নূহ নবীর প্রাগৈতিহাসিক মহাপ্লাবনের (বন্যা) মিথের ব্যবচ্ছেদ

Table of Contents

ভূমিকা: মহাপ্লাবন মিথের মনস্তাত্ত্বিক ও ভৌগোলিক পটভূমি

মানব সভ্যতার ইতিহাস এবং প্রাচীন ধর্মীয় সাহিত্যগুলো নিবিড়ভাবে পর্যালোচনা করলে একটি অত্যন্ত কৌতূহলোদ্দীপক বিষয়ের পুনরাবৃত্তি চোখে পড়ে—তা হলো একটি প্রাগৈতিহাসিক বৈশ্বিক মহাপ্লাবন বা বিশ্বব্যাপী বন্যার গল্প। পৃথিবীর প্রায় প্রতিটি প্রাচীন সংস্কৃতিতেই একটু ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে প্রায় একই ধরনের একটি কাহিনীর উপস্থিতি লক্ষণীয়। এই গল্পটির প্রকৃত সূচনা আসলে কোথা থেকে হয়েছিল এবং কীভাবে তা বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়ল, তা খুঁজতে গেলে মানব ইতিহাসের একেবারে প্রাথমিক পর্যায়ে ফিরে যেতে হবে। বিজ্ঞান ও যুক্তির নিরিখে বিচার করলে দেখা যায়, প্রাচীনকালের মানব সভ্যতাগুলো মূলত গড়ে উঠেছিল বিভিন্ন উর্বর নদী অববাহিকাকে কেন্দ্র করে—যেমন মেসোপটেমিয়ায় টাইগ্রিস ও ইউফ্রেটিস, মিসরে নীল নদ, ভারতে সিন্ধু এবং চীনে পীত নদী। এই অঞ্চলগুলোতে নিয়মিত বন্যা ছিল একটি সাধারণ ও অবধারিত প্রাকৃতিক ঘটনা। তবে মাঝে মাঝে এমন কিছু প্রলয়ংকরী ও অপ্রত্যাশিত স্থানীয় বন্যা সংঘটিত হতো, যা প্রাচীন মানুষের জীবন ও সম্পদকে সম্পূর্ণ ধ্বংস করে দিত। বিজ্ঞান, ভূতত্ত্ব ও বায়ুমণ্ডলীয় নিয়মকানুন সম্পর্কে সেই সময়ের মানুষের বাস্তব জ্ঞান ছিল একেবারেই শূন্য; ফলে আকস্মিক ও ধ্বংসাত্মক এই প্রাকৃতিক বিপর্যয়গুলোকে তারা দেবতাদের ক্রোধ, মানুষের পাপের শাস্তি বা ঐশ্বরিক হস্তক্ষেপের সরাসরি প্রতিফলন হিসেবেই ব্যাখ্যা করত [1]

প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে এই স্থানীয় দুর্যোগের ভয়াবহ স্মৃতিগুলো যখন মানুষের মুখে মুখে স্থানান্তরিত হয়েছে, তখন স্বাভাবিকভাবেই গল্পটিতে নানা অতিপ্রাকৃত উপাদান ও কল্পনার অতিরঞ্জন যুক্ত হয়েছে। একটি কাহিনী যখন শ্রুতি পরম্পরায় একজন মানুষের মুখ থেকে অন্যজনের কাছে যায়, তখন তাতে প্রতিনিয়ত নতুন ডালপালা গজায়, প্রচুর সংযোজন ও বিয়োজন ঘটে। স্থানীয় সমাজব্যবস্থা, ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্য এবং নিজস্ব সাংস্কৃতিক বিশ্বাস এই গল্পগুলোর সাথে মিশে যেতে থাকে, এবং চরিত্রগুলোও সময়ের সাথে সাথে নিজেদের মতো করে বদলে যায়। সময়ের পরিক্রমায় একটি নির্দিষ্ট অঞ্চলের বন্যার বাস্তব স্মৃতি লোককথার গণ্ডি পেরিয়ে রূপান্তরিত হয় সমগ্র পৃথিবী ধ্বংসকারী এক মহাজাগতিক প্লাবনের মিথে, যার সমাপ্তিতে গুটি কয়েক মানুষ ও প্রাণীর ঐশ্বরিক উপায়ে বেঁচে ফেরার রূপরেখা তৈরি করা হয়। এটিই পৃথিবীর প্রায় সকল জনশ্রুতি বা ধর্মীয় লোককাহিনীর উৎপত্তি ও বিবর্তনের পেছনের নির্জলা বাস্তবতা। বিভিন্ন পুরাণ ও ধর্মগ্রন্থে বর্ণিত এই মহাপ্লাবনের আখ্যানগুলোকে যদি অন্ধ বিশ্বাসের বদলে ইতিহাস, ভূতত্ত্ব এবং গাণিতিক যুক্তির কঠোর কষ্টিপাথরে বিচার করা হয়, তবে এটি সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয় যে বিশ্বব্যাপী প্রাগৈতিহাসিক বন্যার এই দাবি বৈজ্ঞানিক ও বস্তুনিষ্ঠভাবে সম্পূর্ণ অবাস্তব এবং অসম্ভব। এই প্রবন্ধে আমরা ঐতিহাসিকভাবে এই মিথের উৎপত্তি এবং বৈজ্ঞানিক ও গাণিতিক প্রমাণের ভিত্তিতে এর অসারতা পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে বিশ্লেষণ করব [2]।, শিশু, বৃদ্ধ, প্রতিবন্ধী এবং নির্বাক প্রাণিকুলকে এভাবে ঢালাওভাবে হত্যার আখ্যানটি ঈশ্বরের পরম করুণাময় ও সর্বজ্ঞানী ধারণার সাথে সরাসরি সাংঘর্ষিক।


মহাপ্লাবন মিথের উৎস এবং বিভিন্ন সভ্যতায় এর বিবর্তন

বিশ্বব্যাপী এই ভয়ঙ্কর ও প্রাণঘাতী বন্যার মিথের তুলনামূলক বিশ্লেষণ করলে এটি দ্ব্যর্থহীনভাবে প্রমাণিত হয় যে, কাহিনীগুলো স্বাধীনভাবে ঘটা কোনো বৈশ্বিক দুর্যোগের ঐতিহাসিক দলিল নয়; বরং এগুলো নির্দিষ্ট ভৌগোলিক অঞ্চলের সুপ্রাচীন লোককাহিনীর ধারাবাহিক সাহিত্যিক বিবর্তন ও সাংস্কৃতিক অনুকরণের ফসল। এই মিথের সর্বপ্রাচীন লিখিত নিদর্শন পাওয়া যায় প্রাচীন মেসোপটেমীয় সভ্যতায়। গিলগামেশের মহাকাব্য এবং আক্কাডীয় মিথের আগে প্রায় খ্রিস্টপূর্ব ১৬০০ সালের দিকে রচিত এরিদু জেনেসিস (Eridu Genesis) হলো এ ধরনের বন্যা মিথের সবচেয়ে প্রাচীন ও আদি উদাহরণ। এরিদু জেনেসিসের এই কাহিনী প্রাচীন নিপ্পুর শহরের ধ্বংসাবশেষ থেকে আবিষ্কৃত মৃত্তিকাফলক বা ট্যাবলেটগুলো থেকে জানা যায়, যা ১৮৯০-এর দশকের শেষের দিকে খনন করে উদ্ধার করা হয় এবং পরবর্তীতে আর্নো পয়েবেল (Arno Poebel) নামক একজন অ্যাসিরিয়োলজিস্ট তা অনুবাদ করেন [3]

গোটা বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে থাকা এই মিথের সবচাইতে উল্লেখযোগ্য ও বিস্তৃত ভার্শনটি পাওয়া যায় মেসোপটেমিয়ার গিলগামেশের মহাকাব্য থেকে। ঐতিহাসিক ও প্রত্নতাত্ত্বিক পণ্ডিতদের গবেষণায় এটি অকাট্যভাবে প্রমাণিত যে, এই কাহিনীটি মূলত আক্কাডীয় ভাষার প্রাচীনতর মহাকাব্য আত্রা-হাসিস থেকে সরাসরি নকল বা আত্মসাৎ করা হয়েছে, যার সময়কাল খ্রিস্টপূর্ব ১৮তম শতাব্দী। গিলগামেশের বন্যা মিথে দাবি করা হয়েছে, সর্বোচ্চ দেবতা এনলিল পৃথিবীতে মানুষের কোলাহল অত্যধিক বেড়ে যাওয়ায় বিরক্ত হয়ে বন্যার মাধ্যমে পৃথিবীর সমস্ত প্রাণী ধ্বংস করার সিদ্ধান্ত নেন। কিন্তু দেবতা এআ, যিনি মাটি ও দেবত্বের রক্ত থেকে মানুষ সৃষ্টি করেছিলেন বলে বিশ্বাস করা হতো, তিনি গোপনে বীর উতনাপিশতিমকে আসন্ন বন্যার কথা জানিয়ে দেন এবং তাকে একটি বিশালাকার নৌকা বানানোর জন্য বিশদ নির্দেশ দেন, যাতে পৃথিবীর জীবনের অস্তিত্ব টিকে থাকে। ঠিক এই একই আখ্যানগত ছাঁচ—একজন ক্রুদ্ধ ঈশ্বর, একজন নির্বাচিত ত্রাণকর্তা, একটি সুবিশাল নৌযান নির্মাণ এবং প্রাণীজগতকে রক্ষার নির্দেশ—পরবর্তী শতকগুলোতে অন্যান্য ধর্ম ও পুরাণ অবিকল নকল করেছে [4]

