খলিফা উসমানের হত্যাকাণ্ড এবং খুনের কারণ

ভূমিকা

কোরআনের ইতিহাসে “উসমানি সংকলন” (Uthmanic recension) একটি কেন্দ্রীয় অধ্যায়। প্রচলিত ইসলামি ইতিহাস অনুযায়ী, তৃতীয় খলিফা উসমান (রা.)-এর শাসনামলে পাঠভেদ/লেখ্যভেদের বিস্তার নিয়ন্ত্রণ করতে একটি “মানক মুসহাফ” নির্ধারণ করা হয়, এবং অন্যান্য কপি/পাঠ-রূপগুলো সরিয়ে দিতে আদেশ জারি হয়। কিন্তু এই একরূপীকরণ প্রক্রিয়া মুসলিম সমাজে সর্বসম্মত ছিল—এ কথা উৎসসমূহে পাওয়া যায় না। বরং সাহাবীপর্যায়ের ভিন্নমত, রাজনৈতিক অসন্তোষ, প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিয়ে অভিযোগ, এমনকি “কিতাবুল্লাহয় পরিবর্তন” ধরনের গুরুতর অভিযোগ—এসবই একত্রে উসমানের শাসন ও মৃত্যুর ইতিহাসকে বিতর্কিত করে তোলে।

এই প্রবন্ধে মূলত দুইটি স্তরে আলোচনা করা হবে: (১) কোরআন-একরূপীকরণ/মুসহাফ পোড়ানোর সিদ্ধান্ত ঘিরে উসমানের বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগ ও বিরোধ; (২) উসমানের শাসনামলে অন্যান্য রাজনৈতিক-প্রশাসনিক অভিযোগ, যা বিদ্রোহ ও হত্যাকাণ্ডের পটভূমি নির্মাণ করে। সূত্র হিসেবে কিতাবুল মাসাহিফ, তাবাকাত, তিরমিযী, তাবারী, ইবন আসাকির, ইবন কাসীরসহ প্রাচীন ঐতিহাসিক-হাদিসধর্মী বর্ণনাগুলো ব্যবহৃত হবে।


মানক মুসহাফ ও “বাকি কপি পোড়ানো”: সিদ্ধান্তের কাঠামো

উসমানের আমলে কোরআনের পাঠভেদ ও লিখিত কপির ভিন্নতা একটি বাস্তব সমস্যা হিসেবে উপস্থাপিত হয়—বিশেষত নতুন অঞ্চলে ইসলাম বিস্তারের ফলে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রথা/উচ্চারণরীতি/লেখ্যরীতি একত্রে সংঘাতে আসে। এই প্রেক্ষিতে একটি কমিটি (যায়েদ ইবন সাবেতের নেতৃত্বে) নির্দিষ্ট রীতিতে মুসহাফ প্রস্তুত করে এবং অন্যান্য কপি ধ্বংস/পোড়ানোর নির্দেশ দেওয়া হয়—যাতে “একক মান” প্রতিষ্ঠিত থাকে। তবে “একরূপীকরণ” নিজেই নিরপেক্ষ প্রশাসনিক কাজ হলেও, “অন্যান্য কপি ধ্বংস” সিদ্ধান্তটি ধর্মীয়-রাজনৈতিকভাবে গভীর প্রতিক্রিয়া তৈরি করে—কারণ এতে কার পাঠকে “মানক” ধরা হবে, কার কপিকে “অপ্রয়োজনীয়/ভুল” ধরা হবে—এই প্রশ্নগুলো অনিবার্যভাবে সামনে আসে। এই বিরোধ সবচেয়ে স্পষ্টভাবে উঠে আসে আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদের অবস্থানে। [1]


আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদের বিরোধ ও কর্তৃত্বের প্রশ্ন

ঐতিহাসিক বর্ণনায় দেখা যায়, কুফা অঞ্চলে আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ উসমানি সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে অবস্থান নেন। তাঁর আপত্তি কেবল “কপি পোড়ানো” নয়—বরং “কার পাঠ/কার সংকলনকে কেন্দ্রীয় মানদণ্ড বানানো হলো” এই কর্তৃত্বগত প্রশ্ন। ইবনে মাসউদের বক্তব্যে তিনি নিজেকে নবীর কাছ থেকে সরাসরি কোরআন শেখা প্রাচীন সাহাবী হিসেবে তুলে ধরেন এবং যায়েদ ইবন সাবেতের তুলনায় নিজের অগ্রাধিকার দাবিও দেখা যায়।

বর্তমান সময়ে আমরা যেই কোরআন দেখি, সেটি সংকলন করেছিলেন ইসলামের তৃতীয় খলিফা হযরত উসমান। সংকলনের পরে হযরত উসমান ঘোষণা দিলেন যে, যার কাছে যত কোরআন আছে সেগুলো সব পুড়িয়ে ফেলতে হবে। যখন কুফাতে শোনা গেল যে, তাদের কাছে সংরক্ষিত সব কোরআনের আয়াত পুড়িয়ে দিয়ে শুধুমাত্র যায়েদ ইবন সাবেতের মুসহাফ এখন থেকে ব্যবহার করতে হবে, আব্দুল্লাহ্‌ ইবনে মাসউদ এর বিরোধিতা করলেন। এই হুকুম শুনে তিনি কুফা শহরে এইভাবে খুৎবা দিলেন [2]

কোরআনের পাঠে লোকেরা ছলনার দোষে পরেছে। আমি এর পাঠ বেশি পছন্দ করি (মুহাম্মদের), যার পাঠ আমি যায়েদ বিন সাবেতের পাঠ থেকে বেশি ভালবাসি। আল্লাহ্‌র কসম! যিনি ব্যতীত আর কোন উপাস্য নেই। আমি আল্লাহ্‌র রাসূল (সাঃ)-এর মুখ থেকে সত্তরেরও বেশী সূরা শিখেছি যখন যায়েদ ইবন সাবেত যুবক ছিলেন, এর মাত্র দুইটি কেশপাশ চুল ছিল এবং যুবকদের সাথে তখন খেলা করতেন।”


