
Table of Contents
- 1 ভূমিকাঃ শান্তির আবরণে এক আগ্রাসী সামরিক মতাদর্শ
- 2 বেসামরিক জনগোষ্ঠীর ওপর আক্রমণ ও লুণ্ঠনের ইসলামিক বৈধতা
- 3 তৃতীয় পরিচ্ছেদঃ নারী ও শিশুদের দাসত্ব—একটি প্রাতিষ্ঠানিক অপরাধ
- 4 ফাতাওয়ায়ে আলমগীরীঃ আঁতকে ওঠার মতো নৃশংস বিধানাবলী
- 5 রাতের আঁধারে অতর্কিত হামলাঃ বেসামরিক নারী-শিশুরা যখন গনিমতের মাল
- 5.1 আজান শোনার ওপর নির্ভরশীল রাতের অতর্কিত আক্রমণ
- 5.2 বিধর্মীদের দাওয়াত এবং ইসলাম কবুল না করলে আক্রমণ
- 5.3 যুদ্ধবন্দী নারী শিশু যেভাবে ভাগাভাগি হতো
- 5.4 যুদ্ধবন্দী নারী যখন সাহাবীদের যৌনদাসী
- 5.5 রাতের অন্ধকারে নারী ও শিশু হত্যার বৈধতা
- 5.6 দাওয়াতের নাটকের আর প্রয়োজন নেই
- 5.7 যুদ্ধবন্দী নারী ধর্ষণ হচ্ছে তাদের কুফরির শাস্তি
- 6 গনিমতের মাল বণ্টন, দাসীর বাজার এবং উন্মুক্ত নিলাম
- 7 আন্তর্জাতিক মানবাধিকারের হরণ ও আধুনিক সভ্যতার সাথে সংঘাত
- 8 উপসংহার ও সামগ্রিক সমালোচনাঃ ধর্মতাত্ত্বিক দস্যুবৃত্তি ও নৈতিক দেউলিয়াগ্রস্ততা
ভূমিকাঃ শান্তির আবরণে এক আগ্রাসী সামরিক মতাদর্শ
আধুনিক বিশ্বের রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপটে ইসলামকে প্রায়শই একটি ‘শান্তির ধর্ম’ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। তবে এই মনোহর বর্ণনার আড়ালে চাপা পড়ে যায় ধ্রুপদী ইসলামী শাস্ত্র, হাদিস এবং ফিকহ্ শাস্ত্রের সেই সুসংগঠিত অংশগুলো, যা একটি অত্যন্ত আগ্রাসী ও সম্প্রসারণবাদী সামরিক মতাদর্শের কথা বলে। ইসলামের এই সমরনীতি কেবল আত্মরক্ষা বা প্রতিরক্ষামূলক যুদ্ধের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং এটি অমুসলিম ভূখণ্ডে পরিকল্পিতভাবে আক্রমণ চালিয়ে ইসলামী শাসন প্রতিষ্ঠা এবং বিজিত জনগোষ্ঠীর ওপর নিরঙ্কুশ আধিপত্য বিস্তারের এক ধর্মীয় পরিকাঠামো।
এই প্রবন্ধের মূল লক্ষ্য হলো ইসলামের সেই ‘আক্রমণাত্মক জিহাদ’ (জিহাদ আল-তালাব) নিয়ে আলোচনা করা, যেখানে লড়াই কেবল সশস্ত্র যোদ্ধাদের বিরুদ্ধে নয়, বরং অমুসলিম বেসামরিক জনগণের জীবন ও সম্পদের ওপর অধিকার স্থাপনেরও পূর্ণ বৈধতা দেওয়া হয়েছে। এখানে যুদ্ধ মানে কেবল ভূখণ্ড বিজয় নয়, বরং বিজিত জনগোষ্ঠীর নারী ও শিশুদের ‘গনিমতের মাল’ হিসেবে দখল করা এবং পুরুষদের দাসে পরিণত করাকে একটি ধর্মীয় কর্তব্য বা ‘সুন্নাত’ হিসেবে সাব্যস্ত করা হয়েছে। যে বিধানগুলো আধুনিক যুগে যুদ্ধাপরাধ বা মানবাধিকার লঙ্ঘন হিসেবে গণ্য, ধ্রুপদী ইসলামী আইনশাস্ত্রে সেগুলোকে অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে ‘ঐশী পুরস্কার’ হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে।
আমরা এই প্রবন্ধে ধ্রুপদী সূত্রগুলোর আলোকে দেখব যে, কীভাবে তরবারির ছায়াতলে জান্নাত খোঁজা এবং ভীতি সঞ্চারের মাধ্যমে বিজয় অর্জনকে ইসলামের প্রসারের প্রধান হাতিয়ার করা হয়েছে। বিশেষ করে, যারা কোনো সরাসরি যুদ্ধে অংশ নেয়নি, সেই সব অমুসলিম বেসামরিক জনগণের জান-মাল লুটপাট এবং তাদের পরিবারকে দাসত্বের শৃঙ্খলে আবদ্ধ করার যে ভয়াবহ শাস্ত্রীয় বৈধতা ইসলামে রয়েছে, তা আজ নির্মোহভাবে বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন। এই আলোচনাটি কেবল ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট নয়, বরং বর্তমানের মৌলবাদী চিন্তা ও বৈশ্বিক নিরাপত্তার ক্ষেত্রে ইসলামের এই আদি বিধানগুলো যে কতটা বড় চ্যালেঞ্জ, তা বুঝতে আমাদের সাহায্য করবে।
বেসামরিক জনগোষ্ঠীর ওপর আক্রমণ ও লুণ্ঠনের ইসলামিক বৈধতা
ইসলামী সমরনীতির একটি অত্যন্ত ভয়াবহ এবং বিতর্কিত দিক হলো ‘দারুল হারব’ বা যুদ্ধরত অঞ্চলের বেসামরিক জানমালের ওপর নিরঙ্কুশ অধিকার প্রতিষ্ঠা। সাধারণ যুদ্ধজয়ের চেয়েও এখানে অধিক গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে শত্রুপক্ষকে আর্থিকভাবে পঙ্গু করে দেওয়া এবং তাদের সামাজিক কাঠামোকে ধ্বংস করার ওপর। এই আক্রমণাত্মক জিহাদের মূল দর্শনটি কেবল সশস্ত্র যোদ্ধাদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং এটি একটি সামগ্রিক যুদ্ধ (Total War), যেখানে শত্রুর সম্পত্তি, পরিবার এবং তাদের বেঁচে থাকার উপকরণগুলোকেও যুদ্ধের লক্ষ্যবস্তু হিসেবে বৈধ করা হয়েছে।
১. তলোয়ার ও সন্ত্রাসের মাধ্যমে জান্নাত লাভঃ ইসলামী তত্ত্বে জিহাদকে কেবল একটি যুদ্ধ হিসেবে নয়, বরং জান্নাত লাভের প্রধান সোপান হিসেবে চিত্রিত করা হয়েছে। যখন বলা হয় যে জান্নাত তলোয়ারের ঝলকানির নিচে অবস্থিত, তখন এটি মুমিনদের মনে এই বার্তাই দেয় যে পরকালীন সুখের পথটি রক্তপাত এবং সংঘাতের মধ্য দিয়ে যায় [1] [2]। এখানে কোনো দয়া বা সমঝোতার চেয়ে শত্রুকে আতঙ্কিত করাকেই বিজয়ের মাপকাঠি ধরা হয়েছে। এমনকি যুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত জীবিকাকে ‘বর্শার ছায়াতলে’ রাখা হয়েছে বলে ঘোষণা করা হয়েছে, যা সরাসরি লুণ্ঠন ও দখলদারিত্বের মাধ্যমে সম্পদ আহরণকে একটি পবিত্র রূপ দান করে [2]। এই দর্শনেরই একটি অংশ হলো শত্রুর হৃদয়ে ‘সন্ত্রাস’ বা ‘ভীতি’ সৃষ্টি করা, যা নবী মুহাম্মাদের মতে তাকে বিজয়ী করার অন্যতম প্রধান ঐশী কৌশল ছিল [3]।
সহীহ বুখারী (তাওহীদ)
অধ্যায়ঃ ৫৬/ জিহাদ ও যুদ্ধকালীন আচার ব্যবহার
পরিচ্ছদঃ ৫৬/২২. জান্নাত হল তলোয়ারের ঝলকানির তলে।
মুগীরাহ ইবনু শু‘বা (রাঃ) বলেন, নাবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) আমাদের জানিয়েছেন, আমাদের ও প্রতিপালকের পয়গাম। আমাদের মধ্যে যে শহীদ হলো সে জান্নাতে পৌঁছে গেল।
‘উমার (রাঃ) নাবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-কে বলেন, আমাদের শহীদগণ জান্নাতবাসী আর তাদের নিহতরা কি জাহান্নামবাসী নয়? আল্লাহর রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেন, হ্যাঁ।
২৮১৮. ‘উমার ইবনু ‘উবায়দুল্লাহ্ (রহ.)-এর আযাদকৃত গোলাম ও তার কাতিব সালিম আবূন নাযর (রহঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, ‘আবদুল্লাহ্ ইবনু আবূ আওফা (রাঃ) তাঁকে লিখেছিলেন যে, আল্লাহর রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেন, তোমরা জেনে রাখ, তরবারির ছায়া-তলেই জান্নাত।
উয়াইসী (রহ.) ইবনু আবূ যিনাদ (রহ.)-এর মাধ্যমে মূসা ইবনু ‘উকবাহ (রহ.) থেকে হাদীস বর্ণনার ব্যাপারে মু‘আবিয়াহ ইবনু ‘আমর (রহ.) আবূ ইসহাক (রহ.)-এর মাধ্যমে মূসা ইবনু ‘উকবাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত হাদীসের অনুসরণ করেছেন। (২৮৩৩, ২৯৬৬, ৩০২৪, ৭২৩৭) (মুসলিম ৩২/৬ হাঃ ১৭৪২, আহমাদ ১৯১৩৬) (আধুনিক প্রকাশনীঃ ২৬০৮, ইসলামিক ফাউন্ডেশনঃ ২৬২০)
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
হাদীস সম্ভার
২০/ (আল্লাহর পথে) জিহাদ
পরিচ্ছেদঃ জিহাদ ওয়াজেব এবং তাতে সকাল-সন্ধ্যার মাহাত্ম্য
(১৯০০) ইবনে উমার (রাঃ) কর্তৃক বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, আমি (কিয়ামতের পূর্বে) তরবারি-সহ প্রেরিত হয়েছি, যাতে শরীকবিহীনভাবে আল্লাহর ইবাদত হয়। আমার জীবিকা রাখা হয়েছে আমার বর্শার ছায়াতলে। অপমান ও লাঞ্ছনা রাখা হয়েছে আমার আদেশের বিরোধীদের জন্য। আর যে ব্যক্তি যে জাতির সাদৃশ্য অবলম্বন করবে, সে তাদেরই দলভুক্ত।
(আহমাদ ৫১১৪-৫১১৫, ৫৬৬৭, শুআবুল ঈমান ৯৮, সহীহুল জামে’ ২৮৩১)
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আবদুল্লাহ ইবন উমর (রাঃ)
সহীহ বুখারী (তাওহীদ পাবলিকেশন)
৫৬/ জিহাদ ও যুদ্ধকালীন আচার ব্যবহার
পরিচ্ছেদঃ ৫৬/১২২. রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর উক্তিঃ এক মাসের পথের দূরত্বে অবস্থিত শত্রুর মনেও আমার সম্পর্কে ভয়-ভীতি জাগরণের দ্বারা আমাকে সাহায্য করা হয়েছে।
وَقَوْلِهِ جَلَّ وَعَزَّ )سَنُلْقِيْ فِيْ قُلُوْبِ الَّذِيْنَ كَفَرُوا الرُّعْبَ بِمَآ أَشْرَكُوْا بِاللهِ ( قَالَهُ جَابِرٌ عَنْ النَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم
মহান আল্লাহর তা‘আলার বাণীঃ আমি কাফিরদের অন্তরে ভীতি প্রবিষ্ট করব। যেহেতু তারা আল্লাহর শরীক করেছে। (আলে ইমরান ১৫১)
(এ প্রসঙ্গে) জাবির (রাঃ) আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে হাদীস উদ্ধৃত করেছেন
২৯৭৭. আবূ হুরাইরাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, অল্প শব্দে ব্যাপক অর্থবোধক বাক্য বলার শক্তি সহ আমাকে পাঠানো হয়েছে এবং শত্রুর মনে ভীতি সঞ্চারের মাধ্যমে আমাকে সাহায্য করা হয়েছে। একবার আমি নিদ্রায় ছিলাম, তখন পৃথিবীর ধনভান্ডার সমূহের চাবি আমার হাতে দেয়া হয়েছে। আবূ হুরাইরাহ্ (রাঃ) বলেন, আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তো চলে গেছেন আর তোমরা ওগুলো বাহির করছ। (৬৯৯৮, ৭০১৩, ৭২৭৩) (মুসলিম ৫/৫ হাঃ ৫২৩, আহমাদ ৭৭৫৮) (আধুনিক প্রকাশনীঃ ২৭৫৬, ইসলামিক ফাউন্ডেশনঃ ২৭৬৬)
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আবূ হুরায়রা (রাঃ)
এবারে আসুন এই হাদিসটির ইংরেজি অনুবাদটি দেখি। নবী এখানে বলেছেন, I have been made victorious with terror। এর সঠিক বাঙলা অনুবাদ হয় আমাকে বিজয়ী করা হয়েছে সন্ত্রাসের দ্বারা। কিন্তু উপরে দেখুন, এর অনুবাদ কী করা হয়েছে!
Narrated Abu Huraira:
Allah’s Messenger (ﷺ) said, “I have been sent with the shortest expressions bearing the widest meanings, and I have been made victorious with terror (cast in the hearts of the enemy), and while I was sleeping, the keys of the treasures of the world were brought to me and put in my hand.” Abu Huraira added: Allah’s Messenger (ﷺ) has left the world and now you, people, are bringing out those treasures (i.e. the Prophet did not benefit by them).
