
Table of Contents
- 1 ভূমিকাঃ কোরআনের হাফস ইবন সুলাইমানের কিরাআত
- 2 কিরাআত ও হাদিসঃ ভিন্ন মূল্যায়নের দ্বৈত মানদণ্ড
- 3 হাফসঃ একই মানুষের দ্বৈত পরিচয়
- 4 উসুলুল হাদিস বনাম উসুলুল কিরাআতঃ দ্বিচারিতা?
- 5 কিরাআতের ইতিহাস ও প্রভাব
- 6 হাফসের কিরাআত বনাম অন্যান্য কিরাআতঃ পাঠভেদ, অর্থগত প্রভাব
- 7 হাফসের বর্ণিত দুর্বল (জইফ) হাদিসের উদাহরণ
- 8 আসিম ইবন আবি আন-নাজুদের নির্ভরযোগ্যতা ও হাদিস শাস্ত্রের মানদণ্ড
- 9 প্রথাগত ব্যাখ্যার ব্যবচ্ছেদ এবং মানসিক বিভাজনের অযৌক্তিকতা
- 10 ১৯২৪ সালের কায়রো মুশাফ এবং হাফস পাঠের রাজনৈতিক আধিপত্য
- 11 উসুলুল কিরাআতের ‘শায’ (Shadh) বা বিরল পাঠের ধারণা এবং হাফসের একক অবস্থান
- 12 ইবন মুজাহিদের ভূমিকা এবং সাত কিরাআতের কৃত্রিম সীমাবদ্ধতা
- 13 উপসংহারঃ হাফসের দ্বৈত সত্তা
ভূমিকাঃ কোরআনের হাফস ইবন সুলাইমানের কিরাআত
ইসলামের প্রামাণ্যতা নির্ধারণে অন্যতম প্রধান ভিত্তি হলো এর বর্ণনাসূত্র বা ‘সনদ’ ব্যবস্থা। উসুলুল হাদিসের কঠোর, নির্মম ও অক্ষমাযোগ্য মাপকাঠিতে প্রত্যেক রাবির ব্যক্তিগত সততা (আদালত), স্মৃতিশক্তির প্রখরতা (যাবত-যাবত হিফজ), নৈতিক চরিত্রের অটুট অবস্থান এবং বর্ণনাধারার সামঞ্জস্যতা অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে যাচাই করা হয়। উল্লেখযোগ্য দুর্বলতা, পুনরাবৃত্ত স্মৃতিভ্রম বা নৈতিক অসংগতি ধরা পড়লে সেই রাবির বর্ণনাকে দুর্বল, মুনকার বা মাতরুক হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ করা হয়—এটাই হাদিস সমালোচনার কঠোরতার একটি বৈশিষ্ট্য।
কিন্তু এই একই শাস্ত্রীয় পদ্ধতির গভীরে লুকিয়ে আছে একটি গুরুত্বপূর্ণ এবং দীর্ঘদিনের আলোচিত ঐতিহাসিক-তাত্ত্বিক স্ববিরোধিতা যা পুরো সনদ-ব্যবস্থাকে তার মূল থেকে দুর্বল করে দেয়। বর্তমান বিশ্বে কোরআনের সর্বাধিক প্রচলিত, প্রায় সর্বজনীন পাঠরীতি (কিরাআত)-এর প্রধান বর্ণনাকারী হাফস ইবন সুলাইমান আল-কূফীকে হাদিস বিশারদগণ একজন ‘কায্যাব’ (মিথ্যাবাদী), ‘মাতরুক’ (পরিত্যাজ্য) এবং সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য ব্যক্তি হিসেবে স্পষ্টভাবে চিহ্নিত করেছেন। অথচ লক্ষণীয়ভাবে আধুনিক মুসলিম উম্মাহর সিংহভাগ—প্রায় সকল মুসলিম—তাঁরই বর্ণিত ‘হাফস ‘আন ‘আসিম’ পাঠরীতিকে ঐশ্বরিক, অপরিবর্তনীয় ও চূড়ান্ত প্রামাণ্যতার একমাত্র মানদণ্ড হিসেবে গ্রহণ করেছে। এই একই ব্যক্তিকে হাদিসের ক্ষেত্রে মিথ্যাবাদী বলে চিরতরে বাতিল করা হয়েছে, কিন্তু কোরআনের ক্ষেত্রে তাঁকে অলৌকিক স্মৃতিধর ও নির্ভুল বর্ণনাকারী হিসেবে উন্নীত করা হয়েছে—এটি কোনো সাধারণ দ্বন্দ্ব নয়, বরং ইসলামের যাচাই-পদ্ধতির মধ্যে একটি সম্ভাব্য পদ্ধতিগত অসামঞ্জস্য।
এই প্রবন্ধের উদ্দেশ্য হলো হাফস ইবন সুলাইমানের এই দ্বৈত পরিচয়ের বিশ্লেষণ করা এবং মূল্যায়ন করা যে, ইসলামের নিজস্ব সনদ-ভিত্তিক যাচাই পদ্ধতিই কীভাবে তার অভ্যন্তরীণ প্রামাণ্যতাকে একটি গুরুত্বপূর্ণ তাত্ত্বিক সমস্যার মুখে ঠেলে দিয়েছে। আমরা বিস্তারিতভাবে বিশ্লেষণ করবো যে, হাফসের কিরাআত গ্রহণ এবং একই সাথে তাঁর হাদিস বর্জনের এই চরম দ্বিমুখী নীতি কেবল একটি সাধারণ ধর্মীয় স্ববিরোধিতা নয়—বরং এর পেছনে কাজ করেছে সুগভীর রাজনৈতিক, প্রশাসনিক এবং প্রাতিষ্ঠানিক প্রভাব। এই প্রভাবই ইসলামের “সনদ ভিত্তিক অবিকৃত সংরক্ষণ” এর সমস্ত দাবিকে যৌক্তিকভাবে, তাত্ত্বিকভাবে এবং ঐতিহাসিকভাবে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করায়। এই দ্বিচারিতা ইঙ্গিত করে যে, ইসলামের প্রামাণ্যতার দাবি আসলে কোনো অটুট ঐশ্বরিক ব্যবস্থার ওপর দাঁড়িয়ে নেই; বরং এটি একটি মানব-নির্ভর ও ঐতিহাসিকভাবে বিকশিত পদ্ধতি হতে পারে—এমন সম্ভাবনা উত্থাপন করে। এই বিশ্লেষণের একটি মৌলিক অনুমান হলো, কারো কাছ থেকে শুনে মৌখিক বর্ণনার ক্ষেত্রে নির্ভরযোগ্যতা যাচাইয়ের মানদণ্ড আদর্শভাবে অভিন্ন হওয়া উচিত। যদি তা না হয়, তবে সেই ভিন্নতার যৌক্তিকতা ব্যাখ্যা করা প্রয়োজন। উল্লেখ্য, এই প্রবন্ধের অনেকগুলো রেফারেন্স আরবি গ্রন্থে রয়েছে, যেগুলো বাংলা বা ইংরেজিতেও অনুবাদ হয়নি। তাই আগ্রহী পাঠক নিজেই অনুবাদ বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্য নিয়ে বইগুলো পড়তে পারেন [1] [2] [3]।
কিরাআত ও হাদিসঃ ভিন্ন মূল্যায়নের দ্বৈত মানদণ্ড
কোরআনের কিরাআত এবং হাদিস—এই দুই জ্ঞানভান্ডারকে প্রথাগত ইসলামি বয়ানে প্রায়ই আলাদা প্রকৃতির বলে উপস্থাপন করা হয়, যেন একটির সংরক্ষণ প্রক্রিয়া অপরটির তুলনায় মৌলিকভাবে ভিন্ন বা অধিক নির্ভুল। কিন্তু বিশ্লেষণাত্মক দৃষ্টিতে দেখলে এই বিভাজনটি টেকসই নয়। উভয় ক্ষেত্রেই জ্ঞানের সংরক্ষণ ও পরিবহন সম্পূর্ণভাবে নির্ভর করেছে নির্দিষ্ট বর্ণনাকারীদের উপর—অর্থাৎ narrator-based transmission। হাদিসে যেমন একটি বক্তব্য নবী পর্যন্ত পৌঁছায় রাবিদের একটি ধারাবাহিক শৃঙ্খলের মাধ্যমে, তেমনি কোরআনের পাঠও সংরক্ষিত হয়েছে নির্দিষ্ট কারী ও রাবিদের মাধ্যমে, যাদের নাম, শৃঙ্খল, এবং শিক্ষার ধারা সুস্পষ্টভাবে লিপিবদ্ধ রয়েছে। এই দুই ক্ষেত্রেই ইসনাদ বা সনদ কাঠামোই মূল ভিত্তি—যেখানে তথ্যের গ্রহণযোগ্যতা নির্ভর করে এই শৃঙ্খলের প্রতিটি ব্যক্তির উপর।
এই ইসনাদ পদ্ধতির একটি মৌলিক বৈশিষ্ট্য হচ্ছে এটি মানবস্মৃতির উপর দাঁড়িয়ে আছে। প্রাথমিক যুগে লিখিত সংরক্ষণ সীমিত ছিল; ফলে তথ্য পরিবাহিত হয়েছে মুখে মুখে, শিক্ষার মাধ্যমে, এবং ব্যক্তিগত অনুশীলনের মাধ্যমে। এর অর্থ, উভয় ক্ষেত্রেই ভুলে যাওয়া, বিকৃতি, অতিরঞ্জন, কিংবা ইচ্ছাকৃত পরিবর্তনের সম্ভাবনা অন্তর্নিহিত ছিল। হাদিসশাস্ত্র এই মানবিক সীমাবদ্ধতাকে স্বীকার করেই অত্যন্ত কঠোর যাচাই প্রক্রিয়া তৈরি করে—যেখানে প্রতিটি রাবির সততা (‘adl), স্মৃতিশক্তি (dabt), এবং ধারাবাহিকতা (ittisal) পরীক্ষা করা হয়। একজন রাবি যদি সামান্যতম অবিশ্বস্ত বা দুর্বল স্মৃতির অধিকারী বলে বিবেচিত হন, তাহলে তার বর্ণনা বাতিল বা অন্তত দুর্বল হিসেবে চিহ্নিত হয়।
উদাহরণস্বরূপ, ইমাম বুখারী এবং ইমাম আহমদ-এর মতো হাদিস বিশারদরা অসংখ্য রাবিকে “দুর্বল”, “ত্যাজ্য”, এমনকি “মিথ্যাবাদী” বলে প্রত্যাখ্যান করেছেন শুধুমাত্র তাদের স্মৃতিশক্তির সীমাবদ্ধতা বা বর্ণনার অসামঞ্জস্যতার কারণে। অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায়, একজন ব্যক্তি ধার্মিক ও সৎ হিসেবে স্বীকৃত হলেও তার স্মৃতি দুর্বল হওয়ায় তার হাদিস গ্রহণযোগ্যতা হারিয়েছে। অর্থাৎ, এখানে শুধুমাত্র নৈতিকতাই নয়, বরং তথ্য সংরক্ষণের নির্ভুলতাও ছিল মূল বিচার মানদণ্ড। এই কঠোরতা এমন পর্যায়ে পৌঁছায় যে, একটি হাদিসের পুরো গ্রহণযোগ্যতা নির্ভর করতে পারে একটি মাত্র রাবির বিশ্বাসযোগ্যতার উপর।
কিন্তু ঠিক এই জায়গাতেই কিরাআতের ক্ষেত্রে একটি অদ্ভুত নীরবতা লক্ষ্য করা যায়। কোরআনের কিরাআতও একইভাবে নির্দিষ্ট রাবিদের মাধ্যমে সংরক্ষিত হয়েছে—যেমন একটি নির্দিষ্ট কিরাআত (যেমন হাফস ‘আন আসিম) সম্পূর্ণভাবে নির্ভর করে কয়েকজন নির্দিষ্ট ব্যক্তির বর্ণনার উপর। এই ক্ষেত্রেও ইসনাদ বিদ্যমান, এই ক্ষেত্রেও মানবস্মৃতি ও মৌখিক পরিবহনই মূল মাধ্যম। তবুও, এখানে সেই একই কঠোর যাচাই প্রক্রিয়া সমানভাবে প্রয়োগ করা হয় না, কিংবা প্রয়োগ করা হলেও তার ফলাফলকে একইভাবে গুরুত্ব দেওয়া হয় না। বরং কিরাআতের ক্ষেত্রে একটি অঘোষিত অনুমান কাজ করে—যে এই পাঠ কোনোভাবে বিশেষ সুরক্ষার অধীনে ছিল, ফলে এর বর্ণনাকারীদের ক্ষেত্রে হাদিসের মতো সংশয় প্রযোজ্য নয়।
এখানে একটি মৌলিক প্রশ্ন অনিবার্যভাবে উঠে আসে: যদি একই ধরনের ইসনাদ কাঠামো, একই ধরনের মানবস্মৃতি, এবং একই ধরনের বর্ণনাকারী-নির্ভর পদ্ধতি উভয় ক্ষেত্রেই ব্যবহৃত হয়ে থাকে, তাহলে এক ক্ষেত্রে সেই মানবিক সীমাবদ্ধতাকে কঠোরভাবে বিবেচনা করা হবে, আর অন্য ক্ষেত্রে তা উপেক্ষা করা হবে—এই বৈপরীত্যের যৌক্তিক ভিত্তি কোথায়? যদি একজন বর্ণনাকারীর স্মৃতি দুর্বল হয়, তাহলে তা কি শুধুমাত্র হাদিস বর্ণনার ক্ষেত্রেই সমস্যা সৃষ্টি করবে, কিন্তু কোরআনের পাঠ বর্ণনার ক্ষেত্রে কোনো প্রভাব ফেলবে না? মানবস্মৃতি তো প্রসঙ্গভেদে আলাদা কোনো যন্ত্রে পরিণত হয় না।
ধরা যাক, একজন রাবি একটি হাদিস ভুলভাবে বর্ণনা করলেন—এই সম্ভাবনাকে হাদিসশাস্ত্র গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করে এবং সেই অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নেয়। কিন্তু একই ব্যক্তি যদি কোরআনের একটি আয়াতের পাঠ বর্ণনা করেন, তাহলে কি সেই ভুলের সম্ভাবনা হঠাৎ করেই শূন্যে নেমে আসে? যদি না আসে, তাহলে কিরাআতের ক্ষেত্রেও একই ধরনের সংশয় প্রযোজ্য হওয়া উচিত। আর যদি বলা হয় যে কিরাআত কোনোভাবে “বিশেষভাবে সংরক্ষিত”, তাহলে সেই দাবি নিজেই প্রমাণের দাবিদার—কারণ তা ইসনাদ-নির্ভর মানবিক প্রক্রিয়ার বাইরের কোনো অতিরিক্ত সুরক্ষা দাবী করে।
