
Table of Contents
ভূমিকা
পৃথিবীর প্রায় প্রতিটি প্রাচীন ধর্মেই মহাবিশ্ব ও মানব সৃষ্টির নিজস্ব পৌরাণিক আখ্যান (Myth) রয়েছে, যা সেই নির্দিষ্ট সময়ের মানুষের জ্ঞান, প্রকৃতির প্রতি তাদের দৃষ্টিভঙ্গি এবং বৈজ্ঞানিক অজ্ঞতাকে প্রতিফলিত করে। ইসলাম ধর্মেও মানব সৃষ্টির এমনই একটি সুনির্দিষ্ট আখ্যান রয়েছে, যেখানে দাবি করা হয় যে প্রথম মানুষ আদমকে কাদামাটি থেকে সরাসরি একজন পূর্ণাঙ্গ মানুষ হিসেবে জাদুকরী প্রক্রিয়ায় তৈরি করা হয়েছিল। এই দাবির বিস্তারিত বিবরণ আমরা পাই প্রখ্যাত ইসলামী ভাষ্যকার ইমাদ উদ্দীন ইবনে কাসীরের লেখা ‘তাফসীরুল কুরআনিল আযীম’ বা তাফসীরে ইবনে কাসীরে। আধুনিক জীববিজ্ঞানের বিবর্তন তত্ত্ব এবং শারীরতত্ত্বের সাথে এই প্রাচীন আখ্যানের বৈজ্ঞানিক অসামঞ্জস্যতা পর্যালোচনার
বর্ণনায় কাদামাটি দিয়ে অবয়ব তৈরি, মাটির মূর্তির মুখ ও মলদ্বার দিয়ে ইবলীসের প্রবেশ-প্রস্থান এবং উপর থেকে নিচের দিকে ধাপে ধাপে প্রাণ সঞ্চারের যে চিত্র তুলে ধরা হয়েছে, তা প্রাচীন রূপকথাসুলভ এবং বৈজ্ঞানিক প্রমাণের নিরিখে সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। মানবদেহ কোনো মাটির ফাঁপা পাত্র নয় এবং জীবনের উৎপত্তি বা চেতনার সঞ্চার কোনো জাদুকরী ফুঁ দেওয়ার মাধ্যমে ঘটে না। পরবর্তী পরিচ্ছেদগুলোতে আমরা আধুনিক জীববিজ্ঞান, বিবর্তনবাদ এবং শারীরতত্ত্বের অকাট্য প্রমাণের আলোকে এই ধর্মীয় দাবিগুলোর যৌক্তিক ও বৈজ্ঞানিক ব্যবচ্ছেদ করব।
তাফসীরে ইবনে কাসীরঃ আদমকে আল্লাহ তৈরি করলো
আসুন তাফসীরে ইবনে কাসীর থেকে জেনে নিই, হযরত আদমকে আল্লাহ কীভাবে তৈরি করেছিল [1] –
অতঃপর তিনি আদম সৃষ্টির জন্য মাটি আনিতে বলিলেন। আল্লাহ তা’আলা আদমকে “লাযিব” মাটি দ্বারা সৃষ্টি করিলেন। লাযিব বলা হয় পবিত্র ছানা মাটিকে। মাটিকে ছানিয়া খামীরার মত আঁটালো ও শক্ত করাকে হামাইম মাসনূন বলা হয়। আল্লাহ তা’আলা সেই মাটি দ্বারা নিজ হাতে আদমকে সৃষ্টি করিলেন। মাটির দেহ সৃষ্টি করিয়া চল্লিশ দিন রাখিয়া দিলেন। তখন ইবলীস আসিয়া তাহাকে লাথি মারিয়া ওলট-পালট করিয়া দেখিত যে, কোথাও ফাঁপা রহিয়াছে কিনা। যেহেতু উহা দোআঁশ মাটির গড়া পাত্রবৎ ছিল, তাই উহা আঘাত পাইয়া আওয়াজ করিত। তখন ইবলীস উহার মুখ দিয়া ঢুকিয়া মলদ্বার দিয়া বাহির হইত এবং মলদ্বার দিয়া ঢুকিয়া মুখ দিয়া বাহির হইত। অতঃপর বলিত, তুমি কোন বস্তুই নহ। কারণ, তোমাকে নগণ্য এঁটেল মাটি দ্বারা সৃষ্টি করা হইয়াছে। আমি যদি তোমার উপর কর্তৃত্ব পাই, তাহা হইলে অবশ্যই আমি তোমাকে অমান্য করিব।