২. বেসামরিক অবকাঠামো ও সম্পদ ধ্বংসের বৈধতাঃ ফাতাওয়ায়ে আলমগীরীর মতো নির্ভরযোগ্য ফিকহ গ্রন্থগুলোতে জিহাদের যে ভয়াবহ পদ্ধতি বর্ণনা করা হয়েছে, তা আধুনিক মানবিক চেতনার জন্য রীতিমতো ভীতিকর। সেখানে স্পষ্ট বলা হয়েছে যে, যদি কাফেররা ইসলামের দাওয়াত বা জিযিয়া গ্রহণে অস্বীকৃতি জানায়, তবে তাদের বিরুদ্ধে কামান বা মিনজানিক ব্যবহার করা যাবে, তাদের ঘরবাড়িতে অগ্নিসংযোগ করা যাবে এবং জনপদ ডুবিয়ে দেওয়ার জন্য বাঁধ ভেঙে পানি ছেড়ে দেওয়া যাবে। এমনকি তাদের শস্যক্ষেত নষ্ট করা, গবাদি পশু হত্যা করা এবং ফলবান বৃক্ষ নিধন করাকেও জিহাদের অপরিহার্য অংশ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে ( পুরো বিবরণ নিচে আলোচিত হবে )। এই ধ্বংসলীলার মূল উদ্দেশ্য হলো কাফেরদের মনে ক্রোধ ও হতাশা সৃষ্টি করা এবং তাদের বশ্যতা স্বীকারে বাধ্য করা। এখানে বেসামরিক জনগণের জীবনধারণের মৌলিক অধিকারের চেয়ে ইসলামী আধিপত্যবাদকে অনেক বেশি প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে।
৩. অতর্কিত আক্রমণ ও লুণ্ঠনের অর্থনীতিঃ ইসলামে জিহাদ কেবল ঘোষিত যুদ্ধ নয়, বরং অনেক ক্ষেত্রে এটি ছিল অপ্রস্তুত জনগোষ্ঠীর ওপর অতর্কিত আক্রমণ। যদি কোনো গোত্রের কাছে আগে একবার ইসলামের দাওয়াত পৌঁছে থাকে, তবে পরবর্তীতে তাদের ওপর রাতের অন্ধকারে বা দিনের আলোয় কোনো সতর্কবার্তা ছাড়াই আক্রমণ করা সম্পূর্ণ বৈধ [4]। এই ধরনের আক্রমণের প্রধান উদ্দেশ্য থাকে বিপুল পরিমাণ ‘গনিমত’ বা লুটের মাল সংগ্রহ করা। হুনাইনের যুদ্ধের দৃষ্টান্ত থেকে দেখা যায়, কীভাবে হাজার হাজার নারী ও শিশুকে বন্দী করা হয়েছিল এবং লক্ষাধিক গবাদি পশু ও রূপা লুণ্ঠন করা হয়েছিল [5]।
৪. মানবতার বিপরীতে সাম্প্রদায়িক বিভাজনঃ ইসলামী যুদ্ধনীতিতে মানুষের পরিচয় নির্ধারিত হয় তার ধর্মের ভিত্তিতে। ফাতাওয়ায়ে আলমগীরী অনুযায়ী, যদি কাফেরদের দুর্গে কোনো মুসলিম বন্দী বা ব্যবসায়ীও থাকে, তবুও সেখানে অগ্নিসংযোগ বা তীর নিক্ষেপ থেকে বিরত থাকা যাবে না—এমনকি কাফেররা যদি মুসলিম শিশুদের ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে, তবুও তাদের লক্ষ্য করে আক্রমণ চালিয়ে যেতে হবে [4]। এই নিষ্ঠুর বিধান প্রমাণ করে যে, বৃহত্তর ইসলামী রাজনৈতিক লক্ষ্য অর্জনের পথে ব্যক্তি মানুষের জীবন, এমনকি সে মুসলিম হলেও, অত্যন্ত গৌণ বিষয় হিসেবে বিবেচিত হয়।
তৃতীয় পরিচ্ছেদঃ নারী ও শিশুদের দাসত্ব—একটি প্রাতিষ্ঠানিক অপরাধ
ইসলামী জিহাদের সবচেয়ে অমানবিক ও অন্ধকার দিকটি উন্মোচিত হয় যুদ্ধবন্দীদের—বিশেষ করে নারী ও শিশুদের ওপর নামিয়ে আনা চরম লাঞ্ছনা ও দাসত্বের শৃঙ্খলের মাধ্যমে। আধুনিক মানবাধিকার এবং যুদ্ধনীতি যেখানে নিরপরাধ বেসামরিক ব্যক্তি, নারী ও শিশুদের রক্ষার কথা বলে, সেখানে ধ্রুপদী ইসলামী আইন এই দুর্বল শ্রেণিকে গণহারে ‘মালে গনীমত’ বা যুদ্ধের সম্পদ হিসেবে গণ্য করে তাদের ব্যক্তিসত্তা ও অধিকারকে সমূলে বিনাশ করেছে। এটি কোনো বিচ্ছিন্ন অপরাধ নয়, বরং ফিকহ শাস্ত্রের মাধ্যমে একে একটি বৈধ অর্থনৈতিক ও সামাজিক প্রতিষ্ঠানে রূপ দেওয়া হয়েছে।
১. নারী ও শিশুদের ব্যক্তিসত্তার বিলোপ ও পণ্যায়নঃ ইসলামী আইন অনুযায়ী, যখন কোনো ভূখণ্ডে আক্রমণ চালিয়ে অমুসলিমদের পরাজিত করা হয়, তখন তাদের সম্পদ ও ভূমির পাশাপাশি তাদের স্ত্রী এবং সন্তানদেরও দখল করা মুজাহিদদের জন্য বৈধ হয়ে যায়। ফাতাওয়ায়ে আলমগীরীতে স্পষ্ট বলা হয়েছে যে, আরবের মুশরিক যারা আসমানী কিতাবধারী নয়, তারা পরাজিত হলে তাদের পুরুষদের ইসলাম গ্রহণে বাধ্য করা হবে নতুবা হত্যা করা হবে—তবে তাদের নারী ও শিশুদের ক্ষেত্রে কোনো বিকল্প নেই; তারা বাধ্যতামূলকভাবে ‘মালে গনীমত’ বা লুণ্ঠিত সম্পদ হিসেবে গণ্য হবে [6]। হুনাইনের যুদ্ধে নবী মুহাম্মাদের নির্দেশে ৬ হাজার নারী ও শিশুকে বন্দী করে লুণ্ঠিত সম্পদের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল, যা প্রমাণ করে যে নিরপরাধ নারী ও শিশুরা ইসলামের প্রসারের পথে কেবল একটি বিনিময়যোগ্য পণ্য ছাড়া আর কিছুই ছিল না [7]।
২. দয়া প্রদর্শনের ওপর ধর্মীয় নিষেধাজ্ঞাঃ ইসলামী যুদ্ধনীতিতে বন্দীদের প্রতি অনুগ্রহ বা দয়া প্রদর্শন করে তাদের নিঃশর্ত মুক্তি দেওয়াকে শাস্ত্রীয়ভাবে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। ফাতাওয়ায়ে আলমগীরীর মাসআলা অনুযায়ী, কোনো লাভ বা বিনিময় ছাড়া বন্দীদের এমনিতেই ছেড়ে দেওয়া জায়েজ নেই, কারণ তারা তখন ‘দাস হওয়ার উপযুক্ত’ এবং তাদের ওপর ‘মুসলমানদের হক’ বা অধিকার জন্মে যায় [8]। এমনকি যদি কোনো শাসক মনে করেন যে কাউকে ছেড়ে দেওয়া উচিত, তবুও তিনি ধর্মীয়ভাবে সীমাবদ্ধ। এই বিধানটি প্রমাণ করে যে, ইসলামে ক্ষমা বা দয়ার চেয়ে শত্রুপক্ষকে হীন ও দাসত্বের শৃঙ্খলে আবদ্ধ রাখাকেই আল্লাহর সন্তুষ্টির পথ হিসেবে দেখা হয়েছে।
৩. বন্দীদের ভাগ্য নির্ধারণ ও হত্যার বৈধতাঃ যুদ্ধবন্দীদের ক্ষেত্রে শাসকের বা ইমামের চূড়ান্ত ক্ষমতার কথা বলতে গিয়ে ফাতাওয়ায়ে আলমগীরীতে বলা হয়েছে যে, শাসক চাইলে বন্দীদের হত্যা করতে পারেন অথবা তাদের দাস বানাতে পারেন [9]। যদি কোনো বন্দী প্রাণের ভয়ে ইসলাম গ্রহণ করে, তবুও তাকে মুক্তি দেওয়া হয় না; বরং তাকে দাস হিসেবেই রাখা হয়। এটি ধর্মের নামে একটি সুকৌশলী জবরদস্তি, যেখানে মানুষের জীবনের চেয়ে তাকে দাসে পরিণত করে রাখাটা বেশি জরুরি মনে করা হয়েছে। এমনকি আরব মুশরিকদের ক্ষেত্রে ‘ইসলাম গ্রহণ নতুবা মৃত্যু’—এই দুটি চরম পথের বাইরে তৃতীয় কোনো মানবিক পথ রাখা হয়নি [9]।
৪. অসমর্থ বন্দীদের প্রতি চরম নির্দয়তাঃ জিহাদের ময়দান থেকে ফেরার পথে যদি বন্দীদের সাথে করে আনা অসম্ভব হয়ে পড়ে, তবে ইসলামের বিধান আরও বেশি নৃশংস হয়ে ওঠে। ফাতাওয়ায়ে আলমগীরীর নির্দেশ অনুযায়ী, এমতাবস্থায় ইসলাম গ্রহণ না করলে পুরুষদের সরাসরি হত্যা করা হবে। কিন্তু নারী, শিশু ও বৃদ্ধদের ক্ষেত্রে—যাদের সরাসরি হত্যা করার ওপর কিছু সীমাবদ্ধতা আছে—তাদের কোনো খাদ্য বা পানীয় বিহীন জনমানবহীন নির্জন স্থানে ফেলে আসা হবে যাতে তারা ক্ষুধা ও পিপাসায় ধুঁকে ধুঁকে মারা যায় [8]। তলোয়ার দিয়ে সরাসরি হত্যা না করে এভাবে তিলে তিলে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেওয়ার এই বিধানটি ইসলামী দয়ার দাবিকে হাস্যকর এবং নিষ্ঠুর তামাশায় পরিণত করেছে।
ফাতাওয়ায়ে আলমগীরীঃ আঁতকে ওঠার মতো নৃশংস বিধানাবলী
ইসলামী আইনশাস্ত্র বা ফিকহ্-এর ইতিহাসে ফাতাওয়ায়ে আলমগীরী (যা আল-ফাতাওয়া আল-হিন্দিয়া নামেও পরিচিত) একটি অত্যন্ত প্রভাবশালী এবং প্রামাণ্য দলিল। মুঘল সম্রাট আওরঙ্গজেবের নির্দেশে ১৭শ শতাব্দীতে এটি সংকলিত হয়, যাকে “ভারতে তৈরি মুসলিম আইনের সর্বশ্রেষ্ঠ নিদর্শন” হিসেবে গণ্য করা হয়। এটি কোনো সাধারণ গ্রন্থ নয়, বরং সুন্নি হানাফি মাজহাবের ভিত্তিতে রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য তৈরি একটি পূর্ণাঙ্গ আইনি কোড বা সংবিধান।
এই সংকলনটি সম্পন্ন করতে আওরঙ্গজেব তৎকালীন বিশ্বের শ্রেষ্ঠ ৫০০ জন আলেমকে নিযুক্ত করেছিলেন। শেখ নিজাম বুরহানপুরির নেতৃত্বে এই বিশাল আলেম সমাজ কুরআন এবং সহীহ হাদিসের ওপর ভিত্তি করে কয়েক বছরের পরিশ্রমে এই গ্রন্থটি তৈরি করেন। কিন্তু এই গ্রন্থের ‘জিহাদ’ এবং ‘গনিমতের মাল’ সংক্রান্ত পরিচ্ছেদগুলো পাঠ করলে আধুনিক মানবিক চেতনা শিউরে ওঠে। এখানে অমুসলিমদের বিরুদ্ধে যে ধরণের নিষ্ঠুরতার আইনি বৈধতা দেওয়া হয়েছে, তা বর্তমান সভ্য জগতের যুদ্ধাপরাধের সংজ্ঞার সাথে হুবহু মিলে যায়।
আসুন এক নজরে দেখে নেই এই গ্রন্থে জিহাদ ও অমুসলিমদের বিষয়ে ঠিক কী ধরণের বিভীষিকাময় নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে: [10] –
কাফেরদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের সময় তাদের ঘরবাড়িতে অগ্নিসংযোগ করা, কামান ব্যবহার করে বসতি ধ্বংস করা এবং পানির বাঁধ ভেঙে জনপদ ডুবিয়ে দেওয়া সম্পূর্ণ বৈধ। এমনকি তাদের শস্যক্ষেত নষ্ট করা এবং ফলবান বৃক্ষ নিধন করার নির্দেশও দেওয়া হয়েছে। [4]
আরবের মুশরিক বা যারা আসমানী কিতাবধারী নয়, তাদের ওপর বিজয়ী হলে তাদের নারী ও শিশুদের ক্ষেত্রে কোনো মানবিক করুণা নেই; তারা বাধ্যতামূলকভাবে ‘মালে গনীমত’ বা লুণ্ঠিত সম্পদ হিসেবে গণ্য হবে এবং মুজাহিদদের মধ্যে দাস হিসেবে বণ্টন করে দেওয়া হবে। [6]
যুদ্ধক্ষেত্র থেকে ফেরার সময় যদি বন্দীদের সাথে করে আনা অসম্ভব হয়, তবে পুরুষদের তলোয়ার দিয়ে হত্যা করা হবে। কিন্তু নারী, শিশু ও বৃদ্ধদের কোনো খাদ্য বা পানীয় ছাড়াই জনমানবহীন নির্জন প্রান্তরে ফেলে আসার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, যাতে তারা ক্ষুধা ও পিপাসায় ধুঁকে ধুঁকে মারা যায়। [8]
যদি কাফেররা যুদ্ধের সময় কোনো মুসলিম বন্দী বা শিশুকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে, তবুও আক্রমণ থামানো যাবে না। এমনকি সেই মুসলিমদের মৃত্যু নিশ্চিত জেনেও কাফেরদের লক্ষ্য করে তীর নিক্ষেপ চালিয়ে যেতে হবে। [4]
কোনো লাভ বা বিনিময় ছাড়া বন্দীদের এমনিতেই ছেড়ে দেওয়া জায়েজ নেই, কারণ তারা তখন ‘দাস হওয়ার উপযুক্ত’। এমনকি কোনো বন্দী যদি প্রাণের ভয়ে ইসলাম গ্রহণ করে, তবুও তাকে মুক্তি দেওয়া হয় না; বরং তাকে দাস হিসেবেই রাখা হয়। [11]
অমুসলিমদের সাথে ব্যবহারের ক্ষেত্রে সাপ ও বিচ্ছুর উপমা টানা হয়েছে। বলা হয়েছে, যেমন সাপের দাঁত ভেঙে দেওয়া হয় যাতে সে দংশন করতে না পারে, তেমনি কাফেরদেরও এমনভাবে পর্যুদস্ত করতে হবে যেন তাদের বংশপরম্পরা অবশিষ্ট থাকলেও তারা মাথা তুলতে না পারে। [8]
দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ
জিহাদ ও লড়াইয়ের পদ্ধতি
১. মাসআলা: ইমামুল মুসলিমীন (শাসক) যখন দারুল ইসলামে প্রবেশের উদ্যোগ নেবেন তখন তার কর্তব্য হবে বাহিনী পরিদর্শন করে আশ্বারোহী ও পদাতিকের সংখ্যা জেনে নেয়া। তাদের নাম লিপিবদ্ধ করা (এবং প্রয়োজনীয় বিষয় অবগত হওয়া) (শরহে তাহাবী)।
২. মাসআলা: মুসলিম বাহিনী দারুল হারবে প্রবেশ করে কোন শহর বা দুর্গ অবরোধ করে তাদেরকে ইসলামের দাওয়াত দিবে১ যদি তারা দাওয়াতে সাড়া দেয় তাহলে তাদের বিরুদ্ধে লড়াই থেকে বিরত থাকবে। আর যদি তারা সাড়াদানে বিরত থাকে তাহলে তাদেরকে জিযয়া প্রদানের আহবান জানাবে (হিদায়া)। যদি তারা জিয়া দিতে সম্মত হয় তাহলে মুসলমানদের যাবতীয় সুবিধা ও দায় তাদের ক্ষেত্রেও কার্যকর হবে (কান্য)।
উপরোক্ত হুকুম ঐ ব্যক্তি সম্পর্কে যাদের থেকে (ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকে) জিযয়া কবুল করা যায়। অতএব যার থেকে জিযয়া গ্রহণ করা যায় না তাদেরকে জিয়া প্রদানের প্রতি আহবান জানানো হবে না (তাবয়ীন)।
উল্লেখ থাকে যে, কাফিররা কয়েক শ্রেণীতে বিভক্ত:
প্রথম শ্রেণী: ঐ সমস্ত লোক যাদের থেকে জিযয়া নেওয়া (সর্বসম্মতিক্রমে) জাইয নেই।
তারা হলো, আরবের ঐ সমস্ত মুশরিক যারা আসমানী কোন কিতাবেরই অনুসারী নয়। অতএব মুসলমানগণ যখন তাদের উপর বিজয়ী হবে, হয় তারা পুরুষদের ইসলাম কবুল করবে, নতুবা তাদের হত্যা করা হবে। অবশ্য তাদের নারী ও শিশুরা মালে গনীমত হিসাবে গণ্য হবে।
দ্বিতীয় শ্রেণী: ঐ সকল লোক যাদের থেকে সর্বসম্মতিক্রমে জিয়া নেয়া জাইয। তারা হলো, আসমানী কিতাবের অনুসারী। আরব বা অনারব ইয়াহুদী খৃস্টানরা এবং আরব বা অনারব অগ্নিপূজকরা।
তৃতীয় শ্রেণী: ঐ সমস্ত লোক যাদের থেকে জিযয়া আদায় করার ব্যাপারে ফকীহদের মতপার্থক্য রয়েছে। তারা হলো, উপরে বর্ণিত জনগোষ্ঠী ছাড়া অন্যরা। তবে আমাদের হানাফী মাযহাব অনুযায়ী তাদের থেকে জিযয়া আদায় করা ওয়াজিব (মুহীত)।
৩. মাসআলা: যাদের কাছে ইসলামের দাওয়াত পৌছেনি তাদেরকে ইসলামের দাওয়াত
দেয়া ছাড়া লড়াই শুরু করা জাইয নেই (হিদায়া)। মুসলমানগণ ইসলামের দাওয়াত পৌঁছানো ব্যতীত যদি তাদের সাথে লড়াই করে তারা গুনাহগার হবে। তবে তাদের জানমাল ক্ষতি করার দায় মুসলমানদের উপর আরোপিত হবে না। যেরূপ তাদের নারী ও শিশুদের ক্ষেত্রে তাদেরকে দায়বদ্ধ করা হয় না (মাবসূত)। যাদের কাছে ইতোপূর্বে দাওয়াত পৌছেছে অতিরিক্ত সতর্কীকরণ হিসাবে তাদেরকেও (পুনরায়) দাওয়াত দেওয়া মুস্তাহাব, ওয়াজিব নয়২ (হিদায়া)।
