ভূমিকা
কোরআনের ১৬:৬৬ নম্বর আয়াতে গবাদি পশুর স্তন্যদুগ্ধ উৎপাদনের প্রক্রিয়া সম্পর্কে একটি সুনির্দিষ্ট বর্ণনা পাওয়া যায়, যা আধুনিক শারীরস্থান (Anatomy) এবং প্রাণীবিজ্ঞানের (Zoology) আলোকে একটি অসংগতিপূর্ণ ও প্রাক-বৈজ্ঞানিক ধারণা মাত্র। ওই আয়াতে দাবি করা হয়েছে যে, পশুর পেটের ভেতর ‘গোবর ও রক্তের মধ্যখান’ থেকে বিশুদ্ধ দুধ উৎপন্ন হয়। এই জাতীয় বর্ণনা কোনো বৈজ্ঞানিক বাস্তবতাকে তুলে ধরার পরিবর্তে সপ্তম শতাব্দীর মানুষের সাধারণ পর্যবেক্ষণলব্ধ একটি ভ্রান্ত ধারণাকেই প্রতিফলিত করে। আধুনিক জীববিজ্ঞান প্রমাণ করেছে যে, দুগ্ধ উৎপাদন একটি অত্যন্ত জটিল জৈব-রাসায়নিক প্রক্রিয়া, যা মূলত স্তন্যগ্রন্থির (Mammary gland) বিশেষায়িত কোষে সম্পন্ন হয় এবং এর সাথে বর্জ্য পদার্থ বা গোবরের কোনো সরাসরি সংস্থানগত বা পদ্ধতিগত সম্পর্ক নেই। এই প্রবন্ধে আমরা রক্তসংবহন ও স্তন্যগ্রন্থির কোষীয় কার্যাবলীর প্রেক্ষিতে উক্ত প্রাচীন ধর্মীয় দাবিটির অসারতা বিশ্লেষণ করব।

শারীরস্থানিক বিভ্রান্তিঃ ‘গোবর ও রক্ত’ তত্ত্বের ব্যবচ্ছেদ
কোরআনের ১৬:৬৬ আয়াতের বর্ণনায় ‘গোবর ও রক্তের মধ্যখান’ (মীন বাইনি ফার্থিওঁ ওয়া দামিন) শব্দবন্ধটি একটি গুরুতর শারীরস্থানিক (Anatomical) অসংগতিকে নির্দেশ করে। শারীরবৃত্তীয় দৃষ্টিকোণ থেকে, গোবর বা অপাচ্য খাদ্যবস্তু পরিপাকতন্ত্রের (Digestive Tract) শেষাংশে অবস্থান করে, যা একটি সম্পূর্ণ পৃথক নালীপথ। অন্যদিকে, রক্ত সংবহনতন্ত্রের (Circulatory System) মাধ্যমে সারা শরীরে পুষ্টি ও অক্সিজেন সরবরাহ করে। এই দুটি তন্ত্রের অবস্থান এবং কাজ সম্পূর্ণ ভিন্ন। আধুনিক বিজ্ঞান নিশ্চিত করে যে, দুগ্ধ উৎপাদন কোনো ‘পরিশোধন’ প্রক্রিয়া নয় যেখানে গোবর ও রক্ত থেকে দুধ ছেঁকে নেওয়া হয়, বরং এটি স্তনগ্রন্থির এলভিওলার কোষে (Alveolar cells) রক্তবাহিত পুষ্টি উপাদান ব্যবহার করে সম্পূর্ণ নতুন একটি তরল পদার্থের সংশ্লেষণ। আয়াতের বর্ণনাটি এমন এক প্রাচীন ধারণার বহিঃপ্রকাশ যেখানে মনে করা হতো পেটের ভেতরে খাদ্যের বিভিন্ন অংশ আলাদা হয়ে একদিকে গোবর, একদিকে রক্ত এবং মাঝখান দিয়ে দুধ বের হয়ে আসে [1]।

দুগ্ধ উৎপাদন ও বর্জ্য নিষ্কাশনের তুলনামূলক শারীরবৃত্তীয় ছক
| প্রক্রিয়ার ধাপ | সংশ্লিষ্ট অঙ্গ ও স্থান | উপাদানের প্রকৃতি | বৈজ্ঞানিক বাস্তবতা |
| পরিপাক ও শোষণ | পাকস্থলী ও ক্ষুদ্রান্ত্র | খাদ্যসার ও পুষ্টি উপাদান | অন্ত্রের প্রাচীর থেকে পুষ্টি উপাদান রক্তে মিশে যায়। |
| পরিবহন | রক্তবাহিকা (Arteries) | অ্যামিনো অ্যাসিড, গ্লুকোজ, ফ্যাটি অ্যাসিড | রক্ত কেবল কাঁচামাল পরিবহন করে, দুধ নয়। |
| সংশ্লেষণ (Synthesis) | স্তন্যগ্রন্থি (Mammary Glands) | ল্যাকটোজ, কেসিন, মিল্ক ফ্যাট | স্তনগ্রন্থির কোষ রক্ত থেকে উপাদান নিয়ে দুধ তৈরি করে। |
| বর্জ্য নিষ্কাশন | মলাশয় (Rectum) | অপাচ্য খাদ্য বা গোবর | এটি পরিপাকতন্ত্রের বর্জ্য, যার সাথে স্তনের কোনো সংযোগ নেই। |
প্রাক-আধুনিক তাফসির এবং মধ্যযুগীয় শারীরস্থানিক ভ্রান্তি
