
Table of Contents
- 1 ভূমিকাঃ মিথ্যার রাজপ্রাসাদ ও হারুন ইয়াহিয়া ব্র্যান্ড
- 2 ধর্মের লেবাসে অপরাধ সাম্রাজ্যঃ আদনান ওকতারের মুখোশ উন্মোচন
- 3 বাংলাদেশে হারুন ইয়াহিয়ার বুদ্ধিবৃত্তিক আধিপত্য ও নকলের সংস্কৃতি
- 4 সিউডো-সায়েন্স বা অপবিজ্ঞানঃ হারুন ইয়াহিয়া কীভাবে বিজ্ঞামনষ্কতা ধ্বংস করেছেন
- 5 উপসংহারঃ একটি বুদ্ধিবৃত্তিক সাম্রাজ্যের পতন এবং আমাদের শিক্ষা
ভূমিকাঃ মিথ্যার রাজপ্রাসাদ ও হারুন ইয়াহিয়া ব্র্যান্ড
একবিংশ শতাব্দীতে ইসলামি বিশ্বে ‘বিজ্ঞানবাদ’ বা ‘সায়েন্টিফিক মিরাকল’ (Scientific Miracles) নামক যে প্রবণতাটি সবচেয়ে বেশি জনপ্রিয়তা পেয়েছে, তার নেপথ্য কারিগরদের নাম নিলে সবার ওপরে আসবে একজন তুর্কি নাগরিকের নাম—আদনান ওকতার, যিনি বিশ্বজুড়ে ‘হারুন ইয়াহিয়া’ ছদ্মনামে পরিচিত। গত কয়েক দশকে হারুন ইয়াহিয়া কেবল একটি নাম নয়, বরং একটি বিলিয়ন ডলারের ‘ব্র্যান্ড’ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছিলেন। তার অগণিত বই, উচ্চমানের প্রামাণ্যচিত্র এবং আকর্ষণীয় গ্রাফিক্সে ঠাসা সৃষ্টির তত্ত্ব (Creationism) সারা বিশ্বের মুসলিম তরুণদের এক ধরণের মনস্তাত্ত্বিক শ্রেষ্ঠত্ব ও বুদ্ধিবৃত্তিক প্রশান্তি দিয়ে আসছিল। তাদের বিশ্বাস করানো হয়েছিল যে, ডারউইনের বিবর্তনবাদ একটি বিশাল ষড়যন্ত্র এবং আধুনিক বিজ্ঞানের প্রতিটি বড় আবিষ্কার আসলে চৌদ্দশ বছর আগেই কোরআনে লেখা ছিল।
বাংলাদেশে যারা ইসলামি ‘বিজ্ঞান বিষয়ক’ কিতাব লেখেন বা ওয়াজ মাহফিলে বিজ্ঞানের দোহাই দিয়ে কথা বলেন, হারুন ইয়াহিয়া তাদের কাছে এক অদৃশ্য ‘রূহানী পিতা’ বা বুদ্ধিবৃত্তিক ধ্রুবতারা। বিবর্তনবাদের বিরোধিতায় আরিফ আজাদ থেকে শুরু করে বর্তমান সময়ের তথাকথিত ইসলামি বিজ্ঞানীদের অধিকাংশ মালমশলাই সরাসরি হারুন ইয়াহিয়ার বই থেকে সংগৃহীত, অনুবাদকৃত অথবা অবিকল নকল করা। কিন্তু ট্র্যাজেডিটি এখানেই যে, যাকে আদর্শ মেনে মুসলিম বিশ্ব বিজ্ঞানের জয়গান গাইছিল, খোদ তুরস্কেই সেই আদনান ওকতারকে চিহ্নিত করা হয়েছে একজন ভয়ঙ্কর অপরাধী, জালিয়াতি এবং নৈতিকভাবে চরম স্খলিত ব্যক্তি হিসেবে। বিজ্ঞান ও ধর্মের নামাবলি গায়ে জড়িয়ে তিনি যে একটি বিশাল অপরাধ সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছিলেন, তার নগ্ন রূপ আজ বিশ্ববাসীর সামনে উন্মোচিত। নিচে হারুন ইয়াহিয়ার অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড এবং বাংলাদেশে তার প্রভাব নিয়ে একটি সামগ্রিক চিত্র দেওয়া হলো:
বাংলাদেশে বর্তমান সময়ের প্রায় সকল ইসলামি অ্যাপোলোজিস্ট ও লেখকদের রূহানী পিতা হারুন ইয়াহিয়া। বিবর্তনবাদ বিরোধী অধিকাংশ বই ও আর্টিকেল সরাসরি তার ‘Global Publishing’ হাউজের কন্টেন্ট থেকে কপি করা। মূলত তিনি বাংলাদেশে ‘বৈজ্ঞানিক মোজেজা’র একটি ফেক-ইন্ডাস্ট্রি তৈরি করে দিয়েছেন।
১১ জানুয়ারি, ২০২১ তারিখে তুরস্কের আদালত তাকে ১০৭৫ বছরের কারাদণ্ড দেয়। পরবর্তীতে ২০২২ সালে পুনঃবিচারে এই দণ্ড বাড়িয়ে ৮,৬৫৮ বছর করা হয়। তার বিরুদ্ধে যৌন নিপীড়ন, অপরাধমূলক গ্যাং পরিচালনা এবং শিশুদের নির্যাতনের অকাট্য প্রমাণ পাওয়া যায়।
সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান, এনসিএসইধর্মের লেবাসে অপরাধ সাম্রাজ্যঃ আদনান ওকতারের মুখোশ উন্মোচন
হারুন ইয়াহিয়া বা আদনান ওকতার কেবল একজন শৌখিন লেখক ছিলেন না; তিনি ছিলেন তুরস্কের একটি বিশাল কাল্ট (Cult) বা গোষ্ঠী-নেতা। টেলিভিশনের পর্দায় তাকে দেখা যেত সুন্দরী নারীদের পরিবেষ্টিত অবস্থায়—যাদের তিনি ‘কিটেনস’ (Kittens) বলে ডাকতেন। একদিকে তিনি বিবর্তনবাদবিরোধী তথাকথিত ‘সায়েন্টিফিক’ লেকচার দিতেন, অন্যদিকে তার ব্যক্তিগত জীবন ছিল আধুনিক যুগের যেকোনো অপরাধী গ্যাংস্টারের চেয়েও ভয়াবহ। ২০২১ এবং ২০২২ সালের আদালতের রায়ে এটি স্পষ্ট হয়ে যায় যে, ‘ইসলামি ঐতিহ্য’ রক্ষার দাবিদার এই ব্যক্তিটি আসলে দীর্ঘ সময় ধরে একটি সংঘবদ্ধ অপরাধী চক্র পরিচালনা করে আসছিলেন।
দণ্ডাদেশের ভয়াবহতা: ১০৭৫ থেকে ৮৬৫৮ বছর
২০২১ সালের জানুয়ারিতে ইস্তাম্বুলের একটি আদালত তাকে অপরাধমূলক সংগঠন পরিচালনা, যৌন নির্যাতন এবং জালিয়াতির দায়ে ১,০৭৫ বছরের কারাদণ্ড দেয় [1]। কিন্তু নাটকের এখানেই শেষ ছিল না। ২০২২ সালে উচ্চ আদালতে আপিলের পর তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলো আরও স্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয়। ফলে বিচারক তার সাজার মেয়াদ বাড়িয়ে অবিশ্বাস্যভাবে ৮,৬৫৮ বছর নির্ধারণ করেন [2]। এই সাজাটি ছিল মূলত তার দ্বারা পরিচালিত অপরাধী সংগঠনের প্রতিটি সদস্যের সম্মিলিত অপরাধের দায়ভার এবং সরাসরি তার দ্বারা সংঘটিত যৌন অপরাধের যোগফল।

অপরাধের ধরণ ও আইনি ব্যবচ্ছেদ
আদনান ওকতারের বিরুদ্ধে অভিযোগগুলো কেবল ধর্মীয় স্খলন ছিল না, বরং সেগুলো ছিল মারাত্মক ফৌজদারি অপরাধ। নিচে তার প্রধান অপরাধগুলোর একটি তালিকা দেওয়া হলো:
নিচে আদনান ওকতারের সাজা ও অভিযোগের একটি ‘লিগ্যাল ফ্যাক্ট-শিট’ টেবিল দেওয়া হলো:
| বিষয | বিস্তারিত তথ্য |
|---|---|
| প্রধান অপরাধী | আদনান ওকতার (ওরফে হারুন ইয়াহিয়া) |
| প্রাথমিক সাজা (২০২১) | ১০৭৫ বছর ৯ মাস |
| চূড়ান্ত সাজা (২০২২) | ৮,৬৫৫৮ বছর |
| ভুক্তভোগীর সংখ্যা | ২৩৬ জন আসামী এবং অসংখ্য গোপন ভুক্তভোগী নারী ও শিশু |
| আদালতের মন্তব্য | “একজন অপরাধী চক্রের প্রধান যিনি ধর্মের নাম ব্যবহার করে ব্ল্যাকমেইল ও যৌন সন্ত্রাস চালিয়েছেন।” |
বাংলাদেশে হারুন ইয়াহিয়ার বুদ্ধিবৃত্তিক আধিপত্য ও নকলের সংস্কৃতি
হারুন ইয়াহিয়া বা আদনান ওকতার কেবল তুরস্কের একজন কাল্ট লিডার ছিলেন না; তিনি ছিলেন আধুনিক সময়ের ইসলামি অপপ্রচারের (Islamic Apologetics) একজন বিশ্বস্ত ‘সাপ্লায়ার’। বাংলাদেশে গত দুই দশকে বিজ্ঞান বনাম ইসলাম নিয়ে যে সমস্ত বিতর্ক বা বইপত্র প্রকাশিত হয়েছে, তার প্রায় ৮০-৯০ শতাংশের কাঁচামাল সরাসরি হারুন ইয়াহিয়ার কারখানা থেকে আসা। বাংলাদেশের ইসলামি পাঠকদের কাছে তার উচ্চমানের গ্রাফিক্স, ঝকঝকে ভিডিও এবং সহজবোধ্য ‘সৃষ্টিবাদী’ (Creationist) যুক্তিগুলো এতটাই জনপ্রিয় ছিল যে, মানুষ কখনো তার পেছনের মানুষটিকে চিনে নেওয়ার প্রয়োজন বোধ করেনি।
অপবিজ্ঞানের পাইকারি বিক্রেতা
বাংলাদেশে যখন ‘বিবর্তনবাদ’ নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে এক ধরণের ভীতি তৈরি করা হয়, তখন হারুন ইয়াহিয়ার ‘বিবর্তন একটি ধোঁকা’ (The Evolution Deceit) বইটি প্রধান অস্ত্র হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছিল। বাংলাদেশের শত শত মাদ্রাসা এবং ওয়াজ মাহফিলে যে সমস্ত যুক্তি দেওয়া হয়—যেমন ‘জীবন্ত জীবাশ্ম’ বা ‘প্রজাতির পরিবর্তন বা রূপান্তর অসম্ভব’—তার প্রায় সবই হারুন ইয়াহিয়ার বই থেকে নেওয়া। মজার ব্যাপার হলো, এই লেখকদের অধিকাংশই হারুন ইয়াহিয়ার নাম উল্লেখ না করে তার যুক্তিগুলোকে নিজেদের ‘গবেষণা’ হিসেবে চালিয়ে দেন।
কপি-পেস্ট সাহিত্যের রমরমা ব্যবসা
বাংলাদেশের বর্তমান সময়ের অনেক জনপ্রিয় ইসলামি লেখক, যারা নিজেদের ‘বিজ্ঞানমনস্ক’ দাবি করেন, তারা মূলত হারুন ইয়াহিয়ার লেখার একনিষ্ঠ অনুবাদক বা রূপান্তরকারী। তুরস্কের এই সাজাপ্রাপ্ত অপরাধী যা কিছু লিখেছেন, বাংলাদেশের লেখকরা কেবল তার নামফলক সরিয়ে দিয়ে নিজেদের নাম বসিয়ে তা বাজারে ছেড়েছেন। হারুন ইয়াহিয়ার ‘গ্লোবাল পাবলিশিং’ (Global Publishing) থেকে প্রকাশিত বইগুলোর ডায়াগ্রাম এবং ছবিগুলোই আজ বাংলাদেশের তথাকথিত ‘বিবর্তন বিরোধী’ বইগুলোর প্রধান আকর্ষণ। নিচে বাংলাদেশে হারুন ইয়াহিয়ার এই ‘বুদ্ধিবৃত্তিক আধিপত্য’ কীভাবে কাজ করে, তা একটি ‘ইনফ্লুয়েন্স মেকানিজম’ লিস্টের মাধ্যমে দেওয়া হলো:
সিউডো-সায়েন্স বা অপবিজ্ঞানঃ হারুন ইয়াহিয়া কীভাবে বিজ্ঞামনষ্কতা ধ্বংস করেছেন
হারুন ইয়াহিয়ার তথাকথিত ‘বৈজ্ঞানিক’ প্রচারণার সবচেয়ে ভয়ংকর দিকটি ছিল এর মোড়ক। তিনি বিজ্ঞানকে খণ্ডন করার জন্য বিজ্ঞানেরই পরিভাষা ব্যবহার করতেন, কিন্তু তার পদ্ধতির মধ্যে বিজ্ঞানের ন্যূনতম কোনো সততা বা ‘পিয়ার-রিভিউ’ (Peer-review) প্রক্রিয়া ছিল না। একেই আধুনিক দর্শনের ভাষায় বলা হয় ‘সিউডো-সায়েন্স’ (Pseudo-science) বা অপবিজ্ঞান। হারুন ইয়াহিয়া এমন এক প্রজন্মের জন্ম দিয়েছেন যারা ল্যাবরেটরিতে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করার চেয়ে ইউটিউব ভিডিও বা চকচকে রঙিন বই দেখে বিবর্তনবাদ বা জ্যোতির্বিজ্ঞানকে ‘ভুল’ প্রমাণ করতে বেশি আগ্রহী।
অপব্যাখ্যার কারখানা ও বুদ্ধিবৃত্তিক চাতুরি
হারুন ইয়াহিয়ার অন্যতম প্রধান অস্ত্র ছিল ‘চেরিপিকিং’ (Cherry-picking) বা পছন্দমতো তথ্য বেছে নেওয়া। তিনি কোনো বিখ্যাত বিজ্ঞানীর গবেষণাপত্র থেকে একটি লাইন বা একটি প্যারাগ্রাফ ছিঁড়ে নিয়ে সেটিকে এমনভাবে উপস্থাপন করতেন যেন ওই বিজ্ঞানী নিজেই বিবর্তনবাদকে অস্বীকার করছেন। অথচ পুরো গবেষণাপত্রটি পড়লে দেখা যেত মূল সত্যটি তার দাবির সম্পূর্ণ বিপরীত। এই ধরণের বুদ্ধিবৃত্তিক জালিয়াতি মুসলিম বিশ্বের সাধারণ পাঠকদের মধ্যে চরম বিভ্রান্তি তৈরি করেছে। হারুন ইজহারের কপিক্লোনগুলোও একইভাবে বিভিন্ন জার্নালের কিছুটা অংশ কপি করে এরকম হাজারো দাবী একত্রিত করে নতুন নতুন অপবৈজ্ঞানিক কিতাব নাজিল করে ফেলেছেন।
‘অ্যাটলাস অফ ক্রিয়েশন’ ও মিথ্যার দলিলাদেশ
তার বিখ্যাত গ্রন্থ ‘অ্যাটলাস অফ ক্রিয়েশন’ (Atlas of Creation) মূলত একটি বিশাল ভলিউমের রঙিন অ্যালবাম, যেখানে তিনি দাবি করেছেন যে লক্ষ লক্ষ বছর ধরে প্রাণীদের কোনো পরিবর্তন হয়নি। তিনি ‘জীবন্ত জীবাশ্ম’ (Living Fossils) এর দোহাই দিয়ে প্রমাণ করতে চেয়েছেন যে বিবর্তন একটি কল্পনা। কিন্তু আধুনিক জেনেটিক্স এবং প্যালিওন্টোলজি প্রমাণ করেছে যে, বাহ্যিক রূপ একই থাকলেও জিনগত স্তরে এবং অভ্যন্তরীণ শরীরবৃত্তীয় প্রক্রিয়ায় বিবর্তন নিরন্তর চলছে। হারুন ইয়াহিয়া বিজ্ঞানের এই সূক্ষ্ম স্তরগুলোকে সচেতনভাবে এড়িয়ে গিয়ে কেবল স্থূল চাক্ষুষ সাদৃশ্য দিয়ে মানুষকে বিভ্রান্ত করেছেন। নিচে হারুন ইয়াহিয়ার ‘অপবিজ্ঞান’ বা সিউডো-সায়েন্সের প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলো একটি ডায়াগ্রামের আকারে সাজিয়ে দেওয়া হলো:
বিজ্ঞানীদের গবেষণাপত্র থেকে খণ্ডিত বাক্য ব্যবহার করে মিথ্যা উপসংহার টানা। তিনি এমনভাবে উদ্ধৃতি দিতেন যেন মনে হয় বিবর্তনবাদীরা নিজেরাই তাদের তত্ত্ব নিয়ে সন্দিহান।
তিনি এমন সব দাবি করেন যা বৈজ্ঞানিকভাবে পরীক্ষা করা অসম্ভব। যদি কোনো তথ্য তার বিশ্বাসের বিরুদ্ধে যায়, তবে তিনি সেটিকে ‘ইহুদি ষড়যন্ত্র’ বা জালিয়াতি বলে উড়িয়ে দেন।
কেবল বাহ্যিক গঠন বা ছবি দেখে সিদ্ধান্ত দেওয়া। অণুজীব বিজ্ঞান বা জেনেটিক্সের জটিল গাণিতিক প্রমাণগুলোকে তিনি রঙিন গ্রাফিক্সের আড়ালে ঢাকা দিয়ে দেন।
হারুন ইয়াহিয়া নিজে কখনো কোনো ল্যাবরেটরিতে গবেষণা করেননি। তার কাজ ছিল স্রেফ ইন্টারনেটের তথ্যকে ধর্মীয় ছাঁচে রি-প্যাকেজিং করা।
উপসংহারঃ একটি বুদ্ধিবৃত্তিক সাম্রাজ্যের পতন এবং আমাদের শিক্ষা
হারুন ইয়াহিয়া বা আদনান ওকতারের আট হাজার বছরেরও অধিক মেয়াদের কারাদণ্ড কেবল একজন ব্যক্তির পতন নয়, বরং এটি তথাকথিত ‘ইসলামি অপবিজ্ঞান’ বা ‘সায়েন্টিফিক মিরাকল’ ইন্ডাস্ট্রির এক চরম নৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক পরাজয়। কয়েক দশক ধরে যে মানুষটি বিশ্বজুড়ে মুসলিম তরুণদের বিজ্ঞান শিখিয়েছেন, বিবর্তনবাদকে ‘শয়তানি চক্রান্ত’ হিসেবে প্রচার করেছেন এবং নৈতিকতার ঝাণ্ডা উড়িয়েছেন—তার নিজের আস্তানাটিই ছিল নারী ও শিশু নির্যাতন, অর্থপাচার এবং যৌন সন্ত্রাসের আখড়া। এই বৈপরীত্য আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় যে, যখন কোনো জ্ঞানচর্চাকে যুক্তির চেয়ে ভাবাবেগ এবং প্রমাণের চেয়ে অন্ধবিশ্বাসের ওপর দাঁড় করানো হয়, তখন সেখানে এই ধরণের প্রতারকদের জন্ম হওয়া অনিবার্য। হারুন ইয়াহিয়ার এই অধ্যায় থেকে আমাদের জন্য কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা রয়েছে:
পরিশেষে বলা যায়, হারুন ইয়াহিয়ার পতন আসলে একটি সুযোগ। এটি সুযোগ আমাদের এই অন্ধকার বৃত্ত থেকে বেরিয়ে আসার। বিজ্ঞানকে বিজ্ঞানের জায়গায় এবং ধর্মকে বিশ্বাসের জায়গায় রেখে একটি যুক্তিনির্ভর সমাজ গঠন করা এখন সময়ের দাবি। জালিয়াতি, জালিয়াতিই থাকে—চাই তা কোনো ল্যাবরেটরিতে হোক বা কোনো সুসজ্জিত ধর্মীয় কিতাবের পাতায়। হারুন ইয়াহিয়া ইতিহাসে কেবল একজন অপরাধী হিসেবেই নয়, বরং একটি প্রজন্মের বুদ্ধিবৃত্তিক সময় নষ্টকারী এক ‘মাস্টার মাইন্ড’ প্রতারক হিসেবেও চিহ্নিত হয়ে থাকবেন।
