
Table of Contents
- 1 ভূমিকাঃ বিশ্বব্যাপী ইসলামী আধিপত্যই জিহাদের লক্ষ্য
- 2 শিরক ও ফিতনাঃ যুদ্ধের ধর্মতাত্ত্বিক অজুহাত ও ব্যাখ্যা
- 3 আক্রমণাত্মক জিহাদ (জিহাদ আল-তালাব): দাওয়াত, জিযিয়া ও আক্রমণ
- 4 রাতের আঁধারে অতর্কিত হামলাঃ বেসামরিক নারী-শিশুরা যখন গনিমতের মাল
- 5 গামিদির ‘ইতমাম-ই-হুজ্জাহ’ তত্ত্ব, প্রগতিশীল ব্যাখ্যা এবং কিতালের প্রশ্ন
- 6 জবরদস্তি ও ধর্মান্তরঃ ‘দ্বীনের মধ্যে জবরদস্তি নেই’
- 7 উপসংহারঃ আধুনিক মানবাধিকার বনাম জিহাদের চিরন্তন বিধান
ভূমিকাঃ বিশ্বব্যাপী ইসলামী আধিপত্যই জিহাদের লক্ষ্য
ইসলামের রাজনৈতিক ও সামরিক দর্শনে ‘জিহাদ’ এবং ‘কিতাল’ (সশস্ত্র যুদ্ধ) কেবল কোনো সাময়িক প্রতিরক্ষা কৌশল নয়, বরং এটি একটি সুদূরপ্রসারী ও বৈশ্বিক লক্ষ্য অর্জনের রক্তক্ষয়ী স্থায়ী হাতিয়ার। এই দর্শনের মূলে রয়েছে পৃথিবীর বুক থেকে যাবতীয় ‘শিরক’ বা অংশীবাদিতা নির্মূল করে একক আল্লাহর সার্বভৌমত্ব বা ‘হুকুমত’ কায়েম করা। শাস্ত্রীয় ইসলাম অনুযায়ী, সমগ্র বিশ্ব মূলত দুই ভাগে বিভক্ত— ‘দারুল ইসলাম’ বা ইসলামের ভূমি এবং ‘দারুল হারব’ বা যুদ্ধের ভূমি। ইসলামের এই সম্প্রসারণবাদী নীতি অনুযায়ী, যতক্ষণ পর্যন্ত পৃথিবীর প্রতিটি প্রান্তে আল্লাহর দ্বীন বিজয়ী না হবে, আল্লাহর হুকুমত কায়েম না হবে এবং প্রতিটি জনপদ থেকে অমুসলিমদের রাজনৈতিক ও ধর্মীয় কর্তৃত্ব বিলুপ্ত না হবে, ততক্ষণ পর্যন্ত মুমিনদের ওপর এই যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়াকে একটি পবিত্র ও অপরিহার্য ধর্মীয় দায়িত্ব হিসেবে সাব্যস্ত করা হয়েছে।
এই জিহাদের লক্ষ্য কেবল মানচিত্র দখল নয়, বরং মানবমস্তিস্ক থেকে অন্য সকল ধর্ম বা ‘কুফর’ ও ‘শিরক’ মুছে ফেলা। যখন কোনো জনপদে মুসলিম বাহিনী আক্রমণ চালায়, তখন সেখানে অমুসলিমদের সামনে তিনটি সুনির্দিষ্ট পথ খোলা রাখা হয়: প্রথমত, ইসলাম গ্রহণ করা; দ্বিতীয়ত, বশ্যতা স্বীকার করে চরম অবমাননাকর ও বৈষম্যমূলক ‘জিযিয়া’ কর প্রদানের মাধ্যমে ‘জিম্মী’ হিসেবে বেঁচে থাকা; এবং তৃতীয়ত, এই দুইটিতে সম্মত না হলে যুদ্ধের মুখোমুখি হওয়া। এই যুদ্ধ কেবল সামরিক বিজয় নয়, বরং এটি বিজয়ীদের জন্য এক বিশাল অর্থনৈতিক ও ব্যক্তিগত লাভের পথও উন্মুক্ত করে দেয়। যুদ্ধের পর বিজিত অঞ্চলের মানুষের ভাগ্য নির্ধারিত হয় ‘গনীমত’ বা যুদ্ধের লুটের মাল হিসেবে। সেখানে পরাজিত পুরুষের রক্ত যেমন হালাল গণ্য করা হয়, জমিনে তাদের প্রচুর রক্ত প্রবাহিত করার নির্দেশনা দেয়া হয়, তেমনি তাদের নারী ও শিশুদের ‘দাস-দাসী’ হিসেবে গ্রহণ করা, ভোগ করা কিংবা বাজারে বিক্রি করে দেওয়াকেও ধর্মীয়ভাবে বৈধতা দেওয়া হয়েছে।
বর্তমান বিশ্বে ইসলাম প্রচারকগণ ইসলামের এই ‘আক্রমণাত্মক জিহাদ’ বা ‘জিহাদ আল-তালাব’-এর ধারণাকে প্রায়শই আত্মরক্ষামূলক বলে প্রচার করলেও, ধ্রুপদী তাফসীর, হাদিস এবং ফিকাহ শাস্ত্রের গ্রন্থগুলো ভিন্ন এক নিষ্ঠুর বাস্তবতার সাক্ষ্য দেয়। যেখানে শিরককে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে পৃথিবীর ‘সবচেয়ে বড় বিশৃঙ্খলা’ বা ‘ফিতনা’ হিসেবে, আর সেই বিশৃঙ্খলা বা ফিতনা ফ্যাসাদ দমনের নামে ভিন্ন ধর্মাবলম্বীদের অস্তিত্বকে হুমকির মুখে ফেলা হয়েছে। এই প্রবন্ধে আমরা প্রামাণ্য তথ্যের ভিত্তিতে দেখাবো কীভাবে ইসলামের এই জিহাদ ও কিতালের বিধান একইসাথে একটি রাজনৈতিক আধিপত্যবাদ এবং অমানবিক দাসপ্রথার জন্মদাতা। এই আলোচনাটি কেবল তাত্ত্বিক সমালোচনা নয়, বরং এটি ইসলামের সেই কঠোর শাস্ত্রীয় কাঠামোর নির্মোহ ব্যবচ্ছেদ, যা আধুনিক মানবাধিকার ও মানবিক মূল্যবোধের সাথে সরাসরি সংঘাতপূর্ণ।
শিরক ও ফিতনাঃ যুদ্ধের ধর্মতাত্ত্বিক অজুহাত ও ব্যাখ্যা
ইসলামি আক্রমণাত্মক জিহাদের এই কেয়ামত পর্যন্ত অন্তহীন ধারাবাহিকতাকে বৈধতা দেওয়ার জন্য কোরআনের একটি বিশেষ শব্দকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে, তা হলো— ‘ফিতনা-ফ্যাসাদ’। সাধারণ অর্থে ফিতনা-ফ্যাসাদ বলতে বিশৃঙ্খলা বা গোলযোগ বোঝানো হলেও, জিহাদের আয়তগুলোতে এর অর্থ অত্যন্ত সুনির্দিষ্ট এবং ভয়াবহ। ইসলামের ধ্রুপদী ব্যাখ্যা অনুযায়ী, পৃথিবীতে আল্লাহর একচ্ছত্র আধিপত্যের পথে সবচেয়ে বড় বাধা বা বিশৃঙ্খলা হলো ‘শিরক’ বা আল্লাহর সাথে অন্য কাউকে অংশীদার করা। অর্থাৎ, পৃথিবীতে একজন অমুসলিমের অস্তিত্ব বা ভিন্ন কোনো ধর্মের উপাসনা করাই ইসলামের দৃষ্টিতে একটি বিশৃঙ্খলা বা মহাতঙ্ক বা ফিতনা, যা যুদ্ধের মাধ্যমে নির্মূল করা মুমিনদের জন্য আবশ্যিক কর্তব্য। আসুন মতিউর রহমান মাদানির একটি বক্তব্য শুনি, যা থেকে খুব পরিষ্কার বোঝা যাবে যে, ফিতনা ফ্যাসাদ কেন আল্লাহর দৃষ্টিতে সবচাইতে মারাত্মক অপরাধ এবং শিরক কীভাবে ফিতনা ফ্যাসাদের অন্তর্ভূক্ত একটি অপরাধ হিসেবে ইসলামে গণ্য,
জিহাদের এই চরমপন্থী ধারণাটি বোঝার জন্য সূরা আনফালের ৩৯ নম্বর আয়াতটির তাফসীর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। হানাফী মাযহাবের প্রখ্যাত পণ্ডিত আল্লামা কাজী ছানাউল্লাহ পানিপথী তার ‘তাফসীরে মাযহারী’তে এই আয়াতের যে ব্যাখ্যা দিয়েছেন, তা থেকে পরিষ্কার হয় যে ইসলামের দৃষ্টিতে শান্তির একমাত্র পথ হলো হয় ইসলাম গ্রহণ, না হয় চরম লাঞ্ছনার সাথে আনুগত্য স্বীকার। “এবং তোমরা তাহাদিগের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করিতে থাকিবে যতক্ষণ না ফিতনা দূরীভূত হয় এবং আল্লাহের দ্বীন সামগ্রীকভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়…” (সূরা আনফাল: ৩৯)
এই আয়াতের ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে, পৃথিবীতে সবচেয়ে বড় বিশৃঙ্খলা হচ্ছে শিরক। আলোচ্য বাক্যে ফিতনা অপসারিত না হওয়া পর্যন্ত যুদ্ধ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এর অর্থ—মুশরিকেরা যতক্ষণ পর্যন্ত শিরক পরিত্যাগ না করবে, অথবা মুসলমানদের একচ্ছত্র কর্তৃত্ব মেনে নিয়ে জিযিয়া দিতে সম্মত না হবে, ততক্ষণ পর্যন্ত তাদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম চালিয়ে যেতে হবে। এখানে ‘দ্বীন প্রতিষ্ঠা’র অর্থ হলো শক্তি, বিজয় এবং একচ্ছত্র শাসন প্রতিষ্ঠা। আসুন সারা পৃথিবীতে বর্তমান সময়ে খুবই জনপ্রিয় একজন সালাফি আলেমের বক্তব্য শুনে নিই,
এই শাস্ত্রীয় ব্যাখ্যার সপক্ষে আমরা আল্লামা পানিপথীর মূল গ্রন্থের দলিলগুলো নিচে দিচ্ছি, যা প্রমাণ করে যে এটি কোনো বিচ্ছিন্ন ব্যাখ্যা বা বোঝার ভুল নয়, বরং ইসলামের মূলধারার আকিদা [1] –
এবং তোমরা তাহাদিগের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করিতে থাকিবে যতক্ষণ না ফিতনা দূরীভূত হয় এবং আল্লাহের দ্বীন সামগ্রীকভাবে প্রতিষ্ঠিত হয় এবং যদি তাহারা বিরত হয় তবে তাহারা যাহা করে আল্লাহ্ তাহার সম্যক দ্রষ্টা।
যদি তাহারা মুখ ফিরায় তবে জানিয়া রাখ যে আল্লাহ্ই তোমাদিগের অভিভাবক এবং কত উত্তম অভিভাবক এবং কত উত্তম সাহায্যকারী ।
( সূরা আনফালঃ ৩৯, ৪০ )
প্রথমে বলা হয়েছে এবং তোমরা তাদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করতে থাকবে যতক্ষণ না ফেতনা দূরীভূত হয় এবং আল্লাহর দ্বীন সামগ্রিকভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়। ফেতনা অর্থ বিশৃংখলা। আর পৃথিবীতে সবচেয়ে বড় বিশৃংখলা হচ্ছে শিরিক ( অংশীবাদিতা )। আলোচ্য বাক্যে ফেতনা অপসারিত না হওয়া পর্যন্ত যুদ্ধ করার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। এ কথার অর্থ-মুশরিকেরা যতক্ষণ পর্যন্ত শিরিক পরিত্যাগ না করবে, অথবা মুসলমানদের একচ্ছত্র কর্তৃত্ব মেনে নিয়ে জিযিয়া দিতে সম্মত না হবে, ততক্ষণ পর্যন্ত সংগ্রাম করতে হবে তাদের বিরুদ্ধে। আলোচ্য নির্দেশনাটিতে এ রকম বলা হয়নি যে, সকল অংশীবাদী ও অবিশ্বাসীকে যুদ্ধের মাধ্যমে ইসলাম গ্রহণে বাধ্য করতে হবে। এ রকম মনে করা হলে আলোচ্য আয়াতটি চলে যাবে জিযিয়া দিতে সম্মত হয় তবে তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ কোরো না। সুতরাং – এই আয়াতের নির্দেশনাটি দাঁড়াচ্ছে এ রকম অবিশ্বাসীরা ইসলাম গ্রহণ না করা পর্যন্ত অথবা জিযিয়া প্রদানের মাধ্যমে পূর্ণ অনুগত না হওয়া পর্যন্ত সংগ্রাম চালিয়ে যেতে হবে। এখানে দ্বীন প্রতিষ্ঠার অর্থ হবে শক্তি , বিজয় এবং একচ্ছত্র শাসন প্রতিষ্ঠা। ‘ দ্বীন ‘ শব্দের এ রকম অর্থ উল্লেখ করা হয়েছে কামুস গ্রন্থে।
হজরত মেকদাদ বিন আসওয়াদ বর্ণনা করেছেন, রসুল স . বলেছেন, এক সময় ইসলাম প্রতিষ্ঠিত হবে পৃথিবীর সকল গৃহে। অবিশ্বাস ও অংশীবাদিতা হয়ে যাবে ইসলামের সম্পূর্ণ অধীন। সকল শ্রেষ্ঠত্ব ও মাহাত্ম্য হবে কেবল আল্লাহর।