সময়ের সাথে সাথে মেসোপটেমিয়ার এই আদি মিথটি বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে এবং স্থানীয় সংস্কৃতির সাথে মিশে নতুন রূপ লাভ করে। উদাহরণস্বরূপ, হিন্দু পুরাণে, বিশেষ করে খ্রিস্টপূর্ব ৬ষ্ঠ শতকে রচিত শতপথ ব্রাহ্মণ এবং অন্যান্য পুরাণগুলোতে একটি মহা-ব বন্যার কাহিনী পাওয়া যায়, যাকে হিন্দু বিশ্বাসে মন্বন্তর-সন্ধ্যা বলা হয়। এই কাহিনীতে বিষ্ণুর মৎস্য অবতার প্রথম মানুষ মনুকে আসন্ন বন্যা সম্পর্কে সতর্ক করেন এবং তাঁকে একটি বিশাল নৌকা তৈরির পরামর্শ দেন। একইভাবে, জরথুস্ট্রিয়ান মাজদাইজম-এ, অশুভ শক্তি আহরিমান একটি খরার মাধ্যমে পৃথিবী ধ্বংস করার চেষ্টা করেন, কিন্তু দেবতা মিথ্রা একটি পাথরে তীর নিক্ষেপ করলে সেখান থেকে বন্যা শুরু হয়, যা পৃথিবীকে রক্ষা করে এবং এক ব্যক্তি তাঁর গরু নিয়ে একটি নৌকায় বেঁচে যান। ঐতিহাসিক নরবার্ট এটিংগার যৌক্তিকভাবে তুলে ধরেছেন যে, ইয়িমা এবং ভারার কাহিনী মূলত একটি বন্যা মিথই ছিল, কিন্তু পূর্ব ইরানের শুষ্ক ও রুক্ষ প্রকৃতির কারণে সেখানে বন্যার বদলে কঠোর শীতের উপস্থাপনা যুক্ত করা হয়েছে। তিনি আরও দেখিয়েছেন যে, বিদেভদাদ ২.২৪-এ গলিত পানির প্রবাহের যে উল্লেখ রয়েছে, তা মূলত সেই আদি বন্যা মিথেরই একটি অবশিষ্টাংশ। এমনকি প্রাচীন ভারতীয় বন্যা মিথের নায়কও মূলত ছিলেন যম, যা পরবর্তীতে বিবর্তিত হয়ে মনুতে পরিবর্তিত হয় [5]

গ্রিক সভ্যতায়, প্লেটোর তিমাইয়াসে (প্রায় খ্রিস্টপূর্ব ৩৬০ সালে রচিত) একটি বন্যার কাহিনী স্থান পেয়েছে যা পূর্ববর্তী মেসোপটেমীয় সংস্করণগুলোর সাথে হুবহু মিলে যায়। এতে বলা হয়েছে, ব্রোঞ্জ যুগের মানুষদের অবিরাম যুদ্ধ-বিগ্রহের কারণে দেবতা জিউস রেগে যান এবং মানুষকে শাস্তি দেওয়ার জন্য একটি বন্যা পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেন। টাইটান প্রমিথিউস গোপনে ডিউকালিয়নকে বন্যার পরিকল্পনার কথা জানান এবং তাঁকে একটি নৌকা বানানোর পরামর্শ দেন। নয় রাত ও দিনের পর পানি নামতে শুরু করে এবং নৌকাটি এক পাহাড়ে ভেঙে পড়ে। এমনকি উত্তর আমেরিকার গ্রেট প্লেইন্স অঞ্চলের আদিবাসী উপজাতি চেয়েন জাতির মধ্যেও এমন একটি বিশ্বাস প্রচলিত যে, একটি বন্যা তাদের ইতিহাসের গতিপথ পরিবর্তন করেছিল। বিজ্ঞান ও ইতিহাসের দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করলে দেখা যায়, এটি মূলত মিসৌরি নদীর উপত্যকায় ঘটা কোনো ভয়াবহ স্থানীয় বন্যার স্মৃতি, যা কালের বিবর্তনে তাদের সৃষ্টিতত্ত্বে বৈশ্বিক রূপ নিয়েছে। এই সমস্ত প্রমাণ দ্ব্যর্থহীনভাবে নির্দেশ করে যে, ধর্মগ্রন্থগুলোর এই দাবী কোনো বাস্তব ঐতিহাসিক সত্য নয়; বরং একটি স্থানীয় প্রাকৃতিক দুর্যোগ কীভাবে মানবীয় কল্পনার আশ্রয়ে বিভিন্ন সংস্কৃতিতে স্থানান্তরিত হয়ে অলৌকিক রূপ ধারণ করেছে, এটি তারই প্রকৃষ্ট উদাহরণ [6]

নূহ

আব্রাহামিক ধর্মে নূহের প্রাগৈতিহাসিক মহাপ্লাবন এবং কোরআনের বয়ান

যেহেতু আমাদের ভৌগোলিক ও সামাজিক অবস্থান মূলত মুসলিম অধ্যুষিত অঞ্চলে, তাই আমাদের কাছে মহাপ্লাবনের ইসলামি সংস্করণ বা নূহ নবীর গল্পটিই সর্বাধিক প্রচলিত ও পরিচিত। কোরআন, হাদিস ও অন্যান্য ইসলামি ধর্মগ্রন্থে দাবি করা হয়েছে যে, নূহের সময়ে পুরো পৃথিবী একটি সর্বগ্রাসী বন্যায় প্লাবিত হয়েছিল, যার পানি পৃথিবীর সর্বোচ্চ পর্বতশৃঙ্গগুলোকেও তলিয়ে দিয়েছিল। এই গল্পের মূল ভিত্তি হলো—ঈশ্বরের (আল্লাহর) প্রতি মানুষের অবাধ্যতা ও অবিশ্বাস। জেনেসিস এবং কোরআনের বর্ণনা অনুযায়ী, মানুষের পাপাচার দেখে ঈশ্বর সিদ্ধান্ত নেন যে পৃথিবীর সমস্ত অবিশ্বাসী (কাফের) মানুষকে তিনি পৃথিবীর বুক থেকে সম্পূর্ণ নিশ্চিহ্ন করে দেবেন। এই ধ্বংসযজ্ঞে শুধু অবাধ্য মানুষই নয়, বরং নির্বাক জীবজন্তু, গাছপালা এবং আকাশচারী পাখিদেরও ঢালাওভাবে হত্যার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। একমাত্র নূহ নবী, যিনি ঈশ্বরের অনুগত ছিলেন, তাঁকে এবং তাঁর পরিবারকে একটি বিশালাকার নৌকা নির্মাণের মাধ্যমে রক্ষা করার কথা বলা হয়, যেখানে পৃথিবীর সমস্ত প্রাণিকুলের একটি করে জোড়া তুলে নেওয়া হবে ভবিষ্যৎ বংশবৃদ্ধির জন্য।

কোরআনের বয়ান অনুযায়ী, নূহ নবী দীর্ঘদিন তাঁর সম্প্রদায়ের অবিশ্বাসীদের ধর্মীয় দাওয়াত দিয়েছিলেন। কিন্তু যখন তিনি বেশিরভাগ মানুষকে ধর্মান্তরিত করতে ব্যর্থ হন, তখন তিনি স্বয়ং আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করেন যেন এই প্লাবনে একজন অবিশ্বাসীও প্রাণে বেঁচে না যায়। অর্থাৎ, এই গণবিধ্বংসী প্রার্থনায় নারী, শিশু, বৃদ্ধ, প্রতিবন্ধী এবং নিরীহ প্রাণীদের জীবনের কোনো মূল্য বা করুণার স্থান ছিল না। নূহ নবীর সেই ভয়াবহ প্রার্থনাটি কোরআনে স্পষ্টভাবে উল্লেখ আছে: নূহ বলল, ‘হে আমার রব্ব! ভূপৃষ্ঠে বসবাসকারী কাফিরদের একজনকেও তুমি রেহাই দিও না।[7]

নূহ বলল, ‘হে আমার রব্ব! ভূপৃষ্ঠে বসবাসকারী কাফিরদের একজনকেও তুমি রেহাই দিও না।
— Taisirul Quran
নূহ আরও বলেছিলঃ হে আমার রাব্ব! পৃথিবীতে কাফিরদের মধ্য হতে কোন গৃহবাসীকে অব্যাহতি দিওনা।
— Sheikh Mujibur Rahman
আর নূহ বলল, ‘হে আমার রব! যমীনের উপর কোন কাফিরকে অবশিষ্ট রাখবেন না’।
— Rawai Al-bayan
নূহ্ আরও বলেছিলেন, ‘হে আমার রব! যমীনের কাফিরদের মধ্য থেকে কোনো গৃহবাসীকে অব্যাহতি দেবেন না [১]।
— Dr. Abu Bakr Muhammad Zakaria

নূহের এই প্রার্থনায় সাড়া দিয়ে আল্লাহ তাঁকে পুরস্কৃত করেন এবং অন্যদের ডুবিয়ে মারার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেন [8]

সৎকর্মশীলদেরকে আমি এভাবেই প্রতিদান দিয়ে থাকি।
— Taisirul Quran
এভাবেই আমি সৎ কর্মশীলদেরকে পুরস্কৃত করে থাকি।
— Sheikh Mujibur Rahman
নিশ্চয় এভাবে আমি সৎকর্মশীলদের পুরস্কার দিয়ে থাকি।
— Rawai Al-bayan
নিশ্চয় আমরা এভাবে মুহসিনদেরকে পুরস্কৃত করে থাকি,
— Dr. Abu Bakr Muhammad Zakaria

সে ছিল আমার মু’মিন বান্দাহদের একজন।
— Taisirul Quran
সে ছিল আমার মু’মিন বান্দাদের অন্যতম।
— Sheikh Mujibur Rahman
নিশ্চয় সে আমার মুমিন বান্দাদের একজন।
— Rawai Al-bayan
নিশ্চয় তিনি ছিলেন আমাদের মুমিন বান্দাদের অন্যতম।
— Dr. Abu Bakr Muhammad Zakaria

অতঃপর অন্যদের আমি ডুবিয়ে দিয়েছিলাম।
— Taisirul Quran
অবশিষ্ট সকলকে আমি নিমজ্জিত করেছিলাম।
— Sheikh Mujibur Rahman
তারপর আমি অন্যদের ডুবিয়ে দিয়েছিলাম।
— Rawai Al-bayan
তারপর অন্য সকলকে আমরা নিমজ্জিত করেছিলাম।
— Dr. Abu Bakr Muhammad Zakaria

মহাপ্লাবন সংঘটিত হওয়ার প্রক্রিয়া সম্পর্কে কোরআনে বলা হয়েছে যে, আকাশ থেকে প্রবল বৃষ্টিপাত এবং মাটি থেকে উৎসারিত জলধারার মাধ্যমে এই বন্যা সৃষ্টি করা হয়েছিল: ‘ফলে আমরা উন্মুক্ত করে দিলাম আকাশের দ্বারসমূহ প্রবল বর্ষণশীল বারিধারার মাধ্যমে, এবং মাটি থেকে উৎসারিত করলাম ঝর্ণাসমূহ; ফলে সমস্ত পানি মিলিত হল এক পরিকল্পনা অনুসারে।’ [9]