………
১. কেননা হযরত ইব্ন আব্বাস (রা) বর্ণনা করেছেন যে, নবী (সা) ইসলামের প্রতি দাওয়াত না দিয়ে কোন কাউমের বিরুদ্ধে লড়াই করেন নি।
২. কেননা বিশুদ্ধ বর্ণনায় প্রমাণিত যে, নবী (সা) অসতর্ক অবস্থায় বনী মুসতালিকের উপর হামলা করেছিলেন এবং উসামা (রা)-কে দায়িত্ব দিয়েছিলেন উবনা বস্তিতে খুব জোরে হামলা চালানোর এবং বস্তি জ্বালিয়ে দেয়ার আর অসতর্ক হানা কখনো দাওয়াত দিয়ে হয় না।
………
তবে এটা মুস্তাহাব হওয়ারও দু’টি শর্ত। প্রথমত: পুনঃদাওয়াতে মুসলমানদের কোন রূপ অনিষ্টের সম্ভাবনা না থাকা। যেমন অতিরিক্ত সময়কে তারা সমরায়োজনের কাজে লাগাবে। কিংবা কোন কূট-কৌশল অবলম্বন করে তাহলে এক্ষেত্রে লড়াইর পূর্বে পুনরায় দাওয়াত দেওয়া মুস্তাহাব নয়।
দ্বিতীয় শর্তটি হলো: পুনঃদাওয়াত দ্বারা তাদের ইসলাম গ্রহণের সম্ভাবনা থাকা। যদি সম্ভাবনা না থাকে তাহলে তাদেরকে দাওয়াত দিবে না (মুহীত)। কাজেই যে ভূখণ্ডের কাফিরদের নিকট একবার ইসলামের দাওয়াত পৌঁছেছে তাদের উপর রাত্রে অথবা দিনে অতর্কিত হামলা চালালে অন্যায় হবে না (মুহীত: সারাঙ্গী)।
যদি তারা (ইসলামের দাওয়াত প্রত্যাখান করে তাহলে তাদের বিরুদ্ধে আল্লাহর সাহায্য প্রার্থনা করবে এবং লড়াইয়ে অবতীর্ণ হবে (ইখতিয়ার: শরহুল মুস্তার)। তাদের বিরুদ্ধে মিনজানিক (কামান) মোতায়েন করবে, জ্বালাও পোড়াও চালাবে, (বাঁধ ভেঙ্গে বা অন্য উপায়ে) তাদের উপর পানি ছেড়ে দিবে এবং তাদের বৃক্ষ নিধন করবে এবং তাদের শস্য, ফসলাদি নষ্ট করবে (হিদায়া)। তাদের দুর্গসমূহ ভেঙ্গে বিরান করে দিবে ও পানি বহিয়ে তা ডুবিয়ে দিবে এবং তাদের দালান প্রাসাদ বিধ্বস্ত করে ফেলবে। হযরত হাসান ইবন যিয়াদ (র) বলেন, এ যদি জানতে পারে যে, উক্ত দুর্গে কোন মুসলমান কয়েদী নেই। অতএব যদি তা জানতে না পারে তবে জ্বালানো এবং পোড়ানো জাইয নেই। কিন্তু আমাদের বক্তব্য হলো, আমরা যদি এ কাজ থেকে মুসলিম বাহিনীদেরকে বিরত রাখি তবে তাদের জন্য মুশরিকদের সাথে লড়াই করে জয়লাভ করা কঠিন হবে। তাছাড়া খুবই কম দুর্গ এমন আছে যাতে বিপক্ষীয় বন্দী থাকে না। তবে এসব কর্মকাণ্ড মুশরিকদের উদ্দেশ্যেই করবে (মাবসূত)।
তাদের মাঝে মুসলিম বন্দী বা ব্যবসায়ী থাকলেও তাদের প্রতি তীর নিক্ষেপ করতে বাঁধা নেই। ১ যদি তারা মুসলিম বালকদের কিংবা বন্দীদের ঢাল রূপে ব্যবহার করা হয় তাহলেও তাদের প্রতি তীর বর্ষণ থেকে বিরত থাকবে না। অবশ্য কাফিরদের প্রতি তীর বর্ষণের নিয়্যত করবে। ২ ঐ মুসলমানদের যে ক’জন তাদের তীর বর্ষণের শিকার হবে তাদের দিয়্যত মুজাহিদদের উপর ওয়াজিব হবে না। আর কাফফারাও ওয়াজিব হবে না।৩
৪. মাসআলা: মুসলিম বাহিনীর সঙ্গে নারী ও কুরআন শরীফ নিয়ে যাওয়া দোষের না, যদি তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যায়। কিন্তু নিরাপদ নয় এমন ক্ষুদ্র বাহিনীর সাথে নিয়ে যাওয়া মারূহ। কোন মুসলমান যদি নিরাপত্তা নিয়ে তাদের দেশে প্রবেশ করে এবং তারা যদি প্রতিশ্রুতি রক্ষাকারী হয়, তাহলে কুরআন শরীফ সঙ্গে নিতে বাধা নেই (হিদায়া)।
৫. মাসআলা: বড় বাহিনীতে প্রয়োজনীয় সেবা কর্মের জন্য বয়স্কা নারীদের নেয়া যায়। পক্ষান্তরে যুবতী নারীর জন্য গৃহই অধিক নিরাপদ। তবে ফিতনার আশঙ্কা থাকার কারণে
………
১. কেননা ইসলামের কেন্দ্র থেকে তীর বর্ষণের মাধ্যমে বৃহৎ ক্ষতিরোধ করা যায় পক্ষান্তরে মুসলিম বন্দী ও ব্যবসায়ী নিহত হওয়ায় সীমিত ক্ষতি তাছাড়া খুব কম দুর্গই মুসলমান থেকে খালি হয়। সুতরাং তা বিবেচনা করে যদি বিরত থাকতে হয় তাহলে তো জিহাদের দরজাই বন্ধ হয়ে যাবে।
২. কেননা কার্যত: পার্থক্য করা অসম্ভব হলেও উদ্দেশ্যগতভাবে তা সম্ভব। তাছাড়া আদেশ পালনের দায়িত্ব সাধ্য অনুযায়ী বিবেচিত।
৩. কেননা জিহাদ হলো ফরজ, আর ফরয পালনের সাথে “দণ্ড” যুক্ত হতে পারে না।
৪. যেমন রান্নাবাড়ি, পানি পান করানো, সেবা শুশ্রূষা করা ইত্যাদি।
………
৫. মাসআলা: যে সকল লোক বন্দী তাদের ব্যাপারে শাসকের ইখতিয়ারাধীন থাকবে,
ইচ্ছা করলে তাদেরকে হত্যা করবে আবার চাইলে তাদেরকে দাস বানাবে। তবে আরবের মুশরিকদের এবং মুরতাদদের বিষয়টি ভিন্ন১ (হয়ত তারা ইসলাম গ্রহণ করবে নতুবা তলোয়ার দ্বারা গর্দান উড়িয়ে দেওয়া হবে) তিনি চাইলে তাদেরকে মুসলমানদের যিম্মী বানিয়ে স্বাধীনতা দিয়ে দিবেন। তবে আরবের মুশরিকদের এবং মুরতাদদের বিষয়টি ভিন্ন (তাদের স্বাধীনরূপে ছেড়ে দেওয়া যাবে না)। তবে বন্দীদের মধ্যে যারা ইসলাম গ্রহণ করবে তাদেরকে দাস বানানো ছাড়া অন্য কোন সিদ্ধান্ত নেয়া যাবে না (তাবয়ীন)। আর তাদেরকে দারুল হারবে ফেরত দেওয়া যাবে না। উল্লেখ্য মুসলমান বন্দীদের বিনিময়ে হারবী বন্দীদেরকে মুক্তিপণ হিসাবে দেওয়া (অর্থাৎ হারবীদের নিকট যে সকল মুসলমান বন্দী হয়ে আছে তাদের বিনিময়ে যে সকল হারবী মুসলমানদের নিকট বন্দী হয়ে আছে তাদেরকে মুক্তিপণ হিসাবে দেওয়া) ইমাম আবু হানীফা (র)-এর মতানুযায়ী জাইয নেই২ (কাফী)।
অনুরূপ বর্ণনা মুতুনেও রয়েছে। এক্ষেত্রে ইমাম আবূ হানীফা (র)-এর মতটিই বিশুদ্ধ (যাদ)। ইমাম মুহাম্মদ (র) সিয়ারে কবীরে বলেন, কাফিরদের যে সকল নর-নারী মুসলমানদের
………
১. কারণ তাদের কুফরী ও শিরকী ইসলামের দৃষ্টিতে জঘন্যতম অপরাধ আরবের মুশরিকদের ক্ষেত্রে, কারণ এই যে, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম তাদের মাঝেই আবির্ভূত হয়েছেন। পবিত্র কুরআন তাদের ভাষায় নাযিল হয়েছে। কাজেই ইসলামের বার্তা ও শরীআতের বিধানাবলী তাদের নিকট সর্বাপেক্ষা স্পষ্ট ও সহজতম। আর অলৌকিক ঘটনাবলী ও আল্লাহর নির্দেশনাবলী তাদের ক্ষেত্রে অধিকতর প্রকাশিত ও অবলোকনযোগ্য।
আর মুরতাদদের ক্ষেত্রে কারণ এই যে, তারা ইসলামের দিকে পথ প্রদর্শন পেয়ে ইসলামের যাবতীয় সৌন্দর্য ও কল্যাণকর বিধানাবলী সম্পর্কে অবগত হওয়ার পর ইসলাম প্রত্যাখান করতঃ তাদের প্রতিপালকের সাথে কুফুরী ও রাসূলের শানে গোস্তাখী ও চরম বে-আদবী করেছে। এ সমস্ত কারণে এ উভয় শ্রেণীর লোকেরা (আরবের মুশরিক এবং মুরতাদরা) অধিকতর শান্তির উপযুক্ত বিধায় হয়ত তারা ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করবে নতুবা তাদেরকে হত্যা করা হবে। তাদের ব্যাপারে এছাড়া অন্য কোন বিকল্প নেই।
২. কারণ কাফির বন্দীদের ফেরৎ দেওয়ার অর্থ মুসলমানদের দুশমনদের সাহায্য করা। কারণ পরবর্তীতে এরাই জাগ্রত ও সোচ্চার হয়ে উঠবে এবং যোদ্ধা হয়ে মুসলমানদের বিরুদ্ধে লড়াই করতে আসবে। আর যুদ্ধ এমন একটি বিষয় যাতে গোটা মুসলিম জাতির ক্ষতির প্রবল আশঙ্কা থাকে যা মুসলমান বন্দীকে দুশমনদের হাতে যিম্মী হিসাবে ছেড়ে রাখতে সাধারণত পরিলক্ষিত হয় না। কাজেই ইসলাম ও মুসলমানের সার্বিক অনিষ্টতা এবং লড়াইয়ের সম্ভাব্য ক্ষতিরোধের ব্যবস্থা গ্রহণ করা কয়েকজন মুসলিম বন্দীকে মুক্ত করার চেয়ে অধিক
শ্রেয়।
তাছাড়া সে যদি তাদের হাতে বন্দী থেকে যায় তাহলে এটা হবে স্বান্ত্রিকভাবে তার দিক থেকে একটি পরীক্ষা যার দায়-দায়িত্ব শুধু তারই। তা আমাদের সাথে সম্পৃক্ত হবে না। পক্ষান্তরে তাদের বন্দীদের তাদের হাতে অর্পণ করে সাহায্য করার দায়-দায়িত্ব আমাদের সাথেই সম্পৃক্ত হবে এবং এর ভয়াবহ পরিণাম আমাদেরই ভুগতে হবে।
৩. মুতুন শব্দটি মন্ত্র এর বহুবচন অর্থাৎ পিঠ, পৃষ্ঠ মূল অংশ মূল পাঠ টেক্সট। হানাফী ফিকহের পরিভাষায় মুতুন বলতে ঐ সমস্ত কিতাবকে বুঝায় যাতে যাহিরি রিওয়ায়েতের অনুকরণে হানাফী মাযহাবের মাসাইল সমূহ লিপিবদ্ধ করা হয়েছে। যেমন বিদায়া, মুখতাসারুল কুদূরী, মুখতার, বেকায়া, কানযুদ্দাকায়িক, মুলতাকাল আবছর।
আর যাহিরি রিওয়ায়েত ঐ সকল রিওয়ায়েত বা মাসাইলকে বলা হয় যা মাযহাব রচনাকারী ব্যক্তিবর্গ ইমাম আবু হানীফা, আবু ইউসুফ ও মুহাম্মদ (র) থেকে বর্ণিত এবং তা ইমাম মুহাম্মদ (র) কর্তৃক প্রণীত ছয়টি কিতাবে জামি’ সাগীর, জামি’কবীর, সিয়ারে সাগীর, সিয়ারে কবীর, মাবসূত ও যিয়াদাত উল্লেখ হয়েছে।
………
৭. মাসআলা: বন্দীদের প্রতি অনুগ্রহ প্রদর্শন করা (অর্থাৎ তাদেরকে দাস কিংবা যিম্মী না বানিয়ে কিংবা হত্যা না করে এমনিতেই ছেড়ে দেয়া জাইয নেই১ (কাফী)।
৮. মাসআলা : ইমাম মুহাম্মদ (র) বলেন, যদি মুশরিক শিশুদের সঙ্গে তাদের মাতাপিতারাও বন্দী হয় তাহলে ঐ শিশুদেরকে মুক্তিপণ২ হিসাবে দেয়া যাবে। আর যদি শুধু শিশুরা বন্দী হয় (তাদের মাতা-পিতারা বন্দী না হয়) এবং তাদেরকে দারুল ইসলামে নিয়ে আসা হয় তাহলে তাদেরকে মুক্তিপণ হিসাবে দেওয়া যাবে না।
অনুরূপ যদি দারুল হরবেই গনীমত বণ্টন করা হয় এবং একটি শিশু কোন ব্যক্তির অংশে পড়ল কিংবা তথায় গনীমতের মাল বিক্রি করা হলে ঐ ব্যক্তি ক্রয় সূত্রে সে শিশুটির মালিক হলো তাহলে উক্ত শিশু ঐ ব্যক্তিরই অনুবর্তীরূপে মুসলমান বলে বিবেচিত হবে (মুহীত)।
৯. মাসআলা: ইমাম মুহাম্মদ (র) বলেন, মুসলমানরা যদি কাফিরদের থেকে ঘোড়া এবং
হাতিয়ার নিয়ে নেয়। এরপর তারা তা মালের বিনিময়ে ছাড়িয়ে নিতে চায় তাহলে তাদেরকে এ সুযোগ প্রদান জাইয হবে না। পক্ষান্তরে যদি তারা এ দরখাস্ত করে যে তোমরা আমাদের বন্দী লোকদের আমাদেরকে দিয়ে দাও আর এর পরিবর্তে একজন কিংবা বলল দু’জন মুশরিক নিয়ে নাও তাহলে মুসলমানদের জন্য এরূপ করা জাইয নেই। দারুল হারবে বন্দী মুসলমানদের বিনিময়ে দিরহাম-দিনার এবং যুদ্ধের দ্বারা উপকরণ বা উপাদান নয় এমন জিনিস দেয়া যায়। যেমন বস্ত্র, খাদ্য ইত্যাদি। যুদ্ধের উপকরণ দেয়া জাইয নেই। যেমন অস্ত্র, ঘোড়া, লোহা। (সিরাজুল ওয়াহ্হাজ)।
১০. মাসআলা: ইমাম মুহাম্মদ (র) সিয়ারে কবীরে উল্লেখ করেছেন, কোন আযাদ মুসলমান বা যিম্মী যদি দারুল হারবে বন্দী থাকে। এমতাবস্থায় সে তাদের ওখানেই নিরাপত্তাধীন কোন মুসলমান বা যিম্মীকে বলল, তুমি আমাকে (মুক্তি দিয়ে) মুক্ত কর বা ক্রয় কর, এরপর সে তাই করল এবং তাকে দারুল ইসলামে নিয়ে এলো। তাহলে সে আযাদ বলে গণ্য হবে। আর মুক্তিপণ বা ক্রয় মূল্য ঐ ব্যক্তির উপর ঋণ হিসাবে বিবেচিত হবে। সুতরাং আদিষ্ট ব্যক্তি যে পরিমাণ মাল মুক্তিপণ দিয়েছিল তা তার থেকে আদায় করে নিবে। তবে আদায়কৃত মুক্তি দিয়্যত সমপরিমাণ হতে হবে। অতএব যদি দিয়্যতের নিসাব থেকেও বেশী মুক্তিপণ আদায় করে তাহলে এক্ষেত্রে সে দিয়্যতের নিসাব পরিমাণ মালই আদায় করতে পারবে এর চেয়ে বেশী নয়।
অনেকে বলেছেন যে ইমাম আবু হানীফা (র)-এর বক্তব্য অনুযায়ী এ হুকুমই কার্যকর হওয়া উচিৎ যে আদিষ্ট ব্যক্তি মুক্তি হিসাবে যে পরিমাণই আদায় করুক তা আদেশ দাতা (বন্দী) থেকে আদায় করে নিবে অর্থাৎ দিয়্যতের নিসাব থেকে কম হোক বা বেশী হোক তাতে কোন পার্থক্য হবে না। তবে বিশুদ্ধতম কথা হলো (ইমাম আবূ হানীফা, আবূ ইউসুফ ও মুহাম্মদ (র) তাঁদের সকলের নিকট এ ক্ষেত্রে ঐ হুকুমই প্রযোজ্য (যা প্রথমে উল্লেখ করা হয়েছে।
………
১. কেননা ইরশাদ হচ্ছে: তোমরা মুশরিকদের যেখানে পাও হত্যা করো (সূরা বাকারা) তাছাড়া তাদেরকে বন্দী করে হাতের মুঠোয় আনার কারণে তারা দাস হওয়ার উপযুক্ত এবং তাতে রয়েছে মুসলমানদের হক। সুতরাং কোন লাভ ও বিনিময় ছাড়া উক্ত হক রহিত করা জাইয হবে না। এতদ্ব্যতীত এদের দ্বারা পরবর্তীতে মুসলমানদের ক্ষতি ও অনিষ্টতার প্রবল আশঙ্কা রয়েছে।
২. কারণ এগুলোর যুদ্ধের সামান এবং যুদ্ধ ক্ষেত্রে দুশমনকে পরাস্ত করার অন্যতম মাধ্যম।
………
আর তাদের বাসন পত্র এবং আসবাবপত্রসহ ঘরের যাবতীয় আসবাব পত্র এমনভাবে ভেঙ্গে চুরমার করে দিবে যেন পরবর্তীর্তে এসব দ্বারা উপকৃত না হতে পারে। আর সকল ধরনের তরল জাতীয় পদার্থ প্রবাহিত করে দিবে, যেন তারা পরবর্তীতে এসব দ্বারা উপকৃত না হতে পারে। এসব কর্মকাণ্ড এজন্য করা হবে যাতে তারা ক্রোধান্বিত হয়ে উঠে।
১৮. মাসআলা: দারুল হারবের অভিযান থেকে ফেরার সময় যদি বন্দীদের সঙ্গে আনা
তাদের সম্ভব না হয় তাহলে পুরুষদেরকে হত্যা করা হবে যদি ইসলাম গ্রহণ না করে এবং নারী, শিশু ও বৃদ্ধাদেরকে খাদ্য ও পানীয় বিহীন নির্জন স্থানে ফেলে আসবে, যেন তারা ক্ষুধা-পিপাসায় মারা যায়। কেননা হাদীসে নিষেধাজ্ঞা আসার কারণে হত্যা করা সম্ভব নয়, আবার বাঁচিয়ে রাখাও বিশেষ কোন যুক্তি নেই।১
