কুরআন এবং ভ্রূণের বিকাশ: আলাকাহ পর্যায়

পূর্ববর্তী পর্বঃ কুুরআন এবং ভ্রূণের বিকাশ – ‘নুতফা’ পর্যায়

আলাকাহ পর্যায়

কুরআনের ভ্রূণ বিকাশের বর্ণনা থেকে জানা যায়, নুতফা পর্যায়ের পর আসে আলাকাহ পর্যায়। কুরআন বলে, নুতফা (বীর্য) আলাকায় পরিণত হয়।

কুরআনে ‘আলাকাহ’ শব্দটি দ্বারা ‘জমাট রক্ত’ বোঝানো হয়েছে।

একটি ভ্রূণকে কখনোই ‘জমাট রক্ত’ বলা যায় না। একটি ভ্রূণ তার বিকাশের কোনো পর্যায়েই জমাট রক্তে পরিণত হয় না।

গত তিন দশক ধরেই ‘আলাকাহ’ শব্দটি কুরআনের অন্যতম আলোচিত একটি শব্দ। কুরআনের ভ্রূণ বিকাশের বর্ণনার এই ‘আলাকাহ পর্যায়’ পৃথিবীজুড়ে অনেক বেশি আলোচিত হয় যখন টরন্টো বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শারীরস্থানবিৎ অধ্যাপক কিথ মুর কুরআনের বর্ণনার সমর্থনে কিছু বিশেষ বিবৃতি দেন। কিথ মুরের বিবৃতি কুরআনের ভ্রূণ বিকাশের বর্ণনা নির্ভুল প্রমাণ করে ফেলেছে, এমনটা ভেবেই মুসলিমরা স্বস্তি বোধ করেন। তারা বিশ্বাস করেন, কিথ মুরের বক্তব্য মানব ভ্রূণের বিকাশ নিয়ে কুরআনের বক্তব্যকে পুরোপুরি সঠিক প্রমাণ করে। মুসলিম অ্যাপোলজিস্টরা আজও ইসলামকে সত্য ধর্ম বলে ঈশ্বরের পাঠানো ধর্ম বলে প্রমাণ করতে কিথ মুরের নাম এবং তার বক্তব্য সমূহ ব্যবহার করেন। অমুসলিমদের ইসলামে ধর্মান্তর করার উদ্দেশ্যে এবং সাধারণ মুসলিমদের ইসলামের প্রতি আরও অন্ধ করে রাখতে ইসলাম প্রচারকগণ কিথ মুরের নাম আর তার বক্তব্য সমূহ ব্যবহার করে প্রচার করেন, মানব ভ্রূণের বিকাশ নিয়ে আধুনিক বিজ্ঞানের প্রমাণিত তথ্য যা বলে তার সাথে ১৪০০ বছর আগের গ্রন্থ কুরআনের বর্ণনার কোনো অমিল নেই। আপনি যদি তাদের সাথে দ্বিমত পোষণ করে তাদের মতের বিরুদ্ধে কিছু বলেন তাহলে আপনার বিরুদ্ধে তারা অত্যন্ত উদ্ভট এবং বাচ্চাসুলভ একটি জবাব দিবেন, আর সেটি হলো, “আপনি কি মেডিকেলে পড়েছেন?” কিংবা, “আপনি কি বিজ্ঞানের ছাত্র?”