মুহাম্মাদ ইবনে ঈসা আত-তিরমিজি লিখেছেন [3] [4]

যুহরী (র) বলেনঃ ইবায়দুল্লাহ্‌ ইবনে আব্দুল্লাহ্‌ ইবনে উতবা বলেছেন যে, হযরত আবদুল্লাহ্‌ ইবনে মাসঊদ (রা) যায়েদ ইবনে ছাবিতের এ তৈরী কপি পছন্দ করেন নি। তিনি বলেছেনঃ “হে মুসলিম সম্প্রদায়!” কুরআনের মুসহাফ লিপিবদ্ধ করার কাজে আমাকে দূরে রাখা হয়েছে আর এর দায়িত্ব বহন করেছে এমন এক ব্যক্তি যে আল্লাহ্‌র শপথ আমি যখন ইসলাম গ্রহণ করি তখন সে ছিল এক কাফিরের ঔরসে। (এই কথা বলে তিনি যায়েদ ইবনে ছাবিতের দিকে ইঙ্গিত করেছেন)। আব্দুল্লাহ্‌ ইবনে মাসঊদ (রা) বলেছেনঃ হে ইরাকবাসী! তোমাদের কাছে যে মুসহাফগুলো রয়েছে সেগুলো লুকিয়ে রাখ।


ইবনে আবু দাউদের কিতাবুল মাসাহিফ গ্রন্থে আছে যে ইবনে মাসউদ বলতেন [5]

আমি সরাসরি আল্লাহ্‌র রাসূল (সাঃ) থেকে সত্তর সূরা পেয়েছি যখন যায়েদ বিন সাবেত তখনও একজন বাচ্চা মানুষ ছিল—এখন আমি কি ত্যাগ করব যেটা আমি আল্লাহ্‌র রাসূল থেকে সরাসরি পেয়েছি?”


এই উদ্ধৃতিগুলো একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা দেখায়: উসমানি মানকীকরণকে “সর্বসম্মত ধর্মীয় সিদ্ধান্ত” হিসেবে উপস্থাপন এবং প্রচার করা হলেও, সাহাবীপর্যায়ে তা “অন্তর্বিরোধহীন” ছিল না।


“সাত উপভাষা/কিরাআত” ইস্যু ও পাঠ-বৈচিত্র্য দমন

কোরআনের “সাত আহরুফ” (সাত রীতি/উপভাষা) বা পাঠ-রূপের অনুমোদনের ধারণা ইসলামী বর্ণনায় বহুল আলোচিত। কিন্তু বাস্তব চর্চায় অঞ্চলভেদে পাঠভেদের প্রসার একটি “বিভক্তি-ঝুঁকি” হিসেবে দেখা হয়। উসমানি সংকলনকে তাই কখনো কখনো এমনভাবে ব্যাখ্যা করা হয়—যেন এটি বৈচিত্র্যের উপর এক ধরনের কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ আরোপ। যৌক্তিকভাবে এটিকে “বৈচিত্র্য দমন” বলেও অভিযোগ উঠতে পারে; সমর্থনমূলক দৃষ্টিতে এটিকে “ঐক্য রক্ষা” বলা হয়। [6]


অভিযোগ: “কিতাবুল্লাহয় পরিবর্তন”—বিদ্রোহের ভাষা

উসমানের বিরুদ্ধে সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগগুলোর একটি হলো—তাঁর বিরুদ্ধে “কিতাবুল্লাহয় পরিবর্তন” বা “কোরআনে হস্তক্ষেপ” ধরনের ভাষা ব্যবহার। আপনার সংকলিত আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া অংশে মুহাম্মদ ইবন আবূ বকরের মুখে এই অভিযোগের উপস্থিতি দেখা যায়। এখানে লক্ষ্যণীয় হলো: (ক) অভিযোগটি রাজনৈতিক বিদ্রোহের ভাষা হিসেবে এসেছে, নাকি সত্যিই টেক্সট-পরিবর্তনের নির্দিষ্ট অভিযোগ হিসেবে এসেছে—এ পার্থক্য না করলে পাঠক ভুল বুঝতে পারে; (খ) একই ঘটনার বর্ণনা বিভিন্ন উৎসে ভিন্নভাবে এসেছে—কোথাও আঘাত/দাড়ি ধরা/লজ্জিত হয়ে সরে যাওয়া, কোথাও হত্যাকারীর পরিচয় ইত্যাদিতে পার্থক্য।


প্রশাসনিক/রাজনৈতিক অসন্তোষ—স্বজনপ্রীতির অভিযোগ

উসমানের হত্যাকে কেবল “মুসহাফ পোড়ানো” ইস্যু দিয়ে ব্যাখ্যা করলে ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট অসম্পূর্ণ থেকে যায়। বহু প্রাচীন ইতিহাসগ্রন্থে তাঁর শাসনামলে প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত, প্রাদেশিক গভর্নর নিয়োগ, স্বজনপ্রীতি (nepotism) অভিযোগ, আর্থিক অনুদান/বায়তুলমাল সংক্রান্ত বিতর্ক, এবং কিছু সাহাবীর সঙ্গে বিরোধের নানা উপাদান এসেছে। এগুলো বিদ্রোহীদের নৈতিক ভাষ্য নির্মাণে ভূমিকা রাখে এবং বিভিন্ন অঞ্চলে (মিশর, কুফা, বসরা) অসন্তোষকে সংগঠিত করে।