হজরত ইবনে ওমর কর্তৃক বর্ণিত হয়েছে, রসুল স . বলেছেন, আমাকে অবিশ্বাসীদের বিরুদ্ধে ওই সময় পর্যন্ত সংগ্রাম করার নির্দেশ দেয়া হয়েছে-যতক্ষণ না তারা বলে, ‘ লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মদুর রসুলুল্লাহ’ প্রতিষ্ঠা করে নামাজ এবং প্রদান করে জাকাত। যে এ রকম করবে আমার পক্ষ থেকে তার জীবন ও সম্পদ হয়ে যাবে সুরক্ষিত। আল্লাহ্ই তাদের অভ্যন্তরীণ হিসাব গ্রহণ করবেন ( তিনি বিচার করবেন , তারা তাদের জীবন ও সম্পদ রক্ষার জন্যে , না অন্তরের তাগিদে ইসলাম গ্রহণ করেছে )। বোখারী ও মুসলিম। হজরত আবু হোরায়রা থেকে ছয়জন সাহাবী হাদিসটি বর্ণনা করেছেন। আল্লামা সুয়ুতী বলেছেন , হাদিসটি সুবিদিত ( মুতাওয়াতির )।




এই ধর্মতাত্ত্বিক অবস্থান থেকেই শিরক বা কুফরিতে লিপ্ত ব্যক্তিদের রক্তকে ‘হালাল’ বা বৈধ মনে করা হয়। বর্তমান যুগের আলেমদের ব্যাখ্যাতেও এই একই সুর প্রতিধ্বনিত হয়। ড. আবু বকর মুহাম্মদ যাকারিয়ার সম্পাদনায় প্রকাশিত একটি গ্রন্থে অত্যন্ত স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে যে, শিরক কেবল একটি পাপ নয়, বরং এটি একটি ‘হত্যাযোগ্য অপরাধ’। অর্থাৎ, যারা ইসলামের নির্ধারিত তৌহিদের বাইরে অন্য কোনো বিশ্বাস লালন করে, তাদের সাথে কোন প্রকার চুক্তি না থাকলে স্বাভাবিক অবস্থাতে তাদের হত্যা করা হালাল। চুক্তি না থাকা এবং কুফরির কারণে তারা মূলত তাদের জীবনের নিরাপত্তা হারায়। আসুন সরাসরি বই থেকে দেখি, [2] –

এই তথাকথিত ‘ফিতনা’ দমনের নামে চালানো আক্রমণাত্মক জিহাদ কেবল তাত্ত্বিক আলোচনার বিষয় নয়। এটি সরাসরি প্রয়োগ করা হয় সেইসব অমুসলিম বা ‘হারবী’ কাফেরদের ওপর, যাদের সাথে মুসলিমদের কোনো শান্তি চুক্তি নেই। এই বিধানের মূল ভিত্তি হলো মুহাম্মদের-এর সেই বিখ্যাত বাণী, যেখানে তিনি বলেছেন— “আমাকে মানুষের বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে যতক্ষণ না তারা কালিমা পাঠ করে” [3]। সুতরাং, ইসলামের দৃষ্টিতে পৃথিবী থেকে শিরক নিশ্চিহ্ন না হওয়া পর্যন্ত এই রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম বা কিতাল চালিয়ে যাওয়া একটি চিরন্তন স্বর্গীয় আদেশ। [4] [5] [6] [7] [8] –
সূনান আত তিরমিজী (তাহকীককৃত)
৩৮/ ঈমান
পরিচ্ছেদঃ ১. যতক্ষণ পর্যন্ত মানুষ “লা-ইলা-হা ইল্লাল্লা-হ’ না বলবে ততক্ষণ পর্যন্ত তাদের বিরুদ্ধে কিতাল করতে আমি আদেশপ্রাপ্ত হয়েছি
২৬০৭। আবূ হুরাইরাহ (রাযিঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর মৃত্যুর পর আবূ বকর (রাযিঃ) যখন খলীফা নির্বাচিত হন, তখন আরবের কিছু সংখ্যক লোক কাফির হয়ে যায়। উমার ইবনুল খাত্তাব (রাযিঃ) আবূ বাকর (রাযিঃ)-কে বললেন, আপনি এদের বিরুদ্ধে কিভাবে অস্ত্ৰধারণ করবেন, অথচ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ মানুষ যে পর্যন্ত না “আল্লাহ তা’আলা ব্যতীত আর কোন প্ৰভু নেই” এই কথার স্বীকৃতি দিবে সেই পর্যন্ত আমি তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে আদিষ্ট হয়েছি। আর যে ব্যক্তি বললো, “আল্লাহ ব্যতীত আর কোন প্ৰভু নেই” সে আমার থেকে তার মাল ও রক্ত (জীবন) নিরাপদ করে নিল। তবে ইসলামের অধিকার সম্পর্কে ভিন্ন কথা। আর তাদের প্রকৃত হিসাব-নিকাশ রয়েছে আল্লাহ তা’আলার দায়িত্বে।
আবূ বকর (রাযিঃ) বললেনঃ আল্লাহর শপথ নামায ও যাকাতের মধ্যে যে ব্যক্তি পার্থক্য করে আমি তার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করবোই। কেননা যাকাত সম্পদের হাক্ক। কেউ উটের একটি রশি দিতেও যদি অস্বীকার করে, যা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -কে দিত, আল্লাহর কসম! আমি তার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করবোই। তারপর উমার ইবনুল খাত্তাব (রাযিঃ) বলেন, আল্লাহর শপথ! আমি দেখতে পেলাম আল্লাহ যেন যুদ্ধের জন্য আবূ বাকরের অন্তর উন্মুক্ত করে দিয়েছেন। অতঃপর আমি বুঝতে পারলাম যে, তার সিদ্ধান্তই যথার্থ।
সহীহঃ সহীহাহ (৪০৭), সহীহ আবূ দাউদ (১৩৯১-১৩৯৩), বুখারী ও মুসলিম।
আবূ ঈসা বলেন, এই হাদীসটি হাসান সহীহ। শু’আইব ইবনু আবী হামযা (রহঃ) যুহরী হতে, তিনি উবাইদুল্লাহ ইবনু আবদিল্লাহ হতে, তিনি আবূ হুরাইরাহ (রাযিঃ)-এর সূত্রে একই রকম বর্ণনা করেছেন। এই হাদীস মামার-যুহরী হতে, তিনি আনাস (রাযিঃ) হতে, তিনি আবূ বাকর (রাযিঃ) হতে এই সূত্রে ইমরান আল-কাত্তান বর্ণনা করেছেন। এ বর্ণনাটি ভুল। ‘ইমরানের ব্যাপারে মা’মার হতে বর্ণিত বর্ণনাতে বিরোধিতা করা হয়েছে।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আবূ হুরায়রা (রাঃ)
সূনান আত তিরমিজী (তাহকীককৃত)
৩৮/ ঈমান
পরিচ্ছেদঃ ২. আমি লোকদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে আদিষ্ট হয়েছি যতক্ষণ পর্যন্ত না তারা “লা-ইলা-হা ইল্লাল্লা-হ’ বলবে এবং নামায আদায় করবে
২৬০৮। আনাস ইবনু মালিক (রাযিঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ আমি লোকদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার জন্য আদিষ্ট হয়েছি যতক্ষণ পর্যন্ত না তারা সাক্ষ্য দিবে যে, আল্লাহ তা’আলা ব্যতীত আর কোন প্ৰভু নেই এবং মুহাম্মাদ আল্লাহ তা’আলার বান্দা ও তার রাসূল এবং আমাদের কিবলামুখী হয়ে নামায আদায় করবে, আমাদের যবেহকৃত পশুর গোশত খাবে এবং আমাদের মতো নামায আদায় করবে। তারা এগুলো করলে তাদের জান ও মালে হস্তক্ষেপ করা আমাদের জন্য হারাম হয়ে যাবে। কিন্তু ইসলামের অধিকারের বিষয়টি ভিন্ন। মুসলিমদের প্রাপ্য সুযোগ-সুবিধা তারাও পাবে এবং মুসলিমদের উপর অর্পিত দায়-দায়িত্ব তাদের উপরও বর্তাবে।
সহীহঃ সহীহাহ (৩০৩) ও (১/১৫২), সহীহ আবূ দাউদ (২৩৭৪), বুখারী অনুরূপ।
মুআয ইবনু জাবাল ও আবূ হুরাইরাহ (রাযিঃ) হতেও এই অনুচ্ছেদে হাদীস বর্ণিত আছে। আবূ ঈসা বলেন, এই হাদীসটি হাসান সহীহ এবং উপরোক্ত সূত্রে গারীব। ইয়াহইয়া (রাহঃ) হুমাইদ হতে, তিনি আনাস (রাযিঃ)-এর সূত্রে একই রকম হাদীস বর্ণনা করেছেন।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
সূনান নাসাঈ (ইফাঃ)
অধ্যায়ঃ ৩৮/ হত্যা অবৈধ হওয়া
পরিচ্ছদঃ ১. মুসলিমকে হত্যা করার অবৈধতা
৩৯৭৯. ইসহাক ইবন ইবরাহীম (রহঃ) … আবূ হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ না বলা পর্যন্ত আমি লোকের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে আদিষ্ট হয়েছি। যদি তারা ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ্’ বলে, তবে আমার পক্ষ হতে তাদের জানমাল রক্ষা করে নেবে কিন্তু এর হক ব্যতীত। আর তাদের হিসাব আল্লাহর যিম্মায়।
তাহক্বীকঃ সহীহ।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
সহীহ মুসলিম (হাঃ একাডেমী)
অধ্যায়ঃ ১। ঈমান (বিশ্বাস)
পরিচ্ছদঃ ৮.লোকেদের বিরুদ্ধে জিহাদের নির্দেশ যতক্ষণ না তারা স্বীকার করে যে, আল্লাহ ছাড়া প্রকৃত কোন ইলাহ নেই, মুহাম্মাদ আল্লাহর রাসূল এবং সালাত কায়িম করে, যাকাত দেয়, নাবী যে শারীআতের বিধান এনেছেন তার প্রতি ঈমান আনে, যে ব্যক্তি এসব করবে সে তার জান মালের নিরাপত্তা লাভ করবে; তবে শারীআত সম্মত কারণ ব্যতীত, তার অন্তরের খবর আল্লাহর কাছে; যে ব্যক্তি যাকাত দিতে ও ইসলামের অন্যান্য বিধান পালন করতে অস্বীকার করে তার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার এবং ইসলামের বৈশিষ্ট্যসমূহ প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে ইমামের গুরুত্বারোপ করার নির্দেশ।
৩৫-(৩৫/…) আবূ বকর ইবনু আবূ শাইবাহ (রহঃ) ….. জাবির (রাযিঃ), আবূ হুরাইরাহ (রাযিঃ) ও আবূ সালিহ থেকে বর্ণনা করেন যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, লোকদের বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য আমি আদিষ্ট হয়েছি। বাকী অংশ আবূ হুরাইরাহ (রাযিঃ) থেকে ইবনুল মুসাইয়্যাব-এর বর্ণিত হাদীসের অনুরূপ।
আবূ বাকর ইবনু শাইবাহ ও মুহাম্মাদ ইবনু আল মুসান্না (রহঃ) ….. জাবির (রাযিঃ) থেকে বর্ণনা করেন যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, “আল্লাহ ব্যতীত প্রকৃত কোন ইলাহ নেই” এ কথার স্বীকৃতি না দেয়া পর্যন্ত লোকদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার জন্য আমি আদিষ্ট হয়েছি। “আল্লাহ ছাড়া প্রকৃত কোন ইলাহ নেই” এ কথা স্বীকার করলে তারা আমার থেকে তাদের জান মালের নিরাপত্তা লাভ করবে; তবে শারী’আত সম্মত কারণ ছাড়া। তাদের হিসাব-নিকাশ আল্লাহর কাছে। তারপর তিনি আয়াতটি তিলাওয়াত করেনঃ “আপনি তো একজন উপদেশদাতা। আপনি এদের উপর কর্মনিয়ন্ত্রক নন”- (সূরাহ আল গা-শিয়াহ্ ৮৮ঃ ২১-২২)। (ইসলামিক ফাউন্ডেশনঃ ৩৫, ইসলামিক সেন্টারঃ ৩৫-৩৬)
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
সুনানে ইবনে মাজাহ
পাবলিশারঃ তাওহীদ পাবলিকেশন
অধ্যায়ঃ ৩০/ কলহ-বিপর্যয়
পরিচ্ছদঃ ৩০/১. যে ব্যক্তি ‘‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ ’’ বলে, তার উপর হস্তক্ষেপ থেকে বিরত থাকা