ইসলাম প্রচারকদের এই বিশেষ একজন মানুষের নাম ব্যাবহার করে মানব ভ্রূণের বিকাশ নিয়ে কুরআনের বর্ণনা সমূহ নির্ভুল প্রমাণ করার চেষ্টা দেখে মনে হয় তারা যুক্তিবিদ্যা নিয়ে কোনোরকম কোনো জ্ঞান রাখে না বা, খুব একটা জ্ঞান রাখে না বা, তাদের বক্তব্য সমূহ কতটুকু যুক্তিযুক্ত কতটুকু গ্রহণযোগ্য তা নিয়ে তারা দ্বিতীয় বার ভেবে দেখেন না। কিথ মুরের নাম ব্যবহার করে কুরআনের ভ্রূণ বিকাশের বর্ণনা সঠিক বলে প্রমাণ করার এই চেষ্টা প্রকৃত পক্ষে এক প্রকার কুযুক্তি বা লজিক্যাল ফ্যালাসি, আর এই ধরনের লজিক্যাল ফ্যালাসিকে বলে ARGUMENTUM AD VERECUNDIAM বা, ARGUMENT FROM AUTHORITY, যাকে বাংলায় বলা হয় প্রাধিকারের কুযুক্তি। কোনো বিশেষ লোকের নাম ব্যাবহার করে কোনোকিছু প্রমাণ করার বা ন্যায্যতা প্রদান করার চেষ্টা করা হলে তা ARGUMENT FROM AUTHORITY বা প্রাধিকারের কুযুক্তি বলে গণ্য হবে। যেমন, যদি বলা হয়, “নিশ্চয়ই ঈশ্বর আছেন, কেননা বিজ্ঞানী নিউটনের মতো জ্ঞানী লোকও ঈশ্বরে বিশ্বাস করতেন” তাহলে সেটি লজিক্যাল ফ্যালাসি বা কুযুক্তি বলে গণ্য হবে। কারণ, নিউটনের মতো জ্ঞানী লোক ঈশ্বরে বিশ্বাস করলেই প্রমানিত হয় না যে, ঈশ্বর বলে আসলেই কোনো অলৌকিক সত্ত্বার অস্তিত্ব আছে। সেইজন্যই, কেউ যদি ঈশ্বর আছে বলে প্রমাণ করতে বা ঈশ্বরে বিশ্বাসকে সঠিক সিদ্ধান্ত বলে প্রমাণ করতে বিজ্ঞানী নিউটনের নাম ব্যাবহার করেন তাহলে তা ARGUMENT FROM AUTHORITY বা প্রাধিকারের কুযুক্তি বলে গণ্য হবে।

ইসলাম প্রচারকরা প্রচার করেন যে, মানব ভ্রূণের বিকাশ নিয়ে কুরআনের বর্ণনা সমূহকে ড. কিথ মুর সত্য বলে প্রমাণ করেছেন, আর সেই কিথ মুর এমন একজন লোক যিনি না কুরআন অনুসরণ করেন না কুরআন বুঝেন। তিনি এমন একজন লোক যিনি না ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন, না কুরআনের ভাষায় কথা বলেন।

কিথ মুর বলেছেন,

“As Dr. Persaud said, we don’t read Arabic. The Scholars translated for us. We simply give our interpretations. We are not saying they are accurate.” [1]

Embryology in the Quran with Drs. TVN Persaud, Keith L. Moore and E Marshall Johnson

‘আলাকাহ’ শব্দটির জন্য মুসলিম অ্যাপোলজিস্টরা এই অর্থ সমূহ তুলে ধরেনঃ

ক) ঝুলন্ত/স্থগিত খ) জোঁকের মতো বস্তু গ) রক্তপিণ্ড

এই অর্থ সমূহ ব্যবহার করে তারা আলাকাহ পর্যায়কে বাস্তবতার সাথে সংগতিপূর্ণ করে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করেন।

ক) ঝুলন্ত/স্থগিত

‘আলাকাহ’ শব্দটির মূল ‘আলাক’ শব্দটির অর্থ ঝুলে থাকা বা আটকে থাকা। [2]

অ্যাপোলজিস্টদের দাবি, ‘আলাকাহ’ শব্দটি দ্বারা যেকোনো কিছুই বোঝায় যা ঝুলে থাকে বা আটকে থাকে। তাদের দাবি অনুসারে, ‘ঝুলন্ত বা স্থগিত’ অর্থটি ভ্রূণের কানেকটিং স্টকের সাহায্যে ঝুলে থাকা নির্দেশ করে।

‘আলাকাহ’ শব্দটি দ্বারা যদি এমন কিছু বোঝায় যা ঝুলে থাকে বা আটকে থাকে তাহলে আমরা যেকোনো কিছুকেই ‘আলাকাহ’ বলতে পারি। আপনি যে জামাটি গায়ে দিয়ে এই লেখাটি পড়ছেন সেটিও ‘আলাকাহ’ বলে দাবি করা যায়, কেননা আপনার গায়ের জামাটি আপনার গায়ের সাথে ‘ঝুলছে’ বা আপনার গায়ের সাথে ‘আটকে আছে’। আপনি যে ফোনটি হাতে নিয়ে এই প্রবন্ধটি পড়ছেন সেই ফোনটিকেও ‘আলাকাহ’ বলে দাবি করা যায়, কেননা আপনার হাতে থাকা মোবাইল ফোনটিও আপনার হাতের সাথে ‘আটকে’ আছে। যেকোনো ধরণের ফল এবং ফুলকেও ‘আলাকাহ’ হিসেবে বর্ণনা করা যায়, কেননা যেকোনো ধরণের ফল এবং ফুলও গাছের সাথে ‘ঝুলে থাকে’ বা ‘আটকে থাকে’। আমরা আকাশে উড়ে বেড়ানো পাখিও ‘আলাকাহ’ হিসেবে বর্ণনা করতে পারি, কেননা আকাশে উড়ে বেড়ানো পাখিও বাতাসের সাথে ‘সংলগ্ন’ আছে বলে বর্ণনা করা যায়। এমনকি পৃথিবী, অন্যান্য গ্রহ সমূহ এবং নক্ষত্র সমূহকেও আমরা ‘আলাকাহ’ হিসেবে বর্ণনা করতে পারি, কেননা আমরা বলতে পারি পৃথিবী, অন্যান্য গ্রহ সমূহ এবং নক্ষত্র সমূহ শূন্যের সাথে ‘সংলগ্ন’ আছে।