কোরআনের ১৬:৬৬ আয়াতের ব্যাখ্যায় প্রাচীন ও মধ্যযুগীয় তাফসিরকারকগণ যে বিবরণ প্রদান করেছেন, তা থেকে এটি স্পষ্ট হয় যে, তৎকালীন ধর্মীয় পণ্ডিতগণ এই বর্ণনাকে কোনো রূপক অলঙ্কার হিসেবে নয়, বরং একটি আক্ষরিক ও ভৌতিক প্রক্রিয়া হিসেবেই গ্রহণ করেছিলেন। উদাহরণস্বরূপ, ইসলামের অন্যতম প্রখ্যাত মুফাসসির আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা)-এর উদ্ধৃতি দিয়ে তাফসীরে জালালাইনে যে ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে, তা সে সময়ের মানুষের শারীরস্থানিক অজ্ঞতাকেই ফুটিয়ে তোলে। সেখানে দাবি করা হয়েছে যে, পশু যখন ঘাস খায়, তখন তা পাকস্থলীতে গিয়ে জমা হয় এবং পাকস্থলী তা ‘সিদ্ধ’ বা পাক করে। এরপর যকৃত (Liver) এই মিশ্রণটিকে তিনটি ভাগে ভাগ করে দেয়: রক্ত যায় রগের দিকে, দুধ যায় স্তনের দিকে এবং অবশিষ্ট অংশ গোবর হিসেবে থেকে যায় ।
এই ‘বণ্টন তত্ত্ব’ বা ‘Sorting Mechanism’ আধুনিক শারীরবিদ্যার (Physiology) সম্পূর্ণ বিপরীত। যকৃতের কাজ রক্ত শোধন বা পুষ্টি বিপাক করা হলেও, এটি সরাসরি গোবর থেকে দুধ বা রক্তকে পৃথক করার কোনো ছাঁকুনি হিসেবে কাজ করে না। বরং আধুনিক বিজ্ঞান প্রমাণ করেছে যে, দুগ্ধ উৎপাদন একটি আন্তঃকোষীয় রাসায়নিক সংশ্লেষণ প্রক্রিয়া।
| বিষয় | প্রাচীন তাফসিরের দাবি (ইবনে আব্বাস ও জালালাইন) | আধুনিক বৈজ্ঞানিক বাস্তবতা |
| উৎপাদন প্রক্রিয়া | পাকস্থলীতে খাদ্য সিদ্ধ হওয়া এবং যকৃত দ্বারা পৃথকীকরণ। | স্তনগ্রন্থির এলভিওলার কোষে রক্তবাহিত পুষ্টি থেকে নতুন সংশ্লেষণ। |
| যকৃতের ভূমিকা | রক্ত, দুধ ও গোবরকে আলাদা আলাদা গন্তব্যে পাঠিয়ে দেওয়া। | বিপাকীয় কাজ এবং গ্লুকোজ নিয়ন্ত্রণ; দুধ পৃথকীকরণের সাথে কোনো সম্পর্ক নেই। |
| দুধের উৎস | সরাসরি পাকস্থলীর ভেতরকার ‘মিশ্রণ’ থেকে সংগৃহীত। | স্তন্যদানকারী কোষের ভেতরকার জটিল জৈব-রাসায়নিক বিক্রিয়া। |
| গোবরের অবস্থান | দুধ ও রক্ত পৃথক হওয়ার পর পাকস্থলীতে অবশিষ্ট থাকা বর্জ্য। | পরিপাকতন্ত্রের শেষ অংশে (মলাশয়) অবস্থানকারী অপাচ্য অংশ। |
আসুন কোরআনের আয়াতটি পড়ি [2] –
তোমাদের জন্য গবাদি পশুতেও অবশ্যই শিক্ষা নিহিত আছে। তোমাদেরকে পান করাই ওদের পেটের গোবর আর রক্তের মাঝ থেকে বিশুদ্ধ দুগ্ধ যা পানকারীদের জন্য খুবই উপাদেয়।
— Taisirul Quran
অবশ্যই (গৃহপালিত) চতুস্পদ জন্তুর মধ্যে তোমাদের জন্য শিক্ষা রয়েছে; ওগুলির উদরস্থিত গোবর ও রক্তের মধ্য হতে তোমাদেরকে আমি পান করাই বিশুদ্ধ দুগ্ধ, যা পানকারীদের জন্য সুস্বাদু।
— Sheikh Mujibur Rahman
আর নিশ্চয় চতুষ্পদ জন্তুতে রয়েছে তোমাদের জন্য শিক্ষা। তার পেটের ভেতরের গোবর ও রক্তের মধ্যখান থেকে তোমাদেরকে আমি দুধ পান করাই, যা খাঁটি এবং পানকারীদের জন্য স্বাচ্ছ্যন্দকর।
— Rawai Al-bayan
আর নিশ্চয় গবাদি পশুর মধ্যে তোমাদের জন্য শিক্ষা রয়েছে। তার পেটের গোবর ও রক্তের মধ্য থেকে [১] তোমাদেরকে পান করাই বিশুদ্ধ দুধ, যা পানকারীদের জন্য স্বাচ্ছন্দ্যকর।
— Dr. Abu Bakr Muhammad Zakaria
এই বিষয়ে তাফসীরে জালালাইনে যা বলা আছে আসুন সেটি পড়ে নিই [3] –