এই দ্বৈত মানদণ্ড—একই মানবিক প্রক্রিয়াকে দুই ভিন্নভাবে মূল্যায়ন করা—শুধু একটি পদ্ধতিগত অসামঞ্জস্য নয়; এটি জ্ঞানতাত্ত্বিকভাবে একটি গুরুতর সমস্যা। কারণ এখানে মূলত একটি নীতি লঙ্ঘিত হচ্ছে: একই ধরনের প্রমাণ ও প্রক্রিয়ার ক্ষেত্রে একই মানদণ্ড প্রয়োগ করা। যখন এই নীতি ভেঙে ফেলা হয়, তখন পুরো যাচাই কাঠামোই প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে। ফলে, কিরাআত ও হাদিসের মধ্যে যে কৃত্রিম বিভাজন তৈরি করা হয়, তা আসলে একটি প্রতিরক্ষামূলক নির্মাণ—যা গভীর বিশ্লেষণে টিকে থাকে না।
হাফসঃ একই মানুষের দ্বৈত পরিচয়
ইসলামের পাঠসংরক্ষণ ব্যবস্থার একটি অদ্ভুত বৈপরীত্য হলো হাফস ইবন সুলাইমান আল-কূফী (মৃত্যু ১৮০ হিজরি/৭৯৬ খ্রি.) নামক ব্যক্তিকে ঘিরে তৈরি হওয়া দ্বৈত মূল্যায়ন। একই ব্যক্তি ইসলামের দুটি মৌলিক জ্ঞানশাস্ত্রে সম্পূর্ণ বিপরীত পরিচয়ে উপস্থিত। কোরআনের ক্ষেত্রে তিনি আজকের বিশ্বের সবচেয়ে প্রভাবশালী বর্ণনাকারী; কিন্তু হাদিসের ক্ষেত্রে তিনি বহু প্রাচীন মুহাদ্দিসের কাছে দুর্বল, পরিত্যাজ্য এমনকি মিথ্যাবাদী হিসেবেও বিবেচিত। এই দ্বৈত অবস্থান কেবল একটি ব্যক্তিগত বিতর্ক নয়; এটি ইসলামের সনদ-ভিত্তিক প্রামাণ্যতা পদ্ধতির ভেতরকার একটি মৌলিক তাত্ত্বিক সংকটকে প্রকাশ করে।
কোরআনের বর্ণনাকারী হিসেবে হাফস
হাফস ছিলেন কুফার বিখ্যাত ক্বারী আসিম ইবন আবি আন-নাজুদ-এর ছাত্র ও পালিতপুত্র। তিনি তাঁর উস্তাদের কাছ থেকে কোরআনের একটি নির্দিষ্ট পাঠরীতি (কিরাআত) শিখেছিলেন, যা পরবর্তীতে “হাফস ‘আন ‘আসিম” নামে পরিচিত হয়। এই পাঠরীতি মূলত কুফা অঞ্চলে প্রচলিত ছিল এবং আসিমের অন্যান্য ছাত্রদের মধ্যে শু‘বা ইবন আইয়াশও একই উস্তাদ থেকে কিরাআত বর্ণনা করতেন।
ঐতিহাসিকভাবে কোরআনের পাঠ একটিমাত্র ছিল না; বিভিন্ন অঞ্চলে বিভিন্ন ক্বারীদের পাঠ প্রচলিত ছিল। কিন্তু আধুনিক যুগে যে পাঠটি বিশ্বজুড়ে প্রায় একচ্ছত্র আধিপত্য লাভ করেছে, সেটি হলো এই হাফস ‘আন ‘আসিম কিরাআত। বিশেষত বিংশ শতাব্দীতে মিশরীয় মুদ্রণ প্রকল্পের মাধ্যমে এই পাঠ আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে পরিণত হয় এবং আজকের অধিকাংশ মুশাফ ঠিক এই রীতিতে মুদ্রিত হয়। ফলে বাস্তবতার বিচারে আজকের মুসলিম বিশ্বের অধিকাংশ মানুষ যে কোরআন পড়ে, তা ঐতিহাসিকভাবে হাফসের বর্ণিত পাঠের ওপর নির্ভরশীল।
হাফস বনাম শু‘বাঃ একই শিক্ষকের দুই ছাত্র, দুই ভিন্ন পাঠভেদ
হাফস ইবনে সুলাইমানের পাঠ (হাফস ‘আন ‘আসিম) আজ বিশ্বের অধিকাংশ মুসলিমের ব্যবহৃত কোরআন পাঠ। কিন্তু একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, হাফস ছিলেন কোরআন পাঠের শিক্ষক আসিম ইবনে আবি নাজুদ–এর একমাত্র ছাত্র নন। তার আরেকজন গুরুত্বপূর্ণ ছাত্র ছিলেন শু‘বা ইবনে আইয়াশ। অর্থাৎ একই শিক্ষক থেকে শিক্ষা নেওয়া দুই ছাত্রের মধ্যেই কোরআনের পাঠে কিছু ক্ষেত্রে ধ্বনিগত, ব্যাকরণগত এবং সীমিত অর্থগত পার্থক্য দেখা যায়।
উদাহরণস্বরূপ, হাফস ও শু‘বার পাঠে শব্দের উচ্চারণ, ব্যাকরণগত গঠন, এমনকি কখনো কখনো অর্থগত সূক্ষ্ম পার্থক্যও লক্ষ্য করা যায়। এই পার্থক্যগুলো দেখায় যে কোরআনের পাঠ সংরক্ষণ সম্পূর্ণ একরৈখিক বা অভিন্ন ছিল না; বরং একই শিক্ষকের মধ্যেও ভিন্ন পাঠের ধারা বিদ্যমান ছিল।
এই বাস্তবতা ইসলামী ঐতিহ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ দাবিকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করায়। যদি কোরআনের পাঠ সম্পূর্ণ একরৈখিক ও অভিন্নভাবে সংরক্ষিত হয়ে থাকে বলে দাবি করা হয়, তাহলে একই শিক্ষকের দুই ছাত্রের মধ্যে পাঠভেদ কেন থাকবে? আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ঐতিহাসিকভাবে হাফসের হাদিস বর্ণনার বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে বহু প্রাচীন হাদিস বিশারদ সংশয় প্রকাশ করেছেন। তবুও আজ বিশ্বব্যাপী যে কোরআন পাঠ সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হয়, সেটি মূলত তারই বর্ণিত পাঠ। ফলে একটি অদ্ভুত দ্বৈত মানদণ্ড দেখা যায়: হাদিসের ক্ষেত্রে যার বর্ণনাকে দুর্বল বলা হয়েছে, কোরআনের পাঠের ক্ষেত্রে তার বর্ণনাই হয়ে উঠেছে বিশ্ব মুসলিম সমাজের প্রধান মানদণ্ড।
হাদিস বর্ণনাকারী হিসেবে হাফস
কিন্তু হাদিস শাস্ত্রে একই ব্যক্তির মূল্যায়ন সম্পূর্ণ ভিন্ন। প্রাচীন মুহাদ্দিসগণ হাফসের স্মৃতিশক্তি, বর্ণনাধারা এবং সততা নিয়ে গুরুতর সন্দেহ প্রকাশ করেছেন। বিভিন্ন রিজাল-গ্রন্থে তাঁর সম্পর্কে কঠোর মন্তব্য পাওয়া যায়।
| মুহাদ্দিস | মন্তব্য | রেফারেন্স |
|---|---|---|
| ইমাম বুখারি | منكر الحديث – অগ্রহণযোগ্য বর্ণনা করেন | আল-দু‘আফা আল-কাবির |
| ইমাম আহমদ | ليس بثقة – বিশ্বস্ত নন | আল-ইলাল |
| ইয়াহইয়া ইবন মাঈন | كذاب – মিথ্যাবাদী | তারিখ ইবন মাঈন |
| ইমাম নাসায়ী | مترك الحديث – হাদিস বর্জনীয় | আল-দু‘আফা ওয়াল-মাতরুকিন |
| ইবন হিব্বান | সনদ পাল্টানো ও বর্ণনা বিকৃত করার অভিযোগ | আল-মাজরূহিন |
এখানে উল্লেখ্য যে, আধুনিক রক্ষণশীল পক্ষ হাফসকে ‘মিথ্যাবাদী’ বলার সূত্রগুলোকে (বিশেষ করে ইবন মাঈন ও ইবন খিরাশের বর্ণনা) ‘দুর্বল’ বা ‘অজ্ঞাত’ প্রমাণ করার আপ্রাণ চেষ্টা করে। তারা দাবি করে যে ইবন খিরাশ একজন ‘শিয়া’ বা ‘রাফিযি’ ছিলেন বলে তার সাক্ষ্য অগ্রহণযোগ্য। কিন্তু এটি একটি ধ্রুপদী ‘অ্যাড হোমিনিম’ (ব্যক্তি আক্রমণ), যা দিয়ে হাফসের জালিয়াতির ব্যাপকতাকে ঢাকা সম্ভব নয়। কারণ হাফস সম্পর্কে ইমাম আহমদ ইবন হাম্বল, ইমাম বুখারি এবং ইমাম নাসাঈর ‘মাতরুক’ (পরিত্যক্ত) এবং ‘মুনকার’ (অগ্রহণযোগ্য) হওয়ার ঘোষণাগুলো অত্যন্ত শক্তিশালী ও প্রসিদ্ধ সূত্রে প্রমাণিত। রিজাল শাস্ত্রে বহু সমালোচকের নিকট একই ধরনের নেতিবাচক মূল্যায়ন পাওয়া গেলে সেই রাবিকে সাধারণত অত্যন্ত দুর্বল বা বর্জনীয় হিসেবে বিবেচনা করা হয়। কেবল একটি বা দুটি সূত্রের চুলচেরা বিশ্লেষণ দিয়ে হাফসের সামগ্রিক অযোগ্যতাকে আড়াল করা পদ্ধতিগতভাবে অসম্ভব।
এই মন্তব্যগুলো কেবল সাধারণ সমালোচনা নয়। উসুলুল হাদিসের নিয়ম অনুযায়ী, যদি কোনো রাবিকে “কায্যাব”, “মাতরুক” বা “মুনকারুল হাদিস” বলা হয়, তাহলে তাঁর বর্ণনাকে সাধারণত গ্রহণযোগ্য বলে ধরা হয় না। কারণ এতে তার আদালত (নৈতিক নির্ভরযোগ্যতা) এবং দাবত (স্মৃতি ও সংরক্ষণ ক্ষমতা) উভয়ই প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে যায়।
এখানেই একটি মৌলিক সমস্যা তৈরি হয়। যদি কোনো ব্যক্তির স্মৃতিশক্তি এবং সততা এতটাই দুর্বল হয় যে তাঁর হাদিস বর্ণনা প্রত্যাখ্যাত হয়, তাহলে একই ব্যক্তির মাধ্যমে সংরক্ষিত কোরআনের পাঠকে কীভাবে সম্পূর্ণ নির্ভুল বলে ধরা যায়?
হাদিস এবং কিরাআত উভয়ই মৌখিক বর্ণনার ওপর নির্ভরশীল হলেও, ইসলামী ঐতিহ্যে এদের যাচাইয়ের পদ্ধতি সবসময় অভিন্ন ছিল কি না—এই প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ। অথচ একই ব্যক্তির ক্ষেত্রে এক জায়গায় এই মানদণ্ড কঠোরভাবে প্রয়োগ করা হচ্ছে, আর অন্য জায়গায় তা শিথিল করা হচ্ছে। ফলে হাফসের এই দ্বৈত পরিচয় একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উত্থাপন করে: সমস্যাটি কি ব্যক্তির মধ্যে, নাকি মূল্যায়নের পদ্ধতির মধ্যেই একটি কাঠামোগত অসামঞ্জস্য রয়েছে?
হাফস বিন সুলাইমান-এর ‘মাতরুক’ হওয়ার দলিল
হাদিস শাস্ত্রের পরিভাষায় কোনো রাবি বা বর্ণনাকারীকে যখন ‘মাতরুক’ (المتروك) বলা হয়, তখন বুঝতে হবে তাঁর গ্রহণযোগ্যতা সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে গেছে। উসুলুল হাদিসের নিয়ম অনুযায়ী, الحديث المتروك বা ‘পরিত্যক্ত হাদিস’ হলো এমন বর্ণনা যার বর্ণনাকারী সাধারণ কথাবার্তায় মিথ্যা বলার জন্য অভিযুক্ত (যদিও রাসূলের নামে সরাসরি মিথ্যাচারের প্রমাণ সবসময় না পাওয়া যায়), অথবা তার বর্ণনায় অত্যন্ত জঘন্য এবং পৌনঃপুনিক ভুল লক্ষ্য করা যায়। কোনো রাবি ‘মাতরুক’ হিসেবে চিহ্নিত হওয়ার অর্থ হলো, তার আদালত (চরিত্র) এবং দাবত (স্মৃতিশক্তি) উভয়ই ইমামদের নিকট অযোগ্য বলে প্রমাণিত। আসুন ইসলামহাউজ থেকে প্রকাশিত “হাদিস শাস্ত্রের পরিভাষা পরিচিতি” গ্রন্থ থেকে মাতরুক শব্দের অর্থ জেনে নিই, [4]

হাফস বিন সুলাইমান সম্পর্কে ইমাম আল-মিযযি তাঁর বিখ্যাত জীবনীগ্রন্থ ‘তাহযীবুল কামাল’-এ প্রাচীন মুহাদ্দিসদের যে কঠোর মতামতগুলো সংকলন করেছেন, তা নিচে উদ্ধৃত করা হলো: [5]
الله الذي خلقكم من ضعف ثم جعل من بعد ضعف قوة ثم جعل من بعد قوة ضعفا وشيبة يخلق ما يشاء وهو العليم القدير
هذا رابع استئناف من الأربعة المتقدمة رجوع إلى الاستدلال على عظيم القدرة في مختلف المصنوعات من العوالم لتقرير إمكانية البعث وتقريب حصوله إلى عقول منكريه لأن تعدد صور إيجاد المخلوقات وكيفياته من ابتدائها عن عدم أو من إعادتها بعد انعدامها ويتطور وبدونه مما يزيد إمكان البعث وضوحا عند منكريه ، فموقع هذه الآية كموقع قوله الله الذي يرسل الرياح فتثير سحابا ونظائرها كما تقدم ; ولذلك جاءت فاتحتها على أسلوب فواتح نظائرها وهذا ما يؤذن به تعقيبها بقوله ويوم تقوم الساعة يقسم المجرمون الآية .
