লা ইকরাহা ফিদ-দীনঃ ইসলামে কি আসলেই কোন জবরদস্তি নেই?

Table of Contents

ভূমিকা

সাধারণ মুসলিমদের মধ্যে একটি বহুল প্রচলিত ধারণা হলো “দ্বীনে কোনো জোর নেই”, যা সূরা বাকারার ২৫৬ নম্বর আয়াতে উল্লেখ করা হয়েছে [1]। এই আয়াতটিকে প্রায়ই ইসলামের সহনশীলতার বিজ্ঞাপন হিসেবে ব্যবহার করা হয়। ইউরোপ আমেরিকা বা সভ্য দেশগুলোতে ইসলাম প্রচারের ক্ষেত্রে এই আয়াতটি বহুল ব্যবহৃত। তবে কোরআন, নবীর সুন্নাহ ও হাদিস, ইসলামি আইনশাস্ত্র (ফিকহ) এবং নির্ভরযোগ্য তাফসীর গ্রন্থগুলো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ব্যক্তি-স্বাধীনতার এই দাবিটি মূলত দুটি প্রধান স্তরে প্রাতিষ্ঠানিক জবরদস্তির মাধ্যমে ভুল প্রমাণিত হয়। অর্থাৎ ইসলামের প্রাথমিক যুগে সংখ্যলঘু অবস্থায় মুসলিমদের জন্য এই আয়াত কার্যকর হলেও, সার্বজনীনভাবে এটি ইসলামের নীতি বা পন্থা নয়। সংখ্যাগুরু হলেই ইসলাম জবরদস্তির প্রকাশ্যে ঘোষণা দেয়।

ইসলামি ইতিহাসের প্রাথমিক যুগে যখন মুসলিমরা দুর্বল ছিল, তখন সহনশীলতার আয়াত নাজিল হলেও পরবর্তীতে তা রহিত বা ‘মানসুখ’ হয়ে যায়। প্রখ্যাত তাফসীরকারদের মতে, সূরা তাওবার ৫ এবং ৭৩ নম্বর আয়াত (তরবারির আয়াত) নাজিল হওয়ার পর অমুসলিমদের ওপর ইসলাম চাপিয়ে দেওয়ার বিষয়টি বৈধতা পায়। বিশেষ করে আরবের মুশরিক বা মূর্তিপূজারীদের জন্য কেবল দুটি পথ খোলা ছিল: হয় ইসলাম গ্রহণ, নতুবা মৃত্যু ( সূরা তওবা, আয়াত: ৫ )। অন্যদিকে, ইহুদি ও খ্রিস্টানদের (আহলে কিতাব) জন্য জিজিয়া কর প্রদানের মাধ্যমে অবমাননাকর ও দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক হিসেবে বেঁচে থাকার শর্ত জুড়ে দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ, ইসলাম গ্রহণ না করা পর্যন্ত তাদের ওপর সামরিক ও অর্থনৈতিক চাপ প্রয়োগের মাধ্যমে পরোক্ষ বা প্রত্যক্ষভাবে জবরদস্তি করা হয়।

আবার অন্যদিকে ইসলামের গণ্ডিতে প্রবেশ করার পর কোনো ব্যক্তির আর নিজস্ব বিবেক বা পছন্দের অধিকার থাকে না। যদি কোনো মুসলিম তার ধর্ম পরিবর্তন করতে চায় বা ইসলাম ত্যাগ করতে চায়, তবে তার শাস্তি হিসেবে মৃত্যুদণ্ড নির্ধারণ করা হয়েছে। এটি আধুনিক মানবাধিকারের দৃষ্টিতে ব্যক্তির আত্মপরিচয় ও বিশ্বাসের ওপর চূড়ান্ত জবরদস্তি। কেবল ধর্মত্যাগই নয়, বরং ব্যক্তিগত ইবাদত পালনের ক্ষেত্রেও ইসলাম বলপ্রয়োগকে সমর্থন করে; যেমন শিশুদের ১০ বছর বয়স হওয়ার পর নামাজ না পড়লে প্রহার করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সালাফিদের একটি কট্টর অংশ মনে করেন, বেনামাজিকে মুরতাদ আখ্যাত দিয়ে হত্যা করাও ইসলামে বৈধ। কিছু প্রখ্যাত আলেম এটিও মত দিয়েছেন যে, সহিহ হাদিসকে সহিহ জানার পরেও সত্য হিসেবে স্বীকার না করলে তাকেও হত্যা করা যায়। এমনকি প্রথম খলিফা আবু বকরের আমলে যারা কেবল যাকাত দিতে অস্বীকার করেছিল, তাদের ‘মুরতাদ’ বা বিদ্রোহী আখ্যা দিয়ে তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ পরিচালনা ও গণহারে হত্যা করা হয়েছিল, যা প্রমাণ করে যে ইসলামের ভেতরে কোনো ব্যক্তি-স্বাধীনতার অবকাশ নেই; বরং এটি একটি বাধ্যতামূলক আনুগত্যের ব্যবস্থা।

১. ইসলাম গ্রহণের পূর্বে জবরদস্তি (অমুসলিমদের জন্য)

মদিনার যুগে অবতীর্ণ ‘তরবারির আয়াত’ দ্বারা সহনশীলতার বিধানগুলো রহিত করা হয়েছে। অমুসলিমদের জন্য মূলত কোনো নিরপেক্ষ স্বাধীনতা রাখা হয়নি:

  • মূর্তিপূজারী/মুশরিক: হয় ইসলাম গ্রহণ, নতুবা মৃত্যু।
  • আহলে কিতাব (ইহুদি-খ্রিস্টান): ইসলাম গ্রহণ, নতুবা অবমাননাকর জিজিয়া কর প্রদান করে বশ্যতা স্বীকার করা, অন্যথায় যুদ্ধ।
২. ইসলাম গ্রহণের পরে জবরদস্তি (মুসলিমদের জন্য)

একবার ইসলাম গ্রহণ করার পর সেখান থেকে বের হওয়া বা নিজস্ব বিশ্বাস বজায় রাখার পথ আইনগতভাবে বন্ধ:

  • ধর্মত্যাগ (মুরতাদ): ইসলাম ত্যাগ করলে তার চূড়ান্ত শাস্তি মৃত্যুদণ্ড।
  • বাধ্যতামূলক পালন: নামাজ বা যাকাত অস্বীকার করলে প্রহার বা রাষ্ট্রীয়ভাবে সামরিক শক্তি প্রয়োগের বিধান।
  • ব্যক্তি-স্বাধীনতা: বিশ্বাস ত্যাগের কোনো আইনি অধিকার নেই, যা আধুনিক মানবাধিকারের স্পষ্ট লঙ্ঘন।
জবরদস্তি

আধুনিক মানবাধিকার, নৈতিকতা ও সেক্যুলার সমাজের উদার দৃষ্টিভঙ্গি

আধুনিক বিশ্বের নৈতিক মানদণ্ড ও সেক্যুলার আইনি কাঠামোর সাথে ইসলামের শাস্ত্রীয় জবরদস্তিমূলক বিধানগুলোর পার্থক্য অত্যন্ত প্রকট। সমকালীন মানবাধিকারের মূল ভিত্তি হলো ব্যক্তির চিন্তা ও শরীরের ওপর তার স্বায়ত্তশাসন এবং বিবেকের স্বাধীনতা, যা কোনো ধর্মীয় বা রাষ্ট্রীয় আধিপত্যের অধীন নয়। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সনদের ১৮ নম্বর অনুচ্ছেদে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে যে, প্রত্যেক মানুষের নিজের ইচ্ছা অনুযায়ী ধর্ম গ্রহণ, পালন, বিশ্বাস কিংবা অবিশ্বাস এমনকি যেকোন সময়ে ধর্ম পরিবর্তনের পূর্ণ অধিকার রয়েছে [2]। সেক্যুলার সমাজে একজন নাগরিকের মর্যাদা তার ধর্মীয় পরিচয়ের ওপর নির্ভর করে না, বরং রাষ্ট্র তাকে একজন ‘মানুষ’ হিসেবে সমান অধিকার প্রদান করে। এর বিপরীতে, ইসলামিক শাস্ত্রীয় বিধানে ‘জিম্মী’ বা ‘মুরতাদ’ এর মতো যে বিভাজনগুলো রয়েছে, তা আধুনিক নাগরিক সমতার ধারণাকে সরাসরি অস্বীকার করে এবং সমাজকে ধর্মীয় শ্রেষ্ঠত্ববাদের ভিত্তিতে বিভক্ত করে ফেলে।

নৈতিকতার বিচারে, কোনো বিশ্বাস যদি তলোয়ারের ভয় বা আইনি শাস্তির মাধ্যমে চাপিয়ে দেওয়া হয়, তবে তা আর ‘বিশ্বাস’ থাকে না, বরং তা একটি ‘রাজনৈতিক আনুগত্য’ বা ‘দাসত্বে’ পরিণত হয়। একজন মুসলিমকে যদি জানানো হয় যে, ইসলাম ত্যাগ করলেই মৃত্যুদণ্ড, সেটি তার স্বাধীন মত প্রকাশ, বেছে নেয়ার স্বাধীনতা এবং চিন্তার ওপর জড় খাটানো, একধরণের ভয়ের সংকৃতির মধ্যে তার বিবেক বুদ্ধিকে দমন করে রাখা। সেক্যুলার ও উদারপন্থী সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি হলো, সত্য অনুসন্ধানের পথ উন্মুক্ত থাকতে হবে এবং কোনো আদর্শই সমালোচনার উর্ধ্বে নয়। কিন্তু ইসলামিক বিধানে যখন মুরতাদ বা ধর্মত্যাগীকে ‘রাষ্ট্রদ্রোহী’ হিসেবে গণ্য করে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়, তখন সেখানে ব্যক্তিগত বিবেককে রুদ্ধ করে দেওয়া হয়। আধুনিক নীতিশাস্ত্র অনুযায়ী, শিশুদের ওপর ধর্মীয় কড়াকড়ি বা শারীরিক নিগ্রহ করা তাদের মানসিক বিকাশের পরিপন্থী এবং এটি মৌলিক শিশু অধিকারের লঙ্ঘন [3]। অর্থাৎ, একটি সভ্য ও মানবিক সমাজ তখনই গড়ে ওঠে যখন সেখানে ভিন্নমতের জন্য জীবনের ঝুঁকি থাকে না এবং ধর্মকে ব্যক্তির একান্ত ব্যক্তিগত পছন্দ হিসেবে দেখা হয়, যা কোনোভাবেই রাষ্ট্রীয় বা সামাজিক জবরদস্তির হাতিয়ার হতে পারে না।


দ্বীনে কোনো জোর নেই?