গোবর ও রক্তের মাঝখান দিয়ে পরিষ্কার দুধ বের করা সম্পর্কে হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা) বলেন, জন্তুর ভক্ষিত ঘাস তার পাকস্থলীতে একত্রিত হলে পাকস্থলী তা সিদ্ধ করে। পাকস্থলীর এই ক্রিয়ার ফলে খাদ্যের বিষ্ঠা নিচে বসে যায় এবং মুখ উপরে থেকে যায়। দুধের উপরে থাকে রক্ত। এরপর যকৃত এই তিন প্রকার বস্তুকে পৃথকভাবে তাদের স্থানে ভাগ করে দেয়, রক্ত পৃথক করে রগের মধ্যে চলায় এবং দুধ পৃথক করে জঙুর স্তনে পৌঁছে দেয়। এখন পাকস্থলীতে শুধু বিষ্ঠা থেকে যায়, যা গোবর হয়ে বের হয়ে আসে।

এবারে দেখে নেয়া যাক, তাফসীরে মাযহারীতে কী বলা হয়েছে, [4]
‘ফী বুতুনিহী’ অর্থ তার বা তাদের উদরস্থিত। এখানে ‘তার’ বা ‘তাদের’ সর্বনামটি সম্পৃক্ত হয়েছে ‘মিম্মা’ কথাটির ‘মা’ অব্যয়ের সঙ্গে। এভাবে কথাটির অর্থ দাঁড়াবে তার বা তাদের উদরে যা আছে। সকল পশু থেকে দুধ পাওয়া যায় না। তাই এখানে মর্মার্থ হবে কিছু সংখ্যক পশুর উদরে। এমতো ক্ষেত্রে ‘তার উদরে’ কথাটির ‘তার’ সর্বনামটি হবে ঋণাত্মক এবং তা সম্পৃক্ত হবে ওই কিছু সংখ্যক দুগ্ধবতী পশুর সঙ্গে। আবার কারো কারো মতে আমান অর্থ পশু। আর সে পশু হচ্ছে জিন্সে আম বা এক শ্রেণীর পশু। যদি তাই হয়, তবে ‘তার উদরে’ কথাটির ‘তার’ সর্বনামটি সংশ্লিষ্ট হবে এক শ্রেণীর পশুর সঙ্গে।
‘ফরছ’ অর্থ ওই গলিত পদার্থ, যা সংশ্লিষ্ট থাকে নাড়িভুঁড়িতে। গোবররূপে যা বেরিয়ে আসে, তা কিন্তু ‘ফরছ’ নয়, বর্জ্য। ‘খলিসন্’ অর্থ বিশুদ্ধ। অর্থাৎ যা রক্ত ও পাকস্থলিস্থিত গলিত পদার্থের প্রভাব থেকে মুক্ত। অর্থাৎ দুগ্ধ। লক্ষণীয় যে, রক্ত ও পাকস্থলিস্থিত গলিত পদার্থ থেকে নিঃসৃত হলেও দুধের মধ্যে কিন্তু রক্তের রঙ অথবা ওই গলিত পদার্থের দুর্গন্ধ, কোনোটাই নেই।
‘সাইগান’ অর্থ সুপেয় বা সুস্বাদু, যা অনায়াসে গলাধঃকরণ করা যায়। বাগবী লিখেছেন, হজরত ইবনে আব্বাস বলেছেন, পশুরা ঘাস পাতা ইত্যাদি আহার করে। সেগুলো চলে যায় তাদের পাকস্থলিতে। সেখানে চলে পরিপাক কর্ম। পরিপাক ক্রিয়া সমাপনের পর খাদ্যের নির্যাস হয় ত্রিধাবিভক্ত। উপরের অংশ হয় রক্ত। মধ্যবর্তী অংশ হয় দুগ্ধ। আর তলদেশের অংশ হয় গোবর। অর্থাৎ দুগ্ধ বেরিয়ে আসে রক্ত ও গোবরের মাঝখান থেকে। দুগ্ধ নিঃসরণের এই কাজটি সম্পাদিত হয় যকৃতের তত্ত্বাবধানে। যকৃত রক্ত পরিচালন করে ধমনীতে এবং দুগ্ধ প্রবাহিত করে দুগ্ধাধারে বা ওলানে। আর গোবরকেও রাখে তার যথাস্থানে।
আল্লামা বায়যাবী বলেছেন, হজরত ইবনে আব্বাসের বক্তব্যের মর্মার্থ এই হতে পারে যে, দুধের উপাদান থাকে রক্ত ও গোবরের মাঝামাঝি। উপরের অংশে থাকে রক্ত। আর নিচের অংশে থাকে বর্জ্য। পাকস্থলিতে জারিত খাদ্যের প্রথম অংশ টেনে নেয় যকৃত। বর্জ্য পড়ে থাকে তার নির্দিষ্ট স্থানে। অতঃপর জারিত খাদ্যের প্রথম অংশ পুনরায় পরিপাক হয়। পরের পরিপাককৃত পদার্থকে বলে কিমুস। দেহের যাবতীয় উপাদান এতে বিদ্যমান থাকে। জলীয় অংশই থাকে অধিক। এই জলীয় অংশকে বলে এখলাত। এরপর যকৃত তার পৃথকীকরণ শক্তির প্রভাবে প্রয়োজনাতিরিক্ত পানি ধমনীর মাধ্যমে পাঠিয়ে দেয় বৃক্কে। অতঃপর এই মিশ্রণকে প্রয়োজনানুসারে পরিচালনা করে শরীরের বিভিন্ন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গে। এভাবেই মহাপ্রাজ্ঞ ও সর্বশক্তিধর আল্লাহর সুব্যবস্থাপনায় প্রতিটি অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ পায় তাদের প্রয়োজনীয় প্রাপ্য। পুরুষজাতীয় প্রাণীর স্বভাবে থাকে নমনীয়তার ও শীতলতার প্রাধান্য। তাই তাদের খাদ্যমিশ্রণ হয় প্রয়োজনাতিরিক্ত। স্ত্রীজাতীয় প্রাণীর ক্ষেত্রে অতিরিক্ত অংশটুকু ভ্রূণের লালনপালনার্থে পরিচালিত হয় জরায়ুতে। সন্তান প্রসবের পর ওই অতিরিক্ত খাদ্য পরিচালিত হয় স্তনের দিকে। সেখানে তা জমা হয় দুধরূপে। তখন খাদ্যের নির্যাস পরিপাকতন্ত্র থেকে ছড়িয়ে পড়ে অন্যান্য অঙ্গ-প্রত্যঙ্গে। এভাবে উৎপাদিত দুগ্ধ, তার পরিমাণ, রঙ, প্রবাহ ইত্যাদি একটি জটিল প্রক্রিয়া বটে। তবে এটা সুনিশ্চিত যে, এর নেপথ্যে রয়েছে মহাকুশলী ও মহাজ্ঞানী আল্লাহর ত্রুটিহীন তত্ত্বাবধান ও নিখুঁত ব্যবস্থাপনা। যে ব্যক্তি বিশুদ্ধ অনুসন্ধিৎসা ও বিনয়ী অভিনিবেশ সহকারে বিষয়টি বুঝতে চেষ্টা করবে, সেই কেবল অবগত হতে পারবে এর অভিজ্ঞান। সে তখন মানুষের প্রতি আল্লাহ্পাকের বিপুল অনুগ্রহ ও অকৃপণ দানের কথা স্বীকার না করেই পারবে না।

এবারে দেখা যাক তাফসীরে ইবনে কাসীরে কী বলা হয়েছে, [5]
৬৬. অবশ্যই আন’আমের মধ্যে তোমাদিগের জন্য শিক্ষা আছে। উহাদিগের উদরস্থিত গোবর ও রক্তের মধ্যে হইতে তোমাদিগকে পান করাই বিশুদ্ধ দুগ্ধ যাহা পানকারীদিগের জন্য সুস্বাদু।
৬৭. এবং খর্জুর বৃক্ষের ফল ও আংগুর হইতে তোমরা মাদক ও উত্তম খাদ্য গ্রহণ করিয়া থাক, ইহাতে অবশ্যই বোধশক্তিসম্পন্ন সম্পদায়ের জন্য রহিয়াছে নিদর্শন।
তাফসীর: আল্লাহ তা’আলা ইরশাদ করেন হে মানব জাতি ! إِنَّ لَكُمْ فِي الْأَنْعَامِ
নিশ্চয়ই তোমাদের জন্য চুতষ্পদ প্রাণীর মধ্যে- যেমন গরু উট ছাগল ইত্যাদির মধ্যে عبُرَةُ বড় উপদেশ রহিয়াছে। যে মহান সত্তা এই সকল চতুষ্পদ প্রাণী সৃষ্টি করিয়াছেন তাঁহার শক্তি তাঁহার অনুগ্রহ ও দয়া বুঝিবার জন্য ইহাতে নিদর্শন রহিয়াছে। বنُسَقِ مِمَّا فِي بُطُونِهِ আয়াতাংশের بُطُونِ এর সর্বনামটি হয় এর অর্থের দিকে ফিরিয়াছে এই কারণে একবচন সর্বনাম ব্যবহার করা হইয়াছে কিংবা তা কে حَيْوَانٌ এর অর্থে বুঝাইয়া উহার প্রতি সর্বনাম ফিরান হইয়াছে। তখন ইবারত এইরূপ হইবে مما 0 2018 RICS نُسْقِيكُمْ مِمَّا فِي بُطُونِهِ هُذَا الْحَيَوَانُ এর فِي بُطُونِهَا উভয় প্রকার ব্যবহার আরবী ব্যাকরণ মাফিক বিশুদ্ধ। যেমন ইরশাদ হইয়াছে كُلاً إِنَّهَا تَذْكِرَةٌ مِّمَّنُ شَاءَ ذَكَرَهُ উক্ত আয়াতে প্রথম সর্বনামটি এক বচন স্ত্রীলিংগ হিসাবে ব্যবহৃত হইয়াছে এবং ব্রত এর সর্বনামটি এক বচন পুংলিঙ্গে ব্যবহৃত হইয়াছে অথচ উভয় সর্বনাম একই বস্তুর দিকে ফিরিয়াছে। وَإِنِّي مُرْسِلَةٌ إِلَيْهِمُ بِهَدَيَةٍ فَنَاظِرَةٌ بِمَا يَرْجِعُ الْمُرْسَلُونَ فَلَمَّا جَاءَ 1 سُلَيْمَانَ অত্র আয়াতেও শব্দটি স্ত্রীলিংগ এবং এর মধ্যে সর্বনামটি পুংলিঙ্গ ব্যবহৃত হইয়াছে। কারণ ধর্ম শব্দটি ১ এর অর্থে ব্যবহৃত হইয়াছে এবং এই কারণে এর সর্বনামটি পুংলিঙ্গ ব্যবহৃত হওয়া বিশুদ্ধ হইয়াছে।
14 TO RECO FACE 1 قوله مِن بَيْنَ فَرْثٍ وَدَمٍ لَّبَنًا خَالِصًا তোমাদের পান করিবার জন্য বাহির করেন। অর্থাৎ চতুষ্পদ প্রাণীর উদরে যে রক্ত ও মল থাকে উহা হইতে আল্লাহ তা’আলা সাদা সুস্বাদু ও সুমিষ্ট দুধ পৃথক করিয়া স্তনে পৌঁছাইয়া দেন। রক্ত রগসমূহের মধ্যে প্রবেশ করে পেশাব মুত্র নালিতে এবং মল উহার আপন স্থানে পৌছিয়া যায়। অথচ ইহার কোনটি অপরটির সহিত মিশ্রিত হয় না এবং le لَبَنًا خَالِصًا سَائِعًا لِلشَّارِبِينَ ال 96 Gala aa wafice আল্লাহ তা’আলা এমন বিশুদ্ধ দুধ তোমাদের জন্য বাহির করেন যাহা চাবাইবার প্রয়োজন হয় না বরং মুখের মধ্যে প্রবেশ করিবার সাথে সাথেই হলকের নীচে চলিয়া যায়।