ثم قوله الله الذي خلقكم مبتدأ وصفة ، وقوله يخلق ما يشاء هو الخبر ، أي يخلق ما يشاء مما أخبر به وأنتم تنكرون .
والضعف بضم الضاد في الآية وهو أفصح وهو لغة قريش . ويجوز في ضاده الفتح وهو لغة تميم . وروى أبو داود والترمذي عن عبد الله بن عمر قال : قرأتها على رسول الله ( الذي خلقكم من ضعف ) يعني لفتح الضاد فأقرأني ( من ضعف ) يعني بضم الضاد . وقرأ الجمهور ألفاظ ضعف الثلاثة بضم الضاد في الثلاثة . وقرأها عاصم وحمزة بفتح الضاد ، فلهما سند لا محالة يعارض حديث ابن عمر . والجمع بين هذه القراءة وبين حديث ابن عمر أن النبيء صلى الله عليه وسلم نطق بلغة الضم لأنها لغة قومه ، وأن الفتح رخصة لمن يقرأ بلغة قبيلة أخرى ، ومن لم يكن له لغة تخصه فهو مخير بين القراءتين . والضعف : الوهن واللين .
و ( من ) ابتدائية ، أي مبتدأ خلقه من ضعف ، أي من حالة ضعف ، وهي حالة كونه جنينا ثم صبيا إلى أن يبلغ أشده ، وهذا كقوله خلق الإنسان من [ ص: 128 ] عجل يدل على تمكن الوصف من الموصوف حتى كأنه منتزع منه ، قال تعالى وخلق الإنسان ضعيفا .
والمعنى : أنه كما أنشأكم أطوارا تبتدئ من الوهن وتنتهي إليه فكذلك ينشئكم بعد الموت إذ ليس ذلك بأعجب من الإنشاء الأول وما لحقه من الأطوار ، ولهذا أخبر عنه بقوله يخلق ما يشاء .
وذكر وصف العلم والقدرة لأن التطور هو مقتضى الحكمة وهي من شئون العلم ، وإبرازه على أحكم وجه هو من أثر القدرة .
وتنكير ( ضعف وقوة ) للنوعية ; ف ” ضعف ” المذكور ثانيا هو عين ضعف المذكور أولا ، و ” قوة ” المذكورة ثانيا عين ” قوة ” المذكورة أولا . وقولهم : النكرة إذا أعيدت نكرة كانت غير الأولى ، يريدون به التنكير المقصود منه الفرد الشائع لا التنكير المراد به النوعية .
وعطف ” وشيبة ” للإيماء إلى أن هذا الضعف لا قوة بعده وأن بعده العدم بما شاع من أن الشيب نذير الموت .
والشيبة : اسم مصدر الشيب . وقد تقدم في قوله تعالى واشتعل الرأس شيبا في سورة مريم .
এই বক্তব্যের বাংলা অনুবাদ নিচে দেওয়া হলো:
তাহযীবুল কামাল ফী আসমাঈর রিজাল
আল-মিযযি — জামাল উদ্দিন আবুল হাজ্জাজ আল-মিযযি
খণ্ড: ৭, পৃষ্ঠা: ১১-১৬
১৩৯০ – (ত, উস, ক্ব): হাফস বিন সুলাইমান আল-আসাদি, আবু উমর আল-বাযযায
তিনি কূফার অধিবাসী এবং একজন ক্বারী (কুরআন পাঠকারী)। তাঁকে ‘আল-গাদ্বিরি’ বলা হয় এবং ‘হাফীস’ নামেও তিনি পরিচিত। তিনি হাফস বিন আবি দাউদ এবং কিরাআত শাস্ত্রে আসিম বিন আবি আন-নুজূদের সহচর ও তাঁর স্ত্রীর গর্ভজাত সন্তান (সৎ ছেলে)। তিনি আসিমের সাথে একই ঘরে বসবাস করতেন। তাঁর বংশপরিচয় সম্পর্কে এ-ও বলা হয়েছে যে, তিনি হাফস বিন সুলাইমান বিন আল-মুগীরা। (তাহযীবুল কামাল, খণ্ড ৭, পৃষ্ঠা ১১)
যাঁদের নিকট থেকে তিনি বর্ণনা করেছেন (শিক্ষকবৃন্দ):
তিনি ইসমাইল বিন আবদুর রহমান আস-সুদ্দী, আইয়ুব আস-সাখতিয়ানি, সাবিত আল-বুনানি, হাম্মাদ বিন আবি সুলাইমান, হুমায়দ আল-খাসসাফ, সালিম আল-আফতাস, সিমাক বিন হারব, তালহা বিন ইয়াহইয়া বিন তালহা বিন উবাইদুল্লাহ, আসিম বিন আবি আন-নুজূদ, আসিম আল-আহওয়াল, আবদুল্লাহ বিন ইয়াযিদ আন-নাখয়ি, আবদুল মালিক ইবনে উমাইর, আবু হাসিন উসমান বিন আসিম, আলকামা বিন মারসাদ, কায়েস বিন মুসলিম, কাসীর বিন যাযান, কাসীর বিন শিনযীর, লাইস বিন আবি সুলিম, মুহারিব বিন দিসার, মুহাম্মদ বিন সাওক্বাহ, মুহাম্মদ বিন আবদুর রহমান বিন আবি লায়লা, মুসা বিন আবি কাসীর, মুসা আস-সাগীর, হায়সাম বিন হাবিব আস-সাররাফ, ইয়াযিদ বিন আবি যিয়াদ, আবু ইসহাক আস-সাবি’য়ি এবং আবু ইসহাক আশ-শায়বানি প্রমুখের নিকট থেকে বর্ণনা করেছেন। (তাহযীবুল কামাল, খণ্ড ৭, পৃষ্ঠা ১১)
যাঁরা তাঁর থেকে বর্ণনা করেছেন (ছাত্রবৃন্দ):
তাঁর থেকে বর্ণনা করেছেন আহমদ বিন আবদাহ আদ-দব্বি, আদম বিন আবি ইয়াস, আবু ইব্রাহিম ইসমাইল বিন ইব্রাহিম আত-তারজুমানি, বকর বিন বক্কার, জাফর বিন হুমায়দ আল-কূফি, হাসান বিন মুহাম্মদ বিন আয়ুন, আবু উমর হাফস বিন আবদুল্লাহ আল-হুলওয়ানি আদ-দরীর, হাফস বিন গিয়াস, মুহাম্মদ বিন সাদ আল-আউফির পিতা সাদ বিন মুহাম্মদ, সুলাইমান বিন দাউদ আবু রাবি’ আয-যাহরানি, সালিহ বিন মালিক আল-আযদি আল-খাওয়ারিযমি, সালিহ বিন মুহাম্মদ আত-তিরমিযি, আবু শুআইব সালিহ বিন মুহাম্মদ আল-কাওয়াস (যিনি তাঁর নিকট থেকে কিরাআতও বর্ণনা করেছেন), আবদুল্লাহ বিন আস-সাররি আল-আন্তাকি, আবদুর রহমান বিন হাম্মাদ আত-তালহি, আবদুল গাফফার বিন আল-হাকাম, উবাইদ বিন আস-সাব্বাহ আন-নাহশালি আল-খাযযায, উসমান বিন আল-ইয়ামান, আবু মনসুর ইসাম বিন আল-ওয়াদদাহ আল-বাসরি, আলী বিন হাজার আল-মারওয়াযি, আলী বিন আইয়াশ আল-হিমসি, আলী বিন ইয়াযিদ আস-সাদায়ি, আমর বিন হাম্মাদ আল-কান্নাদ, আমর বিন আস-সাব্বাহ আল-কূফি (মুক্রি), আমর বিন উসমান আর-রাক্কি, আমর বিন আউন আল-ওয়াসিতি, আমর বিন মুহাম্মদ আন-নাক্বিদ, মুহাম্মদ বিন বক্কার বিন আর-রায়্যান, মুহাম্মদ বিন হারব আল-খাওলানি, মুহাম্মদ বিন আল-হাসান আস-আসাদি, মুহাম্মদ বিন সুলাইমান লুয়াইন, আবু উমর হুবাইরা বিন মুহাম্মদ আত-তাম্মার, হিশাম বিন আম্মার আদ-দিমাশকি, ইয়াহইয়া বিন সাঈদ আল-আত্তার এবং ইয়াসরা বিন সাফওয়ান আল-লাখমি প্রমুখ। (তাহযীবুল কামাল, খণ্ড ৭, পৃষ্ঠা ১২)
ইমামদের মতামত (জরহ ও তা’দীল):
মুহাম্মদ বিন সাদ আল-আউফি তাঁর পিতার সূত্রে বর্ণনা করেন যে, তিনি হাফস বিন সুলাইমান সম্পর্কে বলেছেন: “তুমি যদি তাঁকে দেখতে, তবে তাঁর সমঝ ও জ্ঞানের গভীরতা দেখে তোমার চোখ জুড়িয়ে যেত।” (তাহযীবুল কামাল, খণ্ড ৭, পৃষ্ঠা ১২)
আবু আলী ইবনুল সাওয়াস আবদুল্লাহ বিন আহমদ বিন হাম্বলের সূত্রে বর্ণনা করেন যে, ইমাম আহমদ বিন হাম্বল তাঁকে ‘সালিহ’ (ভালো/গ্রহণযোগ্য) বলেছেন। (তাহযীবুল কামাল, খণ্ড ৭, পৃষ্ঠা ১৩)
তবে আবদুর রহমান বিন আবি হাতিম, আবদুল্লাহ বিন আহমদের বরাতে লিখেছেন যে, ইমাম আহমদ বিন হাম্বল তাঁকে ‘মাতরুকুল হাদিস’ (যাঁর হাদিস বর্জন করা হয়েছে) বলেছেন। (তাহযীবুল কামাল, খণ্ড ৭, পৃষ্ঠা ১৩)
একই কথা উমর বিন মুহাম্মদ আস-সাবূনি, হাম্বল বিন ইসহাকের সূত্রে ইমাম আহমদ থেকে বর্ণনা করেছেন। (তাহযীবুল কামাল, খণ্ড ৭, পৃষ্ঠা ১৩)
আবার উসমান বিন আহমদ ইবনে সাম্মাক, হাম্বল বিন ইসহাকের সূত্রে ইমাম আহমদ থেকে বর্ণনা করেন যে, তিনি বলেছেন: “তাঁর মধ্যে কোনো সমস্যা নেই (মা বিহি বা’স)।” (তাহযীবুল কামাল, খণ্ড ৭, পৃষ্ঠা ১৩)
ইয়াহইয়া বিন মা’ঈন বলেন, আইয়ুব বিন মুতাওয়াক্কিল মনে করতেন যে, আবু বকর বিন আইয়াশের চেয়ে হাফস বিন সুলাইমান অধিক বিশুদ্ধ কিরাআত সম্পন্ন ছিলেন, তবে আবু বকর হাফসের চেয়ে অধিক নির্ভরযোগ্য (আওসাক্ব)। (তাহযীবুল কামাল, খণ্ড ৭, পৃষ্ঠা ১৩)
আবু কুদামা আস-সারাক্বসি এবং উসমান বিন সাঈদ আদ-দারিমি ইয়াহইয়া বিন মা’ঈনের সূত্রে বর্ণনা করেন যে, হাফস ‘সিক্বাহ’ (নির্ভরযোগ্য) নন। (তাহযীবুল কামাল, খণ্ড ৭, পৃষ্ঠা ১৩)
আলী ইবনুল মাদিনী বলেছেন: “তিনি হাদিসে দুর্বল এবং আমি ইচ্ছাকৃতভাবে তাঁকে বর্জন করেছি।” (তাহযীবুল কামাল, খণ্ড ৭, পৃষ্ঠা ১৪)
ইব্রাহিম বিন ইয়াকুব আল-জুযজানি বলেছেন: “তাঁর বিষয় বহু আগেই চুকে গেছে (অর্থাৎ তিনি পরিত্যক্ত)।” (তাহযীবুল কামাল, খণ্ড ৭, পৃষ্ঠা ১৪)
ইমাম বুখারী বলেছেন: “তাঁরা (মুহাদ্দিসগণ) তাঁকে বর্জন করেছেন।” (তাহযীবুল কামাল, খণ্ড ৭, পৃষ্ঠা ১৪)
ইমাম মুসলিম বলেছেন: “তিনি মাতরুক (পরিত্যক্ত)।” (তাহযীবুল কামাল, খণ্ড ৭, পৃষ্ঠা ১৪)
ইমাম নাসায়ী বলেছেন: “তিনি নির্ভরযোগ্য নন এবং তাঁর হাদিস লেখা যাবে না।” অন্য স্থানে তিনি তাঁকে ‘মাতরুক’ বলেছেন। (তাহযীবুল কামাল, খণ্ড ৭, পৃষ্ঠা ১৪)
সালিহ বিন মুহাম্মদ আল-বাগদাদী বলেছেন: “তাঁর হাদিস লেখা যাবে না এবং তাঁর বর্ণিত সকল হাদিসই মুনকার (অস্বীকৃত)।” (তাহযীবুল কামাল, খণ্ড ৭, পৃষ্ঠা ১৪)
যাকারিয়া বিন ইয়াহইয়া আস-সাজি বলেছেন: “তিনি সিমাক, আলকামা এবং আসিম থেকে বাতিল (ভিত্তিহীন) হাদিস বর্ণনা করেন।” (তাহযীবুল কামাল, খণ্ড ৭, পৃষ্ঠা ১৪)
আবু যুরআ বলেছেন: “তিনি হাদিসে দুর্বল।” (তাহযীবুল কামাল, খণ্ড ৭, পৃষ্ঠা ১৪)
ইমাম আবু হাতিম বলেছেন: “তাঁর হাদিস লেখা যাবে না, তিনি হাদিসে দুর্বল, সত্যবাদী নন এবং মাতরুকুল হাদিস।” (তাহযীবুল কামাল, খণ্ড ৭, পৃষ্ঠা ১৫)
আবদুর রহমান বিন ইউসুফ বিন খিরাশ বলেছেন: “তিনি কذاب (চরম মিথ্যাবাদী), মাতরুক এবং হাদিস জাল করেন।” (তাহযীবুল কামাল, খণ্ড ৭, পৃষ্ঠা ১৫)
হাকিম আবু আহমদ বলেছেন: “যাঁদের হাদিস বিলুপ্ত হয়ে গেছে তিনি তাঁদের একজন (যাহিবুল হাদিস)।” (তাহযীবুল কামাল, খণ্ড ৭, পৃষ্ঠা ১৫)
শু’বা ইবনুল হাজ্জাজের সূত্রে ইয়াহইয়া বিন সাঈদ বর্ণনা করেন: “হাফস বিন সুলাইমান আমার কাছ থেকে একটি বই নিয়েছিলেন কিন্তু আর ফেরত দেননি; তিনি মানুষের বই নিয়ে সেগুলো নকল করতেন।” (তাহযীবুল কামাল, খণ্ড ৭, পৃষ্ঠা ১৫)
ইবনে আদি বলেন: “আসিমের কিরাআত সম্পর্কে হাফস এবং আবু বকর বিন আইয়াশ সবচেয়ে বেশি জ্ঞানী ছিলেন; হাফস কিরাআতে আবু বকরের চেয়ে দক্ষ ছিলেন কিন্তু তিনি ছিলেন মিথ্যাবাদী, আর আবু বকর ছিলেন সত্যবাদী।” (তাহযীবুল কামাল, খণ্ড ৭, পৃষ্ঠা ১৫)
মৃত্যু:
বলা হয়ে থাকে যে, তিনি ১৮০ হিজরিতে ৯০ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেন। আবু আমর আদ-দানি বলেন, তিনি ১৯০ হিজরির কাছাকাছি সময়ে ইন্তেকাল করেন। (তাহযীবুল কামাল, খণ্ড ৭, পৃষ্ঠা ১৫)
ওয়াকী বিন আল-জাররাহ তাঁর সম্পর্কে বলেছেন: “তিনি নির্ভরযোগ্য ছিলেন।” (তাহযীবুল কামাল, খণ্ড ৭, পৃষ্ঠা ১৬)
ইমাম তিরমিযি এবং ইমাম নাসায়ী (মুসনাদে আলী-তে) তাঁর থেকে হাদিস বর্ণনা করেছেন। এছাড়া ইবনে মাজাহ-ও তাঁর বর্ণনা গ্রহণ করেছেন। (তাহযীবুল কামাল, খণ্ড ৭, পৃষ্ঠা ১৬)
উপরে উল্লিখিত গ্রন্থ বা জীবনী-সংকলনটি একটি ঐতিহাসিক সংকটকে নগ্নভাবে ফুটিয়ে তোলে। এখানে লক্ষ্যণীয় যে, ইমাম বুখারী, মুসলিম, আহমদ বিন হাম্বল এবং নাসায়ীর মতো ইসলামের মূল প্রামাণ্যতা স্তম্ভের রক্ষকগণ একযোগে হাফসকে ‘মাতরুক’ এবং ‘মিথ্যাবাদী’ বলে রায় দিয়েছেন। উসুলুল হাদিসের ‘আদালত’ (চরিত্র) ও ‘দাবত’ (স্মৃতিশক্তি) এর মাপকাঠিতে যিনি হাদিসের ক্ষেত্রে চরমভাবে অযোগ্য ও নীতিভ্রষ্ট, তাঁরই বর্ণিত কুরআন পাঠকে কীভাবে ‘মুত্তাওয়াতির’ বা অভ্রান্ত বলে গ্রহণ করা সম্ভব?
