
Table of Contents
ভূমিকাঃ ১৯৭১-এর কালরাত্রি ও যুদ্ধের সংজ্ঞা
যেকোনো মানবিক ও সভ্য সমাজের অস্তিত্ব টিকে থাকে কিছু অলিখিত নৈতিক চুক্তির ওপর। যুদ্ধও তার বাইরে নয়। ১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চের সেই বিভীষিকাময় রাতে যখন পাকিস্তানি সেনাবাহিনী ঘুমন্ত ও নিরস্ত্র বাঙালি জনগোষ্ঠীর ওপর হায়েনার মতো ঝাঁপিয়ে পড়েছিল, তখন তারা কেবল একটি জনপদকে আক্রমণ করেনি, বরং তারা যুদ্ধের চিরন্তন নৈতিক ব্যাকরণকে পদদলিত করেছিল। ঘুমন্ত মানুষ হলো পৃথিবীর সবচেয়ে অসহায় ও অরক্ষিত সত্তা। যে ব্যক্তি যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত নয়, যার হাতে আত্মরক্ষার কোনো ঢাল নেই, তার ওপর আক্রমণের অর্থ হলো ‘বীরত্ব’ নয়, বরং ‘কাপুরুষোচিত অপরাধ’। আধুনিক যুদ্ধাপরাধের মানদণ্ডে বেসামরিক জনগণের ওপর, বিশেষ করে নারী ও শিশুদের ওপর এই পরিকল্পিত সংহার কেবল কৌশলগত সিদ্ধান্ত নয়, বরং এটি মানবতার বিরুদ্ধে এক চরম অপরাধ (Crimes Against Humanity)।
রাতের নিস্তব্ধতায়, কোনো আগাম সতর্কতা বা যুদ্ধের ঘোষণা ছাড়াই যখন একটি সশস্ত্র গোষ্ঠী সাধারণ মানুষের ওপর চড়াও হয়, তখন সমাজতাত্ত্বিক ও দার্শনিক সংজ্ঞায় তাকে ‘যুদ্ধ’ বলা চলে না। একে বড়জোর দস্যুবৃত্তি বা পৈশাচিক ডাকাতি হিসেবে চিহ্নিত করা যায়। আশ্চর্যের বিষয় হলো, ইতিহাসের বিভিন্ন বাঁকে এই নৃশংসতাকে ‘রণকৌশল’ হিসেবে জায়েজ করার চেষ্টা করা হয়েছে। এমনকি মুমিন সমাজের একটি অংশ যখন নবী মুহাম্মদের যুদ্ধ অভিযানগুলোকে আধুনিক গেরিলা যুদ্ধের সাথে তুলনা করেন, তখন তারা একটি মৌলিক নৈতিক ফারাককে সুকৌশলে এড়িয়ে যান। শুধু যে আক্রমণাত্মক জিহাদের কথাই এখানে বলা হচ্ছে তা নয়, এর সাথে যুক্ত হয় নবী মুহাম্মদের গুপ্তহত্যার ঘটনাগুলিও, যেখানে ঘুমন্ত মানুষকে পর্যন্ত হত্যা করা হয়েছিল। সেই প্রসঙ্গে বিস্তারিত এই প্রবন্ধে আলোচনা করা হয়েছে।
গেরিলা যুদ্ধ একটি স্বীকৃত সামরিক পদ্ধতি হতে পারে, কিন্তু তার প্রধান শর্ত হলো লক্ষ্যবস্তুর নিখুঁত পার্থক্যকরণ (Distinction)। মুক্তিযুদ্ধের সময় বাঙালি মুক্তিযোদ্ধারা যখন দখলদার বাহিনীর ওপর অতর্কিত হামলা করতেন, তখন তাদের মূল লক্ষ্য থাকতো শত্রুর সামরিক শক্তিকেন্দ্র। সেখানে বেসামরিক নাগরিকদের জানমালের সুরক্ষা নিশ্চিত করা ছিল এক অলিখিত শপথ। কিন্তু যখন কোনো বাহিনী রাতের আঁধারে নারী-শিশু নির্বিশেষে একটি জনপদের ওপর আক্রমণ চালায়, যেখানে আক্রান্তদের পলায়ন বা প্রস্তুতির কোনো সুযোগ থাকে না, তখন তা আর মুক্তি সংগ্রাম বা গেরিলা লড়াইয়ের সংজ্ঞায় পড়ে না। সেটি হয়ে দাঁড়ায় স্রেফ এক অন্ধ পাশবিকতা, যা আমরা ১৯৭১-এর সেই অভিশপ্ত রাতে প্রত্যক্ষ করেছিলাম এবং যার ছায়া আমরা ইতিহাসের আরও গভীরে, প্রাচীন রণক্ষেত্রগুলোতেও খুঁজে পাই।