হত্যাকাণ্ড ও দাফন: ঘটনাবলি ও বর্ণনার বৈচিত্র্য

উসমানের হত্যার ঘটনায় মূল কাঠামো মোটামুটি এক—গৃহ অবরোধ, ভেতরে প্রবেশ, আঘাত, হত্যাকাণ্ড—কিন্তু বিশদ বিবরণে বর্ণনাভেদ আছে: কে প্রথম আঘাত করলো, কে দাড়ি ধরলো, হত্যাকারীর নাম কী, নাইলা (রা.)-এর আহত হওয়ার বিবরণ, কুরআনে রক্তের ছিটা ইত্যাদি। একইভাবে দাফন নিয়েও ভিন্নতা আছে—তিন দিন, দুই রাত, বা সেই রাতেই দাফন; কারা জানাযা পড়ালেন; বাকী-র বাইরে দাফন ইত্যাদি।


আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া

এইসব প্রশ্নের উত্তর জানতে, আমাদের জানা দরকার, হযরত উসমানের মৃত্যু কীভাবে হয়েছিল [7]। প্রশ্ন হচ্ছে, খলিফা উসমানকে কিতাবুল্লাহ বা কোরআনে পরিবর্তনের অভিযোগে অভিযুক্ত কারী এই মুহাম্মদ ইবনে আবু বকর কে ছিলেন? হ্যাঁ, তিনি ছিলেন খোদ প্রথম খলিফা হযরত আবু বকরের সন্তান এবং অত্যন্ত ধার্মিক একজন মুসলিম হিসেবে যিনি ছিলেন বিখ্যাত।

আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া (খণ্ড ৩৩২–৩৩৩) থেকে
আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, খণ্ড ৩৩২-এ সাইফ ইবন উমর তামীমী (রহ.) ঈস ইবন কাসিম সূত্রে, উসামা ইবন যায়দের আজাদকৃত দাসী খানসা সূত্রে বর্ণনা করেন—আর এই খানসা উসমান (রা.)-এর স্ত্রী নাইলা বিনত ফারাফিসার সঙ্গে অবস্থান করতেন—যে, হামলার সময় তিনি গৃহে উপস্থিত ছিলেন। এ সময় মুহাম্মদ ইবন আবূ বকর (রা.) গৃহে প্রবেশ করে তাঁর সঙ্গে থাকা তীরের ভারী ফলক দ্বারা উসমান (রা.)-এর গলায় আঘাত করেন। তখন উসমান (রা.) বলেন,
“ভাতিজা, থাম! আল্লাহর শপথ, তুমি এমন স্থানে হাত দিয়েছ, যেখানে তোমার পিতাও হাত দিতেন না।”
এ কথা শুনে তিনি লজ্জিত হয়ে দাড়ি ছেড়ে দেন এবং সরে দাঁড়ান। গৃহের লোকজন তাঁর মুখোমুখি হলে দীর্ঘ বাদ-প্রতিবাদ হয়। লোকেরা জয়ী হয়ে গৃহে প্রবেশ করে। মুহাম্মদ ইবন আবূ বকর গৃহ থেকে বের হয়ে চলে যান।
এরপর এক ব্যক্তি তাঁর নিকটে আসে, যার হাতে ছিল খেজুরের ডাল। সে অগ্রভাগে এসে উসমান (রা.)-এর মাথার কাছে দাঁড়িয়ে ডাল দিয়ে আঘাত করে তাঁকে রক্তাক্ত করে। রক্তের ছিটা কুরআন মজীদের উপর পড়ে তা রঞ্জিত হয়। পরে তারা তরবারি দ্বারা তাঁর ওপর আঘাত হানে। অপর এক ব্যক্তি অগ্রসর হয়ে তাঁর বুকে তরবারির আঘাত করে।
স্ত্রী নাইলা বিনত ফারাফিসা আল-কালবিয়া আহত হয়ে চিৎকার করে খলীফার গায়ের ওপর পড়ে যান। তিনি বলতে থাকেন,
“হে শায়বার কন্যা! তবে কি আমীরুল মু’মিনীনকে হত্যা করা হবে?”
তিনি তলোয়ার হাতে নিলে এক ব্যক্তি তাঁর হাতে আঘাত করে। (তারীখে তাবারী ও তারীখুল কামিলের বর্ণনায় উল্লেখ আছে যে, নাইলার হাতের আঙুল কেটে যায়।)
সন্ত্রাসীরা গৃহের আসবাবপত্র লুটপাট করে। এক ব্যক্তি উসমান (রা.)-এর নিকট দিয়ে অতিক্রম করার সময় তাঁকে কুরআন মজীদের ওপর মাথা রেখে থাকতে দেখে তাতে পদাঘাত করে এবং বলে—
“আজকের দিনের মতো এমন সুন্দর কোনো কাফিরের মুখমণ্ডল আমি আর দেখিনি, আর আজকের দিনের মতো এমন সম্মানজনক কোনো কাফিরের শয্যাও দেখিনি।”
বর্ণনাকারী বলেন, আল্লাহর কসম! সন্ত্রাসীরা গৃহে কিছুই অবশিষ্ট রাখেনি; এমনকি পানির পেয়ালাও নিয়ে যায়।
হাফিজ ইবন আসাকির বর্ণনা করেন যে, উসমান (রা.) দৃঢ়তার সঙ্গে গৃহের সদস্যদের বের করে দেন। তাঁর পরিবার ছাড়া সেখানে আর কেউ ছিল না। এ সময় সন্ত্রাসীরা দেয়াল টপকে, দরজা খুলে এবং বাতি জ্বালিয়ে ভিতরে প্রবেশ করে। তাদের মধ্যে কোনো সাহাবী ছিলেন না; এমনকি কোনো সাহাবীর সন্তানও ছিলেন না। কেবল মুহাম্মদ ইবন আবূ বকর (রা.) ছিলেন।
এদের মধ্যে কেউ তাঁকে প্রহার করলে তিনি বেহুঁশ হয়ে পড়েন। নারীরা চিৎকার করতে থাকলে তারা ছত্রভঙ্গ হয়ে বেরিয়ে যায়। খলীফা নিহত হয়েছেন মনে করে মুহাম্মদ ইবন আবূ বকর পুনরায় গৃহে প্রবেশ করেন। তিনি দেখেন যে খলীফার জ্ঞান ফিরেছে। তখন তিনি বলেন,
“হে বোকা বৃদ্ধ! তুমি কোন ধর্মের অনুসারী?”
উসমান (রা.) জবাব দেন,
“আমি ইসলামের অনুসারী। আমি বোকা বৃদ্ধ নই; বরং আমি আমীরুল মু’মিনীন।”
ইবন আবূ বকর বলেন,
“তুমি কিতাবুল্লাহতে পরিবর্তন সাধন করেছ।”
খলীফা বলেন,
“কিতাবুল্লাহ তো আমার এবং তোমাদের সকলের সম্মুখেই বিদ্যমান রয়েছে। আমি কিভাবে তাতে বিকৃতি সাধন করলাম?”
(আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, খণ্ড ৩৩৩)
ইবন আবূ বকর এগিয়ে এসে বলেন—
“কিয়ামতের দিন আমরা যদি বলি, ‘হে আমাদের পালনকর্তা! আমরা আমাদের নেতা-কর্তাদের আনুগত্য করেছিলাম, আর তারা আমাদেরকে বিভ্রান্ত করেছে,’ তবে আমাদের কথা গৃহীত হবে না।” (সূরা আহযাব ৩৩:৬৭)
এ কথা বলে তিনি খলীফাকে টেনে-হেঁচড়ে দরজা পর্যন্ত নিয়ে আসেন। তখন খলীফা বলছিলেন—
“হে ভাতিজা! তোমার পিতা আমার দাড়ি ধরতেন না।”
মিসরীয়দের মধ্যে কিনদা গোত্রের এক ব্যক্তি আসে, যার উপাধি ছিল ‘গাধা’; তার কুনিয়া ছিল আবূ রোমান। কাতাদার মতে তার নাম ছিল রোমান; অন্যদের মতে নীলাভ-লাল-হলুদের মিশ্র বর্ণের ব্যক্তি। কেউ বলেন, তার নাম ছিল সুদান ইবন রোমান আল-মুরাদী। ইবন উমর সূত্রে বর্ণিত আছে, খলীফা উসমান (রা.)-এর হত্যাকারীর নাম ছিল আসওয়াদ ইবন হুমরান। সে বর্শা দ্বারা তাঁকে আঘাত করে; তার হাতে উন্মুক্ত তরবারিও ছিল। পরে সে পুনরায় এসে তাঁর বুকে বর্শা বিদ্ধ করে এবং তরবারির ধার পেটে স্থাপন করে তাঁর জীবন শেষ করে।
স্ত্রী নাইলা বাধা দিতে গেলে তাঁর হাতের আঙুল কেটে যায়।
আরও বর্ণিত আছে যে, মুহাম্মদ ইবন আবূ বকর তীরের ফলক নিক্ষেপ করলে তা খলীফার গলায় বিদ্ধ হয়। তবে অধিকতর গ্রহণযোগ্য মত হলো—হত্যাকারী অন্য কেউ; মুহাম্মদ ইবন আবূ বকর নন। খলীফা বলেছিলেন,
“তুমি এমন এক ব্যক্তির দাড়ি ধরেছ, যাকে তোমার পিতা সম্মান করতেন।”
এ কথা শুনে তিনি লজ্জিত হয়ে ফিরে যান।
ইবন আওন সূত্রে ইবন আসাকির বর্ণনা করেন যে, কিনানা ইবন বিশর খলীফার মুখমণ্ডল ও মাথার অগ্রভাগে লোহার হাতুড়ি দ্বারা আঘাত করলে তিনি কাত হয়ে পড়ে যান। আবদুর রহমান ইবন হারিসও অনুরূপ বর্ণনা করেছেন। ‘ফুতূহে ইবন আ’শাম’-এ উল্লেখ আছে, আহত হয়ে খলীফা জামার পেছনের অংশ মাটিতে স্থাপন করে পড়ে যান। পরে সুদান ইবন হুমরান আল-মুরাদী তাঁকে হত্যা করে। আমর ইবনুল হুমুক তাঁর বুকে চড়ে বসে বর্শা দ্বারা নয়বার আঘাত করে এবং বলে—
“তিনটি আল্লাহর উদ্দেশ্যে, বাকি ছয়টি আমার অন্তরের ক্ষোভের জন্য।”
তাবারানী হাসান সূত্রে বর্ণনা করেন যে, এক আনসারী ব্যক্তি গৃহে গেলে উসমান (রা.) তাকে বলেন—
“ভাতিজা, ফিরে যাও; তুমি আমার হত্যাকারী নও।”
লোকটি জিজ্ঞেস করে, “আপনি কীভাবে তা জানলেন?”
তিনি বলেন, “কারণ তোমার জন্মের সপ্তম দিনে তোমাকে নবী করীম (সা.)-এর কাছে আনা হলে তিনি তোমার তাহনিক করেন এবং তোমার জন্য দোয়া করেন।”

উসমান হত্যাকাণ্ড
উসমান হত্যা

এবারে আসুন আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া গ্রন্থের ৭ম খণ্ডে চলে যাই [8]

