ইসলামে দাসী অদল বদল করে ভোগঃ চক্রাকারে ধর্ষিত হওয়ার নির্লজ্জ ইসলামী বিধান

ভূমিকা

ইসলামি ফিকহশাস্ত্রে দাসীদের নিছক ‘পণ্য’ বা ‘সম্পত্তি’ হিসেবে গণ্য করার যে আইনি কাঠামো গড়ে তোলা হয়েছে, তার অন্যতম কুৎসিত দিক হলো দাসী বিনিময় বা উপহার হিসেবে হস্তান্তরের বৈধতা। যখন একজন বন্দিনী নারীকে ‘গনিমতের মাল’ বা যুদ্ধের লুণ্ঠিত সম্পদ হিসেবে বণ্টন করা হয়, তখন থেকেই তার মানবিক সত্তা বিলুপ্ত হয়ে যায় এবং সে মালিকের নিরঙ্কুশ যৌন ভোগের বস্তুতে পরিণত হয়। এই প্রাতিষ্ঠানিক ভোগবাদী ব্যবস্থার চরম রূপ পরিলক্ষিত হয় যখন মালিক তার এই ‘সম্পত্তি’ অন্য কোনো পুরুষের কাছে বিক্রি, বাজারে তুলে বিক্রি বা উপহার হিসেবে হস্তান্তর করে। ইসলামের বিধান অনুযায়ী, মালিকানা পরিবর্তনের সাথে সাথেই সেই নারীর শরীরের ওপর যৌন অধিকারও নতুন মালিকের কাছে আইনত স্থানান্তরিত হয়। এটি মূলত একটি সুশৃঙ্খল এবং ধর্মীয় আইনের মোড়কে আবৃত ধারাবাহিক যৌন দাসত্ব, যেখানে একজন নারীকে পর্যায়ক্রমে একাধিক পুরুষের লালসার শিকার হতে হয়। ‘হিবা’ বা উপহারের এই বিধানটি বাহ্যিক দৃষ্টিতে সাধারণ সৌজন্য বা লেনদেন মনে হলেও, এর অন্তর্নিহিত বাস্তবতা হলো যুদ্ধের ময়দান থেকে ধরে আনা নারীদের মুসলিম বাহিনীর যোদ্ধাদের মধ্যে চক্রাকারে ভোগের সুযোগ করে দেওয়া। ফলে, একজন নারী কোনো একজন মালিকের দ্বারা যথেষ্ট পরিমাণ ধর্ষণের শিকার হওয়ার পরেও তার মুক্তি মিলত না। সেই মালিক তাকে অন্য কোন বন্ধু বা ভাতৃসম প্রতিবেশীকে উপহার দিয়ে দিলে, পরবর্তী মালিকের কাছে গিয়েও তাকে পুনরায় একই শারীরিক লাঞ্ছনার মুখোমুখি হতে বাধ্য হতো। এভাবে ঘুরে ঘুরে এক একজন নারীকে প্রায় সকল সাহাবীর হ্যাটেই ধর্ষোনের শিকার হতে হতো, যেহেতু মুহাম্মদের সাহাবীরা প্রায়শই আজল করতো। এই আইনি বৈধতা মূলত নারীর চরম অবমাননা এবং পদ্ধতিগত গণ-ধর্ষণের একটি প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি ছাড়া আর কিছুই নয়। বিশেষ করে যখন হাদিস ও ফিকহ গ্রন্থগুলোতে দেখা যায় যে, দাসী হস্তান্তরের ক্ষেত্রে কেবলমাত্র ‘ইস্তিবরা’ বা জরায়ু মুক্ত হওয়ার (এক মাস মাসিক চক্র পর্যবেক্ষণ) শর্ত দেওয়া হয়েছে, তখন এটি পরিষ্কার হয়ে যায় যে এই হস্তান্তরের মূল কেন্দ্রবিন্দুতেই ছিল যৌন সংসর্গ। অর্থাৎ, আগের মালিকের শুক্রাণু থেকে গর্ভধারণ হয়েছে কি না তা নিশ্চিত হওয়ার পরেই নতুন মালিক তাকে ভোগের লাইসেন্স পেয়ে যাচ্ছে। যুক্তির নিরিখে দেখলে, এটি কোনো সভ্য বিধান হতে পারে না; বরং এটি বন্দিনী নারীদের একটি পণ্য হিসেবে ব্যবহার করে পুরুষতান্ত্রিক লালসা চরিতার্থ করার একটি ধর্মীয় হাতিয়ার। ইবনে জায়েদের বর্ণনা থেকে যেমনটি জানা যায় যে, জাহেলি যুগে পত্নী বিনিময়ের প্রথা থাকলেও ইসলামে দাসী বিনিময়কে বৈধ রাখা হয়েছে, যা প্রমাণ করে যে দাসীদের ক্ষেত্রে কোনো মানবিক মর্যাদা বা অধিকারের বালাই ছিল না।