ইসলাম ধর্মের পবিত্র ধর্মীয় গ্রন্থ কোরআনে বলা হয়েছে, [4]

দীনের মধ্যে জবরদস্তির অবকাশ নেই, নিশ্চয় হিদায়াত গোমরাহী হতে সুস্পষ্ট হয়ে গেছে। কাজেই যে ব্যক্তি মিথ্যে মা’বুদদেরকে (তাগুতকে) অমান্য করল এবং আল্লাহর প্রতি ঈমান আনল, নিশ্চয়ই সে দৃঢ়তর রজ্জু ধারণ করল যা ছিন্ন হওয়ার নয়। আল্লাহ সর্বশ্রোতা এবং সর্বজ্ঞাতা।
— Taisirul Quran
দীনের ব্যাপারে কোন জবরদস্তি কিংবা বাধ্যবাধকতা নেই। নিশ্চয়ই ভ্রান্তি হতে সুপথ প্রকাশিত হয়েছে। অতএব যে তাগুতকে অবিশ্বাস করে এবং আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করে সে দৃঢ়তর রজ্জুকে আঁকড়ে ধরলো যা কখনও ছিন্ন হবার নয় এবং আল্লাহ শ্রবণকারী, মহাজ্ঞানী।
— Sheikh Mujibur Rahman
দীন গ্রহণের ব্যাপারে কোন জবরদস্তি নেই। নিশ্চয় হিদায়াত স্পষ্ট হয়েছে ভ্রষ্টতা থেকে। অতএব, যে ব্যক্তি তাগূতকে অস্বীকার করে এবং আল্লাহর প্রতি ঈমান আনে, অবশ্যই সে মজবুত রশি আঁকড়ে ধরে, যা ছিন্ন হবার নয়। আর আল্লাহ সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞ।
— Rawai Al-bayan
দীন গ্রহণের ব্যাপারে কোনো জোর-জবরদস্তি নেই [১]; সত্য পথ সুস্পষ্ট হয়েছে ভ্রান্ত পথ থেকে। অতএব, যে তাগূতকে [১] অস্বীকার করবে [৩] ও আল্লাহ্‌র উপর ঈমান আনবে সে এমন এক দৃঢ়তর রজ্জু ধারন করল যা কখনো ভাঙ্গবে না [৪]। আর আল্লাহ্‌ সর্বশ্রোতা ও সর্বজ্ঞানী।
— Dr. Abu Bakr Muhammad Zakaria

“দ্বীনে কোনো জোর নেই” এই আয়াতের প্রকৃত ব্যাখ্যা পাওয়া যায় ইসলামিক তাফসীর গ্রন্থগুলোতে। এখানে মূলত বোঝানো হয়েছে যে, এই আয়াতটি ইসলামের প্রারম্ভিক যুগে নাজিল হওয়া একটি বিধান যখন মুসলিমগণ শক্তিহীন ছিল। যা পরবর্তীতে তরবারির আয়াত বা সূরা তওবার মাধ্যমে মুশরিকদের জন্য মানসুখ হয়ে যায়। সেই সাথে শুরুর দিকে নাজিল হওয়া সকল শান্তিপূর্ণ আয়াতই আসলে মানসুখ হয়ে গেছে, সামান্য কিছু ক্ষেত্রবিশেষ ছাড়া। ইসলামের বিধান অনুসারে, ইসলাম গ্রহণের পর ধর্মত্যাগের কোনো সুযোগ নেই এবং আহলে কিতাব অর্থাৎ ইহুদি ও খ্রিস্টানদের জন্য কেবলমাত্র ইসলাম গ্রহণ, যুদ্ধের সম্মুখীন হওয়া, অথবা জিযিয়া কর প্রদান করা ছাড়া অন্য কোনো বিকল্প নেই। অন্যদিকে মুশরিক বা মুর্তি পূজারীদের জন্য শুধু দুইটি রাস্তা খোলা, হয় ইসলাম কবুল করতে হবে নতুবা তাদের হত্যা করা হবে। এটি কোনো ধরনের শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান নয়; বরং অমুসলিমদের ইসলামিক রাষ্ট্রের অধীনে তাদের ধর্মীয় ও সামাজিক স্বাধীনতা সংকুচিত করা হয়। ইসলামের এই বিধান আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সনদের “ধর্মের স্বাধীনতা”“মতপ্রকাশের স্বাধীনতা”-র স্পষ্ট লঙ্ঘন, যা প্রতিটি মানুষের জন্মগত অধিকার।

অমুসলিমদের জন্য নির্ধারিত বিকল্পসমূহ (ইসলামি বিধান)
আহলে কিতাব (ইহুদি ও খ্রিস্টান)
১. ইসলাম গ্রহণ: মুসলিম হয়ে যাওয়া।
OR
২. জিজিয়া কর: বশ্যতা স্বীকার করে কর প্রদান।
OR
৩. যুদ্ধ/মৃত্যু: সামরিক সম্মুখীন হওয়া।
মুশরিক বা মূর্তিপূজারী
১. ইসলাম গ্রহণ: একমাত্র পথ হিসেবে গ্রহণ।
OR
২. হত্যা/মৃত্যু: ইসলাম গ্রহণ না করলে একমাত্র পরিণতি।

একইসাথে, এই আয়াতের ব্যাখ্যাতে সবচাইতে প্রখ্যাত ইসলামিক আলেমগণ কী বলেন, তা আসুন তাদের একজনার মুখ থেকেই শুনি,

এই আয়াতের প্রেক্ষিতে ইসলামিস্টরা প্রায়ই সহাবস্থানের সপক্ষে কথা বললেও, তাদের কার্যকলাপ এবং ইসলামিক ইতিহাস অন্যকিছু প্রমাণ করে। মক্কা বিজয়ের পর, ইসলামের প্রসারের জন্য বহু যুদ্ধ পরিচালিত হয়, যেখানে অমুসলিম মূর্তিপুজারীদের বেঁচে থাকার জন্য ইসলাম গ্রহণ করা ছাড়া আর কোনো বিকল্প ছিল না। সেগুলো জোরপূর্বক ধর্মান্তরের স্পষ্ট উদাহরণ। নবীর একটি বিখ্যাত হাদিসে বলা হয়েছে যে, তিনি আদিষ্ট হয়েছেন যতক্ষণ পর্যন্ত মানুষ “আল্লাহ ছাড়া আর কোনো উপাস্য নেই” এই স্বীকৃতি না দেয়, ততক্ষণ পর্যন্ত তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার। এটি স্পষ্টতই নির্দেশ করে, ইসলামে সহনশীলতার স্থান নেই; বরং এটি ইসলাম প্রতিষ্ঠার জন্য অন্যান্য ধর্ম ও মতবাদকে উৎখাত করার আহ্বান জানায়।

এই সমস্ত বিধানগুলো ইসলামের সহিষ্ণুতা এবং ধর্মীয় স্বাধীনতার দাবীকে বাস্তবে একেবারেই খণ্ডন করে। ইসলামিক আইন এবং বিধান অনুযায়ী, অমুসলিমদের অধিকার সীমাবদ্ধ এবং তাদেরকে দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক হিসেবে গণ্য করা হয়, যা মানবাধিকার লঙ্ঘনের প্রতীক। তাই, “দ্বীনে কোনো জোর নেই” এই আয়াতটি সহনশীলতার প্রতীক হিসেবে ব্যবহার করা হলেও, প্রকৃতপক্ষে ইসলাম তার শাস্ত্রীয় বিধান এবং বাস্তবিক কার্যকলাপের মাধ্যমে এটি পুরোপুরি অস্বীকার করে। এই আয়াতগুলোর তাফসীরগুলো থেকে আমরা এবারে দেখবো, এই আয়াতগুলোর প্রেক্ষাপট শানে নুযূল আসলে কী।


তাফসীরে ইবনে কাসীরঃ জবরদস্তির চূড়ান্ত রূপ

ইবনে কাসীর এই আয়াতের ব্যাখ্যায় দুটি প্রধান মত তুলে ধরেছেন। প্রথমত, এটি কেবল সেই সব আহলে কিতাবদের জন্য যারা অবমাননাকর জিযিয়া দিয়ে বশ্যতা স্বীকার করে। দ্বিতীয় এবং অধিকতর কঠোর মতটি হলো, এই আয়াতটি পরবর্তী ‘জিহাদের আয়াত’ বা ‘তরবারির আয়াত’ দ্বারা রহিত (মানসুখ) হয়ে গেছে। এখন সকল মানুষকে ইসলাম গ্রহণে বাধ্য করা বা বশ্যতা স্বীকারে বাধ্য করা মুসলমানদের ওপর ওয়াজিব। যারা এটি অস্বীকার করবে, তাদের বিরুদ্ধে সশস্ত্র যুদ্ধ বা জিহাদ পরিচালনা করাই হলো শরীয়তের প্রকৃত উদ্দেশ্য।

সহনশীলতার বিলুপ্তি

ইবনে কাসীর পরিষ্কার করেছেন যে, “দ্বীনে জোর নেই” আয়াতটি চিরস্থায়ী কোনো নীতি নয়। জিহাদের বিধান আসার পর এটি তার কার্যকারিতা হারিয়েছে, যা ইসলামের প্রাথমিক যুগের তথাকথিত সহনশীলতাকে একটি সাময়িক কৌশল হিসেবে প্রমাণ করে।

জবরদস্তির বৈধতা

এখানে স্পষ্ট করা হয়েছে যে, ইসলাম গ্রহণ না করলে বা জিযিয়া না দিলে যুদ্ধ করা হবে। অর্থাৎ, জীবনের ঝুঁকি বা আর্থিক দণ্ড (জিযিয়া) সামনে রেখে কাউকে ধর্ম মানতে বাধ্য করা সরাসরি জবরদস্তিরই নামান্তর।

আগ্রাসী মনোভাব

আশেপাশের কাফেরদের ওপর আক্রমণ করার নির্দেশ দিয়ে এখানে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের ধারণাকে পুরোপুরি নাকচ করা হয়েছে [5]

আলিমগণের বৃহৎ একটি দল বলেন, এই আয়াতটি সেই সকল কিতাবীদের বেলায় প্রযোজ্য যাহারা তাহাদের দীন বিলুপ্তির পূর্বে তাহা গ্রহণ করিয়াছেন এবং ইসলাম প্রতিষ্ঠিত হইবার পর জিযিয়া দিয়া থাকিত।
অন্য একটি দল বলেন, যুদ্ধের আয়াত দ্বারা এই আয়াতটি রহিত হইয়া গিয়াছে। তাই এখন সকল সম্প্রদায়কে সত্য-সরল ইসলামের প্রতি দাওয়াত দেওয়া প্রত্যেক মুসলমানের উপর ওয়াজিব। এখন যদি কেহ ইহা গ্রহণে অস্বীকৃতি জানায় অথবা জিযিয়া দান করিয়া মুসলমানদের অধীনতা গ্রহণ করিতে অসম্মতি প্রকাশ করে, তাহা হইলে তাহাদের বিরুদ্ধে জিহাদ ঘোষণা করিতে হইবে। এই হইল ‘ইকরাহ’ বা জবরদস্তির আসল অর্থ। কেননা আল্লাহ তা’আলা অন্যত্র
سَتُدْعَوْنَ إِلَى قَوْمٍ أُولِي بَأْسٍ شَدِيدٍ تُقَاتِلُونَهُمْ أَوْ يُسْلِمُونَ : 21
“অতি সত্বরই তোমাদিগকে ভীষণ শক্তিশালী এক সম্প্রদায়ের দিকে আহ্বান করা হইবে, হয় তোমরা তাহাদের সঙ্গে যুদ্ধে রত হইবে, না হয় তাহারা ইসলাম গ্রহণ করিবে।”
আল্লাহ তা’আলা আরও বলিয়াছেন:
يَا أَيُّهَا النَّبِيُّ جَاهِدِ الْكُفَّارَ وَالْمُنْفِقِينَ وَاغْلُظْ عَلَيْهِمْ
“হে নবী! কাফির ও মুনাফিকদের সঙ্গে যুদ্ধ করুন এবং তাহাদের ব্যাপারে কঠোরতা অবলম্বন করুন।”
কুরআনের অন্য স্থানে রহিয়াছে:
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا قَاتِلُوا الَّذِينَ يَلُوْنَكُمْ مِنَ الْكُفَّارِ وَلْيَجِدُوا فِيكُمْ غِلْظَةٌ وَاعْلَمُوا أَنَّ اللَّهَ مَعَ الْمُتَّقِينَ.
অর্থাৎ “হে মু’মিনগণ! তোমরা তোমাদের আশেপাশের কাফিরদের সঙ্গে যুদ্ধ কর, তাহাদের প্রতি কঠোরতা প্রদর্শন কর এবং বিশ্বাস রাখিও যে, আল্লাহ খোদাভীরুদের সঙ্গে রহিয়াছেন।”