উসমান (রা.)-এর হত্যার বিবরণ
(১) খলীফা ইবন খাইয়াতের বর্ণনা
খলীফা ইবন খাইয়াত রাবাব সূত্রে বর্ণনা করেন:
উসমান (রা.) আশতারকে তাঁর জন্য ডেকে আনতে আমাকে পাঠান। তিনি বললেন, “লোকেরা কি চায়?” উত্তরে বলা হলো, “তিনটির যেকোনো একটি মেনে নেওয়া ছাড়া উপায় নেই।” তিনি জানতে চাইলেন, “সে তিনটি বিষয় কী?”
(আশতার) বললেন:
তারা আপনাকে ইখতিয়ার দিচ্ছে—
১. আপনি দায়িত্ব ত্যাগ করে তাদের হাতে ন্যস্ত করুন এবং ঘোষণা করুন: ‘ব্যাপারটি তোমাদের; তোমরা যাকে ইচ্ছা নির্বাচন কর।’
২. আপনি নিজেকেও কিসাস (প্রতিশোধ)-এর জন্য পেশ করতে পারেন।
৩. অন্যথায় লোকেরা আপনার সঙ্গে যুদ্ধ করবে।
তখন তিনি বললেন:
“তারা যে নেতৃত্ব তাদের হাতে ন্যস্ত করার কথা বলছে, তা আমি করব না। কারণ, আল্লাহ তা’আলা আমাকে যে পোশাক পরিয়েছেন, আমি তা খুলে ফেলতে পারি না। আর তাদের জন্য আমি নিজের থেকে কিসাস গ্রহণ করার ব্যাপারে আল্লাহর কসম করে বলছি—যদি তোমরা আমাকে হত্যা করো, তবে আমার পরে আর পরস্পরকে ভালোবাসতে পারবে না, সকলে মিলে একসঙ্গে নামাজ আদায় করতে পারবে না এবং একসঙ্গে শত্রুর বিরুদ্ধে যুদ্ধও করতে সক্ষম হবে না।”
বর্ণনাকারী বলেন, নেকড়ের মতো খর্বাকৃতির এক ব্যক্তি দরজা দিয়ে উঁকি মেরে ফিরে যায়। ১৩ জন লোক সঙ্গে নিয়ে হযরত আবূ বকর তনয় মুহাম্মদ আগমন করে তাঁর দাড়ি ধরে টান দেন; ফলে তাঁর দাঁতের ঘর্ষণের শব্দ শোনা যায়।
তিনি (মুহাম্মদ) বললেন:
“মু‘আবিয়া তোমার কোনো কাজে আসেনি; ইবন আমিরও কাজে লাগেনি; তোমার পত্রাদিও তোমাকে রক্ষা করতে পারেনি।”
খলীফা বললেন:
“ভাতিজা, আমার দাড়ি ছাড়।”
বর্ণনাকারী বলেন, তিনি চক্ষুর ইশারায় উপস্থিত ব্যক্তিদের মধ্যে একজনের সাহায্য চাইলেন। লোকটি তীরের ভারী ফলক নিয়ে এগিয়ে এসে তাঁর মস্তকে আঘাত করে।
আমি জিজ্ঞেস করলাম, “তারপর কী হলো?”
তিনি বললেন, “এরপর একে একে সকলে হামলা চালিয়ে তাঁকে হত্যা করে।”
(২) সাইফ ইবন উমর তামীমীর বর্ণনা (খানসা সূত্রে)
সাইফ ইবন উমর তামীমী (রহ.) ঈস ইবন কাসিম সূত্রে, উসামা ইবন যায়দের আজাদকৃত দাসী খানসা সূত্রে—[এই খানসা উসমান (রা.)-এর স্ত্রী নাইলা বিনত ফারাফিসার সঙ্গে থাকতেন]—বর্ণনা করেন:
হামলার সময় তিনি গৃহে ছিলেন। এ সময় মুহাম্মদ ইবন আবূ বকর (রা.) গৃহে প্রবেশ করে সঙ্গে থাকা তীরের ভারী ফলক দিয়ে তাঁর গলায় আঘাত করেন। উসমান (রা.) বলেন:
“ভাতিজা, থাম। আল্লাহর শপথ, তুমি এমন স্থানে হাত দিয়েছ, যেখানে তোমার পিতাও হাত দিতেন না।”
তিনি লজ্জিত হয়ে দাড়ি ছেড়ে দূরে সরে দাঁড়ান। গৃহের লোকজন তাঁর মুখোমুখি হয় এবং দীর্ঘ বাদ-প্রতিবাদ হয়। লোকজন জয়ী হয়ে গৃহে প্রবেশ করে। মুহাম্মদ ইবন আবূ বকর গৃহ থেকে বের হয়ে চলে যান।
এরপর এক ব্যক্তি, যার হাতে খেজুরের ডাল ছিল, অগ্রসর হয়ে উসমান (রা.)-এর মাথায় আঘাত করে তাঁকে রক্তাক্ত করে। রক্তের ছিটা কুরআন মজীদের উপর পতিত হয়ে তা রঞ্জিত করে। তারপর তারা তরবারি দ্বারা তাঁর ওপর আঘাত হানে। অপর এক ব্যক্তি তাঁর বুকে তরবারি দ্বারা আঘাত করে।
স্ত্রী নাইলা বিনত ফারাফিসা আল-কালবিয়াও আহত হয়ে চিৎকার করে খলীফার গায়ের উপর পড়ে যান। তিনি বলতে থাকেন:
“হে শায়বার কন্যা! তবে কি আমীরুল মু’মিনীনকে হত্যা করা হবে?”
তিনি তলোয়ার হাতে নিলে এক ব্যক্তি তাঁর হাতে আঘাত করে। (তারীখে তাবারী ও তারীখুল কামিল-এর বর্ণনা মতে নাইলার হাতের আঙুল কাটা যায়।)
সন্ত্রাসীরা গৃহের আসবাবপত্র লুটপাট করে। এ সময় এক ব্যক্তি উসমান (রা.)-এর নিকট দিয়ে অতিক্রম করার সময় তাঁকে কুরআন মজীদের উপর মাথা রেখে থাকতে দেখে পদাঘাত করে বলে:
“আজকের দিনের মতো এমন সুন্দর কোনো কাফিরের মুখমণ্ডল আমি আর দেখিনি, আর আজকের দিনের মতো এমন সম্মানজনক কোনো কাফিরের শয্যাও আমি দেখিনি।”
বর্ণনাকারী বলেন:
“আল্লাহর কসম, সন্ত্রাসীরা গৃহে কিছুই রেখে যায়নি; এমনকি পানির পেয়ালাও নিয়ে যায়।”
(৩) ইবন আসাকিরের বর্ণনা
হাফিজ ইবন আসাকির বর্ণনা করেন যে, উসমান (রা.) দৃঢ়তার সঙ্গে গৃহের সকল সদস্যকে বের করে দেন। তাঁর পরিবার ছাড়া সেখানে আর কেউ ছিল না। সন্ত্রাসীরা দেয়াল টপকে, দরজা খুলে এবং বাতি জ্বালিয়ে ভিতরে প্রবেশ করে।