অতঃপর যখন আল্লাহ তাহার ভিতর প্রাণ প্রবিষ্ট করাইলেন, উহা যেহেতু মাথার দিক হইতে প্রবিষ্ট হইয়াছে, তাই পূর্ণ দেহ তখনও সক্রিয় হয় নাই। শুধু সর্বাঙ্গে গোশত ও রক্ত সৃষ্টি হইতেছিল। যখন প্রাণ নাভি পর্যন্ত পৌঁছিল, তখন আদম (আ) নিজ দেহের দিকে তাকাইয়া অবাক হইলেন এবং তখনই উঠার জন্য চেষ্টা করিলেন, কিন্তু তাহা পারিলেন না। তাই আল্লাহ তা’আলা বলেন: মানুষ বড়ই তাড়াহুড়া প্রিয় সৃষ্টি।(১৭:১১) অর্থাৎ ভাল-মন্দ কোন ক্ষেত্রেই তাহার ধৈর্য থাকে না।
অবশেষে যখন সর্বাঙ্গে প্রাণ সঞ্চারিত হইল, তখন তিনি হাঁচি দিলেন। সঙ্গে সঙ্গে আল্লাহ পাকের ইঙ্গিতে আলহামদু লিল্লাহি রব্বিল আলামীন বলিলেন। জবাবে আল্লাহ পাক বলিলেন, ইয়্যারহামুকাল্লাহু য়্যা আদম।
অতঃপর আল্লাহ তা’আলা ইবলীস ও তাহার সঙ্গী ফেরেশতাগণকে (আকাশে অবস্থানকারী ফেরেশতাগণকে নহে) হুকুম দিলেন- আদমকে সিজদা কর। তখন ইবলীস ছাড়া সকল ফেরেশতাই সিজদা করিলেন, শুধু ইবলীস দম্ভভরে উহা অস্বীকার করিল।

কাদামাটি থেকে মানব সৃষ্টির পৌরাণিক সমান্তরাল এবং ঐতিহাসিক উৎস
কাদামাটি থেকে মানব সৃষ্টির যে আখ্যান ইসলাম ও অন্যান্য ইব্রাহিমীয় ধর্মে (ইহুদি ও খ্রিস্টধর্ম) দেখা যায়, তা ঐতিহাসিকভাবে মোটেও কোনো মৌলিক বা ঐশ্বরিক ধারণা নয়। বরং নৃতাত্ত্বিক এবং তুলনামূলক ধর্মতত্ত্বের (Comparative Religion) বিশ্লেষণে এটি অত্যন্ত সুষ্পষ্ট যে, মাটি থেকে মানুষ তৈরির এই গল্প প্রাচীন পৃথিবীর প্রায় সব সংস্কৃতিরই একটি অতি সাধারণ এবং বহুল প্রচলিত লোককথা বা মিথ (Myth)। ইব্রাহিমীয় ধর্মগুলোর উদ্ভবের হাজার হাজার বছর আগে থেকেই মধ্যপ্রাচ্য এবং বিশ্বের অন্যান্য আদিম ধর্মে অবিকল এই একই ধরনের গল্প প্রচলিত ছিল। আদিম মানুষ যখন দেখত যে কাদা মাটি ছেনে নানা ধরনের পাত্র, খেলনা বা মূর্তি তৈরি করা যায়, তখন তারা তাদের নিজেদের উৎপত্তির ব্যাখ্যা দিতে গিয়েও নিজেদের মতো করে একজন কারিগরের কল্পনা করে নিয়েছিল, যিনি মাটি দিয়ে তাদের অবয়ব তৈরি করেছেন। [2]

ঐতিহাসিক প্রমাণের দিকে তাকালে আমরা এর অসংখ্য দৃষ্টান্ত দেখতে পাই:
সুমেরীয় ও মেসোপটেমীয় পুরাণ: কুরআন বা বাইবেল রচিত হওয়ার বহু আগে, প্রাচীন মেসোপটেমিয়ায় সুমেরীয়রা বিশ্বাস করত যে দেবতারা তাদের কাজের ভার কমানোর জন্য মানুষ সৃষ্টির সিদ্ধান্ত নেন। তাদের পুরাণ অনুযায়ী, দেবতা ‘এনকি’ (Enki) এবং দেবী ‘নাম্মু’ (Nammu) মাটি বা কাদা ছেনে মানুষের আকৃতি তৈরি করেছিলেন। তাছাড়া, বিখ্যাত ‘গিলগামেশ মহাকাব্য’-এ উল্লেখ আছে যে দেবী ‘আরুরু’ (Aruru) কাদামাটি থেকে এনকিডুকে (Enkidu) সৃষ্টি করেছিলেন। [3]