জবরদস্তি 1
জবরদস্তি 3
জবরদস্তি 5

তাফসীরে জালালাইনঃ প্রাতিষ্ঠানিক অবরুদ্ধতা

জালালাইন অনুযায়ী, এই আয়াতটি কেবল জিযিয়া প্রদানকারী আহলে কিতাবদের জন্য খাস। তবে এখানে একটি সূক্ষ্ম পার্থক্য টানা হয়েছে—কাউকে ইসলামে প্রবেশে বাধ্য করা না হলেও, একবার প্রবেশ করার পর বের হওয়ার (মুরতাদ হওয়ার) কোনো সুযোগ নেই। ধর্মত্যাগের শাস্তি হিসেবে মৃত্যুদণ্ডকে এখানে রাষ্ট্রদ্রোহিতা বা খুনের মতো অপরাধের সাথে তুলনা করা হয়েছে। এখানে বলা হয়েছে ইসলাম বর্জন কোনো ব্যক্তিগত স্বাধীনতা নয়, বরং রাষ্ট্রীয় শৃঙ্খলা রক্ষার দোহাই দিয়ে বলপ্রয়োগের মাধ্যমে ইসলামের ভেতরে রাখার কথাই বলা হয়েছে।

যৌক্তিক বিভ্রান্তি

বিশ্বাস পরিবর্তন করা বা ধর্ম ত্যাগ করাকে চুরি বা খুনের মতো অপরাধের সাথে তুলনা করা একটি চরম যৌক্তিক বিচ্যুতি। ব্যক্তিগত বিবেক ও বিশ্বাস কখনোই অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের সমতুল্য হতে পারে না।

প্রবেশ সহজ, প্রস্থান নিষিদ্ধ

এটি এমন একটি ব্যবস্থার কথা বলে যেখানে ঢোকার পথ খোলা থাকলেও বের হওয়ার পথটি মৃত্যুর মাধ্যমে বন্ধ। একে ‘মানবাধিকার’ বা ‘বিবেকের স্বাধীনতা’র চূড়ান্ত পরিহাস বলা যায়।

শান্তির নামে দমন

ফিতনা-ফাসাদ বা বিশৃঙ্খলা রোধের নামে ভিন্নমতকে হত্যা করার যে বৈধতা এখানে দেওয়া হয়েছে, তা মূলত একটি একনায়তান্ত্রিক আদর্শের প্রতিফলন, যা আধুনিক সেক্যুলার মূল্যবোধের পরিপন্থী [6]

শানে নুযূলের দিক দিয়ে মুফাসসিরগণ এটাকে আহলে কিতাবের জন্যে খাস মনে করেন। অর্থাৎ, ইসলামি রাষ্ট্রে অবস্থানকারী কোনো আহলে কিতাব যদি কর আদায় করে তাহলে তাকে ইসলাম গ্রহণে বাধ্য করা হবে না। বস্তুত এ আয়াতের হুকুম ব্যাপক। অর্থাৎ কাউকে ইসলাম গ্রহণের জন্যে বাধ্য করা যাবে না। কারণ আল্লাহ হেদায়েত ও গোমরাহিকে স্পষ্ট করে দিয়েছেন। তথাপি কুফর ও শিরকের সমাপ্তি এবং বাতিলের শক্তি খর্ব করার জন্যে জিহাদের বিধান, আর এখানে উল্লিখিত জোর-জবরদস্তি ভিন্ন ব্যাপার। জিহাদের দ্বারা উদ্দেশ্য হলো সে শক্তিকে দমন করা, যা আল্লাহর দীনের উপর আমল করতে এবং তাঁর মনোনীত দীনের প্রচার-প্রসারের ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধক হয়। কারণ এ ধরনের শক্তি মাঝে মধ্যে মাথাচাড়া দিয়ে থাকে। এ কারণেই জিহাদের নির্দেশ এবং প্রয়োজনীয়তা কিয়ামত পর্যন্ত বহাল থাকবে। যেমন হাদীসে এভাবে মুরতাদ হওয়ার সাজা বা শাস্তির সাথেও এ আয়াতের কোনো সম্পর্ক নেই। কারণ এ সাজার দ্বারা ইসলাম গ্রহণে বাধ্য করা উদ্দেশ্য নয়; বরং ইসলামি দৃষ্টিভঙ্গি ও নিয়মনীতির সংরক্ষণ উদ্দেশ্য। কোনো ইসলামি রাষ্ট্রে একজন কাফেরের স্বীয় কুফরির উপর অটল থাকার অনুমতি থাকতে পারে। কিন্তু একবার যখন সে ইসলামে দীক্ষিত হলো, তখন তার বিরুদ্ধাচরণ এবং তা থেকে পদচ্যুত হওয়ার অনুমতি দেওয়া যেতে পারে না। কাজেই আগেই সে উত্তমরূপে ভেবেচিন্তে ইসলাম গ্রহণ করবে। কেননা যদি মুরতাদ হওয়ার অনুমতি দেওয়া হতো তাহলে বুনিয়াদি দৃষ্টিভঙ্গি বিনষ্ট হয়ে যেত। আর এর দ্বারা মতবাদগত ভিন্নতা ও শত্রুতা বৃদ্ধি পেত। ফলে যা ইসলামি সমাজব্যবস্থার শান্তি, নিরাপত্তা এবং রাষ্ট্রের স্থায়িত্ব আশঙ্কাযুক্ত হতো। এ কারণেই যেভাবে মানবাধিকারের নামে হত্যা, চুরি, ছিনতাই, ব্যভিচার ইত্যাদি অন্যায়ের অনুমতি দেওয়া যায় না। একইভাবে মুক্ত চিন্তার নামে একই ইসলামি রাষ্ট্রে মতবাদগত দ্রোহিতা তথা ধর্মচ্যুতির অনুমতিও দেওয়া যায় না। এটা কোনো বাধ্যবাধকতা নয়; বরং মুরতাদের মৃত্যুদণ্ড ঠিক সেভাবেই ন্যায়ানুগ বিচার, যেভাবে হত্যা ও ডাকাতি এবং বিভিন্ন চারিত্রিক অন্যায়ে লিপ্ত ব্যক্তিদেরকে কঠোর সাজা দেওয়া আইনের দৃষ্টিতে সঠিক বিবেচিত। একটির উদ্দেশ্য হলো, রাষ্ট্রীয় নিয়ম-শৃঙ্খলা সংরক্ষণ, আর অপরটির উদ্দেশ্য হলো রাষ্ট্রকে বিভিন্ন ফিতনা-ফ্যাসাদ থেকে রক্ষা করা। রাষ্ট্রের সুশৃঙ্খলার জন্যে উভয় বিষয় অতি জরুরি। বর্তমান অধিকাংশ ইসলামি রাষ্ট্র এ উভয় বিষয়কে গুরুত্ব না দেওয়ারকারণে যেসব বিশৃঙ্খলা, নিরাপত্তাহীনতা ও অস্থিরতার শিকার হয়েছে তা বলার অপেক্ষা রাখে না।

জবরদস্তি 7

তাফসীরে মাযহারীঃ অমানবিকীকরণ ও দ্বৈত মানদণ্ড

তাফসীরে মাযহারীতে দাবি করা হয়েছে যে, জিহাদ বলপূর্বক ঈমানদার বানানোর জন্য নয়, বরং ‘পৃথিবীর অশান্তি’ দূর করার জন্য। তবে এই ‘অশান্তি সৃষ্টিকারী’ বলতে সরাসরি অমুসলিম বা কাফেরদের বোঝানো হয়েছে। এখানে কাফেরদের হিংস্র সাপ, বিচ্ছু বা উন্মাদ কুকুরের সাথে তুলনা করে তাদের হত্যা করা বা জিযিয়া দিতে বাধ্য করাকে যুক্তিযুক্ত দেখানো হয়েছে। একইসাথে বলা হয়েছে, ইসলাম যেহেতু কেবলই কল্যাণ, তাই এখানে বলপ্রয়োগ করা অবান্তর, কারণ কল্যাণ তো সবাই গ্রহণ করবেই।

অমানবিকীকরণ (Dehumanization)

ইসলামের বিশ্বাস অনুসারে শিরক হচ্ছে সবচেয়ে বড় ফিতনা। এই ফিতনা বা বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিকারী অমুসলিমদের সাপ, বিচ্ছু বা উন্মাদ কুকুরের সাথে তুলনা করা অত্যন্ত নিচু মানসিকতা ও উগ্রবাদী মনোভাবের বহিঃপ্রকাশ। এই ধরণের ঘৃণা উৎপাদনকারী ভাষা যেকোনো ধরণের সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা বা গণহত্যার তাত্ত্বিক ভিত্তি হিসেবে কাজ করে।

ত্রুটিপূর্ণ যুক্তি

একদিকে বলা হচ্ছে বলপ্রয়োগের প্রয়োজন নেই কারণ ইসলাম সহজ-সরল পথ, অন্যদিকে সেই পথ গ্রহণ না করলে হত্যার বা জিযিয়ার ভয় দেখানো হচ্ছে। এটি একটি সুস্পষ্ট দ্বিমুখী অবস্থান।

কল্যানের দোহাই

“কল্যাণ চাপিয়ে দেওয়া জবরদস্তি নয়”—এই দাবিটি যেকোনো স্বৈরাচারী ব্যবস্থার মৌলিক যুক্তি। ব্যক্তির কাছে যা অকল্যাণ বা মিথ্যা, তাকে তা ‘কল্যাণ’ হিসেবে জোর করে গেলাতে চাওয়া ব্যক্তিগত স্বাধীনতার ওপর চরম নগ্ন হস্তক্ষেপ।