দাসী উপহার, বিনিময় বা বদলের ইসলামিক বৈধতা

ইসলামের দাসী বিক্রি বা উপহার হিসেবে দান করার বিধানটি খালি চোখে খুব সাধারণ মনে হলেও, আসলে এর মধ্যে লুকিয়ে আছে ভয়াবহ কুৎসিত এক আইনি মারপ্যাঁচ। এই বিধানটি কাজে লাগিয়ে গনিমতের মাল হিসেবে প্রাপ্ত একটি মেয়েকে সাহাবীগণ সবাই মিলে মিশে ভোগ করতে পারবে, অদল বদল করে। এর অর্থ হচ্ছে, একটি মেয়ে মুসলিম বাহিনীর হাতে বন্দী হলে তাকে সবাই মিলে ভোগ না করা পর্যন্ত তার কোন নিস্তার নেই। একজন ভোগের পরে অন্যজনকে দিয়ে দিবে, তার কাছ থেকে আবার আরেকজন দাসীকে নিয়ে আসবে। এভাবে নিত্য নতুন দাসী তাদের বিছানায় সবসময়ই থাকবে। আসুন এই সম্পর্কিত একটি হাদিস পড়ে নিই [1]

সহীহ বুখারী (তাওহীদ পাবলিকেশন)
৫১/ হিবা ও এর ফযীলত
পরিচ্ছেদঃ ৫১/৩৬. প্রচলিত অর্থে যদি কেউ বলে এই দাসীটি তোমার খিদমাতের জন্য দিলাম, এটি বৈধ।
وَقَالَ بَعْضُ النَّاسِ هَذِهِ عَارِيَّةٌ وَإِنْ قَالَ كَسَوْتُكَ هَذَا الثَّوْبَ فَهُوَ هِبَةٌ
কোন কোন ফিকাহ্ বিশারদ বলেন, এটি আরিয়ত হবে। তবে কেউ যদি বলে, এ কাপড়টি তোমাকে পরিধান করতে দিলাম, তবে তা হিবা হবে।
২৬৩৫. আবূ হুরাইরাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। আল্লাহর রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর বর্ণিত গ্রন্থ হতে বলেছেন, ইবরাহীম (আঃ) সারাকে সঙ্গে নিয়ে হিজরত করলেন। লোকেরা সারার উদ্দেশে হাজিরাকে হাদিয়া দিলেন। তিনি ফিরে এসে (ইবরাহীমকে) বললেন, আপনি কি জেনেছেন, কাফিরকে আল্লাহ পরাস্ত করেছেন এবং সেবার জন্য একটি বালিকা দান করেছেন।
ইবনু সীরীন (রহ.) বলেন, আবূ হুরাইরাহ্ (রাঃ)-এর সূত্রে নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) থেকে বর্ণনা করেন, অতঃপর (সেই কাফির) সারার উদ্দেশে হাজিরাকে দান করল। (২২১৭) (আধুনিক প্রকাশনীঃ ২৪৪৩, ইসলামিক ফাউন্ডেশনঃ ২৪৫৯)
بَابُ إِذَا قَالَ أَخْدَمْتُكَ هَذِهِ الْجَارِيَةَ عَلَى مَا يَتَعَارَفُ النَّاسُ فَهُوَ جَائِزٌ
حَدَّثَنَا أَبُو الْيَمَانِ أَخْبَرَنَا شُعَيْبٌ حَدَّثَنَا أَبُو الزِّنَادِ عَنْ الأَعْرَجِ عَنْ أَبِيْ هُرَيْرَةَ أَنَّ رَسُوْلَ اللهِ صلى الله عليه وسلم قَالَ هَاجَرَ إِبْرَاهِيْمُ بِسَارَةَ فَأَعْطَوْهَا آجَرَ فَرَجَعَتْ فَقَالَتْ أَشَعَرْتَ أَنَّ اللهَ كَبَتَ الْكَافِرَ وَأَخْدَمَ وَلِيْدَةً وَقَالَ ابْنُ سِيْرِيْنَ عَنْ أَبِيْ هُرَيْرَةَ عَنْ النَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم فَأَخْدَمَهَا هَاجَرَ.
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আবূ হুরায়রা (রাঃ)

