
Table of Contents
ভূমিকা
ধর্মীয় গ্রন্থ এবং তার ব্যাখ্যাগুলো প্রায়শই তাদের সমসাময়িক মানুষের বৈজ্ঞানিক জ্ঞানের সীমাবদ্ধতা দ্বারা আবদ্ধ থাকে। কিন্তু সমস্যা তখনই তৈরি হয়, যখন সপ্তম শতাব্দীর সীমিত জ্ঞানলব্ধ ধারণাকে একবিংশ শতাব্দীর পরীক্ষিত সত্যের ওপর স্থান দেওয়ার চেষ্টা করা হয়। ইসলামি ধর্মতত্ত্বে মহাবিশ্ব সম্পর্কে এমন অনেক দাবি করা হয়েছে, যা আধুনিক জ্যোতির্বিজ্ঞানের (Astronomy) আলোকে কেবল ভুলই নয়, বরং হাস্যকরভাবে অবাস্তব। এর একটি প্রকৃষ্ট উদাহরণ হলো আমাদের নিজেদের গ্যালাক্সি বা ছায়াপথ সম্পর্কে ইসলামি দৃষ্টিভঙ্গি। সহীহ হাদিস অনুসারে, এই বিশাল নক্ষত্রপুঞ্জটি নাকি ‘আসমানের দরজা’ এবং নূহের বন্যার পানির উৎস! এই প্রবন্ধে আমরা যুক্তি ও আধুনিক বিজ্ঞানের আতশ কাঁচের নিচে এই আদিম বিশ্বাসটিকে ব্যবচ্ছেদ করব এবং দেখাব যে, এটি ঐশ্বরিক প্রজ্ঞার নয়, বরং তৎকালীন আরবের মহাজাগতিক অজ্ঞতার একটি সুস্পষ্ট নিদর্শন।
কোরআনের বক্তব্যঃ আসমানের দরজা
কোরআনে এই সম্পর্কে বলা হয়েছে, আল্লাহ নাকি আসমানের দরজা খুলে দিয়েছিলেন নুহ নবীর আমলে, পানি আসার জন্য [1]
তখন আমি আকাশের দরজাগুলো খুলে দিয়ে মুষলধারায় বৃষ্টি বর্ষিয়েছিলাম।
— Taisirul Quran
ফলে আমি উন্মুক্ত করে দিলাম আকাশের দ্বার, প্রবল বারি বর্ষণে।
— Sheikh Mujibur Rahman
ফলে আমি বর্ষণশীল বারিধারার মাধ্যমে আসমানের দরজাসমূহ খুলে দিলাম।
— Rawai Al-bayan
ফলে আমরা উন্মুক্ত করে দিলাম আকাশের দ্বারসমূহ প্রবল বর্ষণশীল বারিধারার মাধ্যমে,
— Dr. Abu Bakr Muhammad Zakaria
হাদিস সম্পর্কে ইসলামিক আকীদা
ইসলামি ধর্মতত্ত্ব বা আকীদার একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ হলো মুহাম্মদ-এর প্রতিটি কথা ও কাজকে পরম সত্য হিসেবে গ্রহণ করা। বিশুদ্ধ ইসলামি বিশ্বাস অনুযায়ী, নবীর মুখ নিঃসৃত প্রতিটি শব্দই ঐশী তত্ত্বাবধানে পরিচালিত এবং তা ভুল-ত্রুটির ঊর্ধ্বে। এই বিশ্বাসের মূল ভিত্তি হলো—নবী মুহাম্মদ ব্যক্তিগত আবেগ, রাগ বা খুশির বশবর্তী হয়ে এমন কিছু বলেন না যা অসত্য। ফলে, কোনো সহিহ হাদিসে যদি কোনো বাস্তব জীবনের বা বৈজ্ঞানিক বা মহাজাগতিক দাবি করা হয়, তবে একজন একনিষ্ঠ মুসলিমের কাছে সেটি পর্যবেক্ষণযোগ্য বিজ্ঞানের চেয়েও অধিকতর সত্য হিসেবে বিবেচিত হয় [2]
সূনান আবু দাউদ (ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
১৯/ শিক্ষা-বিদ্যা, (জ্ঞান-বিজ্ঞান)
পরিচ্ছেদঃ ৪১৭. ইলম লিপিবদ্ধ করা সম্পর্কে।
৩৬০৭. মুসাদ্দাদ (রহঃ) ….. আবদুল্লাহ ইবন আমর (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেনঃ আমি যা কিছু রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট হতে শ্রবণ করতাম, তা লিখে রাখতাম। আমি ইচ্ছা করতাম যে, আমি এর সবই সংরক্ষণ করি। কিন্তু কুরাইশরা আমাকে এরূপ করতে নিষেধ করে এবং বলেঃ তুমি যা কিছু শোন তার সবই লিখে রাখ, অথচ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একজন মানুষ, তিনি তো কোন সময় রাগান্বিত অবস্থায় কথাবার্তা বলেন এবং খুশীর অবস্থায়ও বলেন। একথা শুনে আমি লেখা বন্ধ করি এবং বিষয়টি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে অবহিত করি। তখন তিনি তার আংগুল দিয়ে নিজের মুখের প্রতি ইাশারা করে বলেনঃ তুমি লিখতে থাক, ঐ যাতের কসম, যাঁর হাতে আমার জীবন, যা কিছু এ মুখ হতে বের হয়, তা সবই সত্য।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আবদুল্লাহ ইবনু আমর ইবনুল আস (রাঃ)