গেরিলা যুদ্ধ বনাম দস্যুবৃত্তিঃ নৈতিকতার সীমারেখা ও ‘যূথবদ্ধ অপরাধে’র দর্শন
গেরিলা যুদ্ধ আধুনিক ও প্রাচীন সমরবিদ্যায় একটি স্বীকৃত কৌশল হলেও, এর নৈতিক ভিত্তি দাঁড়িয়ে থাকে ‘লক্ষ্যভেদে’র বিচক্ষণতার ওপর। গেরিলা আক্রমণের মূল দর্শন হলো—দুর্বল পক্ষ যখন শক্তিশালী প্রতিপক্ষের মুখোমুখি হয়, তখন সরাসরি সম্মুখ সমরে না গিয়ে অতর্কিত আঘাতের মাধ্যমে শত্রুর সামরিক কাঠামোকে পঙ্গু করে দেওয়া। কিন্তু এই সামরিক কৌশলের একটি অলিখিত এবং অলঙ্ঘনীয় শর্ত হলো ‘পার্থক্যকরণ’ (Principle of Distinction)। অর্থাৎ, আক্রমণ হবে কেবল অস্ত্রধারী যোদ্ধার বিরুদ্ধে; কোনোভাবেই সেখানে বেসামরিক নাগরিক, নারী বা শিশুদের অন্তর্ভুক্ত করা যাবে না। যখন কোনো সশস্ত্র গোষ্ঠী এই সীমারেখা অতিক্রম করে রাতের অন্ধকারে ঘুমন্ত নিরস্ত্র জনপদে ঝাঁপিয়ে পড়ে, তখন সেটি আর বীরত্বপূর্ণ ‘গেরিলা যুদ্ধ’ থাকে না; বরং তা স্রেফ নৃশংস দস্যুবৃত্তি বা ডাকাতির নামান্তর হয়ে দাঁড়ায়।
একটি আক্রমণ ‘গেরিলা যুদ্ধ’ নাকি ‘নৃশংস অপরাধ’, তা বোঝার সবচেয়ে সহজ মানদণ্ড হলো আক্রমণের লক্ষ্যবস্তু। যদি কোনো হামলায় বেসামরিক জনগণের জানমালের সুরক্ষা নিশ্চিত না করে নির্বিচারে রক্তপাত ঘটানো হয়, তবে তা সমরকৌশল নয়—তা মানবিক লাঞ্ছনা। ইসলামের ইতিহাসের দিকে তাকালে আমরা দেখতে পাই, প্রাথমিক যুগের জিহাদ বা অভিযানগুলোতে এই ‘অতর্কিত আক্রমণ’ বা ‘বায়াতাত’ (Night raids) ছিল অত্যন্ত নিয়মিত ঘটনা। ইসলামের পক্ষ থেকে দাবি করা হয় যে এগুলো ছিল বীরত্বপূর্ণ বিজয়, কিন্তু এর গভীরে লুকিয়ে আছে এক ভয়াবহ নৃশংসতা। মদিনার প্রাথমিক যুগের ইতিহাসে দেখা যায়, নবী মুহাম্মদ বনূ মুসতালিকের ওপর এমন এক সময়ে আক্রমণ চালিয়েছিলেন যখন তারা ছিল নিজ বসবাসের স্থানে, অপ্রস্তুত এবং তাদের পশুদের পানি পান করাচ্ছিল। কোনো পূর্ব ঘোষণা বা যুদ্ধের আহ্বান ছাড়াই এমন হামলা আধুনিক যুদ্ধাপরাধের সংজ্ঞায় ‘বর্বরতা’ হিসেবেই গণ্য হবে। [1] [2] –
সহীহ মুসলিম (ইফাঃ)
অধ্যায়ঃ ৩৩/ জিহাদ ও এর নীতিমালা
পরিচ্ছেদঃ ১. যে সকল বিধর্মীর কাছে ইসলামের দাওয়াত পৌঁছেছে, পূর্ব ঘোষণা ব্যতীত তাদের বিরুদ্ধে আক্রমন পরিচালনা বৈধ