মুহাদ্দিসরা যেখানে হাফসের হাদিস লেখাও নিষিদ্ধ করেছিলেন এবং তাঁকে ‘অসৎ’ ও ‘জালিয়াত’ সাব্যস্ত করেছিলেন, সেখানে আধুনিক ইসলামের সিংহভাগ পাঠ পদ্ধতি তাঁর ওপর নির্ভর করা একটি পদ্ধতিগত দ্বিচারিতা। যদি তাঁর নৈতিক অখণ্ডতা (Adalah) হাদিসের ক্ষেত্রে নষ্ট হয়ে থাকে, তবে সেই একই মানুষ কিরাআতের ক্ষেত্রে আমানতদার থাকবেন—এমন দাবি যৌক্তিকভাবে টেকে না। এই দ্বিমুখী নীতি স্পষ্ট করে দেয় যে, ইসলামের সনদ-ব্যবস্থা অনেক ক্ষেত্রে নিরপেক্ষ মানের বদলে প্রশাসনিক ও প্রাতিষ্ঠানিক প্রয়োজনের ভিত্তিতে নমনীয় করা হয়েছে।
উসুলুল হাদিস বনাম উসুলুল কিরাআতঃ দ্বিচারিতা?
ইসলামের প্রামাণ্যতার একমাত্র দাবীদার ভিত্তি হলো ‘সনদ’ ব্যবস্থা, আর এই সনদ-ব্যবস্থার সবচেয়ে কঠোর, নির্মম ও অক্ষমাযোগ্য শাস্ত্র হলো উসুলুল হাদিস। এই শাস্ত্রের মূল নীতি হলো: একজন রাবির (বর্ণনাকারীর) প্রত্যেকটি বর্ণনা তখনই ‘সহিহ’ (প্রামাণ্য) বলে গণ্য হবে যখন তিনি পাঁচটি অপরিহার্য শর্ত পূরণ করবেন—
বর্ণনাকারীর চারিত্রিক সততা ও নৈতিক অখণ্ডতা। এটি নিশ্চিত করে যে রাবি ব্যক্তিগত জীবনে মিথ্যাচার বা কাবিরা গুনাহ থেকে মুক্ত।
রাবির স্মৃতিশক্তির অটুট প্রখরতা ও নির্ভুলতা। এটি তথ্যের কোনো বিকৃতি ছাড়াই সঠিকভাবে তা ধারণ ও বর্ণনা করার ক্ষমতা যাচাই করে।
রাবির দেওয়া বর্ণনার সামঞ্জস্যতা। এটি নিশ্চিত করে যে বর্ণনাকারীর তথ্য পূর্ববর্তী বা সমসাময়িক নির্ভরযোগ্য বর্ণনার সাথে সাংঘর্ষিক নয়।
সনদের অবিচ্ছিন্ন সংযোগ। অর্থাৎ প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত প্রতিটি রাবি তার পূর্ববর্তী রাবির কাছ থেকে সরাসরি হাদিস শুনেছেন—এমন অকাট্য প্রমাণ।
অন্যান্য নির্ভরযোগ্য রাবিদের বিপরীতে একক বা বিরোধী বর্ণনা না হওয়া। এটি তথ্যের স্ববিরোধিতা ও বিরল ত্রুটিগুলো বর্জন করতে সাহায্য করে।
উসুলুল হাদিসের ইমামগণ (ইমাম বুখারি, ইমাম মুসলিম, ইয়াহইয়া ইবন মাঈন, ইমাম আহমদ, ইমাম নাসায়ী প্রমুখ) স্পষ্টভাবে ঘোষণা করেছেন যে, সামান্যতম দুর্বলতা—একটি মাত্র স্মৃতিভ্রম (সু-উল হিফজ), একবারের চারিত্রিক অসংগতি, মিথ্যার অভিযোগ বা অন্য নির্ভরযোগ্য রাবিদের সাথে বিরোধ—হলেই সেই রাবির সমস্ত বর্ণনা সরাসরি ‘বাতিল’, ‘মুনকার’, ‘মাতরুক’ বা ‘কায্যাব’-এর পর্যায়ে ফেলে দেওয়া হয়। এই নিয়মের কোনো ব্যতিক্রম নেই, কোনো ছাড় নেই। একজন রাবি যদি হাদিস বর্ণনায় মাত্র একটি হাদিসেও ভুল করে থাকেন বা অন্যদের সাথে সাংঘর্ষিক বর্ণনা দেন, তাহলে তাঁর পুরো সনদ ‘জইফ’ থেকে ‘মাউদু’ (জাল) পর্যায়ে চলে যায়। এটাই ইসলামের নিজস্ব প্রামাণ্যতার অটুট দাবির একমাত্র স্তম্ভ।
অথচ ঠিক এই একই মানদণ্ডে যখন আমরা হাফস ইবন সুলাইমান আল-কূফীর দিকে তাকাই, তখন দেখা যায় যে তিনি সম্পূর্ণভাবে অযোগ্য, পরিত্যাজ্য এবং মিথ্যাবাদী হিসেবে চিহ্নিত। ইমাম বুখারি তাঁকে ‘মুনকারুল হাদিস’ বলেছেন, ইমাম আহমদ ‘লায়সা বি-সিকাহ’ (বিশ্বস্ত নন), ইয়াহইয়া ইবন মাঈন সরাসরি ‘কায্যাব’ (মিথ্যাবাদী), ইমাম নাসায়ী ‘মাতরুকুল হাদিস’ (হাদিস বর্জনীয়) এবং ইবন হিব্বান তাঁকে সনদ পাল্টানো, মুরসালকে মারফু বানানোর অভিযোগে অভিযুক্ত করেছেন। অর্থাৎ হাফসের স্মৃতিশক্তি, চরিত্র এবং বর্ণনাধারা—সবকিছুই উসুলুল হাদিসের কঠোর মাপকাঠিতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ। তার হাদিস বর্ণনাগুলো সাধারণত গ্রহণযোগ্য বলে বিবেচিত হয় না।
কিন্তু আশ্চর্যের ব্যাপার, ঠিক এই একই হাফস ইবন সুলাইমানের বর্ণিত ‘হাফস ‘আন ‘আসিম’ কিরাআত আজ ইসলামি দুনিয়ার একমাত্র মানদণ্ড হয়ে দাঁড়িয়েছে। আধুনিক মুসলিম উম্মাহর প্রায় সকল মুশাফ, সকল মাদ্রাসা, সকল ইমাম এবং সকল দেশে এই পাঠকেই ‘ঐশ্বরিক’ ও ‘অপরিবর্তনীয়’ বলে গ্রহণ করা হয়। অর্থাৎ হাদিসের ক্ষেত্রে যে ব্যক্তিকে মিথ্যাবাদী ও পরিত্যাজ্য বলে চিরতরে বাতিল করা হয়েছে, কোরআনের ক্ষেত্রে ঠিক সেই ব্যক্তিকেই অত্যন্ত নির্ভুল বর্ণনাকারী হিসেবে বিবেচিত ও নির্ভুল বর্ণনাকারী হিসেবে উন্নীত করা হয়েছে।
এই দ্বিচারিতা কোনো সাধারণ অসামঞ্জস্য নয়—এটি সনদ-ভিত্তিক প্রামাণ্যতার দাবির মধ্যে একটি গুরুতর প্রশ্ন উত্থাপন করে। এই দ্বিচারিতা কয়েকটি মৌলিক ও অস্বীকার্য প্রশ্ন উত্থাপন করে যা সরাসরি ইসলামের প্রামাণ্যতার দাবিকে চূর্ণ করে দেয়:
প্রথমত, হাফসের স্মৃতিশক্তি ও সততা যদি হাদিস বর্ণনায় গ্রহণযোগ্য না হয়, তাহলে তাঁর কোরআন বর্ণনা কি ভিন্নরকমভাবে যাচাই হয়েছিল? হাদিসের একটি মাত্র লাইন মনে রাখতে গিয়ে যিনি ভুল করেন, মিথ্যা বলেন বা সনদ পাল্টান, তিনি কীভাবে কোরআনের ৬২৩৬টি আয়াতের প্রতিটি শব্দ, প্রতিটি হরফ, প্রতিটি মাখরাজ, গুন্নাহ, ইদগাম, ইখফা এবং সূক্ষ্মতম উচ্চারণগত পার্থক্য নির্ভুলভাবে মুখস্থ রাখতে পারেন? কোরআনের স্মৃতি তো হাদিসের চেয়ে অনেক বেশি জটিল ও কঠোর পরীক্ষা। যদি হাদিসে তাঁর স্মৃতি দুর্বল প্রমাণিত হয়, তাহলে কোরআনে তাঁর স্মৃতি কীভাবে অভ্রান্ত হয়ে গেল? এটা কি কোনো অলৌকিক বিশেষাধিকার? নাকি শুধুমাত্র প্রয়োজনের খাতিরে নিয়ম বদলে দেওয়া?
দ্বিতীয়ত, কোরআনের পাঠ কি হাদিস থেকে বেশি গ্রহণযোগ্য, যখন তার উৎস একই ব্যক্তি? উভয়ই শ্রুতিনির্ভর (oral transmission) বিদ্যা। উভয়েরই সনদ একই। উভয়েরই মূল্যায়নের জন্য একই উসুল প্রযোজ্য বলে ইসলাম নিজেই দাবি করে। তাহলে কেন একই ব্যক্তির একটি বর্ণনা ‘মাতরুক’ আর অন্যটি ‘মুত্তাওয়াতির’? এই দ্বৈত মানদণ্ড কি ইঙ্গিত করে না যে, ইসলামের যাচাই পদ্ধতি আসলে নিয়ম-ভিত্তিক নয়, বরং ফলাফল-ভিত্তিক? যা রক্ষা করতে চায় তা গ্রহণ, যা রক্ষা করতে চায় না তা বর্জন—এটাই কি সত্যিকারের মানদণ্ড?