একারণেই মুসলমানরা যদি দারুল হারবে কোথাও সাপ বা বিচ্ছু পায় তবে তারা বিচ্ছুর লেজ কেটে দিবে আর সাপ হলে তার দাঁত ভেঙ্গে দিবে যেন মুসলমানদের ওখানে থাকা অবস্থায় কোন ক্ষতি না হয়। আর তাদের একেবারেই মেরে ফেলবে না যেন তাদের বংশ পরম্পরা বাকি থাকে পরবর্তীতে তাদের বংশধররা কাফিরদেরকে দংশন করে ও কষ্ট দেয় (সিরাজুল ওয়াহ্হাজ)।
১৯. মাসআলা: গনীমতের মাল যতক্ষণ পর্যন্ত দারুল ইসলামে এনে সংরক্ষণ না করা হবে ততক্ষণ পর্যন্ত তার মালিক হওয়া যায় না (মুহীত: সারাঙ্গী)।
উপরোক্ত মূলনীতির উপর অনেক মাসাইল ভিত্তি করে (১) গনীমতের হকদারদের কেউ যদি (দারুল হারবের মধ্যেই) বন্দীকৃত দাসীর সাথে সংগম কর্ম করে এরপর উক্ত দাসী একটি সন্তান প্রসব করল আর ঐ ব্যক্তি সে সন্তানের দাবী করল তাহলে এক্ষেত্রে তার সাথে উক্ত সন্তানের বংশ সম্পর্ক সাব্যস্ত হবে না। তবে (সংগম করার কারণে) ঐ ব্যক্তির উপর উফর ওয়াজিব হবে।
কাজেই উক্ত দাসী, তার সন্তান এবং (আদায়কৃত) উফর গনীমতের হকদারদের মাঝে বণ্টন করে দেওয়া হবে। (২) দারুল হারবে গনীমতের মাল বণ্টন করার পর যখন প্রত্যেকেই নিজ নিজ অংশ পেয়ে গেল এমতাবস্থায় কেউ যদি নিজ অংশ দারুল ইসলামে আনার পূর্বেই মারা যায় তাহলে কোন ব্যক্তি উত্তরাধিকার সূত্রে তার অংশের হকদার হবে না। (৩) মুজাহিদদের কেউ যদি গনীমতের কোন জিনিস নষ্ট বা ধ্বংস করে ফেলে তাহলে হানাফী মাযহাব অনুযায়ী সে তার জন্য দায়বদ্ধ হবে না। (৪) শাসক যদি ইজতিহাদ করা ব্যতীত কিংবা গাযীদের প্রয়োজনের দিকে লক্ষ্য না করে গনীমত বণ্টন করে তাহলে তা আমাদের (হানাফী) মাযহাব অনুযায়ী সহীহ হবে না২ (তাবয়ীন)।
………
১. হত্যার নিষেধাজ্ঞার ১ বা হেতু হচ্ছে দুর্বলের প্রতি করুণা, সুতরাং একই হেতুতে উপরোক্ত আরেন বৈধ হতে পারে না। (সম্পাদক)
২. অর্থাৎ ইমাম যদি আলিম হয় এবং তার মধ্যে ইজতিহাদ করে সঠিক ও মঙ্গলজনক সিদ্ধান্ত গ্রহণের যোগ্যতা থাকে তাহলে এরূপ চিন্তা-ভাবনা ছাড়া বণ্টন করা কিংবা মুজাহিদদের ফায়দা ও প্রয়োজনের দিকে লক্ষ্য না করে বণ্টন করা সহীহ হবে না। অতএব ইমাম যদি এ বিবেচনা করে বণ্টন করে যে দারুল ইসলামে গনীমত নিয়ে যাওয়ার আগে তা ধ্বংস বা নষ্ট হয়ে যেতে পারে তবে তা সহীহ্ হবে অনুরূপ যদি তাতে মুজাহিদদের উপকার নিহিত থাকে তবুও সহীহ্ হবে।





রাতের আঁধারে অতর্কিত হামলাঃ বেসামরিক নারী-শিশুরা যখন গনিমতের মাল
যেকোনো সভ্য সমাজ বা আধুনিক আন্তর্জাতিক যুদ্ধনীতিতে গেরিলা আক্রমণ এবং সাধারণ ডাকাতির মধ্যে একটি সুনির্দিষ্ট সীমারেখা থাকে। গেরিলা যুদ্ধে লক্ষ্যবস্তু হয় কেবল সশস্ত্র শত্রুসেনা। কিন্তু যখন কোনো আক্রমণে ঘুমন্ত, নিরস্ত্র বেসামরিক মানুষকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়, শিশুদের জীবনের নিরাপত্তা কেড়ে নেওয়া হয় এবং নারীদের সম্পদ হিসেবে গণ্য করা হয়, তখন তাকে আর ‘যুদ্ধ’ বলা যায় না—তা হয়ে দাঁড়ায় স্রেফ সংঘবদ্ধ ‘ডাকাতি’ বা ‘যুদ্ধাপরাধ’। ইসলামের প্রাথমিক যুগের এই অতর্কিত হামলাগুলো (যাকে সীরাতের পরিভাষায় ‘তাবেয়ীত’ বলা হয়) ছিল ঠিক তেমনই নৃশংস। রাতের অন্ধকারে যখন মানুষ গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন থাকতো, তখন মুসলিম বাহিনী অতর্কিতভাবে তাদের জনপদে ঝাঁপিয়ে পড়তো। এই আক্রমণে নারী বা শিশু আলাদা করার কোনো সুযোগ বা সদিচ্ছা কোনোটাই থাকতো না। নবী মুহাম্মদের নির্দেশ ছিল অত্যন্ত পরিষ্কার—যেহেতু রাতের আঁধারে শত্রু-মিত্র আলাদা করা কঠিন, তাই অবিশ্বাসী কাফেরদের পরিবারের নারী ও শিশুরাও সেই আক্রমণের বৈধ লক্ষ্যবস্তু। যারা এই নৃশংস হামলা থেকে বেঁচে যেতো, তাদের ভাগ্য হতো আরও করুণ; তাদের বন্দী করে যৌনদাসী হিসেবে ব্যবহার করা হতো এবং বাজারে বিক্রি করে দেওয়া হতো। এটি আধুনিক মানবাধিকারের দৃষ্টিতে কেবল অমানবিকই নয়, বরং এক ভয়াবহ যুদ্ধাপরাধ।
আজান শোনার ওপর নির্ভরশীল রাতের অতর্কিত আক্রমণ
নিচের হাদিসটিতে দেখা যায়, মুহাম্মদের আক্রমণের মানদণ্ড কোনো ন্যায়বিচার বা আত্মরক্ষা ছিল না, বরং তা ছিল কেবল একটি নির্দিষ্ট ধর্মীয় আগ্রাসন। যদি কোনো জনপদে আযানের শব্দ শোনা যেতো, তবে তারা প্রাণে বাঁচতো; অন্যথায় তাদের ওপর রক্তক্ষয়ী হামলা চালানো হতো। অর্থাৎ, মানুষের জীবনের নিরাপত্তা নির্ভর করতো তারা মুহাম্মদের ধর্ম গ্রহণ করেছে কি না—তার ওপর। [12]
সহীহ মুসলিম (ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
৪/ কিতাবুস স্বলাত
পরিচ্ছেদঃ ৬. দারুল কুফর বা অমুসলিম দেশে কোন গোত্রে আযানের ধ্বনি শোনা গেলে সেই গোত্রের উপর হামলা করা থেকে বিরত থাকা
ইসলামিক ফাউন্ডেশন নাম্বারঃ ৭৩৩ , আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ৩৮২
৭৩৩। যুহায়র ইবনু হারব (রহঃ) … আনাস ইবনু মালিক (রাঃ) থেকে বর্ণিত যে, তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ভোরে শত্রুর বিরুদ্ধে আক্রমণ পরিচালনা করতেন। আযান শোনার অপেক্ষা করতেন। আযান শুনতে পেলে আক্রমণ করা থেকে বিরত থাকতেন। আযান শুনতে না পেলে আক্রমণ করতেন। একবার তিনি কোন এক ব্যাক্তিকে اللَّهُ أَكْبَرُ اللَّهُ أَكْبَرُ বলতে শুলেন। তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তুমি ফিতরাত (দ্বীন ইসলাম) এর উপর রয়েছ। এর পর সে ব্যাক্তি أَشْهَدُ أَنْ لاَ إِلَهَ إِلاَّ اللَّهُ أَشْهَدُ أَنْ لاَ إِلَهَ إِلاَّ اللَّهُ বলল। তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তুমি জাহান্নাম থেকে বেরিয়ে এলে। সাহাবায়ে কিরাম লোকটির প্রতি লক্ষ্য করে দেখতে পেলেন যে, সে ছিল একজন ভেড়ার রাখাল।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আনাস ইবনু মালিক (রাঃ)
বিধর্মীদের দাওয়াত এবং ইসলাম কবুল না করলে আক্রমণ
এই হাদিসটি ইসলামের ‘শান্তিবাদী’ এবং ‘রক্ষণাত্মক’ দাবির কফিনে শেষ পেরেক ঠুকে দেয়। এখানে দেখা যাচ্ছে, বনূ মুসতালিক গোত্র কোনো যুদ্ধের প্রস্তুতি নিচ্ছিল না, তারা শান্তিতে তাদের পশুদের পানি পান করাচ্ছিল। এমন অপ্রস্তুত অবস্থায় কোনো ঘোষণা ছাড়াই তাদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে যোদ্ধাদের হত্যা করা হয় এবং হারিছ কন্যা জুওয়াইরিয়াসহ নারীদের বন্দী করা হয়। এটি কোনো বীরত্ব নয়, বরং চরম প্রতারণা ও বিশ্বাসঘাতকতার এক প্রকৃষ্ট উদাহরণ। ইসলাম প্রচারকগণ এই আক্রমণকে নানাভাবে বৈধতা দেয়ার উদ্দেশ্যে বলেন, বনু মুসতালিক গোত্র নিশ্চয়ই বড় কোন অন্যায় করেছিল, তাই শাস্তিস্বরূপ এই আক্রমণ করা হয়েছিল। কিন্তু তর্কের খাতিরে সেই দাবীকে মেনে নিলেও, বেসামরিক নারী ও শিশুদের ওপর আক্রমণ, হত্যা এবং দাসে পরিণত করে ভোগ বা বাজারে বিক্রি করাকে উনারা কীভাবে নৈতিক কাজ মনে করেন, তা বোধগম্য হয় না [13]
সহীহ মুসলিম (ইফাঃ)
অধ্যায়ঃ ৩৩/ জিহাদ ও এর নীতিমালা
পরিচ্ছেদঃ ১. যে সকল বিধর্মীর কাছে ইসলামের দাওয়াত পৌঁছেছে, পূর্ব ঘোষণা ব্যতীত তাদের বিরুদ্ধে আক্রমন পরিচালনা বৈধ
৪৩৭০। ইয়াহইয়া ইবনু ইয়াহইয়া তামীমী (রহঃ) … ইবনু আউন (রহঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বললেন, আমি নাফি’ (রহঃ) কে এই কথা জানতে চেয়ে পত্র লিখলাম যে, যুদ্ধের পূর্বে বিধর্মীদের প্রতি দ্বীনের দাওয়াত দেওয়া প্রয়োজন কি না? তিনি বলেন, তখন তিনি আমাকে লিখলেন যে, এ (নিয়ম) ইসলামের প্রারম্ভিক যুগে ছিল। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বনূ মুসতালিকের উপর আক্রমণ করলেন এমতাবস্থায় যে, তারা অপ্রস্তুত ছিল (তা জানতে পারেনি।) তাদের পশুদের পানি পান করানো হচ্ছিল। তখন তিনি তাদের যোদ্ধাদের (পূর্ণ বয়স্ক পুরুষ) হত্যা করলেন এবং অবশিষ্টদের (নারী শিশুদের) বন্দী করলেন। আর সেই দিনেই তাঁর হস্তগত হয়েছিল। (ইয়াহইয়া বলেন যে, আমার ধারণা হল, তিনি বলেছেন) জুওয়ায়রিয়া অথবা তিনি নিশ্চিতরূপে ইবনাতুল হারিছ (হারিছ কন্যা) বলেছিলেন। বর্ণনাকারী বলেন, এই হাদীস আমাকে আবদুল্লাহ ইবনু উমর (রাঃ) বর্ণনা করেছেন। তিনি সেই সেনাদলে ছিলেন।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ ইবনু ‘আউন (রহঃ)
এই ঘটনা কিন্তু এটিই একমাত্র উদাহরণ নয়। প্রায় একই ঘটনা ঘটেছিল আওতাস আক্রমণের সময়েও। এই ক্ষেত্রে কাফের গোত্রটি তাদের স্ত্রী এবং শিশুদেরও সাথে নিয়ে এসেছিল, কারণ ছিল তারা যুদ্ধে যাওয়ার কারণে তাদের এলাকা অরক্ষিত হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু সেই নারী ও শিশুরা কোন অবস্থাতেই সেই যুদ্ধের অংশগ্রহণকারী ছিল না। তারা শুধুমাত্র যোদ্ধাদের সাথে গিয়েছিল, যুদ্ধের ময়দান থেকে দুরে একটি নির্দিষ্ট স্থানে তারা তাঁবু গেড়ে সেখানেই অপেক্ষা করছিল। সেই নারী ও শিশুদের মুসলিমরা গনিমতের মাল হিসেবে গ্রহণ করে এবং স্বামীদের উপস্থিতিতেই তাদের বিছানায় তুলে নেয়, [14]
সহীহ মুসলিম (হাদীস একাডেমী)
১৮। দুধপান
পরিচ্ছেদঃ ৯. ইসতিবরার পর যুদ্ধ বন্দিনীর সাথে সঙ্গম করা জায়িয এবং তার স্বামী বর্তমান থাকলে সে বিবাহ বাতিল
হাদিস একাডেমি নাম্বারঃ ৩৫০০ , আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ১৪৫৬
৩৫০০-(৩৩/১৪৫৬) উবায়দুল্লাহ ইবনু উমার আল মায়সারাহ আল কাওয়ারীরী (রহঃ) ….. আবূ সাঈদ খুদরী (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত যে, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হুনায়ন এর যুদ্ধের সময় একটি দল আওত্বাস এর দিকে পাঠান। তারা শত্রু দলের মুখোমুখী হয়ে তাদের সাথে যুদ্ধ করে জয়লাভ করে এবং তাদের অনেক কয়েদী তাদের হস্তগত হয়। এদের মধ্য থেকে দাসীদের সাথে যৌন সঙ্গম করা রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কয়েকজন সাহাবা যেন নাজায়িয মনে করলেন, তাদের মুশরিক স্বামী বর্তমান থাকার কারণে। আল্লাহ তা’আলা এ আয়াত অবতীর্ণ করেন “এবং নারীর মধ্যে তোমাদের অধিকারভুক্ত দাসী ব্যতীত সকল সধবা তোমাদের জন্য নিষিদ্ধ” অর্থাৎ তারা তোমাদের জন্য হালাল, যখন তারা তাদের ইদ্দাত (ইদ্দত) পূর্ণ করে নিবে। (ইসলামিক ফাউন্ডেশন ৩৪৭৩, ইসলামীক সেন্টার ৩৪৭২)
[গর্ভবতী হলে প্রসব, অন্যথায় এক ঋতু অতিবাহিত হওয়াকে ইসতিবরার বলে।]
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আবূ সা’ঈদ খুদরী (রাঃ)
যুদ্ধবন্দী নারী শিশু যেভাবে ভাগাভাগি হতো
কাফেরদের আক্রমণ করে নবী মুহাম্মদ ও তার সাহাবীরা কী পরিমাণ গনিমতের মালামাল লুট করতো, তার একটি উদাহরণ এখানে দেয়া হচ্ছে। উল্লেখ্য, নবী মুহাম্মদ এবং তার সাহাবীবৃন্দ এরকম অসংখ্য আক্রমণ করেছেন, অসংখ্য গোত্রের মালামাল লুট করেছেন। [7]
নাসরুল বারী (বাংলা ৮ম খণ্ড) পৃষ্ঠা ৪১১
আক্রমণের নির্দেশ দেন। প্রচণ্ড যুদ্ধ শুরু হলে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এক মুষ্টি মাটি নিয়ে কাফিরদের দিকে নিক্ষেপ করেন, আর বলেন, “شاهت الوجوه” – ‘মন্দ হোক এসব চেহারা’। মুসলিম শরীফের এক রেওয়ায়াতে আছে, নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এক মুষ্টি মাটি নিক্ষেপের পর বলেছেন- انْهزموا ورب محمد । ‘শপথ মুহাম্মদের প্রভুর! তারা পরাস্ত হয়েছে।’
এমন কোন লোক বাকি ছিল না যাদের চোখে এ মাটির মুষ্টি থেকে ধূলো পৌঁছেনি। তৎক্ষণাৎ যুদ্ধের রং পাল্টে যায়। শত্রুদের পা উপড়ে যায়, তারা রণক্ষেত্র ছেড়ে পালিয়ে যায়। দুশমনদের ৭০ জন নিহত হয়। বহু গ্রেফতার হয়। অগণিত গনিমতের সম্পদ মুসলমানদের হস্তগত হয়।
৬ হাজার মহিলা ও শিশু বন্দী। ২৪ হাজার উট, ৪০ হাজার বকরী, ৪ হাজার উকিয়া রূপা। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নির্দেশ দেন যেন সমস্ত গনিমতের সম্পদ জি’রানায় জমা করা হয় এবং স্বয়ং তিনি তায়েফে তাশরীফ নেন।
এর বিবরণ “باب غزوة طائف” এ ইনশাআল্লাহ আসবে।
مُحَمَّد بن عبد الله بن نُمَيْرٍ قَالَ حَدَّثَنَا يَزِيدُ بن هَارُونَ قَالَ أَخْبَرَنَا ۳۹۸۰. حَدَّثَنَا مُحَمَّد بن عَبدِ ال اسْمَاعِيلُ قَالَ رَايْتُ بَيْدِ عَبدِ اللهِ ابْنِ أَبِي أوفى ضَربَةً قَالَ ضُرِبَتُهَا مَعَ النَّبِيِّ اللَّهِ يَوْمَ حُنين قلت شهدتُ حُنَيْنَا ؟ قَالَ قَبْلَ ذَلِكَ .