করে এখলাস অথবা পরীক্ষা কোনোটাই সম্পন্ন হতে পারে না। এই হুকুমটি কি কতিপয় লোকের জন্য না সাধারণভাবে সকলের জন্য প্রযোজ্য? এর উত্তরে কোনো কোনো আলেম বলেন, এই আয়াত আহলে কিতাব অর্থাৎ ইহুদীদের জন্যই নির্ধারিত। কেননা আনসারদের ইহুদী ও খৃষ্টান ধর্মাবলম্বী সন্তানদের উদ্দেশ্যে এই আয়াত অবতীর্ণ হয়েছে।
আমি বলি, এই হুকুম সাধারণ। কোনো কোনো আলেম বলেন, ‘মুশরিকদের বিরূদ্ধে যুদ্ধ করো’ এবং ‘কাফের ও মুনাফিকদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করো’ আল্লাহতায়ালার এই হুকুম দ্বারা উক্ত আয়াতটি রহিত হয়েছে। বাগবী এবং হজরত ইবনে মাসউদ এরকমই বলেছেন।
আমি বলি, রহিত ওই সময়ে হতে পারে, যখন দুটি হুকুমের মধ্যে দ্বন্দ্ব হয়। কিন্তু এখানে একটি আয়াত অপরটির প্রতিদ্বন্দ্বী নয়। যুদ্ধ-বিগ্রহের উদ্দেশ্য বলপূর্বক ইমানদার বানানো নয়। বরং পৃথিবীতে অশান্তি ও ধ্বংসাত্মক কার্যকলাপ দূর করার জন্যই জেহাদ করতে বলা হয়েছে। আল্লাহ্পাক চান মানুষ সহজ সরল পথে চলুক এবং তাঁর ইবাদত করুক। বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিকারী কাফেররা হিংস্র সাপ বিচ্ছু ও উন্মাদ কুকুরের মতো। তাই তাদেরকে হত্যা করতে বলা হয়েছে। এজন্যই আল্লাহতায়ালা তাদের উপর জিজিয়া কর বিধিবদ্ধ করেছেন। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘যে পর্যন্ত তারা অধীনতা স্বীকার না করে এবং প্রজারূপে জিজিয়া কর দিতে সম্মত না হয়’। রসুলুল্লাহ স. শিশু, নারী, সহায়-সম্বলহীন, দুনিয়াত্যাগী আলেম, অচলব্যক্তি এবং অন্ধকে হত্যা করতে নিষেধ করেছেন। কারণ তারা অশান্তি ও ধবংসাত্মক কার্যকলাপ করতে পারে না।
‘সত্যপথ ভ্রান্ত পথ হইতে সুস্পষ্ট হইয়াছে’ রসুলে পাক স. এর মোজেজাসমূহ এবং সুস্থ বিবেক সাক্ষী দেয় যে, ইমানই সরল সঠিক পথ। যা স্থায়ী এবং পূর্ণতা পর্যন্ত পৌঁছায়। আর কুফরের পথ বঙ্কিম। যার গতি অন্যায়ের দিকে। এখন আর ওজর আপত্তি চলবে না। বলপ্রয়োগের আর প্রয়োজন নেই।
বায়যাবী এই আয়াতের ব্যাখ্যা এইভাবে করেছেন যে, বলপ্রয়োগের অর্থ কাউকে দিয়ে এমন কাজ করানো যাতে তার কল্যাণ রয়েছে। দ্বীন কেবলই কল্যাণ। এবং কল্যাণ ভ্রষ্টতা থেকে অবশ্যই পৃথক। জ্ঞানীদের সামনে হেদায়েত প্রকাশ করা হয়েছে। এখন মুক্তিকামী ও সৎকর্মান্বেষণকারী হেদায়েত কবুল করার দিকে অগ্রসর হবে। এটাই স্বাভাবিকতা। কাজেই বল প্রয়োগের প্রয়োজন অবান্তর।

জবরদস্তি 9
জবরদস্তি 11

মুরতাদ, যাকাত অস্বীকারকারী ও বেনামাজিকে হত্যার বিধান

ইসলামে “দ্বীনে জোর-জবরদস্তি নেই” (সূরা বাকারা: ২৫৬) আয়াতটিকে প্রায়ই একটি বৈশ্বিক মানবিক বাণী হিসেবে প্রচার করা হয়। কিন্তু ইসলামী আইন বা ফিকাহ শাস্ত্রের গভীরে প্রবেশ করলে দেখা যায়, এই তথাকথিত স্বাধীনতা কেবল একটি তাত্ত্বিক অলঙ্কার মাত্র। বিশেষ করে ইসলাম ধর্ম ত্যাগ করলে যে মৃত্যুদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে, তা ব্যক্তির মৌলিক অধিকারের ওপর চরম এক জবরদস্তি। যখন কোনো মতাদর্শে প্রবেশের পথ খোলা থাকে কিন্তু বের হওয়ার পথটি রক্তের বিনিময়ে রুদ্ধ থাকে, তখন সেখানে ‘পছন্দের স্বাধীনতা’ দাবি করা স্রেফ একটি প্রহসন। একইসাথে, নবী মুহাম্মদের সামান্যতম সমালোচনাও ইসলামী শরীয়তে বিনাবিচারে হত্যা করার উপযুক্ত অপরাধ হিসেবে স্বীকৃত।

ঐতিহাসিকভাবে, প্রথম খলিফা আবু বকরের আমলের রিদ্দাহ যুদ্ধসমূহ ছিল এই জবরদস্তির প্রথম বড় উদাহরণ। যারা কেবল যাকাত দিতে অস্বীকার করেছিল বা রাষ্ট্র নিয়ন্ত্রিত ধর্মীয় ব্যবস্থা থেকে বিচ্যুত হতে চেয়েছিল, তাদের বিরুদ্ধে সশস্ত্র অভিযান চালিয়ে গণহারে হত্যা করা হয়—যা আধুনিক কোনো বিচারব্যবস্থায় অকল্পনীয়। একইভাবে, যারা কেবল ব্যক্তিগত আলস্যবশত নামাজ ত্যাগ করে, তাদের ক্ষেত্রেও ইসলামী পণ্ডিতদের একটি বড় অংশ হত্যার ফতোয়া দিয়েছেন। এটি প্রমাণ করে যে ইসলামে ইবাদত কেবল আল্লাহর প্রতি ভালোবাসা নয়, বরং রাষ্ট্রের চাপে পালনীয় একটি বাধ্যতামূলক দায়িত্ব; এমনকি শিশুদের ক্ষেত্রেও নামাজ না পড়লে মারপিট করে ধর্ম পালনে বাধ্য করার নির্দেশ সরাসরি বর্ণিত হয়েছে।

ইসলামপন্থীগণ প্রায়ই যুক্তি দেন যে, মুরতাদ হত্যা ধর্মীয় জবরদস্তি নয় বরং ‘রাষ্ট্রদ্রোহের’ সাজা। কিন্তু এই যুক্তিটি অত্যন্ত দুর্বল; কারণ কোনো প্রকার রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রে লিপ্ত না হয়ে কেবল ব্যক্তিগত বিশ্বাসের পরিবর্তন কীভাবে রাষ্ট্রদ্রোহ হতে পারে? মূলত, ব্যক্তিগত বিবেক ও শান্তিপূর্ণ ধর্মত্যাগকে আইনিভাবে দণ্ডনীয় অপরাধ সাব্যস্ত করা হলো বিশ্বাসের ওপর কাঠামোগত সন্ত্রাস—যেখানে শাস্তির ভয় দেখিয়ে মানুষকে একটি নির্দিষ্ট ধর্মমতের ছায়াতলে আটকে রাখা হয়। একদিকে “কোনো জোর নেই” স্লোগান দেওয়া এবং অন্যদিকে বেনামাজিকে হত্যার ইসলামিক বিধান বহাল রাখা ইসলামের ভেতরে এক গভীর নৈতিক ও যৌক্তিক দ্বৈততা উন্মোচন করে। আসুন এই বিষয়ে আরও স্পষ্ট ধারণা পেতে বাংলাদেশের প্রখ্যাত আলেম শাইখ ড. মুযাফফর বিন মুহসিন এর একটি ভিডিও দেখে নেয়া যাক:


শরীয়া-রাষ্ট্রে অমুসলিম নাগরিক (ভিডিও)

একটি তথাকথিত আদর্শ ইসলামী রাষ্ট্রে অমুসলিমদের মর্যাদা কেবল ‘সুরক্ষিত নাগরিক’ হিসেবে নয়, বরং ‘বশ্যতা স্বীকারকারী জিম্মী’ হিসেবে সংজ্ঞায়িত। শরীয়া আইনের লক্ষ্য কেবল অমুসলিমদের থেকে কর আদায় করা নয়, বরং তাদের সামাজিকভাবে হীনম্মন্য ও অবমাননাকর অবস্থায় রাখা। জিজিয়া কর আদায়ের সময় তাদের ঘাড় ধরে ঝাঁকুনি দেওয়া বা তাদের উচ্চতায় নিচু রাখা—এই ধরণের বিধানগুলোর মূল উদ্দেশ্য হলো তাদের মনস্তাত্ত্বিকভাবে এটি বোঝানো যে, তারা দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক। আধুনিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে যেখানে প্রতিটি নাগরিকের সমান মর্যাদা স্বীকৃত, সেখানে ইসলামের এই ‘জিম্মী প্রথা’ একটি বৈষম্যমূলক ব্যবস্থা। এটি অমুসলিমদের ওপর এমন এক ধরণের মনস্তাত্ত্বিক চাপ সৃষ্টি করে, যেন তারা সামাজিক গ্লানি থেকে বাঁচতে বাধ্য হয়ে ইসলাম গ্রহণ করে। একে কোনোভাবেই ‘ধর্মীয় স্বাধীনতা’ বলা চলে না।

আসুন এই নিয়ে একটি ভিডিও দেখি, যেখানে আরবের একজন ইসলামিক আলেম শেখাচ্ছেন, কীভাবে একটি শরিয়াভিত্তিক রাষ্ট্রে অমুসলিমদের প্রতি পদে পদে অপমান অপদস্ত করতে হবে, যেন তারা বাধ্য হয় ইসলাম গ্রহণ করতে,


সূরা তওবার আনসেন্সরড তাফসীর (ভিডিও)

কুরআনের শান্তিকামী আয়াতগুলোকে আধুনিককালের ইসলামিস্টরা ঢাল হিসেবে ব্যবহার করলেও, ধ্রুপদী তাফসীরবিদগণ কখনোই লুকোচুরি করেননি। সূরা তাওবা বা কুরআনের সর্বশেষ বড় সূরাগুলোর নাজিল হওয়া এটিই প্রমাণ করে যে, ইসলামের শক্তি যখন বৃদ্ধি পায়, তখন পূর্বের ‘সহনশীলতা’র নীতি রহিত বা ‘মানসুখ’ হয়ে যায়। প্রখ্যাত মুফাসসিরদের মতে, সূরা তাওবার ৫ এবং ৭৩ নম্বর আয়াত—যা ‘তরবারির আয়াত’ নামে পরিচিত—পূর্ববর্তী কয়েকশ শান্তিপূর্ণ আয়াতকে বাতিল করে দিয়েছে। এটি থেকে এটিই প্রতীয়মান হয় যে, মক্কী জীবনের শান্তি ছিল মূলত মুসলিমদের দুর্বল অবস্থানের কারণে একটি কৌশলগত অবস্থান। যখনই তারা মদিনায় রাষ্ট্রক্ষমতা ও সামরিক শক্তি অর্জন করল, তখনই ‘জিহাদ’ এবং ‘কিতাল’-এর মাধ্যমে ধর্ম প্রসারের চূড়ান্ত নির্দেশ আসলো। এই পরিবর্তনশীল নীতি ইসলামের তথাকথিত ‘শাশ্বত শান্তির ধর্ম’ হওয়ার দাবিকে অসার প্রমাণ করে। এবারে আসুন সূরা তওবার একটি নির্ভীক সাহসী ওয়াজ শুনি,