তৃতীয়ত, যদি একই মানদণ্ডে যাচাই না হয়, তবে ইসলামের “সনদ ভিত্তিক প্রামাণ্যতা” (isnad-based authenticity) নিজেই কি খণ্ডিত হয় না? যদি সনদের একই রাবিকে এক ক্ষেত্রে মিথ্যাবাদী বলে বাতিল করা হয় এবং অন্য ক্ষেত্রে নির্ভুল বলে গ্রহণ করা হয়, তাহলে পুরো সনদ-ব্যবস্থাই অর্থহীন হয়ে যায়। এটি আর কোনো অটুট ঐশ্বরিক পদ্ধতি থাকে না—এটি হয়ে যায় একটি সুবিধাবাদী, রাজনৈতিক এবং প্রাতিষ্ঠানিক খেলা। ইসলাম যে দাবি করে “আমাদের সনদই পৃথিবীর সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য প্রামাণ্যতা ব্যবস্থা”, সেই দাবি এই একটি উদাহরণেই দুর্বল হয়ে যায়।
ইসলামিস্টরা একটি ‘স্পেশালাইজেশন’ বা বিশেষত্বের যুক্তি দাঁড় করান যে, একজন মানুষ এক বিদ্যায় দুর্বল হয়েও অন্য বিদ্যায় ইমাম হতে পারেন। কিন্তু এই যুক্তিটি ইসলামের নিজস্ব ‘আদালত’ (নৈতিক সততা) নীতির সরাসরি পরিপন্থী। হাদিস শাস্ত্রে হাফস যখন ‘কায্যাব’ (মিথ্যাবাদী) হিসেবে চিহ্নিত হন, তখন সেটি কেবল তার স্মৃতিশক্তির সমস্যা নয়, বরং তার নৈতিক অখণ্ডতার ওপর একটি চূড়ান্ত রায়। সততা বা সত্যবাদিতা কোনো খণ্ডিত গুণ নয় যে, একজন মানুষ হাদিসের ক্ষেত্রে রাসুলের নামে মিথ্যা বলবেন আর কোরআনের ক্ষেত্রে পরম সত্যবাদী হবেন। যদি হাফসের ‘আদালত’ বা চরিত্রই নষ্ট হয়ে থাকে, তবে তিনি কিরাআতে কত বড় বিশেষজ্ঞ—তা সম্পূর্ণ গৌণ। কারণ অসাধু ব্যক্তির দক্ষতা কেবল জালিয়াতিকে আরও সূক্ষ্ম ও বিশ্বাসযোগ্য করতে সাহায্য করে, সত্য রক্ষা করতে নয়।
সারকথা, এই দ্বিচারিতা কোনো ছোটখাটো অসামঞ্জস্য নয়। এটি ইসলামের নিজস্ব যাচাই পদ্ধতির চূড়ান্ত আত্মঘাতী স্ববিরোধ। এটি ইঙ্গিত করে যে, সনদ-ব্যবস্থা আসলে কোনো নিরপেক্ষ বিচারব্যবস্থা নয়—এটি একটি নিয়ম-বদলানো, প্রয়োজন-অনুসারে-নমনীয় এবং ফলাফল-নির্ভর তাত্ত্বিক অসামঞ্জস্যপূর্ণ কাঠামো। হাফসের ক্ষেত্রে এই দ্বিচারিতা যতক্ষণ না স্বীকার করা হবে, ততক্ষণ ইসলামের “অবিকৃত সংরক্ষণ” এর সমস্ত দাবি একটি বিশাল মিথ্যার মুখোশ মাত্র।
কিরাআতের ইতিহাস ও প্রভাব
আজকের অনেক মুসলমান মনে করেন কোরআনের একটি নির্দিষ্ট পাঠই ইতিহাসের শুরু থেকে সর্বজনীনভাবে প্রচলিত ছিল। কিন্তু কোরআনের পাঠসংরক্ষণের ইতিহাস বাস্তবে অনেক বেশি জটিল। বিভিন্ন অঞ্চলে বিভিন্ন ক্বারীর পাঠ শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে সমান্তরালভাবে প্রচলিত ছিল।
ইসলামী ঐতিহ্য অনুযায়ী, কোরআনের একাধিক পাঠরীতি বা কিরাআত প্রাচীনকাল থেকেই প্রচলিত ছিল। পরবর্তী যুগে এগুলোর মধ্যে কয়েকটি পাঠকে গ্রহণযোগ্য বলে স্বীকৃতি দেওয়া হয় এবং ধীরে ধীরে “সাত কিরাআত” বা পরে “দশ কিরাআত” ধারণা তৈরি হয়। কিন্তু এই নির্বাচন প্রক্রিয়া নিজেই একটি ঐতিহাসিক বিকাশের ফল; এটি নবীর যুগ থেকেই নির্দিষ্টভাবে নির্ধারিত ছিল এমন প্রমাণ ঐতিহাসিকভাবে স্পষ্ট নয়।
চতুর্থ হিজরি শতকে ইবন মুজাহিদ তাঁর গ্রন্থ কিতাব আস-সাবআ-তে সাতটি কিরাআতকে ক্যানোনিক্যাল হিসেবে নির্ধারণ করেন। এর আগে আরও বহু পাঠ প্রচলিত ছিল। তাঁর নির্বাচনের ফলে কিরাআতের ক্ষেত্রটি কার্যত সীমাবদ্ধ হয়ে যায় এবং অন্য অনেক পাঠ ধীরে ধীরে প্রান্তিক হয়ে পড়ে।
এরপর দীর্ঘ সময় ধরে বিভিন্ন অঞ্চলে বিভিন্ন পাঠ প্রচলিত ছিল। উদাহরণস্বরূপ:
ওয়ারশ ‘আন নাফি’
দুরি ‘আন আবু আমর’
ইবন কাসির
নাফি
এই বাস্তবতা দেখায় যে, ইসলামের ইতিহাসের অধিকাংশ সময়ে কোরআনের পাঠ একক ছিল না; বরং আঞ্চলিকভাবে ভিন্ন ভিন্ন রীতি সমান্তরালভাবে টিকে ছিল।
১৯২৪ সালের কায়রো মুশাফ এবং পাঠের মানদণ্ডীকরণ
আধুনিক যুগে পরিস্থিতি নাটকীয়ভাবে বদলে যায়। ১৯২৪ সালে মিশরের রাজা ফুয়াদের উদ্যোগে আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয়ের তত্ত্বাবধানে একটি মানসম্মত কোরআন সংস্করণ প্রকাশ করা হয়, যা সাধারণত কায়রো এডিশন বা আমিরি মুশাফ নামে পরিচিত। এই প্রকল্পের মূল লক্ষ্য ছিল প্রশাসনিক ও শিক্ষাগত সুবিধার জন্য একটি একক পাঠ নির্ধারণ করা।
কমিটি শেষ পর্যন্ত হাফস ‘আন ‘আসিম পাঠকেই মানদণ্ড হিসেবে গ্রহণ করে। কারণ এটি তখন মিশরে প্রচলিত ছিল এবং মুদ্রণের জন্য সহজ বলে বিবেচিত হয়। এই সিদ্ধান্তের পর সরকারি স্কুল, মাদ্রাসা এবং মসজিদে সেই পাঠই ব্যবহৃত হতে থাকে।
পরবর্তী সময়ে সৌদি আরবের মদিনায় কিং ফাহদ কমপ্লেক্স থেকে বিপুল পরিমাণ কোরআন মুদ্রণ ও বিতরণের ফলে এই পাঠ আন্তর্জাতিকভাবে আরও ছড়িয়ে পড়ে। ফলে ধীরে ধীরে অনেক অঞ্চলে অন্যান্য কিরাআত প্রান্তিক হয়ে যায় এবং হাফস পাঠ কার্যত বৈশ্বিক মানদণ্ডে পরিণত হয়।
ঐতিহাসিক বাস্তবতা ও তাত্ত্বিক প্রশ্ন
এই ইতিহাস কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উত্থাপন করে।
প্রথমত, যদি একটি নির্দিষ্ট পাঠ সত্যিই একমাত্র ঐশ্বরিক ও অপরিবর্তনীয় হয়ে থাকে, তাহলে ইতিহাসের দীর্ঘ সময় ধরে বিভিন্ন পাঠ কীভাবে সমান্তরালভাবে টিকে ছিল?
দ্বিতীয়ত, যদি একাধিক কিরাআতকেই ইসলামী ঐতিহ্য “সহিহ” বা “মুত্তাওয়াতির” হিসেবে স্বীকার করে, তাহলে একই আয়াতে শব্দগত ভিন্নতা কীভাবে ব্যাখ্যা করা হবে?
তৃতীয়ত, যদি আধুনিক যুগে একটি নির্দিষ্ট পাঠ প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে পরিণত হয়ে থাকে, তাহলে আজকের “একমাত্র প্রচলিত পাঠ” ধারণাটি কতটা ঐতিহাসিক বাস্তবতা, আর কতটা আধুনিক মানদণ্ডীকরণের ফল?
এই প্রশ্নগুলো কোরআনের পাঠসংরক্ষণের ইতিহাসকে সরল বা একরৈখিক কোনো প্রক্রিয়া হিসেবে দেখার সুযোগ দেয় না। বরং এটি দেখায় যে কোরআনের পাঠসংরক্ষণ একটি দীর্ঘ ঐতিহাসিক বিকাশের মধ্য দিয়ে গঠিত হয়েছে, যেখানে মৌখিক বর্ণনা, আঞ্চলিক পাঠপ্রথা, পণ্ডিতদের নির্বাচন এবং আধুনিক রাজনৈতিক-প্রাতিষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত—সবকিছুই ভূমিকা রেখেছে।
“মুত্তাওয়াতির কিরাআত” দাবির যৌক্তিকতা
ইসলামি ঐতিহ্যে একটি বহুল প্রচলিত দাবি হলো, কোরআনের গ্রহণযোগ্য কিরাআতগুলো “মুত্তাওয়াতির”—অর্থাৎ এত বিপুল সংখ্যক বর্ণনাকারীর মাধ্যমে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে পৌঁছেছে যে সেখানে ভুল বা জালিয়াতির সম্ভাবনা নেই। কিন্তু আধুনিক কোরআন গবেষণায় এই দাবিটি ক্রমবর্ধমানভাবে প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে।
সমকালীন একাডেমিক গবেষণায় দেখা যায়, কিরাআতের এই “মুত্তাওয়াতির” ধারণাটি মূলত পরবর্তী যুগে গড়ে ওঠা একটি তাত্ত্বিক কাঠামো। কোরআনের পাঠসংক্রান্ত ইতিহাস বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, প্রথম কয়েক শতাব্দীতে বিভিন্ন অঞ্চলে বিভিন্ন পাঠ প্রচলিত ছিল এবং সেগুলোর মধ্যে পার্থক্যও ছিল উল্লেখযোগ্য।
কোরআন গবেষক Shady Hekmat Nasser তার গুরুত্বপূর্ণ গবেষণায় দেখিয়েছেন যে, “মুত্তাওয়াতির কিরাআত” ধারণাটি মূলত একটি পরবর্তী যুগের ধর্মতাত্ত্বিক নির্মাণ, যা মুসলিম পণ্ডিতরা কোরআনের পাঠভেদকে বৈধতা দেওয়ার জন্য তৈরি করেছিলেন। তার বিশ্লেষণ অনুযায়ী, প্রাথমিক যুগে কিরাআতের সংরক্ষণ মূলত সীমিত কিছু শিক্ষকের মাধ্যমে মৌখিকভাবে প্রচারিত হয়েছিল, এবং এগুলোকে প্রকৃত অর্থে “মুত্তাওয়াতির” বলা ঐতিহাসিকভাবে সমস্যাজনক।
একই ধরনের সংশয় প্রকাশ করেছেন অক্সফোর্ডের গবেষক Nicolai Sinai। তার মতে, কিরাআতগুলোকে “মুত্তাওয়াতির” হিসেবে উপস্থাপন করা ইসলামী পাণ্ডিত্যিক ঐতিহ্যের একটি নর্মেটিভ দাবি, কিন্তু ঐতিহাসিক বিশ্লেষণে দেখা যায় যে এগুলো মূলত সীমিত কিছু বর্ণনাশৃঙ্খলার মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।
ফলে “মুত্তাওয়াতির কিরাআত” ধারণাটি নিজেই একটি সমস্যাজনক তত্ত্ব হয়ে দাঁড়ায়। যদি এই পাঠগুলো প্রকৃত অর্থে অসংখ্য স্বাধীন সূত্রে সংরক্ষিত হয়ে থাকে, তাহলে তাদের মধ্যে এত ভিন্নতা কেন দেখা যায়? আবার যদি সেগুলো সীমিত কয়েকজন বর্ণনাকারীর মাধ্যমে প্রচারিত হয়ে থাকে, তাহলে “মুত্তাওয়াতির” দাবি ঐতিহাসিকভাবে কতটা টেকসই, সেটিই বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়ায়।
হাফসের কিরাআত বনাম অন্যান্য কিরাআতঃ পাঠভেদ, অর্থগত প্রভাব
ইসলাম যে দাবি করে “কোরআন অবিকৃত, শব্দে শব্দে, হরফে হরফে সংরক্ষিত এবং কোনো পরিবর্তন ছাড়াই আল্লাহর পক্ষ থেকে নেমে এসেছে”, সেই দাবির সবচেয়ে বড় কবরখানা হলো কিরাআতের পাঠভেদ। হাফস ইবন সুলাইমানের বর্ণিত ‘হাফস ‘আন ‘আসিম’ কিরাআতকে আজ বিশ্বের প্রায় সব মুসলিম ‘একমাত্র ঐশ্বরিক পাঠ’ বলে মেনে নিয়েছে, অথচ অন্যান্য কিরাআত (বিশেষ করে ওয়ারশ ‘আন নাফি’) এর সাথে তুলনা করলেই দেখা যায় যে, একই আয়াতে শব্দ, উচ্চারণ এবং অর্থের মধ্যে এমন গভীর পার্থক্য রয়েছে যা কোনোভাবেই “অপরিবর্তনীয়” বা “একই ওহী” হতে পারে না। এই পাঠভেদগুলো কোনো সাধারণ উচ্চারণগত তফাত নয়—এগুলো সরাসরি আল্লাহর গুণাবলি, বাক্যের বিষয়বস্তু, আইনি বিধান এবং তাত্ত্বিক অর্থকে বদলে দেয়।
