07.মেরাজের রাতে উম্মেহানীর ঘরে

Print Friendly, PDF & Email

মেরাজের ঘটনার সময়ে নবী মুহাম্মদের স্ত্রী খাদিজা আর জীবিত নেই। খাজিদার মৃত্যুতে নিশ্চিতভাবেই নবী দুঃখিত ছিলেন। ঐদিকে উম্মে হানীর পিতা আবু তালিবেরও সেই কাছাকাছি সময়ে মৃত্যু ঘটে। এরকম সময়ে নবীর মনে পুরনো প্রেম জেগে ওঠা অস্বাভাবিক কিছু বলে আমার মনে হয় না। সব মানুষই দুঃখের সময়, শোকের সময় প্রিয় মানুষদের সান্নিধ্য চায়। এটিই মানুষের স্বভাব। আসুন কয়েকজন প্রখ্যাত ইসলামিক আলেমের বক্তব্য শুনে নিই,


এবারে আসুন বাঙলাদেশের প্রখ্যাত একজন আলেম ড আবু বকর মুহাম্মদ যাকারিয়ার বিখ্যাত তাফসীর গ্রন্থ, যেই গ্রন্থটি সৌদি সরকার কর্তৃক সত্যায়িত, সেই বইটি থেকে দেখে নিই, [1]

অনেক ইসলামিক এপোলোজিস্টই দাবী করেন, মেরাজ বা ইসরার রাতে উম্মে হানীর সাথে উম্মে হানীর স্বামী হুবায়রা ইবন ‘আমর ইবন ‘আয়িয আল-মাখযুমীও ছিলেন। এর কারণ হিসেবে উনারা বলেন, বিবরণটিতে উম্মে হানীর কাছ থেকে “আমরা” শব্দটি এসেছে, অর্থাৎ সেই রাতে উম্মে হানীর স্বামী বাইরে ছিলে না। উম্মে হানী, উম্মে হানীর স্বামী এবং নবী মুহাম্মদ, এরা সবাই মিলে নাকি সেই রাতে নামাজ আদায় করছিলেন! অথচ, আরেকটি বিবরণ থেকে জানা যায়, নবী মুহাম্মদের ভয়ে উম্মে হানীর স্বামী দেশ ছেড়ে পালিয়ে গিয়েছিলেন, যেটি পরে আলোচনা হবে। প্রশ্ন হচ্ছে, যেই লোক নবী মুহাম্মদকে বাসায় ডেকে রাতে বউ সহ একত্রে নামাজ পড়তেন, সেই লোক মক্কা বিজয়ের পরে নিশ্চয়ই নবী মুহাম্মদের আতঙ্কে দেশ ছেড়ে পালাবেন না, তাই না? তাছাড়া, আরো জরুরি বিষয় হচ্ছে, বেশিরভাগ সূত্র থেকে জানা যায়, উম্মে হানী ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন মক্কা বিজয়ের পরে [2] । তাহলে হিজরতের পূর্বে মুহাম্মদ মক্কায় থাকাকালীন সময়ই উনারা একসাথে কেন নামাজ আদায় করতেন? সেই রাতে তো উম্মে হানী মুসলিমই ছিলেন না, তাহলে রাতের বেলা তারা নামাজ আদায় না করে থাকলে কী করতেন? হিসেব কিছুতেই মিলছে না কিন্তু। আসুন বর্ণনাগুলো পড়ি [3] [4]

2
মক্কা বিজয়ের পরে যারা ইসলাম গ্রহণ করেছিল

মুহাম্মদ ইবনে ইসহাক বলেন, মুহাম্মদ ইবন সাইব কালবী…. উম্মে হানী বিনতে আবু তালিব (রা.) হতে বর্ণিত, তিনি রাসুলুল্লাহ(ﷺ)-এর মিরাজ সম্পর্কে বলেন, যেই রাত্রে রাসুলুল্লাহ(ﷺ)-এর মিরাজ সংঘটিত হয় সেই রাতে তিনি আমার বাড়ীতে শায়িত ছিলেন। ঈশার সলাত শেষে তিনি ঘুমিয়ে যান। আমরাও ঘুমিয়ে যাই। ফজরের সামান্য আগে তিনি আমাদেরকে জাগালেন। তিনি সালাত পড়লেন এবং আমরাও তাঁর সাথে (ফজরের) সালাত পড়লাম তখন তিনি বললেনঃ হে উম্মে হানী, তোমরা তো দেখেছো আমি তোমাদের সাথে ঈশার সালাত পড়ে তোমাদের এখানেই শুয়ে পড়ি। কিন্তু এরপরে আমি বাইতুল মুকাদ্দাস গমন করি এবং সেখানে সলাত আদায় করি। এখন ফজরের সলাত তোমাদের সাথে পড়লাম যা তোমরা দেখলে। উম্মে হানী বলেন, এই বলে তিনি চলে যাওয়ার জন্য উঠে দাঁড়ালেন। আমি তাঁর চাদরের কিনারা ধরে ফেললাম। ফলে তাঁর পেট থেকে কাপড় সরে গেল। তা দেখতে ভাঁজ করা কিবতী বস্ত্রের মত স্বচ্ছ ও মসৃণ। আমি বললাম : হে আল্লাহর নবী! আপনি এ কথা লোকদের কাছে প্রকাশ করবেন না। অন্যথায় তারা আপনাকে মিথ্যাবাদী বলবে এবং আপনাকে কষ্ট দেবে। কিন্তু তিনি বললেন : আল্লাহর কসম! আমি অবশ্যই তাদের কাছে এ ঘটনা ব্যক্ত করব। তখন আমি আমার এক হাবশী দাসীকে বললাম ; বসে আছো কেন, জলদি, রাসূলুল্লাহ্(ﷺ)-এর সঙ্গে যাও, তিনি লোকদের কি বলেন তা শোনো, আর দেখো তারা কী মন্তব্য করে।