নবী কী জঙ্গি ছিলেন? (ভিডিও)

আধুনিককালে ‘জঙ্গিবাদ’ বা ‘টেররিজম’ বলতে আমরা যা বুঝি, তার অনেক উপাদানই তৎকালীন সামরিক অভিযানে দেখা যায়। ‘আমি আদিষ্ট হয়েছি মানুষের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার জন্য যতক্ষণ না তারা সাক্ষ্য দেয়…’—রাসূলুল্লাহর এই বাণীটি কোনো রক্ষণাত্মক যুদ্ধের কথা বলে না, বরং এটি একটি চিরন্তন আগ্রাসনের নীতি। যখন একটি ধর্মের প্রবর্তক নিজেই ঘোষণা করেন যে যুদ্ধের মাধ্যমে অন্যদের বশ্যতা স্বীকার করানোই তার মিশন, তখন সেই ধর্মবিশ্বাস আর আধ্যাত্মিকতায় সীমাবদ্ধ থাকে না, তা একটি সাম্রাজ্যবাদী শক্তিতে রূপ নেয়। মক্কা বিজয়ের পর মূর্তিপূজারীদের প্রতি যে ‘সাধারণ ক্ষমা’র কথা বলা হয়, তা আসলে ছিল একটি স্বল্পসময়ের জন্য শর্তসাপেক্ষ ক্ষমা—পরবর্তী সময়ে তা বদলে গিয়ে হয় ইসলাম গ্রহণ করো, নয় দেশত্যাগ করো, নতুবা মৃত্যু বরণ করো, এই নীতিতে পরিণত হয়। এই জবরদস্তিমূলক অবস্থানটিই বর্তমান বিশ্বের চরমপন্থী গোষ্ঠীগুলোর প্রধান অনুপ্রেরণা। আসুন আরেকটি ওয়াজ শুনি,


জিহাদ সম্পর্কে মিথ্যাচার (ভিডিও)

বর্তমান সময়ের তথাকথিত মডারেট মুসলিম বা ইসলামি চিন্তাবিদগণ পশ্চিমা বিশ্বের কাছে গ্রহণযোগ্য হতে ‘জিহাদ’ শব্দটিকে কেবল ‘আত্মিক সংগ্রাম’ হিসেবে সংজ্ঞায়িত করার আপ্রাণ চেষ্টা করেন। কিন্তু ইসলামের আকর গ্রন্থ এবং চার ইমামের ফিকহী সিদ্ধান্তগুলো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, জিহাদ মানেই হলো কাফিরদের বিরুদ্ধে সশস্ত্র যুদ্ধ (কিতাল)। ধ্রুপদী ইসলামে ‘ডিফেন্সিভ জিহাদ’ বা রক্ষণাত্মক যুদ্ধের চেয়ে ‘অফেন্সিভ জিহাদ’ বা আক্রমণাত্মক জিহাদকে বেশি সওয়াবের কাজ হিসেবে দেখা হয়েছে। এই সত্যটি গোপন করে ইসলামিস্টরা এক ধরণের ‘তাকিয়া’ বা ধর্মীয় প্রতারণার আশ্রয় নেয়। অমুসলিমদের ওপর ইসলাম চাপিয়ে দেওয়া বা তাদের ইসলামী রাষ্ট্রের অধীনে পদানত করার যে সামরিক বাধ্যবাধকতা রয়েছে, তা অস্বীকার করা মূলত ইসলামের দীর্ঘ তেরোশ বছরের ইতিহাসকেই অস্বীকার করার শামিল। জিহাদ কোনো শান্তির পথ নয়, বরং এটি একটি সাম্রাজ্যবাদী রাজনৈতিক আধিপত্য বিস্তারের হাতিয়ার। আসুন আরও একজন ইংরেজিভাষী আরব আলেমের বক্তব্য শুনে নেয়া যাক,


হাদিসের পরিষ্কার বর্ণনা

ইসলামের প্রাথমিক ইতিহাস এবং প্রথম খলিফা আবু বকরের আমল পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, সেখানে ‘ব্যক্তিগত পছন্দ’ বা ‘ব্যক্তি-স্বাধীনতা’র কোনো স্থান ছিল না। রাসূলুল্লাহর মৃত্যুর পর যখন আরবের বিভিন্ন গোত্র যাকাত দিতে অস্বীকার করল বা ধর্ম ত্যাগ করতে চাইল, তখন তাদের ‘মুরতাদ’ আখ্যা দিয়ে যে ভয়াবহ গণহত্যা চালানো হয়েছিল, তা ইসলামের ইতিহাসের এক রক্তক্ষয়ী অধ্যায়। সহীহ হাদিসগুলোর বর্ণনা অনুযায়ী, রাসূলুল্লাহর পরিষ্কার নির্দেশ ছিল—যারা কালিমা পড়বে না, তাদের সম্পদ ও জীবন নিরাপদ নয়। অর্থাৎ, কালিমা পড়া বা ইসলাম গ্রহণ করা ছিল প্রাণ বাঁচানোর একমাত্র উপায়। ওসামা বিন জায়েদ যখন একজনকে কালিমা পড়ার পরও হত্যা করেছিলেন, তখন রাসূলুল্লাহর অসন্তুষ্টি কেবল এই কারণে ছিল না যে তিনি অন্যায় করেছেন, বরং রাসূলুল্লাহর যুক্তি ছিল—কালিমা পড়ার পর ওই ব্যক্তি আইনিভাবে ‘মুসলিম’ হয়ে গেছে, তার অন্তরের খবর নেওয়া আমাদের কাজ নয়। অর্থাৎ, ইসলামে ‘লোকদেখানো’ বা ‘জবরদস্তিমূলক’ আনুগত্যও রাষ্ট্রীয়ভাবে বৈধ।

অর্থাৎ ইসলাম সরাসরিই জোরপূর্বক ধর্মান্তরিত হতে বাধ্য করে, নতুবা অবমাননাকর জিযিয়া কর আরোপ করে। এবারে আসুন কয়েকটি হাদিস পড়ে নেয়া যাক [7] [8]

সূনান আত তিরমিজী (তাহকীককৃত)
৩৮/ ঈমান
পরিচ্ছেদঃ ১. যতক্ষণ পর্যন্ত মানুষ “লা-ইলা-হা ইল্লাল্লা-হ’ না বলবে ততক্ষণ পর্যন্ত তাদের বিরুদ্ধে কিতাল করতে আমি আদেশপ্রাপ্ত হয়েছি
২৬০৭। আবূ হুরাইরাহ (রাযিঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর মৃত্যুর পর আবূ বকর (রাযিঃ) যখন খলীফা নির্বাচিত হন, তখন আরবের কিছু সংখ্যক লোক কাফির হয়ে যায়। উমার ইবনুল খাত্তাব (রাযিঃ) আবূ বাকর (রাযিঃ)-কে বললেন, আপনি এদের বিরুদ্ধে কিভাবে অস্ত্ৰধারণ করবেন, অথচ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ মানুষ যে পর্যন্ত না “আল্লাহ তা’আলা ব্যতীত আর কোন প্ৰভু নেই” এই কথার স্বীকৃতি দিবে সেই পর্যন্ত আমি তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে আদিষ্ট হয়েছি। আর যে ব্যক্তি বললো, “আল্লাহ ব্যতীত আর কোন প্ৰভু নেই” সে আমার থেকে তার মাল ও রক্ত (জীবন) নিরাপদ করে নিল। তবে ইসলামের অধিকার সম্পর্কে ভিন্ন কথা। আর তাদের প্রকৃত হিসাব-নিকাশ রয়েছে আল্লাহ তা’আলার দায়িত্বে।
আবূ বকর (রাযিঃ) বললেনঃ আল্লাহর শপথ নামায ও যাকাতের মধ্যে যে ব্যক্তি পার্থক্য করে আমি তার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করবোই। কেননা যাকাত সম্পদের হাক্ক। কেউ উটের একটি রশি দিতেও যদি অস্বীকার করে, যা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -কে দিত, আল্লাহর কসম! আমি তার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করবোই। তারপর উমার ইবনুল খাত্তাব (রাযিঃ) বলেন, আল্লাহর শপথ! আমি দেখতে পেলাম আল্লাহ যেন যুদ্ধের জন্য আবূ বাকরের অন্তর উন্মুক্ত করে দিয়েছেন। অতঃপর আমি বুঝতে পারলাম যে, তার সিদ্ধান্তই যথার্থ।
সহীহঃ সহীহাহ (৪০৭), সহীহ আবূ দাউদ (১৩৯১-১৩৯৩), বুখারী ও মুসলিম।
আবূ ঈসা বলেন, এই হাদীসটি হাসান সহীহ। শু’আইব ইবনু আবী হামযা (রহঃ) যুহরী হতে, তিনি উবাইদুল্লাহ ইবনু আবদিল্লাহ হতে, তিনি আবূ হুরাইরাহ (রাযিঃ)-এর সূত্রে একই রকম বর্ণনা করেছেন। এই হাদীস মামার-যুহরী হতে, তিনি আনাস (রাযিঃ) হতে, তিনি আবূ বাকর (রাযিঃ) হতে এই সূত্রে ইমরান আল-কাত্তান বর্ণনা করেছেন। এ বর্ণনাটি ভুল। ‘ইমরানের ব্যাপারে মা’মার হতে বর্ণিত বর্ণনাতে বিরোধিতা করা হয়েছে।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আবূ হুরায়রা (রাঃ)

সূনান আত তিরমিজী (তাহকীককৃত)
৩৮/ ঈমান
পরিচ্ছেদঃ ২. আমি লোকদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে আদিষ্ট হয়েছি যতক্ষণ পর্যন্ত না তারা “লা-ইলা-হা ইল্লাল্লা-হ’ বলবে এবং নামায আদায় করবে
২৬০৮। আনাস ইবনু মালিক (রাযিঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ আমি লোকদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার জন্য আদিষ্ট হয়েছি যতক্ষণ পর্যন্ত না তারা সাক্ষ্য দিবে যে, আল্লাহ তা’আলা ব্যতীত আর কোন প্ৰভু নেই এবং মুহাম্মাদ আল্লাহ তা’আলার বান্দা ও তার রাসূল এবং আমাদের কিবলামুখী হয়ে নামায আদায় করবে, আমাদের যবেহকৃত পশুর গোশত খাবে এবং আমাদের মতো নামায আদায় করবে। তারা এগুলো করলে তাদের জান ও মালে হস্তক্ষেপ করা আমাদের জন্য হারাম হয়ে যাবে। কিন্তু ইসলামের অধিকারের বিষয়টি ভিন্ন। মুসলিমদের প্রাপ্য সুযোগ-সুবিধা তারাও পাবে এবং মুসলিমদের উপর অর্পিত দায়-দায়িত্ব তাদের উপরও বর্তাবে।
সহীহঃ সহীহাহ (৩০৩) ও (১/১৫২), সহীহ আবূ দাউদ (২৩৭৪), বুখারী অনুরূপ।
মুআয ইবনু জাবাল ও আবূ হুরাইরাহ (রাযিঃ) হতেও এই অনুচ্ছেদে হাদীস বর্ণিত আছে। আবূ ঈসা বলেন, এই হাদীসটি হাসান সহীহ এবং উপরোক্ত সূত্রে গারীব। ইয়াহইয়া (রাহঃ) হুমাইদ হতে, তিনি আনাস (রাযিঃ)-এর সূত্রে একই রকম হাদীস বর্ণনা করেছেন।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)

আসুন একটি উদাহরণ দেখে নিই, নবী মুহাম্মদের সাহাবীগণ কীভাবে কাফের রাজ্যগুলোকে আক্রমণ করতো, এবং আক্রমণের সময়ে তারা কী বলতো [9] [10]

সহীহ বুখারী (তাওহীদ পাবলিকেশন)
৫৮/ জিযিয়াহ্‌ কর ও সন্ধি স্থাপন
পরিচ্ছেদঃ ৫৮/১. জিম্মীদের নিকট থেকে জিযইয়াহ গ্রহণ এবং হারবীদের সঙ্গে যুদ্ধ বন্ধের চুক্তি।
৩১৫৯. জুবাইর ইবনু হাইয়াহ (রহ.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, ‘উমার (রাঃ) মুশরিকদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার জন্য বিভিন্ন বড় বড় শহরের দিকে সৈন্য দল প্রেরণ করলেন। সে সময় হুরমযান ইসলাম গ্রহণ করে। ‘উমার (রাঃ) তাঁকে বললেন, আমি এসব যুদ্ধের ব্যাপারে তোমার পরামর্শ গ্রহণ করতে চাই। তিনি বললেন, ঠিক আছে। এ সকল দেশ এবং দেশে মুসলিমদের দুশমন যে সব লোক বাস করছে, তাদের দৃষ্টান্ত একটি পাখির মত, যার একটি মাথা, দু’টি ডানা ও দু’টি পা রয়েছে। যদি একটি ডানা ভেঙ্গে দেয়া হয়, তবে সে পাখিটি উভয় পা, একটি ডানা ও মাথার ভরে উঠে দাঁড়াবে। যদি অপর ডানা ভেঙ্গে দেয়া হয়, তবে সে দু’টি পা ও মাথার ভরে উঠে দাঁড়াবে। আর যদি মাথা ভেঙ্গে দেয়া হয়, তবে উভয় পা, উভয় ডানা ও মাথা সবই অকেজো হয়ে যাবে। কিসরা শত্রুদের মাথা, কায়সার হল একটি ডানা, আর পারস্য অপর একটি ডানা। কাজেই মুসলিমগণকে এ আদেশ করুন, তারা যেন কিসরার উপর হামলা করে।
বাকর ও যিয়াদ (রহ.) উভয়ে যুবাইর ইবনু হাইয়াহ (রহ.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, অতঃপর ‘উমার (রাঃ) আমাদের ডাকলেন আর আমাদের উপর নু‘মান ইবনু মুকাররিনকে আমীর নিযুক্ত করেন। আমরা যখন শত্রু দেশে পৌঁছলাম, কিসরার এক সেনাপতি চল্লিশ হাজার সৈন্য নিয়ে আমাদের মুকাবিলায় আসল। তখন তার পক্ষ হতে একজন দোভাষী দাঁড়িয়ে বলল, তোমাদের মধ্য থেকে একজন আমার সঙ্গে আলোচনা করুক। তখন মুগীরাহ (ইবনু শু‘বাহ) (রাঃ) বললেন, যা ইচ্ছা প্রশ্ন করতে পার। সে বলল, তোমরা কারা? তিনি বললেন, আমরা আরবের লোক। দীর্ঘ দিন আমরা অতিশয় দুর্ভাগ্য এবং কঠিন বিপদে ছিলাম। ক্ষুধার জ্বালায় আমরা চামড়া ও খেজুর গুটি চুষতাম। চুল ও পশম পরিধান করতাম। বৃক্ষ ও পাথর পূজা করতাম। আমরা যখন এ অবস্থায় পতিত তখন আসমান ও যমীনের প্রতিপালক আমাদের মধ্য হতে আমাদের নিকট একজন নবী পাঠালেন। তাঁর পিতা-মাতাকে আমরা চিনি। আমাদের নবী ও আমাদের রবের রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদেরকে তোমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার আদেশ দিয়েছেন, যে পর্যন্ত না তোমরা এক আল্লাহ্ তা‘আলার ‘ইবাদাত কর কিংবা জিযইয়াহ দাও। আর আমাদের নবী আমাদের রবের পক্ষ হতে আমাদেরকে জানিয়েছেন যে, আমাদের মধ্য হতে যে নিহত হবে, সে জান্নাতে এমন নি‘মাত লাভ করবে, যা কখনো দেখা যায়নি। আর আমাদের মধ্য হতে যারা জীবিত থাকবে তোমাদের গর্দানের মালিক হবে। (৭৫৩০) (ইসলামিক ফাউন্ডেশনঃ ২৯৩৪)
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ জুবাইর ইবনু হাইয়াহ (রহঃ)

জবরদস্তি 13

তাফসীর গ্রন্থে পরিষ্কার বিবরণ

এবারে আসুন, “দ্বীনে কোন জোর প্রয়োগ নেই”– এই আয়াতটি সম্পর্কে ইসলামের বিধানটি আসলে কী, সরাসরি তাফসীর গ্রন্থ থেকে দেখে নিই। কোরআনের এই আয়াতটির শানে নুজুল এবং বিস্তারিত ব্যাখ্যা পড়ে দেখা এই জন্য জরুরি। ইসলামে জোর জবরদস্তি নেই, এরূপ বিবরণ সংবলিত আয়াতটি হচ্ছে সূরা বাকারার ২৫৬ নাম্বার আয়াত, যা কোরআনেরই শেষের দিকে নাজিল হওয়া সূরা তাওবার ৫ নং ও ৭৩ নং আয়াত দ্বারা অর্থাৎ জিহাদের আয়াত দ্বারা মানসুখ বা রহিত হয়ে গেছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে বিখ্যাত তাফসীর গ্রন্থ আহকামুল কোরআনে। একইসাথে, এখানে আসলে কী বোঝানো হয়েছে, সেটি ভালভাবে বোঝার জন্য তাফসীর পড়ে দেখা জরুরি [11]

আল্লাহর কথা,
দ্বীনে কোন জোর প্রয়োগ নেই। হেদায়েতের পথ গুমরাহী থেকে আলাদা স্পষ্ট প্রতিভাত হয়ে উঠেছে।
( সূরা বাকারাঃ ২৫৬ )
দহাক, সুদ্দী, সুলায়মান ইবনে মৃসা বলেছেন, এই আয়াতটি মনসূখ হয়ে গেছে এ আয়াতটি দ্বারাঃ
হে নবী! তুমি কাফির ও মুনাফিকদের বিরুদ্ধে জিহাদ কর। (সূরা তওবাঃ ৭৩)
এবং এ আয়াতটি দ্বারাঃ
অতএব তোমরা মুশরিকদের হত্যা কর। (সূরা আত্-তওবাঃ ৫)

আল-হাসান ও কাতাদা বলেছেন, ‘দ্বীনে জোর প্রয়োগ নেই’ কথাটি বিশেষভাবে সেই আহলে কিতাব লোকদের বেলায়, যারা জিযিয়া দিতে প্রস্তুত হবে। আরবের সাধারণ মুশরিকদের বেলায় এ কথা নয়। কেননা তারা বশ্যতা স্বীকার করে জিযিয়া দিতে রাজী হয়নি। তাদের নিকট থেকে হয় ইসলাম কবুল নিতে হবে, না হয় তরবারির আঘাত তাদের উপর পড়বে।
এ পর্যায়ে এ – ও বলা হয়েছে যে , উক্ত আয়াতের অর্থ হল, যুদ্ধের পরে যারা ইসলাম কবুল করেছে তাদের সম্পর্কে বল না যে, জোর – জবরদস্তির ফলে তারা ইসলাম কবুল করেছে ।
আবু বকর বলেছেনঃ দ্বীনে জোর প্রয়োগের অবকাশ নেই। এটি সংবাদ দানরূপে বলা কথা। কিন্তু মূলত একটি আদেশ। এটি সম্ভব যে , আয়াতটি মুশরিকদের বিরুদ্ধে করার আদেশ নাযিল হওয়ার পূর্বে এ আয়াত নাযিল হয়েছিল। ফলে তখন সে কথা সব কাফির সম্পর্কেই প্রয়োগীয় ছিল। যেমন আল্লাহর এই কথাটিঃ
প্রতিরোধ কর সেই পন্থায় যা অতীব উত্তম। তাহলে তোমার ও যার মধ্যে শত্রুতা আছে, সে সহসাই অতীব উষ্ণ বন্ধুতে পরিণত হবে ।
( সূরা হা-মিম-আস সিজদাঃ ৩৪ )
যেমন আল্লাহর কথাঃ
এবং যা অতীব উত্তম পন্থা, তদ্বারা বিরোধীদের সাথে মুকাবিলা কর ।
( সূরা নহলঃ ১২৫ )
আল্লাহর কথাঃযখন তাদেরকে মূর্খ লোকেরা সম্বোধন করে , তখন তারা বসে সালাম।
( সূরা ফুরকানঃ ৬৩ )
ইসলামের প্রথম দিকে যুদ্ধ নিষিদ্ধ ছিল। শেষ পর্যন্ত কাফিরদের প্রতি ইসলাম পেশ করার কাজটি যখন সম্পূর্ণ হয়ে গেল, নবীর সত্যতা প্রতিষ্ঠিত হল, তারপরও যখন তারা শত্রুতা করতে থাকল, তখন মুসলমানদেরকে নির্দেশ দেয়া হল তাদের সাথে যুদ্ধ করার জন্যে। তখন দ্বীনের জোর প্রয়োগ করার অবকাশ নেই ‘ কথাটি আরবের মুশরিকদের বেলায় মনসুখ হয়ে গেল। আয়াত নাযিল হলঃ
মুশরিকদের যেখানেই পাবে , হত্যা করবে। ( সূরা আত্-তওবাঃ ৫)
মুশরিকদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার হুকুম সম্বলিত আরও বহু আয়াত রয়েছে। তাই উক্ত আয়াতের প্রয়োগ কেবলমাত্র আহলি কিতাবের সাথে থেকে গেল অর্থাৎ দ্বীন গ্রহণের ব্যাপারে তাদের উপর কোন জোর প্রয়োগ করা যাবে না। আর আহলি কিতাবদেরকেও নিষ্কৃতি দেয়া হবে তখন, যদি তারা বশ্যতা স্বীকার করে জিযিয়া দিতে রাজী হয়। তখন তারা মুসলমানদের যিম্মী হয়ে থাকবে। ইসলামের শাসনাধীন হবে।
এ কথার হাদিসী প্রমাণ হচ্ছে , নবী করীম ( স ) নিজে আরবের মুশরিকদের নিকট থেকে ইসলাম ছাড়া অন্য কিছু গ্রহণ করতে প্রস্তুত হন নি। তা নাহলে তাদের উপর তরবারি চালিয়েছেন।