এই দ্বৈততা ইঙ্গিত করে যে, কোরআন আসলে কোনো অলৌকিক অবিকৃত গ্রন্থ নয়; বরং এটি মানুষের স্মৃতি, আঞ্চলিক উচ্চারণ, রাজনৈতিক পছন্দ এবং পরবর্তীকালীন ক্যানোনাইজেশনের ফল। নিচে হাফস এবং ওয়ারশ কিরাআতের মধ্যে তিনটি সবচেয়ে স্পষ্ট উদাহরণ দেওয়া হলো। প্রত্যেকটি ক্ষেত্রে আমরা আরবি শব্দ, ট্রান্সলিটারেশন, হুবহু অনুবাদ এবং অর্থগত-তাত্ত্বিক প্রভাব বিস্তারিতভাবে দেখব।
উদাহরণ: হাফস বনাম ওয়ারশ কিরাআতের মধ্যে পার্থক্য
| আয়াত | হাফস পাঠ (বর্তমান স্ট্যান্ডার্ড মুশাফ) | ওয়ারশ পাঠ (উত্তর আফ্রিকা ও অন্যান্য অঞ্চলে প্রচলিত) | ট্রান্সলিটারেশন ও হুবহু অর্থ | অর্থগত ও তাত্ত্বিক প্রভাব |
|---|---|---|---|---|
| সূরা বাকারা ২:১৮৪ | فِدْيَةٌ طَعَامُ مِسْكِينٍ | فِدْيَةٌ إِطْعَامُ مِسْكِينٍ | হাফস: “একজন মিসকিনের খাদ্য (طَعَامُ)” ওয়ারশ: “একজন মিসকিনকে খাওয়ানো (إِطْعَামُ)” | হাফসে এটি একটি নাম (noun)—শুধু “খাদ্য” দিলেই চলবে। ওয়ারশে এটি ক্রিয়ামূলক (verbal noun)—“খাওয়ানো” অর্থাৎ প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন করতে হবে। ফলে রমজানের ফিদয়া (কাফফারা) আইনের ব্যাখ্যা সম্পূর্ণ বদলে যায়। একটি পাঠে শুধু খাবার দিলেই দায়মুক্তি, অন্যটিতে খাওয়ানোর দায়িত্ব। “অপরিবর্তনীয় ওহী” হলে এমন আইনি পার্থক্য কীভাবে সম্ভব? |
| সূরা ইউসুফ ১২:১১০ | نَشَاءُ | يَشَاءُ | হাফস: “যদি আমরা চাই (نَشَاءُ—we will)” ওয়ারশ: “যদি তিনি চান (يَشَاءُ—He will)” | হাফসে আল্লাহ নিজেকে “আমরা” (plural of majesty বা ত্রিত্বের ইঙ্গিত?) বলে উল্লেখ করছেন। ওয়ারশে “তিনি” (singular)। এটি সরাসরি আল্লাহর একত্ব (তাওহীদ) এবং বাক্যের বিষয়কে বদলে দেয়। একই আয়াতে এক পাঠে আল্লাহ নিজেকে বহুবচনে বলছেন, অন্যটিতে একবচনে। এই ব্যক্তি-পরিবর্তন কি ওহীর অংশ? |
| সূরা ফাতিহা ১:৪ | مَالِكِ يَوْمِ الدِّينِ | مَلِكِ يَوْمِ الدِّينِ | হাফস: “দিনের মালিক (مَالِكِ—Owner, Master, Possessor)” ওয়ারশ: “দিনের রাজা (مَلِكِ—King, Sovereign)” | “মালিক” অর্থ সম্পত্তির অধিকারী, নিয়ন্ত্রক। “মলিক” অর্থ রাজা, শাসক। আল্লাহর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ গুণাবলির (আসমা ওয়াস-সিফাত) মধ্যে এই পার্থক্য সরাসরি তাঁর বৈশিষ্ট্যকে বদলে দেয়। এক পাঠে আল্লাহ “মালিক”, অন্যটিতে “রাজা”—এ দুটোর অর্থ, দার্শনিক গভীরতা এবং আইনি প্রভাব সম্পূর্ণ ভিন্ন। কোনটি আসল ওহী? |
এই তিনটি উদাহরণই “মুত্তাওয়াতির” (বহু সনদে বর্ণিত) কিরাআত হিসেবে স্বীকৃত। অর্থাৎ ইসলাম নিজেই স্বীকার করে যে এগুলো সবই “সহিহ” এবং “ঐশ্বরিক”। কিন্তু একই সূরায়, একই আয়াতে যদি শব্দ বদলে যায় এবং অর্থ বদলে যায়, তাহলে “কোরআন এক এবং অপরিবর্তনীয়” এই দাবি কোথায় দাঁড়ায়? এগুলো কোনো সামান্য উচ্চারণের তফাত নয়—এগুলো আল্লাহর গুণ, আইনি বিধান এবং বাক্যের মূল অর্থকে ভিন্ন ভিন্ন করে দেয়।
যে প্রশ্নসমূহ ইসলামের ‘পরিবর্তনহীন কোরআন’ দাবির মূলে আঘাত করেঃ
প্রথমত, যদি কোরআন সত্যিই “পরিবর্তনহীন” হয় এবং প্রতিটি শব্দ আল্লাহর পক্ষ থেকে অবিকৃতভাবে সংরক্ষিত হয়, তাহলে এই পাঠভেদগুলো কীভাবে স্বীকৃত? ইসলাম নিজেই সাত (বা দশ) কিরাআতকে “মুত্তাওয়াতির” বলে গ্রহণ করে। অর্থাৎ একই জায়গায় দুই-তিনটি ভিন্ন শব্দ একসাথে “ওহী” হিসেবে চালানো হয়। এটি কি স্বীকার করা নয় যে, কোরআন আসলে একটি নয়, বরং একাধিক সংস্করণের সংমিশ্রণ? যদি সত্যিই একটি মাত্র অবিকৃত ওহী থাকত, তাহলে এমন বৈচিত্র্য কোথা থেকে আসল?
দ্বিতীয়ত, একটি কিরাআতে আল্লাহকে “রাজা” (مَلِك) বলা হয়, অন্যটিতে “মালিক” (مَالِك)—এটি কি তাত্ত্বিকভাবে সমস্যা সৃষ্টি করে না? আল্লাহর সিফাত (গুণাবলি) নিয়ে ইসলামের পুরো আকীদা (তাওহীদ, আসমা ওয়াস-সিফাত) এই শব্দগুলোর ওপর নির্ভর করে। এক পাঠে আল্লাহ সম্পত্তির মালিক, অন্যটিতে রাজত্বের অধিকারী। এই দুটোর মধ্যে দার্শনিক, আইনি এবং আধ্যাত্মিক পার্থক্য বিশাল। তাহলে কোনটি আসল আল্লাহর গুণ? কোনটি মানুষের বানানো? এই প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে “সবই সঠিক” বলে চালিয়ে দেওয়া কি তাত্ত্বিক অসামঞ্জস্য নয়?
সারকথা, এই পাঠভেদগুলো ইসলামের “কোরআন অবিকৃত” দাবির মুখোশ সম্পূর্ণ খুলে ফেলে। যে ধর্ম নিজেকে “শব্দে শব্দে সংরক্ষিত” বলে গর্ব করে, সেই ধর্মই একই আয়াতে একাধিক ভিন্ন শব্দ ও ভিন্ন অর্থকে একসাথে “ওহী” বলে চালিয়ে দেয়। এটি আর কোনো অলৌকিক সংরক্ষণ নয়—এটি মানুষের স্মৃতি, আঞ্চলিক উচ্চারণ এবং পরবর্তী রাজনৈতিক নির্বাচনের ফল। হাফসের কিরাআত যতই “জনপ্রিয়” হোক, এই পাঠভেদ দেখিয়ে দেয় যে কোরআন আসলে একটি মানবীয় সংকলন—যার মধ্যে পরিবর্তন, সংশোধন এবং দ্বন্দ্ব লুকিয়ে আছে। এই সত্য যতক্ষণ না স্বীকার করা হবে, ততক্ষণ ইসলামের পুরো “অবিকৃততা”র দাবি একটি বিশাল মিথ্যা ছাড়া আর কিছুই নয়।
হাফসের বর্ণিত দুর্বল (জইফ) হাদিসের উদাহরণ
হাফস ইবন সুলাইমান আল-কূফীর হাদিস বর্ণনার ক্ষেত্রে যে সমস্ত ত্রুটি ধরা পড়েছে, তা কোনো সাধারণ দুর্বলতা নয়। এগুলো সরাসরি তাঁর স্মৃতিশক্তি (দাবত), চরিত্র (আদালত) এবং সনদ-সংরক্ষণের ক্ষমতার ওপর আঘাত করে। উসুলুল হাদিসের নিয়ম অনুসারে যদি একজন রাবির বর্ণনায় এমন ভুল থাকে, তাহলে তাঁর সমস্ত বর্ণনা ‘জইফ’ থেকে ‘মাতরুক’ বা ‘মুনকার’ হয়ে যায়। অথচ ঠিক এই হাফসের কোরআন বর্ণনাকে আজ বিশ্বের প্রায় সব মুসলিম ‘অপরিবর্তনীয় ওহী’ হিসেবে গ্রহণ করে। এই দ্বিচারিতা আরও স্পষ্ট হয় যখন আমরা তাঁর বর্ণিত কয়েকটি জইফ হাদিসের উদাহরণ দেখি। নিচে তিনটি সুস্পষ্ট উদাহরণ বিস্তারিতভাবে তুলে ধরা হলো, যেখানে হাফসের স্মৃতিভ্রম, সনদ-পাল্টানো এবং একক বর্ণনা স্পষ্টভাবে প্রমাণিত।
হাদিস ১: তাহাজ্জুদের রাকাআত সংখ্যা নিয়ে বিরোধ
হাফস ইবন সুলাইমান বর্ণনা করেছেন যে, রাসুলুল্লাহ (সা.) তাহাজ্জুদের নামাজে ১২ রাকাআত পড়তেন। অথচ প্রামাণ্য ও নির্ভরযোগ্য রাবিদের (যেমন আয়েশা রা., ইবন আব্বাস রা. এবং অন্যান্য সাহাবীদের সনদ) বর্ণনায় স্পষ্ট যে, রাসুলুল্লাহ (সা.) সাধারণত ৮ রাকাআত (কখনো ১১ রাকাআত) তাহাজ্জুদ পড়তেন। হাফসের এই বর্ণনা সম্পূর্ণ একক এবং অন্যান্য সিকাহ রাবিদের বর্ণনার সাথে সাংঘর্ষিক। এটি শুধু সংখ্যার ভুল নয়—এটি সুন্নাহের মূল বিধানকে বদলে দেয়।
এই হাদিসটি হাফসের স্মৃতিভ্রমের (সু-উল হিফজ) সবচেয়ে বড় প্রমাণ। যিনি কোরআনের হাজার হাজার আয়াতের সূক্ষ্ম উচ্চারণ মনে রাখতে পারেন বলে দাবি করা হয়, তিনি এমন একটি সাধারণ ইবাদতের রাকাআত সংখ্যা গুলিয়ে ফেললেন কীভাবে?
হাদিস ২: সূরা কাহফ জুমার দিনে পড়লে আলো ছড়াবে
হাফসের সনদে বর্ণিত হয়েছে যে, যে ব্যক্তি জুমার দিনে সূরা কাহফ পড়বে, তার জন্য কিয়ামতের দিন আলো ছড়িয়ে পড়বে। কিন্তু এই বর্ণনার সনদ দ্বন্দ্বপূর্ণ—হাফস একদিকে বলছেন এক কথা, অন্য নির্ভরযোগ্য রাবিরা (যেমন আবু সাঈদ খুদরী রা.-এর সিকাহ সনদ) একেবারে ভিন্ন বর্ণনা দিয়েছেন। হাফস এখানে সনদ পাল্টিয়ে মুরসালকে মারফু বানিয়েছেন এবং অন্য রাবিদের বর্ণনার সাথে সরাসরি সাংঘর্ষিক তথ্য দিয়েছেন।
এই হাদিসটি স্পষ্ট করে যে, হাফস শুধু স্মৃতিভ্রম করেননি, বরং সনদের সংযোগ ইচ্ছাকৃতভাবে বা অনিচ্ছাকৃতভাবে বদলে ফেলেছেন। উসুলুল হাদিসে এমন রাবিকে ‘মুনকারুল হাদিস’ বলা হয়।
হাদিস ৩: জুমার রাতে কবরের আজাব বন্ধ থাকে
হাফসের একক বর্ণনায় বলা হয়েছে যে, জুমার রাতে কবরের আজাব সাময়িকভাবে বন্ধ থাকে। এই হাদিসটি কোনো সাহাবি সূত্রে প্রমাণিত নয় এবং অন্য কোনো সিকাহ রাবির সনদে পাওয়া যায় না। এটি সম্পূর্ণ হাফসের একক (শায) বর্ণনা, যা অন্যান্য প্রামাণ্য সনদের সাথে কোনো মিল নেই। এখানে হাফসের ‘আদালত’ (চারিত্রিক সততা) নিয়ে প্রশ্ন ওঠে, কারণ তিনি এমন একটি বিষয় বর্ণনা করেছেন যা কোনো সাহাবি বা তাবেয়ী পর্যন্ত পৌঁছায়নি।
হাফসের বর্ণনায় যে সমস্যাগুলো বারবার দেখা যায়ঃ
হাফস প্রায়ই সনদের একটি ধাপ লাফিয়ে দেন বা দুর্বল রাবিকে সিকাহ বলে চালিয়ে দেন। এতে পুরো সনদের ধারাবাহিকতা ভেঙে যায় এবং বর্ণনাটি নির্ভরযোগ্যতা হারায়।
হাফস একই নামের একাধিক রাবিকে গুলিয়ে ফেলতেন। ফলে একজন সিকাহ রাবির নামে দুর্বল বর্ণনা চলে আসত, যা তথ্যের সত্যতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে।
ইবন হিব্বানের মতে, হাফস মুরসাল হাদিসকে মারফু বানাতেন। অর্থাৎ তিনি সনদকে ঘষামাজা করে নতুন করে সাজাতেন, যা হাদিস শাস্ত্রের মানদণ্ডে তাত্ত্বিক অসামঞ্জস্য হিসেবে গণ্য।
তাঁর বর্ণনা প্রায়ই অন্য সকল নির্ভরযোগ্য রাবির বিপরীতে একক বা শায (Contradictory) হয়ে যায়। উসুলুল হাদিসে এমন বর্ণনাকে সরাসরি বাতিল বা ‘মুনকার’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।