এবারে আসুন তাফসীরে মাযহারী থেকে এই সম্পর্কে একটি দলিল দেখে নিই, [2]

ইবনে জায়েদ বলেছেন, মূর্খতার যুগে পত্নী বিনিময়ের কুপ্রথার প্রচলন ছিলো। আলোচ্য আয়াতের মাধ্যমে সেই প্রথাটি নিষিদ্ধ করা হয়েছে। উল্লেখ্য, ক্রীতদাসী বিনিময় দোষের নয়।

ভোগ

এবারে আসুন বর্তমান বিশ্বের সবচাইতে প্রভাবশালী ইসলামিক ফতোয়া ওয়েবসাইট islamweb.net এ প্রকাশিত একটি প্রবন্ধ পড়ি, [3]

المصنف
ابن أبي شيبة – عبد الله بن محمد بن أبي شيبة
جزء
5
صفحة
33
إظهار / إخفاء التشكيل بحث في الكتاب
2662 ( 29 ) الرجل يريد أن يشتري الجارية فيمسها
( 1 ) حدثنا جرير عن منصور عن مجاهد قال : كنت مع ابن عمر أمشي في السوق فإذا نحن بناس من النخاسين قد اجتمعوا على جارية يقلبونها ، فلما رأوا ابن عمر تنحوا وقالوا : ابن عمر قد جاء ، فدنا منها ابن عمر فلمس شيئا من جسدها وقال : أين أصحاب هذه الجارية ، إنما هي سلعة .
( 2 ) نا علي بن مسهر عن عبيد الله عن نافع عن ابن عمر أنه كان إذا أراد أن يشتري الجارية وضع يده على أليتيها أو بين فخذها وربما كشف عن ساقيها [ ص: 33 ]
( 3 ) حدثنا وكيع عن سفيان عن عبيد المكتب عن إبراهيم عن رجل من أصحاب عبد الله أنه قال : ما أبالي مسستها أو مسست هذا الحائط .
( 4 ) حدثنا وكيع عن عبد الله بن حبيب عن أبي جعفر أنه ساوم بجارية فوضع يده على ثدييها وصدرها .
( 5 ) حدثنا ابن مبارك عن الأوزاعي قال : سمعت عطاء وسئل عن الجواري اللاتي يبعن بمكة فكره النظر إليهن إلا لمن يريد أن يشتري .
( 6 ) حدثنا أزهر السمان عن ابن عون قال : كان محمد إذا بعث إليه بالجارية ينظر إليها كشف بين ساقيها وذراعيها .
( 7 ) حدثنا هشيم عن مغيرة عن إبراهيم أن صديقا له أسود كتب إليه أن يشتري له جارية ، ففعل فعاب شيئا من ساق الجارية ، قال : فبلغ ذلك الأسود من قوله فقال : ما أحب أني نظرت إلى ساقيها ولا إلى كذا وكذا .
( 8 ) حدثنا وكيع عن حماد بن سلمة عن حكيم الأثرم عن أبي تميمة عن أبي موسى أنه خطبهم فقال : لا أعلم رجلا اشترى جارية فنظر إلى ما دون الجارية وإلى ما فوق الركبة إلا عاقبته .