৪৩৭০। ইয়াহইয়া ইবনু ইয়াহইয়া তামীমী (রহঃ) … ইবনু আউন (রহঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বললেন, আমি নাফি’ (রহঃ) কে এই কথা জানতে চেয়ে পত্র লিখলাম যে, যুদ্ধের পূর্বে বিধর্মীদের প্রতি দ্বীনের দাওয়াত দেওয়া প্রয়োজন কি না? তিনি বলেন, তখন তিনি আমাকে লিখলেন যে, এ (নিয়ম) ইসলামের প্রারম্ভিক যুগে ছিল। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বনূ মুসতালিকের উপর আক্রমণ করলেন এমতাবস্থায় যে, তারা অপ্রস্তুত ছিল (তা জানতে পারেনি।) তাদের পশুদের পানি পান করানো হচ্ছিল। তখন তিনি তাদের যোদ্ধাদের (পূর্ণ বয়স্ক পুরুষ) হত্যা করলেন এবং অবশিষ্টদের (নারী শিশুদের) বন্দী করলেন। আর সেই দিনেই তাঁর হস্তগত হয়েছিল। (ইয়াহইয়া বলেন যে, আমার ধারণা হল, তিনি বলেছেন) জুওয়ায়রিয়া অথবা তিনি নিশ্চিতরূপে ইবনাতুল হারিছ (হারিছ কন্যা) বলেছিলেন। বর্ণনাকারী বলেন, এই হাদীস আমাকে আবদুল্লাহ ইবনু উমর (রাঃ) বর্ণনা করেছেন। তিনি সেই সেনাদলে ছিলেন।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ ইবনু ‘আউন (রহঃ)

এই ধরণের অতর্কিত হামলার সবচেয়ে অন্ধকার দিক হলো নারী ও শিশুদের নিরাপত্তা হীনতা। রাতের অন্ধকারে যখন উন্মুক্ত তরবারি নিয়ে আক্রমণ চালানো হয়, তখন কে যোদ্ধা আর কে নিরপরাধ শিশু—তা বিচার করার কোনো অবকাশ থাকে না। নবী মুহাম্মদের কাছে যখন তাঁর অনুসারীরা এই আশঙ্কার কথা জানালেন যে, রাতের আঁধারে অনিচ্ছাকৃতভাবে নারী ও শিশুরাও তো মারা পড়তে পারে; তখন তিনি যে উত্তর দিয়েছিলেন তা অত্যন্ত অমানবিক এবং দার্শনিক দিক থেকে বিপজ্জনক। তিনি বলেছিলেন, “তারাও (নারী ও শিশুরা) তাদেরই (কাফেরদেরই) অন্তর্ভুক্ত।” [3] [4] [5] [6]
সহীহ মুসলিম (ইফাঃ)
অধ্যায়ঃ ৩৩/ জিহাদ ও এর নীতিমালা
পরিচ্ছদঃ ৯. রাতের অতর্কিত আক্রমনে অনিচ্ছাকৃতভাবে নারী ও শিশু হত্যায় দোষ নেই
৪৩৯৯। ইয়াহইয়া ইবনু ইয়াহইয়া, সাঈদ ইবনু মনসুর ও আমর আন নাকিদ (রহঃ) … সা’ব ইবনু জাছছামা (রাঃ) থেকে বর্ণিত যে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে মুশরিকদের নারী ও শিশু সন্তান সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হলো, যখন রাতের আধারে অতর্কিত আক্রমণ করা হয়, তখন তাদের নারী ও শিশুরাও আক্রান্ত হয়। তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ তারাও তাদের (মুশরিকদের) অন্তর্ভুক্ত।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
সহীহ মুসলিম (হাঃ একাডেমী)
অধ্যায়ঃ ৩৩। জিহাদ ও সফর
পরিচ্ছদঃ ৯. রাতের আকস্মিক হামলায় অনিচ্ছাকৃতভাবে নারী ও শিশু হত্যায় দোষ নেই
৪৪৪২-(২৭/…) আবদ ইবনু হুমায়দ (রহঃ) ….. সা’ব ইবনু জাসসামাহ্ (রাযিঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে জিজ্ঞেস করলাম, হে আল্লাহর রসূল! আমরা রাতের অন্ধকারে আকস্মিক হামলায় মুশরিকদের শিশুদের উপরও আঘাত করে ফেলি। রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তারাও তাদের (মুশরিক যোদ্ধাদের) মধ্যে গণ্য। (ইসলামিক ফাউন্ডেশন ৪৪০০, ইসলামিক সেন্টার ৪৪০০)