এই চারটি সমস্যা যখন একসাথে হাফসের প্রায় প্রত্যেক হাদিসে দেখা যায়, তখন ইমামগণ তাঁকে ‘কায্যাব’ ও ‘মাতরুক’ বলে ঘোষণা করেছেন। অথচ ঠিক এই একই ব্যক্তির কোরআন বর্ণনাকে আজ “মুত্তাওয়াতির” ও “অভ্রান্ত” বলে চালিয়ে দেওয়া হয়।
এই উদাহরণগুলো স্পষ্ট ইঙ্গিত করে যে, হাফসের স্মৃতি ও চরিত্র হাদিসের ক্ষেত্রে যেখানে সম্পূর্ণ ব্যর্থ, সেখানে কোরআনের ক্ষেত্রে তাঁকে অলৌকিক মনে করা চরম দ্বিচারিতা। যদি তাঁর একটি হাদিসেও এমন ভুল হয়, তাহলে কোরআনের হাজার হাজার আয়াত কীভাবে নির্ভুল থাকল? এই প্রশ্নের কোনো উত্তর ইসলামের সনদ-ব্যবস্থার কাছে নেই। এটি শুধু হাফসের নয়—পুরো “সনদ ভিত্তিক প্রামাণ্যতা”র মৃত্যুদণ্ড।
আসিম ইবন আবি আন-নাজুদের নির্ভরযোগ্যতা ও হাদিস শাস্ত্রের মানদণ্ড
হাফস ইবন সুলাইমান যার কাছ থেকে কিরাআত শিক্ষা করেছেন, সেই আসিম ইবন আবি আন-নাজুদ (মৃত্যু ১২৭ হিজরি) কিরাআত শাস্ত্রে অত্যন্ত উচ্চমর্যাদার অধিকারী হলেও হাদিস শাস্ত্রের সূক্ষ্ম মানদণ্ডে তিনি প্রশ্নাতীত ছিলেন না। উসুলুল হাদিসের ইমামগণ আসিমকে ব্যক্তি হিসেবে ‘সাদুক’ বা সত্যবাদী বললেও তাঁর মুখস্থ শক্তি (Hifz) এবং তথ্য সংরক্ষণের ক্ষমতা সম্পর্কে গুরুতর আপত্তি তুলেছেন। ইমাম ইয়াকুব ইবন সুফিয়ান আল-ফাসাউই মন্তব্য করেছেন যে, আসিমের হাদিস বর্ণনায় ত্রুটি বা বিশৃঙ্খলা লক্ষ্য করা যায়। ইমাম নাসায়ী তাঁকে ‘লায়সা বি-ক্বাউই’ বা শক্তিশালী নন বলে অভিহিত করেছেন। এমনকি ইয়াহইয়া ইবন মাঈন, যিনি রাবি যাচাইয়ের ক্ষেত্রে অত্যন্ত কঠোর ছিলেন, তিনি আসিমকে হাদিসের ক্ষেত্রে নির্ভরযোগ্য মনে করতেন না।
হাদিস শাস্ত্রের নীতি অনুযায়ী, যদি কোনো রাবির স্মৃতিশক্তিতে সামান্যতম বিচ্যুতি (সু-উল হিফজ) ধরা পড়ে, তবে তাঁর বর্ণিত একক হাদিসগুলো ‘জইফ’ বা দুর্বল বলে গণ্য হয়। আসিম সম্পর্কে ইবন হাজার আল-আসকালানির পর্যবেক্ষণ হলো, তিনি কিরাআতে ইমাম হলেও হাদিসে ছিলেন অত্যন্ত দুর্বল স্মৃতিশক্তির অধিকারী। এই ঐতিহাসিক বাস্তবতা একটি কাঠামোগত প্রশ্ন উত্থাপন করে: হাদিস যাচাইয়ের ক্ষেত্রে যে স্মৃতিশক্তিকে অযোগ্য বা দুর্বল হিসেবে প্রত্যাখ্যান করা হলো, সেই একই ব্যক্তির স্মৃতিশক্তি কীভাবে হাজার হাজার আয়াতের জটিল শব্দবিন্যাস ও উচ্চারণরীতি (কিরাআত) সংরক্ষণের ক্ষেত্রে অভ্রান্ত হিসেবে গৃহীত হলো? এই পদ্ধতিগত বিচ্ছিন্নতা ইঙ্গিত করে যে, ইসলামের প্রাথমিক যুগে হাদিস এবং কোরআন সংরক্ষণের মানদণ্ড অভিন্ন ছিল না, যা ‘সনদ’ ভিত্তিক প্রামাণ্যতার দাবিকে তাত্ত্বিকভাবে দুর্বল করে দেয়।
প্রথাগত ব্যাখ্যার ব্যবচ্ছেদ এবং মানসিক বিভাজনের অযৌক্তিকতা
হাফস ইবন সুলাইমানের এই দ্বৈত চরিত্রকে বৈধতা দিতে গিয়ে পরবর্তী যুগের ইসলামি স্কলারগণ একটি বহুল প্রচলিত যুক্তি দাঁড় করিয়েছেন। তাঁদের মতে, হাফস কিরাআত শাস্ত্রে অত্যন্ত মনোযোগী ও পারদর্শী ছিলেন, কিন্তু হাদিস বর্ণনায় তাঁর বিশেষ আগ্রহ ছিল না কিংবা তিনি তা যথাযথভাবে সংরক্ষণ করতে পারেননি। ইমাম ইবন হাজার আল-আসকালানি এবং ইমাম যাহাবি উভয়েই এই যুক্তি দিয়েছেন যে, একজন ব্যক্তি একটি নির্দিষ্ট বিদ্যায় ইমাম বা বিশেষজ্ঞ হতে পারেন এবং অন্য একটিতে দুর্বল হতে পারেন। কিন্তু এই প্রতিরক্ষাটি গভীর বুদ্ধিবৃত্তিক ও মনস্তাত্ত্বিক সংকটের জন্ম দেয়।
প্রথমত, হাফসের ওপর হাদিস বিশারদদের অভিযোগ কেবল ‘ভুল করা’ বা ‘স্মৃতিশক্তির ত্রুটি’র মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। ইমাম ইয়াহইয়া ইবন মাঈনের মতো কঠোর সমালোচক তাকে সরাসরি ‘কায্যাব’ বা মিথ্যাবাদী বলেছেন। উসুলুল হাদিসের নিয়ম অনুযায়ী, যদি কোনো ব্যক্তি একবারও রাসুলের নামে ইচ্ছাকৃত মিথ্যা বলার অভিযোগে অভিযুক্ত হন, তবে তাঁর বর্ণিত সকল তথ্য চিরতরে পরিত্যাজ্য হয়ে যায়। এখানে প্রশ্নটি কেবল মেধার নয়, বরং তাঁর ‘আদালত’ বা চারিত্রিক নির্ভরযোগ্যতার। যদি হাফস হাদিসের ক্ষেত্রে অসাধু বা মিথ্যাবাদী হয়ে থাকেন, তবে কেবল কিরাআতের ক্ষেত্রে তিনি কীভাবে পরম সত্যবাদী ও বিশ্বস্ত হয়ে উঠলেন? চরিত্র বা সততা কি কোনো বিষয়ের ভিত্তিতে খণ্ডিত হতে পারে?
দ্বিতীয়ত, কিরাআত এবং হাদিস উভয়ই শ্রুতিনির্ভর (Oral transmission) বিদ্যা। কিরাআতের সূক্ষ্ম মাখরাজ, গুন্নাহ এবং শব্দের উচ্চারণ মনে রাখা হাদিসের মতন (মূল কথা) মনে রাখার চেয়ে অনেক বেশি জটিল ও কঠোর স্মৃতিশক্তির দাবি রাখে। যিনি কোরআনের হাজার হাজার শব্দের সূক্ষ্মতম পার্থক্য নির্ভুলভাবে মনে রাখতে পারেন বলে দাবি করা হয়, তিনি মাত্র কয়েক লাইনের হাদিস বর্ণনায় কেন “পরিত্যাজ্য” (Matruk) বা “অগ্রহণযোগ্য” (Munkar) হয়ে উঠলেন—এই বৈপরীত্য কেবল অবিশ্বাস্যই নয়, বরং পদ্ধতিগতভাবে অসম্ভব বলে প্রতীয়মান হয়। এই অসামঞ্জস্য নির্দেশ করে যে, ইসলামের এই দুই স্তম্ভের প্রামাণ্যতা রক্ষার মানদণ্ড আসলে এক নয়, বরং প্রয়োজনের খাতিরে সেখানে নিয়ম শিথিল করা হয়েছে।
তদুপরি, এই ‘বিশেষত্ব’ বা ‘মনোযোগের অভাব’ এর যুক্তিটি মনস্তাত্ত্বিকভাবেও হাস্যকর। হাদিস বর্ণনা হলো মূল বক্তব্য মনে রাখা, যেখানে সামান্য শব্দ পরিবর্তনেও অর্থের বিকৃতি না ঘটলে ছাড় দেওয়া হয়। কিন্তু কিরাআত হলো ৬২৩৬টি আয়াতের প্রতিটির প্রতিটি হরফ, সূক্ষ্ম স্বরচিহ্ন (হরকত) এবং উচ্চারণশৈলী (তাজবিদ) মুখস্থ রাখা—যা হাদিসের চেয়ে হাজার গুণ বেশি কঠিন ও জটিল। যে ব্যক্তি ৩-৪ লাইনের একটি সহজ হাদিসের সনদ ও মতন মনে রাখতে গিয়ে ‘চরম গাফিলতি’ বা ‘বিৃঙ্খলা’ (ইখতিলাত) প্রদর্শন করেন, তার পক্ষে কয়েক হাজার আয়াতের জটিল বিন্যাস নির্ভুল রাখা অবাস্তব। সহজ কাজে (হাদিস) যিনি শোচনীয়ভাবে ব্যর্থ, কঠিন কাজে (কিরাআত) তাকে ‘ইমাম’ হিসেবে মেনে নেওয়া কেবল একটি অন্ধ আবেগীয় সিদ্ধান্ত হতে পারে, কোনো যৌক্তিক প্রামাণ্যতা নয়।
১৯২৪ সালের কায়রো মুশাফ এবং হাফস পাঠের রাজনৈতিক আধিপত্য
হাফস ‘আন ‘আসিম’ কিরাআত আজ বিশ্বের সর্বাধিক পঠিত, প্রায় একচ্ছত্র এবং “একমাত্র ঐশ্বরিক” পাঠ হিসেবে মুসলিম উম্মাহর মনে গেঁথে গেছে। কিন্তু এই আধিপত্য কোনো অলৌকিক বা ঐশ্বরিক শ্রেষ্ঠত্বের ফল নয়—এটি সম্পূর্ণ বিংশ শতাব্দীর রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত, প্রশাসনিক সুবিধাবাদ এবং মুদ্রণ শিল্পের বাণিজ্যিক-রাজনৈতিক খেলার ফসল। ঐতিহাসিকভাবে কোরআনের বিভিন্ন কিরাআত বিভিন্ন অঞ্চলে সমানভাবে জনপ্রিয় ছিল। উত্তর আফ্রিকায় ‘ওয়ারশ ‘আন নাফি’’, সুদান ও ইয়েমেনের কিছু অংশে ‘দুরি ‘আন আবু আমর’’, মক্কায় ‘ইবন কাসির’, মদিনায় ‘নাফি’—এসব পাঠপদ্ধতি শত শত বছর ধরে স্থানীয়ভাবে প্রচলিত ছিল। কিন্তু হাফস পাঠের আজকের এই একচ্ছত্র আধিপত্যের পেছনে কোনো ঐশ্বরিক নির্দেশ বা রাসুলের পছন্দ নয়—শুধুমাত্র ১৯২৪ সালের একটি রাজনৈতিক-প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত এবং তার পরবর্তী বৈশ্বিক ছড়িয়ে পড়া।
১৯২৪ সালে মিশরের রাজা ফুয়াদের সরাসরি নির্দেশে আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি বিশেষজ্ঞ কমিটি কোরআনের একটি প্রমিত (standardized) সংস্করণ মুদ্রণের সিদ্ধান্ত নেয়। এই প্রকল্পটি ১৯০৭ সাল থেকে শুরু হয়ে ১৭ বছর ধরে চলেছিল। প্রাথমিক উদ্দেশ্য ছিল একদম সাধারণ ও প্রশাসনিক: মিশরের সরকারি স্কুল, মাদ্রাসা এবং মসজিদে কোরআনের পাঠে অভিন্নতা আনা এবং লিথোগ্রাফি (পাথরে ছাপা) যুগের মুদ্রণজনিত বিভ্রান্তি ও ত্রুটি দূর করা। কমিটি কোনো ঐশ্বরিক নির্দেশনা বা প্রাচীন ম্যানুস্ক্রিপ্টের তুলনামূলক বিশ্লেষণ করে সিদ্ধান্ত নেয়নি—তারা সরাসরি কুফার পাঠরীতি, অর্থাৎ ‘হাফস ‘আন ‘আসিম’ পদ্ধতিকে সরকারি মানদণ্ড হিসেবে বেছে নেয়। কারণ? এটি মিশরে তখন ইতিমধ্যে জনপ্রিয় ছিল এবং মুদ্রণের জন্য সহজ ও সুবিধাজনক। এর আগে ইসলামি বিশ্বে কোনো একটি নির্দিষ্ট পাঠকে এভাবে রাষ্ট্রীয়ভাবে সর্বজনীন করে দেওয়ার কোনো সফল উদ্যোগ ছিল না। এটি ছিল একটি সম্পূর্ণ আধুনিক, মানবীয় এবং রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত। [6]
এই কায়রো এডিশন বা ‘রাজা ফুয়াদ মুশাফ’ (যাকে আমিরি মুশাফও বলা হয়) প্রকাশের পর থেকেই আন্তর্জাতিকভাবে এত ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করে যে, এটিই কার্যত আধুনিক কোরআনের একমাত্র প্রমিত রূপ হয়ে দাঁড়ায়। ১৯৮৫ সালে সৌদি আরবের ‘কিং ফাহদ কমপ্লেক্স ফর দ্য প্রিন্টিং অব দ্য নোবল কোরআন’ (মদিনা) যখন পবিত্র মদিনা থেকে বিশাল আকারে কোরআন মুদ্রণ শুরু করে এবং হজ্জ যাত্রীদের মধ্যে লক্ষ লক্ষ বিনামূল্যে বিতরণ করে, তখন তারা ঠিক এই কায়রো সংস্করণ বা হাফস পাঠকেই গ্রহণ করে (শুধু কিছু সামান্য অর্থোগ্রাফিক সংশোধন সহ)। ফলে বৈশ্বিক মুদ্রণ শিল্প, আন্তর্জাতিক শিক্ষা ব্যবস্থা, মিডিয়া এবং সৌদি-সমর্থিত দাওয়াহ নেটওয়ার্কের প্রভাবে অন্য সব কিরাআত (ওয়ারশ, দুরি, কালুন প্রভৃতি) প্রান্তিক হয়ে পড়ে। আজ যে কোনো মুসলিম দেশে “কোরআন” বলতে যা বোঝায়, তা আসলে ১৯২৪ সালের এই মিশরীয় রাজনৈতিক প্রকল্পেরই ফল।