ভোগ 1

বাংলা অনুবাদঃ মুসান্নাফ ইবনে আবি শায়বাহ্‌
অনুচ্ছেদ নং: ২৬৬২ (২৯) — কোনো ব্যক্তি যখন দাসী কেনার ইচ্ছা করে তখন তাকে স্পর্শ করা প্রসঙ্গে
১. মুজাহিদ থেকে বর্ণিত: তিনি বলেন, আমি ইবনে ওমরের সাথে বাজারের মধ্য দিয়ে হাঁটছিলাম। হঠাৎ আমরা দেখলাম যে একদল দাস ব্যবসায়ী (নখাসিন) একটি দাসীকে ঘিরে ধরেছে এবং তাকে উল্টেপাল্টে পরীক্ষা করছে (যাচাই করছে)। যখন তারা ইবনে ওমরকে দেখল, তারা সরে দাঁড়াল এবং বলল, “ইবনে ওমর এসেছেন।” তখন ইবনে ওমর সেই দাসীটির নিকটবর্তী হলেন এবং তার শরীরের কোনো একটি অংশ স্পর্শ করলেন। এরপর তিনি বললেন, “এই দাসীটির মালিকরা কোথায়? এটি তো কেবলই একটি পণ্য (Commodity)।” ( মুসান্নাফ ইবনে আবি শায়বাহ্‌, হাদিস নং: ২৬৬২০ )
২. আলী ইবনে মুসহির থেকে বর্ণিত (নাফে’র সূত্রে): ইবনে ওমর যখন কোনো দাসী কেনার ইচ্ছা করতেন, তখন তিনি তার নিতম্বের ওপর অথবা তার দুই উরুর মাঝখানে হাত রাখতেন এবং মাঝেমধ্যে তার দুই পায়ের নলা (Shins) উন্মোচিত করতেন। ( মুসান্নাফ ইবনে আবি শায়বাহ্‌, হাদিস নং: ২৬৬২১ )
৩. ওকি’ থেকে বর্ণিত (ইব্রাহিমের সূত্রে): আব্দুল্লাহ (ইবনে মাসউদ)-এর একজন সঙ্গী বলতেন, “আমি তাকে (দাসীকে) স্পর্শ করলাম নাকি এই দেয়ালটি স্পর্শ করলাম—তাতে আমার কিছুই যায় আসে না।” ( মুসান্নাফ ইবনে আবি শায়বাহ্‌, হাদিস নং: ২৬৬২২ )
৪. ওকি’ থেকে বর্ণিত (আবু জাফরের সূত্রে): আবু জাফর এক দাসীর দামাদামি করার সময় তার স্তনদ্বয় এবং বুকের ওপর হাত রাখলেন। ( মুসান্নাফ ইবনে আবি শায়বাহ্‌, হাদিস নং: ২৬৬২৩ )