4
6

এবারে আসুন প্রথমা প্রকাশনী থেকে প্রকাশিত সিরাতে রাসুলাল্লাহ গ্রন্থ থেকে বিবরণটি দেখে নিই, [5]

রাসুলে করিমের (সা.) মিরাজ সম্পর্কে উম্মে হানী বিনতে আবু তালিব ওরফে হিন্দের কাছ থেকে কিছু বর্ণনা আমি পেয়েছি। তিনি বলেছেন, ‘আমার বাড়িতে থাকা অবস্থায়ই তিনি মিরাজে গেছেন, অন্য কোনো খান থেকে যাননি। সে রাতে তিনি আমার বাড়িতে ঘুমিয়ে ছিলেন। সে রাতে তিনি এশার নামাজ পড়ে ঘুমাতে গেলেন। আমরাও ঘুমিয়ে পড়লাম। ভোরের একটু আগে রাসুলে করিম (সা.) আমাদের জাগিয়ে দিলেন। আমরা ফজরের নামাজ পড়লাম। তারপর তিনি বললেন, “উম্মে হানি, কালকে তো এইখানে এই উপত্যকায় আপনাদের সঙ্গে আমি এশার নামাজ পড়লাম। সে তো আপনি দেখেছিলেন। তারপর আমি জেরুজালেমে গেলাম এবং ওখানে নামাজ পড়লাম। আবার এখানে আমি এক্ষনি আপনাদের সঙ্গে ফজরের নামাজ পড়লাম, এই যেমন দেখলেন । তিনি বাইরে যাওয়ার জন্য উঠে দাঁড়াতেই আমি তাঁর জামা চেপে ধরলাম, তাতে টান লেগে তাঁর পেট উদাম হয়ে গেল, যেন আমি এক ভাঁজ করা মিসরীর কাপড় ধরে টেনেছিলাম। আমি বললাম, রাসুলুল্লাহ, এ কথা কাউকে যেন বলবেন। না, ওরা বলবে এটা মিথ্যা কথা, আপনাকে তারা অপমান করবে।’ তিনি বললেন, ‘আল্লাহর কসম, তাদের আমি বলবই।’

8

এবারে আসুন একটি হাদিস পড়ি, যেখানে বলা হচ্ছে, কোন পুরুষ কোন প্রাপ্ত বয়স্কা নারীর কাছে কিছুতেই রাত যাপন করবে না; যদি না সে তার স্বামী হয় অথবা মুহরিম হয় [6],

সহীহ মুসলিম (ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
৪০/ সালাম
পরিচ্ছেদঃ ৮. নির্জনে অনাত্মীয়া স্ত্রীলোকের কাছে অবস্থান করা এবং তার কাছে প্রবেশ করা হারাম
৫৪৮৬। ইয়াহইয়াহ ইবনু ইয়াহইয়া, আলী ইবনু হুজর, ইবনু সাব্বাহ ও যুহায়র ইবনু হারব (রহঃ) … জাবির (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ সাবধান! কোন পুরুষ কোন প্রাপ্ত বয়স্কা নারীর কাছে কিছুতেই রাত যাপন করবে না; তবে যদি সে তার স্বামী হয় অথবা মাহরাম হয়।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ জাবির ইবনু আবদুল্লাহ আনসারী (রাঃ)

তথ্যসূত্র

  1. কুরআনুল করীম, বাংলা অনুবাদ ও সংক্ষিপ্ত তাফসীর, ড আবু বকর মুহাম্মদ যাকারিয়া, প্রথম খণ্ড, পৃষ্ঠা ৯৫৯ []
  2. সীরাতুল মুস্তফা (সা), আল্লামা ইদরিস কান্ধলবী, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, তৃতীয় খণ্ড, পৃষ্ঠা ৪৩ []
  3. তাফসির ইবন কাসির, ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ, ৬ষ্ঠ খণ্ড, পৃষ্ঠা ২৫১ []
  4. সীরাতুন নবী (সা.), ইবন হিশাম, ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ, দ্বিতীয় খণ্ড, পৃষ্ঠা ৭৬ []
  5. সিরাতে রাসুলাল্লাহ (সাঃ), অনুবাদ, শহীদ আখন্দ, প্রথমা প্রকাশনী, পৃষ্ঠা ২১৮ []
  6. সহীহ মুসলিম, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, হাদিস নম্বর-৫৪৮৬ []
সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত © সংশয় - চিন্তার মুক্তির আন্দোলন