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
সুনানে ইবনে মাজাহ
তাওহীদ পাবলিকেশন
অধ্যায়ঃ ১৮/ জিহাদ
১/২৮৩৯। সাব‘ ইবনে জাসসামা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাতের বেলা মুশরিকদের মহল্লায় অতর্কিত আক্রমণ প্রসঙ্গে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে জিজ্ঞেস করা হলো, যাতে নারী ও শিশু নিহত হয়। তিনি বলেনঃ তারাও (নারী ও শিশু) তাদের অন্তর্ভুক্ত।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)

নবীর এই একটি বাক্য—‘তারাও তাদেরই অন্তর্ভুক্ত’—ব্যক্তির ব্যক্তিগত দায়মুক্তির ধারণাকে চিরতরে নস্যাৎ করে দেয়। এটি ‘যূথবদ্ধ শাস্তি’ বা ‘Collective Punishment’-এর এক চরম বহিঃপ্রকাশ। এই দর্শনের অর্থ হলো, যেহেতু পুরুষরা ইসলাম গ্রহণ করেনি বা তারা শত্রু, সেহেতু তাদের পরিবারের নিরপরাধ শিশু ও নারীরাও ‘শত্রু’ হিসেবেই গণ্য হবে এবং তাদের জীবনের কোনো স্বতন্ত্র মূল্য থাকবে না। এই ধরণের চিন্তাধারা কোনোভাবেই কোনো মানবিক বা ন্যায়সঙ্গত গেরিলা যুদ্ধের অংশ হতে পারে না। বরং এটি সরাসরি যুদ্ধাপরাধ এবং নৃশংস বর্বরতা। এর পরের ধাপে বিজয়ী পক্ষ যখন অবশিষ্ট নারী ও শিশুদের গনিমতের মাল হিসেবে বন্দী করে এবং যৌনদাসী হিসেবে বাজারে বিক্রি করে, তখন তা আধুনিক সভ্যতার চোখে এক চরম অসভ্যতা হিসেবে প্রতিভাত হয়। এই তথাকথিত ‘পবিত্র যুদ্ধ’ আসলে ছিল রাতের অন্ধকারে নিরস্ত্র মানুষের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়া এক পরিকল্পিত দস্যুবৃত্তি, যেখানে নারী ও শিশুদের আর্তনাদকে ‘আল্লাহর বিজয়’ বলে উদযাপন করা হয়েছে।
গনিমতের দর্শন ও লুণ্ঠিত মানবতাঃ দাসত্বকে ‘পবিত্র’ করার অপপ্রয়াস
যুদ্ধের ময়দানে যখন অস্ত্রের ঝনঝনানি থামে, তখন শুরু হয় বিজিত পক্ষের ওপর বিজয়ীর একচ্ছত্র আধিপত্যের অধ্যায়। কিন্তু যুদ্ধের এই পরবর্তী পর্যায়টি যদি হয় লুণ্ঠিত বেসামরিক নারী ও শিশুদের ‘পণ্য’ হিসেবে ব্যবহারের উৎসব, তবে তা কোনোভাবেই কোনো মহান আদর্শের অংশ হতে পারে না। ইসলামের প্রাথমিক যুদ্ধগুলোতে আমরা এক ভয়াবহ বৈপরীত্য লক্ষ্য করি। একদিকে দাবি করা হয় এটি ‘মুক্তির ধর্ম’, অন্যদিকে যুদ্ধের পর অসহায় নারী ও শিশুদের ‘গনিমত’ বা যুদ্ধের মাল হিসেবে গণ্য করা হয়। এই ‘গনিমত’ শব্দটির মধ্যেই লুকিয়ে আছে এক চরম অমানবিক দর্শন—মানুষকে বস্তুতে রূপান্তরের দর্শন।