৫. ইবনে মুবারক থেকে বর্ণিত (আতা’র সূত্রে): মক্কায় বিক্রয়যোগ্য দাসীদের বিষয়ে তাকে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি বলেন, যারা কেনার ইচ্ছা রাখে না তাদের জন্য এদের দিকে তাকানো অপছন্দনীয় (অর্থাৎ ক্রেতার জন্য তাকানো বৈধ)। ( মুসান্নাফ ইবনে আবি শায়বাহ্‌, হাদিস নং: ২৬৬২৪ )
৬. আজহার আস-সাম্মান থেকে বর্ণিত (ইবনে আউনের সূত্রে): মুহাম্মদ (ইবনে সীরীন)-এর কাছে যখন কোনো দাসী পাঠানো হতো, তখন তিনি তাকে দেখার সময় তার দুই পায়ের নলা এবং দুই বাহু উন্মুক্ত করে দেখতেন। ( মুসান্নাফ ইবনে আবি শায়বাহ্‌, হাদিস নং: ২৬৬২৫ )
৭. হুশাইম থেকে বর্ণিত (ইব্রাহিমের সূত্রে): জনৈক কৃষ্ণাঙ্গ ব্যক্তি ইব্রাহিমকে একটি দাসী কিনে দেওয়ার জন্য লিখেছিলেন। তিনি তা করলেন (দাসী কিনলেন) এবং সেই দাসীর পায়ের নলার কোনো একটি ত্রুটির সমালোচনা করলেন। যখন সেই কৃষ্ণাঙ্গ ব্যক্তিটির কাছে এই কথা পৌঁছাল, তিনি বললেন, “আমি চাই না যে আমি তার পায়ের নলার দিকে কিংবা অমুক অমুক (অঙ্গের) দিকে তাকাই।” ( মুসান্নাফ ইবনে আবি শায়বাহ্‌, হাদিস নং: ২৬৬২৬ )
৮. ওকি’ থেকে বর্ণিত (আবু মুসা আল-আশআরীর সূত্রে): আবু মুসা (রা.) লোকদের উদ্দেশ্যে ভাষণ দিলেন এবং বললেন, “আমি যদি জানতে পারি যে কোনো ব্যক্তি দাসী কেনার সময় তার নাভির নিচের অংশ বা হাঁটুর ওপরের অংশের দিকে তাকিয়েছে, তবে আমি তাকে শাস্তি দেব।” ( মুসান্নাফ ইবনে আবি শায়বাহ্‌, হাদিস নং: ২৬৬২৭ )
সারসংক্ষেপ: এই বর্ণনাগুলো স্পষ্ট করে যে, তৎকালে দাসী কেনা-বেচার সময় তাদের শরীরের বিভিন্ন স্পর্শকাতর অঙ্গ (বুক, নিতম্ব, উরু) ক্রেতা বা পরীক্ষক হিসেবে সরাসরি স্পর্শ করা বা উন্মুক্ত করে দেখার প্রচলন ছিল। ইবনে ওমরের মতো ব্যক্তিদের উক্তি থেকে পরিষ্কার হয় যে, দাসীদের মানুষের পরিবর্তে নিছক ক্রয়যোগ্য ‘পণ্য’ বা ‘সামগ্রী’ হিসেবে গণ্য করা হতো।