৩৯৮০/৩২২. মুহাম্মদ ইবনে আবদুল্লাহ্ ইবনে নুমাইর র. হযরত ইসমাঈল (ইবনে আবু খালিদ) র. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি আবদুল্লাহ্ ইবনে আবু আওফা রা-এর হাতে একটি আঘাতের চিহ্ন দেখতে পেয়েছি। (আঘাতের চিহ্নের ব্যাপারে জিজ্ঞেস করলাম, এটা কি?) তিনি বলেছেন, হুনাইনের (যুদ্ধের) দিন নবী আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সঙ্গে থাকা অবস্থায় আমাকে এ আঘাত করা হয়েছিল। আমি বললাম, আপনি কি হুনাইন যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলেন? তিনি বললেন, এর পূর্বের যুদ্ধগুলোতেও অংশগ্রহণ করেছি। (অর্থাৎ, এর পূর্বেও বিভিন্ন যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছি যেমন- হুদাইবিয়া, খন্দক।)
ব্যাখ্যাঃ শিরোনামের সাথে মিল “يَوْمَ حُنَيْن” শব্দে।

এই বিপুল লুণ্ঠিত মালের এক-পঞ্চমাংশ (খুমুস) স্বয়ং নবীর জন্য বরাদ্দ থাকা প্রমাণ করে যে, এই জিহাদ কেবল আদর্শিক ছিল না, বরং এর পেছনে একটি শক্তিশালী অর্থনৈতিক লোলুপতাও বিদ্যমান ছিল [15]।
সহীহ বুখারী (তাওহীদ)
অধ্যায়ঃ ৫৭/ খুমুস (এক পঞ্চমাংশ)
পরিচ্ছেদঃ ৫৭/৭. আল্লাহ তা‘আলার বাণীঃ ‘‘নিশ্চয় এক পঞ্চমাংশ আল্লাহর ও রসূলের’’ (আনফাল ৪১)। তা বণ্টনের অধিকার রসূলেরই। আল্লাহর রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, আমি বণ্টনকারী ও সংরক্ষণকারী আর আল্লাহ তা‘আলাই প্রদান করেন।
৩১১৭. আবূ হুরাইরাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ‘আমি তোমাদের দানও করি না এবং তোমাদের বঞ্চিতও করি না। আমি তো মাত্র বণ্টনকারী, যেভাবে নির্দেশিত হই, সেভাবে ব্যয় করি।’ (আধুনিক প্রকাশনীঃ ২৮৮৩, ইসলামিক ফাউন্ডেশনঃ ২৮৯৪)
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আবূ হুরায়রা (রাঃ)
যুদ্ধবন্দী নারী যখন সাহাবীদের যৌনদাসী
আসুন আরো কিছু হাদিস দেখে নিই, [16] [17] [18] [19] [20] [21] –
সূনান আবু দাউদ (ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
৬/ বিবাহ
পরিচ্ছেদঃ ১৩৯. বন্দী স্ত্রীলোকের সাথে সহবাস করা।
২১৫২. উবায়দুল্লাহ্ ইবন উমার ইবন মায়সার …… আবূ সাঈদ আল খুদরী (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হুনায়নের যুদ্ধের সময় আওতাস্ নামক স্থানে একটি সৈন্যদল প্রেরণ করেন। তারা তাদের শত্রুদের সাথে মুকাবিলা করে তাদেরকে হত্যা করে এবং তাদের উপর বিজয়ী হয়। আর এই সময় তারা কয়েদী হিসাবে (হাওয়াযেন গোত্রের) কিছু মহিলাকে বন্দী করে। তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কিছু সাহাবী তাদের সাথে অনধিকারভাবে সহবাস করা গুনাহ মনে করে, কেননা তাদের মুশরিক স্বামীরা তখন বন্দী ছিল। তখন আল্লাহ্ তা’আলা এই আয়াত নাযিল করেনঃ (অর্থ) যে সমস্ত স্ত্রীলোকদের স্বামী আছে তারা তোমাদের জন্য হারাম। তবে যারা তোমাদের অধিকারভুক্ত দাসী অর্থাৎ যেসব মহিলা যুদ্ধবন্দী হিসাবে তোমাদের আয়ত্বে আসবে তারা ইদ্দত (হায়েযের) পূর্ণ করার পর তোমাদের জন্য হালাল।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আবূ সা’ঈদ খুদরী (রাঃ)
সূনান আবু দাউদ (ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
৬/ বিবাহ
পরিচ্ছেদঃ ১৩৯. বন্দী স্ত্রীলোকের সাথে সহবাস করা।
১৫৪. আমর ইবন আওন …… আবূ সাঈদ আল খুদরী (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেনঃ কোন গর্ভবতী বন্দিনীর সাথে তার সন্তান প্রসবের আগে এবং কোন রমণীর সাথে তার হায়েয হতে পবিত্র হওয়ার পূর্বে সহবাস করবে না।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আবূ সা’ঈদ খুদরী (রাঃ)
সহীহ মুসলিম (হাদীস একাডেমী)
১৭। বিবাহ
পরিচ্ছেদঃ ২২. আযল এর হুকুম
হাদিস একাডেমি নাম্বারঃ ৩৪৩৬,
আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ১৪৩৮
৩৪৩৬-(১২৫/১৪৩৮) ইয়াহইয়া ইবনু আবূ আইয়ুব, কুতায়বাহ্ ইবনু সাঈদ ও আলী ইবনু হুজর (রহিমাহুমুল্লাহ) ….. ইবনু মুহায়রিয (রহঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি এবং আবূ সিরমাহ (রহঃ) আবূ সাঈদ আল খুদরী (রাযিঃ) এর নিকট গেলাম। আবূ সিরমাহ তাকে জিজ্ঞেস করলেন, হে আবূ সাঈদ! আপনি কি রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে ’আযল সম্পর্কে আলোচনা করতে শুনেছেন? তিনি বললেন, হ্যাঁ আমরা রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সাথে বানু মুসতালিক এর যুদ্ধ করেছি। সে যুদ্ধে আমরা আরবের সবচেয়ে সুন্দরী বাঁদীদের বন্দী করলাম। এদিকে আমরা দীর্ঘকাল স্ত্রী সাহচর্য থেকে বঞ্চিত ছিলাম। অন্যদিকে আমরা ছিলাম সম্পদের প্রতি অনুরাগী। এমতাবস্থায় আমরা বাঁদীদের দ্বারা উদ্দেশ্য হাসিল করার এবং ’আযল করার ইচ্ছা করলাম। কিন্তু আমরা এ কথাও আলোচনা করলাম যে, আমরা কি এ কাজ করতে যাব, অথচ রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের মধ্যে উপস্থিত রয়েছেন। তার নিকট আমরা কি এ ব্যাপারে কিছু জিজ্ঞেস করব না! তাই আমরা রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে জিজ্ঞেস করলাম। তিনি বললেনঃ ঐ কাজ না করাতে তোমাদের কোন ক্ষতি নেই। কেননা, আল্লাহ তা’আলা কিয়ামত পর্যন্ত যত মানুষ সৃষ্টি করার কথা লিখে রেখেছেন সে সব মানুষ সৃষ্টি হবেই। (ইসলামিক ফাউন্ডেশন ৩৪০৯, ইসলামীক সেন্টার ৩৪০৮)
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ ইবনু মুহায়রিয (রহঃ)
সহীহ বুখারী (তাওহীদ পাবলিকেশন)
৬৪/ মাগাযী [যুদ্ধ]
পরিচ্ছেদঃ ৬৪/৩২. যাতুর রিকা-র যুদ্ধ।
قَالَ ابْنُ إِسْحَاقَ وَذَلِكَ سَنَةَ سِتٍّ وَقَالَ مُوْسَى بْنُ عُقْبَةَ سَنَةَ أَرْبَعٍ وَقَالَ النُّعْمَانُ بْنُ رَاشِدٍ عَنْ الزُّهْرِيِّ كَانَ حَدِيْثُ الإِفْكِ فِيْ غَزْوَةِ الْمُرَيْسِيْعِ
ইবনু ইসহাক (রহ.) বলেছেন, এ যুদ্ধ ৬ষ্ঠ হিজরী সনে সংঘটিত হয়েছিল। মূসা ইবনু ‘উকবাহ (রহ.) বলেছেন, ৪র্থ হিজরী সনে। নুমান ইবনু রাশিদ (রহ.) যুহরী (রহ.) থেকে বর্ণনা করেছেন যে, মুরাইসীর যুদ্ধে ইফকের ঘটনা ঘটেছিল।
৪১৩৮. ইবনু মুহাইরীয (রহ.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদা আমি মসজিদে প্রবেশ করে আবূ সা‘ঈদ খুদরী (রাঃ)-কে দেখতে পেয়ে তার কাছে গিয়ে বসলাম এবং আযল সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলাম। আবূ সা‘ঈদ খুদরী (রাঃ) বললেন, আমরা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সঙ্গে বানূ মুসতালিকের যুদ্ধে যোগদান করেছিলাম। এ যুদ্ধে আরবের বহু বন্দী আমাদের হস্তগত হয়। মহিলাদের প্রতি আমাদের মনে আসক্তি জাগে এবং বিবাহ-শাদী ব্যতীত এবং স্ত্রীহীন অবস্থা আমাদের জন্য কষ্টকর অনুভূত হয়। তাই আমরা আযল করা পছন্দ করলাম এবং তা করতে মনস্থ করলাম। তখন আমরা পরস্পর বলাবলি করলাম, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের মাঝে আছেন। এ ব্যাপারে তাঁকে জিজ্ঞেস না করেই আমরা আযল করতে যাচ্ছি। আমরা তাঁকে এ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলে তিনি বললেন, ওটি না করলে তোমাদের কী ক্ষতি? ক্বিয়ামাত (কিয়ামত) পর্যন্ত যতগুলো প্রাণের আগমন ঘটবার আছে, ততগুলোর আগমন ঘটবেই। [২২২৯; মুসলিম ত্বলাক (তালাক)/২১, হাঃ ১৪৩৮, আহমাদ ১১৮৩৯] (আধুনিক প্রকাশনীঃ ৩৮২৬, ইসলামিক ফাউন্ডেশনঃ ৩৮২৯)
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ ইবনু মুহায়রিয (রহঃ)
সহীহ মুসলিম (হাদীস একাডেমী)
১৭। বিবাহ
পরিচ্ছেদঃ ২২. আযল এর হুকুম
হাদিস একাডেমি নাম্বারঃ ৩৪৫১, আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ১৪৪০
৩৪৫১-(১৩৬/১৪৪০) আবূ বকর ইবনু আবূ শায়বাহ ও ইসহাক ইবনু ইবরাহীম (রহিমাহুমাল্লাহ) ….. জাবির (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমরা ’আযল করতাম আর কুরআন নাযিল হত। এর উপর ইসহাক আরো বাড়িয়ে বলেছেন যে, সুফইয়ান (রহঃ) বলেন, এতে যদি নিষেধ করার মতো কিছু থাকত, তবে কুরআন তা নিষেধ করে দিত। (ইসলামিক ফাউন্ডেশন ৩৪২৪, ইসলামীক সেন্টার ৩৪২৩)
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ জাবির ইবনু আবদুল্লাহ আনসারী (রাঃ)

রাতের অন্ধকারে নারী ও শিশু হত্যার বৈধতা
জিহাদের নৃশংসতা আরো চরমে পৌঁছায় যখন রাতের আঁধারে কাফেরদের শিশুদের ওপর আক্রমণ করাও ইসলামের বিধানে বৈধ। মুহাম্মদের সাহাবীরা যখন দ্বিধান্বিত হয়ে তাকে প্রশ্ন করেন যে, রাতের হামলায় নারী ও শিশুরা তো মারা যাচ্ছে, তখন মুহাম্মদ কোনো অনুশোচনা বা সতর্কতা ছাড়াই উত্তর দেন যে— “তারাও (নারী ও শিশু) তাদের (মুশরিকদের) অন্তর্ভুক্ত।” অর্থাৎ, অমুসলিম হওয়ার কারণে শিশুদের জীবনের কোনো আলাদা মূল্য মুহাম্মদের কাছে ছিল না। এই সম্মিলিত দণ্ড বা ‘Collective Punishment’ আধুনিক সভ্যতায় এক জঘন্যতম অপরাধ হিসেবে গণ্য। [22] [23] [24] [25] !
সহীহ মুসলিম (ইফাঃ)
অধ্যায়ঃ ৩৩/ জিহাদ ও এর নীতিমালা
পরিচ্ছদঃ ৯. রাতের অতর্কিত আক্রমনে অনিচ্ছাকৃতভাবে নারী ও শিশু হত্যায় দোষ নেই
৪৩৯৯। ইয়াহইয়া ইবনু ইয়াহইয়া, সাঈদ ইবনু মনসুর ও আমর আন নাকিদ (রহঃ) … সা’ব ইবনু জাছছামা (রাঃ) থেকে বর্ণিত যে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে মুশরিকদের নারী ও শিশু সন্তান সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হলো, যখন রাতের আধারে অতর্কিত আক্রমণ করা হয়, তখন তাদের নারী ও শিশুরাও আক্রান্ত হয়। তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ তারাও তাদের (মুশরিকদের) অন্তর্ভুক্ত।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
সহীহ মুসলিম (হাঃ একাডেমী)
অধ্যায়ঃ ৩৩। জিহাদ ও সফর
পরিচ্ছদঃ ৯. রাতের আকস্মিক হামলায় অনিচ্ছাকৃতভাবে নারী ও শিশু হত্যায় দোষ নেই
৪৪৪২-(২৭/…) আবদ ইবনু হুমায়দ (রহঃ) ….. সা’ব ইবনু জাসসামাহ্ (রাযিঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে জিজ্ঞেস করলাম, হে আল্লাহর রসূল! আমরা রাতের অন্ধকারে আকস্মিক হামলায় মুশরিকদের শিশুদের উপরও আঘাত করে ফেলি। রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তারাও তাদের (মুশরিক যোদ্ধাদের) মধ্যে গণ্য। (ইসলামিক ফাউন্ডেশন ৪৪০০, ইসলামিক সেন্টার ৪৪০০)
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
সুনানে ইবনে মাজাহ
তাওহীদ পাবলিকেশন
অধ্যায়ঃ ১৮/ জিহাদ
১/২৮৩৯। সাব‘ ইবনে জাসসামা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাতের বেলা মুশরিকদের মহল্লায় অতর্কিত আক্রমণ প্রসঙ্গে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে জিজ্ঞেস করা হলো, যাতে নারী ও শিশু নিহত হয়। তিনি বলেনঃ তারাও (নারী ও শিশু) তাদের অন্তর্ভুক্ত।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)

দাওয়াতের নাটকের আর প্রয়োজন নেই
বর্তমান সময়ের অ্যাপোলোজিস্ট বা জনপ্রিয় বক্তারা যখন ইসলামকে নারীর সুমহান মর্যাদা দানকারী ধর্ম হিসেবে প্রচার করেন, তখন তারা কৌশলে বনূ মুসতালিক বা আওতাসের যেই নারী ও শিশুরা গনিমতের মাল হয়েছিল তাদের ঘটনাগুলোর মতো এই বীভৎস ঘটনাগুলো এড়িয়ে যান। নিচের হাদিসে সরাসরি লাজলজ্জার মাথা খেয়ে গর্বের সাথে স্বীকার করা হয়েছে যে, দাওয়াতের নাটকের আর প্রয়োজন নেই; যাদের কাছে একবার ইসলামের নাম পৌঁছেছে, তাদের ওপর যেকোনো সময় ঘোষণা ছাড়াই ঝাঁপিয়ে পড়া ইসলামের বৈধ যুদ্ধকৌশল। এটি কোনো আধ্যাত্মিক বিপ্লব নয়, দ্বীনের দাওয়াত নয় বরং সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসনের এক নগ্ন রূপ। [13] [26] –
সহীহ মুসলিম (ইফাঃ)
অধ্যায়ঃ ৩৩/ জিহাদ ও এর নীতিমালা
পরিচ্ছেদঃ ১. যে সকল বিধর্মীর কাছে ইসলামের দাওয়াত পৌঁছেছে, পূর্ব ঘোষণা ব্যতীত তাদের বিরুদ্ধে আক্রমন পরিচালনা বৈধ
৪৩৭০। ইয়াহইয়া ইবনু ইয়াহইয়া তামীমী (রহঃ) … ইবনু আউন (রহঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বললেন, আমি নাফি’ (রহঃ) কে এই কথা জানতে চেয়ে পত্র লিখলাম যে, যুদ্ধের পূর্বে বিধর্মীদের প্রতি দ্বীনের দাওয়াত দেওয়া প্রয়োজন কি না? তিনি বলেন, তখন তিনি আমাকে লিখলেন যে, এ (নিয়ম) ইসলামের প্রারম্ভিক যুগে ছিল। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বনূ মুসতালিকের উপর আক্রমণ করলেন এমতাবস্থায় যে, তারা অপ্রস্তুত ছিল (তা জানতে পারেনি।) তাদের পশুদের পানি পান করানো হচ্ছিল। তখন তিনি তাদের যোদ্ধাদের (পূর্ণ বয়স্ক পুরুষ) হত্যা করলেন এবং অবশিষ্টদের (নারী শিশুদের) বন্দী করলেন। আর সেই দিনেই তাঁর হস্তগত হয়েছিল। (ইয়াহইয়া বলেন যে, আমার ধারণা হল, তিনি বলেছেন) জুওয়ায়রিয়া অথবা তিনি নিশ্চিতরূপে ইবনাতুল হারিছ (হারিছ কন্যা) বলেছিলেন। বর্ণনাকারী বলেন, এই হাদীস আমাকে আবদুল্লাহ ইবনু উমর (রাঃ) বর্ণনা করেছেন। তিনি সেই সেনাদলে ছিলেন।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ ইবনু ‘আউন (রহঃ)

ইসলামী ফিকাহর অন্যতম ইমাম আবু হানিফা এবং তার শিষ্যদের মতে, যেহেতু ইসলামের বার্তা পৃথিবীর অধিকাংশ জায়গায় পৌঁছে গেছে, তাই এখন অমুসলিমদের আর সতর্ক করার প্রয়োজন নেই। যেকোনো সময় তাদের ওপর মরণঘাতী হামলা চালানো যেতে পারে। এই দৃষ্টিভঙ্গি প্রমাণ করে যে, ইসলামি রাষ্ট্রের পাশেপাশে অমুসলিমদের অস্তিত্ব সবসময়ই ছিল হুমকির মুখে এবং আক্রমণাত্মক জিহাদই ছিল তাদের সাথে যোগাযোগের একমাত্র ভাষা।
এবারে আসুন তাহাবী শরীফ থেকে একটি হাদিস পড়ে নেয়া যাক, যেখানে দেখা যাচ্ছে, যেহেতু বর্তমানে সকলের কাছেই ইসলামের দাওয়াত পৌঁছে গেছে, তাই আবারো ইসলামের পথে আহবান জানাবার আর কোন বিশেষ প্রয়োজন নেই। আক্রমনাত্মক জিহাদ বা অতর্কিত আক্রমণ চালালে সেটি সম্পূর্ণ জায়েজ [27] –
৪৭২৪. মুহাম্মদ ইব্ন্ন খুযায়মা (র) ….. মানসূর (র) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি ইবরাহীম (র)-কে দায়লামীদেরকে দাওয়াত দেয়া সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলাম। তিনি বললেন, ইসলামের দাওয়াত তার অবহিত রয়েছে।
ইমাম আবূ জা’ফর তাহাবী (র) বলেন: যা কিছু আমরা সংশ্লিষ্ট বিষয়ে রিওয়ায়াত করেছি তাতে স্পষ্ট হয়ে
গিয়েছে যে, দাওয়াতের আবশ্যকতা ইসলামের শুরুতে ছিল। কেননা তখন সবার কাছে দাওয়াত পৌঁছায়নি এবং তারা জানতও না যে, তাদের বিরুদ্ধে কেন যুদ্ধ করা হয়। তাই দাওয়াত দেয়ার নির্দেশ ছিল যেন তা তাদের জন্য তাবলীগ হয়ে যায় এবং তাদেরকে অবহিত করা হয় যে, তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের কারণ কি? অতঃপর অপর লোকদের উপর আক্রমণ করার নির্দেশ দিয়েছেন। তাই এর মর্ম এটাই হলো যে, এরা আহ্বানের মুখাপেক্ষী ছিল না, কেননা তারা অবহিত ছিল যে, তাদেরকে কিসের দিকে আহ্বান করা হচ্ছে। আর যদি তারা আহ্বানে সাড়া দিত তাহলে তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা হত না। সুতরাং আহ্বানের কোন অর্থ হয় না। ইমাম আবূ হানীফা (র), ইমাম আবূ ইউসুফ (র) ও ইমাম মুহাম্মদ (র)-এরূপই বলতেন যে, প্রত্যেক সম্প্রদায়ের নিকট ইসলামের দাওয়াত পৌঁছে গিয়েছে। এখন ইমাম আগাম দাওয়াত দেয়া ছাড়াই তাদের সঙ্গে লড়াই করতে পারেন। আর যে সমস্ত সম্প্রদায়ের কাছে ইসলামের আহ্বান পৌঁছায়নি তাদের সঙ্গে লড়াই করা সমীচীন নয়, যতক্ষণ না তাদের উপর স্পষ্ট হয়ে যায় যে, কিসের জন্য বা কি কারণে তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা হচ্ছে এবং তাদেরকে কিসের দিকে আহ্বান করা হচ্ছে।

যুদ্ধবন্দী নারী ধর্ষণ হচ্ছে তাদের কুফরির শাস্তি
এবারে আসুন শুনি, যুদ্ধবন্দী নারীদের ধর্ষণের ইসলামিক কারণ,
এবারে আমরা আহমদুল্লাহ এবং অন্যান্য আলেমদের কিছু ওয়াজ শুনে নিই,
এবারে আসুন শুনি, একজন পাকিস্তানী মুসলিম কীভাবে ভারত পাকিস্তান যুদ্ধ হলে ভারতীয় নায়িকা মাধুরীকে গনিমতের মাল বানাবে, তার আগাম বুকিং দিচ্ছে দেখে নিই,
গনিমতের মাল বণ্টন, দাসীর বাজার এবং উন্মুক্ত নিলাম
উপরে ইসলামিক বিধানগুলোর যেই বিবরণ আমরা পড়লাম, যেকোন সুস্থ মানুষের তাতে আঁতকে ওঠার কথা। এই বিবরণগুলোর সারকথা এটাই যে, বেসামরিক নারী-শিশুদের মানুষ হিসেবে নয়—যুদ্ধলব্ধ সম্পত্তি হিসেবে “বন্দী/দাস” বানিয়ে ফেলা ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ বিধানের অন্তর্ভূক্ত এবং নবী নিজেও এই কাজগুলো করেছেন। কিন্তু প্রশ্ন হলো—এই দাসদের ভাগ্যে এরপর কী ঘটেছিল? এখানেই ঘটনাটা ধর্মীয় রোমান্টিসাইজিং ভেঙে চূর্ণ হয়ে যায়ঃ এই বেসামরিক নারীরা ও শিশুরা পর্যন্ত “মানবিক নিরাপত্তা”টুকু পেলো না; তাদের একাংশকে বাজারি পণ্যের মতো বিক্রি করা হয়, এবং সেই বিক্রির টাকা দিয়ে নবীর অনুসারীরা অস্ত্র ও ঘোড়া কেনে—অর্থাৎ মানুষকে নগদে রূপান্তর করে যুদ্ধ-যন্ত্রে বিনিয়োগ। এই লেনদেনের ভেতরে নৈতিকতার কোনো ছাপ নেই; আছে কেবল মানুষকে বস্তু বা জিনিস হিসেবে উপস্থাপনের নির্মম বলপ্রয়োগ।
যুদ্ধবন্দী নারী শিশুদের বাজারে দাস হিসেবে বিক্রি করার সুন্নত
এবারে আসুন দেখি, বেসামরিক নারী ও শিশুদের সাথে নবী মুহাম্মদ কী করেছেন। বনু কুরাইজা গোত্রের বেসামরিক নারী ও শিশুদের বিক্রি করে নবী অস্ত্র ও ঘোড়া কিনেছেন, এটি খুব ভালভাবেই সীরাত গ্রন্থগুলোতে বর্ণিত আছে [28]

একইসাথে আমাদের জেনে রাখা প্রয়োজন, গনিমতের মাল হিসেবে পাওয়া এইসব নারীর ভাগ্যে কী ঘটেছিল, সেগুলো হয়তো আমরা কখনোই ভালভাবে জানতে পারবো না। তবে অনুমান করা যায় সহজেই। এই প্রবন্ধে সবকিছু আলোচনা করা সম্ভব নয়, অন্য প্রবন্ধে সেগুলো নিয়ে আরও বিস্তারিতই আলোচনা রয়েছে। আগ্রহী পাঠকগণ এই প্রবন্ধগুলো পড়বেন আশাকরি [29] [30] [31]। এবারে আসুন আরও একটি রেফারেন্স পড়ে দেখা যাক। ইবনে ইসহাকের সিরাতে রাসুলাল্লাহ গ্রন্থে গনিমতের মাল ভাগাভাগির বিবরণ পাওয়া যায়। সেখান থেকে জানা যায়, নবী মুহাম্মদ নিজের জন্য এক পঞ্চমাংশ রেখেছিলেন, এবং একজন নারীও নিয়েছিলেন [32] –
[ ছাবিত ইবনে কায়েস এ সম্পর্কে বলেছেন:
আমার কর্তব্য শেষ, আমি উদারতা দেখিয়েছি,
অনেক চেষ্টা করেছি
অথচ বাকি সব ধৈর্যহারা হয়েছে
আমার ওপর জাবিরের সকলের চেয়ে বেশি দাবি
দড়ি দিয়ে হাত বাঁধা ছিল তার
তাকে মুক্ত করার জন্য রাসুলের (সা.) কাছে গেছি আমি।
তিনি ছিলেন আমাদের দয়ার সাগর । ]
রাসুলের (সা.) হুকুম ছিল, ওদের প্রাপ্তবয়স্ক সবাইকে যেন হত্যা করা হয়।
আতিয়া আল-কুরাজি সূত্রে আবদুল মালিক ইবনে উমায়র এবং তাঁর সূত্রে শুবা ইবনে আল-হাজ্জাজ আমাকে বলেছেন,বনু কুরাইজার সব প্রাপ্তবয়স্ক সদস্যকে হত্যা করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। আমি তখন নাবালক ছিলাম, কাজেই আমাকে ছেড়ে দেওয়া হয়েছিল ।
আল-মুনজিরের জননী এবং সালিত ইবনে কায়েসের বোন সালমা বিনতে কায়েস ছিলেন রাসুলের (সা.) খালা। রাসুলের (সা.) সঙ্গে তিনি জেরুজালেম ও মক্কা উভয় দিকে মুখ করে নামাজ পড়েছেন। বনু আদি ইবনে আল-নাজ্জারের ভাই আইউব ইবনে আবদুর রহমান আমাকে বলেছেন, সালমার আশ্রিত রিফা ইবনে সামাওয়াল প্রাপ্তবয়স্ক ছিলেন। তিনি রাসুলের (সা.) কাছে তাঁর প্রাণ ভিক্ষা চান। তিনি বলেন, সেই লোক কসম খেয়েছে, সে নামাজ পড়বে, উটের মাংস খাবে। রাসুল (সা.) তাঁর প্রার্থনা মঞ্জুর করেন।
বনু কুরাইজার সম্পত্তি ও স্ত্রী-ছেলেমেয়েদের রাসুল (সা.) মুসলমানদের মধ্যে ভাগবণ্টন করে দেন। উট ও মানুষের অংশ সেদিনই স্থির হয়। তিনি গ্রহণ করেন এক-পঞ্চমাংশ। একজন ঘোড়াওয়ালা তিন অংশ পেয়েছিল, ঘোড়ার জন্য দুই আর আরোহীর জন্য এক। বনু কুরাইজার দিকে মোট ঘোড়ার সংখ্যা ছিল ছত্রিশ। এই প্রথম যুদ্ধ-সম্পদের ওপর লটারি হয় এবং এক-পঞ্চমাংশ আলাদা রাখা হয়। এই নজির পরবর্তী সময়ের অন্যান্য যুদ্ধে অনুসরণ করা হয়।
রাসুল (সা.) নিজের জন্য নির্বাচিত করেছিলেন বনু আমর ইবনে কুরাইজার এক নারীকে। তার নাম রায়হানা বিনতে আমর ইবনে খুনাফা। তিনি আমৃত্যু তাঁর কর্তৃত্বের অধীন ছিলেন। রাসুল (সা.) তাঁকে বিয়ে করে পর্দানশিন করার প্রস্তাব দিয়েছিলেন।কিন্তু রায়হানা বলেছিলেন, ‘তার চেয়ে বরং আপনি আমাকে আপনার কর্তৃত্বের আওতায় রাখুন। সেটা আপনার-আমার উভয়ের জন্য সহজ হবে।’ বন্দী হওয়ার সময় তিনি ইসলামের প্রতি অশ্রদ্ধা প্রকাশ করেন এবং ইহুদি ধর্ম আঁকড়ে থাকেন। এতে রাসুল (সা.) নারাজ হন এবং তাঁকে আলাদা করে রাখেন। একদিন সাহাবিদের সঙ্গে বসে ছিলেন তিনি, তখন পেছনে চপ্পলের আওয়াজ হলো। তিনি বললেন, ‘ছালাবা ইবনে সাইয়া আসছে, রায়হানা ইসলাম গ্রহণ করেছে সেই সুখবর নিয়ে। ছালাবা সত্যিই সেই সুসংবাদ জ্ঞাপন করল। তিনি প্রীত হলেন। খন্দক ও বনু কুরাইজা বিষয়ে আল্লাহ সুরা আহজাবে তাদের বিচার, তাদের প্রতি অনুগ্রহ প্রদর্শন ও সাহায্যের কথা বলেছেন। তিনি বলেন, ‘হে বিশ্বাসীগণ, তোমরা তোমাদের প্রতি আল্লাহর অনুগ্রহের কথা স্মরণ করো, যখন শত্রুবাহিনী তোমাদের বিরুদ্ধে সমাগত হয়েছিল এবং আমি তাদের বিরুদ্ধে বাতাস এবং অদৃশ্য সৈন্যবাহিনী প্রেরণ করেছিলাম। তোমাদের সব কাজের দ্রষ্টা আল্লাহ।’ শত্রুবাহিনী হচ্ছে কোরাইশ, গাতাফান ও বনু কুরাইজা। বাতাসের সঙ্গে প্রেরিত আল্লাহর বাহিনী ছিল ফেরেশতারা।
– ১. সুরা ৩৩।
– ৫০৬ ● সিরাতে রাসুলুল্লাহ (সা.)

নারীর শরীরের উন্মুক্ত প্রদর্শনীঃ যৌনদাসী ক্রয়ের ‘রিটার্ন পলিসি’
ইমাম কুদুরী তাঁর গ্রন্থে দাসীকে সরাসরি একটি ‘দ্রব্য’ (Goods) হিসেবে গণ্য করেছেন। আধুনিক যুগে আমরা যেমন কোনো ত্রুটিপূর্ণ পণ্য ফেরত দিই, ফিকহ শাস্ত্রেও দাসীর ক্ষেত্রে ঠিক একই নিয়ম রাখা হয়েছে। যদি কোনো দাসী ক্রয় করার পর দেখা যায় তার মুখে বা বগলে দুর্গন্ধ আছে, তবে ক্রেতা সেই ‘পণ্য’ বা নারীকে বিক্রেতার কাছে ফেরত দিতে পারবেন।
এর পেছনে যে যুক্তি দেওয়া হয়েছে তা অত্যন্ত অবমাননাকর: বলা হয়েছে, দাসী যেহেতু যৌন সম্ভোগের (Sexual Intercourse) উদ্দেশ্যে কেনা হয়, তাই শারীরিক দুর্গন্ধ সেই মিলনের পথে একটি ‘দোষ’ বা অন্তরায়। পক্ষান্তরে, পুরুষ দাসের ক্ষেত্রে এই দুর্গন্ধ তেমন বড় কোনো ত্রুটি নয়, কারণ তার প্রধান কাজ হলো হাড়ভাঙা খাটুনি দেওয়া। অর্থাৎ, একজন নারীর সত্তাকে এখানে কেবল তার সুগন্ধ বা যৌন লালসা মেটানোর ক্ষমতার ওপর ভিত্তি করে পরিমাপ করা হয়েছে। [33]
কুদুরী (আরবি-বাংলা) ২৩০ কিতাবুল বুয়ুই
… এর আলোচনাঃ ক্রয়কৃত বস্তুতে দোষ-ত্রুটি দেখা দেয়ার পর তা ফিরিয়ে দেয়া বা পূর্ণ থাকার কারণ হল, মতলক আকদের চাহিদা হল, তা ত্রুটিমুক্ত হওয়া। তবে এ টা কয়েকটি শর্তের সাথে সম্পৃক্ত। (১) সে ত্রুটি বিক্রেতার নিকট থাকতেই ছিল, ক্রেতার হস্তক্ষেপের পর সৃষ্টি হয়নি। (২) ক্রেতার ক্রয় করার সময় ত্রুটি সম্পর্কে অনবগত হওয়া (৩) এবং হস্তগত করার সময়ও সে ত্রুটি সম্পর্কে অজ্ঞাত থাকা। (৪) ক্রেতা কষ্ট ব্যতীত ত্রুটি বিদূরীত করতে সক্ষম না হওয়া। (৫) এ ত্রুটি এবং সকল ত্রুটিমুক্ত হওয়ার শর্ত যদি না করা হয় এবং আবূদ ভঙ্গ হওয়ার পূর্বে তা দূর হওয়া যদি সম্ভব না হয় ।
লো তা JS, -এর আলোচনা ঃ পণ্য দ্রব্যের যে কোন দোষ-ত্রুটিকে মনগড়া ভাবে ‘দোষ’ বলে অভিহিত করা যাবে না; বরং ব্যবসায়ীদের রীতি-রেওয়াজে যেটা ‘দোষ’ বলে স্বীকৃত তাই কেবল ‘দোষ’ হিসেবে গণ্য হবে। কেননা ‘দোষ’ থাকলে দ্রব্যের মান ও মূল্যে কমতি দেখা দেয়। আর কোন দ্রব্যের মূল্য কমতি হল কিনা তার বিচার করার ভার ব্যবসায়ীদের ওপর। মনে রাখতে হবে আয়েব বা দোষ সম্পর্কিত এ ব্যাখ্যা বস্তুত একটি মূল সূত্র। এ সূত্র ধরে আরো অনেক মাসায়েল সংকলন করা সম্ভব। স্বয়ং গ্রন্থকারও এ সূত্রে সংকলনকৃত কয়েকটি মাসআলা পেশ করেছেন।
…-এর আলোচনাঃ কোন ক্রীতদাসের মধ্যে পলায়ন প্রভৃতি বদ অভ্যাসগুলো শৈশবে বিদ্যমান থাকা সত্ত্বেও যদি বালেগ হওয়ার পর মালিকের নিকট পুনরায় তা প্রকাশ পেয়ে না থাকে, তবে ক্রেতার অধিকারে এসে এর পুনরাবৃত্তি ঘটলে তা দোষ হবে না। অর্থাৎ এটা দোষ তো বটেই, কিন্তু বিক্রেতার নিকট হতে উদ্ভূত দোষ বলে দাবি করা যাবে না এবং গোলামও ফেরত দেয়া যাবে না; বরং ধরে নিতে হবে এগুলো নব সৃষ্ট দোষ। অপর দিকে শৈশবকালীন এ কু-অভ্যাস গুলো যদি ক্রেতার নিকট নাবালেগ অবস্থায়ই প্রকাশ পায় কিংবা বালেগ অবস্থায় বিক্রেতার নিকট প্রকাশ পাওয়ার পর ক্রেতার নিকট এসে তার পুনরাবৃত্তি ঘটে, তবে তা ফেরতযোগ্য দোষ বলে গণ্য হবে। কারণ এ সমস্ত দোষের শৈশবকালীন উৎস এবং বালেগ অবস্থার উৎস এক নয়; বরং সম্পূর্ণ ভিন্ন। কেননা শৈশবে পলায়ন করে থাকে খেলাধুলার মোহে, পক্ষান্তরে বালেগ হওয়ার পর তা করে চুরি বা বেপরোয়া মনোভাবের বশবর্তী হয়ে। উৎসের ভিন্নতার কারণে দোষও ভিন্ন হয়ে যায় । সুতরাং ক্রেতার নিকট প্রকাশিত দোষ তখন পূর্বের দোষ বলে দাবি করা চলে না ।
…-এর আলোচনাঃ অর্থাৎ কোন দাসী ক্রয় করার পর যদি তার মুখে বা বগলে দুর্গন্ধ অনুভূত হয় অথবা সে ব্যভিচারিণী বা জারজ বলে প্রমাণিত হয়; তবে তাকে ফেরত দেয়া যাবে। কারণ অনেক সময় দাসী যৌন সম্ভোগের উদ্দেশ্যেও ক্রয় করা হয়। আর শারীরিক ও চারিত্রিক এ সব দোষ-ত্রুটি ও দুর্বলতা তখন মিলনের পথে অন্তরায় হয়ে দাঁড়ায় । সুতরাং দাসীর ক্ষেত্রে এগুলো দোষ। পক্ষান্তরে গোলাম দ্বারা উদ্দেশ্য থাকে গৃহস্থালীর কাজকর্ম সম্পন্ন করা। আর এ সকল ত্রুটি সাধারণত গৃহস্থালীর কাজে ব্যাঘাত সৃষ্টি করে না। তদুপরি দুর্গন্ধ যদি অতিশয় হয় অথবা ব্যভিচার তার অভ্যাসে পরিণত হয়ে থাকে, তবে তা দোষের মধ্যে গণ্য হবে। এতে পরিষ্কার প্রতীয়মান হয় যে, দ্রব্যের মধ্যকার ত্রুটি যদি এমন হয় যা থেকে দ্রব্য সাধারণত মুক্ত হতে পারে না, যেমন এক মণ সরিষার মধ্যে পোয়া, দেড় পোয়া ধান বা কলাই থাকা- দূষণীয় নয় । কিন্তু ধুলাবালি বা কলাইর পরিমাণ যদি এক-দুই কেজি হয়, তবে অবশ্যই তা দোষের মধ্যে পরিগণিত হবে।

স্পর্শ ও প্রদর্শনীঃ লাজলজ্জার সকল সীমার বিলুপ্তি
ইসলামী নীতিশাস্ত্রে ‘হায়া’ বা লজ্জাকে ঈমানের অঙ্গ বলা হলেও, দাসবাজারের ক্ষেত্রে সেই হায়া বা পর্দা কোথায় ছিল—তা একটি বড় প্রশ্ন। আশরাফুল হিদায়ার মাসআলা অনুযায়ী, ক্রেতা যদি কোনো দাসী কেনার ইচ্ছা পোষণ করে, তবে সে দাসীর সেই সব অঙ্গ স্পর্শ করতে পারবে যা দেখা জায়েজ। এর মধ্যে রয়েছে বুক, পিঠ এবং পায়ের নলি। এমনকি স্পর্শের ফলে ক্রেতার মনে তীব্র যৌন উত্তেজনা বা কামভাব জাগ্রত হলেও শাস্ত্রীয়ভাবে একে ‘জায়েজ’ বা বৈধ বলা হয়েছে।
এই প্রদর্শনীর বীভৎসতা সবচেয়ে বেশি প্রকাশ পায় কিশোরী দাসীদের ক্ষেত্রে। বালেগা হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত কিশোরী দাসীদের ঊর্ধ্বাংশ (বুক ও পিঠ) খোলা অবস্থায় বাজারে প্রদর্শন করা যেত। এমনকি সঙ্গমের উপযোগী ছোট শিশুদের (যাদের বয়স সাত বা নয় হতে পারে) বাজারে কেবল নিম্নাংশ ঢেকে প্রদর্শন করা হতো। এটি কেবল একটি ঐতিহাসিক বর্ণনা নয়, বরং এটি প্রমাণ করে যে মানুষের মর্যাদাকে এখানে ক্রয়-বিক্রয়ের মুনাফার নিচে বলি দেওয়া হয়েছিল। [34] –
ইমাম কুদুরী (রহ.) তাঁর মুখতাসারুর কুদুরী গ্রন্থে বলেন, যদি কেউ দাসী ক্রয় করার ইচ্ছা পোষণ করে তার জন্য দাসীর ঐ সকল অঙ্গসমূহ স্পর্শ করা জায়েজ, যা দেখা জায়েজ। এমনকি যদি স্পর্শ করার দ্বারা ক্রেতার মধ্যে কামভাব জাগ্রত হয়, তবুও।
মুসান্নিফ (রহ.) বলেন, ইমাম মুহাম্মদ (রহ.) তাঁর জামিউস সাগীরের মধ্যে এইভাবেই মাসআলাটি বর্ণনা করেছেন। জামিউস সাগীরের ইবারত এই- “ইমাম মুহাম্মদ (রহ.) ও আবু ইউসুফ (রহ.) এ দুজন ইমাম আবু হানীফা (রহ.) থেকে বর্ণনা করেন, যে ব্যক্তি কোন দাসী ক্রয় করার ইচ্ছা পোষণ করেছে তার জন্য দাসীর পায়ের নলি, বুক ও হাত স্পর্শ করাতে কোন ক্ষতি বা দোষ নেই এবং এসব অঙ্গ অনাবৃত অবস্থায় দেখাতেও কোন সমস্যা নেই”। “কামভাব জাগ্রত হলেও স্পর্শ করা বৈধ হবে”।
“স্পর্শ করার দ্বারা কামভাব জাগ্রত হওয়ার আশংকা থাকলেও স্পর্শ করা জায়েজ। তাদের মতে ক্রয় করার উদ্দেশ্যে দাসীর দিকে তাকানো বৈধ, যদিও এতে উত্তেজিত হওয়ার আশংকা থাকে”।
“পূর্বযুগের ইমামগণ দাসী ক্রয় করার সময় তাদের ত্বক সম্পর্কে ধারণা নেওয়ার উদ্দেশ্যে স্পর্শ করাকে বৈধ বলতেন, কেননা সেই সময়ের লোকজন সাধারণভাবে নেক ছিলেন”।
“পরবর্তীকালে ওলামাগণ কামভাব না থাকা অবস্থায় স্পর্শ করার অনুমতি দিয়েছেন। আর এর উপরেই বর্তমান ফতোয়া”।
“যখন কোন কিশোরী দাসী প্রথম ঋতুমতী হয় তারপর থেকে উক্ত দাসীকে বিক্রয়ের উদ্দেশ্যে বাজারে নিয়ে নিম্নাঙ্গ আবৃত হয় এমন এক কাপড় পরিয়ে তাকে দর্শন করানো যাবে না। কারণ ঋতুমতী হওয়ার অর্থ হল সে বালেগা হয়েছে। আর বালেগা দাসীর পেট ও পিঠ সতরের অন্তর্ভুক্ত যা ইতঃপূর্বে আলোচনা করা হয়েছে। সুতরাং এখন যদি শুধুমাত্র নিম্নাঙ্গের পোশাক পরিধান করানো হয় তাহলে বুক ও পিঠ খোলা থাকবে তাই তাকে ঊর্ধাঙ্গের কামিজ তথা পোশাক পরতে হবে। উল্লেখ্য যে ইজার এমন পোশাককে বলা হয় যার দ্বারা শুধুমাত্র নাভি থেকে নিচের অংশ ঢাকা যায়”।
“এ আলোচনা দ্বারা বুঝা গেল এর চেয়ে কম বয়সী দাসীদের বুক পিঠ খোলা অবস্থায় বাজারে নিয়ে যাওয়াতে কোন দোষ নেই”।
“যে কিশোরী দাসী কামভাবের পর্যায়ে উপনীত হয়েছে (অর্থাৎ সঙ্গমের উপযুক্ত হয়েছে, এতে সাত বা নয় বছর বয়সের কোন শর্ত নেই) তাকে বিক্রির জন্য এক কাপড়ে পেশ করা যাবে না”।


দাসী কেনার সময় যোনি পরীক্ষা করে কেনা
বিশ্ব মানবতার পথপ্রদর্শক নবী মুহাম্মদের সাহাবীগণ দাসবাজার থেকে সুন্দরী ভার্জিন বা কুমারী দাসী কিনে আনতো ভোগের জন্য। তাদের বাজারে কুমারী দাসীদের বাজার মূল্যও ছিল বেশি। কিন্তু মাঝে মাঝে কিনে আনা ক্রীতদাসীকে দেখা যেত, তারা ঠিক কুমারী নন। কুমারী যোনি যেহেতু মুহাম্মদের সাহাবীদের খুবই পছন্দের ছিল (আল্লাহ পাক বেহেশতেও কুমারী যোনির হুরের লোভ দেখিয়েছেন), দাসীদের এনে বিছানায় তোলার পরে যদি দেখা যেতো কুমারী যোনির পর্দা ফেটে যথেষ্ট রক্তরক্তি হচ্ছে না, অথবা সাহাবীরা সঙ্গম করে ঠিক মজা পাচ্ছে না যোনি যথেষ্ট টাইট না হওয়ার জন্য, তখন নবীর সাহাবীগণ ক্ষেপে যেতো। কারণ তারা তো পয়সা দিয়েছিল কুমারী বা ভার্জিন মেয়ের জন্য! মানে তারা ভাবতো, পুরো টাকাই গচ্চা গেল!
এই বিষয়ে আশরাফুল হিদায়াতে যেই মাসালাটি দেয়া আছে, সেটি হচ্ছে, এরকম হলে যাচাই করার জন্য মালিক দাসীর লজ্জাস্থান বা যোনি পরীক্ষা করে দেখতে পারবে। এসব ফিকহী বিধান পড়লে বোঝা যায়, সাহাবীদের মধ্যে দাসবাজারে ‘ভার্জিন’ বা কুমারী দাসীদের চাহিদা ও মূল্য ছিল আকাশচুম্বী। আর এই চাহিদাকে ঘিরে তৈরি হয়েছিল আরও এক পৈশাচিক আইনি বিধান। যদি কোনো মালিক কুমারী হিসেবে কোনো নারীকে ক্রয় করার পর দাবি করেন যে তিনি কুমারী নন, তবে বিষয়টি যাচাই করার জন্য ওই নারীর লজ্জাস্থান বা যোনি পরীক্ষা করা বৈধ করা হয়েছে। প্রশ্ন হচ্ছে, পরীক্ষাটি কীভাবে করা হতো? টু ফিঙ্গার টেস্ট?
ভেবে দেখুন, যে নারী যুদ্ধে তাঁর পরিবার হারিয়েছেন, তাঁকে এখন এক অপরিচিত পুরুষের সামনে স্রেফ তাঁর ‘পণ্যমূল্য’ যাচাইয়ের জন্য জননেন্দ্রিয় উন্মুক্ত করে পরীক্ষা দিতে হচ্ছে। আধুনিক নীতিশাস্ত্রে একে সরাসরি Sexual Assault বা যৌন নিপীড়ন বলা হয়, অথচ ফিকহ শাস্ত্র একে ‘ব্যবসায়িক ইনসাফ’ হিসেবে বৈধতা দিয়েছে। এখানে নারীর সতীত্ব কোনো সম্মান নয়, বরং এটি কেবল একটি ‘মানদণ্ড’ যা দিয়ে তাঁর বাজারদর নির্ধারিত হতো। [35] –
৬. অনুরূপভাবে কোনো ব্যক্তি যদি কোনো দাসীকে কুমারী হিসেবে ক্রয় করে। অতঃপর দেখে যে, উক্ত দাসীর কুমারীত্ব নষ্ট হয়ে গেছে কিন্তু বিক্রেতা কুমারীত্ব নষ্ট হওয়ার বিষয়টি অস্বীকার করে তাহলে এরূপ অবস্থায় বিষয়টি যাচাই করার জন্য এক পর্যায়ে দাসীর লজ্জাস্থান পরীক্ষার উদ্দেশ্যে দেখা বৈধ।

আন্তর্জাতিক মানবাধিকারের হরণ ও আধুনিক সভ্যতার সাথে সংঘাত
আধুনিক বিশ্বব্যবস্থা যে সকল মানবিক মূল্যবোধ এবং আইনি কাঠামোর ওপর দাঁড়িয়ে আছে, ইসলামের আক্রমণাত্মক জিহাদ ও গনিমতের মাল সংক্রান্ত বিধানগুলো তার ঠিক বিপরীত মেরুতে অবস্থান করে। বিশেষ করে ১৯৪৯ সালের জেনেভা কনভেনশন এবং ১৯৪৮ সালের সার্বজনীন মানবাধিকার ঘোষণার (UDHR) সাথে ধ্রুপদী ইসলামী যুদ্ধনীতির তুলনা করলে দেখা যায়, একটি যেখানে মানুষের জন্মগত মর্যাদা ও জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে চায়, অন্যটি সেখানে ধর্মীয় শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণের জন্য মানুষের ব্যক্তিসত্তাকে পণ্য বা দাসে রূপান্তর করতে উৎসাহিত করে।
১. জেনেভা কনভেনশন বনাম শাসকের খেয়ালখুশিঃ আধুনিক আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী, কোনো সশস্ত্র সংঘাতের সময় যারা সরাসরি যুদ্ধে অংশ নেয় না (বেসামরিক নাগরিক) এবং যারা অস্ত্র সংবরণ করে আত্মসমর্পণ করে, তাদের ওপর আক্রমণ বা নির্যাতন চালানো একটি ভয়ংকর যুদ্ধাপরাধ। জেনেভা কনভেনশনের ৩ নম্বর ধারা অনুযায়ী, যুদ্ধবন্দীদের সাথে সর্বদা মানবিক আচরণ করতে হবে এবং তাদের জীবন ও শারীরিক নিরাপত্তার পূর্ণ নিশ্চয়তা দিতে হবে। অথচ আমরা দেখেছি, ফাতাওয়ায়ে আলমগীরীর মতো ধ্রুপদী কিতাবগুলোতে আত্মসমর্পণকারী বন্দীদের ভাগ্য নির্ধারণের ভার ছেড়ে দেওয়া হয়েছে শাসকের মর্জির ওপর। সেখানে হত্যা করা বা দাসে পরিণত করাকে একটি বৈধ প্রশাসনিক বিকল্প হিসেবে রাখা হয়েছে, যা আধুনিক সভ্যতায় সরাসরি মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ (Crimes Against Humanity) হিসেবে গণ্য।
২. দাসত্বের প্রাতিষ্ঠানিক রূপ বনাম মানবাধিকারের ৪ নম্বর অনুচ্ছেদঃ সার্বজনীন মানবাধিকার ঘোষণার ৪ নম্বর অনুচ্ছেদে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে— “কাউকেই দাসত্ব বা দাসত্বের শৃঙ্খলে আবদ্ধ রাখা যাবে না; দাসপ্রথা এবং দাস ব্যবসা তার সকল রূপে নিষিদ্ধ থাকবে।” কিন্তু ইসলামী শরিয়াহর আক্রমণাত্মক জিহাদ কেবল দাসপ্রথাকে টিকিয়েই রাখেনি, বরং যুদ্ধজয়ের পুরস্কার হিসেবে অমুসলিম নারী ও শিশুদের ‘মালে গনিমত’ হিসেবে ভোগ করাকে ধর্মীয়ভাবে অলঙ্কৃত করেছে। কোনো নিরপরাধ নারীকে তার ইচ্ছার বিরুদ্ধে অপহরণ করে ‘দাসী’ হিসেবে হাটে বিক্রি করা কিংবা তার সাথে শারীরিক সম্পর্ক স্থাপনকে বৈধ করা আধুনিক জমানায় কেবল মানবাধিকার লঙ্ঘন নয়, বরং এটি যৌন দাসত্ব (Sexual Slavery) ও মানবপাচারের নামান্তর। ধর্মের দোহাই দিয়ে এই অমানবিকতাকে বৈধতা দেওয়া বৈশ্বিক নৈতিকতার পরিপন্থী।
৩. অবকাঠামো ধ্বংস ও পরিবেশগত অপরাধঃ আধুনিক যুদ্ধনীতিতে বেসামরিক অবকাঠামো, ফসলী জমি এবং পানির উৎস ধ্বংস করা নিষিদ্ধ। বিশেষ করে ‘Scorched Earth’ বা পোড়ামাটি নীতি বর্তমানে আন্তর্জাতিক আইনের চোখে অপরাধ। অথচ ইসলামী ফিকহ অনুযায়ী, শত্রুকে পর্যুদস্ত করতে তাদের ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দেওয়া, বৃক্ষ নিধন করা এবং পানির উৎস নষ্ট করে দেওয়াকে জিহাদের কৌশল হিসেবে জায়েজ করা হয়েছে। এই পদ্ধতিটি কেবল একটি জাতির বর্তমানকে নয়, বরং তাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের বেঁচে থাকার উপায়কেও ধ্বংস করে দেয়। এটি কোনোভাবেই একটি ‘শান্তির ধর্ম’ বা মানবিক ব্যবস্থার পরিচয় হতে পারে পারে না।
৪. সাম্প্রদায়িক বৈষম্য ও নাগরিকত্বের ধারণাঃ আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থা জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকল নাগরিকের সমান অধিকারে বিশ্বাসী। কিন্তু ইসলামী জিহাদ দর্শন বিশ্বকে ‘দারুল ইসলাম’ (ইসলামের ভূমি) এবং ‘দারুল হারব’ (যুদ্ধের ভূমি) এই দুই ভাগে বিভক্ত করে দেয়। এই বিভাজন অনুযায়ী, অমুসলিমদের জীবন ও সম্পদের কোনো স্বাধীন মূল্য নেই যতক্ষণ না তারা বশ্যতা স্বীকার করে বা জিযিয়া প্রদান করে। এই ধরনের সাম্প্রদায়িক ও বিভাজনমূলক দর্শন আধুনিক বহুত্ববাদী সমাজ এবং গণতান্ত্রিক বিশ্বব্যবস্থার স্থিতিশীলতার জন্য এক বিরাট হুমকি। যা একপক্ষকে ‘পবিত্র মুজাহিদ’ এবং অন্য পক্ষকে ‘লুণ্ঠনযোগ্য কাফের’ হিসেবে চিহ্নিত করে, তা কখনোই বিশ্বজনীন মানবাধিকারের মানদণ্ডে উত্তীর্ণ হতে পারে না।
উপসংহার ও সামগ্রিক সমালোচনাঃ ধর্মতাত্ত্বিক দস্যুবৃত্তি ও নৈতিক দেউলিয়াগ্রস্ততা
এই প্রবন্ধ সিরিজে আমরা ধ্রুপদী ইসলামের প্রাথমিক উৎস এবং ফিকহ শাস্ত্রের যে প্রামাণ্য দলিলগুলো পর্যালোচনা করেছি, তা থেকে একটি বিষয় অত্যন্ত স্পষ্ট— ইসলামের রাজনৈতিক ও সামরিক দর্শন কোনো অর্থেই আধুনিক সভ্যতার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। “জান্নাত তলোয়ারের ছায়াতলে” কিংবা “সন্ত্রাসের মাধ্যমে বিজয়” অর্জনের যে দাবিগুলো স্বয়ং নবী করেছেন, তা আজ কোনো লুকোচুরির বিষয় নয়। বরং এটি একটি সুসংগঠিত ‘ধর্মতাত্ত্বিক আধিপত্যবাদ’, যা ভিন্নমতাবলম্বীদের মানুষ হিসেবে নয়, বরং লুণ্ঠনযোগ্য ‘বস্তু’ হিসেবে সংজ্ঞায়িত করে।
ইসলামী জিহাদের অন্যতম চালিকাশক্তি হলো গনিমতের মাল বা লুণ্ঠিত সম্পদের আকর্ষণ। যখন কোনো ধর্মতত্ত্ব যুদ্ধজয়ের পুরস্কার হিসেবে অন্যের স্ত্রী-সন্তানকে দাসী বানানো এবং তাদের সম্পদ দখলকে ‘পবিত্র’ হিসেবে স্বীকৃতি দেয়, তখন তা আর নিছক আত্মরক্ষামূলক যুদ্ধ থাকে না; তা পরিণত হয় একটি সংগঠিত ‘predatory system’ বা শিকারি ব্যবস্থায়। ফাতাওয়ায়ে আলমগীরীতে বর্ণিত নিয়মগুলো—যাতে ফসল ধ্বংস করা, পানি দিয়ে ডুবিয়ে দেওয়া কিংবা ক্ষুধার্ত রেখে নিরপরাধ নারী-শিশুকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেওয়ার বৈধতা দেওয়া হয়েছে—তা কোনো ঐশী দয়ার পরিচয় বহন করে না। বরং এটি মধ্যযুগীয় এক চরম বর্বরতার নথিপত্র, যা ধর্মের লেবাস পরে আজ পর্যন্ত টিকে আছে।
ইসলামী নীতিশাস্ত্রে ‘মানবিকতা’ কেবল মুসলিমদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। অমুসলিমদের ক্ষেত্রে এই নীতিগুলো পুরোপুরি পাল্টে যায়। যে ইসলাম মানুষের অধিকারের কথা বলে, সেই ইসলামই আবার অন্য ধর্মাবলম্বীদের নারী ও শিশুদের হাটে তুলে বিক্রি করার লাইসেন্স প্রদান করে। এই যে সাম্প্রদায়িক বিভাজন—যেখানে ‘কাফের’ হওয়া মানেই তার জীবন ও সম্পদের নিরাপত্তা হারানো—তা আধুনিক যুক্তিবাদী চেতনার মূলে কুঠারাঘাত। যদি কোনো ধর্ম সত্য এবং ন্যায়ের ওপর ভিত্তি করে দাঁড়িয়ে থাকে, তবে তার প্রসারের জন্য কেন ‘সন্ত্রাস’ বা ‘ভীতি’ সৃষ্টির প্রয়োজন হবে? সত্যের কি তরবারির ওপর ভর করে জান্নাত বিক্রি করতে হয়?
আজকের একবিংশ শতাব্দীতে দাঁড়িয়ে যখন আমরা মানবাধিকার, জেন্ডার ইকুয়ালিটি এবং জেনেভা কনভেনশনের কথা বলি, তখন ইসলামের এই আক্রমণাত্মক জিহাদের বিধানগুলো এক বিরাট প্রহসন হিসেবে সামনে আসে। এই বিধানগুলো কেবল ইতিহাসের পাতায় বন্দি নয়; বরং এগুলো আজও অনেক কট্টরপন্থী গোষ্ঠীর আদর্শিক অনুপ্রেরণা। যারা এই বর্বরতাকে ‘সুন্নাত’ বলে পালন করতে চায়, তারা মূলত আধুনিক বহুত্ববাদী সমাজকে ধ্বংস করে একটি অন্ধকার মধ্যযুগে ফিরিয়ে নিয়ে যেতে চায়। ভিন্ন ধর্মাবলম্বীদের অস্তিত্বকে ‘ফিতনা’ বা উপদ্রব মনে করে তাদের রক্ত ঝরানো বা দাস বানানো কোনো ধর্ম হতে পারে না; এটি হলো একটি ‘supremacist’ বা আধিপত্যবাদী রাজনৈতিক ইশতেহার।
পরিশেষে, এটি আজ অনস্বীকার্য যে, যে দর্শন নিরপরাধ নারী ও শিশুদের অপহরণ করে দাসত্বের শৃঙ্খলে আবদ্ধ করাকে ইবাদত মনে করে, তার নৈতিক ভিত্তি অত্যন্ত নড়বড়ে। যুক্তি, বিবেক এবং সর্বজনীন মানবাধিকারের আলোয় ইসলামের এই আক্রমণাত্মক জিহাদ ও দাসত্বের বিধানগুলো কেবল বর্জনীয়ই নয়, বরং তীব্র নিন্দনীয়। একটি সুন্দর ও মানবিক বিশ্ব গড়তে হলে এই ধরনের মধ্যযুগীয় নিষ্ঠুরতা ও সাম্প্রদায়িক আধিপত্যবাদের হাত থেকে মানুষকে মুক্ত হতে হবে। সত্য ও ন্যায়ের আধুনিক মানদণ্ড কেবল কোনো প্রাচীন লিপির অন্ধ আনুগত্যে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না; বরং একে হতে হবে মানুষের মুক্তি ও সমমর্যাদার সপক্ষে।
তথ্যসূত্রঃ
- সহীহ বুখারী, তাওহীদ পাবলিকেশন, হাদিসঃ ২৮১৮ ↩︎
- হাদীস সম্ভার, হাদিসঃ ১৯০০ 1 2
- সহীহ বুখারী, তাওহীদ পাবলিকেশন, হাদিসঃ ২৯৭৭ ↩︎
- ফাতাওয়ায়ে আলমগীরী, ৩য় খণ্ড, পৃষ্ঠা ৫০৩ 1 2 3 4
- সহজ নসরুল বারী, শরহে সহীহ বুখারী, ৮ম খণ্ড, আরবি-বাংলা, সহজ তরজমা ও বিস্তারিত ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ, হযরত মাওলানা মুহাম্মদ উসমান গনী, আল কাউসার প্রকাশনী, পৃষ্ঠা ৪১১ ↩︎
- ফাতাওয়ায়ে আলমগীরী, ৩য় খণ্ড, পৃষ্ঠা ৫০২ 1 2
- সহজ নসরুল বারী, ৮ম খণ্ড, পৃষ্ঠা ৪১১ 1 2
- ফাতাওয়ায়ে আলমগীরী, ৩য় খণ্ড, পৃষ্ঠা ৫৪০ 1 2 3 4
- ফাতাওয়ায়ে আলমগীরী, ৩য় খণ্ড, পৃষ্ঠা ৫৩৭ 1 2
- ফাতাওয়ায়ে আলমগীরী, ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ, তৃতীয় খণ্ড, পৃষ্ঠা ৫০২, ৫০৩, ৫৩৫, ৫৩৭, ৫৪০ ↩︎
- ফাতাওয়ায়ে আলমগীরী, ৩য় খণ্ড, পৃষ্ঠা ৫৩৭, ৫৪০ ↩︎
- সহীহ মুসলিম, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, হাদিসঃ ৭৩৩ ↩︎
- সহীহ মুসলিম, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, হাদিসঃ ৪৩৭০ 1 2
- সহীহ মুসলিম, হাদীস একাডেমী, হাদিসঃ ৩৫০০ ↩︎
- সহীহ বুখারী, তাওহীদ পাবলিকেশন, হাদিসঃ ৩১১৭ ↩︎
- সূনান আবু দাউদ, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, হাদিসঃ ২১৫২ ↩︎
- সূনান আবু দাউদ, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, হাদিসঃ ১৫৪ ↩︎
- সহীহ মুসলিম, হাদীস একাডেমী, হাদিসঃ ৩৪৩৬ ↩︎
- সহীহ বুখারী, তাওহীদ পাবলিকেশন, হাদিসঃ ৪১৩৮ ↩︎
- সহীহ মুসলিম, হাদীস একাডেমী, হাদিসঃ ৩৪৫১ ↩︎
- সূনান আবু দাউদ, তাহকিকঃ আল্লামা নাসিরুদ্দীন আলবানী, আল্লামা আলবানী একাডেমী, ৩য় খণ্ড, পৃষ্ঠা ২১৫-২১৬, হাদিসঃ ২১৫৫ ↩︎
- সহীহ মুসলিম, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, হাদিসঃ ৪৩৯৯ ↩︎
- সহীহ মুসলিম, হাদিস একাডেমী, হাদিসঃ ৪৪৪২ ↩︎
- সুনানে ইবনে মাজাহ, তাওহীদ পাবলিকেশন, হাদিসঃ ২৮৩৯ ↩︎
- সহিহ মুসলিম শরীফ (প্রয়োজনীয় ব্যাখ্যাসহ বঙ্গানুবাদ), আল হাদীছ প্রকাশনী, ১৭ ও ১৮ তম খণ্ড, পৃষ্ঠা ৩১ ↩︎
- সহিহ মুসলিম, বাংলাদেশ ইসলামিক সেন্টার, ষষ্ঠ খণ্ড, পৃষ্ঠা ১৮১, হাদিসঃ ৪৩৭০ ↩︎
- তাহাবী শরীফ, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, তৃতীয় খণ্ড, পৃষ্ঠা ৩৩৭ ↩︎
- সীরাতে ইবনে হিশাম, মূলঃ ইবনে হিশাম, অনুবাদঃ আকরাম ফারুক, বাংলাদেশ ইসলামিক সেন্টার, পৃষ্ঠা ২২৭ ↩︎
- ইসলাম অনুসারে ক্রীতদাসীর সতর বা পর্দা নাভী থেকে হাঁটু পর্যন্ত ↩︎
- ইসলামে দাসী-ধর্ষণঃ দাসী সহবাসে কি সম্মতি জরুরি? ↩︎
- ইসলামী শরিয়তে পেডোফিলিয়ার আইনি ছাড়পত্রঃ নাবালিকা দাসীর সাথে সহবাসের বৈধতা ↩︎
- সিরাতে রাসুলাল্লাহ (সাঃ), ইবনে ইসহাক, অনুবাদঃ শহীদ আখন্দ, প্রথমা প্রকাশনী, পৃষ্ঠা ৫০৬ ↩︎
- আল- মিসবাহুন নূরী শরহে মুখতাসারুল কুদুরী, প্রথম খণ্ড, ইসলামিয়া কুতুবখানা, পৃষ্ঠা ২৩০ ↩︎
- আশরাফুল হিদায়া, ইসলামিয়া কুতুবখানা, ৯ম খণ্ড, পৃষ্ঠা ৬১৮, ৬১৯ ↩︎
- আশরাফুল হিদায়া, ইসলামিয়া কুতুবখানা, ৯ম খণ্ড, পৃষ্ঠা ৫৯৬ ↩︎