বনূ মুসতালিকের ওপর অতর্কিত আক্রমণের ঘটনাটি যুদ্ধের ইতিহাসে এক কলঙ্কজনক দৃষ্টান্ত। যখন একটি জনপদ তাদের প্রাত্যহিক কাজে ব্যস্ত, পশুপাখিকে জলপান করাচ্ছে—ঠিক সেই অপ্রস্তুত মুহূর্তে তাদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়া কোনো সুসংগঠিত সেনাবাহিনীর বীরত্ব হতে পারে না। এই আক্রমণে যোদ্ধাদের হত্যার পর বেঁচে যাওয়া নারী ও শিশুদের বন্দী করা হয়। এদের মধ্যে ছিলেন হারিস-কন্যা জুওয়াইরিয়া। একটি স্বাধীন জীবনের অধিকারিণী নারীকে মুহূর্তের মধ্যে ‘দাসী’ বানিয়ে ফেলা এবং বিজয়ী নেতার শয্যাসঙ্গিনী হিসেবে গ্রহণ করা কোনোভাবেই আধুনিক মানবাধিকার বা নৈতিকতার সংজ্ঞায় ‘বিজয়’ নয়; বরং এটি হলো একটি ব্যক্তির আত্মমর্যাদাকে ধুলোয় মিশিয়ে দেওয়ার চরম ঔদ্ধত্য। এই সামগ্রিক প্রক্রিয়াটি কেন আন্তর্জাতিক আইনের দৃষ্টিতে যুদ্ধাপরাধ, তা বোঝা প্রয়োজন:
ইসলামিস্টরা প্রায়ই দাবি করেন, তৎকালীন আরবে এটিই ছিল রীতি। কিন্তু প্রশ্ন হলো, একটি ‘শাশ্বত’ ও ‘ঐশ্বরিক’ ধর্ম কেন একটি অমানবিক প্রথাকে বিলুপ্ত না করে বরং তাকে আরও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দান করল? কেন যুদ্ধের বাজারে নারী ও শিশুদের নিলামে তোলার মতো নিষ্ঠুরতাকে ‘আল্লাহর বিধান’ বলে জায়েজ করা হলো? এটি আসলে কোনো গেরিলা যুদ্ধ ছিল না; ছিল এক সুপরিকল্পিত আগ্রাসন, যার মূল লক্ষ্য ছিল বিরুদ্ধবাদীদের সমূলে বিনাশ করা এবং তাদের পরিবারগুলোকে লুণ্ঠিত সম্পদ হিসেবে ভোগ করা। রাতের অন্ধকারে ঘুমন্ত মানুষের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়া থেকে শুরু করে দিনের আলোয় তাদের স্ত্রী-কন্যাদের দাসে পরিণত করা পর্যন্ত—এই পুরো প্রক্রিয়াটি একটি বর্বর দস্যুবৃত্তির প্রতিচ্ছবি, যা আধুনিক সভ্য জগতের শান্তিপ্রিয় ও মানবিক মূল্যবোধের সাথে কোনোভাবেই সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
উপসংহারঃ যুদ্ধের ছদ্মবেশে এক অমানবিক উত্তরাধিকার
১৯৭১-এর সেই রক্তঝরা কালরাত্রি থেকে শুরু করে ইতিহাসের ধুলোবালিমাখা প্রাচীন রণক্ষেত্র—সবখানেই একটি বিষয় দিবালোকের মতো স্পষ্ট: যখনই কোনো আদর্শ বা রাষ্ট্র তার সম্প্রসারণের নেশায় মত্ত হয়, তখন প্রথম বলি হয় ‘মানবিক নৈতিকতা’। আমাদের এই সামগ্রিক আলোচনা ও উপস্থাপিত শাস্ত্রীয় প্রমাণগুলো একটি চূড়ান্ত সত্যকে প্রতিষ্ঠিত করে যে, যুদ্ধের নামে রাতের অন্ধকারে ঘুমন্ত জনপদে ঝাঁপিয়ে পড়া কোনো সুসংগঠিত সামরিক কৌশল নয়, বরং এটি এক প্রকার ‘পবিত্র দস্যুবৃত্তি’। যারা ইসলামের এই আক্রমণগুলোকে আধুনিক ‘গেরিলা যুদ্ধ’ বা ‘মুক্তিযুদ্ধের’ সাথে তুলনা করে আত্মতুষ্টি লাভ করতে চান, তারা আসলে ‘মুক্তিকামী যোদ্ধার’ মহান সংজ্ঞাকেই চরমভাবে অপমান করেন।