মালিকানা হস্তান্তর ও লিগ্যাল ‘ধর্ষণ’: একটি চক্রাকার পদ্ধতি

ইসলামি আইনি কাঠামোতে দাসীদের ওপর যৌন অধিকার লাভের প্রধান শর্তই হলো ‘মালিকানা’ (মিলক আল-ইয়ামিন)। এই মালিকানা অর্জিত হয় হয় যুদ্ধের মাধ্যমে (গনিমত), না হয় ক্রয় বা উপহারের (হিবা) মাধ্যমে। অত্যন্ত ভয়াবহ ব্যাপার হলো, এই মালিকানা হস্তান্তরের সাথে সাথে ওই নারীর ইচ্ছা বা অনিচ্ছাকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে তার শরীরের ওপর নতুন মালিকের নিরঙ্কুশ যৌন অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়। ফিকহশাস্ত্র অনুযায়ী, একজন মালিক যখন তার দাসীকে অন্য কারো কাছে বিক্রি বা উপহার হিসেবে প্রদান করেন, তখন এটি মূলত এক ব্যক্তির ভোগের পর অন্য ব্যক্তিকে ভোগের সুযোগ করে দেওয়ার একটি আইনি দলিল মাত্র। এই প্রক্রিয়ায় একজন নারীকে পর্যায়ক্রমে একাধিক পুরুষের হাতে তুলে দেওয়া হয়, যা আধুনিক সংজ্ঞায় ‘সিরিয়াল রেপ’ বা ধারাবাহিক যৌন নিপীড়নের সমতুল্য। ইসলামি আইনবিদরা এই হস্তান্তরের ক্ষেত্রে কেবল ‘ইস্তিবরা’ বা এক মাস ঋতুস্রাব পর্যবেক্ষণের যে বিধান দিয়েছেন, তা মূলত নারীর সুরক্ষার জন্য নয়, বরং পরবর্তী মালিকের যৌন সংসর্গের ফলে জন্ম নেওয়া সন্তানের পিতৃপরিচয় যেন গুলিয়ে না যায়, তা নিশ্চিত করার জন্য [4]। অর্থাৎ, বিধানটি পরিষ্কার করে দেয় যে, হস্তান্তরের মূল উদ্দেশ্যই ছিল যৌন ভোগ। যদি কোনো বন্দিনী নারী তার পূর্ববর্তী মালিকের দ্বারা যৌন লালসার শিকার হওয়ার পর পুনরায় অন্য কারো কাছে ‘উপহার’ হিসেবে হস্তান্তরিত হন, তবে তাকে বাধ্যতামূলকভাবে নতুন মালিকের শয্যাসঙ্গিনী হতে হতো। এটি প্রমাণ করে যে, এই ব্যবস্থায় বন্দিনী নারীদের কোনো স্বতন্ত্র মানবিক মর্যাদা ছিল না; তারা ছিল স্রেফ হাতবদল হওয়া এক একটি জৈবিক প্রয়োজনের বস্তু। সাহাবীদের যুগে এই প্রথার ব্যাপক প্রচলন এটিই নিশ্চিত করে যে, গনিমতের মাল হিসেবে আসা নারীরা ছিল একটি চলমান ভোগ্যপণ্য, যা বন্ধু বা আত্মীয়দের মধ্যে বিনিময় করে গোষ্ঠীগত লালসা চরিতার্থ করা হতো। ইবনে আবি শায়বার মুসান্নাফে বর্ণিত হয়েছে যে, আলী এক ব্যক্তিকে একটি দাসী উপহার দিয়েছিলেন এবং তাকে নির্দেশ দিয়েছিলেন যেন ইস্তিবরা (একটি পিরিয়ড হওয়া) শেষ না হওয়া পর্যন্ত তার সাথে যৌন মিলন না করে। এই বর্ণনাগুলো স্পষ্ট করে যে, উপহার বা হিবার এই বিধানটি মূলত বন্দিনী নারীদের একটি পদ্ধতিগত যৌন শোষণের চক্রের মধ্যে আটকে রাখার একটি হাতিয়ার ছিল।


পণ্য হিসেবে নারীর দেহঃ আজল ও বাজারজাতকরণের অমানবিক সমীকরণ

আজল বা বীর্যপাতের আগে লিঙ্গ অপসারনের প্রথাটি এই দাসী অদল-বদল বা বিক্রয় প্রক্রিয়ার সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। সাহাবীদের বর্ণনায় পাওয়া যায় যে, তারা যখন গনিমতের মাল হিসেবে দাসী পেতেন [5], তখন তাদের প্রথম চিন্তাই থাকত কীভাবে গর্ভবতী না করে তাদের ভোগ করা যায়। এর মূল কারণ ছিল সম্পূর্ণ বাণিজ্যিক; যদি কোনো দাসী মালিকের ঔরসে গর্ভবতী হয়ে পড়ত, তবে ইসলামি আইনে তাকে আর বিক্রি করা যেত না (সে ‘উম্মে ওয়ালাদ’ হয়ে যেত) এবং মালিকের মৃত্যুর পর সে মুক্ত হয়ে যেত। অর্থাৎ, দাসীর গর্ভধারণ ছিল মালিকের জন্য এক প্রকার আর্থিক লোকসান। তাই তারা দাসীকে ক্রমাগত ধর্ষণ করত ঠিকই, কিন্তু বীর্যপাত করত বাইরে (আজল), যাতে তার ‘পণ্যমূল্য’ অক্ষুণ্ণ থাকে এবং কিছুদিন ভোগের পর তাকে অন্য মালিকের কাছে চড়া দামে বিক্রি বা উপহার হিসেবে হস্তান্তর করা যায় [4]। এই বীভৎস বাস্তবতা প্রমাণ করে যে, ইসলামি সমাজ ব্যবস্থায় বন্দিনী নারীর শরীর ছিল নিছক একটি হস্তান্তরযোগ্য বস্তুর মতো, যা একজন ব্যবহার করে অবলীলায় অন্যজনের হাতে তুলে দিচ্ছে।