৩/৩৯২৯। আওস (রাঃ) বলেন, আমরা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর নিকট উপবিষ্ট ছিলাম। তিনি আমাদেরকে (অতীতের) ঘটনাবলী উল্লেখপূর্বক উপদেশ দিচ্ছিলেন। ইত্যবসরে এক ব্যক্তি তাঁর নিকট এসে তাঁর সাথে একান্তে কিছু বললো। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ তোমরা তাকে নিয়ে গিয়ে হত্যা করো। লোকটি ফিরে গেলে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে ডেকে জিজ্ঞেস করলেনঃ তুমি কি সাক্ষ্য দাও যে, ‘‘আল্লাহ ব্যতীত কোন ইলাহ নাই’’? সে বললো, হাঁ। তিনি বলেনঃ যাও, তোমরা তাকে তার পথে ছেড়ে দাও। কারণ লোকেরা ‘‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’’ না বলা পর্যন্ত আমাকে তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। তারা তাই করলে তাদের জান-মালে হস্তক্ষেপ আমার জন্য হারাম হয়ে গেলো।
নাসায়ী ৩৯৭৯, ৩৯৮২, ৩৯৮৩, আহমাদ ১৫৭২৭, দারেমী ২৪৪৬। তাহকীক আলবানীঃ সহীহ।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
আক্রমণাত্মক জিহাদ (জিহাদ আল-তালাব): দাওয়াত, জিযিয়া ও আক্রমণ
ইসলামী আইনশাস্ত্রে জিহাদকে মূলত দুটি প্রধান ভাগে ভাগ করা হয়েছে:
জিহাদ আল-দাফ: এটি মূলত প্রতিরক্ষামূলক জিহাদ। যখন কোনো মুসলিম ভূখণ্ড আক্রান্ত হয় বা শত্রুপক্ষ মুসলিমদের অস্তিত্বের ওপর হুমকি হয়ে দাঁড়ায়, তখন সেই আক্রমণ প্রতিহত করাই হলো এই জিহাদের মূল লক্ষ্য। আধুনিক প্রচারণায় জিহাদের এই দিকটিকেই প্রধান হিসেবে তুলে ধরা হয়।
জিহাদ আল-তালাব: এটি হলো আক্রমণাত্মক জিহাদ। ধ্রুপদী ইসলামী আকিদা অনুযায়ী, অমুসলিম রাষ্ট্রগুলোতে আগ বাড়িয়ে আক্রমণ করা এবং কুফরী শাসনব্যবস্থা উপড়ে ফেলে সেখানে শরীয়াহর আইন প্রতিষ্ঠা করাই এর লক্ষ্য। এটি ইসলামী হুকুমত সম্প্রসারণের জন্য একটি বাধ্যতামূলক ইবাদত হিসেবে গণ্য হয়।
আধুনিক প্রচারণায় জিহাদকে ইসলামিস্টগণ নিজের নফসের সাথে জিহাদ, বা কেবল প্রতিরক্ষামূলক জিহাদ বলে প্রমাণের চেষ্টা করা হলেও, ধ্রুপদী ইসলামী আকিদা অনুযায়ী ‘জিহাদ আল-তালাব’ বা অমুসলিম রাষ্ট্রগুলোতে আগ বাড়িয়ে আক্রমণ করা কেবল বৈধই নয়, বরং ইসলামী হুকুমত প্রতিষ্ঠার জন্য এটি একটি আবশ্যিক ইবাদত। এই জিহাদের লক্ষ্য হলো কুফরী শাসনব্যবস্থাকে সমূলে উৎপাটন করে সেখানে শরীয়াহর শাসন জারি করা। অনেক মুসলিমই বর্তমান সময়ে ইউরোপ আমেরিকাতে গিয়ে ইসলাম কতটা শান্তির ধর্ম তা প্রচার করার চেষ্টা করেন, কিন্তু ইসলামের এই আক্রমণাত্মক জিহাদের বিবরণ ঘুণাক্ষরেও তারা উল্লেখ করেন না। তারা উল্লেখ করেন, ইসলাম নাকি বলেছে যার যার দ্বীন তার তার। অথচ এটি ইসলামের পরবর্তী যুগের জন্য বিধান ছিল না। আসুন আরও একজন ইংরেজিভাষী আরব আলেমের বক্তব্য শুনে নেয়া যাক, যিনি এই বিষয়টি আরও পরিষ্কার করেছেন,
মুহাম্মদ যখন কোনো সেনাপতিকে যুদ্ধের অভিযানে পাঠাতেন, তখন তিনি অমুসলিমদের সামনে তিনটি সুনির্দিষ্ট বিকল্প বা অপশন পেশ করার নির্দেশ দিতেন। এই বিষয়টি কোনো আধুনিক ব্যাখ্যা নয়, বরং সরাসরি সহীহ মুসলিমের একটি দীর্ঘ হাদীস দ্বারা প্রমাণিত। সেখানে স্পষ্ট বলা হয়েছে যে, মুসলিম বাহিনীর আক্রমণের পূর্বে কাফেরদের তিনটি বিষয়ের দিকে আহ্বান জানাতে হবে:
এবারে আমরা একটি বিখ্যাত আকিদা গ্রন্থ থেকে দেখে নিবো, এই বিষয়ে ইসলামের হুকুমত এবং বিধান আসলে কী [9]
আকাশের দিকে ইঙ্গিত করে বোঝানো হলো যে আপনি আল্লাহর রাসূল। রাসূলুল্লাহ (সা.) বললেন, “তুমি একে মুক্ত করতে পারো।” (হাদীস নং ১১)
যেসব কথা ও কাজ কেবল একজন মুসলিমই বলতে বা করতে পারে এবং যার মাধ্যমে স্পষ্ট বোঝা যায় যে উক্ত ব্যক্তি ইসলামে প্রবেশ করেছে, সেসব কথা ও কাজই ‘ইসলাম গ্রহণ’ হিসেবে গণ্য হবে। উদাহরণস্বরূপ: মুসলিমদের মতো সালাত আদায় করা, হজ পালন করা ইত্যাদি। তবে যদি প্রমাণিত হয় যে, উক্ত ব্যক্তি এসকল কাজের মাধ্যমে ভ্রান্ত বিশ্বাস পরিত্যাগ করে নির্ভেজাল ইসলামে প্রবেশ করেনি—বরং তার ধর্মবিশ্বাস অনুযায়ী কাফির অবস্থায়ই এসকল আমল করছে (যেমন বর্তমানে কাদিয়ানীরা) বা সে তামাশার ছলে এটি করছে—তবে তার ক্ষেত্রে এগুলো ইসলাম গ্রহণ হিসেবে গণ্য হবে না। তাকে ততক্ষণ মুসলিম গণ্য করা হবে না, যতক্ষণ না সে এমন কোনো বাক্য ব্যবহার করে যাতে বোঝা যায় সে নিজ বিশ্বাস পরিত্যাগ করে রাসূলুল্লাহ (সা.) কর্তৃক প্রচারিত ও সাহাবায়ে কিরাম কর্তৃক অনুসৃত সঠিক ধর্মবিশ্বাসে প্রত্যাবর্তন করছে।
ইসলাম গ্রহণে বাধ্য করার বিধান
কাউকে ইসলাম গ্রহণে বাধ্য করা একটি গুরুত্বপূর্ণ ফিকহী বিষয়। সমস্ত ওলামায়ে কিরাম একমত হয়েছেন যে, যেসব কাফিরের সাথে মুসলিমদের কোনো চুক্তি নেই (হারবী) বা যারা জিজিয়া প্রদানকারী জিম্মী কাফির নয়, তাদের হত্যার ভয় দেখিয়ে বা অন্য কোনোভাবে ইসলাম গ্রহণে বাধ্য করা হলে তা গ্রহণযোগ্য হবে। অর্থাৎ, এভাবে ইসলাম গ্রহণের পর সে যদি পুনরায় ধর্মত্যাগ করতে চায়, তবে তাকে ‘মুরতাদ’ সাব্যস্ত করে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হবে। এ বিষয়ে দলিল হলো রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর বাণী:
“আমাকে আদেশ করা হয়েছে মানুষের সাথে যুদ্ধ করার জন্য যতক্ষণ না তারা বলে— ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’।” (বুখারী ও মুসলিম)
যখন তারা এটি বলবে, তখন তাদের রক্ত ও সম্পদ সংরক্ষিত বলে গণ্য হবে। সহীহ মুসলিমের একটি দীর্ঘ হাদীসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ (সা.) কোনো অভিযানে সেনাপতি প্রেরণের সময় উপদেশ দিয়ে বলতেন: “তাদের তিনটি বিষয়ের দিকে ডাকো। তার মধ্যে যেটিই তারা গ্রহণ করুক, তুমিও সেটি গ্রহণ করো।” এই তিনটি বিষয় হলো:
ক. ইসলাম গ্রহণ
খ. জিজিয়া কর আদায় করা
গ. যুদ্ধ করা
সুতরাং, যুদ্ধের মাধ্যমে যাদের ইসলাম গ্রহণে বাধ্য করা হয়, তারা দুনিয়ার বিচারে মুসলিম বলেই গণ্য হবে। ওসামা বিন যায়েদের ঘটনাতেও একই বিষয় প্রমাণিত হয়। ওসামা (রা.) যাকে হত্যা করতে উদ্যত হয়েছিলেন, সেই কাফির হঠাৎ কালিমা পাঠ করে বসে। ওসামা মনে করেছিলেন তরবারির ভয়ে সে ইসলাম গ্রহণ করেছে, তাই তার ইসলাম গ্রহণযোগ্য নয়। কিন্তু রাসূলুল্লাহ (সা.) একারণে তাকে কঠোর তিরস্কার করেন। এর স্পষ্ট অর্থ হলো—যাকে হত্যা করা বৈধ, তাকে যদি হত্যার ভয় দেখানো হয় এবং সে ভীত হয়ে ইসলামে প্রবেশ করে, তবে তার ইসলাম গ্রহণযোগ্য হবে। পরবর্তীতে সে ইসলাম পরিত্যাগ করলে তাকে মুরতাদ হিসেবে গণ্য করা হবে। (হাদীস নং ১২ ও ১৩)
হারবী ও জিম্মীদের ক্ষেত্রে মতভেদ
কানযুদ্দাকাইকের ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে: “যদি চুক্তিবিহীন কাফিরকে (হারবী) ইসলাম গ্রহণে বাধ্য করা হয়, তবে তা গ্রহণযোগ্য হওয়ার ব্যাপারে ইজমা (ঐক্যমত) সম্পাদিত হয়েছে।” (তাবঈনুল হাকাইক্ক)
যাদের সাথে মুসলিমদের চুক্তি রয়েছে—যেমন জিম্মী (হাদীস নং ১৪), মুস্তা’মান (হাদীস নং ১৫) বা মুয়াহিদ (হাদীস নং ১৬)—তাদের ইসলাম গ্রহণে বাধ্য করা বৈধ নয় এবং এ ব্যাপারে উম্মতের ইজমা রয়েছে। তবে কেউ যদি এদের বাধ্য করে এবং তারা ইসলাম গ্রহণ করে, তবে সেই ইসলাম গ্রহণযোগ্য হবে কি না, সে বিষয়ে ওলামায়ে কিরামের মধ্যে দ্বিমত রয়েছে:
হাম্বালী ও শাফেঈ মাযহাব: তাদের মতে এটি ইসলাম গ্রহণ হিসেবে গণ্য হবে না যতক্ষণ না বাধ্যবাধকতা দূর হওয়ার পর সে স্বেচ্ছায় ইসলামের ওপর টিকে থাকে। (হাদীস নং ১৭; আল-মুগনী)
হানাফী মাযহাব: গ্রহণযোগ্য মত অনুযায়ী, এটি ইসলাম গ্রহণ হিসেবেই গণ্য হবে এবং তাকে পুনরায় কুফরিতে ফিরে যেতে দেওয়া হবে না। (তাবঈনুল হাকাইক্ক)
এখানে প্রথম মতটিই (শাফেঈ ও হাম্বালী) অধিকতর সঠিক বলে প্রতীয়মান হয়।
বংশগত ও পরিস্থিতিগত মুসলিম পরিচয়
একজন ব্যক্তি নিম্নোক্ত উপায়েও মুসলিম হিসেবে গণ্য হতে পারে:
১. মুসলিম পিতা-মাতার মাধ্যমে:
সমস্ত ওলামায়ে কিরাম একমত যে, মুসলিম পিতা-মাতার ঘরে ভূমিষ্ঠ শিশু মুসলিম হিসেবেই গণ্য হবে। একইভাবে কাফির দম্পতি মুসলিম হলে তাদের না-বালেগ সন্তানরাও মুসলিম হবে। যদি পিতা-মাতার একজন মুসলিম হন, তবে সন্তান মুসলিম হিসেবেই গণ্য হবে। (বুখারী; ফাতহুল বারী-৩/২২০) এর দলিল হলো রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর বাণী: “ইসলাম সবার উপরে, ইসলামের উপরে কিছু বিজয়ী হতে পারে না।” (হাদীস নং ১৮; দারে কুতনী)
২. যুদ্ধবন্দী শিশুর ক্ষেত্রে:
শিশু অবস্থায় যুদ্ধে বন্দী হওয়ার মাধ্যমে মুসলিম হিসেবে গণ্য হওয়ার ক্ষেত্রে উক্ত শিশুর ইচ্ছার কোনো গুরুত্ব নেই। এটিও একটি বাধ্যতামূলক পদ্ধতি।
“দ্বীনের মধ্যে জবরদস্তি নেই” আয়াতের ব্যাখ্যা
বর্তমানে অনেক চিন্তাবিদ প্রচার করেন যে, ইসলামে কাউকে বাধ্য করার সুযোগ নেই। তারা সূরা বাকারার ২৫৬ নম্বর আয়াত (“দ্বীনের মধ্যে কোনো জবরদস্তি নেই”) বা সূরা ইউনুসের ৯৯ নম্বর আয়াত পেশ করেন। তবে ওলামায়ে কিরামের মতে, এ সকল আয়াতকে অন্যান্য দলিল ও রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর আমলের সাথে সমন্বয় করে বুঝতে হবে।