প্রতিটি বস্তুই কোনো না কোনো ভাবে ‘ঝুলছে’ অথবা ‘আটকে আছে’ বলে বর্ণনা করা যায়। এমন কোনো প্রাকৃতিক বস্তুর অস্তিত্ব থাকা ধারণাতীত যা ‘ঝুলছে’ বা ‘আটকে আছে’ বলে বর্ণনা করা যায়না। আর তাই এটি মনে করাটা খুবই হাস্যকর যে ‘ঝুলন্ত বস্তু’ বা ‘স্থগিত বস্তু’ দ্বারা ভ্রূণ বিকাশের কোনো বিশেষ পর্যায়ের কথা নির্দেশ করা যায়। আর সেজন্যই এই দাবিটি অর্থহীন যে কুরআনে ‘আলাকাহ’ শব্দটি দ্বারা ‘ঝুলন্ত বস্তু’ বা ‘সংলগ্ন বস্তু’ বোঝানো হয়েছে।

অ্যাপোলজিস্টদের এই ব্যাখাটির আরও একটি বড় সমস্যা হলো, ব্যাখাটি কুরআন হাদিসের তথ্যের বিরুদ্ধে যায়। কারণ, ভ্রূণ অ্যামনিয়টিক ক্যাভিটিতে স্থগিত থাকে এবং বাচ্চার জন্ম অব্দি নাভিরজ্জুর সাথে সংযুক্ত থাকে বা সংলগ্নে থাকে। অর্থ্যাৎ, কুরআনে ‘আলাকাহ’ শব্দটি দ্বারা যদি ‘ঝুলন্ত বস্তু’ বা ‘সংলগ্ন বস্তু’ বোঝানো হয়ে থাকে, তাহলে আলাকাহ পর্যায়কে হতে হবে ভ্রূণ বিকাশের একটি সর্বোচ্চ পর্যায়।

সূরা আল-মু’মিনুনের ১৪ নং আয়াত বলছে, আল্লাহ্ ‘আলাকাহ’ কে মাংসপিণ্ডে পরিণত করেন।

23:14
পরে আমি বীর্যকে পরিণত করি 'আলাকাহ' তে, অতঃপর রক্তপিন্ডকে পরিণত করি মাংসপিন্ডে এবং মাংসপিন্ডকে পরিণত করি অস্থিপঞ্জরে; অতঃপর অস্থিপঞ্জরকে ঢেকে দিই মাংস দ্বারা; অবশেষে ওকে গড়ে তুলি অন্য এক সৃষ্টি রূপে; অতএব নিপুণতম স্রষ্টা আল্লাহ কত কল্যাণময়!

আবার, সহিহ বুখারী হাদিস গ্রন্থের একটি সহিহ হাদিস বলছে, একটি ভ্রূণ আলাকাহ পর্যায়ে পৌঁছায় চল্লিশ তম দিনে এবং এই আলাকাহ পর্যায়ের শেষ হয় আশি তম দিনে।

