
Table of Contents
- 1 ভূমিকাঃ ভিকটিম মনস্তত্ত্ব
- 2 মজলুম মুসলমানদের প্রতিনিধিদের কিছু বক্তব্য
- 3 ঐতিহাসিক উপাত্ত ও অভ্যন্তরীণ গণহত্যার পরিসংখ্যান
- 4 আধুনিক রাজনৈতিক ইসলাম, প্রভাবশালী তাত্ত্বিক এবং উগ্রবাদের বুদ্ধিবৃত্তিক উৎস
- 5 পাশ্চাত্যের দিকে আঙুল তোলার রাজনীতি, আত্মপ্রবঞ্চনা
- 6 বৈশ্বিক মনস্তত্ত্বের স্ববিরোধিতা ও রাজনৈতিক ইসলামের দ্বিচারিতা
- 7 উপসংহারঃ ভিকটিম মনস্তত্ত্বের চরম মূল্য এবং বুদ্ধিবৃত্তিক জাগরণের অপরিহার্যতা
ভূমিকাঃ ভিকটিম মনস্তত্ত্ব
দীর্ঘদিন ধরে বিশ্বজুড়ে, বিশেষ করে মুসলিম-অধ্যুষিত সমাজগুলোতে একটি প্রবল ন্যারেটিভ বা বয়ান ঐতিহাসিকভাবে প্রতিষ্ঠিত রয়েছে— “সারাবিশ্বে মুসলমানরা সবচেয়ে বেশি নির্যাতিত এবং অমুসলিম বিশ্ব তাদের বিরুদ্ধে নিরন্তর ষড়যন্ত্রে লিপ্ত।” ধর্মীয় উপাসনালয়, ওয়াজ মাহফিল থেকে শুরু করে রাজনৈতিক মঞ্চ, এমনকি মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশগুলোতে বামপন্থী রাজনীতিবিদগণ, এমনকি অনেক সেক্যুলার বুদ্ধিজীবী পর্যন্ত— সর্বত্রই এই ‘ভিকটিম মনস্তত্ত্ব’ (Victimhood psychology) অত্যন্ত সুচারুভাবে প্রচার করা হয়। সাধারণ মানুষের মধ্যে এই ধারণাটি এমনভাবে গেঁথে দেওয়া হয় যে, পশ্চিমা বিশ্ব, ইহুদি, খ্রিস্টান এবং অন্যান্য অমুসলিম সম্প্রদায় সম্মিলিতভাবে দিনরাত ইসলাম এবং মুসলিমদের ধ্বংস করার চক্রান্ত করছে। এই ধরনের বক্তব্য সচেতনভাবে জনপ্রিয় করা হয়, কারণ এইসব ষড়যন্ত্রতত্ত্ব কাফেরদের প্রতি বিদ্বেষকে নৈতিকতার মুখোশ পরিয়ে বৈধতা দেয়। কিন্তু আবেগ, ধর্মীয় আবেশ এবং যাচাইবিহীন বিশ্বাস সরিয়ে রেখে যখন যৌক্তিক এবং বস্তুনিষ্ঠ উপাত্ত দিয়ে এই বয়ানটি যাচাই করা হয়, তখন বাস্তবতার সাথে এর যোজন যোজন দূরত্ব পরিলক্ষিত হয়।
প্রথমত, এই ষড়যন্ত্রতত্ত্বের মধ্যে একটি সুস্পষ্ট ও মৌলিক মনস্তাত্ত্বিক স্ববিরোধিতা (Cognitive dissonance) এখানে কাজ করছে— যে পশ্চিমা বিশ্ব এবং অমুসলিম রাষ্ট্রগুলোকে মুসলিমদের প্রধান শত্রু এবং তাদের দুর্দশার আদি কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়, সেই দেশগুলোতেই মুসলিমদের অভিবাসনের হার সারা বিশ্বে সবচেয়ে বেশি। উন্নত জীবন, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, বাকস্বাধীনতা এবং মানবাধিকারের আশায় প্রতি বছর লক্ষ লক্ষ মুসলিম ইউরোপ, উত্তর আমেরিকা এবং অস্ট্রেলিয়ায় পাড়ি জমাচ্ছে [1]। অপর দিকে, মধ্যপ্রাচ্যের ধনী মুসলিম রাষ্ট্রগুলো (যেমন: সৌদি আরব, কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত) মুসলিম শরণার্থীদের আশ্রয় দেওয়ার ক্ষেত্রে এবং নাগরিকত্ব প্রদানের ক্ষেত্রে অত্যন্ত কঠোর এবং বৈষম্যমূলক নীতি অবলম্বন করে [2]। যদি অমুসলিম বিশ্বই মুসলিমদের ওপর নির্যাতনের মূল হোতা হতো, তবে এই তথাকথিত ‘নির্যাতিত’ সম্প্রদায় তাহলে সেই তথাকথিত ‘নির্যাতকদের’ দেশেই কেন দলে দলে আশ্রয় খুঁজছে এবং স্থায়ীভাবে বসতি গড়ছে এবং স্থায়ীভাবে বসবাস করতে চাইছে, সেটি এই ষড়যন্ত্রতত্ত্বের প্রচারকরা সচেতনভাবেই এড়িয়ে যান।
দ্বিতীয়ত, ঐতিহাসিক এবং পরিসংখ্যানগত উপাত্ত বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, গত এক শতাব্দীতে মুসলিমদের প্রাণহানির সবচেয়ে বড় কারণ কোনো অমুসলিম শক্তির সরাসরি আক্রমণ নয়; বরং মুসলিমদের নিজেদের মধ্যকার ভূ-রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব, ক্ষমতার লড়াই, জাতিগত নিধন এবং শিয়া-সুন্নি বা অন্যান্য উপদলীয় সংঘাত। নিজেদের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক ব্যর্থতাকে আড়াল করার জন্য সাম্রাজ্যবাদ বা পশ্চিমাদের ঘাড়ে ঢালাওভাবে দোষ চাপানোর একটি প্রবণতা মুসলিম দেশগুলোর শাসকদের মাঝে প্রবল। সমাজ থেকে শিক্ষা, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে পশ্চাৎপদতার মূল কারণ হিসেবে নিজেদের কাঠামোগত ত্রুটি, স্বৈরতন্ত্র বা ধর্মান্ধতাকে দায়ী না করে, একটি কল্পিত শত্রুর বিরুদ্ধে জনগণকে উদ্দীপ্ত করে রাখা রাজনৈতিকভাবে অনেক বেশি সুবিধাজনক।
আদি খেলাফতের হারানো গৌরব পুনরুদ্ধারের অবাস্তব ও ঐতিহাসিকভাবে অযাচাইকৃত ‘গৌরব’-এর কল্পনায় বিভোর থেকে অনেকেই আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞান চর্চাকে অবজ্ঞা করেছেন। ফলস্বরূপ, শিক্ষা ও মানব উন্নয়ন সূচকে মুসলিম অধ্যুষিত দেশগুলো, বিশেষ করে সাব-সাহারান আফ্রিকা ও দক্ষিণ এশিয়ার একটি বড় অংশ, ব্যাপকভাবে পিছিয়ে পড়েছে [3]। নিজেদের এই বুদ্ধিবৃত্তিক ও কাঠামোগত ব্যর্থতার দায়ভার অন্যের ওপর চাপিয়ে আত্মতুষ্টি লাভের যে প্রবণতা, তা একটি সম্প্রদায়ের সামগ্রিক পতনেরই ইঙ্গিত দেয়।
এই প্রবন্ধে আমরা সরাসরি পরীক্ষা করব— ঐতিহাসিক তথ্য, পরিসংখ্যান এবং রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহের নির্মোহ বিশ্লেষণের মাধ্যমে অনুসন্ধান করব— বিশ্বজুড়ে মুসলিমদের প্রাণহানি এবং দুর্দশার প্রকৃত উৎস কী এবং কারা এই তথাকথিত “নির্যাতনের” পেছনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা পালন করেছে।
মজলুম মুসলমানদের প্রতিনিধিদের কিছু বক্তব্য
বাংলাদেশে বহু ইসলামি বক্তৃতা/ওয়াজে প্রায় নিয়মিতভাবে ইহুদিদের বিরুদ্ধে ঘৃণামূলক ভাষা, ষড়যন্ত্রতত্ত্ব, কিংবা পরিচয়-ভিত্তিক শত্রু নির্মাণ দেখা যায়—এবং এই ভাষ্য কেবল বক্তার মধ্যে সীমিত থাকে না; শ্রোতাদের একটি অংশের বিশ্বাস-গঠনের ভেতরেও তা ঢুকে পড়ে। প্রশ্ন হলো: এসব বক্তব্য কেন ও কীভাবে সামাজিকভাবে গ্রহণযোগ্য হয়ে ওঠে? ধর্মীয় কর্তৃত্ব, “পবিত্রতা”র দাবি, এবং শত্রু-পরিচয় তৈরির রাজনৈতিক মনস্তত্ত্ব—এই তিনটি উপাদান কীভাবে একত্রে কাজ করে, তা বিশ্লেষণ করা জরুরি। কিন্তু নিজেদের মজলুম জনগোষ্ঠীর ভাষা এরকম কীভাবে হয়, তা কেবল অযৌক্তিকই নয়, বরং পূর্বে নির্মিত ভিকটিম ন্যারেটিভের সাথেও সাংঘর্ষিক।
এবারে আসুন সূরা তওবার একটি নির্ভীক সাহসী ওয়াজ শুনি,
আসুন আরেকটি ওয়াজ শুনি,
আসুন আরও একজন ইংরেজিভাষী আরব আলেমের বক্তব্য শুনে নেয়া যাক,
আসুন এই নিয়ে একটি ভিডিও দেখি, যেখানে আরবের একজন ইসলামিক আলেম শেখাচ্ছেন, কীভাবে একটি শরিয়াভিত্তিক রাষ্ট্রে অমুসলিমদের প্রতি পদে পদে অপমান অপদস্ত করতে হবে, যেন তারা বাধ্য হয় ইসলাম গ্রহণ করতে,
বাংলাদেশের সবচাইতে প্রখ্যাত কয়েকজন আলেমের বক্তব্য শুনি,
বাংলাদেশের টিভি-চ্যানেলে প্রচারিত বক্তব্য কিছু বক্তব্য আসুন শুনি,
এবারে সব ধর্মের মানুষের সহাবস্থান এবং সম্প্রীতি বিষয়ে আসুন আরও দুইটি ওয়াজ শুনে নিই,
ঐতিহাসিক উপাত্ত ও অভ্যন্তরীণ গণহত্যার পরিসংখ্যান
মুসলিম সমাজে প্রচলিত “বিশ্বব্যাপী মুসলিম নিধন” সংক্রান্ত বয়ানটির সত্যতা যাচাই করতে গেলে দেখা যায়, গত এক শতাব্দীতে অমুসলিমদের হাতে নিহত মুসলিমদের তুলনায় মুসলিমদের নিজেদের হাতে নিহত বা নির্যাতিত মুসলিমদের সংখ্যা কয়েক গুণ বেশি। এই তথাকথিত ‘উম্মাহর ঐক্য’ বা ‘ভ্রাতৃত্বের’ ধারণাটি ঐতিহাসিক বাস্তবতার সামনে দাঁড়াতে পারে না। যখনই স্বার্থ, ক্ষমতা বা আদর্শিক ভিন্নতার প্রশ্ন এসেছে, তখনই মুসলিম শাসকরা বা উগ্রপন্থী গোষ্ঠীগুলো অন্য মুসলিমদের ওপর চরম নৃশংসতা চালিয়েছে।
এর একটি ধ্রুপদী উদাহরণ হলো ১৯৭১ সালে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে (বর্তমান বাংলাদেশ) সংঘটিত গণহত্যা। পশ্চিম পাকিস্তানি সেনাবাহিনী, যারা ধর্মীয় পরিচয়কে তাদের শাসনের বৈধতা হিসেবে ব্যবহার করত, তারা নয় মাসে আনুমানিক ৩ লক্ষ থেকে ৩০ লক্ষ মানুষকে হত্যা করে, যাদের সিংহভাগই ছিল মুসলিম [4]। এই হত্যাকাণ্ডের প্রধান কারিগররা ছিলেন জেনারেল ইয়াহিয়া খান এবং টিক্কা খানের মতো মুসলিম জেনারেলরা। তারা বাঙালি মুসলিমদের ‘সাচ্চা মুসলমান’ নয় বলে অভিহিত করে তাদের ওপর হত্যা ও ধর্ষণের বৈধতা দিয়েছিল। এখানে কোনো ‘ইহুদি-নাসারা’ চক্রান্ত ছিল না; বরং এটি ছিল এক মুসলিম জনগোষ্ঠীর ওপর অন্য মুসলিম শাসকগোষ্ঠীর রাজনৈতিক ও জাতিগত আধিপত্য বিস্তারের নৃশংস বহিঃপ্রকাশ।
তদানীন্তন মধ্যপ্রাচ্য এবং উত্তর আফ্রিকার সংঘাতগুলো বিশ্লেষণ করলে আরও ভয়াবহ চিত্র পাওয়া যায়। ১৯৮০ থেকে ১৯৮৮ সাল পর্যন্ত চলা ইরান-ইরাক যুদ্ধে প্রায় ১০ লক্ষ মুসলিম নিহত হয় [5]। এই যুদ্ধটি ছিল সম্পূর্ণভাবে ক্ষমতার লড়াই এবং শিয়া-সুন্নি সাম্প্রদায়িক বিভাজনের ফল। সাদ্দাম হোসেন তার দীর্ঘ শাসনামলে (১৯৭০-২০০৩) কুর্দি এবং শিয়া মুসলিমদের ওপর যে দমন-পীড়ন চালিয়েছেন, তাতে প্রায় ৬ লক্ষ মানুষের প্রাণহানি ঘটে [6]। সিরিয়ার গৃহযুদ্ধে বাশার আল-আসাদ সরকারের হাতে এবং আইএসের মতো চরমপন্থী গোষ্ঠীর হাতে যে পরিমাণ মুসলিম নিহত হয়েছে (প্রায় ৫ লক্ষাধিক), তা আধুনিক ইতিহাসে নজিরবিহীন [7]।
নিম্নে গত কয়েক দশকের কিছু বড় ধরনের প্রাণহানির পরিসংখ্যান দেওয়া হলো, যেখানে মূল আক্রমণকারী এবং ভিকটিম উভয়ই ছিল মুসলিম সম্প্রদায়ভুক্ত:
| সংঘাত বা গণহত্যার নাম | সময়কাল | জড়িত পক্ষসমূহ (প্রধানত মুসলিম) | নিহতের আনুমানিক সংখ্যা | প্রেক্ষাপট ও তথ্যসূত্র |
| ১. বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ ও গণহত্যা | ১৯৭১ | পশ্চিম পাকিস্তানি সেনাবাহিনী বনাম পূর্ব পাকিস্তানের বাঙালি | ৩ লক্ষ থেকে ৩০ লক্ষ | জাতিগত ও রাজনৈতিক আধিপত্য বিস্তার। পাকিস্তানি জান্তা বাঙালিদের ‘সাচ্চা মুসলমান’ মনে করত না। [4] |
| ২. ইন্দোনেশিয়ায় গণহত্যামূলক শুদ্ধি অভিযান | ১৯৬৫–১৯৬৬ | সুহার্তোর নেতৃত্বাধীন সেনাবাহিনী বনাম সন্দেহভাজন কমিউনিস্ট | প্রায় ৫ লক্ষ থেকে ১০ লক্ষ | রাজনৈতিক শুদ্ধি অভিযান, যেখানে নিহতদের বিশাল অংশই ছিল সাধারণ মুসলিম। [8] |
| ৩. ইরান-ইরাক যুদ্ধ | ১৯৮০–১৯৮৮ | সাদ্দাম হোসেনের ইরাক বনাম আয়াতুল্লাহ খোমেনির ইরান | ৫ লক্ষ থেকে ১০ লক্ষের বেশি | ভূ-রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব এবং শিয়া-সুন্নি মতাদর্শগত রেষারেষি। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর এটি অন্যতম রক্তক্ষয়ী পরিখা যুদ্ধ। [5] |
| ৪. কুয়েত আগ্রাসন (উপসাগরীয় যুদ্ধ) | ১৯৯০–১৯৯১ | সাদ্দাম হোসেনের ইরাকি বাহিনী বনাম কুয়েত | আনুমানিক ১ লক্ষ থেকে ১.৫ লক্ষ | ইরাক কর্তৃক প্রতিবেশী মুসলিম রাষ্ট্র কুয়েত দখল এবং সম্পদ লুণ্ঠনের চেষ্টা, যা পরবর্তীতে আন্তর্জাতিক সামরিক হস্তক্ষেপে গড়ায়। [9] |
| ৫. আল-আনফাল অভিযান (কুর্দি গণহত্যা) | ১৯৮৮ | সাদ্দামের ইরাকি শাসকগোষ্ঠী বনাম কুর্দি সম্প্রদায় (সুন্নি মুসলিম) | ৫০ হাজার থেকে ১.৮ লক্ষ | ইরাকের উত্তরাঞ্চলে কুর্দিদের ওপর রাসায়নিক অস্ত্র প্রয়োগ এবং পদ্ধতিগত জাতিগত নিধন। [10] |
| ৬. সিরিয়ার গৃহযুদ্ধ | ২০১১–বর্তমান | বাশার আল-আসাদ সরকার বনাম বিদ্রোহী গোষ্ঠী এবং আইএস | ৫ লক্ষ থেকে ৬ লক্ষের বেশি | রাজনৈতিক স্বৈরতন্ত্রের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ, যা পরবর্তীতে ভয়াবহ শিয়া-সুন্নি প্রক্সি যুদ্ধ এবং আইএসের মতো চরমপন্থীদের উত্থানের রূপ নেয়। [7] |
| ৭. ইয়েমেন যুদ্ধ ও মানবিক সংকট | ২০১৪–বর্তমান | হুথি বিদ্রোহী (শিয়া) বনাম সৌদি নেতৃত্বাধীন সামরিক জোট (সুন্নি) | প্রায় ৩ লক্ষ ৭৭ হাজার | এটি মূলত ইরান ও সৌদি আরবের মধ্যকার একটি ভূ-রাজনৈতিক প্রক্সি যুদ্ধ। যুদ্ধ, অনাহার এবং কলেরায় লাখ লাখ মুসলিম মারা গেছে। [11] |
| ৮. আলজেরিয়ার গৃহযুদ্ধ | ১৯৯১–২০০২ | আলজেরিয়ার সরকার বনাম ইসলামিক স্যালভেশন ফ্রন্ট (GIA) | ১ লক্ষ থেকে ২ লক্ষ | সেনাবাহিনী নির্বাচনের ফলাফল বাতিল করলে ইসলামপন্থী বিদ্রোহীরা সশস্ত্র সংগ্রাম শুরু করে এবং অসংখ্য সাধারণ নাগরিক হত্যা করে। [12] |
| ৯. সুদানের গৃহযুদ্ধ ও দারফুর গণহত্যা | ২০০৩–বর্তমান | সুদানের সরকার ও জানজাওয়িদ মিলিশিয়া বনাম দারফুরের অ-আরব মুসলিম | প্রায় ৩ লক্ষ | জাতিগত ও সম্পদভিত্তিক সংঘাত। আরব মিলিশিয়ারা অ-আরব মুসলিমদের গ্রাম জ্বালিয়ে দেয়, ধর্ষণ ও হত্যা করে। [13] |
| ১০. আফগানিস্তানের গৃহযুদ্ধ ও তালেবানি শাসন | ১৯৭৮–বর্তমান | মুজাহিদিন, তালেবান, আল-কায়েদা এবং সরকারি বাহিনী | ৪ লক্ষ থেকে ২০ লক্ষ (বিভিন্ন পর্যায়ে) | মতাদর্শগত সংঘাত এবং উগ্র ইসলামি শাসন চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা, যার ফলে লাখ লাখ সাধারণ মুসলিমের মৃত্যু এবং বাস্তুচ্যুতি ঘটেছে। [14] |
| ১১. সোমালিয়ার গৃহযুদ্ধ | ১৯৯১–বর্তমান | বিভিন্ন গোত্রীয় মিলিশিয়া, আল-শাবাব (ইসলামপন্থী) বনাম সরকার | ৩ লক্ষ থেকে ৫ লক্ষ | রাষ্ট্রকাঠামোর পতন, গোত্রীয় সংঘাত এবং আল-শাবাবের মতো ইসলামি চরমপন্থীদের আত্মঘাতী হামলা ও সন্ত্রাসবাদ। [15] |
| ১২. পাকিস্তান: আহমদিয়া ও অন্যান্য সংখ্যালঘু নির্যাতন | ১৯৫৩, ১৯৭৪–বর্তমান | রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় উগ্রপন্থী গোষ্ঠী বনাম আহমদিয়া সম্প্রদায় | প্রত্যক্ষভাবে কয়েক হাজার, পরোক্ষভাবে লক্ষাধিক ভুক্তভোগী | মাওলানা মওদুদীর উস্কানিতে শুরু হওয়া এই বৈষম্য পরবর্তীতে সংবিধানে যুক্ত হয়। আহমদিয়াদের অমুসলিম ঘোষণা করে তাদের মানবাধিকার হরণ করা হয়। [16] |
| ১৩. বেলুচিস্তান সংঘাত | ১৯৪৮–বর্তমান | পাকিস্তান রাষ্ট্র ও সামরিক বাহিনী বনাম বেলুচ জাতীয়তাবাদী গোষ্ঠী | হাজার হাজার নিহত এবং নিখোঁজ (সঠিক পরিসংখ্যান ধামাচাপা দেওয়া) | জাতিগত ও রাজনৈতিক বঞ্চনা। পাকিস্তান সেনাবাহিনী গুম (Enforced disappearances) এবং বিচারবহির্ভূত হত্যার মাধ্যমে বেলুচ মুসলিমদের ওপর নির্যাতন চালিয়ে আসছে। [17] |
| ১৪. আইএস (ISIS) এর উত্থান ও ধ্বংসযজ্ঞ | ২০১৪–২০১৯ | আইএসআইএস বনাম ইরাক ও সিরিয়ার সাধারণ মুসলিম ও ইয়াজিদি | লক্ষাধিক | খিলাফত প্রতিষ্ঠার নামে বাগদাদীর নেতৃত্বাধীন আইএস হাজার হাজার সুন্নি ও শিয়া মুসলিমকে হত্যা করে এবং ভিন্নমতাবলম্বীদের দাসীতে পরিণত করে। [18] |
এই পরিসংখ্যানগুলো স্পষ্টভাবে দেখায় যে, ১৯৪৮ সালের পর থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত বিশ্বে মোট মুসলিম প্রাণহানির প্রায় ৮৫ শতাংশই ঘটেছে অন্য মুসলিম বা মুসলিম রাষ্ট্রের হাতে। অথচ সাধারণ মুসলিম মানসে এই সত্যটি সুকৌশলে এড়িয়ে যাওয়া হয়। ষড়যন্ত্রতত্ত্বের দোহাই দিয়ে এই বিশাল আত্মঘাতী হত্যাকাণ্ডগুলোকে ‘পশ্চিমা চক্রান্ত’ হিসেবে চালিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হয় যাতে নিজেদের অভ্যন্তরীণ ব্যর্থতা এবং নৃশংসতাকে আড়াল করা যায়।
এই সারণিটি অত্যন্ত স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে যে, সাম্রাজ্যবাদ বা পশ্চিমাদের ষড়যন্ত্রের বয়ানটি মূলত একটি ইচ্ছাকৃতভাবে নির্মিত রাজনৈতিক প্রোপাগান্ডা। ইয়েমেনে যখন একটি মুসলিম দেশ (সৌদি জোট) আরেক মুসলিম দেশের ওপর বোমা বর্ষণ করে লক্ষ লক্ষ শিশুকে অনাহারে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেয়, অথবা পাকিস্তানে যখন বেলুচদের গুম করা হয়, তখন সেখানে কোনো ‘ইহুদি-নাসারা’ বা অমুসলিম বিশ্বের চক্রান্ত থাকে না। এই বিশাল প্রাণহানির পেছনে দায়ী মূলত মুসলিম বিশ্বের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ব্যর্থতা, অগণতান্ত্রিক স্বৈরতন্ত্র, শিয়া-সুন্নি ক্ষমতার লড়াই এবং চরমপন্থী মতাদর্শের চর্চা। ষড়যন্ত্রতত্ত্বের দোহাই দিয়ে এই বাস্তবতাকে অস্বীকার করা এক প্রকার আত্মঘাতী প্রবঞ্চনা।
আধুনিক রাজনৈতিক ইসলাম, প্রভাবশালী তাত্ত্বিক এবং উগ্রবাদের বুদ্ধিবৃত্তিক উৎস
গত এক শতাব্দীতে মুসলিম বিশ্বে যে অপরিসীম মানবীয় বিপর্যয়, সহিংসতা ও অসহিষ্ণুতার বিস্তার ঘটেছে, তা কোনো আকস্মিক বা বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এর পেছনে রয়েছে সুনির্দিষ্ট একটি বুদ্ধিবৃত্তিক কাঠামো এবং রাজনৈতিক ইসলামের তাত্ত্বিকদের সুদীর্ঘ প্রচারণা। সাধারণ ধর্মপ্রাণ মানুষের মধ্যে ক্রমাগত ‘নির্যাতিত’ হওয়ার যে হীনম্মন্যতা তৈরি করা হয়েছে, তা মূলত এই রাজনৈতিক অভিলাষ হাসিলেরই একটি মোক্ষম হাতিয়ার। গ্রাম-বাংলার ওয়াজ মাহফিল থেকে শুরু করে ইন্টারনেটের পরিসরে যে উগ্র ওয়াজ বা ধর্মীয় বয়ান প্রতিদিন প্রচারিত হচ্ছে, তা মূলত এই তাত্ত্বিকদেরই রাজনৈতিক মতাদর্শের লোকজ সংস্করণ। এই ওয়াজগুলোতে ক্রমাগত ভিকটিম কার্ড খেলা হয় এবং কাল্পনিক শত্রুর বিরুদ্ধে জিহাদের উস্কানি দেওয়া হয়, যা তরুণ সমাজকে বিজ্ঞান, যুক্তি ও আধুনিক শিক্ষার বদলে আত্মঘাতী ধ্বংসের দিকে ঠেলে দেয় [19]।
গত একশ বছরে ইসলামি বিশ্বে সবচেয়ে বেশি প্রভাব বিস্তারকারী রাজনৈতিক ও ধর্মীয় নেতাদের একটি তালিকা পর্যালোচনা করলে এক ভয়াবহ চিত্র ফুটে ওঠে। আধুনিক ইসলামের ব্যাখ্যাকারী হিসেবে পরিচিত এই প্রভাবশালীদের প্রায় সকলেই কোনো না কোনোভাবে সহিংসতা, সন্ত্রাসবাদ অথবা মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধের সাথে জড়িত বা এর তাত্ত্বিক গুরু।
উপরের এই ব্যক্তিরা আধুনিক ইসলামি সমাজে সর্বাধিক পঠিত, অনুসরণীয় এবং প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব। এরা প্রত্যেকেই সাজাপ্রাপ্ত, নিন্দিত অথবা মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত অপরাধী। এদের কেউই পশ্চিমা বা অমুসলিমদের ষড়যন্ত্রের শিকার নন; বরং এরা নিজেরাই লক্ষ কোটি মুসলিম এবং অমুসলিমদের ওপর সীমাহীন নির্যাতন ও প্রাণহানির মূল হোতা। এদের প্রণীত মতাদর্শ এবং ওয়াজ মাহফিলগুলোতে ছড়ানো অন্ধ আবেগের কারণে আজ মুসলিম সমাজ জ্ঞান-বিজ্ঞান থেকে ছিটকে পড়ে আত্মঘাতী অন্ধকারের দিকে ধাবিত হচ্ছে।
প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক, এই প্রভাবশালীদের বিচার করে বা কোণঠাসা করে কি মুসলিম জনগোষ্ঠীর ওপর নির্যাতন করা হচ্ছে? নাকি এই নেতারাই লক্ষ কোটি মুসলিমকে বিপথগামী করে নির্যাতনের মুখে ঠেলে দিয়েছেন? তাহলে ইসলামের প্রকৃত শত্রু কে? সাধারণ মুসলিমদের পশ্চাৎপদতা, অজ্ঞতা এবং দুর্দশার জন্য আসলে কারা দায়ী? কোনো ভিনদেশী শক্তি, নাকি মুসলিম সমাজের ভেতরের এই স্বঘোষিত ধর্মরক্ষকেরাই?
পাশ্চাত্যের দিকে আঙুল তোলার রাজনীতি, আত্মপ্রবঞ্চনা
মুসলিম বিশ্বের যেকোনো অভ্যন্তরীণ সংকট, গৃহযুদ্ধ বা গণহত্যার ক্ষেত্রে একটি সাধারণ প্রবণতা হলো এর দায়ভার পশ্চিমা বিশ্ব, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, ইসরায়েল বা ভারতের ওপর চাপিয়ে দেওয়া। এটি একটি অত্যন্ত সুবিধাজনক ‘স্কেপগোট’ বা বলির পাঁঠা খোঁজার রাজনীতি। বলা হয়ে থাকে, পশ্চিমা বিশ্ব এবং তাদের অস্ত্র ব্যবসায়ীরা ষড়যন্ত্র করে মুসলিমদের মধ্যে যুদ্ধ বাঁধিয়ে দেয়। এটি অনস্বীকার্য যে, বৈশ্বিক পরাশক্তিগুলো এবং তাদের সামরিক-শিল্প কমপ্লেক্স (Military-industrial complex) নিজেদের ভূ-রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্বার্থে বিশ্বজুড়ে অস্ত্র বিক্রি করে। কিন্তু অস্ত্র উৎপাদনকারী দেশগুলো অস্ত্র বিক্রি করলেই যে একটি জাতিকে নিজেদের ভাইদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়তে হবে, এমন কোনো যৌক্তিক বাধ্যবাধকতা নেই। অস্ত্র বাইরে থেকে আসতে পারে, কিন্তু ট্রিগার চাপার সিদ্ধান্ত সম্পূর্ণ অভ্যন্তরীণ।
এই ষড়যন্ত্রতত্ত্বের সবচেয়ে নগ্ন এবং নির্লজ্জ রূপটি দেখা যায় ১৯৭১ সালের বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের বর্ণনায়। ইসলামপন্থী এবং পাকিস্তানপন্থীরা প্রায়শই প্রচার করে যে, পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তান নাকি সুখে-শান্তিতে ‘ইসলামি ভ্রাতৃত্বের’ বাঁধনে আবদ্ধ ছিল এবং ভারত বা রাশিয়ার চক্রান্তে এই দুই ভাইয়ের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি হয়েছে। এটি কেবল ভুল নয়, বরং একটি সচেতন ঐতিহাসিক মিথ্যাচার। প্রকৃত সত্য হলো, পশ্চিম পাকিস্তানের দীর্ঘ ২৪ বছরের অর্থনৈতিক শোষণ, রাজনৈতিক বঞ্চনা, ভাষাগত ও সাংস্কৃতিক আগ্রাসন এবং চূড়ান্ত পর্যায়ে পূর্ব পাকিস্তানের নিরস্ত্র বাঙালিদের ওপর চালানো ইতিহাসের অন্যতম বর্বর গণহত্যার কারণেই বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছিল। যখনই এই ‘পশ্চিমা বা ভারতীয় ষড়যন্ত্রের’ তত্ত্ব হাজির করা হয়, তার মূল উদ্দেশ্যই থাকে মূলত পশ্চিম পাকিস্তানি ইসলামপন্থী সামরিক জান্তার গণহত্যা এবং মানবতাবিরোধী অপরাধগুলোকে সুকৌশলে ধামাচাপা দেওয়া [41]। যারা এই ষড়যন্ত্রতত্ত্ব প্রচার করে, তারা মূলত অপরাধীদের রক্ষা করার অসৎ উদ্দেশ্য নিয়েই তা করে থাকে।
পরিসংখ্যান এবং বাস্তব পরিস্থিতি অত্যন্ত নির্মম। ১৯৪৮ সালের পর থেকে আজ পর্যন্ত বিশ্বজুড়ে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সংঘাতে প্রায় দেড় কোটি মুসলিম নিহত হয়েছে, যার প্রায় ৮৫ শতাংশই প্রাণ হারিয়েছে অন্য কোনো মুসলিম শাসক, সামরিক বাহিনী বা সশস্ত্র মুসলিম গোষ্ঠীর হাতে [42]। সুন্নিরা শিয়াদের হত্যা করেছে, শিয়ারা সুন্নিদের মেরেছে, আর উভয় পক্ষ মিলেমিশে আহমদিয়া বা কুর্দিদের ওপর নির্যাতন চালিয়েছে। এই অন্তহীন সংঘাতের ফলে কোটি কোটি মুসলিম আজ গৃহহীন, পঙ্গু ও বাস্তুচ্যুত। নারী ও শিশুরা হচ্ছে ধর্ষিত, লাঞ্ছিত ও দাসত্বের শিকার (যেমনটা আইএস ইয়াজিদি ও অন্যান্য নারীদের সাথে করেছিল)। নিজেদের দেশে ন্যূনতম মানবাধিকার না পেয়ে এই বাস্তুচ্যুত মানুষগুলোই শেষ পর্যন্ত সেই তথাকথিত ‘শত্রু’ ইউরোপ বা আমেরিকাতেই পাড়ি জমাচ্ছে একটি সুন্দর ও নিরাপদ জীবনের আশায়। অথচ, বাংলাদেশ বা পাকিস্তানের মতো দেশে প্রতিনিয়ত হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান বা আদিবাসীদের ওপর যে কাঠামোগত এবং সামাজিক নির্যাতন চলছে, তা নিয়ে এই ভিকটিম কার্ড খেলা গোষ্ঠীগুলো সম্পূর্ণ নিশ্চুপ থাকে।
তাহলে চূড়ান্ত প্রশ্নটি থেকেই যায়— আধুনিক বিশ্বে মুসলমানদের এই দুর্দশা ও নির্যাতনের জন্য আসলে কারা দায়ী? ইহুদিরা? হিন্দুরা? খ্রিস্টানরা? ইউরোপ-আমেরিকা? ইসরায়েল? নাকি কোনো অলীক মামদো ভূত?
তথ্য, প্রমাণ এবং ইতিহাসের বস্তুনিষ্ঠ বিচার বলে যে, এর জন্য বাইরের কোনো শক্তি দায়ী নয়। মুসলিমদের বর্তমান পতনের মূল কারণ তাদের নিজেদের মনস্তত্ত্ব এবং সমাজকাঠামো। খেলাফতের মতো একটি অগণতান্ত্রিক, সম্প্রসারণবাদী এবং সেকেলে শাসনব্যবস্থার ‘স্বপ্নদোষে’ ভুগে তারা আধুনিক রাষ্ট্রবিজ্ঞান, মানবাধিকার এবং বহুত্ববাদকে প্রত্যাখ্যান করেছে। তারা বুঝতে ব্যর্থ হয়েছে যে, মধ্যযুগের মতো তরবারি হাতে অন্য দেশ দখল করে ধর্ম চাপিয়ে দেওয়ার দিন চিরতরে শেষ হয়ে গেছে। ইউরোপ এবং পশ্চিমা বিশ্ব যখন জ্ঞান, বিজ্ঞান, প্রযুক্তি এবং মানবতাবাদী দর্শনে সর্বোচ্চ মনোযোগ দিয়ে নিজেদের সভ্যতার শিখরে নিয়ে গেছে, মুসলিম বিশ্বের একটি বড় অংশ তখন মাদ্রাসাগুলোতে বিজ্ঞান ও গণিতের বদলে পরকালের রোমান্টিক গল্প এবং ভিন্নমতের প্রতি ঘৃণার চাষাবাদ করেছে।
অনেকেই এই অলৌকিক আশায় বসে আছেন যে, ঈশ্বর বা আল্লাহ আকাশ থেকে কোনো কেরামতি করে মুসলিমদের আবারও বিশ্বের চালকের আসনে বসিয়ে দেবেন। এটি একটি চরম অবৈজ্ঞানিক এবং নিয়তিবাদী (Fatalistic) চিন্তাধারা। ইতিহাস প্রমাণ করে, অলৌকিক শক্তির আশায় বসে থাকা জাতিগুলো ক্রমাগত মার খেয়েছে এবং নিশ্চিহ্ন হয়েছে। মুসলিমদের নিজেদের ব্যর্থতার দায়ভার অন্যের ওপর চাপিয়ে ‘নির্যাতিত’ হওয়ার এই অভিনয় বন্ধ করতে হবে। যতদিন পর্যন্ত তারা এই আত্মপ্রবঞ্চনা এবং অন্ধবিশ্বাস থেকে বেরিয়ে এসে নিজেদের রাজনৈতিক, সামাজিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক কাঠামোর আমূল সংস্কার না করবে, ততদিন তারা নিজেদের সৃষ্ট এই নরক থেকেই মুক্তি পাবে না। সত্যনিষ্ঠ আত্ম-সমালোচনা এবং বিজ্ঞানমনস্ক শিক্ষাই হলো এই পতন থেকে উত্তরণের একমাত্র পথ।
বৈশ্বিক মনস্তত্ত্বের স্ববিরোধিতা ও রাজনৈতিক ইসলামের দ্বিচারিতা
মুসলিম বিশ্বের বুদ্ধিবৃত্তিক পতন এবং আত্মপ্রবঞ্চনার আলোচনাটি অসম্পূর্ণ থেকে যাবে, যদি না আমরা বৈশ্বিক পরিসরে মুসলিম জনগোষ্ঠীর একটি বড় অংশের রাজনৈতিক ও মনস্তাত্ত্বিক দ্বিচারিতা (Hypocrisy) বিশ্লেষণ করি। বর্তমান বিশ্বে, বিশেষ করে পশ্চিমা গণতান্ত্রিক দেশগুলোতে, রাজনৈতিক ইসলামের সমর্থকরা অত্যন্ত সুকৌশলে একটি দ্বৈত নীতি অবলম্বন করে চলেছে। এই দ্বৈত নীতির মূল কথা হলো— “যখন আমরা সংখ্যালঘু, তখন আমরা সেক্যুলারিজম ও মানবাধিকারের দাবিদার; আর যখন আমরা সংখ্যাগরিষ্ঠ, তখন আমরা শরিয়াহ এবং একক আধিপত্যের প্রবক্তা।” এই কাঠামোগত স্ববিরোধিতা শুধু তাত্ত্বিক নয়, বরং এটি সমসাময়িক সমাজতাত্ত্বিক গবেষণায় এবং বাস্তব ঘটনাপ্রবাহে বারবার প্রমাণিত হয়েছে।
যখন মুসলিমরা ইউরোপ, উত্তর আমেরিকা বা অস্ট্রেলিয়ার মতো অমুসলিম দেশগুলোতে সংখ্যালঘু হিসেবে বসবাস করে, তখন তারা অত্যন্ত সোচ্চারভাবে বহুসংস্কৃতিবাদ (Multiculturalism), ধর্মনিরপেক্ষতা (Secularism), এবং ধর্মীয় স্বাধীনতার (Freedom of Religion) কথা বলে। তারা পশ্চিমা লিবারেল মূল্যবোধ এবং মানবাধিকার সনদের দোহাই দিয়ে নিজেদের জন্য সর্বোচ্চ সুযোগ-সুবিধা, মসজিদ নির্মাণের অধিকার এবং নিজস্ব ধর্মীয় পোশাক পরার স্বাধীনতা আদায় করে নেয়। এ সময় তারা প্রচার করে যে, “ইসলাম একটি শান্তির ধর্ম” এবং এটি সকল ধর্মের সাথে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানে বিশ্বাসী। পশ্চিমা প্রগতিশীল এবং বামপন্থী গোষ্ঠীগুলোও অনেক সময় এই বয়ানের ফাঁদে পড়ে তাদের অবারিত সমর্থন দিয়ে থাকে।
কিন্তু মুদ্রার অপর পিঠটি অত্যন্ত ভয়ংকর এবং বৈপরীত্যে পরিপূর্ণ। যখনই এই একই গোষ্ঠী কোনো একটি নির্দিষ্ট অঞ্চলে বা দেশে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে অথবা রাজনৈতিকভাবে শক্তিশালী হয়, তখন তাদের সেই ‘বহুসংস্কৃতিবাদ’ এবং ‘সহাবস্থানের’ বুলি বাতাসে মিলিয়ে যায়। সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের পরপরই তারা পশ্চিমা ধর্মনিরপেক্ষতা এবং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধকে ‘কুফরি’ (অবিশ্বাসীদের মতবাদ) আখ্যা দিয়ে তা পদদলিত করে এবং রাষ্ট্রের ওপর একটি একক ও চরমপন্থী শরিয়াহ ব্যবস্থা (Sharia Law) চাপিয়ে দেওয়ার দাবি তোলে। তখন আর ভিন্ন ধর্মাবলম্বী, নাস্তিক, সংশয়বাদী বা এলজিবিটিকিউ (LGBTQ) সম্প্রদায়ের কোনো অধিকার বা অস্তিত্ব তারা স্বীকার করে না।
এই মনস্তাত্ত্বিক স্ববিরোধিতা বা দ্বিচারিতার প্রমাণ শুধু বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়; এটি বিভিন্ন আন্তর্জাতিক জরিপ এবং গবেষণায় অত্যন্ত স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে। ২০১৩ সালে ‘পিউ রিসার্চ সেন্টার’ (Pew Research Center)-এর করা “The World’s Muslims: Religion, Politics and Society” শীর্ষক এক বিস্তৃত গবেষণায় মুসলিম বিশ্বের মনস্তত্ত্বের এক চাঞ্চল্যকর চিত্র উন্মোচিত হয়। এই গবেষণাটি দেখায় যে, বিশ্বের অধিকাংশ মুসলিম-অধ্যুষিত দেশে বিপুল সংখ্যক মানুষ গণতান্ত্রিক আইনের পরিবর্তে শরিয়াহ আইনকে রাষ্ট্রের একমাত্র আইন হিসেবে দেখতে চায়।
পিউ রিসার্চের ওই একই জরিপে আরও কিছু ভয়াবহ তথ্য উঠে এসেছে, যা পশ্চিমা লিবারেল মূল্যবোধের সম্পূর্ণ পরিপন্থী: [43]
এই পরিসংখ্যানগুলো স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে যে, মানবাধিকার, বাকস্বাধীনতা এবং নারী অধিকারের মতো আধুনিক ধারণাগুলো মূলত তাদের কাছে একটি কৌশলগত হাতিয়ার মাত্র। ইউরোপ বা আমেরিকায় অভিবাসী হয়ে আসার সময় তারা যেই গণতান্ত্রিক স্বাধীনতা এবং সহনশীলতার সুযোগ নিয়ে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করে, সংখ্যায় ভারী হওয়ার পর তারা সেই একই কাঠামোটি ধ্বংস করার জন্য আক্রমণাত্মক জিহাদ বা রাজনৈতিক ইসলামের বিস্তারে লিপ্ত হয়।
এর বাস্তব উদাহরণ আমরা দেখতে পাই ইউরোপের বিভিন্ন শহরে গজিয়ে ওঠা ‘নো-গো জোন’ (No-go zones) বা শরিয়াহ নিয়ন্ত্রিত এলাকাগুলোতে। প্যারিস, ব্রাসেলস বা লন্ডনের কিছু নির্দিষ্ট এলাকায় উগ্রবাদী গোষ্ঠীগুলো নিজেদের মতো করে শরিয়াহ টহল দল (Sharia patrols) তৈরি করে এবং স্থানীয় অমুসলিম বা প্রগতিশীল মুসলিমদের ওপর নিজেদের রক্ষণশীল রীতিনীতি চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে [44]। তারা ইউরোপের মাটিতে দাঁড়িয়েই ইউরোপীয় সভ্যতার পতন কামনা করে এবং সেখানে ‘খেলাফতের পতাকা’ ওড়ানোর স্বপ্ন দেখে। অথচ, এই একই ব্যক্তিরা যদি সৌদি আরব বা ইরানের মতো কোনো ধর্মভিত্তিক রাষ্ট্রে গিয়ে বসবাস করত, তবে তারা পশ্চিমা বিশ্বের এই ন্যূনতম স্বাধীনতাটুকুও পেত না।
সুতরাং, এই রাজনৈতিক ও আদর্শিক দ্বিচারিতা মূলত একটি আধিপত্যকামী মনস্তত্ত্বের ফসল। ‘সংখ্যালঘু অবস্থায় শান্তির বুলি এবং সংখ্যাগরিষ্ঠ হলে শরিয়াহর দণ্ড’—এই দ্বৈত নীতি যতক্ষণ পর্যন্ত মুসলিম সমাজ আত্ম-সমালোচনার মাধ্যমে পরিত্যাগ না করবে, ততক্ষণ পর্যন্ত বিশ্ব শান্তি এবং বহুত্ববাদী সমাজের সাথে তাদের একটি স্বাভাবিক ও বিশ্বাসযোগ্য সম্পর্ক গড়ে ওঠা কার্যত অসম্ভব।
উপসংহারঃ ভিকটিম মনস্তত্ত্বের চরম মূল্য এবং বুদ্ধিবৃত্তিক জাগরণের অপরিহার্যতা
‘নির্যাতিত মুসলিম সম্প্রদায়’-এর যে মিথ যুগ যুগ ধরে সমাজে চর্চিত হয়ে আসছে, তা নিছক কোনো রাজনৈতিক ভুল বোঝাবুঝি নয়; বরং এটি একটি গভীর এবং আত্মঘাতী মনস্তাত্ত্বিক ব্যাধি। এই ভিকটিম মনস্তত্ত্ব সমাজকে একটি সান্ত্বনামূলক ঘেরাটোপে আটকে রাখে, যেখানে নিজেদের যাবতীয় অযোগ্যতা এবং কাঠামোগত ব্যর্থতার জন্য সব সময় একটি প্রস্তুত ‘বলির পাঁঠা’ (যেমন: পশ্চিমা বিশ্ব, ইহুদি বা ভিন্নধর্মী গোষ্ঠী) পাওয়া যায়। ফলস্বরূপ, আত্ম-সমালোচনা, প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার, আধুনিক রাষ্ট্র বিনির্মাণ এবং বৈজ্ঞানিক জাগরণের মতো অত্যন্ত জরুরি বিষয়গুলো চিরকাল উপেক্ষিত থেকে যায়।
ইতিহাসের নির্মোহ পাঠ এবং সমাজবিজ্ঞানের সূত্র আমাদের দেখায়, ষড়যন্ত্র তত্ত্ব দিয়ে কোনো জাতি দীর্ঘমেয়াদে টিকে থাকতে পারে না। যে সমাজ তাদের তরুণ প্রজন্মকে মহাকাশ গবেষণা, চিকিৎসা বিজ্ঞান কিংবা তথ্যপ্রযুক্তির বদলে পরকালের রোমান্টিসিজম এবং কাল্পনিক শত্রুর প্রতি ঘৃণার শিক্ষা দেয়, বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় সেই সমাজের পতন অনিবার্য। ইউরোপ বা পশ্চিমা বিশ্ব যখন রেনেসাঁ এবং এনলাইটেনমেন্টের (Enlightenment) মধ্য দিয়ে রাষ্ট্র ও সমাজ থেকে অন্ধবিশ্বাসকে দূরে সরিয়ে মানবিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক উৎকর্ষের দিকে এগিয়ে গেছে, মুসলিম বিশ্বের একটি বড় অংশ তখন বিপরীতমুখী যাত্রা করেছে। তারা আজও সপ্তম শতাব্দীর একটি সেকেলে ও অগণতান্ত্রিক রাজনৈতিক কাঠামোর (খেলাফত) মধ্যে একবিংশ শতাব্দীর জটিল আর্থ-সামাজিক সমস্যার সমাধান খুঁজছে, যা সমাজবিজ্ঞানের ভাষায় একটি চরম কালানুক্রমিক ভ্রান্তি (Anachronism)।
শক্তি, সম্পদ এবং জ্ঞান—এই তিনটি মাপকাঠিতেই আজ মুসলিম বিশ্ব চরমভাবে পিছিয়ে আছে। এবং এই পিছিয়ে পড়ার জন্য কোনো ভিনদেশী চক্রান্তকারী বা অস্ত্র ব্যবসায়ী দায়ী নয়। যখন একটি সমাজ নিজস্ব চিন্তাশীলতাকে বিসর্জন দিয়ে সাইয়েদ কুতুব বা মওদুদীর মতো চরমপন্থীদের রাজনৈতিক মতাদর্শকে ধর্ম হিসেবে গ্রহণ করে, তখন সেই সমাজ মূলত নিজেরাই নিজেদের ধ্বংসের বীজ বপন করে। লক্ষ লক্ষ মুসলিমের রক্তে আজ অন্য কোনো সম্প্রদায়ের হাত যতটা না রঞ্জিত, তার চেয়ে বহুগুণ বেশি রঞ্জিত স্বয়ং মুসলিমদেরই হাত।
পরিশেষে এটি অনুধাবন করা অপরিহার্য যে, বিশ্বের বুকে কোনো জাতিই কেবল অন্যের করুণা বা আকাশ থেকে নেমে আসা কোনো ঐশী সাহায্যে মাথা তুলে দাঁড়াতে পারেনি। মুসলিম সমাজকে এই অপ্রিয় এবং কঠিন সত্যের মুখোমুখি হতে হবে যে, তাদের প্রকৃত শত্রু কোনো ইহুদি, খ্রিস্টান, হিন্দু বা পশ্চিমা পরাশক্তি নয়; তাদের প্রধান শত্রু হলো তাদের নিজস্ব অজ্ঞতা, ধর্মান্ধতা, বিজ্ঞানবিমুখতা, এবং অভ্যন্তরীণ উপদলীয় সংঘাত। নিজেদের তৈরি করা এই সামাজিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক স্থবিরতার কারাগার ভাঙতে হলে, কাল্পনিক শত্রুর বিরুদ্ধে অন্তহীন অভিযোগের এই রাজনৈতিক সংস্কৃতি চিরতরে পরিত্যাগ করতে হবে। একটি যুক্তিনির্ভর, বিজ্ঞানমনস্ক, মানবাধিকারভিত্তিক এবং বহুত্ববাদী সমাজ গঠন ছাড়া এই ঐতিহাসিক পতন থেকে মুক্তির আর কোনো অলৌকিক পথ খোলা নেই।
তথ্যসূত্রঃ
- Pew Research Center, “Europe’s Growing Muslim Population”, 2017 ↩︎
- Amnesty International, “Syria’s Refugee Crisis in Numbers”, 2015 ↩︎
- UNDP, Human Development Reports ↩︎
- R. J. Rummel, “Statistics of Democide”, 1997 1 2
- SIPRI Yearbook, 1989 1 2
- Human Rights Watch, “Genocide in Iraq: The Anfal Campaign Against the Kurds”, 1993 ↩︎
- Syrian Observatory for Human Rights, 2021 1 2
- Robert Cribb, “The Indonesian Killings of 1965–1966”, 1990 ↩︎
- Lawrence Freedman, “A Choice of Enemies”, 2008 ↩︎
- Human Rights Watch, “Genocide in Iraq: The Anfal Campaign”, 1993 ↩︎
- UNDP Report on Yemen, 2021 ↩︎
- Luis Martinez, “The Algerian Civil War”, 2000 ↩︎
- UN Report on Darfur, 2008 ↩︎
- Watson Institute, “Costs of War Project”, 2021 ↩︎
- Human Rights Watch on Somalia ↩︎
- Human Rights Watch, “Pakistan: Pandering to Extremists”, 2011 ↩︎
- Amnesty International, “Pakistan: End Enforced Disappearances”, 2019 ↩︎
- UN Human Rights Council Report on ISIS, 2016 ↩︎
- Taj Hashmi, “Global Islam and Forgiveness”, 2010 ↩︎
- David Motadel, “Islam and Nazi Germany’s War”, 2014 ↩︎
- Ervand Abrahamian, “Tortured Confessions: Prisons and Public Recantations in Modern Iran”, 1999 ↩︎
- Seyyed Vali Reza Nasr, “The Vanguard of the Islamic Revolution: The Jama’at-i Islami of Pakistan”, 1994 ↩︎
- Richard P. Mitchell, “The Society of the Muslim Brothers”, 1993 ↩︎
- Sayyid Qutb, “Milestones”, 1964 ↩︎
- International Crimes Tribunal, Bangladesh, Verdict on Ghulam Azam, 2013 ↩︎
- Matthew Levitt, “Hamas: Politics, Charity, and Terrorism in the Service of Jihad”, 2006 ↩︎
- Zachary Abuza, “Militant Islam in Southeast Asia”, 2003 ↩︎
- International Crimes Tribunal, Bangladesh, Verdict on Delwar Hossain Sayeedi, 2013 ↩︎
- Thomas Hegghammer, “The Caravan: Abdallah Azzam and the Rise of Global Jihad”, 2020 ↩︎
- Sumantra Bose, “Kashmir: Roots of Conflict, Paths to Peace”, 2003 ↩︎
- Ali Riaz, “Islamist Militancy in Bangladesh: A Complex Web”, 2008 ↩︎
- Stephen Tankel, “Storming the World Stage: The Story of Lashkar-e-Taiba”, 2011 ↩︎
- Ahmed Rashid, “Taliban: Militant Islam, Oil and Fundamentalism in Central Asia”, 2000 ↩︎
- The Daily Star, “Zakir Naik’s speeches inspired Dhaka attackers”, 2016 1 2
- Joby Warrick, “Black Flags: The Rise of ISIS”, 2015 ↩︎
- Stephen Tankel, “Beyond FATA: Exploring the Punjabi Militant Threat to Pakistan”, 2008 ↩︎
- Alexander Meleagrou-Hitchens, “Incitement: Anwar al-Awlaki’s Western Jihad”, 2020 ↩︎
- Amnesty International, “Bangladesh: Stop the spate of targeted killings”, 2016 ↩︎
- Alexander Thurston, “Boko Haram: The History of an African Jihadist Movement”, 2017 ↩︎
- Christopher Anzalone, “The Resilience of al-Shabaab”, 2016 ↩︎
- Hamoodur Rahman Commission Report, Supplementary Report, 1974 ↩︎
- R. J. Rummel, “Death by Government”, 1994 ↩︎
- Pew Research Center, “The World’s Muslims: Religion, Politics and Society”, 2013 ↩︎
- Kenan Malik, “The Failure of Multiculturalism”, Foreign Affairs, 2015 ↩︎