মিশরীয় পুরাণ: প্রাচীন মিশরীয় সভ্যতায় বিশ্বাস করা হতো যে, ‘খনুম’ (Khnum) নামক ভেড়ার মাথাবিশিষ্ট এক দেবতা নীল নদের তীরের কাদামাটি দিয়ে তার কুমোরের চাকায় ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে মানুষের শরীর এবং আত্মা তৈরি করতেন। এরপর দেবতা ‘হেকাত’ (Heket) সেই মাটির পুতুলের মধ্যে শ্বাস বা প্রাণ ফুঁকে দিতেন। আদম সৃষ্টির ক্ষেত্রে আল্লাহ কর্তৃক মাটির মূর্তিতে প্রাণ ফুঁকে দেওয়ার যে বর্ণনা তাফসীরে রয়েছে, তার সাথে প্রাচীন মিশরের এই মিথের অবিশ্বাস্য রকমের মিল লক্ষ্য করা যায়। [4]
গ্রিক পুরাণ: গ্রিক পুরাণে বলা হয়েছে, টাইটান ‘প্রমিথিউস’ (Prometheus) কাদা এবং পানি মিশিয়ে প্রথম মানুষের আকার তৈরি করেছিলেন এবং দেবী ‘এথেনা’ (Athena) সেই মাটির মূর্তিতে শ্বাস দিয়ে প্রাণ সঞ্চার করেছিলেন। [5]
চীনা পুরাণ: চীনা পুরাণ অনুসারে, পৃথিবী সৃষ্টির পর দেবী ‘নুওয়া’ (Nüwa) একাকীত্ব বোধ করলে তিনি হলুদ কাদামাটি (Yellow earth) দিয়ে নিজের হাতে মানুষের আকৃতি তৈরি করেন এবং তাদের জীবন দান করেন। [6]
এই ঐতিহাসিক সমান্তরাল আখ্যানগুলো অকাট্যভাবে প্রমাণ করে যে, তাফসীরে বর্ণিত হযরত আদমকে “লাযিব” বা ছানা মাটি দিয়ে তৈরি করার গল্পটি কোনো ঐতিহাসিক সত্য বা ঐশ্বরিক প্রত্যাদেশ নয়। এটি মূলত প্রাচীনকালের অজ্ঞ মানুষের কল্পনানির্ভর লোককথারই একটি বিবর্তিত ও মধ্যপ্রাচ্যীয় সংস্করণ। আদিম যুগের মানুষেরা যেহেতু কোষ, ডিএনএ (DNA) বা বিবর্তনের মতো জটিল বৈজ্ঞানিক প্রক্রিয়া সম্পর্কে সম্পূর্ণ অজ্ঞ ছিল, তাই মাটির মূর্তি বানিয়ে তাতে জাদুকরী উপায়ে প্রাণ ফুঁকে দেওয়ার এই সরল এবং শিশুতোষ ব্যাখ্যাটিই তাদের কাছে সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য মনে হয়েছিল। যুক্তিবাদী এবং একাডেমিকভাবে এটি সুস্পষ্ট যে, এই বর্ণনাগুলো শুধুই সাংস্কৃতিক প্রক্ষেপণ (Cultural Projection), যার কোনো বৈজ্ঞানিক বা বস্তুগত ভিত্তি নেই। [7]
আদমের নাভি এবং জীববিজ্ঞানের অকাট্য যুক্তি
তাফসীরে ইবনে কাসীরের পূর্ববর্তী বর্ণনায় আমরা দেখেছি যে, হযরত আদমের দেহে যখন প্রাণ সঞ্চারিত হচ্ছিল, তখন একটি সুনির্দিষ্ট স্থানে পৌঁছার বর্ণনা দেওয়া হয়েছে: “যখন প্রাণ নাভি পর্যন্ত পৌঁছিল…”। এই বিবরণটি শুধু একটি সাধারণ শারীরবৃত্তীয় বর্ণনা নয়, বরং এটি একটি গভীর যৌক্তিক এবং বৈজ্ঞানিক বিরোধাভাস তৈরি করে। আধুনিক জীববিজ্ঞানের আলোকে বিবেচনা করলে প্রশ্ন জাগে: যদি আদম প্রথম মানুষ হয়ে থাকেন এবং সরাসরি কাদামাটি থেকে সৃষ্ট, তবে তাঁর কেন ‘নাভি’ থাকবে?