আর যমীন থেকে উৎসারিত করেছিলাম ঝর্ণাধারা, অতঃপর (সব) পানি মিলিত হল যে পরিমাণ (পূর্বেই) নির্ধারিত করা হয়েছিল।
— Taisirul Quran
এবং মাটি হতে উৎসারিত করলাম প্রস্রবণ। অতঃপর সকল পানি মিলিত হল এক পরিকল্পনা অনুসারে।
— Sheikh Mujibur Rahman
আর ভূমিতে আমি ঝর্না উৎসারিত করলাম। ফলে সকল পানি মিলিত হল নির্ধারিত নির্দেশনা অনুসারে।
— Rawai Al-bayan
এবং মাটি থেকে উৎসারিত করলাম ঝর্ণাসমূহ; ফলে সমস্ত পানি মিলিত হল এক পরিকল্পনা অনুসারে [১]
— Dr. Abu Bakr Muhammad Zakaria

তখন আমি আকাশের দরজাগুলো খুলে দিয়ে মুষলধারায় বৃষ্টি বর্ষিয়েছিলাম।
— Taisirul Quran
ফলে আমি উন্মুক্ত করে দিলাম আকাশের দ্বার, প্রবল বারি বর্ষণে।
— Sheikh Mujibur Rahman
ফলে আমি বর্ষণশীল বারিধারার মাধ্যমে আসমানের দরজাসমূহ খুলে দিলাম।
— Rawai Al-bayan
ফলে আমরা উন্মুক্ত করে দিলাম আকাশের দ্বারসমূহ প্রবল বর্ষণশীল বারিধারার মাধ্যমে,
— Dr. Abu Bakr Muhammad Zakaria

এরপর নৌকায় প্রাণী ও পরিবার তোলার নির্দেশ এবং নূহের পুত্রের মৃত্যুর দৃশ্য বর্ণিত হয়েছে। নূহ তাঁর পুত্রকে নৌকায় উঠতে বললে সে পাহাড়ে আশ্রয় নেওয়ার কথা বলে, কিন্তু বন্যার বিশাল ঢেউ তাকে ভাসিয়ে নিয়ে যায়: “সে বলল, ‘আমি এমন এক পর্বতে আশ্রয় নেব যা আমাকে পানি হতে রক্ষা করবে।’ তিনি বললেন, ‘আজ আল্লাহর হুকুম থেকে রক্ষা করার কেউ নেই…’ আর তরঙ্গ তাদের মধ্যে অন্তরায় হয়ে গেল, ফলে সে নিমজ্জিতদের অন্তর্ভুক্ত হল।” পরিশেষে জল নেমে গেলে নৌকাটি জুদী পর্বতে এসে থামে এবং বলা হয়, “যালিম সম্প্রদায়ের জন্য ধ্বংস।” [10]

শেষে যখন আমার নির্দেশ এসে গেল, আর তন্দুর (পানিতে) উথলে উঠল, আমি বললাম, ‘প্রত্যেক শ্রেণীর যুগলের দু’টি তাতে তুলে নাও আর তোমার পরিবার পরিজনকে, তাদের ছাড়া যাদের ব্যাপারে আগেই ঘোষণা দেয়া হয়েছে। আর যারা ঈমান এনেছে তাদেরকেও (তুলে নাও)। তার সঙ্গে ঈমান এনেছিল খুব অল্প কয়েকজনই।
— Taisirul Quran
অবশেষে যখন আমার ফরমান এসে পৌঁছল এবং যমীন হতে পানি উথলে উঠতে লাগল, আমি বললামঃ প্রত্যেক শ্রেণীর প্রাণী হতে একটি নর এবং একটি মাদী অর্থাৎ দু’ দু’টি করে তাতে (নৌকায়) উঠিয়ে নাও এবং নিজ পরিবারবর্গকেও, তাকে ছাড়া যার সম্বন্ধে পূর্বে নির্দেশ হয়ে গেছে, এবং অন্যান্য মু’মিনদেরকেও। আর অল্প কয়েকজন ছাড়া কেহই তাঁর সাথে ঈমান আনেনি।
— Sheikh Mujibur Rahman
অবশেষে যখন আমার আদেশ আসল এবং চুলা উথলে উঠল*, আমি বললাম, ‘তুমি তাতে তুলে নাও প্রত্যেক শ্রেণী থেকে জোড়া জোড়া** এবং যাদের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত হয়ে গিয়েছে তাদের ছাড়া তোমার পরিবারকে এবং যারা ঈমান এনেছে তাদেরকে। আর তার সাথে অল্পসংখ্যকই ঈমান এনেছিল। * التنور এর আরেকটি অর্থ হল ভূপৃষ্ঠ। প্লাবন শুরু হওয়ার আগে ভূপৃষ্ঠের সবখান দিয়ে পানি উৎসারিত হতে লাগল।
— Rawai Al-bayan
অবশেষে যখন আমাদের আদেশ আসল এবং উনান উথলে উঠল [১]; আমরা বললাম, এতে উঠিয়ে নিন প্রত্যেক শ্রেণীর যুগলের দুটি [২], যাদের বিরুদ্ধে পূর্ব-সিদ্ধান্ত হয়েছে তারা ছাড়া আপনার পরিবার-পরিজনকে এবং যারা ঈমান এনেছে তাদেরকে। আর তার সাথে ঈমান এনেছিল কেবল অল্প কয়েকজন [৩]।
— Dr. Abu Bakr Muhammad Zakaria

পর্বত সদৃশ তরঙ্গমালার মধ্য দিয়ে তা তাদেরকে নিয়ে বয়ে চলল। তখন নূহ তার পুত্রকে- যে তাদের থেকে আলাদা হয়ে গিয়েছিল- ডাক দিয়ে বলল, ‘হে আমার পুত্র! আমাদের সঙ্গে আরোহণ কর, কাফিরদের সঙ্গে থেক না।
— Taisirul Quran
আর সেই নৌকাটি তাদেরকে নিয়ে পবর্ততুল্য তরঙ্গের মধ্যে চলতে লাগল, আর নূহ স্বীয় পুত্রকে ডাকতে লাগল এবং সে ছিল ভিন্ন স্থানে; হে আমার পুত্র! আমাদের সাথে সাওয়ার হয়ে যাও এবং কাফিরদের সাথে থেকনা।
— Sheikh Mujibur Rahman
আর তা পাহাড়সম ঢেউয়ের মধ্যে তাদেরকে নিয়ে চলছিল এবং নূহ তার পুত্রকে ডাক দিল, আর সে ছিল আলাদা স্থানে- ‘হে আমার পুত্র, আমাদের সাথে আরোহণ কর এবং কাফিরদের সাথে থেকো না’।
— Rawai Al-bayan
আর পর্বত-প্রমাণ তরঙ্গের মধ্যে এটা তাদেরকে নিয়ে বয়ে চলল; নূহ তাঁর পুত্রকে, যে পৃথক ছিল, ডেকে বললেন, ‘হে আমার প্রিয় পুত্র! আমাদের সাথে আরোহণ কর এবং কাফিরদের সঙ্গী হয়ো না।’
— Dr. Abu Bakr Muhammad Zakaria

সে (অর্থাৎ নূহের পুত্র) বলল, ‘আমি এক্ষুণি পাহাড়ে আশ্রয় নেব যা আমাকে পানি থেকে রক্ষা করবে।’ নূহ বলল, ‘আজ আল্লাহর হুকুম থেকে কোন কিছুই রক্ষা করতে পারবে না, অবশ্য আল্লাহ যার প্রতি দয়া করবেন সে রক্ষা পাবে।’ অতঃপর ঢেউ তাদের দু’জনার মাঝে আড়াল করল আর সে ডুবে যাওয়া লোকেদের মধ্যে শামিল হয়ে গেল।
— Taisirul Quran
সে বললঃ আমি এখনই কোন পাহাড়ে আশ্রয় গ্রহণ করব যা আমাকে পানি হতে রক্ষা করবে। সে (নূহ) বললঃ আজ আল্লাহর শাস্তি হতে কেহই রক্ষাকারী নেই, কিন্তু যার উপর তিনি দয়া করেন। ইতোমধ্যে তাদের উভয়ের মাঝে একটি তরঙ্গ অন্তরাল হয়ে পড়ল, অতঃপর সে নিমজ্জিতদের অন্তর্ভুক্ত হল।
— Sheikh Mujibur Rahman
সে বলল, ‘অচিরেই আমি একটি পাহাড়ে আশ্রয় নেব, যা আমাকে পানি থেকে রক্ষা করবে’। সে (নূহ) বলল, ‘যার প্রতি আল্লাহ দয়া করেছেন সে ছাড়া আজ আল্লাহর আদেশ থেকে কোন রক্ষাকারী নেই’। এরপর তাদের উভয়ের মধ্যে ঢেউ অন্তরায় হয়ে গেল। অতঃপর সে নিমজ্জিতদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে গেল ।
— Rawai Al-bayan
সে বলল, ‘আমি এমন এক পর্বতে আশ্রয় নেব যা আমাকে পানি হতে রক্ষা করবে।’ তিনি বললেন, ‘আজ আল্লাহ্‌র হুকুম থেকে রক্ষা করার কেউ নেই, তবে যাকে আল্লাহ্‌ দয়া করবেন সে ছাড়া।’ আর তরঙ্গ তাদের মধ্যে অন্তরায় হয়ে গেল, ফলে সে নিমজ্জিতদের অন্তর্ভুক্ত হল [১]।
— Dr. Abu Bakr Muhammad Zakaria

অতঃপর বলা হল, ‘হে যমীন! তোমার পানি গিলে ফেল, আর হে আকাশ, থাম।’ অতঃপর পানি যমীনে বসে গেল, কার্য সমাপ্ত হল, নৌকা জুদী পর্বতে এসে ভিড়ল, আর বলা হল- ‘যালিম লোকেরা ধ্বংস হোক!’
— Taisirul Quran
আর আদেশ হলঃ হে যমীন! স্বীয় পানি শুষে নাও, এবং হে আসমান! থেমে যাও। তখন পানি কমে গেল ও ঘটনার পরিসমাপ্তি ঘটল, আর নৌকা জূদী (পাহাড়) এর উপর এসে থামল। আর বলা হল, অন্যায়কারীরা আল্লাহর রাহমাত হতে দূরে।
— Sheikh Mujibur Rahman
আর বলা হল, ‘হে যমীন, তুমি তোমার পানি চুষে নাও, আর হে আসমান, বিরত হও’। অতঃপর পানি কমে গেল এবং (আল্লাহর) সিদ্ধান্ত বাস্তবায়িত হল, আর নৌকা জুদী পর্বতের উপর উঠল এবং ঘোষণা করা হল, ‘ধ্বংস যালিম কওমের জন্য’।
— Rawai Al-bayan
আর বলা হল, ‘হে যমীন! তুমি তোমার পানি গ্রাস করে নাও, হে আকাশ! ক্ষান্ত হও।’ আর পানি হ্রাস করা হল এবং সিদ্ধান্ত বস্তবায়িত হল। আর নৌকা জুদী পর্বতের উপর স্থির হল [১] এবং বলা হল, ‘যালিম সম্প্রদায়ের জন্য ধ্বংস।’
— Dr. Abu Bakr Muhammad Zakaria

ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে এটিকে পাপের শাস্তি হিসেবে আখ্যায়িত করা হলেও, যৌক্তিক ও দার্শনিক মানদণ্ডে বিচার করলে এই আখ্যানে একটি গুরুতর স্ববিরোধিতা (Logical contradiction) পরিলক্ষিত হয়। কোরআনের অন্য আয়াতগুলো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, মানুষের অবিশ্বাস বা অবাধ্যতার মূল কারণ স্বয়ং ঈশ্বরের পূর্বনির্ধারণ বা ‘তকদির’। কোরআনে সুস্পষ্টভাবে দাবি করা হয়েছে যে, আল্লাহ নিজেই অবিশ্বাসীদের অন্তর ও কান মোহর বা সিলগালা করে দিয়েছেন: “আল্লাহ তাদের হৃদয়সমূহ ও তাদের শ্রবণশক্তির উপর মোহর করে দিয়েছেন, এবং তাদের দৃষ্টির উপর রয়েছে আবরণ। আর তাদের জন্য রয়েছে মহাশাস্তি।” [11]

আল্লাহ তাদের অন্তর ও কানের উপর মোহর করে দিয়েছেন,আর তাদের চোখে আছে আবরণ আর তাদের জন্য আছে মহা শাস্তি।
Taisirul Quran
আল্লাহ তাদের অন্তরসমূহের উপর ও তাদের কর্ণসমূহের উপর মোহরাংকিত করে দিয়েছেন এবং তাদের চক্ষুসমূহের উপর আবরণ পড়ে আছে এবং তাদের জন্য রয়েছে ভয়ানক শাস্তি।
Sheikh Mujibur Rahman
আল্লাহ তাদের অন্তরে এবং তাদের কানে মোহর লাগিয়ে দিয়েছেন এবং তাদের চোখসমূহে রয়েছে পর্দা। আর তাদের জন্য রয়েছে মহাআযাব।
Rawai Al-bayan
আল্লাহ্‌ তাদের হৃদয়সমূহ ও তাদের শ্রবণশক্তির উপর মোহর করে দিয়েছেন (১), এবং তাদের দৃষ্টির উপর রয়েছে আবরণ। আর তাদের জন্য রয়েছে মহাশাস্তি।
Dr. Abu Bakr Muhammad Zakaria

তাছাড়া, গোটা মহাবিশ্ব যেহেতু সর্বশক্তিমান ঈশ্বরের নিরঙ্কুশ নিয়ন্ত্রণাধীন, তাই তাঁর ইচ্ছা বা সিদ্ধান্ত ছাড়া কারও পক্ষে স্বাধীনভাবে পথভ্রষ্ট হওয়া সম্ভব নয়। এটি কোরআনের দ্বারা সরাসরি সমর্থিত: “আল্লাহ যাকে সৎপথে চালান, সেই সৎপথ প্রাপ্ত এবং তিনি যাকে পথভ্রষ্ট করেন, আপনি কখনও তার জন্যে পথপ্রদর্শনকারী ও সাহায্যকারী পাবেন না।” [12]

আল্লাহ যাকে সৎপথে চালান, সেই সৎপথ প্রাপ্ত এবং তিনি যাকে পথভ্রষ্ট করেন, আপনি কখনও তার জন্যে পথপ্রদর্শনকারী ও সাহায্যকারী পাবেন না।

“যাকে আল্লাহ পথ দেখাবেন, সেই পথপ্রাপ্ত হবে। আর যাকে তিনি পথ ভ্রষ্ট করবেন, সে হবে ক্ষতিগ্রস্ত।” [13]

যাকে আল্লাহ পথ দেখাবেন, সেই পথপ্রাপ্ত হবে। আর যাকে তিনি পথ ভ্রষ্ট করবেন, সে হবে ক্ষতিগ্রস্ত

যুক্তি ও প্রমাণের মানদণ্ডে এটি একটি অনিবার্য দার্শনিক সংকট তৈরি করে: যদি সর্বনিয়ন্তা ঈশ্বর নিজেই পূর্বনির্ধারিতভাবে (Predestination) মানুষের অন্তর সিলগালা করে দেন এবং তাদের পথভ্রষ্ট করেন, তবে সেই অবাধ্যতার দায়ভার সম্পূর্ণভাবে মানুষের ওপর চাপিয়ে নারী, শিশু ও নির্বাক প্রাণিকুলসহ সমগ্র পৃথিবীকে একটি বৈশ্বিক বন্যায় ডুবিয়ে মারা চরম অন্যায্য। এটি ঈশ্বরের তথাকথিত ‘পরম করুণাময়’ ও ‘ন্যায়বিচারক’ ধারণার সাথে সরাসরি সাংঘর্ষিক। যুক্তির আলোকে এটি প্রতীয়মান হয় যে, এই আখ্যানটি কোনো সর্বজ্ঞানী সত্তার নিখুঁত ন্যায়বিচার নয়; বরং এটি আদিম মানুষের প্রতিশোধপরায়ণ মানসিকতা, অজ্ঞতা এবং স্থানীয় বন্যার ভয়াবহ অভিজ্ঞতার ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠা একটি পৌরাণিক রূপকথারই সম্প্রসারিত রূপ।


বৈশ্বিক প্লাবনের বৈজ্ঞানিক অসারতাঃ জলবায়ু ও আবহাওয়াবিজ্ঞান

ধর্মগ্রন্থগুলোর আখ্যান অনুযায়ী, নূহ নবীকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল একটি বিশালাকার নৌকা নির্মাণের, যেখানে তিনি দীর্ঘকালের জন্য পর্যাপ্ত খাদ্যদ্রব্য মজুত করবেন এবং পৃথিবীর প্রতিটি প্রাণী, পাখি ও কীট-পতঙ্গের এক জোড়া করে আশ্রয় দেবেন। ঈশ্বরের পরিকল্পনা ছিল এক সর্বগ্রাসী মহাপ্লাবন বা বন্যার মাধ্যমে সমস্ত অবিশ্বাসী মানুষ ও অবাধ্য প্রাণিকুলকে ধ্বংস করা। বাইবেলের জেনেসিস এবং অন্যান্য ধর্মীয় বর্ণনা মতে, চল্লিশ দিন ও চল্লিশ রাত ধরে প্রবল বৃষ্টিপাত হয় এবং বন্যার জল এত উঁচুতে পৌঁছায় যে, পৃথিবীর সমস্ত আকাশের নিচে যত উঁচু পাহাড়-পর্বত ছিল, সবই জলে ঢাকা পড়ে যায়। জল নেমে যাওয়ার পর বেঁচে থাকা প্রাণীরা পুনরায় বংশবৃদ্ধি করে পৃথিবীকে আবাদ করে।

বিজ্ঞান ও যুক্তির নিরিখে এই মহাপ্লাবনের কাহিনী থেকে দুটি মৌলিক গাণিতিক ও বাস্তবসম্মত প্রশ্ন উত্থাপিত হয়:

১. এভারেস্ট ডুবানোর মতো পানি কি পৃথিবীতে আছে?
মাউন্ট এভারেস্টের উচ্চতা প্রায় 8,848 মিটার। পুরো পৃথিবীকে এই উচ্চতা পর্যন্ত পানিতে তলিয়ে দিতে বর্তমান সমুদ্রপৃষ্ঠের চেয়ে অন্তত ৩ গুণ বেশি পানির প্রয়োজন।

বৈজ্ঞানিক তথ্যমতে, বায়ুমণ্ডলের সমস্ত জলীয় বাষ্প যদি একযোগে ঘনীভূত হয়ে বৃষ্টি হিসেবে ঝরে, তবে তা পৃথিবীকে মাত্র 2.5 সেন্টিমিটার (১ ইঞ্চি) গভীরতায় ঢাকতে পারবে [14]। ভূগর্ভস্থ পানি বা মেরু অঞ্চলের সব বরফ গললেও তা এভারেস্টের উচ্চতার ধারেকাছে পৌঁছানো অসম্ভব।
২. নৌকায় কি সব প্রাণীর জোড়া রাখা সম্ভব?
বর্তমানে পৃথিবীতে আবিষ্কৃত প্রজাতির সংখ্যা প্রায় 87,00,000 (৮৭ লক্ষ)। এই বিপুল সংখ্যক প্রাণীর প্রত্যেকের এক জোড়া করে একটি নৌকায় রাখা বা রক্ষণাবেক্ষণ করা গাণিতিকভাবে অসম্ভব।
বাস্তব সমস্যা: প্রতিটি প্রজাতির জন্য আলাদা খাদ্য সরবরাহ, বর্জ্য নিষ্কাশন এবং নির্দিষ্ট তাপমাত্রার ভারসাম্য রক্ষা করা একটি প্রাচীন কাঠের নৌকার কাঠামোয় অসম্ভব ছিল। এছাড়া কোটি কোটি পোকামাকড়ের সংকুলান ও তাদের অস্তিত্ব রক্ষা করাও জৈবিকভাবে অসম্ভব [15]

প্রথম প্রশ্নের অর্থাৎ জলবায়ুগত ও ভূতাত্ত্বিক সম্ভাবনার গাণিতিক সমাধান করা যাক। একটি বৈশ্বিক মহাপ্লাবন ঘটাতে হলে ওই বিপুল পরিমাণ জল কোথা থেকে এসেছিল এবং বন্যা শেষে তা কোথায় গেল—এটি একটি মৌলিক বৈজ্ঞানিক প্রশ্ন। বিজ্ঞান অনুযায়ী, পৃথিবীর মোট জলের পরিমাণ একটি বদ্ধ চক্র বা Water Cycle-এর মধ্যে আবর্তিত হয়। গোটা পৃথিবীজুড়ে একই সাথে বন্যা হওয়ার মতো বিশাল জলরাশি হঠাৎ মাটি শুষে নিতে পারে না, আবার তা মহাশূন্যেও হারিয়ে যেতে পারে না। অতিরিক্ত জলকে অবশ্যই বাষ্পীভূত হয়ে বায়ুমণ্ডলে (Atmosphere) ফিরে যেতে হবে। এর অর্থ হলো, ওই মহাপ্লাবনের সমস্ত জল বর্তমানে বায়ুমণ্ডলেই জলীয় বাষ্প হিসেবে জমা থাকার কথা। সুতরাং, আবহমণ্ডলের সমস্ত বাষ্প যদি জলবিন্দুতে ঘনীভূত হয়ে পৃথিবীর উপরে ঝরে পড়ত, তাহলে সর্বোচ্চ পাহাড়গুলোকে ঢেকে দিয়ে আরেকটি মহাপ্লাবন হতে পারত। কিন্তু তা কি সম্ভব?

