Table of Contents
- 1 ভূমিকাঃ সত্যের অপলাপ এবং প্রাতিষ্ঠানিক বাটপারি
- 2 প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের লাইসেন্স এবং মুহাম্মদের দ্বিমুখী অবস্থান
- 3 অনুসারীদের সুবিধাবাদ এবং কোরআনিক বৈধতার নগ্নতা
- 4 রণাঙ্গনে শঠতাঃ যুদ্ধের নামে প্রতারণার বৈধতা
- 5 প্রতারণার মাধ্যমে গুপ্তহত্যার রক্তাক্ত উত্তরাধিকার
- 6 উপসংহার: নৈতিক দেউলিয়াত্বের প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ
ভূমিকাঃ সত্যের অপলাপ এবং প্রাতিষ্ঠানিক বাটপারি
একটি সভ্য সমাজের নৈতিক ভিত্তি রচিত হয় মানুষের পারস্পরিক বিশ্বাস এবং দেওয়া প্রতিশ্রুতির পবিত্রতার ওপর। ‘কথা দিয়ে কথা রাখা’ কেবল একটি সামাজিক শিষ্টাচার নয়, বরং এটি মানুষের চারিত্রিক সততার চূড়ান্ত মাপকাঠি। যখন কোনো মতাদর্শ বা ধর্ম নিজেকে ‘পূর্ণাঙ্গ জীবনবিধান’ হিসেবে দাবি করে এবং তার প্রবর্তককে ‘সর্বোত্তম চরিত্রের অধিকারী’ হিসেবে উপস্থাপন করে, তখন প্রত্যাশা থাকে যে সেই আদর্শ অন্তত নৈতিকতার এই ন্যূনতম মানদণ্ড বজায় রাখবে। কিন্তু ইসলামের প্রাথমিক উৎসগুলো—কোরআন এবং সহিহ হাদিস—যখন নিবিড়ভাবে বিশ্লেষণ করা হয়, তখন এক ভয়াবহ এবং হতাশাজনক চিত্র ফুটে ওঠে। দেখা যায়, এখানে নৈতিকতা কোনো অটল স্তম্ভ নয়, বরং পরিস্থিতির প্রয়োজনে পরিবর্তনশীল এক সুবিধাবাদী কৌশল মাত্র।
ইসলামের এই কাঠামোতে ‘শপথ’ বা ‘ওয়াদা’ করার বিষয়টি কোনো পবিত্র অঙ্গীকার নয়, বরং এটি এক প্রকারের ‘ইলাস্টিক’ বা স্থিতিস্থাপক বিধান। এখানে অত্যন্ত চতুরতার সাথে ‘কাফফারা’ বা জরিমানার একটি ধারণা প্রবর্তন করা হয়েছে, যার মাধ্যমে একজন ব্যক্তি খুব সহজেই তার দেওয়া প্রতিশ্রুতি থেকে পিছু হটে আসতে পারে। কোনো ব্যক্তি যখন স্রষ্টার নামে শপথ করার পরেও জাগতিক লাভের লোভে বা ব্যক্তিগত সুবিধার্থে সেই শপথ ভেঙে ফেলে, তখন সেটি কেবল একটি মিথ্যাচারই নয়, বরং তা স্রষ্টার নামকে ব্যক্তিগত ঢাল হিসেবে ব্যবহার করার নামান্তর। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো, ইসলামের প্রবর্তক এবং তার ঈশ্বর এই শপথ ভঙ্গকে কেবল বৈধই করেননি, বরং এর জন্য একটি সুনির্দিষ্ট ‘রেট চার্ট’ বা মূল্যতালিকা তৈরি করে দিয়েছেন।
এই প্রবন্ধের মূল লক্ষ্য হলো এটি দেখানো যে, কীভাবে ইসলামের নবী নিজের এবং তার অনুসারীদের সুবিধার্থে প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের মতো একটি চরম অনৈতিক কাজকে ঐশ্বরিক বাণীর মোড়কে বৈধতা দিয়েছেন। এটি কেবল কোনো ছোটখাটো ত্রুটি নয়, বরং এটি মিথ্যাচারকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার এক নির্লজ্জ প্রচেষ্টা। যে ধর্মে একটি জরিমানা বা কয়েক দিনের উপবাসের বিনিময়ে দেওয়া কথা ভাঙার লাইসেন্স পাওয়া যায়, সেখানে মানুষের পারস্পরিক বিশ্বাসের কোনো জায়গা অবশিষ্ট থাকে না। আমরা দেখব, কীভাবে মুহাম্মদ নিজের প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের দায়ভার আল্লাহর ওপর চাপিয়ে দিয়ে নিজেকে একপ্রকার ‘পবিত্র দায়মুক্তি’ দান করেছিলেন এবং এই সুবিধাবাদী সংস্কৃতিকে পরবর্তী প্রজন্মের মুমিনদের মধ্যেও ছড়িয়ে দিয়েছিলেন।
প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের লাইসেন্স এবং মুহাম্মদের দ্বিমুখী অবস্থান
ইসলামের নবী মুহাম্মদকে তাঁর অনুসারীরা ‘আল-আমিন’ বা পরম বিশ্বাসী হিসেবে উপস্থাপন করলেও, হাদিসের দলিলাদি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় তিনি অত্যন্ত পরিকল্পিতভাবে প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের একটি প্রাতিষ্ঠানিক রূপরেখা তৈরি করেছিলেন। মুহাম্মদের নৈতিক দর্শনে ‘কথা দেওয়া’ বা ‘শপথ করা’ কোনো অলঙ্ঘনীয় বিষয় ছিল না, বরং তা ছিল পরিস্থিতির প্রয়োজনে পরিবর্তনযোগ্য একটি খেলনা মাত্র। সহিহ হাদিসের পাতায় আমরা দেখি, তিনি অত্যন্ত নির্লজ্জভাবে তার অনুসারীদের শিক্ষা দিচ্ছেন যে, কোনো বিষয়ে কসম বা শপথ করার পর যদি তার বিপরীত কাজটি অধিকতর লাভজনক বা ‘উত্তম’ মনে হয়, তবে যেন তারা আগের শপথটি তুচ্ছজ্ঞান করে ভেঙে ফেলে। এই ‘উত্তম’ হওয়া বা না হওয়া সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত ও বিষয়ীগত (subjective) ব্যাপার, যার কোনো সুনির্দিষ্ট নৈতিক মানদণ্ড নেই। অর্থাৎ, একজন মুসলিম তার ব্যক্তিগত সুবিধার জন্য যেকোনো সময় স্রষ্টার নাম নিয়ে করা শপথ ভঙ্গ করতে পারে, যা কার্যত সমাজব্যবস্থায় পারস্পরিক আস্থার মূলে কুঠারাঘাত করার নামান্তর। [1]
সহীহ বুখারী (তাওহীদ)
৯৩/ আহ্কাম
পরিচ্ছেদঃ ৯৩/৬. যে ব্যক্তি নেতৃত্ব চায়, তা তার উপরই ন্যস্ত করা হয়।
৭১৪৭. ‘আবদুর রহমান ইবনু সামুরাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে বলেছেনঃ হে ‘আবদুর রহমান ইবনু সামুরাহ! নেতৃত্ব চেয়ে নিও না। কেননা, যদি চাওয়ার পর তোমাকে তা দেয়া হয়, তাহলে তার সকল দায়িত্বভার তোমার উপরই অর্পিত হবে। আর যদি না চাওয়া সত্ত্বেও তোমাকে তা দেয়া হয়, তাহলে এ ক্ষেত্রে (আল্লাহর পক্ষ থেকে) সহযোগিতা করা হবে। আর কোন বিষয়ে কসম করার পর তার বিপরীত দিকটিকে যদি উত্তম বলে মনে কর, তাহলে উত্তম কাজটিই করবে আর তোমার কসমের কাফ্ফারা আদায় করে দিবে। (৬৬২২) (আধুনিক প্রকাশনী- ৬৬৪৮, ইসলামিক ফাউন্ডেশন- ৬৬৬২)
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আব্দুর রহমান ইবন সামুরা (রাঃ)
মুহাম্মদ কেবল এই অনৈতিক বিধানের প্রবক্তাই ছিলেন না, বরং তিনি নিজেও এর নিয়মিত চর্চা করতেন। তাঁর জীবনের একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা হলো আশআরী গোত্রের সাথে তাঁর আচরণ। যখন তারা তাঁর কাছে যুদ্ধের জন্য সওয়ারী বা বাহন চাইতে এল, মুহাম্মদ তখন রাগান্বিত অবস্থায় শপথ করে বসলেন যে তিনি তাদের কিছুই দেবেন না। কিন্তু কিছুক্ষণ পরেই যখন যুদ্ধলব্ধ গনীমতের উট তাঁর হস্তগত হলো, তিনি অবলীলায় নিজের সেই কসম ভুলে গিয়ে তাদের বাহন দিয়ে দিলেন। যখন সাহাবীরা তাঁকে তাঁর করা সেই কঠিন শপথের কথা মনে করিয়ে দিলেন, মুহাম্মদ অত্যন্ত চতুরতার সাথে সেই দায়ভার ‘আল্লাহর’ ওপর চাপিয়ে দিলেন। তিনি দাবি করলেন যে, আল্লাহই তাদের বাহন দিয়েছেন এবং তিনি নিজেই একটি নীতি নির্ধারণ করে নিয়েছেন যে—যখনই তিনি কোনো শপথ করবেন এবং পরে তার চেয়ে ভালো কিছু (লাভজনক কিছু) দেখবেন, তখন তিনি সেই শপথ ভেঙে ফেলবেন এবং তথাকথিত ‘কাফফারা’ দিয়ে হালাল হয়ে যাবেন। [2] [3]
সহীহ বুখারী (ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
৫৯/ যবাহ করা, শিকার করা
পরিচ্ছেদঃ ২১৯২. মুরগীর গোশত
ইসলামিক ফাউন্ডেশন নাম্বারঃ ৫১২১, আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ৫৫১৭ – ৫৫১৮
৫১২১। ইয়াহইয়া (রহঃ) … আবূ মূসা আশ-আরী (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে মুরগীর গোশত খেতে দেখেছি।
আবূ মা’মার (রহঃ) … যাহদাম (রহঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমরা আবূ মূসা আশআরী (রাঃ) এর কাছে ছিলাম। জারমের এ গোত্র ও আমাদের মাঝে ভ্রাতৃত্ব ছিল। আমাদের কাছে খাবার আনা ছিল। তাতে ছিল মোরগের গোশত। দলের মধ্যে লালচে রংয়ের এক ব্যাক্তি বসা ছিল। সে খাবারের দিকে অগ্রসর হল। আবূ মূসা আশআরী (রাঃ) তখন বলেনঃ এগিয়ে এসো, আমি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে মোরগের গোশত খেতে দেখেছি। সে বললঃ আমি এটিকে এমন কিছু খেতে দেখেছি, যে কারণে তা খেতে আমি অপছন্দ করি। তখন আমি কসম করেছি যে, আমি তা খাব না। তিনি বললেনঃ এগিয়ে এসো, আমি তোমাকে জানাবো। কিংবা তিনি বলেছেন, আমি তোমাদের কাছে হাদীস বর্ননা করবো।
আমি আশআরীদের এক দল সহ রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিকট এলাম। এরপর আমি তার সামনে এসে উপস্থিত হই যখন তিনি ছিলেন রাগান্বিত। তখন তিনি বণ্টন করছিলেন সাদাকার কিছু জানোয়ার। আমরা তার কাছে সাওয়ারী চাইলাম। তখন তিনি কসম করে বললেনঃ আমাদের কোন সাওসারী দিবেন না এবং বললেনঃ তোমাদের সাওয়ারীর জন্য দিতে পারি এমন কোন জন্তু আমার কাছে নেই। তারপর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিকট গনীমতের কিছু উট আনা হল। তিনি বললেনঃ আশআরীগণ কোথায়? আশআরীগণ কোথায়?
আবূ মূসা আশআরী (রাঃ) বলেনঃ এরপর তিনি আমাদের সাদাচুল বিশিষ্ট বলিষ্ট পাঁচটি উট দিলেন। আমরা কিছু দুরে গিয়ে অবস্থান করলাম। তখন আমি আমার সঙ্গীদের বললাম রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার কসমের কথা ভুলে গিয়েছিলেন। আল্লাহর কসম যদি আমরা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে তার কসমের ব্যাপারে গাফিল রাখি, তাহলে আমরা কোনদিন সফলকাম হবো না। কাজেই আমরা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিকট ফিরে গিয়ে তাকে বলা হলঃ ইয়া রাসুলাল্লাহ! আমরা আপনার নিকট সাওয়ায়ী চেয়েছিলাম তখন আপনি আমাদের সাওসারী দেবেন না বলে কসম করেছিলেন। আমাদের মনে হয় আপনি আপনার কসমের কথা ভুলে গিয়েছেন।
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ আল্লাহ নিজেই তো আমাদের সাওয়ারীর জানোয়ার দিয়েছেন। আল্লাহর কসম, আমি যখন কোন ব্যাপারে কসম করি এরপর কসমের বিপরীত কাজ তার চাইতে মঙ্গলজনক মনে করি, তখন আমি মঙ্গলজনক কাজটিই করি এবং কাফফারা দিয়ে হালাল হয়ে যাই।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আবূ মূসা আল- আশ’আরী (রাঃ)

এই আচরণটি গভীরভাবে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, মুহাম্মদ এখানে এক প্রকার ‘গ্যাসলাইটিং’ বা মনস্তাত্ত্বিক কারসাজির আশ্রয় নিয়েছেন। তিনি নিজের মেজাজের বশবর্তী হয়ে করা শপথ রক্ষার চেয়ে বস্তুগত লাভকে প্রাধান্য দিয়েছেন এবং সেই নৈতিক স্খলনকে বৈধতা দিতে ‘আল্লাহর ইচ্ছা’ নামক একটি কাল্পনিক ঢাল ব্যবহার করেছেন। যদি একজন নেতার ‘হ্যাঁ’ যেকোনো মুহূর্তে ‘না’ হয়ে যেতে পারে এবং তিনি নিজেই নিজের করা শপথকে তুচ্ছ মনে করেন, তবে তার সত্যবাদিতার দাবি কতটুকু অন্তঃসারশূন্য তা সহজেই অনুমেয়। ‘কাফফারা’ বা কিছু অর্থদণ্ড বা উপবাসের বিনিময়ে মিথ্যাকে সত্যে রূপান্তর করার এই প্রক্রিয়া মূলত শঠতা ও সুবিধাবাদকে একটি ধর্মের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। এটি প্রমাণ করে যে, মুহাম্মদের কাছে সত্যের চেয়ে ক্ষমতার রাজনীতি এবং ব্যক্তিগত সুবিধাই ছিল সর্বাগ্রে।
অনুসারীদের সুবিধাবাদ এবং কোরআনিক বৈধতার নগ্নতা
মুহাম্মদের প্রবর্তিত এই সুবিধাবাদী সংস্কৃতি কেবল তাঁর নিজের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি, বরং তা তাঁর নিকটতম অনুসারীদের মধ্যেও সংক্রামিত হয়েছিল এবং শেষ পর্যন্ত কোরআনের আয়াতের মাধ্যমে একে একটি স্থায়ী আইনি রূপ দেওয়া হয়েছিল। মুহাম্মদের পরম বন্ধু এবং ইসলামের প্রথম খলিফা আবু বকরের জীবন ও আচরণ বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, তিনিও প্রাথমিক অবস্থায় শপথের পবিত্রতা রক্ষা করলেও, যখনই তথাকথিত ‘ঐশ্বরিক ছাড়পত্র’ বা শপথ ভঙ্গের আয়াত নাজিল হলো, তখনই তিনি সেই নীতিহীনতার পথে পা বাড়ালেন। আবু বকরের মতো একজন ব্যক্তিত্ব যখন বলেন যে, তিনি কোনো বিষয়ে কসম করার পর তার চেয়ে ‘উত্তম’ কিছু দেখলে আগের কসম ভেঙে ফেলবেন এবং কাফফারা দিয়ে দেবেন, তখন তা স্পষ্ট করে দেয় যে ইসলামের শীর্ষ নেতৃত্বের কাছে ‘সত্য’ বা ‘অঙ্গীকার’ ছিল এক প্রকার পণ্য, যা প্রয়োজনের খাতিরে বিসর্জন দেওয়া যায়। এটি কোনো আধ্যাত্মিক উত্তরণ নয়, বরং এটি ছিল একটি নৈতিক দেউলিয়া সমাজ ব্যবস্থার বহিঃপ্রকাশ, যেখানে সত্যবাদিতার চেয়ে বৈষয়িক লাভ বা রণকৌশলই ছিল শেষ কথা। [4]
সহীহ বুখারী (ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
৭১/ শপথ ও মানত
পরিচ্ছেদঃ আল্লাহর বাণীঃ তোমাদের নিরর্থক শপথের জন্য আল্লাহ তোমাদেরকে দায়ী করবেন না, কিন্তু যে সব শপথ তোমরা ইচ্ছাকৃতভাবে দৃঢ় কর … তোমরা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা পর্যন্ত
ইসলামিক ফাউন্ডেশন নাম্বারঃ ৬১৬৮, আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ৬৬২১
৬১৬৮। মুহাম্মাদ ইবনু মূকাতিল আবূল হাসান (রহঃ) … আয়িশা (রাঃ) থেকে বর্ণিত যে, আবূ বকর (রাঃ) কখনও কসম ভঙ্গ করেননি, যতক্ষন না আল্লাহ তা’আলা কসমের কাফফারা সংক্রান্ত আয়াত নাযিল করেন। তিনি বলতেন আমি যেকোন ব্যাপারে কসম করি। এরপর যদি এর চেয়ে উত্তমটি দেখতে পাই তবে উত্তমটিই করি এবং আমার কসম ভঙ্গের জন্য কাফফারা আদায় করে দেই।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আয়িশা বিনত আবূ বাকর সিদ্দীক (রাঃ)
সবচেয়ে বিস্ময়কর এবং কুরুচিপূর্ণ বিষয়টি হলো, এই পুরো মিথ্যাচার এবং সুবিধাবাদকে জায়েজ করার জন্য স্বয়ং ‘আল্লাহ’কে দিয়ে কোরআনের আয়াত নাজিল করানো হয়েছে। সূরা বাকারা (আয়াত ২২৫) এবং সূরা মায়িদা (আয়াত ৮৯)-এর মতো আয়াতগুলো পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, সেখানে অত্যন্ত ধূর্ততার সাথে ‘নিরর্থক শপথ’ এবং ‘ইচ্ছাকৃত শপথ’-এর মধ্যে একটি বিভাজন তৈরি করা হয়েছে। আল্লাহ দাবি করছেন যে, মানুষ যদি ভুল করে বা মনের অজান্তে কোনো মিথ্যা শপথ করে, তবে তার জন্য কোনো শাস্তি নেই। কিন্তু এর চেয়েও ভয়ংকর বিষয় হলো, যে শপথগুলো মানুষ ‘বুঝে-শুঝে’ এবং ‘দৃঢ়ভাবে’ করে, সেগুলোও ভেঙে ফেলার জন্য একটি আর্থিক বা শারীরিক বিনিময় মূল্য নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে। দশজন মিসকিনকে খাওয়ানো বা তিন দিন রোজা রাখার বিনিময়ে যদি স্রষ্টার নামে করা একটি পবিত্র অঙ্গীকার ভেঙে ফেলা যায়, তবে সেই স্রষ্টার সার্বভৌমত্ব এবং নৈতিক দৃঢ়তা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা অনিবার্য। [5] [6] –
আল্লাহ তোমাদের অর্থহীন শপথের জন্য তোমাদেরকে পাকড়াও করবেন না, কিন্তু তোমাদের অন্তরের সংকল্পের জন্য দায়ী করবেন। আল্লাহ ক্ষমাশীল, সহনশীল।
— Taisirul Quran
তোমাদের নিরর্থক শপথসমূহের জন্য তোমাদেরকে আল্লাহ পাকড়াও করবেননা, কিন্তু তিনি তোমাদেরকে ঐ সব শপথ সম্বন্ধে ধরবেন যেগুলি তোমাদের মনের সংকল্প অনুসারে সাধিত হয়েছে; এবং আল্লাহ ক্ষমাশীল, ধৈর্যশীল।
— Sheikh Mujibur Rahman
আল্লাহ তোমাদেরকে তোমাদের অর্থহীন শপথের জন্য পাকড়াও করবেন না। কিন্তু পাকড়াও করবেন যা তোমাদের অন্তরসমূহ অর্জন করেছে। আর আল্লাহ ক্ষমাশীল, সহনশীল।
— Rawai Al-bayan
তোমাদের অনর্থক শপথের [১] আল্লাহ্ তোমাদেরকে পাকড়াও করবেন না; কিন্তু তিনি সেসব কসমের ব্যাপারে পাকড়াও করবেন, তোমাদের অন্তর যা সংকল্প করে অর্জন করেছে। আর আল্লাহ্ ক্ষমাপরায়ণ, পরম সহিষ্ণু।
— Dr. Abu Bakr Muhammad Zakaria
তোমাদের অর্থহীন শপথের জন্য আল্লাহ তোমাদেরকে পাকড়াও করবেন না, কিন্তু বুঝে সুঝে যে সব শপথ তোমরা কর তার জন্য তোমাদেরকে পাকড়াও করবেন। (এ পাকড়াও থেকে অব্যাহতির) কাফফারা হল দশ জন মিসকিনকে মধ্যম মানের খাদ্যদান যা তোমরা তোমাদের স্ত্রী পরিবারকে খাইয়ে থাক, অথবা তাদেরকে বস্ত্রদান অথবা একজন ক্রীতদাস মুক্তকরণ। আর এগুলো করার যার সামর্থ্য নেই তার জন্য তিন দিন রোযা পালন। এগুলো হল তোমাদের শপথের কাফফারা যখন তোমরা শপথ কর। তোমরা তোমাদের শপথ রক্ষা করবে। আল্লাহ তাঁর আয়াতসমূহ তোমাদের জন্য বিষদভাবে বর্ণনা করেন যাতে তোমরা শোকর আদায় কর।
— Taisirul Quran
আল্লাহ তোমাদের অর্থহীন কসমের জন্য তোমাদের পাকড়াও করবেননা, কিন্তু তিনি তোমাদেরকে ঐ কসমসমূহের জন্য পাকড়া করবেন যেগুলিকে তোমরা (ভবিষ্যত বিষয়ের প্রতি) দৃঢ় কর, সুতরাং ওর কাফফারা হচ্ছে দশজন অভাবগ্রস্তকে মধ্যম ধরণের খাদ্য প্রদান করা, যা তোমরা নিজ পরিবারের লোকদেরকে খাইয়ে থাক, কিংবা তাদেরকে পরিধেয় বস্ত্র দান করা (মধ্যম ধরণের), কিংবা একজন গোলাম কিংবা বাঁদী মুক্ত করা। আর যে ব্যক্তি সামর্থ্য রাখেনা সে (একাধারে) তিন দিন সিয়াম পালন করবে; এটা তোমাদের কসমসমূহের কাফ্ফারা যখন তোমরা কসম কর এবং অতঃপর ভঙ্গ কর এবং নিজেদের কসমসমূহকে রক্ষা করবে। এই রূপেই আল্লাহ তোমাদের জন্য স্বীয় বিধানসমূহ বর্ণনা করেন যেন তোমরা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ কর।
— Sheikh Mujibur Rahman
আল্লাহ তোমাদেরকে পাকড়াও করেন না তোমাদের অর্থহীন কসমের ব্যাপারে, কিন্তু যে কসম তোমরা দৃঢ়ভাবে কর সে কসমের জন্য তোমাদেরকে পাকড়াও করেন। সুতরাং এর কাফফারা হল দশ জন মিসকীনকে খাবার দান করা, মধ্যম ধরনের খাবার, যা তোমরা স্বীয় পরিবারকে খাইয়ে থাক, অথবা তাদের বস্ত্র দান, কিংবা একজন দাস-দাসী মুক্ত করা। অতঃপর যে সামর্থ্য রাখে না তবে তিন দিন সিয়াম পালন করা। এটা তোমাদের কসমের কাফ্ফারা, যদি তোমরা কসম কর, আর তোমরা তোমাদের কসম হেফাযত কর। এমনিভাবে আল্লাহ তোমাদের জন্য তাঁর আয়াতসমূহ বর্ণনা করেন যাতে তোমরা শোকর আদায় কর।
— Rawai Al-bayan
তোমাদের বৃথা শপথের জন্য আল্লাহ তোমাদেরকে পাকড়াও করবেন না, কিন্তু যেসব শপথ তোমরা ইচ্ছে করে কর সেগুলোর জন্য তিনি তোমাদেরকে পাকড়াও করবেন। তারপর এর কাফফারা দশজন দরিদ্রকে মধ্যম ধরনের খাদ্য দান, যা তোমরা তোমাদের পরিজনদেরকে খেতে দাও, বা তাদেরকে বস্ত্রদান, কিংবা একজন দাস মুক্তি [১]। অতঃপর যার সামর্থ নেই তার জন্য তিন দিন সিয়াম পালন [২]। তোমরা শপথ করলে এটাই তোমাদের শপথের কাফফারা। আর তোমরা তোমাদের শপথ রক্ষা করো [৩]। এভাবে আল্লাহ তোমাদের জন্য তাঁর আয়াতসমূহ বর্ণনা করেন, যাতে তোমরা শোকর আদায় কর।
— Dr. Abu Bakr Muhammad Zakaria
এই ‘কাফফারা’ বা জরিমানা প্রথা মূলত মিথ্যাচারকে একটি বাণিজ্যিক রূপ দান করেছে। এটি বিত্তবানদের জন্য এমন এক ‘পাপমুক্তি’র লাইসেন্স, যেখানে তারা তাদের সম্পদ ব্যবহার করে যেকোনো সময় যেকোনো প্রতিশ্রুতি থেকে সরে আসতে পারে। এটি কোনো ‘ক্ষমাশীল’ ঈশ্বরের পরিচয় নয়, বরং এটি এমন এক ব্যবস্থার পরিচয় দেয় যেখানে নৈতিকতাকে দরাদরি বা বারগেইনিং-এর স্তরে নামিয়ে আনা হয়েছে। কোরআনের এই বিধানগুলো প্রমাণ করে যে, তৎকালীন আরবের রাজনৈতিক এবং সামরিক প্রয়োজনে মুহাম্মদ যখনই প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের প্রয়োজন অনুভব করেছেন, তখনই তিনি অত্যন্ত সময়োপযোগীভাবে ওহী বা প্রত্যাদেশের নাম করে নিজের জন্য এবং তাঁর অনুসারীদের জন্য মিথ্যাচারের এক রাজপথ তৈরি করে নিয়েছেন। যে ধর্মগ্রন্থ সরাসরি শপথ ভঙ্গের ‘রেট চার্ট’ প্রদান করে, তাকে কোনোভাবেই একটি নৈতিক আলোকবর্তিকা হিসেবে মেনে নেওয়া সম্ভব নয়; বরং এটি প্রতারণা এবং সুবিধাবাদের এক প্রাতিষ্ঠানিক দস্তাবেজ মাত্র।
রণাঙ্গনে শঠতাঃ যুদ্ধের নামে প্রতারণার বৈধতা
ইসলামী নৈতিকতার তথাকথিত ‘উত্তম আদর্শের’ দাবিটি আবারও চরমভাবে হোঁচট খায় যখন আমরা যুদ্ধের ময়দানে মুহাম্মদের রণকৌশল এবং তাঁর দেওয়া নির্দেশাবলী বিশ্লেষণ করি। একজন আদর্শ নেতার কাছে প্রত্যাশা থাকে যে, তিনি যুদ্ধের মতো চরম সংকটেও অন্তত বীরত্ব ও সততার ন্যূনতম মানদণ্ড বজায় রাখবেন। কিন্তু মুহাম্মদ রণাঙ্গনকে কেবল অস্ত্রের লড়াই হিসেবে দেখেননি, বরং একে ‘প্রতারণা’ ও ‘ধূর্ততার’ এক অবাধ বিচরণক্ষেত্র হিসেবে ঘোষণা করেছেন। সহিহ হাদিসের একাধিক বর্ণনায় অত্যন্ত স্পষ্টভাবে পাওয়া যায় যেখানে তিনি সগর্বে ঘোষণা করছেন— “যুদ্ধ হচ্ছে একটি ধোঁকা বা কৌশল।” এই একটি বাক্যই আসলে ইসলামের সমরনীতির প্রকৃত চরিত্র উন্মোচন করার জন্য যথেষ্ট। এটি প্রমাণ করে যে, শত্রুকে পরাজিত করার জন্য যেকোনো ধরনের হীন শঠতা, মিথ্যাচার বা বিশ্বাসভঙ্গ করা মুহাম্মদের কাছে কেবল বৈধই ছিল না, বরং তা ছিল একটি প্রশংসনীয় রণকৌশল।
সহীহ মুসলিম (হাদীস একাডেমী)
৩৩। জিহাদ ও সফর
পরিচ্ছেদঃ ৫. যুদ্ধের মধ্যে শক্রকে ধোঁকা দেয়ার বৈধতা
হাদিস একাডেমি নাম্বারঃ ৪৪৩১, আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ১৭৩৯
৪৪৩১-(১৭/১৭৩৯) আলী ইবনু হুজুর সাদী, আমর আন্ নাকিদ ও যুহায়র ইবনু হারব (রহঃ) ….. জাবির (রাযিঃ) হতে বর্ণিত যে, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যুদ্ধ কৌশল ও ছলনারই নাম। (ইসলামিক ফাউন্ডেশন ৪৩৮৯, ইসলামিক সেন্টার ৪৩৮৯)
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ জাবির ইবনু আবদুল্লাহ আনসারী (রাঃ)
সহীহ মুসলিম (হাদীস একাডেমী)
৩৩। জিহাদ ও সফর
পরিচ্ছেদঃ ৫. যুদ্ধের মধ্যে শক্রকে ধোঁকা দেয়ার বৈধতা
হাদিস একাডেমি নাম্বারঃ ৪৪৩২, আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ১৭৪০
৪৪৩২-(১৮/১৭৪০) মুহাম্মাদ ইবনু আবদুর রহমান ইবনু সাহম (রহঃ) ….. আবূ হুরাইরাহ্ (রাযিঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যুদ্ধ কুটকৌশলেরই নাম। (ইসলামিক ফাউন্ডেশন ৪৩৯০, ইসলামিক সেন্টার ৪৩৯০)
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আবূ হুরায়রা (রাঃ)
এই হাদিসের ব্যাখ্যা আসুন নসরুল বারী থেকে পড়ে নিই, [7]

বিশ্বের ইতিহাসে বীরত্ব বলতে সবসময় বোঝানো হয়েছে সম্মুখ সমরের সাহসিকতাকে, যেখানে শত্রুর সাথে বীরত্বের লড়াই হয়। কিন্তু মুহাম্মদের প্রবর্তিত এই ‘ধোঁকার নীতি’ যুদ্ধের ময়দান থেকে মহানুভবতা এবং নৈতিকতাকে চিরতরে নির্বাসিত করেছে। যখন কোনো নেতা তাঁর অনুসারীদের শেখান যে ছলনা করাই যুদ্ধের মূল মন্ত্র, তখন সেই বাহিনীর কাছে কোনো আদর্শ বা নৈতিক বালাই অবশিষ্ট থাকে না। প্রতারণা বা ধোঁকাবাজি যেকোনো বিচারেই একটি অত্যন্ত নোংরা এবং নিচ কাজ। কিন্তু ইসলামের নবী এই নীচতাকেই ‘জিহাদের’ মোড়কে পবিত্রতা দান করেছেন। এর ফলে, কাফের বা অবিশ্বাসী শত্রুদের বিরুদ্ধে যেকোনো ধরনের শঠতা অবলম্বন করা মুসলিমদের কাছে একটি জায়েজ কাজে পরিণত হয়েছে। এই ধূর্ত মানসিকতা কেবল শত্রুপক্ষকে পরাজিত করার লক্ষ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং এটি প্রমাণ করে যে মুহাম্মদের কাছে লক্ষ অর্জনের জন্য উপায়ের (means) কোনো বাছবিচার ছিল না।
এই বিষাক্ত সমরনীতির প্রভাব কতটুকু গভীর, তা তৎকালীন ইসলামী ব্যাখ্যাকারদের আলোচনা থেকেই স্পষ্ট হয়ে যায়। প্রখ্যাত আলেমদের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, যুদ্ধের এই ‘ছলনা’ বা ‘ধোঁকা’ মূলত শত্রুর চোখে ধুলো দেওয়া এবং তাদের অসতর্ক অবস্থায় আক্রমণ করার একটি বৈধ পথ। যখন একজন ধর্মপ্রবর্তক নিজেই প্রতারণাকে যুদ্ধের মূল ভিত্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেন, তখন তাঁর দেওয়া অন্যান্য নৈতিক উপদেশের আর কোনো গুরুত্ব থাকে না। এটি মূলত এমন এক সংস্কৃতির জন্ম দেয় যেখানে প্রতিপক্ষকে ধোঁকা দেওয়াকে বীরত্ব মনে করা হয়। মুহাম্মদের এই ‘যুদ্ধ মানেই ধোঁকা’ তত্ত্বটি মূলত তাঁর সামগ্রিক সুবিধাবাদী চরিত্রের আরেকটি বহিঃপ্রকাশ, যেখানে তিনি বিজয়ী হওয়ার জন্য সত্য, ন্যায় এবং মানবিক শিষ্টাচারকে অবলীলায় বিসর্জন দিয়েছেন। যে ব্যবস্থা শঠতাকে একটি শিল্পের পর্যায়ে নিয়ে যায়, তাকে আর যা-ই হোক, কোনো ‘শান্তি’ বা ‘শাশ্বত নৈতিকতার’ ধর্ম বলা যায় না; বরং এটি এক চূড়ান্ত নৈতিক দেউলিয়াত্বের নামান্তর।
প্রতারণার মাধ্যমে গুপ্তহত্যার রক্তাক্ত উত্তরাধিকার
ইসলামের ইতিহাসে ভিন্নমত এবং সমালোচনাকে কণ্ঠরোধ করার সবচেয়ে ভয়ংকর ও বর্বর উদাহরণ হলো ইহুদী কবি কা’ব ইবনু আশরাফের গুপ্তহত্যা। এই ঘটনাটি কেবল একটি রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড নয়, বরং এটি ছিল পরবর্তী সময়ে মুসলিম বিশ্বে ভিন্নমতাবলম্বীদের বিচারবহির্ভূত হত্যার প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি। মুহাম্মদের বিরুদ্ধে কবিতা লেখা বা মুসলিম নারীদের নিয়ে ব্যঙ্গ করার অপরাধে কোনো আইনি প্রক্রিয়া, তদন্ত বা আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ না দিয়ে সরাসরি গুপ্তঘাতক পাঠিয়ে খুন করার এই নির্দেশটি মুহাম্মদের তথাকথিত ‘মানবিকতা’ ও ‘ন্যায়বিচারের’ দাবিকে চূড়ান্তভাবে খারিজ করে দেয়। আধুনিক সভ্য সমাজে যেখানে বাকস্বাধীনতা একটি মৌলিক অধিকার, সেখানে কেবল শব্দ বা কবিতার অপরাধে কাউকে হত্যা করা এক আদিম ও পৈশাচিক মানসিকতার পরিচয় দেয়। মুহাম্মদ প্রমাণ করেছেন যে, তিনি যুক্তির উত্তরে যুক্তি নয়, বরং অস্ত্রের ভাষায় বিশ্বাসী ছিলেন।
এই হত্যাকাণ্ডের সবচেয়ে কদর্য দিকটি হলো এতে ‘প্রতারণা’ বা ‘মিথ্যাচারের’ সরাসরি ঐশ্বরিক অনুমোদন। মুহাম্মদের নির্দেশে যখন মুহাম্মাদ ইবনু মাসলামাহ এবং তাঁর দল এই হত্যার দায়িত্ব নিলেন, তখন তাঁরা নবীর কাছে মিথ্যা কথা বলার বা ছলনার আশ্রয় নেওয়ার অনুমতি চাইলেন। নবী অত্যন্ত নির্লজ্জভাবে সেই অনুমতি প্রদান করলেন। ঘাতক দলটি কা’ব ইবনু আশরাফের কাছে গিয়ে নবীর সমালোচনা করল, তাঁর ওপর নিজেদের বিরক্তির কথা নাটকীয়ভাবে উপস্থাপন করল এবং একপ্রকার বিশ্বাসঘাতকতামূলক বন্ধুত্বের অভিনয় করে তাঁকে বাড়ির বাইরে নির্জনে ডেকে আনল। রাতের অন্ধকারে এক ঘাতকের দল যখন ‘দুধ ভাই’ বা বন্ধুর ছদ্মবেশে এসে নিজের সুগন্ধি শুকতে দেওয়ার নাম করে একজন মানুষকে অতর্কিতে তরবারি দিয়ে কুপিয়ে হত্যা করে, তখন তাকে আর যা-ই হোক ‘পবিত্র জিহাদ’ বলা যায় না; এটি একটি কাপুরুষোচিত এবং জঘন্য অপরাধ। মুহাম্মদ এই খুনের খবর শুনে উল্লাসিত হয়ে একে ‘সাফল্য’ হিসেবে গণ্য করেছেন, যা তাঁর প্রতিহিংসাপরায়ণ চরিত্রের নগ্ন বহিঃপ্রকাশ। আসুন হাদিসগুলো পড়ি, [8] [9] [10]
সহীহ বুখারী (তাওহীদ)
অধ্যায়ঃ ৫৬/ জিহাদ ও যুদ্ধকালীন আচার ব্যবহার
পরিচ্ছদঃ ৫৬/১৫৯. হারবীকে গোপনে হত্যা করা।
৩০৩২. জাবির (রাঃ) সূত্রে নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ‘কা’ব ইবনু আশরাফকে হত্যা করার দায়িত্ব কে নিবে?’ তখন মুহাম্মাদ ইবনু মাসলামাহ (রাঃ) বললেন, ‘আপনি কি পছন্দ করেন যে, আমি তাকে হত্যা করি?’ আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, হ্যাঁ। মুহাম্মাদ ইবনু মাসলামাহ (রাঃ) বললেন, ‘তবে আমাকে অনুমতি দিন, আমি যেন তাকে কিছু বলি।’ তিনি বললেন, ‘আমি অনুমতি দিলাম।’ (২৫১০) (আধুনিক প্রকাশনীঃ ২৮০৭, ইসলামিক ফাউন্ডেশনঃ ২৮১৭)
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
সহীহ বুখারী (তাওহীদ)
অধ্যায়ঃ ৬৪/ মাগাযী (যুদ্ধ)
পরিচ্ছদঃ ৬৪/১৫. কা‘ব ইব্নু আশরাফ-এর হত্যা
(কা‘ব ইবনু আশরাফ বনী কুরায়যা গোত্রের একজন কবি ও নেতা ছিল যে বিভিন্ন সময় রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম) এর নামে বিদ্রুপাত্মক কথা প্রচার করতো। এমনকি সম্ভ্রান্ত মুসলিমদের স্ত্রী কন্যাদের সম্পর্কেও কুৎসিত অশালীন উদ্ভট কথা রচনা করতো। এসকল কর্মকাণ্ডে ত্যক্ত বিরক্ত হয়ে অবশেষে তৃতীয় হিজরী সনের রবীউল আওয়াল মাসে রসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম) মুহামমাদ ইবনু মাসলামাহকে নির্দেশ দেন তাকে যেন হত্যা করা হয়। এবং সে আদেশ মতে তাকে হত্যা করা হয়।)
৪০৩৭. জাবির ইবনু ‘আবদুল্লাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত। একদা রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, কা‘ব ইবনু আশরাফের হত্যা করার জন্য কে প্রস্তুত আছ? কেননা সে আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূলকে কষ্ট দিয়েছে। মুহাম্মাদ ইবনু মাসলামাহ (রাঃ) দাঁড়ালেন, এবং বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! আপনি কি চান যে, আমি তাকে হত্যা করি? তিনি বললেন, হাঁ। তখন মুহাম্মাদ ইবনু মাসলামাহ (রাঃ) বললেন, তাহলে আমাকে কিছু প্রতারণাময় কথা বলার অনুমতি দিন। রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, হাঁ বল। এরপর মুহাম্মাদ ইবনু মাসলামাহ (রাঃ) কা‘ব ইবনু আশরাফের নিকট গিয়ে বললেন, এ লোকটি (রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম) সদাকাহ চায় এবং সে আমাদেরকে বহু কষ্টে ফেলেছে। তাই আমি আপনার নিকট কিছু ঋণের জন্য এসেছি। কা‘ব ইবনু আশরাফ বলল, আল্লাহর কসম পরে সে তোমাদেরকে আরো বিরক্ত করবে এবং আরো অতিষ্ঠ করে তুলবে। মুহাম্মাদ ইবনু মাসলামাহ (রাঃ) বললেন, আমরা তাঁর অনুসরণ করছি। পরিণাম কী দাঁড়ায় তা না দেখে এখনই তাঁর সঙ্গ ত্যাগ করা ভাল মনে করছি না। এখন আমি আপনার কাছে এক ওসাক বা দুই ওসাক খাদ্য ধার চাই।
বর্ণনাকারী সুফ্ইয়ান বলেন, ‘আমর (রহ.) আমার নিকট হাদীসটি কয়েকবার বর্ণনা করেছেন। কিন্তু তিনি এক ওসাক বা দুই ওসাকের কথা উল্লেখ করেননি। আমি তাকে বললাম, এ হাদীসে তো এক ওসাক বা দুই ওসাকের কথাটি বর্ণিত আছে, তিনি বললেন, মনে হয় হাদীসে এক ওসাক বা দুই ওসাকের কথাটি বর্ণিত আছে। কা‘ব ইবনু আশরাফ বলল, ধার তো পাবে তবে কিছু বন্ধক রাখ। মুহাম্মাদ ইবনু মাসলামাহ (রাঃ) বললেন, কী জিনিস আপনি বন্ধক চান। সে বলল, তোমাদের স্ত্রীদেরকে বন্ধক রাখ। মুহাম্মাদ ইবনু মাসলামাহ (রাঃ) বললেন, আপনি আরবের একজন সুশ্রী ব্যক্তি, আপনার নিকট কীভাবে, আমাদের স্ত্রীদেরকে বন্ধক রাখব? তখন সে বলল, তাহলে তোমাদের ছেলে সন্তানদেরকে বন্ধক রাখ। তিনি বললেন, আমাদের পুত্র সন্তানদেরকে আপনার নিকট কী করে বন্ধক রাখি? তাদেরকে এ বলে সমালোচনা করা হবে যে, মাত্র এক ওসাক বা দুই ওসাকের বিনিময়ে বন্ধক রাখা হয়েছে। এটা তো আমাদের জন্য খুব লজ্জাজনক বিষয়। তবে আমরা আপনার নিকট অস্ত্রশস্ত্র বন্ধক রাখতে পারি। রাবী সুফ্ইয়ান বলেন, লামা শব্দের মানে হচ্ছে অস্ত্রশস্ত্র। শেষে তিনি (মুহাম্মাদ ইবনু মাসলামাহ) তার কাছে আবার যাওয়ার ওয়াদা করে চলে আসলেন। এরপর তিনি কা’ব ইবনু আশরাফের দুধ ভাই আবূ নাইলাকে সঙ্গে করে রাতের বেলা তার নিকট গেলেন। কা’ব তাদেরকে দূর্গের মধ্যে ডেকে নিল এবং সে নিজে উপর তলা থেকে নিচে নেমে আসার জন্য প্রস্তুত হল। তখন তার স্ত্রী বলল, এ সময় তুমি কোথায় যাচ্ছ? সে বলল, এই তো মুহাম্মাদ ইবনু মাসলামাহ এবং আমার ভাই আবূ নাইলা এসেছে। ‘আমর ব্যতীত বর্ণনাকারীগণ বলেন যে, কা’বের স্ত্রী বলল, আমি তো এমনই একটি ডাক শুনতে পাচ্ছি যার থেকে রক্তের ফোঁটা ঝরছে বলে আমার মনে হচ্ছে। কা’ব ইবনু আশরাফ বলল, মুহাম্মাদ ইবনু মাসলামাহ এবং দুধ ভাই আবূ নাইলা, (অপরিচিত কোন লোক তো নয়) ভদ্র মানুষকে রাতের বেলা বর্শা বিদ্ধ করার জন্য ডাকলে তার যাওয়া উচিত। (বর্ণনাকারী বলেন) মুহাম্মাদ ইবনু মাসলামাহ (রাঃ) সঙ্গে আরো দুই ব্যক্তিকে নিয়ে সেখানে গেলেন। সুফ্ইয়ানকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল যে, ‘আমর কি তাদের দু’জনের নাম উল্লেখ করেছিলেন? উত্তরে সুফ্ইয়ান বললেন, একজনের নাম উল্লেখ করেছিলেন। ‘আমর বর্ণনা করেন যে, তিনি আরো দু’জন মানুষ সঙ্গে করে নিয়ে গিয়েছিলেন এবং তিনি বলেছিলেন, যখন সে (কা’ব ইবনু আশরাফ) আসবে। ‘আমর ব্যতীত অন্যান্য রাবীগণ (মুহাম্মাদ ইবনু মাসলামার সাথীদের সম্পর্কে) বলেছেন যে (তারা হলেন) আবূ আবস্ ইবনু জাব্র হারিস ইবনু আওস এবং আববাদ ইবনু বিশ্র। ‘আমর বলেছেন, তিনি অপর দুই লোককে সঙ্গে করে নিয়ে এসেছিলেন এবং তাদেরকে বলেছিলেন, যখন সে আসবে তখন আমি তার মাথার চুল ধরে শুঁকতে থাকব। যখন তোমরা আমাকে দেখবে যে, খুব শক্তভাবে আমি তার মাথা আঁকড়িয়ে ধরেছি, তখন তোমরা তরবারি দ্বারা তাকে আঘাত করবে। তিনি (মুহাম্মাদ ইবনু মাসলামাহ) একবার বলেছিলেন যে, আমি তোমাদেরকেও শুঁকাব। সে (কা‘ব) চাদর নিয়ে নিচে নেমে আসলে তার শরীর থেকে সুঘ্রাণ বের হচ্ছিল। তখন মুহাম্মাদ ইবনু মাসলামাহ (রাঃ) বললেন, আজকের মত এতো উত্তম সুগন্ধি আমি আর কখনো দেখিনি। ‘আমর ব্যতীত অন্যান্য রাবীগণ বর্ণনা করেছেন যে, কা‘ব বলল, আমার নিকট আরবের সম্ভ্রান্ত ও মর্যাদাসম্পন্ন সুগন্ধী ব্যবহারকারী মহিলা আছে। ‘আমর বলেন, মুহাম্মাদ ইবনু মাসলামাহ (রাঃ) বললেন, আমাকে আপনার মাথা শুঁকতে অনুমতি দেবেন কি? সে বলল, হাঁ। এরপর তিনি তার মাথা শুঁকলেন এবং এরপর তার সাথীদেরকে শুঁকালেন। তারপর তিনি আবার বললেন, আমাকে আবার শুকবার অনুমতি দেবেন কি? সে বলল, হাঁ। এরপর তিনি তাকে কাবু করে ধরে সাথীদেরকে বললেন, তোমরা তাকে হত্যা কর। তাঁরা তাকে হত্যা করলেন। এরপর নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট এসে এ খবর দিলেন। (২৫১০; মুসলিম ৩২/৪৩, হাঃ ১৮০১) (আধুনিক প্রকাশনীঃ ৩৭৩৫, ইসলামিক ফাউন্ডেশনঃ ৩৭৩৯)
হাদিসটির আর্কাইভ লিংক
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)

এই গুপ্ত হত্যা সম্পর্কে সহজ নসরুল বারীতে কী লেখা রয়েছে তা দেখে নিই, [11]

এই গুপ্তহত্যার আদর্শটিই আজ আধুনিক যুগে ‘শাতিমে রাসুল’ বা নবীর সমালোচকের মৃত্যুদণ্ড নামক বিষবৃক্ষের মূলে জল ঢালছে। বর্তমান বিশ্বে, বিশেষ করে পাকিস্তান ও বাংলাদেশে যে মব জাস্টিস বা বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের প্রাদুর্ভাব দেখা যায়—যেখানে সামান্য সমালোচনার অজুহাতে একদল উন্মত্ত জনতা কাউকে পিটিয়ে মেরে ফেলে বা পুড়িয়ে দেয়—তার সরাসরি অনুপ্রেরণা উৎস হলো এই হাদিসগুলো। মুহাম্মদ যদি রাষ্ট্রের বিচার বিভাগীয় কোনো ব্যবস্থা ছাড়াই কেবল সমালোচনার জন্য গোপনে ঘাতক পাঠাতে পারেন, তবে তাঁর অন্ধ অনুসারীরা কেন আইন নিজের হাতে তুলে নেবে না? এই হাদিসগুলো মূলত মুসলিম সমাজে এমন এক অসহিষ্ণুতা তৈরি করেছে, যেখানে ভিন্নমতের স্থান কেবল কবরে। মুহাম্মদের এই হঠকারী ও অমানবিক সিদ্ধান্ত কেবল কা’ব ইবনু আশরাফকে হত্যা করেনি, বরং এটি কয়েক শতক ধরে অসংখ্য মুক্তমনা ও সমালোচকের রক্তের হোলি খেলার এক স্বর্গীয় লাইসেন্স হয়ে দাঁড়িয়েছে।
উপসংহার: নৈতিক দেউলিয়াত্বের প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ
সামগ্রিক আলোচনা ও দলিলাদি বিশ্লেষণ করলে এটি দিবালোকের মতো স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে, ইসলামের নৈতিক দর্শনে ‘সত্য’ বা ‘অঙ্গীকার’ কোনো অটল আদর্শ নয়, বরং এটি ক্ষমতার রাজনীতি এবং ব্যক্তিগত অভিরুচির কাছে এক নমনীয় খেলনা মাত্র। মুহাম্মদ যে ‘আল-আমিন’ বা পরম বিশ্বাসযোগ্যতার তকমা নিজের গায়ে লাগিয়েছিলেন, তাঁর নিজের প্রবর্তিত আইন, যুদ্ধের ময়দানে শঠতার নির্দেশ এবং সমালোচকদের গুপ্তহত্যার নগ্ন ইতিহাস সেই মিথকে চূর্ণ-বিচূর্ণ করে দেয়। একজন সাধারণ মানুষের জন্য যেখানে প্রতিশ্রুতি রক্ষা করা বীরত্ব ও সততার পরম লক্ষণ, সেখানে ইসলামের নবী ও তাঁর কল্পিত ঈশ্বর সেই প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের জন্য ‘কাফফারা’ নামক একটি ‘পাপমুক্তির শোরুম’ খুলে বসেছেন। জরিমানার বিনিময়ে মিথ্যাকে বৈধতা দেওয়া কেবল একটি ব্যক্তিগত নৈতিক স্খলন নয়, এটি একটি গোটা সমাজ ও সভ্যতাকে চরম অবিশ্বাসের অন্ধকারে ঠেলে দেওয়ার এক প্রাতিষ্ঠানিক চক্রান্ত। যখন কোনো ধর্মের সর্বোচ্চ আদর্শই মানুষকে শেখায় যে, বৈষয়িক লাভ বা পরিস্থিতির প্রয়োজনে নিজের কসম ভেঙে ফেলাই শ্রেয়, তখন সেই ধর্ম আর নৈতিকতার শিক্ষক থাকে না; বরং তা হয়ে ওঠে ধূর্ততা, প্রতারণা ও সুবিধাবাদের এক অন্ধকার পাঠশালা।
মুহাম্মদের এই কৌশলটি ছিল অত্যন্ত গভীর এবং রাজনৈতিকভাবে দূরভিসন্ধিমূলক। তিনি জানতেন যে, আরবের অস্থির ভূ-রাজনীতিতে নিজের কর্তৃত্ব টিকিয়ে রাখতে হলে তাঁকে বারবার গিরগিটির মতো অবস্থান পরিবর্তন করতে হবে। আর এই ক্রমাগত ভোল পাল্টানোর সময় যেন অনুসারীদের মনে তার সততা নিয়ে কোনো যৌক্তিক প্রশ্ন না জাগে, সেজন্যই তিনি অত্যন্ত চতুরতার সাথে ‘আল্লাহ’ নামক সত্তাকে ব্যবহার করে সুবিধামতো আয়াত নাজিল করিয়ে নিয়েছেন। নিজের মেজাজ বা রাগের মাথায় নেওয়া ভুল সিদ্ধান্তের দায়ভার থেকে মুক্তি পেতে তিনি যে ঐশ্বরিক ঢালটি তৈরি করেছিলেন, তা মূলত তাঁর এক প্রকার মনস্তাত্ত্বিক কারসাজি বা ‘গ্যাসলাইটিং’। তিনি অত্যন্ত সফলভাবে তার অনুসারীদের মগজধোলাই করতে সক্ষম হয়েছিলেন এই বলে যে—শপথ ভঙ্গ করা বা যুদ্ধের ময়দানে প্রতারণা করা কোনো পাপ নয়, যদি তা তথাকথিত ‘ইসলামী কল্যাণের’ নামে করা হয়। অথচ এই ‘কল্যাণ’ সংজ্ঞায়িত করার একক মালিক ছিলেন তিনি নিজে। এই ব্যবস্থাটি কেবল সত্যবাদিতার সংজ্ঞাকেই বদলে দেয়নি, বরং এটি প্রমাণ করেছে যে ইসলামের ঈশ্বর আসলে মুহাম্মদের রাজনৈতিক ইচ্ছার এক ‘মহাজাগতিক রাবার স্ট্যাম্প’ ছাড়া আর কিছুই নয়।
পরিচ্ছদগুলোতে আলোচিত কা’ব ইবনু আশরাফের পৈশাচিক গুপ্তহত্যা এবং যুদ্ধের ময়দানে প্রতারণাকে ‘কৌশল’ হিসেবে জায়েজ করার এই সংস্কৃতি আজ মুসলিম বিশ্বকে এক ভয়াবহ অসহিষ্ণুতার দিকে ঠেলে দিয়েছে। যে ধর্মের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপিত হয়েছে মিথ্যাচার, প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ এবং ভিন্নমতকে চোরাগোপ্তা হামলায় পিষ্ট করার ওপর, সেই ধর্ম আধুনিক যুগের মানবাধিকার বা বাকস্বাধীনতার সাথে চিরকালই সাংঘর্ষিক থাকবে। ‘কাফফারা’র মাধ্যমে মিথ্যাকে ধুয়ে মুছে সাফ করার এই সংস্কৃতি মূলত সততার কফিনে শেষ পেরেক ঠুকে দেওয়ার সমতুল্য। পরিশেষে বলা যায়, ইসলামের এই বিধানগুলো মানবতার নৈতিক ইতিহাসের এক কলঙ্কিত অধ্যায়। যে আদর্শের সূচনালগ্নেই রয়েছে প্রতারণার বৈধতা এবং সমালোচকের রক্তে ভেজা হাত, সেই আদর্শের ওপর দাঁড়িয়ে কোনো উন্নত, মানবিক ও বিশ্বাসযোগ্য সমাজ বিনির্মাণ করা কেবল অসম্ভবই নয়, বরং তা মানবসভ্যতার অগ্রগতির জন্য এক চরম হুমকি।
তথ্যসূত্রঃ
- সহীহ বুখারী, তাওহীদ পাবলিকেশন্স, হাদিসঃ ৭১৪৭ ↩︎
- সহীহ বুখারী, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, হাদিসঃ ৫১২১ ↩︎
- সহীহ বুখারী, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, খণ্ড ৯, পৃষ্ঠা ১৮১, ১৮২ ↩︎
- সহীহ বুখারী, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, হাদিসঃ ৬১৬৮ ↩︎
- সূরা বাকারা, আয়াত ২২৫ ↩︎
- সূরা মায়িদা, আয়াত ৮৯ ↩︎
- সহজ নসরুল বারী, শরহে সহীহ বুখারী, আরবি-বাংলা, সহজ তরজমা ও বিস্তারিত ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ, হযরত মাওলানা উসমান গনী, আল কাউসার প্রকাশনী, সপ্তম খণ্ড, পৃষ্ঠা ২২৭, ২২৮ ↩︎
- সহীহ বুখারী, তাওহীদ পাবলিকেশন্স, হাদিসঃ ৩০৩২ ↩︎
- সহীহ বুখারী, তাওহীদ পাবলিকেশন্স, হাদিসঃ ৪০৩৭ ↩︎
- সহীহ বুখারী, তাওহীদ পাবলিকেশন্স, ৪র্থ খণ্ড, পৃষ্ঠা ৪৫ ↩︎
- সহজ নসরুল বারী, শরহে সহীহ বুখারী, সপ্তম খণ্ড, আরবি-বাংলা, সহজ তরজমা ও বিস্তারিত ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ, হযরত মাওলানা মুহাম্মদ উসমান গনী, আল কাউসার প্রকাশনী, পৃষ্ঠা ২২৯ ↩︎