“দ্বীনের মধ্যে জবরদস্তি নেই” আয়াতটি কেবল সেই সব কাফিরদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য যারা জিজিয়া দিতে সম্মত হয়েছে। কিন্তু যারা জিজিয়া দিতে নারাজ বা যারা মুরতাদ হয়ে গেছে, তাদের ক্ষেত্রে বাধ্য করার বিধানই প্রযোজ্য হবে। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: “যে তার দ্বীন পরিবর্তন করে তাকে হত্যা করো।” (বুখারী) সুতরাং, প্রতিটি আয়াতকে তার সঠিক প্রেক্ষাপটে প্রয়োগ করতে হবে; ঢালাওভাবে সব ক্ষেত্রে জবরদস্তি নিষিদ্ধ করা হয়নি। (হাদীস নং ২৯)
ফুটনোটসমূহ:
(১১) হাদীসটি ইমাম আবু দাউদ বর্ণনা করেছেন এবং এর সনদকে দুর্বল বলেননি, অর্থাৎ তিনি হাদীসটিকে গ্রহণযোগ্য মনে করেছেন। আল-হাইছামী মাজমুয়ায়ে যাওয়ায়েদে বলেছেন, “এই হাদীসের রাবিরা বিশ্বস্ত।” তবে শায়েখ আলবানী হাদীসটিকে দুর্বল বলেছেন।
(১২) সহীহ বুখারী ও মুসলিম; হাদীসটি পূর্বে উল্লেখ করা হয়েছে।
(১৩) ইবনুল আরবী বলেন, “একজন মুসলিম যখন এমন কোনো কাফিরের সাক্ষাৎ পায় যার সাথে কোনো চুক্তি নেই, তবে তার জন্য তাকে হত্যা করা বৈধ।” (আহকামুল কুরআন)। মোল্লা আলী ক্বারী আল-হানাফী ইমাম আল-খাত্তাবী থেকে বর্ণনা করেন, “কাফিরদের রক্তের ব্যাপারে মূলনীতি হলো তা বৈধ (ইবাহাত)।” (মিরকাতুল মাফাতিহ)। অর্থাৎ চুক্তি না থাকলে তাদের রক্ত নিষিদ্ধ নয়।
(১৪) ইসলামী রাষ্ট্রের অনুগত কর (জিজিয়া) দিয়ে বসবাসকারী কাফিররা।
(১৫) ইসলাম সম্পর্কে জানার উদ্দেশ্যে বা ব্যবসার প্রয়োজনে কর্তৃপক্ষের অনুমতি নিয়ে অল্প সময়ের জন্য ইসলামী রাষ্ট্রে আশ্রয়গ্রহণকারী কাফিররা।
(১৬) নিজেদের ভূখণ্ডে অবস্থান করেই মুসলিমদের সাথে যুদ্ধবিরতির চুক্তি করে যেসব কাফিররা।
(১৭) যদি জিম্মী বা মুস্তা’মানকে বাধ্য করা হয়, তবে তার ইসলাম ধর্তব্য হবে না যতক্ষণ না সে স্বেচ্ছায় এর ওপর টিকে থাকে। (আল-মুগনী)।
(১৮) দারে কুতনী, বুলুগুল মারাম। ইমাম বুখারী হাদীসটিকে মাওকুফভাবে সনদ ছাড়া উল্লেখ করেছেন। ইবনে হাজার আসকালানী ও শায়েখ আলবানী হাদীসটিকে ‘হাসান’ বলেছেন। (ফাতহুল বারী-৩/২২০; ইরওয়াউল গালীল-১২৬৮)।
(২৮) এ বিষয়ে পরবর্তী অধ্যায়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হবে ইনশা-আল্লাহ।
(২৯) আমীরুল মু’মিনীন উমর ইবনুল খাত্তাব (রা.) এবং অন্যান্য সাহাবারা শর্ত করতেন যে, অমুসলিমরা ইসলামী রাষ্ট্রে তাদের ধর্মীয় উৎসবসমূহ প্রকাশ্যে পালন করতে পারবে না। (মাজমুউল ফাতাওয়া; তাফসীরে ইবনে কাছির)।







এই আক্রমণাত্মক জিহাদের ভয়াবহতা বোঝার জন্য নিচের ভিডিও দলিলগুলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, যেখানে বর্তমান সময়ের আলেমরাও মাঝে মাঝে ইসলামের এই বর্বর বিধানগুলোর কথা স্বীকার করে ফেলেন,
এমনকি, ইসলামের অনেক অনলাইন দাইয়ীরাও ইনিয়ে বিনিয়ে শুগারকোট করে এই বিধানটি স্বীকার করে ফেলেন। আসুন মুহাম্মদ মুশফিকুর রহমান মিনারের বক্তব্য শুনি,
জিহাদের এই প্রক্রিয়ায় যদি কোনো অমুসলিম রাষ্ট্র বাধা দেয় বা মুসলিমদের বশ্যতা স্বীকার করতে অস্বীকার করে, তবে শুরু হয় সশস্ত্র ‘কিতাল’। এই যুদ্ধের পর বিজিত অঞ্চলের সম্পদ ও মানুষজন বিজয়ীদের জন্য ‘গনীমত’ বা যুদ্ধের লুটের মাল হিসেবে সাব্যস্ত হয়। এটিই মূলত সেই পথ, যা ইসলামে বৈধ দাসপ্রথার ভিত্তি তৈরি করে। যখন কোনো অমুসলিম জনপদ যুদ্ধের মাধ্যমে বিজিত হয়, তখন সেখানকার নারীদের এবং শিশুদের কোনো ইচ্ছা বা সম্মতি ছাড়াই মুসলিম যোদ্ধারা নিজেদের ব্যক্তিগত সম্পত্তি বা দাস-দাসী হিসেবে গ্রহণ করার নিরঙ্কুশ অধিকার লাভ করে [10] ।
রাতের আঁধারে অতর্কিত হামলাঃ বেসামরিক নারী-শিশুরা যখন গনিমতের মাল
যেকোনো সভ্য সমাজ বা আধুনিক আন্তর্জাতিক যুদ্ধনীতিতে গেরিলা আক্রমণ এবং সাধারণ ডাকাতির মধ্যে একটি সুনির্দিষ্ট সীমারেখা থাকে। গেরিলা যুদ্ধে লক্ষ্যবস্তু হয় কেবল সশস্ত্র শত্রুসেনা। কিন্তু যখন কোনো আক্রমণে ঘুমন্ত, নিরস্ত্র বেসামরিক মানুষকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়, শিশুদের জীবনের নিরাপত্তা কেড়ে নেওয়া হয় এবং নারীদের সম্পদ হিসেবে গণ্য করা হয়, তখন তাকে আর ‘যুদ্ধ’ বলা যায় না—তা হয়ে দাঁড়ায় স্রেফ সংঘবদ্ধ ‘ডাকাতি’ বা ‘যুদ্ধাপরাধ’। ইসলামের প্রাথমিক যুগের এই অতর্কিত হামলাগুলো (যাকে সীরাতের পরিভাষায় ‘তাবেয়ীত’ বলা হয়) ছিল ঠিক তেমনই নৃশংস। রাতের অন্ধকারে যখন মানুষ গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন থাকতো, তখন মুসলিম বাহিনী অতর্কিতভাবে তাদের জনপদে ঝাঁপিয়ে পড়তো। এই আক্রমণে নারী বা শিশু আলাদা করার কোনো সুযোগ বা সদিচ্ছা কোনোটাই থাকতো না। নবী মুহাম্মদের নির্দেশ ছিল অত্যন্ত পরিষ্কার—যেহেতু রাতের আঁধারে শত্রু-মিত্র আলাদা করা কঠিন, তাই অবিশ্বাসী কাফেরদের পরিবারের নারী ও শিশুরাও সেই আক্রমণের বৈধ লক্ষ্যবস্তু। যারা এই নৃশংস হামলা থেকে বেঁচে যেতো, তাদের ভাগ্য হতো আরও করুণ; তাদের বন্দী করে যৌনদাসী হিসেবে ব্যবহার করা হতো এবং বাজারে বিক্রি করে দেওয়া হতো। এটি আধুনিক মানবাধিকারের দৃষ্টিতে কেবল অমানবিকই নয়, বরং এক ভয়াবহ যুদ্ধাপরাধ।
নিচের হাদিসটিতে দেখা যায়, মুহাম্মদের আক্রমণের মানদণ্ড কোনো ন্যায়বিচার বা আত্মরক্ষা ছিল না, বরং তা ছিল কেবল একটি নির্দিষ্ট ধর্মীয় আগ্রাসন। যদি কোনো জনপদে আযানের শব্দ শোনা যেতো, তবে তারা প্রাণে বাঁচতো; অন্যথায় তাদের ওপর রক্তক্ষয়ী হামলা চালানো হতো। অর্থাৎ, মানুষের জীবনের নিরাপত্তা নির্ভর করতো তারা মুহাম্মদের ধর্ম গ্রহণ করেছে কি না—তার ওপর। [11]
সহীহ মুসলিম (ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
৪/ কিতাবুস স্বলাত
পরিচ্ছেদঃ ৬. দারুল কুফর বা অমুসলিম দেশে কোন গোত্রে আযানের ধ্বনি শোনা গেলে সেই গোত্রের উপর হামলা করা থেকে বিরত থাকা
ইসলামিক ফাউন্ডেশন নাম্বারঃ ৭৩৩ , আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ৩৮২
৭৩৩। যুহায়র ইবনু হারব (রহঃ) … আনাস ইবনু মালিক (রাঃ) থেকে বর্ণিত যে, তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ভোরে শত্রুর বিরুদ্ধে আক্রমণ পরিচালনা করতেন। আযান শোনার অপেক্ষা করতেন। আযান শুনতে পেলে আক্রমণ করা থেকে বিরত থাকতেন। আযান শুনতে না পেলে আক্রমণ করতেন। একবার তিনি কোন এক ব্যাক্তিকে اللَّهُ أَكْبَرُ اللَّهُ أَكْبَرُ বলতে শুলেন। তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তুমি ফিতরাত (দ্বীন ইসলাম) এর উপর রয়েছ। এর পর সে ব্যাক্তি أَشْهَدُ أَنْ لاَ إِلَهَ إِلاَّ اللَّهُ أَشْهَدُ أَنْ لاَ إِلَهَ إِلاَّ اللَّهُ বলল। তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তুমি জাহান্নাম থেকে বেরিয়ে এলে। সাহাবায়ে কিরাম লোকটির প্রতি লক্ষ্য করে দেখতে পেলেন যে, সে ছিল একজন ভেড়ার রাখাল।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আনাস ইবনু মালিক (রাঃ)
এই হাদিসটি ইসলামের ‘শান্তিবাদী’ এবং ‘রক্ষণাত্মক’ দাবির কফিনে শেষ পেরেক ঠুকে দেয়। এখানে দেখা যাচ্ছে, বনূ মুসতালিক গোত্র কোনো যুদ্ধের প্রস্তুতি নিচ্ছিল না, তারা শান্তিতে তাদের পশুদের পানি পান করাচ্ছিল। এমন অপ্রস্তুত অবস্থায় কোনো ঘোষণা ছাড়াই তাদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে যোদ্ধাদের হত্যা করা হয় এবং হারিছ কন্যা জুওয়াইরিয়াসহ নারীদের বন্দী করা হয়। এটি কোনো বীরত্ব নয়, বরং চরম প্রতারণা ও বিশ্বাসঘাতকতার এক প্রকৃষ্ট উদাহরণ। ইসলাম প্রচারকগণ এই আক্রমণকে নানাভাবে বৈধতা দেয়ার উদ্দেশ্যে বলেন, বনু মুসতালিক গোত্র নিশ্চয়ই বড় কোন অন্যায় করেছিল, তাই শাস্তিস্বরূপ এই আক্রমণ করা হয়েছিল। কিন্তু তর্কের খাতিরে সেই দাবীকে মেনে নিলেও, বেসামরিক নারী ও শিশুদের ওপর আক্রমণ, হত্যা এবং দাসে পরিণত করে ভোগ বা বাজারে বিক্রি করাকে উনারা কীভাবে নৈতিক কাজ মনে করেন, তা বোধগম্য হয় না [12]
সহীহ মুসলিম (ইফাঃ)
অধ্যায়ঃ ৩৩/ জিহাদ ও এর নীতিমালা
পরিচ্ছেদঃ ১. যে সকল বিধর্মীর কাছে ইসলামের দাওয়াত পৌঁছেছে, পূর্ব ঘোষণা ব্যতীত তাদের বিরুদ্ধে আক্রমন পরিচালনা বৈধ
৪৩৭০। ইয়াহইয়া ইবনু ইয়াহইয়া তামীমী (রহঃ) … ইবনু আউন (রহঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বললেন, আমি নাফি’ (রহঃ) কে এই কথা জানতে চেয়ে পত্র লিখলাম যে, যুদ্ধের পূর্বে বিধর্মীদের প্রতি দ্বীনের দাওয়াত দেওয়া প্রয়োজন কি না? তিনি বলেন, তখন তিনি আমাকে লিখলেন যে, এ (নিয়ম) ইসলামের প্রারম্ভিক যুগে ছিল। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বনূ মুসতালিকের উপর আক্রমণ করলেন এমতাবস্থায় যে, তারা অপ্রস্তুত ছিল (তা জানতে পারেনি।) তাদের পশুদের পানি পান করানো হচ্ছিল। তখন তিনি তাদের যোদ্ধাদের (পূর্ণ বয়স্ক পুরুষ) হত্যা করলেন এবং অবশিষ্টদের (নারী শিশুদের) বন্দী করলেন। আর সেই দিনেই তাঁর হস্তগত হয়েছিল। (ইয়াহইয়া বলেন যে, আমার ধারণা হল, তিনি বলেছেন) জুওয়ায়রিয়া অথবা তিনি নিশ্চিতরূপে ইবনাতুল হারিছ (হারিছ কন্যা) বলেছিলেন। বর্ণনাকারী বলেন, এই হাদীস আমাকে আবদুল্লাহ ইবনু উমর (রাঃ) বর্ণনা করেছেন। তিনি সেই সেনাদলে ছিলেন।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ ইবনু ‘আউন (রহঃ)