তাদের মধ্যে কোনো সাহাবী ছিলেন না; এমনকি কোনো সাহাবীর সন্তানও ছিলেন না। কেবল মুহাম্মদ ইবন আবূ বকর (রা.) ছিলেন।
তাদের মধ্যে কেউ অগ্রসর হয়ে তাঁকে প্রহার করলে তিনি বেহুঁশ হয়ে পড়েন। নারীরা চিৎকার শুরু করলে তারা ছত্রভঙ্গ হয়ে গৃহত্যাগ করে।
খলীফা নিহত হয়েছেন মনে করে মুহাম্মদ ইবন আবূ বকর পুনরায় প্রবেশ করেন। তিনি দেখেন যে খলীফার জ্ঞান ফিরেছে। তখন তিনি বলেন:
“হে বোকা বৃদ্ধ! তুমি কোন ধর্মের অনুসারী?”
উসমান (রা.) জবাব দেন:
“আমি ইসলামের অনুসারী। আমি বোকা বুড়ো নই; বরং আমি আমীরুল মু’মিনীন।”
ইবন আবূ বকর বলেন:
“তুমি কিতাবুল্লাহয় পরিবর্তন সাধন করেছ।”
খলীফা বলেন:
“কিতাবুল্লাহ তো আমার এবং তোমাদের সকলের সম্মুখে বিদ্যমান রয়েছে। আমি কিভাবে তাতে বিকৃতি সাধন করলাম?”
(৪) “কিয়ামতের দিন…” আয়াত উদ্ধৃতি ও দরজা পর্যন্ত টানা
ইবন আবূ বকর এগিয়ে যান এবং বলেন:
“কিয়ামতের দিন আমরা যদি বলি— ‘হে আমাদের পালনকর্তা! আমরা আমাদের নেতা-কর্তাদের আনুগত্য করেছিলাম, আর তারা আমাদেরকে বিভ্রান্ত করেছে’—তবে আমাদের কথা গৃহীত হবে না।” (সূরা আহযাব ৩৩:৬৭)
এই বলে তিনি খলীফাকে টানা-হেঁচড়া করে ঘরের দরজা পর্যন্ত নিয়ে আসেন। তখন খলীফা বলছিলেন:
“হে ভাতিজা! তোমার পিতা আমার দাড়ি ধরতে পারতেন না!”
(৫) হামলাকারীদের পরিচয় (বিভিন্ন বর্ণনা)
মিসরীয়দের মধ্যে কিনদা গোত্রের এক ব্যক্তি আগমন করে, যার পদবী ছিল ‘গাধা’। তার কুনিয়াত (উপনাম) ছিল আবূ রোমান। কাতাদার মতে লোকটির নাম ছিল রোমান; অন্যদের মতে সে ছিল নীল, লাল-হলুদের মিশ্র বর্ণের। কেউ কেউ বলেন, লোকটির নাম ছিল সুদান ইবন রোমান আল-মুরাদী।
ইবন উমর সূত্রে বর্ণিত আছে। তিনি বলেন, যে ব্যক্তি খলীফা উসমান (রা.)-কে হত্যা করেছে, তার নাম ছিল আসওয়াদ ইবন হুমরান। সে বর্শা দ্বারা তাঁকে আঘাত হানে; তার হাতে উন্মুক্ত তরবারিও ছিল। তিনি বলেন, লোকটি পুনরায় আগমন করে তাঁর বুকে বর্শা বিদ্ধ করে এবং তরবারির ধার তাঁর পেটে স্থাপন করে তাঁর জীবনলীলা সাঙ্গ করে দেয়।
স্ত্রী নাইলা নিকটে ছিলেন। তিনি এগিয়ে এসে বাধা দান করলে তাঁর হাতের আঙুল কাটা যায়।
একথাও বর্ণিত আছে যে, মুহাম্মদ ইবন আবূ বকর তীরের ফলক নিক্ষেপ করলে তা খলীফার গলায় বিদ্ধ হয়। সঠিক কথা এই যে, হত্যাকারী ছিল অন্য কেউ; মুহাম্মদ ইবন আবূ বকর নন।
“তুমি এমন এক ব্যক্তির দাড়ি ধরেছ, তোমার পিতা যাকে সম্মান করতেন।” খলীফা একথা বললে তিনি লজ্জিত হয়ে ফিরে যান। এরপর তিনি মুখ ঢেকে দূরে সরে যান। অবশ্য এতেও তাঁর কোনো কল্যাণ হয়নি। আল্লাহর অভিপ্রায় সুনিশ্চিত, আর এটা আল্লাহর কিতাবে লিপিবদ্ধ ছিল।
(৬) ইবন আসাকির—লোহার হাতুড়ি, পড়ে যাওয়া, ও অন্যান্য বর্ণনা
ইবন আওন সূত্রে ইবন আসাকির বর্ণনা করেন যে, কিনানা ইবন বিশর খলীফার মুখমণ্ডল এবং মাথার অগ্রভাগে লোহার হাতুড়ি দ্বারা আঘাত করলে খলীফা কাত হয়ে পড়ে যান। আবদুর রহমান ইবন হারিসও ইবন আওন সূত্রে অনুরূপ বর্ণনা করেছেন।
পক্ষান্তরে ‘ফুতূহে ইবন আ’শাম’-এ আছে যে, খলীফা আহত হয়ে জামার পেছনের অংশ মাটিতে স্থাপনপূর্বক পতিত হন। কাত হয়ে পড়ে গেলে সুদান ইবন হুমরান আল-মুরাদী আঘাত করতে করতে তাঁকে হত্যা করে।
অবশ্য আমর ইবনুল হুমুক লাফ দিয়ে খলীফার বুকে চড়ে বসে—তখন তাঁর অন্তিম অবস্থা। সে বর্শা দ্বারা নয়বার তাঁকে আঘাত করে এবং বলে:
“তিনটা আল্লাহর উদ্দেশ্যে, বাকি ছয়টা আমার বুকে পুঞ্জীভূত ক্ষোভের জন্য।”
(৭) তাবারানীর বর্ণনা—আনসারী ব্যক্তি, তাহনীক, এবং মুহাম্মদ ইবন আবূ বকরকে “হন্তা” বলা
তাবারানী আহমদ ইবন মুহাম্মদ ইবন ছাদকা বাগদাদী ….. হাসান সূত্রে বর্ণনা করেন:
সায়াফ উসমান আমাকে হাদীস শুনান যে, জনৈক আনসারী ব্যক্তি গৃহে উসমান (রা.)-এর নিকটে গেলে তিনি তাকে বললেন:
“ভাতিজা! ফিরে যাও, তুমি তো আমার হত্যাকারী নও।”
লোকটি বললো, “আপনি কেমন করে তা জানতে পারলেন?”
তিনি বললেন:
“কারণ, তোমার জন্মের সপ্তম দিবসে তোমাকে নবী করীমের খেদমতে আনা হলে তিনি তোমার তাহনীক তথা মিষ্টি-মুখ করেন (নিজ মুখে খেজুর চিবিয়ে নরম করে তোমার মুখে তুলে দেন) এবং তোমার বরকতের জন্য রাসূলুল্লাহ নিজে দু’আ করেছেন।”
