এই বিষয়টির সাথে আরও একটি বিষয় জেনে নেয়া জরুরি যে, ইসলামে জাহান্নামের কনসেপ্ট আসলে কেমন। এটি কী আকার আকৃতি সম্পন্ন কোন সচেতন সত্তা, নাকি কোন বস্তু? আসুন সেই বিষয়ে একটি ওয়াজ শুনি,
এবারে আসুন এই সম্পর্কিত হাদিসগুলো পড়ে নেয়া যাক,
সহীহ মুসলিম (হাঃ একাডেমী)
অধ্যায়ঃ ৫। মাসজিদ ও সলাতের স্থানসমূহ
পাবলিশারঃ হাদিস একাডেমি
পরিচ্ছদঃ ৩২. জামাআতে রওনাকারীর জন্য পথিমধ্যে তীব্র গ্রীষ্মের সময় তাপ ঠাণ্ডা হয়ে আসলে যুহর আদায় করা মুস্তাহাব
১২৯০-(১৮৭/…) হারমালাহ ইবনু ইয়াহইয়া (রহঃ) ….. আবূ হুরায়রাহ (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ জাহান্নাম অভিযোগ করে আল্লাহর কাছে বলল, হে আমার প্রভু! আমার এক অংশ অন্য অংশকে খেয়ে ফেলছে। সুতরাং আমাকে শ্বাস-প্রশ্বাস গ্রহণের অনুমতি দিন। তাই আল্লাহ তা’আলা তাকে দু’বার শ্বাস-প্রশ্বাসের অনুমতি দান করলেন। একবার শীত মৌসুমে আরেকবার গ্রীষ্ম মৌসুমে। তোমরা শীতকালে যে ঠাণ্ডা অনুভব করে থাকো তা জাহান্নামের শ্বাস-প্রশ্বাসের কারণে। আবার যে গরমে বা প্রচণ্ড উত্তাপ অনুভব করে থাকো তাও জাহান্নামের শ্বাস-প্রশ্বাসের কারণে। (ইসলামী ফাউন্ডেশন ১২৭৭, ইসলামীক সেন্টার ১২৯০)
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
সহীহ মুসলিম (ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
৫/ মসজিদ ও সালাতের স্থান
পরিচ্ছেদঃ ৩২. তীব্র গ্রীষ্মের সময় তাপ কমে আসলে যোহর আদায় করা মুস্তাহাব
১২৭৯। হারামালা ইবনু ইয়াহইয়া (রহঃ) … আবূ হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন যে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, জাহান্নাম বলল, হে রব! আমার একাংশ অন্য অংশকে খেয়ে ফেলল। আমাকে শ্বাস নেয়ার অনুমতি দিন। তখন তাকে দুটি শ্বাসের অনুমতি দিলেন। একটি শীতকালে এবং আর একটি গ্রীষ্মকালে। অতএব, তোমরা যে শীত অনুভব কর, তা জাহান্নামের শ্বাস; আর যে গ্রীষ্ম অনুভব কর, তাও জাহান্নামের শ্বাস।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আবূ হুরায়রা (রাঃ)
উল্লেখ্য, ইসলামের এই বিশ্বাসের সপক্ষে কোন বৈজ্ঞানিক প্রমাণ পাওয়া যায়নি, এবং এগুলো যে একেবারেই প্রাচীন কালের মানুষের অধবিশ্বাস বা কুসংস্কার বা সঠিক কারণ সম্পর্কে অজ্ঞতা, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। এই ধরনের অন্ধবিশ্বাস বিজ্ঞানীয় সত্যকে অস্বীকার করে এবং যুক্তিবাদী চিন্তাকে দমন করে, যা সমাজে অজ্ঞতা এবং অগ্রগতির অভাব ঘটায়। আধুনিক বিজ্ঞানভিত্তিক যুক্তিবাদী সমাজ গঠনের জন্য সমাজে এই ধরণের কুসংস্কারের প্রভাব একটি বড় বাধা। তাই এইসব কুসংস্কারের বিরুদ্ধে আধুনিক বৈজ্ঞানিক ও যৌক্তিক জ্ঞান উপস্থাপন করা জরুরি।
উপসংহার
পৃথিবীর ঋতু পরিবর্তনের বিজ্ঞানীয় ব্যাখ্যা যুক্তি, প্রমাণ এবং পর্যবেক্ষণের ভিত্তিতে দাঁড়িয়ে আছে, যা অক্ষের হেলানো এবং আবর্তনের মতো প্রাকৃতিক প্রক্রিয়াকে ব্যাখ্যা করে। বিপরীতে, ইসলামী অন্ধবিশ্বাস যেমন জাহান্নামের শ্বাস-প্রশ্বাসের ধারণা, সম্পূর্ণ অযৌক্তিক এবং কোনো প্রমাণহীন কুসংস্কার। এটি বিজ্ঞানের সাথে সাংঘর্ষিক এবং যুক্তিবাদী সমাজের অগ্রগতিকে বাধাগ্রস্ত করে। ক্রিটিকাল থিঙ্কিংয়ের মাধ্যমে এই ধরনের অন্ধবিশ্বাসকে প্রত্যাখ্যান করা দরকার, যাতে ফ্যাক্টভিত্তিক জ্ঞান প্রাধান্য পায়।