গ্রন্থঃ সহীহ বুখারী (ইফাঃ)
অধ্যায়ঃ ৭০/ তাকদির (كتاب القدر)
হাদিস নম্বরঃ ৬১৪২
পরিচ্ছেদ নাই
৬১৪২। আবূল ওয়ালীদ হিশাম ইবনু আবদউল মালিক (রহঃ) … আবদূলাহ ইবনু মাসউদ (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেনঃ বিশ্বাসী ও বিশ্বস্ত রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ তোমাদের প্রত্যেকেই আপন আপন মাতৃগর্ভে চল্লিশ দিন পর্যন্ত বীর্য হিসেবে জমা থাক। তারপর ঐরুপ চল্লিশ দিন রক্তপিণ্ড এবং এরপর ঐরুপ চল্লিশ দিন মাংসপিণ্ড হিসেবে থাকে। তারপর আল্লাহ একজন ফেরেশতা প্রেরন করেন এবং তাকে বিযিক, মউত, দূর্ভাগ্য ও সৌভাগ্য-এ চারটি ব্যাপার লিপিবদ্ধ করার জন্য নির্দেশ প্রদান করা হয়। তিনি আরও বলেন, আল্লাহর কসম! তোমাদের মাঝে যে কেউ অথবা বলেছেনঃ কোন ব্যাক্তি জাহান্নামীদের আমল করতে থাকে। এমন কি তার মাঝে এবং জাহান্নামের মাঝে তখন কেবলমাত্র একহাত বা এক গজের ব্যবধান থাকে। এমন সময় তাকদীর তার ওপর প্রাধান্য বিস্তার করে আর তখন সে জান্নাতীদের আমল করা শুরু করে দেয়। ফলে সে জান্নাতে প্রবেশ করে। আর এক ব্যাক্তি বেহেশতীদের আমল করতে থাকে। এমন কি তার মাঝে ও জান্নাতের মাঝে কেবলমাত্র এক গজ বা দু-গজের ব্যবধান থাকে। এমন সময় তাকদীর তার উপর প্রাধান্য বিস্তার করে আর অমনি সে জাহান্নামীদের আমল শুরু করে দেয়। ফলে সে জাহান্নামে প্রবেশ করে। আবূ আবদুল্লাহ বুখারী (রহঃ) বলেন যে, আদম তার বর্ননায় শুধুমাত্র ذِرَاعٌ‏ (এক গজ) বলেছেন।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)

কুরআনে ‘আলাকাহ’ শব্দটি দ্বারা যদি ‘ঝুলন্ত বস্তু’ বা ‘স্থগিত বস্তু’ বা ‘আটকে থাকা বস্তু’ বোঝানো হয়ে থাকে তাহলে ইসলামী গ্রন্থ সমূহ ভুলভাবে বলছে যে, ভ্রূণ কেবল চল্লিশ দিনের জন্যই স্থগিত থাকে বা আটকে থাকে এবং চল্লিশ দিন পর তা মাংসপিণ্ডে পরিনত হয়। অর্থ্যাৎ, ইসলাম প্রচারকদের এই দাবিটি সত্য হলেও কুরআন ভুল প্রমানিত হবে।

আরও একটি সমস্যা আছে আর সেটা হলো, ‘কানেকটিং স্টক’ হলো নাভিরজ্জুর পূর্ববর্তী অবস্থা আর নাভিরজ্জুর সাথে সংযুক্ত অবস্থাতেই বাচ্চা তার মায়ের পেট থেকে জন্ম নেয়। পরিষ্কারভাবেই অ্যাপোলজিস্টদের এই ব্যাখাটি ভ্রূণ বিকাশের কোনো নির্দিষ্ট পর্যায়ের জন্য প্রযোজ্য হতে পারে না।

খ) জোঁকের মতো বস্তু

অ্যাপোলজিস্টদের দাবি, ‘আলাকাহ’ শব্দটি দ্বারা জোঁকের মতো বস্তুও বোঝায় আর এই অর্থটি বাস্তবতার সাথে সংগতিপূর্ণ। তারা বলেন, একটি ভ্রূণ মায়ের জরায়ুতে থাকাকালীন ১৫ থেকে ২০ দিনে একটি জোঁকের মতো আকৃতিতে পরিণত হয়। আবার, জোঁক যেমন যেখানে লেগে থাকে সেখান থেকে রক্ত চোষে তেমনি একটি ভ্রূণও মায়ের শরীর থেকে রক্তের মাধ্যমে পুষ্টি নেয়।

‘আলাকাহ’ শব্দটির অর্থ ‘জোঁকের মতো বস্তু’ বলাটা ভুল। ‘আলাকাহ’ অর্থ ‘জোঁক’, ‘জোঁকের মতো বস্তু’ নয়। [3] আপনি বলতে পারেন, ‘জোঁক’ শব্দটি জোঁকের মতো বস্তুও বোঝাতে পারে। উদাহরণ দিয়ে বোঝানোর জন্য আপনি বলতে পারেন, ‘আরিফ একটি ছাগল’ কথাটির মানে এই না যে আরিফ আসলেই একটি তৃণভোজী গৃহপালিত প্রাণী যে কাঁঠাল পাতা খেতে ভালোবাসে, বরং আরিফ ছাগলের মতো।