আল্লাহ তা’আলা দুধের আলোচনার পরপরই মদের আলোচনা করিয়াছেন যাহা
খেজুর ও আঙ্গুর হইতে প্রস্তুত করা হয়। দুধ পান করিবার মত ইহা পান করিতেও কোন কষ্ট হয় না। তবে মনে রাখিতে হইবে যে, এই আয়াত মদ হারাম হইবার পূর্বে অবতীর্ণ হইয়াছিল। এই কারণেই আল্লাহ তা’আলা এখানে ইহাকে আল্লাহর অনুগ্রহ হিসাবে বর্ণনা করিয়াছেন। ইরশাদ হইয়াছে وَمِنْ ثَمَرَاتِ النَّخِيُلِ وَالْأَعْنَابِ تَتَّخِذُونَ

এবারে আসুন বুখারী শরীফের একটি ব্যাখ্যা দেখে নিই,
৪৯ গোবর ও রক্তের মাঝখান দিয়ে পরিষ্কার দুধ বের করা সম্পর্কে আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস বলেন: জন্তুর ভক্ষিত ঘাস তার পাকস্থলীতে একত্রিত হলে পাকস্থলী তা সিদ্ধ করে। পাকস্থলীর এই ক্রিয়ার ফলে খাদ্যের বিষ্ঠা নীচে বসে যায় এবং দুধ উপরে থেকে যায়। দুধের উপর থাকে রক্ত। এরপর যকৃত এই তিন প্রকার বস্তুকে পৃথকভাবে তাদের স্থানে ভাগ করে দেয়, রক্ত পৃথক করে রগের মধ্যে চালায় এবং দুধ পৃথক করে জন্তুর স্তনে পৌঁছে দেয়। এখন পাকস্থলীতে শুধু বিষ্ঠা থেকে যায়, যা গোবর হয়ে বের হয়ে আসে। (মাআরেফুল কুরআন বাংলা সংস্করণ পৃঃ ৭৪৬)

প্রাচীন এই ব্যাখ্যাগুলো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, তৎকালীন মানুষ পশুর পেট কাটলে একদিকে গোবর এবং অন্যদিকে রক্ত দেখতে পেত। এই দৃশ্যমান অভিজ্ঞতার ওপর ভিত্তি করেই তারা ধারণা করে নিয়েছিল যে, পবিত্র দুধ নিশ্চয়ই এই দুই ‘অপবিত্র’ বস্তুর মাঝখান থেকেই কোনো অলৌকিক উপায়ে নিঃসৃত হয়। এই ধারণাটি মূলত পর্যবেক্ষণমূলক ভুল (Observational Error), যা আধুনিক অণুবীক্ষণিক জীববিজ্ঞানের যুগে পুরোপুরি অচল। সুতরাং, কোরআনিক আয়াতের এই বর্ণনা এবং তার সমসাময়িক ব্যাখ্যাগুলো মূলত সপ্তম শতাব্দীর আরবের মানুষের সীমিত জ্ঞান এবং প্রচলিত কুসংস্কারেরই প্রতিফলন, যা কোনোভাবেই আধুনিক বিজ্ঞানের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
দুগ্ধ উৎপাদনঃ নিষ্ক্রিয় ছাঁকুনি বনাম জৈব-রাসায়নিক কারখানা
কোরআনের বর্ণনায় দুধকে ‘গোবর ও রক্তের মধ্যবর্তী’ স্থান থেকে আসা একটি বিশুদ্ধ পানীয় হিসেবে চিত্রায়িত করা হয়েছে, যা মূলত একটি প্রাচীন ‘পরিশোধন’ (Filtration) ধারণাকে সমর্থন করে। কিন্তু আধুনিক প্রাণরসায়ন (Biochemistry) আমাদের জানায় যে, দুধ কোনো পূর্ব-প্রস্তুত তরল নয় যা শরীর কেবল গোবর বা রক্ত থেকে ছেঁকে বের করে আনে। স্তন্যপায়ী প্রাণীর দুগ্ধ উৎপাদন প্রক্রিয়া বা ‘ল্যাকটোজেনেসিস’ (Lactogenesis) কোনো নিষ্ক্রিয় ছাঁকুনি প্রক্রিয়া নয়, বরং এটি স্তনগ্রন্থির এলভিওলার এপিথেলিয়াল কোষের ভেতরে ঘটা একটি জটিল এবং সক্রিয় সংশ্লেষণ প্রক্রিয়া। রক্তপ্রবাহের কাজ এখানে কেবল কাঁচামাল (যেমন: অ্যামিনো অ্যাসিড, গ্লুকোজ ও ফ্যাটি অ্যাসিড) সরবরাহ করা। আশ্চর্যজনক সত্য হলো, দুধের প্রধান উপাদানগুলো—যেমন কেসিন (Casein) নামক প্রোটিন কিংবা ল্যাকটোজ (Lactose) নামক শর্করা—রক্তের মধ্যে এই রূপে বিদ্যমান থাকে না। স্তনগ্রন্থির কোষগুলো রক্ত থেকে আসা পুষ্টি উপাদানগুলোকে ভেঙে সম্পূর্ণ নতুন রাসায়নিক গঠন তৈরি করে। অর্থাৎ, দুধ রক্ত বা গোবরের কোনো মধ্যবর্তী নির্যাস নয়, বরং এটি শরীরের একটি বিশেষায়িত অঙ্গের নিজস্ব উৎপাদন। গোবর পরিপাকতন্ত্রের বর্জ্য হিসেবে মলাশয় দিয়ে নির্গত হয় এবং রক্ত সংবহনতন্ত্রের নালীতে আবদ্ধ থাকে; এই দুইয়ের মাঝখানে দুধ তৈরির কোনো ‘ভৌতিক’ বা ‘শারীরস্থানিক’ কক্ষপথের অস্তিত্ব বিজ্ঞানে অসম্ভব।