তারপর অপর এক আনসারী ব্যক্তি তাঁর কাছে গেলে তাকেও ঠিক একই কথা বলেন।
এরপর মুহাম্মদ ইবন আবূ বকর প্রবেশ করলে তাকে বললেন:
“তুমি আমার হন্তা।”
তিনি বললেন, “হে অথর্ব বৃদ্ধ, তুমি কেমন করে জানলে?”
খলীফা বললেন:
“জন্মের সপ্তম দিনে তাহনীক আর দু’আ’র জন্য তোমাকে রাসূলুল্লাহর খেদমতে হাজির করা হলে তুমি রাসূলুল্লাহর কোলে পায়খানা করেছিলে।”
রাবী বলেন: এরপর তাঁর বুকে চড়ে দাড়ি ধরে এবং হাতের তীরের ফলক উসমান (রা.)-এর বুকে বিদ্ধ করে।
(এই হাদীসটি নিতান্ত যয়ীফ পর্যায়ের এবং তাতে গ্রহণযোগ্য না হওয়ার উপকরণও বিদ্যমান রয়েছে।)
একাধিক সূত্রে একথা প্রমাণিত হয়েছে যে, তাঁর দেহের রক্তের ছিটা মহান আল্লাহর বাণী—
فَسَيَكْفِيكَهُمُ اللَّهُ وَهُوَ السَّمِيعُ الْعَلِيمُ
—এর উপর পড়েছিল।
(৮) দাফন বিলম্ব—৩ দিন/২ রাত/রাতেই দাফন (ভিন্ন মত)
ইবন জারীর তাবারী উল্লেখ করেছেন, নিহত হওয়ার পর উসমান (রা.)-এর লাশ তিন দিন দাফন-কাফনহীন অবস্থায় পড়ে থাকে। … আলী (রা.)-এর বায়‘আতের ব্যাপারে ব্যস্ত থাকায় লোকেরা তাঁর দিকে মনোযোগ দিতে পারেনি। বায়‘আতের কাজ সম্পন্ন হলে তবে সে দিকে মনোযোগ দেয়।
কারো কারো মতে, দু’ রাত পড়ে থাকে; আবার অন্যদের মতে রাতেই তাঁকে দাফন করা হয়।
বিদ্রোহীদের ভয়ে গোপনে মাগরিব ও এশার মধ্যবর্তী সময়ে তাঁকে দাফন করা হয়। আবার কারো কারো মতে, এ ব্যাপারে বড় বড় সাহাবীর সঙ্গে পরামর্শ করে অনুমতি নেওয়া হয়।
(৯) জানাযা ও দাফনে অংশগ্রহণকারী (নামগুলোর তালিকা)
সাহাবীদের একটি ক্ষুদ্র দল তাঁর লাশ নিয়ে গমন করেন; তাঁদের মধ্যে ছিলেন—
হাকীম ইবন হিসাম, হুয়াইতিব ইবন আব্দুল উয্যা, আবুল জাহাম ইবন হুলাইফা, নিয়ার ইবন মাকরাম আসলামী, যুবাইর ইবন মুৎইম, যাইদ ইবন সাবিত, কা’ব ইবন মালিক, তালহা ও যুবাইর, আলী ইবন আবূ তালিব, তাঁর সঙ্গীদের মধ্যে কিছু লোক এবং কয়েকজন নারী—যাঁদের মধ্যে ছিলেন তাঁর দুই স্ত্রী নাইলা এবং উম্মুল বানীন বিনত উত্তা ইবন হাসীন—এবং দু’জন শিশু।
এটাই ওয়াকিদী এবং সাইফ ইবন উমর তামীমীর উক্তির সারবস্তু।
এছাড়া তাঁর খাদিম-সেবকদের একটি দল গোসল-কাফনের পর তাঁর মৃতদেহ গৃহের দরজা পর্যন্ত বহন করে আনে। কারো কারো মতে তাঁকে গোসল এবং কাফন পরানো হয়নি; তবে প্রথমোক্ত মতটিই বিশুদ্ধ।
(১০) জানাযার ইমামতি—ভিন্ন বর্ণনা
যুবাইর ইবন মুৎইম তাঁর জানাযার ইমামতি করেন। কেউ কেউ বলেন যুবাইর ইবনুল আওয়াম; আবার কারো মতে হাকীম ইবন হিসাম, বা মারওয়ান ইবনুল হাকাম; ভিন্নমতে মিসওয়ার ইবন মাখরামা তাঁর জানাযার নামাজে ইমামতি করেন।
(১১) দাফনস্থল নিয়ে বাধা, প্রস্তর নিক্ষেপ, এবং ‘বাকী’-র বাইরে দাফন
কোনো কোনো খারিজী তাঁর লাশ দাফনের বিরোধিতা করে লাশে প্রস্তর নিক্ষেপ করে এবং খাটিয়া থেকে ফেলে দিতে চায়। তারা ইহুদীদের কবরস্থান ‘দীর-ই মালা’-এ তাঁর লাশ দাফন করতে দৃঢ় সংকল্প ছিল। অবশেষে তাদের নিকট আলী (রা.)-কে প্রেরণ করলে তিনি তাদেরকে এ কাজ করতে বারণ করেন।
ওয়াকিদী উল্লেখ করেন যে, জানাযার স্থলে নামাজের জন্য লাশ রাখা হলে কতিপয় আনসার বাধা দিতে চাইলে আবূ জাহাম ইবন হুলাইফা বলেন:
“লাশ দাফন করতে দাও; কারণ আল্লাহর হুকুমে তাঁর ফেরেশতারা তাঁর জন্য জানাযার নামাজ পড়েছেন।”
এরপর তারা বলে, জান্নাতুল বাকীতে তাঁর লাশ দাফন করা যাবে না; বরং দেয়ালের বাইরে দাফন কর। তাই বাকীর পূর্ব দিকে খেজুরগাছের নিচে তাঁর লাশ দাফন করা হয়।
(১২) লাশে হামলা—পাঁজরের হাড় ভাঙা (ওয়াকিদী)
ওয়াকিদী উল্লেখ করেন, উসমান (রা.)-এর লাশ জানাযার নামাজের জন্য খাটিয়ায় রাখা হলে উমাইর ইবন যাবী তাঁর লাশের উপর হামলা চালায় এবং তাঁর পাঁজরের একটি হাড় ভেঙে ফেলে। যাবীকে আটক করা হয় এবং কারাগারে তার মৃত্যু হয়।
পরবর্তীকালে হাজ্জাজ ইবন ইউসুফ এই উমাইর ইবন যাবীকে হত্যা করে।
(১৩) ইমাম বুখারীর ইতিহাস গ্রন্থে—তাওয়াফের সময় দোয়া (অসম্পূর্ণ)
আর ইমাম বুখারী তাঁর ইতিহাস গ্রন্থে মূসা ইবন ইসমাঈল ….. মুহাম্মদ ইবন সীরীন সূত্রে উল্লেখ করেন যে, আমি কা’বা শরীফ তাওয়াফ করছিলাম, এমন সময় এক ব্যক্তি বলছিল:
اللهم اغفر لي وما أظن أن تغفر لي —