জীববিজ্ঞান অনুযায়ী, মানুষের পেটের নাভি (Umbilicus) কোনো ইচ্ছাকৃত নকশা করা গহ্বর বা অলঙ্কার নয়; এটি মূলত একটি ক্ষতের দাগ (Vestigial scar)। এই নাভি সৃষ্টি হয় শুধুমাত্র তখনই, যখন একটি মানুষ তার মায়ের জরায়ুতে (Womb) বেড়ে ওঠে। ভ্রূণ অবস্থায় একটি শিশু মায়ের গর্ভফুলের (Placenta) সাথে নাভিরজ্জু (Umbilical cord) নামক একটি নলের মাধ্যমে যুক্ত থাকে। এই নাভিরজ্জু দিয়েই শিশু মায়ের শরীর থেকে অক্সিজেন এবং সমস্ত পুষ্টি গ্রহণ করে এবং বর্জ্য পদার্থ ত্যাগ করে। জন্মের ঠিক পরক্ষণেই, শিশু যখন নিজে থেকে শ্বাস নেওয়া এবং খাবার গ্রহণ করা শুরু করে, তখন এই নাভিরজ্জুটি কেটে ফেলা হয়, এবং যে স্থান থেকে রজ্জুটি কাটা হয়, সেটিই পরে শুকিয়ে নাভিতে পরিণত হয়।
কিন্তু ধর্মীয় বিবরণ এবং-এ প্রদর্শিত সৃষ্টির প্রক্রিয়া অনুসারে, হযরত আদমের কোনো মা ছিল না, কোনো জরায়ু বা গর্ভফুলের সাথে তাঁর সংযোগের প্রশ্নই ওঠে না। তিনি ছিলেন সরাসরি কাদামাটি থেকে একটি পূর্ণাঙ্গ এবং সম্পূর্ণ মানুষের অবয়বে সৃষ্ট । যেহেতু তিনি কোনো মানব মায়ের গর্ভে বড় হননি, সেহেতু তাঁর নাভিরজ্জুর কোনো প্রয়োজন ছিল না। নাভিরজ্জু না থাকলে নাভি থাকারও কোনো যৌক্তিক বা বৈজ্ঞানিক কারণ নেই।
অতএব, তাফসীরে বর্ণিত ‘নাভি’ শব্দটি প্রমাণ করে যে, এই আখ্যানের রচয়িতারা স্তন্যপায়ী প্রাণীর ভ্রূণবিদ্যা এবং শারীরতত্ত্ব সম্পর্কে সম্পূর্ণ অজ্ঞ ছিলেন। তাঁরা শুধু পরিচিত মানবদেহের গঠনকে অনুকরণ করে প্রথম মানুষের গল্প বানিয়েছিলেন, কিন্তু সেই দেহের প্রতিটি অংশের উৎপত্তির ইতিহাস ও কারণ বুঝতে অক্ষম ছিলেন। আদমের নাভি একটি মৃত অস্তিত্বের ইতিহাস বহন করে—একটি এমন ইতিহাসের দাগ, যা প্রথম মানুষের জীবনে কখনোই ঘটেনি। এটি ধর্মগ্রন্থের একটি অভ্যন্তরীণ যৌক্তিক ত্রুটি (Internal logical failure), যা প্রমাণ করে যে এই বর্ণনাগুলো কোনো সর্বজ্ঞাত স্রষ্টার কাছ থেকে আসেনি, বরং প্রাচীনকালের অজ্ঞ মানুষের কল্পনার ফসল। একটি নিখুঁতভাবে সৃষ্ট সত্তায় একটি অর্থহীন, অকার্যকর “ক্ষতের দাগ” থাকা স্রষ্টার নকশাকেই ত্রুটিপূর্ণ হিসেবে উপস্থাপন করে।
উপসংহারঃ পৌরাণিক কল্পকাহিনী বনাম বৈজ্ঞানিক বাস্তবতা
তাফসীরে ইবনে কাসীরের বিবরণ, লুডভিগ ফইয়ারবাখের দার্শনিক বিশ্লেষণ এবং আধুনিক জীববিজ্ঞানের অকাট্য প্রমাণাদির আলোকে এটি সুষ্পষ্ট যে, কাদামাটি থেকে জাদুকরী উপায়ে প্রথম মানব সৃষ্টির ধর্মীয় আখ্যানটি একটি প্রাক-বৈজ্ঞানিক পৌরাণিক কাহিনী মাত্র। ফইয়ারবাখ যেমনটি দেখিয়েছিলেন, ঈশ্বর বা অলৌকিক সৃষ্টির এই ধারণাগুলো মূলত মানুষের নিজেরই অজ্ঞতা, ভয় এবং প্রকৃতির ওপর নির্ভরশীলতার মনস্তাত্ত্বিক প্রক্ষেপণ। প্রাচীন মানুষ যখন বিশ্বজগতের প্রকৃত কার্যকারণ বুঝত না, তখন তারা নিজেদের কল্পনাশরা শক্তি দিয়ে এই ধরনের সরলীকৃত গল্প তৈরি করেছিল।