হাদিসের বিবরণঃ ছায়াপথ আসমানের দরজা
ইসলামি বিশ্বাস অনুসারে ছায়াপথ হচ্ছে আসমানের দরজা। আসুন হাদিসগুলো পড়ি,
আল-আদাবুল মুফরাদ
মেহমানদারি
পরিচ্ছেদঃ ৩২৯-ছায়াপথ।
৭৭১। আবুত তুফাইল (রাঃ) থেকে বর্ণিত। ইবনুল কাওয়া (রহঃ) আলী (রাঃ)-কে ছায়াপথ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করেন। তিনি বলেন, তা হলো আসমানের প্রবেশদ্বার এবং নৃহের বন্যায় প্রবল বৃষ্টি বর্ষণের জন্য আকাশের ঐ দ্বারই খুলে দেয়া হয়েছিল (৫৪ঃ ১১ আয়াতের প্রতি ইঙ্গিত)।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
আল-আদাবুল মুফরাদ
মেহমানদারি
পরিচ্ছেদঃ ৩২৯- ছায়াপথ।
৭৭২। ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন, রংধনু হলো পৃথিবীবাসীর জন্য মহাপ্লাবনের পর নিরাপত্তার প্রতীক এবং ছায়াপথ হলো আকাশের একটি দরজা, যা থেকে আকাশ বিদীর্ণ হবে।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
তাফসির গ্রন্থের বিবরণঃ ইবনে কাসীর
আসুন তাফসীরে ইবনে কাসীর থেকে এই বিষয়ক আয়াতটির অর্থ জেনে নেয়া যাক, [3]


ধর্মতাত্ত্বিক দাবিঃ আকাশের ফাটল ও পানির উৎস
ইসলামের চতুর্থ খলিফা আলী ইবনে আবী তালিব এবং বিখ্যাত সাহাবী আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাসের বর্ণিত ‘সহীহ’ হাদিসগুলো (আল-আদাবুল মুফরাদ: ৭৭১, ৭৭২) ইসলামের মহাজাগতিক ধারণার একটি স্তম্ভ উন্মোচন করে। এই বর্ণনাগুলো অনুসারে: ১. ছায়াপথ (Milky Way Galaxy) হলো ‘আসমানের প্রবেশদ্বার’ বা দরজা। ২. এই দরজাটিই খুলে দেওয়া হয়েছিল নূহের সময় মহাপ্লাবনের প্রবল বর্ষণের জন্য। ৩. কেয়ামতের সময় এই দরজা থেকেই আকাশ বিদীর্ণ হবে।
এই দাবিগুলো কোনো রূপক অর্থ বহন করে না, বরং হাদিসের প্রেক্ষাপট এবং কুরআনের আয়াতের (৫৪:১১) সাথে সংযোগ স্থাপন করলে বোঝা যায়, একে আক্ষরিক অর্থেই একটি ভৌত দরজা এবং পানির উৎস হিসেবে গণ্য করা হয়েছে।
বৈজ্ঞানিক বাস্তবতার সাথে সংঘাত
আদিম মহাজাগতিক ফ্যান্টাসি
সপ্তম শতাব্দীর আরব মরুভূমির একজন মানুষের দৃষ্টিতে রাতের আকাশ ছিল এক রহস্যময় বিশাল শামিয়ানা বা কঠিন গম্বুজ। আধুনিক আলোক দূষণহীন সেই গাঢ় অন্ধকারে ‘মিল্কিওয়ে’ বা ছায়াপথকে মনে হতো আকাশের গায়ে এক দীর্ঘ সাদাটে ধোঁয়াশা বা উজ্জ্বল পলিমাটির পথের মতো। এই বিশেষ দৃশ্যমান অবস্থাটিই ছিল তৎকালীন মানুষের যাবতীয় ভ্রান্ত বিশ্বাসের মূল ভিত্তি। একে বিস্তারিতভাবে নিচের পয়েন্টগুলোতে বিশ্লেষণ করা যায়:
উপসংহারঃ ওহী নয়, মানবিক অজ্ঞতার প্রতিফলন
ছায়াপথ সম্পর্কিত এই ইসলামি বিশ্বাসটি প্রমাণ করে যে, এই তথাকথিত ‘ওহী’ বা ঐশ্বরিক জ্ঞান মহাবিশ্বের প্রকৃত কাঠামো সম্পর্কে সম্পূর্ণ অজ্ঞ ছিল। যদি কোনো সর্বজ্ঞ স্রষ্টা এই তথ্যগুলো দিতেন, তবে তিনি তার নিজের সৃষ্টি করা গ্যালাক্সিকে একটি সামান্য ‘দরজা’ এবং বৃষ্টির পানির উৎস হিসেবে ভুলভাবে উপস্থাপন করতেন না।
এই হাদিসগুলো কোনো অলৌকিক সত্যের সন্ধান দেয় না, বরং এটি উন্মোচিত করে যে, ইসলামের প্রাথমিক যুগের মানুষরা তাদের চারপাশের জগতকে বোঝার জন্য যে কল্পকাহিনীগুলো তৈরি করেছিল, সেগুলোকেই পরবর্তীতে ‘সহীহ’ ধর্মের মোড়কে পবিত্র করা হয়েছে। একজন যুক্তিবাদী মানুষের কাছে এটি স্পষ্ট যে, ছায়াপথ কোনো আসমানের দরজা নয়, বরং এটি মহাজাগতিক অজ্ঞতার একটি স্মৃতিস্তম্ভ, যা ধর্মীয় অন্ধবিশ্বাস বিজ্ঞানকে অস্বীকার করলে কী ধরণের হাস্যকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়—তার সাক্ষ্য বহন করছে।
