ইসলামে নারীর খৎনা করা সুন্নত

ভূমিকা

নারীর খৎনা বা Female Genital Mutilation (FGM) একটি অমানবিক, ক্ষতিকর ধর্মীয় ও সামাজিক প্রথা, যা আজও অনেক দেশে বিদ্যমান। এই প্রথা একটি আন্তর্জাতিক মানবাধিকার লঙ্ঘন এবং মারাত্মক অপরাধ হিসেবে বিবেচিত। যদিও এটি কিছু সমাজে ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির নামে প্রচলিত, কিন্তু FGM বাস্তবে নারীর স্বাস্থ্যের জন্য বিপজ্জনক এবং দীর্ঘস্থায়ী শারীরিক ও মানসিক ক্ষতি করে। বিভিন্ন দেশের আইন এবং আন্তর্জাতিক সংগঠনগুলোর প্রচেষ্টা সত্ত্বেও এই প্রথাটি এখনও বহাল রয়েছে। ধর্মীয় অন্ধত্ব, কুসংস্কার এবং শিক্ষার অভাবের কারণে এখনো এটি নির্মূল করা সম্ভব হয়নি। এই প্রবন্ধটি নারীর খৎনা কেন আন্তর্জাতিক মানবাধিকার লঙ্ঘন এবং মারাত্মক অপরাধ, সেই বিষয়ে দৃষ্টিপাত করবে।


FGM-এর সংজ্ঞা এবং ধরন

নারীর খৎনা বা FGM হলো নারীর যৌনাঙ্গের কিছু অংশ বা সম্পূর্ণরূপে কেটে ফেলা বা আঘাত করা। এটি সাধারণত চারটি প্রধান ধরণে বিভক্ত:

  1. ক্লিটোরিডেক্টমি: নারীর ক্লিটোরিস আংশিক বা সম্পূর্ণরূপে কেটে ফেলা।
  2. এক্সিসন: ক্লিটোরিস এবং ল্যাবিয়া মিনোরার আংশিক বা সম্পূর্ণ কাটা।
  3. ইনফিবুলেশন: ল্যাবিয়া মিনোরা এবং ল্যাবিয়া মেজোরার কাটা এবং যৌনাঙ্গের প্রবেশপথ সেলাই করা, যাতে প্রজনন প্রক্রিয়ায় বাধা সৃষ্টি হয়।
  4. অন্যান্য আঘাতমূলক পদ্ধতি: সেলাই, ছেঁড়া বা আঘাতের মতো কোনো ক্ষতিকর পদ্ধতি।

FGM-এর এই ধরনেরগুলোর মধ্যে প্রতিটিই নারী স্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক বিপজ্জনক এবং তাদের জীবনভর শারীরিক ও মানসিক ক্ষতি করে।


আন্তর্জাতিক মানবাধিকার লঙ্ঘন

FGM একটি চরম মানবাধিকার লঙ্ঘন, কারণ এটি নারীর শারীরিক অখণ্ডতা, স্বাধীনতা এবং স্বাস্থ্য সম্পর্কিত মৌলিক অধিকারের ওপর আক্রমণ। আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলি যেমন জাতিসংঘ এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) দীর্ঘদিন ধরে FGM-কে বন্ধ করার প্রচেষ্টা চালিয়ে আসছে। WHO-এর মতে, নারীর খৎনা মানবাধিকারের জন্য ক্ষতিকর এবং এর বিরুদ্ধে একটি ব্যাপক প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। এই প্রথা মেয়েদের শৈশবে বা কৈশোরে তাদের সম্মতি ব্যতিরেকে সম্পন্ন করা হয়, যা তাদের মৌলিক অধিকার লঙ্ঘন করে। অর্থাৎ যখন তারা সুস্থভাবে সজ্ঞানে নিজের শরীরের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত দেয়ার বয়সে পৌঁছে, ততদিনে তার শরীর ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে যায়।

FGM এর ফলে নারীরা তাদের শারীরিক, মানসিক এবং যৌন স্বাস্থ্য হারায় এবং অনেক ক্ষেত্রেই তারা প্রজননক্ষমতা হারায়। এটি এক ধরনের যৌন সহিংসতা এবং বৈষম্য। জাতিসংঘের মানবাধিকার ঘোষণা অনুসারে, প্রতিটি ব্যক্তির শরীরের ওপর পূর্ণ অধিকার রয়েছে এবং কারও সম্মতি ছাড়া শারীরিক নির্যাতন মানবাধিকারের লঙ্ঘন। ১৯৪৮ সালে গৃহীত জাতিসংঘের মানবাধিকার সনদ এবং ১৯৭৯ সালের নারীর প্রতি সকল প্রকার বৈষম্য বিলোপ সনদ (CEDAW)-এ স্পষ্টভাবে FGM এর মতো কুপ্রথাকে অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।


নারীর খৎনার বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট

নারীর খৎনা অনেক দেশে প্রথাগতভাবে চালু রয়েছে, বিশেষত আফ্রিকা, মধ্যপ্রাচ্য, এবং এশিয়ার কিছু অঞ্চলে। নিম্নলিখিত দেশগুলোতে FGM ব্যাপকভাবে প্রচলিত:

  1. সোমালিয়া: এখানে প্রায় ৯৮% মেয়ে ও নারী FGM-এর শিকার। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ইনফিবুলেশন পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়, যা অত্যন্ত বেদনাদায়ক এবং প্রাণঘাতী হতে পারে।
  2. মালির মতো দেশ: এখানে FGM একটি সমাজসিদ্ধ প্রথা হিসেবে প্রচলিত, এবং প্রায় ৮৯% নারী এই প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যায়।
  3. ইথিওপিয়া: ইথিওপিয়ায় FGM প্রথাটি প্রচলিত থাকলেও সাম্প্রতিক সময়ে এর হার কিছুটা কমেছে।
  4. মিশর: মিশরে FGM-এর হার ৮৭%। যদিও ২০০৮ সালে এটি নিষিদ্ধ করা হয়েছে, তবুও এখনো প্রথাটি গোপনে চলে আসছে।
  5. ইন্দোনেশিয়া: কিছু অঞ্চলে FGM একটি ধর্মীয় বা সাংস্কৃতিক প্রথা হিসেবে চালু রয়েছে।

আফ্রিকার অনেক দেশে নারীর খৎনা সামাজিকভাবে স্বীকৃত। অনেক ক্ষেত্রে, এই প্রথা চালানোর মূল উদ্দেশ্য নারীর কুমারিত্ব এবং নৈতিকতা রক্ষা করা। এই সমাজে একটি মেয়েকে যদি খৎনা না করা হয়, তাহলে তাকে সমাজে অবাঞ্ছিত মনে করা হয়। এর ফলে সামাজিক চাপ এবং সাংস্কৃতিক বাধ্যবাধকতার কারণে নারীরা FGM-এর শিকার হয়।


FGM-এর বৈজ্ঞানিক প্রভাব

নারীর খৎনা অত্যন্ত বিপজ্জনক এবং এর শারীরিক ও মানসিক প্রভাব মারাত্মক। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, FGM নারীর শারীরিক এবং মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর ব্যাপকভাবে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।

শারীরিক প্রভাব:

  1. চরম ব্যথা এবং রক্তক্ষরণ: FGM এর সময় নারীরা চরম ব্যথা অনুভব করেন, কারণ এটি সাধারণত অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে এবং চিকিৎসাশাস্ত্রবিহীন পদ্ধতিতে সম্পন্ন হয়। এ প্রক্রিয়ায় প্রচুর রক্তক্ষরণ হয়, যা মৃত্যুর ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়।
  2. সংক্রমণ: অপরিষ্কার উপকরণ ব্যবহারের ফলে সংক্রমণের ঝুঁকি অত্যন্ত বেশি থাকে। হেপাটাইটিস, টিটেনাস এবং এইচআইভি এর মতো রোগ সংক্রমণ হতে পারে।
  3. মূত্রনালীর সমস্যা: FGM এর পর অনেক নারীর মূত্রনালীর সমস্যা দেখা দেয়। অনেক সময় মূত্রাশয় এবং কিডনি ক্ষতিগ্রস্ত হয়, যা জীবনের জন্য বিপজ্জনক।
  4. জন্মদানের সময় জটিলতা: নারীদের খৎনার কারণে সন্তান জন্মদানের সময় অনেক বেশি জটিলতা দেখা দেয়। প্রায়ই সিজারিয়ান অপারেশন করতে হয়, এবং অনেক ক্ষেত্রে সন্তান জন্মের সময় মা ও শিশুর মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে।
  5. প্রজনন ক্ষমতা হারানো: ইনফিবুলেশন প্রক্রিয়ায় যৌনাঙ্গের প্রবেশপথ সেলাই করার ফলে প্রজনন ক্ষমতা হারানোর ঝুঁকি থাকে।

মানসিক প্রভাব:

FGM শুধু শারীরিকভাবে নয়, মানসিকভাবেও নারীদের ওপর দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলে। নারীদের মধ্যে হতাশা, আতঙ্ক, এবং PTSD (Post-Traumatic Stress Disorder) দেখা দিতে পারে। অনেক নারী যৌন জীবনে সমস্যায় পড়েন এবং সম্পর্কের ক্ষেত্রে গভীর মানসিক সংকট অনুভব করেন।


বৈজ্ঞানিক প্রমাণ:

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) এবং জাতিসংঘের জনসংখ্যা তহবিল (UNFPA) এর গবেষণাগুলো প্রমাণ করে যে, FGM একটি বিপজ্জনক এবং অপ্রয়োজনীয় প্রথা যা নারীর শারীরিক এবং মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর মারাত্মক প্রভাব ফেলে। ২০১৮ সালের এক রিপোর্টে WHO জানায়, “নারীর খৎনা নারীর যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্যকে দীর্ঘমেয়াদে বিপর্যস্ত করে।”

ড. লরা ক্যাম্পবেল তার গবেষণায় উল্লেখ করেন, “FGM এর প্রভাব একাধিক শারীরিক ও মানসিক জটিলতা সৃষ্টি করে। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় প্রভাব হচ্ছে যৌনাঙ্গের সংক্রমণ, প্রসবকালীন জটিলতা, এবং মানসিক ট্রমা।” [1]


ইসলামে নারীর খৎনা

ইসলামে নারীর খৎনা [2] একটি ধর্মীয় বিধান। হাদিস থেকে জানা যায়, নারীর খৎনার সময় বেশী গভীর করে কাটতে নিষেধ করেছেন নবী, কারণ বেশি গভীর করে কেটে ফেললে স্বামীরা আর সেক্স করে আনন্দ পাবে না। অর্থাৎ নারীর খৎনা ইসলামে অনুমোদিত এবং এটি করার নির্দেশনাও দেয়া আছে।

সুনান আবূ দাউদ (তাহকিককৃত)
পাবলিশারঃ আল্লামা আলবানী একাডেমী
অধ্যায়ঃ ৩৬/ শিষ্টাচার
পরিচ্ছদঃ ১৮০. খাতনা করা সম্পর্কে
৫২৭১। উম্মু ‘আতিয়্যাহ আল-আনসারী (রাঃ) সূত্রে বর্ণিত। মদীনাতে এক মহিলা খাতনা করতো। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে বললেনঃ তুমি গভীর করে কাটবে না। কারণ তা মেয়েলোকের জন্য অধিকতর আরামদায়ক এবং স্বামীর জন্য অতি পছন্দনীয়। ইমাম আবূ দাঊদ (রহঃ) বলেন, ‘উবাইদুল্লাহ ইবনু ‘আমর (রহঃ) থেকে আব্দুল মালিক (রহঃ) সূত্রে একই অর্থে ও সনদে এটি বর্ণিত হয়েছে। ইমাম আবূ দাঊদ (রহঃ) বলেন, হাদীসটির সনদ দুর্বল।(1)
সহীহ।
(1). বায়হাক্বী।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)

অর্থাৎ ইসলামের বিধান অনুসারে, নারীদেরও খৎনা করা উচিত। আসুন শায়খ আহমদুল্লাহর বক্তব্য শুনে নিই,


এবারে আসুন শ্রেষ্ঠতম মুহাদ্দিস আল্লামা আলবানীর একটি ফতোয়া পড়ে নিই [3]

খৎনা

আসুন ইসলামের এই নারীর খৎনা প্রথার সুচনা কীভাবে হয়েছিল, তা ইসলামিক দলিল থেকে জেনে নেয়া যাক, [4]

খৎনা 1

এবারে একজন ভিক্টিমের গল্প শুনি,

About This Article

Genre: Semi-Academic Skeptical Analysis

Epistemic Position: Scientific Skepticism and Secular Humanist Ethics

This article belongs to the skeptical-rationalist analytical tradition of Shongshoy.com.

Its purpose is not theological neutrality or artificial both-sides balance, but evidence-based critical examination of religious, philosophical, moral, and historical claims.

Neutrality here means methodological fairness: accurate use of sources, logical rigor, evidentiary discipline, and factual consistency. It does not mean moral indifference or equal treatment between harmful doctrines and their criticism.

Strong criticism should not be mistaken for bias if it is supported by evidence and sound reasoning.

This article should be evaluated through source quality, evidentiary strength, logical rigor, factual consistency, and fairness in representing opposing claims—not through theological sensitivity, apologetic expectations, or demand for rhetorical softness.


তথ্যসূত্রঃ
  1. Campbell, Health Consequences of FGM, 2015 ↩︎
  2. ইসলামে নারীর খৎনা প্রসঙ্গে  ↩︎
  3. ফাতাওয়ায়ে আলবানী, আল্লামা মুহাম্মদ নাসীরুদ্দীন আলবানী (রহঃ) , মুহাম্মাদ শহীদুল্লাহ খান মাদানী (অনুবাদক) , শাইখ আব্দুল্লাহ মাহমুদ (অনুবাদক) , শাইখ ড. আব্দুল্লাহ ফারুক সালাফী (অনুবাদক), পৃষ্ঠা ১৭৪ ↩︎
  4. আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ইবনে কাসীর, প্রথম খণ্ড, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, পৃষ্ঠা ৩৪৯-৩৫০ ↩︎