এই ঘটনা কিন্তু এটিই একমাত্র উদাহরণ নয়। প্রায় একই ঘটনা ঘটেছিল আওতাস আক্রমণের সময়েও। এই ক্ষেত্রে কাফের গোত্রটি তাদের স্ত্রী এবং শিশুদেরও সাথে নিয়ে এসেছিল, কারণ ছিল তারা যুদ্ধে যাওয়ার কারণে তাদের এলাকা অরক্ষিত হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু সেই নারী ও শিশুরা কোন অবস্থাতেই সেই যুদ্ধের অংশগ্রহণকারী ছিল না। তারা শুধুমাত্র যোদ্ধাদের সাথে গিয়েছিল, যুদ্ধের ময়দান থেকে দুরে একটি নির্দিষ্ট স্থানে তারা তাঁবু গেড়ে সেখানেই অপেক্ষা করছিল। সেই নারী ও শিশুদের মুসলিমরা গনিমতের মাল হিসেবে গ্রহণ করে এবং স্বামীদের উপস্থিতিতেই তাদের বিছানায় তুলে নেয়, [13]
সহীহ মুসলিম (হাদীস একাডেমী)
১৮। দুধপান
পরিচ্ছেদঃ ৯. ইসতিবরার পর যুদ্ধ বন্দিনীর সাথে সঙ্গম করা জায়িয এবং তার স্বামী বর্তমান থাকলে সে বিবাহ বাতিল
হাদিস একাডেমি নাম্বারঃ ৩৫০০ , আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ১৪৫৬
৩৫০০-(৩৩/১৪৫৬) উবায়দুল্লাহ ইবনু উমার আল মায়সারাহ আল কাওয়ারীরী (রহঃ) ….. আবূ সাঈদ খুদরী (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত যে, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হুনায়ন এর যুদ্ধের সময় একটি দল আওত্বাস এর দিকে পাঠান। তারা শত্রু দলের মুখোমুখী হয়ে তাদের সাথে যুদ্ধ করে জয়লাভ করে এবং তাদের অনেক কয়েদী তাদের হস্তগত হয়। এদের মধ্য থেকে দাসীদের সাথে যৌন সঙ্গম করা রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কয়েকজন সাহাবা যেন নাজায়িয মনে করলেন, তাদের মুশরিক স্বামী বর্তমান থাকার কারণে। আল্লাহ তা’আলা এ আয়াত অবতীর্ণ করেন “এবং নারীর মধ্যে তোমাদের অধিকারভুক্ত দাসী ব্যতীত সকল সধবা তোমাদের জন্য নিষিদ্ধ” অর্থাৎ তারা তোমাদের জন্য হালাল, যখন তারা তাদের ইদ্দাত (ইদ্দত) পূর্ণ করে নিবে। (ইসলামিক ফাউন্ডেশন ৩৪৭৩, ইসলামীক সেন্টার ৩৪৭২)
[গর্ভবতী হলে প্রসব, অন্যথায় এক ঋতু অতিবাহিত হওয়াকে ইসতিবরার বলে।]
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আবূ সা’ঈদ খুদরী (রাঃ)
আসুন আরো কিছু হাদিস দেখে নিই, [14] [15] [16] [17] [18] [19] –
সূনান আবু দাউদ (ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
৬/ বিবাহ
পরিচ্ছেদঃ ১৩৯. বন্দী স্ত্রীলোকের সাথে সহবাস করা।
২১৫২. উবায়দুল্লাহ্ ইবন উমার ইবন মায়সার …… আবূ সাঈদ আল খুদরী (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হুনায়নের যুদ্ধের সময় আওতাস্ নামক স্থানে একটি সৈন্যদল প্রেরণ করেন। তারা তাদের শত্রুদের সাথে মুকাবিলা করে তাদেরকে হত্যা করে এবং তাদের উপর বিজয়ী হয়। আর এই সময় তারা কয়েদী হিসাবে (হাওয়াযেন গোত্রের) কিছু মহিলাকে বন্দী করে। তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কিছু সাহাবী তাদের সাথে অনধিকারভাবে সহবাস করা গুনাহ মনে করে, কেননা তাদের মুশরিক স্বামীরা তখন বন্দী ছিল। তখন আল্লাহ্ তা’আলা এই আয়াত নাযিল করেনঃ (অর্থ) যে সমস্ত স্ত্রীলোকদের স্বামী আছে তারা তোমাদের জন্য হারাম। তবে যারা তোমাদের অধিকারভুক্ত দাসী অর্থাৎ যেসব মহিলা যুদ্ধবন্দী হিসাবে তোমাদের আয়ত্বে আসবে তারা ইদ্দত (হায়েযের) পূর্ণ করার পর তোমাদের জন্য হালাল।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আবূ সা’ঈদ খুদরী (রাঃ)
সূনান আবু দাউদ (ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
৬/ বিবাহ
পরিচ্ছেদঃ ১৩৯. বন্দী স্ত্রীলোকের সাথে সহবাস করা।
১৫৪. আমর ইবন আওন …… আবূ সাঈদ আল খুদরী (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেনঃ কোন গর্ভবতী বন্দিনীর সাথে তার সন্তান প্রসবের আগে এবং কোন রমণীর সাথে তার হায়েয হতে পবিত্র হওয়ার পূর্বে সহবাস করবে না।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আবূ সা’ঈদ খুদরী (রাঃ)
সহীহ মুসলিম (হাদীস একাডেমী)
১৭। বিবাহ
পরিচ্ছেদঃ ২২. আযল এর হুকুম
হাদিস একাডেমি নাম্বারঃ ৩৪৩৬,
আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ১৪৩৮
৩৪৩৬-(১২৫/১৪৩৮) ইয়াহইয়া ইবনু আবূ আইয়ুব, কুতায়বাহ্ ইবনু সাঈদ ও আলী ইবনু হুজর (রহিমাহুমুল্লাহ) ….. ইবনু মুহায়রিয (রহঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি এবং আবূ সিরমাহ (রহঃ) আবূ সাঈদ আল খুদরী (রাযিঃ) এর নিকট গেলাম। আবূ সিরমাহ তাকে জিজ্ঞেস করলেন, হে আবূ সাঈদ! আপনি কি রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে ’আযল সম্পর্কে আলোচনা করতে শুনেছেন? তিনি বললেন, হ্যাঁ আমরা রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সাথে বানু মুসতালিক এর যুদ্ধ করেছি। সে যুদ্ধে আমরা আরবের সবচেয়ে সুন্দরী বাঁদীদের বন্দী করলাম। এদিকে আমরা দীর্ঘকাল স্ত্রী সাহচর্য থেকে বঞ্চিত ছিলাম। অন্যদিকে আমরা ছিলাম সম্পদের প্রতি অনুরাগী। এমতাবস্থায় আমরা বাঁদীদের দ্বারা উদ্দেশ্য হাসিল করার এবং ’আযল করার ইচ্ছা করলাম। কিন্তু আমরা এ কথাও আলোচনা করলাম যে, আমরা কি এ কাজ করতে যাব, অথচ রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের মধ্যে উপস্থিত রয়েছেন। তার নিকট আমরা কি এ ব্যাপারে কিছু জিজ্ঞেস করব না! তাই আমরা রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে জিজ্ঞেস করলাম। তিনি বললেনঃ ঐ কাজ না করাতে তোমাদের কোন ক্ষতি নেই। কেননা, আল্লাহ তা’আলা কিয়ামত পর্যন্ত যত মানুষ সৃষ্টি করার কথা লিখে রেখেছেন সে সব মানুষ সৃষ্টি হবেই। (ইসলামিক ফাউন্ডেশন ৩৪০৯, ইসলামীক সেন্টার ৩৪০৮)
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ ইবনু মুহায়রিয (রহঃ)
সহীহ বুখারী (তাওহীদ পাবলিকেশন)
৬৪/ মাগাযী [যুদ্ধ]
পরিচ্ছেদঃ ৬৪/৩২. যাতুর রিকা-র যুদ্ধ।
قَالَ ابْنُ إِسْحَاقَ وَذَلِكَ سَنَةَ سِتٍّ وَقَالَ مُوْسَى بْنُ عُقْبَةَ سَنَةَ أَرْبَعٍ وَقَالَ النُّعْمَانُ بْنُ رَاشِدٍ عَنْ الزُّهْرِيِّ كَانَ حَدِيْثُ الإِفْكِ فِيْ غَزْوَةِ الْمُرَيْسِيْعِ
ইবনু ইসহাক (রহ.) বলেছেন, এ যুদ্ধ ৬ষ্ঠ হিজরী সনে সংঘটিত হয়েছিল। মূসা ইবনু ‘উকবাহ (রহ.) বলেছেন, ৪র্থ হিজরী সনে। নুমান ইবনু রাশিদ (রহ.) যুহরী (রহ.) থেকে বর্ণনা করেছেন যে, মুরাইসীর যুদ্ধে ইফকের ঘটনা ঘটেছিল।
৪১৩৮. ইবনু মুহাইরীয (রহ.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদা আমি মসজিদে প্রবেশ করে আবূ সা‘ঈদ খুদরী (রাঃ)-কে দেখতে পেয়ে তার কাছে গিয়ে বসলাম এবং আযল সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলাম। আবূ সা‘ঈদ খুদরী (রাঃ) বললেন, আমরা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সঙ্গে বানূ মুসতালিকের যুদ্ধে যোগদান করেছিলাম। এ যুদ্ধে আরবের বহু বন্দী আমাদের হস্তগত হয়। মহিলাদের প্রতি আমাদের মনে আসক্তি জাগে এবং বিবাহ-শাদী ব্যতীত এবং স্ত্রীহীন অবস্থা আমাদের জন্য কষ্টকর অনুভূত হয়। তাই আমরা আযল করা পছন্দ করলাম এবং তা করতে মনস্থ করলাম। তখন আমরা পরস্পর বলাবলি করলাম, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের মাঝে আছেন। এ ব্যাপারে তাঁকে জিজ্ঞেস না করেই আমরা আযল করতে যাচ্ছি। আমরা তাঁকে এ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলে তিনি বললেন, ওটি না করলে তোমাদের কী ক্ষতি? ক্বিয়ামাত (কিয়ামত) পর্যন্ত যতগুলো প্রাণের আগমন ঘটবার আছে, ততগুলোর আগমন ঘটবেই। [২২২৯; মুসলিম ত্বলাক (তালাক)/২১, হাঃ ১৪৩৮, আহমাদ ১১৮৩৯] (আধুনিক প্রকাশনীঃ ৩৮২৬, ইসলামিক ফাউন্ডেশনঃ ৩৮২৯)
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ ইবনু মুহায়রিয (রহঃ)
সহীহ মুসলিম (হাদীস একাডেমী)
১৭। বিবাহ
পরিচ্ছেদঃ ২২. আযল এর হুকুম
হাদিস একাডেমি নাম্বারঃ ৩৪৫১, আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ১৪৪০
৩৪৫১-(১৩৬/১৪৪০) আবূ বকর ইবনু আবূ শায়বাহ ও ইসহাক ইবনু ইবরাহীম (রহিমাহুমাল্লাহ) ….. জাবির (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমরা ’আযল করতাম আর কুরআন নাযিল হত। এর উপর ইসহাক আরো বাড়িয়ে বলেছেন যে, সুফইয়ান (রহঃ) বলেন, এতে যদি নিষেধ করার মতো কিছু থাকত, তবে কুরআন তা নিষেধ করে দিত। (ইসলামিক ফাউন্ডেশন ৩৪২৪, ইসলামীক সেন্টার ৩৪২৩)
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ জাবির ইবনু আবদুল্লাহ আনসারী (রাঃ)

জিহাদের নৃশংসতা আরো চরমে পৌঁছায় যখন রাতের আঁধারে কাফেরদের শিশুদের ওপর আক্রমণ করাও ইসলামের বিধানে বৈধ। মুহাম্মদের সাহাবীরা যখন দ্বিধান্বিত হয়ে তাকে প্রশ্ন করেন যে, রাতের হামলায় নারী ও শিশুরা তো মারা যাচ্ছে, তখন মুহাম্মদ কোনো অনুশোচনা বা সতর্কতা ছাড়াই উত্তর দেন যে— “তারাও (নারী ও শিশু) তাদের (মুশরিকদের) অন্তর্ভুক্ত।” অর্থাৎ, অমুসলিম হওয়ার কারণে শিশুদের জীবনের কোনো আলাদা মূল্য মুহাম্মদের কাছে ছিল না। এই সম্মিলিত দণ্ড বা ‘Collective Punishment’ আধুনিক সভ্যতায় এক জঘন্যতম অপরাধ হিসেবে গণ্য। [20] [21] [22] [23] !