যখন কেউ এমন একটি বাক্য প্রকাশ করেন যে, ‘আরিফ একটি ছাগল’, তিনি মূলত রূপক অর্থে নির্দিষ্ট বৈশিষ্ট্যাবলী বা চরিত্র বোঝান। ‘আরিফ একটি ছাগল’ কথাটি হয়তো প্রকাশ করে আরিফ কোনো বোকা বা অল্পবুদ্ধির লোক। একইভাবে কেউ যদি বলে, ‘আরিফ একটি জোঁক’, এটি হয়তো প্রকাশ করে, আরিফ নামক একটি লোক কারো অর্থ আত্মসাৎ করার চেষ্টা করছে।

এখানে একটি অত্যাবশ্যক প্রশ্ন এসে যায় আর প্রশ্নটি হলো, এটা বলা ন্যায্য কিনা যে, ‘আরিফ একটি ছাগল’ কথাটি প্রকাশ করে, আরিফের আকৃতি আর একটি ছাগলের আকৃতি পুরোপুরি এক। এরকম রূপক অর্থের ব্যবহার খুঁজে পাওয়া খুব কঠিন। কারণ কোনোকিছুর প্রকৃত আকৃতি প্রকাশ করতে রূপক অর্থের ব্যাবহার দুর্বোধ্য।

আবার, ‘আরিফ একটি হাতি’ কথাটি আরিফ নামক কোনো লোকের আকার প্রকাশ করবে, কথাটির মানে এই নয় যে আরিফ নামক লোকটির আকৃতি ঠিক একটি হাতির আকৃতির মতো, বরং আরিফ নামক লোকটি অনেক মোটা। একইভাবে, ‘আরিফ একটি লাঠি’ কথাটির মানে এই নয় যে আরিফ নামক লোকটির আকৃতি ঠিক একটি লাঠির আকৃতির মতো, বরং আরিফ লোকটি খুব চিকন।

পরিষ্কারভাবেই, ‘ভ্রূণটি একটি জোঁক’ কথাটি থেকে এটা বোঝা যায় না যে, ভ্রূণটির আকৃতি ঠিক একটি জোঁকের আকৃতির মতো।

কুরআনের লেখক যদি ‘আলাকাহ’ শব্দটি দ্বারা আসলেই ‘জোঁকের মতো বস্তু’ বোঝান, তাহলে একজন পাঠকের এটা বোঝার কোনো উপায় থাকে না যে, কুরআনের লেখক ‘জোঁকের মতো বস্তু’ বলে আসলে কি বুঝিয়েছেন, উপমাটি আসলে কি প্রকাশ করছে।

এটা বলাটা যদি ন্যায্য হয় যে, ‘ভ্রূণটি একটি জোঁক’ প্রকাশ করে, ভ্রূণটির আকৃতি ঠিক একটি জোঁকের আকৃতির মতো, তাহলে এটা বলাও ন্যায্য হবে যে, ‘ভ্রূণটি একটি জোঁক’ প্রকাশ করে, ভ্রূণটির টেস্টিস এবং ওভারিস উভয়ই আছে। আর এভাবে কুরআন ভুল বলে উপস্থাপন করা যাবে।

অ্যাপোলজিস্টরা বলেন, একটি জোঁক যেমন যেখানে লেগে থাকে সেখান থেকে রক্ত চুষে নেয়, একটি ভ্রূণও তেমন মায়ের শরীর থেকে রক্তের মাধ্যমে পুষ্টি নেয়। আর এই তুলনাটি একদমই অর্থহীন যা কিছুই প্রমাণ করে না। কারণ, একটি জোঁক কেবল রক্ত চুষে নেয়। অপরদিকে, একটি ভ্রূণ যেমন তার মায়ের শরীর থেকে রক্ত গ্রহণ করে, আবার তেমন মায়ের শরীরে রক্ত ফিরিয়ে দেয়। একটি জোঁক কোনো প্রাণীর গায়ে লেগে থাকলে সেখান থেকে রক্ত ‘চুরি’ করে নেয়। অপরদিকে, একটি ভ্রূণ তার মায়ের সাথে পরিপোষক পদার্থ, শ্বাসযন্ত্রের গ্যাস এবং বর্জনীয় পদার্থের বিনিময়ে জড়িত থাকে। [4] [5] ভ্রূণের সাথে জোঁকের এই তুলনা, একটি ব্যাংকের সকল কাস্টমারকে ব্যাংক ডাকাতের সাথে তুলনা দেওয়ার মতোই অর্থহীন।