ইবনে আব্বাস বা ইবনে ওমরের মতো প্রথম সারির সাহাবীদের ফতোয়া ও আচরণে দেখা যায়, তারা দাসীকে হাতবদল করার ক্ষেত্রে অত্যন্ত বস্তুনিষ্ঠ ও আবেগহীন ছিলেন। এমনকি কোনো কোনো ক্ষেত্রে দাসী কেনার আগে তার শরীরের বিভিন্ন অঙ্গ প্রত্যঙ্গ পরীক্ষা করার বর্ণনাও সিরাত, হাদিস ও ফিকহের গ্রন্থগুলোর পাতায় পাওয়া যায় [6], যা আধুনিক সভ্যতার মাপকাঠিতে চরম শ্লীলতাহানি হিসেবে গণ্য। উদাহরণস্বরূপ, আব্দুল্লাহ ইবনে ওমর দাসী ক্রয় করার সময় তাদের উরু বা শরীরের বিভিন্ন স্থানে হাত দিয়ে পরীক্ষা করতেন বলে নির্ভরযোগ্য সূত্রে বর্ণিত হয়েছে। এই ঘটনাগুলো স্পষ্ট করে দেয় যে, ‘হিবা’ বা উপহারের সংস্কৃতি কোনো মানবিক বদান্যতা ছিল না, বরং এটি ছিল একটি সুসংগঠিত প্রাতিষ্ঠানিক যৌন পাচার ব্যবস্থা, যাকে ধর্মের লেবাস পরিয়ে বৈধ করা হয়েছিল। যখন একজন মালিক তার ব্যবহৃত দাসীকে বন্ধুকে উপহার দেয়, তখন সেই নারী কেবল একজন মালিক হারায় না, বরং তার পুরো অস্তিত্ব নতুন করে ধর্ষিত হওয়ার জন্য প্রস্তুত হতে বাধ্য হয়। ইসলামি ফিকহ এই পুরো প্রক্রিয়াটিকে ‘জায়েজ’ বা বৈধ ঘোষণা করার মাধ্যমে মূলত নারীর ওপর পুরুষের আদিম ও পাশবিক আধিপত্যকেই চিরস্থায়ী রূপ দান করেছে।


উপসংহারঃ একটি প্রাতিষ্ঠানিক যৌন শোষণের দলিল

ইসলামি ফিকহশাস্ত্রের গভীরে প্রবেশ করলে এটি দিবালোকের মতো স্পষ্ট হয়ে যায় যে, ইসলামে দাসপ্রথা কেবল একটি শ্রমনির্ভর ব্যবস্থা ছিল না, বরং এটি ছিল নারীদেহের ওপর পুরুষের নিরঙ্কুশ আধিপত্য ও লালসা চরিতার্থ করার একটি আইনি ঢাল। দাসী বিনিময়, বিক্রি কিংবা উপহার (হিবা) হিসেবে হস্তান্তরের যে বিধানগুলো হাদিস ও ফিকহ গ্রন্থগুলোতে ছড়িয়ে আছে, তা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; বরং এটি একটি সুপরিকল্পিত প্রাতিষ্ঠানিক যৌন শোষণের কাঠামো। এই ব্যবস্থায় একজন যুদ্ধবন্দী নারীর সম্মতি বা মানবিক মর্যাদার কোনো স্থান ছিল না। তাকে দেখা হতো কেবল একটি ‘উপভোগ্য সম্পদ’ হিসেবে, যা এক মালিকের তৃপ্তি মেটানোর পর অন্য মালিকের কাছে হস্তান্তর করা যায়। ইবনে জায়েদের সেই ঐতিহাসিক স্বীকারোক্তি—যেখানে তিনি জাহেলি যুগের পত্নী বিনিময়কে নিষিদ্ধ বললেও দাসী বিনিময়কে ‘দোষের নয়’ বলে সাব্যস্ত করেছেন—তা মূলত তৎকালীন মুসলিম সমাজের দ্বিচারিতা ও নারীবিদ্বেষী দৃষ্টিভঙ্গিরই প্রতিফলন।