সহীহ মুসলিম (ইফাঃ)
অধ্যায়ঃ ৩৩/ জিহাদ ও এর নীতিমালা
পরিচ্ছদঃ ৯. রাতের অতর্কিত আক্রমনে অনিচ্ছাকৃতভাবে নারী ও শিশু হত্যায় দোষ নেই
৪৩৯৯। ইয়াহইয়া ইবনু ইয়াহইয়া, সাঈদ ইবনু মনসুর ও আমর আন নাকিদ (রহঃ) … সা’ব ইবনু জাছছামা (রাঃ) থেকে বর্ণিত যে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে মুশরিকদের নারী ও শিশু সন্তান সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হলো, যখন রাতের আধারে অতর্কিত আক্রমণ করা হয়, তখন তাদের নারী ও শিশুরাও আক্রান্ত হয়। তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ তারাও তাদের (মুশরিকদের) অন্তর্ভুক্ত।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
সহীহ মুসলিম (হাঃ একাডেমী)
অধ্যায়ঃ ৩৩। জিহাদ ও সফর
পরিচ্ছদঃ ৯. রাতের আকস্মিক হামলায় অনিচ্ছাকৃতভাবে নারী ও শিশু হত্যায় দোষ নেই
৪৪৪২-(২৭/…) আবদ ইবনু হুমায়দ (রহঃ) ….. সা’ব ইবনু জাসসামাহ্ (রাযিঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে জিজ্ঞেস করলাম, হে আল্লাহর রসূল! আমরা রাতের অন্ধকারে আকস্মিক হামলায় মুশরিকদের শিশুদের উপরও আঘাত করে ফেলি। রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তারাও তাদের (মুশরিক যোদ্ধাদের) মধ্যে গণ্য। (ইসলামিক ফাউন্ডেশন ৪৪০০, ইসলামিক সেন্টার ৪৪০০)
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
সুনানে ইবনে মাজাহ
তাওহীদ পাবলিকেশন
অধ্যায়ঃ ১৮/ জিহাদ
১/২৮৩৯। সাব‘ ইবনে জাসসামা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাতের বেলা মুশরিকদের মহল্লায় অতর্কিত আক্রমণ প্রসঙ্গে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে জিজ্ঞেস করা হলো, যাতে নারী ও শিশু নিহত হয়। তিনি বলেনঃ তারাও (নারী ও শিশু) তাদের অন্তর্ভুক্ত।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)

বর্তমান সময়ের অ্যাপোলোজিস্ট বা জনপ্রিয় বক্তারা যখন ইসলামকে নারীর সুমহান মর্যাদা দানকারী ধর্ম হিসেবে প্রচার করেন, তখন তারা কৌশলে বনূ মুসতালিক বা আওতাসের যেই নারী ও শিশুরা গনিমতের মাল হয়েছিল তাদের ঘটনাগুলোর মতো এই বীভৎস ঘটনাগুলো এড়িয়ে যান। নিচের হাদিসে সরাসরি লাজলজ্জার মাথা খেয়ে গর্বের সাথে স্বীকার করা হয়েছে যে, দাওয়াতের নাটকের আর প্রয়োজন নেই; যাদের কাছে একবার ইসলামের নাম পৌঁছেছে, তাদের ওপর যেকোনো সময় ঘোষণা ছাড়াই ঝাঁপিয়ে পড়া ইসলামের বৈধ যুদ্ধকৌশল। এটি কোনো আধ্যাত্মিক বিপ্লব নয়, দ্বীনের দাওয়াত নয় বরং সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসনের এক নগ্ন রূপ। [12] [24] –
সহীহ মুসলিম (ইফাঃ)
অধ্যায়ঃ ৩৩/ জিহাদ ও এর নীতিমালা
পরিচ্ছেদঃ ১. যে সকল বিধর্মীর কাছে ইসলামের দাওয়াত পৌঁছেছে, পূর্ব ঘোষণা ব্যতীত তাদের বিরুদ্ধে আক্রমন পরিচালনা বৈধ
৪৩৭০। ইয়াহইয়া ইবনু ইয়াহইয়া তামীমী (রহঃ) … ইবনু আউন (রহঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বললেন, আমি নাফি’ (রহঃ) কে এই কথা জানতে চেয়ে পত্র লিখলাম যে, যুদ্ধের পূর্বে বিধর্মীদের প্রতি দ্বীনের দাওয়াত দেওয়া প্রয়োজন কি না? তিনি বলেন, তখন তিনি আমাকে লিখলেন যে, এ (নিয়ম) ইসলামের প্রারম্ভিক যুগে ছিল। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বনূ মুসতালিকের উপর আক্রমণ করলেন এমতাবস্থায় যে, তারা অপ্রস্তুত ছিল (তা জানতে পারেনি।) তাদের পশুদের পানি পান করানো হচ্ছিল। তখন তিনি তাদের যোদ্ধাদের (পূর্ণ বয়স্ক পুরুষ) হত্যা করলেন এবং অবশিষ্টদের (নারী শিশুদের) বন্দী করলেন। আর সেই দিনেই তাঁর হস্তগত হয়েছিল। (ইয়াহইয়া বলেন যে, আমার ধারণা হল, তিনি বলেছেন) জুওয়ায়রিয়া অথবা তিনি নিশ্চিতরূপে ইবনাতুল হারিছ (হারিছ কন্যা) বলেছিলেন। বর্ণনাকারী বলেন, এই হাদীস আমাকে আবদুল্লাহ ইবনু উমর (রাঃ) বর্ণনা করেছেন। তিনি সেই সেনাদলে ছিলেন।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ ইবনু ‘আউন (রহঃ)

ইসলামী ফিকাহর অন্যতম ইমাম আবু হানিফা এবং তার শিষ্যদের মতে, যেহেতু ইসলামের বার্তা পৃথিবীর অধিকাংশ জায়গায় পৌঁছে গেছে, তাই এখন অমুসলিমদের আর সতর্ক করার প্রয়োজন নেই। যেকোনো সময় তাদের ওপর মরণঘাতী হামলা চালানো যেতে পারে। এই দৃষ্টিভঙ্গি প্রমাণ করে যে, ইসলামি রাষ্ট্রের পাশেপাশে অমুসলিমদের অস্তিত্ব সবসময়ই ছিল হুমকির মুখে এবং আক্রমণাত্মক জিহাদই ছিল তাদের সাথে যোগাযোগের একমাত্র ভাষা।
এবারে আসুন তাহাবী শরীফ থেকে একটি হাদিস পড়ে নেয়া যাক, যেখানে দেখা যাচ্ছে, যেহেতু বর্তমানে সকলের কাছেই ইসলামের দাওয়াত পৌঁছে গেছে, তাই আবারো ইসলামের পথে আহবান জানাবার আর কোন বিশেষ প্রয়োজন নেই। আক্রমনাত্মক জিহাদ বা অতর্কিত আক্রমণ চালালে সেটি সম্পূর্ণ জায়েজ [25] –
৪৭২৪. মুহাম্মদ ইব্ন্ন খুযায়মা (র) ….. মানসূর (র) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি ইবরাহীম (র)-কে দায়লামীদেরকে দাওয়াত দেয়া সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলাম। তিনি বললেন, ইসলামের দাওয়াত তার অবহিত রয়েছে।
ইমাম আবূ জা’ফর তাহাবী (র) বলেন: যা কিছু আমরা সংশ্লিষ্ট বিষয়ে রিওয়ায়াত করেছি তাতে স্পষ্ট হয়ে
গিয়েছে যে, দাওয়াতের আবশ্যকতা ইসলামের শুরুতে ছিল। কেননা তখন সবার কাছে দাওয়াত পৌঁছায়নি এবং তারা জানতও না যে, তাদের বিরুদ্ধে কেন যুদ্ধ করা হয়। তাই দাওয়াত দেয়ার নির্দেশ ছিল যেন তা তাদের জন্য তাবলীগ হয়ে যায় এবং তাদেরকে অবহিত করা হয় যে, তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের কারণ কি? অতঃপর অপর লোকদের উপর আক্রমণ করার নির্দেশ দিয়েছেন। তাই এর মর্ম এটাই হলো যে, এরা আহ্বানের মুখাপেক্ষী ছিল না, কেননা তারা অবহিত ছিল যে, তাদেরকে কিসের দিকে আহ্বান করা হচ্ছে। আর যদি তারা আহ্বানে সাড়া দিত তাহলে তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা হত না। সুতরাং আহ্বানের কোন অর্থ হয় না। ইমাম আবূ হানীফা (র), ইমাম আবূ ইউসুফ (র) ও ইমাম মুহাম্মদ (র)-এরূপই বলতেন যে, প্রত্যেক সম্প্রদায়ের নিকট ইসলামের দাওয়াত পৌঁছে গিয়েছে। এখন ইমাম আগাম দাওয়াত দেয়া ছাড়াই তাদের সঙ্গে লড়াই করতে পারেন। আর যে সমস্ত সম্প্রদায়ের কাছে ইসলামের আহ্বান পৌঁছায়নি তাদের সঙ্গে লড়াই করা সমীচীন নয়, যতক্ষণ না তাদের উপর স্পষ্ট হয়ে যায় যে, কিসের জন্য বা কি কারণে তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা হচ্ছে এবং তাদেরকে কিসের দিকে আহ্বান করা হচ্ছে।

এবারে আসুন শুনি, যুদ্ধবন্দী নারীদের ধর্ষণের ইসলামিক কারণ,
এবারে আমরা আহমদুল্লাহ এবং অন্যান্য আলেমদের কিছু ওয়াজ শুনে নিই,
এবারে আসুন শুনি, একজন পাকিস্তানী মুসলিম কীভাবে ভারত পাকিস্তান যুদ্ধ হলে ভারতীয় নায়িকা মাধুরীকে গনিমতের মাল বানাবে, তার আগাম বুকিং দিচ্ছে দেখে নিই,
গামিদির ‘ইতমাম-ই-হুজ্জাহ’ তত্ত্ব, প্রগতিশীল ব্যাখ্যা এবং কিতালের প্রশ্ন
জাবেদ আহমদ গামিদির ‘ইতমাম-ই-হুজ্জাহ’ (সত্যের সপক্ষে প্রমাণ পূর্ণকরণ) তত্ত্বটি আধুনিক যুগে ইসলামের কিতাল-সংক্রান্ত বিধানগুলোকে একটি সংকীর্ণ ঐতিহাসিক ফ্রেমে বন্দি করার প্রচেষ্টা হিসেবে কাজ করে, যা প্রকারান্তরে ধ্রুপদী ইসলামের রাজনৈতিক ও সামরিক দর্শনকে অস্বীকার করার নামান্তর। গামিদির দাবি অনুযায়ী, রাসূলের সরাসরি উপস্থিতিতে সত্যের চূড়ান্ত প্রমাণ উপস্থাপিত হওয়ার পর যারা তা প্রত্যাখ্যান করেছে, কেবল তাদের ওপরই খোদায়ী আজাব হিসেবে কিতাল বা সশস্ত্র যুদ্ধ আপতিত হয়েছিল—যাকে তিনি ‘ঐশ্বরিক বিচার’ হিসেবে সংজ্ঞায়িত করেন। তবে এই তত্ত্বটি সূক্ষ্মভাবে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে, এটি কুরআনের ভাষাগত কাঠামো, হাদিসের সর্বজনীনতা এবং ঐতিহাসিক ধারাক্রমের সাথে সাংঘর্ষিক। প্রথমত, উসূলুল ফিকহের (ইসলামি আইনতত্ত্ব) একটি মৌলিক ও সর্বসম্মত নীতি হলো: ‘আল-ইবরাতু বি-উমুমিল লাফজ, লা বি-খুসুসিস সাবাব’ (বিধানের কার্যকারিতা শব্দের ব্যাপকতার ওপর নির্ভর করে, অবতীর্ণ হওয়ার বিশেষ প্রেক্ষাপটের ওপর নয়) [26]। সূরা তাওবার ৫ এবং ২৯ নম্বর আয়াতে মুশরিক ও আহলে কিতাবদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের যে আদেশ দেওয়া হয়েছে, সেখানে কোনো প্রকার সময়সীমা (Time-frame) বা ‘ইতমাম-ই-হুজ্জাহ’ এর মতো টেকনিক্যাল শর্তারোপ করা হয়নি। যদি কিতাল কেবল রাসূলের যুগের একটি সাময়িক খোদায়ী ব্যবস্থা হতো, তবে কুরআনের ভাষ্যে ‘মুশরিক’ বা ‘কাফির’ শব্দের পরিবর্তে কেবল ‘আরবের সমকালীন অবাধ্য জাতি’ জাতীয় সুনির্দিষ্ট ও সীমাবদ্ধ পরিভাষা ব্যবহৃত হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু কুরআনের সাধারণ নির্দেশসমূহ নির্দেশ করে যে, এই কিতাল কোনো বিশেষ প্রেক্ষাপটের সাময়িক বিধান ছিল না, কোন সাময়িক দুর্ঘটনাও এটি নয়, বরং এটি কুফর ও শিরকের বিরুদ্ধে ইসলামের একটি চিরন্তন সামরিক অবস্থান [27]।
গামিদির তত্ত্বটি আরও বড় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে যখন জিযিয়া (কর) ও বশ্যতা স্বীকারের বিষয়টি আলোচনায় আসে। গামিদি কিতালকে কেবল ‘খোদায়ী শাস্তি’ হিসেবে চিত্রিত করতে চান, যা সাধারণত নূহ (আ.)-এর প্লাবন বা আদ-সামুদ জাতির ওপর আসা আজাবের সমতুল্য। কিন্তু ইতিহাসে কোনো খোদায়ী আজাবের ক্ষেত্রে ‘বশ্যতা স্বীকার ও কর প্রদান’-এর বিনিময়ে বেঁচে থাকার সুযোগ দেওয়া হয়নি। সূরা তাওবার ২৯ নম্বর আয়াতে আহলে কিতাবদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের লক্ষ্য হিসেবে বলা হয়েছে ‘হাত্তা ইয়ু’তু আল-জিযিয়াতা আন ইয়াদিন ওয়া হুম সাগিরুন’ অর্থাৎ যতক্ষণ না তারা অনুগত হয়ে অবনত অবস্থায় জিযিয়া প্রদান করে। এই ‘সাগিরুন’ বা লাঞ্ছিত/অবনত অবস্থার শর্তটি প্রমাণ করে যে, কিতালের উদ্দেশ্য কেবল পরকালীন সত্য অস্বীকারের দণ্ড নয়, বরং এটি একটি বৈশ্বিক রাজনৈতিক ও আইনি কাঠামো প্রতিষ্ঠার প্রক্রিয়া, যেখানে ইসলামি সার্বভৌমত্ব নিরঙ্কুশ থাকবে এবং অন্য সমস্ত জীবনব্যবস্থা তার অধীনে দমিত থাকবে [28]। গামিদির আধুনিক ব্যাখ্যা এই নগ্ন রাজনৈতিক আধিপত্যবাদকে ‘ঐশ্বরিক বিচার’ বলে মোড়কীকরণ করতে চায়, যা মূলত কিতালের প্রকৃত রূপকে আড়াল করার একটি বুদ্ধিবৃত্তিক অপচেষ্টা। আসুন ইবনে কুদামার আল-মুগনি থেকে একটি ফতোয়া পড়ি যে, বছরে একবার অন্তত আক্রমণাত্মক জিহাদ করা আবশ্যক, এবং এর কারণগুলো দেখে নিই, [29]
المغني
ابن قدامة – موفق الدين عبد الله بن أحمد بن قدامة المقدسي
إظهار / إخفاء التشكيل بحث في الكتاب
( 7415 ) وأقل ما يفعل مرة في كل عام ; لأن الجزية تجب على أهل الذمة في كل عام ، وهي بدل عن النصرة ، فكذلك مبدلها وهو الجهاد ، فيجب في كل عام مرة ، إلا من عذر ، مثل أن يكون بالمسلمين ضعف في عدد أو عدة ، أو يكون ينتظر المدد يستعين به ، أو يكون الطريق إليهم فيها مانع أو ليس فيها علف أو ماء ، أو يعلم من عدوه حسن الرأي في الإسلام ، فيطمع في إسلامهم إن أخر قتالهم ، ونحو ذلك مما يرى المصلحة معه في ترك القتال ، فيجوز تركه بهدنة فإن النبي صلى الله عليه وسلم قد صالح قريشا عشر سنين ، وأخر قتالهم حتى نقضوا عهده ، وأخر قتال قبائل من العرب بغير هدنة . وإن دعت الحاجة إلى القتال في عام أكثر من مرة وجب ذلك ; لأنه فرض كفاية ، فوجب منه ما دعت الحاجة إليه .