আদমের নাভির মতো একটি ক্ষুদ্র অথচ তাৎপর্যপূর্ণ শারীরবৃত্তীয় ত্রুটি প্রমাণ করে যে, এই গল্পগুলোর রচয়িতারা মানুষের প্রজনন ও ভ্রূণবিদ্যা সম্পর্কে সম্পূর্ণ অজ্ঞ ছিলেন। তাঁরা শুধু তাঁদের চারপাশের চেনা জগতকে অনুকরণ করে গল্প সাজিয়েছিলেন, কিন্তু সেই গঠনের পেছনের বিবর্তনীয় ইতিহাস বুঝতে পারেননি। অন্যদিকে, আধুনিক বিজ্ঞান ফসিল রেকর্ড, ডিএনএ বিশ্লেষণ এবং তুলনামূলক শারীরতত্ত্বের মাধ্যমে সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করেছে যে, মানুষ কোনো বিচ্ছিন্ন বা বিশেষ সৃষ্টি নয়; বরং কোটি কোটি বছর ধরে চলা বিবর্তন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে অন্যান্য প্রাণীর সাথে একটি সাধারণ আদিপুরুষ থেকে উদ্ভূত হয়েছে।
লুডভিগ ফইয়ারবাখের দর্শনের মূল সুর ধরে বলা যায়, সত্যের অনুসন্ধান করতে হলে আমাদের কল্পিত স্বর্গীয় কাহিনীর মায়া ত্যাগ করে এই বাস্তব পৃথিবীর বস্তুগত প্রমাণের দিকে তাকাতে হবে। অন্ধবিশ্বাস ও অলৌকিকতার ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠা ধর্মতাত্ত্বিক দাবিগুলো আধুনিক বিজ্ঞানের কষ্টিপাথরে আজ অসার প্রমাণিত। মানুষের মুক্তি নিহিত রয়েছে কল্পিত ঈশ্বরের দাসত্বে নয়, বরং যুক্তি, বিজ্ঞান এবং সহমানবের প্রতি ভালোবাসার ওপর ভিত্তি করে একটি মানবিক ও বাস্তবমুখী বিশ্ববীক্ষা গড়ে তোলার মধ্যে।
তথ্যসূত্রঃ
- তাফসীরে ইবনে কাসীর, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, প্রথম খণ্ড, পৃষ্ঠা ৩৯০ ↩︎
- Leeming, David Adams. Creation Myths of the World: An Encyclopedia. ABC-CLIO, 2010, p. 17. ↩︎
- Dalley, Stephanie. Myths from Mesopotamia: Creation, the Flood, Gilgamesh, and Others. Oxford University Press, 2000, p. 15. ↩︎
- Pinch, Geraldine. Egyptian Mythology: A Guide to the Gods, Goddesses, and Traditions of Ancient Egypt. Oxford University Press, 2004, p. 153. ↩︎
- Hesiod. Theogony and Works and Days. Translated by M.L. West, Oxford University Press, 1988, p. 45. ↩︎
- Birrell, Anne. Chinese Mythology: An Introduction. Johns Hopkins University Press, 1999, p. 163. ↩︎
- Wundt, Wilhelm. Elements of Folk Psychology. Allen & Unwin, 1916, p. 378. ↩︎