এছাড়াও এই ব্যাখাটি কুরআন হাদিসের তথ্যের বিরুদ্ধে যায়। ইসলামী গ্রন্থসমূহ বলছে, একটি ভ্রূণ আলাকাহ পর্যায়ে পৌঁছায় চল্লিশ তম দিনে এবং এই আলাকাহ পর্যায়ের শেষ হয় আশি তম দিনে। অথচ, একটি ভ্রূণ তার বিকাশের অধিকাংশ সময় ধরেই মায়ের রক্তের সাহায্যে পুষ্টি গ্রহণ করে। অর্থ্যাৎ, কুরআনের লেখক যদি ‘আলাকাহ’ শব্দটি দ্বারা বোঝায়, ভ্রূণ মায়ের রক্তের সাহায্যে পুষ্টি গ্রহণ করে, তাহলে কুরআন ভুলভাবে বলছে, ভ্রূণ কেবল চল্লিশ দিনের জন্যই মায়ের রক্তের সাহায্যে পুষ্টি গ্রহণ করে।

এবার আসি, কুরআনের ভ্রূণ বিকাশের বর্ণনায় ‘আলাকাহ’ শব্দটি দ্বারা আসলেই ‘জোঁকের মতো বস্তু’ বোঝানো হয়েছে কিনা সেই বিষয়ে। অ্যাপোলজিস্টদের এই ব্যাখ্যার সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো, এই ব্যাখাটি কুরআনের ভ্রূণ বিকাশের আয়াত সমূহের বাক্যপ্রসঙ্গের বিরুদ্ধে যায়। কুরআনের লেখক কুরআনের ভ্রূণ বিকাশের আয়াত সমূহে সোজাসুজিভাবে অল্পকিছু কথায় ভ্রূণ বিকাশ বর্ণনা করেছে। বিখ্যাত ইসলামী পণ্ডিতগণও তাদের তাফসীর সমূহে ভ্রূণ বিকাশ বিষয়ক আয়াত সমূহের সোজাসুজি ব্যাখ্যা দিয়েছেন কোনো রূপক অর্থের ব্যবহার ছাড়াই। এমনকি বর্তমান সময়ের মুসলিম অ্যাপোলজিস্টরাও আলাকাহ পর্যায় ব্যতীত অন্যান্য পর্যায়ের সোজাসুজি ব্যাখ্যা দেন। কেবল আলাকাহ পর্যায়কেই তারা বিশেষভাবে রূপক অর্থে ব্যাখ্যা করেন। পরিষ্কারভাবেই, এটা Special pleading logical fallacy.

একটু খেয়াল করুন, কুরআনের লেখক ভ্রূণ বিকাশের বর্ণনায় সোজাসুজিভাবে ভ্রূণকে বীর্য বলছে, আবার সোজাসুজিভাবে মাংসপিণ্ড বলছে। আবার সোজাসুজিভাবে বলছে, মাংসপিণ্ড হাড়ে পরিণত হয়। আবার সোজাসুজিভাবে বলছে, হাড় মাংস দ্বারা আবৃত হয়। কুরআনের ভ্রূণ বিকাশের বর্ণনায় দেখা যায়, কুরআন ভ্রূণ আসলে কি এবং কিসে পরিণত হয় সেটা বর্ণনা করছে, কিসের মতো তা নয়। অতএব, কেবল আলাকাহ পর্যায়ের জন্যই রূপক অর্থের ব্যবহার অনুমান করা গ্রহণযোগ্য নয়। এই রূপক অর্থটি কুরআনের বাক্যপ্রসঙ্গের সাথে সংগতিপূর্ণ নয়।

ভ্রূণ বিকাশের একটি বাস্তবিক এবং শারীরিক বর্ণনা প্রকাশ করতে রূপক অর্থের ব্যবহার সহায়ক নয়। ‘আলাকাহ’ শব্দটির একটি অর্থ রয়েছে যা রূপকবর্জিতও, আবার কুরআনের বাক্যপ্রসঙ্গের সাথে সংগতিপূর্ণও। আবার, অধিকাংশ ইসলামী পণ্ডিত দ্বারা সমর্থিতও। ‘আলাকাহ’ শব্দটির সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য এবং নির্ভরযোগ্য এই অর্থটি হলো ‘একটি জমাট রক্ত’।

প্রখ্যাত আরবী ডিকশনারি লিসান আল-আরব থেকে আমরা জানতে পারি, জোঁক নামক প্রাণীটিকে ‘আলাকাহ’ বলা হয়, কারণ এটা দেখতে রক্তের মতো। [6] লিসান আল-আরব থেকে তথ্যটি দেখানো হলোঃ

অনুবাদঃ দৈববাণী (কুরআন): “তারপর আমরা নুতফা আলাকাহয় পরিনত করি” (আয়াত ২৩:১৪) এবং এথেকে এটা বলা হয়েছিলো যে পানিতে বসবাস করা প্রাণীটি আলাকাহ, কারণ এটা রক্তের মতো লাল, জমাট রক্ত হলো আলাক। এবং আল-আলাক: পানিতে থাকা কালো ক্রিমি।