আবহাওয়াবিজ্ঞানের প্রামাণিক তথ্য থেকে জানা যায়, পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে প্রতি বর্গমিটারের ওপর যে বায়ুর স্তম্ভ রয়েছে, তার মধ্যে গড়ে ১৬ কিলোগ্রাম বাষ্প থাকে এবং কোনো ক্ষেত্রেই তা সর্বোচ্চ ২৫ কিলোগ্রামের বেশি নয়। যদি ধরে নেওয়া হয় যে, বায়ুমণ্ডলের এই সম্পূর্ণ জলীয় বাষ্প একযোগে ঘনীভূত হয়ে পৃথিবীর বুকে বৃষ্টি হিসেবে ঝরে পড়ল, তবে সেই জলের গভীরতা কতটা হবে? গাণিতিক হিসাবটি অত্যন্ত সরল: ২৫ কিলোগ্রাম বা ২৫,০০০ গ্রাম জল আয়তনের দিক থেকে ২৫,০০০ ঘন-সেন্টিমিটার (cm3cm^3) জলের সমান। এক বর্গমিটার এলাকার ক্ষেত্রফল হলো ×=,১০০ \times ১০০ = ১০,০০০ বর্গসেন্টিমিটার (cm2cm^2)। এখন এই আয়তনকে ক্ষেত্রফল দিয়ে ভাগ করলে আমরা বৃষ্টির জলের সম্ভাব্য সর্বোচ্চ গভীরতা পাই: ,÷,=.২৫,০০০ \div ১০,০০০ = ২.৫ সেন্টিমিটার। অর্থাৎ, বায়ুমণ্ডলের সমস্ত জল একযোগে ঝরে পড়লেও বন্যার জলস্তর মাত্র ২.৫ সেন্টিমিটার (প্রায় ১ ইঞ্চি) উঁচুতে উঠতে পারত। এটি পৃথিবীর মাটি বিন্দুমাত্র জল শোষণ না করলেই কেবল সম্ভব। বাইবেলের বর্ণনা অনুযায়ী, মহাপ্লাবন পৃথিবীর পুরো উপরিভাগকে একযোগে প্লাবিত করে দিয়েছিল, যার ফলে কোনো একটি স্থান অন্য স্থান থেকে আর্দ্রতা “ধার” করতে পারত না।

নূহ 1

ধর্মগ্রন্থের বর্ণনা অনুযায়ী, এই বন্যায় মাউন্ট এভারেস্টের মতো পর্বতশৃঙ্গও তলিয়ে গিয়েছিল, যার উচ্চতা প্রায় ৯ কিলোমিটার (৯,০০০ মিটার)। অথচ আমাদের গাণিতিক হিসাব অকাট্যভাবে প্রমাণ করছে যে, বন্যার জল ২.৫ সেন্টিমিটারের বেশি হওয়া কোনোভাবেই সম্ভব নয়; পর্বতশৃঙ্গ ডোবাতে হলে এই জলস্তরকে বাস্তবতার চেয়ে প্রায় ৩,৬০,০০০ গুণ বেশি হতে হতো। এমনকি, ধর্মগ্রন্থের দাবি অনুযায়ী যদি ৪০ দিন ধরে একটানা বৃষ্টি হয়েও থাকে, তবে ওই ২.৫ সেন্টিমিটার জল ৪০ দিনে ভাগ করলে দৈনিক অধঃক্ষেপণ দাঁড়ায় মাত্র ০.৬ মিলিমিটারের কাছাকাছি। এটি কোনো প্রলয়ংকরী ঝড় বা বন্যা নয়, বরং এটি কেবলই একটি অত্যন্ত মৃদু ঝিরঝিরে বৃষ্টি। শরৎকালের সাধারণ একটি বৃষ্টির দিনেও এর চেয়ে বহুগুণ বেশি জল বর্ষিত হয়। সুতরাং, আবহাওয়াবিজ্ঞানের কঠোর সমীকরণে এটি প্রশ্নাতীতভাবে প্রমাণিত যে, সর্বোচ্চ পর্বতশৃঙ্গকে ডুবিয়ে দেওয়ার মতো কোনো বৈশ্বিক মহাপ্লাবনের ধারণাটি বৈজ্ঞানিকভাবে শতভাগ অসম্ভব ও অবাস্তব [16]


নূহের নৌকার গাণিতিক, জীবতাত্ত্বিক ও কাঠামোগত অসারতা

দ্বিতীয় যে মৌলিক প্রশ্নটি এই মহাপ্লাবনের আখ্যানকে প্রশ্নবিদ্ধ করে, তা হলো নৌকার ধারণক্ষমতা এবং জীবতাত্ত্বিক বাস্তবতা। ধর্মীয় গ্রন্থগুলোর দাবি অনুযায়ী, নূহ নবীকে পৃথিবীর সমস্ত প্রাণিকুলের একটি করে জোড়া নৌকায় স্থান দিতে হয়েছিল। এই দাবিটির সত্যতা যাচাই করতে হলে প্রথমে আমাদের নৌকার আকার এবং তাতে উপলব্ধ বাসযোগ্য স্থানের গাণিতিক হিসেব করতে হবে। বাইবেলের বর্ণনা অনুযায়ী, নূহের নৌকাটি ছিল তিনতলা বিশিষ্ট; যার দৈর্ঘ্য ছিল ৩০০ হাত এবং প্রস্থ ছিল ৫০ হাত। পশ্চিম এশিয়ার প্রাচীন পরিমাপ অনুযায়ী এক হাতের (Cubit) দৈর্ঘ্য ছিল প্রায় ৪৫ সেন্টিমিটার বা ০.৪৫ মিটার। এই মাপ মেট্রিক পদ্ধতিতে রূপান্তর করলে নৌকার প্রতিটি তলার দৈর্ঘ্য দাঁড়ায় ×.=৩০০ \times ০.৪৫ = ১৩৫ মিটার এবং প্রস্থ দাঁড়ায় ×.=.৫০ \times ০.৪৫ = ২২.৫ মিটার। সুতরাং, প্রতিটি তলার ক্ষেত্রফল ছিল ×.=,.১৩৫ \times ২২.৫ = ৩,০৩৭.৫ বর্গমিটার। যেহেতু নৌকাটি তিনতলা ছিল, তাই নৌকায় মোট বাসযোগ্য স্থান ছিল প্রায় ,.×=,.৩,০৩৭.৫ \times ৩ = ৯,১১২.৫ বর্গমিটার (পূর্ণসংখ্যায় প্রায় ৯,১২০ বর্গমিটার)।

এবার পৃথিবীর প্রাণীবৈচিত্র্যের দিকে তাকানো যাক। আধুনিক জীববিজ্ঞান ও প্রাণিবিজ্ঞানের তথ্যমতে, পৃথিবীতে বর্তমানে স্তন্যপায়ী প্রাণীর প্রজাতি রয়েছে ৬,৪০০-এর বেশি। তর্কের খাতিরে যদি ধরেও নিই যে সেই প্রাচীনকালে স্তন্যপায়ী প্রজাতির সংখ্যা ৩,৫০০ ছিল, তবুও ৯,১২০ বর্গমিটার জায়গায় প্রতিটি স্তন্যপায়ী জোড়ার জন্য বরাদ্দ থাকে মাত্র ,÷,.৯,১২০ \div ৩,৫০০ \approx ২.৬ বর্গমিটার জায়গা। হাতি, গণ্ডার, জিরাফ বা জলহস্তীর মতো বিশাল আকৃতির প্রাণীদের জন্য এইটুকু জায়গা কতটা অবাস্তব, তা সহজেই অনুমেয়। কিন্তু নৌকায় শুধু স্তন্যপায়ীরাই ছিল না; সেখানে আরও স্থান দিতে হতো প্রায় ১৩,০০০ প্রজাতির পাখি, ৩,৫০০ প্রজাতির সরীসৃপ, ১,৪০০ প্রজাতির উভচর প্রাণী, ১৬,০০০ প্রজাতির মাকড়সা এবং প্রায় ৩,৬০,০০০ প্রজাতির কীটপতঙ্গকে। এই বিপুল সংখ্যক ও বৈচিত্র্যময় প্রজাতির প্রাণীকে একজোড়া করে সেই নির্দিষ্ট নৌকায় স্থান দেওয়া স্থানিক ও গাণিতিকভাবে সম্পূর্ণ অসম্ভব।

এই গাণিতিক অসম্ভবতার পাশাপাশি প্রাণিভৌগোলিক বণ্টন বা বায়োজিয়োগ্রাফির (Biogeography) প্রশ্নটি এই আখ্যানকে আরও অবাস্তব করে তোলে। দক্ষিণ আমেরিকার ধীরগতির স্লথ, অস্ট্রেলিয়ার ক্যাঙ্গারু কিংবা মেরু অঞ্চলের পেঙ্গুইনের মতো প্রাণীরা কীভাবে হাজার হাজার মাইল বিশাল সমুদ্র, পর্বত ও মরুভূমি পাড়ি দিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের নির্দিষ্ট একটি বিন্দুতে নূহের নৌকায় এসে পৌঁছাল, তার কোনো যৌক্তিক উত্তর ধর্মীয় বয়ানে নেই। একইভাবে, প্লাবন শেষে এই প্রাণীগুলো আবার কীভাবে কোনো প্রকার চিহ্ন বা মধ্যবর্তী জীবাশ্ম না রেখেই অত্যন্ত দ্রুততার সাথে নিজ নিজ আদি মহাদেশে ফিরে গেল, তা আধুনিক জীববিজ্ঞানের প্রতিষ্ঠিত নীতিগুলোর পরিপন্থী। যদি সকল প্রাণী মেসোপটেমীয় কোনো পাহাড় থেকেই পুনরায় সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ত, তবে আমরা ক্যাঙ্গারু বা কোয়ালার মতো প্রাণীদের হাড় বা জীবাশ্ম অস্ট্রেলিয়া যাওয়ার পথে এশিয়া বা ইউরোপেও খুঁজে পেতাম, যা বাস্তবে কোথাও নেই [17]