দুগ্ধ উৎপাদন প্রক্রিয়ায় স্তনগ্রন্থির এই সক্রিয় ভূমিকা প্রাচীন বর্ণনাগুলোকে আমূল বাতিল করে দেয়। প্রাচীন তাফসিরকারকগণ যখন দাবি করেন যে যকৃত দুধকে পৃথক করে স্তনে পাঠিয়ে দেয়, তখন তারা মূলত কোষীয় পর্যায়ে ঘটে যাওয়া এই জৈব-রাসায়নিক সংশ্লেষণ সম্পর্কে সম্পূর্ণ অজ্ঞ ছিলেন। বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিকোণ থেকে, গোবর হলো অন্ত্রের ভেতরের বস্তু আর দুধ হলো শরীরের এপিথেলিয়াল টিস্যু থেকে নিঃসৃত একটি সম্পূর্ণ ভিন্ন রাসায়নিক তরল। এদের মধ্যে কোনো সংস্থানগত সংযোগ নেই। ‘গোবর ও রক্তের মধ্যবর্তী স্থান’ বলতে কোনো শারীরস্থানিক অঞ্চল পশুর দেহে নেই; এটি কেবল সপ্তম শতাব্দীর মানুষের একধরণের অনুমাননির্ভর বর্ণনা যা আধুনিক এনাটমি ও ফিজিওলজির কাছে হাস্যকর ও ভিত্তিহীন।
যকৃতের ভূমিকা এবং প্রাচীন শারীরবিদ্যার ভ্রান্তি
প্রাচীন ও মধ্যযুগীয় তাফসিরকারকগণ কোরআনের ১৬:৬৬ আয়াতকে সমর্থন করতে গিয়ে যকৃতের (Liver) কার্যাবলী সম্পর্কে যে বিবরণ দিয়েছেন, তা মূলত তৎকালীন সময়ের অপেশাদার শারীরবিদ্যার একটি দলিল। তাফসীরে মাযহারী এবং জালালাইনে হযরত ইবনে আব্বাসের সূত্রে দাবি করা হয়েছে যে, পাকস্থলীতে পরিপাক শেষে যকৃত একটি ‘বাছাইকারী যন্ত্র’ হিসেবে কাজ করে, যা খাদ্যনির্যাসকে তিন ভাগে ভাগ করে নির্দিষ্ট গন্তব্যে পাঠিয়ে দেয় [6]। তাদের মতে, যকৃত রক্তকে ধমনীতে এবং দুধকে ওলানে বা স্তনে প্রবাহিত করে, আর গোবরকে তার নির্দিষ্ট স্থানে রেখে দেয় [7]। আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞান বা হেপাটোলজি (Hepatology) অনুযায়ী, যকৃতের এমন কোনো শারীরস্থানিক ক্ষমতা বা নালী নেই যা সরাসরি স্তনগ্রন্থির সাথে যুক্ত হয়ে ‘দুধ’ নামক কোনো তরল সেখানে পৌঁছে দিতে পারে। যকৃত মূলত রক্ত থেকে পুষ্টি উপাদান গ্রহণ করে তা বিপাক (Metabolism) করে এবং গ্লাইকোজেন হিসেবে শক্তি সঞ্চয় করে বা বিষমুক্তকরণ প্রক্রিয়া চালায়। এটি কোনোভাবেই গোবর থেকে দুধকে ‘ছেঁকে’ আলাদা করার কোনো ফিল্টার হিসেবে কাজ করে না।
এই শারীরবৃত্তীয় অসংগতিটি আরও প্রকট হয়ে ওঠে যখন আমরা পশুর সংবহনতন্ত্র পর্যবেক্ষণ করি। যকৃত থেকে কোনো তরল সরাসরি স্তনগ্রন্থিতে যাওয়ার কোনো ‘দুধবাহী নালী’ (Milk Duct) নেই। বরং, স্তনগ্রন্থি তার প্রয়োজনীয় কাঁচামাল সাধারণ রক্তপ্রবাহ থেকেই সংগ্রহ করে, যা শরীরের অন্যান্য অঙ্গের মতোই সাধারণ সংবহন প্রক্রিয়ার অংশ। প্রাচীন তাফসিরকারকগণ ‘গোবর ও রক্তের মধ্যবর্তী স্থান’ বলতে যা বুঝিয়েছেন, তা মূলত কোনো বাস্তব স্থান নয়, বরং একটি লজিক্যাল ফ্যালাসি বা যৌক্তিক হেয়ালি। তারা মনে করতেন, যেহেতু গোবর নিচে থাকে এবং রক্ত শরীরে প্রবাহিত হয়, তাই দুধ নিশ্চয়ই এদের মাঝখান থেকে কোনো অলৌকিক কায়দায় পরিশোধিত হয়ে আসে [8]। আধুনিক শারীরস্থান অনুযায়ী, গোবর বা মলের অবস্থান হলো মলাশয়ে (Rectum), যা শরীরের পেছনের অংশে অবস্থিত; আর স্তনগ্রন্থি শরীরের নিচের অংশে একটি সম্পূর্ণ ভিন্ন প্রকোষ্ঠে অবস্থিত। এই দুইয়ের মধ্যে কোনো ‘মধ্যবর্তী স্থান’ থেকে কোনো কিছু নিঃসৃত হওয়ার দাবিটি প্রাক-বৈজ্ঞানিক যুগের ব্যবচ্ছেদবিদ্যার দুর্বলতাকেই নির্দেশ করে।