আল-মুগনি (ইবনে কুদামা) থেকে অনুবাদ
(৭৪১৫) এবং এটি (আক্রমণাত্মক জিহাদ) বছরে অন্তত একবার করা আবশ্যক; কারণ জিজিয়া প্রতি বছর আহলে জিম্মাদের (মুসলিম রাষ্ট্রে বসবাসরত অমুসলিমদের) ওপর ওয়াজিব হয়, আর এই জিজিয়া হলো (ইসলামের) বিজয় বা সাহায্যের বিকল্প। সুতরাং, এর আসল বিনিময়—অর্থাৎ জিহাদ—প্রতি বছর একবার ওয়াজিব হবে [30]।
তবে কোনো ওজর বা যুক্তিসঙ্গত কারণ থাকলে তা ব্যতিক্রম হতে পারে; যেমন:
মুসলিমদের জনবল বা যুদ্ধ সরঞ্জামে দুর্বলতা থাকা।
অতিরিক্ত সৈন্য বা সাহায্যের অপেক্ষায় থাকা যার মাধ্যমে সাহায্য লাভ করা যায়।
শত্রুদের কাছে পৌঁছানোর পথে কোনো প্রতিবন্ধকতা থাকা, কিংবা পথে পশুখাদ্য বা পানির অভাব থাকা।
শত্রুর পক্ষ থেকে ইসলামের প্রতি ইতিবাচক মনোভাব বা আগ্রহের আভাস পাওয়া যায়, যার ফলে তাদের সাথে যুদ্ধ বিলম্বিত করলে তাদের ইসলাম গ্রহণের আশা থাকে।
এই জাতীয় বা অনুরূপ কোনো ক্ষেত্রে যেখানে যুদ্ধ ত্যাগ করার মধ্যে ‘মাসলাহাত’ বা বৃহত্তর কল্যাণ নিহিত থাকে, সেখানে সন্ধি বা চুক্তির মাধ্যমে যুদ্ধ ত্যাগ করা জায়েজ। কেননা নবী (সা.) কুরাইশদের সাথে দশ বছরের জন্য সন্ধি করেছিলেন এবং তারা চুক্তি ভঙ্গ না করা পর্যন্ত তাদের সাথে যুদ্ধ স্থগিত রেখেছিলেন। আবার আরবের অনেক গোত্রের সাথে কোনো প্রকার সন্ধি চুক্তি ছাড়াই তিনি যুদ্ধ বিলম্বিত করেছিলেন [30]।
আর যদি কোনো বছর প্রয়োজনের খাতিরে একবারের বেশি যুদ্ধ করার দাবি দেখা দেয়, তবে সেটিও ওয়াজিব হবে; কারণ এটি (জিহাদ) হলো ‘ফরজে কিফায়া’, সুতরাং প্রয়োজনের খাতিরে যতটুকু করা আবশ্যক হবে ততটুকুই পালন করতে হবে [30]।
ঐতিহাসিক এবং ফিকহি ঐতিহ্যের বিচারেও গামিদির অবস্থান অত্যন্ত দুর্বল। ইসলামের স্বর্ণযুগের চার মাজহাবের কোনো ফকীহ বা মুজতাহিদ ইমাম কিতালকে কেবল রাসূলের যুগের জন্য নির্দিষ্ট বলে মনে করেননি। ইমাম নববী থেকে শুরু করে ইবনে তাইমিয়া পর্যন্ত সকলেই একমত যে, ইসলামি রাষ্ট্রের সীমান্ত সংলগ্ন কাফিরদের বিরুদ্ধে বছরে অন্তত একবার অভিযান চালানো ‘ফরজে কিফায়া’ [31]। যদি কিতাল কেবল ‘ইতমাম-ই-হুজ্জাহ’ নির্ভর হতো, তবে মুহাম্মদের ওফাতের পর সাহাবায়ে কিরামের পারস্য ও রোম বিজয় কোনোভাবেই বৈধতা পেত না, কারণ সাহাবাগণ রাসূল ছিলেন না এবং তারা কোনো জাতির ওপর সরাসরি ‘ইতমাম-ই-হুজ্জাহ’ করার অলৌকিক ক্ষমতা রাখতেন না। অথচ সাহাবাগণ এই বিজয়গুলোকে কুরআনি জিহাদের নিরবচ্ছিন্ন ধারাবাহিকতা হিসেবেই গ্রহণ করেছিলেন। অধিকন্তু, সহীহ হাদিসের ভাষ্য—‘আমাকে মানুষের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে যতক্ষণ না তারা সাক্ষ্য দেয় যে আল্লাহ ছাড়া কোনো ইলাহ নেই’—এখানে ‘আন-নাস’ (মানুষ) শব্দটির ব্যবহার অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ [32]। এটি একটি ব্যাপকবাচক শব্দ (Universal quantifier), যা কোনো ভৌগোলিক বা ঐতিহাসিক সীমারেখায় আবদ্ধ নয়। গামিদি এই হাদিসটিকেও তার তত্ত্বের সাথে খাপ খাওয়ানোর জন্য অত্যন্ত কসরতপূর্ণ ব্যাখ্যা দেন, যা মূলত ইসলামের ধ্রুপদী সমরদর্শনকে আধুনিক লিবারেল নেশন-স্টেটের ছাঁচে ফেলার একটি ব্যর্থ প্রচেষ্টা। প্রকৃতপক্ষে, ইসলামের কিতাল কোনো রূপক বা প্রেক্ষাপট-নির্ভর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নয়, বরং এটি একটি সুনির্দিষ্ট ‘অফেন্সিভ’ বা আক্রমণাত্মক রণকৌশল, যার লক্ষ্য হলো পৃথিবীর বুক থেকে শিরকের রাজনৈতিক ক্ষমতা উৎখাত করে একক ইলাহ আল্লাহর হুকুমত, শরীয়ত ও কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করা—যা গামিদির প্রগতিশীল পর্দার আড়ালে ঢাকা পড়ে না।
জবরদস্তি ও ধর্মান্তরঃ ‘দ্বীনের মধ্যে জবরদস্তি নেই’
ইসলামের প্রচার ও প্রসারের ক্ষেত্রে বর্তমানে একটি আয়াত প্রায়শই ঢাল হিসেবে ব্যবহার করা হয়— “দ্বীনের মধ্যে কোনো জবরদস্তি নেই” (সূরা বাকারা: ২৫৬) বা তোমাদের ধর্ম তোমাদের, আমাদের ধর্ম আমাদের (সূরা কাফিরুন, আয়াত ৬) বা যে একজন নিরাপরাধ মানুষকে হত্যা করলো সে যেন পুরো মানবজাতিকে হত্যা করলো (সূরা মায়িদা, আয়াত ৩২) । আধুনিক ব্যাখ্যাকারীরা একে ইসলামের ধর্মীয় স্বাধীনতার প্রমাণ হিসেবে পেশ করেন। কিন্তু ধ্রুপদী ইসলামী আইনশাস্ত্র বা ফিকাহ এবং নির্ভরযোগ্য ওলামাদের ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এই আয়াতের প্রয়োগ অত্যন্ত সীমিত এবং নির্দিষ্ট প্রেক্ষাপটে আবদ্ধ। প্রকৃত সত্য হলো, ইসলামে কিছু নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে অমুসলিমদের ইসলাম গ্রহণে বাধ্য করা কেবল বৈধই নয়, বরং আইনত স্বীকৃত। প্রবন্ধটি দীর্ঘ হয়ে যাবে বিধায় সেই বিষয়গুলো সম্পর্কিত আলাদা প্রবন্ধের লিঙ্ক দেয়া হয়েছে, আগ্রহী পাঠক পড়ে দেখবেঙ আশাকরি।
ঐতিহাসিক বাস্তবতায় দেখা যায়, নবী মুহাম্মদ আরবের পার্শ্ববর্তী বিভিন্ন কাফের সম্রাট ও রাষ্ট্রপ্রধানদের কাছে ইসলাম কবুলের আমন্ত্রণ জানিয়ে চিঠি লিখেছিলেন, যেখানে স্পষ্টতই বশ্যতা স্বীকার না করলে যুদ্ধের চরম হুমকি দেওয়া হয়েছিল। মক্কা বিজয়ের পর আরব উপদ্বীপ থেকে বহু মুশরিক সম্প্রদায়কে সমূলে উচ্ছেদ করা হয়েছিল, যাদের সাথে মুহাম্মদের ব্যক্তিগত কোনো শত্রুতা ছিল না। তাদের একমাত্র অপরাধ ছিল তারা ইসলাম গ্রহণে সম্মত হয়নি। মুহাম্মদের এই আক্রমণাত্মক নীতি এবং বিভিন্ন গোত্র উচ্ছেদের ঘটনাগুলো অত্যন্ত বিস্তারিত ও স্বতন্ত্র আলোচনার দাবি রাখে, যা বিস্তারিতভাবে অন্য প্রবন্ধগুলোতে তথ্যসূত্রসহ আলোচনা করা হয়েছে।
অর্থাৎ ইসলামী আকিদা এবং অন্যান্য ফিকহী কিতাবের আলোকে এটি স্পষ্ট যে, জবরদস্তি নিষিদ্ধ করার বিধানটি কেবল সেই সব কাফেরদের জন্য যারা ‘জিযিয়া’ বা নিরাপত্তা কর দিয়ে বশ্যতা স্বীকার করেছে। কিন্তু যারা ‘হারবী’ (যাদের সাথে কোনো শান্তি চুক্তি নেই) বা যারা জিজিয়া দিতে নারাজ, তাদের ক্ষেত্রে যুদ্ধের ভয় দেখিয়ে ইসলাম গ্রহণে বাধ্য করার বিধান ইসলামে বিদ্যমান।
এই বিষয়ে আরো ভালভাবে নিশ্চিত হওয়ার জন্য আসুন সহিহ মুসলিমের ব্যাখ্যাগ্রন্থ থেকে কিছু বিবরণ পড়ে নিই। এখানে বলা হয়েছে, শুধুমাত্র ইসলাম কবুল অথবা অপমানিত অবস্থায় নত হয়ে জিযিয়া প্রদানের মাধ্যমেই কাফের আহলে কিতাবীগণ জীবিত থাকতে পারবে। একইসাথে, কাফেররা আক্রমণের সূচনা না করলেও, আগ বাড়িয়ে তাদের আক্রমণ করা বৈধ। তবে মনে রাখতে হবে, শক্তিসামর্থ্যের কথা [33] –
চতুর্থ ধাপঃ মুসলমানগণের বিরুদ্ধে যুদ্ধ আরম্ভ না করিলেও সকল ধর্ম ও বর্ণের কাফিরদের বিরুদ্ধে প্রথমেই জিহাদ শুরু করিবে। যতক্ষণ পর্যন্ত না তাহারা ইসলাম গ্রহণ করে কিংবা জিযিয়া (ইসলামী রাষ্ট্রে অমুসলিমদের উপর ধার্যকৃত কর) প্রদান না করে। আর ইহা দ্বারা আল্লাহ তা’আলার কালেমা সমুন্নত করা, দ্বীন ইসলামের মর্যাদা দান এবং কুফরের দাপট ধ্বংস করা উদ্দেশ্য। আর এই ধাপের কার্যক্রম হিজরী ৯ম সনে হযরত আবূ বকর সিদ্দীক (রাযি.)-এর যবানীতে এই ধাপের ঘোষণা দেওয়া হইয়াছিল। আল্লাহ সুবহানাহু তা’আলা সূরা তাওবায় ইহার বিস্তারিত বিবরণ দিয়াছেন। আল্লাহ তা’আলা ইরশাদ করেন, অনন্তর যখন হারাম মাসসমূহ অতীত হইয়া যাইবে তখন ঐ মুশরিকদেরকে তোমরা যেইখানেই পাও হত্যা কর এবং ধৃত কর আর অবরোধ কর এবং প্রত্যেক ঘাটির অবস্থানসমূহে তাহাদের লক্ষ্য করিয়া বসিয়া যাও। অতঃপর তাহারা যদি (কুফরী হইতে) তাওবা করিয়া লয় এবং নামায আদায় করিতে থাকে এবং যাকাত দিতে থাকে, তবে তাহাদের পথ ছাড়িয়া দাও, নিশ্চয়ই আল্লাহ তা’আলা অতীব ক্ষমাশীল পরম দয়ালু। -(সূরা তাওবা ৫)
সূরা তাওবার অপর আয়াতে আল্লাহ তা’আলা ইরশাদ করেন, তোমরা যুদ্ধ কর ঐ সকল লোকদের বিরুদ্ধে যাহারা আল্লাহ ও কিয়ামত দিবসের উপর ঈমান রাখে না, আল্লাহ ও তাঁহার রসূল যাহা হারাম করিয়া দিয়াছেন তাহা হারাম করে না আর গ্রহণ করে না সত্য ধর্ম যতক্ষণ না তাহারা বশ্যতা স্বীকার করতঃ জিযিয়া (কর) প্রদানে স্বীকৃতি জ্ঞাপন করে। -(সূরা তাওবা ২৯)
সূরায়ে আনফালে আল্লাহ তা’আলা ইরশাদ করেনঃ আর তোমরা তাহাদের সহিত লড়িতে থাক যদ্যাবধি তাহাদের মধ্য হইতে ফিতনা (শিরক) বিলুপ্ত হইয়া না যায় এবং দ্বীন যেন কেবল আল্লাহর জন্যই হয়। -(সূরা আনফাল ৩৯)


