Table of Contents
ভূমিকা: ঐতিহাসিক সত্য বনাম এপলজিস্টদের চাতুর্য
কুরআনের সবচাইতে বিতর্কিত এবং কঠোর সূরাগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো নবম সূরা—আত-তাওবা। এই সূরার ‘তলোয়ারের আয়াত’ (আয়াত ৫) নিয়ে আধুনিক মুসলিম অ্যাপলজিস্টরা বা ধর্মতাত্ত্বিকরা চরম অস্বস্তিতে ভোগেন। অমুসলিম বা মুশরিকদের যেখানে পাওয়া যাবে সেখানেই হত্যা করার এই কঠোর নির্দেশকে বর্তমান বিশ্বের মানবিক ও উদারনৈতিক মূল্যবোধের সামনে গ্রহণযোগ্য করে তুলতে তারা এক অভিনব চাতুর্যের আশ্রয় নেন। তারা প্রায়ই দাবি করেন যে, এই আয়াতগুলো নাকি যুদ্ধের ময়দানে সম্মুখ সমর চলাকালে নাজিল হয়েছিল, যাতে একে একটি আত্মরক্ষামূলক যুদ্ধের কৌশল হিসেবে চালিয়ে দেওয়া যায়। কিন্তু ইসলামের ধ্রুপদী ইতিহাস, সিরাত এবং প্রখ্যাত সব তাফসীর গ্রন্থ বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এটি একটি ডাহা মিথ্যা কথা। মূলত নিজেদের ‘লজ্জা’ ঢাকতে এবং ইসলামকে একটি আধুনিক ‘শান্তিবাদী’ কাঠামোতে ফিট করতে তারা ইসলামের প্রকৃত ইতিহাসকেই বিকৃত করে ফেলছেন।
প্রকৃতপক্ষে সূরা তাওবা যখন নাজিল হয়, তখন আরবের মুশরিকদের সাথে মুসলমানদের কোনো সক্রিয় যুদ্ধ চলছিল না। বরং মক্কা বিজয়ের পর ইসলামি রাষ্ট্রের একচ্ছত্র আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল এবং আরবে পৌত্তলিকদের অস্তিত্ব বিলীন করার চূড়ান্ত সময়সীমা ঘোষণা করা হয়েছিল। তথাকথিত শান্তির ধর্মের ভাবমূর্তি রক্ষা করার জন্য ঐতিহাসিক সত্যকে পাশ কাটিয়ে এই এপলজিস্টরা যে বয়ান তৈরি করেন, তা সরাসরি সিরাত ও তাফসীরের বর্ণনার বিরোধী। আজকের প্রবন্ধে আমরা দেখব, কীভাবে আধুনিক মুমিন লেখকরা পাঠকদের বিভ্রান্ত করার জন্য এই সূরার প্রেক্ষাপট নিয়ে বানোয়াট ও ভিত্তিহীন তথ্য প্রচার করছেন।
সূরা তাওবার ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটঃ আরিফ আজাদের কোরআন অবমাননা
সাম্প্রতিককালে অনেকে দাবি করছেন যে, কুরআনের নবম সূরা, আত-তাওবা, কেবল যুদ্ধের সময় প্রযোজ্য, শান্তিকালে নয়। এই দাবিটি কতটা সত্য? আসলেই কি সূরা তওবা যুদ্ধের সময় অবতীর্ণ হয়েছিল, নাকি সম্পূর্ণ শাস্তির সময়? এই বিষয়টি সঠিকভাবে বুঝতে হলে, আমাদের সূরা তাওবার ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট এবং বিষয়বস্তু বিশ্লেষণ করতে হবে। উল্লেখ্য, বাংলাদেশের মুমিনদের একজন প্রিয় লেখক আরিফ আজাদ তার বইতে এই সম্পর্কিত একটি মিথ্যা তথ্য লেখার পরে থেকেই, মুমিনদের মধ্যে এই ধারণাটি জনপ্রিয়তা পায়। আরিফ আজাদ লিখেছে, এই আয়াত নাকি নাজিল হয়েছিল যুদ্ধের উত্তপ্ত সময়ে! কিন্তু এটি একটি ডাহা মিথ্যা কথা। তাই আসুন শুরুতেই প্যারাডক্সিক্যাল সাজিদ ২ বইয়ের এই দাবীটি দেখে নেয়া যাক, [1]
‘হুম; কিন্তু কুরআনের এক জায়গায় বলা হয়েছে মুশরিকদের যেখানেই পাওয়া যাবে, সেখানেই হত্যা করতে। এটা কেন?’
‘খুবই সহজ জিনিস। হ্যাঁ, কুরআন বলেছে মুশরিকদের যেখানেও পাও, হত্যা করো; কিন্তু, আপনাকে এই আয়াত নাযিলের প্রেক্ষাপট জানতে হবে। এই আয়াত নাযিল হয়েছিল যুদ্ধের উত্তপ্ত সময়ে যখন মুসলিম বাহিনী এবং মুশরিক বাহিনী পরস্পর মুখোমুখি। এই আয়াতে যে-নির্দেশ এসেছে সেটি কেবল ওই প্রেক্ষাপটে।
যেমন-৭১ সালের ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তার কালজয়ী ভাষণে বলেছিলেন, ‘আমরা ওদের ভাতে মারব, পানিতে মারব।’ তার এই কথাগুলো তখন যুদ্ধশিবিরে অবস্থানরত সৈনিকদের উদ্দীপ্ত করেছিল; প্রেরণা জুগিয়েছিল; কিন্তু আজকে এই সময়ে কি আমরা বলি, ‘পাকিস্তানীদের আমরা ভাতে মারব, পানিতে মারব? বলি না। ঠিক একইভাবে, কুরআনের সেই আয়াত বিশেষ একটি সময়, প্রেক্ষাপট ও একটি ঘটনাকে কেন্দ্র করেই নাযিল হয়েছিল। এটা কোনোভাবেই প্রমাণিত হয় না যে, এই আয়াত দিয়ে ইসলাম সবসময় অমুসলিমদের হত্যার বিধান দিয়েছে বা এরকম কিছু।’
সাজিদ থামল। লোকটি জিজ্ঞেস করলেন, ‘কুরআন কি এমন কারও সাথে রক্তারক্তিতে জড়িয়ে পড়ার নির্দেশ দিচ্ছে না, যারা আদতে সংখ্যালঘু এবং নিরপরাধ?’
আমি সাজিদের মুখ থেকে কথা কেড়ে নেওয়ার মতো করে বললাম, ‘একদমই না। প্রথমত এই আয়াত যখন নাযিল হয়, তখন কাফির-মুশরিকরা সংখ্যালঘু ছিল না; বরং মুসলিমরা ছিল সংখ্যালঘু।’
সাজিদ বলল, ‘আপনার পয়েন্টটি দারুণ। কুরআন কি অমুসলিমদের সাথে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়তে বলেছে? দেখুন, আল্লাহ তাআলা কুরআনে বলছেন, ‘ অর্থাৎ আল্লাহ বলছেন, Fight in the way of Allah (with) those who fight you.’ ‘তাদের সাথেই কেবল যুদ্ধ করো, যারা তোমাদের সাথে যুদ্ধে লিপ্ত হয়।’ পৃথিবীর কোনো জাতি কি এই থিওরিতে বিশ্বাস করে যে, অন্য একটি জাতি এসে তাদের মেরে সাফ করে যাবে, আর তারা তাদের জামাই আদর দিয়ে বরণ করে নেবে?’
ভদ্রলোক বললেন, ‘না।’

নবম হিজরী ও সূরা তাওবার প্রকৃত প্রেক্ষাপট
প্রকৃতপক্ষে এই আয়াতটি নাজিল হওয়ার সময়কাল কোনোভাবেই সম্মুখ যুদ্ধের উত্তপ্ত মুহূর্ত নয়, বরং এটি তাবুক যুদ্ধ-পরবর্তী সময়ের ঘটনা, মক্কায় যখন কোন যুদ্ধি চলছিল না। ঘটনাটি মক্কা বিজয়ের পর ৯ম হিজরীর জিলক্বদ মাসের। তৎকালীন প্রেক্ষাপটে মুসলিমদের সাথে কোনো গোষ্ঠীরই কোনো যুদ্ধ চলছিল না, বরঞ্চ কাফেররা মুসলিমদের নিয়ন্ত্রণে ও অধীনে ছিল। সেই সময়ে মুহাম্মদ আবু বকরকে হজ্জের আমীর নির্বাচন করে মক্কায় প্রেরণ করেন, যাতে তিনি শরীয়তের বিধান অনুযায়ী লোকজনের হজ্জ আদায়ের ব্যবস্থা করতে পারেন। ঠিক সেই সময়ই মুশরিকদের সাথে কৃত চুক্তিগুলো বাতিল বা পুনর্মূল্যায়ন করার নির্দেশ দিয়ে সূরা তাওবা বা সূরা বারা’আতের প্রারম্ভিক চল্লিশটি আয়াত নাজিল হয়। এই আয়াতগুলোতে স্পষ্টভাবে উল্লেখ ছিল যে, এ বছরের পর থেকে কোনো মুশরিক মসজিদে হারামে প্রবেশ করতে পারবে না এবং উলঙ্গ হয়ে তাওয়াফ করা নিষিদ্ধ। যাদের সাথে মুহাম্মদ কোনো চুক্তি করেছিলেন, তা নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত পূর্ণ করার কথা বলা হলেও, যাদের সাথে চুক্তি ছিল না বা অনির্ধারিত ছিল, তাদের জন্য ‘ইয়াওমুন নাহার’ বা কোরবানির দিন থেকে চার মাসের একটি সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়—যদি এই সময়ের মধ্যে তারা ইসলাম গ্রহণ না করে, তবে এই অবকাশ শেষ হওয়ার পর তাদের যেখানে পাওয়া যাবে সেখানেই হত্যা করা হবে। অর্থাৎ এই সূরাটি ছিল মুশরিকদের সাথে সমস্ত চুক্তি ভঙ্গের সরাসরি ঘোষণা এবং চার মাস অতিক্রান্ত হয়ে গেলে তাদের যেখানে পাওয়া যাবে হত্যা করার সুস্পষ্ট বিধান। মুহাম্মদ পরবর্তীতে হযরত আলীকে দিয়ে এই ঘোষণাটি জনসমক্ষে প্রচার করান। এই প্রেক্ষাপটটি বিস্তারিতভাবে বুঝতে আমরা প্রামাণ্য সীরাতগ্রন্থ ‘সীরাতুল মুস্তফা’র বর্ণনাটি দেখে নিতে পারি। [2]
হযরত সিদ্দীক আকবর (রা) কে হজ্জের আমীর নির্বাচনঃ ৯ম হিজরীর যিলকা’দ মাসে নবী (সা) হযরত আবূ বকর (রা)-কে হজ্জের আমীর নির্বাচন করে মক্কা মুকাররমা প্রেরণ করেন। মদীনা থেকে তিনশ লোক এবং কুরবানীর জন্য বিশটি উট তাঁর সাথে প্রদান করেন, যাতে তিনি শরী’আতের বিধান অনুযায়ী লোকজনের হজ্জ আদায়ের ব্যবস্থা করতে পারেন এবং চুক্তি ভঙ্গ করার ব্যাপারে সূরা তাওবার যে চল্লিশ আয়াত নাযিল হয়েছে, তা ঘোষণা করবেন। আয়াতসমূহে এ বিষয়ে বর্ণনা ছিল যে, এ বছরের পর মুশরিকরা মসজিদে হারামে যেতে পারবে না এবং উলঙ্গ হয়ে বায়তুল্লাহ তাওয়াফ করতে পারবে না, যার সাথে নবী (সা) কোনো চুক্তি করেছেন তা ঐ নির্ধারিত সময়ের মধ্যে পূর্ণ করা হবে। যাদের সাথে কোনো চুক্তি করা হয়নি, তাদেরকে ‘ইয়াওমুন নাহর’ বা কুরবানীর দিন থেকে চার মাসের সুযোগ দেয়া হলো।
হযরত সিদ্দীক আকবর (রা) রওয়ানা হওয়ার পর নবী (সা)-এর এটা খেয়াল হলো যে, চুক্তি এবং চুক্তি ভঙ্গ সম্পর্কে এরূপ ব্যক্তির দ্বারা ঘোষণা হওয়া উচিত যিনি চুক্তিকারীর গোত্র এবং আহলে বায়তের অন্তর্ভুক্ত। কেননা আরবগণ এরূপ বিষয়ে গোত্র ও আত্মীয়দের কথা গ্রহণ করে থাকে। সুতরাং রাসূল (সা) হযরত আলী (রা)-কে ডেকে স্বীয় ‘আদবা’ (عضباء) নামক উটে সওয়ার করে হযরত আবূ বকর (রা)-এর পিছনে প্রেরণ করেন এবং নির্দেশ প্রদান করেন যে, হজ্জের সময় তুমি সূরা বারা’আতের আয়াতসমূহ লোকজনকে শোনাবে। কোনো কোনো রিওয়ায়াতের দ্বারা প্রতীয়মান হয় যে, বারা’আতের আয়াত হযরত সিদ্দীক আকবর (রা) রওয়ানা হওয়ার পর নাযিল হয়, এজন্য পরে হযরত আলীকে (রা) পয়গাম শোনানোর জন্য প্রেরণ করা হয়। হযরত সিদ্দীক আকবর (রা) উটের আওয়ায শুনেই উপলব্ধি করতে সক্ষম হলেন যে, স্বয়ং হুযুর (সা) আগমন করেছেন। তিনি থেমে গেলেন এবং আলী (রা)-কে দেখতে পেয়ে জিজ্ঞাসা করলেন أمير أو مأمور অর্থাৎ আমীর হয়ে এসেছেন অথবা অধীন হয়ে? হযরত আলী (রা) বললেন, আমি শুধু সূরা বারা’আতের কিছু আয়াত শোনানোর নির্দেশ প্রাপ্ত হয়ে এসেছি। বস্তুত হযরত সিদ্দীকে আকবর (রা) লোকজনকে হজ্জ করালেন এবং হজ্জের খুতবাও তিনিই পেশ করেন। হযরত আলী (রা) সূরা বারা’আতের আয়াতসমূহ এবং এর বিষয়বস্তু ‘ইয়াওমুন নাহরে’ (কুরবানীর দিন) জামারায়ে আকাবার নিকট দাঁড়িয়ে লোকজনকে শোনালেন। হযরত আবূ বকর (রা) কিছু লোককে হযরত আলী (রা)-এর সহযোগিতার জন্য নিযুক্ত করেন, যাতে তারা বারবার ঘোষণা দিতে পারে।
তদনুসারে কুরবানীর দিন এই ঘোষণা দেয়া হয় যে, বেহেশতে কোনো কাফির প্রবেশ করতে পারবে না, আগামী বছর থেকে কোনো মুশরিক হজ্জ আদায় করতে পারবে না, এবং কেউ উলঙ্গ হয়ে বায়তুল্লাহর তাওয়াফ করতে পারবে না। রাসূলুল্লাহ (সা)-এর সাথে যার কোনো চুক্তি রয়েছে, তা নির্ধারিত সময়ের মধ্যে পূর্ণ করতে হবে। যার সাথে কোনো চুক্তি নেই অথবা অনির্ধারিত সময়ের জন্য চুক্তি রয়েছে, তার জন্য চার মাসের নিরাপত্তা রয়েছে। যদি এ সময়ে ইসলাম গ্রহণ না করে, তাহলে এ সময়ের পর যেখানে পাওয়া যাবে, তাকে হত্যা করা হবে।
এক হাদীসে বর্ণিত আছে, হযরত আলী (রা) যুল-হুলায়ফা পৌঁছে হযরত সিদ্দীক আকবর (রা)-এর সাথে মিলিত হয়ে বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা) আমাকে এ আয়াত সমূহের ঘোষণা দেয়ার জন্য প্রেরণ করেছেন। হযরত আবূ বকর (রা)-এর এ ধারণা হলো যে, সম্ভবত আমার সম্পর্কে কোনো আয়াত নাযিল হয়েছে। ফলে তিনি সাথে সাথেই মদীনা আগমন করে রাসূল (সা)-কে আরয করেন, হে আল্লাহর রাসূল! আমার সম্পর্কে কি কোনো আয়াত নাযিল হয়েছে? নবী (সা) বললেন, না, তুমি তো আমার হেরা গুহার সাথী, সাওর গুহার সাথী এবং হাউযে কাওসারেও তুমি আমার সাথী হবে। কিন্তু সূরা বারা’আতের ঘোষণা আমি অথবা আমার গোত্রের কোনো ব্যক্তি ছাড়া অন্য কেউ করতে পারে না। যার কারণে বারা’আতের আয়াত ঘোষণা ও শোনানোর জন্য আমি আলীকে প্রেরণ করেছি। ১


আরিফ আজাদের দাবি বনাম ঐতিহাসিক বাস্তবতা
এই আয়াতটির নাজিলের সময়কাল হচ্ছে যুদ্ধ পরবর্তী সময়, মক্কা বিজয়ের পর ৯ম হিজরীর জিলক্বদ মাসে। যখন কারো সাথেই মুসলিমদের উত্তপ্ত যুদ্ধ চলছিল না। সেই সময়ে হযরত মুহাম্মদ হযরত আবু বকরকে হজ্জের আমীর নির্বাচন করে প্রেরণ করেন, যাতে তিনি শরীয়তের বিধান অনুযায়ী লোকজনের হজ্জ আদায়ের ব্যবস্থা করেন। সেই সময়ই চুক্তি ভঙ্গ করার ব্যাপারে সূরা তাওবা বা সুরা বারা’আতের যে চল্লিশ আয়াত নাযিল হয়েছে তা ঘোষণা করেন। এই আয়াত সমূহে এই বিষয়গুলো স্পষ্টভাবেই উল্লেখ ছিল যে, এ বছরের পর মুশরিকরা মসজিদে হারামে প্রবেশ করতে পারবে না, উলঙ্গ হয়ে তাওয়াফ করতে পারবে না, যার সাথে আল্লাহর রাসূল কোনো চুক্তি করেছেন তা ঐ নির্ধারিত সময়ের মধ্যে পূর্ণ করা হবে, যাদের সাথে চুক্তি নেই তাদেরকে ইয়াওমুন নাহার বা কুরবানির দিন থেকে চার মাসের সুযোগ দেয়া হলো- যদি এ সময়ের মধ্যে ইসলাম গ্রহণ না করে তাহলে এ সময়ের পর যেখানে পাওয়া যাবে হত্যা করা হবে। অর্থাৎ এই সুরাটি হচ্ছে মুশরিকদের সাথে সমস্ত চুক্তি ভঙ্গের সরাসরি আদেশ, চার মাস অতিক্রম হয়ে গেলে সকল মুশরিককে যেখানে পাওয়া যাবে হত্যা করার সুস্পষ্ট বিধান। হযরত আলী আহলে বায়তের অন্তর্ভুক্ত হওয়ায় হযরত আবু বকরকে হজ্বের আমীর নির্ধারণ করে হযরত মুহাম্মদ হযরত আলীকে দিয়ে এ ঘোষণা দেয়ান। তথ্যসূত্র উল্লেখ করলেই ব্যাপারটি বুঝতে পারবেন, আয়াতটি নাজিলের কারণ এবং প্রেক্ষাপট।
এই নিয়ে যারা মিথ্যাচার করবে, তারা প্রকারান্তরে নাস্তিকদের জবাব দিতে গিয়ে আসলে ইসলামেরই মূল ইমান আকিদারই অবমাননা করবে। আসুন ইবনে কাসীরের সবচাইতে প্রখ্যাত তাফসীরে দেখি, সুরা তওবা কবে কোন পরিস্থিতিতে নাজিল হয়েছিল! [3] –
অবতরণকাল: যে সকল সূরা নবী করীম (সা)-এর জীবনের শেষ দিকে নাযিল হইয়াছিল, সূরা তাওবা ঐগুলির অন্যতম। ইমাম বুখারী (র) বলেন: আবুল ওয়ালীদ (র) বিভিন্ন রাবীর সূত্রে বারা (রা) হইতে বর্ণনা করেন যে, তিনি বলেন: সর্বশেষ অবতীর্ণ আয়াত হইতেছে )ستنتُونَكَ قُلِ اللَّهُ يُفْتِيكُمْ فِي الْكَلالَةِ( এই আয়াত এবং সর্বশেষে অবতীর্ণ সূরা হইতেছে-সূরা বারাআত (সূরা তাওবা)।
সূরা তাওবার প্রথমে ‘বিসমিল্লাহ্ )بسم الله الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ( লিখিত না থাকিবার কারণ:
সাহাবীগণ উসমান (রা)-এর তত্ত্বাবধানে কুরআন মজীদ সংকলন করিবার কালে এই সূরার প্রথমে বিসমিল্লাহ্ লিখেন নাই। তাঁহারা উসমান (রা)-এর নির্দেশে এইরূপ করিয়াছিলেন। তিনি এইরূপ নির্দেশ কেন দিয়াছিলেন, নিম্নোক্ত রিওয়ায়েতে তাহা বর্ণিত হইয়াছে:
ইমাম তিরমিযী (র) বিভিন্ন বর্ণনাকারীর বরাতে মুহাম্মদ ইব্ন্ন বাশার (র) হইতে বর্ণনা করেন যে, তিনি বলেন: একদা আমি উসমান (রা)-এর নিকট জিজ্ঞাসা করিলাম, সূরা আনফাল যাহার আয়াতের সংখ্যা এক শতের নিম্নে এবং সূরা তাওবা যাহার আয়াতের সংখ্যা অন্যূন একশত -এই দুইটি সূরার মধ্যবর্তী স্থানে আপনারা ‘বিসমমিল্লাহ্’ লিখেন নাই কেন? এতদ্ব্যতীত উক্ত সূরাদ্বয়কে আপনারা যে ‘দীর্ঘ সূরা সপ্তক )السبع الطول(‘-এর মধ্যে স্থাপন করিয়াছেন; উহার কারণ কি? উসমান (রা) বলিলেন: অনেক সময়ে এইরূপ ঘটিত যে, নবী করীম (সা)-এর প্রতি একটি সূরার অংশ বিশেষ নাযিল হইবার পর অন্য একটি সূরার অংশ বিশেষ নাযিল হইত। এইরূপ নবী করীম (সা)-এর উপর একটি সূরা নাযিল হওয়া শেষ হইবার পূর্বে অন্য একটি সূরার অংশ বিশেষ নাযিল হইত। এমতাবস্থায় কোন আয়াত নাযিল হইলে তিনি কোন ওয়াহী লেখক সাহাবীকে ডাকিয়া বলিতেন: ‘যে সূরায় এই এই বিষয় বর্ণিত হইয়াছে, এই আয়াতটিকে উহার মধ্যে (অমুক স্থানে) স্থাপন কর।’ সূরা-আনফাল হইতেছে মদীনায় অবতীর্ণ প্রথম সূরাসমূহের অন্যতম। পক্ষান্তরে, সূরা বারাআত (সূরা তাওবা) হইতেছে মদীনায় অবতীর্ণ শেষ সূরাসমূহের অন্যতম। কিন্তু, উভয় সূরায় বর্ণিত ঘটনা ও কাহিনী প্রায় একরূপ। এই পরিপ্রেক্ষিতে আমি ধারণা করিলাম: ‘সূরা বারাআত পৃথক কোন সূরা নহে; বরং উহা সূরা আনফাল-এর একটি অংশ।’ অথচ নবী করীম (সা) এ সম্বন্ধে কিছু বলিয়া যান নাই। উপরোক্ত কারণে আমি উহাদিগকে পরস্পর সন্নিহিত করিয়া স্থাপন করিয়াছি; কিন্তু উহাদের মধ্যবর্তী স্থানে (সূরা তাওবার প্রথমে) বিসমিল্লাহ্ লিখি নাই। তেমনি উপরোক্ত কারণে উভয় সূরা মিলিয়া দীর্ঘ সূরার আকার গ্রহণ করে বলিয়া উহাদিগকে ‘দীর্ঘ সূরা-সপ্তক’-এর মধ্যে স্থাপন করিয়াছি।
উক্ত রিওয়ায়েতকে ইমাম আহমদ, ইমাম আবু দাউদ, ইমাম নাসাঈ, ইমাম ইব্ন হিব্বান এবং ইমাম হাকিম (র) বর্ণনা করিয়াছেন। ইমাম হাকিম (র) উক্ত রিওয়ায়েত সম্বন্ধে মন্তব্য করিয়াছেন: ‘উহার সনদ সহীহ; তবে ইমাম বুখারী ও ইমাম মুসলিম উহাকে বর্ণনা করেন নাই।’
এই সূরার প্রথমাংশ নাযিল হয় নবী করীম (সা) তাবুকের যুদ্ধ হইতে ফিরিয়া আসিবার পর। নবী করীম (সা) সেই বৎসরই হজ্জ করিতে মনস্থ করিয়াছিলেন, কিন্তু মুশরিকগণ প্রথা অনুসারে সে বৎসরও হজ্জ করিতে আসিবে এবং তাহারা উলঙ্গ অবস্থায় কা’বা ঘর তাওয়াফ করিবে-এই বিষয়টি স্মরণে আসিবার পর উক্ত নির্লজ্জতাপূর্ণ দৃশ্যকে এড়াইবার উদ্দেশ্যে তিনি পরিকল্পনা পরিবর্তন করিয়া আবু বকর সিদ্দীক (রা)-এর নেতৃত্বে একদল সাহাবীকে হজ্জে পাঠাইলেন। আবু বকর সিদ্দীক (রা)-এর উপর দায়িত্ব দিলেন, তিনি লোকদিগকে হজ্জের কার্যাবলী শিক্ষা দিবেন এবং মুশরিকগণকে জানাইয়া দিবেন যে, তাহারা আগামী বৎসর হইতে আর হজ্জ করিতে পারিবে না। নবী করীম (সা) আবু বকর সিদ্দীক (রা)-এর উপর আরো দায়িত্ব দিলেন-‘তিনি লোকদের মধ্যে মুশরিকদের বিষয়ে আল্লাহ্ ও তাঁহার রাসূলের দায়িত্বমুক্ত হইবার কথা ঘোষণা করিবেন।’ আবু বকর সিদ্দীক (রা)-এর রওয়ানা হইয়া যাইবার পর নবী করীম (সা) আলী (রা)-কে তাঁহার পক্ষ হইতে ঘোষণাকারীরূপে পাঠাইলেন। আলী (রা)-কে পাঠাইবার কারণ এই ছিল যে, নবী করীম (সা)-তাঁহার কোন পিতৃ-সম্পর্কের নিকটাত্মীয় )العصبة(-কে নিজের পক্ষ হইতে প্রেরণ করিবার জন্যে আদিষ্ট হইয়াছিলেন। আর আলী (রা( ছিলেন তাঁহার সেইরূপ একজন নিকটাত্মীয়। এতসম্পর্কিত রিওয়ায়েত শীঘ্রই উল্লেখিত হইবে।
(۱) بَرَاءةُ مِنَ اللَّهِ وَرَسُولِهِ إِلَى الَّذِينَ عُهَدتُّمْ مِنَ الْمُشْرِكِينَ فَ
(۲) فَسِيحُوا فِي الْأَرْضِ أَرْبَعَةَ أَشْهُرٍ وَاعْلَمُوا أَنَّكُمْ غَيْرُ مُعْجِزِى اللهِ ، وَأَنَّ اللَّهَ مُخْزِي الْكَفِرِينَ )
১. ইহা সম্পর্কচ্ছেদ আল্লাহ ও তাঁহার রাসূলের পক্ষ হইতে সেই সমস্ত মুশরিকদের সহিত যাহাদিগের সহিত তোমরা পারস্পরিক চুক্তিতে আবদ্ধ হইয়াছিলে।
২. অতঃপর তোমরা দেশে চারিমাসকাল পরিভ্রমণ কর ও জানিয়া রাখ যে, তোমরা আল্লাহকে হীনবল করিতে পারিবে না এবং আল্লাহ কাফিরদিগকে লাঞ্ছিত করিয়া থাকেন।
তাফসীর : بَر مِّنَ الله وَرَسُولُم অর্থাৎ ‘ইহা হইতেছে আল্লাহ্ ও তাঁহার রাসূলের পক্ষ হইতে চুক্তিবদ্ধ মুশরিকদের প্রতি দায়িত্বমুক্তির ঘোষণা। যে সকল মুশরিকের সহিত তোমরা (মু’মিনগণ) চুক্তি করিয়াছিলে, তাহাদের প্রতি আল্লাহ্ ও তাঁহার রাসূল ঘোষণা করিতেছেন যে, তাহাদের নিরাপত্তার বিষয়ে আল্লাহ্ ও তাঁহার রাসূল দায়িত্বমুক্ত হইলেন। আলোচ্য আয়াতদ্বয়ের ব্যাখ্যা নিয়া তাফসীরকারগণের মধ্যে মতভেদ রহিয়াছে। তাহারা উহার বিভিন্নরূপ ব্যাখ্যা প্রদান করিয়াছেন। একদল তাফসীরকার বলেন: ‘যে সকল মুশরিকের সহিত অনির্দিষ্টকালের জন্যে অথবা চারি মাস বা উহার কম সময়ের জন্যে মুসলমানদের চুক্তি হইয়াছিল, আলোচ্য আয়াতে শুধু তাহাদের নিরাপত্তার বিষয়ে আল্লাহ্ ও তাঁহার রাসূলের পক্ষ হইতে দায়িত্বমুক্তির কথা ঘোষণা করা হইয়ছিল। যাহাদের সহিত চার মাস হইতে অধিকতর নির্দিষ্ট সময়ের জন্যে চুক্তি হইয়াছিল, আয়াতে তাহাদের নিরাপত্তার বিষয়ে আল্লাহ্ ও তাঁহার রাসূলের দায়িত্ব মুক্তির কথা ঘোষণা করা হয় নাই; বরং তাহাদের সহিত সম্পাদিত চুক্তির মেয়াদ শেষ না হওয়া পর্যন্ত উক্ত চুক্তি বলবৎ থাকিবে। কারণ অন্যত্র আল্লাহ্ তা’আলা বলিতেছেন:
إِلَّا الَّذِينَ عَاهَدتُّمْ مِنَ الْمُشْرِكِينَ ثُمَّ لَمْ يَنْقُصُوكُمْ شَيْئًا وَلَمْ يُظَاهِرُوا عَلَيْكُمْ أَحَدًا فَأَتِمُوا إِلَيْهِمْ عَهْدَهُمْ إِلى مُدَّتِهِمْ إِنَّ اللهَ يُحِبُّ الْمُتَّقِينَ .
“কিন্তু যে সকল মুশরিকের সহিত তোমাদের চুক্তি করিবার পর তাহারা (চুক্তি অনুসারে প্রাপ্য) কোন অধিকার হইতে তোমদিগকে বঞ্চিত করে নাই এবং তোমাদের বিরুদ্ধে কাহাকেও সাহায্য করে নাই, তাহাদের সহিত সম্পাদিত চুক্তিকে তোমরা তাহাদের ব্যাপারে উহার নির্দিষ্ট মেয়াদ পর্যন্ত পালন করিবে। যাহারা বিশ্বাসঘাতকতা করে না, নিশ্চয় আল্লাহ্ তাহাদিগকে
ভালবাসেন (৯:৪) 1)
এতদ্ব্যতীত নবী করীম (সা) বলিয়াছেন: আল্লাহর রাসূলের সহিত যাহার চুক্তি রহিয়াছে; তাহার চুক্তির মেয়াদ শেষ না হওয়া পর্যন্ত উহা বলবৎ থাকিবে। উক্ত হাদীস শীঘ্রই উল্লেখিত হইবে।
আলোচ্য আয়াতের বিভিন্ন ব্যাখ্যার মধ্য হইতে উপরোক্ত ব্যাখ্যা অধিকতম যুক্তি সংগত অধিকতম শক্তিশালী। ইমাম ইব্ন জারীর (র) উপরোক্ত ব্যাখ্যাকেই সঠিক বলিয়া গ্রহণ করিয়াছেন। কাল্ল্বী এবং মুহাম্মদ ইব্ন কা’ব কুরী প্রমুখ বহুসংখ্যক তাফসীরকার হইতেও উপরোক্ত ব্যাখ্যা বর্ণিত হইয়াছে।
আলী ইব্ন তালহা (র) ইব্ন আব্বাস (রা) হইতে বর্ণনা করিয়াছেন যে, আলোচ্য আয়াতদ্বয়ের ব্যাখ্যায় ইব্ন আব্বাস (রা) বলেন: আল্লাহর রাসূলের সহিত যাহাদের চুক্তি ছিল, তাহাদের জন্যে আল্লাহ্ তা’আলা চারিমাস সময় নির্ধারণ করিয়া দিয়াছেন। তাহারা চারিমাস যাবৎ যথা ইচ্ছা তথায় বিচরণ করিতে পারিবে।
চারিমাস অতিবাহিত হইবার পর আল্লাহ্ ও তাঁহার রাসূলের উপর তাহাদের নিরাপত্তার ব্যাপারে আর কোন দায়িত্ব থাকিবে না। উক্ত চারি মাস হইতেছে ‘যুলহাজ্জ )ذوالحجة(‘ মাসের দশ তারিখ হইতে ‘রবিউস্সানী )الربيع الثاني(‘ মাসের দশ তারিখ পর্যন্ত। পক্ষান্তরে, আল্লাহর রাসূলের সহিত তাঁহাদের কোন চুক্তি ছিল না, তাহাদের জন্যে আল্লাহ্ তা’আলা فاذا انسلخ الأَشْهُرُ الحُرُمُ এই আয়াতে যিলহাজ্জ মাসের দশ তারিখ হইতে মুহাররম মাসের শেষ তারিখ পর্যন্ত মোট পঞ্চাশ দিন সময় নির্ধারণ করিয়া দিয়াছেন। উক্ত পঞ্চাশ দিন অতিবাহিত হইবার পর আল্লাহ্ ও তাঁহার রাসূলের উপর তাহাদের নিরাপত্তার ব্যাপারে কোন দায়িত্ব থাকিবে না। উক্ত দুই শ্রেণীর কাফিরদের যে শ্রেণীর জন্যে যে সময়সীমা আল্লাহ্ তা’আলা নির্ধারিত করিয়া দিয়াছেন, উহা অতিবাহিত হইবার পর তাহাদিগকে হত্যা করিবার জন্যে আল্লাহ্ তা’আলা মু’মিনদিগকে আদেশ দিয়াছেন। অবশ্য কাফিরগণ ইসলাম গ্রহণ করিলে তাহাদিগকে হত্যা করা যাইবে না।
মুহাম্মদ ইব্ন কা’ব কুরযী প্রমুখ ব্যক্তিগণ হইতে আবূ-মা’শার মাদানী বর্ণনা করিয়াছেন: নবী করীম (সা) হিজরী নবম সনে আবূ বকর সিদ্দীক (রা)-এর নেতৃত্বে একদল সাহাবীকে হজ্জে পাঠাইলেন। অতঃপর সূরা বারাআতের ত্রিশটি অথবা চল্লিশটি আয়াতসহ আলী (রা)-কে পাঠাইলেন। তিনি (আলী রা) লোকদিগকে উহা পড়িয়া শুনাইলেন। তিনি মুশরিকগণকে জানাইয়া দিলেন যে, তাহারা চারি মাস যথা ইচ্ছা তথায় চলিয়া ফিরিয়া বেড়াইতে পারিবে। (অতঃপর, তাহাদের নিরাপত্তার ব্যাপারে আল্লাহ্ ও তাঁহার রাসূলের উপর কোন দায়িত্ব থাকিবে না।) তিনি (আলী রা) আরাফাতের দিনে মুশরিকদিগকে উক্ত আয়াতসমূহ পড়িয়া শুনাইলেন। তিনি তাহাদের জন্যে যুলহিজ্জা মাসের দশ তারিখ হইতে রবিউস্সানী মাসের দশ তারিখ পর্যন্ত এই চারি মাস সময় নির্ধারিত করিয়া দিলেন। তিনি তাহাদের সমাবেশ স্থানসমূহে গিয়া গিয়া তাহাদিগকে উক্ত আয়াতসমূহ পড়িয়া শুনাইলেন। তিনি তাহাদের সম্মুখে আরো ঘোষণা করিলেন: আগামী বৎসর হইতে আর কোন মুশরিক হজ্জ করিতে পারিবে না এবং এখন হইতে আর কেহ উলঙ্গ হইয়া কা’বা ঘর তাওয়াফ করিতে পারিবে না।’
মুজাহিদ (র) হইতে ইব্ন আবূ নাজীহ্ (র) বর্ণনা করিয়াছেন: মুজাহিদ (র) বলেন: ‘যে
সকল মুশরিক গোত্রের সহিত মুসলমানদের চুক্তি ছিল; যেমন খুযাআ গোত্র এবং মাল্লেজ গোত্র সেই সকল গোত্র এবং যে সকল মুশরিক গোত্রের সহিত মুসলমানদের কোন চুক্তি ছিল না, সেই সকল গোত্র ইহাদের সকলের প্রতিই )برائةٌ مِّنَ الله وَرَسُولُه( এই আয়াতে আল্লাহ্ তা’আলা তাহাদের নিরাপত্তার ব্যাপারে আল্লাহ্ ও রাসূলের দায়িত্ব মুক্তির বিষয় ঘোষণা করিয়াছেন।’
মুজাহিদ (র) আরো বলেন: ‘নবী করীম (সা) তাবুকের যুদ্ধ হইতে ফিরিয়া আসিয়া মনস্থ করিলেন, ‘তিনি সেই বৎসর হজ্জ পালন করিবেন,’ কিন্তু মুশরিকগণ উলঙ্গ হইয়া কা’বা ঘর তাওয়াফ করিয়া থাকে-এই বিষয় তাঁহার স্মরণে আসিলে উক্ত নির্লজ্জ কার্য বন্ধ না হওয়া পর্যন্ত তিনি হজ্জ পালন করা স্থগিত রাখিতে সিদ্ধান্ত করিলেন। অতঃপর নবী করীম (সা) আবূ বকর সিদ্দীক (রা) এবং আলী (রা)-কে পবিত্র মক্কায় পাঠাইলেন। তাহারা বিভিন্ন জনসমাবেশ স্থানে গিয়া মুসলমানদের সহিত চুক্তিবদ্ধ মুশরিকগণ এবং তাহাদের সহিত চুক্তি সম্পর্কহীন মুশরিকগণ-এই উভয় শ্রেণীর লোকদের নিকট ঘোষণা করিলেন যে, তাহাদিগকে চারি মাস সময় দেওয়া হইল। উক্ত চারি মাস যাবৎ তাহারা নিরাপদে সর্বত্র চলাফেরা করিতে পারিবে। অতঃপর তাহাদিগের সহিত যুদ্ধ করা হইবে; তবে তাহারা ঈমান আনিলে তাহাদিগকে হত্যা করা হইবে না। উক্তচারি মাস হইতেছে যুলহিজ্জা মাসের দশ তারিখ হইতে রবিউস্স্সানী মাসের দশ তারিখ পর্যন্ত সময়।
সুন্দী এবং কাতাদা (র) হইতেও অনুরূপ রিওয়ায়েত বর্ণিত হইয়াছে। যুহরী (র) বলেন: ‘মুশরিকদিগকে যে চারি মাস সময়ের জন্যে নিরাপত্তা দেওয়া হইয়াছিল, উহা ছিল ‘শাওয়াল’ হইতে মুহাররম মাস পর্যন্ত চারিমাস।’ যুহরীর উক্ত বর্ণনা গ্রহণযোগ্য নহে; আর গ্রহণযোগ্য হয় কী রূপে? উক্ত ঘোষণা প্রচারিত হইয়াছিল যিলহজ্জ মাসের দশ তারিখে। সে সময়ের জন্যে
তাফসীর: পূর্ববর্তী আয়াতে আল্লাহ্ তা’আলা বর্ণনা করিয়াছেন: ‘আল্লাহর রাসূলের
সহিত যে সকল মুশরিকের অনির্দিষ্ট মেয়াদের সন্ধি-চুক্তি সম্পাদিত রহিয়াছে, তাহাদিগকে চারি মাসের সময় দেওয়া হইতেছে। চারি মাস সময়ের মধ্যে তাহারা জান বাঁচাইবার জন্যে পৃথিবীর যে কোন স্থানে চলিয়া যাইতে পারিবে। চারি মাস সময় অতিবাহিত হইবার পর তাহাদের নিরাপত্তার ব্যাপারে আল্লাহ্ ও তাঁহার রাসূলের উপর কোন দায়িত্ব থাকিবে না।’ আলোচ্য আয়াতে আল্লাহ্ তা’আলা বলিতেছেন: ‘কিন্তু তোমাদের সহিত যাহাদের নির্দিষ্ট মেয়াদের সন্ধি চুক্তি সম্পাদিত রহিয়াছে, তাহারা যদি কোনরূপে চুক্তি-ভঙ্গ না করিয়া থাকে এবং তোমাদের বিরুদ্ধে কাহাকেও সাহায্য না করিয়া থাকে, তবে চুক্তির মেয়াদ শেষ না হওয়া পর্যন্ত তোমরা তাহাদের সহিত চুক্তি অনুযায়ী আচরণ করিবে। যাহারা চুক্তি ভঙ্গ না করে, নিশ্চয় আল্লাহ্ তাহাদিগকে ভালবাসেন।
ইতিপূর্বে একাধিক সনদে এই মর্মে হাদীস বর্ণিত হইয়াছে যে, নবী করীম (সা) আলী (রা) প্রমুখ সাহাবীদিগকে এই ঘোষণা প্রচার করিবার জন্যে নির্দেশ দিয়াছিলেন যে, ‘আল্লাহর রাসূলের সহিত যাহাদের সন্ধি-চুক্তি রহিয়াছে, (তাহারা চুক্তি মানিয়া চলিলে) চুক্তির মেয়াদ শেষ না হওয়া পর্যন্ত তাহাদের সহিত উহা বলবৎ থাকিবে।’ এখানে উক্ত রিওয়ায়েতসমূহ বর্ণনা করিবার প্রয়োজন নাই।
(٥) فَإِذَا انْسَلَخَ الْأَشْهُرُ الْحُرُمُ فَاقْتُلُوا الْمُشْرِكِينَ حَيْثُ وَجَدْتُمُوهُمْ وَخُذُوهُمْ وَاحْصُرُوهُمْ وَاقْعُدُوا لَهُمْ كُلَّ مَرْصَدٍ فَإِنْ تَابُوا وَأَقَامُوا الصَّلوةَ وَأَتُوا الزَّكَوةَ فَخَلُوا سَبِيلَهُمْ ، إِنَّ اللَّهَ غَفُورٌ رَّحِيمٌ )
৫. অতঃপর নিষিদ্ধ মাস অতিবাহিত হইলে মুশরিকদিগকে যেখানে পাইবে হত্যা করিবে, তাহাদিগকে বন্দী করিবে, অবরোধ করিবে এবং প্রত্যেক ঘাঁটিতে তাহাদের জন্যে ওঁৎ পাতিয়া থাকিবে; কিন্তু যদি তাহারা তওবা করে, সালাত কায়েম করে ও যাকাত দেয় তবে তাহাদিগের পথ ছাড়িয়া দিবে, আল্লাহ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।
তাফসীর: আয়াতে আল্লাহ্ তা’আলা বলিতেছেন: ‘যে সকল মুশরিককে চারি মাস সময় দেওয়া হইয়াছে, প্রদত্ত সময় অতিবাহিত হইবার পর তোমরা তাহাদিগকে যেখানেই পাইবে, সেখানেই হত্যা করিবে। তেমনি তোমরা তাহাদিগকে গ্রেফতার করিবে, অবরোধ করিবে এবং তাহাদিগকে ধরিবার জন্যে সম্ভাব্য সকল পথে ওঁৎ পাতিয়া থাকিবে; তবে তাহারা কুফরী পরিত্যাগ করিয়া ঈমান আনিলে, নামায কায়েম করিলে এবং যাকাত প্রদান করিলে তাহাদিগকে পূর্ণ নিরাপত্তা প্রদান করিবে। আল্লাহ্ ক্ষমাশীল ও কৃপাময়।’
আলোচ্য আয়াতে উল্লেখিত الأشهرُ الحُرُمُ )নিষিদ্ধ মাসসমূহ) কোন কোন মাস এ সম্বন্ধে তাফসীরকারদের মধ্যে মতভেদ রহিয়াছে। ইমাম ইব্ন জারীর বলেন নিম্নোক্ত আয়াতে আল্লাহ্ তা’আলা যে চারি মাসকে নিষিদ্ধ চারি মাসরূপে নির্ধারিত করিয়াছেন, আলোচ্য আয়াতে উল্লেখিত ‘নিষিদ্ধ মাসসমূহ’ হইতেছে সেই নিষিদ্ধ চারি মাস। আল্লাহ্ তা’আলা বলিতেছেন:
إِنَّ عِدَّةَ الشُّهُورِ عِنْدَ اللهِ اثْنَا عَشَرَ شَهْرًا فِي كِتَابِ اللهِ يَوْمَ خَلَقَ السَّمَوَاتِ وَالْأَرْضَ مِنْهَا اربعة حرم .
অর্থাৎ আল্লাহ্ যেদিন আকাশসমূহ এবং পৃথিবীকে সৃষ্টি করিয়াছেন, সেই দিন হইতে নিশ্চয় আল্লাহ্র নিকট (বৎসরের) মাসসমূহের সংখ্যা হইতেছে-বারো মাস। উহাদের মধ্য হইতে চারি মাস হইতেছে-নিষিদ্ধ (৯: ৩৬)।
উক্ত আয়াতে বর্ণিত ‘নিষিদ্ধ চারি মাস’ হইতেছে-যিলকাদ, যিলহাজ্জ, মুহাররম এবং রজব। অতএব, ইমাম ইবন জারীর (র) কর্তৃক বর্ণিত ব্যাখ্যা অনুসারে আলোচ্য আয়াতে উল্লেখিত ‘নিষিদ্ধ মাসসমূহ’ হইতেছে-উক্ত চারি মাস অর্থাৎ যিলকাদ, যিলহাজ্জ, মুহাম এবং রজব।)
ইমাম আবূ জা’ফর বাকেরও ইমাম ইন জারীরের ব্যাখ্যার অনুরূপ ব্যাখ্যা বর্ণনা করিয়াছেন।
তবে ইমাম ইব্ন জারীর বলেন: আলোচ্য আয়াতে নিষিদ্ধ চারি মাস অতিবাহিত হইবার পর যে সকল মুশরিককে হত্যা করিতে বলা হইয়াছে, তাহাদের ক্ষেত্রে উক্ত নিষিদ্ধ চারি মাসের প্রথম মাস হইতেছে রজব মাস এবং শেষ মাস হইতেছে মুহাররম মাস। ইমাম ইব্ন জারীর কর্তৃক বর্ণিত উপরোক্ত ব্যাখ্যা অনুসারে আলোচ্য আয়াতের তাৎপর্য এই দাঁড়ায়: ‘সংশ্লিষ্ট মুশরিকদের প্রতি আল্লাহ্ ও তাঁহার রাসূলের দায়িত্ব-মুক্তির ঘোষণা প্রচারিত হইবার পর মুহাম মাস শেষ হইলেই তোমরা তাহাদিগকে যেখানে পাইবে, সেখানেই হত্যা করিবে।
ইব্ন আব্বাস (রা) হইতে আলী ইব্ন আবী তালহা (র) অনুরূপ ব্যাখ্যা বর্ণনা করিয়াছেন। যাহ্হাকও অনুরূপ ব্যাখ্যা বর্ণনা করিয়াছেন। উক্ত ব্যাখ্যা গ্রহণযোগ্য নহে। আয়াতের পুরা বর্ণনা হইতে যাহা সঠিক মনে হইতেছে তাহা হইল যাহা ইব্ন আব্বাস (রা) হইতে আওফী (র) বর্ণনা করিয়াছেন। অর্থাৎ আলোচ্য আয়াতে যে নিষিদ্ধ মাসসমূহ উল্লেখিত হইয়াছে, ঐগুলি হইতেছে : فَسِيحُواً في الأرض أربعة أشهر এই আয়াতাংশে উল্লেখিত ‘চারি মাস’। আলোচ্য আয়াতে আল্লাহ্ তা’আলা বলিতেছেন: উক্ত চারি মাস অতিবাহিত হইবার পর তোমরা সংশ্লিষ্ট মুশরিকদিগকে যেখানে পাইবে সেখানেই হত্যা করিবে।’ মুজাহিদ, আমর ইব্ন শুআয়েব, মুহাম্মদ ইবন ইসহাক, কাতাদা, সুদ্দী এবং আবদুর রহমান ইবন যায়েদ ইব্ন আসলামও অনুরূপ ব্যাখ্যা বর্ণনা করিয়াছেন। আয়াতে উল্লেখিত اَلْأَشْهُرُ الْحُرُمُ শব্দগুচ্ছটি হইতেছে একটি নির্দিষ্ট )معرفه( শব্দগুচ্ছ। কোন অনুল্লেখিত বিষয়কে এইরূপ নির্দিষ্ট শব্দের পদবাচ্য হিসাবে গ্রহণ করা অপেক্ষা ইতিপূর্বে উল্লেখিত কোন বিষয়কে উহার পদবাচ্য হিসাবে গ্রহণ করা অধিকতর শ্রেয়; অতএব ইতিপূর্বে যে চারিটি মাস’ উল্লেখিত হইয়াছে উহাকেই আলোচ্য আয়াতে বর্ণিত নিষিদ্ধ মাসসমূহের’ উদ্দিষ্ট হিসাবে গ্রহণ করা অধিকতর শ্রেয়।
فَإِذَا انْسَلَخَ الْأَشْهُرُ الْحُرُمُ অর্থাৎ ‘সংশ্লিষ্ট মুশরিকদিগকে যে চারি মাস সময় দিয়াছি, সেই চারি মাস সময় অতিবাহিত হইয়া যাইবার পর।’
ناظلُوا الْمُشْرِكِينَ حَيْثُ وَجَدْتُمُوهُمْ অর্থাৎ ‘তোমরা সংশ্লিষ্ট মুশরিকদিগকে যেখানেই পাইবে,
সেখানেই হত্যা করিবে।’ উক্ত আয়াতাংশের তাফসীর এই যে, উহাতে আল্লাহ্ তা’আলা মু’মিনদিগকে আদেশ দিয়াছেন ‘তোমরা সংশ্লিষ্ট মুশরিকদিগকে হারাম শরীফের বাহিরে যেখানেই পাইবে, সেখানেই হত্যা করিবে।’ হারাম শরীফের মধ্যে তাহাদিগকে হত্যা করে যাইবে না। নিম্নোক্ত আয়াত দ্বারা উহা প্রমাণিত হয়:
وَلَا تُقَاتِلُوهُمْ عِنْدَ الْمَسْجِدِ الْحَرَامِ حَتَّى يُقَاتِلُوكُمْ فِيهِ – فَإِنْ قَاتَلُوكُمْ فَاقْتُلُوهُمْ .
অর্থাৎ আর, তোমরা মসজিদুল হারাম-এর নিকটে তাহাদেরই সহিত যুদ্ধ করিও না-যতক্ষণ না তাহারা উহার নিকট তোমাদের সহিত অগ্রে যুদ্ধে লিপ্ত হয়। তাহারা তথায় তোমাদের সহিত অগ্রে যুদ্ধে লিপ্ত হইলে তোমরা সেখানেও তাহাদিগকে হত্যা করিও (২: ১৯১)।
وَخُذُوهُمْ অর্থাৎ যদি তোমরা তাহাদিগকে বন্দী করিতে চাও, তবে তাহা কর।
واحصرُوهُمْ وَاقْعُدُوا لَهُمْ كُلِّ مَرْصَدَ অর্থাৎ ‘তোমরা বিনা চেষ্টায় বা সামান্য চেষ্টায় তাহাদিগকে
নিজেদের সামনে পাইবার ভরসায় নিশ্চেষ্ট বসিয়া থাকিও না; বরং তাহাদিগকে ধরিবার জন্যে তাহাদিগকে অবরোধ করিও এবং ওঁৎ পাতিবার স্থানসমূহে ওঁৎ পাতিয়া বসিয়া থাকিও। এইরূপ বিশাল পৃথিবীকে তাহাদের জন্যে সংকীর্ণ করিয়া দিও। ফলে তাহারা হয় নিহত হইবে, আর না হয় ইসলাম গ্রহণ করিবে।’
فَإِنْ تَابُوا وَأَقَامُوا الصَّلوةَ وَأَتُوا الزَّكُوةَ فَخَلُّوا سَبِيلَهُمْ إِنَّ اللهَ غَفُورٌ رَّحِيمٌ .
কিন্তু, যদি তাহারা কুফরী ত্যাগ করিয়া ঈমান আনে, সালাত কায়েম করে এবং যাকাত প্রদান করে, তবে তোমরা তাহাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করিও না; নিশ্চয় আল্লাহ্ ক্ষমাশীল ও কৃপাময়।
উক্ত আয়াতাংশ এবং অনুরূপ আয়াতসমূহের ভিত্তিতে আবু বকর সিদ্দীক (রা) স্বীয় খিলাফতের যুগে যাকাত প্রদানে অনিচ্ছুক ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে জিহাদ করিয়াছিলেন। উক্ত আয়াতাংশ দ্বারা প্রমাণিত হয় যে, কাফিরগণ যতদিন কুফরী ত্যাগ করিয়া ফরয কার্যসমূহ পালন না করিবে, ততদিন তোমরা তাহাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করিবে এবং তাহাদিগকে হত্যা করিবে। এখানে আল্লাহ্ তা’আলা সালাত ও যাকাতকে উল্লেখ করিয়া সকল ফরয কার্যসমূহের







তলোয়ারের আয়াত এবং মুশরিকদের প্রতি চূড়ান্ত আল্টিমেটাম
সূরা তাওবার ৫ নম্বর আয়াতটিকে ইসলামের ইতিহাসে ‘তলোয়ারের আয়াত’ (আয়াতুস সাইফ) বলা হয়। আধুনিক এপলজিস্টরা এই আয়াতের প্রেক্ষাপট নিয়ে যত ধোঁয়াশাই তৈরি করুক না কেন, প্রখ্যাত মুফাসসিরগণের মতে এটি কোনো নির্দিষ্ট যুদ্ধের রণকৌশল ছিল না, বরং এটি ছিল আরবের মাটি থেকে পৌত্তলিকতা নির্মূলের একটি আইনি ডিক্রি। ইসলাম হাউস থেকে প্রকাশিত এবং ড. আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া সম্পাদিত তাফসীর গ্রন্থে এই আয়াতের ভয়াবহতা ও এর চূড়ান্ত প্রকৃতি সম্পর্কে অত্যন্ত স্পষ্টভাবে বর্ণনা করা হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে যে, এই আয়াতটি নাজিল হওয়ার পর মুশরিকদের সাথে পূর্বের সমস্ত চুক্তি রহিত হয়ে যায়। [4] –
সংশ্লিষ্ট সবচেয়ে সম্মানিত কাজ। এ কারণে বহু স্থানে আল্লাহ তা’আলা
সালাতের সাথে সাথে যাকাতের আলোচনা করেছেন। সহীহ বুখারী ও মুসলিমে বর্ণিত হয়েছে: আব্দুল্লাহ ইবনু ওমর রাদিয়াল্লাহু আনহুমা বলেন, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: আমি লোকদের বিরুদ্ধে ততক্ষণ পর্যন্ত লড়াই করতে আদিষ্ট হয়েছি যতক্ষণ না তারা এই সাক্ষ্য দেয় যে, আল্লাহ ছাড়া প্রকৃত কোনো উপাস্য নেই এবং মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহর রাসূল এবং তারা সালাত প্রতিষ্ঠা করে, যাকাত প্রদান করে। আল-হাদীস।
এই সম্মানিত আয়াতটি হচ্ছে তরবারির (জিহাদের) আয়াত যে সম্পর্কে দহাক ইবনু মুযাহিম বলেন: এই আয়াতটি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এবং মুশরিকদের মাঝে সংঘটিত যাবতীয় চুক্তিকে রহিত করে দিয়েছে। সকল চুক্তি এবং সকল মেয়াদকে রহিত করে দিয়েছেন।
আউফী বর্ণনা করেন, আব্দুল্লাহ ইবনু আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহুমা এ আয়াত সম্পর্কে বলেন: সূরা আল-বারা’আহ (সূরা আত-তাওবাহ) অবতীর্ণ হওয়ার পর থেকে কোনো মুশরিকের কোনো চুক্তি এবং কোনো অঙ্গিকার আর অবশিষ্ট নেই। হারাম মাসসমূহ অতিক্রান্ত হওয়া, সূরা আত-তাওবাহ অবতীর্ণ হওয়ার পূর্বে মুশরিকদের থেকে দায়মুক্তির নির্দেশের দিন থেকে রবিউল আখির মাসের প্রথম দশ দিন এই চার মাস।

অর্থাৎ, এই ঘোষণার পর কোনো মুশরিকের পক্ষেই আর কোনো রক্ষা কবচ অবশিষ্ট ছিল না। এমনকি যারা কোনো প্রকার চুক্তি ভঙ্গ করেনি, তাদের ক্ষেত্রেও এই নির্দেশ কার্যকর ছিল। তাফসীরে মাযহারীতে বিষয়টি আরও পরিষ্কার করে ব্যাখ্যা করা হয়েছে যে, এই ঘোষণাটি ছিল সর্বজনীন এবং এতে কোনো নির্দিষ্ট গোষ্ঠী বা গোত্রকে ছাড় দেওয়া হয়নি। আসুন রেফারেন্সটি দেখে নিই: [5]
ওমরাহকে বলা হয় গৌণ হজ (হজে আসগর) তাই হজকে বলা হয়েছে মহান বা মুখ্য হজ (হজে আকবার)। এই অভিমতের সমর্থক জুহরী, শা’বী এবং আতা। তাঁরা বলেছেন, পূর্বের আয়াতে যে চার মাসের কথা বলা হয়েছে, সেই চার মাসের ভিত্তি হচ্ছে হজে আকবার। আমি বলি, আলোচ্য আয়াতে আকবারের দিন প্রদত্ত একটি ঘোষণার কথা বলা হয়েছে। এই ঘোষণার সঙ্গে কথিত চার মাসের কোনো সংযোগ নেই। হজের প্রারম্ভ ও সমাপ্তির কোনো উল্লেখ এখানে নেই। উল্লেখ নেই কোনো মাস অথবা সময়ের।
প্রথম আয়াতের উল্লেখিত সম্পর্কচ্ছেদের ঘোষণাটি দেয়া হয়েছিলো কেবল ওই সকল মুশরিককে লক্ষ্য করে, যারা মুসলমানদের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ ছিলো। আর আলোচ্য আয়াতের ঘোষণাটি দেয়া হয়েছে সাধারণভাবে। তাই এখানে বলা হয়েছে- ইলান্ নাস (মানুষের প্রতি) যারা চুক্তিবদ্ধ এবং যারা চুক্তিবদ্ধ নয়-তারা সকলে এই ঘোষণার অন্তর্ভুক্ত। তা ছাড়া যে সকল চুক্তিবদ্ধ মুশরিক চুক্তি ভঙ্গ করেনি, তাদের সম্পর্কে অন্যত্র নিদের্শ এসেছে ফাআতিমমু ইলাইহিম আহাদহুম (কৃত চুক্তি পরিপূর্ণ কর)। এ বিষয়টিও লক্ষ্য করতে হবে যে, চার মাস পরিভ্রমণ করার নির্দেশের সঙ্গেও হজে আকবারের কোনো সম্পর্ক নেই। যদি থাকতো তবে, ভ্রমণের সূচনা বা তারিখের কথাও উল্লেখ করা হতো এখানে। কিন্তু এখানে সেরকম কিছু নেই।
আমি বলি, বারাআতুম মিনাল্লাহি ওয়া রসুলিহি (এটা সম্পর্কচ্ছেদ আল্লাহ্ ও তাঁর রসুলের পক্ষ থেকে) এবং আন্নাল্লহা বারিউম মিনাল মুশরিকীনা ওয়া রসুলুহু (আল্লাহর সঙ্গে অংশীবাদীদের কোনো সম্পর্ক নেই এবং তাঁর রসুলের সঙ্গেও নয়)
এ আয়াত দু’টো কেবল তাবুক যুদ্ধের চুক্তিভঙ্গকারী বিধর্মীদেরকে লক্ষ্য করে অবতীর্ণ হয়েছে, এ রকম বলা যায় না। বরং চুক্তিভূত এবং চুক্তিবহির্ভূত সকল বিধর্মীই ঘোষণা দু’টোর লক্ষ্যস্থল। তাদের সকলকে লক্ষ্য করেই চার মাস নির্বিঘ্নে চলাফেরা করার অনুমতি দেয়া হয়েছে। কারণ ওই চারমাস আল্লাহতায়ালা যুদ্ধ-বিগ্রহ ও হত্যাকাণ্ড নিষিদ্ধ করেছেন। তাই, একস্থানে এরশাদ করা হয়েছে ‘ফা ইজানসালাখাল আশহুরুল হুরুম (যখন সম্মানিত মাসগুলো অতীত হয়ে যায়) অন্য এক স্থানে এসেছে- মিনহা আরবাআতুন হুরুমুন (তন্মধ্যে চারটি সম্মানিত)।
জ্ঞাতব্যঃ এই আয়াতে উল্লেখিত ‘ওয়া রসুলুহু’ কথাটিকে ‘ওয়া রসুলিহি’ পাঠ করা হতো। ইবনে আবী মালেকার বর্ণনায় এসেছে, এক আরববাসী হজরত ওমরের খেলাফতের সময় মদীনায় এসে বললো, আমাকে আপনারা কেউ আল্লাহ্ কালাম শিখিয়ে দিন। মোহাম্মদ বিন খাত্তাব তাকে শিখিয়ে দিলেন সুরা বারাআত এবং আলোচ্য আয়াতের ‘রসুলুহু’কে পড়লেন ‘রসুলিহি’। এ রকম পড়ার ফলে

উপসংহারঃ ইতিহাসের অপলাপ বনাম অকাট্য দলিল
উপরোক্ত আলোচনা ও প্রামাণ্য দলিলসমূহ থেকে এটি দিবালোকের মতো স্পষ্ট যে, সূরা তাওবার কঠোর বিধানগুলো কোনো তাৎক্ষণিক যুদ্ধের উত্তপ্ত মুহূর্তে বা আত্মরক্ষার তাগিদে নাজিল হয়নি। বরং মক্কা বিজয়ের পর যখন আরবে মুসলমানদের নিরঙ্কুশ ক্ষমতা প্রতিষ্ঠিত, তখন ইসলামি রাষ্ট্র থেকে পৌত্তলিকতা সম্পূর্ণ নির্মূল করার একটি আইনি এবং প্রশাসনিক নির্দেশ হিসেবে এই সূরাটি অবতীর্ণ হয়েছিল। আধুনিক মুসলিম এপলজিস্টরা যখন এই আয়াতগুলোকে ‘যুদ্ধের ময়দানের রণকৌশল’ হিসেবে প্রচার করেন, তখন তারা মূলত ইতিহাসের নির্জলা বিকৃতি ঘটান। তারা এটি করেন মূলত ইসলামের আদি ইতিহাসের এই কঠোর দিকটিকে আধুনিক মানবিক মূল্যবোধের মোড়কে আড়াল করার জন্য। এটি একদিক দিয়ে বেশ আনন্দের কথা যে, আধুনিককালের ইসলামিক দায়ীরা এই আয়াতগুলোর প্রকৃত অর্থ ও প্রেক্ষাপট নিয়ে নৈতিকভাবে বড় ধরণের লজ্জার মধ্যে পড়ে যান। কারণ আজকের এই সভ্য ও ভদ্র সমাজে দাঁড়িয়ে এই আয়াতগুলোর আক্ষরিক অর্থ প্রচার করার কোনো উপায় নেই। যেকোনো মুক্তমনা ও যুক্তিবাদী মানুষ মাত্রই বুঝবেন যে, কুরআনের এই আয়াতগুলো ধর্মীয় ঘৃণা এবং বিদ্বেষের এক চূড়ান্ত বহিঃপ্রকাশ।
এই দইয়ীরা যখন বুঝতে পারেন যে এই আয়াতগুলো বর্তমান বিশ্বের মানবাধিকার ও সহনশীলতার মানদণ্ডে সরাসরি ‘ঘৃণা ভাষণ’ হিসেবে গণ্য হবে, তখনই তারা মিথ্যার আশ্রয় নেন। তারা ইসলামকে জোরপূর্বক ‘মানবিক’ হিসেবে উপস্থাপন করে সাধারণ মানুষকে বিভ্রান্ত করেন। তাদের এই অপচেষ্টা হয়তো একনিষ্ঠ সাধারণ মুসলিমদের সাময়িক মানসিক সান্ত্বনা দেয়, কিন্তু সত্য গোপন করা কখনোই দীর্ঘমেয়াদী সমাধান হতে পারে না। বাস্তবতা হলো, ইউরোপ বা আমেরিকার মতো উন্নত দেশগুলোর কোনো জনসভায় বা সেমিনারে যদি সূরা তাওবার এই আয়াতগুলোর প্রকৃত অর্থ এবং এর প্রেক্ষাপট (যেখানে অন্য ধর্মাবলম্বীদের চার মাসের সময় দিয়ে হত্যা বা ইসলাম গ্রহণের আল্টিমেটাম দেওয়া হয়েছে) প্রচার করা হয়, তবে তাকে নিশ্চিতভাবেই উগ্রবাদ বা জঙ্গিবাদের উস্কানি হিসেবে গণ্য করা হবে। কিন্তু আধুনিক এই তথ্যপ্রযুক্তির যুগে ইসলামের ইতিহাসের এই রূঢ় সত্যগুলোকে লুকিয়ে রাখা আর সম্ভব নয়।
আরিফ আজাদের মতো লেখকরা যখন বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে সাধারণ পাঠকদের আবেগ পুঁজি করে বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষণের সাথে এই খুনি আয়াতের তুলনা দেন, তখন তারা চরম বুদ্ধিবৃত্তিক অসততার পরিচয় দেন। তারা সচেতনভাবে এড়িয়ে যান যে—বঙ্গবন্ধুর ভাষণ ছিল একটি শোষিত ও নিপীড়িত জাতির অস্তিত্ব রক্ষার লড়াইয়ের ডাক, যা ছিল সম্পূর্ণ রাজনৈতিক ও আত্মরক্ষামূলক। অন্যদিকে, সূরা তাওবার এই আয়াতগুলো ছিল একটি বিজয়ী ও শাসক শক্তির পক্ষ থেকে পরাজিত বা অধীনস্থ নিরস্ত্র জনগোষ্ঠীর প্রতি ‘ধর্ম গ্রহণ করো অথবা মৃত্যু/নির্বাসন বেছে নাও’ জাতীয় এক চূড়ান্ত ও একপাক্ষিক দণ্ডাজ্ঞা। ইসলামের ধ্রুপদী তাফসীরকারগণ তাদের সময়ে কোনো রাখঢাক না করেই এই সত্যগুলো লিখে গেছেন, কারণ তখন বিশ্বব্যাপী যুদ্ধের মাধ্যমেই ধর্ম বিস্তারের রীতি ছিল। কিন্তু আধুনিককালের প্রচারকরা নিজেদের ‘লজ্জা’ ঢাকতে এবং বিশ্ববাসীর কাছে ইসলামকে গ্রহণযোগ্য করতে বানোয়াট বয়ান তৈরি করছেন। সত্যকে জানতে হলে আমাদের অবশ্যই আধুনিক এই এপলজিস্টিক কল্পকাহিনীর মায়াজাল ছিন্ন করে ইসলামের মূল উৎস এবং ধ্রুপদী প্রামাণ্য ইতিহাসের দিকে ফিরে তাকাতে হবে। সত্য স্বীকার করে নেওয়াই হচ্ছে সবচাইতে সৎ ও সাহসী পদ্ধতি।
আসুন এবার সূরা তাওবার একটি নির্ভীক ও সত্যনিষ্ঠ তাফসীর শুনে নিই:
তথ্যসূত্রঃ
- প্যারাডক্সিক্যাল সাজিদ -২, আরিফ আজাদ, পৃষ্ঠা ৪৬ ↩︎
- সীরাতুল মুস্তফা (সা), খণ্ড ৩, পৃষ্ঠা ৯৯-১০০ ↩︎
- তাফসীরে ইবনে কাসীর, খণ্ড ৪, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, পৃষ্ঠা ৫১২-৫১৫, ৫২৫-৫২৭ ↩︎
- সূরা আত-তওবার তাফসীর, ইসলাম হাউস, সম্পাদনাঃ ড. আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া, পৃষ্ঠা ১২ ↩︎
- তাফসীরে মাযহারী, কাযি ছানাউল্লাহ পানিপথি (রাঃ), অনুবাদকঃ মওলানা এ, বি, এম, মাঈনুল ইসলাম, প্রকাশকঃ হাকিমাবাদ খানকায়ে মোজাদ্দেদিয়া, পঞ্চম খণ্ড, পৃষ্ঠা ২২৪ ↩︎