পর্যবেক্ষণমূলক ভুল এবং সপ্তম শতাব্দীর জ্ঞানতাত্ত্বিক সীমাবদ্ধতা
কোরআনের বর্ণনায় যে ‘গোবর ও রক্তের মধ্যবর্তী স্থান’ থেকে দুধ আসার কথা বলা হয়েছে, তা মূলত সপ্তম শতাব্দীর একজন সাধারণ মানুষের ‘খালি চোখের পর্যবেক্ষণ’ বা ‘Naked-eye Observation’-এর একটি ধ্রুপদী উদাহরণ। তৎকালীন আরবের মানুষের কাছে উন্নত কোনো অণুবীক্ষণিক যন্ত্রপাতি বা কোষতত্ত্বের (Cell Theory) জ্ঞান ছিল না। তাদের জ্ঞানতাত্ত্বিক সীমাবদ্ধতা ছিল তাদের চারপাশের দৃশ্যমান জগতের অভিজ্ঞতায় সীমাবদ্ধ। যখন একটি পশু জবাই করা হতো, তখন একজন পর্যবেক্ষক তিনটি জিনিস সরাসরি দেখতে পেতেন: পরিপাকতন্ত্রের ভেতরে থাকা অর্ধ-পাচিত ঘাস বা মল (গোবর), শরীরের রক্ত এবং ওলানে থাকা দুধ। এই তিনটি উপাদানকে শরীরের অভ্যন্তরে দেখার পর, সেই সময়ের মানুষের জন্য এটি একটি যৌক্তিক অনুমান ছিল যে, যেহেতু দুধ সাদা ও বিশুদ্ধ এবং গোবর ও রক্ত লাল ও দুর্গন্ধযুক্ত, তাই নিশ্চয়ই কোনো অলৌকিক প্রক্রিয়ায় এই দুই অপবিত্র স্তরের মাঝখান থেকে দুধ ছেঁকে বের হয়ে আসে [1]। এই ধরণের চিন্তাধারাকে বিজ্ঞানের ভাষায় ‘পর্যবেক্ষণমূলক লজিক্যাল ফ্যালাসি’ বলা হয়, যেখানে কার্যকারণ সম্পর্ক (Causality) নির্ণয়ে ভুল করা হয়েছে।
এই প্রাক-বৈজ্ঞানিক ধারণাটি মূলত ‘পবিত্রতা বনাম অপবিত্রতা’ নামক একটি ধর্মতাত্ত্বিক রূপককে প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা করেছে। তাফসীরগুলোতে বারবার জোর দেওয়া হয়েছে যে, রক্ত ও গোবরের মতো দুটি ভিন্ন রঙ ও গন্ধের বস্তুর মাঝখান থেকে কীভাবে ‘বিশুদ্ধ’ দুধ বেরিয়ে আসে, তা একটি নিদর্শন [9]। কিন্তু শারীরবৃত্তীয়ভাবে দুধ কোনোভাবেই রক্ত বা গোবরের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয় না। রক্ত কেবল পুষ্টির বাহক হিসেবে কাজ করে, যা শরীরের প্রতিটি কোষেই যায়—চোখের পানি বা ঘাম তৈরিতেও রক্ত পুষ্টি যোগায়। কিন্তু আমরা কখনোই বলি না যে চোখের পানি রক্ত ও গোবরের মাঝখান থেকে আসে। কোরআনের এই নির্দিষ্ট বর্ণনাটি প্রমাণ করে যে, তৎকালীন লেখক বা বক্তার কাছে দুধের উৎপাদন প্রক্রিয়াটি ছিল একটি বিস্ময়কর ‘ছাঁকুনি প্রক্রিয়া’ যা কেবল বাহ্যিক দৃশ্যপট থেকেই অনুমান করা সম্ভব ছিল। এই ধরণের পর্যবেক্ষণলব্ধ বর্ণনা আধুনিক বৈজ্ঞানিক মানদণ্ডে উত্তীর্ণ হওয়া তো দূরের কথা, বরং এটি মধ্যযুগীয় ভুল ধারণারই একটি লিখিত দলিল হিসেবে গণ্য হয়।
উপসংহারঃ বৈজ্ঞানিক সত্যের বিজয় ও বিশ্বাসের সংকট