অর্থ্যাৎ, যা জোঁকের মতো তাই ‘আলাকাহ’ নয়, বরং যা রক্তের মতো তা ‘আলাকাহ’ বলা যেতে পারে।

(গ) জমাট রক্ত

অ্যাপোলজিস্টদের দাবি, ‘জমাট রক্ত’ অর্থটিও বাস্তবতার বিরুদ্ধে যায় না। তাদের দাবি, ‘জমাট রক্ত’ অর্থটি দ্বারা এমনকিছু বোঝায় যা দেখতে জমাট রক্তের মতো।

তারা বলেন, তৃতীয় সপ্তাহের শেষে ভ্রূণের ভেতরে রক্ত চলাচলের কারণে ভ্রূণ দেখতে জমাট রক্তের মতো লাগে।

অ্যাপোলজিস্টরা খুব ভালো করেই জানেন, একটি ভ্রূণ তার বিকাশের কোনো পর্যায়েই জমাট রক্তে পরিণত হয় না। এই বাস্তবতার ওপর সচেতন থেকেই তারা বিষয়টি অন্যভাবে ব্যাখ্যা করেন।

এখানে প্রথম সমস্যাটি হলো, যে কারণে জোঁক রূপকটি অগ্রহণযোগ্য ঠিক সেকারণেই এই রূপকটি অগ্রহণযোগ্য।

দ্বিতীয় সমস্যাটি হলো, একটি ভ্রূণ যেমন বিকাশের কোনো পর্যায়েই জমাট রক্তে পরিণত হয় না, তেমনি একটি ভ্রূণকে তার বিকাশের কোনো পর্যায়েই জমাট রক্তের মতো মনে হয় না।

ভ্রূণ বিকাশের এই পর্যায়ের একটি ইমেজ তুলে ধরা হলো, যা দেখে বোঝা যায় ভ্রূণকে এই পর্যায়ে কোনোভাবেই একটি জমাট রক্তপিণ্ডের মতো মনে হয় নাঃ

গত ১৪০০ বছরের প্রত্যেক খ্যাতিমান ইসলামী পণ্ডিতই বলেছেন, ‘আলাকাহ’ মানে ‘জমাট রক্ত’।

আমি প্রথম শ্রেণীর এবং আধুনিক ইসলামী পণ্ডিতদের নামের একটি তালিকা তুলে ধরছি, যারা বলেছেন, কুরআনের ভ্রূণ বিকাশের আয়াত সমূহে ‘আলাকাহ’ শব্দটি দ্বারা ‘জমাট রক্ত’ বোঝানো হয়েছেঃ

  1. Ikrimah al-Barbari (died. 723 CE) – quoted in Tafsir ibn Kathir [7]
  2. Zaid ibn Ali (d. 740 CE) – Ghareeb al-Quran [8]
  3. Muqatil ibn Sulayman (d. 767 CE) [9]
  4. Al-Tabari (d 923 CE) – Jami al-bayan fi Tafsir al Quran [10]
  5. Al-Tabarani (d. 970 CE) – al-Tafsir al-Kabir [11]
  6. Abu al-Layth al-Samarqandi (d. 985 CE) – Bahar al-Uloom [12]
  7. al-Tha’labi (d. 1035 CE) – al-Jawahir al-Hisan fi Tafsir al-Quran [13]
  8. Al-Mawardi (d. 1058 CE) – al-Nakath wa al-Uyoon [14]
  9. al-Baghawi (d. 1122) – Ma’alim al-Tanzeel [15]
  10. Al-Zamakshari (d. 1143 CE) – al-Kashaaf [16]
  11. Ibn ʿAṭiyyah (d. 1151) – al-Maharar al-Wajeez fi Tafsir al-Kitab al-Azeez [17]
  12. Al-Tabarsi (d. 1153 CE) – Majma’ al-Bayan fi Tafsi al-Quran [18]
  13. ibn al-Jawzi (1201 CE) – Zad al-Maseer fi ‘Ilm al-Tafsir [19]
  14. Al-Razi (d. 1209 CE) – Mafatih al-Ghayb, Tafsir al-Kabir [20]
  15. Ibn Abd Al-Salam (d. 1261 CE) – Tafsir al-Quran [21]
  16. Al-Qurtubi (d. 1273 CE) – al-Jami’ al-ahkam al-Quran [22]
  17. Al-Baidawi (d. 1286 CE) – Anwar al-Tanzeel wa Asrar al-Taweel [23]
  18. Ibn Kathir (d. 1373 CE) – Tafsir al-Qur’an al-Kareem [24]
  19. Ibn Rajab (d. 1392 CE) – Jami’ al-‘Uloom wal-Hikam [25]
  20. Fairuz Abadi (d. 1414 CE) – Tafsir al-Quran [26]
  21. Al-Suyuti (d. 1505 CE) – Tafsir al-Jalalyn [27]
  22. Ash-Shawkhani (d. 1834 CE) – Fatah al-Qadeer [28]
  23. Muhammad Shafi‘ (d. 1976 CE) – Maariful Quran [29]
  24. Muhammad Muhsin Khan (born 1927 CE) – The Noble Quran [30]