উসমান
উসমান 3
উসমান 5
উসমান 7
উসমান 9
উসমান 11

উপসংহার

উসমানি মুসহাফ-মানকীকরণ কোরআনের ইতিহাসে একযোগে দুটি বাস্তবতা তুলে ধরে: একদিকে এটি পাঠ-ঐক্য প্রতিষ্ঠার কার্যকর প্রশাসনিক পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হয়; অন্যদিকে একই পদক্ষেপ সাহাবীপর্যায়ের কর্তৃত্ব-প্রশ্ন, পাঠ-প্রাধান্য, এবং “কপি পোড়ানো”কে কেন্দ্র করে নৈতিক ও ধর্মীয় উদ্বেগ তৈরি করে। আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদের বিরোধ এই টানাপোড়েনকে সবচেয়ে স্পষ্টভাবে সামনে আনে। পাশাপাশি, উসমানের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক/রাজনৈতিক অভিযোগসমূহ—স্বজনপ্রীতি, গভর্নর নিয়োগ, অর্থনীতি/বায়তুলমাল বিতর্ক, সাহাবীদের সঙ্গে সংঘাত—বিদ্রোহের সামাজিক ভিত্তি নির্মাণ করে। ফলত, তাঁর মৃত্যু কেবল একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনার পরিণতি নয়; বরং একাধিক অভিযোগ, অসন্তোষ ও ক্ষমতা-সংঘাতের সমষ্টিগত বিস্ফোরণ হিসেবে ঐতিহাসিক সূত্রগুলোতে প্রতিফলিত।


তথ্যসূত্রঃ
  1. আদি কোরআন পুড়িয়ে ফেলা ↩︎
  2. কিতাবুল তাবাকাত আল-কবির, ইবন সা’দ, ২য় খণ্ড, পৃষ্ঠা ৪৪৪ ↩︎
  3. জামিউত তিরমিযী, সোলেমানিয়া বুক হাউস, পৃষ্ঠা ৮৫১ ↩︎
  4. Jami’ at-Tirmidhi Vol. 5, Book 44, Hadith 3104 ↩︎
  5. কিতাবুল মাসাহিফ, ইবন আবি দাউদ, পৃষ্ঠা ১৫ ↩︎
  6. ৬টি উপভাষার কোরআন পুড়িয়ে ফেলা ↩︎
  7. আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া, আল্লামা ইবনে কাসীর, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, সপ্তম খণ্ড, পৃষ্ঠা ৩৩২-৩৩৩ ↩︎
  8. আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ৭ম খণ্ড, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, পৃষ্ঠা ৩৩১-৩৩৪, ৩৪২-৩৪৩ ↩︎