সূরা বাকারার ২৫৬ নম্বর আয়াত মানসুখ
জবরদস্তি 16
জবরদস্তি 18
জবরদস্তি 20

আকীদা গ্রন্থে পরিষ্কার বিবরণ

ইসলামের আধ্যাত্মিক দাবির আড়ালে এর আইনি কাঠামো বা ‘আকীদা’ যে কতটা কঠোর ও জবরদস্তিমূলক, তা প্রখ্যাত আলেমদের লিখিত কিতাবসমূহ বিশ্লেষণ করলেই স্পষ্ট হয়। ধ্রুপদী আকীদা ও ফিকহ শাস্ত্র অনুযায়ী, ‘বিশ্বাস’ কোনো ব্যক্তিগত অভিরুচি নয়, বরং এটি একটি আইনি চুক্তির মতো—যেখানে প্রবেশ করা সহজ হলেও বের হওয়ার পথটি অবরুদ্ধ। এই গ্রন্থে অত্যন্ত স্পষ্টভাবে বর্ণনা করা হয়েছে যে, একজন ‘হারবী’ বা যুদ্ধরত কাফিরকে যদি তরবারির ভয় দেখিয়ে বা হত্যার হুমকি দিয়েও ইসলাম গ্রহণ করানো হয়, তবে দুনিয়ার বিচারে তার সেই ইসলাম গ্রহণ বৈধ এবং চূড়ান্ত বলে গণ্য হবে। এখানে ব্যক্তির ‘অন্তর’ বা ‘আন্তরিকতা’র চেয়ে ‘আনুগত্য’কে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। বিশ্বাসের ক্ষেত্রে ‘সম্মতি’ বা ‘Consent’ এর এই অনুপস্থিতি প্রমাণ করে যে, ইসলাম মূলত একটি রাজনৈতিক-সামাজিক শৃঙ্খলা বজায় রাখার হাতিয়ার হিসেবে কাজ করে। শিশু অবস্থায় বা যুদ্ধবন্দী হিসেবে কাউকে মুসলিম সাব্যস্ত করা এবং পরবর্তীতে তাকে সেই ধর্ম ত্যাগ করতে বাধা দেওয়া—ব্যক্তির আত্মপরিচয় নির্ধারণের মৌলিক অধিকারের এক নগ্ন লঙ্ঘন [12]

আকাশের দিকে ইঙ্গিত করে বোঝানো হলো যে আপনি আল্লাহর রাসূল। রাসূলুল্লাহ (সা.) বললেন, “তুমি একে মুক্ত করতে পারো।” (হাদীস নং ১১)
যেসব কথা ও কাজ কেবল একজন মুসলিমই বলতে বা করতে পারে এবং যার মাধ্যমে স্পষ্ট বোঝা যায় যে উক্ত ব্যক্তি ইসলামে প্রবেশ করেছে, সেসব কথা ও কাজই ‘ইসলাম গ্রহণ’ হিসেবে গণ্য হবে। উদাহরণস্বরূপ: মুসলিমদের মতো সালাত আদায় করা, হজ পালন করা ইত্যাদি। তবে যদি প্রমাণিত হয় যে, উক্ত ব্যক্তি এসকল কাজের মাধ্যমে ভ্রান্ত বিশ্বাস পরিত্যাগ করে নির্ভেজাল ইসলামে প্রবেশ করেনি—বরং তার ধর্মবিশ্বাস অনুযায়ী কাফির অবস্থায়ই এসকল আমল করছে (যেমন বর্তমানে কাদিয়ানীরা) বা সে তামাশার ছলে এটি করছে—তবে তার ক্ষেত্রে এগুলো ইসলাম গ্রহণ হিসেবে গণ্য হবে না। তাকে ততক্ষণ মুসলিম গণ্য করা হবে না, যতক্ষণ না সে এমন কোনো বাক্য ব্যবহার করে যাতে বোঝা যায় সে নিজ বিশ্বাস পরিত্যাগ করে রাসূলুল্লাহ (সা.) কর্তৃক প্রচারিত ও সাহাবায়ে কিরাম কর্তৃক অনুসৃত সঠিক ধর্মবিশ্বাসে প্রত্যাবর্তন করছে।
ইসলাম গ্রহণে বাধ্য করার বিধান
কাউকে ইসলাম গ্রহণে বাধ্য করা একটি গুরুত্বপূর্ণ ফিকহী বিষয়। সমস্ত ওলামায়ে কিরাম একমত হয়েছেন যে, যেসব কাফিরের সাথে মুসলিমদের কোনো চুক্তি নেই (হারবী) বা যারা জিজিয়া প্রদানকারী জিম্মী কাফির নয়, তাদের হত্যার ভয় দেখিয়ে বা অন্য কোনোভাবে ইসলাম গ্রহণে বাধ্য করা হলে তা গ্রহণযোগ্য হবে। অর্থাৎ, এভাবে ইসলাম গ্রহণের পর সে যদি পুনরায় ধর্মত্যাগ করতে চায়, তবে তাকে ‘মুরতাদ’ সাব্যস্ত করে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হবে। এ বিষয়ে দলিল হলো রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর বাণী:
“আমাকে আদেশ করা হয়েছে মানুষের সাথে যুদ্ধ করার জন্য যতক্ষণ না তারা বলে— ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’।” (বুখারী ও মুসলিম)
যখন তারা এটি বলবে, তখন তাদের রক্ত ও সম্পদ সংরক্ষিত বলে গণ্য হবে। সহীহ মুসলিমের একটি দীর্ঘ হাদীসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ (সা.) কোনো অভিযানে সেনাপতি প্রেরণের সময় উপদেশ দিয়ে বলতেন: “তাদের তিনটি বিষয়ের দিকে ডাকো। তার মধ্যে যেটিই তারা গ্রহণ করুক, তুমিও সেটি গ্রহণ করো।” এই তিনটি বিষয় হলো:
ক. ইসলাম গ্রহণ
খ. জিজিয়া কর আদায় করা
গ. যুদ্ধ করা
সুতরাং, যুদ্ধের মাধ্যমে যাদের ইসলাম গ্রহণে বাধ্য করা হয়, তারা দুনিয়ার বিচারে মুসলিম বলেই গণ্য হবে। ওসামা বিন যায়েদের ঘটনাতেও একই বিষয় প্রমাণিত হয়। ওসামা (রা.) যাকে হত্যা করতে উদ্যত হয়েছিলেন, সেই কাফির হঠাৎ কালিমা পাঠ করে বসে। ওসামা মনে করেছিলেন তরবারির ভয়ে সে ইসলাম গ্রহণ করেছে, তাই তার ইসলাম গ্রহণযোগ্য নয়। কিন্তু রাসূলুল্লাহ (সা.) একারণে তাকে কঠোর তিরস্কার করেন। এর স্পষ্ট অর্থ হলো—যাকে হত্যা করা বৈধ, তাকে যদি হত্যার ভয় দেখানো হয় এবং সে ভীত হয়ে ইসলামে প্রবেশ করে, তবে তার ইসলাম গ্রহণযোগ্য হবে। পরবর্তীতে সে ইসলাম পরিত্যাগ করলে তাকে মুরতাদ হিসেবে গণ্য করা হবে। (হাদীস নং ১২ ও ১৩)
হারবী ও জিম্মীদের ক্ষেত্রে মতভেদ
কানযুদ্দাকাইকের ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে: “যদি চুক্তিবিহীন কাফিরকে (হারবী) ইসলাম গ্রহণে বাধ্য করা হয়, তবে তা গ্রহণযোগ্য হওয়ার ব্যাপারে ইজমা (ঐক্যমত) সম্পাদিত হয়েছে।” (তাবঈনুল হাকাইক্ক)
যাদের সাথে মুসলিমদের চুক্তি রয়েছে—যেমন জিম্মী (হাদীস নং ১৪), মুস্তা’মান (হাদীস নং ১৫) বা মুয়াহিদ (হাদীস নং ১৬)—তাদের ইসলাম গ্রহণে বাধ্য করা বৈধ নয় এবং এ ব্যাপারে উম্মতের ইজমা রয়েছে। তবে কেউ যদি এদের বাধ্য করে এবং তারা ইসলাম গ্রহণ করে, তবে সেই ইসলাম গ্রহণযোগ্য হবে কি না, সে বিষয়ে ওলামায়ে কিরামের মধ্যে দ্বিমত রয়েছে:
হাম্বালী ও শাফেঈ মাযহাব: তাদের মতে এটি ইসলাম গ্রহণ হিসেবে গণ্য হবে না যতক্ষণ না বাধ্যবাধকতা দূর হওয়ার পর সে স্বেচ্ছায় ইসলামের ওপর টিকে থাকে। (হাদীস নং ১৭; আল-মুগনী)
হানাফী মাযহাব: গ্রহণযোগ্য মত অনুযায়ী, এটি ইসলাম গ্রহণ হিসেবেই গণ্য হবে এবং তাকে পুনরায় কুফরিতে ফিরে যেতে দেওয়া হবে না। (তাবঈনুল হাকাইক্ক)
এখানে প্রথম মতটিই (শাফেঈ ও হাম্বালী) অধিকতর সঠিক বলে প্রতীয়মান হয়।
বংশগত ও পরিস্থিতিগত মুসলিম পরিচয়
একজন ব্যক্তি নিম্নোক্ত উপায়েও মুসলিম হিসেবে গণ্য হতে পারে:
১. মুসলিম পিতা-মাতার মাধ্যমে:
সমস্ত ওলামায়ে কিরাম একমত যে, মুসলিম পিতা-মাতার ঘরে ভূমিষ্ঠ শিশু মুসলিম হিসেবেই গণ্য হবে। একইভাবে কাফির দম্পতি মুসলিম হলে তাদের না-বালেগ সন্তানরাও মুসলিম হবে। যদি পিতা-মাতার একজন মুসলিম হন, তবে সন্তান মুসলিম হিসেবেই গণ্য হবে। (বুখারী; ফাতহুল বারী-৩/২২০) এর দলিল হলো রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর বাণী: “ইসলাম সবার উপরে, ইসলামের উপরে কিছু বিজয়ী হতে পারে না।” (হাদীস নং ১৮; দারে কুতনী)
২. যুদ্ধবন্দী শিশুর ক্ষেত্রে:
শিশু অবস্থায় যুদ্ধে বন্দী হওয়ার মাধ্যমে মুসলিম হিসেবে গণ্য হওয়ার ক্ষেত্রে উক্ত শিশুর ইচ্ছার কোনো গুরুত্ব নেই। এটিও একটি বাধ্যতামূলক পদ্ধতি।
“দ্বীনের মধ্যে জবরদস্তি নেই” আয়াতের ব্যাখ্যা
বর্তমানে অনেক চিন্তাবিদ প্রচার করেন যে, ইসলামে কাউকে বাধ্য করার সুযোগ নেই। তারা সূরা বাকারার ২৫৬ নম্বর আয়াত (“দ্বীনের মধ্যে কোনো জবরদস্তি নেই”) বা সূরা ইউনুসের ৯৯ নম্বর আয়াত পেশ করেন। তবে ওলামায়ে কিরামের মতে, এ সকল আয়াতকে অন্যান্য দলিল ও রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর আমলের সাথে সমন্বয় করে বুঝতে হবে।
“দ্বীনের মধ্যে জবরদস্তি নেই” আয়াতটি কেবল সেই সব কাফিরদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য যারা জিজিয়া দিতে সম্মত হয়েছে। কিন্তু যারা জিজিয়া দিতে নারাজ বা যারা মুরতাদ হয়ে গেছে, তাদের ক্ষেত্রে বাধ্য করার বিধানই প্রযোজ্য হবে। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: “যে তার দ্বীন পরিবর্তন করে তাকে হত্যা করো।” (বুখারী) সুতরাং, প্রতিটি আয়াতকে তার সঠিক প্রেক্ষাপটে প্রয়োগ করতে হবে; ঢালাওভাবে সব ক্ষেত্রে জবরদস্তি নিষিদ্ধ করা হয়নি। (হাদীস নং ২৯)
ফুটনোটসমূহ:
(১১) হাদীসটি ইমাম আবু দাউদ বর্ণনা করেছেন এবং এর সনদকে দুর্বল বলেননি, অর্থাৎ তিনি হাদীসটিকে গ্রহণযোগ্য মনে করেছেন। আল-হাইছামী মাজমুয়ায়ে যাওয়ায়েদে বলেছেন, “এই হাদীসের রাবিরা বিশ্বস্ত।” তবে শায়েখ আলবানী হাদীসটিকে দুর্বল বলেছেন।
(১২) সহীহ বুখারী ও মুসলিম; হাদীসটি পূর্বে উল্লেখ করা হয়েছে।
(১৩) ইবনুল আরবী বলেন, “একজন মুসলিম যখন এমন কোনো কাফিরের সাক্ষাৎ পায় যার সাথে কোনো চুক্তি নেই, তবে তার জন্য তাকে হত্যা করা বৈধ।” (আহকামুল কুরআন)। মোল্লা আলী ক্বারী আল-হানাফী ইমাম আল-খাত্তাবী থেকে বর্ণনা করেন, “কাফিরদের রক্তের ব্যাপারে মূলনীতি হলো তা বৈধ (ইবাহাত)।” (মিরকাতুল মাফাতিহ)। অর্থাৎ চুক্তি না থাকলে তাদের রক্ত নিষিদ্ধ নয়।
(১৪) ইসলামী রাষ্ট্রের অনুগত কর (জিজিয়া) দিয়ে বসবাসকারী কাফিররা।
(১৫) ইসলাম সম্পর্কে জানার উদ্দেশ্যে বা ব্যবসার প্রয়োজনে কর্তৃপক্ষের অনুমতি নিয়ে অল্প সময়ের জন্য ইসলামী রাষ্ট্রে আশ্রয়গ্রহণকারী কাফিররা।
(১৬) নিজেদের ভূখণ্ডে অবস্থান করেই মুসলিমদের সাথে যুদ্ধবিরতির চুক্তি করে যেসব কাফিররা।
(১৭) যদি জিম্মী বা মুস্তা’মানকে বাধ্য করা হয়, তবে তার ইসলাম ধর্তব্য হবে না যতক্ষণ না সে স্বেচ্ছায় এর ওপর টিকে থাকে। (আল-মুগনী)।
(১৮) দারে কুতনী, বুলুগুল মারাম। ইমাম বুখারী হাদীসটিকে মাওকুফভাবে সনদ ছাড়া উল্লেখ করেছেন। ইবনে হাজার আসকালানী ও শায়েখ আলবানী হাদীসটিকে ‘হাসান’ বলেছেন। (ফাতহুল বারী-৩/২২০; ইরওয়াউল গালীল-১২৬৮)।
(২৮) এ বিষয়ে পরবর্তী অধ্যায়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হবে ইনশা-আল্লাহ।
(২৯) আমীরুল মু’মিনীন উমর ইবনুল খাত্তাব (রা.) এবং অন্যান্য সাহাবারা শর্ত করতেন যে, অমুসলিমরা ইসলামী রাষ্ট্রে তাদের ধর্মীয় উৎসবসমূহ প্রকাশ্যে পালন করতে পারবে না। (মাজমুউল ফাতাওয়া; তাফসীরে ইবনে কাছির)।