স্থান সংকুলান ছাড়াও এই আখ্যানে আরও গভীর লজিস্টিক ও বাস্তুতান্ত্রিক (Ecological) অসারতা রয়েছে। ধর্মীয় বর্ণনামতে, এই প্রাণীগুলোকে প্রায় ১৫০ দিন (মতান্তরে প্রায় এক বছর) নৌকায় আবদ্ধ থাকতে হয়েছিল। এতগুলো প্রাণীর জন্য মাসের পর মাস পর্যাপ্ত খাবার এবং বিশুদ্ধ পানীয় জলের ব্যবস্থা কীভাবে করা হয়েছিল? বিশেষ করে মাংসাশী প্রাণীদের (যেমন: সিংহ, বাঘ, নেকড়ে) খাদ্যের জন্য প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ মাংসের প্রয়োজন, যার অর্থ হলো তাদের খাবার জোগানোর জন্য নৌকায় অতিরিক্ত হাজার হাজার শিকারযোগ্য প্রাণী মজুত রাখতে হতো, যার জন্য আলাদা জায়গার প্রয়োজন। এছাড়া, লক্ষ লক্ষ প্রাণীর মলমূত্র পরিষ্কার করা, তাদের জন্য উপযুক্ত তাপমাত্রা ও বায়ু চলাচলের ব্যবস্থা করা এবং মাত্র আটজন মানুষের (নূহ ও তাঁর পরিবার) পক্ষে প্রতিদিন এই বিশাল প্রাণিকুলের যত্ন নেওয়া কোনো যৌক্তিক সমীকরণেই মেলা সম্ভব নয়।

খাদ্য সরবরাহের এই জটিলতার সাথে যুক্ত হয় ‘খাদক ও শিকারের প্যারাডক্স’ (Predator-Prey Paradox)। যদি প্রতিটি প্রাণীর মাত্র একটি করে জোড়া নৌকায় থাকত, তবে নৌকা থেকে নামার পর ক্ষুধার্ত বাঘ বা সিংহ যদি বেঁচে থাকা একমাত্র জোড়া হরিণ বা জেব্রাকে খেয়ে ফেলত, তবে সেই প্রজাতিটি তৎক্ষণাৎ পৃথিবী থেকে বিলুপ্ত হয়ে যেত। নতুন করে বাস্তুসংস্থান ও পর্যাপ্ত খাদ্যশৃঙ্খল গড়ে ওঠার আগে এই ভারসাম্য বজায় রাখা কোনোভাবেই সম্ভব ছিল না। এছাড়া পরজীবী ও রোগতত্ত্বের (Parasitology) বিষয়টি এখানে চরম অসংগতি তৈরি করে। অনেক রোগজীবাণু ও পরজীবী (যেমন: গুটিবসন্ত, পোলিও বা হুকওয়ার্ম) কেবল মানুষের শরীরে বেঁচে থাকে এবং বংশবৃদ্ধি করে। যদি প্লাবনে নূহের পরিবার ছাড়া আর কোনো মানুষ বেঁচে না থাকে, তবে এই রোগগুলো পৃথিবীতে টিকে থাকার জন্য নূহ ও তাঁর পরিবারের আটজন সদস্যকে একযোগে হাজার হাজার মরণব্যাধি ও পরজীবীর ‘জীবন্ত বাহক’ (Host) হিসেবে কাজ করতে হতো। চিকিৎসাবিজ্ঞানের বিচারে এটি কেবল অসম্ভবই নয়, বরং ওই আটজন মানুষের জন্য তাৎক্ষণিক মৃত্যুসম ছিল [18]

নূহ 3

জাহাজ নির্মাণ প্রকৌশলের দিক থেকেও এটি একটি অবাস্তব গল্প। ধর্মগ্রন্থের মাপকাঠিতে ওই বিশাল আকারের ভাসমান নৌকাটি প্রায় ২০,০০০ টন জল স্থানচ্যুত করতে পারত। আধুনিক নৌ-প্রকৌশল বিজ্ঞান অনুযায়ী, ইস্পাতের শক্ত কাঠামো ছাড়া কেবল কাঠ দিয়ে এত বড় জাহাজ নির্মাণ করা কাঠামোগতভাবে অসম্ভব। সমুদ্রের বিশাল ঢেউয়ের তোড়ে এত বড় কাঠের কাঠামো নিজস্ব ওজনেই ভেঙে পড়বে এবং জল ঢুকে তলিয়ে যাবে। মানব ইতিহাসে নির্মিত সবচেয়ে বড় কাঠের জাহাজগুলোরও (যেমন: ছয় মাস্তুল বিশিষ্ট ‘ওয়াইওমিং’) দৈর্ঘ্য নূহের নৌকার চেয়ে অনেক কম ছিল, এবং তা সত্ত্বেও ঢেউয়ের চাপে সেগুলোর কাঠের জোড়া খুলে গিয়ে প্রতিনিয়ত জল ঢুকত। সেই প্রাগৈতিহাসিক যুগে উন্নত প্রযুক্তি ছাড়া এমন অতিকায় জলযান নির্মাণের দাবি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন।


ভূতাত্ত্বিক সাক্ষ্যের অনুপস্থিতি ও অকাট্য প্রমাণের অভাব

ভূতত্ত্ব বিজ্ঞানের (Geology) মৌলিক নীতি অনুযায়ী, যদি কোনো সময়ে সমগ্র পৃথিবীজুড়ে মাউন্ট এভারেস্ট সমান উচ্চতার কোনো মহাপ্লাবন সংঘটিত হতো, তবে পৃথিবীর প্রতিটি মহাদেশের শিলাস্তরে তার একটি অকাট্য ও অভিন্ন স্বাক্ষর (Global Stratigraphic Signature) থাকার কথা। এমন প্রলয়ংকরী বন্যায় বিশাল পরিমাণে ভূমিক্ষয় এবং পলি সঞ্চয়ন (Sedimentation) ঘটার ফলে সমগ্র পৃথিবীজুড়ে একটি সুনির্দিষ্ট ও সমজাতীয় পাললিক শিলা বা পলিমাটির স্তর তৈরি হতো। কিন্তু আধুনিক ভূতাত্ত্বিক রেকর্ড বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, গত ৫,০০০ বছরের মধ্যে এমন কোনো বৈশ্বিক পলিস্তরের অস্তিত্ব পৃথিবীতে নেই। উল্টো, গ্র্যান্ড ক্যানিয়ন বা হিমালয়ের মতো পর্বতগুলোর ভূতাত্ত্বিক স্তর বিন্যাস পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায় যে, এগুলো লক্ষ-কোটি বছর ধরে ধীরগতির প্রাকৃতিক প্রক্রিয়ায় গঠিত হয়েছে এবং সেখানে কোনো আকস্মিক বৈশ্বিক জলমগ্নতার চিহ্ন মাত্র নেই। যদি ধর্মগ্রন্থের দাবি সত্যি হতো, তবে পৃথিবীর প্রতিটি প্রান্তের ভূতাত্ত্বিক স্তরে আমরা একই সময়ের মৃত সামুদ্রিক প্রাণীর জীবাশ্ম এবং পলির স্তর খুঁজে পেতাম, যা বাস্তবে অনুপস্থিত। আধুনিক ভূতত্ত্ববিদরা দ্ব্যর্থহীনভাবে প্রমাণ করেছেন যে, তথাকথিত ‘নোয়ার ফ্লাড’ বা নূহের মহাপ্লাবনের ভূতাত্ত্বিক দাবিটি ভৌত প্রমাণের নিরিখে কেবল একটি কল্পনাপ্রসূত মিথ ছাড়া আর কিছুই নয়। মাটির এই নীরব সাক্ষ্য ধর্মীয় আখ্যানের সেই অবাস্তব দাবিকে বিজ্ঞানের আদালতে সরাসরি মিথ্যা প্রতিপন্ন করে [1]


জেনেটিক বোটলনেক এবং বংশগতিবিদ্যার চরম পরাজয়

জীববিজ্ঞানের অন্যতম প্রধান শাখা হলো পপুলেশন জেনেটিক্স বা জনসমষ্টির বংশগতিবিদ্যা, যা এই মহাপ্লাবনের আখ্যানকে সম্পূর্ণ নস্যাৎ করে দেয়। ধর্মীয় দাবি অনুযায়ী, বর্তমান বিশ্বের কোটি কোটি প্রাণী মাত্র কয়েক হাজার বছর আগে নৌকায় রক্ষিত একজোড়া (কিংবা অল্প কয়েকটি) পূর্বপুরুষ থেকে উদ্ভূত হয়েছে। বিজ্ঞানের পরিভাষায় একে বলা হয় ‘জেনেটিক বোটলনেক’ (Genetic Bottleneck)। যদি প্রতিটি প্রজাতির মাত্র দুটি প্রাণী থেকে বর্তমান বিশাল জনসমষ্টি তৈরি হতো, তবে সেই প্রজাতির মধ্যে জিনগত বৈচিত্র্য (Genetic Diversity) প্রায় শূন্যের কোঠায় নেমে আসত। চরম অন্তপ্রজনন বা ইনব্রিডিংয়ের (Inbreeding) ফলে ক্ষতিকর প্রচ্ছন্ন মিউটেশনগুলো প্রকট হয়ে উঠত, যার পরিণতিতে প্রজাতিগুলো কয়েক প্রজন্মের মধ্যেই বিলুপ্ত হয়ে যাওয়ার কথা। বর্তমানে আমরা যদি চিতা বা উত্তরীয় এলিফ্যান্ট সিলের ডিএনএ বিশ্লেষণ করি, তবে তাদের ইতিহাসে ঘটে যাওয়া অতীতের জেনেটিক বোটলনেকের স্পষ্ট ছাপ দেখতে পাই। কিন্তু পৃথিবীর লক্ষ লক্ষ প্রজাতির ডিএনএ-তে ৪-৫ হাজার বছর আগের এমন কোনো সমকালীন বৈশ্বিক বোটলনেকের চিহ্ন পাওয়া যায় না। যদি নূহের গল্পের দাবি সত্যি হতো, তবে আজ পৃথিবীর প্রতিটি বিড়াল কিংবা প্রতিটি ঘোড়ার ডিএনএ প্রায় অভিন্ন হতো, যা বাস্তবে অসম্ভব। বংশগতিবিদ্যার এই অকাট্য সত্যটি প্রমাণ করে যে, মাত্র একজোড়া প্রাণী থেকে পৃথিবীর প্রাণবৈচিত্র্য নতুন করে শুরু হওয়ার গল্পটি বিবর্তনীয় ও জৈবিক কোনো মানদণ্ডেই টিকে না। এটি কেবল আধুনিক জীববিজ্ঞানের জ্ঞানশূন্য আদিম মানুষের একটি অবৈজ্ঞানিক কল্পনাপ্রসূত আখ্যান মাত্র [17]