তাছাড়া, কুরআনে যে ‘আলাকাহ’ শব্দটি দ্বারা সোজাসুজি অর্থে ‘জমাট রক্ত’ বোঝানো হয়েছে তার প্রমাণ প্রখ্যাত আরবী-ইংরেজী ডিকশনারি Lane’s lexicon থেকে পাওয়া যায়। [31] Lane’s lexicon বলছেঃ

‘আলাকাহ’ শব্দটি কেবল ‘জমাট রক্ত’ হিসেবেই সংজ্ঞায়িত করা হয়নি, বরং সূরা আল-মু’মিনুনের ১৪ নং আয়াতের ব্যাখাও দেওয়া হয়েছে। আর ব্যাখায় বলা হয়েছে, ‘আলাকাহ’ হলো সেমিনাল ফ্লুইডের পরবর্তী অবস্থা, যখন তা জমাট রক্তে পরিণত হয়।

অত:পর উপরের দীর্ঘ আলোচনা থেকে আমরা এই সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারি যে, কুরআন মানব ভ্রূণের বিকাশের একটি পর্যায়ে মানব ভ্রূণকে “জমাট রক্ত” হিসেবে বর্ণনা করে, যা বাস্তবতার বিরুদ্ধে যায় এবং কুরআনকে ভুল প্রমানিত করে।

তথ্যসূত্র সমূহঃ

  • 4. Barry Mitchell & Ram Sharma 2009. Embryology: An Illustrated Colour Text. Second Edition. Chruchill Livingstone ElSevier. Page 10.
  • 5. Ibid. page 11
  • 6. “(Alaq)” Lisan al-Arab.
  • 7. Tafsir Ibn Kathir. Verse 23:14.
  • 8. Zaid ibn Ali. Ghareeb al-Qur’an.
  • 9. Muqatil ibn Sulayman.
  • 10. Al-Tabari. Jami al-bayan fi Tafsir al Qur’an.
  • 11. Al-Tabarani. Al-Tafsir al-Kabir.
  • 12. Abu al-Layth al-Samarqandi. Bahar al-Uloom.
  • 13. al-Tha’labi. al-Jawahir al-Hisan fi Tafsir al-Qur’an. 
  • 14. Al-Mawardi. al-Nakath wa al-Uyoon.
  • 15. al-Baghawi. Ma’alim al-Tanzeel.
  • 16. al-Zamakshari. al-Kashaaf. 
  • 17. ibn ʿAṭiyyah. al-Maharar al-Wajeez fi Tafsir al-Kitab al-Azeez.
  • 18. al-Tabarsi. Majma’ al-Bayan fi Tafsi al-Qur’an.
  • 19. ibn al-Jawzi. Zad al-Maseer fi ‘Ilm al-Tafsir.
  • 20. al-Razi. Mafatih al-Ghayb, Tafsir al-Kabir.
  • 21. ibn Abd Al-Salam. Tafsir al-Qur’an.
  • 22. ibn Abd Al-Salam. Tafsir al-Qur’an.
  • 23. al-Baidawi. Anwar al-Tanzeel wa Asrar al-Taweel.
  • 24. ibn Kathir. Tafsir al-Qur’an al-Kareem.
  • 25. ibn Rajab, Jami’ al-‘Ulum wal-Hikam: A collection of Knowledge & Wisdom, Rendered into English by Muhammad Fadel. Umm al-Qura. Page 69.
  • 26. Fairuz Abadi. Tafsir al-Qur’an.
  • 27. al-Suyuti. Tafsir al-Jalalyn.
  • 28. ash-Shawkhani. Fatah al-Qadeer.
  • 29. Muhammad Shafi. Maariful Qur’an. Vol 6. page 245.
  • 30. Muhammad Muhsin Khan. The Noble Qur’an.

আরও পড়ুনঃ

Marufur Rahman Khan

Ex-Muslim Atheist - Feminist - Secularist

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *