
Table of Contents
ভূমিকা
আল্লাহর অসীম করুণাময়তা ইসলামের একটি মৌলিক বিশ্বাস। মুসলমানরা মনে করেন, আল্লাহ্ তার সৃষ্টির প্রতি অসীম দয়াশীল এবং করুণাময়। তবে, যদি আল্লাহ সত্যিই অসীম করুণাময় হন, তাহলে প্রশ্ন উঠতে পারেঃ কেন তিনি দোজখের মতো একটি চিরস্থায়ী শাস্তির স্থান তৈরি করেছেন? একজন সর্বদয়ালু, সর্বক্ষমতাশালী স্রষ্টা কীভাবে তার সৃষ্টিকে চিরস্থায়ী শাস্তি দিতে পারেন? এই প্রশ্নটি দার্শনিক এবং ধর্মীয় চিন্তাবিদদের দীর্ঘদিন ধরে ভাবিয়ে তুলেছে। এই প্রবন্ধে আমরা আল্লাহর অসীম করুণাময়তা এবং দোজখের অস্তিত্বের মধ্যে একটি যৌক্তিক এবং দার্শনিক অসঙ্গতি অনুসন্ধান করব।
অসীম কাকে বলে?
“অসীম” শব্দটি বাংলা ভাষায় একটি বিশেষণ, যার অর্থ হলো “যার কোনো সীমা নেই” বা “সীমাবদ্ধ নয়।” শব্দটি মূলত সংস্কৃত “असीम” (asīma) শব্দ থেকে উদ্ভূত হয়েছে। এটি বাংলা ভাষায় এমন কিছুকে নির্দেশ করে যা অসীম, অশেষ, অন্তহীন, বা যার কোনো পরিসীমা বা সীমানা নেই। যৌক্তিকভাবে, যখনই কোন কোন কিছুর সীমানা নির্ধারিত হবে, সাথে সাথে সেটি আর অসীম থাকবে না। একইভাবে, যখনই আপনি এর শেষ নির্ধারন করতে পারবেন, এটি সাথে সাথেই অসীম থেকে খারিজ হয়ে যাবে। যেকোনভাবেই যদি কোন কিছুর সীমা নির্ধারিত হয়ে যায়, তাহলে সেটি আর অসীম থাকে না। সসীম হয়ে যায়।
অসীম অর্থের বিশদ ব্যাখ্যা
কিছু উদাহরণঃ
- ১। আমার কাছে অসীম সংখ্যক মার্বেল আছে। – এটি একটি ভুল তথ্য, বা যৌক্তিকভাবে এর কোন ভিত্তি নেই। কারণ মার্বেল অসীম সংখ্যক হতে পারে না। সংখ্যাটি বড় হওয়ার মানে অসীম নয়।
- ২। আমার কাছে অনেকগুলো মার্বেল আছে। – এটি একটি সঠিক তথ্য হতে পারে। কারণ কারো কাছে অনেক মার্বেল থাকা যৌক্তিকভাবে সম্ভব।
অসীম করুণার সংজ্ঞা
“অসীম করুণা” বলতে বোঝায় এমন একটি গুণ, যার কোনো সীমা বা পরিসীমা নেই। এটি একটি অন্তহীন গুণ, যা কোনো শর্ত বা নির্দিষ্ট পরিস্থিতির দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয় না। সহজভাবে বলতে গেলে, অসীম করুণা মানে এমন একটি গুণ, যেখানে কোনো অবস্থাতেই করুণার পরিসমাপ্তি ঘটে না। বা আমরা কোনভাবেই তার সীমা নির্ধারণ করতে সক্ষম হবো না। অথবা বলা যায়, তার কোন পরিমাণ হয় না, অন্তহীন। কোন একটি পরিস্থিতিতে যদি তার সীমানা নির্ধারণ সম্ভব হয়, সাথে সাথেই সেটি সসীম হয়ে যায়। আল্লাহর করুণার ক্ষেত্রেও একই কথা সমভাবে প্রযোজ্য। যদি আমরা কোন একটি সীমা নির্ধারণ করতে পারি, সাথে সাথেই সেটি সসীম হয়ে যায়। অর্থাৎ যৌক্তিকভাবে, আল্লাহর অসীম করুণা সমস্ত সৃষ্টির প্রতি সমানভাবে প্রযোজ্য হতে হবে, পাপী কিংবা সৎ মানুষ নির্বিশেষে। কোন একটি ক্ষেত্রে যদি করুণার সীমা নির্ধারিত হয়ে যায়, সাথে সাথেই তা সসীম হয়ে যায়। অর্থাৎ যৌক্তিকভাবে অসীম দয়ালু আল্লাহর ভালো বা খারাপ যেকোনো সৃষ্টির প্রতি সমানভাবে অসীম করুণাময় হতে হবে, কোন একটি পয়েন্টে তা থেমে গেলেই, যৌক্তিকভাবে তিনি সসীম করুণাময় হয়ে যাবেন। ।
দোজখের ধারণা এবং করুণার সীমাবদ্ধতা
ইসলামে, দোজখকে এমন একটি স্থান হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে, যেখানে পাপী এবং অবিশ্বাসীরা তাদের পাপের শাস্তি ভোগ করবে। এই বিষয়ে অসংখ্য কোরআনের আয়াত এবং হাদিসের বর্ণনা রয়েছে, যেগুলো অন্যান্য প্রবন্ধে পাবেন। এটি একটি স্থায়ী শাস্তির স্থান, যেখানে শাস্তি ভোগ করা অসহনীয় এবং অবিরাম। যা অনন্তকাল চলতে থাকবে। এখানে প্রশ্ন আসে: যদি আল্লাহর করুণা অসীম হয়, তাহলে কেন দোজখের অস্তিত্ব রয়েছে? এর মানে কি এই নয় যে, আল্লাহর করুণা আসলে সীমাবদ্ধ? যদি তিনি করুণাময় হন, তবে তার সৃষ্টির প্রতি চিরস্থায়ী শাস্তি আরোপ করা কি করুণার বিপরীত নয়? নীতিগতভাবে কোন শাস্তি বা কোন পুরষ্কারই কখনো “অসীম” হতে পারে না। একটি সীমাবদ্ধ জীবনে সীমিত সময়ের জন্য বিশ্বাস স্থাপন করে পরকালে অসীম পুরস্কার পাওয়া কিংবা অসীম শাস্তি ভোগ করা যৌক্তিকভাবে একটি অসামঞ্জস্যপূর্ণ ধারণা। এতে পরিমাপের তত্ত্ব (Theory of Measure) এবং ন্যায়বিচারের নীতিমালা লঙ্ঘিত হয়। কারণ, একটি সীমিত ক্রিয়ার জন্য অসীম পরিমাণ শাস্তি বা পুরস্কার দেওয়া কোনোমতেই ন্যায়সঙ্গত হতে পারে না। ন্যায়বিচারের সাধারণ নিয়ম অনুসারে, অপরাধ বা কৃতিত্বের মাত্রা অনুযায়ী শাস্তি বা পুরস্কার দেওয়া উচিত। যেখানে সেই মাত্রাটি থাকে না, শাস্তি বা পুরষ্কার অসীম হয়ে যায়, সেখানে ন্যায় বিচার থাকতে পারে না।
দার্শনিক ও যৌক্তিক বিশ্লেষণ
দার্শনিকভাবে, অসীম করুণা এবং শাস্তির ধারণার মধ্যে একটি মৌলিক বিরোধ বিদ্যমান। নিচের কয়েকটি যুক্তি এই বিরোধটিকে স্পষ্ট করে:
প্রতিরোধক যুক্তি এবং সম্ভাব্য ব্যাখ্যা
কিছু ধর্মতাত্ত্বিক এবং দার্শনিকরা যুক্তি দিয়েছেন যে, দোজখের শাস্তি প্রকৃতপক্ষে আল্লাহর করুণারই আরেকটি রূপ। তাদের মতে, পাপীদের শাস্তি দেওয়া এবং তাদের শিক্ষা দেওয়া হচ্ছে, যাতে তারা নিজেদের ভুল বুঝতে পারে এবং চিরস্থায়ী শাস্তি ভোগ না করে। তবে, এই যুক্তি অসীম করুণার ধারণার সাথে মানানসই নয়, কারণ দোজখের শাস্তি অনন্তকাল ধরে চলবে বলে ধর্মগ্রন্থগুলো দাবী করে।
হাদিসের ভাষ্যঃ পরিমাপযোগ্য করুণা
কোনকিছু যখন পরিমাপযোগ্য হয়ে যায়, তখন আর তা অসীম থাকে না। এই হাদিসে বর্ণিত আছে, আল্লাহর রহমত বা দয়া বা করুণা আল্লাহ ৯৯ ভাগ রেখে দিয়েছেন, একভাগ দিয়েছেন। অর্থাৎ এই হাদিস অনুসারেই, আল্লাহর রহমত পরিমাপযোগ্য।
হাদীস সম্ভার
৪/ আন্তরিক কর্মাবলী
পরিচ্ছেদঃ আল্লাহর দয়ার আশা রাখার গুরুত্ব
(৪৫৩) উক্ত সাহাবী (রাঃ) থেকেই বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বলতে শুনেছি, আল্লাহ রহমতকে একশ ভাগ করেছেন। তার মধ্যে নিরানব্বই ভাগ তিনি নিজের কাছে রেখে দিয়েছেন। আর পৃথিবীতে একভাগ অবতীর্ণ করেছেন। ঐ এক ভাগের কারণেই সৃষ্টজগৎ একে অন্যের উপর দয়া করে। এমনকি জন্তু তার বাচ্চার উপর থেকে পা তুলে নেয় এই ভয়ে যে, সে ব্যথা পাবে।
অন্য এক বর্ণনায় আছে, নিশ্চয় আল্লাহর একশটি রহমত আছে, যার মধ্য হতে একটি মাত্র রহমত তিনি মানব-দানব, পশু ও কীটপতঙ্গের মধ্যে অবতীর্ণ করেছেন। ঐ এক ভাগের কারণেই (সৃষ্টজীব) একে অপরকে মায়া করে, তার কারণেই একে অন্যকে দয়া করে এবং তার কারণেই হিংস্র জন্তুরা তাদের সন্তানকে মায়া করে থাকে। বাকী নিরানব্বইটি আল্লাহ পরকালের জন্য রেখে দিয়েছেন, যার দ্বারা তিনি কিয়ামতের দিন আপন বান্দাদের উপর রহম করবেন।
এ হাদীসটিকে ইমাম মুসলিমও সালমান ফারেসী (রাঃ) থেকে বর্ণনা করেছেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, নিশ্চয় আল্লাহ তা’আলার একশটি রহমত আছে, যার মধ্য হতে মাত্র একটির কারণে সৃষ্টিজগৎ একে অন্যের প্রতি দয়া প্রদর্শন করে। আর নিরানব্বইটি (রহমত) কিয়ামতের দিনের জন্য রয়েছে।
অন্য এক বর্ণনায় আছে, আল্লাহ তা’আলা আসমান যমীন সৃষ্টি করার দিন একশটি রহমত সৃষ্টি করলেন। প্রতিটি রহমত আসমান ও যমীনের মধ্যস্থল পরিপূর্ণ (বিশাল)। অতঃপর তিনি তার মধ্য হতে একটি রহমত পৃথিবীতে অবতীর্ণ করলেন। ঐ একটির কারণেই মা তার সন্তানকে মায়া করে এবং হিংস্র প্রাণী ও পাখীরা একে অন্যের উপর দয়া করে থাকে। অতঃপর যখন কিয়ামতের দিন হবে, তখন আল্লাহ এই রহমত দ্বারা সংখ্যা পূর্ণ করবেন।
(বুখারী ৬০০০, মুসলিম ৭১৪৮-৭১৫১)
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আবূ হুরায়রা (রাঃ)
এই হাদিসটির মূল ভিত্তি হলো রহমত বা দয়ার একটি নির্দিষ্ট গাণিতিক বণ্টন, যেখানে সমগ্র করুণাকে ১০০টি পৃথক এককে ভাগ করা হয়েছে। যখন কোনো গুণাবলীকে এভাবে ১:৯৯ অনুপাতে বিভক্ত করা হয়, তখন যৌক্তিকভাবেই সেটি একটি সসীম বা পরিমাপযোগ্য কাঠামোর মধ্যে চলে আসে, কারণ প্রকৃত অসীমতাকে নির্দিষ্ট সংখ্যায় ভাগ করে তার অংশবিশেষকে আলাদা করা গাণিতিকভাবে অসম্ভব। হাদিস অনুযায়ী, আল্লাহ এই রহমতের মাত্র এক ভাগ পৃথিবীতে অবতীর্ণ করেছেন যা সমস্ত সৃষ্টিজগতের যাবতীয় মায়া ও মমতার উৎস, আর বাকি নিরানব্বই ভাগ তিনি নিজের কাছেই রেখে দিয়েছেন।এই পরিমাণগত বিভাজন নির্দেশ করে যে, রহমত এখানে একটি বণ্টনযোগ্য ভাণ্ডার বা রিসোর্স হিসেবে উপস্থাপিত হয়েছে, যা অসীমতার চিরাচরিত দার্শনিক সংজ্ঞার সাথে এক ধরনের তাত্ত্বিক বৈপরীত্য তৈরি করে।
পৃথিবীতে বিদ্যমান সেই এক শতাংশ রহমতের কারণেই মা তার সন্তানের প্রতি মমতা দেখায় এবং হিংস্র পশুরাও তাদের শাবকদের রক্ষা করার তাগিদ অনুভব করে। জগতের সমস্ত পারস্পরিক দয়া ও সহমর্মিতা এই ক্ষুদ্র অংশেরই বহিঃপ্রকাশ, যা থেকে বোঝা যায় যে মূল ভাণ্ডারের বিশালতা কতখানি হতে পারে। পরকালের জন্য সংরক্ষিত নিরানব্বই ভাগ রহমত মূলত কিয়ামতের দিনের ভয়াবহতা ও বিচারের কঠোরতার বিপরীতে একটি বিশাল আশার সঞ্চার করে, যেখানে বিচার দিবসে এই বিশাল অংশটি বান্দাদের উপর বর্ষিত হবে। অন্য একটি বর্ণনামতে, কিয়ামতের দিন সেই দুনিয়াবি এক ভাগকেও পরকালীন অংশের সাথে যুক্ত করে পুনরায় ১০০ পূর্ণ করা হবে, যা করুণার এই চক্রটিকে একটি গাণিতিক পূর্ণতায় নিয়ে যায় এবং প্রমাণ করে যে এখানে রহমতকে একটি নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে আবদ্ধ ও বণ্টনযোগ্য গুণ হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে।
উপসংহার
উপরের বিশ্লেষণ থেকে স্পষ্ট হয় যে, আল্লাহর অসীম করুণাময়তা, করুণার পরিমাপযোগ্যতা এবং দোজখের অনন্ত শাস্তির বিশ্বাসের মধ্যে একটি মৌলিক দ্বন্দ্ব রয়েছে। যদি করুণা সত্যিই অসীম হয়, তবে তার কোনো সীমা থাকা উচিত নয় এবং দোজখের মতো অনন্ত শাস্তির স্থান থাকা উচিত নয়। তবে, যদি দোজখের অস্তিত্ব থাকে, তাহলে করুণার অসীমতার দাবী আর টেকে না। এই কারণে, দার্শনিকভাবে এবং যৌক্তিকভাবে আল্লাহর “অসীম করুণাময়” হওয়া একটি অসামঞ্জস্যপূর্ণ এবং যৌক্তিকভাবে অবাস্তব ধারণা।
About This Article
Genre: Semi-Academic Skeptical Analysis
Epistemic Position: Scientific Skepticism
This article belongs to the skeptical-rationalist analytical tradition of Shongshoy.com.
It applies historical criticism, empirical reasoning, logical analysis, and scientific skepticism in evaluating religious, philosophical, and historical claims.
The objective is not theological neutrality, but evidence-based critical examination and adversarial analysis of ideas and narratives.
This article should primarily be evaluated through: source quality, evidentiary strength, logical rigor, and factual consistency.

পৃথিবীর প্রত্যেক মানুষ যদি এইভাবে চিন্তা করে ! তাহলেই পৃথিবী হবে সুন্দর বাসযোগ্য ।