আসুন একটি উদাহরণ দেখে নিই, নবী মুহাম্মদের সাহাবীগণ কীভাবে কাফের রাজ্যগুলোকে আক্রমণ করতো, এবং আক্রমণের সময়ে তারা কী বলতো [34] [35]
সহীহ বুখারী (তাওহীদ পাবলিকেশন)
৫৮/ জিযিয়াহ্ কর ও সন্ধি স্থাপন
পরিচ্ছেদঃ ৫৮/১. জিম্মীদের নিকট থেকে জিযইয়াহ গ্রহণ এবং হারবীদের সঙ্গে যুদ্ধ বন্ধের চুক্তি।
৩১৫৯. জুবাইর ইবনু হাইয়াহ (রহ.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, ‘উমার (রাঃ) মুশরিকদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার জন্য বিভিন্ন বড় বড় শহরের দিকে সৈন্য দল প্রেরণ করলেন। সে সময় হুরমযান ইসলাম গ্রহণ করে। ‘উমার (রাঃ) তাঁকে বললেন, আমি এসব যুদ্ধের ব্যাপারে তোমার পরামর্শ গ্রহণ করতে চাই। তিনি বললেন, ঠিক আছে। এ সকল দেশ এবং দেশে মুসলিমদের দুশমন যে সব লোক বাস করছে, তাদের দৃষ্টান্ত একটি পাখির মত, যার একটি মাথা, দু’টি ডানা ও দু’টি পা রয়েছে। যদি একটি ডানা ভেঙ্গে দেয়া হয়, তবে সে পাখিটি উভয় পা, একটি ডানা ও মাথার ভরে উঠে দাঁড়াবে। যদি অপর ডানা ভেঙ্গে দেয়া হয়, তবে সে দু’টি পা ও মাথার ভরে উঠে দাঁড়াবে। আর যদি মাথা ভেঙ্গে দেয়া হয়, তবে উভয় পা, উভয় ডানা ও মাথা সবই অকেজো হয়ে যাবে। কিসরা শত্রুদের মাথা, কায়সার হল একটি ডানা, আর পারস্য অপর একটি ডানা। কাজেই মুসলিমগণকে এ আদেশ করুন, তারা যেন কিসরার উপর হামলা করে।
বাকর ও যিয়াদ (রহ.) উভয়ে যুবাইর ইবনু হাইয়াহ (রহ.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, অতঃপর ‘উমার (রাঃ) আমাদের ডাকলেন আর আমাদের উপর নু‘মান ইবনু মুকাররিনকে আমীর নিযুক্ত করেন।আমরা যখন শত্রু দেশে পৌঁছলাম, কিসরার এক সেনাপতি চল্লিশ হাজার সৈন্য নিয়ে আমাদের মুকাবিলায় আসল। তখন তার পক্ষ হতে একজন দোভাষী দাঁড়িয়ে বলল, তোমাদের মধ্য থেকে একজন আমার সঙ্গে আলোচনা করুক। তখন মুগীরাহ (ইবনু শু‘বাহ) (রাঃ) বললেন, যা ইচ্ছা প্রশ্ন করতে পার। সে বলল, তোমরা কারা? তিনি বললেন, আমরা আরবের লোক। দীর্ঘ দিন আমরা অতিশয় দুর্ভাগ্য এবং কঠিন বিপদে ছিলাম। ক্ষুধার জ্বালায় আমরা চামড়া ও খেজুর গুটি চুষতাম। চুল ও পশম পরিধান করতাম। বৃক্ষ ও পাথর পূজা করতাম। আমরা যখন এ অবস্থায় পতিত তখন আসমান ও যমীনের প্রতিপালক আমাদের মধ্য হতে আমাদের নিকট একজন নবী পাঠালেন। তাঁর পিতা-মাতাকে আমরা চিনি। আমাদের নবী ও আমাদের রবের রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদেরকে তোমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার আদেশ দিয়েছেন, যে পর্যন্ত না তোমরা এক আল্লাহ্ তা‘আলার ‘ইবাদাত কর কিংবা জিযইয়াহ দাও। আর আমাদের নবী আমাদের রবের পক্ষ হতে আমাদেরকে জানিয়েছেন যে, আমাদের মধ্য হতে যে নিহত হবে, সে জান্নাতে এমন নি‘মাত লাভ করবে, যা কখনো দেখা যায়নি। আর আমাদের মধ্য হতে যারা জীবিত থাকবে তোমাদের গর্দানের মালিক হবে। (৭৫৩০) (ইসলামিক ফাউন্ডেশনঃ ২৯৩৪)
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ জুবাইর ইবনু হাইয়াহ (রহঃ)

উপসংহারঃ আধুনিক মানবাধিকার বনাম জিহাদের চিরন্তন বিধান
সার্বিক আলোচনা ও দালিলিক পর্যালোচনা শেষে এটি স্পষ্ট যে, ইসলামের ‘জিহাদ’ ও ‘কিতাল’ সংক্রান্ত বিধানগুলো কেবল কোনো নির্দিষ্ট সময়ের আত্মরক্ষা বা ব্যক্তিগত নৈতিক সংগ্রামের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বরং এটি একটি সুসংগঠিত রাজনৈতিক ও সামরিক আধিপত্যবাদ, যার চূড়ান্ত লক্ষ্য হলো পৃথিবীর বুক থেকে ভিন্নমত ও ভিন্ন বিশ্বাসের অবসান ঘটিয়ে একক ধর্মীয় হুকুমত প্রতিষ্ঠা করা। শাস্ত্রীয় তথ্যসূত্র এবং প্রখ্যাত আলেমদের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, শিরক বা কুফরকে পৃথিবীর ‘সবচেয়ে বড় বিশৃঙ্খলা’ হিসেবে সাব্যস্ত করে এর বিরুদ্ধে অস্ত্র ধারণ করাকে একটি পবিত্র ইবাদত হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে।
আমরা দেখেছি কীভাবে ‘জিহাদ আল-তালাব’ বা আক্রমণাত্মক জিহাদের মাধ্যমে একটি স্বাধীন জনপদকে পদানত করা হয় এবং সেখানকার মানুষের জীবনের মূল্য নির্ধারণ করা হয় তাদের ধর্মান্তর বা জিযিয়া করের ওপর। এর চেয়েও ভয়াবহ দিকটি হলো যুদ্ধলব্ধ ‘গনীমত’ হিসেবে নারী ও শিশুদের দাসদাসী হিসেবে গ্রহণ করার বিধান, যা আধুনিক মানবিক মূল্যবোধ এবং মানবাধিকারের চরম পরিপন্থী। বর্তমানে অনেক আধুনিক ব্যাখ্যাকারী একে প্রতিরক্ষামূলক বা প্রতীকী যুদ্ধ বলে দাবি করার চেষ্টা করলেও, ধ্রুপদী ফিকাহ এবং নির্ভরযোগ্য হাদিসগুলোর সাক্ষ্য ভিন্ন। সেখানে কোনো রাখঢাক ছাড়াই অমুসলিমদের রক্ত ও সম্পদকে বৈধ ঘোষণা করা হয়েছে যতক্ষণ না তারা বশ্যতা স্বীকার করছে।
একটি আধুনিক, সভ্য এবং বহুত্ববাদী পৃথিবীতে যেখানে প্রত্যেকের ব্যক্তিগত স্বাধীনতা এবং বিশ্বাসের অধিকারকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়, সেখানে ‘শিরক নিশ্চিহ্ন করা’র নামে এ ধরনের সশস্ত্র সম্প্রসারণবাদী ধর্মীয় দর্শন কেবল সংঘাতেরই জন্ম দেয়। ইসলামের এই বিধানগুলো যখন ‘চিরন্তন’ এবং ‘অপরিবর্তনীয়’ হিসেবে দাবি করা হয়, তখন তা কেবল অমুসলিমদের জন্যই নয়, বরং সামগ্রিক বৈশ্বিক শান্তির জন্য এক বিরাট চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়। তাই ইসলামের এই কিতাল ও দাসপ্রথার বিধানগুলোকে এড়িয়ে না গিয়ে, বরং সেগুলোর উৎস ও প্রয়োগ নিয়ে নির্মোহ এবং যৌক্তিক ব্যবচ্ছেদ করা অত্যন্ত জরুরি। সত্য এবং ন্যায়কে কেবল বিশ্বাসের চশমায় না দেখে, যুক্তির কষ্টিপাথরে যাচাই করাই হতে পারে এই মধ্যযুগীয় আধিপত্যবাদ থেকে মুক্তির একমাত্র পথ।
তথ্যসূত্রঃ
- তাফসীরে মাযহারী, হাকিমাবাদ খানকায়ে মোজাদ্দেদিয়া প্রকাশনী, ৫ম খণ্ড, পৃষ্ঠা ১১৭-১২০ ↩︎
- বাংলাদেশে প্রচলিত শির্ক বিদ‘আত ও কুসংস্কার পর্যালোচনা ২. শির্কের পরিণতি ↩︎
- সহীহ বুখারী ও মুসলিম ↩︎
- সূনান আত তিরমিজী (তাহকীককৃত), হাদিসঃ ২৬০৭ ↩︎
- সূনান আত তিরমিজী (তাহকীককৃত), হাদিসঃ ২৬০৮ ↩︎
- সূনান নাসাঈ (ইফাঃ), হাদিসঃ ৩৯৭৯ ↩︎
- সহীহ মুসলিম (হাঃ একাডেমী), হাদিসঃ ৩৫ ↩︎
- সুনানে ইবনে মাজাহ, তাওহীদ পাবলিকেশন, হাদিসঃ৩৯২৯ ↩︎
- আল-ইতকান ফি তাওহীদ আর-রহমান, শাইখ আব্দল্লাহ আল মুনির, পৃষ্ঠা ১৪-১৭, ২৫-২৭ ↩︎
- ইসলামের অমানবিক দাসপ্রথা ↩︎
- সহীহ মুসলিম, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, হাদিসঃ ৭৩৩ ↩︎
- সহীহ মুসলিম, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, হাদিসঃ ৪৩৭০ 1 2
- সহীহ মুসলিম, হাদীস একাডেমী, হাদিসঃ ৩৫০০ ↩︎
- সূনান আবু দাউদ, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, হাদিসঃ ২১৫২ ↩︎
- সূনান আবু দাউদ, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, হাদিসঃ ১৫৪ ↩︎
- সহীহ মুসলিম, হাদীস একাডেমী, হাদিসঃ ৩৪৩৬ ↩︎
- সহীহ বুখারী, তাওহীদ পাবলিকেশন, হাদিসঃ ৪১৩৮ ↩︎
- সহীহ মুসলিম, হাদীস একাডেমী, হাদিসঃ ৩৪৫১ ↩︎
- সূনান আবু দাউদ, তাহকিকঃ আল্লামা নাসিরুদ্দীন আলবানী, আল্লামা আলবানী একাডেমী, ৩য় খণ্ড, পৃষ্ঠা ২১৫-২১৬, হাদিসঃ ২১৫৫ ↩︎
- সহীহ মুসলিম, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, হাদিসঃ ৪৩৯৯ ↩︎
- সহীহ মুসলিম, হাদিস একাডেমী, হাদিসঃ ৪৪৪২ ↩︎
- সুনানে ইবনে মাজাহ, তাওহীদ পাবলিকেশন, হাদিসঃ ২৮৩৯ ↩︎
- সহিহ মুসলিম শরীফ (প্রয়োজনীয় ব্যাখ্যাসহ বঙ্গানুবাদ), আল হাদীছ প্রকাশনী, ১৭ ও ১৮ তম খণ্ড, পৃষ্ঠা ৩১ ↩︎
- সহিহ মুসলিম, বাংলাদেশ ইসলামিক সেন্টার, ষষ্ঠ খণ্ড, পৃষ্ঠা ১৮১, হাদিসঃ ৪৩৭০ ↩︎
- তাহাবী শরীফ, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, তৃতীয় খণ্ড, পৃষ্ঠা ৩৩৭ ↩︎
- আল-ইতকান ফি উলূমিল কুরআন, সুয়ূতী ↩︎
- তাফসীরে কুরতুবী, খণ্ড ৮, পৃষ্ঠা ৭২ ↩︎
- তাফসীরে ইবনে কাসীর, সূরা তাওবা ২৯ ↩︎
- ابن قدامة – موفق الدين عبد الله بن أحمد بن قدامة المقدسي ↩︎
- আল-মুগনি, ইবনে কুদামা, খণ্ড ৯, পৃষ্ঠা ১৬৪ 1 2 3
- মিনহাজ আত-তালিবিন ↩︎
- সহীহ বুখারী, হাদিস ২৫ ↩︎
- সহিহ মুসলিম শরীফ (প্রয়োজনীয় ব্যাখ্যাসহ বঙ্গানুবাদ), আল হাদীছ প্রকাশনী, ১৭ ও ১৮ তম খণ্ড, পৃষ্ঠা ১২, ১৩ ↩︎
- সহীহ বুখারী, তাওহীদ পাবলিকেশন, হাদিসঃ ৩১৫৯ ↩︎
- সহীহ বুখারী, তাওহীদ পাবলিকেশন, তৃতীয় খণ্ড, পৃষ্ঠাঃ ৩৫৭, ৩৫৮ ↩︎