সার্বিক বিশ্লেষণের পর এটি দ্ব্যর্থহীনভাবে বলা যায় যে, গবাদি পশুর দুগ্ধ উৎপাদন সম্পর্কে কোরআনের বর্ণনাটি কোনো অলৌকিক বা গূঢ় সত্য নয়, বরং এটি সপ্তম শতাব্দীর এক আদিম ও স্থূল পর্যবেক্ষণেরই লিখিত রূপ। আধুনিক জীববিজ্ঞানের জয়যাত্রা যেখানে স্তন্যগ্রন্থির কোষীয় কার্যকলাপ, হরমোনের প্রভাব এবং ডিএনএ-নির্ভর প্রোটিন সংশ্লেষণকে প্রতিটি ধাপে প্রমাণ করে দিয়েছে, সেখানে ‘গোবর ও রক্তের মধ্যবর্তী স্থান’ থেকে দুধ আসার দাবিটি নিছক একটি শারীরস্থানিক রূপকথা। বিজ্ঞান প্রমাণ করেছে যে দুধ কোনো ‘পরিশোধিত বর্জ্য’ নয়, বরং রক্তবাহিত পুষ্টি উপাদানকে কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহার করে শরীরের একটি বিশেষায়িত কারখানায় তৈরি হওয়া সম্পূর্ণ নতুন একটি জৈব-রাসায়নিক পণ্য। এই প্রক্রিয়ায় পরিপাকতন্ত্রের বর্জ্য বা গোবরের কোনো ভূমিকা নেই এবং শারীরস্থানিক দিক থেকেও এদের মধ্যে কোনো উৎপত্তিমূলক বা সংস্থানগত সংযোগ নেই।
পরিশেষে বলা যায়, বিশ্বাসের অন্ধগলি মানুষের জ্ঞানতাত্ত্বিক বিকাশকে ব্যাহত করে এবং তাকে প্রাচীন কুসংস্কারের বৃত্তে আটকে রাখে। কোরআনের ১৬:৬৬ আয়াতের ভ্রান্ত তথ্যটি আমাদের চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় যে, ধর্মগ্রন্থগুলো মূলত তাদের সময়ের জ্ঞানের প্রতিফলন মাত্র। বিজ্ঞানের অগ্রগতির সাথে সাথে যখন এই ধরণের দাবিগুলো ধুলিসাৎ হয়ে যায়, তখন সেগুলো রক্ষার জন্য অদ্ভুত সব অজুহাত তৈরি না করে বরং বাস্তবতাকে মেনে নেওয়াই যুক্তিবাদিতার পরিচয়। জ্ঞান কোনো স্থির বিষয় নয়; এটি পরিবর্তনশীল এবং প্রমাণের ওপর নির্ভরশীল। আর সেই প্রমাণের দাড়িপাল্লায় কোরআনের এই শারীরবৃত্তীয় বর্ণনাটি একটি সুস্পষ্ট বৈজ্ঞানিক ভুল হিসেবেই চিহ্নিত হয়।
About This Article
Genre: Semi-Academic Skeptical Analysis
Epistemic Position: Scientific Skepticism and Secular Humanist Ethics
This article belongs to the skeptical-rationalist analytical tradition of Shongshoy.com.
Its purpose is not theological neutrality or artificial both-sides balance, but evidence-based critical examination of religious, philosophical, moral, and historical claims.
Neutrality here means methodological fairness: accurate use of sources, logical rigor, evidentiary discipline, and factual consistency. It does not mean moral indifference or equal treatment between harmful doctrines and their criticism.
Strong criticism should not be mistaken for bias if it is supported by evidence and sound reasoning.
This article should be evaluated through source quality, evidentiary strength, logical rigor, factual consistency, and fairness in representing opposing claims—not through theological sensitivity, apologetic expectations, or demand for rhetorical softness.
তথ্যসূত্রঃ
- কোরআন, সূরা নাহল, আয়াত ৬৬ 1 2
- সূরা নাহল, আয়াত ৬৬ ↩︎
- তাফসীরে জালালাইন, ৩য় খণ্ড, ইসলামিয়া কুতুবখানা প্রকাশনী, পৃষ্ঠা ৪৯৫ ↩︎
- তাফসীরে মাযহারী, খন্দ ৬, পৃষ্ঠা ৫৪১, ৫৪২ ↩︎
- তাফসীরে ইবনে কাসীর, ৬ষ্ঠ খণ্ড, পৃষ্ঠা ১২২, ১২৩ ↩︎
- তাফসীরে জালালাইন, ৩য় খণ্ড, ইসলামিয়া কুতুবখানা প্রকাশনী, পৃষ্ঠা ৪৯৫ ↩︎
- তাফসীরে মাযহারী, খণ্ড ৬, পৃষ্ঠা ৫৪১-৫৪২ ↩︎
- তাফসীরে ইবনে কাসীর, ৬ষ্ঠ খণ্ড, পৃষ্ঠা ১২২-১২৩ ↩︎
- তাফসীরে ইবনে কাসীর, ৬ষ্ঠ খণ্ড, পৃষ্ঠা ১২৩ ↩︎