বাস্তবতা হলো, হাফসের কিরাআতের এই জনপ্রিয়তা ও একচ্ছত্র আধিপত্য কোনো তাত্ত্বিক বা ঐশ্বরিক শ্রেষ্ঠত্বের কারণে নয়—বরং শুধুমাত্র প্রশাসনিক সহজীকরণ, মুদ্রণ শিল্পের বিস্তার এবং রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার খেলার কারণে ঘটেছে। এটি ইঙ্গিত করে যে, যে পাঠটিকে আজকের মুসলমানরা ‘একমাত্র’, ‘অপরিবর্তনীয়’ এবং ‘ঐশ্বরিক প্রামাণ্যতার চূড়ান্ত মানদণ্ড’ বলে মনে করেন, তার বর্তমান রূপটি আসলে ১৯২৪ সালের একটি রাজনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সিদ্ধান্তেরই ফল—কোনো প্রাচীন অলৌকিক সংরক্ষণ নয়। এই ইতিহাস জানলে কোরআনের পাঠগত বৈচিত্র্য এবং হাফসের একক আধিপত্যের মধ্যকার সম্পূর্ণ কৃত্রিমতা ও তাত্ত্বিক অসামঞ্জস্য স্পষ্ট হয়ে ওঠে। [7]
এই রাজনৈতিক প্রক্রিয়াই হাফস ইবন সুলাইমানের দ্বৈত পরিচয়কে চিরস্থায়ী করে দিয়েছে—হাদিসে ‘কায্যাব’ ও ‘মাতরুক’, কোরআনে ‘ইমাম’। যে পাঠ আসলে মানুষের রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের ফল, তাকে আজ “অপরিবর্তনীয় ঐশ্বরিক” বলে চালিয়ে দেওয়া ইসলামের পুরো সনদ-ভিত্তিক প্রামাণ্যতার দাবিকে দুর্বল করে। এটি আর কোনো অলৌকিকতা নয়—এটি একটি বিশাল মানবীয় তাত্ত্বিক অসামঞ্জস্য।
উসুলুল কিরাআতের ‘শায’ (Shadh) বা বিরল পাঠের ধারণা এবং হাফসের একক অবস্থান
হাদিস শাস্ত্রে ‘শায’ (Irregular) বলতে এমন বর্ণনাকে বোঝানো হয়, যেখানে একজন নির্ভরযোগ্য রাবি তাঁর চেয়েও বেশি নির্ভরযোগ্য বা অধিক সংখ্যক রাবির বিপরীতে কোনো তথ্য প্রদান করেন। উসুলুল হাদিস অনুযায়ী, এমন বৈচিত্র্যপূর্ণ বর্ণনাকে প্রত্যাখ্যান করা হয়। কিন্তু কিরাআত শাস্ত্রের ক্ষেত্রে এই নিয়মটি অদ্ভুতভাবে শিথিল। হাফস ইবন সুলাইমানের বর্ণিত অনেক পাঠ বা উচ্চারণরীতি অন্যান্য প্রসিদ্ধ ক্বারী বা ইমামদের বর্ণনার তুলনায় সম্পূর্ণ ভিন্ন বা একক (Isolated), তবুও সেগুলোকে “মুত্তাওয়াতির” বা অবিচ্ছিন্ন জনশ্রুতি হিসেবে চালিয়ে দেওয়া হয়।
বিখ্যাত কিরাআত বিশেষজ্ঞ ইমাম ইবন মুজাহিদ তাঁর ‘কিতাব আস-সাবআ’ গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন যে, অনেক ক্ষেত্রে হাফস তাঁর উস্তাদ আসিমের থেকে এমন সব পাঠ বর্ণনা করেছেন যা আসিমের অন্য ছাত্র আবু বকর শু’বাহ বর্ণনা করেননি। হাদিস শাস্ত্রের মানদণ্ডে যদি একই উস্তাদের দুই ছাত্রের মধ্যে একজন (যিনি আবার হাদিসে দুর্বল হিসেবে চিহ্নিত) ভিন্ন কিছু বর্ণনা করেন, তবে তা ‘মুনকার’ বা ‘শায’ হিসেবে বাতিল হওয়ার কথা। কিন্তু কোরআনের ক্ষেত্রে এই একক বর্ণনাকেই শ্রেষ্ঠত্বের মর্যাদা দেওয়া হয়েছে।
এই বৈপরীত্যের একটি প্রকট উদাহরণ হলো সূরা ফাতিহার ‘মালিক’ (مالك) এবং ‘মালিক’ (ملك) পাঠের পার্থক্য। হাফস পাঠে এটি ‘মালিক’ (মালিক/অধিপতি), কিন্তু ওয়ারশ বা অন্যান্য অনেক পাঠে এটি ‘মালিক’ (রাজা)। তাত্ত্বিকভাবে ‘মালিক’ এবং ‘মালিক’ শব্দ দুটির অর্থের গভীরতা ভিন্ন। যদি ওহী অবিকৃত এবং শব্দে শব্দে সংরক্ষিত হয়ে থাকে, তবে একই স্থানে দুটি ভিন্ন বিশেষ্য (Noun) কীভাবে ঐশ্বরিক হতে পারে? এটি কি ইঙ্গিত করে যে, বর্ণনাকারীরা তাদের নিজস্ব আঞ্চলিক ভাষা বা বুঝ অনুযায়ী পাঠে পরিবর্তন এনেছেন?
ইমাম সুয়ূতী তাঁর ‘আল-ইতকান’ গ্রন্থে স্বীকার করেছেন যে, কিরাআতের এই পার্থক্যগুলো মূলত রাবিদের বর্ণনার ভিন্নতার কারণে তৈরি হয়েছে। যখন হাফসের মতো একজন “হাদিস শাস্ত্রে অযোগ্য” রাবি এমন সব পাঠ নিয়ে আসেন যা অন্যদের চেয়ে আলাদা, তখন তাকে “শায” হিসেবে বাতিল না করে “মুত্তাওয়াতির” হিসেবে গ্রহণ করা কেবল অযৌক্তিকই নয়, বরং পদ্ধতিগত দ্বিচারিতা। এটি স্পষ্ট করে যে, কোরআনের বর্তমান পাঠটি যতটা না ঐশ্বরিক সংরক্ষণের ফল, তার চেয়ে অনেক বেশি বর্ণনাকারীদের স্মৃতি ও ব্যাখ্যার ওপর নির্ভরশীল।
ইবন মুজাহিদের ভূমিকা এবং সাত কিরাআতের কৃত্রিম সীমাবদ্ধতা
কোরআনের পাঠপদ্ধতির ইতিহাসে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মোড় ছিল চতুর্থ হিজরি শতক, যখন ইবন মুজাহিদ (মৃত্যু ৩২৪ হিজরি) তাঁর ‘কিতাব আস-সাবআ’ (সাত কিরাআতের গ্রন্থ) রচনার মাধ্যমে সাতটি নির্দিষ্ট পাঠকে “সহিহ” বা প্রামাণ্য হিসেবে চিহ্নিত করেন। এই প্রক্রিয়ার আগে ইসলামি বিশ্বে আরও অনেকগুলো পাঠ পদ্ধতি (যেমন ক্বারী আমাশ বা ইয়াকুবের পাঠ) প্রচলিত ছিল। ইবন মুজাহিদের এই নির্বাচন কোনো ঐশ্বরিক প্রত্যাদেশ বা রাসুলের সরাসরি নির্দেশের ভিত্তিতে ছিল না, বরং এটি ছিল একটি প্রশাসনিক এবং বুদ্ধিবৃত্তিক প্রয়াস যার লক্ষ্য ছিল পাঠগত বৈচিত্র্যকে একটি নির্দিষ্ট কাঠামোর মধ্যে সীমাবদ্ধ করা।
এই সংকলন প্রক্রিয়ায় হাফস ইবন সুলাইমানকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল তাঁর উস্তাদ আসিমের ছাত্র হিসেবে। মজার ব্যাপার হলো, ইবন মুজাহিদ যখন এই সাতজনকে বেছে নিচ্ছিলেন, তখন তিনি মূলত তৎকালীন প্রধান শহরগুলোর (মক্কা, মদিনা, কুফা, বসরা ও দামেস্ক) জনপ্রিয় পাঠকদের প্রাধান্য দিয়েছিলেন। হাফসের পাঠ কুফায় জনপ্রিয় হওয়ার কারণে এই তালিকায় স্থান পায়। আধুনিক গবেষক শাদি নাসেরের মতে, এই ক্যানোনাইজেশন বা প্রমিতকরণ প্রক্রিয়াটি ছিল মূলত একটি পরবর্তীকালীন উদ্ভাবন, যা ঐতিহাসিক বিশৃঙ্খলাকে একটি নিয়মতান্ত্রিক রূপ দেওয়ার চেষ্টা করেছিল মাত্র [8]।
সুতরাং, হাফস ইবন সুলাইমান যে পাঠটি বর্ণনা করেছেন, তা “একমাত্র সঠিক” পাঠ হওয়ার বদলে একটি ঐতিহাসিকভাবে নির্বাচিত পাঠ মাত্র। এই কৃত্রিম সীমাবদ্ধতা ইঙ্গিত করে যে, কোরআনের বর্তমান রূপটি কোনো সংরক্ষিত অলৌকিকতার চেয়ে মানুষের বাছাই প্রক্রিয়ার ওপর বেশি নির্ভরশীল। এটি একই সাথে এই প্রশ্নকেও উসকে দেয় যে, হাফসের মতো একজন বিতর্কিত বর্ণনাকারী যদি ইবন মুজাহিদের তালিকায় স্থান না পেতেন, তবে আজকের ইসলামি বিশ্বের কোরআনের রূপটি সম্পূর্ণ ভিন্ন হতে পারত কি না।
উপসংহারঃ হাফসের দ্বৈত সত্তা
হাফস ইবন সুলাইমানের এই দ্বৈত সত্তা—হাদিস শাস্ত্রে ‘কায্যাব’ (মিথ্যাবাদী), ‘মাতরুক’ (পরিত্যাজ্য) ও ‘মুনকার’ হিসেবে চিরতরে বাতিল, অথচ কোরআনের কিরাআতে ‘ইমাম’ ও ‘মুত্তাওয়াতির’ হিসেবে উন্নীত—ইসলামি ঐতিহ্যের প্রামাণ্যতার মূলে একটি গভীর, অপূরণীয় ও পদ্ধতিগত ফাটল উন্মোচন করে যা আর কোনোভাবেই ঢাকা যায় না। উসুলুল হাদিসের যে নির্মম ও অক্ষমাযোগ্য মানদণ্ড সামান্যতম স্মৃতিভ্রম, একবারের চারিত্রিক অসংগতি বা সনদের ত্রুটিকেও ক্ষমার অযোগ্য মনে করে এবং সেই রাবির সমস্ত বর্ণনাকে ‘বাতিল’ করে দেয়, সেই একই মানদণ্ডে হাফস কেবল দুর্বল নন—বরং সরাসরি ‘মিথ্যাবাদী’ ও ‘পরিত্যাজ্য’ হিসেবে চিহ্নিত।
এই ঐতিহাসিক বাস্তবতাকে পাশ কাটিয়ে তাঁরই বর্ণিত কিরাআতকে ‘ঐশ্বরিক’ ও ‘অপরিবর্তনীয়’ বলে গ্রহণ করা ইঙ্গিত করে যে, ইসলামের তথাকথিত সংরক্ষণ পদ্ধতি কোনো অখণ্ড, অভিন্ন বা ঐশ্বরিক যুক্তির ওপর দাঁড়িয়ে নেই। বরং এটি সম্পূর্ণ ক্ষেত্রবিশেষে আপস, দ্বিমুখী নীতি এবং প্রয়োজন-অনুসারে-নিয়ম-বদলানোর ওপর প্রতিষ্ঠিত। ১৯২৪ সালের কায়রো মুশাফের মাধ্যমে হাফসের পাঠকে যেভাবে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের বলে বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে—যেখানে মিশরের রাজা ফুয়াদের নির্দেশে আল-আজহার কমিটি শুধু প্রশাসনিক সুবিধার জন্য এই পাঠকে সরকারি মানদণ্ড বানিয়েছে—তা কোনো অলৌকিক শ্রেষ্ঠত্বের কারণে নয়, বরং বিংশ শতাব্দীর রাজনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সুবিধাবাদের চূড়ান্ত ফল।
পরিশেষে, হাফস ইবন সুলাইমানের দ্বৈত সত্তা ইঙ্গিত করে যে, ইসলামের সনদ-ব্যবস্থা কোনো নিরপেক্ষ বিজ্ঞান নয়। এটি একটি নমনীয় কাঠামো যা প্রয়োজন অনুযায়ী সত্যের সংজ্ঞা বদলাতে পারে। হাদিসের ‘মিথ্যাবাদী’ যখন কোরআনের ‘ইমাম’ হয়ে ওঠেন, তখন ‘শব্দে শব্দে সংরক্ষিত’ হওয়ার দাবিটি একটি তাত্ত্বিক অসামঞ্জস্যতে পরিণত হয়। এটি স্পষ্ট করে যে, কোরআনের বর্তমান রূপটি ঐশ্বরিক সংরক্ষণের ফল নয়, বরং মানুষের রাজনৈতিক নির্বাচন ও ইতিহাসের ঘাত-প্রতিঘাতের ফসল।
তথ্যসূত্রঃ
- Ibn Hajar, Tahdhib al-Tahdhib, entry on Hafs ibn Sulayman ↩︎
- Al-Dhahabi, Mizan al-I’tidal, vol. X ↩︎
- Ibn Abi Hatim, Al-Jarh wa al-Ta’dil ↩︎
- হাদিস শাস্ত্রের পরিভাষা পরিচিতি, লেখক: সানাউল্লাহ নজির আহমদ, সম্পাদনা: আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া, প্রকাশক: ইসলাম প্রচার ব্যুরো, রাবওয়াহ, রিয়াদ, ইসলামহাউজ, পৃষ্ঠা ৩২০ ↩︎
- ابن عاشور – محمد الطاهر بن عاشور ↩︎
- Gabriel Said Reynolds, The Qur’an and the Bible: Text and Commentary, p. 3 ↩︎
- Ingrid Mattson, The Story of the Qur’an, p. 129 ↩︎
- শাদি নাসের, দ্য ট্রান্সমিশন অফ দ্য ভেরিয়েন্ট রিডিংস অফ দ্য কোরআন, পৃ. ৩৮ ↩︎