এই পুরো প্রক্রিয়াটি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ‘ইস্তিবরা’ বা ‘আজল’ এর মতো বিধানগুলো প্রণয়ন করা হয়েছিল মূলত পুরুষের আর্থিক ও বংশগত স্বার্থ রক্ষার জন্য, নারীর সুরক্ষার জন্য নয়। একজন দাসীকে যখন ধারাবাহিকভাবে একাধিক সাহাবী বা মালিকের শয্যাসঙ্গিনী হতে হতো, তখন ধর্মীয় আইনের দোহাই দিয়ে তার ওপর চালানো হতো পদ্ধতিগত গণ-ধর্ষণ। মালিকানা পরিবর্তনের সাথে সাথে যৌন অধিকারের এই যে স্বয়ংক্রিয় হস্তান্তর, তা আধুনিক সভ্যতার যেকোনো মাপকাঠিতেই চরম বর্বরতা ও মানবাধিকারের লঙ্ঘন। মুহাম্মদের সাহাবীদের এই কর্মকাণ্ড কোনো ব্যক্তিগত বিচ্যুতি ছিল না, বরং তা ছিল খোদ ধর্মীয় বিধানের প্রয়োগ।

পরিশেষে বলা যায়, ইসলামের এই দাসী হস্তান্তরের বিধানটি প্রমাণ করে যে, তৎকালীন সময়ে ধর্মকে ব্যবহার করে একটি নারী পাচার ও যৌন দাসত্বের চক্রকে বৈধতা দেওয়া হয়েছিল। একটি বন্দিনী মেয়েকে মুসলিম বাহিনীর হাতে পড়ার পর যে অসহায়ত্বের মধ্য দিয়ে যেতে হতো, যেখানে তাকে এক হাত থেকে অন্য হাতে পণ্য হিসেবে ঘুরে বেড়াতে হতো, তা কোনো সভ্য ধর্মের ‘ঐশ্বরিক’ বিধান হতে পারে না। এই বিধানগুলো কেবল ইতিহাসের একটি অন্ধকার অধ্যায়ই নয়, বরং এটি নারীত্বের চরম অবমাননার এক অকাট্য দলিল, যা আজও যুক্তিবাদী ও সংবেদনশীল মানুষের বিবেককে দংশন করে।


তথ্যসূত্রঃ
  1. সহীহ বুখারী, তাওহীদ পাবলিকেশন, হাদিসঃ ২৬৩৫ ↩︎
  2. তাফসীরে মাযহারী, কাজী ছানাউল্লাহ পানিপথী, নবম খণ্ড, পৃষ্ঠা ৫৪১ ↩︎
  3. ابن أبي شيبة – عبد الله بن محمد بن أبي شيبة ↩︎
  4. ইসলামে দাসীদের সাথে সম্মতিহীন আযল(আজল) ও তার কারণ বিশ্লেষণ 1 2
  5. যুদ্ধে বেসামরিক নারী ও শিশুর ভাগ্যঃ ইসলামে গনিমতের মাল বা লুটপাটের মাল ↩︎
  6. মানবিকতার কফিনে শেষ পেরেকঃ ইসলামের দাসীবাজার ও নারীর শরীরের উন্মুক্ত নিলাম ↩︎