গেরিলা যুদ্ধের মহিমা টিকে থাকে তার সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য এবং মানবিক সীমারেখার ওপর। কিন্তু বনূ মুসতালিক বা অন্যান্য অভিযানে যে ‘বায়াতাত’ বা অতর্কিত হামলার চিত্র আমরা দেখি, সেখানে লক্ষ্যবস্তুর কোনো বাছবিচার ছিল না। নবীর সেই অমোঘ বাণী—“তারাও (নারী ও শিশুরা) তাদেরই অন্তর্ভুক্ত”—ব্যক্তির স্বাধীন অস্তিত্ব ও মৌলিক অধিকারকে এক নিমিষেই ধুলোয় মিশিয়ে দিয়েছে। এটি কেবল একটি ঐতিহাসিক উক্তি নয়, বরং এটি একটি অমানবিক দর্শনের জন্মদাতা; যা নিরপরাধ শিশুকে তার পিতার অপরাধের (বা ভিন্নমতের) অংশীদার বানিয়ে ফেলে। এই ‘যূথবদ্ধ অপরাধের’ (Collective Guilt) তত্ত্বই পরবর্তীতে যুদ্ধবন্দী নারীদের যৌনদাসী হিসেবে ব্যবহার এবং শিশুদের বাজারে পণ্য হিসেবে নিলামে তোলাকে ‘বৈধতা’ দান করেছে।
আধুনিক সভ্য জগৎ যখন মানবাধিকারের সর্বজনীন ঘোষণা বা রোম সংবিধির মতো আইনের মাধ্যমে যুদ্ধবন্দী ও বেসামরিক মানুষের মর্যাদা রক্ষা করতে সচেষ্ট, তখন চৌদ্দশ বছর আগের সেই প্রথাগত বর্বরতাকে ‘ঐশ্বরিক’ বা ‘শাশ্বত’ বলে প্রচার করা কেবল অযৌক্তিক নয়, বরং বিপজ্জনক। ১৯৭১ সালের সেই রাতে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী যে হিংস্রতার পরিচয় দিয়েছিল, তার সাথে ইতিহাসের এই অতর্কিত হামলাগুলোর এক অদ্ভুত মনস্তাত্ত্বিক মিল খুঁজে পাওয়া যায়—উভয় ক্ষেত্রেই ‘অপ্রস্তুত শত্রুকে’ ঘায়েল করার উল্লাস মানবিক করুণার ঊর্ধ্বে স্থান পেয়েছে।
পরিশেষে এটিই আমাদের উপলব্ধিতে আসা উচিত যে, যে ব্যবস্থা বা আদর্শ যুদ্ধের ময়দান থেকে ধরে আনা নারীকে সম্ভোগের পণ্য বানাতে পারে এবং শিশুকে দাসের শৃঙ্খলে বাঁধতে পারে, তা আর যা-ই হোক, কোনো ‘শান্তির বার্তা’ হতে পারে না। এই নৃশংসতাগুলো কোনো যুদ্ধের ‘দুর্ঘটনা’ ছিল না, বরং এগুলো ছিল একটি সুপরিকল্পিত ব্যবস্থার অংশ। তাই আজকের মানবিক ও যুক্তিনির্ভর সমাজে দাঁড়িয়ে এই অমানবিক উত্তরাধিকারকে যুদ্ধের ‘রণকৌশল’ বলে আড়াল করার কোনো সুযোগ নেই। বরং একে ইতিহাসের এক অন্ধকার অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত করে, মানবিক মর্যাদাকে সর্বোর্ধ্বে স্থান দেওয়াই হবে প্রকৃত সত্যনিষ্ঠার পরিচয়।
তথ্যসূত্রঃ
- সহীহ মুসলিম, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, হাদিসঃ ৪৩৭০ ↩︎
- সহিহ মুসলিম, বাংলাদেশ ইসলামিক সেন্টার, ষষ্ঠ খণ্ড, পৃষ্ঠা ১৮১, হাদিসঃ ৪৩৭০ ↩︎
- সহীহ মুসলিম, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, হাদিসঃ ৪৩৯৯ ↩︎
- সহীহ মুসলিম, হাদিস একাডেমী, হাদিসঃ ৪৪৪২ ↩︎
- সুনানে ইবনে মাজাহ, তাওহীদ পাবলিকেশন, হাদিসঃ ২৮৩৯ ↩︎
- সহিহ মুসলিম শরীফ (প্রয়োজনীয় ব্যাখ্যাসহ বঙ্গানুবাদ), আল হাদীছ প্রকাশনী, ১৭ ও ১৮ তম খণ্ড, পৃষ্ঠা ৩১ ↩︎