বাস্তুসংস্থান ও লবণাক্ততার সংকট: জলজ ও উদ্ভিদজগতের অনিবার্য বিনাশ

ধর্মীয় আখ্যানে কেবল নৌকার ভেতরের প্রাণীদের রক্ষার কথা বলা হলেও, নৌকার বাইরের বিশাল ও জটিল বাস্তুসংস্থান (Ecosystem) যে এই মহাপ্লাবনে সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে যেত, তা অত্যন্ত সুকৌশলে এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে। বিজ্ঞান অনুযায়ী, সমুদ্রের লোনা জল এবং নদী-হ্রদের মিষ্টি জল যখন একীভূত হয়ে সমগ্র পৃথিবী ডুবিয়ে দেবে, তখন জলের লবণাক্ততার ভারসাম্য সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে যেত। এর ফলে অধিকাংশ মাছ এবং জলজ প্রাণী ‘অসমোটিক শক’-এর (Osmotic Shock) কারণে কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই মারা যেত; কারণ লোনা জলের মাছ মিষ্টি জলে এবং মিষ্টি জলের মাছ লোনা জলে বাঁচতে পারে না। লবণাক্ততার এই ভারসাম্যহীনতার পাশাপাশি হাইড্রোস্ট্যাটিক চাপের (Hydrostatic Pressure) বিষয়টিও সমুদ্রের তলদেশের প্রাণের জন্য চরম বিপর্যয় বয়ে আনত। যদি পানি এভারেস্টের উচ্চতা পর্যন্ত পৌঁছাত, তবে বর্তমান সমুদ্রপৃষ্ঠের গভীরতা আরও প্রায় ৯ কিলোমিটার বৃদ্ধি পেত। এই বিশাল জলস্তরের প্রচণ্ড চাপে সমুদ্রতলের অধিকাংশ জীব এবং প্রবাল প্রাচীর পিষ্ট হয়ে ধ্বংস হয়ে যেত। এছাড়া, সূর্যালোক সমুদ্রের মাত্র ২০০ মিটারের বেশি গভীরতায় কার্যকরভাবে পৌঁছাতে পারে না। ফলে সারা পৃথিবী এক বছর জলমগ্ন থাকলে সামুদ্রিক ফাইটোপ্ল্যাঙ্কটন ও শৈবালগুলো সালোকসংশ্লেষণ করতে না পেরে মারা যেত, যা বৈশ্বিক খাদ্যচক্রের ভিত্তিকেই ধসিয়ে দিত। শুধু তাই নয়, দীর্ঘ এক বছর লোনা জল ও কাদার স্তূপের নিচে স্থলজ উদ্ভিদের বীজ এবং চারাগুলো পচে ধ্বংস হয়ে যেত। প্লাবন শেষে পানি নেমে গেলেও মাটির অত্যধিক লবণাক্ততার কারণে নতুন করে কোনো বনভূমি বা শস্যক্ষেত্র গড়ে ওঠা উদ্ভিদবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে অসম্ভব ছিল [19]

নূহ 5

বিশেষ করে প্রবাল প্রাচীর বা কোরাল রিফ, যা সমুদ্রের বাস্তুসংস্থানের প্রাণকেন্দ্র, সেগুলো সূর্যালোকের অভাব এবং লবণের ঘনত্বের সামান্য পরিবর্তনেই নিশ্চিহ্ন হয়ে যেত। শুধু জলজ প্রাণীই নয়, উদ্ভিদজগতের বিনাশও ছিল অনিবার্য। ধর্মগ্রন্থের বর্ণনা অনুযায়ী প্রায় এক বছরকাল পৃথিবী জলমগ্ন থাকলে, স্থলজ উদ্ভিদগুলো অক্সিজেন এবং সালোকসংশ্লেষণের (Photosynthesis) অভাবে পচে ধ্বংস হয়ে যেত। এর অর্থ হলো, পানি নেমে যাওয়ার পর নৌকা থেকে বেরিয়ে আসা তৃণভোজী প্রাণীদের জন্য পৃথিবীতে কোনো খাদ্য অবশিষ্ট থাকত না। একটি মৃত ও পচা স্তূপের ওপর কোনো প্রাণিকুলের বেঁচে থাকা জৈবিকভাবে অসম্ভব। এই বাস্তুতান্ত্রিক বাস্তবতা প্রমাণ করে যে, মহাপ্লাবনের গল্পটি কোনো সর্বজ্ঞানী সত্তার পরিকল্পনা হতে পারে না, বরং এটি জীববিজ্ঞানের প্রাথমিক জ্ঞানহীন আদিম মানুষের একটি অদূরদর্শী উর্বর মস্তিষ্কের ফসল [20]


প্রত্নতাত্ত্বিক ধারাবাহিকতা এবং নিরবচ্ছিন্ন ইতিহাসের অখণ্ডতা

ঐতিহাসিক ও প্রত্নতাত্ত্বিক তথ্যের নিরিখে মহাপ্লাবনের দাবিটি খতিয়ে দেখলে এক চরম কালানুক্রমিক অসঙ্গতি ধরা পড়ে। বিভিন্ন ধর্মতাত্ত্বিক হিসাব ও বংশলতিকা অনুযায়ী, তথাকথিত এই মহাপ্লাবন সংঘটিত হওয়ার সম্ভাব্য সময়কাল ছিল আনুমানিক খ্রিস্টপূর্ব ২৩০০ থেকে ২৫০০ অব্দ। অথচ সমকালীন মানব ইতিহাসের রেকর্ড পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, সেই সময়ে প্রাচীন বিশ্বের প্রধান প্রধান সভ্যতাগুলো—যেমন মিশরের প্রাচীন সাম্রাজ্য (Old Kingdom), সিন্ধু সভ্যতা এবং চীনের লংশান সংস্কৃতি (Longshan Culture)—কোনো প্রকার ছেদ বা বিপর্যয় ছাড়াই তাদের স্বাভাবিক গতিধারা অব্যাহত রেখেছিল। মিশরের ফারাওদের রাজবংশীয় তালিকায় বা পিরামিড তৈরির বিশাল কর্মযজ্ঞের ইতিহাসে এমন কোনো বৈশ্বিক মহাপ্রলয়ের চিহ্ন মাত্র নেই, যা তাদের সমগ্র জনপদকে নিশ্চিহ্ন করে দিয়েছিল। যদি প্রকৃতপক্ষেই বিশ্বব্যাপী সব মানুষ ও প্রাণী মারা যেত, তবে প্রত্নতাত্ত্বিক খননে আমরা প্রতিটি প্রাচীন সভ্যতার স্তরে একই সময়ে একটি বিশাল ঐতিহাসিক শূন্যতা বা অভিন্ন ধ্বংসের স্তর খুঁজে পেতাম। কিন্তু বাস্তবে মিশরের চতুর্থ বা পঞ্চম রাজবংশ কিংবা সিন্ধু সভ্যতার শহরগুলো সেই সময়ে পূর্ণ বিকশিত অবস্থায় ছিল এবং তাদের শিল্প, সংস্কৃতি ও প্রশাসন কোনো প্রকার অলৌকিক বাধা ছাড়াই নিরবচ্ছিন্নভাবে বিবর্তিত হয়েছে।

এই ঐতিহাসিক ও প্রত্নতাত্ত্বিক অসংগতির পাশাপাশি ভাষাতাত্ত্বিক বিবর্তনের (Linguistic Evolution) বিষয়টিও মহাপ্লাবনের আখ্যানকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। ধর্মীয় দাবি অনুযায়ী, বর্তমান বিশ্বের সকল মানুষ নূহের তিন সন্তানের বংশধর। যদি তাই হতো, তবে বর্তমান বিশ্বের হাজার হাজার বিচিত্র ভাষা ও লিপি মাত্র ৪-৫ হাজার বছরের ব্যবধানে একটি একক উৎস থেকে তৈরি হওয়া অসম্ভব। ভাষাতাত্ত্বিক গবেষণায় দেখা যায়, সুমেরীয়, মিশরীয়, চীনা বা মেসো-আমেরিকার ভাষাগুলো প্লাবনের কথিত সময়ের সমকালেই সম্পূর্ণ স্বাধীন ও স্বতন্ত্রভাবে বিকশিত হয়েছিল। মাত্র কয়েক হাজার বছরের ব্যবধানে একটিমাত্র পরিবারের ভাষা থেকে এত বিশাল এবং কাঠামোগতভাবে ভিন্ন ভাষাগত বৈচিত্র্য তৈরি হওয়া বিবর্তনীয় ভাষাবিজ্ঞানের মৌলিক নিয়মের পরিপন্থী। মূলত মানব ইতিহাসের নিরবচ্ছিন্ন এই ভাষাগত বিবর্তন প্রমাণ করে যে, কোনো বৈশ্বিক প্রলয় কখনোই মানব সভ্যতাকে সম্পূর্ণ মুছে দিতে পারেনি [21]


তাপগতিবিদ্যার সংকট: শক্তির অবিনাশিতা ও অসম্ভব উত্তাপ

তাপগতিবিদ্যার (Thermodynamics) অমোঘ সূত্রগুলো নূহের মহাপ্লাবনের আখ্যানকে একটি চরম অবাস্তব ভৌতিক গল্পে পরিণত করে। যদি ধর্মগ্রন্থের দাবি অনুযায়ী মাউন্ট এভারেস্টকে ডুবিয়ে দেওয়ার মতো প্রায় ৯ কিলোমিটার উচ্চতার জলরাশি মাত্র ৪০ দিনে বায়ুমণ্ডল থেকে বর্ষিত হতো, তবে সেই বিপুল পরিমাণ জলীয় বাষ্প ঘনীভূত হওয়ার সময় যে পরিমাণ ‘সুপ্ত তাপ’ (Latent Heat of Condensation) নির্গত করত, তা পৃথিবীকে একটি জ্বলন্ত চুল্লিতে পরিণত করার জন্য যথেষ্ট ছিল। গাণিতিক হিসেব অনুযায়ী, বায়ুমণ্ডলের ওই বিশাল পরিমাণ ঘনীভবন থেকে নির্গত তাপের ফলে পৃথিবীর তাপমাত্রা কয়েক হাজার ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছে যেত, যা সমুদ্রের জলকে ফুটিয়ে বাষ্প করে দিত এবং কাঠের তৈরি সেই জাহাজসহ সমস্ত প্রাণীকে মুহূর্তেই ভস্মীভূত করে ফেলত। এছাড়া, আকাশ থেকে পড়া বৃষ্টির পানির পতনজনিত গতিশক্তি (Kinetic Energy) তাপে রূপান্তরিত হয়ে বায়ুমণ্ডলকে আরও উত্তপ্ত করে তুলত। এমনকি যদি তথাকথিত সৃষ্টিবাদীদের দাবি অনুযায়ী ধরে নেওয়া হয় যে জল ‘মাটির নিচ থেকে’ (Fountains of the deep) এসেছিল, তবুও ভূ-অভ্যন্তরের সেই বিশাল চাপের জল উপরে উঠে আসার সময় যে পরিমাণ ঘর্ষণ ও টেকটোনিক শক্তি উৎপন্ন হতো, তা পৃথিবীকে গলিত লাভার পিণ্ডে পরিণত করার জন্য যথেষ্ট ছিল। বিজ্ঞানের এই সরল কিন্তু অকাট্য সূত্রগুলো প্রমাণ করে যে, মহাপ্লাবনের এই কাহিনী কেবল তাপগতিবিদ্যার বিরুদ্ধেই যায় না, বরং এটি একটি আদিম ও অবৈজ্ঞানিক রূপকথা যা বাস্তব ভৌত জগতের কোনো নিয়মকেই মান্য করে না [16]