জবরদস্তি 22
জবরদস্তি 24
জবরদস্তি 26
জবরদস্তি 28
জবরদস্তি 30
জবরদস্তি 32
জবরদস্তি 34

শিরককারীর রক্ত হালাল

বাংলাদেশের প্রখ্যাত আলেম এবং ইসলামী ফিকাহ শাস্ত্রের অন্যতম পণ্ডিত ড. আবু বকর মুহাম্মদ যাকারিয়ার সম্পাদনায় প্রকাশিত মো আব্দুল কাদেরের বই বাংলাদেশে প্রচলিত শির্ক বিদ‘আত ও কুসংস্কার পর্যালোচনা গ্রন্থে পরিষ্কারভাবেই বলা আছে যে, শিকর হচ্ছে হত্যাযোগ্য অপরাধ। যারা শিরক করে, তাদের রক্ত মুসলিমদের জন্য হালাল! আসুন সরাসরি বই থেকে দেখি, [13]-

জবরদস্তি 36

উপসংহার: বিশ্বাসের স্বাধীনতা বনাম প্রাতিষ্ঠানিক জবরদস্তি

উপরোক্ত তাত্ত্বিক আলোচনা, ঐতিহাসিক দলিল এবং নির্ভরযোগ্য শাস্ত্রীয় তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করলে একটি ধ্রুব সত্য আমাদের সামনে উন্মোচিত হয়: ইসলামে ‘ধর্মীয় স্বাধীনতা’র ধারণাটি কোনো শাশ্বত নৈতিক ভিত্তি নয়, বরং এটি একটি পরিস্থিতিগত ও কৌশলগত অবস্থান। যখন মক্কী জীবনে মুসলিমরা সংখ্যালঘু ও শক্তিহীন ছিল, তখন ‘সহনশীলতা’ ও ‘শান্তি’র বাণীগুলো (যেমন: লা ইকরাহা ফিদ্দীন) প্রচার করা হয়েছে। কিন্তু মদিনায় গিয়ে যখনই তারা সামরিক ও রাজনৈতিক শক্তিতে বলীয়ান হলো, তখনই সেই ‘সহনশীলতা’র স্থান দখল করে নিল ‘তরবারির আয়াত’ এবং আক্রমণাত্মক জিহাদের নির্দেশ। অর্থাৎ, ক্ষমতা ও জনবল বৃদ্ধি পাওয়ার সাথে সাথেই ইসলাম তার আদিম ও জবরদস্তিমূলক রূপে আত্মপ্রকাশ করেছে।

ইসলামের এই কাঠামোগত জবরদস্তি আধুনিক সভ্য সমাজের মৌলিক মানবাধিকারগুলোর সাথে সরাসরি সাংঘর্ষিক। এর কারণগুলো হলো:

১. বিবেকের স্বাধীনতার অভাব: একজন মানুষ যে বিশ্বাসের মধ্যে জন্ম নিয়েছে, বা যাকে বলপ্রয়োগের মাধ্যমে কোনো বিশ্বাসে আনা হয়েছে, সেখান থেকে তার বের হওয়ার পথটি চিরতরে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। ধর্মত্যাগের শাস্তি হিসেবে মৃত্যুদণ্ড প্রদান করা—মানবাধিকারের ইতিহাসে সবচাইতে বড় বর্বরতা এবং এটি ব্যক্তির আত্মনিয়ন্ত্রণ অধিকারের নগ্ন লঙ্ঘন।
২. কাঠামোগত বৈষম্য: অমুসলিমদের ওপর জিজিয়া কর আরোপ এবং তাদের সামাজিকভাবে অবমাননাকর অবস্থায় রাখার যে বিধান শরীয়া শাস্ত্রে রয়েছে, তা আধুনিক ‘নাগরিক সমতা’র ধারণাকে ধুলোয় মিশিয়ে দেয়। এটি মূলত একটি বৈষম্যমূলক সাম্প্রদায়িক ব্যবস্থা, যা অমুসলিমদের দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিকে পরিণত করে।
৩. শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের অন্তরায়: আধুনিক বিশ্ব যেখানে ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে ‘লিভ অ্যান্ড লেট লিভ’ (নিজে বাঁচো এবং অন্যকে বাঁচতে দাও) নীতিে বিশ্বাসী, সেখানে ইসলাম শিখিয়ে থাকে ‘দারুল হারব’ (শত্রু দেশ) ও ‘দারুল ইসলাম’ (ইসলামী দেশ) বিভাজন। জিহাদ ও কিতালের মাধ্যমে আল্লাহর আইন বা খেলাফত প্রবর্তনের এই দীক্ষা মূলত বিশ্বব্যাপী এক অস্থিরতা ও উগ্রবাদের জন্ম দেয়।

পরিশেষে এটি বলা যায় যে, ইসলাম ধর্ম তার আদি ও অকৃত্রিম রূপে কোনোভাবেই একটি মানবিক ও সভ্য সমাজের উপযোগী নয়। বিশ্বাসের জগতে জোর-জবরদস্তি প্রবেশ করানোর মাধ্যমে এটি মানুষের সৃজনশীলতা ও সত্য অনুসন্ধানের পথকে রুদ্ধ করে দেয়। যে ধর্ম তরবারির ভয় দেখিয়ে বা আইনি দমন-পীড়নের মাধ্যমে নিজের সংখ্যা বৃদ্ধি করতে চায়, তা আর যা-ই হোক, মুক্তিকামী মানুষের জন্য কোনো পাথেয় হতে পারে না। বরং এটি একটি রাজনৈতিক আধিপত্যবাদী ব্যবস্থা, যা শান্তির পরিবর্তে বিভাজন এবং স্বাধীনতার পরিবর্তে দাসত্বকেই বেশি মহিমান্বিত করে।


তথ্যসূত্রঃ
  1. সূরা বাকারা, আয়াত: ২৫৬ ↩︎
  2. Universal Declaration of Human Rights, Article 18 ↩︎
  3. UN Convention on the Rights of the Child ↩︎
  4. সূরা বাকারা, আয়াত ২৫৬ ↩︎
  5. তাফসীরে ইবনে কাসীর, সূরা বাকারা, আয়াত: ২৫৬ ↩︎
  6. তাফসীরে জালালাইন, সূরা বাকারা, আয়াত: ২৫৬ ↩︎
  7. সূনান আত তিরমিজী (তাহকীককৃত), হাদিসঃ ২৬০৭ ↩︎
  8. সূনান আত তিরমিজী (তাহকীককৃত), হাদিসঃ ২৬০৮ ↩︎
  9. সহীহ বুখারী, তাওহীদ পাবলিকেশন, হাদিসঃ ৩১৫৯ ↩︎
  10. সহীহ বুখারী, তাওহীদ পাবলিকেশন, তৃতীয় খণ্ড, পৃষ্ঠাঃ ৩৫৭, ৩৫৮ ↩︎
  11. আহকামুল কুরআন, খায়রুন প্রকাশনী, দ্বিতীয় খণ্ড, পৃষ্ঠা ৩৫৫ – ৩৫৮ ↩︎
  12. আল-ইতকান ফি তাওহীদ আর-রহমান, শাইখ আব্দল্লাহ আল মুনির, পৃষ্ঠা ১৪-১৭, ২৫-২৭ ↩︎
  13.  বাংলাদেশে প্রচলিত শির্ক বিদ‘আত ও কুসংস্কার পর্যালোচনা ২. শির্কের পরিণতি ↩︎