নূহ 7

‘আঞ্চলিক প্লাবন’ তত্ত্বের যৌক্তিক ও তাত্ত্বিক সংকট

বর্তমান যুগের অনেক ধর্মতাত্ত্বিক যখন দেখেন যে একটি বৈশ্বিক মহাপ্লাবন বৈজ্ঞানিক ও গাণিতিকভাবে সম্পূর্ণ অসম্ভব, তখন তারা এই মিথকে রক্ষা করার জন্য ‘আঞ্চলিক প্লাবন’ (Local Flood) নামক একটি নতুন ব্যাখ্যার আশ্রয় নেন। তাদের দাবি অনুযায়ী, বন্যাটি সমগ্র পৃথিবীতে নয়, বরং কেবল নূহের নির্দিষ্ট জনপদে বা মেসোপটেমীয় অববাহিকায় হয়েছিল। কিন্তু এই দাবিটি মূল ধর্মীয় টেক্সট এবং সাধারণ কাণ্ডজ্ঞানের সাথে চরমভাবে সাংঘর্ষিক। প্রথমত, যদি বন্যাটি কেবল একটি নির্দিষ্ট অঞ্চলের হতো, তবে নূহকে শত বছর ধরে একটি বিশাল জাহাজ বানানোর নির্দেশ দেওয়ার কোনো যৌক্তিক প্রয়োজন ছিল না; তিনি খুব সহজেই তাঁর অনুসারী ও গবাদি পশু নিয়ে পার্শ্ববর্তী কোনো উঁচু এলাকায় বা অন্য দেশে হিজরত করতে পারতেন। দ্বিতীয়ত, আঞ্চলিক বন্যার জন্য পৃথিবীর সমস্ত প্রাণীর জোড়া নৌকায় তোলার নির্দেশটি হাস্যকর ও অপ্রাসঙ্গিক; কারণ পার্শ্ববর্তী অঞ্চলে তো সেই একই প্রজাতির প্রাণীরা বিচরণ করছিলই। তৃতীয়ত, ধর্মগ্রন্থগুলোর বর্ণনা অনুযায়ী যদি জল পর্বতশৃঙ্গগুলোকে ডুবিয়ে দেয়, তবে পদার্থবিজ্ঞানের ‘তরলের সমোচ্চশীলতা’ (Communicating vessels) নীতি অনুযায়ী সেই জল কিছুতেই একটি নির্দিষ্ট অঞ্চলে স্থির হয়ে থাকতে পারে না; তা অবশ্যই পার্শ্ববর্তী নিচু এলাকাগুলোতে ছড়িয়ে পড়ে সমগ্র পৃথিবীকে প্লাবিত করত। সুতরাং, বৈজ্ঞানিক পরাজয় ঢাকতে ‘আঞ্চলিক প্লাবন’-এর যে অজুহাত দেওয়া হয়, তা কেবল একটি তাত্ত্বিক জালিয়াতি ছাড়া আর কিছুই নয়। এটি মূলত আধুনিক সৃষ্টিবাদীদের একটি মরিয়া প্রচেষ্টা, যা ধর্মগ্রন্থের আক্ষরিক বর্ণনা এবং বিজ্ঞানের বাস্তব সত্য—উভয়কেই অস্বীকার করে [22]


উপসংহারঃ রূপকথা বনাম বৈজ্ঞানিক বাস্তবতা

সার্বিকভাবে বিশ্লেষণ করলে এটি দিনের আলোর মতো স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে, ইতিহাস, প্রত্নতত্ত্ব, ভূতত্ত্ব, আবহাওয়াবিজ্ঞান এবং জীববিজ্ঞানের সমন্বিত ও অকাট্য প্রমাণের ভিত্তিতে নূহের প্রাগৈতিহাসিক মহাপ্লাবন বা বৈশ্বিক বন্যার আখ্যানটি কোনো ঐতিহাসিক বা বাস্তব ঘটনা নয়। বৈজ্ঞানিক সমীকরণে সর্বোচ্চ পর্বতশৃঙ্গ ডোবানোর মতো বায়ুমণ্ডলে পর্যাপ্ত জলের অভাব, একটিমাত্র কাঠের নৌকায় লক্ষ লক্ষ প্রজাতির প্রাণীর স্থান সংকুলানের গাণিতিক অসম্ভবতা এবং দীর্ঘমেয়াদে সেই বিপুল প্রাণিকুলের খাদ্য ও বাস্তুতান্ত্রিক পরিচর্যার অবাস্তবতা—এই সবকিছুর বিচার করলে দেখা যায়, এ ধরনের কোনো বৈশ্বিক দুর্যোগ ঘটার ন্যূনতম সম্ভাবনা বা ভূতাত্ত্বিক প্রমাণ পৃথিবীতে নেই [22]

উপরন্তু, প্রাচীন মেসোপটেমীয় সভ্যতার ‘এরিদু জেনেসিস’, ‘আত্রা-হাসিস’ এবং ‘গিলগামেশের মহাকাব্য’ থেকে এই কাহিনীর সরাসরি অনুকরণ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করে যে, এটি একটি বিবর্তিত আদিম লোককথা। মূলত প্রাচীন টাইগ্রিস, ইউফ্রেটিস বা অনুরূপ কোনো নদী অববাহিকায় ঘটে যাওয়া প্রলয়ংকরী কিন্তু সম্পূর্ণ স্থানীয় একটি বন্যার ভয়াবহ স্মৃতিই এই মিথের জন্ম দিয়েছে। প্রাচীন মানুষের বৈজ্ঞানিক অজ্ঞতা এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগকে ঈশ্বরের ক্রোধ হিসেবে ব্যাখ্যা করার মনস্তাত্ত্বিক প্রবণতার ফলেই একটি স্থানীয় দুর্যোগ সময়ের পরিক্রমায় ও মানুষের মুখে মুখে অতিরঞ্জিত হয়ে বৈশ্বিক মহাপ্লাবনের রূপ ধারণ করেছে [23]

সবশেষে, দার্শনিক ও যৌক্তিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করলে নারী, শিশু, বৃদ্ধ এবং নির্বাক প্রাণীদের ঢালাওভাবে ডুবিয়ে হত্যার এই আখ্যানটি কোনো পরম ন্যায়বিচারক বা করুণাময় ঈশ্বরের ধারণার সাথে মোটেও সঙ্গতিপূর্ণ নয়। বরং এটি প্রাচীন মানুষের প্রতিশোধপরায়ণ, উপজাতীয় ও আদিম চিন্তাধারারই একটি সাহিত্যিক প্রতিফলন। ধর্মীয় অনুভূতির চাদরে আবৃত হয়ে হাজার হাজার বছর ধরে এই গল্পটি মানুষের বিশ্বাসে গেঁথে থাকলেও, সত্য, যুক্তি ও প্রমাণের কঠোর কষ্টিপাথরে এর কোনো ঐতিহাসিক বা বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই। মানব সভ্যতার উচিত প্রাচীন রূপকথা বা অন্ধ বিশ্বাসের অন্ধ অনুকরণ না করে বিজ্ঞান, বস্তুনিষ্ঠ প্রমাণ ও যুক্তির আলোকে পৃথিবীর ইতিহাসকে অনুধাবন করা [24]


তথ্যসূত্রঃ
  1. Montgomery, David R. “The Rocks Don’t Lie: A Geologist Investigates Noah’s Flood.” W. W. Norton & Company, 2012 1 2
  2. Frazer, James George. “Folklore in the Old Testament.” Macmillan, 1918 ↩︎
  3. Chen, Y. S. “The Primeval Flood Catastrophe: Origins and Early Development in Mesopotamian Traditions.” Oxford University Press, 2013 ↩︎
  4. Finkel, Irving. “The Ark Before Noah: Decoding the Story of the Flood.” Hodder & Stoughton, 2014 ↩︎
  5. Witzel, Michael. “The Origins of the World’s Mythologies.” Oxford University Press, 2012 ↩︎
  6. Dundes, Alan. “The Flood Myth.” University of California Press, 1988 ↩︎
  7. কোরআন ৭১:২৬ ↩︎
  8. কোরআন ৩৭:৮০-৮২ ↩︎
  9. কোরআন ৫৪:১১-১২ ↩︎
  10. কোরআন ১১:৪০-৪৪ ↩︎
  11. সূরা বাকারা আয়াত ৭ ↩︎
  12. কোরআন ১৮:১৭ ↩︎
  13. কোরআন ৭:১৭৮ ↩︎
  14. USGS, 2024 ↩︎
  15. Census of Marine Life, 2011 ↩︎
  16. Plimer, Ian. “Telling Lies for God: Reason vs Creationism.” Random House, 1994 1 2
  17. Coyne, Jerry A. “Why Evolution is True.” Viking, 2009 1 2
  18. Isaak, Mark. “The Problems with a Global Flood.” TalkOrigins, 2003 ↩︎
  19. Moore, Robert A. “The Impossible Voyage of Noah’s Ark.” 1983 ↩︎
  20. Isaak, Mark. “The Counter-Creationism Handbook.” University of California Press, 2007 ↩︎
  21. Wilkinson, Toby. “The Rise and Fall of Ancient Egypt.” Random House, 2010 ↩︎
  22. Moore, Robert A. “The Impossible Voyage of Noah’s Ark.” Creation/Evolution Journal, 1983 1 2
  23. Prothero, Donald R. “Evolution: What the Fossils Say and Why It Matters.” Columbia University Press, 2007 ↩︎
  24. Dawkins, Richard. “The Magic of Reality: How We Know What’s Really True.” Free Press, 2011 ↩︎